জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে কোনো বিতর্ক কাম্য নয়

সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিধান যুক্ত করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এ বিষয়ে খোদ ইসিতেই যে মতভেদ রয়েছে, তা প্রকাশ পেয়েছে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (লিখিত আপত্তি) দিয়ে একজন নির্বাচন কমিশনারের সভাস্থল ত্যাগ করার মধ্য দিয়ে। গত বৃহস্পতিবার কমিশনের মুলতবি সভার শুরুতে আইন সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে একজন নির্বাচন কমিশনার ১৫টি সংশোধনীর প্রস্তাব পেশ করলে কমিশন অন্তত ৮ থেকে ১০টি ক্ষেত্রে সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত নেয়, যার মধ্যে ইভিএম গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সর্বশেষ সংলাপে যে ২৩টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল তার মধ্যে ১২টি ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিলেও আওয়ামী লীগ ও জোটভুক্ত দলগুলো পক্ষে মতামত দেয়। সংলাপের পর নির্বাচন কমিশনও বলেছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ইভিএম ব্যবহার করা হবে, নয়তো নয়। এ প্রেক্ষাপটে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মাস দু’য়েক আগে তড়িঘড়ি করে ইভিএম ব্যবহারের বিধান আইনে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে আরপিও সংশোধন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা মনে করি, নির্বাচনে ইভিএমসহ যে কোনো ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতৈক্য হওয়া দরকার। ইসি আয়োজিত সংলাপে বিএনপিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল যেখানে ইভিএমের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, সেখানে তাদের সঙ্গে কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই ইভিএমে ভোটগ্রহণে ইসির এত আগ্রহ কেন- এ প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়া হলেই তা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। নির্বাচন যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন ইভিএমে ভোট গ্রহণের অতিউৎসাহী এ সিদ্ধান্ত কাউকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেবে না- এমন নিশ্চয়তা কি ইসি দিতে পারবে? ইভিএম নয়, বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সেটা নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি। এটা সত্য, প্রযুক্তির কল্যাণে সহজে ও দ্রুততম সময়ে যে কোনো কাজ করা সম্ভব এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যায়। ইভিএমে তেমন অনেক সুবিধা হয়তো পাওয়া যাবে; কিন্তু সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের ঐকমত্য ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হবে বলেই মনে হয়। পূর্ববর্তী সংলাপে যেহেতু অনেক রাজনৈতিক দল ইভিএমের বিরোধিতা করেছে, নতুন করে সংলাপ ডাকা হলে তারা এটির পক্ষে কথা বলবে- এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসি অবশ্যই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখে, তবে তা যেন অপ্রীতিকর কোনো পরিস্থিতি  তৈরি না করে এবং প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে না ফেলে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। তাছাড়া নির্বাচনের প্রাক্কালে আরপিও সংশোধন, প্রকল্প পাস, সংলাপ ও ভোটগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষিত করে তোলা যাবে কিনা, সেটিও ভেবে দেখার বিষয়। কোনো ধরনের ‘হ-য-ব-র-ল’ পরিস্থিতির জন্ম না দিয়ে বরং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইসি সামনে অগ্রসর হবে এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সচেষ্ট হবে, এটাই কাম্য।

পবিত্র ঈদুল আজহা

মুসলিম জাহানের জন্য খুশির বার্তা নিয়ে বছর ঘুরে আবারও ফিরে এসেছে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি প্রিয় বান্দা হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর সীমাহীন ভক্তি, সর্বোচ্চ ত্যাগের সদিচ্ছা এবং গভীরতম আত্মসমর্পণে পরম করুণাময় সন্তুষ্ট হন এবং তিনি ইব্রাহিমকে (আ.) আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ পশু কোরবানি করতে নির্দেশ দান করেন। এ ঘটনার পর থেকে মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রতীক হিসেবে পশু কোরবানি দিয়ে আসছেন। প্রতিবছর মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান পবিত্র হজের পরই কোরবানি দেয়া হয়। পাঁচ দিন ধরে চলে হজের আনুষ্ঠানিকতা। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখ লাখ মুসলমান আরাফাত ময়দানে সমবেত হন। এটি মুসলিম ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্তও বটে। কোরবানির মূল কথা হল ত্যাগ। সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি দিয়ে দরিদ্র প্রতিবেশীদের মধ্যে এর মাংস বিতরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। পরিতাপের বিষয়, এদেশের অনেকের কাছে ধর্মের মতো আধ্যাত্মিক একটি বিষয়ও পরিণত হয়েছে লোক দেখানো আচারে। প্রতিযোগিতা করে মাংস খাওয়া এবং মাসের পর মাস ডিপফ্রিজে জমিয়ে রাখা ইদানীং আমাদের কালচারে পরিণত হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে- আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে কোরবানি করা পশুর রক্ত বা মাংস কিছুই পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় বান্দার তাকওয়া। কাজেই কোরবানি কোনো লোক দেখানো বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। কোরবানির অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ। আল্লাহতায়ালা প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করতে বলেছেন। আমরা তাঁর আদেশ পালন করব অন্তরের তাগিদে, মানুষকে দেখানোর জন্য নয়। কোরবানির মাধ্যমে আমরা ভেতরের পশুশক্তিকে যেমন হত্যা করব, তেমনি সুদৃঢ় করব মানুষে মানুষে ভালোবাসা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অভূক্ত শীর্ণ মানুষের জন্য একবেলা বা দু’বেলা উন্নতমানের আহারের ব্যবস্থা করা যায়। কিছু পশু হালের পশু হিসেবে বিপন্ন কৃষকদের মাঝে দান করা যায়। সব ধর্মেই দানকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। মানবতার সেবাই তো প্রকৃত ধর্ম। পশু কোরবানির মধ্যদিয়ে ব্যক্তি, সমাজ তথা মানুষের ভেতরের পশুশক্তিকে দমনই হচ্ছে কোরবানির মূল কথা। ঈমানদার মুসলমানরা তা-ই করেন। এ ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের পথ ধরে লাভ করা যায় আল্লাহর নৈকট্য। গ্রাম ও নগরীতে পশু কোরবানি-পরবর্তী পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি কর্পোরেশনকে তৎপর থাকতে হবে। নগরবাসীর প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, তারাও যেন পশু কোরবানি দেয়ার ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সচেষ্ট হন। রাস্তার ওপর বা যত্রতত্র কোরবানি দেয়া অনুচিত। এতে পরিবেশ দূষিত হয়, দুর্গন্ধ ছড়ায়। ঈদের পবিত্রতা সব ক্ষেত্রেই বজায় রাখা প্রয়োজন। ঈদ মানে আনন্দ। আল্লাহ এ আনন্দে দরিদ্রদের শরিক করার জন্য তার ধনী বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন। লোক দেখানো ধর্মীয় আচার পালনে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, মমতা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে ঈদুল আজহার আদর্শকে আমরা সমুন্নত রাখতে পারি। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বিশ্বের সব মুসলমানকে সেই তওফিক দান করুন।

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় নৈরাজ্য কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাজধানী ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসগুলো শুধু ট্রাফিক আইনের ক্ষেত্রে নয়, যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। উদ্বেগের বিষয় হল, ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে সরকারেরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ফলে রাজধানী ও আশপাশের রুটে সিটিং সার্ভিসের নামে চলাচলকারী বাসগুলোয় লাগামহীনভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হলেও যাত্রীরা তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আশ্চর্যজনক হল, সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের পর বেশকিছু কোম্পানির বাসভাড়া আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ইতঃপূর্বে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বদনাম ঘোচাতে সিটিং সার্ভিস বন্ধের অভিযানে নেমেছিলেন পরিবহন মালিকরা। ওই অভিযানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষও (বিআরটিএ) অংশ নিয়েছিল। সে সময় রাজধানীজুড়ে বাসের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলা হয়। সংকট সৃষ্টির ঘটনায় বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, বরং সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে একধরনের বৈধতা দেয়া হয়। কয়েক বছর আগেও রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সুদৃশ্য ও মানসম্মত বাস চলাচল করলেও এখন আর তা দেখা যায় না। অনেক রুটে তখন এসি বাসও চলাচল করত। কাউন্টারভিত্তিক সেসব বাস সার্ভিসে মানুষ নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট সংগ্রহ করে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে যানবাহনে ওঠার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। যাত্রীরা, বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ মোটামুটি নিরাপদ ও নির্বিঘেœ চলাফেরা করতে পারত সে সময়। বর্তমানে এ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। এর বদলে ঢাকার রাজপথ দখল করে নিয়েছে লক্কড়ঝক্কড় মার্কা বাস। এর মধ্যে কিছু বাস কাউন্টার পদ্ধতিতে চলাচল করলেও বেশিরভাগই লোকালে পরিণত হয়েছে, অথচ তারা বাড়তি ভাড়া আদায় করছে সিটিংয়ের নামে। ফলে রাজধানীর বিপুলসংখ্যক যাত্রীর হয়রানি ও ভোগান্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে অবাক বিষয় হচ্ছে, এসব গণপরিবহনের কোনটি লোকাল, কোনটি সিটিং, তা দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। দু-একটি ব্যতিক্রম বাদে মহানগরীর সব রুটেই সিটিং, লোকাল, ডাইরেক্ট, স্পেশাল ইত্যাদি নামধারী বাসগুলোয় যাত্রীদের গাদাগাদি ও বাদুড়ঝোলা হয়ে চলতে হচ্ছে। এছাড়া একই দূরত্বের গন্তব্যে যেতে একেক ধরনের বাস সার্ভিসে ভিন্ন ভিন্ন হারে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সরকারি মালিকানায় পরিচালিত বিআরটিসি বাস সার্ভিসও এ অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত নয়। ঢাকা মহানগরীতে চলাচলরত গণপরিবহনে যাত্রী ভাড়া কার্যকর ও রুট পারমিট দেয়ার দায়িত্ব রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটি সংক্ষেপে আরটিসি’র। আরটিসি বর্তমানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মোটরযান আইন-১৯৮৩ অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের গায়ে আঁচড় থাকতে পারবে না, যানবাহন রংচটা হতে পারবে না এবং যান্ত্রিক ক্রটিমুক্ত হতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ওই যানবাহনকে ফিটনেসবিহীন হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এসব ক্রটি সারিয়ে রাস্তায় নামতে হবে। আইনটি যে একেবারেই মানা হচ্ছে না, রাজধানীর রাস্তায় চোখ রাখলেই তা স্পষ্ট হয়। দেশে প্রতিবছর সড়কপথে অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে কমপক্ষে ৪ হাজার মানুষ এবং পঙ্গুত্ববরণ করছে এর দ্বিগুণ, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধের পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়ঝক্কড় কোনো যানবাহন যাতে রাজপথে চলাচল করতে না পারে, এ ব্যাপারে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

জাতীয় শোক দিবস

আজ বাঙালির শোকের দিন ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকান্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা আজ তাঁদের স্মরণ করছি। মর্মস্পর্শী এ হত্যাকান্ডের আজ ৪২ বছর পূর্ণ হলো। এ হত্যাকান্ডের বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে ফিরেছে প্রায় তিন যুগ। ঘটনার ৩৪ বছর পর গত ২০১০ সালে প্রত্যক্ষ ঘাতকদের কয়েকজনের ফাঁসি হয়েছে। এতে কিছুটা হলেও জাতি গ্লানিমুক্ত হয়েছে। তবে এখনো মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন ঘাতক বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে এত বড় একটি হত্যাকান্ড কেবল কয়েকজন খুনির কাজ ছিল না, এর নেপথ্যে ছিল দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গভীর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। সেসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র কিন্তু আজো উন্মোচিত হয়নি, শনাক্ত হয়নি হত্যার ষড়যন্ত্রকারীরা, নেপথ্য নায়করা। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক স্বদেশ গড়ার যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, সেই স্বপ্ন-সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেশকে আবার সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের পথে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্য নিয়েই ঘটানো হয়েছিল ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি। ঘাতকদের লক্ষ্য ছিল শুধু বঙ্গবন্ধু পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করাই নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাংলাদেশটাকেই ধ্বংস করে দেয়া। তাই তো ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় একই বছরের ৩ নভেম্বর কারা অভ্যন্তরে হত্যা করা হলো বঙ্গন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর চার জাতীয় নেতাকেও। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের যে প্রক্রিয়া সে সময় অঙ্কুরিত হয়েছিল তারই একটি ভয়ঙ্কর পরিণতি ঘটে ১৫ আগস্টে। স্বাধীন বাংলার স্থপতিকে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারীরা খুনিদের যাতে বিচার না হয় সেজন্য ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে। স্বঘোষিত খুনিরা পরবর্তী সময়ে নির্বিঘেœ পালিয়ে থাকার সুযোগ পায়। এদের কেউ কেউ বিদেশে মিশনে চাকরি পেয়ে পুরস্কৃত হয়। ১৯৯৬-এ আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিলের আগ পর্যন্ত ২১ বছর স্বঘোষিত খুনিরা বিচারের আওতা থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ পেয়েছিল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই প্রথম এর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৮-এ দায়রা জজ আদালতের দেয়া ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের রায় পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে পুনর্মূল্যায়িত হয় এবং ১২ জনের মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রাখা হয়। এরপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারকের অভাবে দীর্ঘ ৫ বছর ঝুলে থাকে মামলাটির আপিল শুনানি। পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর হাইকোর্টে আপিল বিভাগে একজন বিচারক নিয়োগের ফলে মামলাটির শুনানির পথ উন্মুক্ত হয় এবং পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলাটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয় এবং এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়। তবে এখনো সব ঘাতকের দন্ড কার্যকর হয়নি। পলাতক খুনিদের খুঁজে দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের ব্যবস্থা নিতে হবে। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা শুধু কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের কাজ নয়, এর নেপথ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কিছু তথ্য উঠে এসেছে দেশি-বিদেশি গবেষক সাংবাদিকদের লেখায়। দাবি উঠেছে একটি কমিশন গঠন করে এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার এবং চক্রান্তকারীদেরও বিচারাধীন করার। আমরা চাই সরকার এ লক্ষ্যে উদ্যোগ নিক। কারণ ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ড শুধু ব্যক্তি মুজিব ও তাঁর পরিবারকে হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয় ও সংবিধান ছেঁটে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলে। সে ষড়যন্ত্র, সে অপচেষ্টা এখনো বলবৎ। একই লক্ষ্য ও চক্রান্তের পথ ধরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে গেছে ২১ আগস্টসহ আরো কিছু হামলা-হত্যাকান্ড। কাজেই জাতীয় নিরাপত্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে সুরক্ষার জন্যই দরকার মুজিব হত্যা ষড়যন্ত্রের উন্মোচন ও তার মূলোৎপাটন।

ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি

খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না দেশের ব্যাংকিং খাত। দুশ্চিন্তার বিষয় হল, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বর্তমানে ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক প্রভাব, সুশাসনের অভাব এবং সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা শিথিল হওয়ার কারণেই মূলত খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ঋণ ভাগাভাগি করার কারণে সেখানেও খেলাপির সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত রোববার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত ১৪টি ব্যাংক। এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৬৮ শতাংশ। এর মধ্যে আদায়অযোগ্য কুঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা- এটি মোট খেলাপি ঋণের ৮৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এ চিত্র দেশের ব্যাংকিং খাত, ব্যবসায়-বাণিজ্য, সর্বোপরি অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হল, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়া। এছাড়া যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রদেয় নতুন ঋণও খেলাপির পাল্লা ভারি করছে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঋণ যাতে কুঋণে পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর সতর্ক থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে অসৎ কর্মকর্তাদের দাপট ও আধিপত্য রোধের বিষয়েও নজর দেয়া উচিত। দেখা গেছে, অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপি ঋণের প্রসার ঘটায়। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেয়ার পর তা খেলাপিতে পরিণত করার প্রবণতা শুরুতেই রোধ করা গেলে ব্যাংকগুলোর পক্ষে ঝুঁকি এড়ানো সহজ হবে। দুঃখজনক হল, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি, যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে সোনালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকসহ আরও কিছু ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা। বস্তুত ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা এক ধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহিতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা গেলে খেলাপি ঋণসহ অন্যান্য অনিয়ম হ্রাস পাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, খেলাপি ঋণ কাঙ্খিত মাত্রায় কমিয়ে আনা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে ব্যাংকিং খাতে অবশ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাধারণত খেলাপি ঋণের প্রায় পুরোটাই মন্দঋণে পর্যবসিত হওয়ায় তা লোকসান বা পুঁজি ঘাটতি হিসেবে দেখানো হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এ ধরনের ঘাটতি মিটিয়ে থাকে সরকারি তহবিল থেকে টাকা গ্রহণ করে, যা মূলত জনগণের দেয়া ট্যাক্স। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে এ ঘাটতি মেটায়। নিয়মানুযায়ী ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে গড়ে ২৫ ভাগ মূলধন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয় যা ‘প্রভিশন’ নামে পরিচিত। প্রভিশনে রাখা অর্থ ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে না বিধায় ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এর কুফলও সাধারণ গ্রাহকদের বইতে হয়, যা অনাকাক্সিক্ষত। ব্যাংকগুলোর দেয়া ঋণ যাতে কুঋণে পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। এজন্য অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দেয়া উচিত। ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে খেলাপি ঋণের বিস্তার রোধ ও অনাদায়ী ঋণ আদায়ে সরকার কঠোর হবে, এটাই প্রত্যাশা।

স্মার্টকার্ড তৈরির কাজে গতি আনতে হবে

মেশিন অকেজো হয়ে পড়ায় এবং দক্ষ লোকবলের অভাবে স্মার্টকার্ড তৈরি প্রায় বন্ধের মুখে। সে কারণে চলতি বছরের মধ্যে দেশের প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ভোটারের হাতে স্মার্টকার্ড পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন ইসির এনআইডি অণুবিভাগের কর্মকর্তারা। এই ব্যর্থতার পেছনের কারণ হিসেবে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তাতেই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ববোধ সম্পর্কে হতাশা জাগে, এর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন ওঠে। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি স্মার্টকার্ড সরবরাহকারী ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজিসের (ওটি) সঙ্গে ১০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৮১৬ কোটি টাকার) চুক্তি করে ইসি। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ৯ কোটি ভোটারের জন্য স্মার্টকার্ড উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে তাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ওই চুক্তির মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করার মতো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। পরে স্মার্টকার্ড তৈরির বিষয়ে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজিসের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পরে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অণুবিভাগ নিজেরাই স্মার্টকার্ড তৈরির প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কিন্তু এ প্রকল্পের আওতায় ৯টি মেশিনের মধ্যে ৫টিই অকেজো হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কর্মীদের স্থায়ীকরণের দাবি পূরণ না হওয়ায় বেশিরভাগ কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ফলে স্মার্টকার্ড তৈরির ধারাবাহিকতায় দেখা দিয়েছে জটিলতা। সে কারণে প্রতিদিন যে দেড় লাখ কার্ড তৈরির কথা ছিল তা কমে যাওয়ায় ২০১৮ সালের মধ্যে সব নাগরিকের স্মার্টকার্ড সরবরাহে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। দেশে বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪০ লাখ। কিন্তু এখন পর্যন্ত ৪ কোটি স্মার্টকার্ড পারসোনালাইজেশন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি নাগরিক স্মার্টকার্ড পেয়েছেন। ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এরপর রাজধানী ঢাকা ও বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হয়। রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কার্ড বিতরণ করা হয়। একজন নাগরিকের জন্য এই কার্ড এখন অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের সিমকার্ড কেনা- সব কিছুতেই প্রয়োজন। সময়ের প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্রের ধরনে পরিবর্তন এনে সাধারণ কার্ডের পরিবর্তে স্মার্টকার্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। স্বাভাবিকভাবেই এই কার্ড পেতে দায়িত্বশীল সব নাগরিক আগ্রহী। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক সব নাগরিকের স্মার্টকার্ড প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চয় গ্রহণ করবে- এমন প্রত্যাশ করছি। এ জন্য জনবল সংকটসহ অন্যান্য সমস্যা দ্রুত সমাধান করে স্মার্টকার্ড তৈরির কাজে গতি আনতে হবে।

আর্থিক খাতে কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি

আর্থিক খাতে নানা কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির দায়ে দুদকের মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই। আর্থিক খাতের আলোচিত দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ঘটনায় দায়ের করা ডেসটিনি, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্র“পের মতো চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ধীরগতি উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেসটিনি এমএলএম পদ্ধতিতে ব্যবসার নামে প্রতারণামূলকভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনায় ২০১২ সালে দুটি মামলা করে দুদক। দেশের ব্যাংকিং খাতে আর্থিক কেলেঙ্কারির আরেকটি নজির হলমার্ক গ্র“প। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখাসহ কয়েকটি শাখার মাধ্যমে আড়াই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এই বিজনেস গ্র“প। এ ঘটনায় ২০১২ সালে ৩৮টি মামলা করে দুদক। এসব মামলার মধ্যে ১১টি মামলায় মাত্র ২৮২ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। অথচ মামলাগুলোর চার্জশিটে মোট ৮৫৩ সাক্ষী রয়েছেন। ২০১৩ সালে বিসমিল্লাহ গ্র“প ৫টি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। এ ঘটনায় বিসমিল্লাহ গ্র“পের ১৩ জন ও ৫টি ব্যাংকের ৪১ জন ব্যাংকারকে আসামি করে ১২টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে ১০টি মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচারকাজ চলছে। ডেসটিনি, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্র“পের মতো আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার আইনে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে না। দুদকের তফসিলভুক্ত মামলাগুলো দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে ১৯৫৮ সালের ‘দ্য ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী বিশেষ জজ আদালত স্থাপন করে সরকার। বর্তমানে রাজধানীতে ১২টিসহ সারাদেশে ৩৫টি বিশেষ জজ আদালত রয়েছে। দুদকের মামলার বিচারের এখতিয়ার সম্পন্ন এসব বিশেষ জজ আদালত থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুদকের মামলা বিচারাধীন ৩ হাজার ৪১২টি। আর এসব আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে দেড় লাখের বেশি। দুদকের মামলার তুলনায় অন্যান্য মামলার সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় দুর্নীতির বিচার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। এ ছাড়া মামলার প্রতিটি ধাপ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে আসামিপক্ষের সময়ক্ষেপণ এবং বিচারক সংকট ও মামলার চাপসহ নানা কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লি¬ষ্টরা দাবি করছেন। দুদকের আইনজীবীদের দাবি আদালতকে কঠোর হতে হবে। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ না থাকলে সময় চেয়ে আবেদন জানালে বিচারিক আদালত থেকে নামঞ্জুর করা উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে যে কোনো মামলা দায়েরের পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রয়েছে। আর বিচার শুরু হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু দুদকের মামলায় বেশির ভাগই দুই থেকে আড়াই বছর লেগে গেছে তদন্ত শেষ করতে। একইভাবে বিচার শুরু হওয়ার পরও বছরের পর বছর অতিবাহিত হলেও শেষ হচ্ছে না বিচার কাজ। আমরা চাই, দুদক একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতি দমনে সুষ্ঠু ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করুক। দুদকে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান আইনজীবী সংকট রয়েছে। যে কারণে দুদক প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না, বেশিরভাগ মামলায় আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না। মামলায় দুদকের সাফল্য তুলনামূলকভাবে কম; মামলা নিষ্পত্তির হারও কম। কাঙ্খিত ভূমিকা নিশ্চিত করতে দুদকের নিজস্ব আইনজীবী প্যানেলকে শক্তিশালী করা এবং মামলার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত মাপের আইনজীবী দ্বারা মামলা পরিচালনার কথাও এখন ভাবতে হবে।

পুরনো পথেই গণপরিবহন

নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত সপ্তাহে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বড় একটি আন্দোলনের পরও বেপরোয়া বাস-মিনিবাস চালকদের দৌরাত্ম্য থামেনি। বন্ধ হয়নি সড়কে নৈরাজ্য। যাত্রী তোলা নিয়ে তাদের রেষারেষি অব্যাহত রয়েছে। আগের মতোই এক বাস আরেক বাসের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে চলছে, লিপ্ত রয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। রাস্তার মাঝে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। চালক বাস চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। ভাড়া নিয়েও চলছে নৈরাজ্য। ভাড়া নেয়া হচ্ছে সিটিং সার্ভিসের, অথচ চালানো হচ্ছে লোকাল সার্ভিসের মতো দাঁড়ানো যাত্রী নিয়ে। গত ২৯ জুলাই যাত্রী তোলা নিয়ে বাসগুলোর এই রেষারেষির শিকার হয়েই প্রাণ হারিয়েছে দুই শিক্ষার্থী। এরপর রাজধানীসহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে তোলে তীব্র আন্দোলন। একপর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয় সড়ক নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার। নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করা হয় মন্ত্রিসভায়। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয়েছে ট্রাফিক সপ্তাহ। কিন্তু কোনো কিছুরই যেন তোয়াক্কা করছে না গণপরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। ফলে শুধু যাত্রী ভোগান্তিই বাড়ছে না, আবারও যে কোনো সময় ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। গণপরিবহনকে এভাবে চলতে দেয়া যায় না। এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতেই হবে। বস্তুত এ সবকিছু গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরছে। সেই সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশেরও আরও বেশি তৎপর হওয়া প্রয়োজন। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্প্রতি নতুন সড়ক পরিবহন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু এ আইনে যাত্রীদের স্বার্থ রয়ে গেছে উপেক্ষিত। প্রস্তাবিত আইনে বাস-মিনিবাস চলাচলের অনুমোদন প্রক্রিয়ার সংস্কার এবং ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য এ দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনটি চূড়ান্ত করার আগে এসব বিষয় যেন অবশ্যই সংযোজন করা হয়। নয়তো সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকবে, বদলাবে না কিছুই। শুধু গণপরিবহন নয়, সড়কে মোটরসাইকেল চলাচলেও আসেনি শৃঙ্খলা। তাদের বেপরোয়া চলাচল অব্যাহত রয়েছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের মধ্যে বাড়তি ভাড়া আদায়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে আগের মতোই। রিকশা চলাচলেও তৈরি হয়নি শৃঙ্খলা। এমনকি পথচারীরাও সচেতন হয়েছেন বলা যাবে না। এখনও অনেককে যত্রতত্র রাস্তা পারাপার করতে দেখা যাচ্ছে। মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছেন কেউ কেউ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে কি তবে কেউই কোনো শিক্ষা নেননি? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে সেটা হবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক। পরিবহন খাত, ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে। এ জন্য আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন জনসচেতনতাও। বস্তুত আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও জনসচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা সবাই যদি সদা সতর্ক থাকি, তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও বাধ্য হবে ট্রাফিক ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে

সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে

পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশে প্রতিনিয়ত কত মানুষকে যে পথে বসতে হয়, তার কোনো হিসাব নেই। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ওষুধের দাম কমানোর ব্যবস্থা করা হলে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেত। কিন্তু বাস্তবতা হল বিভিন্ন ওষুধের দাম বেড়েই চলেছে। এ অবস্থায় অনেকের পক্ষে সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। বস্তুত কোনো কারণ ছাড়াই কিছুদিন পরপর বাড়ে বিভিন্ন ওষুধের দাম। রোববারের একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উলে­খ করা হয়েছে, হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ অস্ত্রোপচারের জন্য যেসব ওষুধের প্রয়োজন সেগুলোর দাম বেড়েছে। আগে যে ওষুধের দাম ছিল ১৫০ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪০ টাকা। এভাবে ওষুধের দাম বৃদ্ধি পেলে হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে অনেক জরুরি ওষুধও সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিসটিক্সের (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে একটি কঠিন রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে প্রতিবছর ৬৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। ১৯৯৪ সালের যে নির্দেশনাকে পুঁজি করে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছামতো ওষুধের দাম বাড়ায়, জনস্বার্থে তা পরিবর্তন করা দরকার। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ হতদরিদ্র। তাদের পক্ষে বেশি দামের ওষুধ সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। অসুস্থ ও হতদরিদ্র মানুষের পক্ষে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ওষুধের দাম বেশি রাখা হলে, এ বাবদ অর্থ ব্যয় করে প্রতিনিয়ত মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ে- এ দিকটি বিবেচনায় নিয়ে মানুষ যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ ক্রয় করতে পারে- সরকারকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। মাঝে মাঝে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ওষুধের দাম বাড়িয়ে থাকে। নকল ও ভেজাল ওষুধ ব্যবহারের কারণে মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়- বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করলেও অসাধু ব্যক্তিদের অপতৎপরতার বিষয়টি বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। এসব সমস্যার সমাধানে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। এসব বিষয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও এ বিষয়ে এ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান ওষুধের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করেছে কিনা তা নিয়মিত যাচাই করে আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের গুণগত মান ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করার জন্যও পদক্ষেপ নিতে হবে। জনগণ যাতে সাশ্রয়ী মূল্যে সব ধরনের ওষুধ ক্রয় করতে পারে, এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন করার পাশাপাশি আইন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

জন্মগত অধিকার

মায়ের দুধে শিশুর জন্মগত অধিকার। জন্মের পর পরই নবজাতককে মায়ের দুধ পান করানো হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। অপুষ্টিতে আক্রান্তের সম্ভাবনা দূরীভূত হয়। অন্যদিকে মায়ের শরীর-স্বাস্থ্যও ভাল থাকে। গত ২ আগস্ট থেকে পালিত বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে যে বার্তাটি পাওয়া গেছে, তা হলো, গত কয়েক বছরে দেশে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে দেশে দু’বছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পান করানো শিশুর সংখ্যা পৌঁছেছে ৮৭.৩ শতাংশে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্বে মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও কিউবা। তবে মা ও শিশুস্বাস্থ্যের অপুষ্টির বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে। প্রসূতি মৃত্যুর হারও কমেনি। অন্যদিকে ৫ বছর বয়সী অর্ধেক শিশু ভূগে থাকে অপুষ্টিতে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৬ নারী মারা যান সন্তান প্রসব করতে গিয়ে। এই হিসাবে প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ হাজার নারীর মৃত্যু ঘটে, যাকে বলে প্রসূতিমৃত্যু। বাংলাদেশ বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নে অনেকটা অগ্রসর হলেও অনেকাংশে পিছিয়ে আছে এদিক থেকে, যা হতে পারে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়নে প্রতিবন্ধক। সমাজে প্রচলিত নারীর প্রতি  নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, বাল্যবিবাহ, কুসংস্কার ও অজ্ঞানতা, ক্ষুধা ও অপুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অপ্রাপ্তি সর্বোপরি সন্তান প্রসবে অপর্যাপ্ত সুযোগ ও অকারণে সিজার প্রধানত প্রসূতি নারী ও শিশুর অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ। তদুপরি দেশে সরকারীভাবে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও খুব কম, জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ মাত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাজেট বরাদ্দে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। মা ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় জাতিসংঘ নির্দেশিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) অর্জনের কারণে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে প্রশংসিত হলেও অদ্যাবধি কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। এর অন্যতম হলো পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব তথা পুষ্টি সমস্যা। জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা (২০১৬-২০২৫)-এর চূড়ান্ত খসড়ায় যে তথ্য উঠে এসেছে তা হলোÑ দেশের ১৮ শতাংশ গর্ভবতী মা অপুষ্টির শিকার। আর প্রধানত অপুষ্টির কারণে ২৩ শতাংশ শিশু জন্ম নিচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে কম ওজন নিয়ে। আরও যা উদ্বেগজনক তা হলো, শহরের বস্তি ও গ্রামাঞ্চলে মাসহ শিশু পরিচর্যাকারীর ৭৩ শতাংশই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না। এসবের পেছনে আর্থিক দৈন্য, বাল্যবিয়েসহ নানা কুসংস্কারও বিদ্যমান। সন্তান প্রসবে অকারণে সিজারসহ হাতুড়ে চিকিৎসক তথা দাইয়ের হস্তক্ষেপও কম দায়ী নয়  কোন অংশে। ফলে প্রসূতি মৃত্যুর হার বেড়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এসডিজি অর্জন করতে হলে এসবই দূর করতে হবে পর্যায়ক্রমে। প্রধানত মায়ের অপুষ্টির কারণে শিশু মাতৃদুগ্ধ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।  সেক্ষেত্রে মা ও শিশুর পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকারের অনেক সমুজ্জ্বল সাফল্যের অন্যতম একটি  দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক। সম্প্রতি এটি পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের মতো সুবৃহৎ বহুজাতিক দাতা সংস্থার। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতের উন্নতিতে ‘অসাধারণ ভূমিকা’ রাখছে কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাস্থ্য খাতে অভাবনীয় উন্নতির উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, এটি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছে। এর ফলে নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণসহ ১০টি সূচকে সন্তোষজনক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে অবশ্য কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দারিদ্র্য, চিকিৎসা উপকরণের অভাব, বিভিন্ন রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মা ও শিশুর অপুষ্টির কথাও বলা হয়েছে। তদুপরি নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা তো আছেই।  সে অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোয় প্রশিক্ষিত ধাত্রীসহ সেবার মান বাড়ানো গেলে নারীর অপুষ্টিজনিত সমস্যাসহ প্রসবজনিত জটিলতা ও মাতৃমৃত্যুসহ শিশুমৃত্যুর হার আরও কমে আসবে নিঃসন্দেহে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষিত কেন

ব্যাংকগুলোকে নানা সুবিধা দেয়ার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক ঋণের সুদহার ১ জুলাই থেকে সিঙ্গেল ডিজিট তথা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ছিল; কিন্তু অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই পার হয়ে দ্বিতীয় মাস আগস্টেও কোনো বেসরকারি ব্যাংকই আদেশটি তামিল করছে না। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক ১ জুলাই থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো। অবশ্য চারটি সরকারি ব্যাংক তাদের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে; কিন্তু কোনো বেসরকারি ব্যাংকই আমানতের সুদহার কমালেও এখনও ঋণের সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বাস্তবায়ন করেনি। এর বাস্তবায়ন এড়াতে নানা কৌশল ও শুভঙ্করের ফাঁকির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। তারা ‘কম সুদে সরকারি আমানতের অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না, বেসরকারি আমানতও মিলছে না, সময় লাগবে’- এসব কথা বলে গড়িমসি করছে। আমরা মনে করি, শিল্পের স্বার্থে ইতিবাচক বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, সর্বোপরি দেশের সার্বিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। উদ্বেগের বিষয়, বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখনও শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে সুদ নিচ্ছে। এর সঙ্গে অন্যান্য সার্ভিস চার্জ যোগ করলে সুদহার যে আরও বেশি হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাঝারি শিল্পে ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৫ এবং ক্ষুদ্র শিল্পে তা দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। শিল্পের বিকাশ, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান তৈরি, সর্বোপরি সার্বিক উন্নয়নের পথে এ সুদহার যে বাধার সৃষ্টি করছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সুদহারের দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যাবে। অবশ্য কিছু ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়েছে, তবে সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক রুটিন কাজ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক তা সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো হয়নি। এক্ষেত্রে কৃষিঋণ, রফতানি ঋণ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের সুদহার সমন্বয় করে নিজেদের সুদহার কম দেখানোর একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোকে সংকট কাটিয়ে উঠতে নানা ছাড় দেয়া হয়েছে। সিআরআর বা নগদ ক্যাশ জমা ১ শতাংশ কমানো, বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের পরিচালক সংখ্যা বাড়ানো, এমনকি পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানোর মতো বড় ধরনের ছাড় তাদের দেয়া হয়েছে। তারপরও তাদের সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে গড়িমসি ও নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়া দুর্ভাগ্যজনক। সরকারের শীর্ষমহল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিতে বাধ্য করা, অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্যও সরকারপ্রধানের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া দরকার। বিএবি সভাপতিসহ বিভিন্ন ব্যাংকার বলছেন, কম সুদে আমানত পাওয়া সাপেক্ষে সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো হবে সুদহার। আমরা মনে করি, এভাবে গড়িমসি না করে ব্যাংকগুলো সরকারের দেয়া সুবিধার বিপরীতে অপারেটিং কস্ট কমিয়ে এবং নানাভাবে উদ্যোগ নিতে পারে। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিলে ব্যাংক মালিকরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করতে পারবেন না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

খেলাপি ঋণের বিস্তার রোধ করতে হবে

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৭’ অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে গত বছর মোট খেলাপি ঋণের হার ও পরিমাণ দুই-ই বেড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হল, দেশের ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল ১০টিতেই মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ। খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে এ শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ৫টি, বেসরকারি খাতের ৩টি, বিশেষায়িত একটি এবং বিদেশি খাতের একটি ব্যাংক রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সালে ৭৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, খেলাপি ঋণ কাঙ্খিত মাত্রায় কমিয়ে আনা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ খেলাপি ঋণের বিস্তার ঘটেই চলেছে, যা অনভিপ্রেত। ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিদ্যমান থাকার কারণেই যে খেলাপি ঋণের বিস্তার ঘটছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে ব্যাংকিং খাতে অবশ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাধারণত খেলাপি ঋণের প্রায় পুরোটাই মন্দ ঋণে পর্যবসিত হওয়ায় তা লোকসান বা পুঁজি ঘাটতি হিসেবে দেখানো হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এ ধরনের ঘাটতি মিটিয়ে থাকে সরকারি তহবিল থেকে টাকা গ্রহণ করে, যা মূলত জনগণের দেয়া ট্যাক্স। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে এ ঘাটতি মেটায়। নিয়মানুযায়ী ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে গড়ে ২৫ ভাগ মূলধন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়, যা ‘প্রভিশন’ নামে পরিচিত। প্রভিশনে রাখা অর্থ ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে পারে না বিধায় ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর ব্যবসা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এর কুফলও সাধারণ গ্রাহকদের বইতে হয়। ব্যাংকগুলোর দেয়া ঋণ যাতে কুঋণে পরিণত না হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে অসৎ কর্মকর্তাদের দাপট ও আধিপত্য রোধের বিষয়েও নজর দেয়া উচিত। দেখা গেছে, অসৎ ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপি ঋণের প্রসার ঘটায়। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ নেয়ার পর তা খেলাপি ঋণে পরিণত করার প্রবণতা শুরুতেই রোধ করা গেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব। ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট মূলত দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করে থাকে। কাজেই এটিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়া হলে তা হবে অর্থহীন।

বেপরোয়া বাসচালকদের ঔদ্ধত্যের শেষ কোথায়?

এবার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বাস উঠিয়ে দিল চালক। ঘটনাস্থলেই নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে দুই শিক্ষার্থী। আহত হয়েছে আরো ১২ জন। দুই বাসের রেষারেষিতে এই ঘটনা ঘটেছে। প্রায়ই রাজধানীতে বেপরোয়া চালকদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বলা যায়, গণপরিবহন এখন সাক্ষাৎ যমদূত হিসেবে আবির্ভূত। এসব মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া হলেও অধিকাংশই বেপরোয়া পরিবহন চালকদের দায়হীন হত্যাকান্ড। পরিবহন শ্রমিকদের শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন ও মালিকদের তৎপরতার কারণে সড়কে নিহতদের পরিবার বিচার পায় না। চালকরাও দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি ছাড়াই বেরিয়ে আসে। আবারো তারা গাড়ি রেসের পাল্লায় মেতে ওঠে। কে থামাবে এদের দৌরাত্ম্য? এমন মৃত্যুর অবসান কি হবে না? গত রবিবার রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অদূরে বিমানবন্দর সড়কের পাশে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস ওই স্টপেজে এসে দাঁড়ালে সেটিতে শিক্ষার্থীরা উঠছিল। ঠিক একই সময় যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে একই পরিবহনের আরেকটি বাস দাঁড়ানো বাসটির পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে ঢুকে পড়ে এবং দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের ওপর উঠে যায়। ঘটনাস্থলে মারা যায় কলেজ শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আব্দুল করিম। এভাবে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনার নামে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে হানিফ পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী ছিলেন সাইদুর রহমান পায়েল। বাস থেকে নামার পর আর উঠতে পারেননি পায়েল। দৌড়ে উঠতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় আহত হন। পরে বাসচালক ও তার সহকারীরা মিলে আহত রক্তাক্ত পায়েলকে পাশের খালের মধ্যে ফেলে দেয়। পানিতে ডুবে মারা যায় পায়েল। কোনো সাধারণ সুস্থ মানুষের পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনা বাড়লেও চালকদের সতর্ক করার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দিন দিন যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানীতে বাসে চলাচল বিপজ্জনক। এমন ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ পরিবহন খাতে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা। বেতনভুক্ত চালক দিয়ে লোকাল বাস চালালে মালিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এ অবস্থা থেকে বের হতে নগরীর অধিকাংশ পরিবহন মালিক তাদের বাস-মিনিবাস চালককে চুক্তিতে চালাতে দিচ্ছে। চুক্তির কারণেই চালকরা বেপরোয়া। কারণ একই রুটের যে বাস আগে শেষ গন্তব্যে পৌঁছাবে সেই ফিরতি ট্রিপের সিরিয়াল পাবে আগে। এ কারণে একই রুটের বাসের মধ্যেই ভয়াবহ মরণ রেস দেখা যায়। এসব চালকদের অনেকেরই নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। অনেক সময় চালকের পরিবর্তে বাস চালায় হেলপার। এরা কেউ আইনের তোয়াক্কা করে না। দেশে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইন আছে, রয়েছে শাস্তির বিধান। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ দেখা যায় না। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের দাপটে দোষী চালকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রায় অসম্ভব। সড়কে নৈরাজ্যের কারণ ও এর প্রতিকার সম্পর্কে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের পরামর্শ ও সুপারিশ করা হলেও তা যে অরণ্যে রোদনে পর্যবসিত হচ্ছে। এ জন্য দরকার ইতিবাচক চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ।

হজযাত্রীদের সঙ্গেও অসদাচরণ

হজ ক্যাম্প ও এর ডরমিটরি তৈরি করা হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আল্লাহর ঘরের মেহমানরা যেন ফ্লাইটে ওঠার আগে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারেন; কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় খোদ হজ ক্যাম্পেরই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সে ডরমিটরি দখল করে পরিবার নিয়ে বাস করছেন। বিপরীতে হজযাত্রীরা থাকছেন ক্যাম্পের মেঝে ও মসজিদের বারান্দায়। অথচ ডরমিটরি দখলকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মমাফিক বাড়ি ভাড়া নিচ্ছেন সরকারের কাছ থেকে। এতে একদিকে যেমন হজযাত্রীদের কষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ডরমিটরি ভাড়া বাবদ মোটা অঙ্কের অর্থ আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।আমরা মনে করি, সার্বক্ষণিক সেবা দিতে হয় বিধায় ক্যাম্পেই অবস্থান- এমন অযৌক্তিক দাবি করে ক্যাম্পের ডরমিটরি দখল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। অবিলম্বে ডরমিটরি দখল করে রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের করে দিয়ে সেখানে হজযাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে দখলকারীদের কাছ থেকে সরকার কর্তৃক দেয়া ভাড়ার অর্থ ফেরত এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি-অনিয়ম জেঁকে বসার কারণে হজের মতো পবিত্র একটি ইবাদতের পথের যাত্রীদের কষ্ট দেয়ার মতো ন্যক্কারজনক বিষয়ও সংশ্লিষ্টদের উপলব্ধিতে আসছে না। এটি খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। ডরমিটরি দখলসহ হজ ক্যাম্পের সব ধরনের অনিয়ম এবং হজযাত্রীদের ফ্লাইট ও ভিসাসংক্রান্ত যে কোনো জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে অবিলম্বে। প্রতি বছরই হজের ফ্লাইট ও ভিসাসংক্রান্ত নানা জটিলতা তৈরি হয়। এমনকি এজেন্সিগুলোর প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক মানুষ শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ঘর জিয়ারতে পর্যন্ত যেতে পারেন না। এবারও এখন পর্যন্ত ৩৫ হাজার হজযাত্রী ভিসা পাননি। অথচ ৭ আগস্টের পর আর ভিসা দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে সৌদি দূতাবাস। একদিকে যাত্রী সংকটে হজ ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, অন্যদিকে ভিসা পাচ্ছেন না হজযাত্রীরা, এটি মেনে নেয়া যায় না। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে পবিত্র হজ একইসঙ্গে আর্থিক ও শারীরিক ইবাদতের সংমিশ্রণ হওয়ায় এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে মুসলিম মানসে। এ কারণে একজন মুসলিম যখন পবিত্র হজ আদায়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার সামনে কেবল আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার আকুতির বাইরে অন্যকিছু ভাবার অবকাশ থাকে না। এ সুযোগে তাদের নিয়ে একশ্রেণীর প্রতারক নানা ধান্দায় মেতে ওঠে। হজযাত্রীরা যেন হজ ক্যাম্পে, ফ্লাইটে ও সৌদি আরবে অবস্থানকালীন কোনো ধরনের সমস্যার মুখে না পড়েন, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যেক হজযাত্রীর বাংলাদেশ ত্যাগ ও ফিরে আসা পর্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল ব্যবস্থাপনা থাকবে, সে প্রত্যাশাই করছি আমরা।

তিন সিটি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হোক

আজ রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। নির্বাচনটি স্থানীয় হলেও দেশেরজনগণের দৃষ্টি এখন তিন সিটির দিকে। নির্বাচনে উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গন আলোচিত হচ্ছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের জন্য এটা শেষ অগ্নিপরীক্ষা। এই তিন সিটি নির্বাচনের ওপর নির্ভর করছে আগামী জাতীয় নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। ভোটগ্রহণ এবং পরবর্তী পর্যায়গুলো সুষ্ঠু ও নির্বিঘœ ভাবে সম্পন্ন হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কে হচ্ছেন তিন সিটির নগর পিতা এই নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। তিন সিটিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে। এই প্রথমবারের মতো সিটিগুলোতে দলীয় প্রতীকে মেয়র পদে ভোট হতে যাচ্ছে। রাজশাহী সিটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮। এ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ৫। বরিশাল সিটিতে মোট ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ১৬৬। এ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ৬। সিলেট সিটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২। এ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ৭। নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন করতে সব প্রস্তুতি রেখেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনো ঘটনার খবর এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রচারণাও যে সহিংসতামুক্ত থাকতে পারে, তার সত্যতা আমরা এখন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করেছি। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা রয়েছে। এই নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। ভোটে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে গতকাল শনিবার থেকে মাঠে নেমেছে বিজিবি-র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলার দিকে সতর্ক চোখ রাখছে নির্বাচন কমিশন। সংসদ নির্বাচনের আগে তিন সিটি নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়াও কেন্দ্রে কেন্দ্রে নির্বাহী এবং বিচারিক হাকিম নিয়োজিত করা হয়েছে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে। নির্বাচন কেমন হয় তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ রাজনীতিরও অনেক কিছু। তিন নির্বাচন সুষ্ঠু নির্বিঘœ গ্রহণযোগ্য হলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে যা এ মুহূর্তে সবার কাম্য। এখন নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের দায়িত্ব হলো ভোটাররা যাতে নির্বিঘেœ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন তার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা। কমিশন ইতোমধ্যে সে ব্যাপারে ভোটারদের আশ্বস্ত করেছে। তাদের জন্য এটা একটা পরীক্ষা এবং সুযোগ নিজেদের যোগ্যতা দক্ষতা গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের। সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের যেমন, তেমনি অংশগ্রহণকারী প্রার্থী, ভোটার এবং সমর্থনদানকারী রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছি আমরা। নির্বাচনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয় থাকবে, ভোটারদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তা খোলামনে মেনে নেয়াই গণতন্ত্রের শিক্ষা হওয়া উচিত।

নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব

নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় নগরবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ বছর বর্ষা আসার আগে থেকেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মশার উপদ্রব বেড়েছে। বেড়েছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও। শুক্রবার একটি দৈনিকের খবর বলছে, জুলাই মাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার। চিকিৎসকরা বলেছেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনুসরণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টি হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কারণ ডেঙ্গু জ্বরের কোনো প্রতিষেধক নেই। ডেঙ্গু থেকে রেহাই পেতে হলে এখনই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। জানা যায়, গত বছর পুরো ডেঙ্গু মৌসুমে আক্রান্ত হয়েছিল দুই হাজার ৭৬৯ জন। এ বছর শুধু চলতি মাসে ১ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়াবহতা আগাম বার্তা দিচ্ছে। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এক জরিপে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের ৯৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৭টিকে এডিস মশা বিস্তারে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। জরিপে ঢাকা উত্তরের ২৫ ও দক্ষিণের ৪২টি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তারের নমুনা-লক্ষণ মিলেছে। দুই অংশের অনেক আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক এলাকা, বিভিন্ন ধরনের সরকারি-বেসরকারি দপ্তরও ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। আইইডিসিআরের তথ্য মতে, সাধারণত জুন-জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকে। তবে জুলাই-অক্টোবর পর্যন্ত পরিস্থিতি বেশি খারাপ থাকে। সাধারণত মশক নিধন কার্যক্রমের স্থবিরতা, গাইডলাইনের অভাব এবং মানুষের অসচেতনতাই ডেঙ্গুর প্রকোপের জন্য দায়ী। হঠাৎ থেমে থেমে স্বল্পমেয়াদি বৃষ্টিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা খুব বেশি মাত্রায় প্রজনন সক্ষমতা পায়। ফলে এডিস মশার বিস্তারও ঘটে বেশি। এ মশা যত বেশি হবে ডেঙ্গুর হারও তত বাড়বে। উৎস বন্ধ না করতে পারলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যাবে। ডেঙ্গুর ইতিহাস অনেক পুরনো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে গত দুই দশকে এর প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। ২০০২ সালে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। তবে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বেশি মৃত্যু হয় ২০০০ সালে। ওই বছর ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে হঠাৎ করে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৬০ জনে বৃদ্ধি পায়। সে বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ১৪ জনের। ২০১৭ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭৬৯ জন ও মৃতের সংখ্যা ৮ জন। এ বছর আক্রান্তের সংখ্যা যদি আরো বেড়ে যায়, সেটি হবে নগরবাসীর জন্য আরেকটি বড় দুঃসংবাদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রলম্বিত বর্ষা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার বৃদ্ধি বিভিন্ন প্রজাতির এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তারে সহায়ক হয়। যে বছর বৃষ্টি বেশি হয় সেই বছর এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ে। ফলে ডেঙ্গুর প্রকোপও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। বৃষ্টির স্থায়িত্ব যত বাড়বে ডেঙ্গুর বিস্তারও তত বাড়বে। এ বছর বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বর্ষা ঋতু দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তাই ডেঙ্গুর বিস্তারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে। বৃষ্টি যদি এভাবে থেমে থেমে চলতে থাকে তাহলে এডিস মশার ঘনত্বও বাড়বে। কাজেই দেরি না করেই আমাদের এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। প্রথমত মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এডিস মশা নিধন এবং বংশ বিস্তার রোধে জোরদার অভিযান পরিচালনা করবে এ প্রত্যাশা নগরবাসীর। ডেঙ্গুর প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরি, ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে মানুষকে ওয়াকিবহাল করা, ডেঙ্গু হলে করণীয় সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা জোরদার করাও দরকার।

রাঘববোয়ালরা যেন ছাড় না পায়

বড়পুকুরিয়া কয়লা কেলেঙ্কারি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার পেট্রোবাংলার পরিচালকের (অপারেশন) নেতৃত্বে যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনটি এরপর হস্তান্তর করা হয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে। এরপর প্রতিমন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিবেদনটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে কয়লা চুরির সঙ্গে সাবেক চার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার অধিকতর তদন্তের জন্য অবশ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওদিকে মঙ্গলবার রাতেই বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) বাদী হয়ে চুরির ঘটনায় খনির সদ্য অপসারণকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এই মামলার তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের তিন সদস্যের একটি কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু করেছে। এই টিম খনির অভিযুক্তদের বিদেশ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির উত্তোলনকৃত ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনায় দেশবাসী বিস্মিত। এত বড় চুরি কীভাবে সংঘটিত হল, সেটাও এক বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। পেট্রোবাংলার তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেছেন, গত ১৩ বছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে উপ-মহাব্যবস্থাপক পর্যন্ত পদে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা এই অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। অর্থাৎ আমরা দেখছি, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে পুকুরচুরি নয়, হয়েছে সমুদ্রচুরি। এত উচ্চপদে দায়িত্ব পালনকারীরা এত বড় দুর্নীতি করতে পারে ভাবা যায় না। তদন্তে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে এদের রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা দিলেও অত্যুক্তি হবে না। এই মহা অন্যায় কাজটি করা হয়েছে জনস্বার্থের বিরুদ্ধে। উত্তরাঞ্চলে ইতিমধ্যে বিদ্যুত সরবরাহে বিঘœ ঘটেছে। সেচ ব্যবস্থাসহ বিদ্যুতচালিত অন্যান্য কর্মকান্ডেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ এই কয়লা চুরি সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে এনেছে। অভিযুক্তদের বিচার হতে হবে এবং দোষ প্রমাণিত হলে দিতে হবে কঠোর শাস্তি। নিম্ন পর্যায়ের দোষীদের অন্যায়ের শাস্তি হবে, অথচ উচ্চপদস্থদের হবে না, এটা হতে পারে না। অপরাধী, তার সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক, অন্যায় করলে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে- এটাই আইনের শাসনের মূল কথা।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, পেশিশক্তি ও মাদক নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকি তিনি এও বলেছেন, কে কোন দল করে, কে কী করে, তা দেখার দরকার নেই। নির্দেশনা পালনের ক্ষেত্রে কেউ বাধা দিলে সরাসরি তার সঙ্গে ও তার অফিসে যোগাযোগ করারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা প্রশংসাযোগ্য এবং তা যে কোনো মূল্যে বাস্তবায়নের দাবি রাখে। জেলার প্রধান নির্বাহী ডিসিরা যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স দেখান, তাহলে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে এক্ষেত্রে নিরপরাধ কোনো মানুষ, রাজনৈতিক ভিন্ন মতাদর্শের কোনো ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও ২২টি নির্দেশনা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- সরকারি সেবা পেতে নাগরিকরা যেন হয়রানি-বঞ্চনার শিকার না হন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করা, খাদ্যে ভেজাল রোধ করা এবং সমাজের অতি প্রয়োজনীয় আরও কিছু বিষয়। নাগরিকদের স্বার্থে, সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এগুলো বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। প্রতি বছরই ডিসি সম্মেলনে এমন দিকনির্দেশনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেয়া হয়। জেলা প্রশাসকদের দাবি-দাওয়া নিয়েও আলোচনা হয়; কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়িত হয় কিনা, তা ভালোভাবে মনিটরিংয়ের কোনো ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয় না। এবার সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী সুন্দর একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। তা হল, কওমি মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া। সরকারি নজরদারির বাইরে থাকা মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির অভিযোগ নেই বললেই চলে। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ তাদের সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসতে পারলে আমাদের জাতীয় সংহতি আরও সুদৃঢ় হতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ভাবতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, বর্তমান সরকারের লক্ষ হল- ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও নিরক্ষরতামুক্ত একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়া। এগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে মাঠ পর্যায়ে ডিসিদের আন্তরিকভাবে সরকারের সব নির্দেশ মানতে হবে এবং অনিয়ম-দুর্নীতির ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সমাজ থেকে ভয়ানক এসব অপরাধ কমানো যাবে, অন্যথায় নয়। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই নয়, সামাজিক অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক দেশকে আমরা ছাড়িয়ে গেছি। এ অবস্থা ধরে রাখতে এবং আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দলনিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট। দুর্ভাগ্য বলতে হয়, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছাড়া কোনোকিছুই যেন সুষ্ঠুভাবে করা যায় না দেশে। অথচ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রুটিন দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর জেলা প্রশাসকরা এক্ষেত্রে সচেষ্ট হবেন বলে আমরা আশাবাদী। একইসঙ্গে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নিতে হবে।

বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও

দেশে কতরকম দুর্নীতি সংঘটিত হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার খবরে সারা দেশের মানুষ বিস্মিত হয়েছে। এ ঘটনায় খোদ প্রধানমন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই বিপুল পরিমাণ কয়লা কোথায় গেল তা পূর্ণ তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে খনি থেকে উত্তোলিত ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার আলামত পেয়েছে দুদক। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এদিকে কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়ার ৫২৫ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুত কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে লোডশেডিং বাড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিকল্প উপায়ে দ্রুত বিদ্যুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলে একদিকে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে, অন্যদিকে বিদ্যুতের অভাবে অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সদ্য অপসৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, উল্লিখিত খনি থেকে ইতিমধ্যে ১১ বছরে ১ কোটি ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে সিস্টেম লসের কারণে ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নটি আসে তা হল সিস্টেম লসের কারণে উত্তোলিত কয়লা নষ্ট হলে কয়লা রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হল না কেন? গত ১১ বছর ধরে কয়লা উধাও হয়ে গেল, আর তা কারও নজরে এলো না? একজন কয়লা ব্যবসায়ীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালে ৩০০ টন কয়লা চুরি হয়ে যায়। এ তথ্য জানাজানি হলে খনি কর্মকর্তারা ৩০০ টন কয়লার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে হিসাব সমন্বয় করেন। আমরা মনে করি, এ রকম অপ্রকাশিত চুরির ঘটনা থেকে থাকলে তা তদন্তে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অপর এক কয়লা ব্যবসায়ীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে কয়লা বিক্রির সঙ্গে কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। এ ব্যবসায়ীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে যখন একাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তখন খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা উধাও হওয়ার ঘটনাটি উদ্বেগজনক। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। এসব বিদ্যুত কেন্দ্র পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করতে হবে। সেই কয়লার অংশবিশেষ যদি হঠাৎ ‘উধাও’ হয়ে যায় তাহলে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদনে ধস নামবে। এতে দেশ কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা রাতারাতি উধাও হয়ে যায়নি, দীর্ঘদিন ধরেই এটি ঘটেছে। এই বিপুল পরিমাণ কয়লা কী করে উধাও হয়ে গেল- যারা সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন তাদের তা স্পষ্ট করতে হবে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কয়লা উধাও হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। এ ঘটনায় দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কয়লার রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

চামড়া রফতানিতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের প্রেক্ষাপটে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছিল। উদ্বেগজনক তথ্য হল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর আশপাশের পরিবেশও মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। দূষণ রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকা আরেকটি হাজারীবাগে পরিণত হতে পারে। এদিকে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে চামড়া রফতানিতে মন্দাভাব। একটি জাতীয় দৈনিকের এক খবরে বলা হয়, বিশেষ সহায়তা দিয়েও বাড়ানো যাচ্ছে না চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে গত অর্থবছরে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার কম আয় হওয়া থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট। সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরা এলাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর চামড়া শিল্পের সার্বিক কমপ্লায়েন্স মান নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নয়নের তাগিদ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এছাড়া ইতালির কিছু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের রফতানি আদেশও ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে, যা আমাদের অন্যতম রফতানি খাতটির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। সাভারে বর্তমানে চামড়া শিল্পের কারখানাগুলো যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাতে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। কারখানাগুলো চালুর পর সেখানকার নদীর পানির রং বদলে গেছে। দূষিত পানির কারণে ওই এলাকার কয়েকশ’ মানুষ চর্মরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বর্ষার পর নদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে এলাকাবাসী আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। চামড়া খাতের অন্যতম সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে করা না গেলে চামড়া শিল্পনগরীর চারপাশের জনগণ বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। এদিকে সাভারে চালু হওয়া সব চামড়া কারখানা বিদ্যুত সংযোগ পেলেও অনেক কারখানা এখনও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাজেই সব কারখানায় দ্রুত গ্যাস সংযোগ দেয়া না হলে তাদের পক্ষে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘ প্রত্যাশার পর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি) চারটি মডিউল বর্তমানে চালু হলেও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের অভাবে সিইটিপি থেকে বের হওয়া তরল পদার্থ যথাযথভাবে পরিশোধিত হচ্ছে না। এজন্য সিইটিপি পরিচালনার জন্য যেসব উপকরণ দরকার, তার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর অসম্পূর্ণ অবকাঠামো সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। চামড়া শিল্প যেমন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত, তেমনি পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি না করে চামড়া শিল্পের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

মজুরি বিশৃঙ্খলা চরমে

অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রেই নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়। আমদানি থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত কোথাও দামদরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। এতে নিম্ন আয়ের লোকজনের জীবন ধারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন অবস্থায় সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে। সরকারি খাতের বিভিন্ন কল-কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা যে বেতন পায়, বেসরকারি খাতের অনেক কারখানায় সরকার নির্ধারিত বেতনই তার অর্ধেকেরও কম। আবার এমন বহু বেসরকারি খাত রয়েছে, যেগুলোতে কোনো নিম্নতম মজুরি কখনো নির্ধারণই করা হয়নি। সেসব খাতে নামমাত্র মজুরিতে শ্রমিকরা কাজ করতে বাধ্য হয়। বেতন-ভাতাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। কথায় কথায় ছাঁটাই করা হয়। কাজের নূন্যতম নিরাপত্তাও নেই। প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই বৈষম্য বিশৃঙ্খলার একটি বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে, যা কোনো সভ্য দেশেই কাম্য নয়। জানা যায়, দেশে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণ করে জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তাদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গত বছর নির্ধারণ করা বেতন কাঠামো অনুযায়ী বর্তমানে তাদের নিম্নতম মূল মজুরি আট হাজার ৩০০ টাকা। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতাসহ মোট মজুরি হয় ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড। বোর্ড এ পর্যন্ত বেসরকারি ৪২টি খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেছে। এখনো অর্ধশতাধিক বেসরকারি খাত রয়েছে, যেগুলোতে কখনো কোনো বেতন-ভাতা নির্ধারিত হয়নি। নির্ধারণ করা খাতগুলোতেও বেতন-ভাতায় কোনো সাম্য নেই। বস্ত্র খাতের শ্রমিকদের মূল মজুরি তিন হাজার ৬০০ টাকা, অন্যান্য সুবিধাসহ মোট মজুরি হয় পাঁচ হাজার ৭১০ টাকা। অনেক খাতে আরো কম। কোনো কোনো খাতে গত ৩৫ বছরেও বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি। যেমনÑপেট্রলপাম্প শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ১৯৮৭ সালে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং সেটি এখনো বিদ্যমান। তাদের মূল বেতন ৫৬০ টাকা এবং অন্যান্য সুবিধাসহ মোট প্রাপ্য হয় ৭৯২ টাকা। এই বেতনে এখন হয়তো কোনো শ্রমিক পাওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে মালিকরা যাকে যা দিয়ে পারেন নিয়োগ দেবেন। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় পৌনে সাত কোটি শ্রমিক রয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশেরই কোনো নির্ধারিত মজুরি নেই। তারা নানাভাবে শোষণের শিকার হচ্ছে। দেশে জনসংখ্যা বেশি, বেকারত্বের হারও বেশি। তার সুযোগ নিয়ে নিম্ন আয়ের এসব মানুষকে কেউ যাতে অনৈতিকভাবে শোষণ করতে না পারে তার নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। সে ক্ষেত্রে সরকারই যদি এমন বৈষম্যমূলক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে এসব গরিব মানুষ যাবে কোথায়? আমরা চাই, সরকারি-বেসরকারি খাতগুলোর মধ্যে বেতন-ভাতার বৈষম্য কমিয়ে আনা হোক। জীবনধারণের নূন্যতম মান বজায় রেখে প্রত্যেকের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করা হোক।