আমাদের উপমহাদেশে যত্রতত্র জন্মে বথুয়া শাক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বথুয়া শাক আমাদের উপমহাদেশে যত্রতত্র জন্মে। ধান-গম-যবের ক্ষেত, সবজি ক্ষেত, আনাচ-কানাচ ও পতিত জমিতে অতি সহজেই জন্মায় বলে কখনো মনে হয় না বথুয়া কোনো বিদেশি গাছ। একসময় যবের ক্ষেতে এদের বেশি দেখা যেত বলে হয়তো এর এক নাম ‘যবশাক’। চৈত্র-বৈশাখে এদের বীজ মাটিতে ঝরে পড়ে কিন্তু গজাতে গজাতে গ্রীষ্ম, বর্ষা পার হয়ে শীতকাল এসে যায়। গাছে প্রচুর বীজ হয়। কোমর সমান উঁচু একটি সাধারণ গাছে হাজার দশেক বীজ উৎপন্ন হলেও একটি হৃষ্টপুষ্ট বিস্তৃত গাছে ৫০ হাজার বীজ হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। আমাদের দেশে কখনো কখনো বহু বছর ধরে বথুয়া শাকের দেখা পাওয়া যায় না, কিন্তু হঠাৎ করে সাড়ম্বরে আবার উদয় হয়। এর কারণ, বথুয়ার বীজ ৪০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। একই বথুয়া গাছে নানারকম বীজ হতে দেখা যায়, মসৃণ, খসখসে, ঢেউতোলা, স্ট্রাইপ, কালো, বাদামি নানা পদের। একেক ধরনের বীজের সুপ্তিকাল একেকরকম মনে করেন কিছু কৃষি গবেষক। বথুয়ার ক্ষুদ্র বীজ জলে ভাসে না কিন্তু না ভাসলেও তা জলপ্রবাহে দূরে স্থানান্তরিত হতে পারে। বথুয়ার পাতা দেখতে অনেকটা হাঁসের পায়ের মতো বলে ইউরোপে এর সাধারণ নাম ‘গুজফুট’ বা হংসপদ। নিচের দিকের বড় পাতাতে এই আকৃতিটা বেশি বোঝা যায়। এর পাতায় সূক্ষ্ম বুদবুদ সদৃশ স্ফীত রোম থাকে যে কারণে আলোতে চিকচিক করে। উপরের দিকের চেয়ে নিচের দিকে এবং কচি পাতায় এই চিকচিকিটা বেশি থাকে। স্ফীত রোমের কারণে এর পাতা ‘ওয়াটারপ্র“ফ’ বা জলনিরোধক হয়। শাক জলে ডুবিয়ে  ধোয়ার সময় তা স্পষ্ট বোঝা যায়, সহজে পানি লাগতে চায় না। এমন স্ফীত  রোমের কারণ হয়তো কীটপতঙ্গকে দূরে রাখা। পাতার বোঁটা বেশ লম্বা তাই গাছ থেকে শাক তোলা সহজ ও আনন্দের কাজ। বাজার থেকে কেনার সময় অনেকে চিকচিকি দেখে কচি শাকের আঁটি বেছে নেন। তবে বথুয়ার বুড়ো পাতাও খাদ্যোপযোগী, এর স্বাদেরও তেমন পরিবর্তন হয় না, হেলেঞ্চা-পালং ইত্যাদি অন্য শাকের মতো নয়। অনেকে মটরকলাই শাকের মতো একে শুকিয়ে গুঁড়ো করে রাখেন, বৃষ্টির দিনে ঝটপট রান্নায় যা বেশ উপযোগী। চরক সংহিতায় উপদেশ বর্ণিত আছে, সকলপ্রকার শাকের বেলাতেই, সেদ্ধ করে জল নিংড়ে ফেলার। কিন্তু এটিই একমাত্র শাক যার বেলায় এই জল  ফেলে দেয়ার কথা বলা হয়নি। এই শাকে ‘স্যাপোনিন’ নামে মৃদু বিষ থাকে যা দেহে খুবই কম পরিমাণ শোষিত হয়। অকজ্যালিকের পরিমাণও থাকে খুব কম এবং চুলোর তাপে তার অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যায়। মাটিতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে গাছে সামান্য পরিমাণ ‘হাইড্রোজেন সায়ানাইড’ জমতে পারে যা ক্ষতিকর নয় বরং শ্বাসপ্রশ্বাসে ও হজমে সহায়ক হতে পারে। তাজা শাক কোনো কোনো দেশে সালাদ করে খাওয়া হয় যা অতিরিক্ত হলে স্বাস্থ্য-সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে আমাদের এসব বালাই নেই, কারণ আমরা যা-তা একটা কিছু কাঁচা সালাদে খেতে অভ্যস্ত নই। সালাদের জন্য আমাদের নিবাির্চত সবজিগুলো শসা, ক্ষীরা, বাঁধাকপি, পেঁপে, গাজর, বিট, লেটুস, লেবু, ধনে, পুদিনা ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে বেশি। ইদানিং অনেকে আপেলকে যোগ করছেন সালাদের একটি উৎকৃষ্ট উপাদান হিসেবে। ভারতে প্রধান খাবারের সঙ্গে ‘রায়তা’ খাওয়ার প্রচলন আছে যার চল বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে। এই রায়তা গ্রিল করা মাছ-মাংসের সঙ্গে বেশি খাওয়া হলেও যে কোনো খাবারের সঙ্গেই মানিয়ে যায়। হজমকারক এই রায়তা বথুয়া শাক দিয়েও সহজে তৈরি করা যায় যাকে হিন্দিতে বলে ‘বাথুয়া কা রায়তা’। এটি প্রস্তুত করতে এক চুলায় বথুয়া শাক সেদ্ধ করা হয়, পানিটুকু ফেলে দেয়া হয় পরে। অন্য চুলায় তেল বা দেশি ঘি দিয়ে ভুনা হয় জিরা, শুকনো মরিচ, গোলমরিচ, কালা লবণ, হিং ও ইে। তারপর বথুয়ার সঙ্গে ভুনাটুকু মিক্সারে দিয়ে বা হাতে ভালো করে মিশিয়ে নেয়া হয়। এখানে দই ও বথুয়া শাকই প্রধান উপাদান, বাকিসব মসলা যার যার রুচি অনুসারেই যোগ হয় বথুয়া রায়তায়। ভারতীয় উপমহাদেশে কয়েকরকম বথুয়া দেখা যায়। বেশ কিছু দেশে বথুয়া আগাছা হিসেবে পরিচিত। স্পেনে তুলাচাষের জমিতে, রাশিয়ার স্ট্রবেরি ক্ষেতে, জাপানের চা-বাগানে এমনকি কানাডায় তামাকের ক্ষেতেও এদের সংখ্যাধিক্য  দেখা যায়। কানাডা-আমেরিকায় বথুয়ার কারণে শস্য উৎপাদনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খেসারত দিলেও আমাদের দেশে কখনো এটি আপত্তিকর আগাছা নয় বরং উপাদেয় শাকবিশেষ। উল্লিখিত সবকটি প্রজাতিরই শাক খাওয়া যায় এবং রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা হয় পৃথিবীর নানাদেশে। বথুয়া এখন আর ইউরোপ-আমেরিকার গাছ নয়, দেশীয়করণের পর এটি ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে। এর গুণাবলি অসাধারণ কিন্তু আয়ুর্বেদ ও লোকায়ত ব্যবহারে এর বিকাশ অধিক গবেষণার দাবি রাখে।

আরো খবর...