করোনার সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ

মারাত্মক মরণব্যাধির নাম করোনাভাইরাস। এর আক্রমণ শুরু হয়েছিল গত ৭ মাস আগে। তখন একমাসে আক্রান্ত হয়েছিল ১০ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল কম। পরে ১ মাসে আক্রান্ত হয় ৫০-৬০ হাজার। এখন বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা  দেড় কোটির বেশি। মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু ৫%। অবশ্য সুস্থ হওয়া লোকের সংখ্যাও কম নয়। যদিও চীনের উহান প্রদেশে শুরু হয়েছিল এবং  সেখানে ২ মাসে প্রায় সাড়ে চার হাজার লোক মারা যায়। ভাইরাস ইউরোপে প্রবেশের পর ইতালিতে দ্রুত প্রবেশ করে। আর এখন  তো বিশ্বব্যাপী উচ্চ সংক্রমণ চলছে। ২১০টি দেশে এই ভাইরাস সক্রিয়ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর স্থান হলো ব্রাজিলের, তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। সর্বশেষ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় ভাইরাসের আক্রমণ ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। এ অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ায় আমেরিকার যেসব জায়গায় লকডাউন শিথিল করা হয়েছিল  সেখানে আবার লকডাউন কঠোর করা হয়েছে। আসলে করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির যে ক্ষতি সাধন হয়েছে মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও তা হয়নি। শিল্পোন্নত দেশগুলোয় তো শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। সরকার অনুদান দিয়ে তা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। অর্থনীতির চাকা অনির্দিষ্টকাল বন্ধ থাকলে অনেক দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। অধিকাংশ দেশেই চিন্তা করছে কীভাবে অর্থনীতি মোটামুটি সচল রেখে করোনা নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। একেক দেশ একেক পদ্ধতি অনুসরণ করছে। এখন বৃহত্তম জায়গায় লকডাউনের পরিবর্তে স্বল্পপরিসরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কঠোর লকডাউনের প্রবর্তন করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে প্রথম দিকে লকডাউন যেভাবে সফল হয়েছিল পরে কিন্তু তার ধারা অব্যাহত থাকেনি, কারণ বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণে লকডাউন সফল করা সম্ভব হয়নি। দিনমজুর মানুষ করোনায় মৃত্যুর ভয় করে না। দৈনিক খাবার সংগ্রহে বের হয়ে পড়ে। এদের  ভেতর সৎ চেতনা সৃষ্টি সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা উৎপাদন ব্যবস্থাকে বন্ধ রেখে অর্থনীতিকে অচল করে অনির্দিষ্টকাল লকডাউন রাখা সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময় মত দিয়েছে; তবে টেকসই মতামত এ পর্যন্ত কেউ দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। তা ছাড়া একেক দেশের সংকট একেক রকম। একই দেশের বিভিন্ন স্থানের সংকট বিভিন্ন রূপ। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আবির্ভাব অহরহ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় দ্বারা কখন মানুষ আক্রান্ত হবে ঠিক নেই।  সেখানে তো কোনো কথাই নেই। কী ঘটে চলেছে এবার। করোনায় আমরা যখন বিপর্যস্ত তখন এমন এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলো, প্রায় ১৪টি জেলায় হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন, আশ্রয়হীন, খাদ্যসংকটে পড়ল। এরপর আঘাত হেনেছে বন্যা। সরকারকে করোনার সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়াবহ সাইক্লোনকে  মোকাবিলা করতে হলো। এখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে বন্যাকে। মানুষের আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা দরকার। তারপর পুনর্বাসন- যা করতে যথেষ্ট অর্থের প্রয়োজন হবে। করোনার কারণে প্রায় ৭  কোটি মানুষকে খাবার দিতে চচ্ছে। আমাদের দেশে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা একটু কম হলেও প্রায় তিন হাজার। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২ লাখ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই। রোগটি এখন কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। এখন কোন পথে এগোতে হবে; তা সময় ও বাস্তবতাই নির্ধারণ করে দেবে। অনেকে বলছেন, আমরা বহুসংখ্যক লোকের পরীক্ষা করতে পারছি না বলেই আমরা আক্রান্তের সংখ্যায় কম। তা ছাড়া প্রথম থেকে কঠোর ব্যবস্থা নিলে রোগটি ছড়াতো না। তাই দেশব্যাপী রোগটির বিস্তার ঘটছে। একটা সুনির্দিষ্ট হারে না পৌঁছা পর্যন্ত মনে হয় মৃতের সংখ্যা থামবে না। একথা ঠিক, করোনা ম্যানেজমেন্ট আমাদের কিছু ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারি, বেসরকারি মালিকানাধীন হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে বলে মনে হয় না। আমাদের চিকিৎসকরা ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণের কারণেই তাদের  ভেতর ভীতি সঞ্চার হয়েছে। ভীতি সঞ্চার হয়েছে পুলিশ,  সেনাবাহিনী ও নিয়োজিত নিরাপত্তা কর্মীদের। প্রথমদিকে ডাক্তার, নার্স, পুলিশ-সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছিলেন; এখন তাতে শিথিলতা দেখা দিয়েছে। এটা হয়তো মনস্তাত্ত্ব্বিক কারণে। জীবনের মায়া প্রত্যেকেরই আছে। সহকর্মীদের মৃত্যুবরণ করতে  দেখে অনেকে হয়তো ভয় পেয়েছেন সরকার বিভিন্নভাবে উৎসাহ  জোগাচ্ছেন, প্রণোদনা জোগাচ্ছেন। তবে এটাও ঠিক করোনা  রোগীর চাপ অনেক বেশি। শনাক্ত হলেই মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চায়। তবে ৭৫% রোগী বাসায় রেখে চিকিৎসার  যোগ্য, তবে বাসায় রেখে চিকিৎসা করতে হলে কঠোর শৃঙ্খলা মানতে হবে। রোগীকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে আর যারা সংস্পর্শে আসছেন, তাদেরও আলাদা রাখতে হবে। তবে একই বাড়িতে এরূপ কোয়ারেন্টিন করতে হবে। তবে জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হয়। করোনার কারণে আমাদের সোশ্যাল অর্ডারে একটা পরিবর্তন এসেছে। নতুন করে ভাবতে হবে। কীভাবে চলতে হবে। ব্যক্তিপর্যায়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া যাবে না। কথা-বার্তা, চলাচল, নতুন ভাব-ভঙ্গি প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। নতুন করে যে করোনা সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষ অভ্যস্ত হতে পারেনি। মা-বাবা তার সন্তানদের যেভাবে আলিঙ্গন করেছেন; তা এখনো চলেছে। হাঁচি-কাশি যেখানে-সেখানে থু থু ফেলা এখনো চলেছে। প্রতিদিনের খাবারে যে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন, তা গরিব-দুঃখী মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। যতই সামাজিক দূরত্বের কথা বলি  যেখানে মানুষকে জড়ো হতে হয় সেখানে মানুষকে একটা পরোক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পরিবহণে দূরত্ব বজায় রাখা খুব সহজ ব্যাপার নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশ সরকার অনুমোদন দেওয়ার পর বিশেষব্যবস্থা গ্রহণ করে কার্যকর করা যাচ্ছে না, এর পর রয়েছে অপপ্রচার। বিভিন্ন কারণে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা। যা সত্য নয়; তাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্র। সর্বাত্মকভাবে মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার বিষয় জড়িত; সেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত টেনে আনা কী সমুচিত? করোনার মতো মহাসংকটের মোকাবিলা কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিরোধী দল আছেন; তবে সরকারকে সহযোগিতা করার জন্য নয়। সরকারকে সংকটাপন্ন করাই তাদের লক্ষ্য। বিরোধী দল চেষ্টা করছে রাজনৈতিকভাবে সরকারকে মোকাবিলা করা যখন সম্ভব নয়, তখন করোনার সংকট ঘনীভূত করে তার দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। শুধু বিরোধী দল নয়, কিছু অতি বাম ও দক্ষিণপন্থি বুদ্ধিজীবীরাও এমনভাবে বলছেন ও লিখছেন তাতে মনে হয় এই সরকারেই করোনা নিয়ে এসেছে এবং করোনার জন্য সব সংকটের কারণ এই সরকারি-ই দায়ী। কোনো কোনো বিরোধী দলের  নেতারা টিভির পর্দায় এমনভাবে কথা বলেন, তাদের দল ক্ষমতায় থাকলে এভাবে করোনায় বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যু হতো না, যে সংকট গোটা বিশ্বকে চরম বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে,  গোটা বিশ্ব যা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। সেই সংকটজনিত সব দায়-দায়িত্ব অহেতুকভাবে সরকারকে দায়ী করা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে না। সরকারের ভুলভ্রান্তি আছে, তবে আন্তরিকতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংকট মোকাবিলা করছেন না এটা বলা অত্যন্ত অনুচিত। এখনো কোনো সঠিক প্রতিষেধক বের হয়নি। কবে হবে, তাও বলা যায় না। ঘণ্টায় ঘণ্টায় যে প্রতিষেধক আবিষ্কারের কথা বলা হচ্ছে; তা কার্যকর নাও হতে পারে। হয়তো করোনায় এক নতুন সংস্কৃতির পথে আমাদের যেতে বাধ্য করবে। তা ছাড়া ভ্যাকসিন চিরস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়। করোনা এমন একটা ভাইরাস যার গতি ও প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। হয়তো  দেখা যাবে কয়েক মিলিয়ন ভ্যাকসিন ব্যবহারের পর করোনাভাইরাসের প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে. আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের কতদিন সহাবস্থান করতে হবে, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা যাচ্ছে না। তবে যে নীতি সরকারকে এখন মেনে চলতে হচ্ছে, তা হচ্ছে যতদূর সম্ভব শিল্প-কারখানা ও উৎপাদনব্যবস্থাকে চালু রেখে করোনাকে নিয়ন্ত্রণ করা। অর্থনীতিকে অচল করে দিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণকে সচল করা হয়তো সম্ভব নয়। করোনা সংস্কৃতির রূপ কী হবে, বিশ্বের কোথায় কোন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। দুর্ভাগ্য এই  দেশে। ঘূর্ণিঝড় করোনার পর বন্যা শুরু হয়েছে। প্রকৃতি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে, মানুষ যাবে কোথায়? উপকূল ছেড়ে শহরে আসছে। আর শহরে করোনার কারণে যেতে হচ্ছে গ্রামে। কোথায় পাবে আশ্রয়। করোনায় কাজকর্ম বন্ধ করে দিল। মানুষ বেকার হয়ে গেল। ঘূর্ণিঝড় আম্পান মানুষকে বিতাড়িত করল। আর এখন বন্যা। মানুষ তো বাঁচার চেষ্টা করছে। প্রকৃতি এত বৈরী হলে মানুষ যাবে কোথায়? বাঁচবে কি করে। প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। কবি-সাহিত্যিকরা আমাদের দেশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছেন এবং তা কবিতায়, গল্পে, গানে ও সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মানুষকে ভালোবেসে স্বাধীন দেশে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি কবি গুরু থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর মুখ আর  দেখিতে চাই না। সত্যিই বাংলাদেশ সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি। কিন্তু প্রকৃতি সব সময়ে অপরূপ থাকে না। কোনো কোনো সময়ে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা আমাদের সহ্য করতে হয়। ভূপ্রকৃতি গত অবস্থান ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের কারণে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে চলে আমাদের জীবনপ্রবাহ। কল্পনা ও বাস্তবতা এক জিনিস নয়। কবিরা তার কল্পনার জগৎ নিয়ে লিখে থাকেন। আর বাস্তবতা হচ্ছে মাঝেমধ্যে প্রকৃতি বৈরী অবস্থার কারণে দেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও এ বছরে করোনার মতো প্রাণঘাতী মরণব্যাধির থাবায় জনজীবন বিপর্যস্ত। মানুষ আজ প্রকৃতির কাছে বড় অসহায়। দুঃখিনী বাংলার মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। সোনার বাংলা আজ সত্যিই ক্ষত-বিক্ষত। সুখী-সমৃদ্ধশালী ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় নিয়ে আমরা অগ্রসরমান হচ্ছিলাম, তা চরমভাবে হোঁচট খেয়েছে। শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমরা প্রকৃতিকে জয় করেই সামনে এগিয়ে যাব। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, ইনশাল¬াহ দেশ করোনামুক্ত হবে এবং আঁধার  কেটে যাবে একদিন।

 

আরো খবর...