অবিস্মরনীয় এক ঐতিহাসিক দিন ৭ই জুন

মোঃ মোফাজ্জেল হক
মোঃ মোফাজ্জেল হক

পাকিস্তানি শাসন-শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি লাহোরে তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সব বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ডাকা “নিখিল পাকিস্তান জাতীয় সম্মেলনে” পূর্ব বাংলার জনগণের পক্ষে বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন।

সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর এ দাবির প্রতি আয়োজক পক্ষ থেকে গুরুত্ব প্রদান করেনি। তারা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু সম্মেলনে যোগ না দিয়ে লাহোরে অবস্থানকালেই ছয় দফা উত্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ৬ দফা দাবি প্রকাশের সাথে সাথেই সংঘবদ্ধ সুষ্ঠু ও কার্যকরী সংগ্রাম শুরু হয়।

এই ৬ দফা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের শোষণ থেকে রক্ষাকল্পে গণমুক্তির মহাসনদ। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় : ‘…পূর্ব পাকিস্তানবাসীর বাঁচার দাবিরূপে ছয় দফা কর্মসূচি … আমার প্রস্তাবিত ছয় দফা দাবিতে  যে পূর্ব পাকিস্তানের সাড় পাঁচ কোটি শোষিত-বঞ্চিত আদম সন্তানের কথাই প্রতিধ্বনিত হইয়াছে, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নাই।’

সেদিন পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষায় ছয় দফা মোকাবেলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। শাসকগোষ্ঠী ভয়ভীতির সাহায্যে জনসাধারণের মাঝ থেকে ছয় দফা নিশ্চিহ্ন করে  দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়। ১৯৬৬ সালের ৮ই মে পাকিস্তান দেশ রক্ষা আইনে বঙ্গবন্ধু সহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকে গ্রেফতার করে। করণ তারা বুঝতে পারে যে এই ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে, পাঞ্জাব ও সিন্ধু জমিদারদের স্বার্থে আঘাত হানবে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ও সামরিক জান্তার সাথে পূর্বপাকিস্তানী মেহনতী মানুষের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে শাসকগোষ্ঠীর পরাজয় মেনে নিতে হতো। পূর্বপাকিস্থানের সম্পদ লুন্ঠন ও এখানকার আধিপত্য চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যেতো।

ছয় দফার সমর্থনে ও গ্রেফতারের প্রতিবাদে  ১৯৬৬ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগ আয়োজিত পল্টনের জনসভায় ৭ জুন হরতাল কর্মসূচি  ঘোষণা করা হয়।

মাসব্যাপি ৬ দফা প্রচারে ব্যাপক কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। সামরিকজান্তার ১৪৪ ধারা, নির্যাতন, নিষ্পেষণ ও গুলিবর্ষণ উপেক্ষা করে  দেশব্যাপী ছয় দফা দাবিতে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, মজুরসহ আপামর জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলনে ও শ্রমিকনেতা মনু মিয়াসহ এগারো শহীদের রক্তে রঞ্জিত ৭ জুন অমরত্ব লাভ করল।

৭ই জুন আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এমনি একটি যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তন। ৭ জুনকে এক অর্থে বলা যায় ৬ দফার দিবস। এই দিনে ৬ দফার দাবিতে বাঙ্গালী রক্ত দিতে শুরু করে। স্বাধিকারের এই আন্দোলনই ধাপে ধাপে রক্তনদী পেরিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে গিয়ে শেষ হয়েছে। কাজেই বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে ৭ জুন অমর। অবিস্মরণীয় এক ঐতিহাসিক দিন ৭ জুন।

৬ দফা দিবসে সেই দূরদর্শী মহান ব্যক্তি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই যিনি সময়োপযোগী ছয় দফা কর্মসূচি দিয়ে এবং পরবর্তীকালে একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাধীনতা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে সবাইকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

লেখক ঃ সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ, কুষ্টিয়া জেলা।

আরো খবর...