করোনায় ক্ষতিগ্রস্থ মিরপুরের বাঁধাকপি চাষীরা

হাবিবুর রহমান ॥ গ্রীষ্মকালীন সবজিতে অধিক লাভ হয় প্রতিবছরই। তবে এবছর গ্রীষ্মকালীন বাঁধা কপি চাষ করে লষের আশঙ্কা করছে কৃষকরা। এমনকি এসব বাঁধাকপি বিক্রি করে লেবার খরচও উঠছে না। লেবার খরচ এবং পরিবহনের কথা চিন্তা করে কৃষকের বাঁধা কপি এখন ক্ষেতেই পঁচে যাচ্ছে। উঠানোর খরচের ভয়ে কাটছেন না বাঁধা কপি। এদিকে স্থানীয় বাজারে যার দাম ২-৫ টাকার মধ্যে। মাঠ থেকে যা আনতেই খরচ হয়ে যায় ৩-৪ টাকা। কৃষকরা দাবী করছেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বাঁধাকপি জেলার বাইরে পাঠাতে পারছেন না। বাইরে থেকে পাইকারী ক্রেতারাও আসছে না। তাই বাঁধাকপি না কাটার কারণে ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মালিহাদ এলাকার কৃষক সিহাব উদ্দিন। তিন বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন বাঁধাকপির চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত একটা বাঁধা কপিও বাজারে বিক্রি করতে পারেননি। ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার বাঁধাকপি। গতবছর বেশ ভালো ফলন পেলেও বাঁধাকপিতে এবার পুরো লসের আশঙ্কা করছেন তিনি। সিহাব উদ্দিন জানান, শীতকালে এই এলাকায় ব্যপক হারে সবজির চাষ হয়। এর মধ্যে বাঁধা কপি অনেকটায়। এই এলাকায় বাঁধাকপিটা অনেক ভালো হয়। তবে শীতকালের তুলনায় গ্রীস্মকালের বাঁধা কপিটার দাম তুলনামুলকভাবে বেশি পাওয়া যায়। বাজারে এসময় চহিদাও বেশ ভালো থাকে। বিগত কয়েক বছর ধরেই আমি গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপি চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছি। তাই এবারো আমি এবং আমার ভাই উসমান গণি মিলে তিন বিঘা জমিতে গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপির চাষ করেছি। তিনি জানান, নিজেদের জমি হওয়ায় উৎপাদন খরচটা তুলনামুলক কম। সেই সাথে জৈব সার ব্যবহারের ফলে রাসনায়নিক সারও কম লাগে। আর রোগবলাই ও কম দেখা যায়। গত বছর আমি ৮-১০ হাজার টাকা বিঘাপ্রতি খরচ করেছিলাম। বাজারো বেশ ভালো ছিলো। বিঘাপ্রতি ৭০-৮০ হাজার টাকার বাঁধাকপি বিক্রি করেছিলাম। তিনি বলেন, এবছর বিঘাপ্রতি ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার বাঁধাকপির চারা রোপন করেছি। গাছ এবং কপিও বেশ ভালো হয়েছে। ক্ষেতে কোন রোগ বলাই হয়নি। সেই সাথে আবহাওয়াও বেশ অনুকুলে ছিলো। গত বছর প্রতি পিস বাঁধাকপি আমি পাইকারী জমি থেকেই ১৫-২০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলাম। তিনি আরো জানান, এবছরও প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকার মতো বা তারও বেশি হতো। তবে এই করোনা ভাইরাসের কারণে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কম। সেই সাথে রাস্তায় গাড়ী চলাচলে অসুবিধা, বাইরের জেলার ক্রেতারা আসছে না। যেই বাঁধাকপি জমি থেকেই পাইকারী দামে ক্রেতারা কিনে নিয়ে যায় সেখানে কোন ক্রেতায় আসছে না। তিনি জানান, বাজারের যে অবস্থা প্রতি পিস বাঁধাকপি ৩-৪ টাকা। স্থানীয় বাজারে কপি ২-৩ টাকা করে। জমি থেকে তুলে বাজারে নিতে যা খরচ তার চেয়ে কপির দাম কম। এমন থাকলে কপি কাটা লেবারের দাম উঠবে না। কৃষক উসমান গণি জানান, জমির বাঁধাকপি বিক্রির উপযুক্ত হয়েছে ৭-৮ দিন আগেই। এই করোনার জন্য এবং দামের যে অবস্থা এজন্য বাঁধাকপি কাটিনি। এর উপরে আবার দুদিন বৃষ্টি হলো। এতে ক্ষেতের কপি এখন ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে। বাইরের জেলার ক্রেতারা না আসলে তো এবার পুরোটাই লস হয়ে যাবে। কৃষক হারুন জানান, প্রতিবছরই এই এলাকায় বাঁধাকপির দাম বেশ ভালো থাকে। করোনার কারণে একদম কম। আমরা ক্ষেত থেকে বাঁধাকপি তো তুলবো কিন্তু বেঁচবো কোথায়। ১ টাকা ২ টাকা দামে বিক্রি করতে হবে। এর চেয়ে জমিতে থাকায় ভালো। লেবার খবর, গাড়ী ভাড়া ঘর থেকে দিতে হবে এমন হলে। আবুরী মাঠপাড়া এলাকার কৃষক আক্তার আলীও অধিক লাভের আশায় এক বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন বাঁধাকপির চাষ করেছেন। তারও একই অবস্থা। বাজারে দাম ও চাহিদা না থাকায় তিনিও বিক্রি করতে পারছেন না বাঁধাকপি। তিনি জানান, প্রতিবছর এ সময় বাঁধাকপির বেশ দাম ভালো পাওয়া যায়। তাই এবছর গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপির চাষ করেছি। কিন্তু এবার করোনার কারণে বাজারে লোকও নেই, দাম ও নেই। এক টাকা, দুই টাকায় কপি বিক্রি করে কোন খরচই উঠবে না। আবুরী এলাকার কৃষক তুজাম আলী জানান, এবছর গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপি চাষ করে আমরা বিপাকে পড়েছি। দাম নেই বাজারে। বাঁধাকপি কাটা, বাজারে নিয়ে যাওয়া যে খরচ সেটাও ঘর থেকে দিতে হবে মনে হচ্ছে। প্রতবছর ক্রেতারায় জমিতে এসে নিয়ে  যেতো। করোনার কারণে বাইরে থেকে ক্রেতারা আসতে পারছেন না। তবে এসব চাষীদের দাবী, স্থানীয় বাজারের চেয়ে প্রতিবছর জেলার বাইরে থেকে ক্রেতারা আসেন। তাদের মাধ্যমে বিক্রি করলে বেশ ভালো লাভ হয় তাদের। সরকারী কোন উদ্যোগ ছাড়া এসব বাঁধাকপি ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাবে বলে জানায় কৃষকরা। জেলার অন্যতম বৃহত্তর পাইকারী কাঁচা সবজির বাজার দৌলতপুর উপজেলার খলিসাকুন্ডি বাজার। করোনার কারণে সেখানেও নেই ক্রেতার তেমন উপস্থিতি। বাইরে থেকে ক্রেতারাও তেমন আসছে না। খলিসাকুন্ডি কাঁচা বাজারের পাইকারী ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম জানান, করোনার কারণে বাইরের ক্রেতারা ঠিকমতো আসছে না। আমরাই সবজি বাইরে পাঠাতে সমস্যায় পড়ছি। বাঁধাকপির ক্রেতা না থাকায় বাজারে দাম একদম কম। পাইকারী ৪-৬ টাকা পিস হিসাবে বিক্রি হচ্ছে। আমলা সবজি বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা আশরাফুল আলম সেতু জানান, বাজারে অন্য সময়ের তুলনায় বাঁধাকপির দাম অনেকটাই কম। পাইকারী ৪-৬ টাকা দরে আমরা কিনছি। আমদানীর উপরে এর দাম নির্ভর করে। খুচরা প্রতিটা বাঁধাকপি ৮-১০ টাকায় বিক্রি করছি। কুষ্টিয়া শহরের রাজার হাটের পাইকারী বাজারের সবজি ব্যবসায়ী রিয়ন আলী জানান, কিছুদিন আগে বাঁধাকপি কেজির দামে বিক্রি করেছি। এখন সেটা পিস হিসাবে। দাম কমেছে প্রায় অর্ধেক। ১০ টাকা কেজির দরের বাঁধাকপি এখন গোটাটায় ১০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে রাজশাহীর সাহেব বাজার এবং পাবনার বড় বাজারের সবজির আড়তদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেখানেও গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপির দাম খুবই কম। ক্রেতার সংখ্যা কম থাকায় এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্য মুল্য পায় এজন্য সরকার ২০১৫ সালে আবুরী এলাকায় কৃষি পণ্য সরবাহ ও বিপনন কেন্দ্র স্থাপন করে। সেখানে উক্ত এলাকার ২০জন কৃষকদের সমন্বয়ে একটি কমিটির মাধ্যমে উক্ত বিপনন কেন্দ্রটি পরিচালিত হওয়ার কথা। তারা কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে পুরো ইউনিয়নের সবজি কিনে জেলার বাইরে যেখানে চাহিদা ভালো সেসব বাজারে বিক্রি করে লভাংশের টাকা কমিটির অন্যান্য সদস্যের মাঝে বন্টন করা। তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ ঐ বিপনন কেন্দ্রের জমির মালিক জুমারত আলী সে নিজের ইচ্ছা মতো কেন্দ্রটি ভোগ দখল করে আসছে। তিনি ব্যক্তিগত কাজে সেটি ব্যবহার করেন। তারা কৃষকদের কোন পণ্য কিনতে চাই না। আর সবজি চাষীদের বিভিন্ন হয়রানি করার কারণে তারাও সেখানে যেতে চাই না। আবুরী কৃষি পণ্য বিপনন কেন্দ্রের সাধারন সম্পাদক জুমারত আলী জানান, কৃষি পণ্য বিপনন কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায়, মিরপুর উপজেলার ঝুটিয়াডাঙ্গা, আবুরী এলাকার বেশ কয়েকজন কৃষক প্রতিবছরই গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপির চাষ করে। এবছরও প্রায় ১০-১২ বিঘার মতো জমিতে তারা বাঁধাকপির চাষ করেছে। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, গ্রীস্মকালীন বাঁধাকপি চাষটা বেশ লাভজনক হওয়ায় মিরপুরের বেশ কয়েকজন কৃষক এ বাঁধাকপির চাষ করে থাকেন। প্রতিবছর তারা বেশ ভালো দাম পেয়েছে। বিঘাপ্রতি খরচ বাদ দিয়ে ৫৫-৬০ হাজার টাকা করেও লাভ করেছে। বিগত বছর দেখা গেছে পাইকারী ক্রেতারা এসে কৃষকদের জমি থেকেই ভালো দামে বাঁধাকপি কিনে নিয়ে গেছে। তবে এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে একটু অসুবিধা হচ্ছে। দাম অনেকটাই কম। তবে কৃষকরা যাতে ন্যায্য দামে বাঁধাকপিসহ অন্যান্য সবজি বিক্রি করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ঢাকার পাইকারী বাজারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাতি পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারে এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসরাণ অধিদপ্তর থেকেও আমাদের নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে। সে মোতাবেক আমরা কাজ করছি। জেলার বাজার কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, বাজারে বাঁধাকপির চাহিদা অনেকটাই কম। আর বাঁধা কপিটা শীতকালীন সবজি হওয়ায় সে সময় উৎপাদন বেশি হয়। কৃষকরা যাতে ন্যায্য মুল্যে বিক্রি করতে পারে এ জন্য অন্যান্য জেলার বাজারের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। কৃষি পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে বলেও জানান তিনি।

 

 

আরো খবর...