আউশ আবাদে বৃষ্টি ছাড়া অতিরিক্ত পানির দরকার হয় না

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আউশ একটি আদি ধান। ‘আশু’ শব্দ পরিবর্তিত হয়ে আউশ হয়েছে যার অর্থ আগাম। আশি থেকে ১২০ দিনের  ভেতর এ ধান ঘরে তোলা যায়। দ্রুত (আশু) ফসল উৎপন্ন হওয়ার বিচারে এই ধানের এমন নামকরণ হয়েছে। খনার বচনে আছে ‘আউশ ধানের চাষ, লাগে তিন মাস, কোল পাতলা ডাগর গুছি, লক্ষণী বলে হেথায় আছি অর্থাৎ আউশ ধান চাষে তিন মাস লাগে; ফাঁক ফাঁক করে লাগালে গোছা মোটা হয় এবং ফলনও বেশি হয়’। আরও সহজ কথায় আউশে আমন-বোরোর মতো যতœ নিলে ফলন  কোনো অংশেই কম নয়। আউশের জীবনকাল কম এবং পানি সাশ্রয়ী। কথায় আছে জ্যৈষ্ঠে খরা ধানের ভরা। অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ মাসে একটু বৃষ্টি পেলেই আউশের জমি সবুজ ধানে ভরে যায়। এজন্য আউশ আবাদে বৃষ্টি ছাড়া অতিরিক্ত পানির দরকার হয় না। সার  দেয়ার প্রয়োজনীয়তাও কম। কোনো কোনো আউশ ধান নিজে  থেকেই আগাছা দমন করার যোগ্যতা রাখে। আমাদের দেশে শুকনো মৌসুমে বোরো চাষে সেচ কাজে পানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায় যা মেটাতে ভূ-গর্ভস্থ পানি অধিক উত্তোলন করা হয়। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে ও  ভৌগোলিক পরিবেশ বিঘিœত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে  বোরো মৌসুমে ২৫০০-২৮০০ লিটার পানির প্রয়োজন যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই আউশের আবাদ সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। বর্তমান অবস্থা ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনতার পরপর আউশের জমি ছিল ৩.০ মিলিয়ন হেক্টর। আর  বোরোর জমি ছিল ১.০ মিলিয়ন হেক্টরের কাছাকাছি। বোরো শুধু হাওর আর বিল এলাকার আশপাশে চাষ করা হতো। আউশ করা হতো কিছুটা উঁচু জায়গায়। কালের বিবর্তনে বোরো আবাদ এলাকা সম্প্রসারণ হতে থাকে। বোরোর আওতা এখন ৫.০ মিলিয়ন  হেক্টরের কাছাকাছি। এখানে বোরোর জমি এবং আউশ থেকে রূপান্তরিত জমি গভীর পানির ধান আবাদ এলাকা ও কিছু পতিত জমি রয়েছে। রূপান্তরিত বোরোর পুরো জমি আউশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আউশ আবাদে চ্যালেঞ্জসমূহ আগে আউশ আবাদ স্থানীয় জাতনির্ভর ছিল। স্থানীয় জাতের গড় ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি ২.০০ থেকে ২.৩৫ টন পর্যন্ত। ব্যতিক্রম ছিল কেবল কটকতারা, যার এর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৩.৩৫ টন। তবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এখন পর্যন্ত ১১টি আউশের জাত উদ্ভাবন করেছে; যার মধ্যে বোনা হিসাবে বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩ ও ব্রি ধান৮৩ এবং রোপা হিসেবে বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৮২ ও ব্রি ধান৮৫সহ প্রতিটি জাতের ফলন কটকতারার চেয়ে অনেক বেশি। তা ছাড়া বোরো মৌসুমের ১২টি জাত আউশ  মৌসুমে চাষ করা যায়। এগুলোর ফলন ৩.৫-৫ টন/ হেক্টরের  বেশি। এ ছাড়া আরও বেশ কটি সম্ভাবনাময় জাত অবমুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আউশ আবাদ বৃদ্ধিতে করণীয় বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০-২২ লাখ নতুন মুখ যোগ হচ্ছে। এ ছাড়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ১০ লাখ রোহিঙ্গা মোট জনসংখ্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে, এই অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে খাওয়াতে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৩.৫-৪.০ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন করতে হবে। তা ছাড়া বোরো ও আমনের মধ্যে প্রায় ছয় মাস কোনো দানাদার শস্য হার্ভেস্ট না হওয়ায় দেশে খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই অস্বস্থিকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকে। এ সময়ে আউশ আবাদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটা ভালো ফলন ঘরে তোলা গেলে এ ক্ষেত্রে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্বল্পতার কারণে  সেচের সমস্যা রয়েছে, যেমন- বরেন্দ্র এলাকা, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ইত্যাদি এলাকায় আবাদ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বোরো-পতিত-রোপা আমন শস্যবিন্যাসে উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে আউশের আবাদ সম্প্রসারণ করা যাবে। দেশে মোট আবাদযোগ্য জমি ৮৫,০৫,২৭৮.১৪ হেক্টর, মোট  সেচকৃত জমি ৭১,২৪,৮৯৫.৪১ হেক্টর, এবং আবাদযোগ্য পতিত জমি ২,০৪,৩৬৬.১৪ হেক্টর। সেচ সুবিধা সংবলিত জমি বোরো উৎপাদনে ছেড়ে আবাদযোগ্য পতিত জমিতে আউশ আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে গড় ফলন ৩.০টন/হে ধরলেও ৬.১৩ মিলিয়ন টন ফলনজাতীয় উৎপাদনে যোগ হবে। আউশ মৌসুমের জন্য উদ্ভাবিত বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, বিআর২৬, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান৬৫ ও ব্রি ধান৮৩ বোনা হিসেবে এবং বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৮২ ও ব্রি ধান৮৫ রোপা হিসেবে চাষ করা। তাছাড়া বোরো মৌসুমের চাষযোগ্য বিআর১, বিআর২, বিআর৩, বিআর৬, বিআর৭, বিআর৮, বিআর৯, বিআর১২, বিআর১৪, বিআর১৫, বিআর১৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৫৫ আউশ মৌসুমে চাষ করা যায়। আউশ মৌসুমের জন্য উদ্ভাবিত বিআর২৬ এর বিকল্প জাতগুলো মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে। বৃহত্তর বরিশালে রোপা আমন-রিলে  খেসারি/রিলে ফলন-পতিত, রোপা আমন-মুগ/তিল-পতিত, রোপা আমন-তরমুজ/মরিচ-পতিত ফসল ধারায় পতিত জমিতে বিআর২৬/ব্রি ধান৪৮/ব্রি ধান৮২ চাষ করা। আউশের প্রকারভেদ দু’রকমের আউশ হয়। যথা- বোনা ও রোপা আউশ। বোনা আউশ  চৈত্রের শুরু থেকে বৈশাখের মধ্যে (মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত) এবং রোপা আউশ বৃষ্টিপাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে (মের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে) জমি তৈরি ও বীজ বপনের কাজ করতে হবে। বপন সময়ের তারতম্যের জন্য আউশ ধানের ফলনে তেমন পার্থক্য হয় না। কিন্তু দেরি করে ধান বপন করা হলে একই জমিতে রোপা আমন লাগাতে দেরি হয়ে যায়। ফলে আমন ধানের ফলন অনেক কমে যায়। এ ধানের ভালো ফলন পেতে হলে ভালোভাবে জমি তৈরি করতে হবে।  বোনা আউশ ধান চৈত্র-বৈশাখে বুনে আষাঢ়-শ্রাবণে কাটা যায়।  বোনা আউশ সাধারণত উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে ৯০-১০০ দিনে জন্মে। বোনা আউশ রোপা আউশের চেয়েও আগাম। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি বন্যামুক্ত। কিন্তু মাঝারি নিম্ন জমি বন্যা কবলিত হতে পারে তাই উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি আউশ আবাদের জন্য নির্বাচন করা ভালো। রোপা আউশ বন্যামুক্ত মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিম্ন জমিতে জন্মে যা আংশিক সেচনির্ভর। ফলে ওই জমিতে আউশ ধান কাটার পরপরই আমন রোপণ করা হয়। (বাকী অংশ আগামীকাল) লেখক ঃ ড. মো. শাহজাহান কবীর, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

আরো খবর...