আশা-নিরাশার দোলাচলে পোল্ট্রি শিল্প

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পোল্ট্রি এমন একটি শিল্প যার কারণে দেশের জনগণ সুলভে ও সহজে আমিষ ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারছে। তৈরি পোশাক খাতের পর দেশে বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে শিল্পটি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে কৃষির পরই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে পোল্ট্রি শিল্প। পোল্ট্রি শুধু খাওয়ার ক্ষেত্রেই ভালো তা নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব শিল্প হচ্ছে  পোল্ট্রি। সবচেয়ে কম জমির ব্যবহার, সবচেয়ে কম দূষণ, সবচেয়ে কম পানির খরচ, সব ধরনের বর্জ্যই রিসাইকেল হয়। বেকারত্ব, দারিদ্র্য বিমোচন ও পুষ্টির সহজলভ্যতায় পোল্ট্রির উল্লেখযোগ্য অবদান দিন দিন বাড়লেও স্পর্শকাতর শিল্প হওয়ার কারণে প্রায়ই বড় রকমের ঝুঁকির মোকাবিলা করতে হয় এ শিল্পকে। অতীতে বার্ড ফ্লুর মতো ভয়ানক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খেতে হয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্টদের। ওই ক্ষতির জের এখনো অনেকে কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পোল্ট্রি শিল্পকে জলবায়ুর পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক মন্দা, উপকরণের উচ্চমূল্য এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানান প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রান্তিক খামারি আর বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের তিল তিল পরিশ্রমের ফলে শিল্পটি খুব দ্রুত বিকশিত হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই  পোল্ট্রি শিল্প ধীরে ধীরে বিকশিত হলেও অন্তরালে থেকে যাচ্ছে অনেক সমস্যা। খাতসংশ্লিষ্টদের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার ফলে  দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রপ্তানির বিষয়ে অগ্রসর হলেও সমস্যা যেন এর পিছু ছাড়ছে না। বিভিন্ন কারণের মধ্যে একদিকে পোল্ট্রি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে মুরগি ও ডিমের মূল্য হ্রাসের ফলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে পোল্ট্রি খামারগুলো। সমস্যা আর সম্ভাবনার সমন্বয়হীনতায় আশা-নিরাশার দোলাচলে রয়েছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প।

এ প্রসঙ্গে ওয়ার্ল্ড পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, উন্নয়ন ও সুষম খাবার নিশ্চিত করতে হলে   পোল্ট্রি শিল্পের আরো বিকাশ প্রয়োজন। এই খাতকে বড়  কোম্পানির হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো বেশি মানুষকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ডিম-মুরগি যেন সব শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন তারা। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এবং  সেইসঙ্গে  বেড়েছে প্রাণিজ আমিষ গ্রহণের পরিমাণ। দেখা গেছে, কয়েক বছর আগেও প্রায় প্রতি বাড়িতে মুরগি পালন করে মাংস ও ডিমের চাহিদা মেটানো হতো। এখন মানুষ চাইলেই মুরগি ও ডিম হাতের নাগালে কিনতে পারছেন। এই পরিবর্তন এসেছে দেশের পোল্ট্রি উদ্যোক্তা আর খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে নীরব বিপ্লবের ফলে।

খামারিরা জানান একটি মুরগি ৭৬ সপ্তাহে ৫৬ কেজি খাবার খায়। প্রতি কেজি খাবারের দাম ৩৫ থেকে ৩৮ টাকা। এই হিসাবে একটি মুরগি খাবার খায় এক হাজার ৯৬০ টাকার। এছাড়া বাচ্চার দাম, ওষুধ, লেবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরো ব্যয় হয় প্রায় ৪৫০ টাকা। এতে একটি মুরগির দাম পড়ে ২ হাজার ৪১০ টাকা। ডিম পাড়া শেষে মুরগিটি বিক্রি করা যায় গড়ে ২১০ টাকায়। এ টাকা বাদ দিলে মুরগির দাম পড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ টাকা। একটি মুরগি গড়ে সর্বোচ্চ ৩০০টি ডিম দিতে পারে। সে হিসাবে প্রতি ডিমের উৎপাদন খরচ পড়ে ৭ টাকা ৩৩ পয়সা। এই অবস্থায় খামারিদের লাভ তো দূরের কথা, ব্যাপক লসে অস্তিত্বে সংকটে পড়তে যাচ্ছে শিল্পটি। অনুসন্ধানে জানা গেছে,  পোল্ট্রি উৎপাদনে যে খরচ হয় তার ৬৮ শতাংশই যায় পোল্ট্রির খাদ্য খরচ বাবদ। ১৮.৫ শতাংশ বাচ্চা কেনার খরচ। ৫ শতাংশ ওষুধের খরচ। ৪ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি আর বাকি অন্যান্য খরচ। বর্তমানে এসব খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাবারের দাম। জানা  গেছে, সারা বিশ্বে পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ ভুট্টার উৎপাদন কমায় দাম বেড়েছে। আমাদের প্রয়োজনীয় ভুট্টার ৪০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর ওপর আবার বসানো হয়েছে অগ্রিম আয়কর। তাছাড়া পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচামাল সয়াবিন মিল ও ওয়েল কেকের ওপর যথাক্রমে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে  পোল্ট্রি খাদ্যের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। সরকার কৃষি খাতে শস্য উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ রাসায়নিক সারের ওপর যেভাবে ভর্তুকি দেয় তেমনিভাবে পোল্ট্রি খাতে ব্যবহৃত উপকরণ খাবারের ওপর ভর্তুকি দেওয়ার দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের। এছাড়াও পোল্ট্রির ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও খামারিদের ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে বলে শিল্প বিশ্লেষকরা মনে করেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি দেশের মানুষের মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পোল্ট্রি শিল্পনগরী স্থাপন করা প্রয়োজন। তারা বলেন, সরকার কর্তৃক প্রতিটি পোল্ট্রি শিল্পনগরীতে অবকাঠামো, লেয়ার পালনের খাঁচাসহ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, প্রতিটি প্লটকে পোল্ট্রি পালনের উপযোগী করে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় উদ্যোক্তার হাতে হস্তাস্তর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া  পোল্ট্রি শিল্পনগরীতে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নগরীতে ফিডমিল উৎপাদনের জন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে একটি প্লট বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করতে না হয় সে জন্য নগরীর মধ্যে একটি প্লটে পোল্ট্রির ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য বিপণনের জন্য একটি প্লট বরাদ্দ করা প্রয়োজন হবে। অনেক হতাশার মধ্যেও আশার খবর হলো, বীমার আওতায় আসছে  দেশের পোল্ট্রি খাত। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। এ বিষয়ে ধারণাপত্র  তৈরির পর শস্যবীমার মতো পরীক্ষামূলকভাবে  পোল্ট্রি খাতে বীমা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। পরে শিল্পে বীমা সুবিধা চালু করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, পোল্ট্রি বীমা চালু করা হলে খামারিদের অনুকূলে বীমা সুবিধাসহ ঋণ বিতরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারে। পোল্ট্রি বীমা চালু করা হলে ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণে বেশি আগ্রহী হবে, যা   পোল্ট্রি খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন,  পোল্ট্রি খাতে বীমা সুবিধা না থাকায় কখনো ডিমের দাম বাড়ে, আবার কখনো কমে। বীমা চালু হলে এমনটি হবে না। বীমা না থাকার কারণে ব্যাংকগুলো পোল্ট্রি খাতে ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। ব্যাংকও চিন্তা করে কোনো রোগ-বালাইয়ের কারণে খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। বীমা চালু হলে ব্যাংকেরও এ চিন্তা থাকবে না। তখন এ খাতের ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়া সহজ হবে। তিনি বলেন, খুব দ্রুত পোল্ট্রি বীমা চালু হওয়া দরকার।

লেখক ঃ  এস এম মুকুল।

 

আরো খবর...