আসুন লজ্জিত হই

ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হয়েছে নিশ্চয়। ভাবছেন, এ আবার  কেমন কথা আর কেমন আহ্বান? ‘আসুন লজ্জিত হই’- এ কথা কেউ কখনো বলে কাউকে কস্মিনকালে বলেছে কী? শল্যবিদ্যা মতে, হাসি মানুষের জন্য বেশ উপকারী। নিয়মিত হাসি সুস্থ স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। এ কারণে স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিরা এখন সংঘবদ্ধভাবে নিয়মিত হাসির  রেওয়াজ করেন। তাই কোথাও কোথাও বড় করে লেখা থাকে, ‘আসুন হাসি’। হাসির ক্লাব রয়েছে বিদেশে। হাসি-সংস্কৃত সমাদৃতও সেখানে। কিন্তু ‘আসুন লজ্জিত হই’- এমনটি শোনা যায়নি কখনো। অথচ তা থাকাটি খুব জরুরি ছিল, বিশেষ করে আমাদের সমাজবাস্তবতা ও ব্যক্তিমানুষের চর্চায়। এই নষ্ট সময়ে ও বৈরী প্রতিবেশ-পরিবেশে লজ্জার চর্চাটা থাকলে বোধহয় অনৈতিকতার বিষবৃক্ষ এভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারত না। আমাদের আশপাশের মানুষজন এতটা দুর্বিনীত ও দুর্নীতির রাঘববোয়াল হয়ে ওঠার সুযোগ পেত না। করোনাকালে আমাদের অসাধুতা, কপটতা, দুর্নীতি যেভাবে উদোম হয়ে গেছে, এতে মনে হয় না এই সমাজের মানুষের  ভেতর লজ্জা বলে কিছু আছে কিংবা ছিল। এই সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক মানুষজন বরং সব অপকর্ম করেও কোনো অপরাধবোধে ভোগে না। নিজেকে একঘরে মনে করে না। উল্টো তারা গ্রামবাংলায় দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ওই কথাটিকেই প্রকৃষ্ট সত্যরূপে পরিগণিত করে তোলে- ‘যার একবার নাক কাটে, সেই যায় গ্রামের বাইরে দিয়ে আর যার সাতবার নাক কাটে, সেই যায় গ্রামের ভেতর দিয়ে।’ এই অবস্থায় লজ্জাহীন, অরুচিকর, ইতর প্রাণীর মতো ন্যায়-অন্যায় বোধহীন মানুষের কর্মকান্ডে আমাদেরই লজ্জিত হওয়া যুক্তিযুক্ত নয় কী? আসুন, আমরা বিষয়টি একটু খোলসাই করতে করতে  ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং এই লেখার উপর্যুক্ত শিরোনামের সুলুকসন্ধান করি। দেশে করোনার রোগী প্রথম শনাক্ত হয় চলতি বছরের ৮ মার্চ। এর পর যতই দিন  পেরিয়েছে, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত রিজেন্টের সাহেদের প্রতারণা। তার প্রতারণার কারণে বিদেশে আমাদের  দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। সাহেদের প্রতারণার জাল কতটা বিস্তৃত, ভয়ঙ্কর ও সর্বগ্রাসী- এর কিছুটা হলেও ইতোমধ্যে আঁচ করা গেছে। সাহেদ গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাকে নানা মেয়াদ ও অভিযোগে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। সাহেদ এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার অধীন। তাকে নিয়ে আপাতত  কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, প্রতারক সাহেদকে ঘিরে নির্মিত পার্শ্বচরিত্রগুলো নিয়ে। আচ্ছা, সাহেদ কি মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো একা? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের একটি সংলাপ বেশ আলোচিত- ‘মধ্যাহ্ন সূর্যের কোনো সঙ্গী থাকে না।’ সূর্য যখন ঠিক মধ্যাহ্নে থাকে, এর কোনো ছায়াও থাকে না। সাহেদ নিশ্চয় অতটা একা নন। আর একা এত বড় প্রতারণা কখনো করাও যায় না, সম্ভব নয়। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জেনে গিয়েছি, সে একা নয় এবং তার ছবি-সংস্কৃতিও সেটিই বলে। অথচ এখন পর্যন্ত সাহেদের পার্শ্বচরিত্ররা অধরাই রয়ে গেছে। কাউকেই আইনের আওতায় আনা হয়নি। যাদের নিয়ে, যাদের সহযোগিতায়, যাদের সঙ্গে উপঢৌকন বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সাহেদ হয়ে উঠেছেন এই সময়ের আনপ্যারালাল ভন্ড, প্রতারক- তারা তো মনে হয় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। দেশবাসীর কি জানার অধিকার নেই তারা কারা? সাহেদের একটি পরিচয়- তিনি ‘নতুন কাগজ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। এমনকি তার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড পর্যন্ত রয়েছে। লক্ষ্য করুন, কাছাকাছি সময়ে ফরিদপুরের দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেলের দুর্নীতি এবং দখলের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। উল্লেখ্য, তারাও একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। অন্যদিকে নাটোরেও এমন এক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে- যিনি একাই ৫০টি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক-প্রকাশক। একটি পত্রিকার ডিক্লারেশন নিতে হলে কত রকমের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অথচ সেখানে সাহেদের মতো ফেরারি আসামিরাও কায়দা করে হয়ে যাচ্ছেন সম্পাদক-প্রকাশক। তাদের কথা তো জানা হলো। তার পর যে উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা ছিল, তা কি নেওয়া হয়েছে? সাহেদের মতো প্রতারক সম্পাদক-প্রকাশক কি এখনো এই সমাজ-রাষ্ট্রে ঘাপটি মেরে থেকে তাদের অসাধু-অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে না? নাকি সাহেদ শুধু একা একজন ছিলেন? নিশ্চয় নয়। তা হলে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে কবে? হাইকোর্ট যথার্থই বলেছেন, গণমাধ্যমে না এলে সাহেদের প্রতারণা অজানাই থেকে যেত। এর পর তো প্রশাসনের টনক নড়া উচিত। চিরুনি অভিযানের মধ্য দিয়ে খুঁজে বের করা উচিত সাহেদের পার্শ্বচরিত্রগুলো ও বর্ণচোরা সাহেদদের। এবার সাহেদ থেকে বিদ্যুতে আসি। যারা প্রমাণ করে দিল একবিংশ শতাব্দীর এই মঙ্গল গ্রহজয়ী বিজ্ঞাননির্ভর পৃথিবীর  কোথাও ভূত না থাকলেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ভূত আছে। ভুতুড়ে বিল দিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ এই করোনাকালে জনগণের সঙ্গে গর্হিত অপরাধ করেছে। তা ক্ষমার অযোগ্য, নিন্দারও অধিক নিন্দনীয়। আমাদের বিদ্যুৎ খাত কখনই প্রত্যাশিত গ্রাহকবান্ধব হয়ে উঠতে পারিনি। তাদের নানাবিধ ব্যর্থতা উসুল করা হয় গ্রাহকের ওপর প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে। এর পর রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকির অগণন উদাহরণ। তবুও এসব মন্দের ভালো হিসেবে জনগণ সয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ভুতুড়ে বিল যেন সেখানে মরণদূত হয়ে ঠুকে দিয়েছে সর্বশেষ পেরেক। জনগণের যেহেতু বিকল্প নেই,  সেহেতু তাদের দশা হয়েছে- না পারছে সইতে, না পারছে কইতে। আমাদের পাশের দেশের সবচেয়ে নিকটবর্তী ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গে করোনাকালে বিদ্যুৎ বিল মওকুফ, অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত, কিস্তিতে প্রদানের সুবিধাদিসহ নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এ রকম ভুতুড়ে কান্ড ঘটানো হয়নি- যেটি আমাদের দেশে ঘটেছে। অথচ এত বড় ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেই, শাস্তির নামে নামকাওয়াস্তে কয়েকজনের ওপর যে অ্যাকশন নেওয়া হয়েছে- তা পর্বতের মূষিক প্রসবতুল্য। ডা. আবুল কালাম আজাদের কথায় আসায় যাক। সদ্য চুক্তি বাতিল হওয়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই মহাপরিচালকের (ডিজি) অফিস ফটকের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ চাউর হয়েছে। সেখানে বড় করে লেখা রয়েছে, ‘আমি ও আমার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত’। সাধে কি আর গুণীজনরা বলেছেন, ‘ নৈতিকতা এত সহজ জিনিস নয়- যে কারও কাছ থেকে তুমি এটি প্রত্যাশা করবে।’ স্বাস্থ্যের একজন ডিজিও কি যে কেউ- তার কাছ থেকে আমরা ন্যূনতম নৈতিকতাও প্রত্যাশা করতে পারব না? জেকেজির সাবরিনা-আরিফ দম্পতির করোনা শনাক্তকরণে জালিয়াতির খবরটি ছিল দেশব্যাপী বেশ আলোচিত। তারা আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু এখানেও পার্শ্বচরিত্রগুলোর কোনো হদিস নেই। তাদের পৃষ্ঠপোষক কারা, কাদের  যোগসাজশে তারা হয়ে উঠলেন এ রকম খলচরিত্র- তা হয়তো জানার সুযোগ হবে কখনই। এভাবে বিষবৃক্ষের শিকড়-বাকড় রেখে এক-দুটি গাছ কেটে যদি আমরা মনে করি দুর্নীতির মূলোৎপাটন সম্ভব, তা হলে  সেটি স্ফ্রে রসিকতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আর এই রসিকতা যখন সমাজ-রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেড়ে বসে, তখন স্বাভাবিক সময়ের পাশাপাশি বিপদাপন্ন অবস্থাও মানুষের জীবন-জীবিকা ও বেঁচে থাকার মৌল শর্তগুলোয় কেবলই শয়তানের পাশা খেলার দৃশ্য রচিত হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো, এসব দেখার পরও আমাদের হেলদোলের কোঠা শূন্যপ্রায়। কারণ ব্রিটিশ তাড়ানো বাঙালি, ক্ষুদিরামের উত্তরাধিকারে স্নাত বাঙালি ধরেই নিয়েছে ‘ক্ষুদিরাম হবে পাশের বাড়ির ছেলে।’সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ও  দোর্দন্ড প্রতাপের যুগে আমরা এটিকে কি ন্যূনতম ইতিবাচক কাজে লাগাতে পারছি? যদি পারতাম, তা হলে শয়তানের পাশা খেলা এভাবে চলতে পারত না। বোবা হয়ে থাকলে দুর্বৃত্তরাই সুবিধা নেবে। তাই অনৈতিকতা, অসাধুতা ও অন্যায্যতায় যে বা যারা যুক্ত থাকবে- তাদের বয়কট, ঘৃণা ও সুযোগ-সুবিধাকে উপেক্ষা করতে হবে এবং তাদের দেখানো ভয়-ভীতিকে থোড়াই কেয়ার করতে হবে। সেটি শুরু করতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে। আর এটিও যদি না পারি, তা হলে নিদেনপক্ষে লজ্জিত হই আসুন। লজ্জাটিও যদি ভুলতে বসেন, তা হলে আপনার-আপনাদের ভূগোলটি সাহেদময় হয়ে যেতে পারে। এ কারণে লজ্জিত হই এবং লজ্জিত হতে হতে খুঁজে ফিরি কী করণীয়।

লেখক ঃ সাংবাদিক ও গবেষক

 

আরো খবর...