এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে ধর্ষণ, ৬ ছাত্রলীগ কার্মীর নামে মামলা

ঢাকা অফিস ॥ সিলেটের মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে এক গৃহবধূকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে। ওই গৃহবধূ স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজ ঘুরতে আসেন। পরে এসএমপির শাহপরাণ থানা পুলিশ গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ছাত্রবাস থেকে স্বামীসহ ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে। পরে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। সিলেটের প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এমসি কলেজের ১২৮ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণের খবর সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে মাধ্যমে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। গণধর্ষণের ঘটনায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২/৩ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে নগরীর শাহপরাণ থানায় এ মামলা দায়ের করেন। শাহপরাণ থানা পুলিশের ওসি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন- এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাছুম, রবিউল হাসান, তারেক আহমদ ও অর্জুন। এজাহারভুক্ত আসামিদের সবাই আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রঞ্জিত সরকারের অনুসারী এবং ছাত্রলীগ কর্মী বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানের রুম থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত শুক্রবার দিবাগত রাত ২টার দিকে নগরীর শাহপরাণ থানা পুলিশ এমসি কলেজের নতুন ছাত্রাবাসে অভিযান চালায়। এ সময় সাইফুরের রুম থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি লম্বা দা, একটি ছুরি ও দুটি জিআই পাইপ উদ্ধার করা হয়। কলেজ সূত্রে জানা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ ও ছাত্রাবাস বন্ধ থাকলেও সাইফুর অবৈধভাবে ছাত্রাবাসে অবস্থান করছিলেন। তিনি সহযোগীদের নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাস, টিলাগড় ও বালুচর এলাকায় ছিনতাই, অপহরণ ও মাদক ব্যবসা করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাতে বন্ধ ছাত্রাবাসে নিয়মিত জুয়া ও মাদকের আসর বসাতেন এমন অভিযোগও রয়েছে সাইফুরের বিরুদ্ধে। শাহপরাণ থানা পুলিশের ওসি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, গণধর্ষনের ঘটনার পর রাতেই এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় সাইফুর রহমানের রুম থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও ছুরি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছিল। গতকাল শনিবার রাত আটটায় এ প্রতিবেদন তৈরি পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতারের কথা জানা যায়নি। তবে পুলিশ খুঁজে না পেলেও ফেসবুকে সরব ছিল ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। গতকাল শনিবার সকালেও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন মামলার দুই আসামি। গণধর্ষণের মামলার ৫ নম্বর আসামি রবিউল হাসান গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘সম্মানিত সচেতন নাগরিকবৃন্দ আমি রবিউল হাসান। আমি এমসি কলেজের শিক্ষার্থী। আপনারা অনেকে চেনেন, আমি কেমন মানুষ তা হয়তো অনেকে জানেন। শুক্রবার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের সঙ্গে কে-বা কারা আমাকে জড়িয়ে সংবাদ করিয়েছেন জানি না। আমি এমসি কলেজের ছাত্র। কিন্তু আমি হোস্টেলে কখনও ছিলাম না, আমি বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আপনাদের অনুরোধ করে বলছি, এই নির্মম গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত নই, আমাদের পরিবার আছে। যদি আমি এই জঘন্য কাজের সঙ্গে জড়িত থাকি তাহলে প্রকাশ্যে আমাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। আমি কোনোভাবেই এই কাজের সঙ্গে জড়িত নই। সবার কাছে অনুরোধ করছি, সত্য না জেনে আমাকে এবং আমার প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগের নামে অপপ্রচার করবেন না। এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণকারী সব নরপশুকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’ একইভাবে মামলার ৬ নম্বর আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুম নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এরকম জঘন্য কাজের সঙ্গে আমি জড়িত নই। যদি জড়িত প্রমাণ পান প্রকাশ্যে আমাকে মেরে ফেলবেন। একমাত্র আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আছে। আল্লাহ আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন। তবে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে আমাকে সুইসাইডের দিকে নিয়ে যাওয়া আপনাদের বিচার আল্লাহ করবেন।’ মামলার অন্যতম আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুমের পক্ষে সাফাই গেয়ে হুমায়ুন রশিদ পায়েল নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় ছোট ভাই মাহফুজুর রহমান মাসুম এমসিতে ছিল না, সে জাফলং ছিল তার বন্ধুদের সঙ্গে। সেখানের লাইভ ভিডিও ও ছবি ফেসবুকে রয়েছে। সাংবাদিক ভাইদের প্রতি অনুরোধ, মনগড়া নিউজ করে একজন মেধাবী ছাত্রের জীবন নষ্ট করে দেবেন না।’ ফেসবুকে সরব থাকার পরও আসামিদের গ্রেফতার করতে না পারা প্রসঙ্গে শাহপরান থানা পুলিশের ওসি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমরা তাদের গ্রেফতারে সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছি। বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে। এদিকে দীর্ঘদিন এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় অভিযুক্তদের কোনো পদ-পদবি নেই। কিন্তু কলেজের রাজনীতিতে তারা সক্রিয় ছিলেন। তারা মূলত সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রঞ্জিত সরকারের অনুসারী। গণধর্ষণে অভিযুক্তরা সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য নাজমুল ইসলামের সঙ্গে রাজনীতি করতেন বলেও জানা গেছে। একাধিক অনুষ্ঠানে রঞ্জিত সরকার ও ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল ইসলামের সঙ্গে তাদের ছবি রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত শুক্রবার সিলেটের এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে যান ধর্ষণের শিকার ওই গৃহবধূ। একপর্যায়ে রাত ৮টার দিকে তরুণীর স্বামী সিগারেট খাওয়ার জন্য এমসি কলেজের মূল গেটের বাইরে বের হন। এ সময় কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী গৃহবধূকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেতে চায়। এতে তার স্বামী প্রতিবাদ করলে তাকে মারপিট শুরু করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। একপর্যায়ে গৃহবধূ ও তার স্বামীকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীকে বেঁধে ছাত্রলীগের তিন-চারজন নেতাকর্মী গৃহবধূকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) মোহা. সোহেল রেজা পিপিএম বলেন, রাত ৯টার দিকে স্বামীকে ধরে নিয়ে কিছু ছেলে মারপিট করে। গৃহবধূকে ছাত্রাবাসে ভেতরে নিয়ে তিন-চারজন মিলে গণধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। অভিযুক্তদের ধরতে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জোর্তিময় সরকার বলেন, অভিযোগকারী গৃহবধূর স্বামীর বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায়। গত শুক্রবার বিকেলে তিনি স্ত্রীসহ টিলাগড় এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। এ সময় ৪-৫ জন তরুণ তাদের জিম্মি করে ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যায়। পরে ছাত্রাবাসের ভেতরের একটি রাস্তায় তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। সিলেট শাহপরান থানার ওসি কাইয়ুম চৌধুরী জানান, এক দম্পতিকে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে আটকে রাখা হয়েছে খবর পেয়ে পুলিশ ছাত্রাবাস থেকে তাদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া নারী ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। পরে তাকে ওসমানী হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হয়েছে। এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের সুপার মো. জামাল উদ্দিন জানান, কয়েকজন ছাত্রাবাসে এক দম্পতিকে আটক রাখে বলে অভিযোগ পেয়েছি। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। কলেজ কর্তৃপক্ষের ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি: গণধর্ষণের ঘটনায় ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। গতকাল শনিবার গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে দুইজন হোস্টেল সুপারকে যুক্ত করা হয়। এই কমিটি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, কমিটির সদস্যরা ছাত্রদের ছাত্রাবাসে অবস্থানের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত একজন ব্যতীত বাকিরা বহিরাগত। বর্তমান ছাত্রের বিষয়ে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সুপারিশ করবো তার ছাত্রত্ব বাতিলের। এ ছাড়া অভিযুক্তদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষ যতটুকু সহযোগিতা করার করবে। সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ: এদিকে গণধর্ষণের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। সেই সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরাও। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এমসি ও সরকারি কলেজের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী কলেজের সামনে সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকার পরেও কর্তৃপক্ষ কীভাবে ছাত্রাবাস খোলা রাখেন। কর্তৃপক্ষের অবগত থাকার পরেও কেন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়া হল না। যে কারণে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠে কলঙ্কের দাগ লেগেছে বলে মনে করেন তারা। এসময় শিক্ষার্থীরা গণধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও ফাঁসি দাবি করেন। অন্যথায় তারা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন। আন্দোলন চলাকালে টায়ার জ¦ালিয়ে বিক্ষোভ করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কলেজ ও ছাত্রাবাসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আরো খবর...