করোনা আঘাত ও খাদ্য নিরাপত্তা

করোনা দুর্যোগ মোকাবিলার মধ্যদিয়ে জীবনপ্রবাহের  স্রোতকেও গতিশীল রাখতে হবে। অর্থাৎ করোনা মহামারীকে প্রতিহত করে জীবনপ্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে রাজনীতিকদের। বর্তমান বিশ্ব করোনার আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত। এই বিধ্বস্ত অবস্থাকে মেরামত করতে হবে রাজনীতির দূরদর্শী নীতিনির্ধারণের দৃষ্টি দিয়ে। এই মহাদুর্যোগের মধ্যে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা হুশিয়ারি দিয়েছে, আগামীতে খাদ্যপণ্যের অভাবে পৃথিবীতে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। এই দ্বিতীয় দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হবে দক্ষ হাতে স্বচ্ছ মনোজতত্ত্বের মাধ্যমে। বিজ্ঞাননির্ভর পৃথিবীর বিজ্ঞানের আশীর্বাদে কৃষিক্ষেত্রে ঘটেছে বিপ্লবিক উন্নতি। পৃথিবীর একমাত্র ষড়ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। সদা উর্বর পলিমাটি, এই মাটিতে এখন পৃথিবীর অনেক ফল ও ফসল সার্থক উৎপাদন হয়। যেমন ড্রাগন ফল, আরব  দেশের খোরমা খেজুর, স্ট্রবেরি, আঙুর, মালটা, কমলা, মাসরুম, ক্যাপসিকাম, ব্রোকলি এ দেশে এখন প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে এবং এগুলো বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে, অর্থাৎ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। করোনা মহামারীর আক্রমণে লন্ডভন্ড হয়েছে কৃষিক্ষেত্রও। এই বর্ষার পরই রবিশস্যসহ ফসল উৎপাদনের মৌসুম শুরু হবে সারাদেশে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষি বিষয়ে বাংলার কৃষকের অভিজ্ঞতা হাজার বছরের। বর্তমান প্রযুক্তির ফলে মাটি পরীক্ষা, কীটনাশক, রাসায়নিক সার,  জৈবিক সার বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড বীজ, সেচব্যবস্থা এসবের সঠিক সমন্বয় করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ। করোনা আক্রমণ প্রতিহত করার সব যোগ্যতা হারিয়েছে বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাই বলতে চাই, এই অবস্থার কথা মনে রেখে কৃষি ব্যবস্থাকে সঠিক সমন্বয় করার এখনই সময়। বর্তমান জীবনযাত্রার মান ঊর্ধ্বগতির জন্য ঢাকা শহর থেকে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তরা করোনা দুর্যোগের কারণে গ্রামে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এসব কর্মঠ মানুষকে বন্যা-পরবর্তী কৃষি ব্যবস্থায় সংযুক্ত করার সঠিক পরিকল্পনা করে কৃষিক্ষেত্রে জাগরণ তৈরি করা সম্ভব। এর জন্য সমবায় ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্র“প করে কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশুসম্পদ, মৎস্যসম্পদ বিকাশে বিজ্ঞানভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সঠিক সময় এখন বলা যেতে পারে। এই যে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ তার নিজ গ্রামে আয়ের উৎস পাবেন, যিনি মানসিক শক্তিতে পরিপূর্ণ হবেন। মানসিক শক্তির কথা এজন্য বলছি যে, করোনা দুর্যোগের কারণে কর্মঠ মানুষগুলো মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে, কর্মহীনতার কারণে। কাজের মানুষকে কাজ দিলে সে সুস্থ থাকে, আত্মবিকাশে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। অর্থাৎ বন্যা বা বর্ষাকালের পর শরৎকালের শুরুতে কৃষিক্ষেত্রে কর্মতৎপরতা লক্ষ করা যায়। কৃষককে স্বাবলম্বী বলা যায় তখন যখন তার হাল-বলদ আছে, সেচব্যবস্থার নিশ্চয়তা আছে, নিজস্ব বেছন ঘর বা বীজঘর। এখন কৃষকের হাল-বলদ বা সেচব্যবস্থা থাকলেও কিন্তু তার বেছন ঘরটি এখন আর  নেই। এই বেছন ঘর বা বীজঘর চলে গেছে বহুজাতিক  কোম্পানির হাতে। ফলে বীজের আর রাসায়নিক সারের জন্য কৃষক পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কর্মসূচি থাকা একান্ত জরুরি যে, হাজার বছর ধরে বাংলার কৃষকের যে বীজঘর ছিল তাকে আবার পুনর্নিমাণ করা অর্থাৎ প্রত্যেক কৃষকের নিজস্ব একটি বীজঘর থাকবে। এর জন্য সরকারি পর্যায়ে কৃষককে সহায়তা করে কীভাবে এটা বিজ্ঞানভিত্তিক হবে এবং আরও উন্নত হবে তার দেখভাল করা তা হলেই হবে সেই বীজঘরটি বিজ্ঞানভিত্তিক। রাসায়নিক কীটনাশক বিদেশ থেকে আনতে হয়, কিন্তু বর্তমান উন্নত বিশ্বে জৈব সারের ওপর জোর দিয়েছে তাই আমাদেরও উচিত দেশীয় লতাগুল্ম উদ্ভিদ থেকে কীটনাশক  তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রাচীন বাংলায় নিশিন্দা পাতা, নিমপাতা, ভাটপাতা, ইস কাটালি বিষ কাটালি দিয়ে কীটনাশক তৈরি করে ব্যবহার করত তৎকালীন কৃষকরা। এ রকম বহু উপাদান আছে এই সোনার বাংলাদেশে। আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদন করা গেলে আর বিদেশ থেকে কীটনাশক আনার নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যাবে। রাসায়নিক সার জমির ক্ষত করে আর জৈব সার জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। প্রাচীন বাংলায় জৈব সারের বহুল ব্যবহার ছিল। বাংলার কৃষক অনেক সাবধান তারা আফ্রিকান মাগুরকে বর্জন করেছে, কারণ আফ্রিকান মাগুর দেশীয় ছোট মাছ খেয়ে  ফেলে এবং বলা হয় এই মাগুর কি না খায়! এসব মাগুর কারা এনেছে, কারাই বা অনুমোদন দিয়েছে ? বাংলাদেশের পরিবেশের সঙ্গে এরা মানানসই হবে কিনা ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছিল? এসব ক্ষতিকারক জিনিস যেন এ দেশে ঢুকতে না পারে সেদিকে বর্তমান সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এতকিছুর পরও মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান অন্যতম, যা নিঃসন্দেহে সুখবর। তবে একটি বিষয় আমার কাছে মনে হয়েছে খামারে উৎপাদিত সব মাছের স্বাদ প্রায় একইরকম (চিংড়ি মাছ বাদে) এর কারণ হিসেবে আমি দেখেছি যে, সব মাছের খাবার প্রায় একইরকমের যার কারণে সব মাছের স্বাদ একই হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোন কোন মাছের কী কী খাবার হতে পারে তার তালিকা তৈরি করে দিতে মৎস্য বিভাগ। তবে খামারি মাছে স্বাদ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হবে। দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হচ্ছে, তবে অনেকটা অগোছালোভাবে। রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞানমনস্ক তদারকি নিয়মিত করা প্রয়োজন। দুধের কথা বলতে গিয়ে মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি ভারত চন্দ্র রায় গুনাকারের কবিতার দুটি লাইন মনে পড়ল, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।’ বাংলার আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ছবিটি এঁকে দিয়েছে আমার হৃদয়ে। এই স্বপ্ন আমার বাস্তবায়িত হতে পারে বাংলার কৃষি সুসম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে। কবির একটি লাইন আমার জীব স্বপ্ন হয়ে আছে, আশা করি আমার মতো অনেকেরই। আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল, পৃথিবীতে সম্ভবত এত বড় সুমিষ্ট ফল আর নেই। সারাদেশে পরিকল্পিতভাবে কাঁঠাল চাষের বিস্তার হলে দেশের মানুষ প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি লাভ করতে পারত। এসব কৃষিপণ্য সারা বছর সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নেই, ফলে অনেক পণ্য মৌসুমের পর আর পাওয়া যায় না, পর্যাপ্ত হিমাগার থাকলে সুলভমূল্যে এসব ফল সারা বছর পাওয়া যেত। সেই সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে জুস প্লান্ট। কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা জুস প্লান্ট করার মতো পর্যাপ্ত ফল উৎপাদিত হচ্ছে আমাদের দেশে। পশুসম্পদের  ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে তার প্রমাণ গত ২-৩টি  কোরবানির ঈদের চাহিদা দেশীয় উৎপাদন থেকে মেটানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সংঘাতময় পৃথিবীতে ২টি প্রধান যুদ্ধ চলছে- ১. বুলেটের যুদ্ধ ২. পণ্যের যুদ্ধ। বুলেটের যুদ্ধ চলছে খন্ড খন্ড আর পণ্যের যুদ্ধ চলছে বিশ্বজুড়ে। ষড়ঋতুর এই সোনার দেশের পলিমাটিতে বহুজাতীয় ফল, ফসল উৎপাদিত হয়। বলা হয়, আদারে-বাদারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিলেই জন্মে ফসল। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ কর্মক্ষম। তাদের কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত করতে পারলে বাংলাদেশে কৃষির এক  বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটত। ক্রমে ক্রমে বাংলাদেশের স্বরূপ  সোনার বাংলায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। সফলতাই প্রতিটি জীবনের লক্ষ্য। এই সফলতা অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কর্ম। মানুষকে কর্মপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে রাষ্ট্রের। কর্মপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকলেই মানুষ কর্মকান্ডে বিভোর থাকে, জীবন স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিকল্পিত হয়। সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম কৃষিবিদ ও আবহাওয়া বিজ্ঞানী খনার কথা আমাদের মনে আছে। তার জ্ঞান বচন হিসাবে প্রচলিত আছে এই উপমহাদেশে। যাকে খনার বচন বলা হয়। কৃষিক্ষেত্রে তার বাণীর গ্রহণযোগ্যতা এখনো অনেক বেশি। বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্র সুপরিকল্পিত করতে খনার বচনকে লিফলেট আকারে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারে কৃষি বিভাগ। বাংলাদেশে কয়েকশ প্রজাতির আম ও কয়েকশ প্রজাতির ধান আবহমানকাল ধরে জন্মাচ্ছে। সম্ভবত খুব কম দেশেই পাওয়া যাবে, একটি ধানে দুটি চাল। এই জাতের কিছু ধান ২০০৭ কী ২০০৮-এর দিকে পাওয়া গেল দিনাজপুর জেলার বিরামপুর অঞ্চলে। পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হলো। আমার এক ভক্তের মাধ্যমে কয়েকটি ধান আমি সংগ্রহ করেছি। ১টি ধানে ২টি চাল এবং ২টা চালই পুষ্ট। এই ধানের বিস্তার ঘটাতে পারলে এক পরিশ্রম ও ব্যয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন পাওয়া যাবে। আমি কৌতূহলবশত গত বছর বিরামপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি যে, তারা এই সংবাদটি শুনেছিলেন, তবে বিরামপুরে এই ধানের নমুনা তাদের সংগ্রহে নেই। পরে আমি ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারি যে, তাদের কাছে এরকম ধানের কিছু নমুনা আছে এ বিষয়ে তারা গবেষণাও চালিয়ে যাচ্ছে। এই গবেষণা সফল হলে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে আর এক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে যে, করোনার দুর্যোগের কারণে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। তার পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা কি খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করেছে? তবে, দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকার বহু  দেশে ক্ষুধাপীড়িত অঞ্চলে দ্রুত উৎপাদনশীল ইরি ধানের প্রজেক্ট চালু করতে পারত বহু আগেই। এ ক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। এ সময় বিশ্ব সংস্থাগুলোর পরিকল্পনায় নমুনা প্রকল্প থাকতে পারে দেশে দেশে। লেখক ঃ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ভাস্কর্য শিল্পী

 

আরো খবর...