সয়াবিন চাষে বাড়ে জমির উর্বরতা, কমে সারের ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশে উৎপাদিত প্রায় ৮০ শতাংশ সয়াবিন উৎপাদন হয় লক্ষ্মীপুরে। ১০ বছরের মাথায় সয়াবিন চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সয়াবিনের বাম্পার ফলন এবং কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন কৃষকরা। সয়াবিন চাষে কেবল কৃষকেরই ভাগ্য বদল নয়, জমিরও শক্তি বাড়ায়, হয়ে উঠে আরো বেশি উর্বর। যে কারণে পরবর্তী যেকোনো ফসল উৎপাদনে অর্ধেকে  নেমে আসে সারের ব্যবহার। এতে কৃষক লাভবান হন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট নোয়াখালী অঞ্চলের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, সয়াবিনের পাতাসহ অন্যান্য অংশ এবং শেকড় অল্প সময়ের মধ্যে পচে-গলে মাটিতে জৈব সার তৈরি করে। এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ অনেক উন্নত হয়। মাটি হয় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। সয়াবিন চাষের ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরবর্তী ফসলে সারের ব্যবহার অর্ধেক নেমে আসে। উৎপাদন খরচ কমে যায়। ফলনওভালো হয়। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যিকভাবে সয়াবিন চাষে আমদানি নির্ভরতা কমানো, জমির উর্বরতা বৃদ্ধি, দারিদ্র দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মহিউদ্দিন চৌধুরী বিগত কয়েক বছরের তথ্য উপাত্ত গবেষণা ও বিশ্লেষণে জেনেছেন, বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে শস্য পরিক্রমায় রবি ফসল হিসাবে সয়াবিন একক ও অনন্য সাধারণ ফসল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। সয়াবিন চাষে ঝুঁকি ও খরচ বাদামের তুলনায় অনেক কম, লাভও বেশি। সয়াবিন কাটার পর ওই জমিতে আউশ ধানের ফলন খুব ভালো হয়। সয়াবিন বহুমুখী মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। সয়াবিন মাটিতে নাইট্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। প্রতি আবাদ  মৌসুমে হেক্টর প্রতি ২৫০ থেকে ২৭৭ কেজি নাইট্রোজেন সংযোজন করতে পারে। যা ফসলের প্রয়োজনীয় নাইট্রোজেনের শতকরা প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। সয়াবিন গাছের শেকড়ে ফুলন্ত অবস্থায় ১২-৪৩টি ধূসর বর্ণের গুটি থাকে। এ গুটিগুলোতে বায়োক্যামিকেল প্রক্রিয়ায় বায়ুমন্ডলীয় নাইট্রোজেন অবমুক্ত করার পর আপনা আপনি শুষ্ক হয়ে শেকড়সহ জৈব পদার্থ হিসেবে মাটিতে মিশে গিয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। সয়াবিনের ক্ষেতকৃষি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে,  যেকোনো ঋতুতেই সয়াবিন চাষ করা যায়। তবে রবি মৌসুমে সয়াবিনের ব্যাপক আবাদ হয়। এর শেকড়গুচ্ছ মাটির এক মিটার নিচে পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারে। গাছের কান্ডে ফুল হয়। ফুল সচরাচর সাদা, গোলাপি ও বেগুনি রঙের হয়ে থাকে। একটি খোসায় বীজ জন্মে। আর এই বীজগুলোকেই সয়াবিন বলা হয়। বীজ  রোপণের ৯৫ থেকে ১১৫ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা যায়। হেক্টর প্রতি ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ টন উৎপাদন হয়ে থাকে। সয়াবিন গাছ ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়। এর বীজ অত্যন্ত পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। এটি ভোজ্য তেলের প্রধান উৎস। পরিণত বীজ থেকে শিশুখাদ্য, সয়া-দুধ, দই ও পনির, সয়া-স্যস তৈরি হয়। শুষ্ক বীজে আছে  চর্বি, শর্করা ও  প্রোটিন। গ্লিসারিন, রং, সাবান, প্লাস্টিক, মুদ্রণের কালি ইত্যাদি দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সয়াবিন একটি অপরিহার্য উপাদান। কাঁচা সয়াবিন গাছ গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার্য। সয়াবিনের উচ্চ পুষ্টিগুণসহ নানান ব্যবহারে সয়াবিনের আবাদ দিন দিন বেড়েই চলছে। লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খামারবাড়ি লক্ষ্মীপুর অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৫ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি বিভাগ।  এর মধ্যে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় ৬ হাজর ৫৬০ হেক্টর, রায়পুরে ৬ হাজার ১৫০  হেক্টর, রামগঞ্জে ৮৫ হেক্টর, রামগতি  ১৮ হাজার ১৯০ হেক্টর ও কমলনগর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে ১৪ হাজার ৫৫০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে সয়াবিনের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানাচ্ছে কৃষি বিভাগ।

 

 

পোল্ট্রি খাতকে আগামী বাজেটে করমুক্ত ঘোষণার দাবি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা নিশ্চিত করতে পোল্ট্রি শিল্পখাতকে আগামী বাজেটে করমুক্ত ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে লোকসানের মুখে প্রতিনিয়ত মুরগির খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে পোল্ট্রি শিল্পখাত। অথচ টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবান মেধাবী জাতি প্রয়োজন। পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে রূপকল্প-২১ সালের মধ্যে প্রতিদিন ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু পোল্ট্রি ফিডসহ কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত করারোপের কারণে পুঁজি হারিয়ে উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘পোল্ট্রি শিল্পের সহযোগিতায় গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উদ্যোক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল বিপিআইসিসি ও বিশ্ব পোল্ট্রি সাইন্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ব্র্যাঞ্চ যৌথভাবে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ব পোল্ট্রি সাইন্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ব্র্যাঞ্চের সভাপতি শামসুল আরেফীন খালেদ, বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান। এছাড়া বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সিনিয়র সাংবাদিকরা আলোচনায় নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। মসিউর রহমান বলেন পোল্ট্রি শিল্পখাতের ৭০-৯০ হাজার বাণিজ্যিক খামারে বর্তমান ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। জিডিপিতে প্রাণীসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, এর মধ্যে ১ দশমিক ৬ শতাংশ অবদান পোল্ট্রি শিল্পের। অথচ পোল্ট্রি সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্কারোপ করা হয়েছে। আগামী বাজেটে এ খাতে সম্পূর্ণরুপে করমুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, দেশে মৎস্য সম্পদের জন্য আলাদা দফতর থাকলেও পোল্ট্রি শিল্পের জন্য এ রকম কোন অধিদফতর নেই। এত বড় শিল্পখাতের জন্য এখন পৃথক মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদফতর করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে পোল্ট্রি ফিডের কাঁচামালের ঘাটতি রয়েছে। দেশে এত ভুট্টা উৎপাদন হয়, অথচ বছরে পোল্ট্রিফিড তৈরির জন্য ৬০ হাজার মেট্রিক টন ভুট্টা আনা হয় ব্রাজিল থেকে। ভুট্টার পাশাপাশি সয়াবিন, ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য সব জিনিস আমদানি করা হচ্ছে। এসব জিনিস আমদানি করা হচ্ছে কিন্তু বন্দর ব্যবস্থাপনা কি, সেটাও একটি বড় প্রশ্ন। বন্দরে সেবা পাওয়া যায় না। আর এ রকম হচ্ছে এ খাতের কোন অভিভাবক নেই বলে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্পখাতে বর্তমান সাতটি এ্যাসোসিয়েশন রয়েছে। সাতটি প্রতিষ্ঠান সাত ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু সবার লক্ষ্য পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ। নিজেদের মতো দূরত্ব ঘুচিয়ে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা এখন মিলেমিশে কাজ করছেন। মসিউর রহমান আরও বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ এ খাতে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে দেশে বার্ষিক ডিম উৎপাদন ছিল ৬৩৯ কোটি, ২০১৫ সালে ৭১২ কোটি এবং ২০১৬ সালে ডিম উৎপাদন ছিল ৮২১ কোটি। ২০২১ সাল নাগাদ বার্ষিক ডিমের চাহিদা দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি। তিনি বলেন, আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে দেশের পোল্ট্রি শিল্প। এই খাতে নীরব বিপ্লব হয়েছে। আশির দশকে এই খাতে বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১৫শ’ কোটি টাকা। বর্তমানে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। শামসুল আরেফীন বলেন, এ খাতের উন্নয়নে মিডিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মিডিয়ার কারণে দেশের পোল্ট্রি শিল্পখাত বিষয়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি বহির্বিশ্বের লোকজন জানতে পারছেন। কিন্তু এ খাতের আগামীর ভিশন জাতির সামনে তুলে ধরতে আরও ব্যাপক প্রচারণা ও জনসচেতনতার প্রয়োজন। এই কাজগুলো ভালমতো করতে হলে এ খাতের সঙ্গে মিডিয়ারও সম্পৃক্ত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, সবাই ভাল খাবার চায়। খাবার সবার প্রয়োজন। সেখানে কিভাবে ভাল ও জীবানুমুক্ত ডিম ও পোল্ট্রি মাংস নিশ্চিত করা যায় সেটা আগে করতে হবে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্পখাত উন্নয়নে ২০২১, ২০২৪ এবং ২০৩০ সাল সামনে রেখে একটি রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। গোলাম রহমান বলেন, পোল্ট্রি শিল্পখাতের আজকের এ অবস্থানে আসার পেছনে বেসরকারীখাতের অবদানই সবচেয়ে বেশি। তাদের এই প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করতে মিডিয়ার সঙ্গে একটি সমন্বয় থাকা উচিত। আশা করছি, এ খাতের উদ্যোক্তারা এ বিষয়টির দিকে লক্ষ্য রাখবেন। এদিকে, সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে-বর্তমানে এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পোল্ট্রি উদ্যোক্তা ও খামারিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ এবং সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার কারণেই এ অসাধ্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। মাত্র তিন যুগের ব্যবধানে সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভর খাতটি এখন অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল। বর্তমানে পোল্ট্রি মাংস, ডিম, একদিন বয়সী বাচ্চা এবং ফিডের শতভাগ চাহিদা মেটাচ্ছে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প। সাধারণ গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জন্য কম দামে প্রাণিজ আমিষের যোগান দিচ্ছে এ শিল্প। শিশুর পেশীগঠন ও মেধার বিকাশ, শ্রমজীবী মানুষের শক্তির যোগান দেয়া, সর্বোপরি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চিকেন নাগেট, সসেজ, ড্রামস্টিক, বার্গার, সামোসা, মিটবলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার প্যাকেটজাত খাবার-যা কিছুকাল আগেও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হত। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) এর মতে-২০২১ সালের চাহিদা মেটাতে হলে বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি ডিম (প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি ১১ লাখ ডিম), ২০ লাখ মেট্রিক টন (দিনে ৫.৫ হাজার মেট্রিক টন) মুরগির মাংস, ৮৫ কোটি ৮০ লাখ (সপ্তাহে ১ কোটি ৬৫ লাখ) একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা এবং বছরে ৬৫-৭০ লাখ মেট্রিক টন ফিড (মাসে ৫ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ফিড) উৎপাদন করতে হবে। সার্বিক বিচারে পোল্ট্রি শিল্পে মোট বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে প্রায় হবে ৫৫-৬০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বর্তমান বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হবে আরও প্রায় ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা। কারণ এ ডিম ও মাংস ইন্ডাস্ট্রি ছাড়াও, ব্রিডিং ও হ্যাচারি ইন্ডাস্ট্রি, ফিড ইন্ডাস্ট্রি, লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি, ওষুধ, কাঁচামাল এবং সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি জড়িত। কাজেই এ শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ ঘটতে থাকবে।

কৃষি এখন অভিজাত পেশা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ঘোষণা মোতাবেক, ২০৩০ সালের মধ্যেই সরকার এসডিজি অর্জন করতে চায়। সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বাড়াতে হবে খাদ্য উৎপাদন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে বিশ্ববাসীর নজর  কেড়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে সরকার রেকর্ড পরিমাণে বোরো ধানের উৎপাদন করতে চায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির সরাসরি অবদান এখনো ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে কর্মসংস্থানের দিক থেকে কৃষি খাত এখনো প্রথম। প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কর্মসংস্থান এসেছে কৃষি খাত থেকে। ২  কোটি ৪৭ লাখ লোক সরাসরি কৃষিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ভর্তুকি ও প্রযুক্তি সহায়তা, কৃষি সম্প্রসারণের আওতায় সনাতন কৃষি এখন বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষি ধীরে ধীরে একটি লাভজনক ও অভিজাত  পেশা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে কৃষিতে গ্রামীণ শিক্ষিত যুবক-যুবতী ও নারী উদ্যোক্তারা আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে ফসলের ন্যায্য দাম নিয়ে কৃষকের অসন্তুষ্টি রয়েছে। সূত্র বলছে, উৎপাদনে রেকর্ড করতে চলতি সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। চলতি সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ হিসাব করেছে, এবারের  মৌসুমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলোর জন্য গড়ে চাহিদা আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আর এজন্য অতিরিক্ত গ্যাসের চাহিদা তৈরি হয়েছে এক হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি। সারা দেশে বর্তমানে ৪ লাখ ১৬ হাজার ২৩১টি সেচ চালিত বিদ্যুৎ পাম্প রয়েছে। তবে এর বাইরে সারা দেশে বেশ কিছু অবৈধ সেচ পাম্প রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় লোডের পরিমাণ ২ হাজার ৪০৬ মেগাওয়াট। এই চাহিদা ধরে  সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের মোট চাহিদা দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। গত সেচ  মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট। এবার চাহিদা বেড়েছে ২ হাজার ৫৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ৪৬৪ কিলোওয়াট। ২০০৮ সালে ছিল ২২৮ কিলোওয়াট। অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম। এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতাভুক্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ, যা ২০০৮ সালে ছিল ৪৭ শতাংশ। বর্তমানে সরকারের বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতা ২০ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। যার মধ্যে নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা ১৯ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট এবং ভারত থেকে আমাদের চেয়ে কম মূল্যে আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ১ হাজার ১৬০  মেগাওয়াট। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ৩ হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। বর্তমানে ১৩ হাজার ৬৫৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৫৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রায় ২৩ হাজার সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে সবার জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। প্রতিবছরের ফেব্র“য়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সেচ মৌসুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়ে থাকে। সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বৈঠক করেছে। সেখানে কোনোভাবেই যাতে বোরো মৌসুমে কৃষকরা সেচের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পান সেটি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। আর বিদ্যুতের পর্যাপ্ত উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলাকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, গত অর্থবছরে সারা  দেশে বোরো ধানের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৯ মেট্রিক টন। তার আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৩ হাজার ৭৪৯ মেট্রিক টন। এবার সেটি দুই কোটি মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যাবে বলে সরকার আশা করছে সরকার। একক ফসল হিসেবে বোরো ধান সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়  দেশে। বর্তমানে প্রায় ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৬৭ হেক্টর জমিতে এই ধানের চাষ হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বোরো ধানের উৎপাদন জমি দেশে বাড়ছে। গত কয়েক বছর ধরে বোরোর ওপর নির্ভর করে ধান উৎপাদনে রেকর্ড করছে দেশ। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ স্থানে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, মাছ চাষে তৃতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম এবং আলু উৎপাদনে অষ্টম স্থানে রয়েছে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখন অন্য দেশেও চাল রফতানি হয়েছে। জানতে চাইলে  পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমিন বলেন, ধান উৎপাদনকে বিবেচনায় নিয়ে আমরা এরই মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে সব প্রতিষ্ঠানকে দিকনির্দেশনা দিয়েছি, যাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনোভাবে ব্যাহত না হয়। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের কৃষক মনসুর আলী বলেন, এবার বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো। সেচ প্রকল্পে আপাতত কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের এ ব্যাপারে আগে থেকে দিকনির্দেশনা  দেওয়া হয়েছে। সেচ পাম্পগুলো রাত ১১টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাচ্ছে। তা ছাড় দিনের বেলাও বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত লোড পাওয়া যায়। ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কৃষক ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড টাঙ্গাইল জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বলেন, এ জেলায় সব মিলিয়ে ২১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগছে এই মৌসুমে। কিন্তু কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকের বিদ্যুৎ জোগান দেওয়া হচ্ছে পর্যাপ্ত। কৃষি খাতকে উৎসাহিত করতে চলতি অর্থবছরে ২১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা কৃষিঋণের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে, যা আগের অর্থবছরের থেকে বেশি। এই বড় লক্ষ্য অর্জনে এরই মধ্যে বৈঠক করে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

বোরো ধানের জরুরি পরিচর্যা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ভালো ফলনের জন্য সুষম সারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সার প্রয়োগ করতে দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর রাখা দরকার। প্রথমত, ধানের জাত, জীবনকাল ও ফলন মাত্রার ওপর ভিত্তি করে সারের মাত্রা ঠিক করা। দ্বিতীয়ত, সারের কাযর্কারিতা বৃদ্ধির জন্য কোন সার কখন ও কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে তা নিধার্রণ করা। সার ব্যবহার করে অধিক উৎপাদন ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়াই সবার কাম্য। মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে সারের মাত্রা নির্ণয় করা সর্বোত্তম। এ ছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় সার সুপারিশ গাইড অনুযায়ী কিংবা অনলাইনে সার সুপারিশ নিদের্শিকা সফটওয়্যার ব্যবহার করেও সারের মাত্রা জানা যায়।

এ জন্য সরকারি কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে বা কৃষক বন্ধু সেবার ৩৩৩১ নম্বরে কল করে, ব্লকের উপসহকারী কৃষি অফিসার, ইউনিয়ন পরিষদে অবস্থিত ফিয়াক সেন্টার কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রে  যোগাযোগ করে হাতের কাছে সরাসরি সহযোগিতা পাওয়া যাবে।

সার ব্যবস্থাপনা ঃ সাধারণভাবে ১৫০ দিনের নিচে স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন- ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৭৪, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান ৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮ ব্রি হাইব্রিড ধান৩, ব্রি হাইব্রিড ধান৫ বা বিনা ধান-১০ এবং বিনা ধান-১৮ এর ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি অর্থাৎ প্রতি ৩৩ শতকে সারের মাত্রা ইউরিয়া ৩৫ কেজি, টিএসপি বা ডিএপি ১২ কেজি, এমওপি ২০ কেজি, জিপসাম বা গন্ধক ১৫ কেজি, দস্তা (মনোহাইড্রেট) ১.৫ কেজি। ১৫০ দিনের বেশি দীঘের্ময়াদি জাত যেমন- ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৫৮ বা ব্রি ধান৬৯, ব্রি ধান৮৯ এর ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি অর্থাৎ প্রতি ৩৩ শতকে সারের মাত্রা ইউরিয়া ৪০ কেজি, টিএসপি বা ডিএপি ১৩ কেজি, এমওপি ২২ কেজি, জিপসাম ১৫ কেজি, দস্তা ১.৫ কেজি। হাওর অঞ্চলের জাতের ক্ষেত্রে প্রতি ৩৩ শতকে সারের মাত্রা ইউরিয়া ২৭ কেজি, টিএসপি বা ডিএপি ১২ কেজি, এমওপি ২২ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি, দস্তা ১.৫ কেজি। তবে টিএসপির বদলে ডিএপি সার ব্যবহার করলে বিঘাপ্রতি ৫ কেজি ইউরিয়া সার কম প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পদ্ধতি ঃ টিএসপি বা ডিএপি, এমওপি, জিপসাম ও দস্তা সারের পুরোটাই শেষ চাষের সময় মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে দস্তা ও টিএসপি একসাথে না মিশিয়ে পৃথকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সারকে সমান তিন ভাগে ভাগ করে প্রয়োগ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে ১ম কিস্তি চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর, ২য় কিস্তি চারা রোপণের ৩০-৩৫ দিন পর এবং শেষ কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন আগে। দীর্ঘমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে ১ম কিস্তি শেষ চাষের সময়, ২য় কিস্তি চারা রোপণের ২০-২৫ দিন পর অর্থাৎ  গোছায় কুশি দেখা দিলে এবং শেষ কিস্তি কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন আগে। সার প্রয়োগ ও পদ্ধতি নিয়ে আরও কিছু পরামর্শ মেনে চলতে হবে। জৈব সারের গুরুত্ব ঃ জমিতে পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। জৈব সারের সঙ্গে রাসায়নিক সার সমন্বয় করে ব্যবহার করলে রাসায়নিক সারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় ও ভালো ফলন হয়। জমিতে বছরে একবার হলেও বিঘাপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। আমন মৌসুমে যে জমিতে জৈব সার ব্যবহার করা হবে সে জমিতে বোরো মৌসুমে ইউরিয়া সার নির্ধারিত মাত্রার তিন ভাগের এক ভাগ কম ব্যবহার করতে হবে। টিএসটি ও এমওপি সার অর্ধেক মাত্রায় ব্যবহার করলেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ধান কাটার সময় গাছের গোড়া থেকে ১০-১২ ইঞ্চি উপরে কেটে নাড়া মাটিতে মিশিয়ে দিলে পটাশ সারের পরিমাণ তিন ভাগের এক ভাগ কম লাগে। দস্তা বা জিঙ্ক সালফেট সার ফসলচক্রের কোনো একটিতে ব্যবহার করলে তা পরবর্তী দুই ফসলের জন্য ব্যবহার না করলেও চলবে।  বেলে মাটিতে চার কিস্তিতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করাই ভালো। জমিতে ছিপছিপে পানি থাকা অবস্থায় ইউরিয়া সার সমভাবে ছিটানোর পর হাতড়িয়ে বা নিড়ানি দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারলে ভালো ফলন আশা করা যায়। তীব্র শীতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা যাবে না। ইউরিয়া সারের অপচয়রোধে এবং ইউরিয়া সারের কাযর্কারিতা বাড়াতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে। এজন্য এক মৌসুমে প্রতি চারটি গোছার জন্য ২.৭ গ্রাম ওজনের একটি মেগাগুটি প্রয়োগ করলেই যথেষ্ট। যদি কোনো কারণে গন্ধক বা দস্তা ব্যবহার করা না হয় তাহলে গাছের গন্ধক বা দস্তার অভাবজনিত লক্ষণ বুঝে সার দিতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনা ঃ এবারে বোরো ধানে  সেচের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা। মনে রাখতে হবে ধানগাছ কোনো জলজ উদ্ভিদ নয় তবে পানি বেশি পছন্দ করে। এজন্য সারাক্ষণ পানিতে ভাসিয়ে জমি টইটম্বুর করে রাখা ঠিক নয়। পানি বেশি হলে বিভিন্ন ছত্রাকজনিত রোগ, রোগের জীবাণু ছড়ায়, গাছের বৃদ্ধি ব্যহৃত হয়, ফুল/ফল ঝরে পড়ে ও দানা পুষ্ট হয় না। পরিশেষে ফলন কম হয়। আবার অন্যদিকে পানি কম হলে খাদ্য গ্রহণ বা পরিবহনে ব্যাহত হয়, খাদ্য তৈরি বাধাগ্রস্ত হয়, গাছ মরে যেতে পারে, ফুল-ফল দেরিতে আসে, আগাছা বেশি হয় এবং দানা পুষ্ট হয় না। ফলে ফলন কম হয়। ধানে বৃদ্ধির  কোন পর্যায়ে কী পরিমাণ পানি লাগে আসুন তা জানা যাক। চারা লাগানোর সময় ছিপছিপে এক থেকে দেড় ইঞ্চি পানি লাগে। এর কম বা বেশি হলে রোপণে অসুবিধা হয়। চারা লাগানোর থেকে পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত দেড় থেকে দুই ইঞ্চি। পানি কম হলে রোপণ ঝুঁকি সামলে উঠতে বেশি সময় লাগে আর বেশি হলে চারা হেলে পড়ে। চারা লাগানোর ১১ দিন পর থেকে থোড় আসা পর্যন্ত এক থেকে দেড় ইঞ্চি। এর কম বা বেশি হলে কুশি কম হয়। কাইচ থোড় হওয়ার সময় থেকে ফুল ফোটা পর্যন্ত দুই  থেকে চার ইঞ্চি। এ সময় রসের ঘাটতি হলে দানা গঠন পুষ্ট হবে না, দানার সংখ্যা কম হবে। আর পানি বেশি হলে গাছ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ধানে দানা শক্ত ক্ষীর হলে অর্থাৎ ধান কাটার ১০-১২ দিন আগ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে পানি বের করে দিতে হবে। বালাই ব্যবস্থাপনা ঃ ধানের জমিতে সেচের মাধ্যমে পোকামাকড়ের মধ্যে লেদা  পোকা, শীষকাটা লেদা পোকা, থ্রিপস, ছাতরা পোকা, কাটুই পোকা, ওড়চুঙ্গা আর  রোগের মধ্যে ব্লাস্ট, বাদামি দাগ এবং অধিকাংশ আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অন্যদিকে নিষ্কাশন বা পানি সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে পোকামাকড়ের মধ্যে পাতা মাছি, চুংগী  পোকা, বাদামি গাছফড়িং, সাদাপিঠ গাছফড়িং, রোগের মধ্যে বিভিন্ন ছত্রাক  রোগ, পাতা পোড়া রোগ এবং আগাছার মধ্যে শেওলা, পানিকচু, কচুরিপানা বা  চেঁচড়া জাতীয় আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

লেখক ঃ কৃষিবিদ মো. আবু সায়েম, পিএইচডি ফেলো, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

বাণিজ্যিক চাষাবাদে বড় হচ্ছে ফুলের বাজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফুল হচ্ছে উচ্চ মূল্যমান একটি কৃষিপণ্য। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও মননশীলতার প্রতীক এই ফুলকে ঘিরে জেগে উঠছে কৃষি অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা। উপহার, সংবর্ধনা, বিয়ে, গায়ে হলুদ, পূজা-পার্বণ এমনকি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় ফুলের ব্যবহার এখন জনপ্রিয় হচ্ছে। আধুনিক সমাজে ফুলের বহুমুখী ব্যবহারের কারণে শুধু  শৌখিনতায় নয়- ফুল এখন বিরাট অর্থকরী ফসল।  বাংলাদেশে মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফুলের চাহিদাও বাড়ছে। উৎসবপ্রিয় বাঙালির জীবনে বিভিন্ন ধরনের উৎসব সারা বছর লেগেই থাকে। এসব উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় ফুলের গুরুত্ব বেড়েছে। ভালোবাসা দিবস, পহেলা ফাল্গুন, একুশে ফেব্র“য়ারি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, পহেলা বৈশাখে দেশব্যাপী ব্যাপক আয়োজনের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠান যেন ফুল ছাড়া চলেই না। আধুনিকমনস্ক মানুষের রুচির পরিবর্তনে এখন ঘরেও মানুষ তাজা ফুল রাখতে পছন্দ করে। সময়ের চাহিদার আলোকে দেশের অর্থনীতিতেও ফুলের অবদান ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ফুলের বাণিজ্যিক প্রসার  খুব বেশি দিনের নয়। নব্বইয়ের দশকের আগে  দেশের ফুলের চাহিদার প্রায় পুরোটাই ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ফুল দিয়েই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ মেটানো হচ্ছে। মাত্র দুই দশকের পথচলায় ফুল বাণিজ্য অভানীয় সাফল্য দেখিয়েছে। জানা গেছে, ১৯৮২-৮৩ অর্থ বছর থেকে দেশে ফুল অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এরপর থেকে বাড়ছে ফুলের বাণিজ্য। বাড়ছে কর্মসংস্থান। দেশের গন্ডি বিদেশেও রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ফুল। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা।  দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কৃষিভিত্তিক পণ্য হিসেবে ফুলের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সারা পৃথিবীতে ফুলের বাজার প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে   দেশে সার্বিকভাবে ফুলের বাজার মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। একসময় শুধু যশোরে ফুলের চাষ হতো। জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ২০টি জেলায় কমবেশি ১২ হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে। গত চার দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ফুল চাষ হয় যশোর ও ঝিনাইদহ  জেলায়। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাভার, গাজীপুর, সাভার, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার,  মেহেরপুর, রাঙামাটি, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, মানিকগঞ্জ ও নাটোর। তবে বাণিজ্যিকভাবে বেশি চাষ হয় গোলাপ, রজনীগন্ধা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস ও জারবেরা ফুল। ফুল ব্যবসায়ীদের হিসাবে দেখা গেছে, ফুল চাষ, পরিবহন ও বিক্রি মিলিয়ে ফুল ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত। জানা গেছে, বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৯১ সালে সরকার ফুলকে রফতানিযোগ্য পণ্যের তালিকাভুক্ত করে। বিভিন্ন জেলায় কমবেশি ২০ হাজারের খুচরা ফুল ব্যবসায়ী রয়েছেন। আর ঢাকায় আছে ৫০০শর অধিক ফুল বিক্রেতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অধিকাংশ ফুলই ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিক্রি হয়। ঢাকার শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ে রয়েছে পাইকারি ফুলের বাজার। খুচরা বিক্রেতারা এসব জায়গা থেকে ফুল কিনে শহরে ছড়িয়ে পড়েন। ফুলের ব্যাপক চাহিদা ও বিরাট সুযোগ থাকার পরেও ফুল বিক্রির জন্য ঢাকায় কোনো কেন্দ্রীয় বাজার  নেই। যদিও  কেন্দ্রীয়ভাবে ফুলবাজার নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন ফুল বিক্রেতারা। আশার খবর হলো, এরই প্রেক্ষিতে রাজধানীর গাবতলীতে প্রায় দেড় একর জমির ওপর দুইতলা ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে ফুলচাষিদের জন্য স্থায়ী বাজার  তৈরি হচ্ছে। ভবনটি হবে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধার মাধ্যমে ফুল বিপণনে সহায়তা প্রদান প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২২ সালের জুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশে ফুলের সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে। বিশ্ববাজারে অনেক জাতের ফুল আছে। কিন্তু দেশে ফুলের বেশি একটা জাত নেই। দেশে প্রতিনিয়ত ফুলের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে ফুল এনে চাহিদা মেটাতে হয়। এই অবস্থা কাটাতে দেশে বিদেশি ফুল চাষে আগ্রহ বাড়ানো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফুলচাষিরা বিদেশি ফুলচাষে অধিক লাভ পাওয়ায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ধারণা করা হচ্ছে এই উদ্যোগ পুরোমাত্রায় বাস্তবায়িত হলে সারা বছর বিদেশি প্রজাতির বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করে দেশের চাহিদা মেটানোর রফতানি করেও প্রচুর  বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির মতে, রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকার মতো ফুল চাষে দেশের কৃষকরা অনেক আগে থেকেই সিদ্ধহস্ত। এখন তাদের জমিতে ফুটছে জাবেরা, গ্লাডিওলাসের মতো আমদানি-বিকল্প ফুল। এমনকি অর্কিডও আবাদ হচ্ছে  দেশে। তাই এখন আর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড থেকে ফুল আমদানি করতে হচ্ছে না। কৃষকদের মাধ্যমে বিদেশি ফুল চাষ প্রসারে এগিয়ে এসেছে দেশের শীর্ষ বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেটাল অ্যাগ্রো লিমিটেড। জাপান থেকে সরাসরি বীজ এনে তা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে তারা। পঞ্চগড়সহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় দীর্ঘদিন ধরে শীত মৌসুম চলে। এই শীতকে কাজে লাগিয়ে বছরের বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে শীতকালীন ফুল চাষ করা সম্ভব। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশ থেকে উন্নত প্রজাতির ফুলের বীজ এনে দেশে তা প্রসার ঘটালে উত্তরাঞ্চলে ফুল চাষে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ফুল চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগোনোর জন্য এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফুল বিদেশে রফতানির জন্য প্যাকেজিং ব্যবস্থার উন্নয়ন, হিমাগার স্থাপন, ফুলের নতুন নতুন জাত উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।  সেই সঙ্গে সম্ভাবনাময় ফুলশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এর সঙ্গে জড়িত কৃষক ও উদ্যোক্তাদের স্বল্প হারে ঋণ সুবিধা প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তি প্রাপ্তি ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, উন্নত ও নতুন নতুন জাতের বীজ সরবরাহ করা, ওয়্যারহাউজ ও  কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ এবং সর্বোপরি অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। ফুলচাষিদের অভিযোগ- প্রশিক্ষণের অভাব, মানসম্মত বীজের স্বল্পতা, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব প্রভৃতি কারণে ফুলশিল্পে আশানুরূপ উন্নতি করা যাচ্ছে না। দেখা গেছে, পরিবহন ব্যবস্থার অভাবের কারণে অনেক সময় ফুল পচে বড় ধরনের ক্ষতি সম্মুখীন হতে হয়। এসব সমস্যার সমাধান করা  গেলে ফুলের উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো সম্ভব হবে। ফুল রফতানিকারকদের মতে, এ পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। ফুল দু-একদিন তাজা থাকে, তারপর নষ্ট হয়ে যায়। এ অসুবিধা দূর করার জন্য ফ্রিজার ভ্যানের প্রয়োজন। তাহলেই এ খাতে রফতানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

লেখক ঃ এস এম মুকুল, উন্নয়ন গবেষক।

গরু মোটাতাজাকরণে দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে কোরবানির মূল উপাদান হচ্ছে গরু। আর সেটা যদি হয় মোটাতাজা, নাদুস-নুদুস তবে আনন্দের সীমা থাকে না। এ উপলক্ষকে সামনে রেখে যারা গরু মোটাতাজাকরণে আগ্রহী তাদের আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া দরকার। এজন্য দরকার গরু মোটাতাজাকরণে সঠিক ব্যবস্থাপনা। এটি কখন ও কিভাবে করলে বেশি লাভবান হওয়া যায় তার বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতি নিম্নে দেয়া হলো- অধিক মাংস উৎপাদনের জন্য ২-৩ বছর বয়সের শীর্ণকায় গরুকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য সরবরাহ করে হৃষ্টপুষ্ট গরুতে রূপান্তরিত করাকে গরু মোটাতাজাকরণ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটির গুরুত্ব হচ্ছে- দরিদ্রতা হ্রাসকরণ, অল্প সময়ে কম পুঁজিতে অধিক মুনাফা অর্জন, অল্প সময়ের মধ্যে লাভসহ মূলধন ফেরত পাওয়া, প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণ, স্বল্পমেয়াদি প্রযুক্তি হওয়ার কারণে পশু মৃত্যুর হার কম, কৃষিকার্য থেকে উৎপাদিত উপজাত পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে সহজেই মাংস উৎপাদন করা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে আয় বৃদ্ধি করা। গরু মোটাতাজাকরণের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের পশু বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুজাফফর হোসেন জানান- প্রয়োজনীয় উপাদান, পদ্ধতি ও মোটাতাজাকরণের সঠিক সময় : বয়সের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৩ মাসের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ করা যায়। অনেক সময় ৪-৬ মাসও লাগতে পারে। গরু মোটাতাজাকরণের জন্য সুবিধাজনক সময় হচ্ছে বর্ষা এবং শরৎকাল যখন প্রচুর পরিমাণ কাঁচা ঘাস পাওয়া যায়। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে কোরবানি ঈদের কিছুদিন আগ থেকে গরুকে উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে মোটাতাজাকরণ লাভজনক। স্থান নির্বাচন : খামার স্থাপনের জন্য স্থান নির্বাচনে নিম্ন লিখিত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শুষ্ক ও উঁচু জায়গা হতে হবে, যাতে খামার প্রাঙ্গণে পানি না জমে থাকে। খোলামেলা ও প্রচুর আলো-বাতাসের সুযোগ থাকতে হবে। খামারে কাঁচামাল সরবরাহ ও উৎপাদিত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণের জন্য যোগাযোগ সুবিধা থাকতে হবে। পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সুষ্ঠু ব্যবস্থা থাকতে হবে। সুষ্ঠু নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেমন- পানি, মলমূত্র, আবর্জনা ইত্যাদি। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকতে হবে। গরু নির্বাচন : উন্নত দেশের মাংসের গরুর বিশেষ জাত রয়েছে। বিদেশি গরুর জন্য উন্নত খাদ্য ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। তাই দেশীয় গরু মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক। ২-২.৫ বছরের গরুর শারীরিক বৃদ্ধি ও গঠন মোটাতাজাকরণের জন্য বেশি ভালো। এঁড়ে বাছুরের দৈহিক বৃদ্ধির হার বকনা বাছুরের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে বাছুরের বুক চওড়া ও ভরাট, পেট চ্যাপ্টা ও বুকের সঙ্গে সমান্তরাল, মাথা ছোট ও কপাল প্রশস্ত, চোখ উজ্জ্বল ও ভিজা ভিজা, পা খাটো প্রকৃতির ও হাড়ের জোড়াগুলো স্ফীত, পাঁজর প্রশস্ত ও বিস্তৃত, শিরদাঁড়া সোজা হতে হবে। বাসস্থানের গঠন : গরুর বাসস্থান তৈরির জন্য খোলামেলা উঁচু জায়গায় গরুর ঘর তৈরি, একটি গরুর জন্য মাপ হতে হবে কমপক্ষে ১০-১২ বর্গফুট। ভিটায় ১ ফুট মাটি উঁচু করে এর ওপর ১ ফুট বালু দিয়ে ইট বিছিয়ে মেঝে মসৃণ করার জন্য সিমেন্ট, বালু ও ইটের গুঁড়া দিতে হবে। গরুর সামনের দিকে চাড়ি এবং পেছনের দিকে বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করতে হবে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে বেঁধে ওপরে ধারি অথবা খড় ও পলিথিন দিয়ে চালা দিতে হবে, ঘরের পাশে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি দাঁড়ানো গরুকে বাঁশ দিয়ে আলাদা করতে হবে যাতে একে অন্যকে গুঁতা মারতে না পারে। ঘরের চারপাশ চটের পর্দার ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে অতি বৃষ্টি ও অতি ঠান্ডার সময় ব্যবহার করা যায়। খাদ্য : খাদ্যে মোট খরচের প্রায় ৬০-৭০ ভাগ ব্যয় হয়। তাই স্থানীয়ভাবে খরচ কমানো সম্ভব। এজন্য গরু মোটাতাজাকরণের একটি সুষম খাদ্য তালিকা নিচে দেয়া হলো- শুকনা খড়: ২ বছরের গরুর জন্য দৈহিক ওজনের শতকরা ৩ ভাগ এবং এর অধিক বয়সের গরুর জন্য শতকরা ২ ভাগ শুকনা খড় ২-৩ ইঞ্চি করে কেটে এক রাত লালীগুড়-চিটাগুড় মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে প্রতিদিন সরবরাহ করতে হবে। পানিঃচিটাগুড়=২০:১। কাঁচা ঘাস : প্রতিদিন ৬-৮ কেজি তাজা ঘাস বা শস্য জাতীয় তাজা উদ্ভিদের উপজাত দ্রব্য যেমন- নেপিয়ার, পারা, জার্মান, দেশজ মাটি কলাই, খেসারি, দুর্বা ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্য : প্রতিদিন কমপক্ষে ১-২ কেজি দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। নিচে ১০০ কেজি দানাদার খাদ্যের তালিকা দেয়া হলো- গম ভাঙা-গমের ভুসি ৪০ কেজি চালের কুঁড়া ২৩.৫ কেজি খেসারি বা যে কোনো ডালের ভুসি ১৫ কেজি তিলের খৈল-সরিষার খৈল ২০ কেজি লবণ ১.৫ কেজি। উল্লিখিত তালিকা ছাড়াও বাজারে প্রাপ্ত ভিটামিন মিনারেল মিশ্রণ ১% হারে খাওয়াতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের ইউরিয়া মোলাসেস বক ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি হচ্ছে ৩৯ ভাগ চিটাগুড়, ২০ ভাগ গমের ভুসি, ২০ ভাগ ধানের কুঁড়া, ১০ ভাগ ইউরিয়া, ৬ ভাগ চুন ও ৫ ভাগ লবণের মিশ্রণ। রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা : প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পশুর গা ধোয়াতে হবে। গোশালা ও পার্শ¦বর্তী স্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। নিয়মিতভাবে গরুকে কৃমিনাশক ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। বাসস্থান সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পরিমিত পরিমাণে পানি ও সুষম খাদ্য প্রদান করতে হবে। রোগাক্রান্ত পশুকে অবশ্যই পৃথক করে রাখতে হবে। খাবার পাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খামারের সার্বিক জৈব নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। পশু জটিল রোগে আক্রান্ত হলে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বাজারজাতকরণ : মোটাতাজাকরণ গরু লাভজনকভাবে সঠিক সময়ে ভালো মূল্যে বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়। বাংলাদেশে মাংসের জন্য বিক্রয়যোগ্য গবাদিপশুর বাজার মূল্যেও মৌসুমভিত্তিক হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। কাজেই একজন প্রতিপালককে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য অবশ্যই গরুর ক্রয় মূল্য যখন কম থাকে তখন গরু ক্রয় করে বিক্রয় মূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে বিক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণত কোরবানির ঈদের সময় গরুর মূল্য অত্যধিক থাকে এবং এর পরের মাসেই বাজার দর হ্রাস পায়। তাই এখন গরু মোটাতাজাকরণের উপযুক্ত সময়। স্বল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার সহজ এবং সুবিধাজনক উপায়ের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী পদ্ধতি। কিন্তু প্রচলিত এবং অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণের তুলনায় আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ অধিক লাভজনক। সুতরাং কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আমাদের দেশের কৃষকরা যদি ওই পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ করতে পারে তাহলে প্রতি বছর কোরবানি ঈদের সময় গরু আমদানি কমানো সম্ভব হবে এবং এর ফলে দেশ আর্থিকভাবে বিরাট সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে।

প্রজনন সময়ে ইলিশ নিতে ফারাক্কা খুলে দেয়া হবে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাঙালীর রসনাতৃপ্তিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে ইলিশ মাছ। এবার তাই ওপার বাংলা অর্থাৎ পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের রসনাতৃপ্ত করতে বড় ধরনের ভূমিকায় নামছে সেখানকার সরকার। তারা ইলিশ চাষের জন্য বিশেষ করিডর তৈরি বা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬১ কোটি টাকা। ৪০ বছর ধরে তারা পাচ্ছে না ইলিশের স্বাদ। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে ইলিশের অবাধ বিচরণ ছিল পদ্মার হুগলী পর্যন্ত। হুগলী বর্তমানে পশ্চিম বাংলার অংশ বিশেষ। ফারাক্কা তৈরির পর থেকে ইলিশের অবাধ বিচরণ বন্ধ হওয়ার কারণে মাছটি শুধু বাংলাদেশের সম্পদে পরিণত হয়। চুরিয়ে কিংবা রফতানির মাধ্যমে বাংলাদেশের ইলিশ ভারতে গেলেও কলিকাতাসহ পশ্চিম বাংলার মানুষ তৃপ্তি ভরে তা গ্রহণ করত। পশ্চিম বাংলার ইলিশ বেচাকেনায় চড়া দাম থাকায় সাধারণ মানুষ অর্থাৎ মুটে মজুর গরিব বাঙালীরা এর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে। শুধু অধিক ধনিরাই এর স্বাদ গ্রহণ করতে পারত। বিষয়টি আমলে এনে পশ্চিম বাংলা সরকার এর অবাধ চাষ করার জন্য যা হুগলী পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে তার চেষ্টায় মাঠে নেমেছে। তারা বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিয়ে ইলিশকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে হুগলী পর্যন্ত। তার জন্য বড় বাধা ফারাক্কা বাঁধ। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইলিশের প্রজননকালীন সময়ে ইলিশ যাতে পদ্মা হয়ে হুগলী পর্যন্ত যেতে পারে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা ইলিশের প্রজননকালীন সময়ে গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ফারাক্কার সব কটি গেট খুলে দিবে। যা আগামী জুন থেকেই শুরু করবে বলে জানা গেছে। সাধারণত ইলিশ এই সময়ে অবাধে যাতায়াত করে থাকে। গেট খোলা থাকলে ইলিশ অবাধে পৌঁছবে হুগলী পর্যন্ত। পরে প্রজননকালীন সময় শেষ হলে গেট বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে আটকে থাকা ইলিশ প্রচুর পরিমাণে ঝাটকে ছাড়লে তা বড় হয়ে পশ্চিম বাংলার বাঙালীদের রসনাতৃপ্ত করবে। একই সঙ্গে দামও কমে আসবে। পশ্চিম বাংলা সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা দুভাবে উপকৃত হবে। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি আসবে বাংলাদেশে। তবে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের কাজ আগামী জুন থেকে শুরুর সিদ্ধান্ত নিলেও তারা পরীক্ষামূলক ভাবে গত বছরের প্রথম দিকে থেকেই তা চালু করেছে। যার কারণে গত প্রজননকালীন সময়ে তারা ফারাক্কার গেট খুলে দেয়। যার কারণে পানির প্রবাহ বেড়ে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলে। যদিও এটি আমলে কেউ নেইনি। কিন্তু বাউবো বিষয়টি মনিটারিং করায় তাদের গোচরে এসেছে। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ইলিশ গর্ভ অবস্থায় ভারতে ঢুকেছে। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে জুন মাসকে বেছে নিয়েছে ফারাক্কা খুলে রাখার। এই সময়ে শুষ্ক মৌসুম থাকায় পদ্মায় পানির প্রবাহ অনেকটাই বেড়ে যাবে। সাধারণ! সে সময়টিতে প্রজননকালীন ইলিশ বা ছাটকা ধরা বন্ধ থাকবে। ঠিক সেই সময়ে তারা ফারাক্কার গেট খুলে ইলিশ তাদের দেশে ভরে নিবে। এর ফলে উভয় দেশে দারুণভাবে উপকৃত হবে বলে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে তারা কোন ধরনের চুক্তি করবে না। প্রকৃতগত কারণেই তারা ইলিশ পাবে আর বাংলাদেশ পাবে পানি।

গুটি ইউরিয়া যন্ত্র ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফার্ম  মেশিনারী এন্ড পোষ্ট হারেভষ্ট টেকনোলজি (এফএমপিএইচটি) বিভাগ একটি হস্তচালিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে যার মাধ্যমে একজন শ্রমিক প্রতি ঘন্টায় একবিঘা জমিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়াগ করতে পারে। প্রচলিত পদ্ধতিতে একজন শ্রমিক সারাদিনে দক্ষতাভেদে ২০-৩০ শতাংশ জমিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে পারে। সুতরাং প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় যন্ত্রের কার্যক্ষমতা ৭-৮ গণ বেশী।

 

উদ্ভিদের জন্য অত্যাবশকীয় পুষ্টি উপাদানগুলির মধ্যে নাইট্রোজেন অন্যতম। দেশে ব্যবহৃত মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৮০ শতাংশ ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। ধানের জমিতে প্রয়োগকৃত ইউরিয়া পর্যায়ক্রমে হাইড্রোলাইসিস, অ্যামোনিফিকেশন, নাট্রিফিকেশন, ডি- নাট্রিফিকেশন,  ভোলাটিলাইজেশন ও পারকোলেশন প্রক্রিয়ায় গ্যাস হয়ে বাতাসে উড়ে যায়, চুইয়ে মাটির নীচে চলে যায় অথবা পানির সাথে অন্য জমি বা খালে ধুয়ে গিয়ে অপচয় হয়। নাইট্রোজেন সার ব্যবস্থাপনায় মাটির ২-৩ ইঞ্চি নীচে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা প্রায় ৪০ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নিত করা সম্ভব। কিন্তু গুটি ইউরিয়া সঠিক নিয়মে জমিতে প্রয়োগ করা অত্যন্ত শ্রম ও শ্রমিক নির্ভর হওয়ায় কৃষক তা ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষে হস্ত চালিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্রটি উদ্ভাবন করা হয়েছে।

 

ব্রি উদ্ভাবিত গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্রটি একজন শ্রমিকের দ্বারা সহজেই চালানো সম্ভব। এক সাথে দুই সারিতে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা যায়। বিধায় যন্ত্রের কার্যকারিতা অনেক বেশী। যন্ত্রের নির্মাণ কৌশল অত্যন্ত  সহজ হওয়ায় এটি তৈরি ক্রটি দূরীকরণ ও সংরক্ষণ করা সহজ। গুটি ইউরিয়া একসারি পরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে জমিতে প্রয়োগ করতে হয় বিধায় সারি থেকে সারির দূরত্ব ২ সে.মি এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ২০ সে. মি. বিবেচনা করে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রাটির মাধমে জমিতে নালা  তৈরি এবং বন্ধ করার ব্যবস্থাসহ ৬-৮ সে. মি. গভীরে গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করা যায়। যন্ত্রটি দুটি স্কীডের উপর পদ্ধতিগত ভাবে নির্মিত। দুটি স্কীডের মধ্যে বিদ্যমান চালক চাকার সাথে শ্যাফটের মাধ্যমে দুই পাশের দু’টি মিটারিং ডিভাইস সংযুক্ত। মিটারিং ডিভাইস দুটি গুটি ইউরিয়া ধারক বক্সের মধ্যে এমনভাবে সংযুক্ত করা যাতে চালক চাকাটি একটি ঘূর্ণনের সম্পন্ন করলে মিটারিং ডিভাইসও একটি ঘূর্ণন সম্পন্ন করে। প্রতিটি মিটারিং ডিভাইসে ছয়টি করে কাপ সংযুক্ত আছে। চালক চাকা ঘূর্ণনের সাথে সাথে মিটারিং ডিভাইস ঘুরার গুটি ইউরিয়ার বক্স হতে কাপের মাধ্যমে গুটি সংগ্রহ করে বক্সের সাথে সংযুক্ত নির্গমন পথে ফেলে দেয়। নির্গমন পাইপটি স্কীডের নীচে সংযুক্ত নালা তৈরিকারক ডিভাইসের পিছনে সংযুক্ত থাকায় বক্স হতে সংগৃহীত গুটি নালার মধ্যে নির্গমন হয় যা পুনরায় স্কীডারের পিছনে সংযুক্ত নাল বন্ধকারকের মাধ্যমে ঢেকে দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, দু,টি স্কীডের উপর গুটি ইউরিয়ার ধারক বক্স দুটি মধ্যের চালক চাকা বরাবর স্থাপন করা আছে। চালক চাকার একটি ঘূর্ণনের মাধ্যমে যন্ত্রটি ২৪০ সেমি দূরত্ব অতিক্রম করে  এবং প্রতি প্রতিটি মিটারিং ডিভাইসে ছয়টি করে কাপ সংযুক্ত থাকায় ২৪০ সেমি দূরত্বের মধ্যে ৬ টি গুটি ইউরিয়া প্রতিস্থাপিত হয় ফলে গুটি হতে গুটির দূরত্ব হয় ৪০ সেমি।

 

জমিতে যন্ত্রটি নেয়ার পূর্ব যন্ত্রের বিভিন্ন ঘূর্ণয়মান অংশে মবিল/ গ্রীস দিতে হবে। যন্ত্রটি চালানোর সময় এমনভাবে জমিতে স্থাপন করতে হবে যাতে দুই পাশের দুটি স্কীড ও মধ্যের চালক চাকা সারি বরাবর থাকে। গুটি ইউরিয়া বক্সের ২/৩ অংশ পরিমান গুটি দ্বারা পূর্ন করতে হবে। সামনের দিকে ঠেলার মাধ্যমে যন্ত্রটি চালাতে হবে। জমির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেয়ে পুনরায় যন্ত্রটি এক সারি পর স্থাপন করে পূর্বের মত চালাতে হবে। যন্ত্র চালানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে। যেন গুটি প্রয়োগ করা সারিতে পা রাখা না হয়। অর্থ্যাৎ মধ্যের সারি বরাবর পা রেখে যন্ত্রটি চালাতে হবে। যেহেতু জমিতে চারা লাগানোর ৮/১০ দির পর গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়। তাই সে সময় জমি অত্যন্ত কর্দমাক্ত থাকে। ফলে যন্ত্রটি চালানোর সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকা অত্যাবশ্যক।

 

 

প্লাস্টিকের চাল আর নকল ডিম! দুটোই গুজব ও অপপ্রচার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্লাস্টিকের চাল এবং নকল ডিম নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইদানীং বেশ সরগরম। অনেকে ফেসবুক বা ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও দেখে বলছেন, এত দিন বিশ্বাস না করলেও নিজের চোখে যা দেখলাম তা অবিশ^াস করি কেমন করে? হ্যাঁ আপনি যা দেখেছেন তা বাস্তব সম্মত নয়, যেমন বাস্তবসম্মত নয় কাল্পনিক সিনেমার অনেক দৃশ্য! নিতান্ত অপ্রচারের উদ্দেশ্যে তৈরি এসব চটকদার ভিডিও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়Ñ যাতে সাধারণ মানুষ অনায়াসে তা বিশ^াস করে। প্লাস্টিকের চাল এবং নকল ডিম নিয়ে গুজবটা নতুন না। অনেক দিন ধরেই নানা দেশে প্লস্টিকের চাল বা নকল ডিমের গুজবটা ছড়ানো হচ্ছে। নকল ডিমের ‘প্রমাণ’ হিসেবে ইউটিউবের একটা ভিডিও দেখানো হয় যাতে কোনো এক ফ্যাক্টরিতে এ রকম ডিম বানানোটা ধাপে ধাপে দেখানো হয়। ঘটনা কি তাহলে সত্যি? আসুন জেনে নেয়া যাক প্রকৃত ঘটনা। প্রথমেই আসি নকল ডিম বানানো আদৌ সম্ভব কিনা সেই প্রসঙ্গে। নকল ডিম বানানো সম্ভব, মোম এবং এই জাতীয় নানা দ্রব্য মিশিয়ে ডিমের মতো দেখতে কিছু অবশ্যই বানানো চলে। চীনে নানা উৎসবে এ রকম ডিমের ব্যবহার আছে বলে জানা যায়। আবার স্থানীয়ভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা চীনে এগুলো বিক্রি করার সময় ধরা পড়েছে, তাও ইন্টারনেটের কল্যাণে জানা গেছে। তাহলে কি বাংলাদেশে আসছে চীনা নকল ডিম? এ রকম অনেক ভিডিও আছে। আসল ঘটনা হলো ডিমের ভেতরে খোসার ঠিক নিচে একটা পাতলা মেমব্রেন বা আবরণ থাকে বটে। ডিম কড়া রোদে বেশি দিন থাকলে সেটা শুকিয়ে কাগজের মতো হতে পারে। তাই বলে তাকে প্লাস্টিক বা কাগজের ডিম মনে করাটা হাস্যকর। একই ঘটনা প্লাস্টিকের চালের ক্ষেত্রেও চলে। ভিডিওতে দেখলাম একজন ভাত রান্না করার পরে ভাতের চেহারা দেখে বলছেন এটা নির্ঘাত প্লাস্টিকের চাল। ভাতের মাড় নাকি শুকিয়ে প্লাস্টিকের মতো হয়ে গেছে, আর ভাতটাকে বল বানিয়ে বাউন্স করানো যাচ্ছে। পোস্টদাতা কি কখনো ভাতের মাড় শুকানোর পরে কেমন হয় দেখেননি? চাল পুরনো হলে পচতে পারে, আর সেই পচা চালের মাড় নানা অবস্থায় হাঁড়ির গরমে পড়ে প্লাস্টিকের মতো চেহারা হতে পারে। কিন্তু ওই যে মোক্ষম ‘প্রমাণ’ ভাতের বল বাউন্স করা? প্লাস্টিক না হলে কি সেটা হতে পারে? হ্যাঁ অবশ্যই পারে। ভাত মূলত কাবর্হাইড্রেট, আর ভাতের স্থিতিস্থাপকতা অনেক সময়ে রাবারের মতো হওয়া সম্ভব পদার্থ বিজ্ঞানের সব নিয়ম মেনেই। তার জন্য প্লাস্টিক হওয়ার দরকার নেই। কাজেই ভাতের বল বাউন্স করলেই সেটা প্লাস্টিক চাল হওয়ার প্রমাণ নয় মোটেও। আরেকটি বিষয় হলোÑ আমাদের ভাত রান্না করার জন্য তা পানিতে ফোটাতে হয়, পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আমাদের বাজারে যে সব প্লাস্টিক পাওয়া যায় তাদের স্ফুটনাঙ্ক বিভিন্ন। যেমন- পিভিসি প্লাস্টিক গলে ১৬০ ডিগ্রি থেকে ২১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। আমরা জানি, পানির স্ফুটনাঙ্ক ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রার উপরে নেয়া সম্ভব নয়। সুতরাং আপনি যদি বাজার থেকে প্লাস্টিক কিনে আনেন সেটা কখনোই পানি দ্বারা ফুটানো সম্ভব হবে না। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে প্লাস্টিক গলানো হলে সেটা তরলে রূপান্তরিত হয় অথবা তার আকার আকৃতির পরিবর্তন হয়ে যায়। সেটি যদি প্লাস্টিক চালও হয় তার আকার রান্নার পর ভাতের আকারে থাকার কথা নয়। প্লাস্টিক দিয়ে চাল বানানোর বিষয়টি অর্থনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। বাজারে এক কেজি চালের খুচরা দাম কত? প্রকারভেদে ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা। আর এক কেজি প্লাস্টিকের দাম কত? ইন্টারনেট ঘেটে দেখলাম মোটামুটি নিম্নমানের ১ কেজি প্লাস্টিকের দাম কোনো অবস্থাতেই ১৫০-২০০ টাকার কম না। আর সেই কাঁচামালকে দিয়ে চাল বানিয়ে সেই চাল যদি চীন থেকে বাংলাদেশে জাহাজে বা স্থলপথে আমদানি করা হয় এবং বেশ কয়েকজন মধ্যস্বত্বভোগীর হাত পেরিয়ে মুদির দোকানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা কখনোই ২০০-৩০০ টাকা কেজির কম হওয়া সম্ভব নয়। সেই অবস্থায় কীভাবে ক্রেতা সেটা ৫০ টাকা কেজিতে কিনতে পারবেন?একই যুক্তি খাটে নকল ডিমের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের বাজারে একটা ডিমের দাম ৮ টাকার মতো। এখন ভেবে দেখুন, একটা নকল ডিম বানাতে যা লাগে ( যেমন- ডিমের শেল প্যারাফিন, জিপসাম গুঁড়া, ক্যালসিয়াম কাবের্নট, এবং অন্যান্য উপকরণ) সেটা কয়েক হাজার মাইল দূর চীন থেকে বাংলাদেশে রপ্তানি করার খরচসহ ৮ টাকার কমে কি দেয়া সম্ভব? দোকানি আপনার কাছে ৮ টাকায় একটা ডিম বিক্রি করলে অবশ্যই লাভ রেখে বিক্রি করছে। কাজেই তার কেনা দাম ৮ টাকার অনেক কম। তাই হিসাবটা কি মিলে? দুনিয়ার সব ডিম ব্যবসায়ীরা কি অনেক টাকা লস দিয়ে নকল ডিম বিক্রি করবেন, যেখানে আসল ডিম সস্তায় মুরগির কাছ থেকে পাওয়া যায়? অর্থনীতির হিসাব বলছে, সেটাও সম্ভব না। কৃত্রিম ডিমের ক্ষেত্রে, ডিমের শেল প্যারাফিন, জিপসাম গুঁড়া, ক্যালসিয়াম কার্বনেট এবং অন্যান্য উপকরণ দ্বারা তৈরি করা যেতে পারে। ডিমের সাদা অংশ তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে ক্যালসিয়াম আলজেনাইট দ্বারা। সুতরাং এটা পরিষ্কার কৃত্রিম ডিম তৈরি করার জন্য অনেকগুলো রাসায়নিক প্রয়োজন এবং রাসায়নিকগুলোর সঠিক অনুপাতও জরুরি। বাজারে আমরা যে দামে ডিম পাই, এই দামের মধ্যে কখনোই কৃত্রিম বা নকল ডিম তৈরি সম্ভব না। পাশাপাশি খাবারের সময় ডিম ওমলেট বা সিদ্ধ করলে যে স্বাভাবিক আকার আকৃতি হওয়ার কথা প্লাস্টিকের ডিমে সেটা কখনোই হবে না। আগেই বলেছি, পানিতে প্লাস্টিক সিদ্ধ হয় না। প্রয়োজনে আপনিও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। সুতরাং প্লাস্টিকের চাল বা কৃত্রিম ডিম এসব গুজবে আমাদের কান না দেয়াই উত্তম। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে গত বুধবার কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, প্লাস্টিকের চাল পাওয়া খবরের কোনো ভিত্তি নেই, এটা কোনোক্রমেই সম্ভব না। গাইবান্ধায় প্লাস্টিকের চাল পাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে এলে বিষয়টি নিয়ে আমি জেলা প্রশাসক (ডিসি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেই চাল এনে রান্না করা থেকে শুরু করে মুড়ি পর্যন্ত বানানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশে চাল এখন সারপ্লাস (উদ্বৃত্ত), চাষিরা বিক্রি করতে পারছে না। আমি আমার রিসিপশনে (সংবধর্না) টাঙ্গাইলে গেছি, হাজার হাজার মানুষ টাঙ্গাইল শহরে। এক দাবিÑ ‘চালের দাম নেই, আমরা কৃষকরা শেষ হয়ে গেলাম। কৃষিমন্ত্রী আমাদের কিছু বলুন।’ আমি যখন বলেছি, মানুষ হাততালিতে ফেটে পড়েছে। কাজেই প্লাস্টিকের চাল, কোথায় থেকে এসেছে, এটা সম্ভব নাকি? কেন খাওয়াবে? গাইবান্ধায় খাদ্য বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসন কতৃর্ক জব্দকৃত সে চাল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে এতে প্লাস্টিক জাতীয় কিছু নেই। এ প্রসঙ্গে ব্রির শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কমর্কর্তা ও বিভাগীয় প্রধান ড. মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী বলেছেন, এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, সংগৃহীত চালের নমুনায় কোনো প্লাস্টিকের অস্তিত্ব ছিল না।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন, উধ্বর্তন যোগাযোগ কমর্কর্তা

আমগাছ ও মুকুলের যতেœ করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মাঘের শেষে সারাদেশে আমগাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আমের মুকুলের মিষ্টি গন্ধে সুবাসিত হয়ে উঠবে বাংলাদেশ। মুকুলের যতœ না নিলে আমের ভালো ফলন সম্ভব নয়। অনেকেই শখ করে আমগাছ রোপণ করি ভালো ফলনের আশায় কিন্তু সময় মতো সামান্য যতেœর অভাবে এবং পোকা ও রোগের আক্রমণের কারণে আমাদের সেই আশা পূরণ হয় না; আমের মুকুল ও গুটি ঝড়ে যায়। অথচ সময় মতো একটু যতœ নিলেই আমরা পেতে পারি সুস্বাদু আমের স্বাদ। আমগাছে বর্ষার আগে জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে একবার এবং বর্ষার পর আশ্বিন-কার্তিক মাসে আর একবার সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের নিচে যতটুকু স্থানে গাছের ছায়া পড়ে, ততটুকু স্থানের মাটি কুপিয়ে এই সার প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পরপরই হালকা সেচ দিতে হবে। গাছের বয়স ১ থেকে ৪ বছর হলে গোবর ১৫ কেজি, ইউরিয়া ২৫০ গ্রাম, টিএসপি ২৫০ গ্রাম, এমওপি ১০০ গ্রাম, জিপসাম ১০০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১০ গ্রাম, ও বরিক এসিড ২০ গ্রাম দুই ভাগ করে বর্ষার আগে ও পরে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স ৮ থেকে ১০ বছর হলে গোবর ২৫ কেজি, ইউরিয়া ৭৫০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ২৫০ গ্রাম, জিপসাম ২৫০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১৫ গ্রাম ও বরিক এসিড ৩০ গ্রাম এবং গাছের বয়স ১১  থেকে ১৫ বছর হলে গোবর ৩০ কেজি, ইউরিয়া ১০০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ৪০০ গ্রাম, জিপসাম ৩৫০ গ্রাম, জিংক সালফেট ১৫ গ্রাম ও বরিক এসিড ৩০ গ্রাম একই নিয়মে প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া গাছের বয়স ১৬ থেকে ২০ বছর হলে গোবর ৪০ কেজি, ই্উরিয়া ১৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৭৫০ গ্রাম, এমওপি ৫০০ গ্রাম, জিপসাম ৪০০ গ্রাম জিংক সালফেট ২০ গ্রাম ও বরিক এসিড ৪০ গ্রাম বছরে দুই বারে প্রয়োগ করতে হবে। আমের মুকুল ফোটার শেষ পর্যায়ে একবার এবং আম দানার মতো হলে আর একবার বেসিন পদ্ধতিতে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। ফুল আসার সময় শোষক  পোকা আমের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এরা কচি ডগা ও মুকুল থেকে রস চুষে খায়। ফলে মুকুল শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে ঝরে যায়। এ ছাড়া এ পোকার নিম্ফগুলো রস চোষার সময় আঠালো মধুরস নিঃসরণ করে, যা মুকুলে আটকে গিয়ে পরাগায়ন ব্যাহত করে এবং মুকুলে কালো ছত্রাকের জন্ম দেয়। এ  পোকা দমনের জন্য আম গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে একবার এবং আম আমগাছ দানার মতো হলে আর একবার প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি ল্যাম্বডা সাইহ্যালোথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (রিভা ২.৫ ইসি অথবা ক্যারাটে ২.৫ ইসি) মিশিয়ে আম গাছের ডাল, পাতা ও মুকুলে ভালোভাবে ¯েপ্র করতে হবে। আমের মাছি পোকা দমনের জন্য প্রতি গাছে একটি করে ব্যাকটোডি নামের ফেরোমন ফাঁদ লাগানো যেতে পারে। আমের ফল ছিদ্রকারী পোকার কিড়া শাঁস খেয়ে আমের ক্ষতি করে। এ পোকা দমনের জন্য আমের গুটি মার্বেল আকার ধারণ করলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি ফলিথিয়ন ৫০ ইসি মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ২ বার ¯েপ্র করতে হবে।

অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিঊ রোগের কারণে আম গাছের মুকুল ঝরে  যেতে পারে। তাই এ রোগ দমনের জন্য মুকুল আসার ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে একবার এবং আম আমগাছে দানার মতো হলে আর একবার প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি টিল্ট, ২৫০ ইসি অথবা ২ গ্রাম অটোস্টিন, ৫০ ডব্লিউ ডি জি মিশিয়ে গাছের ডালপালা ও মুকুলে ভালোভাবে ¯েপ্র করতে হবে। এ ছাড়া আমের মুকুলও ফল ঝরা রোধে প্রতি লিটার পানিতে এক মিলি মিরাকুলান মিশিয়ে ফুল ফোটার ঠিক আগে একবার এবং আম মটর দানার আকৃতি ধারণ করলে আর একবার ¯েপ্র করা যেতে পারে। আমের বৃদ্ধি পর্যায়ে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। বর্ষার শেষে গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম হারে বরিক এসিড অথবা ১০০ গ্রাম হারে বোরাস্ক সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছের  গোড়ার মাটিতে বোরণ প্রয়োগ করা সম্ভব না হলে আমের মুকুল আসার আগে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম সলোবর মিশিয়ে গাছে ¯েপ্র করলেও সুফল পাওয়া যাবে।

লেখক ঃ নিতাই চন্দ্র রায়, সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিল, নাটোর।

ফসল আবাদে পানি সাশ্রয়ের গুরুত্ব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পুরনো সেচ ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিনগুণের বেশি পানি জমিতে প্রয়োগ করা হয়। যা পানি সম্পদের একটি ঢালাও অপচয়। সেচের পানি ক্রমেই দু®প্রাপ্য হয়ে উঠলেও এ দেশের প্রধান শস্য ধান উৎপাদন একটি সেচনির্ভর চাষপদ্ধতি। এতে ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। আবার, অনিয়ন্ত্রিত ও অসম উত্তোলনের ফলে ভূ-উপরস্থ পানি স্বল্পতায় দেখা দিচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়। তথাপি ভূ-উপরিস্থ পানিরও গুণগত অবনতি হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যবস্থায় বাড়তি খরচ হচ্ছে, তেমনি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ক্ষেত্রেও ক্ষরা, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া বিভিন্ন প্রভাব দেখা দিচ্ছে। ফসলভেদে পানির চাহিদা সঠিকভাবে নিরূপণ, সেচকার্যে পানির পরিবহন ও বিতরণের সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ করে সেচের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত অবস্থার উন্নয়নের জন্য সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা খুবই জরুরি। আর কৃষিপ্রধান দেশে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণ করা যায় মূলত তা নিয়েই শিক্ষা ও গবেষণাকার্য চালিয়ে যাচ্ছে তার বিভাগটি। বছরব্যাপী ফসল উৎপাদনের জন্য সেচ অপরিহার্য। ভূগর্ভস্থ পানির তুলনায় উপরিভাগের পানি সেচের জন্য অধিক উপযোগী হলেও শুষ্ক মৌসুমে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা না থাকায় দেশের ৭৯ ভাগ সেচ ভূগর্ভস্থ পানির উপর নিভর্রশীল। তাই সেচকার্য পরিচালনায় প্রতিবছর গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। বলা হয়ে থাকে প্রচলিত সেচ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার সেচ পানি প্রয়োজন। অতিমাত্রায় ভূগভর্স্থ পানি উত্তোলনের কারণে ভূগভর্স্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে তেমনি বেড়ে যাচ্ছে ভূগভর্স্থ পানিতে আর্সেনিকের সংমিশ্রণ। কমে যাচ্ছে মাটির জৈব উপাদান ও পুষ্টিমান ফলে মাটি হারাচ্ছে তার গুণগতমান। এ সব সমস্যাগুলো মোকাবেলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা। তা ছাড়া যেসব ফসল উৎপাদনে পানি কম লাগে সে সব ফসল উৎপাদনের দিকে মনোযোগী হতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চল, চরাঞ্চল ও যেসব এলাকায় বেলে মাটির উপস্থিতি রয়েছে সেখানে ধান চাষ নিরুৎসাহিত করে গম, ডালজাতীয় ফসল ও সবজি চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এ ছাড়াও সেচের পানি সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এলাকাভিত্তিক ফসল উৎপাদনের জন্য বিশেষ নিদের্শনা প্রদানে নীতি-নির্ধারক মহলের আরও বিশেষ ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এডব্লিউডি প্রযুক্তি (পর্যায়ক্রমে পানি সরবরাহ ও জমি শুকিয়ে সেচ পদ্ধতি) নিয়ে আরডিএ-ব্রি, এডিবির অর্থায়নে ইরির সঙ্গে যৌথভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে গবেষণা পরিচালনার ফলাফলে দেখা গেছে ধান চাষে ১০ থেকে ৩০ ভাগ পানি সাশ্রয় হয়। এ ছাড়া আরডিএ-কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) বিষয়ক যৌথ গবেষণা দেখা যায় এসআরই প্রযুক্তির (কম সেচ ও কম শ্রমিক দিয়ে সেচপদ্ধতি) মাধ্যমে সেচ পানি, বীজ সাশ্রয়সহ বোরো ও আমন মৌসুমে ধানের ফলন ২০ ভাগের অধিক বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া আমরা শিক্ষার্থীদের কৃষিতে কিভাবে পানির অপচয় রোধ করা যায়, কম সেচে ফসল ব্যবস্থাপনা কার্য করা সম্ভব সে বিষয়গুলো শিখিয়ে থাকি। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত বিভাগটিতে নতুন নতুন পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবস্থাপনার উপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিসিএসে (টেকনিক্যাল) ক্যাডারে হিসেবে কাজের সুযোগ। আমি মনে করি গ্র্যাজুয়েটরা সেখানে কাজের সুযোগ পেলে একদিকে যেমন আমাদের পানির অপচয় রোধ করে বেশি ফসল উৎপাদন হবে। অন্যদিকে এড়ানো যাবে পরিবেশের উপর ঝুঁকি। সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয় সুযোগটি তৈরি করতে আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুতই আমাদের দাবিটি বাস্তবায়ন করবে বলে আশা রাখছি।
লেখক ঃ ড. মো. আতিকুর রহমান

চেরির মতো টমেটো, স্বাদ একই

কৃষি প্রতিবেদক ॥ টমেটো, বিশ্বব্যাপী রসনাবিলাসীদের কাছে একটি মুখরোচক খাবার। স্বাদে, গুণে এই সবজি অনন্য। তরকারিতে, ভর্তা কিংবা সালাদে এর জুড়ি  নেই। আর আচার তো রয়েছে। ডিম অমলেটেও টমেটোর ব্যবহার স্বাদে আনে  বৈচিত্র্য। এসব ছাড়াও এই সবজি এখন আঙুরের মতো টপাটপ খাওয়া যাবে।  কেননা, নতুন উদ্ভাবিত এই সবজির একটি জাত যে আঙুরের মতোই। আর স্বাদ, তাও চেরির ফলের মতো। তাই খাবার টেবিলে এর পরিবেশনও করা যায় আঙুরের মতোই। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট টমেটোর এ জাতটি উদ্ভাবন করেছে। নাম দেওয়া হয়েছে, বিনা টমেটো-১০। তবে একে ‘চেরি টমেটো’-ই বলছেন গবেষকরা। ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, উচ্চফলনশীল চেরি টমেটোর গাছের উচ্চতা ১৪০-১৪৫ সে.মি.। আকারে আঙুরের মতো টমেটো প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা হয় ২৫০-৫০০টি। গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ৯০ টন। চারা লাগানোর পর ফল পাকতে ১১০-১১৫ দিন সময় লাগে। যেকোনো উঁচু বেলে, দোআঁশ ও এটেল দোআঁশ প্রকৃতির মাটিতে জাতটি ফলানো যায়। জমি  তৈরি ঃ টমেটোর ফলন অনেকাংশে জমি তৈরির উপর নির্ভর করে। তাই ৪-৫ বার জমি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝরঝরে করে নিতে হবে। বপনের সময় ঃ মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য অক্টোবর সময়ের মধ্যে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। বীজ বপনের পর থেকে চার সপ্তাহ বয়সী চারা মূল জমিতে লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত চারা লাগানো যায়। বীজ শোধন ঃ টমেটোর বীজ বপন করার সময় পিঁপড়ার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বীজ বপনের সঙ্গেই  সেভিন পাউডার বপনকৃত বীজের লাইনের সঙ্গে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। সার ও প্রয়োগ পদ্ধতি ঃ একর প্রতি ৫ টন গোবর, ১৬০ কেজি ইউরিয়া, ১৪০ কেজি টিএসপি ও ১২০ কেজি এমওপি প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের আগে জমি  শোধনের জন্য ফুরাডান পাউডার প্রয়োগ করা ভালো। ইউরিয়া সার ৩ ভাগ করে জমি প্রস্তুতের সময়, চারা লাগানোর ১৫ দিন ও ৩৫ দিন পর এবং এমওপি ২ ভাগ করে চারা লাগানোর ১৫ ও ৩৫ দিন পর মূল জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।  সেচ ও নিষ্কাশন  ঃ চারা মাটিতে পূর্ণরূপে স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন একবার পানি দিতে হবে।  আগাছা দমন এবং মালচিং ঃ আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার এবং মাটি নরম করে মালচিং করতে হবে। বালাই ব্যবস্থাপনা ঃ  ভাইরাসজনিত রোগের হাত থেকে রক্ষার জন্য ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি ¯েপ্র করতে হবে। এ ব্যবস্থা প্রথম ফল পাকার আগ পর্যন্ত চালু রাখতে হবে। পাতা পচা রোগ (লেইট ব্লাইট) থেকে গাছকে রক্ষার জন্য ফুল আসার ঠিক আগ থেকে ১৫ দিন অন্তর তিনবার ডাইথেন-এম৪৫ অথবা রিডোমিল এমজেড অনুমোদিত মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। টমেটোর গাছ ঢলে পড়া  রোগ (উইল্ট) থেকে রক্ষার জন্য ক্ষেতের মাটি যাতে স্যাঁতস্যাঁতে না থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ টেকসই, পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব পাট পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় পাট পণ্যের উৎপাদন কম। এ কারণে বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীর ডেমরায় স্থাপন করা হবে পাট পণ্য উৎপাদনের কারখানা। মসৃণ কাপড়সহ বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদিত হবে এই কারখানায়। দেশ-বিদেশে গৃহস্থালি ও দাফতরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী এসব পণ্য রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করে দারিদ্র্য কমানো এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সরকারকে সহায়তা করবে এই কারখানা। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কারখানা স্থাপনে ‘বহুমুখী পাট পণ্য উৎপাদন ফ্যাক্টরি স্থাপন, ডেমরা, ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। এটি বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ১৮৩ কোটি টাকা। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাব পাওয়ার পর ২০১৮ সালের ১ মার্চ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কিছু শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) আগামী সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক তন্তু হলো পাট। প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট বাংলাদেশে প্রচুর পাট উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। পাট মূলত বহুমুখী ও পুনর্ব্যবহারের উপযোগী, টেকসই, দূষণমুক্ত, পচনশীল, নিরাপদ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব তন্তু। এসব কারণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাজারে বহুমুখী পাট পণ্যের চাহিদা দিন দিন সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে পাটজাত পণ্য রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। এর আগে, ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় বিজেএমসিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২০১৬ সালের ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত বিজেএমসির অধীন জুট মিলে বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের জন্য পৃথক ইউনিট স্থাপন বিষয়ে আলোচনা সভায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি প্রণয়নের নির্দেশনা দেয়া হয়। মন্ত্রণালয় জানায়, উদ্যোগী মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত করিম জুট মিলের অব্যবহৃত জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে ২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নীতিগত অনুমোদন দেন। বর্তমানে প্রকল্পটিতে উৎপাদিত মসৃণ কাপড় দ্বারা বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও রফতানি করা হবে, পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি পাটপণ্য প্রস্তুতকারীরাও প্রকল্পে উৎপাদিত কাপড় দিয়ে বিভিন্ন নক্সার দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী পাটপণ্য তৈরি করতে পারবে। এসব পণ্য দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি করা যাবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আওতায় বছরে ১ হাজার ৮৯০ টন পাটের মসৃণ সুতা ও ১ হাজার ৮৫০ টন পাটের মসৃণ কাপড়সহ বছরে বিভিন্ন আকার ও নক্সার লাখ পিস পাটের ব্যাগ ও অন্যান্য বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য জুয়েনা আজিজ পরিকল্পনা কমিশনের মতামত দিতে গিয়ে বলেন, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ডেমরায় বিজেএমসির করিম জুট মিলের অব্যবহৃত জায়গায় বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, দারিদ্র্যবিমোচনসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মিলের খালি জায়গার সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাট খাতে কর্মরত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তরাও উপকৃত হবেন এবং এ খাতের প্রসার হবে।

পরিবেশ বান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিজমি কমলে নিঃসন্দেহে আমাদের ফসল উৎপাদন কম হবে। আমাদের সবসময় চিন্তা করতে হবে ফসলি জমি যাতে না কমে। কিন্তু বাড়িঘর, কলকারখানা তৈরির জন্য কিছু জমি নষ্ট হবেই। তারপরও আমরা পরিকল্পিত উপায়ে এটি এ হার কমাতে পারি। যেমন: সমন্বিত উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণ করে বসবাস করতে পারি। বাইরের দেশে অনেক আগে  থেকে এ ধারণাটি কাজে লাগানো হচ্ছে। বাংলাদেশে বছরে এক শতাংশ হারে কমছে কৃষিজমি। বিপরীতে প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ নতুন মুখ জনসংখ্যার সঙ্গে যোগ হচ্ছে। এটি চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে দরকার সমন্বিত কৃষি চাষ পদ্ধতির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রকল্প ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। আবার কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হলেও সেগুলো কতখানি পরিবেশবান্ধব, সেগুলোও বিবেচনায় আনতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিতে এ ধরনের চিন্তাভাবনা একদম করা হয় না বলে জানান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. এহসানুল কবীর। এই গবেষক বলেন, কৃষি জমি কমলে নিঃসন্দেহে আমাদের ফসল উৎপাদন কম হবে। আমাদের সবসময় চিন্তা করতে হবে ফসলি জমি যাতে না কমে। কিন্তু বাড়িঘর, কলকারখানা  তৈরির জন্য কিছু জমি নষ্ট হবেই। তারপরও আমরা পরিকল্পিত উপায়ে এটি এ হার কমাতে পারি। যেমন: সমন্বিত উদ্যোগে বহুতল ভবন নির্মাণ করে বসবাস করতে পারি। বাইরের দেশে অনেক আগে থেকে এ ধারণাটি কাজে লাগানো হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো কম আয়তনের দেশেও বর্তমানে বিষয়টি ভাবার সময় এসেছে। কৃষিতে এখন অনেক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে তবে তা পরিবেশের জন্যও কিছুটা হুমকি হয়ে পড়বে যদি সেগুলো ঠিকমত ব্যবহার করতে না পারি। অনেক সময় মেশিনের জন্য যে অ্যানার্জি/ফুয়েল ব্যবহার করা হয় যেমন ব্যাটারি, ডিজেল মাটির সঙ্গে মিশে মাটির ক্ষতি করে,  সেগুলো খেয়াল রাখতে হবে। কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কৃষকের পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে। আর এ দায়িত্ব তাদেরই বেশি ভূমিকা পালন করা দরকার, যারা এ প্রযুক্তিগুলো মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। দেখা যায়, কৃষকের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের যথাযথ জ্ঞান না থাকায়, একটি যন্ত্র একটানা বেশি সময় ব্যবহার করার কারণে যন্ত্রের কর্মদক্ষতা কমে যাচ্ছে। আবার একটি যন্ত্র কর্মদক্ষতা হারানোর পর ব্যবহার করা হলে সেটি তখন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো আমাদের ভাবতে হবে। কোনো প্রযুক্তি কিংবা যন্ত্রপাতি মাঠপর্যায়ে ছড়ানো আগে আমাদের অবশ্যই বাজার পর্যালোচনা করতে হবে। বাজারে অর্থাৎ কৃষকের কল্যাণে কাজে লাগবে এমন প্রযুক্তিই কেবল সম্প্রসারণ করতে হবে। নয়তো উল্টো সেটি আমাদের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাবে। অনেক সময় দেখা যায় মাটি পরীক্ষা না করেই কৃষক ফসল ফলাচ্ছেন। কিন্তু এটি কোনোভাবেই ঠিক না। কোন জমিতে  কোন ফসল উপযোগী সেটিও আমরা মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নিতে পারি। তখন সেই ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারি। অন্যদিকে জমিতে অধিক উৎপাদনের জন্য মাত্রারিক্ত সার ব্যবহার করায় মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে, একইসঙ্গে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। সার ব্যবহারের এ জ্ঞান না থাকার দরুণ প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ সারেরও অপচয় হচ্ছে বলেও জানান এই গবেষক। গবেষক আরো বলেন, একটা সময় আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে পরিমাণের ওপর জোর দিয়েছিলাম,  সেটি বলতে গেলে আমরা সফল হয়েছি। বতর্মানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূণর্তার দেশে পরিণত হয়েছে। এখন আমাদের খাদ্যমান অর্থাৎ নিরাপদ খাদ্যের দিকে অগ্রসর হতে হবে। ব্যবহার করতে হবে পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি।

লেখক ঃ আবুল বাশার মিরাজ, বিকৃবি।

 

 

মানসম্মত মধু উৎপাদনের পাশাপাশি পরাগায়ণের মাধ্যমে বাড়ছে সরিষার ফলন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ রবিশস্য খ্যাত রঙিন ফসল সরিষা। এখন ভর মৌসুম। গ্রামে গেলেই চোখে পড়বে সবুজ মাঠ জুড়ে হৃদয়কাড়া হলুদের অপরূপ  শোভা। সরিষা সবচেয়ে রঙিন ফসল। এই মৌসুমে গ্রামবাংলায় মনপ্রাণ ভরে ওঠে। সরিষার রঙিন হলুদ ফুল প্রকৃতির সবুজ মাঠকে রাঙিয়ে দেয় গায়ে হলুদের রঙে। শীতপ্রধান বাংলাদেশে সরিষার ব্যাপক ফলন হয়। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় মাঠের  পর মাঠ সরিষা ক্ষেতে সবুজ-হলুদ রঙের  খেলা। ক্ষেতের আঁকা-বাঁকা পথ ধরে এই হলুদ-সবুজের অবারিত প্রান্ত যেন শহরের নাগরিকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। গ্রামপ্রেমী মানুষ শীতকালে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে সরিষা ক্ষেতে গিয়ে ছবি তোলেন। যেদিকেই চোখ যাবে দেখা যাবে সবুজ মাঠে শুধুই হলুদ আর হলুদ। প্রকৃতির নির্মল বাতাসে  ভেসে আসে সরিষা ফুলের মাতাল করা ঘ্রাণ। এই সুবাদে কেমন যেন একটা মাদকতা আছে, যা দুর্নিবার কাছে টানে মৌমাছি ও প্রজাপতিদের। দেশে তেলবীজ হিসেবে সরিষা ব্যবহারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। এই ফসলটির আরো বিশেষত্ব হলো- সরিষা ক্ষেতে হলুদ রঙিন ফুলে ফুলে ছুটে আসে রঙিন প্রজাপতি। এরা যেন প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে আরো ঐশ্বর্যমন্ডিত করে  তোলে। সেই সঙ্গে এই মৌসুমে সরিষার জমির পাশে মৌমাছি চাষিরা সারি করে  মৌ-বক্স রাখে। তাদের উদ্দেশ্য মৌমাছির মাধ্যমে মধু আহরণ। পুরো শীত মৌসুম জুড়ে মৌচাষিরা যেসব এলাকায় সরিষা চাষ হয় সেখানে অবস্থান করেন। মৌচাষিদের বক্স থেকে বেরিয়ে মৌমাছিরা ফুলে ফুলে মধু আহরণে ব্যস্ত সময় কাটায়। দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে বের হয় হাজার হাজার মৌমাছি। প্রজাপতি, মৌমাছি, নানা প্রজাতির পোকামাকড় ছাড়াও সরিষা ক্ষেতের রঙিন ফুলের আকর্ষণে ছুটে আসে হলুদিয়া নীলরঙা পাখি। সবমিলিয়ে প্রকৃতির এক অপরূপ খেলা চলে এই রঙিন ফসল সরিষা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে। রঙ-বেরঙের প্রজাপতি আর মৌমাছি হলুদবরণ সরিষার জমিতে ভন ভন গুনগুন আওয়াজে প্রকৃতিকে মাতিয়ে তোলে। সরিষা ক্ষেতের কাছে গেলেই কানে  ভেসে আসবে এমন মাতালকরা মধুর সুর। প্রকৃতির রঙ-রূপ, প্রজাপতি আর  মৌমাছির ভন ভন সব মিলিয়ে সরিষার ক্ষেতগুলো যেন হলুদের সাম্রাজ্য। নিচু জমিতে সরিষার আবাদ তুলনামূলক ভালো হয়। তবে মাঝারি উঁচু জমিতেও সরিষা চাষ করা যায়। অনেক কৃষক জমি ফেলে রাখার চেয়ে উঁচু জমিতেও সরিষা চাষ করেন। সরিষা বীজ থেকে উৎপাদিত তেল রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। এ তেল চাটনিতেও ব্যবহৃত হয়। শিশুসহ সব বয়সী মানুষের শরীরে সরিষা তেল ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া এর কচি পাতা ও ডগা শাক হিসেবে অনেকেই খেয়ে থাকেন। আর সরিষাবাটা ইলিশ মাছের সঙ্গে রান্না দেশের কৃষ্টির অংশ। সরিষা উৎপাদনে ১১তম বাংলাদেশ : বিশ্ব সরিষা উৎপাদন ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান একাদশতম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫২ টন সরিষাবীজ উৎপাদন হয়। ২০১৬-১৭ সালে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৬০ টনে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে টরি, শ্বেত ও রাই তিন ধরনের সরিষা আবাদ হয়। এসব সরিষার বিশেষভাবে প্রচলিত জাতগুলো হচ্ছে টরি-৭, সোনালি, কল্যাণিয়া, দৌলত, বারি সরিষা-৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, রাই-৫ ইত্যাদি। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী মোট ৭  কোটি ২১ লাখ টন সরিষা উৎপাদনের কথা বলা হলেও গত মাসের সংশোধিত পূর্বাভাসে তা ৭ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার টনে নামিয়ে এনেছে ইউএসডিএ। ইনডেক্স মুন্ডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বৈশ্বিক সরিষা বীজ উৎপাদনে শীর্ষস্থানে রয়েছে কানাডা। সম্মিলিতভাবে পরের অবস্থানটি দখল করে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ-২৭) দেশগুলো। তৃতীয় স্থানে রয়েছে চীন। এ ছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভারত ও ইউক্রেন।

সরিষার ভেষজ ও পুষ্টিগুণ ঃ রোগের জীবাণু ধ্বংসকারী হিসেবে সরিষা  তেলের এ গুণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এখন একমত। জার্মানিভিত্তিক এক গবেষণায়ও উঠে আসে, অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে সরিষার তেল অত্যন্ত কার্যকর। ঔষধি গুণাগুণের জন্য সুপ্রাচীনকাল থেকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় বহুলভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে এ তেল। সরিষায় আছে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন-ই ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।  অ্যান্টিবায়োটিকের অতিব্যবহারজনিত কারণে সুপারবাগের সংক্রমণ যখন বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকদের দুশ্চিন্তার সবচেয়ে বড় কারণগুলো অন্যতম হয়ে উঠেছে, সেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প ভেষজ ওষুধ হিসেবে এর কার্যকারিতার বিষয়টি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। সরিষার তেলের উপাদান দেহে ফুসফুস ও অন্ত্রের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়ার (গাট ব্যাকটেরিয়া) কোনো ধরনের ক্ষতি না করেই কিডনির মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হয়। এ কারণে এ তেল বৃহদান্ত্রের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি ও হজমে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত। রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি ও হজমশক্তি বাড়ানোতেও এটি বেশ কার্যকর। কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করার মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় সরিষার তেল। এ ছাড়া শ্বাসকষ্টের প্রদাহ কমানো, খুসখুসে কাশি, ঠান্ডা লাগা, সর্দি ইত্যাদির চিকিৎসায় সরিষার তেলের ব্যবহার সুপ্রাচীন।

জনপ্রিয় হচ্ছে সরিষা ক্ষেতে মধু চাষ : একসময় মৌচাষিরা মৌমাছির মাধ্যমে মধু আহরণে সরিষার জমিতে মৌবক্স নিয়ে গেলে কৃষকরা বিরক্ত হতেন। বাধা দিতেন। এলাকা থেকে তাড়িয়েও দিতেন। কিন্তু কৃষকের সেই ভুল  ভেঙেছে। কারণ তারা দেখেছেন, সরিষার জমিতে মৌমাছির আগমন তাদের ফসলের জন্যই উপকারী। কৃষিবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী তারা এর সুফল  পেয়েছেন। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, সরিষাসহ তৈলবীজ ও শস্যদানার যেসব ফসলে ফুল ধরে সেখানে মৌমাছির পরাগায়ণের মাধ্যমে উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ বেড়ে যাবে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সরিষার ক্ষেতে লাখ লাখ মৌমাছি ফুলে ফুলে বসে সুষ্ঠু পরাগায়ণে সাহায্য করছে। এতে সরিষার ফলন ২৫ থেকে ৩০ ভাগ  বেড়ে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণের অসুবিধা দূর এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফসলের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরাগায়ণের জন্য  মৌচাষিদের অর্থ দিয়ে জমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের দেশে উল্টো জমির মালিককে টাকা দিয়ে জমি থেকে মধু আহরণ করতে হচ্ছে। এজন্য কৃষকদের সচেতন করতে জাতীয় উদ্যোগ দরকার বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন। গত দশ বছরে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রচারণার ফলে সরিষাসহ অন্যান্য ফসল  যেমন তিল, তিষি, ধনিয়ার জমিতে মৌচাষের ব্যাপারে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। দেখা গেছে, আগে যেসব কৃষক মৌচাষিদের বাধা দিতেন বা তাড়িয়ে দিতেন এখন তারাই মৌচাষিদের ডেকে নিয়ে তাদের অবস্থানের জন্য সবরকম ব্যবস্থাই আগ্রহের সাথে করছেন।

এ প্রসঙ্গে কৃষকবন্ধু খ্যাত কৃষিবিদ নিতাই চন্দ্র রায় বলেন, সরিষাসহ ফুল প্রধান রবিশস্য ফসলে মৌচাষের ফলে কৃষক এবং মৌচাষি উভয়েই লাভবান হচ্ছেন। আগে কৃষকদের মাঝে যে ভুল ধারণা ছিল তার অনেকটাই কেটে  গেছে। তবে একই সঙ্গে মধু আহরণ ও ফসলের উৎপাদন বাড়াতে আরো প্রচারণা প্রয়োজন আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি চাষ করে মধু আহরণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর ফলে মানসম্মত মধু উৎপাদনের পাশাপাশি পরাগায়ণের মাধ্যমে বাড়ছে সরিষার ফলন।

 

 

কৃষির উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ন্যানো প্রযুক্তি যেসব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গবেষণা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেগুলো হলো : উদ্ভিদপুষ্টি, শস্য সংরক্ষণ, রোগবিস্তার সংক্রান্ত বিষয় ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগ নির্ণয়, জীবপ্রযুক্তি, প্রাণী স্বাস্থ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পণ্য প্যাকেটজাতকরণ, পানি ব্যবহার দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি কার্যক্রম। ন্যানোকণা ব্যবহারে আরো যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা হলো : ১. কিছু ন্যানোকণার পেটেন্ট রয়েছে, যার জন্য অনুমতি ছাড়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২. কৃষিতে ন্যানোকণা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ আইন ও নীতির অপ্রতুলতা রয়েছে। ৩. উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ন্যানোকণার গবেষণায় সামর্থ্যের (মানবসম্পদ ও স্থাপনা) সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ৪. ন্যানো বিষাক্ততা- কিছু ন্যানোকণা জিন বিবর্তন (মিউটেশন) করতে সক্ষম, ডিএনএ ধ্বংস করে এবং ন্যানো নন-টার্গেটেড জীবের প্রতি বিষাক্ততা তৈরি করতে পারে। সেজন্য, কৃষিতে নতুন ন্যানোকণা সূচনার আগে এর যথাযথ নিরাপদ ব্যবহারের ওপর গবেষণার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রির) সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পার্টনারশিপ খুবই দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মৌলিক জ্ঞান সৃজনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে আবিষ্কৃত নতুন জ্ঞানের বাণিজ্যিকীকরণে রোডম্যাপ তৈরি আশু প্রয়োজন। জাতীয় অভীষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে জ্ঞান, দক্ষতা ও সামর্থ্যের সমন্বিত এবং সর্বোচ্চ ব্যবহারে কৃষির বতর্মান ও সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় ন্যানো প্রযুক্তির দক্ষ প্রয়োগে উৎপাদন ব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব। কৃষি উন্নয়ন তরান্বিত করতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। তা সত্ত্বেও ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা সমাধানের জন্য গবেষণা করা প্রয়োজন। যেমন : অধিকাংশ ন্যানোকণার বাণিজ্যিক উৎপাদন কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল কৃষিতে ন্যানোকণা বাণিজ্যিকীকরণের আগে এর সম্ভাব্য ক্ষতিকারক দিকগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের লক্ষ্যে জরুরিভিত্তিক কিছু কর্মসূচি গ্রহণ প্রয়োজন। এগুলো হলো : ১. জীবপ্রযুক্তির মতো দেশে ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক একটি টাস্কফোর্স গঠন করা। ২. দেশে ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করা। এটা জাতীয়ভাবে ন্যানো প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি গবেষণায় অবদান রাখতে সক্ষম বিজ্ঞানীদের সামর্থ্য জানা যাবে। ৩. ন্যানো প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ভৌত সুবিধাদি প্রতিষ্ঠাকরণ। এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার ন্যানো প্রযুুক্তিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সফলতার অভিজ্ঞতার অনুসরণ করা যেতে পারে। ৪. কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রমে ন্যানো প্রযুক্তিরবিষয়ক কোর্স ও বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্তকরণ। ৫. তরুণ গবেষকদের ন্যানো প্রযুক্তিরবিষয়ক প্রশিক্ষণের আয়োজন। ৬. জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীদের নিয়ে ইন্টারডিসিপ্লিনারি গবেষক দল গঠন করে টাগের্ট ওরিয়েন্টেড গবেষণার জন্য গবেষণা বরাদ্দ প্রদান। ৭. সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে গবেষণার ফলগুলো দ্রুত ব্যবহার উপযোগী শিল্প উপাদানে রূপান্তরে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ৮. ন্যানো প্রযুক্তিবিষয়ক একটি জাতীয় পেশাজীবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা। নতুন ন্যানোকণা যেমন : ন্যানো সার, ন্যানো বালাইনাশক, ন্যানোবাহক, ন্যানো সেন্সর, ন্যানো মোড়কীকরণ এবং ন্যানোচিপ শস্যের স্মার্ট পুষ্টি, বৃদ্ধির উন্নয়ন এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। ন্যানো প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিতভাবে নিখুঁত ও স্মার্ট কৃষির প্রসার ঘটিয়ে ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং শস্য সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমাবে। তাই ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তন করতে নতুন ন্যানোকণা উদ্ভাবন, কৃষি ক্ষেত্রে তাদের নিরাপদ ব্যবহারের জন্য চাহিদামাফিক রূপকল্পনির্ভর আন্তঃবিভাগীয় কোলাবোরেটিভ গবেষণা জোরদার করার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ন্যানো প্রযুক্তি একটি কার্যকর ও সম্ভাবনাময় কৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ন্যানোকণার ব্যবহার নাটকীয়ভাবে উদ্ভিদ পুষ্টি উন্নয়ন, সার ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, ফসলে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগ নির্ণয়, বালাই দমন, খাদ্য মোড়কীকরণ, অজৈব অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, নতুন ন্যানোকণা কার্যকরভাবে শস্য সংরক্ষণের জন্য বালাইনাশকের কার্যকারিতা এবং নিরাপদ ব্যবহারে উন্নয়ন ঘটাতে পারে। অনুরূপভাবে, ন্যানোসার রিলিজ বা ধীরে ধীরে উদ্ভিদের গ্রহণ উপযোগী হওয়া ও ধীর অবক্ষয়ের মাধ্যমে কার্যকরভাবে সার ব্যবহারের দক্ষতার প্রভূত উন্নয়ন করতে পারে। ন্যানোকণার ব্যবহার অথবা ন্যানো বাহকের ভেতরে সারের উপাদান ব্যবহার শস্যের বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। টেকসই উদ্ভিদ পুষ্টি এবং ফসল উৎপাদনের জন্য ন্যানো উপাদানের দক্ষতা আজ প্রমাণিত। সম্প্রতি, ব্যাকটেরিয়াল ও ছত্রাকজনিত সংক্রামক রোগ দমনে জীবাণু প্রতিরোধী দিনের আলোতে রিচার্জেবল ন্যানোতন্তু ঝিল্লিগুলো আলোতে কার্যকর রাসায়নিক যৌগগুলো একত্র করে তৈরি করা হয়েছে। এসব ন্যানোপদার্থ দিনের আলোতে দক্ষতার সঙ্গে ক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি উৎপন্ন করে রোগজীবাণুকে প্রতিরোধ করতে পারে। জীবাণু প্রতিরোধী ন্যানো সূর্যালোকে চার্জেবল ন্যানো উপাদান তৈরির এ চমকপ্রদ কৌশল টেকসই কৃষিব্যবস্থায় বালাই দমনে কাযর্করভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। ন্যানো প্রযুক্তির ডিভাইস ও যন্ত্রপাতি যেমন ন্যানো ক্যাপসুল, ন্যানোকণা, ন্যানো রোবট, এমনকি ভাইরাস ন্যানো ক্যাপসিড সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায়, উদ্ভিদ পুষ্টি গ্রহণ ত্বরান্বিতকরণ, সুনির্দিষ্ট স্থানে কার্যকর উপাদান ডেলিভারি এবং পানি শোধন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব। উদ্ভিদ প্রজনন এবং জেনোমিক রূপান্তরেও ন্যানোকণার ব্যবহার হয়ে থাকে। বতর্মান সরকার আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবান্ধব। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারে অন্তর্ভুক্তি জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮ যে যথেষ্ট ভবিষ্যৎমুখী, তা প্রমাণ করে। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে ন্যানো প্রযুক্তি কৃষকের মাঠপর্যায়ে এখনো তেমন একটা শুরু হয়নি। কিন্তু শিগগির কৃষিতে নানারকম ন্যানো প্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হবে, তা আশা করা যায়। বাংলাদেশে কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ হচ্ছে রোগ নির্ণয়, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ন্যানোপেস্টিসাইড, ন্যানোফার্টিলাইজার, ন্যানোহার্বিসাইড, অগ্রাধিকারভিত্তিক ফুড প্যাকেজিং, ওষুধ ডেলিভারি, মৃত্তিকা দূষণ নির্ণয় ও দূরীকরণ, ফসল উন্নয়ন (জাত), উদ্ভিদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সহনশীলতা বৃদ্ধি, ন্যানোসেন্সর, সেচের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ এবং নিখুঁত (প্রিসিশন) কৃষি। কৃষিতে ন্যানো প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনাময়, তবে বাংলাদেশের কৃষি বিদ্যালয়গুলো ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় ন্যানো প্রযুক্তি খুব একটা অন্তর্ভুক্ত নয়। ন্যানো প্রযুক্তি আন্তঃবিভাগীয় (ইন্টারডিসিপ্লিনারি) এবং সফল ন্যানো প্রযুক্তি উদ্ভাবনে রসায়নবিদ, পদার্থবিদ, বস্তু বিজ্ঞানী, কৃষি বিজ্ঞানী এবং জীববিজ্ঞানীদের যৌথ ও সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। অন্যথায় এটি শুধু কাগুজে নীতি হিসেবে থেকে যাবে। এদেশে ইতোমধ্যে কৃষিতে ন্যানোটেকবিষয়ক কিছু গবেষণায় সাফল্যের নজির রয়েছে। সম্প্রতি বুয়েট ও বশেমুরকৃবির যৌথ গবেষণায় ন্যানো প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বহুলভাবে ব্যবহৃত সেলুলোজ দ্বারা তৈরি কাগজে জীবাণুরোধী গুণাবলি আরোপ করার কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ উদ্ভাবন আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির বিখ্যাত জার্নাল ‘এসিএস সাসটেইনেবল কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ প্রকাশিত হয়েছে। জীবাণুরোধী সিলভার ন্যানোকণা কাগজের ওপর সংযোজনের জন্য বিজ্ঞানীরা সামুদ্রিক শামুক ও ঝিনুকের মধ্যে বিদ্যমান পলিডোপামিন নামক বিশেষ প্রাকৃতিক যৌগের বৈশিষ্ট্য ধার করে। পলিডোপামিনের উপস্থিতির কারণে সমুদ্রের প্রবল ঢেউ উপেক্ষা করেও পাথর ও সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে শামুক ও ঝিনুক নিজেদের শক্তভাবে আটকে রাখতে পারে। উদ্ভাবিত ন্যানোসিলভার কণা সংযোজিত কাগজ তাই কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ নানারকম ব্যাকটেরিয়া ও ক্ষতিকারক ছত্রাক দমনে খুবই কার্যকর হতে পারে।
লেখক ঃ ড. তোফাজ্জল ইসলাম, অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বর্ণপদক বিজয়ী কৃষি বিজ্ঞানী

কুষ্টিয়ার মামুনের মধু যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায়

জহুরুল ইসলাম ॥ এবার সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে কুষ্টিয়ায় উৎপাদিত মধু। এ ব্যতিক্রম উদ্যোগ কুষ্টিয়ার মিরপুরের মৌচাষী মামুন। তিনি সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি পালনের মাধ্যমে মধু উৎপাদন করে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। এখন স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি সেই মধু অষ্ট্রেলিয়াতে রফতানি শুরু করেছেন তিনি। বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলেছে এলাকায়। মামুনের দেখাদেখি অনেকইে এখন মৌচাষে উদ্যোগি হচ্ছেন। মামুনের মৌচাষের চাষের শুরু ১৯৯৭ সালে। তার ভাষ্য, ‘৯৭ সালে মাস্টার্স পাস করার পর চাকরীর পিছনে না ছুটে নিজে কিছু করার কথা ভাবছিলাম। তখন মৌমাছি পালন করে মধু উৎপাদনের কথা মাথায আসে। ২৬০০ টাকা দিয়ে দুটি বাক্স কিনে ওই বছরই শুরু করি মৌমাছি পালন।’ সেই থেকে মামুন সরিষা, কালজিরা, লিচু, কুলসহ বিভিন্ন ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করে আসছেন। ধীরে ধীরে মামুনের মৌ চাসের পরিধি বেড়েছে। আগে তিনি উৎপাদিত মধু স্থানীয়ভাবেই বিক্রি করে আসছিলেন। পরে ফেসবুকে পরিচয় হয় অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি এক বাংলাদেশি যুবকের সাথে। তার সহায়তায় মামুন গেল বছর থেকে মধু প্রক্রিয়াজাত করে অষ্ট্রেলিয়াতে রফতানি শুরু করছেন। চলতি সরিষা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন স্থানে মৌমাছির ৩০০টি বাক্স বসিয়েছেন মামুন। এর থেকে তিনি প্রায় ৮০ টন মধু আহরণের আশা করছেন। এর বড় একটি অংশ অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হবে। এই মৌচাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন এক সমযের বেকার যুবক মামুন। মামুন জানান, অন্য ফুলের মধু শীতকালে জমে না গেলেও সরিষা ফুলের মধু জমে যায়। এ কারণে মানুষের মধ্যে সরিষা ফুলের মধু নিয়ে কিছুটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে এই ধারণা দূর করা গেলে সরিষা ফুলের মধু আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এ ব্যাপারে তিনি কৃষি বিভাগের সহযোগিতা কামনা করেন।

মামুনের মৌ খামারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা সুস্বাদু মধু। এই কাজে মামুনের সহযোগী হিসেবে বেশ কয়েকজনের কর্মসংস্থানও হয়েছে। মামুনের খামারে উৎপাদিত মধুতে কোন ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মেশানো হয়না। ক্রেতাদের সামনেই মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। তাই এলাকার মানুষ মাত্র ৩শ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকায় এক কেজি খাঁটি মধু পেয়ে এলাকাবাসী বেজায় খুশি।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার জানান, এবছর কুষ্টিয়ায় ৬ হাজার ৮শ’ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৪শ’ হেক্টর জমিতে মৌমাছির বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিপুল পরিমান মধু উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে সরিষা ক্ষেতে বিপুল পরিমান মৌমাছির বিচরণের ফলে সুষম পরাগায়ন হচ্ছে। এতে সরিষার ফলন বৃদ্ধি, কৃষকদের আয় বৃদ্ধিসহ কর্মসংস্থানের জন্য মৌ চাষে সহযোগীতা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আরো বড় পরিসরে মৌ চাষের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ করলে দেশের চাহিদা পুরণ করে বিপুল পরিমান মধু বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

 

 

অধিকমাত্রায় তামাক চাষ

কুষ্টিয়ায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা

শরীফুল ইসলাম ॥ কুষ্টিয়ায় অধিকমাত্রায় তামাক চাষের কারনে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খরচ বেশী হওয়ায় চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় বোরো ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে তামাক চাষেই ঝুকেছে বেশী কৃষক। উৎপাদন খরচ বেশী ও ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের বিস্তর অভিযোগ থাকলেও ক্ষতিকর তামাক চাষ নিয়ে কোন অভিযোগ না থাকায় অব্যাহত তামাক চাষ বৃদ্ধি এবছর তা মাত্রা ছাড়িয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে বোরো ধান চাষ ব্যাহত হতে পারে। তবে কৃষি বিভাগ বলছেন তামাক চাষের কারনে বোরো আবাদের ওপর কোন প্রভাব পড়বে না।  কৃষি বিভাগের তথ্যমতে চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় ৩২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হলেও এ পর্যন্ত কৃষকরা বোরো ধান বপন করেছেন ১০ হাজার হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের কম। বিপরীতে তামাক অধ্যুষিত কুষ্টিয়ার বিস্তির্ণ মাঠ জুড়ে ক্ষতিকর তামাক চাষ হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টরেরও বেশী জমিতে। এরমধ্যে দৌলতপুর উপজেলাতেই প্রায় অর্ধেক। বোরো ধান চাষে বিঘা প্রতি ৫ হাজার টাকার বেশী খরচ হলেও উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে চাষীদের লাভ হয় কম। আবার ধানের দাম কম হওয়ায় লাভের পরিবর্তে অনেক সময় তাদের লোকসানও গুনতে হয়। তাই তারা লাভজনক অর্থকরী ফসল ক্ষতিকর তামাক চাষেই ঝুকছে বেশী। কৃষকদের দাবি ঝুঁকিমুক্ত তামাক চাষে লাভ বেশী। জামাল হোসেন নামে বড়গাংদিয়া এলাকার এক কৃষক অভিযোগ করেন, ধান চাষ করে লাভের পরিবর্তে অনেক সময় লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু তামাক চাষে কখনও লোকসান হয় না। নগদ টাকা বিক্রি হওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়। তবে তামাক চাষের কারনে বেরো ধান চাষে কোন প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন, কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভূতি ভুষন সরকার। সরকারী প্রনোদনা বেশী দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পেলে এ অঞ্চলের কৃষকরা বোরো ধান চাষে আরো বেশী আগ্রহী হয়ে উঠবে। সেক্ষেত্রে তামাক চাষ অধ্যুষিত কুষ্টিয়ায় তামাক চাষ হ্রাস পাবে। আর এমনটাই মনে করেন এ অঞ্চলের সচেতন মহল।

ফসল বিধ্বংসী ফল আর্মি ওয়্যার্ম পোকা সনাক্ত হয়েছে মেহেরপুরে

নুহু বাঙালী ॥ এই প্রথম ভুট্টাসহ অন্যান্য ফসল বিধ্বংসী ফল আর্মি ওর্য়্যাম পোকার আক্রমন সনাক্ত হয়েছে মেহেরপুরে। কীটনাশক প্রয়োগ করেও মিলছে না সুফল। বিশেষ করে ভুট্টা ক্ষেতে এর আক্রমন বেশি হয়ে থাকে। ধারনা করা হচ্ছে এটি পাশ^বর্তী দেশ ভারত থেকে এসেছে। ভুট্টাসহ ৮০টি ফসলের ক্ষতি করতে পারে আর্মি ওয়্যার্ম। দ্রুত প্রতিরোধ করা না গেলে ক্ষতির মুখে পড়বে অন্যান্য ফসলও বলছে কৃষি বিভাগ। গাংনী উপজেলার সীমান্ত ঘেষা তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক স্বপন আলীর ভুট্টা ক্ষেতে দেখা মিলেছে ভয়ানক পোকা ফল আর্মি ওয়্যার্ম। কোন ক্ষেতে আক্রমন শুরু হলে কয়েক দিনেই তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো ক্ষেতে। গাছের পাতা থেকে শুরু করে কান্ড পর্যন্ত খেয়ে ফেলছে। যেসব গাছে ইতোমধ্যে আক্রমন করেছে সেই গাছগুলোতে আর ভুট্টা হবে না। এর ফলে লোকসানে পড়বে কৃষক। ফল আর্মি ওয়্যার্র্মের বৈশিষ্ট্য হলো এর মুখের দিকটা ইংরেজী ওআই আকৃতির এবং পিছনের দিকে চারটি কালো ফোটা আছে। যা অন্যান্য ল্যাদা পোকার চেয়ে আলাদা। একটি পরিনত বয়সের আর্মি ওয়্যার্ম অসংখ্য বাচ্চা দিতে পারে। দিনের বেলায় পোকাগুলো গাছের কান্ডের মধ্যে ও মাটিতে অবস্থান করলেও সন্ধ্যার পর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি গাছে। ক্ষেতে পোকার আক্রমন দেখে কীটনাশক দিয়েও কাজ হয়নি, এখন স্বর্না দিয়ে খুঁজে বের করে মেরে ফেলছে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক। দমন করা না গেলে মারত্মক ক্ষতির কারন হয়ে দাড়াবে এই পোকা। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে এই পোকাটি আমেরিকা ও কানাডায় অনেক আগেই সনাক্ত হয়েছে। কীটনাশক দিয়ে দমন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে এটি ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে তাও মেহেরপুরে এটিই প্রথম। এই পোকা দিনে অন্তত ১০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারে। এবং দ্রুত বংশ বিস্তার করতে পারে। জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের হিসেবে ভুট্টা চাষ লাভজনক হওয়ায় জেলায় এবারে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার চাষ হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে বেশি। কৃষক স্বপন আলী জানান, দিন দশেক আগে আমার ভুট্টা ক্ষেতে পোকার আক্রমন চোখে পড়ে। এই পোকা আগে কখনও দেখিনি। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে জানতে পারি এটি ফল আর্মি ওয়ার্ম পোকা। এই পোকা দমনে কয়েক দফা কীটনাশক ছিটিয়েও কোন কাজ হয়নি। ফসল বাচাঁতে সুচ ও স্বর্ণা দিয়ে খুজে বের করে মেরে ফেলছি। এছাড়া আর কোন উপায়ও দেখছি না। কারন চোখের সামনের পুরো ক্ষেতে হষ্ট হয়ে যাবে। মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় পাশ^বর্তী দেশ ভারত থেকে এটি আমাদের দেশে প্রবেশ করতে পারে। বিধ্বংসী এই পোকাটি ফসলের শতভাগ ক্ষতি করতে পারে। তবে আতংকিত না হয়ে পোকার আক্রমন যদি সানাক্ত করা যায় তাহলে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। এই পোকা কীটনাশক দিয়ে দমন করা বেশ কষ্টকর। দেখা মাত্রই হাত দিয়ে মেরে ফেলতে হবে না হলে দ্রুত ব্বংস বিস্তার করে। অথবা জমিতে প্লাবন সেচ দিতে হবে। যেহেতু এই পোকা মাটির নিচে থাকে তাহলে কিছূটা নির্মূল করা সম্ভব, না হলে ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তবে কৃষি বিভাগ বিষয়টি নিয়ে বেশ তৎপর রয়েছে পোকাটি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য কাজ করছে এছাড়াও এই পোকা দমনে কৃষকদের মাঝে ফেরোমন ফাঁদ সরবরাহ করা হচ্ছে।

মাটির স্বাস্থ্য ও অধিক ফসল উৎপাদনে ন্যানো ফার্টিলাইজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিশ্বের সর্বাধুনিক ন্যানো টেকনোলজির সাহায্যে দেশের বিজ্ঞানীরা ‘ন্যানো ফার্টিলাইজার’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার  ক্ষেত্রে এটিকে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (বিসিএসআইআর) বিজ্ঞানীরা ‘ন্যানো ফার্টিলাইজার’ তৈরির পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনে যাওয়ার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে এর গবেষণা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ন্যানো টেকনোলজি বিশ্বের অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র প্রযুক্তি যা সহজেই ফসলের মূলে প্রবেশ করে তার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে। এর ব্যবহারে তৈরি সার ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট সার। আগের দিনে মানুষ বাড়িতে যে সব আবর্জনা থাকত, সেগুলোকে এক জায়গায় জমা করত। গরুর  গোয়াল থেকে যেসব গোবর বা গৃহপালিত পশুপাখির বিষ্ঠা আসত,  সেগুলোকে পচিয়ে জমিতে দিত, তারপর ভালো ফসল হতো। ষাটের দশকের পর সার যখন বাজারে ইউরিয়া, নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশ আসে, তখন সার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফসল উৎপাদন বাড়া শুরু হলো। ন্যানো পার্টিকেলের আকার অণুর চেয়ে সামান্য বড়। এটি ন্যানোমিটার দিয়ে পরিমাপ করা হয়। ১ ন্যানোমিটার সমান টেন টু দি পাওয়ার মাইনাস ৯ মিটার বা ১ বিলিয়ন অফ এ মিটার। বস্তুকে ভেঙে যখন অতটা ক্ষুদ্রতর পর্যায়ে নেওয়া হয়, তখন তার কার্যক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যায়, অনেকটা পারমাণবিক শক্তির মতো। বিসিএসআইআরের কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে ন্যানো ফার্টিলাইজার তৈরির বিষয়ে গবেষণায় অনেক দূর এগিয়েছেন। আসুন, জানা যাক ন্যানো ফার্টিলাইজার কীভাবে কাজ করে? এটা এমন একটি সার যেখানে ফসলের প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদানকে অনেক কম মাত্রায়, একসঙ্গে মিশিয়ে উপাদানগুলোকে কম্প্যাক্ট করে পলিমারাইজড করা হয়। ফলে স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। ফসলের গাছ দ্রুত এটা নিতে পারছে। এতে লাভ হচ্ছে একবার সার ব্যবহার করে দুই ফসল ফলানো যাচ্ছে। কেননা আমাদের দেশে এক বছরে প্রায় দুই বা তিনটি ফসল হয়। এখন ফসলের জন্য একাধিকবার সার দিতে হয়, এতে আনুপাতিক হারে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। আবার এমোনিয়া আকাশে উড়ে বায়ুমন্ডল দূষিত হচ্ছে। কৃষককে কিন্তু এগুলো কিনতে হচ্ছে। ভর্তুকি থাক আর যা-ই থাক, তারপরও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাহলে উপায় কী? উপায় হচ্ছে এই ন্যানো ফার্টিলাইজার। ন্যানো ফার্টিলাইজারের মাধ্যমে কম্প্যাক্ট নাইট্রোজেন, ফসফেট, পটাশ কিংবা অন্যান্য খাদ্য উপাদান পলিমারাইজড করে, গাছের  গোড়ায় দিলে একবার ব্যবহার করে কমপক্ষে দুটি ফসল ফলানো সম্ভব। এটা আট মাস পর্যন্ত রাখা যায়। তাহলে ফার্টিলাইজারে কিন্তু নতুন টেকনোলজি আসছে। এটা একটা বিষয়। দ্বিতীয়টি হলো অ্যাপ্লিকেশনের দিক দিয়ে  বৈচিত্র্য আসছে। আমাদের দেশের কৃষক নাইট্রোজেন ফসফেট কিনে নিয়ে যায় বস্তা ধরে। তিনটি বস্তা নিয়ে ক্ষেতের পাশে একটা চট বিছিয়ে নিল। তার ওপর ঢেলে দিল। তারপর হাত দিয়ে মেশানো শুরু করল। এখন একটি ফসফেটের দানা একটি ইউরিয়ার দানার চেয়ে অনেক বড়। আবার একটি ইউরিয়ার দানা ফসফেটের দানার চেয়ে অনেক ছোট। আর পটাশিয়ামের দানা ক্রিস্টাল। তিনটিকে মেশানো হলো। ছড়ানোর সময় কী হলো, বড় দানাটি আগে হাতে আসবে। তাহলে যে এলাকায় বড় দানাটি পড়ল, সেখানে ফসফেট বেশি পড়ল। তারপর আরেক পাশে ইউরিয়া বেশি পড়ল। পরের পাশে পটাশিয়াম বেশি পড়ল। একই ক্ষেতের মধ্যে, অর্থাৎ একজন কৃষকের  ক্ষেত যদি বিশ শতকের হয়, তার মধ্যে যদি তিন ভাগের এক ভাগে ফসফেট  বেশি পড়ে, তারপর তিন ভাগের আরেক ভাগে ইউরিয়া বেশি পড়ে এবং তিন ভাগের অপর ভাগে পটাশিয়াম বেশি পড়ে, তাহলে কী হবে? ফলনের তারতম্য হবে। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, চা বাগানের গাছগুলো আলাদা আলাদা থাকে। গাছের গোড়ায় যদি ৫০ গ্রামের গ্রানয়েল (ন্যানো ফার্টিলাইজার) দিয়ে দেওয়া হয়, সেটা চায়ের যে লাইফ সাইকেল আছে অর্থাৎ উৎপাদনের সময়টা সাত আট মাস, এই পুরো সময়টা চা উৎপাদন করা যাবে। চা বাগানে সার ছড়িয়ে দিলে বৃষ্টি হলে পানিতে গড়িয়ে নিচে চলে যায়। অনেক সময় লিচিং হয় না, মাটিতে মেশে না। সে ক্ষেত্রে গাছের  গোড়ায় ফার্টিলাইজারটা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। এই ন্যানো ফার্টিলাইজার চা বাগানে অনেক বেশি দিতে হবে না, বেশিবারও দিতে হবে না। ফলনও ভালো পাওয়া যাবে। এতে একদিনে একজন শ্রমিক এক একর জমিতে সার ছিটাতে  যে পরিমাণ খরচ হয়, তার অনেক কম খরচ হবে, বাড়তি লেবার লাগবে না,  তেমনি বাড়তি সারও লাগবে না।

লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আবদুল, লিয়াজো অফিসার, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আগামীকাল ২ ফেব্র“য়ারি জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। এবারে এই দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সুস্থ্য সবল জাতি চাই, পুষ্টিসম্মত নিরাপদ খাদ্যের বিকল্প নাই’। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু পুষ্টি নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। পুষ্টিকর খাবারের জোগোনের মাধ্যমে আমরা এটি অর্জন করতে পারি। এ জন্য খাদ্যশস্য আর প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে আমাদের আরো মনোযোগী হতে হবে। পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমরা স্বাস্থ্যবান জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব। এ জন্য প্রথমেই আমরা কি খাচ্ছি এবং সেটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু দরকারি, সে খাবার থেকে কতটুকু পুষ্টি অথবা শক্তি পাব সেটি ভাবতে হবে। কারণ খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিÑ এই তিনটি শব্দ একটি আরেকটির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মনের জন্য প্রতিদিন পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে হলে একজন ব্যক্তির জন্য সুষম খাদ্য নিবার্চন, খাদ্যের সহজলভ্যতা ও পুষ্টিমূল্য বজায় রেখে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির ওপরও পুষ্টি অনেকটাই নির্ভর করে। খাদ্যের কয়েকটি উপাদান যেমন- শর্করা, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করাই হলো সুষম খাবার। শর্করা শরীরে শক্তি ও কার্যক্ষমতা জোগায়। চাল, গম, যব, আলু, মিষ্টি আলু, কচু, চিনি, মধু, গুড় ইত্যাদিতে প্রচুর শর্করা পাওয়া যায়। প্রতিগ্রাম শর্করা থেকে ৪ কিলো-ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। প্রোটিন হলো দেহ গঠন ও ক্ষয় পূরণকারী খাদ্য। মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন ডাল, বরবটি, শিম, মটরশুঁটি ইত্যাদি দেহ গঠনে সহায়তা করে। প্রতিগ্রাম প্রোটিন থেকে ৪ কিলো-ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। চর্বি বা ফ্যাট দেহের কর্মদক্ষতা বজায় রাখে এবং ত্বক সুন্দর ও মসৃণ রাখে। সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, তিলের তেল, ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাছ, মাংস, ডিম ও কলিজা ইত্যাদি চর্বিযুক্ত খাদ্য। প্রতি গ্রাম চর্বি থেকে ৯ কিলো-ক্যালোরি শক্তি পাওয়া যায়। পানি শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। দিনে কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা দরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন ফলের রস, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা দরকার। আঁশ দেহের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, অন্ত্রনালির সুস্থতা বজায় রাখে। খাদ্যের আঁশ উদ্ভিজ খাদ্য থেকে পাওয়া যায়। যেমন-লালা আটা, যব, ভুট্টা, যবের ছাতু, শিম, শিমের বিচি, ডাল ও ডালজাত খাদ্য, খোসাসহ ফল যেমন-কালোজাম, আঙুর, পেয়ারা, আপেল, নাশপাতি ও সব ধরনের শাক-সবজি। খনিজ লবণ যেমন-ফসফরাস, লৌহ, আয়োডিন, জিংক যা দেহ গঠন, ক্ষয় পূরণ, পরিপোষণ, দেহের শরীরবৃত্তীয় কাজ করে। আয়োাডিন গলগন্ড রোগ প্রতিরোধ করে। লৌহ রক্তস্বল্পতা দূর করে; হাত ও দাঁতের গঠন মজবুত করে। জিংক মানসিক বৃদ্ধি ও হাড়ের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, সি-সব রকমের সবুজ ও রঙিন শাক-সবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, ডিম, দুধ, কলিজা, ছোট মাছ,লেবু চা ইত্যাদি খাদ্যে ভরপুর এবং রোগ প্রতিরোধকারী খাদ্য। ভিটামিন ‘এ’ রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘ডি’ রিকেট রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘বি’ কমপ্লেক্স ত্বকের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে। ভিটামিন ‘সি’ স্কার্ভি রোগ প্রতিরোধ করে। আজকের শিশু আগামী দিনের নাগরিক। শিশুর জন্য জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের দুধই যথেষ্ট এবং ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার দিতে হবে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে খাদ্য পরিবেশন করা হয়। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। শিশু মৃত্যুর কারণ হিসেবে পেটের অসুখ, হাম, নিউমোনিয়া ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর মধ্যে দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি না ঘটার কারণে আত্মকেন্দ্রিকতা, অবসাদ, ব্যক্তিত্বহীনতা দেখা যায় এবং মেধাশক্তি বিকশিত হতে পারে না। ফলে এসব ছেলেমেয়ে অলস ও উদাসীন, পরনিভর্র নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠে। সঠিক রান্নার পদ্ধতি, নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সবই স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে প্রভাবিত করে। মারাত্মক পুষ্টিহীন শিশুদের শুধু ডাল, আলু, সবুজ তেল দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি খাইয়ে অতি অল্পসময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো সম্ভব। শিশুর পুষ্টির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ন্ত ও কৈশোর বয়সের ছেলে-মেয়েদের পুষ্টির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন চূড়ান্ত। তাই পুষ্টির চাহিদাও এ সময়ের পরিবর্তনের ওপর নিভর্রশীল। এ বয়সে মেয়েদের অপুষ্টি বেশি দেখা যায়। কিশোর-কিশোরীদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে হয়। পরিমিত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, বিশুদ্ধ পানি, নিয়মিত শারীরিক শ্রম, বিশ্রাম, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়ের ওপরও নজর দিতে হবে। মায়ের পুষ্টি শিশুর তুষ্টি। অর্থাৎ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবতী মা-ই কেবলমাত্র স্বাস্থ্যবান সন্তানের জন্ম দিতে পারে। পুষ্টিহীন মায়ের সন্তানের জন্মকালীন ওজন কম এবং অসুস্থ, হাবাগোবা, রুগ্ন হয়ে জন্মায়। পরে নানা রোগে ভোগে। প্রসূতি মায়েদেরও নানা রকম জটিলতা দেখা যায়। গভর্বতী ও স্তন্যদাত্রী অবস্থায় মায়েদের খাবারের প্রয়োজন সাধারণ অবস্থার চেয়ে বেশি থাকে। এ সময় প্রয়োজন অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন, জিংকসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। অনেক সময় পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে পুষ্টির অভাবে নিজের চাহিদার ঘাটতির সঙ্গে সন্তানও পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের ঘাটতি নিয়ে জন্মায়। মাকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, বিভিন্ন রঙিন শাকসবজি, ফল, টকজাতীয় ফল, পানি ও পানিজাতীয় খাবার প্রয়োজন অনুযায়ী খেতে হবে। তা ছাড়া এ সময় চিন্তামুক্ত ও আনন্দভাব নিয়ে থাকতে হবে। অনেক সময় কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা মায়ের অপুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বৃদ্ধ বয়সেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পুষ্টির চাহিদা রয়েছে। বয়স বাড়লে খাবারের চাহিদা, হৃৎপিন্ডের কাযর্ক্ষমতা, পরিপাকতন্ত্রের কাযর্ক্ষমতা, চেনতন্ত্রের কাযর্ক্ষমতা কমে যায়। রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। দাঁত-হাড়ের সমস্যা ও বাত-ব্যাধি দেখা দেয়। এ বয়সে সাদা আটা, চাল, চিনি ময়দা ইত্যাদি খাবার কম খেতে হবে। তেল, চর্বি, লবণ, মিষ্টি ক্যাফেন সমৃদ্ধ খাবারও কম খেতে হবে। এ সময়ে পানি ও পানিজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। হজমে সহায়ক, কোষ্ঠকাঠিন্যরোধক, বাত ও ওজন নিয়ন্ত্রক খাবার খেতে হবে। লাল আটা, বিভিন্ন আঁশজাতীয় শাক-সবজি, ফল, চর্বিহীন মাছ-মাংস ইত্যাদি খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনে নিয়মিত হাঁটতে হবে। না হলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, বাত, চোখের রোগ ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। বয়স চল্লিশের পর থেকে ডিমের কুসুম, ঘি, মাখন, অতিরিক্ত চবির্যুক্ত মাছ, মাংস, শকর্রাজাতীয় খাওয়া কমাতে হবে। বৃদ্ধবয়সে ক্যালসিয়াম ও লৌহের অভাব বেশি দেখা যায়। সর তুলে দুধ, দুধের তৈরি খাবার, পনির, পায়েস ইত্যাদি খাওয়া যায়। পুষ্টির সমস্যার জন্য অজ্ঞতা ও অসেচতনতাও দায়ী। বাজারের টিন ও প্যাকেটজাত খাবার থেকে বাড়িতে তৈরি খাবার অনেক বেশি পুষ্টিকর। যে দেশের জনগণের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অবস্থা যত ভালো, সে দেশ তত বেশি উন্নত। সুষম পুষ্টিকর খাবারই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। সরকার সুষম খাবার, খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ে যে জোর দিয়েছে তা বাস্তবায়ন সম্ভব একমাত্র সাধারণ জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমে। জাতীয় গণমাধ্যমগুলো সাধারণ জনগণের মধ্যে পুষ্টি বিষয়ক এই তথ্যসমূহ যথাযথ প্রচারের মাধ্যমে সঠিক যোগাযোগের একটি সেতুবন্ধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক ঃ দেবাশিস সরকার দেব, সহকারী অধ্যাপক, কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ