‘অলৌকিকভাবে’ বেঁচে গেছেন মার্কিন সেনারা

ইরানি হামলা

ঢাকা অফিস ॥ কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলেমানিকে হত্যার বদলায় ইরাকের সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতায় বিস্মিত মার্কিন সেনারা তাদের অক্ষত থাকার ঘটনাকে সৌভাগ্য বলেই মনে করছেন। ওই হামলায় আইন আল-আসাদ ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাকে তেহরানের ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতার নজির বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত সপ্তাহে ইরান আল আসাদের পাশাপাশি দেশটির ইরবিলে আরও একটি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল। তেহরানের মদদপুষ্ট বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় আরও হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। “এটা অলৌকিক যে কেউ আঘাত পায়নি,” আল-আসাদ ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে সোমবার সাংবাদিকদের এমনটাই বলেন মার্কিন লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টাসি কোলম্যান।মার্কিন বিমানবাহিনীর এ নারী কর্মকর্তা ইরাকের পশ্চিম আনবার মরুভূমিতে অবস্থিত আইন আল-আসাদ এয়ারফিল্ডটির পরিচালক। বিস্তৃত এলাকা নিয়ে নির্মিত এ ঘাঁটিতে প্রায় এক হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার বাস।“কে ভেবেছিল যে তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে এবং কেউ হতাহত হবে না?” বলেছেন কোলম্যান।৮ জানুয়ারি ইরানের হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার কাসেম সোলেমানি হত্যার বদলায় ইরানের পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে বলে জানিয়েছিলেন।এর সপ্তাহখানেক আগে যুক্তরাষ্ট্র বাগদাদ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা চালিয়ে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর বিদেশি শাখা কুদস বাহিনীর কমান্ডার সোলেমানিকে হত্যা করেছিল।সোলেমানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন একটি যুদ্ধের আশঙ্কা জাগলেও ইরাকের দুটি ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর থেকে উত্তেজনা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দুটি সামরিক ঘাঁটিতে তেহরানের ওই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেউ আহতও হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র, ইরাক এবং অন্যান্য দেশের সেনাবাহিনীগুলো জানিয়েছে।হামলায় ‘আঁচড়’ না লাগায় মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা অবশ্য ইরানের ‘সদিচ্ছাকে’ ধন্যবাদ দিচ্ছেন না, দিচ্ছেন ঘাঁটির কর্মকর্তাদের। ইরান পাল্টা আঘাত হানতে পারে, এমন খবর পেয়ে ঘাঁটিটির কর্মকর্তারা বেশিরভাগ সৈন্য ও সরঞ্জামকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছিলেন।রয়টার্স বলছে, ইরানের ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিটির এক স্থানে বড় একটি গর্ত সৃষ্টি করেছে এবং জাহাজের কন্টেইনার দিয়ে নির্মাণ করা সেনাদের থাকার জায়গাগুলোকে ভস্মীভূত করেছে।বিস্ফোরণ ভারী কংক্রিটের দেয়ালগুলোকে চুর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে; জাহাজের কন্টেইনারগুলো সাইকেল, চেয়ার ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জিনিসের মতোই ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে আছে।কংক্রিটের দেয়ালের পেছনেই আশ্রয় নিয়েছিলেন কিছু মার্কিন সেনা। ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে একটি তাদের ওই আশ্রয় কেন্দ্রের কাছেই পড়েছিল বলে বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনা বলেছেন।বিমান ঘাঁটিটিতে ডজনখানেকের মতো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছিল। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে মার্কিন বাহিনী সৈন্য এবং সরঞ্জামগুলো বিভিন্ন সুরক্ষিত স্থানে আলাদা আলাদা করে রাখার পরিকল্পনা করেছিল।আল-আসাদের এ ঘাঁটিটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা ছিল না; সে কারণে স্থানীয় কমান্ডারদের ওপরই তাদের অধীনস্ত সেনাদের রক্ষার দায়িত্ব বর্তেছিল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।“কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হামলা হতে পারে এটি জানতে পেরে আমরা সরঞ্জামগুলো সরাতে পেরেছি,” বলেছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা স্টাফ সার্জেন্ট টমি ক্যাল্ডওয়েল।কোলম্যান জানান, খবর পেয়ে স্থানীয় সময় রাত ১০টা নাগাদ তার কর্মীরা সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গিয়েছিল।“তারা এটিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল,” বলেছেন তিনি।তারও প্রায় তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা পর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানা শুরু করে। হামলার পর আরও প্রায় দুই ঘণ্টা বাংকারেই ছিলেন বলে সেনাদের কয়েকজন জানিয়েছেন। কেউ হতাহত হয়েছে কিনা, তা দেখতে বেরিয়েছিলেন স্টাফ সার্জেন্ট আরমান্দো মার্টিনেজ। একটি ক্ষেপণাস্ত্র কিভাবে কংক্রিটের দেয়াল মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে তা দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। “যখন একটা রকেট আঘাত করে, সেটা এক জিনিস, আর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, এটা সন্ত্রাসের মতো। আপনি একটি সাদা আলো দেখলেন, অনেকটা তারা খসে পড়ার মতো, এবং তার কয়েক সেকেন্ড বাদে সেটি ভূমিতে পড়লো ও বিস্ফোরিত হল। অন্য একদিন আমার এক সহকর্মী সত্যিকারের তারা খসে পড়তে দেখেও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল,” বলেছেন তিনি। ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টারের সার্ভিসিং এরিয়া ও পার্কিংয়ের টারমাকে পড়েছিল। কপ্টারগুলো আগেই সরিয়ে নেওয়ায় সেগুলো রক্ষা পেলেও ক্ষেপণাস্ত্রে দুটি লাইট হ্যাঙ্গার পুরোপুরি ধ্বংস ও কাছাকাছি সহজে বহনযোগ্য কেবিনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। “আমরা বাংকারের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ছিলাম, সম্ভবত ৭ কি ৮ ঘণ্টা। এয়ারফিল্ড ও পার্কিং এলাকায় তারা কোন কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে, তা তারা জানতো,” বলেছেন মার্কিন বিমানবাহিনীর মাস্টার সার্জেন্ট কেনেথ গুডউইন।

আরো খবর...