এবারো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি শহীদ মোবারক আলী

আজ কুষ্টিয়ার বংশীতলা যুদ্ধ দিবস

আরিফ মেহমুদ ॥ আজ ৫ সেপ্টেম্বর বুধবার। কুষ্টিয়ার বংশীতলা সম্মুখ যুদ্ধ দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বীরত্বে গাঁথা এক ইতিহাসের দিন আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বংশীতলায় পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। জীবনের মায়া ত্যাগ করে মা মাটি ও দেশের মানুষকে সেদিন মুক্ত করতে কুষ্টিয়ার দামাল ছেলেরা লড়েছিল চির শক্র পাকবাহিনীর সাথে। কয়েক ঘন্টা ধরে চলে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমনের মুখে পাকহানাদাররা তাদের বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়েও অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হয়। বংশীতলার এ যুদ্ধে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, ৮ জনের লাশের দাফন স্থানীয়রা করেন দূর্বাচারাসহ বিভিন্ন জায়গায়। ৩ জনের লাশ নিয়ে যায় পাকহানাদাররা। পর দিন আরো ২ জনের লাশ পাওয়া যায় এখানকার মাঠের জঙ্গলে। কারো কারো মতে আরো বেশি। স্বাধীনতার ৪৬ বছর অতিবাহিত হলেও এই যুদ্ধে নিহত শহীদ মোবারক আলী  মোল্লা রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি আজো। অন্য দিকে ১৩ শহীদ পরিবারের তেমন একটা খোঁজ রাখেনি কেউ। নাম মাত্র ভাতা আর বিজয় দিবসে কিছু উপঢোকন ছাড়া কিছুই পায়নি শহীদ পরিবারগুলো। নানানভাবে ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে এ যুদ্ধে শহীদদের নিয়ে। যুদ্ধের পরের দিন বংশীতলা  থেকে উদ্ধারকৃত শহীদ মেজবার আলীর লাশ এবং দাফনকৃত কবরের জায়গা দখল নিয়ে হয়েছে নানা নাটকীয়তা। পাকবাহিনীর ভয়ে ও ঝড়-বৃষ্টির কারনে পিয়ারপুর মাঠের মধ্যে দাফন করা কবরটি এক সময় অজ্ঞাত দেখানো হলেও উপযুক্ত দাবীদার না থাকায় কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে শহীদ মেজবার আলীর কবর আবিস্কার কাহিনী। এমন স্বাক্ষ্যই দিয়েছেন লাশ উদ্ধার এবং আত্মীয় স্বজনের কাছে হস্তান্তরকারী শহীদ মোবারক আলী মোল্লার ছেলে লিয়াকত আলী মোল্লা ও কুষ্টিয়া  জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার নাছিম উদ্দিন আহমেদ। শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মিত স্মৃতি সৌধে বরাবরই ১১ জনের নামের তালিকা থাকলেও কয়েক বছর আগে কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডা কর্তৃক নতুন করে  মেজবার আলী, সুরুজ লাল ও চাঁদ আলী সহ ১৪ জন শহীদের নামের তালিকা ঠাই  পেয়েছে। এজন্য শহীদ পরিবার, যুদ্ধে অংগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সাবেক কমান্ডার নাছিম উদ্দিন আহমেদ সহ সকল কমান্ডারকে সাধুবাদ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার ইতিহাসের এই বীরত্বে গাঁথা দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে কোন বড় ধরনের কর্মসূচী না থাকলেও স্থানীয়ভাবে শহীদ পরিবারের পক্ষে শহীদ  মোবারক আলী মোল্লার ছেলে আলতাফ হোসেন মোল্লা, জেলা ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ এলাকাবাসী শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা ও মাগফেরাত কামনা করে প্রতি বছরই এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে স্মৃতিসৌধ চত্বরে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল করে থাকেন। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বাদ জহুর বংশীতলা স্মৃতিসৌধ চত্বরে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।  এতে উপস্থিত থাকবেন কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।

ইতিহাস অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মাচ ভাষণের পর ৬ দফা ও ১১ দফা দাবী আদায়ের সংগ্রামকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে সারা দেশের ন্যায় বৃহত্তর কুষ্টিয়াতেও সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠন করে প্রতিবাদ সভা, মিছিল, অসহযোগ আন্দোলন, প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলায় (মুজিবনগরে) অস্থায়ী রাজধানী থাকায় এ জেলা প্রতিরোধ যুদ্ধে ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ২৫ মার্চ রাতে ২৫০ জন পাক সৈন্য আকষ্মিকভাবে কুষ্টিয়ায় প্রবেশ করে। তারা শহরে প্রবেশ করেই কারফিউ জারী, ধর পাকড়, অত্যাচার, নির্যাতন ও যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ শুরু করে। এ সংবাদ সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক নেতা, কর্মী জনসাধারণ সবার মধ্যে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। প্রতিকার ও প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে সবার মধ্যে। এ কারনে পাকহানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে ১ সেপ্টেম্বর ভারত থেকে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়ে কুষ্টিয়া জেলার সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করে। এ দলের বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন কুষ্টিয়া সদর থানার দামাল ছেলেরা। কুষ্টিয়া শহরের আশপাশ ছিল এদের গন্তব্যস্থল। ১ সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকে কুষ্টিয়া সদর থানার বৃত্তিপাড়া হতে পাক  সৈন্য ও মিলিশিয়া পুলিশ বাহিনীর একটি দল দহকুলা গ্রামের মধ্যে দিয়ে আলামপুর গ্রামে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর হামলার জন্য আসে। পরদিন অনেক পাক সৈন্য ও মিলিশিয়া পুলিশ আলামপুর গ্রামে আসে। তারা এ গ্রামের অনেক বাড়ীঘর পুড়িয়ে দেয় এবং আলামপুর গ্রামের কয়েকজন সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে যায়। এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই ৫ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া সদর থানার বংশীতলা ও দূর্বাচারা গ্রামে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা পাক  সৈন্যের হামলা প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে খুব সকালে প্রস্তÍুতি গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন স্থানে সুবিধামত জায়গায় অবস্থান নিয়ে পাক সৈন্যের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু সকাল ১০ টা পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা কোন পাক সৈন্যে দেখতে না পেয়ে তারা মনে করেন আজ আর পাক  সৈন্য আসবে না। তাই তখন মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই যে যার মত নাস্তা খেতে যান এবং কেউ কেউ এদিক সেদিক ঘোরাফেরার মধ্যে ছিলেন। আর এ দলের মুক্তিযোদ্ধা ও লাইট মেশিন গানম্যান আব্দুল কুদ্দুস তার সহকারী সেকেম আলীকে নিয়ে বংশীতলা গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ে গিয়ে আমগাছের গুড়ির পাশে অবস্থান নেয়। এমন সময় তারা দেখতে পান যে পাক সৈন্যরা পায়ে হেটে দূর্বাচারার দিকে আসছে। পাক সেনারা যখন আব্দুল কুদ্দুসের খুব কাছাকাছি চলে আসে তখন আব্দুল কুদ্দুস লাইট মেশিনগান দিয়ে তাদের উপর বিরামহীনভাবে ব্রাশ ফায়ার করতে শুরু করে। হটাৎ করে খুব কাছ থেকে পাক সৈন্যের উপর লাইট মেশিন গানের ব্রাশ ফায়ার শুরু হওয়ায় তারা তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা আক্রমনের সুযোগ পায়নি। রাস্তার দু‘ধারে অথৈ পানি থাকায় অবস্থান নিতে ও পালাতে পারেনি। আব্দুল কুদ্দুসের ব্রাশ ফায়ারে ঘটনাস্থলেই অনেক পাক সৈন্য আহত ও নিহত হয়।

বিরামহীনভাবে গুলিবর্ষণের ফলে লাইট মেশিনগানের ব্যারেল গরম হয়ে ফায়ার বন্ধ হয়ে যায় এবং এ সময়ে পাক সৈন্যের একটি গুলি এসে আব্দুল কুদ্দুসের পায়ে লাগে। এ ফাঁকেই পাক সৈন্যরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। অবস্থা বুঝে আব্দুল কুদ্দুস ও সেকেম আলী পাক সৈন্যের নাগালের বাইরে চলে যায়। এ সময় দূর্বাচারা গ্রামে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা গোলাগুলির শব্দ শুনে অগ্রসর হয়ে বংশীতলা গ্রামের কাছে চলে যায়। পাক সৈন্যরা বংশীতলা গ্রাম হতে দূর্বাচারা গ্রামের দিকে অগ্রসর হবার প্রাক্কালে মুক্তিযোদ্ধা ও পাক সৈন্যের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। এখানেও বেশ কিছু পাক সৈন্য আহত ও নিহত হয়। পাকিসত্মান বাহিনী পিছন থেকে তাদের আর্টিলারি গ্র“প ২ ও ৩ মর্টার এবং রকেট ল্যান্সারের গোলা মুক্তিযোদ্ধাদের উপর  নিক্ষেপ করতে শুরু করে এবং বংশীতলায় হতে অনুমান ৩ মাইল দুরে কুষ্টিয়া টেক্সটাইল মিলে স্থাপিত পাক সৈন্যের ক্যাম্প হতেও যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে লক্ষ্যহীনভাবে হেভিগানের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় দূর্বাচারার মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম অত্যান্ত সাহসিকতার সাথে পাক সৈন্যের অফিসার ক্যাপ্টেন জামিলকে হত্যা করেন। তাজুল ইসলাম এখান থেকে তার দলের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ফেরার সময় অন্য গোলার মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। পাক সৈন্যও চলে যায়। কয়েক ঘন্টা ধরে যুদ্ধ হয়। বংশীতলার যুদ্ধে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা কম-বেশি আহত হন এবং ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা পাক সৈন্যের হাতে ধরা পড়েন। এ ৫ জনের মধ্যে ৩ জনের বাড়ী ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানায়। বাকী ২ জনের বাড়ী হরিণাকুন্ড থানায়। বংশীতলার যুদ্ধে পাক সৈন্যের সঙ্গে ১২ জন রাজাকার এসেছিল। তার মধ্যে ৬ জন যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে পালিয়ে যায়। বাকী ৬ জন রাজাকার পাক  সৈন্যের সঙ্গে ক্যাম্পে ফিরে যায়। পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী বংশীতলা যুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে চরম ভাবে পরাজিত হয়। বংশীতলার এ যুদ্ধে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, ৮ জনের লাশের দাফন স্থানীয়রা করেন দূর্বাচারা সহ বিভিন্ন জায়গায়। ৩ জনের লাশ নিয়ে পাকহানাদাররা। পর দিন আরো ২ জনের লাশ পাওয়া যায় এখানকার মাঠে জঙ্গলে। কারো কারো মতে আরো বেশি। শহীদরা হলেন-তাজুল ইসলাম, খোরশেদ আলম দীল, সেখ দিদার আলী (বীরপ্রতিক), ইয়াকুব আলী, গোলাম মোস্তফা রাজ্জাক, চাঁদ আলী মোল্লা,  মোবারক আলী মোল্লা, আব্দুল মান্নান, মিরাজুল ইসলাম, সুরুজ লাল, মেজবার আলী, সাবান আলী ও কিয়ামুদ্দিন। এখানে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা গুরুতর আহত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে দূর্বাচারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে দাফন করা হয়। এখানে তাদের কবর রয়েছে। শহীদদের পরিবারের লোকজন অভিযোগ করে জানিয়েছে, প্রতিবছর বংশীতলা দিবস ও বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে শহীদদের কবরে সম্মান জাননো হয়। বিশেষ দিনেই শহীদরা শ্রদ্ধা পায়, তাছাড়া অন্য কোন সময় তাদের কথা কেউই মনে রাখেনা। শহীদদের পরিবারের লোকজন আক্ষেপ করে বলেন, যাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে এ স্বাধীন দেশ, অথচ তাদের প্রতি অবহেলা আর অবজ্ঞা ছাড়া কিছুই জোটেনা।

আরো খবর...