আমন ধানের অধিক ফলন পেতে শুধু ইউরিয়া নয়, দরকার সঠিক সময়ে সুষমমাত্রায় বিভিন্ন জৈব ও রাসায়নিক সার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমন ধান সংস্কৃত হৈমন’ বা হৈমন্তিক’ শব্দের অপভ্রংশ। ধান বিশেষ। এর অপর নাম আগুনী ও হৈমন্তিক। আমন মৌসুমে সবচেয়ে বেশি জমিতে ধানের আবাদ হয়। [৪] আমন ধান তিন প্রকার। যথা ১. রোপা আমন : চারা প্রস্তুত করে, সেই চারা রোপণ করে এই ধান উৎপন্ন হয় বলে এর এরূপ নাম। রোপা আমন জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে বীজ তলায় বীজ বোনা হয়, শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে মূল জমিতে রোপা কার হয় এবং অগ্রহায়ণ- পৌষ মাসে ধান কাটা হয়। ২. বোনা আমন : এই আমন ছিটিয়ে বোনা হয়। বোনা আমন চৈত্র-বৈশাখ মাসে মাঠে বীজ বপন করা হয় এবং অগ্রহায়ণ মাসে পাকা ধান কাটা হয়। একে আছাড়া আমনও বলে। ৩. বাওয়া আমন : বিল অঞ্চলে এই আমন উৎপন্ন করা হয়। একে এই কারণে গভীর পানির বিলে আমনও বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির আমন ধানের চাষ হয়ে থাকে। এবং প্রতিটি প্রজাতির ধানের স্থানীয় নাম রয়েছে। যেমন- ইন্দ্রশাইল, কাতিবাগদার, ক্ষীরাইজালি, গদালাকি, গাবুরা, চিংড়িখুশি, চিটবাজ, জেশোবালাম, ঝিঙ্গাশাইল, ঢেপি, তিলককাচারী, দাউদিন, দাদখানি, দুদলাকি, দুধসর, ধলা আমন, নাগরা, নাজিরশাইল, পাটনাই, বাঁশফুল, বাইশ বিশ, বাদশাভোগ, ভাসা মানিক, মালিয়াডাক্র, রাজাশাইল, রূপশাইল, লাটশাইল, হাতিশাইল ইত্যাদি।

আমন মৌসুমে ধানের ফলন বাড়ানোর জন্য সুষম সার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার বিকল্প নেই। আর এতে ফলন বাড়বে।  বীজতলা তৈরি ঃ পরিমিত ও মধ্যম মাত্রার উর্বর মাটিতে বীজতলার জন্য কোনো সার প্রয়োগ করতে হয় না। তবে নিম্ন, অতি নিম্ন অথবা অনুর্বর মাটির ক্ষেত্রে গোবর অথবা খামারজাত সার প্রতি শতকে ২ মণ হিসাবে প্রয়োগ করতে হবে। বীজতলায় চারা হলুদ হয়ে গেলে প্রতি শতকে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া সার চারা গজানোর ২ সপ্তাহ পর মাটিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া প্রয়োগের পরও বীজতলায় চারা হলুদ হয়ে গেলে প্রতি শতকে ৪০০ গ্রাম জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে।

সার ব্যবস্থাপনা ঃ আমন ধানের অধিক ফলন পেতে শুধু ইউরিয়া নয়, দরকার সঠিক সময়ে সুষমমাত্রায় বিভিন্ন জৈব ও রাসায়নিক সার। এর মধ্যে ডাই এমোনিয়াম ফসফেট, ট্রিপল সুপার ফসফেট, মিউরেট অব পটাশ, জিপসাম, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট (ম্যাগসার, এগ্রোম্যাগভিট), জিংক সালফেট (মনো বা  হেপ্টা) বা চিলেটেড জিংক (লিবরেল জিংক), বরিক এসিড, সলিউবর বোরন (লিবরেল বোরন) ইত্যাদি সার সঠিক সময়ে সুষমমাত্রায় ব্যবহার করতে হবে। তবে অধিকাংশ কৃষক অতিমাত্রায় ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে আগ্রহী। কিন্তু জানা দরকার যে, অতিমাত্রায় ইউরিয়া প্রয়োগের ফলে ওই জমিতে ফসফরাস ও পটাশ জাতীয় সারের পরিমাণ মারাত্মক হারে কমে যায়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তথ্য মতে, উফশী জাতের আমনের উচ্চ ফলন পেতে বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) ২১ কেজি ইউরিয়া, ৭-১০ কেজি টিএসপি-ডিএপি, ৩.৫-১৩.৫ কেজি মিউরেট অব পটাশ, ৪-১১ কেজি জিপসাম, ১-২ কেজি জিংক সালফেট এবং ৩৫ মণ জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে। সাশ্রয়ী সার ব্যবহারে কয়েকটি প্রযুক্তি ঃ আমরা জানি, উদ্ভিদের নাইট্রোজেন পুষ্টি উপাদানের অভাব পুরনে জমিতে ইউরিয়া ব্যবহার করা হয়। ইউরিয়া সাশ্রয় করতে ধানের জমিতে গুটি ইউরিয়া প্রযুক্তি, লিফ কালার চার্ট অনুযায়ী ইউরিয়া প্রয়োগ, বিভিন্ন ধরনের জৈব সার (সবুজ সার, আবর্জনা পচা সার, পচা গোবর), নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়াল ইনোকুলাম প্রয়োগ এবং অ্যাজোলার চাষ বাড়ানো যেতে পারে। ব্রির তথ্য মতে, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ কম ইউরিয়া প্রয়োগে ১৫-২০ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পায়। সবুজ সার হিসেবে ধঞ্চের চাষ, গ্রীষ্মকালীন মুগ-মাসকলাই চাষ করলে ইউরিয়ার ব্যবহার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। অন্যদিকে ডাই এমোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ব্যবহার করলে একই সঙ্গে ইউরিয়া ও ফসফরাসের অভাব পুরন করা সম্ভব। জিংক সালফেট (মনো বা হেপ্টা) সার ফসফরাস জাতীয় সারের সঙ্গে একত্রে ব্যবহার করা যায় না। এ সমস্যা সমাধানে জিংক সারের সর্বশেষ প্রযুক্তি চিলেটেড জিংক বা লিবরেল জিংক প্রয়োগ করা যেতে পারে। মূল জমিতে ধানের চারা রোপণের ২০-২২ দিন পর প্রথমবার এবং ৪০-৪৫ দিন পর দ্বিতীয়বার ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম লিবরেল জিংক ¯েপ্র করলে সুফল পাওয়া যাবে। রোপা আমন ধানের জমি তৈরির সময় বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) ৩০০  কেজি জৈব সার ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের ব্যবহার শতকরা ৩০ ভাগ কমানো সম্ভব। এ ছাড়া জৈব সার ব্যবহারে রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম সরবরাহ ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমিক ও গৌণ পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে, মাটির বুনট ও গঠন প্রকৃতি উন্নত হয়। রোপা আমনে সার প্রয়োগের নিয়ম : ১. চারা রোপণের আগে জমি তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে সমুদয় টিএসপি-ডিএপি, মিউরেট অব পটাশ, জিপসাম ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। জমি তৈরির সময় জিংক সালফেট না দিলে স্প্রে আকারে চিলেটেড জিংক বা লিবরেল জিংক ব্যবহার করা যায়। ২. ইউরিয়া সার কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। অতি নিম্ন ও নিম্ন পুষ্টিমানসম্পন্ন মাটির ক্ষেত্রে ইউরিয়া সার সমান ৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে অথবা চারা  রোপণের ৭-১০ দিন পর প্রথম কিস্তি এবং ২৫-৩০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তির সার প্রয়োগ করতে হবে। উভয় কিস্তির সারই জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে এবং জমি তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে ও আগাছা দমনকালে ভালভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। তৃতীয় কিস্তির সার কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন আগে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। মধ্যম ও পরিমিত পুষ্টিমানসম্পন্ন মাটির ক্ষেত্রে ইউরিয়া সার দুই কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তি দ্রুত কুশি গজানোর সময় আগাছা দমনকালে এবং দ্বিতীয় কিস্তি কাইচ থোড় আসার ৫-৭ দিন আগে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। ৩. নাইট্রোজেন সারের উৎস হিসেবে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করলে ধানের চারা  রোপণের ৮-১০ দিন পর একবার ১টি মেগা গুটি (২ গ্রাম) বা ৩টি ছোট গুটি (১ গ্রাম) ইউরিয়া ৪-৫ সেন্টিমিটার গভীরে প্রয়োগ করতে হবে। গুটি প্রথমে ধান  ক্ষেতের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির মাঝে এবং তারপর তৃতীয় ও চতুর্থ সারির মাঝে এভাবে ক্রমান্বয়ে স্থাপন করতে হবে।

আরো কিছু করণীয় : আমনের অধিক ফলন  পেতে উপরোল্লিখিত নিয়মে সুষম সার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সম্পূরক সেচ এবং সময়মত বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। ধানের আগাছা নিয়ে সব সময় কৃষকেরা চিন্তিত থাকেন। আমন ধানের আগাছা দমন করতে মূল জমিতে চারা রোপণের ৫-৭ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কম্বাইন্ড আগাছানাশক বিঘাপ্রতি (৩৩ শতক) ১০০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে ধান বীজ উৎপাদন করতে ইউরিয়া শতকরা ১৫ ভাগ কম প্রয়োগ করতে হবে। ধান পাকার ঠিক আগে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ৪০-৪৫ গ্রাম এগ্রিসাল/থিওভিট/মাইকোসাল (৮০ শতাংশ সালফার) ¯েপ্র করলে বীজের বর্ণ উজ্জ্বল হবে, ধানের গায়ে কালো বা বাদামী দাগ পড়বে না। ধান কাটার পর ঠিকমত মাড়াই-ঝাড়াই করে কড়া রোদে শুকাতে হবে। এরপর বস্তাবন্দি করে গুদামে রাখতে হবে। গুদামে ফসটক্সিন জাতীয় গ্যাস ট্যাবলেট প্রতি টনে ৪টি হারে প্রয়োগ করলে ধানের গুদামজাত পোকার আক্রমণ রোধ করা সম্ভব। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, হাইব্রিড ধানের বীজ পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ হিসেবে রাখা যাবে না।

আরো খবর...