“একটা সাইকেলের খুবই দরকার ছিলো ওদের”

কাঞ্চন কুমার ॥ আমেনা খাতুন ৬ষ্ঠ শ্রেনীর শিক্ষার্থী। সে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার জাহানারা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। বাবা মোমন আলী একজন বর্গা চাষী। তিন বোন আর মা-বাবা নিয়েই তাদের পরিবার। আমেনার বাড়ী স্কুল থেকে স্কুলের দুরত্ব ৯ কিলোমিটার। এত দুর থেকে সে প্রতিদিন স্কুলে আসে।  লেখাপড়াতেও আমেনা বেশ ভালো। ভালো ফলাফল করার আশায় সে গ্রামের স্কুল ছেড়ে ভর্তি হয়েছে এত দুরে। প্রতিদিন স্কুলে আসতে হয় পায়ে হেঁটে তারপর ভ্যানে চড়ে। প্রায় ১ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে তারপর ভ্যানে উঠতে হয় তাকে। আবুরী থেকে আমলায় আসতে ১৫ টাকা ভ্যান ভাড়া দিতে হয়। আবার স্কুল থেকে বাড়ী যেতে ১৫ টাকা। এভাবেই রোজ বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয় আমেনা খাতুন। আমেনা খাতুন জানায়, প্রতিদিন বাড়ী থেকে হেঁটে তারপর ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে স্কুলে আসি। আবার বাড়ী যেতে ১৫ টাকা। পত্র-পত্রিকায় টিভিতে দেখেছি মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। তাই আমিও শিখেছি সাইকেল চালানো। বাড়ীতে অনেকবার বলেছি একটা সাইকেল কিনে দিতে। নতুন না হোক একটা পুরাতন সাইকেল। তাহলে আমি সহজেই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারতাম। তবে সংসারে অভাবের কারনে সাইকেল কেনা হয়নি। একটা সাইকেলের খুবই দরকার ছিলো আমার। আমি নতুন সাইকেল পেয়েছি। প্রতিদিন স্কুলে আসতে আর আমার টাকা লাগবে না। গতকাল বুধবার  দুপুরে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে দরিদ্র ও মেধাবী ২০জন শিক্ষার্থীর মাঝে বিনামূল্যে বাইসাইকেল বিতরণ করেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও গরীব এবং যাতায়াতের অসুবিধা রয়েছে এমন ২০জন ছাত্রীর মধ্যে বাইসাইকেল দেওয়া হয়। সেখানে আমেনা খাতুনও ছিলো। সাইকেল পেয়ে খুব খুশি আমেনা। সানজিদা আরবী আলফী মিরপুর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার বাড়ী ধুবাইল এলাকায়। স্কুল থেকে ২-৩ কিলোমিটার। পিতা একজন কৃষক। কোনদিন সে স্কুলে আসে ভ্যানে আবার কোনদিন পায়ে হেঁটে। তারও রয়েছে স্কুলে যাতায়াতের অসুবিধা। সেও পেয়েছে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে নতুন বাই সাইকেল। সানজিদা আরবী আলফী জানায়, বাড়ী থেকে স্কুলে আসতে অনেক কষ্ট হয়। অনেকসময় গ্রাম থেকে ঠিক সময়ে ভ্যান পাওয়া যায় না। স্কুলে আসতে প্রতিদিন স্কুলে ঠিক সময়ে আসা সম্ভব হয় না। আর কোন চিন্তা নেই আমি রোজ সাইকেল চড়ে স্কুলে আসবো। আজমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আসমাউল হোসনা নিশি জানান, পাঁয়ে হেটে স্কুলে যাওয়া আসা করি। মাঝে মাঝে ভ্যানে যায়। প্রতিদিন তো বাড়ী থেকে টাকা নিতে পারিনি। আজকে নতুন সাইকেল পেয়েছি। সাইকেল চড়েই রোজ স্কুলে যাবো-আসবো। আমলা জাহানারা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামূল ইসলাম জানান, আমেনা খাতুন মেধাবী ছাত্রী। তার বাড়ী স্কুল থেকে প্রায় ৯-১০ কিলোমিটার দুরে। আমি উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে জানতে পারি মেধাবী ও গরীব শিক্ষার্থী যাদের যাতায়াতের অসুবিধা রয়েছে তাদের বাই সাইকেল প্রদান করা হবে। তারপর আমাদের সহায়তায় আমেনা আবেদন করলে আজকে আমেনাকে সাইকেল দেওয়া হয়েছে। একটা সাইকেল তার খুবই দরকার ছিলো। মিরপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জুলফিকার হায়দার জানান, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থী যাদের যাতায়াতের অসুবিধা রয়েছে তাদের মধ্য থেকে ২০ ছাত্রীকে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বাই সাইকেল প্রদান করা হয়েছে। মিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিন জানান, বর্তমান সরকার শিক্ষার মান উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারী শিক্ষার উপরে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষে সরকার শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করেছে। মিরপুর উপজেলায় শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ প্রদানসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। তিনি আরো জানান, গ্রামাঞ্চলে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে অনেক মেয়ে স্কুলে আসতে পারে না। আমরা এবছর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২০জন মেধাবী ও গরীব ছাত্রীকে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বাই সাইকেল প্রদান করেছি। যাতে তারা স্বাচ্ছন্দে বিদ্যালয়ে যেতে পারে। এছাড়া মেধাবী ও গরীব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি, শিক্ষাউপকরণসহ নানা সুবিধাদি দেওয়া অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত জানান, নারী শিক্ষার উপরে গুরুত্ব দিয়ে গরীব ও মেধাবী ২০জন শিক্ষার্থীকে তাদের যাতায়াতের জন্য মিরপুর উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে বাইসাইকেল প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা স্কুলে আসতে আরো উৎসাহী হবে।

 

আরো খবর...