করোনাকালে সচেতনতা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা

কোভিড-১৯ প্রথম শনাক্তকরণের পর ইতোমধ্যে ছয় মাস  পেরিয়েছে। বিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ছয় লাখের বেশি। করোনা সারাবিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এটি অনুধাবন করা যায় যে, করোনার তান্ডব সহসাই থামছে না। করোনার প্রভাবে প্রকৃতি থেকে শুরু করে মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বিশ্বের সর্বক্ষেত্রেই আজ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি ও সচেতনতা মেনে চলার ব্যাপারে লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশনের মতো কিছু শব্দের প্রচলন হয়েছে, যা অনেকের কাছেই নতুন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক দুর্বোধ্য শব্দ সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা ছাড়াই সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। দুর্বোধ্য ও অপরিচিত এই শব্দগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজতর ও বোধগম্য করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দশ্যে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

কোভিড-১৯ : কোভিড-১৯ হলো সংক্রামক ব্যাধি অর্থাৎ  ছোঁয়াচে রোগ, যার জন্য দায়ী হলো একটি আবরণীবদ্ধ আরএনএ ভাইরাস। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনের উহানে ‘নিউমোনিয়া (শ্বাসতন্ত্রের রোগ)’ রোগ ধরা পড়ে, যার কারণ ছিল অজানা। পরে এর কারণ হিসেবে দেখা যায় যে, করোনা ভাইরাসের নতুন একটি প্রজাতির জন্য দায়ী এবং এর পর থেকে ‘২০১৯- নোভেল করোনা ভাইরাস’ নামে অভিহিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ১১  ফেব্র“য়ারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ‘কোভিড-১৯’ নামে নামকরণ করা হয়।

ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) : ইমিউনিটি হলো মানবদেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকার গুণমান বা অবস্থাকে ইমিউনিটি বলা হয়। বিশেষ করে কোনো প্যাথোজেনিক অণুজীবের বিকাশ রোধ করার মাধ্যমে বা এর উৎপাদিত বস্তুগুলোর সব প্রভাব প্রতিরোধের মাধ্যমে একটি বিশেষ রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হওয়ার অবস্থাই শরীরের ইমিউনিটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

হার্ড ইমিউনিটি : একটি নির্দিষ্ট জনসংখ্যার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ জনগণের মাঝে যদি কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তখন সেই জনসংখ্যার যেসব লোকের মাঝে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা  তৈরি হয়নি তাদের মাঝে রোগ সংক্রমণ বাধাগ্রস্ত হয়; একে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বলে। দেহে এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ‘ভ্যাকসিন’-এর মাধ্যমে বা সেই রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর তৈরি হতে পারে।

সামাজিক দূরত্ব : কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নিজের বাড়ির বাইরের মানুষেরও মাস্ক পরিহিত অবস্থায় ছয় ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। একেই সামাজিক দূরত্বও বলে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার : এক ধরনের তরল জীবাণুনাশক, যা হাত বা শরীরের সংস্পর্শে আসা জীবাণুকে মেরে ফেলতে পারে।

পেনডেমিক (মহামারী) : সারাদেশ বা মহাদেশ কিংবা বিশ্বব্যাপী কোনো রোগ বা ব্যাধির প্রাদুর্ভাব।

সার্ভিল্যান্স (সন্দেহভাজন মানুষের ওপর কড়া নজর রাখা) :  যেসব কারণে কোনো ব্যক্তির অসুস্থতার জন্য দায়ী সেসব কারণ, উপাদান বা ঘটনাকে সার্বক্ষণিক নিরীক্ষণ করাকে সার্ভিল্যান্স বলে।

সেরোলজি সার্ভিল্যান্স : রক্তের সিরামে কোনো অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষা করাকে সেরোলজি বলা হয়। একটি নির্দিষ্ট জনসংখ্যার মাঝে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব বা সংক্রমণের ব্যাপ্তি দেখার জন্য সেরোলজি সার্ভিল্যান্স করা হয়।

কন্টাক্ট ট্রেসিং (যোগাযোগ অনুসন্ধান করা) : এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রোগাক্রান্ত ব্যাক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে শনাক্তকরণ, যাচাইকরণ এবং নিয়ন্ত্রণ করা হয়; যাতে পরবর্তী সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়।

আইসোলেশন (পৃথকীকরণ) : এটি সংক্রামক রোগের বিস্তার বন্ধ করার জন্য সর্ব প্রাচীন পদ্ধতি। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখা হয়, যেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যদের মধ্যে রোগ বিস্তার করতে না পারে।

কোয়ারেন্টিন : সংক্রামক রোগের বিস্তার বন্ধ করার জন্য  কোনো সংক্রামক রোগীর সংস্পর্শে আসা সুস্থ মানুষকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য সুস্থ মানুষ (যারা সংক্রামক  রোগীর সংস্পর্শে আসেনি) থেকে আলাদা রাখাকে  কোয়ারেন্টিন বলে। কোয়ারেন্টিনের সময়কাল জীবাণুর উন্মেষকালের সমান হয়।

হোম কোয়ারেন্টিন : সংক্রামক রোগীর সংস্পর্শে আসা সুস্থ মানুষকে নিজের বাড়িতে একটি রুমে অন্যদের থেকে আলাদা রাখাকে হোম কোয়ারেন্টিন বলে।

প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন : সংক্রামক রোগীর সংস্পর্শে আসা সুস্থ মানুষকে কোনো প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে অন্যদের থেকে আলাদা রাখাকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন বলে।

লকডাউন : সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধের জন্য জনসাধারণকে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে না বের হওয়াকে লকডাউন বলে।

জোনিং : নির্দিষ্ট এলাকায় সংক্রমণের হার ভিন্নতায় এলাকাগুলো সবুজ, হলুদ ও লালÑ এভাবে চিহ্নিত করাকে  জোনিং বলা হয়।

সবুজ এলাকা (গ্রিন জোন) : কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতি লাখ জনসংখ্যার মাঝে যদি করোনা আক্রান্তের সংখ্যা তিনজনের নিচে থাকে।

হলুদ এলাকা (ইয়েলো জোন) : কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতি লাখ জনসংখ্যার মাঝে যদি করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩-৫৯ জন হয়ে থাকে।

লাল এলাকা (রেড জোন) : কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রতি লাখ জনসংখ্যার মাঝে যদি করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ জন বা তার চেয়ে বেশি থাকে।

আরটি-পিসিআর (রিভার্স টান্সক্রিপশন রিয়েল টাইম পলিমারেস চেইন রি-অ্যাকশন) : আরটি-পিসিআর হচ্ছে  নোভেল করোনা ভাইরাসের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অদ্যাবধি একমাত্র স্বীকৃত, নির্ভরশীল এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য পরীক্ষা পদ্ধতি। ব্যক্তির কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নমুনা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কেবল আরএনএ বের করা হয়। তার পর এক্সট্রাক্ট আরএনএকে রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার করে কম্পলিমেন্টারি ডিএনএতে রূপান্তর করা হয় এবং পলিমারেজ চেইন রি-অ্যাকশন (পিসিআর) ব্যবহার করে প্রাপ্ত ডিএনএর একটি অংশকে পরীক্ষা করে এটি সার্স-কো ভি-২ এর জেনেটিক কোডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী) : পিপিইর মধ্যে রয়েছে চশমা/ফেসশিল্ড, মাস্ক (মুখ বেষ্টনী), ক্যাপ, গাউন (কভার অল, সার্জিক্যাল গাউন, গ্লাভস, সু-কাভার; যা চিকিৎসকরা  রোগীর চিকিৎসা প্রদানের সময় ব্যবহার করে থাকেন। তবে সাধারণ জনগণের জন্য করোনা প্রতিরোধে ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।

অক্সিজেন থেরাপি : রোগীর শ্বাসকষ্ট হলে বা শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকের পরামর্শে নিম্নের যে কোনো পদ্ধতি অবলম্বনে অক্সিজেন থেরাপি দেওয়া হয়Ñ

অক্সিজেন সিলিন্ডার : অক্সিজেনকে অত্যধিক প্রেসারে তরল করে সরবরাহ করা হয়, যা দিয়ে প্রতি মিনিটে ২ থেকে ১৫ লিটার অক্সিজেন দেওয়া যায়।

হাই ফ্লো নেজাল ক্যানুলা : এ যন্ত্রের সাহায্যে উচ্চচাপে  নোজাল ক্যানুলার সাহায্যে রোগীকে প্রতি মিনিটে ৭০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন সরবরাহ করা যায়। বর্তমান বিশ্বে কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে এটি খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে।

অক্সিজেন কনসেনট্রেটর : এটি একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যার সাহায্যে বাতাস থেকে অক্সিজেনকে ঘন করে রোগীকে সরবরাহ করা হয়, ফলে রোগীকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দীর্ঘ সময় ১ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।

নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেটর

বাই-পেপ: বাই-পেপ মেশিনের সাহায্যে যাদের ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) আছে, যা ফুসফুসের এক ধরনের জটিল রোগ তাদের প্রতি মিনিটে ১৫০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন দেওয়া যেতে পারে।

সি-পেপ : সি-পেপ মেশিনের সাহায্যেও প্রতি মিনিটে ১০০  থেকে ১৫০ লিটার অক্সিজেন দেওয়া যায়।

লাইফ সাপোর্ট/মেকানিক্যাল ভেন্টিলেটর : এ যন্ত্রের সাহায্যে  রোগীর সম্পূর্ণ শ্বাস-নিঃশ্বাস মেশিনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে বাঁচিয়ে রাখা হয়।

মহামারী প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ৩১ দফা নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য বিভাগের ১২ দফা স্বাস্থ্যবিধির প্রস্তাবনার সুফল আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। অন্য সব  ক্ষেত্রের মতো ডিজিটাল বাংলাদেশে টেলিমেডিসিনের জনপ্রিয়তা সাধারণ মানুষের মাঝে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর সুফল পাচ্ছেন। সরকারের সঠিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিই হবে সংকট উত্তরণের পথ। সঠিক তথ্য সহজ করে তুলে ধরার মাধ্যমে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং জনসাধারণকে দৈনন্দিন কর্মকান্ডে, অফিস-আদালতে স্বাস্থ্যবিধিগুলো (যেমন ২০  সেকেন্ড ধরে বারবার হাত ধৌত করা, মাস্ক পরিধান করা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ইত্যাদি) মেনে চলতে হবে, তবেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে, আমরাও ফিরে আসব সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে।

লেখক ঃ মহাসচিব, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)

আরো খবর...