উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিশ্বের বতর্মান জনসংখ্যা ৭০০ কোটি যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে আটশ কোটিতে। অন্যদিকে আধুনিক শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে এত বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার খাদ্য জোগান দেয়া আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আর এই প্রতিকূল পরিবেশে কৃষিকে টেকসই করতে ‘উদ্ভিদের বৃদ্ধি ত্বরান্বিতকারী ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার ও ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ উদ্ভাবন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊধ্বর্তন বৈজ্ঞানিক কমর্কতার্ ড. মো. হারুন-অর রশিদ। কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার, আগাছানাশক, কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহারের ফলে পরিবেশে অনেক ক্ষতিকর পদার্থ উৎপন্ন হচ্ছে যা মানুষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই পরিবেশ দূষণ রোধ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ‘উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া’ নিয়ে গবেষণা করছেন কৃষি পদক জয়ী এই বিজ্ঞানী। সাধারণভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এমন ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় ‘উদ্ভিদের বৃদ্ধি সহায়ক ব্যাকটেরিয়া’। এরা বিভিন্নভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে থাকে। যেমন উদ্ভিদকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা, প্রতিকূল পরিবেশে উদ্ভিদকে টিকে থাকতে সাহায্য করা, রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর বৃদ্ধিকে হ্রাস করা, ক্ষতিকর ভারী ধাতব পদাথের্র প্রভাব হতে রক্ষা করাসহ বিভিন্নভাবে সাহায্য করে থাকে। এমনকি এই ব্যাকটেরিয়াগুলো মানুষ ও পরিবেশে কোনো ক্ষতিও করে না। ব্যাকটেরিয়ার উল্লেখযোগ্য ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ নাইট্রোজেন সংবন্ধন: মাটিতে বসবাসকারী রাইজোবিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া বাতাসের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে গাছকে সরবরাহ করে থাকে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেইন গাছের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে নাইট্রোজেন সংবন্ধনের হার বাড়ানো সম্ভব। ফলে জমিতে ইউরিয়া সার কম প্রয়োগেই ভালো ফলন পাওয়া যাবে। আয়রন সিকোয়েস্ট্রেশন: আয়রন সীমিত মাটিতে বেঁচে থাকতে কিছু ব্যাকটেরিয়া জৈব মলিকুল তথা সিডারোফর উৎপন্ন করে। সিডারোফর উৎপাদনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া একদিকে নিজের দেহের বৃদ্ধির জন্য অধিক আয়রন গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে অন্যদিকে উদ্ভিদকে অধিক আয়রন গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। তামাক উদ্ভিদ এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক পরিমাণ আয়রন সংগ্রহ করতে পারে। ফাইটোহরমোনের মাত্রার পরিবর্তন: বিভিন্ন হরমোন উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও উন্নতি নিয়ন্ত্রণে এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, উদ্ভিদ যখন প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হয় তখন তার ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের চেষ্টা করে। ওইসময় উদ্ভিদের মূলাঞ্চলে অবস্থিত অণুজীবগুলো তাদের ফাইটোহরমোনের মাত্রা পরিবতর্ন করে। উদ্ভিদের হরমোনের মাত্রা পরিবতের্ন সাহায্য করে যা উদ্ভিদকে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। ট্রিহেলোজ উৎপাদন : ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, উদ্ভিদ, পোকা এবং অমেরুদন্ডী প্রাণীতে ট্রিহেলোজ পাওয়া যায়। উচ্চমাত্রার ট্রিহেলোজ বিভিন্ন প্রাণীকে প্রতিকূল পরিবেশে (উচ্চ তাপমাত্রা, উচ্চ লবণাক্ততা ও খরায়) টিকে থাকতে সাহায্য করে। ঠান্ডা প্রতিরোধক প্রোটিন উৎপাদন : নিম্ন তাপমাত্রা উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া ঠান্ডা প্রতিরোধক প্রোটিন তৈরি করতে পারে যা ব্যাকটেরিয়ার আবরণের বাইরের দিকে একটি স্বচ্ছ দানাদার আবরণ তৈরি করতে পারে। দূষিত মাটি পুনরুদ্ধার : বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতব পদার্থ যেমনÑ লেড, ক্যাডমিয়াম, মারকারি, ক্রোমিয়াম, ইউরেনিয়াম, আর্সেনিক প্রভৃতি উদ্ভিদের ব্যবহারের জন্য উপকারী নয়। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে এই সব ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এদের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। প্রতিকূল পরিবেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশ দূষণকারী বিভিন্ন উপাদান শোষণ ও ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার উপকারী স্ট্রেইন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন, ড. মো. হারুন অর রশিদ।

২১৪৭ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

বিএডিসির ৪৩ হাজার ৭৭৮ মেট্রিক টন বীজ অবিক্রীত

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চলতি রবি মৌসুমে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের প্রায় ৪৩ হাজার ৭৭৮ মেট্রিক টন বীজ অবিক্রীত রয়েছে। উচ্চ ফলনশীল জাতের এ বিপুল পরিমাণ বীজ কাজে না লাগায় প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর এই কারণে সরকার পড়তে যাচ্ছে প্রায় দুই হাজার ১৪৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে। শুধু তাই নয় চলতি অর্থবছরে খাদ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ারও আশঙ্কা করছেন অনেকে। বিএডিসি সূত্র জানিয়েছে, যে বিপুল পরিমাণ বীজ বিক্রি হয়নি তার বাজার দরই প্রায় ১৭০ কোটি ৪৪ লাখ ৩৩ হাজার ১২১ টাকা। এর সঙ্গে ১০ লাখ  মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন কম হলে ২০ টাকা কেজি দরে ক্ষতি হবে প্রায় এক হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মজুত বীজের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৫ দশমিক ১৯৬ মেট্রিক টন। এই বীজের মধ্যে রয়েছে আউশ, আমন, বোরো, গম, ভুট্টা (খৈ ভুট্টা), ভুট্টা (হাইব্রিড), আলুবীজ, ডালবীজ, তৈলবীজ, শীতকালীন সবজিবীজ, মসলা (পেঁয়াজবীজ), মসলা (পেঁয়াজ বাল্ব), গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজ, সরগম, বার্লি ও পাটবীজ। এসব উচ্চ ফলনশীল বীজ বিএডিসির সারা দেশের ২২টি অঞ্চলে ৮ হাজার ৫৩৬ ডিলার এবং ১০০টি বীজ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর চলতি রবি মৌসুমে অবিক্রীত বীজ রয়েছে ৪৩ হাজার ৭৭৮ দশমিক ৮৩৮  মেট্রিক টন। এর মধ্যে চলতি বছর বোরো ধানের বীজ বিক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৪ হাজার ১৪৭ দশমিক ৮১২ মেট্রিক টন। তার মধ্যেই অবিক্রীত রয়ে গেছে ২৫ হাজার ৪১১ দশমিক ৭৭৫ মেট্রিক টন। যার মূল্য ১১০ কোটি ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৮ টাকা।  এ ছাড়া গম বীজ ১০ হাজার ৩৯৮ দশমিক ৬৮৩  মেট্রক টন, ভুট্টাবীজ  (খৈ ভুট্টা) ৫ দশমিক শূন্য ২০ মেট্রিক টন, ভুট্টাবীজ  (হাইব্রিড) ৬ দশমিক ৩১০ মেট্রিক টন, আলুবীজ ৫ হাজার ৮০ দশমিক ৬৮৩  মেট্রিক টন, ডালবীজ ৪৭০ দশমিক ৮০৫ মেট্রিক টন, তৈলবীজ ৩১ দশমিক ৭৩০  মেট্রিক টন, শীতকালীন সবজিবীজ ১৭ দশমিক ২৬২ মেট্রিক টন, মসলা  (পেঁয়াজবীজ) ১ দশমিক ১০৬ মেটিক টন, মসলা  ( পেঁয়াজ বাল্ব) ৯৩ দশমিক শূন্য ৪০ মেট্রিক টন, গ্রীষ্মকালীন সবজিবীজ ২৪ দশমিক ৯৯৪ মেট্রিক টন এবং সরগম ৪ দশমিক ১৫৬ মেট্রিক টন। বিপুল পরিমাণ গুণগত মানসম্পন্ন বীজ ব্যবহার না হওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এই কারণে  ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩ দশমিক ৭৮৬৪ মেট্রিক টন ফলন কম হবে। বিএডিসির বীজ উৎপাদন ও বিপণনের সক্ষমতা থাকার পরও বিপুল পরিমাণ বীজ বিক্রি না হওয়ায় বিএডিসির বীজ ও উদ্যান উইংয়ের সদস্য পরিচালক মো. মাহমুদ হোসেন এবং মহাব্যবস্থাপক (বীজ) মো. ফারুক জাহিদুল হকের অদক্ষতা এবং গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বীজ বিক্রয়কাজে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিক্রয় মৌসুমের পূর্বে ও মাঝপথে বদলি করায় মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র। কর্তৃপক্ষের গাফিলতি এবং ভুল সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে বিএডিসির ডিলাররা অভিযোগ করে বলেন, বিএডিসির বীজ উইংয়ের সাবেক সদস্য পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপক (বীজ) দায়ী। তারা সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় সরকারি বীজ কৃষকরা ব্যবহার করতে পারেনি। বিএডিসির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক (বীজ) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বোরো মৌসুমের শুরুতেই যদি সঠিকভাবে মনিটরিং করা হতো তাহলে এত বীজ অবিক্রীত থাকার কথা নয়। অক্টোবর থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে  বোরো বীজ রোপণ শুরু হয়। এরপর আর রোপণের সময় থাকে না। বিএডিসি বীজ ডিলার অ্যাসোসিয়েশন কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের সভাপতি মো. আতাউর রহমান বিএডিসির চেয়ারম্যান বরাবরে বীজের মূল্য কমানোর দাবিতে বোরো মৌসুমের শুরুর দিকে গত ১৮ অক্টোবর একটি লিখিত আবেদন করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, এবার বিএডিসির ধানবীজের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা কেজি। অথচ খোলা বাজারে এখন খাবার ধান ১৭ টাকা কেজি। গমবীজের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬ টাকা কেজি। আবেদনে ধানবীজ ৩৫ টাকা কেজি, গমবীজ ৩৫ টাকা  কেজি এবং আলুবীজ ২০ ও ২২ টাকা কেজি নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় সরকার এবার কোটি কোটি টাকা লোকসানের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলেও ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন। মাগুরা শহরের ঢাকা রোড এলাকার বিএডিসির বীজ ডিলার মুরাদুজ্জামান বলেন, বিএডিসি মাগুরায় মোট ৫০ জন ডিলারকে বীজ বিক্রির জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উচ্চমূল্যের কারণে বেশিরভাগ ডিলারই এ বছর বীজ তোলেনি। এ অবস্থায় কৃষক বাধ্য হবে কম মূল্যে বাইরে থেকে নিম্নমানের বীজ কিনতে হয়েছে, যা ফসল উৎপাদনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএডিসির বীজ ও উদ্যান উইংয়ের সাবেক সদস্য পরিচালক মো. মাহমুদ  হোসেন বলেন, দক্ষতা বা মনিটরিংয়ের কোনো অভাব ছিল না। বরং অন্যান্য বছরের  চেয়েও এবার একাধিক মনিটরিং ও একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বীজ অবিক্রীত থাকা নতুন কিছু নয়। গত বছরও বিপুল পরিমাণ আলুবীজ অবিক্রীত থেকে গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর খামারবাড়িতে এক সেমিনারে বিএডিসির বিপুল পরিমাণের বীজ অবিক্রীত থাকায় েেক্ষাভ প্রকাশ করেছেন সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

মিঠা পানি সংরক্ষন বৃদ্ধিতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কেউ জমি চাষ দিচ্ছে। কেউ দিচ্ছে নিড়ানী। অনেকে আবার সদ্য বেড়ে ওঠা গাছের পরিচর্যাসহ পোকার আক্রমন হয়েছে কিনা পরীক্ষা করছে। এমন চিত্র এখন পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ আবাদী মাঠ জুড়ে। আমন ধান উঠার সাথে সাথে এভাবেই আবাদী মাঠে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তরমুজ, মরিচ, বাদাম, আলু, ডালসহ বিভিন্ন রবিশষ্য চাষীরা। আনুকুল আবাহাওয়া ও পোকার আক্রমন না হলে এবারও রবিশষ্য চাষে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। অপরদিকে বাজার মূল্য ভালো পেলে আর্থিকভাবে সাবলম্বী হওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা কৃষকদের। কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বিগত বছরে ভাল ফলনসহ কাঙ্খিত মূল্য পাওয়ায় এ বছর রবিশষ্য চাষের জমি বেড়েছে। তরমুজ, ডাল, মরিচ, বাদাম ও শীতকালীন বিভিন্ন সবজিসহ প্রায় ২৫ প্রকারের অনান্য ফসলের চাষ হচ্ছে জেলার ৮টি উপজেলায়। চলতি রবি মওসুমে তরমুজের নগরী খ্যাত রাঙ্গাবালী উপজেলায় ৮ হাজার হেক্টর, গলাচিপা উপজেলায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর, কলাপাড়া উপজেলায় ২ হাজার হেক্টরসহ এ তিন উপজেলাতেই মোট সাড়ে ষোল হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হচ্ছে। হেক্টর প্রতি ৪০ মেট্রিক টন হিসাবে এ তিন উপজেলায় ৬ লক্ষ ৬০ হাজার মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। যার বিক্রয় মূল্য ধরা হয়েছে ৫৭৭ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। উৎপাদন খরচ ২০৬ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বাদ দিয়ে কৃষক পর্যায়ে পাচ্ছে প্রায় ৩৭১ কোটি টাকা। রাঙ্গাবলী উপজেলায় সাড়ে ৩’শ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি, ২’শ হেক্টর জমিতে খিরাই, পনের’শ হেক্টর জমিতে ফলন, ৬’শ হেক্টর জমিতে খেসারী, ৫০০ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজিসহ ১১ হাজার ৩৬৮.২৫ হেক্টর জমিতে ২৩ ধরনের রবিশষ্য চাষ হচ্ছে। গলাচিপায় ৪’শ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে। হেক্টর প্রতি ৩০ টন হিসাবে প্রায় ১২ হাজার টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছে কৃষি বিভাগ। আলুর উৎপাদন ব্যায় ১৫৭ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বাদ দিয়ে লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আশা করছে ১৭৯ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। রাঙ্গাবালী উপজেলার বাহেরচর গ্রামের তরমুজ চাষী ইমাম হোসেন বলেন, এবছরে আমি ১০ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। তাতে আমার শেষ পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে ৫লাখ টাকা। আর ফলন ভালো হলে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবো। তরমুজ চাষ করে লোকশানের শঙ্কা খুবই কম। আমাদের শঙ্কা শুধু পানি নিয়ে। সঠিক সময় মিঠা পানি পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া না গেলে বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে তরমুজের। আবার স্লইসগেট দিয়ে লবন পানি ঢুকানো হলেও ক্ষতির সম্মুখিন হত হবে। উপজেলার ছাতিয়ানপাড়া এলাকার তরমুজ চাষী নজরুল হাওলাদার জানান, ২কানী ২বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। ভাল ফলন এবং মূল্য পেলে খরচ বাদে ৫/৬ লক্ষ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। বিগত বছরের লাভের হিসাব তুলে ধরে একই এলাকার মরিচ চাষী নাজমুল জানান, ১ হেক্টর জমি মরিচ চাষে ৫০ হাজার টাকা ব্যায়ে তার লাভ হবে সাড়ে তিন লক্ষ টাকার বেশি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অ:দা) আব্দুল মন্নান জানান, উপকূলীয় এলাকায় মিষ্টি পানির সংরক্ষন বাড়ানো গেলে উপকূলীয় এলাকায় রবিশষ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায় কুমারখালীতে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, খামারি ও খাদ্য বিক্রেতাদের অংশগ্রহণে সভা

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায়, নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে উপজেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাসহ খামারি ও খাদ্য বিক্রেতাদের অংশগ্রহণে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রবিবার বেলা ৩টায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সভাকক্ষে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রোকাশ প্রোগ্রামের কারিগরী সহায়তায় ও ইউকে এইড এর আর্থিক সহায়তায় বীজবিস্তার ফাউন্ডেশন এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস সভাপতিত্ব করেন। উক্ত সভায় বক্তব্য রাখেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. নাহিদ হাসান, খাদ্য বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম, মো: হাসান আলী, মুরগি খামারি আবুল কালাম প্রমূখ। সভায় প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, জনস্বাস্থ্যের দিক বিবেচনায় বীজবিস্তার ফাউন্ডেশন নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায় নিরাপদ মুরগি উৎপাদনে ২০১০ সালের মৎস্য ও পশুখাদ্য উৎপাদন আইনের আওতায় খামারি, ডিলার ও সাধারন ভোক্তাদের সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তাই খামারি ও খাদ্য বিক্রেতাদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রাণিজাত খাদ্য উৎপাদন ও প্রস্তুতিতে অবশ্যই পশু খাদ্য আইন ও বিধিমালা মেনে চলা প্রয়োজন। সেই সাথে প্রাণি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার্থে পোল্ট্রি খাদ্যে ওজন বর্ধক হিসাবে অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার পরিহারের আহবান জানানো হয়। এ সময় বীজবিস্তার ফাউন্টেশনের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর ডলি ভদ্র বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে খামার পরিচালনায় করণীয় বিষয় সম্বলিত বিলবোর্ড স্থাপন ও খামারিদের সমস্যা নিরসনে মোবাইলে ম্যাসেজ প্রদানের মাধ্যমে সেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে বীজবিস্তার ফাউন্ডেশন ভুমিকা রাখবে। উল্লেখ্য, দেশের বেকার যুবক-যুব মহিলারা মুরগী খামার স্থাপনে আগ্রহী হওয়ার কারণে দিনে দিনে পোল্ট্রি শিল্প ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। দেশের প্রাণীজ প্রোটিনের চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ পোল্ট্রি সেক্টর পূরণ করে যাচ্ছে। তুলনামূলক দামে সস্তা হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রোটিনের মূল উৎস হচ্ছে পোল্ট্রি মুরগী। কিন্তু সচেতন নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের বিবেচনায় পোল্ট্রি সেক্টর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নিন্মমানের পোল্ট্রি ফিড, পোল্ট্রি ফিডে মাত্রারিক্তি ও অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার পোল্ট্রি খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলছে। এ জন্য নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনের লক্ষ্যে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় রেখে ভোক্তা সাধারন, সিভিল সোসাইটি, মুরগী খামারি, পোল্ট্রি ফিড বিক্রেতা, ডিলার ও বেসরকারি সংগঠনসমূহের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থেকে পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিধিসম্মতভাবে পরিচালনার গতিপথ প্রদর্শনের সহায়তার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

আধুনিক বোরো ধানের চাষ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ হাওর বা বাঁওড় শব্দ থেকে বোরো শব্দের উৎপত্তি। বোরো ধানগুলো এককালে আমাদের দেশে হাওর ও বাঁওড় এলাকায় চাষ হতো। বর্তমানে সেচের বিস্তার হওয়ায় অন্যান্য উঁচু জমিতেও এর চাষ হচ্ছে। বোরো মওসুমে ধানগাছ প্রচুর সূর্যকিরণ পায়, সার বেশি গ্রহণ করে অথচ গাছ ও পাতা হেলে পড়ে না, ফলবান কুশি বেশি হয় এবং অধিক ফলন পাওয়া যায়। তাই এ মওসুমে আধুনিক জাতের বোরো ধানের চাষ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বোরো ধানের ভালো ফলন পেতে হলে জমি তৈরি, সুষম মাত্রায়  জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার এবং সময়মতো চারা রোপণ করে অন্যান্য পরিচর্যা সঠিকভাবে করতে হবে।

জমি তৈরি ঃ ধানের চারা রোপণের জন্য জমি কাদাময় করে উত্তমরূপে তৈরি করতে হবে। এ জন্য জমিতে প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে মাটি একটু নরম হলে ১০-১৫ সেন্টিমিটার গভীর করে সোজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে চার-পাঁচটি চাষ ও মই দিতে হবে যেন মাটি থকথকে কাদাময় হয়। প্রথম চাষের পর অন্তত সাত দিন জমিতে পানি আটকে রাখা প্রয়োজন। এর ফলে জমির আগাছা, খড় ইত্যাদি পচনের ফলে গাছের খাদ্য বিশেষ করে অ্যামোনিয়াম নাইট্রোজেন জমিতে বৃদ্ধি পায়।

মূল সার প্রয়োগ ঃ বোরো মওসুমে ধানের আশানুরূপ ফলন পেতে জমিতে পরিমাণমতো জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা দরকার। সারণিতে বোরো ধানের জাতভিত্তিক সারের মাত্রা (ইউরিয়া ছাড়া) উল্লেখ করা হলো। জাতভেদে বোরো ধানের সারের পরিমাণ (কেজি/ হেক্টরে)

চারা রোপণ ঃ বীজতলা থেকে ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা সাবধানে তুলে এনে সারি করে রোপণ করতে হবে। এ মওসুমে সারি থেকে সারি ২০-২৫  সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারা ১৫-২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে লাগাতে হবে। জমির উর্বরতা ও জাতের কুশি ছাড়ানোর ওপর ভিত্তি করে এ দূরত্ব কম বা  বেশি হতে পারে। প্রতি গোছায় দু-তিনটি সুস্থ ও সবল চারা ২.৫-৩.৫  সেন্টিমিটার গভীরে রোপণ করতে হবে। খুব গভীরে চারা রোপণ করা ঠিক নয়। এতে কুশি গজাতে দেরি হয়। কুশি ও ছড়া কম হয়। কম গভীরে রোপণ করলে তাড়াতাড়ি কুশি গজায়, কুশি ও ছড়া বেশি হয় ও ফলন বাড়ে। তাই কম গভীরে চারা রোপণের জন্য রোপণের সময় জমিতে ১.২৫ সেন্টিমিটারের মতো ছিপছিপে পানি রাখা ভালো। কাদাময় অবস্থায় রোপণের গভীরতা ঠিক রাখার সুবিধা হয়। রোপণের পর জমির এক কোনায় কিছু বাড়তি চারা রেখে দিতে হয়। এতে রোপণের ১০-১৫ দিন পরে যেসব জায়গায় চারা মরে যায়  সেখানে বাড়তি চারা থেকে শূন্যস্থান পূরণ করা যায়। ফলে জমিতে একই বয়সের চারা রোপণ করা হয়।

সেচ ব্যবস্থা ঃ গাছের প্রয়োজনমাফিক সেচ দিলে সেচের পানির পূর্ণ ব্যবহার হয়। বোরো ধানের জমিতে সব সময় পানি ধরে রাখতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। বোরো মওসুমে সাধারণত ধানের সারা জীবনকালে মোট ১২০  সেন্টিমিটার পানির প্রয়োজন। তবে কাইচ থোড় আসার সময় থেকে ধানের দুধ হওয়া পর্যন্ত পানির চাহিদা দ্বিগুণ হয়। এ সময় জমিতে দাঁড়ানো পানি রাখতে হয়। কারণ থোড় ও ফুল অবস্থায় মাটিতে রস না থাকলে ফলন কমে যায়। রোপণের পর কোন অবস্থায় কতটুকু পানি দরকার তা নিম্নে দেয়া হলো।

ধান কাটার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি বের করে দিতে হবে। এ ছাড়া জমি শুকিয়ে নিতে হবে। এতে মাটিতে জমে থাকা দূষিত বাতাস বের হয়ে যাবে এবং চারাগুলো মাটির জৈব পদার্থ থেকে সহজে খাবার গ্রহণ করতে পারবে।

 

চাষ করুন নেপিয়ার ঘাস

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে হাল চাষের প্রয়োজনে অনেকেই গবাদিপশু পালন করে থাকে। আবার হালের বলদের সাথে অনেকেই ২/১টি গাভীও পালন করে থাকে। এসব গাভীর অধিকাংশই দেশী এবং তাদের দুধ উৎপাদন মোটেই উল্লেখ্যযোগ্য নয়। তবু যতটুকু দুধ পাওয়া যায় তারা তা বাজারে বিক্রি করে থাকেন। যদিও মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক গাভী তুলনামূলকভাবে বেশি দুধ দেয় তারাও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে দেশে ক্রমশই দুধের অভাব প্রকট হয়েছে। ঐড়ঁংবযড়ষফ ওহপড়সব ধহফ ঊীঢ়বহফরঃঁৎব ঝঁৎাবু (ঐওঊঝ) ২০০০ অনুযায়ী ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে মাথা পিছু দুধ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩২.৫ মিঃলিঃ এবং ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪২.৭২ মিঃলিঃ (উৎসঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৬)। অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ২০০ মিঃলিঃ দুধ খাওয়া প্রয়োজন। এদিক বিবেচনায় আমাদের দেশে দুধের উৎপাদন খুবই খারাপ বলা যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য দেশে দুধ উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি। তাছাড়া আমাদেরকে বছরে প্রায় ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার দুধ বা দুগ্ধজাতপণ্য আমদানি করতে হয়। আমরা যদি দেশের গবাদি পশুর সঠিক পরিচর্যা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে অন্যদিকে তেমনি বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

নেপিয়ার ঘাস

দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমেই জাতের উন্নয়ন আবশ্যক। তারপরই আসে খাদ্যের ভূমিকা। খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ জনসংখ্যায় খুবই ঘন বসতিপূর্ণ। জমির পরিমাণ অল্প। তাই যেখানে মানুষের খাদ্য উৎপাদনেই নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে গবাদির জন্য খাদ্য উৎপাদন অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও যদি কৃষকভাইরা দেখেন যে ঘাস উৎপাদনের ফলে তাঁদের গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ছে এবং এর লভ্যাংশ দ্বারা অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব, তাহলে তাঁরা গবাদিপশু পালনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। আর কাঁচা ঘাস সহজ প্রাপ্য হলে গাভী পালনও সহজতর হবে। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ করতে হবে। সেজন্য দরকার ব্যাপকভাবে উচ্চ উৎপাদশীল ঘাস চাষ। কাজেই এ বিষয়ে কৃষক ভাইদের সচেতন করতে হবে।

আমরা আজকে এমনই একটি ঘাস চাষ নিয়ে আলোচনা করবো যার উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বেশি। বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় এ ঘাস জন্মানো সম্ভব এবং তা থেকে প্রায় সারা বছরই গবাদির কাঁচা ঘাসের চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। এই ঘাসটির নাম নেপিয়ার।

নেপিয়ার এক প্রকার স্থায়ী ঘাস। দেখতে আখের মত, লম্বা ৬.৫-১৩.০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। এই ঘাস দ্রুত বধর্নশীল, সহজে জন্মে, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও খরা সহিষ্ণু। একবার রোপন করলে ৩/৪ বছর পর্যন্ত এর ফলন পাওয়া যায়। শীতকালের ২/৩ মাস ছাড়া প্রায় সারা বছরই এর উৎপাদন অব্যাহত থাকে। এই ঘাস আবাদের জন্য উঁচু ও ঢালু জমি যেমন বাড়ির পার্শ্বে উঁচু অনাবাদি জমি, পুকুুরের পাড়, রাস্তার ধার ও বেড়ীবাঁধ সবচেয়ে উত্তম। ডোবা, জলভূমি কিংবা প্লাবিত হয় এমন অঞ্চলে এই ঘাস আবাদ করা যায় না।

জমি নির্বাচন

পানি নিষ্কাশনের জন্য ভাল ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ যেখানে বৃষ্টি বা বর্ষার পানি জমে থাকে না এরূপ জমি নেপিয়ার চাষের জন্য উত্তম। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এ ঘাস রোপন করা যায়, তবে বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

চাষের সময়

নেপিয়ার ঘাস সারা বৎসরই রোপন করা যায়। সাধারণতঃ বর্ষা মৌসুমেই রোপন করা ভাল। বর্ষার প্রারম্ভে এই ঘাসের কাটিং বা চারা রোপন করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে চারা বা কাটিং লাগালে প্রথম বছরেই ৩/৪ বার পর্যন্ত ঘাস কাটা যেতে পারে। চারা বা কাটিং লাগানোর পর যদি রৌদ্র হয় বা মাটিতে রস কম থাকে তাহলে চারার গোড়ায় পানি সেচ দিতে হবে।

জমিচাষ ও রোপন পদ্ধতি

সমতল জমিতে ৪/৫টি চাষ ও মই দিয়ে জমি আগাছামুক্ত করে কাটিং বা চারা লাগাতে হবে। এই ঘাস আখের কাটিং-এর মত কাটিং অর্থাৎ কান্ডের দুই মাথায় কমপক্ষে দু’টি বা তিনটি গিট রেখে কাটতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৩৬ ইঞ্চি এবং এক চারা হতে অন্য চারার দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি। কাটিং ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে রোপন করা উচিত। একটি গিট মাটির নীচে, মধ্যের গিট মাটির সমানে রেখে চারা বা কাটিং অনুমানিক ৪৫০ কৌণিকভাবে লাগাতে হয়। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর অথবা ভাদ্র মাসের শেষ ভাগে যখন বৃষ্টিপাত কম থাকে তখন নেপিয়ার ঘাস লাগানো উত্তম। অতি বৃষ্টিতে কাটিং লাগালে তা পচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মোথা লাগালে অনুরূপভাবে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে গর্তের মধ্যে একটি করে চারা লাগাতে হবে। সম্ভব হলে প্রতি গর্তে কিছু পচা গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা দেয়া উত্তম। রাস্তা, পুকুরের বাঁধ বা পাহাড়ের ঢালু জমিতে নেপিয়ার চাষ করতে হলে প্রথমে ঢালের আগাছা কোদাল বা কাচি দ্বারা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে কোদাল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে প্রতি গর্তে গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা এবং টিএসপি সার দিয়ে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগিয়ে চার পাশ ভাল করে মাটি দিয়ে চেপে দিতে হবে যাতে চারার শিকড় মাটির সাথে লেগে থাকে।

সার ও পানি সেচ পদ্ধতি

উন্নত জাতের ঘাসের ফলন বেশি পেতে হলে জমিতে প্রয়োজন অনুসারে সার দিতে হয়। জমির গুণাগুণের উপর নির্ভর করে সার ও পানি সেচ দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্ষার সময় ৫/৭ মাস পানি সেচের প্রয়োজন হয় না, শুধু খরার সময় পানির সেচের প্রয়োজন হয়। পচা গোবর ও ফার্মজাত আবর্জনা, পচানো ঘাস হেক্টর প্রতি প্রায় ৩০০০/৪০০০ কেজি জমি চাষের সময় ভালভাবে ছিটিয়ে দিলে মাটিতে পুরোপুরি মিশে যায়। বেশি ফলন পেতে হলে এর সাথে হেক্টর প্রতি ২২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ কেজি টিএসপি এবং ৭৫ কেজি মিউরেট অব পটাশ প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপনের পর জমিতে চারা লেগে গেলে অর্থাৎ রোপনের প্রায় ১০/১২ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল হয়। প্রত্যেক কাটিং-এর পর দুই সারির মাঝের জমি ভালভাবে লাঙ্গল বা কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করে হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। প্রথম কাটিং ৬০-৮০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নেপিয়ারের উৎপাদন ভাল হয়। বৎসরে কমপক্ষে দু’বার (আষাঢ়-শ্রাবণ ও মাঘ-ফাল্গুন মাসে মাটি আলগা করে দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে ১০-১২ দিন বিরতিতে এবং শীতকালে ১৫-২০ দিন বিরতিতে পানি সেচ দিলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।

সাথী ঘাস চাষ

নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে শুটি চাষ করলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা বাড়ে অন্যদিকে ঘাসের পুষ্টিমাণও বৃদ্ধি পায়। স্থায়ী শুটি যেমন সেন্ট্রোসীমা, পয়রো, সিরাট্রো ইত্যাদি এবং অস্থায়ী শুটি যেমন বারসীম, কাউপি, মাসকলাই ও খেসারী ইত্যাদির চাষ করা যেতে পারে। দুই সারি নেপিয়ারের মাঝে এই ঘাসের চাষ করতে হয়।

ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলন

কাটিং বা মোথা লাগানোর ৬০-৭০ দিন পর প্রথমবার ঘাস সংগ্রহ করা যায় এবং এর পর প্রতি ৬-৮ সপ্তাহ পরপর জমি হতে ঘাস সংগ্রহ করা যায়। মাটির ৫-৬ ইঞ্চি উপর থেকে ঘাস কাটতে হয়। প্রথম কাটিং-এ ফলন একটু কম হলেও দ্বিতীয় কাটিং থেকে পরবর্তী ২/৩ বছর পর্যন্ত ফলন বাড়তে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ৪-৪-১/২ বছর পর পুনরায় কাটিং বা মোথা লাগাতে হবে। বৎসরে প্রতি হেক্টরে ১৪০-১৮০ টনের মত ঘাস উৎপাদিত হয়। সাইলেজ করার ক্ষেত্রে ঘাসে ফুল ফোটার পূর্বে বা পর পরই কাটা ভাল। এতে খাদ্যমান বেশি থাকে।

খাওয়ানোর নিয়ম

জমি থেকে ঘাস কাটার পর ঘাস যাতে শুকিয়ে না যায় সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। আস্ত ঘাস গবাদিকে খেতে দিলে অপচয় বেশি হয়। তাই মেশিন, দা অথবা কাঁচি দ্বারা ২-৩ ইঞ্চি লম্বা করে কেটে খাওয়ানো ভাল। এই কাটা ঘাস খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।

আলুর দাম তলানিতে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বগুড়ায় বেড়েছে আলু চাষের জমির পরিধি। পাইকারী বাজারে নেই ক্রেতাদের আনাগোনা। আলুর দামও তলানিতে এসে ঠেকেছে। দাম না মেলায় অনেক কৃষক ক্ষেত থেকেই আলু তুলছেন না। গত বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে পাকড়ি (লাল) আলুর দাম কেজিপ্রতি ১৫-১৬ টাকায় নেমে আসে। হাটে সেই আলু আরও কমে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে। আর সাদা হলেন্ডার স্টিক বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৪৫০ টাকা। আর গ্রানোলা জাতের আলুর দাম ছিল প্রতি মণ মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সেই হিসেবে এই আলুর দাম পড়েছে মাত্র ৭ টাকা ৫০ পয়সা কেজি। হাটের চিত্রের চেয়ে মাঠের চিত্র আরও খারাপ। মাঠের কৃষক আলুর দাম পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১০ টাকা কেজি। এবার ফলন ভাল হওয়ার সুবাদে হাটে আলুর স্তুপ। কিন্তু একে তো দাম কম, তার ওপর ক্রেতার অভাবে ওই আলু বিক্রি করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অনেক কৃষক ক্ষেত থেকেই আলু তুলছেন না। সপ্তাহ জুড়ে ঘুরে মিলেছে মাঠের এ চিত্র। বগুড়ায় মোট সবজি আবাদের ৫০ শতাংশ এলাকা এখন আলুর দখলে। বগুড়ার চন্ডীহারার কৃষক আব্দুল মানিক, মোকামতলা বাজার এলাকার সবুর সওদাগর, নয়মাইল বাজারের মিনহাজ উদ্দিন ও শেরপুরের আকবর মিয়া জানান, বাজার পরিস্থিতি দেখে ক্ষেত থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছি। এখন আলু তুললে লসে বিক্রি করতে হবে। আবার দেরিতে তুললে পরবর্তী ফসল চাষ বিঘিœত হবে। যে কারণে আমরা পড়েছি উভয় সঙ্কটে। এদিকে এখনও বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহ রয়েছে। কমছে না ঘন কুশায়াও। আবহাওয়া ক্রমেই চলে যাচ্ছে আলু চাষীদের প্রতিকূলে। জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে রোগবালাই। অথচ এখন মাঠে পড়ে রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ আলু। কৃষি বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ বলেন, গাছ শুকিয়ে যাওয়ার পর আলু না তুললেও অন্তত ১৫ দিন মাটিতে আলু ভাল থাকবে। ওই কয়েক দিনে বাজার কিছুটা চাঙা হতে পারে। বগুড়ার পাইকারি আলুর বাজার কতদিন এমন মন্দা থাকবে তা নিয়ে কৃষি ও কৃষি বিপণন দফতরের কর্মকর্তারা স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি। কৃষকরা জানান, এ সময়ে মূলত পাকড়ি (লাল) প্রজাতির আলুর ফলন হয়। বৃহস্পতিবার মহাস্থান হাটে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে ওই আলু বিক্রি হয়েছে। সাদা হলেন্ডার স্টিক বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৪৫০ টাকা। আর গ্রানোলা জাতের আলুর দাম ছিল প্রতিমণ মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সেই হিসেবে এই আলুর কেজি হাটে পড়ে মাত্র ৭ টাকা ৫০ পয়সা কেজি।

গাংনীতে সাথী ফসলের মধ্যে হাইব্রীড কুমড়া চাষে কৃষকদের সাফল্য

গাংনী প্রতিনিধি ॥ মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কুমারীডাঙ্গা গ্রামে সাথী ফসল হিসাবে হাইব্রীড সুইট যাতের মিষ্টি কুমড়া চাষ করে কৃষকরা আর্থিকভাবে সাফল্য লাভ করেছেন। ফলে কুমারীডাঙ্গা ও পার্শ্ববর্তি গ্রামগুলোতে দিন-দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে হাইব্রীড মিষ্টি কুমড়ার চাষ। কুমারীডাঙ্গা গ্রামের শতাধিক চাষি অন্যান্য ফসলের সাথে হাইব্রীড মিষ্টি কুমড়া চাষ করে সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। অল্প সময়, স্বল্প খরচ আর ভালো ফলনে ওই অঞ্চলের কৃষকরা এ মৌসুমেও অনেক লাভবান হয়েছেন। গাংনী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে গাংনী উপজেলার প্রায় ১শ’৫০হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছে। কৃষকরা কার্তিক-অগ্রহায়ন মাসে ফুলকপির চাষ করে। একই জমিতেই মাসের মাঝামাঝি সময়ে মিষ্টি কুমড়ার বীজ বপন করে। মাঘ-ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত মিষ্টি কুমড়ার ফলন পাওয়া যায়। অন্যান্য ফসলের সাথে কুমড়া আবাদ করায় এতে কৃষকদের আলাদা কোনো খরচ করতে হয় না। সরেজমিনে দেখা গেছে, গাংনী উপজেলার, কুমারীডাঙ্গা, মিনাপাড়া গ্রামে হাইব্রীড সুইট, অনিক, মায়া যাতের মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছে বেশী। তবে উল্লেখযোগ্য হারে কুমড়ার আবাদ হয় কুমারীডাঙ্গা গ্রামে। এখানকার উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া স্থানীয় জেলার চাহিদা পুরণ করার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার কাঁচা বাজার আড়ত, বাজারে পাইকারী দরে বিক্রি করছেন কৃষকরা। এছাড়াও ব্যবসায়ীরা কৃষকের জমি থেকে মিষ্টি কুমড়া ক্রয় করছেন। কুমারীডাঙ্গা গ্রাামের কৃষষক আলতাব হোসেন, টুটুল, শিমুল, আইনাল, শাহাজুল ইসলাম জানান, হাইব্রীড মায়া, অনিক সুইট যাতের মিষ্টি কুমড়া চাষে ১বিঘা জমিতে খরচ হয় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। আর প্রতি বিঘাতে কুমড়া বিক্রি করে লাভ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। একই গ্রামের কৃষক আইনাল হোসেন জানান, এক বিঘা জমি থেকে সবোর্চ্চ ১৩শ’ থেকে ১৫শ’ কুমড়া পাওয়া যায়। প্রতিটি কুমড়ার দাম আকার ভেদে ১০ টাকা কেজি থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে ক্ষেত থেকেই পাইকারী ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যায়। তাই আমাদের বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাশেদ আহমেদ জানান- কুমারীডাঙ্গা গ্রামের গাড়ীর মাঠে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছে বেশি, অন্যান্য এলাকার চেয়ে এখানকার উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া সুস্বাদু ও আকৃতিতে বড় হয় বলে চাহিদা বেশি। প্রায় প্রতিদিন চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণসহ ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ দমনে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। গাংনী উপজেলা কৃষি অফিসার কেএম শাহাবুদ্দীন আহমেদ জানান- এবছর গাংনী উপজেলায় হাইব্রীড অনিক, সুইট, মায়া যাতের মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছে প্রায় ১৫০হেক্টর জমিতে। তিনি আরও বলেন কৃষকরা ফুলকপি, আলু, মরিচ চাষের সাথে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করছে। কম খরচে ভালো লাভ পাচ্ছে। তাই দিন-দিন এখানকার কৃষকরা মিষ্টি কুমড়া আবাদে ঝুঁকে পড়ছে। তবে আগামী বছরে গাংনী উপজেলায় কুমড়ার চাষ দ্বিগুণ হারে বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। চাষীদের উদ্বুদ্ধকরণসহ ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ দমনে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। মাটির উর্বরতা যেনো ঠিক থাকে এবং চাষীরা যাতে পরিকল্পিতভাবে কুমড়ার আবাদ করতে পারে সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ খুব দ্রুত প্রজননক্ষম ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ নামে পরিচিত জাতের ছাগল। আকারে ছোট হলেও এ জাতের একটি ছাগল ১২ মাসে গড়ে ১৫ কেজি ওজন হয়। অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের খাদ্য খেলেও এই ছাগল থেকে পাওয়া যায় উন্নতমানের মাংস। প্রতি বছর একটি ছাগল দু’বার করে গড়ে ২ থেকে ৪টি বাচ্চা দেয়। লাভজনক বিধায় ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ উৎপাদনে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগলের জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন গবেষণা’ শীর্ষক এ প্রকল্প কমিউনিটিভিত্তিক বাস্তবায়ন হলে দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ৪৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হবে ঢাকার সাভার, ময়মনসিংহ সদর, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও বান্দরবান। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, টেকসই উন্নয়নে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ নামের এ সম্ভাবনাময় জেনেটিক সম্পদের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও উন্নয়ন জরুরি। এ প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটিভিত্তিক ছাগল উৎপাদন মডেল তৈরির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামো তৈরি এবং গবেষণা পরিচালনার জন্যই প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটির আওতায় ব্ল্যাক বেঙ্গলের বাচ্চা উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রাণীটির জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হবে। মাঠ পর্যায়ে নিউট্রিশন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্রিডিংয়ের কার্যক্রমও চলবে। এ বিষয়ে বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এবারই প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল উৎপাদন করা হবে। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এ জাতের ছাগল ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, আমরা গবেষণা করে দেখেছি বান্দরবানে যে জাতের ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল বেড়ে উঠছে একই জাতের ছাগল রংপুরে টিকতে পারবে না। তাই সারা দেশে কমিউনিটি ভিত্তিক ছাগল উৎপাদন করা হবে। এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি তৈরি করে এ জাতের ছাগলের প্রসার ও উৎপাদন বাড়ানো হবে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটিতে নিউক্লিয়াস প্রজনন কেন্দ্র, এলাকাভিত্তিক ছাগলের খাদ্য হিসেবে চারণ ভূমি, এলাকা উপযোগী হাইড্রোফনিক (মৃত্তিকাবিহীন জল চাষ বিদ্যা) ফডার ঘাস উৎপাদন, ছাগলের জন্য ফিডিং সিস্টেমের উন্নয়ন করা হবে। জোনভিত্তিক ছাগলের কমিউনিটি গঠন, কমিউনিটি খামারিদের উৎপাদন ও প্রজনন তথ্য রেকর্ডিং সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, কমিউনিটিতে ফ্রোজেন সিমেন ব্যবহার ও উন্নত প্রজনন সংক্রান্ত প্রযুক্তির (এআই) প্রয়োগ করা হবে। এ ছাড়া কমিউনিটি ও বাণিজ্যিকভিত্তিক খামারিদের মধ্যে নতুন প্রযুক্তির বিস্তার, গণসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচারণা কার্যক্রমও চালানো হবে। দেশে প্রাপ্ত প্রায় ২০ মিলিয়ন ছাগলের প্রায় ৯৩ শতাংশ পালন করেন ক্ষুদ্র এবং মাঝারি পর্যায়ের খামারিরা। তাদের খামারের ৯০ শতাংশই ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগল। দেশে প্রাপ্ত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস যেমন সুস্বাদু, তেমনি চামড়া আন্তর্জাতিকভাবে উন্নতমানের বলে স্বীকৃত। তা ছাড়া ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের প্রজননক্ষমতা অধিক এবং দেশীয় জলবায়ুতে এটি বিশেষভাবে উৎপাদন উপযোগী। এসব গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগলের বাণিজ্যিক উৎপাদন এদেশে এখনো চোখে পড়ার মতো প্রসার লাভ করেনি। এর অন্যতম কারণ ইনটেনসিভ বা সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল পালনের ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব। এসব বাধা দূর করতেই কমিউনিটিভিত্তিক ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন উপযোগী এলাকায়। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষকে এই প্রকল্পের আওতায় এনে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।

কালো মুরগির ভালো গুণ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কথায় বলে ‘কালো জগতের আলো’ একদমই সত্যি। কালো রঙটিকে যতই ছোট করা হোক না কেন, অনেক ক্ষেত্রে কিন্তু শুধু কালো রং বলেই জিনিসের দাম বেড়ে যায় কয়েকগুণ। পৃথিবীর তাবত রাষ্ট্রনায়কদের লিমুজিনের রং কালো, মাইকেল জ্যাকসন কিংবা স্টিভ জোভসকে কালো পোশাক ছাড়া অন্য কোনো রঙে দেখেছেন কেউ? ব্ল্যাক রোজ, ব্ল্যাক পার্ল, ব্ল্যাক প্যান্থার থেকে শুরু করে নীহাররঞ্জনের ‘কালো ভ্রমর’Ñ ‘কালো’ শব্দটি জুড়লেই বস্তুটির প্রতি আকর্ষণ যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কালো জুতা, কালো স্যুট এমনকি কালো শার্টেও সাধারণ চেহারার মানুষকে অনেক স্মার্ট ও আকর্ষণীয় লাগে। কিন্তু জানেনকি! পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মুরগির বর্ণও কুচকুচে কালো? পালক থেকে শুরু করে ঠোঁট, পা, নখ, ঝুঁটি, চোখ, সবই কালো। এমনকি, ওই মুরগির মাংসের রংও কালো। শুধু মাংসই নয়, মুরগির জিভ, হাড় ও নাড়িভুঁড়িও কালো রঙের। কেবল রক্ত স্বাভাবিক লাল রঙের। ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের কেমানি এলাকাতেই প্রথম পাওয়া গেছিল এই বিশেষ জাতের কালো মুরগি। নাম ‘জেট ব্ল্যাক’ আয়্যাম কেমানি চিকেন। আমেরিকার ফ্লোরিডায় অবস্থিত গ্রিন ফামের্র ব্রিডার পল ব্র্যাডশো ২০১৩ সাল থেকে এই কালো মুরগির ব্যবসা শুরু করেছেন এবং কয়েক বছরেই কোটিপতি হয়ে গেছেন। একেকটি মুরগির দাম হেঁকেছিলেন ২৫০০ ডলার, ২০১৩ সালেই। ভারতীয় টাকায় প্রায় লাখ দেড়েক। ব্র্যাডশো আদর করে এই কালো মুরগির নাম দিয়েছেন ‘ল্যাম্বরগিনি পোল্ট্রি’। জীববিজ্ঞানীদের মতে কালো টিস্যু জিন প্রকট হওয়ায় এই জেনেটিক পরিস্থিতির নাম ‘ফাইব্রোমেলানোসিস’। চীনের সিল্কি জাতের কালো মুগির সঙ্গে ‘জেট ব্ল্যাক’ আয়্যাম কেমানি চিকেনের কিছুটা মিল রয়েছে, কিন্তু চাইনিজ মুরগি চাইনিজ মোবাইলের মতোই দামে কম ও কদরহীন। তাই দুনিয়ার বিত্তশালীদের ডিশ আলো করছে ‘ল্যাম্বরগিনি পোল্ট্রি’ ওরফে ‘জেট ব্ল্যাক’ আয়্যাম কেমানি চিকেন। ব্রিডারদের ও ভোজন রসিকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও লোভনীয় এই জাতের মোরগের গড়পড়তা ওজন হয় দুই থেকে আড়াই কেজি এবং মুরগির ওজন হয় দেড় থেকে দুই কেজি। ‘জেট ব্ল্যাক’ আয়্যাম কেমানি চিকেনের ডিমও কিন্তু কালো রঙের।
আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশে কড়কনাথ বা কালি মাসি (কালো মাংস) নামে এ প্রজাতির মুরগি পাওয়া যায়। এই মুরগিরও মাংস কালো। দেখতেও কালো। উচ্চমানের প্রোটিন ও অল্প পরিমাণের চর্বিল জন্য চাহিদা খুব বেশি; কিন্তু সেই তুলনায় জোগান অনেক কম। তবে ইন্দোনেশিয়ার অ্যায়্যাম কেমানি চিকেনের তুলনায় দাম ও জনপ্রিয়তা ভারতে অনেক কম। যে মুরগির প্রতি কেজি মাংসের দাম হাজার টাকার বেশি। এক হালি ডিমের দাম ১০০ টাকা। ভারতীয় বিজ্ঞানীদের মতে, এই কালো মুরগিতে রয়েছে রোগমুক্তির মহৌষধ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ থেকে রক্তে শকর্রা নিয়ন্ত্রণ, পেশিশক্তি বাড়াতেÑ এমনকি ক্যান্সারের প্রতিরোধেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে এ মুরগির মাংস ও ডিম। এমনটিই জানিয়েছেন গবেষকরা। পুষ্টিবিদরা জানান, কালো এই মুরগিতে রয়েছে বিপুল পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও প্রচুর পরিমাণে আয়রন। সাধারণ মুরগির চেয়ে এই কালো মুরগির মাংসে কোলেস্টেরলের মাত্রাও অনেক কম বলে জানান তারা। এ মুরগির মাংসে রয়েছে মাত্র ১.৯৪ শতাংশ ফ্যাট; কিন্তু প্রোটিনের মাত্রা অন্য সব মুরগির মাংস থেকে কয়েক গুণ বেশি।
হাঁড়ির খবর হলোÑ সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেটারদের পেশিশক্তি বাড়াতে তাদের খাদ্য তালিকায় কড়কনাথ প্রজাতির মুরগি যোগ করতে বিসিসিআইকে পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির মধ্যপ্রদেশের প্রাণী বিজ্ঞানী ড. আরএস তোমর। এত শত গুণের কথা জেনে সম্প্রতি এই মুরগির উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

বিষমুক্ত শাক-সব্জীর চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য উন্নত বীজ, রাসায়নিক সারের ব্যবহারে যেমন বহু বছর ধরে বাংলাদেশের কৃষকরা অভ্যস্ত, তেমনি ফসল নিরাপদ রাখার জন্য রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারও বহুল প্রচলিত। কিন্তু সব রাসায়নিক বস্তুরই ক্ষতিকর দিক আছে, যা আমাদের জমি ও প্রকৃতির যথেষ্ট ক্ষতি করে ফেলেছে এরই মধ্যে। সুতরাং রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প উপায় যদি উদ্ভাবন করা যায় তাকে বড় সাফল্যই বলতে হবে। সে সাফল্য পেয়েছেন মাগুরার কৃষকরা।
কীট কিংবা বালাই নিধনের জন্য এখন কীটনাশকের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়ে না। প্রাকৃতিকভাবেই ফসলি জমির ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ নিধন সম্ভব। মাগুরার বিভিন্ন মাঠে প্রাকৃতিকভাবে বালাই দমনের নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে এ রকমই মন্তব্য করছেন কৃষি বিভাগ ও কৃষি উন্নয়নে কর্মরত সংশ্লিষ্টরা।
জেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, তিন ধরনের প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে বালাই নাশে স্থানীয় কৃষকরা এখন অনেকটাই সফল। যার প্রথম পর্যায়ে রয়েছে মাছিপোকা দমনে ফেরোমন ট্রাপের ব্যবহার। ফেরোমন ট্রাপের পরই রয়েছে ফসলি জমি বিশেষ করে ধানক্ষেতে লাইভ পার্চিং ও ডেথ পার্চিংয়ের ব্যবহার এবং বন্ধু পোকার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমন।
ফেরোমেন ট্রাপ ঃ
মনোসেক্স ফেরোমেন ট্রাপ হচ্ছে মাছি জাতীয় পোকা দমনের এক ধরনের ফাঁদ। সবজিসহ ফসলি ক্ষেতে প্লাস্টিকের বয়াম স্থাপন করে তার মধ্যে ডিটারজেন্ট পাউডার গুলিয়ে স্ত্রী পোকার গায়ের গন্ধযুক্ত ফেরোমেন স্থাপন করা হয়। ফেরোমেনের গন্ধে পুরুষ মাছি বয়ামের মধ্যে গিয়ে ডিটারজেন্ট গোলানো পানিতে পড়ে মারা যায়। ফলে পোকার বংশ বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়। কৃষি বিভাগ ও ইসডেফ ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গোটা জেলায় পোকা দমনে কৃষকদের মধ্যে এ পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছে।
লাইভ পার্চিং ও ডেথ পার্চিং ঃ
লাইভ শব্দের অর্থ জীবন্ত। পার্চ শব্দের অর্থ দাঁড় কিংবা অল্প উঁচু ও নিরাপদ আসন। সেক্ষেত্রে লাইভ পার্চিং অর্থ জীবন্ত দাঁড়। অন্যদিকে একইভাবে ডেথ পার্চিং অর্থ দাঁড়াচ্ছে মৃত কিংবা মরা দাঁড়। দাঁড় শব্দের সঙ্গে উড়ন্ত পাখির সম্পর্ক রয়েছে। এই দাঁড়ের সঙ্গে ধানিজমির পোকা দমনের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। অতীতে কৃষকরা ধানিজমিতে পাখিদের জন্য কৃত্রিম দাঁড় তৈরি করত। তখন যে কোনো ধানক্ষেতের দিকে তাকালে গাছের মরা ডাল দিয়ে পাখিদের দাঁড় স্থাপনের দৃশ্য খুব সহজে চোখে পড়ত। দাঁড় স্থাপনের লক্ষ্য ছিল একটিই, পাখিদের সহজে বসার ব্যবস্থা করা, যাতে মাজরা পোকাসহ অন্যান্য ক্ষতিকর পোকা তারা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
রাসায়নিক কীটনাশকের দাপটে এ প্রাকৃতিক কীট দমন পদ্ধতিটি হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খুশির সংবাদ হচ্ছে, এখন কৃষি বিভাগের উদ্যোগেই কৃষকদের নতুন করে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে প্রাকৃতিক পোকা দমন পদ্ধতি ব্যবহারে। যে কারণে জেলার সর্বত্র চলতি আউশ-আমন মৌসুমে অধিকাংশ ধানক্ষেতে কৃষকদের এ দাঁড় পাততে দেখা যাচ্ছে।
পার্চিং পদ্ধতির দুটি ভাগ রয়েছে। এর একটির নাম দেওয়া হয়েছে লাইভ পার্চিং, অন্যটি ডেথ পার্চিং। লাইভ পার্চিং পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে ৩ মিটার দূরত্বে পাখিদের বসার জন্য রোপণ করা হচ্ছে ধনচে গাছ। কৃষি বিভাগের মতে, ধনচে গাছ একটু বড় হলেই সেখানে পাখিরা খুব সহজে বসতে পারে। এটি আগাছা না হওয়ায় ক্ষেতের কোনো ক্ষতি করে না। ধনচে গাছ রাইজোডিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া থেকে নাইট্রোজেন সংগ্রহ করে মাটিতে সরবরাহ করে। ফলে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় কম। যেহেতু ধনচে গাছ জীবিত অবস্থায় পাখির মাধ্যমে পোকা দমনে দাঁড় হিসেবে কাজ করছে সুতরাং এর দ্বৈত সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে ডেথ পার্চিং হচ্ছে মরা গাছের ডাল মাঠের মধ্যে পুঁতে দিয়ে একইভাবে পাখিদের বসার জায়গা করে দেওয়া। এ পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২টি ডাল পুঁতে দিলেই হয়। এক্ষেত্রে কেউ কেউ ডালপালার পরিবর্তে শক্ত পাটকাঠি মাঠের মধ্যে পুঁতে দিয়ে পাখি বসার সাময়িক ব্যবস্থা করে দেন।
বন্ধুপোকা ঃ
সব পোকাই ফসলি ক্ষেতের জন্য ক্ষতিকর নয়। শস্যের ক্ষতিকারক পোকার পাশাপাশি রয়েছে কিছু বন্ধুপোকা। বন্ধুপোকা নানাভাবে শক্র পোকা দমন করে ফসলি ক্ষেতে বন্ধু হিসেবে কাজ করে। যে কারণে এদের বলা হয় বন্ধুপোকা। কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে আমাদের জীববৈচিত্র থেকে ক্ষতিকর পোকার সঙ্গে সঙ্গে দিন দিন বন্ধুপোকাও হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে ফসলের ক্ষেতে এখন বন্ধুপোকার সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
আর এ প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখেই মাগুরা সদর উপজেলার শ্রীকুন্ডিী গ্রামে প্রায় ১০০ একর সবজির ক্ষেতে বন্ধুপোকা ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইসডেপ কনসার্ন ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তারা দেড় মাসে এ এলাকার বেগুন, চালকুমড়া, পটল, শসাসহ বিভিন্ন সবজি ক্ষেতে প্রায় ১৪ লাখ বন্ধুপোকা ছেড়েছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক গাউছুল আযম স্বাধীন জানান, তারা শ্রীকুন্ডী এলাকার ১০০ একর জমিতে ৫০ হাজার আইব্রাকন ও ১৩ লাখ ট্রাইকোগ্রামাথ এ দুই জাতীয় বন্ধুপোকা ছেড়েছেন। এছাড়া লেডি বার্ড ব্রিটল নামে আরেক জাতীয় পোকা ছাড়া হয়েছে। আইব্রাকন জাতীয় বন্ধুপোকা মাজরা জাতীয় ক্ষতিকর পোকার শরীরে তাদের আল ফুটিয়ে ওই পোকার জীবনশক্তি নিঃশেষ করে দেয়, যা ফসলি জমিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ট্রাইকোগ্রামা জাতীয় বন্ধুপোকা একই পদ্ধতিতে সবজির ডগা ছিদ্রকারী ক্ষতিকর মাজরা পোকার ডিম নষ্ট করে দেয়। ফলে তাদের বংশ বিস্তার বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয় কৃষকরা এ পোকা ছাড়ার ফলে উপকৃত হচ্ছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, এ পদ্ধতিতে পোকা দমন করলে ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। এতে খরচ যেমন বাঁচে, তেমনি মৌমাছি জাতীয় পরাগায়ন সহায়ক পতঙ্গ সবজি মাচায় খুব সহজে চাক বাঁধে। আর তার ফলে পরাগায়ন ভালো হওয়ায় ফলনও ভালো হয়।
ইসডেপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এসপিজিআর প্রকল্পের সহায়তায় তাদের ল্যাব থেকে প্রথমে ডিম সংগ্রহ করে আনছেন। পরে এ ডিম নিজেদের ল্যাবে দু’দিন রেখে পোকার জন্ম হলে পোকাভর্তি বয়ামগুলো কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছেন। এছাড়া এ বিষয়ে কৃষকদের দিচ্ছেন যথাযথ প্রশিক্ষণ।
এ ব্যাপারে মাগুরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ফসলের ক্ষেতে ফেরোমেন ট্রাপ ও বন্ধুপোকার মাধ্যমে ক্ষতিকর পোকা দমন কার্যক্রম ইসডেপের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ১০টি প্রদর্শনী খামারে পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি পর্যায়ে প্রথমবারের মতো বন্ধুপোকা ছাড়া হয়েছিল, যা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সরকারিভাবেই এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জানান, জেলায় এ বছর ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে ডেথ পার্চিং ও লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। আগামী মৌসুমে শতভাগ ধানিজমি এ পদ্ধতির আওতায় আনা হবে।

ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ ড্রাম সিডারে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বীজতলা তৈরি না করে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে সরাসরি ক্ষেতে ধান বপনে লাভবান হয়ে শেরপুরের পাঁচ উপজেলার শত শত কৃষক ব্যাপক সাড়া  ফেলেছেন। এই পদ্ধতিতে ধান চাষ করতে বীজতলা তৈরি করতে হয় না। ফলে সময়, শ্রম ও ব্যয় সবকিছুই কম লাগে। তাই সনাতনি পদ্ধতির চেয়ে বেশি ফসল পাওয়ায় জেলার সদরসহ নকলা, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীর কৃষকদের মধ্যে ড্রাম সিডার পদ্ধতিতে ধান চাষে আগ্রহ বাড়ছে। সদর উপজেলার লছমনপুর এলাকার কৃষক আক্কাস আলী, আবদুর রৌফ, দেলোয়ার ও শরাফত বলেন, দু’পাশে প্লাস্টিকের দুটি চাকার ভেতর একটি লোহার দন্ডের মধ্যে সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট দূরত্বে  ছোট আকৃতির ছয়টি প্লাস্টিকের ড্রাম থাকে। প্রতিটি ড্রামে থাকে নির্দিষ্ট মাপের নির্দিষ্ট সংখ্যক ছিদ্র। প্লাস্টিকের চাকার সঙ্গে লাগানো থাকে একটি হাতল, যেটি ধরে একজন কৃষক সহজেই যন্ত্রটি টানতে পারেন। তিন থেকে চার হাজার টাকা হলেই এই যন্ত্রটি স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহারে তৈরি করা যায়। নালিতাবাড়ীর রামচন্দ্রকুঁড়া এলাকার কৃষক লিয়াকত গাজী বলেন, ড্রাম সিডারের মাধ্যমে একজন কৃষক দিনে প্রায় আট বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে পারেন। কিন্তু সনাতন পদ্ধতিতে এ ধানের চারা রোপণ করতে অন্তত ২০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। ড্রাম সিডারে ধান চাষ করায় উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম লাগছে। উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, সনাতন পদ্ধতিতে ধান রোপণের জন্য জমি  যেভাবে কাদা করতে হয় সেভাবেই জমি উত্তমরূপে চাষ ও মই দিয়ে কাদাময় করে নিয়ে তারপর ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান রোপণ করতে হবে। বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির প্রথমার্ধে এবং আমন মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা আছে এমন উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমিতে জুনের শেষার্ধ থেকে জুলাইয়ের প্রথমার্ধে ধান বপন করা উত্তম। তবে জমির কোনো স্থানে যেন পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল ওয়াদুদ বলেন, তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষে কৃষককে পরামর্শ দিয়েছেন। ড্রাম সিডারে সারি ধরে আগাছা দমন সহজ হয়। আগাছানাশক ব্যবহার করলে চার থেকে পাঁচ দিন ক্ষেতে ছিপছিপে পানি থাকতে হবে। এলসিসি ভিত্তিক ইউরিয়া প্রয়োগ করতে পারলে এই পদ্ধতিতে ধান চাষে সুফল বেশি পাওয়া যায়। ধানগাছ একটু বড় হলে রোপা পদ্ধতির মতোই পানি সেচ দিতে হয়। সঠিক পরিচর্যায় ড্রাম সিডারে  বোনা ধান শতকরা ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে। এ পদ্ধতিতে চাষ করলে ১২ থেকে ১৫ দিন আগে ধান ঘরে তোলা যায়। কৃষিবিদ শেখ ফজলুল হক মণি বলেন, এ পদ্ধতির ক্ষেতে আগাছা সামান্য বেশি হয়। তাই নিড়ানি বা উইডার দিয়ে আগাছা দমন সহজ হয়। এক্ষেত্রে ব্রি-উইডার বেশ উপযোগী। কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস বলেন, এই যন্ত্রটি হালকা হওয়ায় সহজে বহন করা যায়। ফলে সবাই এটি ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। তিনি জানান, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাইব্রিড জাত, উফসী জাত এবং স্থানীয় জাতের জমি। এছাড়া চলতি মৌসুমে জেলায় কমপক্ষে আড়াইশ বিঘা জমিতে ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষ করা হয়েছে। ড্রাম সিডারের মাধ্যমে ধান চাষের উৎপাদন ব্যয় কম কিন্তু ফলন বেশি পাওয়ায় কৃষক লাভবান হচ্ছেন।

ডুমুর ফল কেন খাবেন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আশ্চযর্জনক ও বিস্ময়কর এক ফলের নাম ডুমুর বা ত্বীন ফল। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা পবিত্র কোরআনে যার বর্ণনা করেছেন। এর উপকারিতা সম্পর্কে মেডিকেল সায়েন্সে প্রমাণিত অনেক রিপোর্ট আছে। জেনে নিন এই ত্বীন বা ডুমুর ফল সম্পর্কে কোরআন ও মেডিকেল সায়েন্স কি বলে? ত্বীন ফলের উল্লেখ আছে পবিত্র কোরআনের সুরা ত্বীনে। এই বরকতময় ফলের নামেই নামকরণ করা হয়েছে এই সুরার। সুরা ত্বীনের ১-৪ নাম্বার আয়াতের অর্থ- “কসম ‘ত্বীন ও যায়তুন’ (ফল) এর, কসম ‘সিনাই’ পবের্তর, কসম এই নিরাপদ নগরীর, অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সবোর্ত্তম গঠন ও আকৃতিতে।” আসুন এবার জেনে নেয়া যাক, কেন খাবেন ত্বীন বা ডুমুুর ফল? ত্বীন ফল নারী-পুরুষের শক্তি বৃদ্ধি করে। ত্বীন ফলে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম রয়েছেÑ যা ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখে। ডুমুর বা ত্বীন ফল রক্তে ক্ষতিকর সুগারের পরিবর্তে ন্যাচারাল সুগার তৈরি করে ব্যালান্স রক্ষা করে। এই ফল মারণব্যাধি ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে। সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেছে, ত্বীন ফল ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। ফাইবারসমৃদ্ধ ত্বীন ফল খাদ্য তালিকায় রাখার ফলে ৩৪% নারীর মধ্যে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কম দেখা গিয়েছে। ত্বীন ফল চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে ত্বীন ফল একান্ত অপরিহার্য। ত্বীন ফল শরীরের অপ্রয়োজনীয় মেদ বা চর্বি কমায়। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে। ইনসুলিনের ওপর নিভর্রশীল ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য ডুমুর বা ত্বীন ফল খুবই উপকারী। এ ছাড়া শরীরের ক্যালসিয়ামের শূন্যতা পূরণ করে এবং গভর্বতী মা ও শিশুর রক্তশূন্যতা রোধ করে। এটি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। যারা শারীরিক দুবর্লতায় ভোগেন এমন ব্যক্তির জন্য ত্বীন ফল খুবই উপকারী। বিশেষ করে মুখ, জিভ বা ঠোঁট ফাটার সমস্যা থাকলে তা নিরাময় করতে ডুমুর সাহায্য করে। প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকায় ডুমুর কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলস প্রতিরোধে সহায়তা করে। ত্বীন ফল শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। যাদের দুধ ও দুধের তৈরি খাবারে অ্যালার্জি আছে তারা ক্যালসিয়ামের ঘাটতির পূরণের জন্য নিয়মিত ত্বীন ফল খান। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম। কাঁচা ডুমুর ফল চর্মরোগের ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। থেঁতো করে ব্রণ ও মেছতায় নিয়মিত লাগালে তা সেরে যায়।
লেখক ঃ ডা. মোহাম্মাদ জহিরুল হক

দেশে ৬০ ভাগ আমিষের চাহিদা পূরণ হয় মৎস্য খাত থেকে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ষোলো কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ৬০ ভাগ আমিষের চাহিদা পূরণ হয় মৎস্য খাত থেকে। পাশাপাশি মাছ রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আশাবাদের খবর হচ্ছে ফিশ অ্যাকুয়াকালচার বা চাষকৃত মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য গ্লোবাল অ্যাকুয়াকালচার প্রডাকশন স্ট্যাটিস্টিকস ফর দ্য ইয়ার-২০১৫’ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে চাষ করা মাছের বার্ষিক উৎপাদন ১৬ লাখ টন। তাদের জরিপে ফিশ অ্যাকুয়াকালচার বা চাষ করা মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার পরই পঞ্চম স্থানটি বাংলাদেশের। শীর্ষস্থানে থাকা চীনের বার্ষিক উৎপাদন ৩৮ লাখ ৬২ হাজার টন, ভারত ৩৫ লাখ ৭৩ হাজার, ভিয়েতনাম ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ও ইন্দোনেশিয়া প্রতি বছর গড়ে ২৭ লাখ ১৮ হাজার টন। এই আশার খবরের প্রতিফলন হচ্ছে মাছ  থেকে দেশে আমিষের চাহিদার ৬০ শতাংশের জোগানই আসছে। আমরা জানি, বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে মৎস্য খাতের অবদান ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।  দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ বা দেড় কোটির  বেশি মানুষ বা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।

চাষ করা মাছ উৎপাদনে নীরব বিপ্লব

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে চাষ করা মাছ উৎপাদনের  ক্ষেত্রে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বেসরকারি উদ্যোগ। যদিও এই উৎপাদন বাড়ার পেছনে সরকারি ও বেসরকারি উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৎস্য খাতের অবদানের পেছনে বিশেষত সরকারের মাছের অভয়াশ্রম ও প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং মৎস্য  আইন বাস্তবায়নও  বেশ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া পোনা অবমুক্তি, বিল ও নার্সারি স্থাপন,  পোনা সংরক্ষণ কর্মসূচি, পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ, বদ্ধ জলাশয়ে নিবিড় মৎস্য চাষ, সামাজিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা গ্রহণ ও মৎস্যচাষিদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে মাছ উৎপাদন বাড়ছে। এছাড়া মৎস্য জেলা হিসেবে ময়মনসিংহে  রেণু ও পোনা উৎপাদনে হ্যাচারি শিল্প গড়ে উঠেছে, যা দেশের প্রায় সব জেলায়ই মৎস্য চাষ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জেলেদের পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যার মাধ্যমে জেলেরা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে পারবেন। বহুবিদ সম্ভাবনা আর অবারিত সুযোগের কারণেই এখন কৃষকদের মধ্যেও মৎস্য চাষে আগ্রহ বাড়ছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে পোনা উৎপাদনকারী জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে যশোর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, কুমিল্লা ও নরসিংদী। তবে মৎস্য  চাষের এলাকা এখন বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, পাবনা, দিনাজপুর, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইল  জেলায়ও বিস্তৃতি লাভ করেছে। নানামুখী উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য  জেলায়ও ব্যক্তি পর্যায়ে পুকুরে মাছ চাষের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক সাফল্য আসতে শুরু করেছে। তারচেয়েও বড় আশাবাদের খবরটি হলো প্রকৃতপক্ষে সারা  দেশে পুকুরে মাছ চাষে বিপ্লবের লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

রোল মডেল হবে বাংলাদেশ

স্বাদু পানির মৎস্য চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা বাংলাদেশের। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।  দৃঢ়তার সঙ্গে চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই অবস্থান ধরে রেখেছে। আবার বিশে মোট মাছ উৎপাদনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। এখানকার আড়াই লাখ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় ও গ্রামীণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মৎস্য চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। সরকার যদি এ বিষয়ে আরো মনোযোগী হয়, চাষিদের সহায়তা করে, তাহলে বৈশ্বিক মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষস্থানে উঠে আসতে পারে বাংলাদেশ।

ঘরের ভেতর মাছের চাষ

বাংলাদেশে একেবারে নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই এ পদ্ধতি খুব জনপ্রিয়। দেরিতে হলেও আমাদের দেশে ময়মনসিংহের মৎস্যচাষি ফিশ হ্যাচারি ও কালচার ফার্ম অ্যাগ্রো থ্রি-দর স্বত্বাধিকারী এ বি এম শামছুল আলম বাদল ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরএএস প্রযুক্তিতে প্রথম মাছ চাষ শুরু করেন। গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ঘরের ভেতর মাছ চাষ করে পুকুরের চেয়েও প্রায় ৩০ গুণ বেশি উৎপাদন সম্ভব। রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতিতে এক ঘনমিটার পুকুরে দুই কেজি মাছ হলে পদ্ধতিতে ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। উদ্যোক্তা এ প্রযুক্তিতে ময়মনসিংহ শহরের বিসিক শিল্পনগরীর একটি টিনশেড প্লটে ১০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৮টি ট্যাংক স্থাপন করেন। প্রতিটি ট্যাংকে পাইপ দিয়ে মেকানিক্যাল ফিল্টার সংযুক্ত করা হযেছে।  মেকানিক্যাল ফিল্টারের কাজ প্রতিটি ট্যাংকের মাছ ও মৎস্য খাদ্যের বর্জ্য পরিষ্কার করা। পরে এ পরিষ্কার পানি পাম্প দিয়ে বায়োফিল্টারে উত্তোলন করা হয়। এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত মাছের গুণগতমান অনেক উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত। উদ্যোক্তার মতানুযায়ী এ পদ্ধতিতে মূলত ক্যাটফিশ জাতীয় মাছ (পাবদা, গোলসা, শিং, মাগুর) চাষ করা হয়। বর্তমানে ৮টি ট্যাংকে তিনি পাবদা ও গোলসা মাছ চাষ করছেন। তিনি জানান, এ ধরনের চাষ-পদ্ধতিতে মাছের খাদ্য কম লাগে। উৎপাদিত মাছ স্বাভাবিক মাছের তুলনায় আকারে বড় হয়। রোগবালাই ও মড়কের আশঙ্কা নেই।

কাজে লাগাতে হবে সুযোগ-সম্ভাবনা

মৎস্য পরিবহনের জন্য ফ্রিজিং পিকআপ ব্যবস্থা করা দরকার। এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মনযোগ দেয়া খুবই জরুরি। মৎস্য উৎপাদনে শীর্ষ দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এ খাতের সম্প্রসারণ হার বেশি হলেও অপচয়ের কারণে মাছের ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছের উচ্ছিষ্টাংশ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খাদ্যপণ্য উৎপাদন হলেও এদেশে তেমন কোনো সুযোগ নেই। অথচ মাছের এ ধরনের উচ্ছিষ্টাংশ দিয়ে তেল, অয়েল কেক ও খাবার তৈরি এবং শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল তৈরি করে বছরে বিপুল অর্থ আয় করা সম্ভব।  সরকার দেশের মাছ উৎপাদন বাড়াতে যতটা নজর দিচ্ছে, ঠিক ততটাই অবহেলা করা হচ্ছে এর সংরক্ষণ কিংবা পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। তাছাড়া মাছ উৎপাদনে জড়িত এবং বিপণন প্রক্রিয়ায় যারা নিয়োজিত, তাদেরও দক্ষতা ও সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাজা মাছ বিপণন করতে এখনো দেশে উন্নত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। খামারি বা জেলেরা এখনো বরং পুরনো পদ্ধতিতে মাছ বিপণন করেন। পরিবহন ব্যবস্থারও দুর্বলতা রয়েছে।

লেখক ঃ এস এম মুকুল, অর্থনীতি বিশ্লেষক।

গমের হুইট ব্লাস্ট প্রতিরোধে মেহেরপুরে কৃষক পর্যায়ে চলছে গবেষনা

মেহেরপুর প্রতিনিধি ॥ কৃষক পর্যায়ে গমের ব্লাস্ট প্রতিরোধে মেহেরপুরে গবেষনা শুরু করেছে ১২ সদস্যর একটি বিজ্ঞানী দল। বিদেশী ৪৮টি গমের বিভিন্ন জাত এবং লাইন নিয়ে চলছে গবেষনা। সফল হলে গম চাষে আর কোন বাধা থাকবে না বলছেন তারা। বাংলাদেশ থেকে চিরতরে নিমূল হবে হুইট ব্লাস্ট রোগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের তত্বাবধানে মেহেরপুর সদর উপজেলার মদনাডাঙ্গা মাঠে চলছে ব্লাস্ট প্রতিরোধী গবেষণা কার্যক্রম। ম্যাক্সিকো থেকে সংগ্রহ করা ৪৮টি গমের জাত ও লাইন নিয়ে গবেষনা করছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের ১২ জনের একটি বিজ্ঞানী দল। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন ধরনের বালাই নাশক সংগ্রহ করে তা প্রয়োগ করা হচ্ছে গমের ক্ষেতে। গমের বীজ বপন থেকে শুরু করে সংগ্রহ করা পর্যন্ত চলবে পরীক্ষা নিরীক্ষা। এখান থেকেই বেরিয়ে আসবে ব্লাস্ট প্রতিরোধী গমের জাত। সরবরাহ করা হবে দেশের বিভিন্ন স্থানে এর ফলে গম চাষ করে আর ক্ষতির মুখে পড়বে না কৃষকরা। কয়েকজন কৃষক জানান, গত কয়েক বছর ধরে মেহেরপুরে ব্যাপক হারে গমে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে। যে জমিতে শুরু হয়েছে অল্প সময়ে জমির সব গম নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে গত দুই বছর ধরে কৃষকদের গম চাষ না করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছিল কৃষি বিভাগ। তারপরও নিষেধ অমান্য করে কৃষকরা গম চাষ করলেও শেষ দিকে এসে ব্লাস্ট আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে অনেক ক্ষেত। গবেষক হুমায়ন কবীর, পিএইচডি ফেলু, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয় ময়মনসিংহ জানান, ব্লাস্ট মেহেরপুরে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা কৃষক পর্যায়ে মাঠ বেছে নিয়ে দেশী ও বিদেশী উপকরন সংগ্রহ করে এখানে ব্লাস্ট প্রতিরোধে গমের গবেষনা চলছে। সফল হলে ব্লাস্ট রোগ নিয়ে আরো কোন চিন্তা থাকবে না। এ ব্যাপারে মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আখতারুজ্জামান জানান, মেহেরপুরে প্রথম ২০১৬ সালে গমে ব্লাস্ট রোগ সনাক্ত হয়। এবং তার পর থেকে ব্লাস্ট প্রতিরোধে কাজ শুরু করে কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এর সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশন। সর্বপরি ব্লাস্ট নির্মূলে সদর উপজেলার মদনাডাঙ্গা মাঠে এই প্রথম মাঠ পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা গমের উপর গবেষনা করছে । এখান থেকে ভালো ফল পেলে দেশ থেকে ব্লাস্ট রোগ নির্মূল করা সম্ভব হবে। এবং কৃষকরা ব্যাপক হারে গম চাষ করতে পারবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে গবেষণার সুফল পাওয়া যাবে এবং এখান থেকে ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে।

 

 

কাঁচা টমেটো পাকানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিকেল দিয়ে

দৌলতপুরে টমেটো চাষে সাফল্য পেয়েছেন চাষীরা

শরীফুল ইসলাম ॥ শীতকালীন সবজি টমেটো চাষে বেশ সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের চাষীরা। এটি অর্থকরী ফসল হিসেবেও গণ্য করা হয়। আর এ অঞ্চলের টমেটো স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বিঘা জমিতে সমপরিমানের চেয়ে বেশী অর্থ লাভ হচ্ছে বলে টমেটো চাষীরা জানিয়েছেন। চলতি শীত মৌসুমে দৌলতপুরে ১৩৬ হেক্টর জমিতে চমোটো চাষ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে বেশী। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় এবছর দৌলতপুরে টমেটোর ফলনও বিগত বছরের চেয়ে ভাল হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে টমেটো চাষে খরচ হয়েছে ১২হাজার টাকা আর তা বিক্রয় হয়েছে বা হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। যা উৎপাদন খরচের চেয়ে বেশী। বর্তমানে খুচরা বাজারে টমেটো প্রতি কেজি বিক্রয় হচ্ছে ২০টাকা করে। তবে হঠাৎ করে স্থানীয় বাজারে টমেটোর দাম পড়ে যাওয়ায় লাভের অংশে ভাটা পড়েছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন। উপজেলার সবজি চাষ খ্যাত আদাবাড়িয়া এলাকার রমজান আলী নামে এক টমেটো চাষী জানান, সে এবছর এক বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছে যার খরচ হয়েছে ১২হাজার টাকা। গতকাল পর্যন্ত সে ওই জমি থেকে ৩০ হাজার টাকার টমেটো বিক্রয় করেছে। অপরদিকে একই এলাকার একরামুল হক নামে অপর টমেটো চাষী অভিযোগ করেন, হঠাৎ করেই টমেটোর দাম কমে যাওয়ায় তার লাভের অংশ কমে যাচ্ছে। এদিকে বাজারের চাহিদা মিটাতে কাঁচা টমেটোতে বিষাক্ত কেমিকেল ¯েপ্র করে তা পাকিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। আর এমন অভিযোগে পুলিশ টমেটোর ক্ষেতে অভিযান চালিয়ে কেমিকেল মেশানো বস্তাভর্তি টমেটো আটকসহ কৃষকদের নজরদারিতে রেখেছে। তবে কেমিকেল মেশানো বস্তা ভর্তি টমেটো আটক করা হলেও স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে আটক হওয়া সেসব বস্তা ভর্তি টমেটো কৃষকদের কাছে ফেরত দিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও এলাকাবাসী জানিয়েছে। টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কৃষকদের প্রয়োজীয় প্রনোদনা ও পরামর্শ দেওয়ায় শীতকালীন সবজি টমেটো চাষ ভাল হয়েছে এবং কৃষকরা অর্থকরী শীতকালীন সবজি ফসল টমেটো চাষে লাভবান হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দৌলতপুর কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম কামরুজ্জামান। সরকারী প্রনোদনা বেশী দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পেলে এ অঞ্চলের কৃষকরা শীতকালীন সবজি টমেটো চাষে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে তামাক চাষ অধ্যুষিত  দৌলতপুরে তামাক চাষ হ্রাস পাবে। আর এমনটাই মনে করেন এ অঞ্চলের সচেতন মহল।

 

 

 

 

সরিষা ফুলের মধু যাচ্ছে বিদেশে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে মৌচাষ শুরু হলেও দেশব্যাপী মৌচাষের সম্প্রসারণ ঘটে ১৯৮০ সাল থেকে। বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বতর্মানে দেশে দেড় থেকে ২ হাজার দক্ষ অদক্ষ মৌচাষি এ পেশায় জড়িত রয়েছেন। সময়ের ব্যবধানে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে মৌচাষ। এক সময় বাংলাদেশে মধু বলতে সুন্দরবনের মধুকেই বোঝানো হতো। মৌয়ালদের সংগ্রহ করা ওই মধুর বিপণন দেশের গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কয়েক বছর ধরে বিশ্ববাজারে পা রেখেছে বাংলাদেশের মধু। আর তা করতে গিয়ে মধু বা মৌ-চাষকেও সুন্দরবনের সীমানা থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে যেতে হয়েছে জেলায় জেলায়। টাঙ্গাইলও এর ব্যতিক্রম নয়। টাঙ্গাইলের প্রায় সব জায়গায় এবার সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষা ক্ষেতের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে মৌ-বাক্স বসানো হয়েছে। এসব বাক্সে পালিত মৌমাছি সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে মৌ-বাক্সে জমা করছে। ওই মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। টাঙ্গাইল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরিষার আবাদের জেলা হিসেবে পরিচিত। মৌচাষে চাষিরা একদিকে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে দূর হচ্ছে বেকারত্ব। ইদানিং অনেক শিক্ষার্থীই লেখাপড়ার পাশাপাশি লাভবান হওয়ার জন্য মৌচাষ করছে। মৌচাষিদের এই মধু এখন দেশের বিভিন্ন স্থানসহ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে চাষিদের দাবি সরকারের সহযোগিতা পেলে তারা এ মধুচাষের পরিধি আরও বাড়িয়ে অধিক লাভবান হতে পারেন। সরিষা ফুলের মধু যেমন খাঁটি তেমনি সুস্বাদু। মধু উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক হওয়ায় বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি ও ক্রেতাদের কাছে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। সরেজমিনে টাঙ্গাইল শহর এবং ১২টি উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, সরিষা ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। আর মৌমাছিরা সরিষা থেকে মধু আহরণ করে বাক্সে জমা করছে। ওই বাক্স থেকে চাষিরা মধু সংগ্রহ করছেন। মৌ-বাক্সের চারদিকে মৌমাছি ভন্ ভন্- ভোঁ ভোঁ শব্দে ঘোরাঘুরি করছে। ওই স্থানে মৌমাছিদের মিলনমেলা তৈরি হয়েছে। টাঙ্গাইল পৌর এলাকার সন্তোষ ঘোষপাড়ার আমিনুর রহমান বিগত ১০ বছর ধরে মৌচাষ করেন। তিনি এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তিনি বলেন, এ বছর আমি সরিষা ক্ষেতে শতাধিক মৌ-বাক্স স্থাপন করেছি। এখন পর্যন্ত আমি (ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি ১ সপ্তাহ) প্রায় দেড় টন মধু সংগ্রহ করতে পেরেছি। সরিষা ক্ষেতে বছরে ৪ মাস মধু আহরণ করে থাকেন। অন্য ৬ মাস কৃত্তিম পদ্ধতিতে চিনি খাইয়ে মৌমাছিদের রাখা হয়। এবার তার প্রায় আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। তিনি আশা করছেন, তার প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন তাদের কাছ থেকে মধু কিনে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, সরিষা ক্ষেত থেকে মূলত ডিসেম্বর থেকে মধু আহরণের উপযুক্ত সময়। তখন জেলার বিভিন্ন স্থানে ভালো সরিষা ফুল ফোটে। আকার ভেদে একটি বাক্সে ২ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যায়। আর প্রতিটি বাক্সে খরচ হয় ২ থেকে ১২ হাজার টাকা। এ ছাড়া আমি লিচু থেকেও মধু সংগ্রহ করে থাকি। আমিনুর রহমান বলেন, তার সংসারের যাবতীয় খরচের ওপর নিভর্রশীল। সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে তাহলে আমরা মৌ-চাষের পরিধি আরও বাড়িয়ে বেশি লাভবান হতে পারব।
মৌচাষি ইয়াকুব আলী বলেন, আমাদের মৌমাছি কিনে আনতে হয়। আমি প্রথমে ৫টি মৌ-বাক্স নিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন আমার মৌ-বাক্স ৫০টিরও বেশি। এই কয়েক মাসের উপার্জন দিয়ে সারা বছর চলে যায়। মধু সংগ্রহে লাভবান হওয়ার কারণে অনেকেই এই পেশায় চলে আসছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলায় এ বছর সরিষার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৮ হাজার হেক্টর জমি। কিন্তু প্রায় ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এ বছর জেলায় ৭ হাজার ২০০টি মৌ-বাক্স বসানোর টার্গেট ছিল। কিন্তু সরিষা ক্ষেতের পাশে প্রায় ১০ হাজারের মতো বাক্স বসানো হয়েছে। যা টােেগর্টর চেয়ে বেশি। ডিসেম্বর পর্যন্ত মধু উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার কেজি। আধুনিক প্রযুক্তি তথা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মধু আহরণ করা হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ বছর জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সরিষা আবাদ এবং মৌ-বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে। সামনে আরও মধু উৎপাদন হবে। তিনি বলেন, বিস্তীর্ণ এলাকার সরিষা ক্ষেতে মৌ-বাক্স স্থাপন করেছে মৌচাষিরা। এতে একদিকে মৌচাষিরা কাঙ্খিত পরিমাণে মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষি জমিতে সরিষার ফলনও অন্য বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, মধু ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এখানকার মধু দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই দেশীয় এ খাঁটি মধু বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষ করলে সরিষার পরাগায়ণের ফলে শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ ফলন বৃদ্ধি পায়। কয়েক বছর আগেও সরিষাচাষিরা তাদের জমিতে মৌ-বাক্স স্থাপনে বাধা দিত। তাদের ধারণা ছিল মৌমাছির কারণে সরিষার ফলন কম হবে। তবে কৃষি কমর্কতার্রা বোঝাতে সক্ষম হন মৌচাষের কারণে সরিষার ফলন কম তো নয়ই বরং ফলন ভালো হয়। এরপর চাষিরা তাদের জমির পাশে মৌ-বাক্স স্থাপনে সহায়তা করে আসছেন। বতর্মানে দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ মধু আমদানি করতে হয়। কিন্তু মধু উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতের দক্ষতা বাড়ালে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে মধু রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রিজম বাংলাদেশের মৌ-চাষ প্রকল্পের সিনিয়র এক্সপার্ট মাতেজা ডামেস্টিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বতর্মানে মৌচাষির সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। সারা দেশে ৩ থেকে ৫ হাজার টন মধু উৎপাদন হয়ে থাকে। এর কিছু অংশ রপ্তানি হলেও অনেক চাষিই সঠিকভাবে মধু সংগ্রহ না করায় চাহিদা থাকলেও রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া ফসলে কীটনাশক ব্যবহার করায় মৌমাছির মধু উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
লেখক ঃ মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল।

মোলাসেস থেকে বায়োগ্যাস

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দিন যাচ্ছে আর জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল ৪১ লাখ ২৯ হাজার ২৬২ টন, আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৮ টনে। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে ব্যাপকভাবে মোটর যানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। বিআরটিএর তথ্য মতে, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৭৯২টি। যা ২০১৪ সালে ছিল ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৪টি। রাজধানী ঢাকা গত অক্টোবর মাসে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭৪টি, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। জ¦ালানি তেলের চাপ কমাতে সিএনজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসে বিকল্প হতে পারে বায়োগ্যাস বা বায়োফুয়েল। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। গত ২০১০ সালে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল চিনি কলগুলোতে উৎপাদিত চিটাগুড় থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদন করা হবে মোটরযান চালানোর জন্য। বছরে ৬০ লাখ টন বায়োফুয়েল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এই প্রকল্প বা উদ্যোগ থেমে যায়। ২০০৬ সালে চিনিশিল্প করপোরেশনের বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সঙ্গে যৌথ গবেষণা শুরু করেন। তারা চিটাগুড় থেকে মোটরগাড়ি চালানো যায় এমন পাওয়ার ইথানল উৎপাদনে সফল হন। পরে পেট্রোলের সঙ্গে শতকরা ১০ ভাগ পাওয়ার ইথানল মিশিয়ে গবেষণার সফলতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হন গষেকরা। এ সাফল্যের ভিত্তিতে চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা ২০০৭ সালে পাওয়ার ইথানল তৈরির জন্য দর্শনা চিনিকলে (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বে এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পাওয়ার ইথানলের সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে গাড়ি চালানো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি সবুজ শস্য ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ এই প্রথম কোনো উপজাত থেকে ইথানল তৈরি করছে বলে চিনি ও খাদ্য শিল্পসংস্থা সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ চিনিশিল্প করপোরেশনের মালিকানাধীন দর্শনা চিনিকলের (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) ডিস্টিলারিতে অ্যালকোহল তৈরির জন্য একটি প্ল্যান্ট বসানো হয়। দেশের চিনিকলগুলোতে প্রতি বছর চিনির উপজাত হিসেবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন চিটাগুড় পাওয়া যায়। এর বিশ্বের উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশের চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে চিনিকলগুলোতে চিনি ও গুড়ের পাশাপাশি জৈবজ্বালানি বা ইথানল উৎপাদনের কোনো বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দেশে যে হারে আখের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে, তাতে এ শিল্পকে ধরে রাখতে হলে চিনিকলে ইথানল তৈরি করাই সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কৃষক ও চিনিশিল্প বেঁচে থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে জৈব জ্বালানি হিসেবে মূলত ইথানল ব্যবহার করা হয়। আর আখের রস বা মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে প্রথমে ইথানল তৈরি করা হয়। এই ইথানল গ্যাসোলিন (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) এর সঙ্গে ২০-২৫ হারে মিশ্রিত করে অথবা পুরোটাই সরাসরি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে ইঞ্জিনের সামান্য কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। তারা বলেন, গ্যাসোলিনের (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে ইথানল ব্যবহার করলে ৯০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড (গ্রিন হাউস গ্যাস) নিঃসরণ কম হয়। এটি ব্যবহারে ইঞ্জিনের শব্দ কম হয় এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জন্যই, আধুনিক বিশ্বে ইথানলকে টেকসই জৈব জ্বালানির অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা বলেন, আখ উৎপাদনে শীর্ষ দেশ ব্রাজিল তার মোট উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ আখ জৈব জ্বালানি (ইথানল) উৎপাদনে ব্যবহার করে এবং প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে ২০-২৫ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত গ্যাসোলিন ব্যবহার করছে ব্রাজিলিয়ানরা। জ্বালানি নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ২০০৯ সালে জৈবজ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যে নীতিমালায় চলতি ২০১৭ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। চীনেও ২০২০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত গ্যাসোলিন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শুধু চীন ও ভারত নয় যেসব দেশে আখ উৎপাদিত হয় যেমন পাকিস্তান, তুরস্ক, মেক্সিকো, থাইল্যান্ডসহ প্রায় সব দেশই এ পথে হাঁটছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে এখন আখ উৎপাদন করে চাষির পাশাপাশি চিনিকলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশেরও বিরাট লোকসান হচ্ছে। তাই এদেশে আখ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ চাষি ও চিনিকলকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখে অন্যান্য দেশের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে জৈব জ্বালানি তৈরির বিকল্প নেই। কারণ এক টন আখ থেকে চিনি (রিকভারি ৭.৫০ শতাংশ হলে) পাওয়া যায় ৭৫ কেজি। যার বতর্মান বাজারমূল্য ৩০০০ টাকা। আর ওই আখ থেকে প্রায় ৮৫ লিটার জৈব জ্বালানি (ইথানল) পাওয়া যায়, যার বাজার মূল্য ৮৫০০ টাকা। তাই জৈব জ্বালানি উৎপাদন কৃষকের সমৃদ্ধি বাড়াবে। যেহেতু বায়োফুয়েল উৎপাদনের মূল উপাদান খাদ্যশস্য, তাই এর উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা খাদ্যমূল্যে স্বাভাবিকভাবেই খারাপ প্রভাব ফেলবে। খারাপ পরিণতির কথা জেনেও মার্কিন কংগ্রেস ২০০৫ সালে শুধু তাদের প্রয়োজনে বায়োফুয়েল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সাল নাগাদ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি লিটার বায়োফুয়েল উৎপাদন করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। বাংলাদেশে জৈব জ্বালানি এখন সময়ের দাবি। এমতাবস্থায় চিটাগুড় থেকে বায়োফুলে উৎপাদনের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

স্বাদ-গুণে অনন্য দেশীয় কুল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ স্বাদ ও পুষ্টিগুণের বিচারে কুল বাংলাদেশের একটি উৎকৃষ্ট ফল। কুল গাছ ছোট থেকে মাঝারি আকারের বৃক্ষ। উচ্চতা গড়ে ৫ থেকে ১৩ মিটার পর্যন্ত হয়। গাছ চির সবুজ, শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত, দ্বিজীবপত্রী ও গভীর মূলী বৃক্ষ। পাতা ছোট, গোলাকার থেকে ডিম্বাকার হয়। বর্ষার শেষে  সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গাছে ফুল আসে ও জাতভেদে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসে ফল পাকে। ফল পাকা ও টাটকা অবস্থায় খাওয়া হয় ও ফল হতে আচার, চাটনি এবং অন্যান্য মুখরোচক খাবার তৈরি করা যায়। কুলের জাত : আমাদের দেশে কুলের অসংখ্য জাত রয়েছে, এসব জাতের মধ্যে অনেক কুলকেই নির্দিষ্ট নামে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। স্বাদ ও গুণের ওপর ভিত্তি করে আমাদের দেশে উৎপাদিত কুলকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়, যথাÑ উত্তম, মধ্যম ও নিম্নজাতের। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গবেষণার মাধ্যমে কিছু কিছু নতুন জাতের কুল আবিষ্কার করেছেন, যেমন- বাউকুল-১, বাউকুল-২, বাউকুল-৩, আপেলকুল, বারিকুল-১, বারিকুল-২, বারিকুল-৩। এ ছাড়াও উন্নত জাতের মধ্যে কুমিল্লা কুল, সাতক্ষীরা কুল, রাজশাহী কুল, থাইকুল আমাদের দেশে চাষ হচ্ছে।

কুল উৎপাদন এলাকাসমূহ : বাংলাদেশের সব জেলাতে কম-বেশি কুল চাষ হয়। তবে রাজশাহী, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর জেলায় উৎকৃষ্ঠ জাতের কুলের আবাদ হয়ে থাকে। কুলের বংশ বিস্তার : দুইভাবে কুলের বংশ বিস্তার করা যায়। বীজ থেকে ও কলম চারা তৈরি করে। তবে কলম করে বংশ বিস্তারে বংশগত গুণাগুণ অক্ষুণœ থাকে। বীজ হতে চারা তৈরি করে তার ওপর “বার্ডিং” এর মাধ্যমে কলম চারা তৈরি করা যায়। বলয়, তালি অথবা টি-বার্ডিং ও ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে কলম চারা তৈরি করা যায়। বার্ডিং করার জন্য বীজ চারার বয়স ৯ মাস থেকে ২ বৎসর বা তার বেশিও হতে পারে। মার্চ মাস থেকে শুরু করে জুলাই-আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়ে বার্ডিং করা যায়, তবে এপ্রিল, মে ও জুন মাস উপযুক্ত সময়। এ ক্ষেত্রে ‘সায়ন’ সংগ্রহের জন্য নিবাির্চত জাত এবং স্টক উভয়েরই পুরনো শাখা-প্রশাখা মার্চ-এপ্রিল মাসে ছাঁটাই করে দিতে হবে। অতঃপর নতুন শাখা বার্ডিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হবে।

কুল উৎপাদনের মাটি : কুল গাছ যে কোনো ধরনের মাটিতে জন্মে এবং লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতা উভয়েই সহ্য করতে পারে। তবে ভারী ও সামান্য ক্ষারযুক্ত বেলে দো-আঁশ মাটি উত্তম।

কুল চাষে মাটি ও জমি তৈরি ঃ বাগান আকারে চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি ভালো। তা ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশে, পতিত জমি, পুকুর পাড় ও অনুর্বর ধরনের মাটিতেও কুল চাষ করা যায়। বর্গাকার রোপণ প্রণালীতে ৬  থেকে ৭ মিটার দূরে দূরে সব দিক ১ মিটার আকার গর্ত খনন করতে হবে। জাত ও স্থানভেদে দূরত্ব কম বেশি হতে পারে। চারা রোপণের কমপক্ষে ১৫  থেকে ২০ দিন পূর্বে গর্ত তৈরি ও গর্তে প্রয়োজনীয় সার মাটির সঙ্গে মিশ্রিত করে গর্ত ভরাট করে রাখতে হবে ও গর্তের ঠিক মাঝখানে চারা রোপণ করতে হবে। প্রতিটি গর্তের মাটির সঙ্গে পচা গোবর ২০ থেকে ২৫ কেজি, টিএসপি- ২৫০ গ্রাম, এমওপি- ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম, ইউরিয়া-২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম মিশিয়ে দিতে হবে। তবে মাটির উবর্রতায় সারের মাত্রা কম বেশি হতে পারে।

কুল চারা রোপণের সময় : জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস কুল চারা রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

কুলের অন্যান্য পরিচর্যা : চারা রোপণের পর সেচের ব্যবস্থা থাকতে হবে। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। উপরি সার প্রয়োগ করতে হবে। রোগ ও পোকার আক্রমণ দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতি বছর ফল সংগ্রহের পর পুরাতন ও রোগাক্রান্ত শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে দিতে হবে। তা ছাড়া ফল সংগ্রহের পর শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে দিলে নতুন উৎপাদিত শাখা-প্রশাখায় কাঙ্খিত ও মানসম্মত ফলন পাওয়া যাবে। সর্বোপরি চারা রোপণ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে নিয়ম মাফিক সব পরিচর্যা গ্রহণ করলে কুল চাষে ভালো লাভবান হওয়া যাবে।

লেখক ঃ মোহাম্মদ নূর আলম গন্ধী

বাড়ির ছাদে ফুল বাগান

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আজকাল অনেকেই বাড়ির ছাদে বিভিন্ন ধরনের ফুল বাগান করে থাকেন। ফুল শুধুমাত্র তার রূপ দিয়ে মুগ্ধ করে না, সেই সঙ্গে আমাদের দেয় অনাবিল মানসিক প্রশান্তি। ফুল ভালোবাসে না এমন মানুষ হয়তো পাওয়া যাবে না  কোথাও। যাদের মনের কোণে সুপ্ত বাসনা আছে নিজে ফুলের বাগান করার, তারা আজই বাসার ছাদেই তৈরি করে নিতে পারেন নিজের ছৈাট্ট এক টুকরো বাগান। নিজের অবসর সময়টুকু আনন্দেই কাটিয়ে দিতে পারবেন আপনার নিজের বাগানে।

ছাদে ফুলের বাগান করতে হলে দরকার হয় বিশেষ পরিচযার্র। ঠিকমতো ফুল গাছের যতœ নিলে আপনার ছোট্ট বাগানটিও ভরে উঠবে নানা ফুলের সমারোহে। তাই আমাদের জানতে হবে ছাদে ফুলের বাগান করার পদ্ধতি, রীতিনীতি এবং আগে ও পরের যতেœর বিষয়গুলো। ফুলগাছগুলো রাখার জন্য একটি রৌদ্র উজ্জ্বল জায়গা নিবার্চন করতে হবে। সেটা ছাদ কিংবা আপনার প্রিয় ব্যালকনিও হতে পারে। একটু  খেয়াল রাখতে হবে সেটা যেন অতিরিক্ত রোদের স্থান না হয় এবং সকাল বেলার  রোদটা যেন থাকে, কারণ সেটা ফুলগাছের জন্য খুব জরুরি। ফুলগাছের জন্য বেশি বড় টবের প্রয়োজন হয় না। ফুলগাছের জন্য ৮-১৬ ইঞ্চি বা মাঝারি আকারের টব নিলেই চলবে। ছোট না বড় টব তা নির্ভর করবে ফুলগাছের আকার আকৃতির ওপর। সাধারণত মৌসুমি ফুলগাছের জন্য ১০-১২ ইঞ্চি টবই যথেষ্ট। কিন্তু যত বড় জায়গা হবে ততই গাছ প্রসারিত হতে পারবে এবং টবে অব্যশই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সবচেয়ে উত্তম মাটি হলো দোআঁশ মাটি। দোআঁশ মাটিতেই ফুল বা ফলের গাছ সব চেয়ে ভালো হয়। গাছ লাগানোর আগে মাটিতে কম্পোস্ট সার বা পচা গোবর সার দিতে হবে। বিশেষ করে টবের ২-৩ সে. মি. উপরের দিকে। মাটি অবশ্যই ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি নার্সারি থেকে মাটি কেনা যায়। গাছ লাগানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চারাগাছ বাছাই করা। আপনি নার্সারি কিংবা ফুলগাছ বিক্রেতার কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। আপনি যার কাছ  থেকেই গাছ সংগ্রহ করুন না কেন অবশ্যই খেয়াল করুন চারা গাছটি সুস্থ সবল কিনা। আর যদি আপনার কাছে গত বছরের বীজ থাকে তাহলে বীজ বুনেও চারা সংগ্রহ করতে পারেন। তাহলে অবশ্যই মৌসুম শুরু হওয়ার ২ মাস আগে তা বুনতে হবে। তবে কিছু কিছু গাছের বীজ না বুনলেও চলে। যেমন চন্দ্রমল্লিকা গাছের শিকড়  থেকে কান্ড বের হয়ে চারা তৈরি হয়। আবার বৃষ্টির সময় গাঁদা ফুলের ডাল  কেটে মাটিতে পুঁতলেও চারা তৈরি হয়। গাছে নিয়মিত প্রতিদিন পানি দিতে হবে। যারা দুবেলা পানি দিতে চান, খেয়াল রাখবেন গাছের গোড়ায় যেন পানি না জমে যায়। আর সপ্তাহে একদিন গাছের পাতায় পানি ¯েপ্র করতে হবে। গাছের গোড়ায় এমনভাবে পানি দিতে হবে যেন গোড়ার মাটি না ধুয়ে যায়। তাই সম্ভব হলে ঝাঝরির মাধ্যমে পানি দিন। মাটি যেন সব সময় ভেজা থাকে। যদি গাছ হেলে পড়ে তাহলে অবশ্যই গাছের সঙ্গে শক্ত কোনো ডাল বা কাঠি বেঁধে দেবেন। গাছে সার দিতে হবে খুব সাবধানেÑ কারণ একটু এদিক ওদিক হলেই গাছ মারা যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে আমরা সার দিচ্ছি একটি টবের ভেতর আর জায়গাটা খুব ছোট। তাই একটি টবের জন্য এক মুঠো সার যথেষ্ট। গাছের গোড়ায় কখনো সার দেয়া যাবে না; সার দিতে হবে গাছের গোড়া থেকে ৪-৫ সে. মি. দূরে। আর সার হতে হবে মিশ্র সার বা তার চেয়ে ভালো হয় যদি গোবর সার দেয়া যায়। কিন্তু গোবর সার শুকিয়ে গুঁড়ো করে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে। কেউ যদি চান তাহলে সবজির ছোলা পচিয়ে জৈব সার তৈরি করে নিতে পারেন সেটাও গাছের জন্য খুব ভালো। গাছ পরিপক্ক হলে বা ফুল আসার ২-৩ সপ্তাহ আগে সার দিতে হবে। আপনাকে আগে ঠিক করতে হবে যে, আপনি ফুল বড় চান নাকি অনেক ফুল চান। যদি আপনি বেশি ফুল চান তাহলে গাছ যখন ২০-২৫ সে. মি. হবে তখন থেকে গাছের আগা অল্প অল্প করে ছাঁটা দেয়া শুরু করতে হবে। আর যদি বড় ফুল চান তাহলে গাছে কুঁড়ি আসার পর কিছু কুঁড়ি কেটে ফেলতে হবে। গাছে যদি কোনো  পোকা মাকড়ের উপদ্রব হয় তাহলে আক্রান্ত পাতা, ফুল বা ডাল কেটে ফেলতে হবে। আর সম্পূণর্ গাছে সাবান পানি ¯েপ্র করতে হবে। তাহলে অনেকটা পোকা মাকড় থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। তো আজ থেকেই শুরু করে ফেলুন আপনার বাড়ি ছাদে ছোট্ট একটি ফুল বাগান। লেখক ঃ ইমরান হোসাইন

ফলের চারাকলম লাগানোর নিয়ম

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এখন ফলগাছ লাগানোর সময়। ভালো ও বেশি ফল পেতে হলে প্রথমেই দরকার স্বাস্থ্যবান ভালো জাতের চারা। তারপর চাই সেগুলো সঠিকভাবে লাগানো। যেনতেনভাবে ফলের চারা-কলম লাগালে সেসব গাছ থেকে কখনো খুব ভালো ফল আশা করা যায় না। মানসম্পন্ন ফল পেতে হলে প্রথমেই কাংক্ষিত জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করতে হবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সিডরের আঘাতে অনেক ফলের গাছ সহজে উপড়ে গেছে। এ সবই অনভিজ্ঞতার ফল। শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় বেশির ভাগ নার্সারিতেই এখন মানসম্পন্ন চারাকলম তৈরি হচ্ছে না,  তৈরি হলেও সেসব কলমের খাসি করা ঠিকভাবে হচ্ছে না। ফলে অল্প শিকড় নিয়ে গাছ বড় হওয়ায় সহজে ঝড়-বাতাসে গাছ পড়ে যাচ্ছে। ফলগাছ রোপণের সময়  যেসব কাজ করা হয় তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ গাছের বৃদ্ধি। গর্ত খনন থেকে শুরু করে চারাকলম রোপণ পর্যন্ত সকল কাজের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। এসব নিয়ম ঠিকমতো মানা না হলে গাছের বৃদ্ধিই শুধু নয়, ফলনের ওপরও প্রভাব পড়ে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেয়ার দরকার আছে।

গর্ত তৈরি ঃ

আমগাছের কলম লাগানোর জন্য যত বড় গর্ত করতে হবে পেয়ারার জন্য তা নয়, কাগজী লেবুর জন্য গর্ত হবে তার চেয়েও ছোট। বড় গাছ যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, ডেওয়া ইত্যাদির জন্যও গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৯০ সেন্টিমিটার। মাঝারি গাছ যেমন- পেয়ারা, বাতাবিলেবু, কমলা, তৈকর, জামরুল ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৭৫ সেন্টিমিটার। ছোট গাছ যেমন- কাগজী লেবু, করমচা, লুকলুকি, কলা, পেঁপে ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৪৫  সেন্টিমিটার। ওপরের মাপে গর্ত খননের সময় ওপরের মাটি গর্তের এক পাশে এবং নিচের মাটি গর্তের আরেক পাশে রেখে প্রথমে জৈব সার মেশাতে হবে। এভাবে  রেখে দেয়ার ৪ থেকে ৫ দিন পর গাছ রোপণের ৩ থেকে ৪ দিন আগে রাসায়নিক সার মেশাতে হবে। এ সময়ে মাঝে মাঝে এই সার মিশ্রিত মাটি ওলট-পালট করে দিতে হবে।

রোপণের সময় ঃ বর্ষার আগে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) বা বর্ষার শুরুতে (আষাঢ়) এবং বর্ষার  শেষে (ভাদ্র-আশ্বিন) ফলগাছের চারাকলম রোপণ করা যেতে পারে। তবে জমি সুনিষ্কাশিত ও বেলে দো-আঁশ প্রকৃতির হলে বর্ষায় ও (আষাঢ়-শ্রাবণ) বৃষ্টির দিন ছাড়া রোপণ করা যায়। শীতকালে চারাকলমের নতুন শিকড় গজায় না বা শিকড়ের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না বলে শীতের সময় রোপণ না করা ভালো। বিকেলবেলা চারা বা কলম রোপণের উপযুক্ত সময়।

রোপণ পদ্ধতি ঃ চারাকলম লাগানোরও বেশ কিছু নিয়ম আছে যেমন- মাটির মধ্যে কতটুকু পুঁতবেন, লাগানোর সময় কোনো ডাল-পাতা ছেঁটে দেবেন কি না অথবা নার্সারি থেকে কিনে এনেই চারাটি লাগাবেন কি না ইত্যাদি। কিছু সাধারণ নিয়ম  মেনে চারাকলম লাগালে ওগুলো ভালো থাকে। যেমন-কলম করে সাথে সাথেই বাগানে রোপণ করা চলবে না। তা করলে গাছ রোপণজনিত আঘাতে মরে যেতে পারে এবং কলমের জোড়া খুলে যেতে পারে। সে জন্য কলম করার অন্তত কয়েক মাস পরে তা রোপণ করা ভালো।

রোপণ করার আগে চাষ ও মই দিয়ে বাগানের মাটি সমতল করে নেয়া উচিত।  রোপণের আগে অবশ্যই দূরত্ব ঠিক করে নকশা করে নেয়া উচিত। গ্রীষ্মেই এ কাজ করে ফেলতে হবে। রোপণের অন্তত ১৫ দিন আগে গর্ত  তৈরি করে সার মাটি ভরে রাখতে হবে। গর্ত প্রতি ৫-১০ কেজি গোবর সার, ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০-২৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫-১৫০ গ্রাম এমওপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

রোপণের কয়েক দিন আগে চারা বা কলম সংগ্রহ করে হার্ডেনিং করতে হবে। এ জন্য ছায়াযুক্ত জায়গায় কয়েক দিন চারাকলম শুইয়ে রেখে পাতা ঝরাতে হবে। মাঝে মাঝে গোড়ার মাটির বলে ও গাছে হালকা পানির ছিটা দিতে হবে। এতে গাছের  রোপণোত্তর মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। লাগানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন চারাকলমের গোড়ার মাটির বলটি ভেঙে না যায়।

মাটির টবে বা পলিব্যাগে চারাকলম থাকলে কিছুটা পানি দিয়ে মাটি সামান্য নরম করে নিতে হবে। এরপর টব মাটিতে কাত করে গড়িয়ে এবং পলিব্যাগ গড়িয়ে বা দুই হাতের তালু দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেপে নরম করে নিতে হয়। টব বা পলিব্যাগের চারাকলমের গোড়ায় হাত দিয়ে চেপে ধরে সম্পূর্ণ চারা বা কলমটি উল্টো করে ধরে টব বা পলিব্যাগ ওপরের দিকে টান দিলে বা টবটির কিনারা শক্ত কোনো জায়গায় ধীরে ধীরে টোকা দিলে মাটির বলটি বেরিয়ে আসে এবং সেটি গর্তে স্থাপন করতে হয়। অবশ্য পলিব্যাগের চারাকলমের ক্ষেত্রে চাকু বা ব্লেড দিয়ে পলিব্যাগের এক দিক কেটে অথবা মাটির টবটির চার দিক আস্তে আস্তে ভেঙে দিয়ে মাটির সম্পূর্ণ বলটি বের করে এনেও গর্তে বসানো যায়। গর্তে বসানোর সময় চারাকলমের গোড়া টবে বা পলিব্যাগে যে পর্যন্ত গোড়ায় মাটি ছিল বা বাইরে ছিল সে পর্যন্তই বাইরে রাখতে হয়। এর বেশি পুঁতে দেয়া বা ওপরে রাখা কোনোটাই ঠিক নয়।

রোপণের সময় অতিরিক্ত পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। তবে এটি সতর্কতার সাথে করতে হয়, যেন চারাকলমের গাছটি আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। চারা কলম রোপণের পর  গোড়ার মাটি কিছুটা চেপে দিয়ে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়।

চারাকলম যদি বড় হয় তবে এটিকে সোজা ও শক্ত রাখার জন্য গাছ থেকে ১০-১৫  সেন্টিমিটার দূরে একটি খুঁটি পুঁতে একটু কাত করে সুতলী দিয়ে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হয়। শক্ত করে বাঁধলে অনেক সময় চারাকলমের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ঝড়ো বাতাসে উপড়ে যাওয়া থেকে চারাকলমকে এই খুঁটি রক্ষা করে।  চারাকলমের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে বেড়া বা খাঁচার ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন কুড়ি বা পাতা না আসা পর্যন্ত গাছে উপরি সার দেয়ার প্রয়োজন নেই।  তবে এই সময়ে গাছের গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়।