করোনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি ও বর্তমান বাস্তবতা

একমাত্র ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, আর কেউ সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দুর্যোগ মোকাবিলায় সংঘবদ্ধ করতে পারেনি, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মেনেই আমাদের পথ চলতে হবে। আমরা কথায় কথায় জাতীয় ঐক্যের কথা বলি। কিন্তু জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কি সম্ভব? যদি সম্ভব না হয় তাহলে কীভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা করব? বিশ্বের এখন বড় সংকট করোনা। এ সংকটের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশেষ করে কর্মজীবী মানুষ যাদের দিন মজুরিতে সংসার চলে, তারা প্রায় অস্তিত্বহীনতার সম্মুখীন। তাদের বেঁচে থাকাটা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধনী দেশগুলোর সংকটের প্রকৃতি এক রকম। আর অপেক্ষাকৃত দরিদ্র, সম্পদহীন দেশের সংকটের গভীরতার মাত্রা অনেক বেশি। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, এ সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কারা- তবে অবশ্যই বলতে হবে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। আর গোটা বিশ্বে খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি। শিল্পন্নোত দেশে শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল শিল্পসমূহ- যা করোনার কারণে আজ দুই মাসের বেশি সময় বন্ধ। সেখানেও শিল্পপতিরা শ্রমিকের বেতন দিতে অক্ষম। উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকলে অর্থনীতি অচল হয়ে পড়লে যে কি ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে সে অভিজ্ঞতা ইতিপূর্বেই বিশ্ববাসীকে উপলব্ধি করতে হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এটাকে যদি প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে ধরা হয় তাহলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই যে বিশ্ব সভ্যতাকে সাময়িকভাবে পরাজয়বরণ করতে হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোন দেশের কত ক্ষতি হয়েছে, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা হয়নি। তবে, ইউরোপের সম্পদশালী দেশসমূহ  যেমন- ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও আমেরিকার মতো দেশে যে ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। যদি জনক্ষয়ের কথা ধরি তাহলে ৫ লাখ লোক ইতিপূর্বেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে তার ১ লাখের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। জনক্ষয়ে ইতালি প্রথমে সর্বোচ্চস্থান দখল করে নিলেও এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। অনেকেই একে ৩য় বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে দ্বিমত পোষণ করে বলতে হয় যে, বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এরূপ সর্বাত্মক ছিল না। অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে অচল করে দিয়ে এভাবে মানব সমাজকে বিশ্বযুদ্ধ অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়নি। তা ছাড়া বিশ্বযুদ্ধে মিত্র ও শক্রপক্ষ ছিল চিহ্নিত। আক্রমণ হয়েছে কিন্তু প্রতিরোধও হয়েছে। উভয়পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু করোনার যুদ্ধ তো আরও ভয়াবহ। শক্রর গতি প্রকৃতি তো অজানা। একের পর এক দেশে আক্রান্ত হয়েছে। করোনা বিজয়ী হচ্ছে মানুষ কিন্তু তারা তো প্রতিরোধ করতে পারছে না। আত্মসমর্পণের পথ ধরেই এগোতে হচ্ছে। একটা শিক্ষাই হয়তো অনেকেই পেয়েছে। প্রকৃতি বিজয় করে মানুষ টিকে আছে। মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই প্রকৃতির অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ব প্রকৃতি যদি বিরূপ হয়, তাহলে মানুষকে তা সহ্য করেই বেঁচে থাকতে হয় অথবা মরে যেতে হয়। আর প্রকৃতি কখন কীভাবে আঘাত করে, তা পূর্ব থেকেই বলা কঠিন। আমরা ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাস সব কিছুই এখন বুঝতে শিখেছি। ভাইরাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা আছে। কিন্তু একটা ক্ষুদ্রতম ভাইরাস যে কী রূপ ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে, ভাবতে বিস্ময় জাগে মনে। তার গতি-প্রকৃতি আমাদের এখনো অজানা। এ নিয়ে প্রচুর গবেষণা করতে হবে। বিজ্ঞানীরা শত চেষ্টা করেও গবেষণায় সফল হতে পারছেন না। এ পর্যন্ত করোনা প্রতিরোধে যা করা হয়েছে তা আত্মরক্ষামূলক। চ্যালেঞ্জ করে জীবাণুকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া এখনো কার্যকর হয়নি, তবে চেষ্টা চলছে। যা করা হয়েছে, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আইসোলেশন, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা। কোয়ারেন্টিনের প্রতিটি পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে জীবাণুর সংস্পর্শে থেকে দূরে থাকা। জীবাণুকে সংক্রমিত হতে না দেওয়া। কিন্তু এর কোনোটিই একটা সক্রিয় সমাজে সফল করা সম্ভব না। ধরুন আইসোলেশন, সম্পূর্ণ আইসোলেশনে থাকা সম্ভব কি? সমাজে বাস করে সমাজ  থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব কি? দায়বদ্ধতার মাধ্যমেই তো সমাজ সক্রিয়। প্রতিনিয়তই আমাদের প্রয়োজন প্রতিবেশীর সঙ্গে সংযোগ। সংসার নামক যে প্রতিষ্ঠান আমরা পরিচালনা করি, তা কি বিচ্ছিন্নভাবে করা সম্ভব! যেখানে লাখ লাখ মানুষকে বাইরে কাজ করতে হয়, সেখানে প্রত্যেকটি মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট স্পেস  রেখে চলা সম্ভব কি? হাট-বাজার, স্কুল-কলেজে কতটুকু দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, কে তা কার্যকর করবে। প্রতিটি মানুষের জন্য  তো একজন নিরাপত্তা কর্মী দেওয়া সম্ভব না। আসুন হোম  কোয়ারেন্টিনের ব্যাপারে এমন কতটা বাসস্থান যেখানে এক ব্যক্তিকে একটা কক্ষ সুযোগ-সুবিধাসহ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়।  যে দেশে একটা কক্ষে একটা পরিবার থাকে এবং ছেলেমেয়েরা বলতে গেলে রাস্তায় মানুষ হয়, তাদের তো কোয়ারেন্টিন করার প্রশ্নই ওঠে না। তা ছাড়া স্বভাবগত কারণেই মানুষের পক্ষে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা সম্ভব নয়। একই বাসায় থেকে এক ব্যক্তিকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করা মোটেও সম্ভব নয়। তাই ধনী বা গরিব যে দেশের কথাই বলি না কেন এ পর্যন্ত আত্মরক্ষার এই ধীরনীতি কার্যকর সম্ভব হয়নি। যেখানে কিছুটা সম্ভব হয়েছে,  সেখানে সুফল পাওয়া গেছে। আর যেখানে করা যায়নি সেখানে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে যেমন আমাদের দেশ। আসলে অর্থনীতি অচল করে দিয়ে করোনা প্রতিরোধের যে পদক্ষেপ তা তো ইতিপূর্বেই অকার্যকর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ২/৩ মাস পার হয়েছে। এমন কি উন্নত-সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী যেসব  দেশ, তারা তো স্কুল- কলেজ শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দিয়ে করোনা প্রতিরোধে  নেমেছে। তারপর তাদেরই অবস্থার কিছু উন্নতি হলেই কঠোর নির্দেশনা শিথিল করা হচ্ছে। আর একটা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে, সেটা মনস্তাত্ত্বিক। গৃহবন্দী অনেকেই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় পড়েছেন। এ সমস্যার প্রকৃতি শিশুদের জন্য এক রকম, বৃদ্ধদের জন্য এক রকম। এ অবস্থা  বেশিদিন চলতে থাকলে সমাজে যে মানসিক বিপর্যয় শুরু হবে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। তারপর এতকিছু করে যে দেশটিতে এটা শুরু হয়েছে সেই চীনে আবার জনগণ নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল পরিস্থিতির অবনতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই হয়ে উঠবে অটো ইমিউনিটি সৃষ্টি হবে কিন্তু বোধ হয় সেরূপটা হচ্ছে না। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার থেকে অনুমান করা হচ্ছে যে, করোনা সংক্রমণ হয়তো অনির্দিষ্টকাল চলবে। এখন আসি বাংলাদেশের দৃশ্যপটে। যারা সরকার চালাচ্ছেন তাদের ধারণা এ পর্যন্ত তারা যা কিছু করেছেন সঠিকই করেছেন। কিন্তু সবকিছু প্রথম থেকেই সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে করা হয়েছে  কোনো ভুলক্রটি ছিল না, এরূপ দাবি করা বোধ হয় সমুচিত নয়। একথা ঠিক করোনার সৃষ্ট মারাত্মক পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো প্রস্তুতি বাংলাদেশ কেন, পৃথিবীর কোনো দেশেরই ছিল না, তা তো স্বচক্ষে দেখা গেল। আমেরিকার মতো দেশে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২১ লাখ। আর মারা গেছে প্রায় ১ লাখের বেশি। ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি কী হলো ? এখন ব্রাজিলের অবস্থা কী? সবকিছু বিবেচনায় নিলে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ যা করেছে তা অপ্রতুল হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় নয়। তবে এখানে একটা মারাত্মক বিষয় হচ্ছে সরকারবিরোধীদের ভূমিকা। নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থকে বর্জন দিয়ে তারা কোনো কিছু করছেন বা বলছেন না। তারা ক্ষমতায় থাকলে করোনা বাংলাদেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারতো না। সরকারবিরোধী দলে যে ভালো লোক নেই তা নয়। তবে অধিকাংশ  লোকই তারা নীরব। আজ পরোক্ষভাবে বিরোধী দলের অবস্থানকে সমর্থন জানাচ্ছেন। একমাত্র ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, আর কেউ সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দুর্যোগ মোকাবিলায় সংঘবদ্ধ করতে পারেনি, এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মেনেই আমাদের পথ চলতে হবে। আমরা কথায় কথায় জাতীয় ঐক্যের কথা বলি। কিন্তু জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কি সম্ভব? যদি সম্ভব না হয় তাহলে কীভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা করব? লেখক ঃ রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

 

আরো খবর...