কৃষকের মুখে হাসি এনেছে আগাম জাতের শিম

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আগাম জাতের শিম চাষ করে লাভবান হয়েছেন যশোরের কৃষক। চলতি মৌসুমের শুরুতেই এখন শিমে ভরে উঠেছে মাঠজুড়ে। দামটাও ভালো পেয়ে খুশি কৃষক। তেমনি, সড়কের দু’ধারের শত শত জমিতে মাচানের উপর শিম গাছগুলোতে ফুলে ফুলে ভরে গেছে। এতে আবহমান গ্রাম বাংলার অন্যরকম এক দৃশ্য হাতছানি দিচ্ছে।জেলার অন্তত পাঁচ হাজার কৃষক শিম চাষে লাভবান হচ্ছেন। সবজি চাষের রাজধানীখ্যাত যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের দু’ধারে গ্রাম সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি, বারীনগর, সাতমাইল, বাঘারপাড়ার খাজুরা ও বন্দবিলা এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিটি ক্ষেতেই দোলা দিচ্ছে শিম ফুল, আর শিম।এখনো বাজারে ভালো দাম থাকায় ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। তবে চলতি  মৌসুমে শুধুমাত্র বাঘারপাড়ার বন্দবিলা গ্রামের শতাধিক কৃষক শিম চাষ করে চমক সৃষ্টি করেছেন। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জৈষ্ঠ্য মাসের শেষেই আগাম জাতের শিম বীজ বপন করা হয়েছে। ফলে অন্তত আরও আড়াই মাস আগে ভাদ্র মাসের শুরুতেই শিম উঠতে শুরু হয়েছে।প্রথমদিকে ১১০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে শিম বিক্রি হয়েছে। তবে দিন যতো যাচ্ছে, ততোই একদিকে শিমের ফলন বাড়ছে, তাছাড়া শীত মৌসুমকে টার্গেট করে লাগানো জমির শিম উঠতে শুরু করেছে। এতে দামটা কমে সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আসছে। কিছুদিন আগেও ৮০ টাকা দরে শিম বিক্রি হলেও বর্তমানে ৪৫থেকে ৫০ টাকা পাইকরি দরে শিম বেচাকেনা হচ্ছে। যশোরাঞ্চলে উৎপাদিত আগাম জাতের শিম ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। গতবারের মতো এবারও আসন্ন জানুয়ারি থেকে তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর,  সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে শিম রফতানি করা হবে আশা প্রকাশ করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।যশোর সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামের কৃষক কিবরিয়া এবং শওকত আলী বলেন, একবিঘা জমিতে শিম চাষে খরচ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। মাঘ মাস পর্যন্ত কমপক্ষে তিন হাজার কেজি শিম বিক্রি করতে পারবেন। প্রতিকেজি ৪০ টাকা দরে বিক্রি হলেও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাবেন। কিন্তু আগের আমলের দেশি শিম যেমন ঘি-কাঞ্চন, হাতিকানি, বানতোড়া, কাকিলা ও পুটুলে প্রভৃতি শিমের চাষ করে এই লাভটা পাওয়া তো না।সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন শিমচাষী ওলিয়ার রহমান, জালাল উদ্দিন, হাফেজ বখতিয়ার বলেন, আগাম শিম চাষে কিছুটা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের দরকার হয়। পরাগায়ণের পর সৃষ্ট ক্ষুদ্র শিমটি ফুল দিয়ে আবৃত থাকে। ফুল সরিয়ে না দিলে সেটি পূর্ণাঙ্গ শিমে পরিণত হতে পারে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানিতে অথবা শিশিরে ফুল ভিজে পচে যায়। কিন্তু বর্তমানে শিমের উন্নত জাতের উদ্ভাবনের কারণে ওই ধরনের সমস্যা  নেই, এখন কোনো ধরনের ঝামেলা ছাড়াই শিম চাষ করা যাচ্ছে।যশোর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এসএম খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, চলতি মৌসুমে সদর উপজেলাতেই ৬শ’ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। এতে ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ কৃষক লাভবান হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় শিম চাষ খুব ভালো হয়েছে।  মৌসুমে শিম চাষের চেয়েও আগাম চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন কৃষক। তবে আসন্ন জানুয়ারিতে গতবছরের মতো কয়েকটি দেশে শিম পাঠানো হলে কৃষক ন্যায্য দাম পাবেন।

আলুর কাংক্ষিত ফলন পাওয়ার উপায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আলু বাংলাদেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় সবজি। সেই সাথে অর্থকরী ফসলও। প্রতি বছর এ দেশে আলুর উৎপাদন যে পরিমাণে হিমাগারে রাখা যায় তার চেয়েও বেশি। তারপরও খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার দিন দিন এমনভাবে বেড়ে গেছে যে, বাজারে আলুর দাম কখনোই আর কম থাকছে না। সে জন্য প্রতি বছরই আলুর মৌসুম শুরুর আগে শুধু কৃষকরাই নয়, যারা কৃষি কাজের সাথে জড়িত নন এমন অনেকেই আলু চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কারণ আলু চাষে স্বল্প সময়ে লাভ বেশি। কিন্তু কিছু কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ না রাখায় আলু চাষে অনেকেই কাংক্ষিত ফল বা ফলন পান না। তখন বিভিন্ন জনকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করেন। তাই আলু চাষে নামার আগে থেকেই যদি কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় তাহলে আলুর কাংক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব হতে পারে।

প্রথমেই জমি নির্বাচন। বেলে বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে আলু ভালো হয়। সূর্যের আলো প্রচুর পড়ে এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি আলু চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। জমিতে পানি সেচ দেয়া ও পানি নিষ্কাশনের উপযুক্ত ব্যবস্খা থাকাও প্রয়োজন। এ জন্য জমি সমতল করতে হয়। যেহেতু আলু মাটির নিচের ফসল, তাই জমি গভীর চাষ দিতে হয়। জমি চাষ দেয়ার পর ৭  থেকে ১৫ দিন রোদে ফেলে শুকিয়ে নিতে হয়। এতে মাটির নিচে থাকা বিভিন্ন পোকা, পোকার কিড়া ও পুত্তলী এবং রোগজীবাণু রোদের আলো ও তাপের সংস্পর্শে এসে নষ্ট হয়। আড়াআড়ি চাষ দিয়ে মাটি এমনভাবে চিকন ও ঝুরঝুরে করতে হয় যেন মাটির মধ্যে বাতাস চলাচল ভালোভাবে করতে পারে, যাতে আলুর টিউবার গঠন কাজটি সহজ হয়। চাষের শেষে জমির সব আগাছা ও আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে দূরে কোথাও পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তবে জমি  তৈরির আগে মাটি শোধন করে নিতে পারলে ভালো হয়। এতে আলুর ঢলে পড়া রোগ প্রতিরোধ করা যায়। আগের বছর ঢলে পড়া রোগ হয়নি বা রোগ হয়েছে এমন যেকোনো জমিতেই মাটি  শোধন করে নিতে হয়। শেষ চাষের আগে বিঘা প্রতি ৪ থেকে ৫ কেজি ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে চাষ দিয়ে সেচ দিতে হয়। ব্লিচিং পাউডার জমির মাটির সাথে  মেশানোর পর জমিতে অবশ্যই জো অবস্থা থাকতে হয়। এভাবে ২৮ থেকে ৩০ দিন জমি ফেলে রাখতে হয়। এতে জমির মাটি শোধন হয় অর্থাৎ মাটির বিশেষ বিশেষ রোগ জীবাণু ধ্বংস হয় বা তাদের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। জানা উৎস বা বিশ্বস্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আলুবীজ সংগ্রহ করতে হয়। বীজ আলু যদি খারাপ হয় তাহলে আলু চাষের সব আয়োজনই বিফলে যেতে বাধ্য। তাই  যেনতেন জায়গা বা যে কারো কাছ থেকে বীজআলু সংগ্রহ না করে এমন উৎস থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হয় যেন আলুর বীজ খারাপ হলে তার জন্য জবাবদিহিতা থাকে। বীজ সংগ্রহের পর বীজ শোধন করতে হয়। এ জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা না করলেও চলে।  যেমন কেউ কেউ কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে থাকেন। এ জাতীয় ছত্রাকনাশক বীজ আলু শোধনে ব্যবহার করলে ১ গ্রাম ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১ কেজি কাটা বীজ আলু ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে বীজবাহিত ছত্রাকঘটিত রোগজীবাণু ধ্বংস হয়। আলুর ঢলে পড়া ও গোড়া পচা রোগ প্রতিরোধে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে  স্ট্রেপটোমাইসিন মিশ্রিত করতে হয়। বীজ আলু সংগ্রহের পর কাটার আগে আলো-বাতাস চলাচল করে এমন পরিষ্কার সমতল জায়গায় বস্তা খুলে আলু  বের করে এক থেকে দেড় ফুট উঁচু স্তূপ বা হিপ করে ছড়িয়ে রাখতে হয়। মাঝে মধ্যে ওলটপালট করতে হয়। বীজআলু শুধু লম্বালম্বি এমনভাবে দু’ভাগ করে সমভাবে কাটতে হয়, যাতে কর্তিত দু’অংশে কমপক্ষে দুটি করে চোখ থাকে। এই অংশের ওজন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম এবং ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট হতে হয়। অনেকেই চোখের সাথে আলুর অংশ কম রেখে বাকিটুকু খাবার হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন, এটা ঠিক নয়। কর্তিত অংশের সাথে যতটুকুই থাকুক সবটুকুই রাখতে হয়। বীজ কাটার সময় চাকু বা বঁটির দুই পাশ জীবাণুনাশকে ভেজানো কাপড়ের টুকরো দিয়ে মাঝে মধ্যে মুছে নিতে হয় যেন রোগজীবাণু এক আলু থেকে অন্য আলুতে ছড়াতে না পারে। আলুর কাটা অংশ উপরের দিকে করে মাটিতে ছড়িয়ে বিছিয়ে রাখতে হয়। কখনোই গাদাগাদি করে রাখা উচিত নয়। রাখার স্থানে আলো এবং বাতাস চলাচল ব্যবস্থা থাকতে হয়। এভাবে ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা রেখে দিলে কাটা অংশের ওপরে একটি শক্ত কালচে ধরনের স্তর পড়ে, যাকে সোবারাইজেশন বলে। এই অংশ ভেদ করে কোনো রোগজীবাণু ঢুকতে পারে না। কাটা অংশে ছাই ব্যবহার করা যেতে পারে, তাতে অতিরিক্ত হিসেবে পটাশিয়াম সরবরাহ করা হয়। আবার পোকার বিকর্ষক হিসেবেও এটি কাজ করে। আলু রোপণের উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শেষ পর্যন্ত। দিন পেছালে শীতে গাছের বৃদ্ধি কমে, গাছ খুব বেশি বড় হওয়ার আগেই টিউবার গঠন কাজ শুরু হয়ে যায়। এতে টিউবার সংখ্যা কমে যায়। শীতে ১৫ ডিগ্রি  সেলসিয়াসের টিউবার গঠন ভালো হয়। ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আলুবীজ রোপণ করা যায়, তবে ফলনও আনুপাতিক হারে কমে যায়। আলু চাষে কম্পোস্ট সার ব্যবহার না করা ভালো। কারণ যেসব কম্পোস্টের উপাদান হিসেবে শাকসবজির উচ্ছিষ্টাংশ বা গাছ-গাছড়ার বা যেকোনো জৈব জিনিসের পচনশীল অংশ ব্যবহার করা হয় সেসবের সাথে ঢলে পড়া রোগের  রোগজীবাণু থাকতে পারে, যা এই রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য কম্পোস্টের পরিবর্তে ভালোভাবে পচানো শুকনো গোবর সারই জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে সংগ্রহ করা শুকনো সার। আলু চাষে একর প্রতি ইউরিয়া ১১২ কেজি, টিএসপি ৭৫ কেজি, এমওপি ১১২ কেজি, জিপসাম ৪০ কেজি, জিংক সালফেট ৫ কেজি এবং বোরণ সার ৪ কেজি ব্যবহার করতে হয়। অর্ধেক ইউরিয়া, অর্ধেক এমওপি ও সম্পূর্ণ টিএসপি এক সাথে মিশিয়ে বীজ আলু বপনের পাশে সারের নালায় দিতে হয়। বাকি সার রোপণের ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। আর জিপসাম, জিংক সালফেট এবং  বোরণ সার শেষ চাষের সময় ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। যেসব অঞ্চলের মাটিতে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি আছে সেসব অঞ্চলে ম্যাগনেশিয়াম সার শেষ চাষের সময় প্রয়োগ করতে হয়। উপরি সার প্রয়োগের পর আলুর সারিতে বা গাছের গোড়ায় উঁচু করে (প্রায় ২০ সেন্টিমিটার) মাটি তুলে দিতে হয়। ভেলির গোড়া চওড়া রাখার জন্য ১৫  সেন্টিমিটার প্রস্থের ছোট কোদাল ব্যবহার করতে হয়। মাটি তোলার সময় লক্ষ্য রাখতে হয় যেন কোদালের সাথে প্রয়োগকৃত সার উঠে না আসে। আলু চাষে সেচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোপণের সময় জমির জো অবস্থা থাকতে হয় এবং রোপণের পর ১ থেকে ২টি গাছ যখন মাটির ওপরে উঠে আসে তখন প্রথমবার সার উপরি প্রয়োগের পর একটি হালকা সেচ দিতে হয়। এটি সাধারণত রোপণের ৭ দিনের মধ্যে দিতে হয়। এবপর মাটির প্রকার ও প্রয়োজন অনুযায়ী ৩ থেকে ৫ বার সেচ দিতে হয়। তবে টিউবার গঠনের শুরুর সময় অর্থাৎ ৪০ থেকে ৪৫ দিনের সময় মাটিতে রস না থাকলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বা ফলন কমে যেতে পারে। সুষম সেচের জন্য তাই নিয়মিত জমি পরিদর্শন করতে হয়। খাবার আলু ৯৮ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়। আর বীজ আলু ৭২ থেকে ৭৫ দিন পর গাছ তুলে  রেখে ৮০ থেকে ৮৫ দিনের মধ্যে ক্ষেত থেকে তুলতে হয়। জাত ভেদে বাংলাদেশে আলুর ফলন একর প্রতি ৭ থেকে ১০ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে।

বেগুন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান সবজি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বেগুন সাধারনত শীতকালের সব্জী । তবে সারা বছর ধরেই এর চাষ করা যায়। শীর্ষ স্থানীয় সব্জী সমুহের মধ্যে বেগুন অন্যতম। বাংলাদেশের ব্যাপক জনসাধারণ বেগুন খেতে পছন্দ করে । সব্জী উৎপাদনের দিক দিয়েও বেগুন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান সবজি। বাজারে বেগুন দুই রঙের দেখা যায়। সাদা এবং বেগুনী । তবে বেগুনী রঙের বেগুন খেতে বেশি সুস্বাদু । ছাদে সহজেই বেগুন চাষ করা যায়। তবে যেহেতু বেগুনে রোগবালাই এবং পোকার আক্রমন বেশী তাই বেগুন চাষে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় ।
চাষ পদ্ধতি ঃ এটেঁল দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি বেগুন চাষের জন্য বেশী উপযোগী। এই মাটিতে বেগুনের ফলন বেশী হয়। বেগুন চাষের জন্য প্রথমে বীজতলায় চারা করে পরে তা টব বা ড্রামে রোপণ করতে হবে । ছাদে অল্প সংখ্যক চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা হিসেবে কাঠের বাক্স, প্লাস্টিকের ট্রে, গামলা অথবা হাফ ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে । বীজতলার পানি যাতে দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। জৈবসার মিশ্রিত বেলে দোআঁশ মাটি দিয়ে বীজতলার পাত্রটি ভরতে হবে। অতঃপর উক্ত পাত্রে বেগুনের বীজ বোনা যেতে পারে। বেগুনের বাগান সাধারণত বিভিন্ন ধরণের রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এসব রোগের অধিকাংশই বীজ বাহিত। তাই বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করে নেয়া দরকার। বীজতলায় বীজ বপনের পূর্বে ভাল কোন ছত্রাকনাশক এমনভাবে মিশাতে হবে যাতে সব বেগুনের বীজে ভালভাবে লাগে। অতঃপর শোধনকৃত বীজ ৫/৬ ঘন্টা ছায়াতে শুকিয়ে বীজতলায় বপন করতে হবে। বীজ বোনার পর মাটি হাত দিয়ে সমান করে দিতে হবে এবং চেপে দিতে হবে। বীজ বপনের একমাস পর বেগুনের চারা ছাদে লাগানোর উপযোগী হয়। চারা বীজতলা থেকে উঠানোর কয়েকঘন্টা আগে বীজতলায় পানে দেয়া প্রয়োজন। যাতে সহজে চারা উঠানো যায়। চারা উঠানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে চারার শিকড় যাতে বেশী কাটা না পড়ে এবং শিকড়ের সাথে কিছুটা মাটি থাকে। তবে বীজতলার চারা উঠানোর ১৫-২০ দিন পূর্বেই চারা গাছ লাগানোর প্রস্তুতমূলক কাজটি সেরে নিতে হবে । ছাদে বেগুনের চারা লাগানোর জন্য ১০-১২ ইঞ্চি মাটির টব সংগ্রহ করতে হবে। টবের তলার ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এবার ২ ভাগ এঁটেল দোআঁশ বা পলি দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ২০-৩০ গ্রাম টি,এস,পি সার, ২০-৩০ গ্রাম পটাশ সার, একত্রে মিশিয়ে ড্রাম বা টব ভরে পানিতে ভিজিয়ে রেখে দিতে হবে ১০-১২ দিন । অতঃপর মাটি কিছুটা খুচিয়ে দিয়ে আবার ৪-৫ দিন এভাবেই রেখে দিতে হবে। যখন মাটি ঝুরঝুরে হবে তখন বেগুনের চারা উক্ত টবে রোপন করতে হবে। বিকাল অথবা রাতে চারা লাগাতে পারলে ভাল হয় । চারা গাছটিকে সোজা করে লাগাতে হবে। সেই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উচু করে দিতে হবে এবং মাটি হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে। যাতে গাছের গোড়া দিয়ে বেশী পানি না ঢুকতে পারে। একটি সোজা কাঠি দিয়ে গাছটিকে বেধে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর প্রথমদিকে পানি কম দিতে হবে। আস্তে আস্তে পানি বাড়াতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি জমে না ।
অন্যান্য পরিচর্যা ঃ টবের মাটি কয়েকদিন পর পর হালকা নিড়ানি দিয়ে আলগা করে দিতে হবে । যাতে বেগুন গাছে আগাছা জন্মাতে না পারে। সেই সাথে মাটি কিছুটা আলগা করে দিলে গাছের শিকড়ের ভাল বৃদ্ধি হয়। বেগুনের ফল ধরা শুরু করলে সরিষার খৈল পচা পানি পাতলা করে গাছে ১৫-২০ দিন অন্তর অন্তর নিয়মিত দিতে হবে ।
রোগবালাই ঃ বেগুনের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হল ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা । এছাড়াও বেগুনে জাব পোকা, বিছা পোকা, পাটা মোড়ানো পোকা ও লাল মাকড় আক্রমণ করে থাকে। রোগবালাইয়ের মধ্যে ঢলে পড়া আর গোড়া পচা অন্যতম। এছাড়াও ফল পচা রোগে বেগুনের অনেক ক্ষতি করে। বেগুনের রোগবালাই এবং পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে মাঝে মাঝে বেগুন গাছে ভাল কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক একত্রে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে ।

ফিরে আসছে বিলুপ্তপ্রায় খরকি মাছ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের শিক্ষকদের গবেষণায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পুকুরেই জনপ্রিয় খরকি মাছের পোনা উৎপাদন ও ক্রস-ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে জাত উন্নয়নের কার্যক্রমে সাফল্য অর্জিত হয়েছে।  বৈজ্ঞানিক এই সফলতার মাধ্যমে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় খরকি মাছের চাষ ও উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইমরান পারভেজের নেতৃত্বে একদল গবেষক প্রায় তিন বছর গবেষণা করে দিনাজপুরসহ ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর জনপ্রিয় মাছ খরকি পুকুরেই চাষ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ও ক্রস-ব্রিডিং করে জাত উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছেন। গবেষণা দলের প্রধান ড. ইমরান পারভেজ বলেন, খরকি মাছের বৈজ্ঞানিক নাম ঈরৎৎযরহঁং ৎবনধ (ঐধসরষঃড়হ ১৮২২) এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে খরকি মাছ পরিচিত। ময়মনসিংহ অঞ্চলে ভাগ্না এবং যশোর অঞ্চলে টাটকিনি নামে পরিচিত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তানসহ অন্যান্য  দেশে খরকি মাছ একসময় প্রচুর পাওয়া যেত। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে খরকি মাছ আজ হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় এ প্রজাতির মাছের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। হুমকির সম্মুখীন এই মাছকে ফিরিয়ে আনতে পুকুরে কৃত্রিম উপায়ে পোনা উৎপাদন ও পোনার লালন-পালনের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়। প্রকল্পটিতে প্রধান গবেষক ড. ইমরান পারভেজকে সহযোগী গবেষক হিসেবে সহযোগিতা করেন প্রভাষক  মৌসুমী সরকার ছন্দা, ড. মাহবুবুল হাসান ও অনুষদীয় শিক্ষকরা। দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ ও যশোর থেকে জীবিত খরকি মাছের মা-বাবা মাছ সংগ্রহ করা হয় এবং এবং এদের মধ্যে মরফোলজিক্যাল ও জেনেটিক পার্থক্য নিরূপণ করা হয়। ওই গবেষণা থেকে দেখা যায়, এরা একই প্রজাতির মাছ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখছে। চারটি স্টকের মধ্যে জেনেটিক বৈচিত্রতার দিক থেকে দিনাজপুর ও ময়মনসিংহের পপুলেশন অন্যতম। গবেষণায় দেখা যায়, একই প্রজাতির মাছ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে এরা পার্থক্য বজায় রাখে, তাই বিভিন্ন এলাকার মাছের মধ্যে ইন্টার ও ইন্ট্রা ব্রিডিং করানো হয়। গবেষণায় দেখা যায় দিনাজপুরের মহিলা মাছ ও ময়মনসিংহের পুরুষ মাছের মধ্যে প্রজনন ঘটালে তারা সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। প্রধান গবেষক ড. ইমরান বলেন, নিষিক্ত ডিম ফুটে রেণু পোনা  বের হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পর প্রথম খাবার হিসেবে সিদ্ধ ডিমের কুসুম পানিতে দ্রবণ তৈরি করে প্রদান করা হয়েছে। এ অবস্থায় ৭ দিন লালন-পালন করা হয়। সাত সপ্তাহ তিন ধরনের খাবার প্রদান করে সবচেয়ে উপযুক্ত খাবার নির্বাচন করা হয়। গবেষণা শেষে দেখা যায়, শতকরা ৩২ ভাগ প্রোটিনযুক্ত খাবার নিয়মিতভাবে প্রদান করার মাধ্যমে খুব দ্রুত পোনা উৎপাদন করা সম্ভব। অপর এক গবেষণায় চারা পোনা উৎপাদনের জন্য মাছের মজুত ঘনত্ব নির্ণয় করা হয়। দেখা যায়, প্রতি হেক্টর পুকুরে আড়াই লাখ ৭-১০ দিন বয়সী  রেণু পোনা মজুত করলে সবচেয়ে বেশি বর্ধন ও বাঁচার হার পাওয়া যায়। প্রকল্পটির সফলতার জন্য বর্তমানে কিছু বিশেষ গবেষণা কার্যক্রম, যেমন- কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক মাছের জাইগোটের বৃদ্ধিকে কীভাবে ব্যাহত করে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে এই মাছের স্পার্মাটোজোয়া কীভাবে এর গতি হারিয়ে  ফেলে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এর বৃদ্ধির কী অবস্থা হয় তার ওপর কাজ চলছে।

মধু উতপাদন হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের উতস

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মধু শত রোগের মহৌষধ। মধু উৎপাদনে বাড়তি আয়ে দারিদ্র্য বিমোচন হয়। শীত মৌসুমে একটি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে এক কেজি মধু পাওয়া যায়। ১০টি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে ১০ কেজি মাসে ৪০ কেজি মধু পাওয়া যায়। ৪০ কেজি মধুর দাম ১২ হাজার টাকা। খরচ খুব সামান্য। মধুর ৭ মাস মৌসুমে ৮৪ হাজার টাকা আয় করা যায়। এছাড়া মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে ফুলের মধ্যে পরাগায়ন ঘটায়। ফলে ফসলের ফলন ২০-৩০% বাড়ে। মৌমাছি নিজের খাদ্যের জন্য ফুল থেকে নেকটার (মধু) সংগ্রহ করে মৌচাকে জমা করে। এই মধুই খেয়ে থাকি আমরা। মধু ১০০ রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়াও মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে ফুলের মধ্যে পরাগায়ণ ঘটায় ফলে ফসলের ফলন ২০-৩০% বাড়ে। মৌমাছি পালনের জন্য ফসলের গাছে পুষ্পায়ন পর্যায়ে জমিতে মৌবাক্স স্থাপন করা হয়। মৌমাছি এখানে মৌচাক তৈরি করে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে জমা করে।
মৌমাছি পালন পদ্ধতি
মৌমাছি পরিবারভুক্ত, সামাজিক ও দলবদ্ধ পতঙ্গ। এরা একটি মৌচাকে তিন শ্রেণিতে ভাগ হয়ে বসবাস করে। যথা- নারী বা রানী, পুরুষ ও শ্রমিক মৌমাছি। প্রতি কলোনিতে এক হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত মৌমাছি বাস করে। এর ৯০ ভাগই শ্রমিক মৌমাছি।
মৌমাছি পালনের বিভিন্ন ধাপ
রানী মৌমাছি সংগ্রহ ঃ প্রতি কলোনিতে একটি রানি মৌমাছি থাকে। রানি মৌমাছির কাজ হচ্ছে প্রজনন কার্য করে ডিম উৎপাদন ও বাচ্চা উৎপাদন করা। কলোনির মধ্যে আকারে সবচেয়ে বড় হচ্ছে রানী মৌমাছি। একটি রানী মৌমাছি প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ডিম পাড়ে। নিষেককৃত ডিম থেকে কর্মী মৌমাছি ও অনিষেককৃত ডিম থেকে পুরুষ ড্রোন সৃষ্টি হয়। রানী মৌমাছিকে ঘিরে কর্মী ও পুরুষ মৌমাছি থাকে। খাদ্য গ্রহণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে রানী ও কর্মী মৌমাছি সৃষ্টি হয়। রয়েল জেলি বেশিদিন (৬-৭ দিন) মৌমাছির লার্ভাকে খাওয়ালে তার জুভেনাইল হরমোনের পরিমাণ বেড়ে যায় ফলে সে রানী মৌমাছিতে পরিণত হয়। রয়েল জেলি ৩ দিন খাওয়ালে কর্মী মৌমাছিতে পরিণত হয়। একই কোলনিতে একাধিক রানী মৌমাছি থাকলে তাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে যে রানীটি বেঁচে থাকে, কর্মী ও পুরুষ মৌমাছিরা তাকে অনুসরণ করে অন্যত্র কোলনি করে। একটি নির্দিষ্ট রানী মৌমাছি নির্দিষ্ট পরিমাণ ডিম পাড়ার পর মারা যায় এবং নতুন রানীর উদ্ভব হয়। এ ছাড়াও গাছের গর্ত থেকে রানী মৌমাছিসহ কোলনি এনে বাক্সে দেওয়া যায়। মৌমাছি পালনের প্রথম কাজ হবে ভারতীয় জাতের বন্য মৌমাছির খোঁজ রাখা। এরা সহজে পোষ মানে, ভদ্র, সহিষ্ণু, বিনা কারণে হুল ফোটায় না।
উপযুক্ত বাক্সে রাখা ও উদ্যানে স্থাপন
একটি উন্নত মৌবাক্স দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। নিচের বড় কক্ষ বাচ্চার ঘর এবং উপরের ছোট অংশ মধু সঞ্চয়ের ঘর। সবার উপরে মৌ বাক্সের ঢাকনা থাকে এবং সবার নিচে বাক্সের তলা থাকে। এ দুটো খুলে বাক্সের মৌ কলোনির অবস্থা পরীক্ষা করা যায়। উক্ত বাক্সের ঘর দুটিতে ৫ থেকে ৭টি ফ্রেম থাকে। এই ফ্রেমেই মৌচাক বেঁধে পালন করা হয়। বাক্সে মৌ কলোনি ঢোকানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। বাক্সে মৌ কলোনি ঢোকানোর জন্য প্রথমে একটি ভালো বাক্স সংগ্রহ করে সন্ধানপ্রাপ্ত কলোনির নিকট নিয়ে যেতে হবে। যন্ত্রপাতি নিতে হবে হাতুড়, বাটাল, কুড়াল, ছুরি, কুইনবেস ও গেট, দিয়াশলাই এবং কলাগাছের রশির আকারে বাকল ইত্যাদি। গাছের ফোকর যদি ছোট থাকে তবে বাটালি দিয়ে প্রয়োজনবোধে কুড়াল দিয়ে কেটে বড় করতে হবে যাতে মৌ কলোনির মৌচাক স্বাভাবিকভাবে বের করা যায়। ফোকর করা সম্পন্ন হলে পুরনো গেঞ্জির কাপড় অথবা খড়ের কুন্ডলি পাকিয়ে আগুন ধরিয়ে ধুয়া সৃষ্টি করে কলোনির সম্পূর্ণ মৌমাছি সরিয়ে মৌচাক কেটে বাক্সের ফ্রেমে কলা গাছের বাকলের সূতা দিয়ে বাঁধতে হবে। ফ্রেমে মৌচাক এমনভাবে বাঁধতে হবে বন্য অবস্থায় তাদের অবস্থান যেমন থাকে। বাধার সময় রানীর ঘর ভেঙে দিতে হবে এবং পুরুষ ও লার্ভাগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। লার্ভা থাকলে এবং তাদের মুখ বন্ধ ও উঁচু অবস্থায় থাকলে বুঝতে হবে এগুলোই পুরুষ ঘর। মৌচাক বাচ্চা ঘরের ফ্রেমগুলোতে বাঁধতে হবে। কমপক্ষে তিনটি ফ্রেম বাঁধলেই হবে। মৌচাক মূল যে জায়গায় ফোকর ছিল তা সরে গেলেও মৌ কলোনির রানীসহ সবই দলবদ্ধভাবে আবার বসবে।
মৌ বাক্সগুলোকে উদ্যানে বা ফসলের জমিতে ফুল ধরার আগে স্থাপন করতে হবে। সাধারণত শীতের শুরুতে বা ফল বাগানে মুকুল ধরার আগে মৌ বাক্স স্থাপন করতে হয়। বাংলাদেশের প্রায় ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদের প্রতি মৌমাছি আসক্ত থাকলেও সরিষা, তিল, তুলা, আম, জাম, লিচু, ভুট্টা ইত্যাদি ফুলের প্রতি আসক্তি বেশি। সরিষা মৌসুমে মৌ কলোনিগুলো সরিষার জমিতে হেক্টর প্রতি ১০টি বাক্স ১০০ মিটার দূরত্বে, পিয়াজ ক্ষেতে হেক্টর প্রতি ১২-৩৬টি বাক্স ৮০ মিটার দূরত্বে স্থাপন ও অবস্থান বদল করতে হয়।
রক্ষণাবেক্ষণ
বাক্সের মৌ কলোনি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। সার্বিক অবস্থা কমপক্ষে সাত দিন পর পর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বাক্স ঘন ঘন খুলে পরীক্ষা করলে বিশেষ করে বাচ্চার ঘর খুললে মৌমাছিগুলোর স্বাভাবিক কাজকর্মের ক্ষতি হয়। যদি মথের আক্রমণ হয় তবে মৌচাক খুলে রোদে শুকাতে হবে। পিউপা বা বাচ্চা মরে থাকলে তা দূর করতে হবে। রানীর ঘর তৈরি হলে তা ভেঙে দিতে হবে তা না হলে মৌ কলোনি উড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এ ছাড়াও বাক্সের তলায় কর্মীর কিংবা পিউপার কিংবা মৌচাকের ময়লা পড়ে থাকতে পারে। এগুলো পরিষ্কার করা উচিত। এরপর কলোনি ফ্রেমগুলো সঠিকভাবে রেখে বাক্সের ঢাকনা লাগিয়ে দিতে হবে। মৌমাছিরা প্রচুর মধু সংগ্রহ করে রাখার স্থান না পেলে মধু ঘরে আরো নতুন চাক দিতে হবে।
ঝড় বৃষ্টিতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে মৌ বাক্সটির প্রবেশপথ বাতাস ও বৃষ্টির বিপরীতমুখী করে নিরাপদ ও শুষ্ক স্থানে রাখতে হয়। ছাদের ওপর পলিথিন কাগজ দিয়ে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে হবে। শীতের প্রচন্ড প্রকোপে মৌমাছিদের যেন কষ্ট না হয় সেজন্য শীতের রাতে মৌ বক্সগুলো চট বা ছালা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। বাক্সে মৌ পালনের সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ হলো বর্ষাকাল। এ সময় কলোনিতে মথের আক্রমণ হয়। মৌমাছি উড়ে যায় চাক ছেড়ে, যাকে ঝাঁক ছাড়া বলে। এ সময় কলোনি পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কলোনিতে গোবরে পোকা, বোলতা, কালো পিঁপড়া, কাক জাতীয় পাখি, ব্যাঙ, ইঁদুর, তেলাপোকা, টিকটিকি, রক্তচোষা, উঁইপোকা ইত্যাদি আক্রমণ করে। এ ছাড়াও ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবী কলোনিতে রোগের সংক্রমণ ঘটায়। এদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাক্সের কলোনির যতœ, পর্যবেক্ষণ এবং রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা দরকার।
মধু আহরণ
বাংলাদেশে অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত মধু সংগ্রহের মৌসুম। উদ্ভিদ ফুলের ভেতর রস জমিয়ে রেখে মৌমাছিকে আকৃষ্ট করে। মৌমাছি তার নিজস্ব প্রয়োজনে এ রস আহরণ করে এবং লালার সঙ্গে মিশিয়ে মধু থলিতে করে মৌচাকে নিয়ে আসে। শ্রমিক মৌমাছি তার পাখা নেড়ে বাতাস সৃষ্টি করে সংগৃহীত রস থেকে পানি বাষ্পায়িত করে। খাঁটি মধু হিসেবে তৈরি করার পর এগুলোকে চাকের নির্দিষ্ট প্রকোষ্ঠে জমা করে এবং মোম দিয়ে প্রকোষ্ঠের মুখ বন্ধ করে দেয়। এক পাউন্ড মধু তৈরি করতে একটি শ্রমিক মৌমাছিকে তার চাক থেকে বের হয়ে ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার বার ফুল থেকে ফুলে বিচরণ করতে হয়। এ জন্য তাকে প্রতিবার যাতায়াতের গড় দূরত্ব দেড় থেকে দুই কিলোমিটার। ভ্রমণ করতে হয় ৩২-৪২ হাজার কিলোমিটার। মৌচাকের শতকরা ৭৫ ভাগ কুটুরি যখন ঘন মধুতে ভরে মৌমাছিরা ঢাকা দিয়ে ফেলবে তখন সে চাক থেকে মধু সংগ্রহ করতে হবে। মৌচাকের মধুঘর মধুতে ভরে গেলে উপরের অংশ চিক চিক করে। এই অবস্থায় ফ্রেম থেকে চাক খুলে মধু নিষ্কাশন যন্ত্রের সাহায্যে মধু সংগ্রহ করা হয়।
মৌমাছি পালন ও মধু উৎপাদনের গুরুত্ব
মধু শত রোগের মহৌষধ। মধু উৎপাদনে বাড়তি আয়ে দারিদ্র্য বিমোচন হয়। শীত মৌসুমে একটি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে এক কেজি মধু পাওয়া যায়। ১০টি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে ১০ কেজি মাসে ৪০ কেজি মধু পাওয়া যায়। ৪০ কেজি মধুর দাম ১২ হাজার টাকা। খরচ খুব সামান্য। মধুর ৭ মাস মৌসুমে ৮৪ হাজার টাকা আয় করতে পারে। মৌচাক দিয়ে মোম তৈরি করা যায়। মৌমাছি পালনে মধু উৎপাদন করে যে লাভ হয় এর চেয়ে পরাগায়ণ বেশি হওয়ার ফলে ফসলের উৎপাদন প্রায় ২০-৩০% বাড়ে। মধু উৎপাদন করা সহজ। একবার মৌ বাক্স স্থাপন করলে সারাবছর মধু উৎপাদন করা যায়। একবার তৈরি করা বাক্স দিয়ে কয়েক বছর মৌচাষ করা যায়।

পেঁয়াজ চাষ ও করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাঙালির ভোজন বিলাসিতার পৃথিবীজুড়ে খ্যাতি রয়েছে। আর ভোজন বিলাসিতায় নানাবিধ মসলার সমন্বয়ে রন্ধনশৈলীর উপস্থাপনা যে কোনো মানুষের মন জয় করে নিতে এতটুকু সময় লাগে না। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় এশিয়ান লোকেরা যে হারে মসলার ব্যবহার করে থাকে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তা লক্ষণীয় নয়। আর খাবারকে রুচিশীল ও মুখরুচক করতে মসলার বিকল্প হয় না। তেমনি একটি মসলার বিবরণ আমি আজকে উপস্থাপন করবো এবং এর বহুবিধ ব্যবহার বাঙালি মানুষের ঘরে যথেষ্ট পরিমাণে সমাদৃত। পেঁয়াজকে শুধু মসলা বললে ভুল হবে। কারণ পেঁয়াজ একাধারে মসলা ও সবজিও বটে। ভাতের সঙ্গে খালি পেঁয়াজ, ছালাদে কাঁচা পেঁয়াজ, ঝালমুড়িতে কাঁচা পেয়াজ, আলুভর্তায়, বেগুন ভর্তায়, শুঁটকি ভর্তায় এর ব্যবহার সবার কাছে সমাদৃত। অধিক হারে ব্যবহার মসলা হিসেবে বেটে পেস্ট বানিয়েই তরকারিকে সুস্বাদু ও রসালুতে পরিণত করে।
পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় মসলা। এর পাতায় ভিটামিন ‘এ বেশি থাকে। তাছাড়া পেঁয়াজের পাতা ও ডাটায় ভিটামিন ‘সি’ ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ। পেঁয়াজ খাবার দ্রুত হজমকারক ও রুচিবর্ধক হিসেবেও এর জুড়ি নেই।
উৎপাদন স্থল ঃ বাংলাদেশের প্রধান প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদন অঞ্চলগুলো হলো- চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, রংপুরের মধ্যে অধিক পরিমাণে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ফরিদপুর অঞ্চলে।
এর চাষাবাদ পদ্ধতি ঃ বেলে-দোআঁশ মাটি পেঁয়াজ চাষের জন্য ভালো, তবে পিএইচ মান ৫.৫ থেকে ৬.৫। এ ফসল চাষের জন্য বারবার চাষ দিয়ে মাটি বেশ ঝুরঝুরে করে নেয়া আবশ্যক। সুনিষ্কাশিত ও উত্তম জৈবপদার্থযুক্ত উর্বর মাটিতে পেঁয়াজ ভালো হয়। পেঁয়াজের জাত বিন্যাস ঃ তাহেরপুরী, বারি পেঁয়াজ-১ (তাহেরপুরী), বারি পেঁয়াজ-২ (রবি মৌসুম), বারি পেঁয়াজ-৩ (খরিপ মৌসুম) (ক) স্থানীয় জাত (খ) ফরিদপুরী। বীজ বপন ঃ বীজতলায় বীজ বুনে চারা উৎপন্ন করে সে চারা জমিতে রোপণ করতে হয়। শল্ককন্দ রোপণ করা যায়। বীজ রোপণের জমিতে বীজ বপন করেও পেঁয়াজের চাষ করা হয়। বীজ হার ঃ বীজ পদ্ধতিতে হেক্টর প্রতি ২.৫-৪ কেজি বীজ, কন্দ পদ্ধতিতে প্রায় ৫৫০ কেজি শল্ককন্দ। চারা উৎপাদন ঃ ৩ মিটার, ৯ মিটার আকারের বীজতলায় জন্য ২০-৩০ গ্রাম বীজের দরকার পড়ে। বীজ বপনের পর বীজগুলোর ৫-৬ সেন্টিমিটার পুরু বালু দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। বীজ বপনের সময় ঃ অক্টোবর-নভেম্বর মাস বীজতলায় বা জমিতে বীজ বপনের সময়। সরাসরি বীজ সারি করে বোনা উচিত। রোপণের পদ্ধতি ঃ আমাদের দেশে তিনটি পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ করা হয়। ১. জমিতে সরাসরি বীজ ছিটিয়ে, ২. বন্ধ বা বালপ রোপণ করে এবং ৩. বীজ থেকে তৈরি চারা সংগ্রহ করে রোপণ। রোপণ দূরত্ব ঃ সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার। প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার দূরত্ব অন্তর ৫-৬টি চারা রাখা যায়। চারা রোপণের ক্ষেত্রে তা করা যায় বীজ বপনের প্রায় এক মাস পর। সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার এবং সারিতে ৪ দূরত্ব ৮-১৬ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। শল্ককন্দ রোপণ দ্বারা আগাম শস্য উৎপন্ন করা যায়। বিদেশি বড় জাতের পেঁয়াজের বীজ থেকে যে চারা হয় তা থেকে প্রথম বছর বীজ উৎপন্ন করা যায় না। সাধারণত ১-২ সেন্টিমিটার ব্যাসবিশিষ্ট পেঁয়াজ ৩-৪০ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারিতে পেঁয়াজের জাত অনুসারে ৮-১৬ সেন্টিমিটার ব্যবধানে রোপণ করা যেতে পারে। পেঁয়াজের জমি চাষ দিয়ে মাটি ভেঙে দেয়া আগাছা দমন এবং পানি সেচের ব্যবস্থা করা উচিত। সার প্রয়োগ ঃ গোবর, সার, খৈল ও টিএসপি সার জমি প্রস্তুতকালে এবং ইউরিয়া ও মিউরেট অব পটাশ সার চারা ১৫-১৮ সেন্টিমিটার উঁচু হওয়ার পর সারির ফাঁকে মালচিংয়ের আগে ছিটিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে। পরিচর্যা ঃ গেঁড় লাগানো গাছে যে কলি বের হয় তা শুরুতে ভেঙে দিতে হয়। কলি তরকারি কিংবা সালাদরূপে ব্যবহৃত হতে পারে। বীজের উদ্দেশ্যে পেঁয়াজ ফসলের যে অংশ রাখা হয়, সেখানে ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগকালে হেক্টর প্রতি ১০ কেজি হিসেবে টিএসপি সার দ্বিতীয় দফায় প্রয়োগ করা যায়। বীজ উৎপাদন ঃ বীজ তৈরি করার উদ্দেশ্যে বীজ অনেক ঘন করে বোনা যায়। ফলে একই জমি থেকে কয়েকগুণ বেশি সংখ্যায় ছোট আকারের পেঁয়াজ পাওয়া যায়। এগুলো সংরক্ষণ করে পরবর্তী বছরে ঘনভাবে রোপণ করলে সে শস্য থেকে বেশি পরিমাণে বীজ পাওয়া যায়।
ভালো বীজ সংগ্রহ ও পরীক্ষাকরণ ঃ অবশ্যই উন্নত ও মেয়াদ সম্পন্ন বীজ ক্রয় করতে হবে। বিএডিসির বীজ কেন্দ্র থেকে বীজ সংগ্রহ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো। বীজ পরীক্ষাকরণের জন্য ১৪-১৫ ইঞ্চি লম্বা একটি কলাগাছের বাকল দুই পাশের চিকন পাতলা অংশ ফেলে দিয়ে নিচ থেকে ৩ ইঞ্চি পারিমাণ রেখে বাকি অংশ চিরে নিতে হবে। এর মধ্যে ২৫টি বীজ গুণে ভেতরে ঢুকিয়ে বাকলটি বেঁধে ঘরের নিরাপদ কোনো স্থানে রেখে দিতে হবে। যেন আলো ও বাতাস উভয়ের সংস্পর্শে থাকে। এভাবে ৪/৫ দিন রেখে মাঝে মধ্যে একটু পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। তারপর বাঁধ খুলে গুনে দেখতে হবে কটি বীজ গজিয়েছে। যদি প্রতি দশটি বিজের মধ্যে ৮টি বীজ গজায় তাহলে বোঝা যাবে সেটা ভালো বীজ। বীজ একটি পাতলা সুতি কাপড়ে পুকুরের পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট। তারপর কাপড়ের পুটলি একটু ঢিলাঢালা করে মুখ বেঁধে কোনো নিরাপদ যায়গায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এভাবে ৪৮ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখার পর দেখা যাবে বীজের মুখ ফেটে চারার গেরা বের হচ্ছে। মোটামুটি ৮৫ শতাংশ বীজের মুখ ফাটা দেখা গেলে জমিতে ছিটিয়ে হালকা মই দিয়ে মাটি সমান করে দিতে হবে। বীজ বপনের কমপক্ষে ১০-১২ দিন সময় লেগে যায় চারা গজাতে। চারা গজানোর ৩৫-৪০ দিন পর চারা ভাঁজ দিয়ে পাতলা করে প্রয়োজনীয় চারা রেখে মাটিতে হাত দিয়ে মালিশ করে দিলে চারার বৃদ্ধি ভালো হয় এবং মাটির রস অনেক দিন থাকে। উত্তোলিত চারা অন্য জমিতে ওই একই পদ্ধতিতে চাষ দিয়ে মাটি জুয়ায়ে (শোধন করে) নিয়ে ভালো করে মই দিয়ে মাটি চাপিয়ে লাঙ্গল টেনে গর্তে চারা বসিয়ে মাটি ভরাট করে দিতে হয়। এক্ষেত্রে চারা থেকে চারার দূরত্ব ১০-১৫ সেমি. এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৩০ সেমি.। লক্ষ্য রাখতে হবে, চারার সবুজ অংশ অবশ্যই মাটির ওপরে থাকতে হবে। নয়তো চারা পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর বাকি চারা বাজারে বিক্রি করে ভালো অর্থ পাওয়া যায়। অন্যভাবে বীজ থেকে চারা উৎপাদনের জন্য ৩/১ মিটার বীজতলা তৈরি করে মাটি শোধন করে নিন। ফলন ঃ দেশি পেঁয়াজের হেক্টরপ্রতি ফলন ৭-১৫ টন। ফসল সংগ্রহ ঃ পেঁয়াজের গাছ নিজে নিজে শুকিয়ে যায়। তখন পেঁয়াজ ভালোভাবে পরিপক্ব হয় এবং ওঠানোর উপযোগী হয়। সংরক্ষণ ঃ পেঁয়াজ ভালো করে শুকানোর পরে গুদামজাত করতে হয়। গুদাম ঠান্ডা ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থাযুক্ত হওয়া উচিত। গুদামে পরীক্ষা করে পচা ও রোগাক্রান্ত পেঁয়াজ বেছে সরিয়ে ফেলতে হয়। রোগ দমন ঃ গুদামে ও স্থানান্তর কালে ধূসর পচা রোগে পেঁয়াজের ঘাড়ের দিক পচে যায়। সেজন্য জমি থেকে সাবধানে পেঁয়াজ তুলতে হয় এবং গুদামজাত করার আগে পেঁয়াজ ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হয়।

ব্রোকলি চাষ ও পুষ্টিমান বা উপকারিতা

কৃষি প্রতিবেদক ॥  ব্রোকলি ক্রসিফেরী গোত্রের অন্তর্ভুক্ত শীতকালিন সব্জি। এতে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ফোলেট, আঁশ আছে। এই সবজি হৃদরোগ, বহুমূত্র এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। ব্রকলি জারণরোধী) ভিটামিন এ এবং সি সরবরাহ করে কোষের ক্ষতিরোধ করে।

ব্রোকলি দেখতে ফুলকপির মতো। রঙ হয় গাঢ় সবুজ ফুলকপির মতো দুধ সাদা নয়। ব্রকলী হচ্ছে অনেকটা ফুলকপির মতো দেখতে বেগুনি, হলুদ, পিংক ও  সবুজ বর্ণের উদ্ভিদ; যার কুঁড়ি ও কান্ড সবজি হিসাবে খাওয়া হয়। পুষ্টি উপাদানের বিবেচনায় ব্রকলি উচ্চমানের সবজি। এটা ভিটামিন, খনিজ এবং এন্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। মানুষের শরীরের জন্য ব্রকলি একটি আদর্শ খাবার। এটা হার্টের অসুখ দুর করতে এবং ডায়াবেটিকস রোগ প্রশমনে খুবই সহায়ক। প্রতি শতক জায়গায় ২৫-৩০ দিন বয়সের ২০০টি চারা রোপণ করে মাত্র ৫০-৬০ দিন পরই ৪০ মণ ব্রকলী উৎপাদন করা সম্ভব। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকা দামে বিক্রি করে ৭ হাজার টাকা আয় করা যায়। অথচ শতক প্রতি জমি তৈরি, বীজ, সার ও অন্যান্যসহ সর্বোচ্চ মোট খরচ ১ হাজার টাকা। যা অন্যান্য ফসল চাষের তুলনায় লাভজনক। ব্রকলী সাধারণত দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে ভাল হয়। মাটি ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে তৈরি করতে হয়। মধ্য ভাদ্র-মধ্য পৌষ এর মধ্য বীজ বপন ও চারা রোপণ করতে হয়। ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করতে হয়। এরপর একর প্রতি গোবর ৬ টন, ইউরিয়া ১০০ কেজি, টি এস পি ৭০ কেজি ও পটাশ ৫৫ কেজি প্রয়োগ করতে হবে ।  মাটি ও জলবায়ু ঃ  ফুলকপি ও ব্রোকলির জলবায়ু প্রায় একই রকম। তবে  ব্রোকলির পারিপার্শ্বিক উপযোগিতার সীমা একটু বেশি বিস্তৃত। তবে ফুলকপির তুলনায় এটি উচ্চতাপমাত্রা ও খরা বেশি সহ্য করতে পারে।  ব্রোকলি ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো জন্মে। ব্রোকলি এপ্রিল মাসের পরেও ভালো ফলন দিতে পারে। জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ উর্বর দো-আঁশ উঁচু জমি এবং মাটির পিএইচ মান ৬-৭ হওয়া ব্রোকলি চাষের জন্য সর্বোত্তম। জাত ঃ  আমাদের দেশে ব্রোকলির কোনো মুক্তায়িত জাত নেই। তবে বিভিন্ন বীজ কোম্পানি বিদেশ থেকে ব্রোকলির সাধারণ ও শঙ্কর উভয় প্রকার জাত আমদানি করে বাজারজাত করছে। উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হচ্ছে- প্রিমিয়াম ক্রপ, গ্রিন কমেট, গ্রিন ডিউক, ক্রুসেডার, ডিসিক্কো, টপার-৪৩, ডান্ডি, ইতালিয়ান গ্রিন, ¯প্রডিটিং টেক্সাস ১০৭, ওয়ালথাম ২৯, গ্রিন মাউন্টেইল, গ্রীন বাড। বীজ বপনের সময় ঃ  আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষার পর পরই আগাম জমি প্রস্তুত করতে হয়। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে (ভাদ্র থেকে কার্তিক) পর্যন্ত বীজতলায় ব্রোকলির বীজ বুনতে হয়। বীজের পরিমাণ ঃ  প্রতি হেক্টর আবাদের জন্য ১৫০ গ্রাম বীজ লাগে। চারা উৎপাদন ঃ  পাতা পচা সার বা  গোবর সার ১ ভাগ, বালু ১ ভাগ ও মাটি ২ ভাগ মিশিয়ে ব্রোকলির বীজতল তৈরি করতে হয়। বীতলার মাপ হচ্ছে ১ মিটার প্রস্থ, ৩ মিটা দৈর্ঘ্য ও ১৫  সেমি. উচ্চতা। ১ হেক্টর জমিতে রোপণের জন্য এরূপ ২০টি বীজতলায় চারা তৈরির প্রয়োজন হবে। বীজতলার উপরিভাগে ৫ সেমি. দূরে দূরে সারি করে ১-২ সেমি. দূরে বীজবপন করা হয়। বীজতলায় চারাকে রোদ বৃষ্টি হতে রক্ষার জন্য আচ্ছাদন বা চাটাইয়ের ব্যবস্থা রাখা উচিত। সকালে-বিকেলে  সেচ দেয়ার পর একটি শক্ত কাঠি দ্বারা বীজতলা সাবধানে খুঁচিয়ে নিড়িয়ে দিতে হয়।

জমি তৈরি ঃ  সারাদিন রোদ পায় এমন জমি ব্রোকলি চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। আবাদের জন্য গভীর চাষ দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। এরপর ২ সারিতে চারা রোপণের জন্য ১ মিটার চওড়া ও ১৫-২০ সেমি. উঁচু মিড়ি বা  বেড তৈরি করতে হবে। সেচ ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধার জন্য মিড়িতে চারা  রোপণ করাই ভালো। মিড়ির দৈর্ঘ্য জমির সাইজ এবং কাজের সুবিধা বিবেচনা করে যত ইচ্ছা করা যেতে পারে। পাশাপাশি দুই মিড়ির মাঝখানে ৩০ সেমি. চওড়া এবং ১৫-২০ সেমি. গভীর নালা থাকবে। নালার মাটি তুলেই মিড়ি তৈরি করা হয়। সেচ দেয়া এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা অত্যন্ত জরুরি।

সার প্রয়োগঃ  প্রতি হেক্টরে গোবর ১৫ হাজার কেজি, ইউরিয়া ২৫০ কেজি, এমপি ২০০ কেজি, টিএসপি ১৫০ কেজি এবং প্রতি চারায় পচা খৈল ৫০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হয়।

চারা রোপণ ঃ  বীজতলায় চারা ৫-৬টি পাতা হলে প্রধান জমিতে রোপণ করতে হয়। সে সময় চারার উচ্চতা ৮-১০ সেমি. হয়। তবে ৪-৬ সপ্তাহ বয়সের চারা  রোপণ সবচেয়ে উত্তম। ৬০  সেমি. ব্যবধানে সারি করে সারিতে ৫০ সেমি. দূরত্বে চারা লাগানো হয়। ভালা ফলনের জন্য চারার বয়স কম হওয়া বাঞ্ছনীয়।

পরবর্তী পরিচর্যা ঃ  রোপণের পর প্রথম ৪-৫ দিন পর্যন্ত এক দিন পর পর  সেচ দিতে হবে। পরবর্তীতে ৮-১০ দিন অন্তর বা প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিলেই চলবে। সেচ পরবর্তী জমিতে ‘জো’ আসলে  ব্রোকলির বৃদ্ধির জন্য মাটির চটা ভেঙে দিতে হবে এবং জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। সারের উপরি প্রয়োগ যথাসময়ে করতে হবে। উল্লেখ্য, সারের উপরি প্রয়োগের পর অবশ্যই জমিতে সেচ দিতে হবে। এ ছাড়া পানি সেচ ও নিষ্কাশনের জন্য বেড সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন ঃ  ব্রোকলি রোপণের ৬০-৭০ দিনের মধ্যে অগ্রীম পুষ্পমঞ্জরি সংগ্রহের উপযুক্ত সময়। ধারালো ছুরি দ্বারা তিন ইঞ্চি কান্ডসহ পুষ্পমঞ্জরি কেটে সংগ্রহ করতে হয়। এভাবে একই জমি থেকে ১ মাসব্যাপী কয়েকবার ব্রোকলির উৎপাদন পাওয়া যায়। পুষ্পমঞ্জরির রঙ ফ্যাকাশে বা ঢিলা হওয়ার আগে মোটামুটি জমাটবাঁধা অবস্থায় সংগ্রহ করা উচিত। এর বর্ণ তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায় বিধায় পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করে খাওয়া বা দ্রুত বাজারজাত করা উচিত। এজন্য অনেক দেশে পলিথিনের প্যাকেটে একে বাজারজাত করা হয়।  ব্রোকলির ফলন প্রতি হেক্টরে ১০-১৫ টন।

পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ঃ  সরুই পোকা বা ডায়মন্ড ব্যাক মথ : এ পোকার আক্রমণে কচি পাতা, ডগা ও কপি খেয়ে নষ্ট করে। পাতার ওপরের ত্বক বা সবুজ অংশ কুরে কুরে খাওয়ার ফলে সেসব অংশ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। আক্রান্ত পাতা সবুজ রঙবিহীন জালের মতো দেখায়। ব্যাপক আক্রমণে পাতা শুকিয়ে মরে যায়। কচি গাছের বর্ধনশীল অংশে এ পোকার আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হয। আক্রান্ত ব্রোকলি খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। এদের ব্যাপক আক্রমণে ব্রকলি উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে পারে।

দমন ব্যবস্থা ঃ  ফসল সংগ্রহের পর ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়য়ে ফেলা এবং পরে জমি ভালো করে চাষ করা। আক্রান্ত পাতার পোকা ২-৩ বার হাতে ধরে মেরে  ফেললে এ পোকা অনেকাংশে দমন করা যায়। পিঁপড়া এবং মাকড়সা এ পোকার কীড়া খায়। বহু রকমের বোলতা যেমন ট্রাইকোগ্রামা, কোটেসিস ইত্যাদি এ পোকার ডিম কীড়াকে ধ্বংস করে ফেলে। ব্যাসিলাস ফুরিনাজিয়েনসিস (বিটি) প্রয়োগ করে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জমি জরিপ করে যদি প্রয়োজন হয় তখন সঠিক নিয়মে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

জাব পোকা ঃ  জাব পোকা একটি অন্যতম প্রধান ক্ষতিকারক পোকা। অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় অবস্থাতেই দলবদ্ধভাবে গাছের নতুন ডগা, পাতা, ফুল, ফল ইত্যাদির রস চুষে খায়। ফলে পাতা বিকৃত হয়ে যায়, বৃদ্ধি ব্যাহত হয় ও প্রায়শ নিচের দিকে কুঁকড়ানো দেখায়। জাব পোকা শরীরের  পেছন দিকে অবস্থিত দুটি নল দিয়ে মধুর মতো এক প্রকার রস নিঃসৃত করে। এ রসে পাতা ও কান্ডে সুটিমোল্ড নামক এক প্রকার কলো রঙের ছত্রাক জন্মায়। এর ফলে গাছের সবুজ অংশ ঢেকে যায় এবং সালোকসংশে ষণ ক্রিয়া বিঘিœত হয়। মেঘলা, কুয়াশাচ্ছন্ন এবং ঠান্ডা আবহাওয়ায় জাব পোকার বংশ বৃদ্ধি  বেশি হয়। তবে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হলে এদের সংখ্যা কমে যায়।

দমন ব্যবস্থা ঃ  প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাব পোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা যায়। নিম বীজের দ্রবণ (১ কেজি পরিমাণ অর্ধভাঙা নিমবীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) বা সাবানঘোলা পানি (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২ চা চামচ গুঁড়া সাবান মেশাতে হবে) ¯েপ্র করেও এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমানো যায়। লেডিবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ  পোকা ও কীড়া এবং সিরফিড ফ্লাইয়ের কীড়া জাব পেকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে দমন করে। সুতরাং উপরোক্ত বন্ধু পোকাগুলো সংরক্ষণ করলে এ  পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শুধু আক্রান্ত স্থানগুলো কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিষক্রিয়াসম্পন্ন কীটনাশক, যেমন- ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।

কাটুই পোকা ঃ  চারা অবস্থায় কাটুই পোকার আক্রমণে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়ে থাকে। এ পোকা সাধারণত চারা গাছের ক্ষতি করে থাকে। দিনের বেলা কাটুই পোকার কীড়া মাটির ফাটলে, মাটির ঢেলায় এবং আবর্জনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। পোকা রাতের বেলা বের হয়ে ব্রোকলির চারা গাছ কেটে  ফেলে। ভোর বেলা  ক্ষেতে কাটা গাছের কাছে মাটি খুঁড়লে কাটুই পোকার কীড়া দেখতে পাওয়া যায়। কাটুই পোকার ব্যাপক আক্রমণে জমিতে ব্রোকলির গাছের সংখ্যা কমে যায় বলে ফলনও কম হয়।

দমন ব্যবস্থা ঃ  পোকা দমনের জন্য ভোরে কাটা চারার গোড়ার মাটি খুঁড়ে কীড়াগুলো মেরে ফেলা উচিত। টর্চ বা হারিকেন নিয়ে রাতে কাটুইপোকার কীড়া সংগ্রহ করে মেরে ফেলা যায়। ক্ষেতে সেচ দিলে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কীড়া মাটির ওপরে উঠে আসে। ফলে সহজে পাখি এদের ধরে খায় এবং হাত দিয়ে মেরে ফেলা যায়। বিষটোপ দিয়ে এ পোকা দমন করা যায়। বিষটোপ হিসেবে শতাংশ প্রতি ২ গ্রাম সেভিন/কার্বোরিল ৮৫ ডবলিউপি অথবা পাদান ৫০ এসপি, ৪০০ গ্রাম গম বা ধানের কুঁড়ার সাথে পরিমাণমতো পানিতে মিশিয়ে এমন একটি বিষটোপ তৈরি করতে হবে যা হাত দিয়ে ছিটানো যায়। এ বিষটোপ সন্ধ্যায় আক্রান্ত ক্ষেতে চারা গাছের গোড়ায় ছিটিয়ে প্রয়োগ করলে কাটুই পোকার কীড়া দমন সহজ হয়। আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

রোগবালাই : দাগ রোগঃ  এ রোগ হলে পাতায় বাদামি রঙের চক্রাকার দাগ পড়ে। দাগগুলো অসম আকারের হয়ে থাকে। দাগ অনেকটা চাক চাক আকারে পর পর সাজানো কতগুলো বলয়ের মতো দেখা যায়। অধিক আক্রান্ত পাতা শুকিয়ে যায়। ফলে অসংখ্য  ছোট ছোট কালচে দাগ দেখা যায়। আক্রান্ত ফসলের বীজ পরিপুষ্ট না হয়ে চিটা হয় এবং ফলন কমে যায়।

দমন ব্যবস্থা ঃ  রোগ দমনের জন্য সুষম সার ও নিয়মিত সেচের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উপযুক্ত শস্য পর্যায় করা। সঠিক দূরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। অনুমোদিত ছত্রাকনাশক যেমন- ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম রোভরাল মিশিয়ে গাছের ১০-১২ দিন অন্তর ¯েপ্র করা উচিত।

দেশে এখন সারা বছর প্রচুর পরিমাণে টমেটো চাষ হচ্ছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশে এখন সারা বছর প্রচুর পরিমাণে টমেটো পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে ৫০টির বেশি জাতের টমেটো চাষ হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ হাজার একর জমিতে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার লাখ টন টমেটো উৎপাদন হয়। তবুও ভরা মৌসুমে টমেটোর দাম কমছে না। বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটা সময় টমেটোর জন্য শীত মৌসুমের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। তখন শীতের প্রথম দিকে দাম বেশি থাকত। পরে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ দাম ক্রেতার হাতের নাগালে আসত। কিন্তু বর্তমানে অনেক নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হয়েছে। সঙ্গে হচ্ছে হাইব্রিড জাতের টমেটোর চাষ। এতে চাহিদার তুলনায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে টমেটো। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেই আগের মতো করেই টমেটো বিক্রি করছেন। মৌসুমের আগে ও পরে বেশি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের পকেট কাটছেন। জানা গেছে, শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা বিশ্বেই সবজি ফসলের মধ্যে আলু ও মিষ্টি আলুর পরই সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় টমেটো। কেননা টমেটো একটি অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। কাঁচা ও পাকা উভয় টমেটোই দেহের জন্য উপকারী। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিনা) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বেশকিছু আধুনিক হাইব্রিড উচ্চফলনশীল জাতের টমেটোর জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যেগুলো থেকে মৌসুম ছাড়াও ভালো ফলন হচ্ছে। এছাড়া কিছু হাইব্রিড জাত বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে এখন পঞ্চাশের ওপরে টমেটোর জাত চাষ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুম ছাড়া ভালো ফলন হওয়ায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের টমেটো চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে গ্রীষ্মকালে টমেটো চাষের প্রবণতা বেড়েছে। তবে রাজধানীর বাজার দর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শুক্রবার লাল টমেটো প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা। সপ্তাহখানেক আগেও একই দামে বিক্রি হয়েছে। কিন্তু দু’সপ্তাহ আগে এ সবজি রাজধানীর বাজারে বিক্রি হয় ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। এছাড়া গ্রীষ্ম মৌসুমেও বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকার ওপরে। কারওয়ানবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা আসমা বেগম বলেন, এখন সারা বছর টমেটোর চাষ করা হয়। বাজারেও পাওয়া যায় প্রচুর। কিন্তু দাম খুব বেশি। তবে শীতের সময় তুলনামূলক দাম কিছুটা কমলেও অন্য মৌসুমে চড়া দাম দিয়ে কিনতে হয়। একই বাজারে সবজি বিক্রেতা সোনাই আলী বলেন, আগে টমেটো শুধু শীতের সময় পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এ সবজি বছরের সবসময় পাওয়া যায়। শীতে দাম কিছুটা কম থাকলেও অন্যান্য সময় খুব চড়া দামে বিক্রি করতে হয়। কারণ পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দামে আনতে হয়। এর জন্য খুচরা বাজারেও এ সবজির দাম বেশি থাকে। বারি ও বিনা সূত্রে জানা গেছে, দেশে আগাম জাতের মধ্যে যে চমেটো চাষ করা হয় তা শীতকালেই উৎপাদন হয়। তবে আগাম ভাবে ফলে। এ আগাম জাতগুলোর বীজ বপন করা হয় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে। আর এ জাতগুলো হচ্ছে- বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫, রোমা ভিএফ, রোমারিও, টিপু সুলতান, গ্রেট পেলে, ডেল্টা এফ ১, উন্নয়ন এফ ১, পুষারুবী, নিউ রূপালী এফ ১ ইত্যাদি। এছাড়া ভরা মৌসুমে শীতকালে স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে যেসব জাতের গাছে ফল ধরে তা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বীজ বুনে অক্টোবর-নভেম্বরে এসব জাতের টমেটোর চারা রোপণ করা হয়। অধিকাংশ জাতই শীতকালে ফলে। এসব জাতের মধ্য আছে- মানিক, রতন, বারি টমেটো ৩, বারি টমেটো ৬, বারি টমেটো ৭, বারি টমেটো ৯, বাহার, মহুয়া ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে নাবি শীত মৌসুমী জাত। এ জাতের বীজ বুনতে হয় জানুয়ারিতে। ফল পাওয়া যায় মার্চ-এপ্রিলে। বাহার, রোমা ভিএফ, রাজা, সুরক্ষা ইত্যাদি জাত নাবি জাতের টমেটো চাষ করা হয়। তবে সারা বছর চাষের উপযোগী জাতের টমেটো বছরের যে কোনো সময় বীজ বুনন করা যায়। আর এর জাত হচ্ছে বারি টমেটো ৬ (চৈতী)।

মিরপুরে আইএফএমসি’র মাঠ দিবসে বিভূতি ভূষন সরকার

কৃষকদের উন্নয়নের জন্যই সর্বদা কাজ করে যাচ্ছি

আমলা অফিস ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে কৃষক মাঠ স্কুলে মাঠ দিবস অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের গোপালপুর কৃষক মাঠ স্কুলে মিরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অফিসের উদ্যোগে আইএফএমসি প্রকল্পের আওতায় এ মাঠ দিবস অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। মাঠ দিবস অনুষ্ঠানে মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ বিভূতি ভূষন সরকার। এসময় তিনি বলেন, আপনারা যারা এই কৃষক মাঠ স্কুল থেকে প্রশিক্ষন গ্রহণ করছেন তারা সকলেই আপনাদের বাস্তব জীবনে সেট করবেন। আপনার আপনাদের আসে পাশের কৃষকদের তা শেখাবেন। একটি বসত বাড়ীতে কিভাবে পরিকল্পিতভাবে একটি খামার করা যায় তা আপনারা শিখেছেন। আশা করছি সেগুলো যার যার বাড়ীতে করবেন। তিনি আরো বলেন, আপনারা কৃষক মাঠ স্কুলের একজন কৃষক একজন সৈনিকের মতো। আপনাদের দেখাদেখি অন্য কৃষকরা চাষাবাদ করবেন। তিনি আরো বলেন, একমাত্র কৃষি বিভাগ এমন একটি বিভাগ যা মানুষকে বিনা পয়সায় সেবা প্রদান করে থাকে। আপনারা কৃষকরা আপনাদের ফসলের যে কোন সমস্যা আমাদের জানান। আমরা সেটা সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহন করবো। আমরা কৃষকদের উন্নয়নের জন্যই সর্বদা কাজ করে যাচ্ছি। অনুষ্ঠানে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল আলীমের পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (সংস্থাপন) কৃষিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাক, কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ বিভাষ চন্দ্র সাহা, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিম হোসেন, মিরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাবিহা সুলতানা, উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষন কর্মকর্তা ফকির মহাম্মদ, কৃষক মাঠ স্কুলের প্রশিক্ষক মনিরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, মাহমুদা খাতুন। অনুষ্ঠানে ২৫টি কৃষক পরিবারে প্রশিক্ষন শেষে সনদপত্র ও কৃষি কথা এবং নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।

দেশের অপুষ্টির চিত্র পাল্টাতে ডিম খাওয়ার প্রবণতা বাড়াতে হবে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে বেশি করে ডিম খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে দেশের অপুষ্টির চিত্র পাল্টে যাবে। বতর্মানে  দেশে দৈনিক ডিম উৎপাদন হয় কমবেশি ৩ কোটি ৮০ লাখ। পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, সারাদেশে বতর্মানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামারে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ। আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশে ৭টি গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম আছে। প্যারেন্টস্টক বা পিএস ফামের্র সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ২০১৪ সালে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হতো প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। বছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৬৩৯ কোটি। মাথাপিছু খাওয়া হতো প্রায় ৪১টি। ২০১৫ সালে ডিম দিনে উৎপাদন হতো প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ। বছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ৭১২ কোটি। মাথাপিছু খাওয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫টি। ২০১৬ সালে দিনে উৎপাদন হয় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ। বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৮২১ কোটি। বতর্মানে মাথাপিছু খাওয়া হয় প্রায় ৫১টি। এই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪  কোটি ৫ লাখ ডিম। আর তখন মাথাপিছু কনজাম্পশন হবে প্রায় ৮৬টি। ডিম দিবসে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সাল নাগাদ যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করতে হলে ডিমের মাথাপিছু কনজাম্পশন অন্তত দ্বিগুণ করতে হবে। প্রতিটি মানুষকে দৈনিক অন্তত একটি করে ডিম খাওয়ার অভ্যাস করার মতো আর্থিক সক্ষমতায় উন্নীত করতে হবে।’ প্রকৃতপক্ষে মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে এই পোল্ট্রি শিল্প। প্রাণিজ  প্রোটিনের অন্যতম উৎস হলো ডিম। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, চর্বি একেবারে খাওয়া ভালো নয়, কথাটা সঠিক নয়। যা ভালো নয়, তা হলো সম্পৃক্ত চর্বি এবং ট্রান্সফ্যাট। গরু খাসির মাংসের জমাট চর্বি, ঘি, মাখন, ক্রিম, পেস্ট্রি ও ডিপ ফ্রাই খাবারে আছে এ ধরনের ক্ষতিকর চর্বি। বাদ দিতে হলে এগুলো বাদ দিন। আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে কেবল অস্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেওয়া নয়। আমরা জানি, প্রাণিজ প্রোটিনের মধ্যে ডিম অন্যতম। ডিমে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, যা হৃদরোগসহ অনেক রোগের বিরুদ্ধে বেশ কার্যকরী। সাধারণ হিসেবে ১০০ গ্রাম খাসির মাংস থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায়, সেই একই পরিমাণ প্রোটিন মেলে ৪টি ডিম থেকে। হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নারীদের অ্যাডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবতীর্কালে সপ্তাহে কমপক্ষে ৬টি ডিম  খেলে ব্রেস্ট ক্যানসারের সম্ভাবনা প্রায় ৪৪ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা ডিমকে একটি ‘পরিপূর্ণ খাদ্য’ বা কমপ্লিট ফুড বা সুপার ফুড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ডিমের মতো এত স্বল্পমূল্যের প্রাণিজ আমিষ দ্বিতীয়টি নেই। কমর্সংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ মাংস ও আমিষের যোগানদাতা হিসেবেও অবদান রাখছে- পোল্ট্রি শিল্প। ভুট্টা ও সয়াবিনের সমন্বয়ে অর্গানিক পদ্ধতিতে বতর্মানে উৎপাদন হচ্ছে এ শিল্পের খাবার। ফলে আমিষের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদনও। নতুন আশা নিয়ে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, ২০২১ সাল নাগাদ দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। তার মানে অর্থনীতিতে এই শিল্পের অবদান ও ভূমিকা ব্যাপকতর হওয়ার বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে।

বিপিআইসিসি সূত্রে জানা গেছে, আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশে গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম আছে। প্যারেন্টস্টক বা পিএস ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। আশার খবর হচ্ছে এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। আধুনিক হ্যাচারিগুলোতে যান্ত্রিক উপায়ে সপ্তাহে এক কোটি ১০ লাখেরও বেশি ডিম ফোটানো হয়। মুরগি পালনের ক্ষেত্রেও যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। খাবার ও পানি সরবরাহ, ডিম সংগ্রহ সবকিছু স্বয়ংক্রিয় উপায়ে করা হয়। ফলে ভোক্তারা সহজেই স্বাস্থ্যকর-জীবাণুমুক্ত ডিম ও মুরগির মাংস পাচ্ছেন। পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে ছয়টি পোল্ট্রি ফার্ম স্থাপনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৮০ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। গত তিন দশকে তা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পখাতে রূপ নিয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিল্পের ওপর নিভর্রশীল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে বছরে গড়ে ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৪৫-৫০টি। তবে আশার খবর হলো ডিম শুধু পুষ্টি উপাদেয় খাবার হিসেবে অসুখ অসুস্থতায় অথবা অতিথি আপ্যায়নে নয়Ñ প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিমের গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়েছে। লেখক ঃ এস এম মুকুল, কৃষি ও অথর্নীতি বিশ্লেষক।

সময় বাঁচাবে , কমাবে খরচ

বাজারে এলো খড় ও ঘাস কাটা মেশিন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষি প্রধান বাংলাদেশে গবাদিপশু পালন একটি লাভজনক কাজ। গবাদিপশুর অন্যতম খাবার খড় ও ঘাস। এসব গোখাদ্য ছোট ছোট টুকরা করে কটে পশুকে খাওয়ানো হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে খড় ও ঘাস টুকরো করে কাটা সময় সাপেক্ষ। এতে করে খরচ বাড়ে। কৃষকদের কথা মাথায় রেখে খামারিদের জন্য স্বল্প দামে খড়, ঘাস ও ভুট্টা গাছ কাটার মেশিন নিয়ে এলো ‘ডিএমআরই’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই মেশিন খামারিদের সময় বাঁচাবে এবং খরচও কমাবে। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী দামে ধান কাটার মেশিন বাজারে নিয়ে আসে। মেশিনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এবার প্রতিষ্ঠানটি আনলো ঘাস কাটা মেশিন। খড়, ঘাস ও ভুট্টা গাছ কাটার এই মেশিনটি বিদ্যুৎ চালিত। এটি দিয়ে ধান, গম ও ভুট্টার খড় গবাদি পশুকে খাওয়ানোর উপযোগী করে ছোট ছোট টুকরা করে কাটা যায়। এ ছাড়াও সকল প্রকার ঘাস, ভুট্টা গাছ এবং অন্যান্য গো-খাদ্য যেমন গাছের পাতা টুকরো করে কাটা যায়। মেশিনটি ঘরে বসেই অনলাইনে কেনার সুযোগ রয়েছে। আছে হোম  ডেলিভারির সুবিধাও। ‘ডিএমআরই’-এর প্রধান নির্বাহী জি.এ.টুটুল বলেন, ‘খড়, ঘাস ও ভুট্টা গাছ কাটার মেশিনটি মূলত চীন থেকে আমদানি করা। এটি একটি বিদ্যুৎ চালিত দীর্ঘ টেকসই সম্পন্ন সাশ্রয়ী মেশিন। এটি খুব সহজেই বহনযোগ্য।’ দুই হর্সপাওয়ারের এই মেশিনটিতে মোটর রয়েছে। এই যন্ত্র দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ৮০০ থেকে ১০০০ কেজি খড়, ঘাস ও ভুট্টা কাটা যাবে। যার ফলে অল্প বিদ্যুৎ খরচে কৃষক এবং খামারীরা অনেক বেশি লাভবান হবেন। কৃষক ও খামারীদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই অনেক কম দামে শতভাগ গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করেই মডেলের এই মেশিনটি বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমে সারাদেশে বিক্রি করছে ‘ডিএমআরই’। যারা অনলাইনের মাধ্যমে মেশিনটি কিনবেন তাদেরকে এটি ব্যবহারের কায়দা-কানুনও সুন্দরভাবে ভিডিও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে শেখাবে প্রতিষ্ঠানটি। এটি পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রশিক্ষক এবং বিক্রয়োত্তর সেবাও মিলবে। এই  মেশিনে থাকছে ১ বছরের সার্ভিস ওয়ারেন্টি। বাংলাদেশের যেকোনো জায়গা  থেকে সরাসরি ফোন করেও অর্ডার করা যাবে। মেশিনটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কৃষকের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হবে।

গবাদিপশুর খুরা রোগের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশে গবাদিপশুর খুরা রোগের ভয়াবহ প্রকোপ রয়েছে। এতদিন এ রোগের ভ্যাকসিনের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ হতো। সেটা অপ্রতুলও ছিল। এ ছাড়া এসব ভ্যাকসিন ব্যয়বহুল হওয়াতে অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে পশুর মৃত্যু হতো। আবার চিকিৎসা করিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়তেন খামারিরা। কিন্তু এখন দেশেই এই সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। উচ্চশিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্পের (হেকেপ) আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুজীব অনুষদের অধ্যাপক এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে ১৭ সদস্যের একদল গবেষক এ কৃতিত্ব দেখিয়েছে। মঙ্গলবার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন সম্পর্কে জানাতে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সোহরাব হোসেইন, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ গবেষক দলের সদস্য ও অন্যরা। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় হকেপ প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা এই বিরাট আবিষ্কার করেছেন। এতে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত অনেক এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, আগে খুরা রোগের যেসব ভ্যাকসিন পাওয়া যেত সেসব ১২০ থেকে ২০০ টাকা দামে বিক্রি হতো। এ কারণে দরিদ্র অনেক খামারি চিকিৎসা করাতে পারতেন না। আবার অন্য দেশ থেকে আনা এসব ভ্যাকসিন যে ভাইরাসের জন্য কার্যকর, দেশের পশু ঠিক সে ভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়াতে সেটা অনেক সময় কার্যকর হতো না। এ আবিষ্কারের ফলে এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে প্রতিটি ভ্যাকসিন কিনতে পারবেন খামারিরা। ভ্যাকসিন সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি আবিষ্কারের জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে আক্রান্ত পশুর টিস্যুর নমুনা নেওয়া হয়েছে। এরপর গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে খুরা রোগের ভাইরাসে তিনটি সেরোটাইপ সঞ্চারণশীল রয়েছে। এর মধ্য থেকে বিভিন্ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাইরাস স্ট্রেইনগুলোকে ‘ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এসবের সম্পূর্ণ জীবনরহস্য উন্মোচনপূর্বক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাজারে বিদ্যমান আমদানিকৃত ভ্যাকসিন ভাইরাসের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পাওয়া গেছে।

যেভাবে প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করছে ব্রয়লার মুরগি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চিকিৎসকরা গরু বা খাসির মাংস থেকে দূরে থাকতে বলেন। ফলে বাধ্য হয়ে ঝুঁকতে হয় মুরগির দিকে। কিন্তু প্রতিদিন এতো মুরগি পাওয়াও মুশকিল। তাই কৃত্রিম উপায়ে প্রজনন বাড়িয়ে বাজারে বিক্রি করা হয় ‘ব্রয়লার মুরগি’। এদিকে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে উঠে এসেছে ব্রয়লার মুরগির ক্ষতিকর দিক। মানুষ তবে খাবে কী? প্রতিবেদনে বলা হয়, মুরগির মাংসে প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন এ, বি ও ডি থাকে। আর এসবের জন্য ব্রয়লার মুরগিকে কম সময়ে মোটা করার জন্য সিনথেটিক হরমোন দেওয়া হয়। যা মানুষের প্রজনন ক্ষমতার ব্যাঘাত ঘটায়। শুধু তা-ই নয়, ব্রয়লার মুরগি রান্না করার সময় তাপমাত্রা বেশি রাখতে হয়, যা কারসিনোজেনিক নামে এক পদার্থ তৈরি করে। এই পদার্থ মানব শরীরে ক্যান্সারের জন্ম দিতে পারে। সূত্র জানায়, ব্রয়লার মুরগি যাতে সুস্থ থাকে, সে জন্য তাদের শরীরে আর্সেনিক প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই রাসায়নিক পদার্থ মানব শরীরের জন্য একেবারেই ঠিক নয়। যার ফলে ডায়াবেটিস, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা ও ক্যান্সার হতে পারে। ব্রয়লার মুরগিতে ফাইবার খুবই কম থাকে, কিন্তু ক্যালোরি থাকে প্রচুর পরিমাণে। যে কারণে শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাব থাকায় মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব কমে যায়। এসব মুরগিতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক থাকায় মানুষের ব্রেনের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। এর ফলে নিউরোলজিক্যাল সমস্যাও হতে পারে। এখন কথা হচ্ছে- শুধু খাওয়ার জন্যই এ ধরনের মুরগি বড় করা হয়। এরা ডিম পাড়ে না। ১০-১২ সপ্তাহের মধ্যেই এরা বেড়ে ওঠে এবং বিক্রি করে দেওয়া হয় পোলট্রি বাজারে। তাহলে এই মুরগি আসলে কতটাই স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে?

বিপুল পরিমান জাল ও নৌকা জব্দ

কুমারখালীতে ইলিশ শিকারের দায়ে ১৬ জেলের কারাদন্ড

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার করায় কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ১৬ জন জেলেকে আটকসহ প্রায় ৪০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল, তিনটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা ও প্রায় ১২ কেজি ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার ভোর রাত ৩টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট রাজীবুল ইসলাম খান পদ্মা নদীতে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার মো: রোকনুজ্জামান, থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) কমলেশ দাস ও উপ পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল আলম সঙ্গীয় ফোর্সসহ উপস্থিত ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজীবুল ইসলাম খান তাঁর নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, পদ্মা নদীর শিলাইদহ ইউনিয়ন ও জগন্নাথপুর ইউনিয়ন এলাকা থেকে সরকারি আইন অমান্য করে ইলিশ মাছ শিকারের সময় ১৬ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন- মো: রিপন হোসেন, মো: শামীম, মো: খলিল হোসেন, আলামিন, মো: আব্দুল গাফফার, মো: শহিদুল ইসলাম, মুন্নাফ শেখ, ইমান মন্ডল, মো: ছয়েন উদ্দিন, মো: নুরুল ইসলাম, মো: রইচ উদ্দিন, সাহেব আলী, আব্দুল্লাহ. মো: শফিকুল ইসলাম, আব্দুল খালেক ও আলিফ কাজী। অভিযান শেষে আটককৃত প্রত্যেককে সরকারি আইন অমান্য করে ইলিশ মাছ শিকারের অপরাধে দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ১৮৮ ধারা মোতাবেক ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে এবং জব্দকৃত প্রায় ৪০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল শিলাইদহ খেয়াঘট এলাকায় স্থানীয়দের উপস্থিতিতে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং জব্দৃকত ইলিশ মাছ স্থানীয় বাহারুল উলুম আদর্শ বালিকা মাদরাসায় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও জব্দকৃত তিনটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা স্থানীয় ইউপি সদস্য মো: শরিফুল ইসলামের জিম্মায় রাখা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে ডিম উত্পাদন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ডিমের উৎপাদন ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তবে উৎপাদন বাড়াতে ইতোমধ্যেই তারা উদ্যোগও নিয়েছেন। বিশ্ব ডিম দিবসের আলোচনায় বক্তারা এ তথ্য জানান।
গত শুক্রবার সিরডাপ মিলনায়তনে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে। আলোচনা সভার প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডাঃ হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক। সভায় বিপিআইসিসি’র সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, বিগত প্রায় এক বছর ডিমের দাম না পেয়ে অনেকেই খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এইচ৯এন১ ভাইরাসের সংক্রমণে ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। সার্বিক বিচারে ডিমের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে উদ্যোক্তারা উত্পাদন বাড়াতে ইতোমধ্যেই উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, চাল, চিনি, দুধ, আটা এমনকি লবণের বিজ্ঞাপনও গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় কিন্তু সাধারণত ডিমের কোন বিজ্ঞাপন দেখা যায় না আমাদের দেশে। ডিম বিক্রি থেকে যে লাভ পাওয়া যায় তা দিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারের খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাচ্চারা যেন সপ্তাহে অন্তত দু’টি ডিম খায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। ডাঃ হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের আদলে বাংলাদেশেও একটি এগ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন। নকল ডিম উৎপাদন বিষয়ে বলেন, নকল ডিম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সম্ভব নয়। ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, ডিমের চাহিদা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিপিআইসিসি’র হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে ডিমের বাণিজ্যিক উত্পাদন দৈনিক প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৬৬৫ কোটি পিস। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর -এই তিন মাসে ডিমের মোট উৎপাদন হয়েছে ৪৩৩ কোটি পিস। প্রতিটি ডিমের গড় মূল্য ৭ টাকা ধরা হলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রায় ১০ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার ডিম কেন্দ্রিক বাণিজ্য হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ১১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকারও অধিক ডিম কেন্দ্রিক বাণিজ্য হবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী এবং বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন নাহার নাহিদ বলেন, ডিম নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ডিম হার্টের জন্য উপকারী, ডিম খেয়ে ওজন কমানো যায়, ব্রেন ডেভেলপমেন্ট এবং হাড় মজবুত করতে ডিম অত্যন্ত কার্যকর। ডায়াবেটিসের রোগীরাও ডিম খেতে পারবেন। অনেকে ডিমের কুসুম না খেয়ে সাদা অংশ খান এতে তারা ডিমের পরিপূর্ণ পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ছাগল উতপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীতে চতুর্থ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ছাগল উপাদনে বাংলাদেশ বিশে^ চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের ফুড এ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট বিশে^র অন্যতম সেরা জাত বিবেচিত হয়েছে। বিশে^ যে পাঁচটি দেশে দ্রুত হারে ছাগল উৎপাদন বাড়ছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। এক সময় খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও আশপাশের চার জেলায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন ছিল  বেশি। বর্তমানে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রায় প্রতিটি জেলায় ব্ল্যাক  বেঙ্গলের উৎপাদন বেড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব, দেশে লালন-পালন হওয়া ছাগলের সংখ্যা প্রায় পৌনে তিন কোটি। বছরে বিক্রিযোগ্য হয় এক কোটিরও বেশি। যার ৭০ শতাংশ ব্ল্যাক বেঙ্গল। বগুড়ার অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের প্রজনন ক্ষমতা বেশি। বছরে দুইয়ের অধিক (কখনও একসঙ্গে চারটি পর্যন্ত) বাচ্চা প্রসব করে। এই জাতের ছাগলকে আবদ্ধ অবস্থায় পালন করা যায় না। প্রতিদিন অনেকটা সময় ধরে তৃণভূমিতে চরাতে হয়। ছাগল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় শহরাঞ্চলের অনেকে বাসাবাড়িতে এই ছাগল পালনের চেষ্টা করেছে। ধরে রাখতে পারেনি। গ্রামাঞ্চলই ছাগল পালনের উর্বর ভূমি। বিশেষ করে উঁচু এলাকায় ছাগল স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে। একটা সময় যমুনার পশ্চিম প্রান্তে লম্বা কানের এক ধরনের ছাগল পালন হতো। যা রাম ছাগল নামে পরিচিত। রাম ছাগল বছরে একটির বেশি বাচ্চা দিতে না পারায় এর পালন কমেছে। অন্য দিকে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল কম সময়ে উচ্চতা বেড়ে হৃষ্টপুষ্ট হওয়ায় তাড়াতাড়ি হাট বাজারে তুলে বিক্রি করা যায়। একেকটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ৩ থেকে ৪ ফুট উঁচু হয়। এতে পালনকারী অধিক লাভবান হয়। গ্রামের অনেক গৃহস্থ এবং কৃষক স্ত্রী ও পুরুষের এক  জোড়া ব্ল্যাক বেঙ্গল পালন করে বছরে তিন থেকে চারটি ছাগল পেয়ে তাড়াতাড়ি ছাগলের খামার তৈরি করতে পারে। প্রতিটি ছাগলের মাংস হয় ১২  থেকে ১৬ কেজি পর্যন্ত। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়ার দাম এবং বিদেশীদের কাছে চামড়ার কদর বেশি। এক চামড়া ব্যবসায়ী জানান, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাড়া অন্য ছাগলের চামড়ার দাম পাওয়া যায় না। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের এক সূত্র জানায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বছর তিনেক হয় কয়েকটি বেসরকারী সংস্থা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলে ছাগল লালন-পালন নিয়ে কাজ করছে। কিভাবে উন্নত জাত পাওয়া যায় এ নিয়েও গবেষণা করছে। একটি সংস্থার হিসাবে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজশাহীতে প্রায় ২০ হাজার খামারে অন্তত ৫০ লাখ ছাগল পালন হচ্ছে। যার বেশিরভাগই ব্ল্যাক বেঙ্গল। বগুড়া প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্র জানায়, বছর কয়েক আগেও বগুড়ায় ছাগল পালনের খামার ছিল প্রায় তিন শ’। বর্তমানে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭শ’। দিন দিন বাড়ছে। প্রতিটি খামারেই লালন-পালন হচ্ছে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।

অধিক ধান উৎপাদনে এসআরআই পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ধানচাষে কম খরচে, অতি যতœ নিয়ে ও কম কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে অধিক ধান উৎপাদন করার পদ্ধতিকে (ঝুংঃবস ড়ভ জরপব ওহঃবহংরভরপধঃরড়হ), এসআরআই, বাংলায় একে সমন্বিত ধানচাষ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বলা যেতে পারে। ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উপকরণ কম ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতিতে ধানচাষ করার কৌশল ১৯৮০ সালে উদ্ভাবন করেন মাদাগাস্কার বিজ্ঞানী ফাদার হেনরি ললানি। এই পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন, রোপণ, সেচ, সার, কীটনাশক কম লাগে। কিন্তু ধানের ফলন হয় বেশি। এসআরআইয়ের বৈশিষ্ট্য ঃ কৃষি উপকরণ কম লাগে। ফলে উৎপাদন খরচ কম হয়। ধান উৎপাদন বেশি হয়। সঠিক পরিমাণ সেচ, আগাছা দমনসহ বিভিন্ন কারণে ফলন বেশি হয়। অতি পরিচর্যা করা হয়। উৎপাদন সময় কম লাগে। অল্প বয়সের চারা রোপণ করা হয়। শ্রমিক কম লাগে। কম বয়সী চারা রোপণ করা হয়। জৈবসার প্রয়োগ করা হয়। পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানো হয়। বর্গাকারে চারা রোপণ করা হয়। যন্ত্র দিয়ে আগাছা দমন করা হয়। এটি একটি পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। চারার বয়স ঃ কম বয়সের ৩৫-৪০ দিনের চারা রোপণ করা হয়। এতে চারা শক্ত থাকে ফলে মারা যায় না এবং রোপণের পর আগাম থোড় বের হয় না। জলাবদ্ধ পদ্ধতির চেয়ে ১০-১৫ দিন আগে ধান পরিপক্ক হয়। সার ও সেচ কম লাগে। পোকা ও রোগ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। পরবর্তী ফসলের প্রস্তুতি নিতে সুবিধা হয়। রোপণ দূরত্ব ঃ সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩৫-৪০ সেন্টিমিটার করে বর্গাকারে চারা রোপণ করা হয়। প্রতি গুছিতে একটি চারা রোপণ করা হয়। এতে গাছ পুষ্টি ও আলো-বাতাস বেশি পায়। কুশি বেশি, ফলন বেশি বীজ, সার ও সেচ কম লাগে। গুছিতে চারা বেশি দিলে পুষ্টি, পানি ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করে। সার প্রয়োগ ঃ রাসায়নিক  সার কম দিয়ে জৈবসার বেশি দেয়া হয়। এতে মাটি, পানি ও বাতাসের পরিবেশ ভালো থাকে। উৎপাদন খরচ কমে। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলির উন্নতি হয়। মাটির উর্বরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। অণুজৈবিক কার্যাবলি বাড়ে। মাটির অম্লসত্ব নিয়ন্ত্রণ হয়। ফলন বেশি হয়। আগাছা দমন ঃ রাইচ উইডার দিয়ে আগাছা দমন করে মাটির সঙ্গে আগাছা মিশিয়ে দেয়া হয়। যা পচে জৈব সারের কাজ করে। সেচ ও নিকাশ দ্বারাও আগাছা দমন হয়। সনাতন পদ্ধতির মতো বার বার দমন করতে হয় না ফলে খরচ কমে। পুষ্টি ব্যবস্থাপনা ঃ ধানের ভালো ফলন পাওয়ার জন্য মাটিতে প্রচুর পুষ্টি উপাদান থাকা দরকার। মাটিতে পুষ্টি উপাদান সরবরাহের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে জমিতে পর্যাপ্ত জৈবসার প্রয়োগ করা। সেচ ও নিকাশ করে জৈবসার মাটির সঙ্গে মেশাতে হবে। সেচ ও নিকাশের দ্বারা কোনো কোনো পুষ্টি গাছের জন্য সহজলভ্য হয়। মাটিতে পুষ্টি থাকা সত্ত্বেও কিছু পুষ্টি গাছ পানির অভাব গ্রহণ করতে পারে না। এজন্য সেচ দিয়ে পুষ্টি গাছ সহজে শোষণ করতে পারে। পানি বেশি হলে কিছু পুষ্টি গাছ গ্রহণ করতে পারে না। জমি থেকে পানি নিকাশ করলে গাছ পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। মাটিতে প্রাকৃতিক উপায়ে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার সবচেয়ে ভালো উপায় এসআরআই পদ্ধতিতে ধানচাষ করা। সনাতন পদ্ধতিতে ধানচাষে সবসময় প্লাবন পদ্ধতিতে সেচ দেয়া হয়। এসআরআই পদ্ধতিতে যখন গাছে পানির প্রয়োজন হবে ঠিক তখন যে পরিমাণ দরকার ঠিক সে পরিমাণই সেচ দেয়া হয়।
সূত্র: কৃষিবিদ ফরহাদ আহমেদ

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজি ঢেঁড়স

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ঢেঁড়স বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজি। দেশের সব অঞ্চলের লোকের কাছেই এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। আমাদের দেশে ঢেঁড়স মূলত ভাজি, ভর্তা ও তরকারির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঢেঁড়সে প্রতি ১০০ গ্রামে ভক্ষণযোগ্য অংশে আমিষ (১.৮ গ্রাম) ভিটামিন-সি (১৮ মিলিগ্রাম) খনিজ পদার্থ বিশেষ করে ক্যালশিয়াম (৯০ মিলিগ্রাম), লোহা (১ মিলিগ্রাম) ও আয়োডিন রয়েছে। জলবায়ু ও মাটি  ঃ ঢেঁড়সের জন্য অপেক্ষাকৃত উচ্চতাপমাত্রা প্রয়োজন। শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় অবস্থায় ঢেঁড়স জন্মানো যায়। সাধারণত খরিফ মৌসুমেই এর চাষ হয়ে থাকে।  দো-আঁশ মাটি ঢেঁড়সের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। প্রচুর জৈবসার প্রয়োগ করতে পারলে বেলে ধরনের মাটিতেও এর চাষ করা যায়। মাটি সুনিষ্কাশিত হওয়া প্রয়োজন। জাত ও বৈশিষ্ট্য ঃ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ১৯৯৬ সনে হলুদ শিরা রোগ প্রতিরোধী বারি ঢেঁড়স -১ অবমুক্ত করে। বারি ঢেঁড়স-১ এর গাছ অবিরত, খাড়া, প্রধান কান্ড থেকে ২-৩টি শাখা বের হয়। ফল সবুজ, প্রস্থচ্ছেদে পাঁচকোণী, দৈর্ঘ্য ১৪-১৮ সেমি.। জাতটি বাংলাদেশের বাইরেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বীজ বপনের সময় ও পরিমাণ ঃ বাংলাদেশে সাধারত ফেব্র“য়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ঢেঁড়স লাগানো হয়। তবে বছরের অন্যান্য সময়ও সীমিতভাবে এর চাষ হয়ে থাকে। প্রতি  হেক্টরে বপনের জন্য ৪-৫ কেজি (১২-২০ গ্রাম/শতাংশ) বীজের প্রয়োজন হয়। জমি নির্বাচন ও তৈরি ঃ  সেচ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাসহ উঁচু জমি নির্বাচন করে ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হবে। এরপর মাঠে সরাসরি বীজ বপনের জন্য এক মিটার প্রস্থ মিড়ি বা বেড তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দুটি  মিড়ির মাঝখানে ৩০ সেমি. প্রস্থ পিলি বা নালা রাখতে হবে। মিড়ি সাধারণত ১৫-২০ সেমি. উঁচু হবে। বীজ বপনের পদ্ধতি ও দূরত্ব ঃ আগাম ফসলের জন্য বীজ ঘন করে বপন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে সারি থেকে সারি ৪৫ সেমি. এবং সারিতে ৩০ সেমি. পর পর লাইনে ৩০ সেমি. অন্তর বীজ বপন করা হয়। সঠিক  মৌসুম ফসলের জন্য অর্থাৎ বৈশাখ মাস থেকে (১৫ এপ্রিলের পর) এক মিটার প্রস্থ   বেডে ৬০ী৪০ সেমি. দূরত্বে দুই সারিতে বীজ বপন করতে হবে। বীজ মাটির ২-৩  সেমি. গভীরে বুনতে হয়। এক সাথে ২টি বীজ বপন করা ভালো। বীজ বপনের আগে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে অঙ্কুরোদগম ভালো হয়। বপনের পর প্রয়োজনীয় পানি সেচ আবশ্যক। চারা গজানোর ৭ দিন পর সুস্থ সবল একটি গাছ যথাস্থানে রেখে অতিরিক্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে। সেচ ও পানি নিষ্কাশন অন্যান্য পরিচর্যা ঃ সময়মতো নিড়ি দিয়ে আগাছা সব সময় পরিষ্কার করে সাথে সাথে মাটির চটা ভেঙে দিতে হবে। খরা হলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। পোকা ও  রোগবালাই দমন ঃ  ঢেঁড়সের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা।  লক্ষণ : ডিম থেকে বাদামি রঙের কীড়া বের হয়ে ডগা বা কচি ফলে আক্রমণ করে। কীড়া ডগা ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে ভেতরের নরম অংশ কুরে কুরে খায়। আক্রান্ত ডগা নেতিয়ে পড়ে ও শুকিয়ে যায় ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ফসল সংগ্রহ ঃ  ফেব্র“য়ারি-মার্চ মাসের মধ্যে বীজ বপন করলে ৪০-৪৫ দিনে এবং এরপর বপন করলে ৫০-৫৫ দিনের মধ্যে ফুল ফুটতে শুরু করে। তবে জাতভেদে কোনো কোনো সময় একটু  দেরি হতে পারে। ঢেঁড়সের ফল সংগ্রহের সময় নির্ণয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফুল ফোটার ৫-৬ দিন পর থেকেই ফল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত ফলের পরাগায়নের ৭-৮ দিন পর ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। ফলের বয়স ১০ দিনের বেশি হলে ফল আঁশময় এবং পুষ্টিমানের দিক দিয়ে নিকৃষ্ট হতে শুরু করে। ফল যত পাড়া যায় গাছ তত বেশি ফল উৎপাদন করে। এক দিন পর পর প্রতিদিনই ঢেঁড়েসের ক্ষেত থেকে ফল সংগ্রহ করা উচিত। কচি ফল সংগ্রহ করলে ফলন সামান্য কমে কিন্তু ফলের স্বাদ ও পুষ্টিমান অনেক বেড়ে যায়। ফলন ঃ উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে ঢেঁড়সের ফলন  হেক্টরপ্রতি ১৪-১৬ টন (৫৫-৬৫ কেজি/শতাংশ) পাওয়া যায়। বীজ সংগ্রহ শুকানো ও সংরক্ষণ  ঃ ফল পাকার পর ফেটে যাওয়ার আগে তুলে ফেলতে হবে। রোগাক্রান্ত গাছ থেকে কোনো ফল সংগ্রহ করা যাবে না। এতে বীজবাহিত ভাইরাস দ্বারা পরবর্তী ফসল আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। ভালো ফলন এবং উন্নত গুণসম্পন্ন বীজের জন্য ৩য় বা ৪র্থ নোড (গিঁট) থেকে ফল সংগ্রহ শুরু করা উত্তম। ফুল ফোটার ৩৫ দিন পর সংগৃহীত ফলে বীজের ফলন ও গুণাগুণ সবচেয়ে ভালো থাকে। তাই পরিপক্ব ফল সংগ্রহের পর এক সপ্তাহ পরিষ্কার মেঝেতে ছড়িয়ে রাখা হয়। অতপর মাড়াই এবং পরিষ্কার করে শুকাতে হবে এবং শুকনা ও ঠা া জায়গায় গুদামজাত করতে হয়। সাধারণত ৭-৮% আর্দ্রতায় গুদামজাত করলে মোটামুটি ২ বছরে বীজের সতেজতা হারায় না।

ধান উতপাদনে আসছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বোরো মৌসুমে চাষের উপযোগী ধানের নতুন দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বিজ্ঞানীরা নতুন এই দুটি জাতের নাম দিয়েছেন ব্রি ধান-৮৮ ও ব্রি ধান-৮৯। ব্রি ধান-৮৮ নামে নতুন জাতটির ফলন একই মৌসুমের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রি ধান-২৮’র চেয়ে হেক্টরে আধা টন বেশি। আর ব্রি ধান-৮৯ নামে জাতটির ফলন হবে ব্রি-২৯’র চেয়ে প্রতি হেক্টরে এক টন বেশি। শুধু তাই নয়, উপযুক্ত পরিচর্চা পেলে এই জাতটির ফলন হতে পারে ৯ টনের চেয়েও বেশি। সারাদেশে ব্রি উদ্ভাবিত নতুন দুটি জাত ছড়িয়ে পড়লে ধান উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কৃষি সচিব মোঃ নাসিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে গত মঙ্গলবার জাতীয় বীজ বোর্ডের সভায় নতুন এই জাত দুটি অনুমোদন পায়। সভায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. শাহজাহান কবীর এবং বীজ বোর্ড ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ড. শাহজাহান কবীর বলেন, বীজ বোর্ডের সভায় চূড়ান্তভাবে ব্রি ধান-৮৮ ও ব্রি ধান-৮৯ নামে নতুন দুটি জাত অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-৮৯ এর ফলন হবে প্রচলিত ব্রি-২৯ এর চেয়ে প্রতি হেক্টরে এক টন বেশি। কোন কোন ক্ষেত্রে জাতটিতে সাড়ে ৮ টন পর্যন্ত ফল পাওয়া গেছে। আর ব্রি ধান-৮৮ এর ফলনও প্রচলিত ব্রি ধান ২৮ এর চেয়ে প্রতি হেক্টরে আধা টন বেশি হবে। উদ্ভাবিত নতুন দুটি জাত দেশের ধান উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে প্রত্যাশা করছেন ড. শাহজাহান কবীর। ব্রি’র উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তমাল লতা আদিত্য বলেন, ব্রি ধান-৮৮ টিস্যু কালচার পদ্ধতি উদ্ভাবিত। জাতটিতে রোগ বালাইয়ের প্রকোপ যেমন কম, তেমন ফলনও বেশি। ধান পাকার পরও এর গাছ হেলে পড়ে না, তাই হাওড় অঞ্চলেও জাতটি চাষ করা যাবে। কৃষিজমিতে চাষের ক্ষেত্রে সুবিধা হলো, ধান কাটতে রিপার মেশিন ব্যবহার করা যাবে। ফলে শ্রমিকের সঙ্কটের ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবেন চাষিরা। আর ব্রি ধান-৮৯ বন্য প্রজাতির একটি ধানের সঙ্গে সঙ্করায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এটি বোরো চাষের একক অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ব্রি ধান-৮৮ বোরো মৌসুমের স্বল্পমেয়াদী একটি জাত, যা প্রচলিত ব্রি ধান-২৮’র পরিপূরক। এর জীবনকাল ব্রি-২৮’র মতোই। হালকা ঝড়-বৃষ্টিতে ঝরে পড়বে না। এর ফলন ব্রি-২৮’র চেয়ে আধা টন বেশি। ফলন হবে ৬ থেকে ৭ টন। সারাদেশে এর গড় ফলন হবে ৭ টন। ধান পাকার পর ব্রি-২৮’র বীজ পাতা হেলে গেলেও ব্রি-৮৮’র ক্ষেত্রে পাতা খাড়া থাকবে। ধান পাকার পরও গাছ সোজা থাকায় রিপার মেশিন ব্যবহার করা যাবে। যে কারণে ধারণা করা হচ্ছে, হাওড় অঞ্চলে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এই চালের ভাত হবে ঝরঝরে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে ব্রি-২৮’র বেশি চাষ হয়, বিশেষ করে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের চাষিরা এই জাত চাষ করে সুফল পাবেন। নতুন জাতে রোগ বালাইয়ের প্রকোপ কম। বিজ্ঞানীরা আরও জানান, বোরো মৌসুমের নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান-৮৯ একই মৌসুমের ব্রি-২৯’র পরিপূরক। নতুন জাতটির ফলন হবে প্রচলিত ব্রি-২৯’র চেয়ে এক টন বেশি। গড়ে যার ফলন হবে ৮ টন। তবে উপযুক্ত পরিচর্চা পেলে জাতটি ৯.৭ টন পর্যন্ত ফলন দিতেও সক্ষম। আর জাতটির জীবনকাল ১৫৪ থেকে ১৫৮ দিন, যা ব্রি-২৯’র চেয়ে ৩ থেকে ৫ দিন কম। সারাদেশেই এটি চাষযোগ্য। এই চালের ভাত হবে ঝরঝরে এবং খেতে সুস্বাদু।

অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে দেশের পোল্ট্রি খাত

কৃষি প্রতিবেদক ॥ অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে দেশের পোল্ট্রি খাত। কিছুদিন আগেও যে শিল্প একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিল; সে পোল্ট্রিশিল্পই আজ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। এ দুরবস্থার জন্য বিদেশি তথা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী মনোভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ৭টি বিদেশি কোম্পানি সরকারের অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে পোল্ট্রিশিল্পের ব্যবসা করছে। এসব কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ নেই দেশীয় প্রতিষ্ঠানের। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ব্যক্তি পর্যায়ের খামারিরা বিদেশি কোম্পানির কাছে একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তাদের মতে, এই শিল্পে বিদেশি আগ্রাসন বাড়লেও সরকারের নজর নেই। নেই বাজারের নিয়ন্ত্রণও। সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের জিডিপিতে পোল্ট্রি খাতের অবদান দুই দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার তিন দশমিক ৯৮ শতাংশ। বেকার যুবকরা পোল্ট্রি খামার স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠায় দিনে দিনে এই প্রবৃদ্ধির হার অনেক বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। অথচ বিদেশি কোম্পানির আগ্রাসী বিনিয়োগের ফলে অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতে বিনিয়োগকারী বিদেশি কোম্পানির মধ্যে পাঁচটি ভারতের, একটি থাইল্যান্ডের এবং একটি চীনের। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে আছে ভিএইচ গ্র“প, গোদরেজ, সগুনা, টাটা এবং অমৃত গ্র“প। তাছাড়া আছে থাইল্যান্ডের সিপি এবং চীনের নিউহোপ। এগুলো দেশের পোল্ট্রিশিল্পের শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদেশি অর্থপুষ্ট খামারগুলো ঋণ নিয়ে আসছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। আর দেশি খামারগুলোকে ঋণ সংগ্রহ করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে। তাই বিদেশি খামারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় বড় খামারগুলোকে অনেক হিমশিম খেতে হচ্ছে। ঝরে পড়ছে ছোট খামারগুলো। এ ছাড়া পোল্ট্রিশিল্পের এই ভারসাম্যহীনতার জন্য সরকারের কিছু ভুল নীতিও দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে পোল্ট্রিশিল্পের আয় করমুক্ত ছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ শিল্পের কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। চলতি অর্থবছরেও তা অব্যাহত আছে। ধুঁকতে থাকা পোল্ট্রি খামারিদের জন্য যা ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ হয়ে উঠেছে। খামারিরা জানান, বর্তমানে তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছেন কিছু দেশি এবং বিদেশি বড় কোম্পানির মনোপলি ব্যবসার কারণে। এসব কোম্পানির কারণেই তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মনোপলির সঙ্গে জড়িত এসব বড় কোম্পানির অধিকাংশই প্রথমে ওষুধ নিয়ে মাঠে নামলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই বাচ্চা উৎপাদন, লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামার, পোল্ট্রি ফিড উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এবং পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্রয়লার মুরগি পালন, ডিম উৎপাদন, ফিড তৈরি এমনকি বিদেশ থেকে ওষুধ এনে বাজারজাত পর্যন্ত করছে। এভাবে তারা বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে এবং সুযোগ বুঝে অভ্যন্তরীণ বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তথ্যমতে, খামারিদের ব্যয়ের ৭০ শতাংশই পোল্ট্রি ফিডে। যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই আমদানিতে ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা না পাওয়ায় আরো বিপাকে রয়েছে পোল্ট্রিশিল্প। অন্যদিকে লাইভ স্টোক ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমতি না নিয়ে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট থেকে অনুমতি নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইতোমধ্যে পোল্ট্রিশিল্পের প্রায় ৪০ শতাংশ বাজার বিদেশিরা দখল করে নিয়েছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সারা পৃথিবী যখন নিজেদের শিল্পকে রক্ষার জন্য নানা নীতিমালা তৈরি করছে তখন আমাদের দেশে হচ্ছে এর উল্টোটা। এই সাতটি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে কি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারবে কিংবা কি পরিমাণ লভ্যাংশ নিয়ে যেতে পারবে তার সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। এসব বিষয়ে নজর না দিলে বাংলাদেশের যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এ শিল্পে জড়িত রয়েছে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সম্ভাবনাময় এ শিল্প ধ্বংস হলে ৫০ লাখ মানুষ বেকার ও পরোক্ষভাবে এক থেকে দেড় কোটি মানুষ পথে বসার উপক্রম হবে। তাই এ শিল্পকে রক্ষায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে পোল্ট্রিশিল্পে কৃষি সেক্টরের মতো প্রান্তিক খামারিদের সরাসরি ভর্তুকি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, স্বল্প সুদে ঋণ দিতে হবে এবং পোল্ট্রি খাদ্যের দাম কমাতে হবে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এসোসিয়েশনের মহাসচিব মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, পোল্ট্রিশিল্পে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ সুবিধা থাকলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা কোনো ঋণ সুবিধা পায় না। তাদের ঋণ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, পোল্ট্রিশিল্পে ব্যাংক ঋণের সুবিধা আছে। কোনো খামারি এ সুবিধা পান না বলে জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা যেন ঋণ সুবিধা পান সে ব্যবস্থা করা হবে।

সবজি চাষে বোরন সারের ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে যত ধরনের সবজি চাষ হয়, এসব সবজির মধ্যে সব সবজিরই সব ধরনের সারের প্রয়োজন সমান নয়। যেসব সার ফসলের জন্য কম লাগে কিন্তু একেবারেই ব্যবহার না করলে বা নিধাির্রত মাত্রায় ব্যবহার না করলে ফসলের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয়। সেই সারগুলোর মধ্যে বোরন অন্যতম। বোরন সার পরিমিত মাত্রায় ব্যবহারে যেমন ফলন বাড়ে তেমনি অতিরিক্ত ব্যবহারে ফসলের ক্ষতি হয় ও ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তাই বোরন সার ব্যবহারে খুবই সতকর্ থাকতে হয়। তেল ফসল হিসেবে বাংলাদেশে সরিষার চাষই প্রধান। প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন লাখ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়ে থাকে। যা থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ মে. টন সরিষা বীজ উৎপাদন হয়। যা থেকে প্রায় পৌনে দুই লাখ মে. টন ভোজ্য তেল পাওয়া যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, সরিষা চাষে বোরন সার ব্যবহার করলে শতকরা ১৯.৮-২৩.০ ভাগ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। এজন্য হেক্টরপ্রতি মাত্র ১৫০-২০০ টাকা খরচ করে অতিরিক্ত প্রায় ৭-৮ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। শীত মৌসুমে যেসব সবজি চাষ করা হয় সেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু সবজির বোরনের চাহিদা লক্ষ্য করা যায়। এসব সবজির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ বেগুন, টমেটো, ফুলকফি, বাঁধাকপি, শিম, বরবটি, মটরশুঁটি, মূলা, আলু, গাজর, শালগম, বীট, সরিষা শাক, পালং শাক, পেঁয়াজ ইত্যাদি। জমিতে মাটির উপরের স্তরের তুলনায় নিচের স্তরেই বোরন বেশি থাকে। বিশেষ করে বেলে বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে সেচের পানির সঙ্গে বোরন চুঁইয়ে মাটির নিচের দিকে চলে যায়। এজন্য এধরনের মাটিতে বোরন সার প্রয়োগের চেয়ে পাতায় প্রয়োগ বেশি কাযর্কর। তবে অন্য ধরনের মাটিতে বিশেষ করে ভারী মাটি বা চুন মাটিতে বোরন বেশি লাগে। বোরন সার প্রয়োগ করা যায়। পাতায় প্রয়োগ করলে প্রতি লিটার পানিতে ১.৫-২.০ গ্রাম এবং মাটিতে প্রয়োগ করলে ৩-৪ কেজি বোরন সার প্রয়োজন হয়। পাতায় ¯েপ্র করলে বীজ বোনার বা চারা রোপণের ২০-২৫ দিন এবং ৪০-৪৫ দিন পর ¯েপ্র করতে হয়। বোরন পাতায় ¯েপ্র করার অসুবিধা হলোÑ অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়ার পর এটি যখন প্রয়োগ করা হয়, তখন ফসলের বেশ কিছু ক্ষতি হয়ে যায়। একটা ফসলে বোরন ব্যবহার করার পরের ফসলে ব্যবহার করতে হয় না। তৃতীয় ফসল চাষের সময় প্রয়োজন বুঝে আবার ব্যবহার করতে হয়।
বোরনের অভাবে বাড়ন্ত আলুগাছের ডগার পাতা পুরু হয় ও কিনারা বরাবর ভিতরের দিকে গুটিয়ে গিয়ে অনেকটা কাপের আকৃতি ধারণ করে। এই সব পাতা ভঙ্গুর হয়। আলুগাছের শিকড়ও গুটিয়ে যায়, গাছ দুবর্ল হয়। আলু ছোট আকারের হয়, খোসা খসখসে ও তাতে ফাটা ফাটা দাগ দেখা যায়। কখনো কখনো আলুর কন্দের ভেতরে বাদামি দাগ দেখা যায়। বোরনের অভাবে টমেটোর চারা গাছে সবুজ রঙের পরিবর্তে কিছুটা বেগুনি রং লক্ষ্য করা যায়। বাড়ন্ত টমেটোগাছের ডগার কুঁড়ি শুকিয়ে মরে যায়। পাতা এবং পাতার বৃন্ত পুরু ও ভঙ্গুর হয়। কান্ড খাটো হয়ে পুরো গাছ ঝোপালো হয়ে যায়। ফল বিকৃত হয় ও খোসা খসখসে হয়ে ফেটে যায়। বোরনের অভাবে বেগুনগাছের বৃদ্ধি কমে যায়। ফুল সংখ্যায় কম আসে এবং ফুল ঝরা বৃদ্ধি পায়। ফল আকারে ছোট হয় ও ফল ফেটে যায়। কখনো কখনো কচি ফল ঝরে পড়ে। বোরনের অভাবে শিম ও বরবটির নতুন বের হওয়া পাতা কিছুটা পুরু ও ভঙ্গুর হয়। পাতার রং গাঢ় সবুজ ও শিরাগুলো হলদে হয়ে যায়। শেষে পাতা শুকাতে শুরু করে, গাছে ফুল দেরিতে আসে ও শুঁটি বীজহীন হয়। বোরনের অভাবে ফুলকপির চারার পাতা পুরু হয়ে যায় এবং চারা খাটো হয়। ফুল বা কাডের্র উপরে ভেজা ভেজা দাগ পড়ে। পরে ওই দাগ হালকা গোলাপি এবং শেষে কালচে হয়ে ফুলটিতে পচন ধরে। পাতার কিনারা নিচের দিকে বেঁকে যায় ও ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। পুরনো পাতা প্রথমে সাদাটে এবং পরে বাদামি হয়ে কিছুটা উঁচু খসখসে দাগে পরিণত হয়। কাটলে আক্রান্ত অংশ থেকে এবং ফুলকপি রান্নার পর এক ধরনের দুগর্ন্ধ বের হয়। বাঁধাকপির মাথা বাঁধা শুরু হওয়ার সময় দেখা যায় যে মাথা বাঁধছে না এবং ভেতরটি ফাঁপা হয়ে যায়। একেবারে ভেতরের কচি পাতাগুলো বাদামি রঙের হয় এবং পচন ধরে। কান্ডের ভেতরের মধ্যাংশ ফাঁপা হয় ও পচে যায়। বোরনের অভাবে মরিচ বা মিষ্টি মরিচের কচি পাতা হলুদ হয়ে এবং ফুল বা কচি ফলও ঝরে পড়ে। গাছের বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বোরনের অভাবে সরিষার বীজ গঠন ঠিকভাবে হয় না। হেক্টরপ্রতি ১.৫ কেজি বোরন প্রয়োগ করলে সরিষার বীজ উৎপাদন প্রায় ৫৯% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে (হালদার ও অন্যান্য, ২০০৭)। জাত, মাটি, স্থান (কৃষি পরিবেশ অঞ্চল) ও মাটিতে রসের তারতম্য অনুসারে বোরন সার হিসেবে পানিতে গুলে নিয়ে ¯েপ্র করতে হয়। পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করলে নিধাির্রত মাত্রার অধের্ক পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়। এ জন্য ১০-১৫ দিন পর পর ২-৩ বার বোরন সার ¯েপ্র করা যেতে পারে। জমিতে সরাসরি বোরন সার প্রয়োগ করা যায়। সে ক্ষেত্রে টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক অক্সাইড ও বোরন সারের সবটুকু এবং ইউরিয়ার অধের্ক পরিমাণ শেষ চাষের সময় মাটিতে প্রয়োগ করতে হয়। বাকি ইউরিয়া গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করে একবার পানি সেচ দিতে হয়। বোরন সার হিসেবে ব্যবহারের জন্য ফলিরিয়েল, সলুবোর, লিবরেল বোরন, আলফা বোরন ইত্যাদি পাওয়া যায়। এ ছাড়া দানাদার বোরিক এসিড ও বোরাক্স বা সোহাগা (সোডিয়াম টেট্রাবোরেট) বোরন সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
লেখক ঃ উদ্যান বিষেশজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর।