কোরবানির পশু কেনায় সতর্কতা!

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত ঈদুল আজহায় বিত্তবান মুসলিমরা গরু, মহিষ, ছাগল, উট ইত্যাদি পশু কোরবানি দিয়ে গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। কোরবানির পশু হিসেবে অধিকাংশ মানুষেরই প্রথম পছন্দ গরু। সাধারণত লালন-পালন করা হয়েছে এবং মায়া জন্মেছে এমন পশুকে কোরবানি দেয়ার কথাই ধর্মে বলা হয়েছে। সুস্থ কোরবানির পশু কোরবানি কবুলের অন্যতম শর্ত। তবে এই ব্যস্ত জীবনে পশু পালন করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। তাই ঈদের কিছুদিন আগে কোরবানির পশু কিনতে সবাই হাটে ছোটেন। শহরের অনেকেরই গরু সম্পর্কে ধারণা কম থাকে। চোখের সৌন্দর্যেই গরু কিনে নিয়ে আসেন। অনেকেই অভিযোগ করেন, পশু অসুস্থ; অথবা কিনে আনার দুদিন পরই মারা গেছে। এসব অঘটন এড়িয়ে চলতে কোরবানির গরু বা পশু কেনার সময় কিছু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে সুস্থ পশু কেনা সম্ভব। কোরবানির পশু কেনার সময় লক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো- দেখতে তরতাজা লাগছে এমন পশু নির্বাচন করুন সতেজ পশুর বৈশিষ্ট্য হলো ত্বক উজ্জ্বল থাকবে; দেখতে ফ্যাকাসে লাগবে না। কোরবানির পশু অসুস্থ থাকলে অস্বাভাবিকভাবে মাথা নিচু করে রাখবে। অসুস্থ পশু প্রকৃতি এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে উদাসীন থাকবে। নড়াচড়া কম করবে বা করবেই না। অসুস্থ পশু অন্য পশুর পেছনে লুকানোর চেষ্টা করবে। হালকা এবং ঘন ঘন কাশি দিচ্ছে এমন পশু না কেনাই ভালো। পশুর কান সমান আছে কিনা লক্ষ্য করুন। কান নিচের দিকে ঝুলে থাকলে বুঝবেন পশুটি অসুস্থ বা কোনো সমস্যা আছে। কোরবানির পশু সুস্থ থাকলে কথার সঙ্গে সঙ্গে কান নাড়িয়ে সাড়া দেবে। বিমর্ষ চোখ থাকলে এবং চোখের কোণে ড্রেইনের মতো দাগটি বেশি বড় থাকলে বুঝবেন পশুটি অসুস্থ। শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাওয়া পশুর অসুস্থতার লক্ষণ। পশুর মুখ এবং নাকে লালা লেগে থাকা ভালো লক্ষণ। শুকনা ও খসখসে মুখ পশুর অসুস্থতার লক্ষণ বহন করে। বামদিকে পশুর পেটের ঠিক পেছনের অংশটুকু ফুলে থাকলে বুঝবেন পশুর পেটের সমস্যা হয়েছে; এ ধরনের পশু কেনা থেকে বিরত থাকুন। সাধারণত পেটের এই অংশটুকু নরম থাকে; এখানে চাপ দিলে আঙুল বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই অংশটুকু কখনো শক্ত থাকে না। এই অংশটুকু শক্ত হয়ে থাকলে বুঝবেন গরুর কোনো সমস্যা আছে। তারপরও, কোরবানির পশু কিনে এনে একজন অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিলে ভালো হয়। তিনি গরুর শরীরের অবস্থা দেখে যেভাবে বলবেন, সেভাবে পশুর যতœ নিন; কোরবানির পশু নিয়ে ভয় অনেক খানি কমে যাবে।

লটকন উত্পাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের অপ্রচলিত, আকর্ষণীয়, ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ দেশীয় টক-মিষ্টি ফল লটকন। আশার খবর হচ্ছে, নরসিংদী, ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ দেশের অনেক স্থানেই লটকনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। তবে পুরো বাংলাদেশেই ফলটির বাণিজ্যিক চাষাবাদ সম্ভব। কেননা লটকন উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী। বর্ষাকালীন এ ফলটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইংরেজিতে বার্মিজ গ্রেপ নামে পরিচিত হলেও আমাদের দেশে এ ফলটি বুবি, বুগি, লটকা, লটকো, নটকো ইত্যাদি নামে পরিচিত। মার্চ মাসের দিকে লটকন গাছে ফুল আসে এবং ফল পরিপক্ব হতে চার-পাঁচ মাস সময় লাগে। লোভনীয় রঙ ও আকৃতির থোকা থোকা লটকন ঢাকাসহ সারা দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। ১০-১৫ বছর আগেও লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না। দামও ছিল কম। সেজন্য কেউ লটকনের বাগান করার চিন্তা করতেন না।
বর্তমানে এ ফলের চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়েছে। এমনকি অন্যান্য ফল চাষের তুলনায় লটকন চাষ বেশ সহজ এবং ফলনও ভালো হওয়ায় চাষিরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে লটকন বাজারে পাওয়া যায়। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কান্ডগুলোয় বেশি ফল আসে। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে পাঁচ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তাই সারা দেশেই (নিচু এলাকা বাদে) এর বাণিজ্যিক চাষ করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একটি পূর্ণ বয়স্ক লটকন গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে ১০০ কেজি পর্যন্ত লটকন সংগ্রহ করা সম্ভব। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করে নিয়েছে নরসিংদীর শিবপুরের লটকন। দেশের লটকন ইংল্যান্ড, কাতার, সৌদি আরবসহ নানা দেশে রফতানি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর লটকন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ২০-২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। এ বিষয়ে নরসিংদীর লটকন চাষীরা জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শে এবং ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিটি জেলায় লটকনের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করা যেতে পারে।
কৃষির ওপর নির্ভরশীল এলাকা ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক পরিবারের অর্থভাগ্য খুলেছে মৌসুমি ফল লটকন বিক্রি করে। কোনো ধরনের পরিচর্যা ছাড়াই প্রকৃতিগতভাবে জন্ম নেওয়া দেশীয় লটকন ফল (বুবি) বাগানের মালিকরা কয়েক দশক ধরে প্রতি মৌসুমে শুধু লটকন ফল বিক্রি করে ঘরে তুলছেন লাখ লাখ টাকা। উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ১০টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ৮০ হেক্টর জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে ছোট-বড় ২৫০টি লটকন ফলের বাগান রয়েছে। লটকন চাষ কয়েক দশক ধরে উপজেলায় কৃষিনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থিক চাহিদা পূরণসহ অনেকের সংসারে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা।
কৃষি অধিদফতরের বিভিন্ন সূত্র মতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ টন লটকন বিদেশে রফতানি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে চলতি অর্থবছরেও বিপুল পরিমাণ লটকন বিদেশে যাবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার টন লটকন উৎপাদন হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি ও বাউ লটকনের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি লটকন-১ ও বাউ লটকন-১ এখন কৃষক পর্যায়ে চাষ হচ্ছে।
লেখক ঃ এস এম মুকুল, বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক।

বাংলাদেশে মাছ উত্পাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মৎস্য উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশে। জানা গেছে, ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে চারটি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশের পরিবেশ মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান। দেশের জনগণ নিজেদের প্রয়োজনে মাছ চাষের প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসেছেন। নিজেদের পুকুরের মাছ খাওয়ার পাশাপাশি বাজার থেকে মাছ কেনার প্রবণতা বেড়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশই এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন মাছ চাষীরা। বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১-এ দেশের মাছের উৎপাদন ৪৫.০ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে যা বর্তমান উৎপাদনের চেয়ে ১০ লাখ টন বেশি। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ আহরণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৫তম। বঙ্গোপসাগরে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি ছাড়াও প্রায় ৫০০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরার আইনগত অধিকার পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বঙ্গোপসাগর থেকে মৎস্য আহরণ পর্যায়ক্রমে বাড়বে। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর অব্যবস্থাপনা ও অবহেলায় উৎপাদিত মাছের একটা বড় অংশ, প্রাায় ১০ লাখ টন নষ্ট বা অপচয় হয়ে যায়। এটা রোধ করতে পারলে মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে।
মাছ উৎপাদনে সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান দেয় মাছ। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিশ্বে পঞ্চম থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয়। বাংলাদেশের আগের দুটি অবস্থানে রয়েছে চীন ও ভারত। দেশে মোট কৃষিজ আয়ের ২৩ দশমিক ৮১ শতাংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান এখন তিন দশমিক ৫৭ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ১১ শতাংশের বেশি ১ দশমিক ৮২ কোটি মানুষ মৎস্য আহরণে স¤পৃক্ত। যার মধ্যে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ লাখ নারী।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে মৎস্য সেক্টরের অবদান অসামান্য। ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ মাছে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য ও স্লোগানে সরকারী-বেসরকারীভাবে দেশব্যাপী ২২-২৮ জুলাই ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৮’ উদযাপিত হয়েছে। সম্প্রতি মৎস্য অধিদফতরের সেমিনার হলে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় দেশের মানুষ গড়ে ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মৎস্য গ্রহণ করছেন। জাটকা নিধন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ায় ২০১৭-১৮ সালে প্রায় পাঁচ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০১৭-১৮ সালে প্রায় ৬৯ হাজার টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের যথাযথ উদ্যোগে ২০১৬-১৭ অর্থবছর ৬৮ হাজার ৩০৫ টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানির মাধ্যমে আয় হয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। এর আগে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ৪১ হাজার টন। সরকারের উন্নয়নমুখী বহুবিধ উদ্যোগ ও সেবার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছর মাছ উৎপাদন ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টন। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা সরকারের।
লেখক ঃ এসএম মুকুল

দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক তিতির পালন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ তিতির পাখি গৃহপালিত পাখির মতোই। হাঁস-মুরগির মতোই তা পালিত হয়ে থাকে। তিতির পাখি গ্রামাঞ্চলে ‘চায়না মুরগি’ নামে পরিচিত। তবে দিন দিন তা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ তিতির পাখি পালনে লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আগমন ঃ তিতির পাখি মূলত আফ্রিকান। ইংরেজদের হাত ধরে এ পাখি ইউরোপ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আসে। বিপন্ন প্রায় ঃ বর্তমানে আইইউসিএন এ প্রজাতিকে আশঙ্কাহীন বলে ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশে এরা প্রায় বিপন্ন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে প্রজাতিটি সংরক্ষিত। গত ৩ দশক আগেও তিতির পাখি গ্রামাঞ্চলে দেশি মুরগির সঙ্গে চলাফেরা করতো। কিন্ত হঠাৎ করেই এ পাখি আর দেখা যায় না। বর্তমানে এ পাখি গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে না থেকে ঢাকার পাখি বিতানে দেখা যায়। সেই খাঁচার প্রতিটি তিতির পাখি ১ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
উদ্যোগ ঃ ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি খামারে তিতির পাখি পালন, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের উদ্যোগে তিতির পাখি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অধ্যাপক ড. সুবাস ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন ও তা পালনের সব ধাপ এই গবেষণা খামারে সম্পন্ন করেছেন। বিতরণ ঃ দেশের সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে বিনামূল্যে পাখি বিতরণ করছেন। এখন উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিতির পালনকে ছড়িয়ে দিতেও কাজ করছেন ড. সুবাস। ইতোমধ্যে তিতির পালনের জন্য খামারিরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।
লালন-পালন ঃ দেশি মুরগির মতোই এদের লালন-পালন করা যায়। তিতির পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্য পাখির তুলনায় বেশি। সংক্রমণ বা পরজীবী সহজে আক্রান্ত করতে পারে না। আলাদা কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ দেওয়ারও প্রয়োজন হয় না। এমনকি এদের সম্পূরক খাদ্যের চাহিদাও কম। প্রতিকূল পরিবেশে এরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। মাংস উৎপাদন ঃ দেশি মুরগি যেখানে ৬ মাসে সর্বোচ্চ ১ কেজি ওজনের হয়, সেখানে তিতির পাখি দেড় কেজি বা তার বেশিও হয়ে থাকে। আবার একটি দেশি মুরগি বছরে ৫০-৬০টা ডিম দেয়, একটি তিতির পাখি বছরে প্রায় ১০০-১২০টি ডিম দেয়। লাভজনক ঃ তিতির অত্যধিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন পাখি। এছাড়া এর বাজার মূল্য দেশি হাঁস-মুরগির চেয়ে অনেক বেশি। তাই এটি লালন-পালন করা দেশি মুরগির চেয়ে লাভজনক। তিতির পাখি পালন দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন সহায়ক তেমনি বিপন্নপ্রায় এ প্রজাতির সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখবে।

চুয়াডাঙ্গায় ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে পাট চাষ!

আব্দুর রহমান অনিক ॥ ক্রমাগত লোকসানে পড়ে দিনে দিনে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে চুয়াডাঙ্গার পাট চাষিরা। গতবছরের তুলনায় চলতি বছর অর্ধেকে নেমে এসেছে পাট চাষ। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, পাট পচানোর জন্য পানির ক্রমাগত অপ্রতুলতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে চাষিরা। আর পাটের পরিবর্তে অর্থকরী ফসল হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে ভুট্টা, ধান ও সবজি চাষ। এভাবে চলতে থাকলে সোনালি আঁশখ্যাত পাট চাষ একদিন জেলা থেকে বিলুপ্তি হবার আশংকা রয়েছে। গত বছরে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হলেও চলতি বছরে তা অর্ধেকেরও নীচে নেমে এসেছে। জানাগেছে, পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী আঁশ উৎপাদনকারী অর্থকরী ফসল। পাটচাষ ও পাট শিল্পের সাথে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জড়িত। স্বাধীনতার পরও প্রায় দেড় যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের অবদানই ছিল মুখ্য। পাট উৎপাদনকারী পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান সবচেয়ে ভালো এবং উৎপাদনের বিবেচনায়য় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ। জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে পাটের দরপতন, উৎপাদন খরচ বেশি ও পাট ছড়ানো পানির অভাবে কৃষক পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন। এক বিঘা জমিতে সাত-আট মণ পাট উৎপাদন হয়। আর প্রতি মণ পাট সর্বোচ্চ ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা দরে বিক্রি হয়। এক্ষেত্রে বাজারমূল্য হিসেবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষক পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছেন। ষাটের দশকেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাট ক্রয় কেন্দ্র ছিলো, আবার বড় বড় জুট মিলের চাহিদা পূরণে কৃষকরা পাট চাষে ব্যাপক লাভবান হতেন। অপরদিকে ক্রয় কেন্দ্রগুলো পাট সংগ্রহ করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করতো। ফলে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে কৃষকরাও ঝুঁকে পড়তো পাট চাষে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলার ৪টি উপজেলায় সর্বমোট পাট চাষ হয়েছে ৯ হাজার ৩শত ৯৪ হেক্টর জমি। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ২৫০ হেক্টর, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৩ হাজার ৯৪ হেক্টর, দামুড়হুদা উপজেলায় ৫ হাজার ২শত ৫০ হেক্টর এবং জীবননগর উপজেলায় মাত্র ৮শত হেক্টর জমি। গত বছর জেলায় পাট চাষ হয়েছিলো ২২ হাজার ৭০ হেক্টর । গত বছরের চাইতে এ বছর পাট চাষ কম হয়েছে ১২ হাজার ৬শত ৭৬ হেক্টর, যা অর্ধেকেরও কম। জেলায় এ বছর ২২ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তার ধারে কাছেও নেই লক্ষ্যমাত্রা। বর্ষা কাল শেষ হয়ে এলেও তেমন বৃষ্টির দেখা নেই। এলাকার বেশির ভাগ খাল, বিল শুকিয়ে যাওয়ায় অল্পসংখ্যক কৃষক, যারা পাট চাষ করছেন তারা চিন্তিত। পাট ঠিকমতো পচাতে না পারলে পাটের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চাষিরা জানালেন-যখন পাট চাষ করে ঘরে তোলে তখন পাটের দাম থাকে ৯শত থেকে ১২শত টাকা। এক বিঘা জমিতে পাট হয় ৭ থেকে ৮ মন। সে হিসেবে এক বিঘা জমির পাট বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকায়। অথচ এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে গিয়ে খরচ হয় সর্বনিম্ন ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় সমস্যা পাট কেটে জাগ দেয়া। তার ওপর পাট চাষ করে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। পাট চাষ করে চাষিরা আর এর সুবিধা ভোগ করে আড়ৎ ব্যবসায়ীসহ বড় বড় মহাজনেরা। দেশে এখন অনেক ধরণের চাষ উঠেছে। এক বিঘা জমিতে বছরে তিন বার চাষাবাদ করার মত ফসল আছে। লোকশান জেনে কেউ পাট চাষ করবে কেন। যতটুকু চাষ হয়েছে জ্বালানির পাটকাটি চাহিদা মেটার জন্য। তার ওপর কৃষি বিভাগের পাট চাষের ব্যাপারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারিভাবে জেলাতে নেই কোনো পাট ক্রয় কেন্দ্র। চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক নাঈম আস শাকিব বলেন, ধানের দাম ভালো পাওয়ায় পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে চাষিরা। তার ওপর সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ার কারণে পাট জাগ দেবার জায়গার সমস্যাতো আছেই। এছাড়াও বর্তমানে ধান পাটের চাষের চাইতে কৃষকেরা সবজি চাষে বেশি আগ্রহী। যার কারণে জেলাতে পাট চাষ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পাট চাষ একদিন আশীর্বাদ স্বরূপ ছিলো। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিশাল সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। বিশ্ব বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পাটকে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জীবনযাত্রার মান হবে উন্নত, আর পাট ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য

চাহিদার মাত্র ২ ভাগ পূরণ হয় দেশে উপাদিত তুলায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চলতি মৌসুমে (২০১৮-২০১৯) তুলা উন্নয়ন বোর্ড সারাদেশে ৫০ হাজার হেক্টরে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। আর তুলা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ১৬০ বেল। দেশে গার্মেন্টস শিল্পের ব্যাপক প্রসারের জন্য প্রতিবছর তুলার চাহিদা বাড়ছে। তুলার চাহিদা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে দেশে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে তুলার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭৫ লাখ বেল। তুলা উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে (২০১৮-১৯) যশোর জোনে ৩ হাজার ৫’শ হেক্টরে সমভূমির তুলা চাষ করে ২৩ হাজার ৬৫ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। ঝিনাইদহ জোনে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৪ হাজার ৬’শ হেক্টরে। তুলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৩১৪ বেল। রাজশাহী জোনে ২৮’শ হেক্টরে তুলা চায় করে ১৮ হাজার ৪৫২ বেল তুলা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জোনে ৪ হাজার ৬’শ হেক্টরে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। তুলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৩১৪ বেল। বগুড়া জোনে ২২’শ ৫০ হেক্টরে তুলা চাষ করে ১৪ হাজার ৮২৮ বেল তুলা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। কুষ্টিয়া জোনে তুলা চাষ লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৪ হাজার ৬’শ হেক্টরে। তুলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ৩১৪ বেল। রংপুর জোনে ২৬’শ হেক্টরে তুলা চাষ করে ১৭ হাজার ১৩৪ বেল তুলা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁও জোনে ১৭’শ হেক্টরে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। তুলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ২০৩ বেল। ময়মনসিংহ জোনে ২১’শ হেক্টরে তুলা চাষ করে ১৩ হাজার ৮৩৯ বেল তুলা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। ঢাকা জোনে তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ১৭’শ হেক্টরে। তুলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ২০৩ বেল। তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ১১’শ ৫০ হেক্টরে সমভূমির তুলা চাষ করে ৬ হাজার ৯২১ বেল তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় ১৮ হাজার ৫’শ হেক্টরে পাহাড়ি জাতের তুলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। পাহাড়ি জাতের তুলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার ৫৭৫ বেল। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন সূত্রে জানা যায়, গত মৌসুমে (২০১৭-১৮) সারাদেশে ২৬ হাজার ৩০০ হেক্টরে সমভূমির ও ১৬ হাজার ৭৫০ হেক্টরে পাহাড়ি জাতের তুলা চাষ করা হয়েছিল। মোট তুলা উৎপাদন হয়েছিল এক লাখ ৬৫ হাজার বেল। ১৯৭৭ সালে আমেরিকান ডেল্টাপাইন জাতের তুলা চাষের মধ্য দিয়ে নতুন করে তুলা চাষের যাত্রা শুরু হয়। চাষ সফল হয়। আস্তে আস্তে চাষ সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে, বিশেষ করে দক্ষিণ পশ্চিমের জেলাগুলোতে। দেশে উৎপাদিত তুলার ৭০ ভাগই উৎপাদন হয় কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও মাগুরা জেলাতে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন জানান, কম জমিতে তুলা চাষ করে বেশি উৎপাদনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিটি জাতের তুলা চাষের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ভারত থেকে বিটি জাতের তুলা বীজ এনে ট্রায়াল চলছে। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হাইব্রিড জাত গুলোর চাষ প্রচলন করা হচ্ছে। বর্তমানে তুলার বিঘা প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে বিঘা প্রতি ৮-১০ মন ফলন হতো। বর্তমান বিঘা প্রতি ১৫-১৬ মন পর্যন্ত ফলন হচ্ছে বলে তিনি জানান। এখন তুলা চাষে ৭ মাস সময় লাগে। আমন ধান কাটার পর ওই জমিতে স্বল্প মেয়াদী জাতের তুলা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খরা প্রবণ এলাকা গুলোতেও পতিত জমিতে তুলা চাষের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ফলন বাড়াতে গাছের অঙ্গ ছাঁটাই

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফল গাছে প্রচুর পরিমাণে ফুল-ফল উৎপাদনক্ষম শাখা-প্রশাখার সংখ্যা বাড়ানো এবং ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি করতে ছাঁটাইয়ের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের শহর-নগর-গ্রামে যেদিকেই তাকানো যায় ফলের গাছ চোখে পড়বেই। এসব গাছের অধিকাংশই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা। খুব কমসংখ্যক ফলগাছ অঙ্গ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বৃদ্ধির সুযোগ পায়। ফলগাছ রোপণই আসল কথা নয়। রোপণ থেকে শুরু করে ফল ধারণ পর্যন্ত ফল গাছের বিভিন্ন অঙ্গ ছাঁটাই ফল গাছ ব্যবস্থাপনার একটি অন্যতম কাজ। মূলত দুটি উদ্দেশ্যে ফল গাছের অঙ্গ ছাঁটাই করা হয়ে থাকে। প্রথমত, অফলন্ত ফলগাছকে একটি নিদির্ষ্ট আকার আকৃতি দেয়া, দ্বিতীয়ত, অফলন্ত ও ফলন্ত ফলগাছের অপ্রয়োজনীয় দুবর্ল, চিকন, নরম, ভাঙ্গা ও মরা ডাল-পালা এবং রোগ ও পোকা আক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করে গাছের ভেতরের দিকে আলো-বাতাস চলাচল স্বাভাবিক রাখা। এ দুটি উদ্দেশ্য ছাড়াও আরো কিছু কারণে ফল গাছ ছাঁটাই করতে হয়। যেমন- * ফলগাছটি যদি মার্তৃগাছ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ফলগাছ থেকে বেশি পরিমাণে সায়ন উৎপাদন করা * ফল গাছে প্রচুর পরিমাণে ফুল-ফল উৎপাদনক্ষম শাখা-প্রশাখার সংখ্যা বাড়ানো এবং ফলের গুণগতমান বৃদ্ধি করা * ঝড় বা প্রবল বাতাসে যেন ফলগাছ সহজে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য গাছকে সুগঠিত ও মজবুত অবকাঠামো প্রদান করা * ফল গাছের বিভিন্ন পরিচর্যা যেমন- বালাইনাশক ¯েপ্র করা, সায়ন সংগ্রহ করা ইত্যাদি কাজ সহজ করা * যেসব ফল গাছে ফল ধারণ সমস্যা আছে, সেসব গাছের ফল ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে নতুন শাখা-প্রশাখা গজানোর ব্যবস্থা করা * এক বছর পর পর যেসব গাছে ফল ধরে সেসব গাছের একান্তর ক্রমিক ফলনের প্রভাব কমানো বা ফল ধরার ব্যবস্থা করা * যেসব শাখা-প্রশাখা অন্য শাখা-প্রশাখার ভেতরে ঢুকে যায় বা নিম্নমুখী হয় সেগুলো ছাঁটাই করে গাছকে ঝোপালো অবস্থা থেকে মুক্ত রাখা। ফল গাছের বিভিন্ন অঙ্গ যেমনÑ ডাল, পাতা, ছাল বা বাকল, ফুল, ফল ও শিকড় বিভিন্ন কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন ফল গাছের বিভিন্ন বয়সে জাত ও বৃদ্ধির স্বভাব অনুযায়ী ছাঁটাই করতে হয়। ফল ধরার আগেই ফল গাছের কাঠামোগত আকৃতি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য হচ্ছে গাছের শীর্ষ ছাঁটাই করে গাছকে খাটো রাখা। এতে গাছে সার প্রয়োগ, সেচ প্রদান, ¯েপ্র করা এবং সহজে ফল সংগ্রহসহ অন্যান্য পরিচর্যা করা যায়। এ ছাড়া গাছে যদি ৪ থেকে ৭টি শাখা-প্রশাখা থাকে তাহলে গাছ যান্ত্রিকভাবেও দৃঢ় ও খোলা-মেলা হয়। গাছের ভেতরের দিকে এমন কিছু শাখা-প্রশাখা গজায় যেগুলো থেকে কোন ফলন পাওয়া যায় না, সেগুলোও ছাঁটাই করা উচিত। কোন কোন ফল গাছের গোড়ার দিকে কিছু কিছু কুশি বা নতুন শাখা বের হতে দেখা যায়, সেগুলো নিয়মিতভাবে ছাঁটাই করতে হয়। যেমন- ডালিম, পেয়ারা, লেবু ও কাঁঠাল গাছের গোড়ায় দুই-তিন সপ্তাহ পর পর বের হওয়া কুশিগুলো ছাঁটাই করতে হয়। ছাঁটাই করার সময় লক্ষ্য রাখতে হয়, গাছের সতেজতা কেমন, বয়স কত এবং জাত ও বৃদ্ধির স্বভাব কেমন। কম বয়সী ফল গাছে যথাসম্ভব কম ছাঁটাই বা হালকা ছাঁটাই করতে হয়। তবে কম বা বেশি যে বয়সেরই হোক না কেন গাছে মরা বা ডাঙ্গা এবং রোগ-পোকা আক্রান্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাইয়ের সময় কিছুটা সুস্থ অংশসহ ছাঁটাই করতে হয়। মূল কান্ড এবং মোটা শাখা কখনোই ছাঁটাই করা ঠিক নয়। বড় মোটা শাখা কাটার সময় নির্দিষ্ট জায়গা থেকে প্রায় ১ ফুট বা ৩০ সেন্টিমিটার দূরে নিচের দিক থেকে কাটা শুরু করতে হয়। কাটার গভীরতা নিভর্র করে কর্তিত শাখার অংশ নিচের দিকে বেঁকে আসা পর্যন্ত। এরপর শাখার উপরের দিকে প্রথম কাটার স্থান থেকে ১ ইঞ্চি বা আড়াই সেন্টিমিটার দূরে দ্বিতীয় কাটা দিতে হয়। এতে কাটা শাখা বাকল বা ছালের সাথে ঝুলে থাকে না। কাটা জায়গায় আলকাতরা বা ছত্রাকনাশক লাগাতে হয়। চিকন শাখাও নিচের দিক থেকে কাটলে অকতির্ত অংশের ছাল বা বাকল উঠে আসে না। কাটার সময় সুস্থ-সবল কুঁড়ি বা পবর্সন্ধির ঠিক উপরেই শাখা কাটা উচিত। তবে গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের জন্য শাখার কুঁড়ি বা পবর্সন্ধির নিচেই কাটতে হয়।
ফল গাছ ছাঁইয়ের জন্য নিদির্ষ্ট সময় ও মৌসুমের প্রতি অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হয়। কারণ অসময়ে ছাঁটাই করলে সুফল পাওয়ার বদলে গাছে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কাঙ্খিত ফলন নাও পাওয়া যেতে পারে। বর্ষার শেষে এবং শীতের আগে ফল গাছে ছাঁটাই করা উচিত। তবে ফল সংগ্রহের পরই ছাঁটাই করা সবচেয়ে ভালো। গাছে ফুল আসার আগে আগে বা ফল ধরা অবস্থায় শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করা ঠিক নয়। তবে নিদির্ষ্টসংখ্যক ফলধারণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ফুল ও ফল ছাঁটাই করা যেতে পারে। এ ছাড়া খরা, দীর্ঘ শুকনো মৌসুম বা শীতের সময় কখনোই ছাঁটাই করা উচিত নয়। বর্ষার সময় বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে ছাঁটাই না করাই ভালো। বাংলাদেশে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফল পাওয়া যায়। এসব ফল গাছ থেকে সংগ্রহ করার পর অথবা শীতের আগেই অথবা যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, তাহলে অঙ্গ ছাঁটাই করা হয়। এতে সুস্থ-সবল ফল গাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কয়েকটি জনপ্রিয় ও প্রচলিত ফলগাছের অঙ্গ ছাঁটাই সম্পর্কে সবারই কিছুটা ধারণা থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল আম। বাগান আকারে ছাড়াও গ্রামে এবং অনেকের বাড়িতেই ছোট-বড় জাতের আম গাছ চোখে পড়ে। সঠিক সময়ে সঠিকভাবে ছাঁটাই এবং অন্যান্য পরিচর্যা করলে এসব আম গাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। জুন মাস থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়ে আম সংগ্রহের পরপরই বোঁটার উপরের কিছুটা অংশসহ গাছ থেকে বোঁটা ছাঁটাই করে ফেলা উচিত। এতে নতুন যে শাখা গজায় তার বয়স ৬-৭ মাস বয়স হলেই পরের মৌসুমে মুকুল আসার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ ছাড়া রোগ ও পোকা আক্রান্ত, মরা, আধামরা, দুর্বল-চিকন শাখা ছাঁটাই করতে হয়। গাছের নিচের আগাছা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোদাল দিয়ে হালকা করে কোপালে কিছু কিছু শিকড় কাটা পড়ে। এতে আম গাছের একান্তর ক্রমিক ফল ধারণ সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সী আম গাছে বেশি ছাঁটাই করলে কলম করার জন্য ভালো সায়ন পাওয়া যায়। জুলাই-আগস্ট মাসে কাঁঠাল সংগ্রহের পর কাঁঠাল গাছের দুর্বল, মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করতে হয়। সেই সঙ্গে ফলের বোঁটা এবং কান্ড ও গোড়া থেকে বের হওয়া নতুন শাখা ছাঁটাই করতে হয়। অনেকেই ছাগলের খাদ্য হিসেবে বছরের যে কোনো সময়ই কাঁঠাল পাতার জন্য ছোট ছোট ডালসহ ছাঁটাই করে থাকেন। এতে গাছের খাদ্য উৎপাদন কমে যায় ও গাছ দুর্বল হয়ে ফল ধারণও কমে যায়। লিচুর ফল সংগ্রহের সময় সাধারণত কিছুটা শাখাসহ ভাঙা হয়। কারণ লিচুর ফুল ফোটা অনেকাংশই নির্ভর করে নতুন শাখা-প্রশাখার ওপর। তবে চায়না-৩ জাতের বেলায় বেশি শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই না করা ভালো। কারণ এ জাতটির নতুন শাখা-প্রশাখায় আমাদের দেশের আবহাওয়ায় খুব বেশি ফুল-ফল ধরে না। এ জন্য দুর্বল, মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত ক্ষতিগ্রস্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করা ছাড়া চায়না-৩ জাতের লিচু সংগ্রহের সময় যতটা সম্ভব কম শাখা-প্রশাখা ভাঙা উচিত।
লেবুর কলম বা চারা রোপণের পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত ২-৩ মাস পর পর শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে পাতলা করে দিতে হয়। ফল সংগ্রহ করার পর ফলন্ত শাখা-প্রশাখাগুলো ছাঁটাই করে দিলে নতুন গজানো শাখায় পরের মৌসুমে বেশি ফলন পাওয়া যায়। এ ছাড়া ২-৩ সপ্তাহ পর পর গাছের গোড়ার কুশি এবং গাছের দুর্বল, শুকনো বা মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করতে হয়। নারিকেল গাছের উপরের দিকে পুষ্পমঞ্জরির সঙ্গে যে জালের মতো বাদামি অংশ থাকে সেগুলো শুকিয়ে গেলে বা রোগ-পোকার আক্রমণ হলেই পরিষ্কার করতে হয়। নারিকেল গাছের সবুজ পাতা এবং পুষ্পমঞ্জরির জাল কখনোই কেটে ফেলা উচিত নয়। গাছে যদি ফল সংখ্যা বেশি হয়, তাহলে চার মাস বয়সের কিছু কচি ডাব পাতলাকরণ পদ্ধতিতে ছাঁটাই করে দিতে হয়। এতে বাকি ফলগুলো ভালোভাবে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। বর্ষার আগে বা পরে গাছ পরিষ্কার করতে হয়। প্রাকৃতিকভাবেই পেয়ারা গাছ ঝোপালো হয়। এ জন্য মূল কান্ড ছাড়া গাছের গোড়া থেকে বের হওয়া শাখা কেটে দিতে হয়। ফল সংগ্রহের পর শাখা-প্রশাখাগুলোর আগা ছাঁটাই করতে হয়। গাছের অন্য শাখা-প্রশাখাও এমনভাবে ছাঁটাই করতে হয় যেন দুপুর বেলা গাছের নিচে কিছু আলো কিছু ছায়া পড়ে। অঙ্গ ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে ফল গাছকে সুস্থ-সবল রেখে বেশি পরিমাণে ফলন পাওয়া সম্ভব। এ জন্য বিভিন্ন ফলের জাত ও বয়স অনুয়ায়ী কখন কিভাবে অঙ্গ ছাঁটাই করলে গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও ফল ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, সে সম্পর্কে আরও বিস্তারিত পরামর্শের জন্য নিকটস্থ কৃষি অফিস বা হর্টিকালচার সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
লেখক ঃ উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

সম্ভাবনাময় মেস্তা ফসল চুকুর

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চুকুর পাতা রান্না করে তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। এর মাংসল বৃতি (শাঁস) কনফেকশনারি খাদ্যসামগ্রী যেমন-জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চা ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। চুকুরের পাতা ও ফলে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কেরোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান থাকে। চুকুরের ফলে পেকটিন থাকায় শুধু চিনি ও চুকাই দিয়ে সহজেই জ্যাম তৈরি করা যায়। পাটজাতীয় মেস্তা ফসল সাধারণত দুই ধরনের হয়। আঁশের জন্য এবং সবজি মেস্তার জন্য। সবজি মেস্তার ইংরেজি নাম রোসেলা বা সরেল। এর পাতা ও ফলের মাংসল বৃতি (শাঁস) টক এবং সুস্বাদু। পৃথিবীর অনেক দেশেই সবজি মেস্তার বাণিজ্যিক চাষ করা হয় এবং খাদ্য হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। উপগুল্মজাতীয় এই উদ্ভিদের জনপ্রিয় নাম চুকুর। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন নামে ফলটি পরিচিত। রাজশাহীতে চুকাই, খুলনায় ও সাতক্ষীরায় অম্লমধু, ধামরাই এবং মানিকগঞ্জে চুকুল, সিলেটে হইলফা, কুমিল্লায় মেডশ, চাকমারা বলেন আমিলা, মগরা চেনেন পুং ও ত্রিপুরারা উতমুখরই নামে। আবার কেউ কেউ বলেন হুগ্নিমুখুই। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একে বলা হয় খড়গুলা। সব শব্দের সরল বাংলা অর্থ টক। ফলটির স্বাদ তার নামের মধ্যেই প্রকাশিত। পাবর্ত্যাঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের প্রায় প্রত্যেকের ঘরের আঙিনা বা বাণিজ্যিকভাবে মেস্তার চাষ করতে দেখা যায়। যে কোনো জেলার উঁচু এবং মধ্যম উঁচু জমিতে মেস্তার চাষ করা যায়। দো-আঁশ এবং বেলে দোÑআঁশ মাটি মেস্তা চাষের উপযোগী। তা ছাড়া পাহাড়ি এলাকায়, বাড়ির আঙিনা ও আশপাশের জমি, অনুবর্র আবাদযোগ্য প্রান্তিক জমিতে মেস্তা চাষ করা যায়। ঢাকা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর, কুমিল্লা, সিলেট ও অন্যান্য জেলার উষর জমিতে মেস্তার ফলন অধিক হয়। তা ছাড়া যে সব উঁচু বা টান জমিতে বর্ষার পানি দাঁড়ায় না সেখানেও মেস্তার আবাদ করা যায়। তবে মেস্তা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। খরা সহনশীল ও নেমাটোড প্রতিরোধী মেস্তার চাষে কিছুটা সুবিধা হলো তা শুষ্ক অঞ্চলের প্রান্তিক জমিতে আবাদ করা যায় এবং স্পাইরাল বোরার ও শিকড়ে গিঁট রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয় না। মেস্তা বেশ খরা সহিষ্ণু এবং পাটের তুলনায় কম উবর্র জমিতে স্বল্প খরচে এর চাষ করা যায়।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বন্য প্রজাতির মেস্তা (এম-৭১৫) থেকে বিশুদ্ধ সারি নিবার্চন ও গবেষণার মাধ্যমে অধিক ফলনশীল সবজি হিসেবে খাবার উপযোগী একটি উন্নত মেস্তার জাত উদ্ভাবন করেছে এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কতৃর্ক ২০১০ সালে বিজেআরআই মেস্তা-২ (সবজি মেস্তা-১) নামে অবমুক্ত করা হয়েছে। এ জাতের চলতি নাম চুকুর হিসেবে সারাদেশে পরিচিত। চুকুরের কান্ড তামাটে রঙের এবং শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট। কান্ড ও পাতায় কোনো কাঁটা থাকে না। পাতা আঙ্গুল আকৃতির (খন্ডিত), পাতার কিনারা ঢেউ খেলানো, গাঢ় সবুজ এবং পরিণত অবস্থায় তামাটে লাল রং ধারণ করে। চুকুরের পাতা স্বাদে টক ও সুস্বাদু। পাতার বৃন্ত ১০-১১ সেমি। ১৩০-১৪০ দিনে গাছে ফুল আসে। ফুলের ব্যাস ৫-৭ মিমি, দল হলদে, গোড়ায় মেরুন দাগ রয়েছে। চুকুরের একটি গাছে ৪০-৬০টি ফল ধরে। ফল অপ্রকৃত, ক্যাপসুল আকৃতির, ওপরের দিকে চোখা ও রোমমুক্ত এবং বৃতি পুরু ও মাংসালো। এক হেক্টর জমিতে ৭,৭৮৯ কেজি সবুজ পাতা এবং ২০০০-২০৫৫ কেজি বৃতি উৎপাদন হয়। বীজ গাঢ় বাদামী, রেমিফমর্ ও কিডনি আকারের। চুকুরের ১০০০টি বীজের ওজন প্রায় ২০ গ্রাম।
চুকুর পাতা রান্না করে তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। এর মাংসল বৃতি (শাঁস) কনফেকশনারি খাদ্যসামগ্রী যেমন-জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চা ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। চুকুরের পাতা ও ফলে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কেরোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান থাকে। চুকুরের ফলে পেকটিন থাকায় শুধু চিনি ও চুকাই দিয়ে সহজেই জ্যাম তৈরি করা যায়, আলাদাভাবে পেকটিন মেশাতে হয় না। অস্ট্রেলিয়া, বার্মা এবং ত্রিনিদাদে এই ফলটি জ্যাম তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মিয়ানমারের জনপ্রিয় সবজি হিসেবে চুকুর পরিচিত। ইতালি, আফ্রিকা ও থাইল্যান্ডে চুকুর পাতা ভেষজ চা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। মেস্তার খৈল গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বীজ থেকে ২০% খাবার তৈল উৎপাদন হয়। মেস্তার তেলে ১৫.৮% পালসিটিক এসিড, ৬.৮% স্টিয়ারিক এসিড, ৫১% অলিক এসিড ও ২৬.৮ লিনোলিক এসিড থাকে। মেস্তার তৈল পৃথিবীর অনেক দেশে সাবান তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এবং খাবার তেলে মেশানো হয়। পাটের চেয়ে সবজি মেস্তার বীজ বড় হওয়ায় জমি চাষ করার সময় মাটি তত মিহি না করলেও চলে। তবে এর শিকড় মাটির বেশ গভীর থেকেও খাদ্যরস সংগ্রহ করে, তাই জমি গভীর করে চাষ দেয়া ভালো। জমির প্রকারভেদে আড়াআড়িভাবে দুই-তিনবার চাষ ও মই দিতে হবে। আগাছা বাছাই করে ফেলতে হবে। প্রতি হেক্টর জমির জন্য ইউরিয়া ১৩২ কেজি, টিএসপি ২৫ কেজি এবং এমওপি ৪০ কেজি পরিমাণ সার দরকার। তবে শুকনা গোবর সার ব্যবহার করা হলে প্রতি হাজার কেজি শুকনো গোবর সার ব্যবহারের জন্য ১১ কেজি ইউরিয়া, ১০ কেজি টিএসপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার নিধাির্রত মাত্রার চেয়ে কম প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে দস্তা ও গন্ধকের অভাব দেখা না গেলে জিপসাম ও সালফেট সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন নেই। বীজ সারিতে ও ছিটিয়ে বপন করা যায়। ৩০ সেমি পর পর সারি করে বীজ বুনতে হবে। সবজি মেস্তা বৈশাখের প্রথম থেকে শ্রাবণের শেষ পর্যন্ত সময় বপন করা যায়। ছিটিয়ে বপন পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রতি হেক্টরে ১২-১৪ কেজি এবং সারিতে বপন পদ্ধতির ক্ষেত্রে ১০-১২ কেজি পরিমাণ বীজ প্রয়োজন হয়। রোগ দমনের জন্য রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। সম্ভব হলে বীজ বপনের আগে শোধন করে নিতে হবে।
চারা গজানোর পর প্রয়োজন অনুসারে নিড়ানি ও গাছ পাতলা করে দিতে হবে। পাটের চেয়ে সবজি মেস্তার নিড়ানি ও পরিচর্যা কম লাগে। বাংলাদেশে খুব সহজে ও অনায়াসে এর চাষ করা যায়। বপনের ১৩০-১৫০ দিন পর সবজি মেস্তার ফুল আসা শুরু হয়। ফুল আসার পরে উপযুক্ত সময়ে ফল পরিপুষ্ট হলে হাত দিয়ে ফল ছিঁড়ে অথবা মাংসল বৃতি (শাঁস) সংগ্রহ করা হয়। এই বৃতি (শাঁস) সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রী তৈরির জন্য কনফেকশনারিতে প্রেরণ করা হয় বা রান্না করে খাওয়ার জন্য সংগ্রহ করা হয়। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের বাজারগুলোতে টক পাতা ও ফল হিসেবে সবজি মেস্তা বিক্রি করা হয়।
লেখক ঃ কৃষিবিদ মো. আল-মামুন, ঊধ্বর্তন বৈজ্ঞানিক কমর্কতা, প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

স্ট্রবেরি চাষ করতে চাইলে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গবেষকদের প্রচেষ্টায় এদেশে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু জাতের স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় স্ট্রবেরি ফলানো সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় শীত বেশি পড়ে ও বেশিদিন থাকে সেসব এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ করা যেতে পারে। মাটি ঃ বেলে ও  দোঁ-আশ মাটিতে প্রচুর জৈব সার প্রয়োগ করে স্ট্রবেরি ফলানো যায়। যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো সম্ভব নয়। চারা ঃ স্ট্রবেরির চারা এখনও তেমন সহজে পাওয়া যায় না। কোনো কোনো নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা যায়। এছাড়া স্ট্রবেরি গাছের গোড়া থেকে বেশকিছু লম্বা লম্বা লতা মাটির উপর দিয়ে লতিয়ে যায়। মাটির সংস্পর্শে লতার গিট থেকে শেকড় গজায়। শেকড়যুক্ত গিট কেটে নিয়ে মাটিতে পুঁতে দিলে নতুন চারা তৈরি হয়। অর্ধেক মাটি অর্ধেক গোবর সার মিশিয়ে পলিব্যাগে ভরে একটি করে শেকড়যুক্ত গিটসহ লতা পুঁতে দিতে হয়। এক্ষেত্রে একটি গাছ থেকে ১৮-২০টি চারা তৈরি করা সম্ভব। জমি ঃ জমি ভালোভাবে চাষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার গভীর করে জমি চাষ দিতে হয়। যেহেতু স্ট্রবেরি গাছের শেকড় মাটির উপর দিকে থাকে; সেজন্য মাটি ঝুরঝুরা করে নির্ধারিত মাত্রায় সার মাটিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

রোপণ ঃ স্ট্রবেরির চারা মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়। তবে নভেম্বর মাস স্ট্রবেরি চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে ভালো। জমি  তৈরির পর লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ৫০ সেন্টিমিটার ও প্রতি সারিতে ৩০  সেন্টিমিটার দূরে দূরে স্ট্রবেরির চারা লাগাতে হয়। সেচ ঃ বৃষ্টি হলে ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে। না হলে গাছ পঁচে যাবে। তবে ফল ধরা শুরু হলে ২-৩ দিন পর পরই সেচ দিতে হবে। সার ঃ প্রতি একরে ৫০-৬০ কেজি ইউরিয়া, ৭০ কেজি টিএসপি এবং ৮০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এসব সার একভাগ দিতে হয় ফুল আসার একমাস আগে এবং অন্য ভাগ দিতে হয় ফুল ফোটার সময়। যতœ ঃ গাছ লাগানোর পর গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো জমি ঢেকে ফেলায় ফলন ভালো হয় না। সেজন্য গাছের গোড়ায় খড় বা পলিথিন বিছিয়ে দিতে হয়। পলিথিন সিট ৩০ সেন্টিমিটার পর গোলাকার ছিদ্র করে স্ট্রবেরি গাছের ঝোপকে মুঠো করে ঢুকিয়ে দিতে হয়। বেশি ফলন ও তাড়াতাড়ি ফল পেতে হরমোন গাছ পাতায় ¯েপ্র করা যেতে পারে। ফল ঃ ফল পুরো পাকলে লাল হয়ে যায়। বিক্রির জন্য পুরো লাল হওয়ার দরকার নেই। ফলগুলো শক্ত থাকা অবস্থায় তুলতে হবে। ফল তুলতে হবে বোটাসহ। ফল তোলার পর ১০-১২ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। গড়ে প্রতি গাছে ১৫০-২০০ গ্রাম ফল ধরে।

৩ মৌসুমেই কলা চাষ করা যায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কলা উপকারী ফল। সকাল-সন্ধ্যার নাস্তায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমে অর্থাৎ প্রথমত আশ্বিন-কার্তিক, দ্বিতীয়ত মাঘ-ফাল্গুন এবং তৃতীয়ত চৈত্র-বৈশাখ মাসে রোপণ করা যায়। জেনে নেই কলা চাষের নিয়ম। মাটি ঃ কলা চাষের জন্য পর্যাপ্ত রোদযুক্ত ও পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা সম্পন্ন উঁচু জমি উপযুক্ত। উর্বর দো-আঁশ মাটি কলা চাষের জন্য উত্তম। গর্ত তৈরি ঃ জমি ভালোভাবে গভীর করে চাষ করতে হয়। দুই মিটার দূরে দূরে ৬০*৬০*৬০ সেন্টিমিটার আকারের গর্ত খনন করতে হয়। চারা রোপণের মাসখানেক আগেই গর্ত খনন করতে হয়। গর্তে গোবর ও টিএসপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত বন্ধ করে রাখতে হয়। রোপণ ঃ কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমে অর্থাৎ প্রথমত আশ্বিন-কার্তিক, দ্বিতীয়ত মাঘ-ফাল্গুন এবং তৃতীয়ত চৈত্র-বৈশাখ মাসে রোপণ করা যায়। চারা রোপণ ঃ রোপণের জন্য ‘অসি তেউড়’ উত্তম। অসি তেউড়ের পাতা সরু, সূচালো এবং অনেকটা তলোয়ারের মত, গুড়ি বড় ও শক্তিশালী এবং কান্ড ক্রমশ গোড়া থেকে উপরের দিকে সরু হয়। তিন মাস বয়স্ক সুস্থ তেউড় রোগমুক্ত বাগান থেকে সংগ্রহ করতে হয়। সাধারণত খাটো জাতের গাছের ৩৫-৪৫ সেন্টিমিটার ও লম্বা জাতের গাছের ৫০-৬০ সেন্টিমিটার দৈঘ্যের তেউর ব্যবহার করা হয়। সার ঃ কলা চাষের জন্য প্রতি গর্তে গোবর-আবর্জনা সার ১৫-২০ কেজি, টিএসপি ২৫০-৪০০ গ্রাম, এমপি ২৫০-৩০০ গ্রাম এবং ইউরিয়া ৫০০-৬৫০ গ্রাম করে দিতে হবে। সার প্রয়োগ ঃ সারের ৫০% গোবর জমি তৈরির সময় এবং বাকি ৫০% গর্তে দিতে হয়। এসময় অর্ধেক টিএসপি গর্তে প্রয়োগ করা হয়। রোপণের দেড়-দুই মাস পর ২৫% ইউরিয়া, ৫০% এমপি ও বাকি টিএসপি জমিতে ছিটিয়ে ভালোভাবে কুপিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এর দুই-আড়াই মাস পর গাছপ্রতি বাকি ৫০% এমপি ও ৫০% ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। ফুল আসার সময় অবশিষ্ট ২৫% ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। পরিচর্যা ঃ চারা রোপণের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে তখনই সেচ দেওয়া উচিত। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে ১৫-২০ দিন অন্তর সেচ দেওয়া দরকার। বর্ষার সময় কলা বাগানে যাতে পানি জমতে না পারে তার জন্য নালা থাকা আবশ্যক। মোচা আসার আগে গাছের গোড়ায় কোন তেউড় রাখা উচিত নয়। মোচা আসার পর গাছপ্রতি মাত্র একটি তেউড় বাড়তে দেওয়া ভালো। কলা সংগ্রহ ঃ রোপণের পর ১১-১৫ মাসের মধ্যেই সাধারণত সব জাতের কলা পরিপক্ক হয়ে থাকে। এতে প্রতি হেক্টরে ১২-১৫ টন ফলন পাওয়া যায়। পানামা রোগ ঃ এটি ছত্রাক জাতীয় মারাত্মক রোগ। এর আক্রমণে প্রথমে বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে যায় এবং পরে কচি পাতাও হলুদ রং ধারণ করে। পরবর্তীতে পাতা বোটার কাছে ভেঙে গাছের চতুর্দিকে ঝুলে থাকে এবং মরে যায়। কিন্তু সবচেয়ে কচি পাতাটি গাছের মাথায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অবশেষে গাছ মরে যায়। কোন কোন সময় গাছ লম্বালম্বি ভাবে ফেটেও যায়। অভ্যন্তরীণ লক্ষণ হিসেবে ভাসকুলার বান্ডেল হলদে-বাদামি রং ধারণ করে। প্রতিকার ঃ আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গাছের তেউড় চারা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বিটল পোকা ঃ কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা কলার কচি পাতায় হাঁটাহাঁটি করে এবং সবুজ অংশ নষ্ট করে। ফলে সেখানে অসংখ্য দাগের সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত আক্রমণে গাছ দুর্বল হয়ে যায়। কলা বের হওয়ার সময় হলে পোকা মোচার মধ্যে ঢুকে কচি কলার উপর হাঁটাহাঁটি করে এবং রস চুষে খায়। ফলে কলার গায়ে দাগ হয়। এসব দাগের কারণে কলার বাজারমূল্য কমে যায়। প্রতিকার ঃ পোকা-আক্রান্ত মাঠে বার বার কলা চাষ করা যাবে না। কলার মোচা বের হওয়ার সময় ছিদ্রবিশিষ্ট পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রতি ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২ বার গাছের পাতার উপরে ছিটাতে হবে। ম্যালথিয়ন বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি বা লিবাসিড ৫০ ইসি ২ মিলি হারে ব্যবহার করতে হবে।

বারি খেসারী জাত স্থানীয় জাতের তুলনায় ফলন বেশি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ খেসারীতে প্রচুর পরিমানে খাদ্য শক্তি ও প্রোটিন আছে। ডাল হিসেবে প্রধানত খাওয়া হয়। এ ছাড়াও পিয়াজু বা বিভিন্ন মুখরোচক খাবারে ব্যবহৃত হয়। দো-আঁশ এবং এটেল দো-আঁশ মাটিতে খেসারী ভালো জন্মে। খেসারী প্রধানত বোনা আমন ধান কাটার আগে রিলে ফসল হিসেবে আবাদ করা হয়। সেজন্য জমি চাষের প্রয়োজন হয় না। একক ফসল হিসেবে আবাদের ক্ষেত্রে ৩-৪ টি চাষ ও মই দিতে হবে। বারি খেসারী-১ জাত স্থানীয় জাতের তুলনায় ৪০% পর্যন্ত বেশি ফলন দেয়। এ জাতের গাছ গাঢ় সবুজ এবং প্রচুর শাখা-প্রশাখা হয়ে থাকে। বারি খেসারী-১ জাতের হাজার বীজের ওজন ৪৮-৫২ গ্রাম। ফসল পাকতে ১২৫-১৩০ দিন সময় লাগে। ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৪-১.৬ টন। এ জাত পাউডারি ও ডাউনী মিলডিউ রোগ প্রতিরোধী। বারি খেসারী-২ ঃ গাছের উচ্চতা ৫৫-৬০ সেন্টিমিটার। পাতা স্থানীয় জাতের তুলনায় বেশি চওড়া। ফুলের রং নীল। বীজ একটু বড়, হাজার বীজের ওজন ৫০-৫৫ গ্রাম। বীজের রং হালকা ধূসর। আমিষের পরিমাণ ২৪-২৬%। বীজ বপন থেকে ফসল পাকা পর্যন্ত ১২৫-১৩০ দিন সময় লাগে। ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৫-২ টন। বারি খেসারী-৩ ঃ গাছের উচ্চতা ৬২-৬৫ সেন্টিমিটার। প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ৩৫-৩৮টি। বীজ বপন থেকে ফসল পাকা পর্যন্ত ১২০-১২৫ দিন সময় লাগে। ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৮-২.০ টন। বীজ বপন ঃ রিলে ফসলের ক্ষেত্রে আমন ধানের পরিপক্কতাকাল এবং জমির রসের পরিমাণের উপর খেসারীর বীজ বপনের সময় নির্ভর করে। এক্ষেত্রে কার্তিক মাস থেকে মধ্য-অগ্রহায়ণ (মধ্য-অক্টোবর থেকে নভেম্বর) পর্যন্ত বীজ বপন করতে হবে। একক ফসলের জন্য মধ্য-কার্তিক থেকে মধ্য-অগ্রহায়ণ (নভেম্বর) মাসে বীজ বপন করতে হবে। রিলে ফসল হিসেবে চাষ করলে আমন ধান কাটার প্রায় এক মাস আগে জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকা অবস্থায় বীজ ছিটিয়ে বপন করতে হবে। একক ফসল হিসেবেও বীজ ছিটিয়ে বপন করা যায়। তবে সারিতে বপনের ক্ষেত্রে সারির দূরত্ব ৫০ সেমি রাখতে হবে। প্রতি একরে ১৬-১৮ কেজি বীজ লাগে, তবে রিলে ফসলের ক্ষেত্রে বীজের পরিমাণ কিছু বেশি দিতে হয়। সার ব্যবস্থাপনা ঃ খেসারীর রিলে ফসলের ক্ষেত্রে সারের প্রয়োজন হয় না। সমুদয় সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হবে। আগে খেসারীর চাষ না করা জমিতে আবাদের জন্য প্রতি কেজি বীজের সাথে ১০০ গ্রাম হারে অনুমোদিত অণুজীব সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ঃ রোগের নাম: খেসারীর ডাউনি মিলডিউ রোগ। ক্ষতির নমুনা ঃ রোগাক্রান্ত খেসারী গাছের পাতা কিছুটা হলদে হয়ে যায়। পাতার নীচে লক্ষ করলে ছত্রাকের অবস্থান খালি চোখেই দেখা যায়। রোগের মাত্রা বেশি হলে পাতা কুঁচকে ও ঝলসে যায়। এ ছত্রাকের জীবাণু মাটিতে ১-২ বৎসর বেঁচে থাকতে পারে। ব্যবস্থাপনা ঃ রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন বারি খেসারী-১ এবং বারি খেসারী-২ চাষ করতে হবে। রিডোমিল এম জেড (০.২%) ১২ দিন পরপর ৩ বার ¯েপ্র করে এ রোগ দমন করা যায়। গুদামজাত ডালের পোকা ব্যবস্থাপনা ঃ ভূমিকা: পূর্ণবয়স্ক পোকা ও কীড়া উভয়ই গুদামজাত ডালের ক্ষতি করে থাকে। ক্ষতির নমুনা ঃ এ পোকা ডালের খোসা ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে শাঁস খেতে থাকে। ফলে দানা হাল্কা হয়ে যায়। এর ফলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ব্যবস্থাপনা: গুদামজাত করার আগে দানা ভালভাবে পরিষ্কার করতে হয়। ডালের দানা শুকিয়ে পানির পরিমান ১২% এর নিচে আনতে হবে। বীজের জন্য টন প্রতি ৩০০ গ্রাম ম্যালাথিয়ন বা সেভিন ১০% গুড়া মিশিয়ে পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। ফসটক্সিন ট্যাবলেট ২টি বড়ি প্রতি ১০০ কেজি গুদামজাত ডালে ব্যবহার করতে হয়। এ বড়ি আবদ্ধ পরিবেশে ব্যবহার করতে হয়।

 

ঈদ সামনে রেখে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম

কৃষি প্রতিবেদক \ বছরের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় পেঁয়াজের চাহিদা বাড়ে কোরবানির ঈদে। আর এই উৎসব সামনে রেখেই ধাপে ধাপে বাড়ছে মসলাজাতীয় পণ্যটির দাম। প্রায় দুই মাস ধরে বাড়তে বাড়তে এই দাম পৌঁছে গেছে ৬০ টাকায়। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে কোন কারণ ছাড়াই দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি দেশী পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা কেজি দরে। আর আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা কেজি দরে। গত রমজান মাসের শেষ দিকে দেশী পেঁয়াজ ৩৫-৪০ টাকা এবং আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম নেমে এসেছিল ২৫-৩০ টাকায়। ঢাকার খুচরা বাজারের কয়েক ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা সাধারণত দুটি সময়ে বাজারকে অস্থির করে তোলে। রমজান মাসে ও কোরবানির ঈদের আগে। কোরবানির ঈদের আর খুব বেশিদিন বাকি নেই। তাই ব্যবসায়ীরা এটাকে লক্ষ্য বানিয়ে থাকতে পারে।
নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা ও বাড়তি মনিটরিংয়ের কারণে গত রোজার শুরুতে পেঁয়াজের বাজার চড়লেও পরে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়েছিল পেঁয়াজের দাম কমিয়ে আনতে। তবে এখন আবার বাজারকে অস্থির করে তুলছে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের বাজার বিশ্লেষণের তথ্যে দেখা গেছে, রোজার ঈদের পর থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে দেশী ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম। কেজিতে পাঁচ টাকা করে বাড়তে বাড়তে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহেই আমদানি করা পেঁয়াজের দাম উঠে যায় ৩৫ টাকায়। আর দেশী পেঁয়াজের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫-৫০ টাকায়। এই দাম আরো বেড়ে জুলাইয়ের শেষে হয়ে গেছে দেশী পেঁয়াজ ৬০ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ৪০ টাকা। সংস্থাটির তথ্য মতে, গত এক মাসেই দেশী পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২২ শতংশের বেশি। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২৩ শতাংশের বেশি। বর্তমানে দেশী ও আমদানি করা পেঁয়াজের যে দাম তা গত বছরের এই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ২৯.৪১ এবং ২৩.০৮ শতাংশ বেশি। হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, বেশ কিছুদিন ধরে পেঁয়াজের দাম একই রকম ছিল। প্রতি টন পেঁয়াজের জন্য ২০০ ডলারে এলসি খোলা হচ্ছিল। প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২০ থেকে ২২ টাকা করে বিক্রি হয়েছিল। স¤প্রতি ভারতে আবারও পেঁয়াজের দাম কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। গত সোমবার ২৫০ ডলারে এলসি খোলা হয়েছে। এতে করে দাম বেড়েছে। শ্যামবাজারের পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, দেশী পেঁয়াজের মজুদ কম থাকার কারণে দিন দিন দাম বেড়েছে। যদিও দেশে একটি সিজনে উৎপাদিত পেঁয়াজ সারা বছরই বিক্রি হয়। নিজস্ব উৎপাদনের পর যে পরিমাণ ঘাটতি থাকে তা আমদানি করে মেটানো হয়। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছিল ১৮ লাখ ৬৬ হাজার টন (বিবিএসের তথ্য মতে); যা ছিল এর আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় দেড় লাখ টন বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন আরও বেশি হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) গোলাম রহমান বলেন, এই সময়টাতে পেঁয়াজের দাম বাড়ার কারণ দেখছি না। বাজারে কোন সমস্যা রয়েছে কি না সেটা মনিটরিং করে দেখা উচিত। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করে থাকলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

জনপ্রিয় সবজি ক্যাপসিকাম চাষ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ক্যাপসিকাম বা মিষ্টি মরিচ একটি জনপ্রিয় সবজি। বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এর আকার-আকৃতি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। তবে সাধারণত ফল গোলাকার ও ত্বক পুরু হয়। এটি আমাদের দেশের প্রচলিত সবজি না হলেও ইদানিং এর চাষ প্রসারিত হচ্ছে। তবে সারা বিশ্বে টমেটোর পরই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সবজি হচ্ছে মিষ্টি মরিচ। মিষ্টি মরিচ ঃ মিষ্টি মরিচ অত্যন্ত মূল্যবান সবজি। প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকার কারণে এবং অতি সহজেই টবে চাষ করা যায় বলে দেশের জনসাধারণকে মিষ্টি মরিচ খাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।

বীজ বপণ ঃ এর বীজ বপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। প্রতি শতকের জন্য ১ গ্রাম বীজ দরকার হয়। বীজ থেকে প্রথমে চারা তৈরি করে নিতে হয়। এ জন্য বীজগুলোকে ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে আগে থেকে তৈরি করে রাখা বীজতলায় ১০  সেন্টিমিটার দূরে দূরে লাইন করে বীজ বুনতে হবে।

মাটি ঃ মিষ্টি মরিচ চাষের জন্য দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি ভালো। মিষ্টি মরিচ খরা ও গোড়ায় পানি জমা কোনটিই সহ্য করতে পারে না।

বেড তৈরি ঃ বীজ বপণের ৭-১০ দিন পর চারার ৩-৪ পাতা হলে মাঝারি আকারের পলিথিন ব্যাগে চারা স্থানান্তর করতে হবে। এরপর মূল জমি চাষ ও মই দিয়ে ভালোভাবে তৈরি করে নিতে হবে। এরপর বেড তৈরি করে নিতে হবে। প্রতিটি বেড চওড়া ২.৫ ফুট রাখতে হয়। দুই বেডের মাঝখানে নালা রাখতে হবে। সাধারণত ৩০ দিন বয়সের চারা তৈরি করা বেডে ১.৫ ফুট দূরে দূরে লাইনে রোপণ করা হয়। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারি প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায় বলে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে রাখলে  ভেতরের তাপমাত্রা বেশি থাকে।

সার ঃ প্রতি শতক জমির জন্য গোবর ৪০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ১.৪ কেজি, এমওপি ১ কেজি, দস্তা ২০ গ্রাম এবং জিপসাম ৪৫০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। এরমধ্যে অর্ধেক গোবর সার জমি  তৈরির সময়, বাকি অর্ধেক গোবর সম্পূর্ণ টিএসপি, দস্তা, জিপসাম, ১/৩ ভাগ এমওপি এবং ১/৩ ভাগ ইউরিয়া চারা রোপণের গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি ২/৩ ভাগ ইউরিয়া এবং এমওপি পরবর্তীতে দুইভাগ করে চারা রোপণের ২৫ এবং ৫০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ ঃ ক্যাপসিকাম খরা ও জলাবদ্ধতা কোনটাই সহ্য করতে পারে না, তাই প্রয়োজন অনুসারে জমিতে সেচ দিতে হবে। কোনো গাছে ফল ধরা শুরু হলে খুঁটি দিতে হবে, যাতে গাছ ফলের ভারে হেলে না পড়ে। জমি সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।

ফসল ঃ মিষ্টি মরিচ পরিপক্ক সবুজ অবস্থায় লালচে হওয়ার আগেই মাঠ থেকে উঠানো যায়। সাধারণত সপ্তাহে একবার গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের পর ঠান্ডা অথচ ছায়াযুক্ত স্থানে বাজারজাতকরণের পূর্ব পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয়। তবে ফল সংগ্রহের সময় প্রতিটি ফলে সামান্য পরিমাণে বোটা রেখে দিতে হবে। রোগ-বালাই ঃ মিষ্টি মরিচে কিছু পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে আছে জাবপোকা, থ্রিপস পোকা, লালমাকড়, অ্যানথ্রাকনোজ রোগ, ব্লাইট রোগ ইত্যাদি। এসব রোগের আক্রমণ হলে নিকটস্থ কৃষিকর্মীর সঙ্গে পরামর্শ করে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

 

যেভাবে চাষ করবেন পানি কচু

কৃষি প্রতিবেদক ॥ যে সব কচু দাঁড়ানো বা স্থির পানিতে চাষ করা যায় তাকে পানি কচু বলে। পানি কচুর বিভিন্ন নাম রয়েছে। কচুতে ভিটামিন এ এবং প্রচুর পরিমাণে লৌহ রয়েছে। তাই সুস্বাদু সবজি হিসেবে চাষ করতে পারেন পানি কচু।
মাটি ঃ পলি দো-আঁশ ও এটেল মাটি পানি কচু চাষের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এর চাষাবাদ করা যায়। বৈশিষ্ট্য ঃ কচুর লতি লম্বায় ৯০-১০০ সেন্টিমিটার। এটি সামান্য চেপ্টা ও সবুজ হয়। বোঁটা এবং পাতার সংযোগস্থলের উপরিভাগের রং বেগুনি। জীবনকাল ১৮০-২১০ দিন। চারা ঃ আগাম ফসলের জন্য কার্তিক (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেস্বর), নাবী ফসলের জন্য মধ্য-ফাল্গুন থেকে মধ্য-বৈশাখ (মার্চ-এপ্রিল) মাসে লাগানো যায়। দক্ষিণাঞ্চলে বছরের যে কোনো সময় লাগানো যায়। প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি লতা রোপণ করা যায়। জমি ভালোভাবে তৈরি করে লাইন থেকে লাইন ২ ফুট এবং গাছ থেকে গাছ ১.৫ ফুট দূরত্ব রাখতে হবে। সার ঃ প্রতি শতকে ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ৭৫০ গ্রাম এবং গোবর ৫০ কেজি দিতে হবে। গোবর, টিএসপি এবং এমওপি সার জমি তৈরির শেষ সময়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ২-৩ কিস্তিতে দিতে হয়, তবে প্রথম কিস্তি রোপণের ২০-২৫ দিনের মধ্যে দেওয়া দরকার। সেচ ঃ পানি কচুর গোড়ায় দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে এবং দাঁড়ানো পানি মাঝে মাঝে নাড়িয়ে দিতে হবে। লতিরাজ জাতের জন্য দাঁড়ানো পানির গভীরতা ৮-১০ সেন্টিমিটার হওয়া দরকার। রোগ ঃ পাতার উপর বেগুনি থেকে বাদামি রঙের গোলাকার দাগ পড়ে। পরবর্তীতে এ দাগ আকারে বেড়ে একত্রিত হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে তা কচু ও কন্দে ছড়িয়ে যায়। উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্র আবহাওয়া ও পরপর ৩-৪ দিন বৃষ্টি হলে এ রোগের মাত্রা খুব বেড়ে যায়। তাই রোগ দেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রিডোমিল এমজেড-৭২ ডব্লিউ অথবা ডাইথেন এম ৪৫ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ৩-৪ বার দিতে হবে। দেওয়ার আগে ট্রিকস মিশিয়ে নিতে হয়। সংগ্রহ ঃ চারা রোপণের ২ মাস পর থেকে ৭ মাস পর্যন্ত লতি হয়ে থাকে।

জীবনের প্রয়োজনে জৈব কৃষি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিশ্বে পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম একটি হলো জৈব কৃষি। কেননা পৃথিবীর বুকে নিরাপদ জীবনযাপন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মাটির গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য জৈব কৃষি ব্যবস্থার জনপ্রিয়করণ জরুরি। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ কৃষকের কাছে আশির দশকের আগ পর্যন্ত অর্গানিক কৃষি জনপ্রিয় ছিল। তারপর নানা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে কৃষকরা বাধ্য হয়ে রাসায়নিক কৃষিতে ঝুঁকে পড়ে নব্বইয়ের দশকে। এতে দৃশ্যমান ফসল উৎপাদন বাড়লেও মাটির উর্বরা শক্তি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় নানা চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষায়। জানা গেছে, কীটনাশক বা বিষের অবাধ আমদানি, কৃষকের মধ্যে সচেতনতার অভাব, অর্গানিক সনদদাতা কর্তৃপক্ষের অভাব এবং বাজারজাতে সমস্যা দেশে অর্গানিক চাষের পথে বড় বাধা। অথচ সত্তরের দশকের আগে দেশের কৃষি ব্যবস্থা অর্গানিক পদ্ধতির ওপরই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ওই সময়ের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে রাসায়নিক সারের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল শস্যের চাষাবাদ শুরু হয়। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় অর্গানিক পদ্ধতি। বাস্তবতা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বে অর্গানিক কৃষিতে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। বাংলাদেশেও জৈব চাষাবাদে ফিরে আসছে কৃষকসমাজ তবে এর মাত্রা খুবই কম। আমাদের কৃষকদের সচেতন করে তুলতে পারলে জৈবসার প্রয়োগ ও জৈব কীটনাশক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধানসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল এবং সবজির উৎপাদন খরচ শতকরা ২৫-৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জৈবসার ব্যবহার করলে ফসলের উৎপাদন খরচ রাসায়নিক সারের চেয়ে শতকরা ৫০-৬০ শতাংশ কম হয়। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন প্রযুক্তিতে উৎপাদিত জৈব সার সবজি ও ধান গাছে প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, পটাশ ও ফসফেট সারের জোগান দেয়। আধা-কম্পোস্ট গোবর, মুরগির বিষ্ঠা, ধানের কুঁড়া, মাছ-মুরগির পাখনা ও পরিপাকতন্ত্র তথা পরিত্যক্ত অংশ একসঙ্গে করে জৈব কম্পোস্ট সার তৈরি করা হয়। জৈবসার প্রয়োগ করলে আর অতিরিক্ত ইউরিয়া, পটাশ ও টিএসপি সার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না বলে মাটির উর্বরতা ও স্বাস্থ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়। উৎপাদিত ফসল হয় স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ। জৈব সার দিয়ে চাষ করলে প্রথম এক থেকে দু’বছর ফলন কিছুটা কম হবে তবে চার থেকে পাঁচ বছর পর রাসায়নিক সার দিয়ে চাষ করা জমির তুলনায় ফলন বেশি হবে। দেশে অর্গানিক কৃষির যথাযথ সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হলে একটি নিয়ন্ত্রক বা তদারকি প্রতিষ্ঠান দরকার। তা না হলে উৎপাদনে কৃষককে ধরে রাখা যাবে না। পাশাপাশি অর্গানিক পণ্য বিষয়ে ভোক্তা আস্থা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

মাছের পোনা সংগ্রহের আধুনিক পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৈ, শিং ও মাগুর মাছের পোনা পরিবহনে একটু ভিন্নতা রয়েছে। মাছগুলো কাঁটাযুক্ত হওয়ায় বড় আকারের পোনা অক্সিজেন ব্যাগে পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকতে হয়। শিং ও মাগুরের ছোট পোনা অক্সিজেন ব্যাগে পরিবহন করাই উত্তম। তাই যে কোনো উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করা ভালো।
এ পদ্ধতিতে পলিথিন ব্যাগে পানি এবং অক্সিজেনসহ পোনাকে প্যাকেট করে পরিবহন করা হয়। সাধারণত বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে ৬৬ সেমি ী ৪৬ সেমি আকারের পলিথিন ব্যাগে পোনা পরিবহন করা হয়। প্রতিটি প্যাকেটে ২টি করে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করাই উত্তম। কোন কারণে যদি একটি ব্যাগ ছিদ্র হয়ে যায় তবে দ্বিতীয়টি পানি, অক্সিজেন ও পোনা রক্ষা করতে সাহায্য করবে। পোনা প্যাকিং করার সময় সমান আকারের দুটি পলিথিন ব্যাগ নিয়ে একটি অন্যটির ভেতর ঢুকিয়ে তার একতৃতীয়াংশ পানি দ্বারা ভর্তি করতে হবে এবং ব্যাগের উপরের অংশ এক হাত দিয়ে আটকে এবং অন্য হাত দিয়ে ব্যাগটিকে উল্টেপাল্টে দেখতে হবে। যেন কোন ছিদ্র পথে পানি বেরিয়ে না যায়। ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগ পাওয়া গেলে তা পরিবর্তন করতে হবে।
ব্যাগের সাইজ ৬৬ সেমি ী ৪৬ সেমি আকারের হলে ২০-২১ দিনের কৈয়ের পোনা ২৫০-৩০০ গ্রাম এবং ৩০-৪০ দিনের শিং ও ২৫-৩০ দিনের মাগুর ৩০০-৪০০ গ্রাম (১৫-১৬শ’) পোনা ১৫-১৮ ঘণ্টার দূরত্বের রাস্তা পরিবহন করা যায়।
কৈ, শিং ও মাগুরের পোনা ৪-৬ ঘণ্টার ভ্রমণে ১-১.৫ কেজি পর্যন্ত প্রতিব্যাগে পরিবহন করা যায়। প্রয়োজনীয় পোনা পানিসহ পলিথিন ব্যাগে রেখে পলিথিনের বাকি অংশ অক্সিজেন দিয়ে পূর্ণ করে সুতলি বা রাবার ব্যান্ড দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে নিতে হবে, যাতে অক্সিজেন বেরিয়ে যেতে না পারে। পোনা পরিবহনের জন্য পানির তাপমাত্রা ২২-২৭০ সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা উচিত। পানির তাপমাত্রা বেশি হলে অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। পরিবহনকালে পলিথিন ব্যাগ যাতে ছিদ্র হতে না পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। সম্ভব হলে পলিথিন ব্যাগ বস্তায় ভরে পরিবহন করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষিত কেন

ব্যাংকগুলোকে নানা সুবিধা দেয়ার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক ঋণের সুদহার ১ জুলাই থেকে সিঙ্গেল ডিজিট তথা ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ছিল; কিন্তু অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই পার হয়ে দ্বিতীয় মাস আগস্টেও কোনো বেসরকারি ব্যাংকই আদেশটি তামিল করছে না। জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক ১ জুলাই থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে এবং আমানতের সুদহার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো। অবশ্য চারটি সরকারি ব্যাংক তাদের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে; কিন্তু কোনো বেসরকারি ব্যাংকই আমানতের সুদহার কমালেও এখনও ঋণের সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার বাস্তবায়ন করেনি। এর বাস্তবায়ন এড়াতে নানা কৌশল ও শুভঙ্করের ফাঁকির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। তারা ‘কম সুদে সরকারি আমানতের অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না, বেসরকারি আমানতও মিলছে না, সময় লাগবে’- এসব কথা বলে গড়িমসি করছে। আমরা মনে করি, শিল্পের স্বার্থে ইতিবাচক বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, সর্বোপরি দেশের সার্বিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। উদ্বেগের বিষয়, বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখনও শিল্প খাতের মেয়াদি ঋণে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে সুদ নিচ্ছে। এর সঙ্গে অন্যান্য সার্ভিস চার্জ যোগ করলে সুদহার যে আরও বেশি হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাঝারি শিল্পে ঋণের সুদহার ১২ থেকে ১৫ এবং ক্ষুদ্র শিল্পে তা দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। শিল্পের বিকাশ, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান তৈরি, সর্বোপরি সার্বিক উন্নয়নের পথে এ সুদহার যে বাধার সৃষ্টি করছে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের সুদহারের দিকে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যাবে। অবশ্য কিছু ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়েছে, তবে সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক রুটিন কাজ হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক তা সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো হয়নি। এক্ষেত্রে কৃষিঋণ, রফতানি ঋণ, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের সুদহার সমন্বয় করে নিজেদের সুদহার কম দেখানোর একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোকে সংকট কাটিয়ে উঠতে নানা ছাড় দেয়া হয়েছে। সিআরআর বা নগদ ক্যাশ জমা ১ শতাংশ কমানো, বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রাখা, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের পরিচালক সংখ্যা বাড়ানো, এমনকি পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানোর মতো বড় ধরনের ছাড় তাদের দেয়া হয়েছে। তারপরও তাদের সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে গড়িমসি ও নানা কৌশলের আশ্রয় নেয়া দুর্ভাগ্যজনক। সরকারের শীর্ষমহল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দিতে বাধ্য করা, অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্যও সরকারপ্রধানের নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া দরকার। বিএবি সভাপতিসহ বিভিন্ন ব্যাংকার বলছেন, কম সুদে আমানত পাওয়া সাপেক্ষে সিঙ্গেল ডিজিটে নামানো হবে সুদহার। আমরা মনে করি, এভাবে গড়িমসি না করে ব্যাংকগুলো সরকারের দেয়া সুবিধার বিপরীতে অপারেটিং কস্ট কমিয়ে এবং নানাভাবে উদ্যোগ নিতে পারে। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিলে ব্যাংক মালিকরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করতে পারবেন না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

ফলগাছ রোপণে করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গ্রীষ্মের শেষে প্রথম বৃষ্টি হলেই আমরা গাছ রোপণের কথা চিন্তা করি। ভাবি, বাড়ির আশপাশের ফাঁকা জায়গাটা এবার গাছে গাছে ভরিয়ে দেবো। বাদ যাবে না ঘরের বারান্দা কিংবা ছাদও। অনেকের চিন্তাটা মাথার ভেতরেই ঘুরপাক খেতে থাকলেও অনেকে বাস্তবায়ন করতে মাঠেও নেমে পড়ি। প্রিয় গাছের চারা বা কলম খুঁজতে ছুটে যাই সরকারি বা বেসরকারি নার্সারিতে। কাংখিত গাছের চারা বা কলম পেয়েও যাই। তাৎক্ষণিকভাবে রোপণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়েও ফেলি। লাগিয়েই ভাবি, যাক কিছু দিনের মধ্যেই জায়গাটা সবুজে সবুজে ভরে যাবে। কিন্তু না, ভাবনার সাথে বাস্তবতাটা ঠিক মেলে না। ক’দিন পরেই দেখা যায় চারা বা কলম সঠিকভাবে বাড়ছে না। শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কী যে হলো চারাগুলোর। চারা বা কলমের এই সমস্যাটা কিন্তু কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখলেই দূর করা যায়। তাহলে চলুন কারণগুলো একে একে জেনে নেয়া যাক।
গ্রীষ্মের শেষে প্রথম বৃষ্টি হলেই গাছের চারা বা কলম রোপণ করা ঠিক নয়। একটু অপেক্ষা করতে হয় পরের দু’তিন বার বৃষ্টির জন্য। কারণ প্রথম বৃষ্টির পর মাটির ভেতরে সৃষ্টি হওয়া গ্যাস বের হওয়ার জন্য বা মাটিতে কিছুটা রস সঞ্চয়ের জন্য সময় দিতে হয়। তাই পর পর কয়েকবার বৃষ্টি হলে মাটির ভেতর ও বাইরের আবহাওয়া প্রায় সম পর্যায়ে চলে আসে। অর্থাৎ মাটির রস ও বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যায়। এই অবস্থায় গাছের চারা বা কলম রোপণ করলে সেগুলো আর মরে না। প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় চারাগুলো তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে।
দেশের অনেক জায়গাতেই এখন মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। তাপমাত্রা বেশি থাকলেও বাতাসের আর্দ্রতা আগের তুলনায় বেশ বেড়ে গেছে। ফল বা কাঠজাতীয় যেকোনো গাছের চারা বা কলম রোপণের সময় এখনই। এ জন্য বেশ কিছু করণীয় কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চারা বা কলম নির্বাচন, রোপণের জায়গা ঠিক করা, চারা বা কলমের জাত অনুসারে সঠিকভাবে গর্ত তৈরি, গর্তে সঠিক নিয়মে সার ব্যবহার, গর্তে সঠিক নিয়মে চারা বা কলম রোপণ এবং রোপণ করা গাছের সুরক্ষা প্রদান।
রোপণ করার জন্য যে চারা বা কলম নির্বাচন করা হবে তার বয়স কখনোই এক বা দু’ বছরের বেশি হওয়া চলবে না। আমাদের অনেকেরই ধারণা, বড় আকারের চারা বা কলম রোপণ করলে সেটা খুব তাড়াতাড়ি বড় হবে এবং ফল দিতে শুরু করবে। সত্যি বলতে কি ধারণাটি একদম ভুল। ছোট আকারের নিখুঁত ও তেজি চারা বা কলম সহজেই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং দ্রুত বেড়ে ওঠে। চারা বা কলম বাছাই করার সময় আরো যেসব বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। চারা বা কলমের নতুন পাতা থাকলে সেই চারা বা কলম রোপণের জন্য বাছাই করবেন না। চারা বা কলমে ফুল বা ফল থাকলে সেটাও রোপণের জন্য বাছাই করবেন না। রোপণের জন্য বাছাই করা চারা বা কলমটি সোজা হতে হবে, দুর্বল বা বাঁকা চারা বা কলম বাদ দিতে হবে। বেশি শাখা-প্রশাখাযুক্ত চারা বা কলম বাছাই করবেন না। বেশি শাখা-প্রশাখা থাকলে সেগুলো ছাঁটাই করে শুধু মূল কান্ডটি রেখে রোপণ করতে হবে। রোপণের আগে নিচের দিকের কিছু পাতার অর্ধেক ছাঁটাই করে দিতে হবে। এতে চারা বা কলম থেকে পানি বের হয়ে গাছ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। কলমের গাছের বেলায় জোড় ঠিকমতো আছে কি না, তা পরখ করে নিতে হবে। বিশেষ করে আদিজোড়ে কোনো ফাটা দাগ আছে কি না, তা দেখে নিতে হবে। যদি থাকে তাহলে সেই কলম বাদ দিতে হবে। কলমের জায়গার পলিথিন খোলা হয়েছে কি না রোপণের আগে সেটাও দেখে নিতে হবে। চারা বা কলমের পাতা কোনো ধরনের পোকামাকড়ে আক্রান্ত থাকলে তা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে ছত্রাকনাশক দিয়ে চারা বা কলম ভালোভাবে ¯েপ্র করার পর রোপণ করতে হবে। রোগাক্রান্ত কোনো চারা বা কলম রোপণের জন্য বাছাই করা ঠিক হবে না। বিশ্বস্ত উৎস বা প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক তথ্য নিয়ে উন্নত জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। চারা বা কলমের শিকড় পলিব্যাগ বা মাটির পট ভেদ করে বের হয়েছে কি না সেটা দেখে নিতে হবে। যদি শিকড় বের হয় তাহলে সেটা ছাঁটাই করে দিতে হবে। পলিব্যাগ বা মাটির পটের মাটি ঠিক আছে কিনা সেটাও দেখে নিতে হবে।
যদি চারা বা কলমের গোড়ার মাটি আলগা হয়ে সরে যায় কিংবা পট বা পলিথিন থেকে চারা বা কলম বের করার পর মাটির বল ভেঙে যায় তাহলে সেই চারা বা কলম বাদ দেয়া ভালো। চারা বা কলম কোথায় রোপণ করা হবে সেই জায়গাটি আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। রোদ পড়ে এবং ভবিষ্যতে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোনো রকম বাধার সৃষ্টি না হয় এমন জায়গাই নির্বাচন করতে হবে। চারা বা কলম রোপণের আগেই বড় গাছের জন্য (আম, কাঁঠাল, লিচু, নারিকেল, বাতাবি লেবু, সফেদা) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও গভীরতায় ১ বর্গ মিটার গর্ত খনন করে কমপক্ষে ৭-১০ দিন খোলা অবস্থায় ফেলে রাখতে হবে। এ সময় গর্ত থেকে তোলা মাটি ঝুরঝুরে করে তার সাথে জৈব সার মিশিয়ে রাখতে হবে। মাঝারি গাছের জন্য ( পেয়ারা, লেবু, জলপাই, কামরাঙ্গা, আমড়া) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও গভীরতায় ৬০ বর্গ সেন্টিমিটার গর্ত খনন করতে হবে। ছোট গাছের জন্য (কলা, পেঁপে, ডালিম) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও গভীরতায় ৪৫ বর্গ সেন্টিমিটার গর্ত খনন করতে হবে। রোপণের ঠিক ৩-৪ দিন আগে জৈব সার মিশ্রিত মাটির সাথে রাসায়নিক সার মিশাতে হবে এবং মাটি দিয়ে গর্ত এমনভাবে ভরাট করতে হবে যেন জমির সমতল থেকে ভরাটকৃত মাটির উচ্চতা ১৫-২০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়। ভরাট করা মাটি চার দিকে ঢালু করে দিতে হবে যেন পানি সহজেই গড়িয়ে যেতে পারে। এ সময় প্রয়োজনমতো পানি গর্তের মাটিতে দিতে হবে, যাতে মাটিতে রসের অভাব না হয়। এরপর গর্তের ঠিক মাঝখানে নিড়ানি বা হাত দিয়ে পট বা পলিব্যাগের সমান করে বা একটু বড় করে গর্ত করতে হবে। গর্তের মাঝে চারা বা কলম স্থাপন করতে হবে এমনভাবে যেন চারা বা কলমের গোড়া আগের অবস্থাতেই থাকে। অর্থাৎ আগে যেটুকু মাটির বলের নিচে ছিল কিংবা যেটুকু মাটির বলের বাইরে ছিল ঠিক সেভাবেই যেন থাকে। এতে চারা বা কলমের গোড়ার বাকল ঠিক থাকে এবং গোড়াপচা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। রোপণ করার পরপরই গাছে এবং গাছের গোড়ার চার দিকে কিছুটা পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। রোপণ করা চারা বা কলমের সুরক্ষার জন্য ঘেরার ব্যবস্থা করতে হবে।
লেখক : খোন্দকার মেসবাহুল ইসলাম, কৃষিবিদ, উদ্যান বিশেষজ্ঞ, হর্টিকালচার সেন্টার, রংপুর

রেড লেডি পেঁপে চাষ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পেঁপে একটি স্বল্পমেয়াদী ফল বা সবজি। এটি অত্যন্ত সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ওষুধি গুণ সম্পন্ন। বাংলাদেশে পেঁপে খুবই জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হয়। এর মোট উৎপাদন প্রায় ৪৯ হাজার টন। আজ জেনে নিন রেড লেডি পেঁপে জাতের চাষ পদ্ধতি। বীজ সংগ্রহ ঃ বীজ কেনার সময় ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। চীন ও তাইওয়ানের রেড লেডি বীজ অনেক ভালো। দাম ঃ তাইওয়ানের রেড লেডি ২ গ্রাম বীজের প্রতি প্যাকেট ৫৫০-৬৫০ টাকায় কিনতে পাওয়া যায়।
বীজের হার ঃ প্রতিগ্রামে বীজের সংখ্যা ৬০-৭০টি। হেক্টরপ্রতি ৭০-১০০ গ্রাম বীজ দরকার। সে হিসেবে ৩ হাজার-৩ হাজার ২০০ চারা দিয়ে ১ হেক্টর জমিতে পেঁপে চারা লাগানো যায়। চারা তৈরি ঃ বীজ থেকে বংশ বিস্তার করা যায়। বীজের প্যাকেট কেটে ২ ঘণ্টা রোদে শুকিয়ে ঠান্ডা জায়গায় রেখে ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভেজানোর পর পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরি করতে হবে। পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরি করলে রোপণের পর চারা দ্রুত বাড়ে। ৫ঢ৬ সে.মি আকারের ব্যাগে সমপরিমাণ বেলে দোআঁশ মাটি ও পচা গোবরের মিশ্রণ ভর্তি করে ব্যাগের তলায় ২-৩টি ছিদ্র করতে হবে। তারপর এতে সংগৃহীত বীজ হলে একটি এবং পুরাতন বীজ হলে ২টি বপন করতে হবে। ১টি ব্যাগে একের বেশি চারা রাখা উচিত নয়।
চারা রোপণ ঃ ১.৫ থেকে ২ মাস বয়সের চারা রোপণ করা যায়। ২ মিটার দূরে দূরে ৬০ঢ৬০ঢ৬০ সে.মি আকারে গর্ত করে রোপণের ১৫ দিন আগে গর্তের মাটির সার মেশাতে হবে। পানি নিষ্কাশনের জন্য ২ সারির মাঝখানে ৫০ সে.মি নালা রাখতে হবে। সার ঃ চারা লাগানোর পর নতুন পাতা এলে ইউরিয়া ও এমপি সার ৫০ গ্রাম করে প্রতি ১ মাস অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। গাছে ফুল এলে এ মাত্রা দ্বিগুণ হবে। শেষ ফল সংগ্রহের আগেও সার দিতে হবে।
পরিচর্যা ঃ গাছের গোড়া থেকে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। গোড়ার মাটি কোদাল দিয়ে হালকা করে দিতে হবে। গাছে অতিরিক্ত ফল হলে কিছু ফল ছিড়ে নিতে হবে। বাকি ফল এতে বড় হওয়ার সুযোগ পাবে। পেঁপে গাছে বিভিন্ন হরমোন প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া যায়।
ফল সংগ্রহ ঃ পুষ্ট হওয়ার সময় কোনো কোনো ফলে হলুদ রং ধারন করে। পুষ্ট ফলে কিছু দিয়ে খোঁচা দিলে পানির মতো তরল আঠা বের হবে। অপুষ্ট ফল থেকে দুধের মতো ঘন আঠা বের হবে।

দুধের উপাদন বাড়াবেন যেভাবে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গাভীর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগতমান জাতের ওপর নির্ভর করে। দেশীয় জাতের গাভীর দুধে মাখনের পরিমাণ বেশি থাকে কিন্তু এরা দুধ উৎপাদন করে কম। বিদেশি জাতের গাভী দেশীয় জাতের গাভী থেকে বেশি দুধ দেয়। খাদ্য ঃ খাদ্য গাভীর দুধ উৎপাদন ও গুণগতমানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। বেশি খাবার দিলে বেশি দুধ পাওয়া যায়। অবশ্যই সুষম খাদ্য হতে হবে। কারণ খাদ্যে বিদ্যমান উপাদানগুলো ভিন্ন অবস্থায় দুধের মাধ্যমে নিঃসৃত হয়। খাদ্য দুধে মাখনের উপস্থিতি কম-বেশি করতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত দানাদার খাদ্য, পিলেট জাতীয় খাদ্য, অতিরিক্ত রসালো খাদ্য, মিহিভাবে গুঁড়ো করা খড়ে গাভীর দুধের মাখনের হার কম হতে পারে। মাখনের পরিমাণ কমে গেলে খাদ্য পরিবর্তন করে প্রয়োজনীয় সুষম খাদ্য খাওয়াতে হবে। দুধে খনিজ পদার্থ ও খাদ্যপ্রাণের পরিমাণ গাভীর খাদ্যের মাধ্যমে বাড়ানো যায়। গাভীকে সুষম খাদ্য না দিলে দুধে সামান্য মাত্রায় আমিষ ও শর্করা জাতীয় উপাদান পাওয়া যায় এবং দুধ উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়। দোহন ঃ দুধ দোহন বিশেষ করে দোহন কাল, দোহনের সময়, দুধ দোহন প্রক্রিয়া, বিভিন্ন বাঁটের প্রভাব ইত্যাদি গাভীর দুধের পরিমাণ ও মানকে প্রভাবিত করে। গাভীর দুধ দেওয়ার পরিমাণ আস্তে আস্তে ৫০ দিনে বেড়ে সর্বোচ্চ হয়। ওলানে দুধের চাপের ওপর দুধের পরিমাণ ও উপাদান নির্ভর করে। দুগ্ধদান কালের ৯০ দিন পর থেকে দুধে মাখন ও আমিষের হার আংশিক বাড়ে। একই গাভীকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দোহন করলে দুধে মাখনের পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। তাই সকালের দুধের চেয়ে বিকালের দুধে মাখনের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই গাভীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২-৩ বার দোহন করা উচিত। এতে দুধ উত্পাদনের পরিমাণ বাড়তে পারে। প্রসবকালে ঃ প্রসবকালে গাভীর সুস্বাস্থ্য আশানুরূপ দুধ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাভী থেকে বেশি দুধ পেতে হলে গর্ভকালে সুষ্ঠু পরিচর্যা ও সুষম খাদ্য দেওয়া প্রয়োজন। প্রসবের দুই মাস আগে গাভীর দুধ দোহন অবশ্যই বন্ধ করে দিতে হবে। মোট দুধ উৎপাদনের ৪০% ওলানের সামনের অংশের বাঁট এবং ৩০% পেছনের অংশের বাঁট থেকে পাওয়া যায়। গাভীর ওলানের বাঁট অবশ্যই সুস্থ থাকতে হবে। সতর্কতা ঃ রক্ষণাবেক্ষণ, বাসস্থান, গাভীর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগতমানের হ্রাস-বৃদ্ধির জন্য অনেকাংশে দায়ী। পারিপার্শ্বিক অবস্থা গাভীর জন্য আরামদায়ক হওয়া উচিত। দোহনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন না করলে অর্থাৎ দুধ দোহন ক্রটিপূর্ণ হলে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ও গুণগতমান কমতে পারে। মৌসুম ঃ প্রতিকূল আবহাওয়া দুধ উৎপাদনের জন্য ক্ষতিকর। শীত মৌসুম দুধাল গাভীর জন্য আরামদায়ক। এ মৌসুমে দুধ উৎপাদনের এবং দুধে মাখনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, গরমকাল, বর্ষাকাল, আর্দ্র আবহাওয়ায় গাভীর দুধের উৎপাদন ও গুণগতমান হ্রাস পায়। গরমের দিকে গাভীকে ঠান্ডা অবস্থায় রাখলে উৎপাদনের কোনো ক্ষতি হয় না। গাভীর প্রজননের সময় দুধ উৎপাদন কমে যায়। প্রসব বিরতি ঃ দীর্ঘ বিরতিতে বাচ্চা প্রসব করলে গাভীর দুধ উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কম বিরতিতে বাচ্চা প্রসবের কারণে দুধ উত্পাদন কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তাই গাভীকে বাচ্চা প্রসবের ৬০-৯০ দিনের মধ্যে পাল দিতে হবে। কোনোক্রমেই ৬০ দিনের আগে প্রজনন করানো উচিত নয়। গাভীর শরীরে ৫০% এবং দুধে প্রায় ৮৭% পানি থাকে। তাই গাভীকে ইচ্ছামত পানি পান করার ব্যবস্থা করলে দুধ উৎপাদন বেশি হয় এবং দুধে মাখনের পরিমাণ বেশি থাকে।

কুমারখালীতে তিন দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষ মেলা উদ্বোধন

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে তিন দিনব্যাপী ফলদ বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল রবিবার সকল ১০টায় উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি শহর প্রদক্ষিণ শেষে বাস টার্মিনালে (মেলা প্রাঙ্গণ) গিয়ে শেষ হয়। পরে বাস টার্মিনাল চত্বরে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সহকারি কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ মোছাব্বেরুল ইসলাম। প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন ও মেলার উদ্বোধনী ঘোষনা করেন কুমারখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান। এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার আফরিন সুলতানা, ইউ ডি এফ বিপ্লব সাহা। সহকারি কৃষি অফিসার (অব:) ভুলেন্দ্রনাথ বালা’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে স্বাগত  বক্তব্য রাখেন, উপজেলা কৃষি অফিসার দেবাশীষ কুমার দাস। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে প্রবীণ ব্যক্তি ও ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মাঝে ফলদ গাছের চারা বিতরণ করা হয়। পরে অতিথিবৃন্দ মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং মেলায় আগত দর্শনার্থীদেরকে বৃক্ষ রোপনে উদ্বুদ্ধ করেন।