দেশে মূলার আবাদ দিন দিন বাড়ছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মূলা একটি পুষ্টিকর সবজি হলেও অনেকেই মূলা খেতে পছন্দ করেন না। মূলাতে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন তথা ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম ও লৌহ রয়েছে। এ দেশে মূলার আবাদ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে অমৌসুমে মূলা আবাদের দিকে চাষিরা ঝুঁকে পড়েছেন।
উঁচু, মাঝারি উঁচু ও মাঝারি নিচু জমিতে মূলা চাষ করা যায়। সুনিষ্কাশিত বেলে দোয়াশ মাটি মূলা চাষের জন্য ভাল। এটেল মাটিতে মূলার বাড় বাড়তি কম হয়। মূলা চাষের জন্য জমি গভীরভাবে ধুলো ধুলো করে চাষ করতে হয়। ছাই ও জৈব সার বেশী ব্যবহারে মূলার বাড় বাড়তি ভাল হয়।
এক সময় জাপানের বিখ্যাত তাসাকি সান জাতের মূলার মাধ্যমে এ দেশে উচ্চফলনশীল মূলার আবাদ শুরু হলেও এখন মূলার প্রায় ২৫-৩০টি জাত চাষ হচ্ছে। আসছে নিত্য নতুন স্বল্প জীবনকালের অধিক ফলনশীল হাইব্রিড জাত। উল্লেখযোগ্য জাত সমূহ হল বারি মূলা ১, বারি মূলা ২, বারি মূলা ৩, বারি মূলা ৪, এভারেষ্ট, হোয়াইট প্রিন্স, হিমালয় এফ১, সুপার ৪০, মুক্তি এফ১, কুইক ৪০, রকি ৪৫, হোয়াইট রকেট, হোয়াইট ৪০, জি চেটকি, সুফলা ৪০, আনারকলি, দুর্বার, রকেট এফ১, সামার বেষ্ট এফ১, হ্যাভেন এফ১, মিনো আর্লি লং হোয়াই, পাইলট এফ১, সিগমা ৪০ ইত্যাদি।
বীজ হার ও বপন ঃ আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ মূলার বীজ বপন করা হয়। প্রতি হেক্টরে বপনের জন্য ২.৫-৩.০ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। সাধারণত ঃ ছিটিয়ে বীজ বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করলে পরিচর্যার সুবিধে হয়। সারিতে বুনতে হলে এক সারি থেকে আর এক সারির দূরত্ব দিতে হবে ২৫-৩০ সেমি.।
সারের মাত্রা ঃ প্রতি শতকে ইউরিয়া সার ১.২-১.৪ কেজি, টিএসপি সার ১.০-১.২ কেজি, এমওপি সার ৮০০ গ্রাম-১.৪ কেজি, গোবর সার ৩০-৪০ কেজি। জমি তৈরির সময় সবটুকু জৈব সার, টিএসপি ও অর্ধেক এমওপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও বাকি অর্ধেক এমওপি সার সমান ২ কিস্তিতে ভাগে ভাগ করে বীজ বপনের পর তৃতীয় ও পঞ্চম সপ্তাহে ছিটিয়ে সেচ দিতে হবে।
পরিচর্যা ঃ বীজ বপনের ৭-১০ দিন পর অতিরিক্ত চারা তুলে পাতলা করে দিতে হবে। ৩০ সেমি. দূরত্বে একটি করে চারা রাখা ভাল। মাটিতে রস কম থাকলে সেচ দিতে হবে। প্রতি কিস্তির সার উপরি প্রয়োগের পর পরই সেচ দিতে হবে। আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে। মাটি শক্ত হয়ে গেলে নিড়ানী দিয়ে মাটির উপরের চটা ভেঙ্গে দিতে হবে।
পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা ঃ অনেক সময় মূলা পাতার বিট্ল বা ফ্লি বিট্ল পাতা ছোট ছোট ছিদ্র করে খেয়ে ক্ষতি করে। এ ছাড়া করাত মাছি বা মাস্টার্ড স’ ফ্লাই, বিছা পোকা ও ঘোড়া পোকা পাতা খায়। বীজ উৎপাদনের সময় ক্ষতি করে জাব পোকা।
রোগ ব্যবস্থাপনা ঃ মূলা পাতায় অল্টারনারিয়া পাতায় দাগ একটি সাধারণ সমস্যা। এছাড়া হোয়াইট স্পট বা সাদা দাগ রোগও দেখা যায়। মূলা শক্ত হয়ে আঁশ হওয়ার আগেই তুলতে হবে। অবশ্য এখন হাইব্রিড জাতসমূহ আসাতে এ সম্ভাবনা অনেক কমে গেছে। তবুও কচি থাকতেই মূলা তুলে ফেলতে হবে। এতে বাজার দাম ভাল পাওয়া যায় এবং স্বাদও ভাল থাকে। জাতভেদে হেক্টর পপ্রতি ফলন হয় ৪০-৬০ টন।

সবজি চাষে বোরন সার ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে বেশির ভাগ সবজি চাষ হয় শীত মৌসুমে। এসব সবজির সব ধরনের সারের প্রয়োজন সমান নয়। কোনো কোনো সারের অভাবে অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। যেসব সার ফসলের জন্য কম লাগে কিন্তু একেবারেই ব্যবহার না করলে বা নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহার না করলে ফসলের জন্য সমস্যার সৃষ্টি হয় সেসব সারের মধ্যে বোরন অন্যতম।
শীত মৌসুমে যেসব সবজি চাষ হয় তার মধ্যে কিছু কিছু সবজির বোরনের চাহিদা লক্ষ করা যায়। এসব সবজির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, বরবটি, মটরশুঁটি, মুলা, আলু, গাজর, শালগম, বীট, সরিষাশাক, পালংশাক, পেঁয়াজ ইত্যাদি।
মাটির ওপরের স্তরের তুলনায় নিচের স্তরে বোরন বেশি থাকে। বিশেষ করে বেলে বা বেলে দো-আঁশ মাটিতে সেচের পানির সাথে বোরন চুঁইয়ে মাটির নিচের দিকে চলে যায়। এ জন্য এ ধরনের মাটিতে বোরন সার প্রয়োগের চেয়ে পাতায় প্রয়োগ বেশি কার্যকরী। তবে অন্য ধরনের মাটিতে বিশেষ করে ভারী মাটি বা চুন মাটিতে বোরন বেশি লাগে। পাতায় প্রয়োগ করলে প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ থেকে ২.০ গ্রাম এবং মাটিতে প্রয়োগ করলে তিন থেকে চার কেজি বোরন সার প্রয়োজন হয়। মাটিতে প্রয়োগের বেলায় মূল সারের সাথে বা প্রথমবার উপরি সার প্রয়োগের সময় প্রয়োগ করতে হয়। অন্য দিকে পাতায় ¯েপ্র করলে বীজ বোনার বা চারা রোপণের ২০ থেকে ২৫ দিন এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর ¯েপ্র করতে হয়।
বোরন পাতায় ¯েপ্র করার অসুবিধা হলো- অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়র পর এটি যখন প্রয়োগ করা হয় তখন ফসলের বেশ কিছু ক্ষতি হয়। বোরনের অভাবে বাড়ন্ত আলুগাছের ডগার পাতা পুরু হয় ও কিনারা বরাবর ভেতরের দিকে গুটিয়ে কাপের আকৃতি ধারণ করে। আলুগাছের শিকড় ও গুটিয়ে যায়, গাছ দুর্বল হয়। আলু ছোট আকারের হয়। বোরনের অভাবে টমেটোর চারাগাছে সবুজ রঙের পরিবর্তে কিছুটা বেগুনি রঙ লক্ষ করা যায়। বাড়ন্ত টমেটোগাছের ডগার কুঁড়ি শুকিয়ে মরে যায়। পাতা ভঙ্গুর হয়। ফলের খোসা খসখসে হয়ে ফেটে যায়।
বোরনের অভাবে বেগুনগাছের বৃদ্ধি কমে যায়। ফুল সংখ্যায় কম আসে এবং ফুল ঝরা বৃদ্ধি পায়। ফল আকারে ছোট হয় ও ফেটে যায়। বোরনের অভাবে শিম ও বরবটির নতুন বের হওয়া পাতা কিছুটা পুরু ও ভঙ্গুর হয়। পাতার রঙ গাঢ় সবুজ ও শিরাগুলো হলুদ হয়ে যায়। শেষে পাতা শুকাতে শুরু করে, গাছে ফুল দেরিতে আসে ও শুঁটি বীজহীন হয়।
বোরনের অভাবে ফুলকপির চারার পাতা পুরু হয়ে যায় এবং চারা খাটো হয়। ফুল বা কার্ডের ওপরে ভেজা ভেজা দাগ পড়ে। পরে ওই দাগ হালকা গোলাপি এবং শেষে কালচে হয়ে ফুলটিতে পচন ধরে। পাতার কিনারা নিচের দিকে বেঁকে যায় ও ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়। পুরনো পাতা প্রথমে সাদাটে এবং পরে বাদামি হয়ে কিছুটা উঁচু খসখসে দাগে পরিণত হয়।
বোরনের অভাবে বাঁধাকপির মাথা বাঁধা শুরু হওয়ার সময় দেখা যায় যে মাথা বাঁধছে না এবং ভেতরটি ফাঁপা হয়ে যায়। একেবারে ভেতরের কচি পাতাগুলো বাদামি রঙের হয় এবং পচন ধরে। কান্ডের ভেতরের মধ্যাংশ ফাঁপা হয় ও পচে যায়। কাটলে তা থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।
বারনের অভাবে বাড়ন্ত মটরশুঁটির কচি পাতা হলুদাভ হয়ে কিছুটা ভেতরের দিকে বেঁকে যায় এবং ডগা শুকিয়ে যায়। অন্যান্য পাতা আকারে ছোট ও পুরু হয়। পাতার শিরা সাদাটে ও শিরার মধ্যবর্তী অংশ হলুদ হয়ে যায়। বোরনের অভাবে গাজরের পাতা ছোট হয়। গাজর আকারে ছোট হয় ও ফেটে যায়। মুলার পাতা বেঁকে যায়, পাতার রঙ প্রথমে বাদামি ও পরে কালো হয়ে শুকিয়ে যায়। মাটির নিচে মুলার স্ফীত অংশের ভেতরের দিকে বাদামি থেকে কালো রঙের পচন ধরে। শিকড়ে ফাটল ধরে ও বৃদ্ধি কমে যায়। বোরনের অভাবে পেঁয়াজ পাতার আগার দিক শুকিয়ে যায়। পরে শুকনো অংশ নিচের দিকে বাড়তে থাকে এবং গোলাকার বা রিংয়ের মতো হয়ে যায়। গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। পেঁয়াজ কন্দের আকারও ছোট হয়। বোরনের অভাবে মরিচ বা মিষ্টিমরিচের কচি পাতা হলুদ হয়ে এবং ফুল বা কচি ফলও ঝরে পড়ে। গাছের বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
বোরনের অভাব পূরণে যদি সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাহলে ফসলের ভালো ফলন পাওয়া যায়। বোরন পরিমাণে যেমন খুব বেশি লাগে না, তেমনি বেশি প্রয়োগ করলেও উল্টা ফল দেয় অর্থাৎ বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। ফলন কমে যায়। মাটিতে যদি রকানো কারণে বোরনের পরিমাণ বেড়ে যায়, তাহলে জমিতে চুন প্রয়োগ করে কিংবা সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে বোরন মাটির নিচের স্তরের দিকে নামানো যেতে পারে।
লেখক: কৃষিবিদ খোন্দকার মো: মেসবাহুল ইসলাম

জৈব সার ব্যবহারে ফিরে আসে জমির হারানো জীবন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ভার্মি কম্পোস্টের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো গরুর গোবর ও কেঁচো। প্রথমে কাঁচা গোবর একটি চারকোণা বিশিষ্ট শেড তৈরি করে সেখানে রাখতে হবে। এরপর হলুদ, মরিচের গুঁড়া এবং থিয়োডিন নামক একটি ওষুধ মিশ্রিত করে শেডের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে কোনো কীটপতঙ্গ সেখানে না আসে। ওই শেডে ১৫ দিন গোবর রেখে টকটিসিটি গ্যাস দূর করে নিয়ে একই ধরনের অন্য একটি শেডে গোবরগুলো স্থানান্তর করে তার ভেতরে কেঁচো ছেড়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, এক ধরনের লালচে কেঁচো ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির জন্য উপযোগী। এরপর আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে ওই শেডে যে জৈব সার তৈরি হবে তা জমিতে ব্যবহারের উপযোগী হবে। ভার্মি কম্পোস্ট সার কৃষক নাসির উদ্দিন ধান, পাট, কচু, কলা, পেঁপে, পেঁয়াজ, আলু ও পানবরজে ব্যবহার করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। এই জৈব সার ব্যবহারে জমির হারানো জীবন ফিরে এসেছে, ফসলের উৎপাদন অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার এই সাফল্য দেখে অন্য চাষিরাও এ সার তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং কোনো প্রকার রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই ভালো ফসল উৎপাদন করায় এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়ে গেছে। অন্যদিকে রাসায়নিক সারের অর্ধেকেরও কম খরচ হয়েছে এই ভার্মি কম্পোস্ট তৈরিতে। রাসায়নিক সারের অগ্নিমূল্য ও এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণে এই কম্পোস্ট হতে পারে কৃষকের জন্য একটি আশীর্বাদ, একটি নিয়ামক যা সবুজ বিপ্লবের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বকুল হোসেন জানান, ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার একটি সম্পূর্ণ জৈব সার। এই সার পরিবেশ সহায়ক ও মাটির স্বাস্থ্য ভালো করে ও মাটিকে উর্বরা করে তোলে। এই সার ফসলের বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ ও অন্যান্য গুণগতমান উন্নয়নে সহায়তা করে ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। কেঁচো সার ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন খরচ কম হয়। এই সারে জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, ম্যাগনেশিয়াম, বোরণসহ অসংখ্য গুণ থাকায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন হয় না। কৃষকের প্রাকৃতিক লাঙ্গল কেঁচো দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে বিলীন হতে চলেছে কেঁচো। সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে তার বংশবিস্তার। যে জৈব পদার্থ মাটিকে উর্বর রাখে, মাটিকে নরম রাখে, মাটিতে বায়ু চলাচলে সুবিধা ঘটায়, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় ও ফসলের পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি করে সেই জৈব পদার্থ আমাদের মাটি থেকে হারিয়ে গেলে যে বিপর্যয় ঘটবে তার লক্ষণগুলো ইতোমধ্যে আমাদের কৃষিতে দৃশ্যমান। তাই মানুষের কল্যাণের জন্যই যে মাটি সেই মাটির প্রতি আমাদের যতœবান, এর সঠিক ব্যবহার ও পরিচর্যা এবং সুসম জৈব প্রযুক্তির চাষাবাদ আমাদের মাটির এবং আমাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারে। ভার্মি কম্পোস্ট কেঁচো সার আমাদের সেই চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য অবদান। মাটির উর্বরা শক্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে রাসায়নিক সার আমদানি ও ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য সরকার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের ব্যবহারের প্রতি কৃষককে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করে তুলতে হবে।

থাই পাঙ্গাশ মাছের চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এক সময় বাংলাদেশের নদ-নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাঙ্গাশ মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে বর্তমানে এ মাছের মজুদ প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। দেশীয় প্রজাতির এই পাঙ্গাশ মাছ খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু, তাই চাহিদাও ব্যাপক। কিন্তু প্রাকৃতিক উৎসের দেশি পাঙ্গাশ মাছ পুকুরে চাষের প্রসার ঘটেনি। তবে ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে থাই পাঙ্গাশের পোনা এনে পুকুরে চাষ করা হয়, যা এদেশে মৎস্য সম্পদের নতুন সংযোজন। এদেশে ক্ষুদ্রায়তন পুকুরের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বৃহদায়তন জলাশয়ে থাই পাঙ্গাশ চাষের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে বিদেশি প্রজাতির এ মাছের কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব হয়েছে। লক্ষণীয় যে, থাই পাঙ্গাশ বর্তমানে দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রাণীজ আমিষের শতকরা ৬৩ ভাগ আসে মাছ থেকে, যার অধিকাংশই পূরণ হয় পাঙ্গাশ দ্বারা। বর্তমানে বাচ্চাদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ হচ্ছে পাঙ্গাশ। কেননা, এ মাছ কাঁটাবিহীন ও সুস্বাদু। অত্যন্ত আশার কথা, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পানির পরিবেশ থাই পাঙ্গাশ চাষের জন্য যথার্থই অনুকূল।
পাঙ্গাশ চাষের সুবিধা : ১. পাঙ্গাশ মাছ সর্বভুক হওয়ায় তৈরি খাদ্য দিয়ে চাষ করা সম্ভব। ২. এ মাছ দ্রুত বর্ধনশীল, উচ্চফলনশীল ও বিদেশে রফতানিযোগ্য। ৩. যে কোনো ধরনের জলাশয় অর্থাৎ পুকুর-দিঘিতে চাষ করা যায়। ৪. অতিরিক্ত শ্বাসযন্ত্র থাকায় প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। ৫. মিঠা ও স্বল্প নোনা পানিতে চাষ করা যেতে পারে। ৬. জীবিত অবস্থায় বাজারজাত করা সম্ভব। ৭. সুস্বাদু, প্রচুর চাহিদা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। ৮. হ্যাচারিতে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সহজেই থাই পাঙ্গাশের পোনা উৎপাদন করা যায়।
পুকুর নির্বাচন ঃ পুকুরের আয়তন ৬০ থেকে ১০০ শতাংশ এবং গভীরতা ৫ থেকে ৭ ফুট হওয়া বাঞ্চনীয়। দোআঁশ ও পলিযুক্ত এটেল মাটি পাঙ্গাশ চাষের জন্য সর্বোত্তম। পুকুরে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক। পুকুর প্রস্তুতকরণ : পুকুর পাড়ের ঝোঁপঝাড় পরিষ্কার রাখতে হবে। পুকুরে জলজ আগাছা, রাক্ষুসে মাছ ও অবাঞ্ছিত প্রাণী রাখা যাবে না। পুকুর শুকানো সম্ভব না হলে রাক্ষুসে মাছ ও অনাকাঙ্খিত পানি দূর করার পর প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে এবং পুকুরের মাটি লাল অমস্নীয় হলে ২ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা অতীব জরুরি। শুকনো পুকুরে চুন দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করতে হবে। পুকুর প্রস্তুতির সময় প্রতি শতাংশে ৮ থেকে ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া এবং ১৫০ গ্রাম টিএসপি সার প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। সার প্রয়োগের ৫ থেকে ৬ দিন পর পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্য (প্লাংটন) তৈরি হলে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়তে হবে।
পোনা মজুদকরণ ঃ অধিক উৎপাদন পেতে হলে একক পদ্ধতিতে পাঙ্গাশ চাষ করা উত্তম। একক চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫ থেকে ৭ ইঞ্চি আকারের পাঙ্গাশের পোনা ১২৫ থেকে ১৫০টি এবং মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫০ থেকে ৬০টি পাঙ্গাশের পোনা ৫ থেকে ১০টি কাতলের পোনা, ২৫ থেকে ৩০টি বিগহেড বা সিলভার কার্পের পোনা এবং ২০ থেকে ২৫টি রুইয়ের পোনা ছাড়া যেতে পারে। তৈরি খাবার সরবরাহ ঃ পাঙ্গাশ মাছের একক চাষের ক্ষেত্রে তৈরি খাদ্য সরবরাহ করা একান্তই অপরিহার্য। এ মাছ চাষে আমিষযুক্ত সুষম খাদ্য অত্যাবশ্যক। খাবার দানাদার হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে ফিশমিল ২০ শতাংশ, সরিষার খৈল ৪৫ শতাংশ এবং গমের ভুসি ৩৫ শতাংশ একত্র করে সামান্য পানি মিশিয়ে দানাদার খাদ্য তৈরি করে রোদে শুকাতে হবে। মাছের খাবার চাষকৃত মাছের দেহের ওজনের শতকরা ৮ থেকে ৩ ভাগ হারে সরবরাহ করা অত্যাবশ্যক। পর্যায়ক্রমে খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করতে হবে। এছাড়া শামুক, ঝিনুক, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুর নাড়িভুঁড়ি টুকরো করে কেটে পাঙ্গাশ মাছকে লোভনীয় খাবার হিসেবে দেয়া যেতে পারে। পোনা মজুদের পর দিন থেকে নিয়মিত সকাল ও বিকাল দু’বার খাবার সরবরাহ করা জরুরি। শীতকালে মাছের খাবার কমাতে হবে।
রোগ ব্যবস্থাপনা ঃ পানির গুণাগুণ নষ্ট হলে মাছে ঘা দেখা দিতে পারে। পানির গুণাগুণ মাছ চাষের অনুকূলে আনার জন্য চুন, লবণ বা জিওলইট প্রয়োগ করতে হবে। মাছে ক্ষত রোগ দেখা দিলে মাছের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াতে হবে। প্রয়োজনে দূষিত পানি বের করে পরিষ্কার, ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে। রোগবালাই থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনে নিয়মিত পানি পরিবর্তন করতে হবে।
পরামর্শ : ১. পোনা মজুদের আগে পানির বিষাক্ততা পরীক্ষা করতে হবে, ২. নার্সারি পুকুরে রেণু বা ধানি পোনা ছাড়ার আগে ক্ষতিকর হাঁসপোকা বা ব্যাঙাচি ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। ৩. মজুদকৃত মাছকে নিয়মিত সুষম খাবার সরবরাহ করতে হবে। ৪. সুস্থ-সবল পোনা মজুদ করতে হবে। ৫. পোনা ছাড়ার উপযোগী সময় সকাল-বিকালের মৃদু ঠান্ডা আবহাওয়া। দুপুরের রোদ, মেঘলা ও নিম্নচাপের দিনে পোনা ছাড়া সমীচীন নয়।
মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ ঃ সঠিক চাষ ব্যবস্থাপনা, উন্নতমানের পোনা মজুদ ও যথানিয়মে সুষম খাবার প্রয়োগ করা সম্ভব হলে মাত্র ৬-৭ মাসে পাঙ্গাশ মাছের গড় ওজন ৯০০ থেকে ১০০০ গ্রাম হয়ে থাকে। বারবার আহরণ করে মাছ বাজারজাত করা হলে মাছের উৎপাদন সন্তোষজনক হয়। এক্ষেত্রে মাত্র ৬ মাসে একটি ভালো ফলন আশা করা যায়। অর্থাৎ একই পুকুরে বছরে দু’বার পাঙ্গাশ মাছের ফলন পাওয়া সম্ভব।

পোল্ট্রি শিল্প দ্রুত বধর্নশীল ও সম্ভাবনাময়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পোল্ট্রিশিল্প বতর্মান বিশ্বে দ্রুত বধর্নশীল একটি বহুমুখী শিল্প। গামের্ন্টেসের পর পোল্ট্রিই দ্বিতীয় বৃহত্তম কমর্সংস্থান সৃষ্টিকারী শিল্প খাত। বলতে দ্বিধা নেই মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে এবং পুষ্টির ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে পোল্ট্রিশিল্প। এ খাত সংশ্লিষ্টদের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার ফলে দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূণর্তা অজর্ন করেছে। বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ আমিষের শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই জোগান দিচ্ছে এই শিল্পটি। এই শিল্প খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। যার সঙ্গে কমবেশি ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা নিভর্রশীল। আশার খবরটি হচ্ছে বতর্মান বাজারে যে পরিমাণ ডিম, মুরগি, বাচ্চা এবং ফিডের প্রয়োজন তার শতভাগ এখন  দেশীয়ভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি দেশের ডিম ও মাংসের শতভাগ চাহিদাপূরণ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদনও করছে এ শিল্পটি। বাংলাদেশে দ্রুত অগ্রসরমান পোল্ট্রিশিল্পের সম্ভাবনাকে সারাবিশ্বে জানান দিতে এবং বিশ্বেও  পোল্ট্রি সায়েন্স জ্ঞান বিনিময়ের লক্ষ্যে বৃহৎ কলেবরে ১১তম আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি  শো ও সেমিনার আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (ডাব্লিউপিএসএ) বাংলাদেশ শাখা এবং ‘বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল’ (বিপিআইসিসি)। আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি সেমিনার অনুষ্ঠানটি হবে ২০১৯ সালের ৫-৬ মার্চ ঢাকার রিজেন্সি হোটেলে এবং আন্তজাির্তক পোল্ট্রি শো অনুষ্ঠিত হবে ৭-৯ মার্চ আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায়। আয়োজকদের প্রত্যাশা এই আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের এই শিল্পের সম্ভাবনা সারাবিশ্বের কাছে ছড়িয়ে পড়বে। পাশাপাশি সেমিনারের মাধ্যমে আমরাও পোল্ট্রি সায়েন্সেরা জ্ঞান-গবেষণা সম্পর্কে আরও সমৃদ্ধ হতে পারব। এবার ভিন্ন আঙ্গিকে এবং আরও জমকালোভাবে অনুষ্ঠিত হবে ১১তম আন্তর্জাতিক  পোল্ট্রি শো ও সেমিনার। আগের বছরগুলোতে ‘ পোল্ট্রি শো’ ও ‘সেমিনার’ একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হলেও এবার ৫ ও ৬ মার্চ, ২০১৯ ওয়াল্ডর্স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন (ডাব্লিউপিএসএ) বাংলাদেশ শাখার উদ্যোগে ঢাকা রিজেন্সি  হোটেলে ‘ইন্টারন্যাশনাল টেকনিক্যাল সেমিনার’ এবং ৭, ৮ ও ৯ মার্চ ডাব্লিউপিএসএ বাংলাদেশ শাখা এবং ‘বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল’ (বিপিআইসিসি)-এর যৌথ উদ্যোগে বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক সম্মেলন  কেন্দ্রে (আইসিসিবি) অনুষ্ঠিত হবে ‘ইন্টারন্যাশনাল পোল্ট্রি শো’। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা  গেছে, বতর্মানে সারা দেশে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার  ছোট-বড় খামার রয়েছে। এ ছাড়া আছে ব্রিডার ফামর্, হ্যাচারি, মুরগির খাবার তৈরির কারখানা। পোল্ট্রিশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্প, কাঁচামাল ও ওষুধ প্রস্তুতকারক এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ডিমের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ। মাথাপিছু কনজাম্পশন ছিল প্রায় ৪১টি। ২০১৬ সালে ডিমের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২  কোটি ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ। মাথাপিছু কনজাম্পশন প্রায় ৫১টি। এই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম। আর তখন মাথাপিছু কনজাম্পশন প্রায় ৮৬টিতে। পরিসংখ্যানে মুরগির মাংসের উৎপাদন ও কনজাম্পশন দেখানো হয়েছে, ২০১৪ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১,৫১০ মেট্রিক টন। তখন মাথাপিছু বার্ষিক কনজাম্পশন ছিল প্রায় ৩.৫ কেজি। ২০১৬ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,৮৫১ মেট্রিক টন। তখন মাথাপিছু বার্ষিক কনজাম্পশন ছিল প্রায় ৪.২  কেজি। আর এ ধারাবাহিকতা থাকলে ২০২১ সালে হবে উৎপাদন হবে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেট্রিক। মাথাপিছু বার্ষিক কনজাম্পশন হবে প্রায় ৭ কেজি। এমন  প্রেক্ষাপটে খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০২০ সালের মধ্যে পোল্ট্রি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি করা যাবে। আর এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হলে প্রাথমিক পর্যায়ে বছরে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই শিল্পের সম্ভাবনা কত বড় তা সহজেই অনুমেয়। ডাব্লিউপিএসএ-বাংলাদেশ শাখার সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ অঞ্জন বলেন, পোল্ট্রি ব্যবসা এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। সাধারণ খামারি থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রত্যেকেই লোকসানের জালে আটকা পড়েছে। কর ও শুল্কের বোঝা প্রতিবছরই বাড়ছে। এবছর আরও দুটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছেÑ একটি বিএসটিআই-এর বাধ্যতামূলক মানসনদ এবং অন্যটি হচ্ছে পোল্ট্রি ও ফিস ফিড মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগের বাধ্যতামূলক ব্যবহার। অঞ্জন বলেন, প্রান্তিক খামারিদের বাঁচাতে হবে এবং সেজন্য তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে হবে, তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে তাহলে আমাদের খামারিরাই অত্যন্ত উন্নতমানের ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন করতে পারবে। মূলত সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের  পোল্ট্রিশিল্প। তিনি বলেন, ঢাকা শোটি এ উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় এবং কার্যকর শো। এবারের পোল্ট্রি শোতে বিশ্বের ১০ থেকে ১৫ জন টপ মোস্ট রিসাচার্রকে পেপার প্রেজেন্টেশনের জন্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবারের স্লোগান ‘পোল্ট্রি ফর হেলদি লিভিং’। আমাদের দেশের স্বল্প শিক্ষিত কিংবা নিরক্ষর খামারিদের অনেকেই বই পড়ে খামার ব্যবস্থাপনা বুঝতে পারেন না তাই এবার আমরা চিত্র-নির্ভর ম্যানুয়াল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। এমনকি মডেল খামার  তৈরির মাধ্যমে খামারিদের হাতে-কলমে শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছি। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং দ্ব্যথর্হীনভাবে বলতে চাই এই তিনটি ক্ষেত্রেই পোল্ট্রিশিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। জাতীয় অর্থনীতিতে পোল্ট্রিশিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ ছাড়াচ্ছে। পোল্ট্রি ফিডের উৎপাদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৬ সালে পোল্ট্রি ফিডের বাষির্ক উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৩ লাখ মেট্রিক টন। ২০২১ সালে পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন হবে প্রায় ৫৫-৬০ লাখ মেট্রিক টন। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বে পোল্ট্রি খাদ্য উৎপাদন ১০০ কোটি টন ছাড়িয়েছে। ক্রমবধর্মান চাহিদা মেটাতে ২০৫০ সালে তা বাড়াতে হবে ৬০ থেকে ৭০ গুণ। ডাব্লিউপিএসএ-বাংলাদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হাসান বলেন, এবারের  সেমিনারের পেপারগুলো যেন আরও বেশি প্রায়োগিক এবং বাংলাদেশের খামারিদের জন্য সহায়ক হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পোল্ট্রি  মেলাতে এক্সিবিটররা যেন তাদের পণ্য ও সেবার সঠিক ডিসপ্লে ও প্রমোশন করতে পারেন, দেশি-বিদেশি ভিজিটররা যেন প্রতিটি স্টল ঘুরে দেখতে পারেন,  দেশীয় খামারিরা যেন পোল্ট্রি ওয়াল্ডের্র সর্বশেষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারেন, বিজনেস ডিল করতে পারেন সে বিষয়গুলো মাথায় রেখেই কাজ চলছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা, কাজের পরিধি বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের নিরাপদ প্রোটিনের উৎস- ডিম ও মুরগির মাংসের প্রতি সাধারণ ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়াতে স্বল্প ও দীঘের্ময়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাযর্ক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের সহযোগিতা পেলে ২০২৫ সালের মধ্যে নতুন এক বাংলাদেশ এবং নতুন এক  পোল্ট্রিশিল্প  দেখবে বিশ্ব।

নিরাপদ পোল্ট্রি উতপাদনে কুমারখালীতে খামারীদের সাথে মাসিক আলোচনা সভা

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদন ও বাজারজাত করণসহ পোল্ট্রি সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়নে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে খামারীদের সাথে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন নগরে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন নন্দলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওশের আলী বিশ্বাস। ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রোকাশ প্রোগ্রামের কারিগরী সহায়তায় ও ইউকে এইড এর আর্থিক সহায়তায় বীজবিস্তার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন, বীজবিস্তার ফাউন্ডেশনের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর ডলি ভদ্র।
সভায় উল্লেখ্য করা হয়, দিনে দিনে ব্রয়লার মুরগী পালনে আগ্রহী হয়ে উঠছে বেকার যুব সমাজ। ফলে পোল্ট্রি শিল্প ব্যাপক প্রসার লাভ করছে। আর দেশে প্রাণীজ প্রোটিনের চাহিদার প্রায় ৪৫ ভাগ পোল্ট্রি সেক্টর পূরণ করে। তুলনামূলক মূল্য সস্তা হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রোটিনের মূল উৎস হচ্ছে পোল্ট্রি। কিন্তু বর্তমানে নাগরিকদের ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের বিবেচনায় পোল্ট্রি সেক্টর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নি¤œমানের পোল্ট্রি ফিড, পোল্ট্রি ফিডে মাত্রাতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার পোল্ট্রি খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলছে। এ আলোচনা সভায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণসহ পোল্ট্রি সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়নে বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১৭ জন খামারী অংশগ্রহণ করে।
উল্লেখ্য, নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনের লক্ষ্যে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও বীজবিস্তার ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় রেখে এই প্রকল্পটি নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক ভুমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও প্রকল্পটি মৎস্য ও পশুখাদ্য আইন-২০১০ এবং নিরাদ খাদ্য আইন-২০১৩ বাস্তবায়নেও এই প্রকল্পটি সহায়ক ভুমিকা পালন করছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প মেডিসিনাল উদ্ভিদ উদ্ভাবন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সম্প্রতি ঘাসজাতীয় মেডিসিনাল উদ্ভিদ খাওয়ানোর মাধ্যমে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে সফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পশুপুষ্টি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-মামুন। উদ্ভাবিত প্লানটেইন বহুবর্ষজীবী ঘাস খাওয়ালে কোনো বিরূপ প্রভাব ছাড়াই প্রাণীর দেহ মোটাতাজা হবে। ঘাসটি খাওয়ানোর মাধ্যমে প্রাণীর মাংস বৃদ্ধির পাশাপাশি মাংস কম চর্বিযুক্ত হয় যা আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তার এ গবেষণাটি অ্যানিমাল জার্নালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা জানি, শরীর গঠন, বৃদ্ধি সাধন ও ক্ষয়পূরণে আমিষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাদ্যের ছয়টি উপাদানের মধ্যে আমিষ অন্যতম, যা আমরা উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে পেয়ে থাকি। তবে প্রাণিজ আমিষ উদ্ভিজ্জ আমিষের চেয়ে উৎকৃষ্ট। মাংস, দুধ এবং ডিম প্রাণিজ আমিষের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা পূরণে গবাদিপশু মোটাতাজাকরণের লক্ষ্যে আশির দশকে শুরু হয়েছিল গ্রোথ প্রোমোটার অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার। কিন্তু গ্রোথ প্রোমোটারের ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে এখন মানুষ অনেক সচেতন। কারণ কৃত্রিম অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটার ব্যবহারের ফলে প্রাণিদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। অপরদিকে প্রাণী থেকে উৎপাদিত পণ্য মাংস, দুধ ও ডিম ভক্ষণের ফলে মানুষের মধ্যেও ক্ষতিকারক রেসিডিউয়াল প্রভাবে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ক্ষতিকারক অ্যান্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রোমোটারের বিকল্প হিসেবে এই উদ্ভাবন গবাদিপ্রাণী মোটাতাজাকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া প্রাণিজ আমিষ ভক্ষণের ফলে মানবদেহেও কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গবেষক ড. আল-মামুন বলেন, সাধারণ ঘাসের তুলনায় প্লানটেইন ঘাসের মধ্যে অধিক পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ এবং ‘ই’ আছে, যা ত্বকের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এছাড়া এর মধ্যে এমন কিছু বায়ো অ্যাকটিভ উপাদান আছে যা সাধারণ ঘাসে নেই। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হিসেবেও রয়েছে ঘাসটির চমৎকার কার্যক্ষমতা, যা ফ্রি র‌্যাডিকেলের কার্যকারিতা বন্ধ করে প্রাণিদেহের কোষ ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে।  রোমন্থক প্রাণী, যেমন- গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল ইত্যাদিকে স্বাভাবিক খাবারের সঙ্গে খুব সামান্য পরিমাণে (পোল্ট্রিতে ১ শতাংশ, ভেড়া ও ছাগলে ৪ শতাংশ, গরু ও মহিষে ৫ থেকে ১০ শতাংশ) ফ্রেশ প্লানটেইন এবং এর পাউডার মিশিয়ে খাওয়ালে প্রাণীর হিট স্ট্রেস কমিয়ে প্রোটিনের সিনথেসিস বাড়িয়ে দেয়। ড. আল-মামুন আরো বলেন, ঘাসটি উচ্চ অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় মাংসের উৎপাদন, স্বাদ ও রঙ বৃদ্ধি পায় এবং পচনরোধ করে। এটি হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে দুগ্ধবতী ও গর্ভবতী প্রাণীর দুধের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ-সবল বাচ্চা জন্ম দিতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে ফ্যাটি অ্যাসিডের (ওমেগা-৬ এবং ওমেগা-৩) অনুপাত কমাতে সহায়তা করে। এমন প্রাণিজ আমিষ গ্রহণে মানুষের হার্ট ভালো থাকে। বয়স ধরে রাখতে সহায়তা করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও আয়ুষ্কাল বাড়ায়। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ক্যানসার ও অটিজম প্রতিরোধ করে। চাষাবাদ সম্পর্কে গবেষক বলেন, ঘাসটি শীতপ্রধান অঞ্চলের উদ্ভিদ। ৬ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। তবে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে বেশি ঔষধি গুণাগুণ থাকে। নভেম্বরের শুরুতে বীজ ছিটিয়ে দিলে তেমন কোনো যতœ ছাড়াই এটি যে কোনো ধরনের মাটিতে জন্মায়। বীজ বপনের ৪৫-৫৫ দিন পর প্রথম কাটিং দেওয়া যায়। এর এক মাস পর দ্বিতীয় কাটিং, দ্বিতীয় কাটিংয়ের এক মাস পর তৃতীয় কাটিং দেওয়া যায়। মেধাবী ও সুস্থ জাতির জন্য প্রাণিখাদ্যে মেডিসিনাল উদ্ভিদ ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। অর্গানিক পদ্ধতিতে প্রাণিজ সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রাণিজ খাদ্য হিসেবে উদ্ভিদটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে। গ্রোথ প্রোমোটারের বিকল্প কিছু আবিষ্কার ও ব্যবহারে গবেষকদের সার্বিক সহযোগিতা করার দাবি জানানো হয় সরকারের কাছে। ঘাসটি যদি মাঠপর্যায়ে চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সুলভ মূল্যে দেওয়া যায়, তাহলে প্রাণিজ সম্পদ থেকে নিরাপদ আমিষ পাওয়া সম্ভব হবে বলে গবেষকদের আশাবাদ।

লেখক ঃ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

তিন কারণে নদীতে আসছে না ইলিশ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ নদীর গতিপথ পরিবর্তন, জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব, মাঝখানে জেগে ওঠা নতুন চর এই তিন কারণে পানির স্রোত বাধা পাচ্ছে। এর ফলে প্রয়োজনের তুলনায় স্রোত কমে গেছে। ইলিশ গবেষকরা বলছেন, ইলিশ সবসময় দলবেঁধে চলে। এই মাছ গতিপথ সবসময় সোজা রাখে। সোজা চলতে গিয়ে যদি বাধা পায়, তাহলে সাগরে ফেরত যায় ইলিশ। নদীতে চর জাগা ও স্রোত কমে যাওয়ায় সাগর থেকে ঝাঁক বেঁধে ইলিশ নদীর মোহনায় আসতে বাধা পাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আহসান কবির। তিনি বলেন, ‘এসব কারণেই এ বছর প্রবল বৃষ্টি হওয়ার পরও ভরা মৌসুমেও নদীতে জেলেরা ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না।’ এদিকে, জেলেরা জানিয়েছেন, উপকূলীয় নদ-নদীতে আর আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। উত্তাল মেঘনা-তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়েও ইলিশের দেখা মিলছে না জেলেদের জালে। তবে সাগরে প্রচুর ইলিশ রয়েছে বলেও জেলেরা দাবি করেন। বরিশাল, ভোলা, ষাটনল, পটুয়াখালী, পাথরঘাটা ও পিরোজপুরের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইলিশের স্বর্গরাজ্য বলে খ্যাত পিরোজপুরের বলেশ্বর ও সন্ধ্যা, ভোলার তেঁতুলিয়া, পটুয়াখালীর পায়রা, আন্দারমানিক, আগুনমুখো এবং চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনাসহ ষাটনল এলাকায় প্রত্যাশিত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এ সব এলাকার জেলেরা জানিয়েছেন, শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমায় ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি তাদের। ভাদ্র মাসের শেষের দিকের জোয়ারে কিছু মাছ আসতে পারে। তারা এখন সেই আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পিরোজপুরের পাড়ের হাটের ইলিশের আড়তদার আফজাল মিয়া। পিরোজপুরের পাড়ের হাট, ভোলার ইলিশা বাজার, বরগুনার পাথরঘাটা, পটুয়াখালীর মহিপুরের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব এলাকায় আড়তগুলো প্রায় মাছশূন্য। নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে অনেকটাই খালি হাতে ফিরে আসতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলেরা। উত্তাল আগুনমুখা, বলেশ্বর, মেঘনা, তেঁতুলিয়া পাড়ি দিয়েও ইলিশ মিলছে না। নদীতে মাছ না পড়ায় দাদনের দেনার ভয়ে বহু জেলে ঘর-ভিটা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জেলে পরিবারগুলোয় এখন দুর্দিন চলছে। তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকেরই নিজস্ব জাল বা মাছ ধরার ট্রলার না থাকায় স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়েছেন। কিন্তু নদীতে মাছ ধরা না পড়ায় এ সব অঞ্চলের জেলেরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। ভোলার অন্যতম মৎস্যকেন্দ্র তজুমদ্দিন উপজেলার মাছ ব্যবসায়ী রফিক সাদী বলেন, ‘তজুমদ্দিন এলাকা থেকে প্রতিবছর ইলিশের মৌসুমে কোটি কোটি টাকার মাছ রফতানি হতো। গত বছরও এ সময়ে যেখানে প্রতিদিন এ মৎস্য কেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ইলিশ বেচাকেনা হতো, সেখানে এখন প্রতিদিন পাঁচ লাখ টাকার মাছও বেচাকেনা হচ্ছে না।’ জেলেরা বলছেন, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসজুড়ে সময়টাই ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু সেই সময় পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমায় ধরা পড়ে ইলিশ। জেলেদের প্রত্যাশা ছিল ওই সময় অন্তত কিছু ইলিশ ধরা পড়বে। কিন্তু এই মৌসুমও চলে গেছে। কিন্তু নদীতে মিলছে না প্রত্যাশীত ইলিশ। বাজারে ছোট-বড় যে সাইজের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, তার বেশিরভাগই সাগরের। সেই সাগরের ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এদিকে পাথরঘাটার ইলিশের ব্যবসায়ী (আড়তদার) সেকেন্দার হাওলাদার বলেন, ‘পানির স্রোত কমে যাওয়া ও নদীতে চর পড়ায় জালে ইলিশ আসছে না ঠিকই কিন্তু এর বাইরেও কিছু কারণ আছে। যে কারণে নদীতে ইলিশ কমে গেছে। সমাজের প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কিছু জেলে নদীতে সারা বছরই বিভিন্ন মাছের পোনা ধরে। এর মধ্যে ইলিশের পোনাও জালে ধরা পড়ে। এতে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হয়।’ ভরা মৌসুমে জেলেদের জালে ইলিশ মাছ কম ধরাপড়ার এটিও একটি কারণ বলে মনে করেন তিনি। বরিশালের একাধিক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, উপকূলীয় নদ-নদীতে আর আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। বরিশালের মোকামে গত কয়েক দিনে ইলিশ সরবরাহের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।’ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, ২০০২-০৩ অর্থ বছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টনে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে দেশে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছর তা ৪ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরও দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭ সালের শেষে দিকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ ভাগ ইলিশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের নদ-নদীতে ধরা মাছের ১২ শতাংশই ইলিশ। বাংলাদেশের জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) এর অবদান এক শতাংশ। এক মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় নদীর পরিবেশ, জাটকা সংরক্ষণ ও অভয়াশ্রম নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশে বছরে ইলিশের বাণিজ্য হতো কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা।

ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন করলো বাংলাদেশ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স জানতে পেরেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সফলতার কথা জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমের নেতৃত্বে গবেষক দলের অন্যান্য সদস্যরা হলেন- পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. বজলুর রহমান মোল্লা, বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. শহিদুল ইসলাম ও ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের প্রফেসর ড. মুহা. গোলাম কাদের খান। গবেষণা কাজটি গবেষকদের নিজস্ব উদ্যোগ, স্বেচ্ছাশ্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টর পূর্ণাঙ্গ জিনোম গবেষণার যুগে প্রবেশ করলো। প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম মনে করছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষকদের সক্ষমতা প্রমাণ হয়েছে। এর আগে দেশি ও বিদেশি গবেষকদের সমন্বয়ে পাট ও মহিষের জীবন রহস্য উন্মোচন হয়েছে। এরপর ইলিশে এই সাফল্যকে মৎস্যখাতের জন্য যুগান্তরকারী বলে মনে করছেন গবেষকরা। ইলিশের জিনোম বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ৭৬ লাখ ৮০ হাজার নিউক্লিওটাইড পেয়েছেন; যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক চতুর্থাংশ। এ ছাড়াও ইলিশের জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ২১ হাজার ৩২৫টি মাইক্রোস্যাটেলাইট (সিম্পল সিকোয়েন্স রিপিট সংক্ষেপে এসএসআর) ও ১২ লাখ ৩ হাজার ৪০০টি সিঙ্গেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম (এসএনপি) পাওয়া গেছে। বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ইলিশ জিনোমে মোট জিনের সংখ্যা জানার কাজ অব্যাহত রয়েছে। ‘জিনোম’ হচ্ছে কোনো জীব প্রজাতির সকল বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক। অন্য কথায় জিনোম হচ্ছে কোনো জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। জীবের অঙ্গসংস্থান, জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াসহ সকল জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এর জিনোমে সংরক্ষিত নির্দেশনা দ্বারা। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং হচ্ছে কোনো জীবের জিনোমে সমস্ত নিউক্লিওটাইড কীভাবে বিন্যস্ত রয়েছে তা নিরূপণ করা। একটি জীবের জিনোমে সর্বমোট জিনের সংখ্যা, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের কাজ পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স থেকেই জানা যায়। গবেষকরা জীবন রহস্য উন্মোচন করতে মেঘনা ও বঙ্গোপসাগর থেকে জীবন্ত পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে উচ্চ গুণগত মানের জিনোমিক ডিএনএ প্রস্তুত করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিনোম সিকোয়েন্সিং সেন্টারে সংগৃহীত ইলিশের পৃথকভাবে প্রাথমিক ডেটা সংগ্রহ করা হয়। এরপর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সার্ভার কম্পিউটারে বিভিন্ন বায়োইনফরম্যাটিক্স প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সংগৃহীত প্রাথমিক ডেটা থেকে ইলিশের পূর্ণাঙ্গ নতুন জিনোম বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়। ইলিশ মাছের জীবন রহস্য উন্মোচনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এ দেশের প্রায় ৪ লাখ মানুষ জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষভাবে ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। এই জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইলিশ একটি ভ্রমণশীল মাছ। এরা সারা বছর সাগরে বাস করে কিন্তু প্রজননের জন্য সাগর থেকে বিভিন্ন নদীতে চলে আসে এবং ডিম ছাড়ার পর মা ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। এ গবেষণা বাংলাদেশের জলসীমার মধ্যে ইলিশের সংখ্যা, বিভিন্ন মোহনায় প্রজননকারী ইলিশ কি ভিন্ন ভিন্ন ‘স্টক’ নাকি এরা সবগুলো একটি স্টকের অংশ, বাংলাদেশের ইলিশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের (ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য) ইলিশ থেকে জেনেটিক্যালি স্বতন্ত্র কি না ইত্যাদি বিষয়ে জানতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে বাংলাদেশি ইলিশের একটি রেফারেন্স জিনোম প্রস্তুত করা যাবে। ইলিশের জিনোমিক ডেটাবেজ স্থাপন করা যাবে; যা যাবতীয় বায়োলজিক্যাল তথ্য ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে। যা ইলিশের বিভিন্ন পপুলেশনের বিস্তৃতি এবং বিভিন্ন উপ-পপুলেশনের উপস্থিতি ও তাদের মধ্যে ইকোলজিক্যাল আন্তঃসংযোগের মাত্রা নির্ণয় করবে।
এদিকে ৭ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ সম্পর্কে জানতে চাইলে গবেষকরা বলেন, সেখানে তারা কী কাজ করেছেন বা কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়ে উল্লেখ নেই। আমরা ২০১৫ সালে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করি এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) তথ্যভান্ডারে ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালে স্বীকৃতি পাই। এ ছাড়া আমরা আগেই এ তথ্যটি দুটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উপস্থাপন করি।

ছাদে বেদানার চাষ অত্যন্ত সহজ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ছাদে বেদানা বা আনার চাষ অত্যন্ত সহজ। চারা লাগানোর জন্য ২০ ইঞ্চি কালার ড্রাম বা টব সংগ্রহ করতে হবে। ড্রামের তলায় ৩-৫টি ছিদ্র করে নিতে হবে। যাতে গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে। টব বা ড্রামের তলার ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। টব বা ড্রামের গাছটিকে ছাদের এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে সবসময় রোদ থাকে। এবার ২ ভাগ বেলে দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ৪০-৫০ গ্রাম টিএসপি সার, ৪০-৫০ গ্রাম পটাশ সার, এবং ২০০ গ্রাম হাড়ের গুড়া একত্রে মিশিয়ে ড্রাম বা টবে পানি দিয়ে রেখে দিতে হবে ১০-১২ দিন। অতঃপর মাটি কিছুটা খুঁচিয়ে দিয়ে আবার ৪-৫ দিন একইভাবে রেখে দিতে হবে। মাটি যখন ঝুরঝুরে হবে তখন একটি সবল সুস্থ কলমের চারা উক্ত টবে রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের সময় খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়া যেন মাটি থেকে আলাদা না হয়ে যায়। চারা গাছটিকে সোজা করে লাগাতে হবে। সেই সঙ্গে গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উঁচু করে দিতে হবে এবং মাটি হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে। যাতে গাছের গোড়া দিয়ে বেশি পানি না ঢুকতে পারে। একটি সোজা কাঠি দিয়ে গাছটিকে বেঁধে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর প্রথমদিকে পানি কম দিতে হবে। আস্তে আস্তে পানি বাড়াতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে আবার বেশি শুকিয়েও না যায়।
অন্যান্য পরিচর্যা ঃ বেদানা গাছের চারা লাগানোর ৪-৫ মাস পর থেকে নিয়মিত ২৫-৩০ দিন অন্তর অন্তর সরিষার খৈল পচা পানি প্রয়োগ করতে হবে। সরিষার খৈল ১০ দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর সেই পচা খৈলের পানি পাতলা করে গাছের গোড়ায় দিতে হবে। ১ বছর পর টবের আংশিক মাটি পরিবতর্ন করে দিতে হবে। ২ ইঞ্চি প্রস্থে এবং ৬ ইঞ্চি গভীরে শিকরসহ মাটি ফেলে দিয়ে নতুন সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে তা ভরে দিতে হবে। মাটি পরিবর্তনের এই কাজটি সাধারণত বর্ষার শেষ এবং শীতের আগে করলেই ভালো হয়। ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর টব বা ড্রামের মাটি কিছুটা খুঁচিয়ে দিতে হবে। ছাদের আনার গাছের ডাল নিয়মিত ছাঁটাই করতে হবে। আনার বা বেদানা গাছের পুরনো ডালের নতুন শাখায় ফুল আসে। পুরনো ডালে নতুন শাখা বের করার জন্যই ডালপালা ছাঁটাই করা প্রয়োজন। এ ছাড়াও আনার গাছের শিকড় থেকে বের হওয়া সাকারও ছেঁটে দেয়া দরকার।

তিন বছরে চামড়া রফতানি কমেছে অর্ধেকের বেশি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিমুখী খাত চামড়া শিল্প। অথচ তিন বছরের ব্যবধানে চামড়া রফতানি কমেছে অর্ধেকের বেশি। আর গেল জানুয়ারি থেকে কমতে শুরু করেছে চামড়াজাত পণ্যের রফতানি। এর কারণ হিসেবে পরিবেশ বান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারাকেই দায়ী করছেন শিল্প মালিকরা। সেই সঙ্গে এই জটিলতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপ চান তারা। অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়বে চামড়া শিল্প।
বড় বড় ড্রামে তীব্র এসিড-ক্ষারসহ বিপজ্জনক নানা রাসায়নিক মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে কাঁচা চামড়া। যার অল্প পরিমাণ মেটাবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বেশিরভাগই হবে রফতানি। যদিও পরিসংখ্যান বলছে, ভাল নেই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই রফতানি খাত। গেল অর্থবছরে এই শিল্পের মোট রফতানি কমেছে আগের বছরের চেয়ে ১২ শতাংশ; তিন বছরের ব্যবধানে প্রায় ১১৭ শতাংশ কমেছে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার রফতানি। আর, গেল জানুয়ারি থেকে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আটকে গেছে চামড়াজাত পণ্যের রফতানিও। ট্যানারি মালিকরা বলছেন, দিন দিন পিছিয়ে পড়ার কারণ, উদ্যোগ নেয়ার পর দেড় দশকেও চামড়া শিল্পে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি শিল্প মন্ত্রণালয়। এর সঙ্গে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রতিক চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধ। এ্যাপেক্স ট্যানারির নির্বাহী পরিচালক এমএ মাজেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ অনেক দেশ আমাদের থেকে চামড়া আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো আমাদের সিটিপি এখনও চালু হয়নি। এমবি ট্যানারির পরিচালক মোহাম্মদ রিন্টু বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের কারণেও আমরা পিছিয়ে পড়ছি। অনেক সময় অর্ডার দিয়েও ট্যাক্সের দোহাই দিয়ে অর্ডার বাতিল করছে।
এ অবস্থায় সাভারে নতুন শিল্পনগরী, দ্রুত শতভাগ কার্যকর করার দাবি ট্যানারি মালিকদের সংগঠন- বিটিএর। বিটিএয়ের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, ‘রাস্তা-ঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে খুব দ্রুতই এ অবস্থার উত্তরণ সম্ভব।’ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একমত অর্থনীতিবিদরা। চামড়া শিল্পের সুরক্ষায়, পোশাক শিল্পের মতো শ্রমিক-মালিক ও সরকার, এই তিন পক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান তাদের। অর্থনীতিবিদ তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে আমাদের এই খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। এই খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য দরকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সদিচ্ছা।’ সেই সঙ্গে এই শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে সাভারে বরাদ্দ পাওয়া প্লটের মালিকানা, ট্যানারি মালিকদের দ্রুত বুঝিয়ে দেয়ার পরামর্শ তাদের।

টবে লাগানো গাছের পরিচর্যা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ টবে কোনো গাছ লাগাবেন সবার আগে সেই গাছের জন্য উপযুক্ত টব  বেছে নিন। উপযুক্ত জায়গায় টব রাখুন। গাছের জন্য দরকার পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ উর্বর মাটি। মাটি অনুর্বর হলে গাছ ভালো হবে না। মাটির তিনভাগের এক ভাগ জৈব সার দিতে হবে। সঙ্গে হাড়ের গুঁড়ো, একটু চুন, সামান্য একটু ছাই দিলে পোকা ও রোগ আক্রমণ কম হবে। গাছের গোড়া যেন নিচু না হয়, যাতে পানি না জমে সেজন্য একটু চেপে মাটি সামান্য উঁচু করে দিতে পারেন। সম্পূর্ণ নতুন টব। ভালো করে ধুয়ে নিন। নতুন গাছের চারা, দেখে কিনতে হবে রোগমুক্ত কিনা। তারপরেও পাতা হালকা সাধারণ পানি দিয়ে ধুয়ে নিন। শুকনো দূর্বা ঘাস টবের মাটির মাঝামাঝি দিয়ে তার ওপরে মাটি দিয়ে চারা গাছ লাগানো যায়। চারা কিনলে ছোট ধরনের কেনা উত্তম। গাছ সোজা রাখার জন্য খুঁটি বেঁধে দিন। খুঁটি হতে পারে বাঁশের কঞ্চি, গাছের ডাল বা অন্য সোজা  কোনো শক্ত কিছু। বনজ বা ফলজ গাছের জন্য এটা খুবই জরুরি। টবের গাছ ঘন ঘন পরিবর্তন করবেন না। আসুন  জেনে নিই টবে চাষ করার উপযুক্ত কিছু গাছের নাম ও তাদের পরিচর্যার পদ্ধতি।
মানিপ্ল্যান্ট ঃ পানি এবং মাটি দুই জায়গাতেই হয়। পানিতে লাগালে ৩-৪ দিন পর পানি পরিবতর্ন করা ভালো। মাটিতে লাগালে মাটি শুকনো হওয়ার আগে পানি দিন। কোনো রাসায়নিক সার সরাসরি গাছের গোড়ায় না দেয়া উত্তম। শিকড়ের ওপর দেবেন না।  গোবর সার দেয়া ভালো। যত কম পারবেন তত কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করুন।
ক্যাকটাস ঃ কণ্টকময় ভালোবাসা। যার আছে সেই তা বুঝতে পারে। পানির চেয়ে রোদ  বেশি দরকার। প্রতিদিন কিছুটা রোদে রাখুন। শীতকালে পানি কম দিলে চলে।
টবের গাছের জন্য যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত ভালো মাটি, দ্বিতীয়ত পরিমিত পানি, তিন-পর্যাপ্ত আলো ও রোদ, চার- নিয়মিত গাছ দেখা, পাঁচ- রোগ বুঝতে পারলে গাছের ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া। অবশ্য গাছভেদে এসবের পরিমাণে ভিন্নতা হতে পারে। প্রখর রোদে চারাগাছকে বেশি সময় সরাসরি রাখবেন না। রাতে গাছে পানি দেয়া উত্তম। রাতে ১০০ গ্রাম শুকনো মরিচের গুঁড়া ১০ লিটার পানিতে ভিজিয়ে সকালে কাপড় দিয়ে ছেঁকে নিন। এবার অল্প পরিমাণ গুঁড়া সাবান মিশিয়ে একটু ফেনা করে নিয়ে রোদ থাকাকালে ¯েপ্র করতে পারেন, ভালো উপকার হতে পারে। চায়ের পাতা, ডিমের খোসা, আলুর খোসা কিংবা চাল ধোয়া পানি গাছের জন্য উপকারী। অল্প করে দিতে পারেন।
এবার একটি জৈব সার বানানোর কৌশল জেনে নিন। চা-পাতা, ডিমের খোসা,  গোবর, শুকনো পাতা এক জায়গায় কিছুদিন রেখে দিন। ভালো জৈব সার হবে। ডিমের খোসা, কলার খোসা, এবং চা/কফির ব্যবহৃত গুঁড়া একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। তারপরে মিশ্রনটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখুন। কিছুদিন পর অল্প অল্প করে গাছের গোড়ার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিন। কিছুদিন পর পর অবশ্যই মাটি কাঁচি দিয়ে কুপিয়ে ওলট-পালট করে  দেবেন। বেশি সার, পানি দিলে গাছ তরতর করে বেড়ে উঠবে। এমনটা ভাববেন না। সব কিছুই দেবেন, তবে পরিমিত। ধৈর্য ধারণ করতে হবে। টবে লাগানো গাছে খৈল দিলে পিঁপড়ার উপদ্রব হতে পারে। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ৭ দিনে একবার চুনের পানি ¯েপ্র করা যায়। অথবা এক গ্যালন পানিতে অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট গুঁড়ো করে মিশিয়ে নিন। তারপর ¯েপ্র করতে পারেন। অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট ওষুধের দোকানে পাবেন। এক গ্যালন (ইউএস) হলো ৩.৭ লিটার।

সুুুগন্ধি ধানের চাষ লাভজনক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এই দেশে আউশ, আমন, বোরো মৌসুমে ধানের জাতে ও ব্যবহারে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্রতা। সেই বৈচিত্রতা উঠে এসেছে কবি জসীমউদ্দীনের একটি কবিতায়। তিনি লিখেছেনÑ আমার বাড়ি যাইও ভোমর, বসতে দেব পিঁড়ে, জলপান যে করতে দেব শালি ধানের চিঁড়ে। শালি ধানের চিঁড়ে দেব, বিন্নি ধানের খই…বাড়ীর গাছের কবরী কলা, গামছা বাঁধা দই। ধান চাষের তিনটি মৌসুমের মধ্যে আমন ও বোরো মৌসুম সুগন্ধি সরু বা চিকন ধান চাষের এর উপযুক্ত মৌসুম। এই ধানের রয়েছে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা। সুদীর্ঘ কাল থেকে গ্রাম বা শহরে ধনী কিংবা গরিব সবার ঘরোয়া কোনো উৎসবে, গায়ে হলুদ, বিয়ে, ঈদ, পূজায় অতিথি আপ্যায়নে সুগন্ধি চালের তৈরি পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, জর্দা, পায়েস, ফিন্নি, পিঠাপুলিসহ নানান মুখরোচক খাবার আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে স্থান করে নিয়েছে সুগন্ধির চালের তৈরি খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ এমনকি আলো ঝলমলে পাঁচতারকা হোটেলে কোনো উৎসব কিংবা সেট মেন্যুতে। হাজারো বছর ধরে কৃষকরা আমন মৌসুমে প্রচলিত জাত কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, চিনি আতপ, বাদশাভোগ, খাসকানী, বেগুনবিচি, তুলসীমালাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি ধান চাষ করে আসছে। প্রচলিত এসব জাত চাষাবাদে ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক সুগন্ধি ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম ও দীঘর্ গবেষণায় সুগন্ধি ধানের স্বাদ ও গন্ধ অক্ষুণœ রেখে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ সুগন্ধি ধান উৎপাদনের উপযোগী। বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর, নওগাঁ, রাজশাহী জেলায় সুগন্ধি ধান বেশি উৎপাদিত হয়। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে আমন মৌসুমে বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, বিনা ধান১৩ এ ছাড়া রয়েছে বিইউ সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১। বিইউ সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১ সুবিধা হচ্ছে আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেও চাষ করা যায়। ব্রি ধান৩৪ জাতের ধান চিনিগুঁড়া বা কালিজিরার মতোই অথচ ফলন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কৃষকরা এ ধানের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন। তা ছাড়া আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় এই জাতটি আমনে বন্যাপ্রবণ এলাকায় নাবিতে রোপণ উপযোগী। ব্রি ধান৭০ ও ব্রি ধান৮০ আমন মৌসুমের উচ্চফলনশীল ধান এবং আলোক অসংবেদনশীল। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫-৫.০ মেট্রিক টন। যা প্রচলিত জাত কাটারিভোগ ধানের চেয়ে দ্বিগুণ। ব্রি ধান৭০ ধানের চাল দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগের চেয়ে আরও বেশি লম্বা। আর ব্রি ধান৮০ থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় জেসমিন ধানের মতো, সুগন্ধিযুক্ত এবং খেতেও সুস্বাদু। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে সুগন্ধিযুক্ত আধুনিক জাত হচ্ছে ব্রি ধান৫০ যা বাংলামতি নামে পরিচিত। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫.৫ থেকে ৬ মেট্রিক টন। বাংলামতি ধান বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন জাতের ধানের চেয়ে দাম অনেক বেশি হওয়ায় লাভ বেশি হয়। এ জাতের চালের মান, স্বাদ, গন্ধ, বাসমতি চালের মতোই। দিনে দিনে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বাসমতি চালের স্থান দখল করে নিচ্ছে আমাদের বাংলামতি চাল। আমদানিকৃত বিদেশি বাসমতি চালের চেয়ে দাম অনেক কম, দেশি অন্যান্য সুগন্ধি জাতের ধানের চেয়ে ফলন বেশি হওয়ায় বাংলামতি ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। সব ধরনের মাটিতেই সুগন্ধি ধানের চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি সুগন্ধি চাষাবাদের জন্য বেশি উপযোগী। বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ এবং রোপা আমন মৌসুমে ১৫ থেকে ২৫ জুলাই পযর্ন্ত বীজতলায় বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে জুলাইয়ের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহে বপন করা ভালো। মূল জমি ভালোভাবে তৈরি করে আমন মৌসুমে ২৫ থেকে ৩০ দিনের এবং বোরো মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের চারা রোপণ করতে হয়। সুগন্ধি ধানের ভালো ফলনের জন্য সারব্যবস্থাপনা খুব জরুরি। সুগন্ধি ধানের জমিতে বিঘাপ্রতি বা ৩৩ শতকে আমনে আধুনিক জাত ব্রি ধান৩৪, ৩৭, ৩৮, ৭০, ৮০ বা বিনাধান১৩-এর ক্ষেত্রে ইউরিয়া ১৮-২০ কেজি, টিএসপি ১০-১২ কেজি, এমওপি ৯-১০ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি, দস্তা ১ কেজি হারে সার প্রয়োগ করতে হয়। আমনে স্থানীয় জাত যেমনÑ কাটারিভোগ, কালিজিরা ইত্যাদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি ইউরিয়া-ডিএপি/ডিএপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ১২-৭-৮-৬ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। সব ক্ষেত্রে প্রতিকেজি ডিএপি সারের জন্য ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া কম ব্যবহার করতে হবে। দেশি উন্নতমানের সুগন্ধি চাল সম্পর্কে ধারণা ও প্রচারণার অভাব থাকায় নামি-দামি হোটেল, রেস্তোরাঁয় আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি চালের পরিবর্তে বিদেশি চাল ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। অধিক পরিমাণে সুগন্ধি ধান চাষাবাদে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে আমাদের সুগন্ধি চালের ব্যাপক চাহিদা। গবের্র বিষয় বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ১৩৬টি দেশে রপ্তানি করছে। বতর্মান সরকারের সদ্বিচ্ছা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট দিক-নিদের্শনায় আধুনিক উচ্চফলনশীল সুগন্ধি ধানের এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধি হবে, নিদির্ষ্ট জেলাভিক্তিক চাষ হওয়া সুগন্ধি ধানের চাষাবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে, কৃষক সমাবেশ, মাঠ দিবসের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে সুগন্ধি ধান চাষে আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে। কৃষকের পরিশ্রমের ফসলের ন্যায্যমূল্যে নিশ্চিত করতে সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে এবং ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে বাংলার সুগন্ধি ধানের মান, পুষ্টিগুণের কথা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। সবার মধ্যে বিদেশি সুগন্ধি জাতের চালের ওপর নিভর্রতা কমিয়ে বাংলামতিসহ দেশীয় সুগন্ধি চালের তৈরি বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর নতুন নতুন আকষর্ণীয় খাবারের প্রতি উৎসাহিত করতে পারলেই সুগন্ধি ধানের হারানো ঐতিহ্যে ফিরে আসবে। কৃষকরা আথির্কভাবে লাভবান হবে এবং অপ্রতিরোধ্য দেশের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখবে।
লেখকদ্বয় ঃ ফার্ম ব্রডকাস্টিং অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং ঊধ্বর্তন যোগাযোগ কমর্কতার্, ব্রি, গাজীপুর

বাংলাদেশে জৈব জ্বালানি এখন সময়ের দাবি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দিন যাচ্ছে আর জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য মতে, ২০১২-১৩ অথর্বছরে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছিল ৪১ লাখ ২৯ হাজার ২৬২ টন, আর ২০১৬-১৭ অথর্বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ লাখ ৫৯ হাজার ৩৯৮ টনে। জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে ব্যাপকভাবে মোটর যানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। বিআরটিএর তথ্য মতে, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ লাখ ১৭ হাজার ৭৯২টি। যা ২০১৪ সালে ছিল ১৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৪টি। রাজধানী ঢাকা গত অক্টোবর মাসে মোটরযানের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭৪টি, যা ২০১০ সালে ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। জ¦ালানি তেলের চাপ কমাতে সিএনজির ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে দেশে গ্যাসের পরিমাণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসে বিকল্প হতে পারে বায়োগ্যাস বা বায়োফুয়েল। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্বেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে। গত ২০১০ সালে একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল চিনি কলগুলোতে উৎপাদিত চিটাগুড় থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদন করা হবে মোটরযান চালানোর জন্য। বছরে ৬০ লাখ টন বায়োফুয়েল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এই প্রকল্প বা উদ্যোগ থেমে যায়। ২০০৬ সালে চিনিশিল্প করপোরেশনের বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সঙ্গে যৌথ গবেষণা শুরু করেন। তারা চিটাগুড় থেকে মোটরগাড়ি চালানো যায় এমন পাওয়ার ইথানল উৎপাদনে সফল হন। পরে পেট্রোলের সঙ্গে শতকরা ১০ ভাগ পাওয়ার ইথানল মিশিয়ে গবেষণার সফলতা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হন গষেকরা। এ সাফল্যের ভিত্তিতে চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থা ২০০৭ সালে পাওয়ার ইথানল তৈরির জন্য দশর্না চিনিকলে (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করে। পরে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, কার্বন নিঃসরণ কমানো ও খনিজ তেলের ওপর নিভর্রতা কমাতে বিশ্বে এখন বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পাওয়ার ইথানলের সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে গাড়ি চালানো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি সবুজ শস্য ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ এই প্রথম কোনো উপজাত থেকে ইথানল তৈরি করছে বলে চিনি ও খাদ্য শিল্পসংস্থা সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ চিনিশিল্প করপোরেশনের মালিকানাধীন দর্শনা চিনিকলের (কেরু অ্যান্ড কোম্পানি) ডিস্টিলারিতে অ্যালকোহল তৈরির জন্য একটি প্ল্যান্ট বসানো হয়। দেশের চিনিকলগুলোতে প্রতিবছর চিনির উপজাত হিসেবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন চিটাগুড় পাওয়া যায়। এর বিশ্বের উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল রেখে বাংলাদেশের চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে চিনিকলগুলোতে চিনি ও গুড়ের পাশাপাশি জৈবজ্বালানি বা ইথানল উৎপাদনের কোনো বিকল্প দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, দেশে যে হারে আখের চাষ দিন দিন কমে যাচ্ছে, তাতে এ শিল্পকে ধরে রাখতে হলে চিনিকলে ইথানল তৈরি করাই সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে কৃষক ও চিনিশিল্প বেঁচে থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বে জৈব জ্বালানি হিসেবে মূলত ইথানল ব্যবহার করা হয়। আর আখের রস বা মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে প্রথমে ইথানল তৈরি করা হয়। এই ইথানল গ্যাসোলিন (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) এর সঙ্গে ২০-২৫ হারে মিশ্রিত করে অথবা পুরোটাই সরাসরি ইঞ্জিনচালিত যানবাহনে ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে ইঞ্জিনের সামান্য কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হয়। তারা বলেন, গ্যাসোলিনের (পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল) পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে ইথানল ব্যবহার করলে ৯০ শতাংশ কাবর্ন ডাই-অক্সাইড (গ্রিন হাউস গ্যাস) নিঃসরণ কম হয়। এটি ব্যবহারে ইঞ্জিনের শব্দ কম হয় এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বায়ুদূষণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ জন্যই, আধুনিক বিশ্বে ইথানলকে টেকসই জৈব জ্বালানির অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারা বলেন, আখ উৎপাদনে শীর্ষ দেশ ব্রাজিল তার মোট উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ আখ জৈব জ্বালানি (ইথানল) উৎপাদনে ব্যবহার করে এবং প্রতিটি ইঞ্জিনচালিত গাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে ২০-২৫ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত গ্যাসোলিন ব্যবহার করছে ব্রাজিলিয়ানরা। জ্বালানি নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ২০০৯ সালে জৈবজ্বালানি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যে নীতিমালায় চলতি ২০১৭ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ ইথানলমিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারকে বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। চীনেও ২০২০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত গ্যাসোলিন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। শুধু চীন ও ভারত নয় যেসব দেশে আখ উৎপাদিত হয় যেমন পাকিসস্তান, তুরস্ক, মেক্সিকো, থাইল্যান্ডসহ প্রায় সব দেশই এ পথে হাঁটছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশে এখন আখ উৎপাদন করে চাষির পাশাপাশি চিনিকলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশেরও বিরাট লোকসান হচ্ছে। তাই এদেশে আখ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ চাষি ও চিনিকলকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখে অন্যান্য দেশের মতো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে জৈব জ্বালানি তৈরির বিকল্প নেই। কারণ এক টন আখ থেকে চিনি (রিকভারি ৭.৫০ শতাংশ হলে) পাওয়া যায় ৭৫ কেজি। যার বতর্মান বাজারমূল্য ৩০০০ টাকা। আর ওই আখ থেকে প্রায় ৮৫ লিটার জৈব জ্বালানি (ইথানল) পাওয়া যায়, যার বাজার মূল্য ৮৫০০ টাকা। তাই জৈব জ্বালানি উৎপাদন কৃষকের সমৃদ্ধি বাড়াবে। যেহেতু বায়োফুয়েল উৎপাদনের মূল উপাদান খাদ্যশস্য, তাই এর উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা খাদ্যমূল্যে স্বাভাবিকভাবেই খারাপ প্রভাব ফেলবে। খারাপ পরিণতির কথা জেনেও মাকির্ন কংগ্রেস ২০০৫ সালে শুধু তাদের প্রয়োজনে বায়োফুয়েল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সাল নাগাদ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি লিটার বায়োফুয়েল উৎপাদন করবে বলে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। বাংলাদেশে জৈব জ্বালানি এখন সময়ের দাবি। এমতাবস্থায় চিটাগুড় থেকে বায়োফুলে উৎপাদনের বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

টার্কিতে পরিবর্তিত হচ্ছে ভাগ্য

কৃষি প্রতিবেদক ॥ টার্কি একটি বিশেষায়িত বিদেশি পাখি। উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকায় টার্কির চাহিদা ও জনপ্রিয়তা ব্যাপক। বাংলাদেশে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়ছে। এ দেশের আবহাওয়ার সাথে টার্কি সহজেই নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায়ও টার্কির মাংস বেশ উপযোগী। এর মাংসে চর্বি ও কোলেস্টেরলের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। দেশে মাংসের চাহিদা পূরণে বিশেষ করে ব্রয়লারের বিকল্প হিসেবে টার্কি যথেষ্ট উপাদেয় ও সম্ভাবনাময়। আর্থিক দিক বিবেচনায় টার্কি পালনে খরচও কম। এরা নরম লতাপাতা, ঘাস, সবজি জাতীয় খাবার বেশ উৎসাহের সঙ্গেই খেয়ে থাকে। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশ ভালো। রাণীক্ষেত, ফাউলপক্সসহ কিছু নির্দিষ্ট রোগের টিকা সময়মতো দিলে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই ঝুঁকিও অনেক কম এবং লাভও বেশি। খামারে পালনের পাশাপাশি বাড়িতে অল্প কিছু মুক্ত অবস্থায় ও স্বাচ্ছন্দে পালন করা যায়। বর্তমানে অনেক তরুণই আগ্রহ নিয়ে টার্কির খামার গড়ে তুলেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কেউ কেউ শখের বশে অল্প কিছু বাসায়ও পালন করছেন। এতে অনেক বেকার যুবকের ভাগ্য পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক পরিবার স্বচ্ছলতার ছোঁয়া পেয়েছে। নিতান্তই শখের বশে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরুয়া ইউনিয়নের নালী গ্রামের আব্দুল আজিজ খানের ছেলে রেজাউল করিম খান এবং রাকিব খান মিলে গড়ে তুলেছেন একটি টার্কি খামার। পেশায় রেজাউল করিম খান স্কুল শিক্ষক এবং রাকিব খান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এনিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদে চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন। তাদের খামারে এখন ছোট-বড় প্রায় দেড়শ’ টার্কি রয়েছে। আশেপাশের এলাকা থেকে আগ্রহী অনেক মানুষ ভিড় জমায় তাদের খামার দেখতে। তাদের দেখাদেখি অনেকেই নতুন করে টার্কি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। রেজাউল করিম খান বলেন, ‘টার্কি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। রাকিবের পড়াশোনার সুবাদে সহজেই আমরা খামারটি গড়ে তুলতে পেরেছি। মানসম্মত টার্কির বাচ্চা উৎপাদন ও ফার্মিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নিয়েছি।’ এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেজ্জাকুল হায়দার বলেন, ‘আমাদের দেশে ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়ছে। তাদের মতো অনেকেই টার্কির খামার গড়ে তুলছেন। আশা করা যায়, খুব শিগগিরই টার্কি শিল্প দেশে ভালো একটা স্থান পাবে।’

মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে জনপ্রিয় হচ্ছে আলোক ফাঁদ

একসাথে ৪০ ব্লকে ধানের পোকা শনাক্ত, ব্যবস্থাপনা প্রদান

কাঞ্চন কুমার ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে কৃষকদের কাছে ধানে আক্রান্ত  পোকামাকড় চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করার এখন জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো আলোক ফাঁদ। উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে কৃষি বান্ধব এ পদ্ধতিকে স্বাগত জানিয়ে ব্যবহার করছেন মাঝারি-ক্ষুদ্র থেকে প্রান্তিক কৃষকরা। কৃষকরা নিজেই জমিতে পোকাগুলোর উপস্থিতি  দেখতে পারছে। কখন কোন পোকার আক্রমন বেশি হতে পারে বা  পোকার উপদ্রব দেখতে পারছে। সে অনুযায়ী কৃষি অফিসের দেওয়া ব্যবস্থা পত্রের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহন করছে। এতে কৃষকরা ধান ক্ষেতে পোকার আক্রমণের আগেই কোন ওষুধ প্রয়োগ করতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে খুব সহজেই পোকা দমন করছে কৃষকরা। আর কৃষকদের এ পদ্ধতি ব্যবহারে এবং সার্বিক নিদের্শনা দিয়ে যাচ্ছে উপজেলা কৃষি অফিস এবং কৃষি কর্মকর্তারা। চলতি আমন মৌসুমে উপজেলায় ২১ হাজার ৭’শ ৫ হেক্টর রোপা আমন জমিতে ফসলের পোকা শনাক্ত এবং আলোক ফাঁদ পদ্ধতি কৃষকদের মাঝে ব্যাপক বিস্তারের লক্ষ্যে উপজেলা কৃষি অফিস নিয়েছে বিশেষ কর্মসূচি। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বিভক্ত ৪০টি কৃষি ব্লকে একযোগে আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হয়। ক্ষতিকর পোকা দেখে ব্যবস্থাপনা পত্র প্রদান করে কৃষি কর্মকর্তাগণ। এসময় প্রায় ৫ শতাধিক কৃষক এ পদ্ধতির ব্যবহার এবং সুফল সম্পর্কে জানতে পারে। ফসলের ক্ষতিকর ও পোকা মাকড় সম্পর্কে জানতে পেরেছে। উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, আমরা মনে করতাম ফসলে পোকা থাকলেই তা ক্ষতি করে। তাদের মেরে ফেলতে হবে। তবে আজকে এই আলোক ফাঁদের মাধ্যমে জানতে পারলাম জমিতে উপকারী পোকাও থাকে। কখন পোকা দমন করতে হবে। আমার জমিতে কোন পোকা বেশি (উপকারী না অপকারী) তা আমি নিজেই পরীক্ষা করতে পারবো। একই এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারবো কোন প্রকার উপদ্রব বেশি। এতে সে অনুযায়ী আমরা ওষুধ দিতে পারবো। তিনি আরো জানান, এর খরচও কম। আর বাড়ীতেই তৈরী করা যায়। তিনটা খুটি একসাথে বেধে হ্যারিকেনের মতো করে সাবান গুড়া মিশ্রিত পানির পাত্রের উপর আলোর উৎস হিসাবে  বৈদ্যুতিক বাল্ব স্থাপন করে ধান ক্ষেতের চার পাশে আইল হতে একটু দূরে স্থাপন করে পোকা আলোতে আকর্ষিত হয়ে সাবান গুলা পানিতে আটকে যায়। যার ফলে  পোকার উপপস্থিতি জানা যায় এভাবেই আলোক ফাঁদের মাধ্যমে পোকা জরিপ করা হয় বলে জানায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, আমরা সোমবার উপজেলার ৪০ টি ব্লকে একযোগে এ আলোক ফাঁদ স্থাপন করি। এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় কৃষকদের নিয়ে আমরা সরেজমিনে তা পরিদর্শন করি। এসময় ধানের জমিতে উপকারী ও ক্ষতিকর পোকা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে ক্ষতিকর পোকার ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়। তিনি আরো জানান, আলোক ফাঁদে আকর্ষিত হয়ে  যে সকল পোকা এসেছে তার মধ্যে ধানের শক্র পোকা। এছাড়া সবুজ পাতা ফড়িং, সাদা পাতা ফড়িং উপস্থিতি পাওয়া  গেছে যেটি নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রয়েছে। এটি একটি সহজলভ্য পদ্ধতি। কৃষকরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে খুব সহজেই ধানের ক্ষেতে  পোকা মাকড়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। এছাড়া মিরপুরে আলোক ফাঁদ ব্যবহারে কৃষকরা বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতি মধ্যেই বেশ কিছু ব্লকে কৃষকরা এ আলোক ফাঁদ ব্যবহার করছে।

পুষ্টিগুণে ভরপুর মাশরুম

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন মাশরুম। কেউ কেউ একে ব্যাঙের ছাতাও বলে থাকে। বর্তমানে খাবার হিসেবেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মাশরুম। রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল উপাদান। দেহের রোগ- প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি সহায়ক অত্যাবশ্যকীয় ১০টি অ্যামাইনো এসিডও বিদ্যমান। চর্বির পরিমাণ খুবই কম থাকে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও ক্যান্সারসহ বেশকিছু মারাত্মক রোগব্যাধি প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মাশরুম। নানা ধরনের খাবারও তৈরি করা হচ্ছে মাশরুম থেকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া মাশরুম চাষের জন্য বেশ উপযোগী। পুষ্টির ঘাটতি পূরণ, দারিদ্র বিমোচন, মাথাপিছু আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মাশরুম চাষ। বেকার তরুণ -তরুণীদের কর্মসংস্থানেরও দুয়ার খুলে দিতে পারে বিভিন্ন ভালো জাতের মাশরুম চাষ। এছাড়াও অনেকে বাসা বা বাড়ির আনাচে -কানাচে ছোট পরিসরে অনেকটা শখের বশেও মাশরুম চাষ করে থাকে। জানা যায়, সারাবিশ্বে প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির মাশরুম রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার প্রজাতি খাবার উপযোগী এবং ৭০০ প্রজাতি ঔষধি হিসেবে খ্যাত। বাকিগুলোর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রজাতির মাশরুমই বিষাক্ত। সম্প্রতি জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কেন্দ্র হতে ৯ প্রজাতির মাশরুম চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। সারা বছরই চাষ করা যায়, এমনকি চাষের ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়াও সাভারে অবস্থিত এ মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে বিনামূল্যে মাশরুম চাষের ওপর প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। এ কার্যক্রম চলে প্রতিদিন সকাল ৯টা হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। প্রতিদিন প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য আগ্রহীরা ভিড় জমান। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনেই রয়েছে বাহারি মাশরুম বিক্রির জন্য ছোট একটি হাট। মাশরুম বিক্রেতারা জানান, প্রতিদিন সাধারণত একেকজন প্রায় ১৫-২৫ কেজি মাশরুম বিক্রি করে থাকেন। প্রত্যেকের মাসিক আয় ২৫-৩০ হাজার টাকা। মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক ড. নিরদ চন্দ্র সরকার বলেন, আমরা বাংলাদেশে চাষের উপযোগী ৯টি জাত অবমুক্ত করেছি। মাশরুম চাষের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। প্রয়োজনীয় পুষ্টি চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে মাশরুম চাষ।

অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার কমাতে মিরপুরে রোপা আউশ ধানের বিপ্লব

কাঞ্চন কুমার ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে এবার রোপা আউশ ধানের ব্যাপক চাষাবাদ হয়েছে। যা কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে। কৃষক ফলনও পাচ্ছে আশানুরূপ। ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ কমিয়ে, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং মাত্রাতিরিক্ত নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার কমাতে রোপা কৃষি বিভাগ রোপা আউশ ধানের চাষে জোর দেয়। এতে চলতি আউশ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি চাষাবাদ হয়েছে। মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের আউশ মৌসুমে মিরপুর উপজেলায় ৭ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে রোপা আউশ ধানের চাষ করা হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৬ হাজার ৩৫১ হেক্টর। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪৪৫ হেক্টর বেশি। বৃষ্টি নির্ভর রোপা আউশ মৌসুমে মিরপুর উপজেলায় হেক্টর প্রতি গড়ে ফলন হয়েছে ৪ দশমিক ৫০ টন। বর্তমান বাজার মুল্যে যার দাম ৫৭ কোটি ৮২ হাজার ৫শ টাকা প্রায়। এবছর মিরপুর উপজেলায় উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ব্রি-ধান-৪৮ এবং বিআর-২৬ জাতের চাষ বেশি হয়েছে। সেই সাথে হাইব্রিড জাতের মধ্যে এ্যারাইজ তেজগোল্ডও লক্ষ্য করার মতো। মিরপুর উপজেলার কৃষক মোতালেব হোসেন জানান, এবার রোপা আউশ ধানের ফলন ভালো। এবং বৃষ্টি হওয়ায় ফলনও ভালো হয়েছে। বোরো মৌসুমের চেয়েও রোপা আউশে খরচ অনেক কম। আরেকজন কৃষক আলফাত হোসেন জানান, বিগত বছরের চেয়ে এবছর রোপা আউশের ভালো ফলন হয়েছে। আগামীতে আমাদের এই এলাকায় রোপা আউশের ধান চাষ বৃদ্ধি যাবে। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, এই অঞ্চলের কৃষকরা বোরো চাষে বেশি আগ্রহ দেখায়। বোরোতে মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার করে। যার ফলে নাইট্রা অক্সাইড নির্গত হয় যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি আরো বলেন, মাননীয় কৃষি মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমানোর জন্য আমরা মিরপুর উপজেলার রোপা আউশ ধানের চাষ করার পরামর্শ দিয়েছি। কৃষকদের বিভিন্ন প্রনোদনার মধ্যদিয়ে উৎসাহিত করেছি। এছাড়া রোপা আউশ ধান বৃষ্টি সেচের উপর নির্ভর হওয়ায় উৎপাদন খরচ কম হয়। কৃষকরা এবছর বেশি রোপা আউশে আগ্রহ দেখাচ্ছে। যার ফলে এই উপজেলায় চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমান রোপা আউশ ধানের চাষ হয়েছে।

দৌলতপুরের পশু হাটগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়

শরীফুল ইসলাম ॥ আর মাত্র একদিন পরই ঈদ। তাই ঈদকে সামনে রেখে শেষ মুহুর্তে জমে উঠেছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের পশু হাটগুলো। প্রতিটি হাটে এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় রয়েছে। এবার উপজেলার বিভিন্ন পশুহাটে ভারতীয় গরুর আমাদানি না থাকলেও দেশী গরুর আমাদানি রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমানে। সেই সাথে পশুর দাম নিয়েও ক্রেতা বিক্রেতাদের মাঝে রয়েছে দ্বিমত। তারপরও পছন্দের পশুটি ক্রয় করতে পেরে যেমন খুশি ক্রেতারা তেমনি বিক্রয় করতে পেরেও বিক্রেতারা খুশি। তবে পশুর খাদ্য সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারন দেখিয়ে বাড়িতে পশু পালনকরা কৃষকরা তাদের পশুর দাম হাকলেও ক্রেতারা সেটাকে মনে করছেন অনেক বেশী। এদিকে শনিবার দুপুরে আল্লারদর্গা পশুহাটে কোরবানীর পশু ক্রয় করতে এসে ভারতীয় গরু না আসায় এবার গরুর দাম বেশী বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. রেজাউল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, এবার কোরবানীর পশুর দাম বেশী। ভারতীয় গরু না আসার কারনে গরুর দাম বেশী। তারপরও তিনি দেশী গরুর আমদানি বেশী হওয়া সন্তোষ প্রকাশ করেন। অপরদিকে বিভিন্ন পশু হাটে অসুস্থ কোরবানীর গরু বা মহিষ বা ছাগল ক্রয় বিক্রয় করা হচ্ছে কি না তার তদারকিসহ পশুর চিকিৎসা সেবা ও জাল টাকা লেন-দেন হচ্ছে কি না তারও তদারকি করছেন দৌলতপুর প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পশু হাটগুলোতে অসুস্থ পশু বা ষ্টেরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ানো পশু হাটে আসছে কিনা বা জাল টাকা ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা তদারকিসহ কোরবানীর পশু জবাই করা বিষয়ক জনসেচেতনতা মূলক বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পশু কোরবানী অপরিহার্য্য। তাই সামর্থবান ব্যক্তিবর্গ পরিবারের সদস্যদের সাথে বিভিন্ন হাটে ঘুরে ফিরে পছন্দের কোরবানীর পশুটি ক্রয় করে বাড়ি ফিরছেন ঈদের বাড়তি আনন্দ নিয়ে। আর কোরবানীর পশু ক্রয় করাও ঈদ আনন্দের একটি অপরিহার্য অংশ বলে মনে করেন কোরবানী পশু ক্রয় করতে আসা দৌলতপুরের বাহিরমাদী গ্রামের এ্যাড. মো. হাসানুল আসকার হাসু।

কোরবানির পশু কেনায় সতর্কতা!

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত ঈদুল আজহায় বিত্তবান মুসলিমরা গরু, মহিষ, ছাগল, উট ইত্যাদি পশু কোরবানি দিয়ে গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। কোরবানির পশু হিসেবে অধিকাংশ মানুষেরই প্রথম পছন্দ গরু। সাধারণত লালন-পালন করা হয়েছে এবং মায়া জন্মেছে এমন পশুকে কোরবানি দেয়ার কথাই ধর্মে বলা হয়েছে। সুস্থ কোরবানির পশু কোরবানি কবুলের অন্যতম শর্ত। তবে এই ব্যস্ত জীবনে পশু পালন করার সুযোগ হয়ে ওঠে না। তাই ঈদের কিছুদিন আগে কোরবানির পশু কিনতে সবাই হাটে ছোটেন। শহরের অনেকেরই গরু সম্পর্কে ধারণা কম থাকে। চোখের সৌন্দর্যেই গরু কিনে নিয়ে আসেন। অনেকেই অভিযোগ করেন, পশু অসুস্থ; অথবা কিনে আনার দুদিন পরই মারা গেছে। এসব অঘটন এড়িয়ে চলতে কোরবানির গরু বা পশু কেনার সময় কিছু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
কিছু বিষয় খেয়াল রাখলে সুস্থ পশু কেনা সম্ভব। কোরবানির পশু কেনার সময় লক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো- দেখতে তরতাজা লাগছে এমন পশু নির্বাচন করুন সতেজ পশুর বৈশিষ্ট্য হলো ত্বক উজ্জ্বল থাকবে; দেখতে ফ্যাকাসে লাগবে না। কোরবানির পশু অসুস্থ থাকলে অস্বাভাবিকভাবে মাথা নিচু করে রাখবে। অসুস্থ পশু প্রকৃতি এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে উদাসীন থাকবে। নড়াচড়া কম করবে বা করবেই না। অসুস্থ পশু অন্য পশুর পেছনে লুকানোর চেষ্টা করবে। হালকা এবং ঘন ঘন কাশি দিচ্ছে এমন পশু না কেনাই ভালো। পশুর কান সমান আছে কিনা লক্ষ্য করুন। কান নিচের দিকে ঝুলে থাকলে বুঝবেন পশুটি অসুস্থ বা কোনো সমস্যা আছে। কোরবানির পশু সুস্থ থাকলে কথার সঙ্গে সঙ্গে কান নাড়িয়ে সাড়া দেবে। বিমর্ষ চোখ থাকলে এবং চোখের কোণে ড্রেইনের মতো দাগটি বেশি বড় থাকলে বুঝবেন পশুটি অসুস্থ। শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে যাওয়া পশুর অসুস্থতার লক্ষণ। পশুর মুখ এবং নাকে লালা লেগে থাকা ভালো লক্ষণ। শুকনা ও খসখসে মুখ পশুর অসুস্থতার লক্ষণ বহন করে। বামদিকে পশুর পেটের ঠিক পেছনের অংশটুকু ফুলে থাকলে বুঝবেন পশুর পেটের সমস্যা হয়েছে; এ ধরনের পশু কেনা থেকে বিরত থাকুন। সাধারণত পেটের এই অংশটুকু নরম থাকে; এখানে চাপ দিলে আঙুল বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই অংশটুকু কখনো শক্ত থাকে না। এই অংশটুকু শক্ত হয়ে থাকলে বুঝবেন গরুর কোনো সমস্যা আছে। তারপরও, কোরবানির পশু কিনে এনে একজন অভিজ্ঞ পশু চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিলে ভালো হয়। তিনি গরুর শরীরের অবস্থা দেখে যেভাবে বলবেন, সেভাবে পশুর যতœ নিন; কোরবানির পশু নিয়ে ভয় অনেক খানি কমে যাবে।

লটকন উত্পাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের অপ্রচলিত, আকর্ষণীয়, ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ দেশীয় টক-মিষ্টি ফল লটকন। আশার খবর হচ্ছে, নরসিংদী, ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ দেশের অনেক স্থানেই লটকনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। তবে পুরো বাংলাদেশেই ফলটির বাণিজ্যিক চাষাবাদ সম্ভব। কেননা লটকন উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী। বর্ষাকালীন এ ফলটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইংরেজিতে বার্মিজ গ্রেপ নামে পরিচিত হলেও আমাদের দেশে এ ফলটি বুবি, বুগি, লটকা, লটকো, নটকো ইত্যাদি নামে পরিচিত। মার্চ মাসের দিকে লটকন গাছে ফুল আসে এবং ফল পরিপক্ব হতে চার-পাঁচ মাস সময় লাগে। লোভনীয় রঙ ও আকৃতির থোকা থোকা লটকন ঢাকাসহ সারা দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। ১০-১৫ বছর আগেও লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না। দামও ছিল কম। সেজন্য কেউ লটকনের বাগান করার চিন্তা করতেন না।
বর্তমানে এ ফলের চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়েছে। এমনকি অন্যান্য ফল চাষের তুলনায় লটকন চাষ বেশ সহজ এবং ফলনও ভালো হওয়ায় চাষিরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে লটকন বাজারে পাওয়া যায়। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কান্ডগুলোয় বেশি ফল আসে। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে পাঁচ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তাই সারা দেশেই (নিচু এলাকা বাদে) এর বাণিজ্যিক চাষ করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একটি পূর্ণ বয়স্ক লটকন গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে ১০০ কেজি পর্যন্ত লটকন সংগ্রহ করা সম্ভব। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করে নিয়েছে নরসিংদীর শিবপুরের লটকন। দেশের লটকন ইংল্যান্ড, কাতার, সৌদি আরবসহ নানা দেশে রফতানি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর লটকন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ২০-২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। এ বিষয়ে নরসিংদীর লটকন চাষীরা জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শে এবং ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিটি জেলায় লটকনের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করা যেতে পারে।
কৃষির ওপর নির্ভরশীল এলাকা ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক পরিবারের অর্থভাগ্য খুলেছে মৌসুমি ফল লটকন বিক্রি করে। কোনো ধরনের পরিচর্যা ছাড়াই প্রকৃতিগতভাবে জন্ম নেওয়া দেশীয় লটকন ফল (বুবি) বাগানের মালিকরা কয়েক দশক ধরে প্রতি মৌসুমে শুধু লটকন ফল বিক্রি করে ঘরে তুলছেন লাখ লাখ টাকা। উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ১০টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ৮০ হেক্টর জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে ছোট-বড় ২৫০টি লটকন ফলের বাগান রয়েছে। লটকন চাষ কয়েক দশক ধরে উপজেলায় কৃষিনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থিক চাহিদা পূরণসহ অনেকের সংসারে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা।
কৃষি অধিদফতরের বিভিন্ন সূত্র মতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ টন লটকন বিদেশে রফতানি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে চলতি অর্থবছরেও বিপুল পরিমাণ লটকন বিদেশে যাবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার টন লটকন উৎপাদন হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি ও বাউ লটকনের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি লটকন-১ ও বাউ লটকন-১ এখন কৃষক পর্যায়ে চাষ হচ্ছে।
লেখক ঃ এস এম মুকুল, বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক।