করোনার প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় বাজেট

॥ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ॥

আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়নের সময় ঘনিয়ে এসেছে। জাতীয় বাজেট যে কোনো দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বছর তা বিশেষভাবে ও অনেক বেশি মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এবারের বাজেট প্রণীত হতে যাচ্ছে, ছয় মাস ধরে চলতে থাকা ভয়াবহ ‘করোনা প্যানডেমিকের’ অভূতপূর্ব বিপর্যয় এবং তার  প্রেক্ষাপটে অর্জিত অভিনব সব অভিজ্ঞতাগুলোর পটভূমিতে। ‘করোনা-দুর্যোগের’ এসব অভিনব অভিজ্ঞতার পটভূমিতে যে বাজেট এবার প্রণীত হবে তা ‘অভিনব’ হবে, এটিই যুক্তির কথা। এটিই স্বাভাবিক কথা। কিন্তু সে ধরনের ‘অভিনবত্ব’ এবারের বাজেটে আদৌ থাকবে কিনা,  সে কথা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সন্দেহ হচ্ছে যে, এবারের বাজেটও হয়তো বা অন্যান্য বছরের বাজেটগুলোর মতোই ‘গতানুগতিক ধারার’ বাজেটই হবে। জনস্বার্থের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটিয়ে এবং বর্তমান ‘করোনা’ পরিস্থিতির কঠিন বাস্তবতাকে যথার্থভাবে বিবেচনায় নিয়ে একটি মৌলিকভাবে ‘নতুন ধারার’ বাজেট প্রণীত হওয়া অপরিহার্য। কিন্তু তা হবে কিনা, সেটিই আজ  দেখার বিষয়। আসন্ন বাজেট সম্পর্কে এটিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমেই দেখা যাক যে, ‘জাতীয় বাজেট’ জিনিসটি আসলে কী? একটি দেশের জন্য ‘জাতীয় বাজেটের’ গুরুত্বই বা কতটুকু? রাষ্ট্রীয় আয়-ব্যয়ের হিসাবকেই ‘জাতীয় বাজেট’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। একটি দেশের বাজেট প্রস্তাবনা হলো পরবর্তী অর্থবছরের জন্য (জুলাই  থেকে পরবর্তী জুন পর্যন্ত) রাষ্ট্রের (তথা সরকারের) আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পিত হিসাবের আনুষ্ঠানিক বিবরণী। অন্যান্য কারণের কথা বাদ দিলেও যে কোনো দেশের ক্ষেত্রে তার ‘জাতীয় বাজেটের’ গুরুত্ব অপরিসীম শুধু এ কারণেই যে, বাজেট হলো ‘জাতীয় আয়ের’ একক বৃহত্তম অংশ। সে হিসেবে ‘জাতীয় অর্থনীতির’ ওপর তার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা হলো সবচেয়ে  বেশি। বাজেটের বিষয়টিকে কোনোমতেই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। ‘জাতীয় বাজেট’ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সংসদই কেবল ‘জাতীয় বাজেট’ প্রণয়নের (ও সেই ভিত্তিতে তার বাস্তবায়নের) ক্ষমতা রাখে। সংসদে অনুমোদিত বাজেট অনুসরণ করে সরকার পরবর্তী অর্থবছরের জন্য কর, শুল্ক,  লেভি ইত্যাদি সংগ্রহ করার এবং রাষ্ট্রের অর্থ খরচ করার আইনগত অধিকার লাভ করে। এ প্রসঙ্গে এ কথাটি বলে রাখা প্রয়োজন যে, রাজনৈতিক- নৈতিকতার বিবেচনা থেকে ‘জাতীয় বাজেট’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সংসদের কতটুকু অধিকার রয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান সংসদের অধিকাংশ সদস্য ‘নৈশকালীন ভুয়া  ভোটে’ সংসদ সদস্য হয়েছেন। সে কারণে বর্তমান সংসদের প্রতিনিধিত্বশীলতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। এই সংসদ নির্বাচনটি ছিল ‘প্রশ্নবিদ্ধ’। আমেরিকার বিপ্লবে অন্যতম স্লোগান ছিল ‘প্রতিনিধিত্বশীলতা ব্যতীত করারোপ নয়’। এসব নিয়ে আরও অনেক কথা বলার আছে। কিন্তু সেসব আজকের লেখার প্রসঙ্গ নয়। সেসব বিষয়ে আলোচনা আজ না হয় স্থগিত থাকুক। আজ বরং শুধু বাজেট প্রসঙ্গ নিয়েই আলোচনা হোক। বাজেট যেহেতু ‘জাতীয় আয়ের’ (জিডিপি) একক বৃহত্তম অংশ, তাই বাজেটের চরিত্র ও স্বরূপের ওপর দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির হালচাল বহুলাংশে নির্ভর করে। অন্যদিকে এ কথাও একই সঙ্গে সত্য যে, ‘জাতীয় বাজেটের’ চরিত্র ও স্বরূপ কী ধরনের হবে, তা নিরূপিত হয় দেশে কোন ধরনের অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা বিরাজ করছে তার দ্বারা। সুতরাং বাজেটের ভেতরেই একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয় একটি দেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যতের গতিধারা। আর এ কথা সকারই জানা আছে যে, একটি  দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে সে দেশের অর্থনীতির হালচাল। তাই দেশের সামগ্রিক চালচিত্র নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বাজেটের গুরুত্ব ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাজেট হতে পারে তিন ধরনের। ‘ঘাটতি’ বাজেট, ‘উদ্বৃত্ত’ বাজেট ও ‘ভারসাম্যমূলক’ বাজেট। এর মধ্য থেকে যে ধরনের বাজেটই প্রণীত হোক না কেন, সব ক্ষেত্রেই মোট জমা ও মোট খরচের পরিমাণকে সমান সমান দেখাতে হবে। বাজেটে জমা-খরচের হিসাব মিলতেই হবে। এদিক থেকে (অর্থাৎ নিছক টেকনিক্যাল দিক থেকে) বিবেচনা করলে বাজেট হলো ক্রেডিট ও ডেবিটের হিসাব মেলানোর একটি কসরত মাত্র। সে অর্থে বাজেট প্রণয়নের কাজটি হলো মূলত একটি ‘অ্যাকাউন্টেন্সির’ কাজ। বাজেট প্রণয়নের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকে আজ কার্যত ক্রেডিট ও  ডেবিটের হিসাব মেলানোর ‘কৈরানিক’ কাজে অবনমিত করে রাখা হয়েছে। প্রচলিত আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখাই যেহেতু বাজেটের নীতিগত ও দার্শনিক ভিত্তি করে রাখা হয়েছে, তাই বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়াটিকে স্বাভাবিকভাবেই প্রধানত একটি ‘অ্যাকাউন্টেন্সির’ হিসাব মেলানোর কাজে পরিণত করে রাখা হয়েছে। সাড়ে চার দশক ধরে মূলত সেটিই হয়ে আছে। বাজেট প্রণয়নের এই ‘গতানুগতিক’ পদ্ধতির মধ্যেই রয়েছে তার ‘গতানুগতিক’ হয়ে থাকার উপাদান। আমাদের দেশে আজকাল যে মূলত ‘অ্যাকাউন্টেন্সির’ দৃষ্টিকোণ থেকেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়ে থাকে, সে কথা সবারই জানা আছে। নতুন কোনো দর্শন, নীতি,  প্রেক্ষিত ইত্যাদিকে প্রথমে স্থির করে নিয়ে সেসবের ভিত্তিতে সার্বিকভাবে গোটা বাজেটটিকে নতুন করে রচনা করা হয় না। বছর বছর ধরে চলতে থাকা ‘বাজেটের’ পুরনো কাঠামো বদলানোর প্রয়োজন হয় না। পুরনো বাজেটের এখানে একটু পরিমাণ বাড়িয়ে, ওখানে একটু কমিয়ে, পুরনো কিছু বাদ দিয়ে, নতুন কিছু যোগ করে, জমা-খরচের হিসাব মিলিয়ে দিতে পারার মধ্যেই বাজেট প্রণয়নের কাজ শেষ করা হয়। কম্পিউটারে ‘কপি অ্যান্ড পেস্ট’ করে নতুন লেখা তেরির মতো ব্যাপার। অনেকটাই নতুন বোতলে সামান্য স্বাদ বদল করা পুরনো মদ ঢেলে, ‘চমকের’ আবরণে সেটিকে পরিবেশন করার মতো ব্যাপার। দক্ষ আমলাদের হাতেই মূলত গোটা কাজটি সম্পাদিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় বাজেট প্রণীত হয় বলেই তার মূল বৈশিষ্ট্য ও মর্মবাণী স্বাভাবিকভাবেই ‘গতানুগতিক’ই হয়। সাড়ে চার দশক ধরে এ দেশে প্রণীত সব বাজেটই এই ‘গতানুগতিক’ ধারাতেই প্রণীত হয়েছে। সব বাজেটই প্রণীত হয়েছে ৯৯ শতাংশ মানুষের   মৌলিক স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার বিনিময়ে মাত্র ১ শতাংশ মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। বছর বছর ধরে এ রকমই হয়ে চলেছে। বাজেট হয়ে উঠেছে ১ শতাংশের জন্য ‘পৌষ মাস’ ও ৯৯ শতাংশের জন্য ‘সর্বনাশ’। বাজেটের নীতি-দর্শন বদল না করতে পারলে প্রতিবছর এই একই রকম ‘১ শতাংশের’ বাজেটই প্রণীত হতে থাকবে। ৯৯ শতাংশ মানুষ বঞ্চিতই হতে থাকবে। এমতাবস্থায় খুবই সঙ্গত প্রশ্ন হলো, বাজেটের নীতি-দর্শন বদল করা যাবে তাহলে কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাব একটিই। তা হলো রাষ্ট্র ও সরকারের শ্রেণি-চরিত্র পরিবর্তন না করতে পারলে বাজেটের নীতি-দর্শন বদল করা যাবে না। এ কাজটি না করতে পারলে পুরনো বাজেটের এখানে-ওখানে কিছু পরিবর্তন করে বাজেটকে একটি ‘নতুন’  চেহারা দেওয়ার পাঁয়তারা করা যাবে, কিন্তু তা ‘নতুন চরিত্রসম্পন্ন’ কোনো ‘বিকল্প বাজেট’ হবে না। তা হবে পুরনোটির একটি ‘নব সংস্করণ’মাত্র। অর্থাৎ তা হয়ে থাকবে ‘একটু বেশি পরিমাণে একই বস্তুু’। ৯৯ শতাংশের স্বার্থে বাজেট যাতে প্রণয়ন করা যায়, সে জন্য রাজনৈতিক গণসংগ্রাম গড়ে তোলা অপরিহার্য। শোষক শ্রেণির সৃষ্টি করা প্রবল প্রতিকূলতার মাঝেও জনগণ, বিশেষত  মেহনতি জনগণ, সে সংগ্রাম গড়ে  তোলার কাজ চালু  রেখেছে। কিন্তু এখনো সে সংগ্রাম পর্যাপ্ত প্রসারতা ও শক্তিমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ‘বিকল্প ধারার’ বাজেট এখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু তা যদি এখনই সম্ভব না-ও হয়,  সেই লক্ষ্যে সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়া সব সময়ই সম্ভব। এটি সব সময়ের জন্যই জনগণের বিশেষ কর্তব্য। সেই সংগ্রাম গড়ে তোলার প্রয়োজনে ‘করোনা’ পরিস্থিতিতে মানুষ যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি অর্জন করেছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ৯৯ শতাংশের জন্য ‘বিকল্প বাজেটের’ কিছু মোটা দাগের রূপরেখা মানুষের মাঝে তুলে ধরার এখনই উপযুক্ত সময়। ছয় মাস আগে শুরু হয়ে ‘করোনা প্যানডেমিক’ আজও আমাদের দেশে ও বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে  বেড়াচ্ছে। ‘স্বাস্থ্যসেবা’র ক্ষেত্রে চরম  দৈন্য ও অবহেলার কারণ মানুষ বুঝতে চেষ্টা করছে। তারা ‘বাজেট’ নিয়েও ভাবতে শুরু করেছে। বাজেটে কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তারা কথা তুলছে। ‘করোনা’ হামলার ভয়াবহ ও অভিনব অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে এই ভাবনার জন্ম দিচ্ছে যে, দেশে এখন ‘৯৯ শতাংশের জন্য’ বিকল্প ধারার বাজেট দরকার। এ সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি এখন আরও প্রকট হয়েছে। ‘করোনা’র আবির্ভাব মানুষের সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুকে বদলে দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু ‘ব্যক্তিস্বার্থ কেন্দ্রিক’ পথে আজ  যে কারও পক্ষে আর বাঁচার উপায় নেই, আজকের দুনিয়ায় যে ‘বাঁচতে হবে সবাই মিলে’Ñ বাস্তবতাই মানুষের মাঝে এসব উপলব্ধি জাগিয়ে তুলছে। বাস্তব ঘটনাবলিই জনগণের মাঝে ‘৯৯ শতাংশ মানুষের স্বার্থে’ বিকল্প ধারার বাজেটের জন্য তাগিদ সৃষ্টি করছে। ‘করোনা’ পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ বুঝতে সক্ষম হচ্ছে যে, আগামী বাজেটে কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। ‘৯৯ শতাংশের জন্য বিকল্প বাজেটের’ রূপরেখা কী হতে পারে, তা নিয়ে অনেকের আগ্রহ আছে। এ নিয়ে গুরুতর আলোচনা হওয়া আজ একটি জরুরি কাজ। সবাইকে তা নিয়ে ভাবতে হবে। ‘করোনা’র প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিষয়টিকে আর ‘পেন্ডিং’ রাখা যায় না। এরূপ ‘বিকল্প বাজেটের’ রূপরেখা সম্পর্কে আমার চিন্তা মোটা দাগে ও খুবই সংক্ষেপে এখানে উপস্থিত করছি। ‘বিকল্প বাজেটের’ রূপরেখা সম্পর্কে প্রথমেই বাজেটের অর্থ সংস্থানের উৎসের বিষয়টিকে বিবেচনায় নিতে হবে। ‘গতানুগতিক’ বাজেটের ক্ষেত্রে বাজেটের অর্থ সংস্থানের প্রধান উৎস হলো ভ্যাট, ডিউটি, বিক্রয় কর ইত্যাদি ‘পরোক্ষ কর’। একজন মানুষের আর্থিক সক্ষমতার অনুপাতে তা আদায় করা হয় না। ‘আর্থিক সক্ষমতা’ নির্বিশেষে ধনী-দরিদ্র সবার কাছ থেকে অনেকটা ‘সমান হারে’ তা আদায় করা হয়। এর ভিত্তিতে পরিচালিত ‘করনীতি’ হলো চরম বৈষম্যমূলক। এ ধরনের বৈষম্যমূলক ‘করনীতি’ আমূলে বদলে দিতে হবে। একজন মানুষের ‘আর্থিক সক্ষমতার’ অনুপাতে এবং ক্রমবর্ধমান হারে বাজেটের অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা ও কাঠামো চালু করতে হবে। অর্থ সংস্থানের জন্য পরোক্ষ করের বদলে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দিতে হবে। বাজেটের পরিমাণও বাড়াতে হবে। এ জন্য খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের কাছ  থেকে পাওনা টাকা আদায়, অপ্রদর্শিত কালো টাকা ও বিদেশে পাচারকৃত  কোটি কোটি টাকা ইত্যাদি উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এসব টাকা রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনিয়োগ করে প্রতিটি মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তাদের ‘প্রকৃত আয়’ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে দেশের ‘অভ্যন্তরীণ বাজার’ প্রসারিত করে জাতীয় অর্থনীতির পায়ের তলার মাটিকে শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপন করতে হবে। গোটা জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে  সেটিকেই একসময় বাজেটের অর্থ সংস্থানের প্রধান উৎস করে তুলতে হবে। সব সমাজের মধ্যে যেমন, তেমনি বিশেষভাবে বাজেটের অর্থ ব্যয়ের  ক্ষেত্রে অপচয়, ‘সিস্টেম লস’, বিলাসিতা ইত্যাদি রোধ করে মিতব্যয়িতার নীতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে হবে। সব ধরনের দুর্নীতি-অনিয়ম কঠোরভাবে দমন ও নিবৃত্ত করতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ হ্রাস করতে হবে। প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় কমিয়ে আনতে হবে। ‘মাথাভারী’ প্রশাসনযন্ত্রকে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে, আমলাতান্ত্রিকতা দূর করে ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে হবে। সর্বনিম্ন-সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দিনগুলোর মতো ১:৬ করতে হবে। এ বিষয়ে আসল কথা হলো, প্রশাসনিক ক্ষেত্রসহ সরকারের রাজস্ব খাতে ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে হবে এবং প্রশাসনকে দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত করে তাকে জনসেবায় উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে হবে। রাজস্ব ব্যয়কে যথাসম্ভব কমিয়ে রেখে বাজেটের ‘উন্নয়ন-বিনিয়োগের’ মূল অংশটির পরিমাণ বাড়াতে হবে। সেই মূল অংশকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করে খরচ করতে হবে। আমাদের দেশে এ-যাবৎকালের প্রায় সবটা সময়জুড়ে ‘জাতীয় বাজেট’ প্রণীত হয়েছে “১ শতাংশের জন্য ‘পৌষ মাস’ ও ৯৯ শতাংশের জন্য ‘সর্বনাশ’’-এর চেহারা ও চরিত্র নিয়ে। সেই যুগের অবসান ঘটানোর সময় আজ এসে গেছে। ‘করোনা মহামারী’র মহাদুর্যোগের মাঝে দাঁড়িয়ে আজ আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। কারণ করোনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, ‘মানব অস্তিত্ব’ টিকিয়ে রাখতে হলে এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তাই বাঁচতে হলে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি যে নীতি-দর্শনের আলোকে এতদিন বাজেট প্রণীত হয়ে চলেছে, তা আমূলে বদলে দিতে হবে। বাঁচার জন্যই ‘৯৯ শতাংশের স্বার্থে বিকল্প ধারার বাজেট চাই’Ñ এই দাবিতে  সোচ্চার হওয়া আজ আপনার-আমার-সবার জরুরি কর্তব্যে পরিণত হয়েছে। লেখক ঃ সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

 

আরো খবর...