আজ থেকে শুরু হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব

সাঁইজির আখড়াবাড়ীতে মানুষ রতনের ভীড়

আরিফ মেহমুদ ॥ মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই বাঙালির চেতনায় এক অবিস্মরণীয় কালপুরুষ। তাঁর গানের মাঝেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির রহস্য। সৃষ্টিকর্তার সাথে আত্মিক সম্পর্ক তাঁর গানের মূলমন্ত্র। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে একই স্রোতধারায় আনার জন্য আমরণ কাজ করেছেন এই মরমী সাধক। বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের সঙ্গীত আজও আমাদের অনুপ্রানিত করে। এই মহান সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব (দোলপূর্ণিমা) উপলক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়ীতে আজ রবিবার থেকে শুরু হচ্ছে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। অনুষ্ঠানমালায় যথারীতি থাকছে আলোচনা সভা, লালন মেলা ও নির্ধারিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় ও লালন একাডেমীর আয়োজনে একটানা ৮ মার্চ রবিবার থেকে শুরু হয়ে ১০ মার্চ মঙ্গলবার পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী চলবে বাউল সম্রাট সাধক ফকির লালন সাইয়ের স্মরণোৎসবের অনুষ্ঠান। সাঁইজীর জীবদ্দশায় তার ভক্ত অনুরাগী শিষ্যরা দোলপূর্ণিমায় স্মরণোৎসবের অনুষ্ঠান খুব জাকজমকভাবে উদযাপিত করতেন। এবারো তার কোন ব্যতিক্রম হচ্ছে না। স্মরণোৎসবের অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতোমধ্যে লালন একাডেমি নানান উদ্যোগসহ সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। লালন সাঁইয়ের মাজারের সাজসজ্জা ও ধোয়া-মোছার কাজ শেষ করে সাঁইজীর পছন্দের সাদা ধূসর রং দিয়ে রাঙিয়ে দিয়েছে তাঁর মাজার। “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি”এই মানবতার দিক্ষা নিতে আত্মার টানে দেশ-বিদেশের সাধু-গুরু ও ভক্তরা দলে দলে আসতে শুরু  করেছে সাঁইজির মাজারে। প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী প্রতিবার দুই অথবা তিনদিনের এ উৎসব পালিত হলেও স্মরণোৎসব থেকে এবং আগত বাউলদের অনুরোধেই তা বাড়িয়ে পাঁচদিনের প্রথা চালু করা হয়েছে। এবারো তার ভিন্নতা নেই। মূল উৎসব শুরু হওয়ার ৭-৮ দিন আগ থেকে আখড়ায় আসা বাউল সাধকরা মাজারের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে আসন গেড়ে গেয়ে চলেছে সাঁইজির আধ্যাত্মিক মর্মবাণী ও ভেদ তথ্যের গান। জমজমাট এখন লালন শাহের আখড়া বাড়ি। কুষ্টিয়া পরিণত হয়েছে উৎসবের শহরে। সুষ্ঠুভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি অনুষ্ঠানস্থলে থাকছে র‌্যাব ও সাদা পোষাকে গোয়েন্দা পুলিশ। স্মরণোৎসবের অনুষ্ঠানে আসা দেশ-বিদেশের লাখো ভক্ত অনুরাগী ও সাধু-গুরুদের চরণ ধূলায় সিক্ত হবে বাউল সম্রাটের ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ী। সভ্যতার এই যুগে মানুষ মানুষে হিংসা বিদ্বেষ ভূলে সময়ের কাজ সময়ে করার সাঁইজির দর্শনের চিরাচরিত তাগিদ “ সময় গেলে সাধন হবে না” এই মানুষে আছে রে মন, ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ ও মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” এই শ্লোগানকে বাস্তবায়নে সদা সত্য ও সঠিক পথে চলে দেশ ও জাতির উন্নয়নে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখতে হবে। উদ্বোধনী দিনে আজ রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আঃ কাঃ মঃ সরওয়ার জাহান বাদশা, কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনের এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান ও সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, কুমারখালি উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান, কুষ্টিয়া জজকোর্টের পিপি এ্যাড.অনুপ কুমার নন্দী, কুষ্টিয়া জজকোর্টের জিপি এ্যাড. আ. স. ম. আখতারুজ্জামান মাসুম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে আলোচনা করবেন ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্জ প্রফেসর ড. মোঃ শাহিনুর রহমান। লালন সাঁইজির সাধনা, রচনা ও বাউলতত্ব নিয়ে আলোচক হিসেবে আলোচনা করবেন লালন মাজারের খাদেম মোহাম্মদ আলী। শুভেচ্ছ বক্তব্য রাখবেন কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সহসভাপতি আজাদ জাহান। স্বাগত বক্কব্য রাখবেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের এনডিসি ও লালন একাডেমির এ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব মুহাম্মদ মুছাব্বেরুল ইসলাম। প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উন্মুক্ত মঞ্চে বিশিষ্টজনদের মুক্ত আলোচনা শেষে রাত ৮টায় শুরু হবে লালন সঙ্গীতানুষ্ঠান। চলবে গভীর রাত অবধি। সঙ্গীত পরিবেশনায় থাকবেন দেশের খ্যাতনামা লালন শিল্পীসহ স্থানীয় লালন শিল্পীরা। উল্লেখ্য, বৃটিশ শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে, মানুষ গুরুর দিক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসাবে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আবির্ভাব ঘটে কুমারখালির  ছেঁউড়িয়াতে। লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকলেও আজো অজানায় রয়ে গেছে তাঁর জন্ম রহস্য। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আর্থিক অসংগতির কারনে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত। যৌবনকালে পূর্ণ লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমনে বেরিয়ে তার  যৌবনের রূপান্তর ও সাধন জীবনে প্রবেশের ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। তীর্থকালে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে তার সঙ্গীরা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পরে মলম শাহ’র আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে তিনি সাধক ফকিরী লাভ করেন। প্রথমে তিনি কুমারখালির ছেঁউড়িয়া গ্রামের গভীর বনের একটি আমগাছের নীচে সাধনায় নিযুক্ত হন। পরে স্থানীয় কারিগর সম্প্রদায়ের সাহায্য লাভ করেন। লালন ভক্ত মলম শাহ আখড়া  তৈরীর জন্য ষোল বিঘা জমি দান করেন। দানকৃত ওই জমিতেই ১৮২৩ সালে লালন আখড়া গড়ে ওঠে। প্রথমে সেখানে লালনের বসবাস ও সাধনার জন্য বড় খড়ের ঘর তৈরী করা হয়। সেই ঘরেই তাঁর সাধন-ভজন বসতো। ছেঁউড়িয়ার আঁখড়া স্থাপনের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিষ্যভক্তদের নিয়ে পরিবৃত থাকতেন। তিনি প্রায় এক হাজার গান রচনা করে গেছেন। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ভোরে এই মরমী সাধক বাউল সম্রাট দেহত্যাগ করেন এবং তাঁর সাধন-ভজনের ঘরের মধ্যেই তাকে সমাহিত করা হয়। আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে লালন মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে লালন সঙ্গীত। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দেশের খ্যাতনামা শিল্পীবৃন্দসহ লালন একাডেমীর স্থানীয় শিল্পিরা। উৎসবকে ঘিরে পুরো একাডেমি চত্ত্বরে শুরু হয়েছে খন্ড-খন্ড স্থানে গানের আসর। এসব গান শুনে আগত দর্শক-শ্রোতারাও নেচে-গেয়ে গানের সাথে সাথে তাল মিলাচ্ছে।

আরো খবর...