আত্মার উর্দ্ধগতি আর অধোঃগতি

 ॥ নাজীর আহ্মদ জীবন ॥

(২য় বা সমাপ্তি পর্ব) “পরমাত্মার (আল্লাহর) এ সৃষ্টি জুড়ে/মানবআত্মার গভীর ক্রন্দন/যাবে না এ ধরায়/কি হবে মুক্তির উপায়/ফিরে আসিবার পথ/না হলে মানব জনম হবে বরবাদ”।

কুষ্টিযার সন্তান মরহুম মিজু আহ্মেদ ছিলেন বারো শরীফের ভক্ত ও মুরিদ। একদিন কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন বেহেস্ত দোজখ বিচার এসব কি সত্যই আছে হুজুর? আমার তো মনে হয় এসব কিছু নাই। শেষ জামানার জ্ঞানী সূফী সাধক বারো শরীফের মহান ইমাম (রঃ) কয়েক মূহুর্ত মাথা নিচু করে থেকে বললেন ঃ “যে ভাবে বইয়ে আছে সে ভাবে নাই। তবে একদিন সব আত্মাকে এক জায়গায় করা হবে। কর্মনুযায়ী আত্মার রূপ সে রকম হয়। বলা হয় দোজখে খারাপ জিনিস খেতে দেয়া হবে; যেমন-মল, মূত্র, পুঁজ, রক্ত, পচা জিনিস। এ দুনিয়ায় কি, কুকুর, শূকর, শিয়াল তা খাচ্ছে না। আত্মার রূপ যে রকম হবে তাতে ফুঁকে দিবে। মিজু ভাই বললেন, তাহলে এ ভাবেই চলতে থাকবে। ইমাম (রঃ) বললেন, “এ ভাবে একটা আত্মা যতদিন না মুক্তি পাবে ততদিন কেয়ামত হবে না। এরপর যেদিন সকল আত্মা মুক্তি পাবে, যেখান থেকে এসেছিল ফিরে যাবে। আল্লাহ, যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছিল তখন সেটা হয়ে যাবে, তখনই হবে ‘মহাপ্রলয়’। বললেন, ‘যতদিন দেহ ততদিন স্ত্রীর ভূমিকা। স্বামী-স্ত্রী মারা গেলে সবই এক। আত্মার জগতে নারী পুরুষ বলে কিছু নেই। সবই এক। ‘আত্মার জগতে’ আবার পার্থক্য আছে নাকি। কেবল নিজ নিজ কর্মের ছাপ নিয়ে চলে যাবে। (মোহাম্মদী ডাইরী ১২-১১-৮২)

১৩-০৬-৮২ তে কথা প্রসঙ্গে মহান শেষ ইমাম (রঃ) কে বলেছিলাম, মুর্শিদ! বারো শরীফ দরবারে ভোরে ফজরের নামাজ পড়ার সময় এত মশা যে, ছেঁকে ধরছে, হাতে-পায়ে কাপড় দিয়েছে। মনে মনে করছিলাম, “আল্লাহ এতসব কেন সৃষ্টি করলো। পরক্ষনেই মনে হলোÑআল্লাহ নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্যে করেছেন।” শুনে আওলাদে রাসূল প্রেমিক, সূফী সাধক মহান ইমাম (রঃ) কয়েক মূহুর্ত চোখ বন্ধ করে ধ্যানাস্থ হয়ে বললেন, “অনেক গুলো আত্মার অধোঃগতির ফলে সৃষ্ট।” পবিত্র কোরআনে বিজ্ঞান সম্পর্কিত বহু আয়াত আছে। যেমন সূরা বাকারাতে বলা হয়েছে ঃ “আল্লাহ পাক  নিঃসন্দেহে মশা বা তদূর্ধ্ব  বস্তু দ্বারা উপমা পেশ করতে লজ্জাবোধ করেন না।’ (বাকারা:২৬) বাংলা ভাষায় যেমন পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ রয়েছে, আরবি ভাষায়ও তাই। এখানে মশা শব্দটা স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে (বাউদা)। কিন্তু কেন স্ত্রীলিঙ্গ ব্যবহার করেছেন? বিজ্ঞান কিছুদিন পূর্বে প্রমাণ করেছে যে; আমাদের শরীর থেকে রক্ত যে খায় সেটা স্ত্রী মশা। তাছাড়া আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ এখানে আরো বলছেন যে তদূধর্ব বস্তু। বিজ্ঞান আরো প্রমাণ করেছে যে সেটা হলো ফ্লাইংপেরাসাইট যা মশা থেকে রক্ত শোষণ করে, আর মশা তার বংশ বিস্তারের প্রয়োজনে আমাদের থেকে রক্ত শোষণ করে।

আল্লাহ কিন্তু এখানে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করেন নাই; আবার মশা শব্দটা ব্যবহারের আগে ফ্লাইং পেরাসাইট এর কথাও আগে নিয়ে আসেননি। আল্লাহ বড় বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান মুখী। বললেন, ‘দোজখ বেহেস্ত, এসব কিছু এখানেই। আলাদা করে কিছু নেই। উপমা দিয়ে এসব তৎকালীন জামানার মানুষকে বুঝানো হয়েছে। আছে “আত্মার অধোঃ গতি আর উর্দ্ধগতি।

অধোঃগতি হলে এসব হবে; জন্তুর (পশু) মধ্যে ফুঁকে দিবে। এভাবেই শাস্তি  হয় এবং চলতে থাকে। এখানে আমরা সকল অবস্থায় পুলসেরাতের উপর। একদিন রাসূল (সাঃ), হযরত আনাস  (রাঃ) সহ যাচ্ছেন। আনাস, জিজ্ঞাসা করলেন Ñ“ইয়া রাসূলাল্লাহ (সঃ)! বেহেস্ত পাবার সহজ পথ কি? বললেন; “আমার হাতে যারা মুরিদ হয়েছে তাদেরকে, আমাকে ভালবাসতে হবে। এতে “আমার আত্মার” ছাপ তাদের উপর পড়বে।  ফলে আত্মার মুক্তি হবে।” আনাস বললেন, এটা তবে সবাইকে বলে দেই; বললেন না, এতে সবাই জড় হয়ে পড়বে।  এবাদত বাদ দিবে। ” মাওলানা রুমী বলেছেন, “যদি তোমরা আত্মার মুক্তি চাও তবে, কামেলকে ভালবাস ও মুরিদ হও। এতে ভুল করলেও (অভ্যাস বশতঃ হওয়া স্বাভাবিক) যেহেতু কামেলের আত্মার ছাপ তার রূপ এক হয়ে যায়। তাই শাস্তি এড়ানো যায়। আত্মা বিকৃত হয় না। রাসূল, সেদিন বলতে নিষেধ করেছিলেন, সেটা হচ্ছে  এটাই, যা বললাম।” (মোহাম্মদী ডাইরীÑ১৩Ñ০৬Ñ৮২)

অন্য একদিন বললাম, মুর্শিদ আত্মার শাস্তি কি ভাবে হয় এটা তো মোহাম্মদ (সাঃ) এর নূরে সৃষ্টি। বলেছিলেন, “আত্মা  যেহেতু পাপের ফলে বিকৃত হয়ে যায়, তাই তখন আর মানবআত্মা থাকে না। আত্মার অধঃগতি হয়। এর কোন আকার বা গন্ধ নেই। যে জন্তুর শরীরে দেয়া হয়  সেটাই সেট হয়। বাইরে থাকে কেবল খোলস্।”

আত্মার অধোঃ ও উর্দ্ধগতি ১ম পর্বের কথা উল্লেখ করে বললেনÑঈসা নবী সেদিন উক্ত রূহের জন্য দোয়া করলেন, ফলে উক্ত রুহ মানুষের  আকৃতি পেয়ে বেহেস্তে চলে গেল। যদি বিচার না হলে বেহেস্তে যাওয়া যাবে না, তবে  সেদিন সে বেহেস্তে  গেল কি করে। হাশ্রতো চলছেই। প্রতি মুহূর্তে আমাদের পরীক্ষা চলছে যদি পাপ বেশি করি তাহলে আমাদের পাপ পূণ্যকে ঢেকে ফেলবে। কিন্তু যদি মুর্শিদের (কামেল) সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকে, তবে সর্বদা ফায়েজ যাবার কারণে (নূরের ছটা) এটাকে কাটিয়ে উঠা যায়। কারণ, ছোট শক্তি কখনও বড়কে ঢেকে রাখতে পারে না। কারণ সে মুর্শিদের রূপে থাকে। এতে সে মুক্তি পায়। তার ভিতর আত্মা, মুর্শিদের রূপে বসে থাকে। আত্মার অধঃপতন আছে, তা হল পশু আত্মায় রূপ নেয়া।” (বিদ্যুৎ এর আলোর বিভিন্ন রূপ দিয়ে বুঝালেন)।

এরপর বললেন, বলা হয় সাত আসমান, চতুর্থ আসমানে ঈসা (আঃ) আছেন। আসলে কি ১-২-৩ করে ৭ আছে? রাসূল সাত আসমান পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আসলে, এসব তারার জগৎ। তৎকালিন যামানার লোকদের বুঝাবার জন্য বেহেস্ত-দোযখ সাত আসমান এসব বুঝানো হয়েছে। রাসূল (সাঃ) তো সেজ্দায় পড়ে আছেন। যতদিন না সব আত্মা আত্মার রাজ্যে ফিরে না যাবে। আর, আল্লাহর ওলীরা তো সেই কাজই করছেন। সেদিনই রাসূল শান্তি পাবেন। (মোহাম্মদী ডাইরী ৮-৮-১৯৮৩-সোমবার)

“তোমাদের প্রভুর নিকট  অবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং জান্নাতের নিকটবর্তী হও, যার আয়তন আকাশ ও পৃথিবী ব্যাপী।” এ আয়াত সম্বন্ধে রাসূলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যদি বেহেশ্ত আকাশ সমূহ ও পৃথিবী ব্যাপী অবস্থান করে, তবে নরক বা দোযখ কোথায়? উত্তর দিয়েছিলেন, “যখন দিন হয়, তখন রাত্রি কোথায়?” এ থেকে বুঝা যায় দিনের পর যখন একই পৃথিবীতে রাত্রি আসে, তখন একই মানবের উপর একই পৃথিবীতে ও আকাশে বেহেশ্ত ও দোযখ্ আগমণ করে। প্রকৃত পক্ষে, বেহেশ্ত ও দোযখ্ মানবাত্মার বিভিন্ন রূপ বা অবস্থা মাত্র যেরুপে রাত্রি ও দিন পৃথিবীর বিভিন্ন অবস্থা। তৎকালিন সময়ের মানুষ বুঝতে পারবে না বলে, রাসূল (সাঃ) উপ্মা দিয়ে বুঝায়েছেন। সময় বড় কঠিন বিষয়। এর উপর বহু কিছু নির্ভর করে। সময় সভ্যতা জ্ঞান জীবন ও মৃত্যু।

জ্ঞানী সূফী সাধক যিনি বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তাধারার সাথে আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার সমন্বয়কারী ও অনুরাগী বলেন ঃ “আত্মার জগৎ অর্থাৎ আলোর জগৎ সম্পর্কে আমাদের একটু খোঁজ করা দরকার। আমার কথা বলছি; অনুভুতিবোধ করছি এসব কোন শক্তিতে। আলোর গতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। এর চেয়ে গতিশীল বস্তু আমাদের মাঝে রয়েছে। সূর্য ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে। আমরা চোখের পল্কে এর দিকে তাকাচ্ছি বা দেখছি।  এটা কার শক্তিতে। রাসূল বলেছেন; “আমরা যেন অবসর সময়ে নামাজবাদ অন্তরের জিকির করি। যে নিজেকে চিনেছে সে তার প্রভুর পরিচয় পেয়েছে”। আমাদের এ মাটির দেহে আলোর (নূর) সংযোগ না হলে নূরের জগতে ফিরে যাওয়া কষ্ট কর। এ মাটির দেহের কোন দাম নেই। কয়েক দিনের জন্য এ দেহকে বাহন হিসাবে রাখা হয়েছে। এর ভিতর যে মূল্যবান ‘আত্মা’ বসে  আছে সেটা হলো অবিনশ্বর। সেই আত্মাকে তার স্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব আমাদের। তাই, মস্নবী শরীফে বলা হয়েছে Ñ “বন্ধুর দেখা পেলে মুক্তির উপায় যেন আমরা যেনে নেই। এখানে বন্ধু আল্লাহর ওলী বা কামেল সাধক। তাই প্রতিটি লোকের উচিৎ নিজেকে জানা।” (মোহাম্মদী ডাইরী থেকে)

“হায় পাখি!”

“হায় পাখি! আজও যে হলো না আপন

রয়ে মোর সাথে সারাটা জীবন;

চলে যেতে চায় সে তার আপন ভূবন

ছাড়ী আমারে নিরব-নিথর করি।

জানো  কি সবে ওগো এ পাখির ধর্ম Ñ

শুনো তবে পাখির নিজস্ব ধর্ম,

ধর্ম না হলে হয় না কোন কর্ম

যে কর্ম তুমি করবে এ ভবে,

সে রঙে সে যে রঞ্জিত হবে।

যে রুপ নিয়ে সে এসেছিল ভূবন

রঙ্গিত না হয় যদি পাখি সেরুপ গড়ন

দুঃখ কষ্টের হবে শেষ তোমার

মানব জনম যে শুধু একবার।

মানব জনম যদি বৃথা হয় তোমার

এর চেয়ে দুঃখ লজ্জার নাই কিছু আর;

আত্মার বিকৃতি ঘটে আসবে পশু রুপে

তোমার পাপের ফলে পাখির কষ্ট হবে

যে রুপ তোমার পাপের ধরণ; পাখির হবে সে রুপ গড়ন।”

(১৮-০৭-৯৩ রবিবার লেখক কর্তৃক লিখিত)

আরো খবর...