সংশ্লিষ্টদের মতামত উপেক্ষিত কেন?

দেশের অর্থনীতির আকার, ব্যাংকগুলোর অবস্থা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, সংশ্লি¬ষ্ট বিশেষজ্ঞ, এমনকি খোদ অর্থমন্ত্রীর আপত্তি সত্ত্বেও আরও তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিচ্ছে সরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় যে এসব ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। কয়েক দিন আগেই কমিউনিটি ব্যাংক নামে পুলিশ বাহিনীর জন্য নতুন একটি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। ওই সময়ই এ তিনটিসহ মোট চারটি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাগজপত্রের অসঙ্গতির কারণে তখন স্থগিত রাখা হলেও ফের সেগুলো অনুমোদনের তোড়জোড় চলছে। বিশেষ বাহিনী হিসেবে পুলিশকে বিশেষায়িত একটি ব্যাংক দেয়ার মধ্যে কোনো সমস্যা অনেকে না দেখলেও ব্যাংকটির অনুমোদনের পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, এতে আমি সন্তুষ্ট নই। কারণ আমি উপলব্ধি করতে পারছি যে এসব ব্যাংক শিগগিরই অন্য ব্যাংকের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যাবে।’ অর্থমন্ত্রীর আশঙ্কা যে অমূলক নয় তা আমরা বুঝতে পারি নতুন প্রজন্মের ৯টি ব্যাংকের পরিস্থিতি থেকে। এগুলো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়া তো দূরের কথা, কোনোমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। এমনকি ফারমার্স ব্যাংক তো দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হওয়ার পর কোনোমতে একে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হল, কয়েক বছর ধরে কার্যক্রম চালানো কিছু ব্যাংকের অবস্থা যখন এমন নাজুক, তখন কেন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার তোড়জোড় চলছে? এটি যে অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না, তা সহজেই বোঝা যায় নতুন ব্যাংকের পাশাপাশি গোটা ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও লাগামহীন খেলাপি ঋণ থেকে। এ ছাড়া যেখানে বিদ্যমানগুলো ভালো ব্যবসা করতে পারছে না, সেখানে নতুন উদ্যোক্তা কেন আসছে- এমন প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। আমরা মনে করি, অনিয়ম-দুর্নীতি করে পার পেয়ে যাওয়া, ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্র কায়েম হওয়া, এমনকি সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণের সুদহার না নামিয়েও বহাল তবিয়তে থাকতে পারার কারণে ব্যাংকের অনুমোদনের প্রতি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বেড়েছে। এমনটি হলে তা খাতটির জন্য যে সুখকর হবে না সেটি বলাই বাহুল্য। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকে প্রয়োজনীয়তা নেই বলে নতুন ব্যাংক অনুমোদন স্থগিত থাকে। সেটি ছিল আগের সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা। ১০৬টির মতো আবেদনের পরও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান কোনো ব্যাংকের অনুমোদন দিতে রাজি হননি। কিন্তু ২০১০ সালের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তি উপেক্ষা করে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আক্ষেপ করে তখন বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের সংস্থা। সরকার সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু সরকারের সে সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল না, তা তো ৯টি ব্যাংকের অবস্থা থেকেই স্পষ্ট। তারপরও অনুমোদন দেয়া হচ্ছে নতুন ব্যাংকের। খাত সংশ্লি¬ষ্টদের মতামতের বিপক্ষে গিয়ে কোনোকিছু চাপিয়ে দিলে তা যে ভালো ফল দেয় না, সরকারের নীতিনির্ধারকদের এটি বুঝতে হবে। অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নতুন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

প্রসঙ্গ – ওষুধ খাতের শৃঙ্খলা

ওষুধ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নতুন করে ওষুধ আইন-২০১৮ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন আইনে লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি ওষুধ উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ, মজুদকরণ, প্রর্দশন ও বিক্রয় করতে পারবে না। এ ছাড়া এই বিধান লঙ্ঘনে কঠোর বিধান রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আইনটি চূড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ের ভ্যাটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে জাতীয় ওষুধ নীতি ২০১৬-এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয় সরকার। এর দুই বছর পরে ওষুধ আইন ২০১৮-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন হচ্ছে। দেশে দেদার তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে নকল-ভেজাল ওষুধ। আর প্রতারিত ও বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তারা। এমনই অবস্থায় ওষুধে ভেজাল প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চূড়ান্ত খসড়ায় বলা আছে, চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে অনিবন্ধিত কোন কোম্পানির ওষুধ লিখতে পারবেন না। ‘ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি)’ ওষুধ ছাড়া রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতিরেকে অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধসহ বিভিন্ন ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। এমনকি ব্যবস্থাপত্র ছাড়া খুচরা কোনো ওষুধও বিক্রি করা যাবে না। যিনি এই বিধান উপেক্ষা করবেন তার সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড করা হবে। এ ছাড়া যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ভেজাল ওষুধ তৈরি করেন তার যাবজ্জীবন কারাদন্ড অথবা ১৪ বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং ২০ লাখ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। সরকার ওষুধ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে গেজেট প্রকাশ করবে। ওই মূল্য তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ওষুধ প্রশাসনের তথ্য মতে, দেশে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ কারখানার সংখ্যা ২৮১টি, ইউনানির ২৬৬টি, আয়ুর্বেদিক ২০৭টি, হোমিওপ্যাথিক ৭৯টি ও হারবাল ৩২টি। এসব কারখানায় মনিটরিং ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্টের অভিযান চালানো হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। বাংলাদেশের ওষুধের সবচেয়ে বড় পাইকারি মার্কেট রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকা। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরির অন্যতম আখড়াও হচ্ছে ঢাকার মিটফোর্ড এলাকা এবং এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভেজাল ওষুধ ছড়াচ্ছে। এরপরও এখানে ওষুধ টেস্টিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। আর নকল-ভেজাল ওষুধ বিক্রেতাদের সংঘবদ্ধ দৌরাত্ম্যের কাছে প্রশাসনও যেন অসহায়। মিটফোর্ড এলাকায় গিয়ে মোবাইল কোর্টেরও হেনস্থা হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষমতাঘনিষ্ঠ লোকজন এই নকল-ভেজাল ওষুধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। মানহীন ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। এই খাতে দুর্নীতি, আইন প্রয়োগের শৈথিল্য, প্রশাসনের নজরদারির অভাব, দুর্বল বিচার ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত অসমর্থতা, দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব ভেজাল ওষুধ বাজারজাত রোধ করতে না পারার প্রধান কারণ। অন্যদিকে আইনে এ সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি কম হওয়াও বড় কারণ। ওষুধের কারখানা ও বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করা, নতুন আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি নকল-ভেজাল ওষুধ উৎপাদক-বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। এই চক্র যত ক্ষমতাবানই হোক তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

শিল্পায়নে সব বাধা অপসারণ করতে হবে

শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ এবং পাইপলাইন সম্প্রসারণে যে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে, তার পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলেই আমাদের ধারণা। তা না হলে নির্বাচনের আগে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগের নথি আটকে রাখা হবে কেন? শিল্প খাত হল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন আশা করা যায় না। অথচ সহস্রাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ সংক্রান্ত ফাইল দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি কারখানার মালিকরা তাদের নিজস্ব অর্থায়নে গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করলেও দু’মাসেও এ সংক্রান্ত ফাইলের মুক্তি মেলেনি। এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এর ফলে সময়মতো উৎপাদনে যেতে পারছে না অনেক কারখানা। অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন। উপায়ান্তর না দেখে ভুক্তভোগী অনেক শিল্প মালিক ক্ষতিপূরণের দাবিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ যাতে শিল্প ও বিনিয়োগে এগোতে না পারে সেজন্য অনেক আগে থেকেই একটি চক্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বস্তুত এরা সরকারকেও বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। অভিযোগ আছে, এ চক্রটি গ্যাস উৎপাদন কম দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগের গতি মন্থর করে রেখেছে। শুধু তাই নয়, পাইপলাইন নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে তারা। এমন অভিযোগও আছে, এ ব্যাপারে চক্রটির সঙ্গে একটি বিদেশি মহলের যোগসাজশ রয়েছে। বস্তুত দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঠেকাতে ষড়যন্ত্রকারীরা নানাভাবেই তৎপর রয়েছে। দেশের শিল্পকারখানা ধ্বংস করে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ করে দিয়ে তারা দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে চায়। এদের দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো নয়। গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি এখনও হয়নি। এ কারণে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করেও উৎপাদনে আসতে পারছেন না। নতুন বিনিয়োগেও আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ শীর্ষক বৈশ্বিক সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ প্রায় আগের মতোই রয়েছে। ব্যবসার পরিবেশ ভালো না হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর অন্যতম গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট। এ সংকট শুধু উৎপাদনের ঘাটতিজনিত নয়, সংযোগের ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তাদের পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। এ ভোগান্তি দূর করতে হবে। বাস্তবতা হল, দেশে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুদ থাকলেও তা উত্তোলনে নেয়া হচ্ছে না কার্যকর উদ্যোগ। এটিও একই ষড়যন্ত্রের অংশ বলে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ। ষড়যন্ত্রকারীরা গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে তুলে দিতে চায়। বস্তুত দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা চলছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের শিল্প খাত ধ্বংস হয়ে যাবে। বিশ্বের অনেক দেশেই বিনিয়োগে উৎসাহিত করার জন্য উদ্যোক্তাদের নানারকম সুযোগ-সুবিধা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে করা হচ্ছে এর উল্টোটি। এটি কাম্য নয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন গ্যাস সংযোগ এবং পাইপলাইন সম্প্রসারণে গড়িমসিসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে বিদ্যমান সব বাধা অপসারণ করতে হবে। দেশীয় শিল্প বিকাশের জন্য এটি অপরিহার্য। এর সঙ্গে যেহেতু দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির প্রশ্ন জড়িত, তাই এ ব্যাপারে অবিলম্বে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করবেন, এটাই প্রত্যাশা।

সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন দেখতে হচ্ছে না জাতিকে। বিষয়টি কেবল দেশের গণতন্ত্রের জন্যই নয়, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সার্বিক উন্নয়নের জন্যও ইতিবাচক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্ব সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেয়া। যেহেতু নির্বাচনের মাঠে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি প্রধান নিয়ামক, সেহেতু এর কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্ত যেন একতরফা না হয় এবং তা কাউকে বেঁকে বসার সুযোগ করে না দেয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ইসি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ সব দল বা জোটের সংবিধানসম্মত যৌক্তিক দাবি-দাওয়ার প্রতি সম্মান দেখানো। এরই মধ্যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি কিছু দাবি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেছে। এতে নির্বাচনের তারিখ এক মাস পেছানো ও নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রন্ট নেতারা। আমরা মনে করি, পরিবেশ তৈরির দাবি তাদের অধিকার। ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবির যেগুলো মেনে নেয়া সম্ভব, সেগুলোর প্রতি সরকার ও ইসিকে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে হবে। নিজেদের স্বার্থের বাইরে গিয়ে দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি মানসম্মত ভোট আয়োজনে আলোচনা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা উন্নত গণতন্ত্রের অংশ বৈকি। নির্বাচন কখনও মূল লক্ষ্য নয়, মূল লক্ষ্য হচ্ছে জনগণকে তাদের শাসক নির্বাচনের অধিকার দেয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। বিষয়টি ইসি, সরকার, সব রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের বিবেচনায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে সবাই নিজেদের গণতন্ত্রের অনুসারী দাবি করলেও আলাপ-আলোচনা ও ছাড় দেয়ার মানসিকতা কোনো পক্ষের মধ্যেই নেই। অথচ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যে কোনো সমস্যার সমাধান এবং অন্যের মতকে সম্মান দেয়াই হল গণতন্ত্রের মূল কথা। কেবল মুখে গণতন্ত্রের বুলি না আওড়ে আচার-আচরণে গণতান্ত্রিক হলে ‘বিচার মানি তালগাছ আমার’ মানসিকতাও কাজ করত না। আমরা আশা করব, ভোট সামনে রেখে সবাই গণতান্ত্রিক মানসিকতা লালন করবে এবং ইসি ও সরকার সংবিধান মোতাবেক সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তরিক থাকবে। অন্যথায়, যে কোনো ধরনের হাঙ্গামা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রশাসন ও ইসিকে সবার জন্য সমান সুযোগ তথা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের মতো ঘৃণ্য পরিবেশ তৈরি করে যাতে কেউ পার পেতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সবাই ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এলে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়া কঠিন কিছু হবে না।

এসএসসির ফরমে অতিরিক্ত ফি

এসএসসি পরীায় অংশ নেয়ার ফরম পূরণ বাবদ শিাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত ফি আদায় কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। শিার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিবাদ, সচেতন মহলের উদ্বেগ, শিা মন্ত্রণালয় ও দুদকের কঠোর নির্দেশ কোনো কিছুই কাজ করছে না। এমনকি হাইকোর্টের নির্দেশনাকে অমান্য করে অতিরিক্ত ফি আদায় উদ্বেগজনক। এবার প্রায় ১৫ লাধিক শিার্থী এসএসসি পরীার প্রস্তুতি নিচ্ছে। টেস্ট পরীার ফল ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পরপরই গত ৭ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ফরম পূরণ। শেষ হবে আগামী ১৪ নভেম্বর। ১০০ টাকা বিলম্ব ফি দিয়ে ফরম পূরণের সময় পাবে ১৬ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রতি বছর ফরম পূরণের ফি বোর্ড নির্ধারণ করে থাকে। বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিজ্ঞান বিভাগ চতুর্থ বিষয়সহ ফরম পূরণের ফি ১ হাজার ৮০০ টাকা। ব্যবসায় শিা বিভাগ চতুর্থ বিষয়সহ ফরম পূরণের ফি ১ হাজার ৬৮০ টাকা আর মানবিক বিভাগ চতুর্থ বিষয়সহ ফরম পূরণের ফি ১ হাজার ৬৮০ টাকা। কিন্তু স্কুল ভেদে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। অভিভাবকদের অনেকের অভিযোগ, চাহিদামতো অর্থ না দিতে চাইলে শিাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপ শিার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করছেন। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ অভিভাবক বাড়তি ফি দিয়ে ফরম পূরণ করছেন। শিার্থী ও অভিভাবকদের জিম্মি করে এই বাড়তি ফি আদায়ের দৌরাত্ম্য চলছে বহুদিন থেকেই। বোর্ড, কেন্দ্র ফির পাশাপাশি কোচিং ফি, মডেল টেস্ট ফি, বার্ষিক পরিবহন ফি, তিন মাসের অগ্রিম বেতন, পিকনিক ফি ইত্যাদি খাত দেখিয়ে স্কুল কর্তৃপ মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করছে। এই প্রবণতা আগে শহরের কিছু নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন এ ব্যাধি ছড়িয়েছে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত। দেশের প্রায় সব অঞ্চল থেকেই বাড়তি ফি আদায়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি ফরম পূরণে বাড়তি ফি আদায় না করার জন্য হাইকোর্ট একটি রুল জারি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ফরম পূরণে বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি নেয়া যাবে না। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। দুদক কর্তৃপ তাদের অভিযোগ কেন্দ্র ১০৬-এ এবং ই- মেইলের মাধ্যমে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করলে তাদের কাছে প্রচুর অভিযোগ আসে। অভিযুক্ত স্কুলগুলোকে দুদক মনিটরিং করছে বলে আমরা জেনেছি। আমরা চাই, স্কুলে ভর্তি বাণিজ্য রোধে জোরালো অবস্থান নিয়ে এ সরকার প্রশংসিত হয়েছে। শিা প্রতিষ্ঠানের ফরম পূরণের বাণিজ্য বন্ধেও তাদের কঠোর হতে হবে। পরীার ফরম পূরণের ফি নির্ধারিত হারে স্বতন্ত্রভাবে আদায় নিশ্চিত করতে হবে। এটাকে প্রতিষ্ঠানের কোনো চাঁদা বা ফি’র সঙ্গে মিলিয়ে নেয়া বা শর্তযুক্ত করা যাবে না। এর জন্য মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

এবার সব পক্ষকেই শুভবুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদের ভোট গ্রহণ করা হবে আগামী ২৩ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ১৯ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের তারিখ ২২ নভেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ নভেম্বর। প্রদত্ত ভাষণে সিইসি আরও বলেছেন, তিনি প্রত্যাশা করেন, নির্বাচনে প্রার্থী ও তার সমর্থকরা নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি মেনে চলবেন। প্রত্যেক ভোটার অবাধে ও স্বাধীন বিবেকে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রদান করবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সিইসি দেশের সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে অনুরোধ করেছেন, তাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থাকলে তা যেন রাজনৈতিকভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেয়া হয়। দলগুলোকে একে অন্যের প্রতি সহনশীল, সম্মানজনক ও রাজনীতিসুলভ আচরণ করারও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। তফসিল ঘোষণার মধ্যদিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অবসান হল। বস্তুত গতকাল থেকেই নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। ১ মাস ১৩ দিন পর যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত কেমন পরিবেশে এবং কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে অবশ্য দুশ্চিন্তা রয়েছে অনেকের মধ্যে। বিশেষত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকারের দুই দফা আনুষ্ঠানিক সংলাপে ঐক্যফ্রন্ট সন্তুষ্ট হতে না পারায় এই দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আদৌ অংশগ্রহণ করবে কিনা তা নিয়েও। এটা ঠিক, অন্যান্য দল অংশ নিলেও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচনটি যথার্থ অংশগ্রহণমূলক হবে না। শুধু তাই নয়, সে ক্ষেত্রে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটবে না। দেশের মানুষ শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। মানুষের সেই আকাঙ্খা বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে এটাই প্রত্যাশা। সরকার পক্ষেরও উচিত হবে, ঐক্যফ্রন্টসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে সহায়তা প্রদান করা, যাতে নির্বাচনে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। দ্বিতীয় কথা, আনুষ্ঠানিক সংলাপ শেষ হয়েছে বটে, তবে এর মানে এই নয় যে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের আর কোনো আলোচনাই হবে না। এখন পর্যন্ত যেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতেই পারে। দুই পক্ষের মধ্যে যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সংলাপ হয়েছে, সেই সৌহার্দ্য যদি নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকে, তাহলে তা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সরকার ও বিরোধী পক্ষ যদি পরস্পরের প্রতি ছাড় দেয়ার মানসিকতা দেখাতে পারে, তাহলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় সুখবর তৈরি হবে অবশ্যই। বহুল কাঙ্খিত নির্বাচন এসে গেল। রাজনৈতিক দলগুলোকে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টিতে মনোযোগ দিতে হবে, তা হল প্রার্থী বাছাই। সব পক্ষই যদি সৎ ও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে, সেটাও আমাদের জন্য কম বড় অর্জন হবে না। সবশেষ কথা, সিইসি যে আহ্বান রেখেছেন- নির্বাচনী আচরণ ও আইন মেনে চলা- সেই আহ্বানেও সাড়া দিতে হবে সবাইকে। আমাদের প্রত্যশা থাকবে, সামনের দিনগুলোয় যেন এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, যা দেশ ও সমাজকে অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় করে তুলতে পারে।

নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিন

ঢাকা ও চট্টগ্রামে দেখা দিয়েছে গ্যাস সংকট। রাজধানীসহ আশপাশের কিছু এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় রান্নাবান্না অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। গ্যাসের অভাবে শুধু রান্নাবান্নাই বিঘিœত হচ্ছে না, ব্যাহত হচ্ছে শিল্পোৎপাদনও। অন্যদিকে মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেয়ায় শনিবার সন্ধ্যা থেকে চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গভীর রাতে রান্নার কাজ করতে হচ্ছে। কেউ কেউ সিলিন্ডার গ্যাসে রান্নাবান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্যাস সংকটের কারণে গাড়ির গ্যাস নিতে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সপ্তাহ ধরে গ্যাস নেই এমন খরব গণমাধ্যমে উঠে আসছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ২৬৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা রয়েছে ৪৪৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ১০০ মিলিয়ন কম পাওয়া যাচ্ছে। গত ৩ দিন ধরে চট্টগ্রামের সব ধরনের গ্রাহক চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না। ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়ে আসছিল কেজিডিসিএল। তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগের মতো জাতীয় গ্রিডনির্ভর হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন শুধু গ্রিড থেকে পাওয়া গ্যাসই সরবরাহ করা হচ্ছে গ্রাহকের কাছে। এতে কমে গেছে স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন। বন্ধ হয়ে গেছে চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার সার কারখানা (সিইউএফএল)। ঢাকা ও চট্টগ্রামে গ্যাসের এমন সংকট আজকের নয়। এটা দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। কিন্তু কেন এই বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না- এটা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীতে কোনো কোনো এলাকায় গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের চাপ গ্রীষ্ম মৌসুমেও কম থাকে। শীত মৌসুমে সংকট আরো বেড়ে যায়। এটা সত্যি রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায়ই প্রায় সারা বছর আবাসিক সংযোগের পাইপলাইনে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ থাকে। আর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সংকট লেগেই থাকছে বছরের পর বছর। গ্যাসের মজুদ সংকটের চেয়ে এ ক্ষেত্রে সঞ্চালনগত সমস্যাই বেশি দায়ী। দেখা গেছে, একটা সময় নির্দিষ্ট সংখ্যক গ্রাহকের কথা মাথায় রেখে এক ধরনের পাইপ বসানো হয়েছে, সময়ের ব্যবধানে ওই এলাকার গ্রাহক বেড়েছে ১০ থেকে ২০ গুণ। ফলে আগের সেই সংকীর্ণ পাইপলাইন দিয়ে ক্রমবর্ধমান গ্রাহকের গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে শীত মৌসুমে পাইপলাইনে তরল হাইড্রো কার্বন জমেও গ্যাস সরবরাহে বিঘœ ঘটায়- এটাও গ্যাস সংকটের আরেকটা কারণ। রাজধানীর আবাসিক গ্যাস গ্রাহকদের ভোগান্তির এসব কারণ চিহ্নিত হয়েছে বহু আগে। এসব নিয়ে লেখালেখিও সব সময়ই হচ্ছে। তারপরও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না তা আমাদের বোধগম্য নয়। পরিবহন খাতে অবাধে সিএনজির ব্যবহার চলছে। এটা নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ নেই। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস নির্ভরতাও দ্রুত কমছে না। সর্বোপরি, গ্যাসের চাহিদা মেটানো ও গ্যাসের সংকট উত্তরণে নতুন নতুন কূপ অনুসন্ধান ও খনন করে গ্যাসের মজুদ বাড়াতে হবে। গ্যাসের অপচয় রোধ করতে হবে। গ্যাসের সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। সর্বোপরি গ্যাসের সাশ্রয়ী ও সুপরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরী

আবাসিক ভবনে রান্নার চুলার গ্যাস বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনার খবর আমরা প্রায়ই গণমাধ্যমে পেয়ে থাকি, যা খুবই মর্মান্তিক। গত শুক্রবার আশুলিয়া এলাকায় একটি বাড়িতে গ্যাসলাইন বিস্ফোরণে দেড় বছরের শিশুসহ একই পরিবারের পাঁচজনের দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্যাস বিস্ফোরণের এমন মর্মন্তুদ ঘটনা ইতোমধ্যে অনেক ঘটেছে। এমন ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি যারা অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর বেঁচে আছেন তাদের অবস্থা আরো হৃদয়বিদারক। গ্যাসের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাসাবাড়িতে গ্যাস বিস্ফোরণের কারণ বদ্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় রান্নাঘরের গ্যাসের চুলার লাইন খোলা থাকা অথবা গ্যাসলাইনে লিকেজ থাকা। সাধারণত দেখা যায়, বাড়িওয়ালারা গ্যাসলাইনের লিকেজ বা ক্রটির ব্যাপারে সচেতন থাকেন না। আশুলিয়ার ঘটনাটি গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের মূল কারণ অবৈধ সংযোগের লিকেজ বলে জানা গেছে। অর্থের বিনিময়ে জোড়াতালির অবৈধ সংযোগের একটি প্রবণতা বাড়ির মালিকদের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংযোগ দেয়া রাষ্ট্রীয় গ্যাস সঞ্চালক কোম্পানিগুলোর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নীতি-নৈতিকতাহীন সংযোগ গ্রহীতাÑ কারো দায়ই কম নয়। পুলিশ অবশ্য বিস্ফোরণের শিকার বাড়িটির মালিককে গ্রেপ্তার করেছে; তবে অবৈধ সংযোগ দেয়ার জন্য দায়ী লাইনম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অর্থলোলুপ অসাধু কর্মীদের কারণে কেবল যে দুর্ঘটনা-প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে তা-ই নয়, একই সঙ্গে সরকারও বড় ধরনের রাজস্ব হারাচ্ছে। আবার যারা গ্যাস ব্যবহারকারী তাদেরও অসতর্কতা রয়েছে। রান্নার কাজ সেরে গ্যাসের চুলা ঠিকমতো বন্ধ করা হলো কিনা সেটা দেখার ব্যাপারেও রয়েছে সচেতনতার অভাব। অনেক সময় পুরনো চুলার অফ-অন নবগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। অর্থাৎ চাবি ঘুরিয়ে বন্ধ করলেও গ্যাস লিকেজ হতে থকে। আবার যেসব এলাকায় সব সময় লাইনে গ্যাস থাকে না, সেখানে চুলা বন্ধ করার ব্যাপারে ব্যবহারকারীদের ঔদাসীন্য কাজ করে। এসব খুবই বিপজ্জনক প্রবণতা। বাসাবাড়িতে গ্যাস বিস্ফোরণ রোধ করতে হলে বাড়ির মালিক, বসবাসকারী, গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা দরকার। বাড়ির মালিকদের অবশ্যই উচিত তার বাড়ির গ্যাস সংযোগ নিরাপদ আছে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করানো; গ্যাসলাইনে লিকেজ সংক্রান্ত অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া। অন্যদিকে গ্যাসের চুলা ব্যবহারকারীদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে চুলা বন্ধ রাখার ব্যাপারে। অবশ্যই রাতে রান্নাবান্নার পর চুলা বন্ধ আছে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। চুলাকে সব সময় ক্রটিমুক্ত রাখতে হবে। রান্নাঘরে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গ্যাস বিতরণ কর্তৃপক্ষকেও এ বিষয়গুলো তদারকির আওতায় আনতে হবে। গৃহস্থালিতে নিরাপদ গ্যাস ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পরামর্শ গণমাধ্যমেও প্রচার করা দরকার। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতায় রোধ হোক গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা।

 

যে কোনো উপায়ে অর্থবহ করে তুলতে হবে সংলাপ প্রক্রিয়া

বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বহুল প্রত্যাশিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সংলাপের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল অনেকদিন আগে থেকেই। সেই প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত সরকারি দলের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ অনুষ্ঠিত হল। গণভবনে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতামূলক কোনো ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলেও কিছু ইতিবাচক বিষয় লক্ষ করা গেছে। প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন এই বলে যে, এখন থেকে সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে  কোনো বাধা দেয়া হবে না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্তৃক উত্থাপিত বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা ও তাদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে এ ধরনের নেতাকর্মীদের একটি তালিকা চেয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচনে সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার হতে পারে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দাবির ব্যাপারেও ১৪ দলের পক্ষ থেকে সম্মতি পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, আরও সংলাপের প্রয়োজন রয়েছে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাবের বিপরীতে সরকারি দলের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। এটা ঠিক, বৃহস্পতিবারের সংলাপে এমন কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি যাতে বিরোধী পক্ষ পরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারে। খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দেয়া ইত্যাদি বিষয় এখনও অমীমাংসিত থেকে গেছে। আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি অচিরেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকার পক্ষ একটা সমঝোতায় উপনীত হতে পারবে, যাতে আগামী নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক ও সুুষ্ঠু হতে পারে। ১৪ দলের সঙ্গে অন্যান্য বিরোধী দলেরও সংলাপ অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। সেসব সংলাপেও নিশ্চয়ই অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে নানা দাবি উত্থাপিত হবে। বাকি সংলাপগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নিশ্চয়ই একটি কমন গ্রাউন্ডে পৌঁছানো সম্ভব হবে। বিরোধী দলগুলোকে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে, নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতা বদলের কোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা নেই। নির্বাচনই একমাত্র গণতান্ত্রিক উপায়, যার মাধ্যমে ক্ষমতার বদল ঘটতে পারে। তাই বিরোধী দলের সেই পরিমাণে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে, যা একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়ক। বিরোধী দলগুলোকে কোনো দাবির ব্যাপারেই অনড় থাকলে চলবে না। সংলাপের অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। অতীতের কোনো সংলাপই সুফল বয়ে আনতে পারেনি। চলমান সংলাপগুলো যেন ব্যর্থ না হয় সে ব্যাপারে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে।

সাফল্যধরে রাখতে হবে

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার মধ্যদিয়ে সুন্দরবন এলাকা আনুষ্ঠানিকভাবে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত হল। এটি একটি বড় স্বস্তিদায়ক ঘটনা অবশ্যই। কারণ এর ফলে সুন্দরবন এলাকায় গ্র“পভিত্তিক দস্যুতার অবসান হবে। পর্যটক ও জেলেরা নির্বিঘেœ সুন্দরবনে চলাচল করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সুন্দরবন সুরক্ষায়। জানা যায়, ইতিপূর্বে দস্যুদের ২৬টি গ্র“প আত্মসমর্পণ করেছে। বাকি ছিল আরও ছয়টি গ্র“প। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বৃহস্পতিবার তারা অস্ত্র সমর্পণ করেছে। সুন্দরবন দস্যুমুক্তকরণে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বন বিভাগের প্রয়াস অনস্বীকার্য। অবদান রয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভিরও। দস্যুদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে এসেছেন তারা। সুন্দরবন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। চব্বিশ ঘণ্টায় ছয়বার রূপ পাল্টানো এ বনে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রয়েছে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ও মৎস্য সম্পদ থেকে গড়ে বছরে ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। আয় হয় পর্যটন শিল্প থেকেও। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবনে ভ্রমণ করেন। জলদস্যু ও বনদস্যুদের কারণে সরকারের এ রাজস্ব আদায়ে বিঘœ ঘটছিল। গত তিন দশক সুন্দরবন এলাকায় নানা সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। দস্যুদের ভয়ে পর্যটকরা সুন্দরবনে যেত কম। তাছাড়া সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন পেশাজীবী, বিশেষত জেলেরা প্রায়ই জলদস্যুদের হামলা ও অপহরণের শিকার হতো। বনদস্যুরা লুট করে নিত বনসম্পদ। এছাড়া চোরা শিকারিরা নিধন করত বন্যপ্রাণী। এখন আর সেসব ঘটনা ঘটবে না বলে আমরা আশা করতে চাই। তবে এখনও শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। র‌্যাব মহাপরিচালক জানিয়েছেন, সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যুতার পেছনে একটি বড় চক্র রয়েছে, যারা উচ্চমূল্যে জলদস্যুদের কাছে খাবার ও ট্রলারের তেল বিক্রি করত। কেউ আবার তাদের অস্ত্র ভাড়া দিত। অনেকে দস্যুদের কাছে বেশি দামে গুলি বিক্রি করত। জলদস্যুরা জেলে ও সাধারণ মানুষকে অপহরণ করে যখন মুক্তিপণ আদায় করত, তখনও অনেকে তার ভাগ পেত। এমনকি অনেক সময় জেলেদের নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য করত জলদস্যুরা। জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করার পর এই সুবিধাভোগীরা স্বভাবতই বিপদে পড়েছে। তাদের অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়েছে। তাই তারা নতুনভাবে গ্র“প তৈরি করে আবার সুন্দরবনে সক্রিয় হতে উৎসাহ দিতে পারে। তেমন কিছু যেন না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে সুন্দরবন এলাকায়। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হবে সুন্দরবনের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখা। সুন্দরবন এলাকাকে নিরাপদ রাখতে এ এলাকায় কয়েকটি ক্যাম্প গড়ে তোলা যেতে পারে। আরেকটি বড় কাজ হল আত্মসমর্পণকৃত দস্যুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে বৈধ কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আবার দস্যুবৃত্তিতে ফিরে না যায়। জলদস্যুতা ও বনদস্যুতার অবসান এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে, এটাই কাম্য।

বিদায় দশম সংস

দশম জাতীয় সংসদ ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য এক মাইলফলক। সরকারী ও বিরোধী দলের সহাবস্থানে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয়েছে অধিবেশন। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরা বহাল থাকছেন। শেষ অধিবেশনের শেষ দিনে বিদায়ের বাণী উচ্চারিত হয়েছে। বিষাদের ছায়া নেমেছিল সংসদ ভুবন জুড়েই। সংসদ সদস্যরা শেষবারের মতো করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেছেন। স্মৃতি ধরে রাখতে অনেকে আবার অধিবেশন কক্ষেই মোবাইল সেটে ছবি  তোলেন। নানামুখী সমালোচনা, বিরোধিতা উপেক্ষা করেই সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার ধারা অব্যাহত রেখেছে দশম সংসদ। সকল প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত করে দেশ ও জনগণের চাহিদা পূরণে সক্রিয় অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছে বিদায়ী সংসদ। রাজনৈতিক ‘অনিশ্চয়তায়’ যাত্রা শুরু করলেও সংসদ সদস্যদের সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলেছে। বলা যায়, বিতর্কে শুরু হলেও স্বস্তিতে  শেষ হয়েছে পাঁচ বছর মেয়াদী সংসদ। অধিবেশন বর্জনের যে অব্যাহত ধারা ও সংস্কৃতি ইতোপূর্বের সংসদগুলো অবলোকন করেছে, দশম সংসদ তা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাকে উচ্চাসনে ঠাঁই দিয়েছে। ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্বাচন বর্জন এবং সহিংসতা ও নাশকতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল নির্বাচন। গঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ। নির্বাচনে ১৫০ জন সাংসদ নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সাংবিধানিকভাবে এরা নির্বাচিত হলেও এ নিয়ে বর্জনকারীরা নানামুখী অপপ্রচার, বিদ্বেষ, বিষোদগার চালালে তা  ধোপে টেকেনি দেশে-বিদেশে। বর্জনের কারণে দলগুলো নিজেরা যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বিলম্বে হলেও স্বীকার করছে তারা। তদুপরি নানা ঘটনার কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকছে এই সংসদ। এই প্রথম টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করার নজির স্থাপন করেছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ। এই সংসদ বেশিদিন টিকবে কিনা সে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা কম হয়নি। কিন্তু সংসদ নেতা  শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছে দশম সংসদের। এই সংসদ আরও দুটি ঘটনার জন্ম দিয়েছে, যা ঐতিহাসিক। এই সংসদের দুজন সদস্য আন্তর্জাতিক দুটি সংস্থার প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। স্পীকার কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারী এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং অপর একজন সংসদ সদস্য ইন্টার পার্লামেন্টারী ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এতে আন্তর্জাতিক আদর্শে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ভারমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। তাদের  নেতৃত্বে ঢাকায় দুটি পৃথক সম্মেলনও হয়েছে। বিগত নবম সংসদে বিরোধী দল বিএনপি ৪১৮ কার্যদিবসের মধ্যে ৩৪২ দিনই সংসদে অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু দশম সংসদে ৪১০ কার্যদিবসে বিরোধী দল একদিনের জন্যও সংসদে অনুপস্থিত থাকেনি। মাত্র সাতবার ওয়াকআউট করেছেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। তবে তা ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। ২০১৪ সালে প্রথম বছরে ৩৬ কার্যদিবসে ১৯টি বিল পাস হলেও সর্বশেষ ২৩তম অধিবেশনে আট কার্যদিবসে পাস হয়েছে ১৯টি বিল। ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া সংসদের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল পাস। এর জের ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পরস্পরকে প্রশংসা ও সহায়তার এমন নজির সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। পুরো মেয়াদে বিরোধী দল তাদের গঠনমূলক ভূমিকার মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। দশম সংসদের ৪১০ কার্যদিবসে সংসদ নেত্রী উপস্থিত ছিলেন ৩৩৮ দিবস। অথচ নবম সংসদে ৩৪২ কার্যদিবসে বিরোধীদলীয় নেতা মাত্র ১০ কার্যদিবস হাজির ছিলেন। এবার বিল পাওয়া যায় ১৯৮, পাস হয়েছে ১৯৩। প্রত্যাহার হয়েছে চারটি। একটি নিষ্পন্ন হয়নি। দশম সংসদ কার্যকর সংসদ হিসেবেই অভিহিত হবে সংসদের ইতিহাসে। জনগণের অনেক আশা-আকাঙ্খা ও দাবি পূরণে এই সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।

কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ কার্যকর হোক

জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। এবার জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় মোট ২৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৩৩ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। গত বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮২০ জন। এবার ২ লাখ ১ হাজার ৫১৩ জন পরীক্ষার্থী বেড়েছে। তাদের পরীক্ষা নির্বিঘœ ও ভালো হোক- এমনই প্রত্যাশা করছি। গত সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, সারাদেশে মোট ২ হাজার ৯০৩টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮৩৪টি। সেই হিসাবে এবার ৬৯টি কেন্দ্র বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও এবার দেশের বাইরে ৯টি কেন্দ্রে ৫৭৮ পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে পরীক্ষার্থীদের প্রবেশ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্রে আগেই একাধিক প্রশ্ন সেট পাঠানো হবে, তবে পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে কেন্দ্রীয়ভাবে লটারির মাধ্যমে প্রশ্ন নির্বাচন করে প্রশ্নপত্রের খাম খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তা ছাড়া কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা থাকে। তাই পরীক্ষা চলাকালে সব কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে উদ্যোগগুলো ইতিবাচক মনে হলেও কতটুকু কার্যকর হবে সেটা দেখার বিষয়। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁসের চিত্র দেখে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবকসহ সংশি¬ষ্টরা। দেশে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন সাধারণ ঘটনা। এর আগে প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি-জেডিসি, এসএসসি ও এইচএসসি এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা এবং চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। তা সত্ত্বেও প্রতিবারই প্রতি পরীক্ষায় নতুন নতুন কৌশলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে। উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ এখানেই। পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে শিশু পরীক্ষার্থীদের ওপর, এমনকি তাদের অভিভাবকদের ওপর। এর মধ্য দিয়ে শিশু শিক্ষার্থী এবং এই সমাজ একটি অশুভ ও অনৈতিক পথের সঙ্গে পরিচিত হবে। শিক্ষিত মানুষই দেশ-জাতির নেতৃত্ব দেয়। অথচ শিক্ষার মতো একটি মৌলিক বিষয় বাংলাদেশে বিপর্যস্ত। প্রশ্নফাঁস, ভর্তি বাণিজ্য, দুর্নীতিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থা। আকাশ-সংস্কৃতির কল্যাণে জেএসসি, এসএসসি-এইচএসসিসহ সব পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন আজ ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় জীবনে গভীর অন্ধকার বয়ে আনছে। এটা বাংলাদেশের জন্য এক অশনি সংকেত। সন্তানদের উচ্চ রেজাল্টের আশায় প্রশ্নফাঁসকারী দুর্বৃত্তদের খপ্পরে পড়েন এক শ্রেণির নৈতিকতাহীন অভিভাবকও। এই ক্ষেত্রে কিছু অভিভাবকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আমরা মনে করি, সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হলে প্রশ্নফাঁস ঠেকানো সম্ভব। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নীতি-নৈতিকতা ও শুদ্ধাচার বিষয়ে শিখন ও প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে।

ধর্মঘটের নামে নৈরাজ্য

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন রোববার ভোর থেকে সারা দেশে ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট পালনের নামে যা করেছে, তা নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা শুধু গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েই সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলেনি; প্রাইভেট কার, সিএনজি বেবিট্যাক্সি, রিকশাসহ সবধরনের যান চলাচলেও বাধা সৃষ্টি করে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করেছে। এসব বাহনের চালকদের মুখে, গাড়ির বডিতে আলকাতরা মাখিয়ে দিয়ে নাজেহাল করেছে। হেনস্তা করেছে যাত্রীদের। এমনকি পরিবহন শ্রমিকরা অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বাধা দেয়ায় মৌলভীবাজারের বড়লেখায় মারা গেছে এক শিশু। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় সরকারি মহিলা কলেজের গাড়িতে ভাংচুর চালিয়ে ছাত্রীদের গায়ে কালি মাখিয়ে দেয়া হয়েছে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহনে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। থমকে গেছে দেশের রফতানিমুখী কারখানাগুলোর পূর্বনির্ধারিত পণ্য রফতানি প্রক্রিয়া। এর প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। বাদ পড়েনি কাঁচাবাজারও। পরিবহন ধর্মঘটের অজুহাতে বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে নিত্যপণ্যের দাম। মোট কথা, পরিবহন শ্রমিকদের কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে জনগণ। প্রশ্ন হল, জনগণকে জিম্মি করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? ধর্মঘট করার অধিকার মানে জনগণকে জিম্মি করা নয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ ব্যাপারে সরকারকে দেখা গেছে প্রায় নীরব ভূমিকায়। বাংলাদেশ সড়ক শ্রমিক ফেডারেশন নামে যে সংগঠনটি এই ধর্মঘট ডেকেছে, সেই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। অথচ এ ধর্মঘটের ব্যাপারে তিনি মুখ বন্ধ করে রেখেছেন। বস্তুত জনগণকে জিম্মি করা এ ধর্মঘটের দায় পড়ছে সরকারের ওপরই। পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছে সদ্য পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারার সংশোধনসহ আট দফা দাবিতে। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বড় একটি আন্দোলনের একপর্যায়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হয়। আইনটির বেশিরভাগ ধারাতেই পরিবহন মালিকদের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষিত হয়নি। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকের শাস্তি আরও কঠোর হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন দেশের বেশির ভাগ মানুষ। অথচ এখন শাস্তি আরও লঘু করার দাবিতে আইন সংশোধনের দাবি তোলা হচ্ছে! এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আমরা মনে করি, যেহেতু প্রণীত আইনটির সঙ্গে সড়কের নিরাপত্তা এবং মানুষের জীবনের প্রশ্ন জড়িত, সেহেতু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের এসব দাবির সঙ্গে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় ভূমিকা কাম্য। বস্তুত গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নয়তো সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকবে, বদলাবে না কিছুই। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সড়ক পরিবহন আইন পরিবর্তনের দাবি দেখে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে কি তবে কেউই কোনো শিক্ষা নেননি? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে সেটা হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক। পরিবহন খাত, ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে। এজন্য আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন জনসচেতনতাও। মনে রাখতে হবে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যে যেমন অপরাধ করবে, তাকে তেমন শাস্তি পেতে হবে। আইনে শাস্তি লঘু করার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি বিনা অপরাধে যেন কারও শাস্তি না হয় সে বিষয়েও সং্িশ্লষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।

রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনুন

খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকিং খাত এবং এর ফলে শিল্প খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার সংবাদ উদ্বেগজনক। জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় আদায় অনিশ্চিত ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা অনভিপ্রেত। দুশ্চিন্তার বিষয় হল, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য, সর্বোপরি অর্থনীতিকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়া। এছাড়া যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রদেয় নতুন ঋণও খেলাপির পাল¬া ভারি করছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঋণ যাতে কুঋণে পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর সতর্ক থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে অসৎ কর্মকর্তাদের দাপট ও আধিপত্য রোধের বিষয়েও নজর দেয়া উচিত। দেখা গেছে, অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপি ঋণের প্রসার ঘটায়। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেয়ার পর তা খেলাপিতে পরিণত করার প্রবণতা শুরুতেই রোধ করা গেলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে ঝুঁকি এড়ানো সহজ হবে। দুঃখজনক হল, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি, যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকসহ আরও কিছু ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারির ঘটনা। বস্তুত ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে খেলাপি ঋণসহ অন্যান্য অনিয়ম হ্রাস পাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। খেলাপি ঋণ কাঙ্খিত মাত্রায় কমিয়ে আনা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে ব্যাংকিং খাতে অবশ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাধারণত খেলাপি ঋণের প্রায় পুরোটাই মন্দঋণে পর্যবসিত হওয়ায় তা লোকসান বা পুঁজি ঘাটতি হিসেবে দেখানো হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এ ধরনের ঘাটতি মিটিয়ে থাকে সরকারি তহবিল থেকে টাকা গ্রহণ করে, যা মূলত জনগণের দেয়া ট্যাক্স। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে এ ঘাটতি মেটায়। নিয়মানুযায়ী ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে গড়ে ২৫ ভাগ মূলধন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়, যা ‘প্রভিশন’ নামে পরিচিত। প্রভিশনে রাখা অর্থ ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে না বিধায় ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এর কুফলও সাধারণ গ্রাহকদের বইতে হয়, যা অনভিপ্রেত। ব্যাংকগুলোর দেয়া ঋণ যাতে কোনোমতেই কুঋণে পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। এজন্য অনিয়ম ও দুর্নীতিমুুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হলে রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার এ ব্যাপারে কঠোর হবে, এটাই প্রত্যাশা।

‘শর্ষের ভূত’ তাড়ানোর জোর উদ্যোগ দরকার

৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, ১২ বোতল ফেনসিডিল, আড়াই কোটি টাকার তিনটি এফডিআর এবং ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার চেকসহ একজন জেলারের আটক হওয়ার ঘটনা অনেক কিছুর ইঙ্গিতবাহী বলা যায়। একশ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার বেপরোয়া অনিয়ম-দুর্নীতি ছাড়াও দেশের কারাগারগুলোর পরিবেশ কেমন তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় চট্টগ্রাম জেলা কারাগারের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাসকে গ্রেফতারের ঘটনায়। ‘রাখিবো নিরাপদ দেখাবো আলোর পথ’ স্লোগান আওড়ালেও দেশের কারাগারগুলোতে গিয়ে অনেক সাধারণ অপরাধী আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে বের হয়ে আসে। কারাগারগুলো রীতিমতো মাদকসংক্রান্ত অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে- এমন তথ্য মাঝে-মধ্যেই পাওয়া যায়। সোহেল রানা ফেনসিডিল ও মাদক ব্যবসার টাকা নিয়ে ধরা পড়ার পর কারাগারে মাদক সরবরাহের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের জেলগুলো মাদক ব্যবসায়ীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এবং জেলে বসে দাগি অপরাধীরা নির্বিঘেœ মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে- এমন খবর বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় এসেছে। এ অপকর্মের পেছনে যে জেল থেকে শুরু করে খোদ কারা অধিদফতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে, চট্টগ্রামের জেলারের গ্রেফতারের ঘটনা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। কারাগারকেন্দ্রিক মাদক গডফাদাররা কতটা বেপরোয়া হলে ফেনসিডিলসহ গ্রেফতারের পর তাদের ছেড়ে দেয়া ও তল্লাশি না করার জন্য পুলিশকে হুমকি দিতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। মাদক গডফাদারদের হাত কত লম্বা, এ হুমকি থেকে তা-ও বোঝা যায়। এ অবস্থায় কারাগারগুলোতে শুদ্ধি অভিযান চালানো এবং কর্মকর্তার ছদ্মবেশে ঘাপটি মেরে থাকা অপরাধীদের মূলোৎপাটনের উদ্যোগ নেয়া দরকার। অন্যথায় দেশের কারাগারগুলো অপরাধীদের সৎ পথে ফেরানোর পরিবর্তে আরও ভয়ংকর অপরাধী বানানোর আখড়ায় পরিণত হতে পারে। এমন এক সময় ফেনসিডিল ও অবৈধ মাদক ব্যবসার টাকাসহ একজন জেলার হাতেনাতে ধরা পড়লেন, যখন মাত্র ক’দিন আগে পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতার করা যাবে না মর্মে একটি আইন পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসাধু ও অপরাধপ্রবণরা যে আইনটি থেকে অনিয়ম-দুর্নীতিতে আরও উৎসাহী হবে, সোহেল রানার পুলিশকে হুমকি-ধমকি দেয়ার ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যেহেতু জনগণের করের পয়সায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা জোগাড় হয়, সেহেতু দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের বিরুদ্ধে বেশি কঠোর হওয়াটাই যৌক্তিক। জেলার সোহেল রানার ক্ষেত্রেও তেমনটি করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারক মহলকে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে বলে আমরা মনে করি। সরকার যখন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনের খসড়া জাতীয় সংসদে দাখিল করা হয়েছে, তখন একজন কর্মকর্তার ফেনসিডিল ও টাকাসহ গ্রেফতার এবং টাকাগুলো মাদক ব্যবসার- এমন স্বীকারোক্তি থেকে স্পষ্ট যে, খোদ শর্ষের ভেতরে থাকা ভূত তাড়ানোর কোনো ব্যবস্থা দেশে নেই। বস্তুত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবকদের সঙ্গে কারাগারের যোগাযোগ একটি গুরুতর অপরাধ। কাজেই অর্থ ও মাদকসহ জেলার গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টির যথাযথ তদন্ত হওয়া দরকার। মাদকনীতি ও নিয়ন্ত্রণ আইন ফলপ্রসূ করতে হলে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এখনও রোহিঙ্গা নিধন!

বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ বৈঠকের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রধান মারজুকি দারুসমান বলেছেন, মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে এখনও রোহিঙ্গাদের নিধন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, শারীরিক নির্যাতন ও গণহত্যা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ এখনও বন্ধ হয়নি। মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের এই বিশেষ বৈঠকে মিয়ানমারে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ তদন্তকারী ইয়াংহি লিও বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করেছিল মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি’র নেতৃত্বে দেশটির পরিস্থিতি অতীতের চেয়ে ভালো হবে; কিন্তু বাস্তবে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছরের আগস্ট মাসে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে এখনও স্বদেশে ফেরত যেতে পারেনি। শেষ দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসা শুরু করার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে মিয়ানমার সরকারের প্রতি কড়া প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানো শুরু হয়ে এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বৃহৎ শক্তিবর্গও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। প্রতিবাদ ও নিন্দার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আশ্বাস দিলেও, এমনকি একটি চুক্তি করলেও বাস্তবে সেই চুক্তির প্রতি সম্মান দেখায়নি, বরং নানা ধরনের টালবাহানার মাধ্যমে সমস্যাটিকে প্রলম্বিত করছে মাত্র। এদিকে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করায় তা এ দেশের জন্য নানামুখী চাপ তৈরি করছে। পরিবেশগত বিপর্যয়ও দেখা দিয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য আর মাত্র দুই মাসের খাবার মজুদ রয়েছে। এটাই যখন বাস্তবতা, তখন রাখাইনে এখনও রোহিঙ্গা নিধন চলছে- এ ধরনের খবর মারাত্মক উদ্বেগজনক বৈকি। প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, তবে কি মিয়ানমার সরকার তথা সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায় না, উল্টো তাদের রাখাইন রাজ্যকে সম্পূর্ণরুপে রোহিঙ্গামুক্ত করার পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে? এ যাবতকাল মিয়ানমারের ওপর কম নৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এসব চাপ গায়ে মাখেনি। তবে কি সামরিক চাপ ছাড়া মিয়ানমারকে টলানো সম্ভব নয়? বর্তমান বিশ্ব নেতৃত্বকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশকেই বিপদগ্রস্ত করেনি, এটি বিশ্ব মানবতার এক বড় সংকট।

অর্থ পাচার নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি ‘ত্বরিত মূল্যায়ন জরিপে’ অংশ নেয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৬১ শতাংশ মনে করেন- দেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ছে। একইসঙ্গে দেশের ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে (আর্থিক খাত) বিশৃঙ্খলা নিয়েও তারা চিন্তিত এবং এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার বলে তারা মতপ্রকাশ করেছেন। আর কিছুদিন পরই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে নতুন মেয়াদে সরকার গঠিত হবে। ক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতো আমরাও মনে করি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে আর্থিক খাত সংস্কার এবং অর্থ পাচার রোধের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত। দেশে ব্যাংকিং তথা আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলার বিষয়টি মোটামুটি দৃশ্যমান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিকে অর্থ পাচার হচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা মুদ্রা পাচার নিয়ে গবেষণা ও বিশে¬ষণকারী আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা গে¬াবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৬ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। উৎকণ্ঠার বিষয় হল, প্রতি বছর অর্থ পাচারের হার বাড়ছে, যা ব্যবসায়ীদের জরিপ ফলাফলেও উঠে এসেছে। জিএফআই’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ৪টি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। এগুলো হল, বিদেশ থেকে আনা আমদানি পণ্যের মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানি পণ্যের মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্যান্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্যমতে, অর্থ পাচার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হচ্ছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হওয়া। অবশ্য দুর্নীতিও অর্থ পাচারের একটি বড় কারণ। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে, সেই সঙ্গে দুর্নীতির মাত্রা কমিয়ে আনা গেলে বিদেশে অর্থ পাচার হ্রাস পাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, টাকা পাচারের বিষয়টি ক্ষমতাসীনরা অবহিত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় না মূলত রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকেই অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে। তবে অর্থ পাচার প্রক্রিয়ায় কেবল রাজনীতিক নন; দেশের অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছাড়াও সরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী জড়িত। এসব ব্যক্তি নীতি-নৈতিকতা ও দেশপ্রেম ভুলে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন বা করছেন। এজন্য তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে একটি দলের রাজনৈতিক উন্নয়ন দর্শন, যা পরে নির্বাচনে দলটির জয়লাভের প্রেক্ষাপটে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশে পরিণত হয়। কাজেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকলে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা পাবে এবং অর্থ পাচার রোধে নির্বাচিত সরকার নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ থাকবে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এ দুই দুষ্টক্ষত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

 

ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক

সারা দেশে ডাকঘরের শাখা রয়েছে প্রায় ১০ হাজার, অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে। এসব শাখার মাধ্যমে প্রতি মাসে অনলাইনে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে ১০০ কোটি টাকা। আবার ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তর হচ্ছে প্রতি মাসে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার পরিমাণ এখন থেকে বেড়ে যাবে বলা যায়। কারণ, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের বিভিন্ন অনলাইন সেবার মাধ্যমে সারা দেশে টাকা স্থানান্তরের খরচ প্রায় ৭২ শতাংশ কমানো হয়েছে। আগে টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হতো, এখন তা কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বোঝা যাচ্ছে, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের অনলাইন সেবাকে জনপ্রিয় করার জন্যই নেয়া হয়েছে এ সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে সারা দেশে অনলাইনের মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর যেমন সহজ হবে, তেমনি কমবে খরচ। এতে উপকৃত হবে গ্রাহকরা, বাড়বে স্থানান্তরিত টাকার পরিমাণ। অর্থাৎ দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বেগবান হবে, বাড়বে টাকার সঞ্চালন। এতে যে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের অনলাইন মাধ্যমে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, মোবাইল মানি অর্ডার সার্ভিস, পোস্ট ই-সেন্টার সার্ভিসসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ সব সার্ভিস যোগ করলে টাকা লেনদেনের পরিমাণ বিশাল আকার ধারণ করবে। ডাক বিভাগ দেশের একটি অতি পুরনো সেক্টর। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে যে কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। সেদিক বিবেচনায় ডাক বিভাগের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এর সেবার মান ও খরচ দুই-ই গ্রহণযোগ্য হওয়া চাই। অনলাইনে টাকা পাঠানোর খরচ ৭২ ভাগ কমানোর সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চিন্তা থেকেই উঠে এসেছে। দেশে আরও নানা অনলাইন মাধ্যমে টাকা স্থানান্তর হয়ে থাকে। সেসব মাধ্যমের সার্ভিস চার্জও কমানো উচিত বলে মনে করি আমরা। অনলাইন সেবা এখন দেশের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত বিস্তৃত। দেশের নিচু স্তর অর্থাৎ স্বল্প আয়ের মানুষও টাকা আদান-প্রদানে অনলাইন সেবা নিয়ে থাকে। ফলে তাদের জন্য অনলাইন সার্ভিস চার্জ সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা দরকার। এটা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্যও জরুরি।

মোবাইল ফোনের গ্রাহকসেবার মান বাড়াতে হবে

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক প্রতিবেদনে দেশের মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর কলড্রপের যে চিত্র উঠে এসেছে তা হতাশাজনক। এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে গ্রামীণফোন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাসে গ্রামীণফোনে কলড্রপ হয়েছে ১০৩ কোটি ৪৩ লাখ। বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি কলড্রপের জন্য গ্রাহককে ১ মিনিট টকটাইম ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও অপারেটরগুলো সেই নিয়ম মানছে না। গ্রামীণফোনের গ্রাহকরা কলমিনিট ফেরত পেয়েছে মাত্র ১০ কোটি ৩০ লাখ। অন্য মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোরও কলড্রপের এবং টকটাইম ফেরত দেয়ার চিত্র ভালো নয়। বস্তুত বিটিআরসির এ প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে দেশের মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর গ্রাহকসেবার মান কেমন তা বোঝা যায়। কলড্রপ নিয়ে মোবাইল ফোন গ্রাহকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে গত এক বছরে এ সংক্রান্ত অভিযোগ বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে। রোববার সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে গ্রামীণফোনের কলড্রপ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। বস্তুত কলড্রপ আর মিউটের যন্ত্রণায় মোবাইল ফোন গ্রাহকরা অতিষ্ঠ। মোবাইল ইন্টারনেটের গতি অস্বাভাবিক কম থাকায় মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার ইত্যাদি ব্যবহার করে কল করার ক্ষেত্রেও বারবার ‘নো কানেকশন’, ‘রিকানেকটিং’ বা ‘ওয়েটিং ফর নেটওয়ার্কে’র যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের। কলড্রপ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো কম বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক বেশিসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। যে হারে গ্রাহক বেড়েছে, সেই হারে তারা নেটওয়ার্কের উন্নয়ন, হালনাগাদ বা সম্প্রসারণ করেনি। এছাড়া বাংলাদেশের নেটওয়ার্কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ (আইসিএক্স) রাখার কারণেও ওই এক্সচেঞ্জের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় কলড্রপ হচ্ছে। এক অপারেটরের কল অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্কে আনুপাতিক হারে বরাদ্দের কাজটি করে আইসিএক্স। অন্যান্য দেশে এই আনুপাতিক বরাদ্দের কাজটি মোবাইল অপারেটররা নিজেরা করে। শুধু বাংলাদেশে এজন্য পৃথক আইসিএক্স অপারেটর নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর ফলে কলের জন্য গ্রাহককে একদিকে বাড়তি পয়সা গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত একটি স্তরের জন্য সেবার গুণগত মানও খারাপ হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে অবশ্যই গ্রাহকসেবার মান উন্নত করতে হবে। তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে টকটাইম, এসএমএস ও মোবাইল ডাটার নামে প্রতিনিয়ত টাকা কেটে রাখে। এসবের, বিশেষত মোবাইল ডাটার মূল্য নিয়েও গ্রাহকদের অভিযোগ অনেক। অথচ সে তুলনায় তারা উন্নত সেবা পাচ্ছে না, এটা মেনে নেয়া যায় না। মোবাইল নেটওয়ার্কে গ্রাহকের জন্য মানসম্পন্ন  সেবা নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব বিটিআরসির। বিটিআরসি মোবাইল গ্রাহকসেবার একটা মানদ- নির্ধারণ করতে পারে এবং সেই মানদ- কতটা রক্ষা করা হচ্ছে, তার মূল্যায়ন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বিটিআরসি তার দায়িত্ব কতটা সঠিকভাবে পালন করছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেতার তরঙ্গের সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল, তাও বিটিআরসি নেয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বেতার তরঙ্গের অপ্রতুলতা থেকে গেছে। গ্রাহকদের জন্য মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর পাশাপাশি বিটিআরসিও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে, এটাই কাম্য।

স্বাস্থ্যসেবায় অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে

চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে সরকার প্রতি বছরই শত শত কোটি টাকা বাজেট বাড়াচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা থাকলেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনৈতিক কারসাজির সিন্ডিকেটেড বাণিজ্যের জন্য  সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দেশের দরিদ্র মানুষ। এ ধরনের হয়রানি ও অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে দেশের বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গঠিত কমিটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। দেশে সময়ে সময়ে উদ্ভূত জনস্বাস্থ্য সেবার সমস্যা ও সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। কমিটি গঠনের বিষয়টি গত সোমবার বিচারপতি জে বি এম হাসান এবং বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হয়। আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে কমিটি বিভিন্ন পত্রিকায় সার্কুলার জারি করে মূল্য তালিকা তৈরি করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কমিটিকে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে অর্ডিন্যান্স প্রণয়নের জন্য বলা হয়েছে। পরে আদালত এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৯ জানুয়ারি দিন ধার্য করে। চলতি বছরের ২৪ জুলাই এক আদেশে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি তালিকা করে টানাতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। ওই আদেশের পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ল্যাবরেটরিতে বিভিন্ন প্যাথলজি পরীক্ষার ফি, সেবার মূল্য তালিকা এবং চিকিৎসার ফির তালিকা করে প্রকাশ্যে টানানোর আদেশ জারি করে। সাম্প্রতিক সময়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটেছে। উন্নত বিশ্বের অনেক উদ্ভাবনের সুফল ভোগ করছে বাংলাদেশের মানুষ। তবে অর্থনৈতিক কারণে এ সুবিধা সবার কাছে সমভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। বিশেষভাবে অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর জন্য এ সমস্যা আরো তীব্র হয়, যখন চিকিৎসকরা অনেক ধরনের পরীক্ষার নিদান দেন। মেডিকেল টেস্টকে কমবেশি সব চিকিৎসক বাড়তি উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত করছেন, এমন অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছে। এই নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি কম হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিকে অভিযান চালানোর খবরও কম নয়। বলা যায় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভয়াবহ বাণিজ্য চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসে। অবশেষে উচ্চ আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপে আসে। সরকার নির্ধারিত স্বাস্থ্যসেবার মূল্য সর্বশেষ গেজেট আকারে প্রকাশ হয় ২০১০ সালে। একই বছরের ২ মার্চ এটি সংশোধন করে একটি পরিপত্র জারি করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। রোগীর সুবিধার্থে সব হাসপাতালে এটি প্রদর্শনের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সরকারি এ পরিপত্র সরকারি হাসপাতাল মানলেও বেসরকারি হাসপাতালে তার সমন্বয় নেই। চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে সরকার প্রতি বছরই শত শত কোটি টাকা বাজেট বাড়াচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার কথা থাকলেও দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনৈতিক কারসাজির সিন্ডিকেটেড বাণিজ্যের জন্য সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দেশের দরিদ্র মানুষ। এ ধরনের হয়রানি ও অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধ করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

খুন-খারাবি বাড়ছে

রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হরহামেশাই বড় ধরনের খুনের ঘটনা ঘটত। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ ধরনের খুনের ঘটনা আগের তুলনায় কমে গেছে। বেড়ে গেছে বীভৎস, বিকৃত ও লোমহর্ষক খুনের ঘটনা। প্রতিদিনই এই ধরনের খুনের ঘটনা কোথাও না কোথাও ঘটছে। পাওয়া যাচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ। সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এসব কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির দৃষ্টান্তই নয়, সামাজিক অসুস্থতারও লক্ষণ। গত রোববার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চার যুবকের মাথা ও মুখমন্ডল থেঁতলানো এবং গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সাতগ্রাম ইউনিয়নের পাঁচরুখী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে সড়কের ধারে লাশগুলো পাওয়া যায়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ দুটি দেশি পিস্তল ও এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার এবং একটি মাইক্রোবাস জব্দ করেছে। এ ছাড়া রাজধানীর দিয়াবাড়ী এলাকায় কাশবন থেকে আগের দিন শনিবার দুই যুবকের গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ছয়জনেরই বয়স ৩৫ বছরের কিছু কম বা বেশি হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। গত মাসে ১৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহরের আলমপুর এলাকার ৩০০ ফুট সড়কের ১১নং ব্রিজের নিচ থেকে পুলিশ তিন ব্যবসায়ী যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে। নিহতদের স্বজনদের দাবি, তারা কেউ রাজনীতি বা কোনো ধরনের অপরাধ কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে পুলিশ বলছে, কারা এবং কি উদ্দেশ্যে তাদের হত্যা করেছে সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা সারাদেশে প্রতিনিয়ত ঘটছে। পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গত সাড়ে ৫ বছরে সারা দেশে ১৯ হাজার ৭২১ জন খুন হয়েছে। একই সময়ে রাজধানীতে খুন হয়েছে ১ হাজার ৯০ জন। ২০১৭ সালে বিভিন্ন ঘটনায় খুন হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৯ জন। ২০১৬ সালে ৮৭৯ জন, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ৩৫ জন, ২০১৪ সালে ৪ হাজার ৫২৩ জন, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ৯৮৮ জন খুন হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়া ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। ভোগবাদী হয়ে উঠছে মানুষ। কমছে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ। এ কারণে তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে একে অপরকে নৃশংস খুন করতে দ্বিধা করছে না। সাধারণভাবে এ ধরনের খুন-খারাবি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই নির্দেশ করে। দেশে আইনের শাসন, অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা বলবৎ থাকলে অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে থাকারই কথা। আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে তা স্বীকার করতেই হবে। অনেক আলোচিত চাঞ্চল্যকর হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা বিচারহীন থাকছে দিনের পর দিন। অপরাধীরা নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে লঘু দন্ডে পার পেয়ে যেতে পারছে। নাগরিকদের রক্ষা করাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত তার রহস্য উদঘাটন করা এবং অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই।