টিস্যু কালচার করে কম জমিতে অধিক আলু উতপাদন হচ্ছে

কৃষি প্রতিবেদক \ আলুর ব্যবহার এখন সর্বজনীন। চাহিদা ও উৎপাদন দুই-ই বেড়েছে। দেশের আলু বিদেশেও সুনাম কুড়িয়েছে। বেড়েছে রফতানি। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে। এই তথ্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত। কৃষক এখন জানে কিভাবে টিস্যু কালচার করে কম জমিতে অধিক আলু উৎপাদন করা যায়। কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গত প্রায় তিন যুগে আলুর উৎপাদন অন্তত দশগুণ বেড়েছে। ১৯৮০ সালে উৎপাদিত হয় ৯ লাখ মেট্রিক টন। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ লাখ মে.টনের বেশি। চলতি বছর আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি টনেরও বেশি। ইতোমধ্যে আলু উৎপাদন প্রধান অঞ্চলগুলোতে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে। রবি ফসলের আলু উৎপাদনের মৌসুমও শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষক আলু আবাদে কোমড় বেঁধে নেমেছে। বিশেষ করে বন্যায় আক্রান্ত এলাকার কৃষক ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আলু আবাদে গুরুত্ব দিয়েছে। একটা সময় আলু ছিল গ্রামের মানুষের খাবার। বর্তমানে আলু আভিজাত্যের খাদ্য তালিকার ওপরের দিকে উঠেছে। ফাস্টফুডে আলু না হলেই নয়। দেশের আলু ফ্রান্সে গিয়ে ফ্রাই তৈরির পর রেসিপি হয়ে ফেরে। চাইনিজ রেস্তরাঁয় দেশী পরিচিতি হারিয়ে প্রবেশ করেছে ফ্রেন্স ফ্রাই নামে। আলু দিয়ে তৈরি হচ্ছে চটপটি, ফুচকা, আলুর চপ, পুড়ি, লুচি, পরোটা, বরফিসহ নানা স্বাদের খাবার। পটাটো চিপসের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। সেদিনের মজলিসের সেই আলু ঘাটি শহরের আতিথেয়তায় পরিবেশিত হয়। আলু দিয়ে খাবারের তালিকা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে চাহিদাও বেড়েছে। ষাটের দশকে হল্যান্ডের আলু বাংলাদেশে আমদানি হয়ে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশের আলুর চাহিদা বেড়েছে বিদেশে। রফতানি হচ্ছে ভিয়েতনাম, রাশিয়া, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ প্রায় ২৮টি দেশে। সূত্র জানায় গত পাঁচ বছরে আলু রফতানি অন্তত দশগুণ বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে আলু রফতানি হয় সাড়ে ৯ হাজার মে.টন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ টনে। উত্তরাঞ্চলের আলু উৎপাদনের বড় এলাকা বগুড়া ও জয়পুরহাট। এই দুই জেলায় আলু আবাদ বেড়েছে। আলু মৌসুমে বগুড়ার বড় হাট শিবগঞ্জের কিচক হাটে স্থান সঙ্কুলান হয় না। বগুড়া-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই ধারে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে আলুর বেচাকেনা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রফতানিকারক ও মহাজনরা ট্রাকের পর ট্রাক আলু কিনে নিয়ে যায়। বর্তমানে আলু আবাদ শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের প্রতিটি এলাকায় আলু চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। নানা জাতের আলুর আবাদ হচ্ছে দেশজুড়ে। কৃষির বীজ বিভাগ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত আলুর ৭১টি জাতের বীজের ছাড়পত্র মিলে অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত জাত ১৩টি। বাকি জাত দেশের বিভিন্ন কোম্পানির। যা এসেছে বিদেশ থেকে। বেশিরভাগ জমিতে আবাদ হচ্ছে কার্ডিনাল, এসটারিক্স, ডায়মন্ড, গ্র্যানুলা, বিনেলা, লেডি রোজেটা, কারেজ, এটলাস, বেলিনি, বেলারুশ, আটলান্টিক বিভালাডি, রেড ফ্যান্টাসি ইত্যাদি। এর সঙ্গে বারি উদ্ভাবিত আলু বারি-৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৩ জাত মাঠে আবাদ পর্যায়ে রয়েছে। আলু আবাদে মাঠের কৃষক এখন অনেক দক্ষ। তারা আগাম আলু উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন জাত সংগ্রহ করে। বীজ সংগ্রহে টিস্যু কালচারের মতো উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখেছে। কৃষি বিভাগ সূত্রের খবর- দেশে আলু বীজের চাহিদা অন্তত ৭ লাখ মে.টন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বেসরকারী সংস্থা ও কৃষকের ঘরে যে বীজ আছে তা দিয়ে এবারের চাহিদা মিটবে, এমনটি আশা কৃষি অধিদফতরের। বিএডিসি জানিয়েছে, সরকার আলু চাষে গুরুত্ব দিয়েছে। বীজ সার উপকরণ সময়মতো দেশের প্রতিটি এলাকায় পৌঁছানো হয়েছে। গুণগতমানের বীজ সংরক্ষণে বিএডিসির আওতায় রয়েছে ২৫টি হিমাগার। খাবার আলু সংরক্ষণে দেশজুড়ে বেসরকারী পর্যায়ে রয়েছে ৪শ’রও বেশি হিমাগার। আলু রফতানিকারকরা তাদের বিশেষায়িত হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করছে।

রসুন বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থকরী মসলা জাতীয় ফসল

কৃষি প্রতিবেদক \ রসুন বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অর্থকরী মসলা জাতীয় ফসল। এটি রান্নার স্বাদ, গন্ধ ও রুচি বৃদ্ধিতে অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমদানী করে আমাদের দেশের রসুনের ঘাটতি মেটানো হয়ে থাকে, যা দেশের জন্য কাম্য নয়। বাংলাদেশের প্রায় ৬৬ হাজার একর জমিতে রসুনের আবাদ হয় এবং মোট উৎপাদন প্রায় ১০২ হাজার টন কিন্তু তা আমাদের চাহিদার মাত্র ৪ ভাগের এক ভাগ পূরণ করে। পুষ্টিমূল্য ও ভেষজ গুণ ঃ রসুনে আমিষ, প্রচুর ক্যালসিয়াম ও সামান্য ভিটামিন ‘সি’ থাকে। রসুন ব্যবহারে অজীণর্তা, পেটফাঁপা, শুলবেদনা, হৃদরোগ, অর্শ, ক্রিমি, সর্দি, কাশি, টাইফয়েড, ডিপথেরিয়া, বাতরোগ, গুরুপাক, বলবর্ধক, শুক্রবর্ধক ও যে কোন প্রকার চর্মরোগ সারে। এছাড়া রসুন থেকে তৈরি ঔষুধ নানা রোগ যেমন-ফুসফুসের রোগ, আন্ত্রিকরোগ, হুপিংকাশি, কানব্যাথা প্রভৃতিতে ব্যবহৃত হয়। উপযুক্ত জমি ও মাটি ঃ পানি জমে না এমন উর্বর দো-আঁশ মাটিতে রসুন ভাল জন্মে তবে এঁটেল দো-আঁশ মাটিতেও চাষ করা যায়। এঁটেল মাটিতে কন্দ সুগঠিত হয় না। জমিতে পানি বের হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে কন্দ বড় হয় না এবং রসুনের রং খারাপ হয়ে যায়। বাংলাদেশের দিনাজপুর, রংপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর ও বরাইগ্রাম, পাবনা জেলার চাটমহর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার তারাশ উপজেলায় রসুন বেশি উৎপাদিত হয়। জাত পরিচিতি ঃ বারি রসুন-১: গড় উচ্চতা ২৫ ইঞ্চি, পাতার সংখ্যা (প্রতি গাছে) ৭-৮টি, কোয়ার সংখ্যা (প্রতি কন্দে) ২০-২২টি, কোয়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ১ ইঞ্চি, বাল্বের ওজন ২০.০৮ গ্রাম, রোগ ও পোকার আক্রমণ খুব কম, জীবন কাল ১৪০-১৫০ দিন, ফলন (একর প্রতি) ২০০০-৩০০০ কেজি। বারি রসুন-২: গড় উচ্চতা ২২ ইঞ্চি, পাতার সংখ্যা (প্রতি গাছে) ৯-১০টি, কোয়ার সংখ্যা (প্রতি কন্দে) ২৩-২৪টি, কোয়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ১ ইঞ্চি, রোগ ও পোকার আক্রমণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ও সংরক্ষণ ক্ষমতা ভাল, জীবন কাল ১৪৫-১৫৫ দিন, ফলন (একর প্রতি) ৩০০০-৪০০০ কেজি। বাউ রসুন-১ ঃ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত¡ বিভাগ হতে এ নামের একটি রসুনের জাত বের করা হয়েছে। এটি ব্যাকটেরিয়াল সফ্ট-রট প্রতিরোধী, ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত কিছু রোগ প্রতিরোধী, উচ্চ ফলনশীল এবং সংরক্ষণ গুন ভাল। বাউ রসুন-২: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত¡ বিভাগ দীর্ঘদিন যাবত গবেষণা চালিয়ে ভাইরাস প্রতিরোধী এ জাত বের করেছে। এটি উচ্চ ফলনশীল, ভাইরাস রোগ প্রতিরোধী, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম, সংরক্ষণ গুন ভাল এবং ফলন প্রতি একরে ৫০০০-৬০০০ কেজি। ইটালী (দেশী জাত): গাছগুলো শক্ত, চওড়া, পাতাগুলো উপরের দিকে থাকে এবং ফলন বেশি হয়। আউশী (দেশী জাত): পাতা অপেক্ষাকৃত ছোট ও চিকন, কন্দ ছোট, ঢলে পড়ে, ফলন কম, বাজারে চাহিদা ও মূল্য কম। বীজ বপন ঃ শুকনো রসুনের বাহিরের সারির কোয়া লাগানো হয়। ১৫ সে.মি. দূরত্বে সারি করে ১০ সে.মি. দূরে ৩-৪ সে.মি. গভীরে রসুনের কোয়া লাগানো হয়। প্রতি হেক্টরে ৩০০-৩৫০ কেজি বীজ রসুনের প্রয়োজন হয়। সার ব্যবস্থাপনা ঃ রসুনে হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ হলো- গোবর ১০ টন, ইউরিয়া ২০০ কেজি, টিএসপি ১২৫ কেজি, এমওপি ১০০ কেজি, জিংক সালফেট ২০ কেজি, বোরাক্স ১০ কেজি ও জিপসাম ১০০ কেজি। জমি তৈরির সময় সমুদয় গোবর, টিএসপি, জিংক সালফেট, বোরাক্স ও জিপসাম মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। রসুন লাগানোর ৩০ দিন ও ৬০ দিন পর যথাক্রমে ১ম ও ২য় কিস্তির উপরি সার প্রয়োগ করা হয়। প্রতিবারে প্রতি হেক্টরে ১০০ কেজি ইউরিয়া ও ৫০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করা হয়। চাষের সময় পরিচর্যা ঃ আগাছা দমন ঃ রসুন লাগানোর ১৫ দিন পর আগাছা বেশি হলে অর্থাৎ আগাছাগুলো নাড়ার উপর দিয়ে যখন উঠে তখন রনষ্টার ৫০ মিলি প্রতি বিঘাতে ৪০-৫০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। জমিতে আগাছা হলে অবস্থা বুঝে একাধিকবার নিড়ানী দিতে হবে। বন্যা প্লাবিত এলাকায় জিরো টিলেজে মালচিং এর মাধ্যমে রসুন লাগানো যাবে। তবে কোন কোন সময় বীজ রোপণ হতে রসুন উত্তোলন পর্যন্ত একটি নিড়ানী লাগতে পারে। তবে নিড়ানী নির্ভর করবে রসুন ক্ষেতে আগাছার পরিমাণের উপর। সেচ ব্যবস্থা ঃ রসুন লাগানোর পর জমির রস বুঝে সেচ দিতে হয়। রসুনের কোয়া লাগিয়েই একবার সেচ দেওয়া হয়। এর পর চারা বের না হওয়া পর্যন্ত জমিতে পর্যাপ্ত রস থাকতে হবে। চারা একবার হয়ে গেলে ১০-১৫ দিন অন্তর সেচ দিলেও চলে। রসুনের জমিতে বিশেষ করে, কন্দ গঠনের সময় উপযুক্ত পরিমাণে রস থাকা দরকার। সে জন্য এ সময় অবশ্যই সেচ দিতে হবে। কন্দ যখন পরিপক্ক হতে থাকে তখন সেচ কম দিতে হয়। এই ফসলে মোটামুটি ৪-৫ টি সেচের দরকার হয়। ড্রেনের দু’পাশের নালা দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া সুবিধাজনক। নালা দিয়ে জমিতে সমভাবে ও সহজেই পানি সেচ দেয়া এবং জমিতে বেশি পানি থাকলে তা বের করে দেওয়া যায়। গাছের গোড়ায় মাটি ঃ চারা গজালে সারির দু’ধার থেকে গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হয়। জমিতে খড় বিছানো ঃ বীজ জমিতে বপনের পর পরই জমিতে খড় বিছিয়ে দেয়া যায়। রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা ঃ পোকার নাম ঃ থ্রিপস- এ পোকা ছোট কিন্তু পাতার রস চুষে খায় বিধায় গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে। সে কারনে ক্ষেতের মধ্যে পাতা বিবর্ণ দেখালে কাছে গিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখা উচিৎ, তা না হলে ফলন অনেক কমে যাবে। পোকা আকৃতিতে খুব ছোট। স্ত্রী পোকা সরু, হলুদাভ। পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ গাঢ় বাদামী। বাচ্চা সাদা বা হলুদ। এদের পিঠের উপর লম্বা দাগ থাকে। ক্ষতির নমুনা ঃ এরা রস চুষে খায় বলে আক্রান্ত পাতা রূপালী রং ধারণ করে। আক্রান্ত পাতায় বাদামী দাগ বা ফোঁটা দেখা যায়। অধিক আক্রমণে পাতা শুকিয়ে যায় ও ঢলে পড়ে। রাইজোম আকারে ছোট ও বিকৃত হয়। জীবন চক্র ঃ স্ত্রী পোকা পাতার কোষের মধ্যে ৪৫-৫০ টি ডিম পাড়ে। ৫-১০ দিনে ডিম হতে নিম্ফ (বাচ্চা) বের হয়। নিম্ফ ১৫-৩০ দিনে দুটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রথম ধাপে খাদ্য গ্রহণ করে এবং দ্বিতীয় ধাপে খাদ্য গ্রহণ না করে মাটিতে থাকে। এরা বছরে ৮ বার বংশ বিস্তার করে। এবং স্ত্রী পোকা পুরুষ পোকার সাথে মিলন ছাড়াই বাচ্চা দিতে সক্ষম। ব্যবস্থাপনা ঃ সাদা রংয়ের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার। ক্ষেতে মাকড়সার সংখ্যা বৃদ্ধি করে এ পোকা দমন করা যায়। আক্রমণ বেশি হলে সাইপারমেক্সিন গ্র“পের সাইপেরিন, সাইপার অথবা ইমাডিক্লোরো ফিড গ্র“পের এডমায়ার প্রতি লিটারে ১ মিলি সাইপারমেক্সিন অথবা ইমিডা ক্লোরোফিড প্রতি লিটারে ০.৫ মিলি গাছে ৪ থেকে ৫ দিন পরপর ¯েপ্র করতে হবে। রোগের নাম ঃ কান্ড পঁচা- স্কেলরোসিয়াম রলফসি ও ফিউজারিয়াম নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়। যে কোন বয়সে গাছ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কন্দ ও শিকড়ে এর আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত কন্দে পচন ধরে এবং আক্রান্ত কন্দ গুদামজাত করে বেশী দিন রাখা যায় না। ক্ষতির নমুনা ঃ আক্রান্ত গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় ও ঢলে পড়ে। টান দিলে আক্রান্ত গাছ খুব সহজে মাটি থেকে কন্দসহ উঠে আসে। আক্রান্ত স্থানে সাদা সাদা ছত্রাক এবং বাদামী বর্ণের গোলাকার ছত্রাক গুটিকা (স্কেলরোসিয়াম) দেখা যায়। অধিক তাপ ও আর্দ্রতা পূর্ণ মাটিতে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ক্ষেতে সেচ দিলেও এ রোগ বৃদ্ধি পায়। এ রোগের জীবাণু মাটিতে বসবাস করে বিধায় সেচের পানির মাধ্যমে ও মাটিতে আন্ত পরিচর্যার সময় কাজের হাতিয়ারের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার হয়। ব্যবস্থাপনা ঃ আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংশ করতে হবে। মাটি সব সময় স্যাঁত স্যাঁতে রাখা যাবে না। আক্রান্ত জমিতে প্রতি বছর পেঁয়াজ/রসুন চাষ করা যাবে না। ম্যানকোজেব গ্র“পের এগ্রিজে ডাইথেনএম-৪৫ অথবা ব্যাভিষ্টিন (কার্ববোন্ডাজিম) ছত্রাকনাশক প্রতি কেজি বীজে ১০০ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধণ করে বপন করতে হবে। ফসল সংগ্রহ ঃ রসুন গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামী রং ধারণ করলে ঢলে পড়ে তখন রসুন তোলার উপযোগী হয়। গাছসহ রসুন তোলা হয় এবং ঐ ভাবে ছায়াতে ভালভাবে শুকিয়ে মরা পাতা কেটে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতি হেক্টরে ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যায়। ফসল সংগ্রহের পর করণীয় ঃ ছায়াতে শুকাতে পারলে ভাল গুণাগুণ বজায় থাকে। রোদে শুকালে রসুন নরম হয়ে যেতে পারে। ফুতি পোকার র্লাভা থেকে রক্ষা পেতে হলে সংরক্ষণের সময় সেভিন পাউডার ১০ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম করে ¯েপ্র করে দিতে হবে। রসুন খুব ভালোভাবে পরিপক্ক করে নিয়ে ক্ষেত থেকে তুলতে হবে। অপরিপক্ক রসুন তুললে সেটা থেকে বীজ করা যাবে না। জমিতে ফুলকা হলে বুঝতে হবে রসুন পরিপক্ক হয়েছে। বাছাই ঃ রসুন মাঠ থেকে সংগ্রহের পর ছোট, মাঝারি ও বড় এই তিনটি গ্রেডে ভাগ করতে হবে। বীজ হিসাবে সংরক্ষণ পদ্ধতি ঃ রসুন সংগ্রহের পর ৫-৭ দিন ছায়াযুক্ত স্থানে শুকাতে হয়। একে রসুনের কিউরিং বলে। পরে পরিমাণ মতো (৪-৫ কেজি) রসুনের শুকানো গাছ বেনি তৈরি করে বাতাস চলাচল করে এমন ঘরে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এক ঝোপা থেকে অন্য ঝোপা কিছুটা দূরে/ফাঁকা করে রাখতে হবে যাতে করে বাতাস চলাচল করতে পারে। এছাড়া রসুন উত্তোলনের পর পাতা ও শিকড় কেটে ব্যাগে এবং বাঁশের র‌্যাক, মাচায় এবং চটের বস্তাতেও সংরক্ষণ করা যায়। বীজের জন্য এভাবে সংরক্ষণ করার আগে যেটা মোটা, সুস্থ, সবল, রোগব্যাধি বিহীন রসুন বাছাই করতে হবে।

চারা রোপণ ও দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ করা যাবে একসঙ্গে একযন্ত্রে

কৃষি প্রতিবেদক \ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান চাষ জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) একই সঙ্গে এক যন্ত্রের সাহায্যে ধানের চারা রোপণ ও দানাদার ইউরিয়া সার প্রয়োগ যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে। উক্ত মেশিনের মাঠ পরীক্ষণ মাঠ দিবস ব্রি মাঠে এবং কৃষকের মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার কাম দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রের মাঠ প্রদর্শনী এবং মাঠ পরীক্ষণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবির, পরিচালক প্রশাসন ড. মোঃ আনছার আলী, ১৯টি গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং অন্যান্য সব বিজ্ঞানী এবং কর্মকর্তাবৃন্দ। রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার কাম দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে যন্ত্রের উদ্ভাবক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার কাম দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রের সাহায্যে জমিতে একই যন্ত্রে একসঙ্গে চারা রোপণ ও ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা যায় বিধায় কৃষকের অর্থ ও সময় সাশ্রয় করা সম্ভব। মাটির গভীরে সার প্রয়োগ করা যায় বিধায় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় শতকারা ৩০ ভাগ ইউরিয়া সার কম লাগে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রোপণ উপযোগী ট্রের মাধ্যমে ধানের চারা উৎপাদন করার কলা-কৌশল সম্পর্কেও তিনি বি¯Íারিত আলোচনা করেন। অত্যন্ত কম খরচ ও কম সময়ে অধিক জমিতে চারা রোপণ করা যায় এবং বীজতলা তৈরির জন্য আলাদা জমির প্রয়োজন নেই। কৃষক বাড়ির আঙ্গিনায়ও বীজতলা তৈরি করতে পারে। রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টারের সাহায্যে বোরো মৌসুমে ট্রেতে উৎপাদিত মাত্র ২৫ দিন বয়সী চারা রোপণ করা যায়। চারার উচ্চতা সাধারণত ১২-১৫ সে.মি. হলেই তা মেশিনে রোপণের উপযুক্ত হয়। উদ্ভাবিত যন্ত্রের সাহায্যে ঘণ্টায় প্রায় ১.৫-২.০ বিঘা জমিতে চারা রোপণ ও দানাদার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা সম্ভব। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় উদ্ভাবিত এই যন্ত্র ব্যবহার করে ধানের চারা রোপণ ও ইউরিয়া সার বাবদ বিঘাপ্রতি কৃষকের সাশ্রয় হবে প্রায় ১৫০০ টাকা। বোরো মৌসুমে কৃষক সাধারণত জমিতে বিঘাপ্রতি ৩৮ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে থাকে, রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার কাম দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রের সাহায্যে ২৮ কেজি/বিঘা ইউরিয়া সার প্রয়োগ করেও প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ১০ ভাগ বেশি ধান উৎপাদন করা যায়। এতে জ্বালানি খরচ প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রায় ১ লিটার। রাইস ট্রান্সপ্ল্যান্টার ব্যবহারে একদিকে যেমন কৃষি শ্রমিকের অভাব ঘুচবে, অন্যদিকে শস্য উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে, এতে কৃষকরা উপকৃত হবে। বর্তমান সময়ে যান্ত্রিকীকরণ আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে দেশের চিরাচরিত কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিক তথা যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থায় রূপান্তরের বিকল্প নেই। কৃষির মানোন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংস্পম্পূর্ণতা অর্জন, পুষ্টি এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ফসল উৎপাদনে লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার তথা কৃষি যান্ত্রীকায়ন এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে দেশের কৃষির বিভিন্ন ¯Íরে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও কৃষি উন্নয়নে খামার যান্ত্রিকীকরণে আমরা এখনও কাঙ্খিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারিনি। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি জমির ক্রমহ্রাস, কম উৎপাদনশীলতা এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি কৃষির অগ্রগতিকে বর্তমানে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রকৃতিনির্ভর কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থাৎ যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও শস্যের নিবিরতা বৃদ্ধি করে তা টেকসই করতে হবে। কৃষিকে লাগসই যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হবে। লেখক ঃ এম আব্দুল মোমিন

লাভজনক হওয়ায় অনেকেই পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হাঁস চাষ

কৃষি প্রতিবেদক \ আমাদের দেশের আবহাওয়া হাঁস পালনে খুবই উপযোগী। সমস্যা হচ্ছে হাঁসের মাংস ও ডিম মুরগির মাংসের চেয়ে জনপ্রিয় কম। তবে বর্তমানে এটি অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এখন হাঁস চাষ লাভজনক একটি প্রযুক্তি। অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে হাঁস চাষে এগিয়ে আসছেন এবং প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হাঁস চাষ। মৎস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খুব সহজে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। হাঁস চাষে অনেক সুবিধা রয়েছে যেমন- মাছের জন্য পুকুরে তেমন বাড়তি সার ও খাদ্য দিতে হয় না । হাঁস থাকলে মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। হাঁস পালনে সুবিধা ঃ হাঁসের রোগবালাই তুলনামুলক খুবই কম। তাছাড়া খাবারের তেমন অভাব হয় না। দেশি মুরগি যেখানে গড়ে বছরে ৫৫টি ডিম দেয়, দেশি হাঁস সেখানে ৯০টির বেশি ডিম দিয়ে থাকে। আর উন্নত জাত হলে বছরে ২৫০-৩০০টি ডিম দিয়ে থাকে। যেভাবে শুরু করতে পারেন ঃ এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আপনার ৪০-৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর লাগবে। ১০০-২০০টি হাঁস এবং হাঁসের ঘর তৈরি করে নিতে হবে। এসব পরিকল্পিতভাবে করলে ভালো হবে। পাহারাদারের ঘরটি হাঁসের ঘরের দক্ষিণ পাশে হলে ভালো হয়। উন্নত হাঁসের জাত ঃ হাঁসের জাত নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে জাতের হাঁস বেশি ডিম দেয় সে জাতের হাঁস নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে খাকি ক্যাম্পেবেল, ইন্ডিয়ান রানার, সিলেট মিটি ও নাগেশ্বরী জাত নির্বাচন করা যেতে পারে। এ জাতের হাঁস ৫ মাস বয়স থেকে ২ বছর পর্যন্ত ডিম দেয়। যেভাবে হাঁস পালন করবেন ঃ হাঁস বিভিন্ন পদ্ধতিতে পালন করা যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে মুক্ত জলাশয়ে হাঁস পালন। এ পদ্ধতিতে ২৫-১০০টি হাঁস মুক্ত পুকুরে, লেকে অথবা ধান কাটার পর পরিত্যক্ত জমিতে পালন করা যায়। অপরটি হচ্ছে ইনটেনসিভ হাঁস পালন। এ পদ্ধতিতে ১-১০ লাখ হাঁস পালন করা সম্ভব। দিনের বেলায় হাঁস পানিতে থাকতে পছন্দ করে। শুধু রাতযাপনের জন্য ঘরের প্রয়োজন। হাঁসের ঘর তৈরি ঃ পুকুরপাড়ে কিংবা পুকুরের ওপর ঘরটি তৈরি করতে হবে। ঘরের উচ্চতা ৫-৬ ফুট হলে ভালো হয়। ঘর তৈরিতে বাঁশ, বেত, টিন, ছন, খড় ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ইট দিয়ে মজবুত করে ঘর তৈরি করতে পারলে ভালো হবে। ঘরটি খোলামেলা হতে হবে এবং সাপ ও ইঁদুর থেকে মুক্ত রাখতে হবে। শহরে বিভিন্ন মাপের চৌবাচ্চায় হাঁস পালন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশস্ত ছাদ থাকলে সুবিধা বেশি। ছাদের একপাশে ঘর অপর পাশে চৌবাচ্চা নির্মাণ করতে হবে। প্রজননের জন্য আটটি হাঁসের সঙ্গে একটি পুরুষ হাঁস রাখা দরকার। এরপর দেশি মুরগির সাহায্যে অথবা ইনকিউবেটরে হাঁসের ডিম ফোটানো যায়। কোথায় পাবেন হাঁসের বাচ্চা ঃ দৌলতপুর হাঁস খামার, নারায়ণগঞ্জ হাস প্রজনন কেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত হাঁস-মুরগির খামার ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে হাঁস বা হাঁসের বাচ্চা সংগ্রহ করতে পারেন। হাঁসের খাদ্য ঃ হাঁস চাষে সুবিধা হলো হাঁস খাল-বিল-পুকুর থেকে তার কিছু খাবার সংগ্রহ করে নেয়। তাছাড়া বাজারে হাঁসের তৈরি খাবার কিনতে পাওয়া যায়। শুকনো খাদ্য না দিয়ে হাঁসকে সবসময় ভেজা খাদ্য দেয়া উচিত। খাদ্যে আমিষের পরিমাণ ডিম দেয়া হাঁসের ক্ষেত্রে ১৭-১৮ শতাংশ ও বাচ্চা হাঁসের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ রাখা উচিত। হাঁস দানা, খইল, ভূষি, ঝিনুকের গুঁড়ো, ডিমের খোসা, কেঁচোসহ অন্যান্য খাবার বেশি পছন্দ করে। মাছের পুকুরেও হাঁস পালন ঃ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাছের পুকুরে হাঁস পালন করলে কৃষকরা বেশি লাভবান হন। এ চাষে হাঁস বেশি প্রোটিন পায়। মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সম্ভাব্য আয়-ব্যয় ঃ ২০-৪০ শতাংশের একটি পুকুরে ১০০-২০০টি হাঁসের জন্য এ প্রকল্প শুরু করলে সব মিলে খরচ হবে ৫০-৬০ হাজার টাকা। সঠিক পরিচর্যা আর যতœ নিতে পারলে প্রথম বছরে যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে ২০-৫০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। রোগমুক্ত, উন্নত জাতের হাঁস আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী চাষ করুন।

শীতে মুরগির খামারের জরুরি ব্যবস্থাপনা

কৃষি প্রতিবেদক \ শীতকালে বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এ সময় খামারি ভাইদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এ কারণে শীতকালে মুরগির খামারে বিশেষ পরিচর্যার দরকার হয়। তাই লাভজনক খামার ব্যবস্থাপনার জন্য খামারি ভাইদের নিচের বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে।

মুরগির বাসস্থান : শীতকালে বয়সভেদে মুরগির ঘরের ভেতরের পরিবেশ ঠিক করতে হবে। যে বয়সের মুরগি পালন করা হবে সে বয়সের মুরগির জন্য ঘরে উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ঘরের আশপাশের ঝোপ-জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করতে হবে, যাতে দিনের আলো পরিপূর্ণভাবে ঘরের চালার ওপর পড়ে। ঘরের দরজা-জানালার ফাঁক বন্ধ করে দিতে হবে যেন ঠান্ডা বাতাস ঘরে প্রবেশ করতে না পারে। মুরগির ঘরে উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

লিটার ব্যবস্থাপনা : শীতকালে লিটার হিসেবে ধানের শুকনা তুষ সবচেয়ে ভালো। তুষ মুরগিকে গরম রাখে। ব্রম্নডার হাউজে ৫-১০ সেন্টিমিটার পুরু করে লিটারসামগ্রী বিছাতে হবে। মুরগি যদি ফ্লোরে পালন করা হয়, তাহলে বড় মুরগির জন্য লিটারের পুরুত্ব ৪ ইঞ্চির কম হবে না। লিটারসামগ্রী হতে হবে পরিচ্ছন্ন ও দূষণমুক্ত। কোনো কারণে পানি পড়ে লিটার ভিজে গেলে ভিজা লিটার বদলে ওই স্থানে শুকনা লিটার বিছাতে হবে। লিটার যেন খুব শুকনা ধুলাময় না হয়।

খামারের তাপমাত্রা : মুরগির ঘরে স্বাভাবিক তাপমাত্রা দরকার ৬৫-৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। তবে ব্রম্নডার হাউজে প্রাথমিক তাপমাত্রা দরকার ২৩-৩৫ ডিগ্রি  সেলসিয়াস। যখন পরিবেশের তাপমাত্রা খুব বেশি কমে যায়, তখন ব্র“ম্নডারে  বৈদ্যুতিক বাল্ব সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে হবে। ঘরের চালা টিনের হলে হার্ডবোর্ড বা এই জাতীয় পদার্থ দিয়ে সিলিং দিতে হবে। ঘর উষ্ণ রাখতে টিনের বা ছাদের ওপর খড় বিছিয়ে দিতে হবে। ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ব্রম্নডিং পিরিয়ডে বাচ্চা যাতে সমভাবে তাপ পায় এ জন্য ৫০০ বাচ্চার জন্য ১০০ ওয়াটের তিনটি বাল্ব সংযুক্ত একটি ব্রম্লডার হার্ডবোর্ড স্থাপন করতে হবে। খামারের আলো চলাচল : মুরগির ঘরে আলো এমনভাবে দিতে হবে যেন তা ঘরে সমভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রম্নডিং পিরিয়ডে প্রথম তিন দিন নিরবচ্ছিন্ন আলো রাখা দরকার।

প্রতি বর্গমিটারে বাচ্চার ঘনত্ব: ব্রম্নডার হাউজে প্রতি বর্গমিটারে প্রথমে ৫০টি বাচ্চা রাখতে হবে এবং চার দিন বয়সের পর থেকে ক্রমান্বয়ে জায়গা বাড়িয়ে দিতে হবে। ১৪ দিন বয়সের পর ঘরের তাপমাত্রা ঠিক রেখে বাচ্চা যাতে পুরো ঘরে বিচরণ করতে পারে সে অনুযায়ী জায়গা বাড়াতে হবে। ডিমপাড়া মুরগি বা লেয়ারের শরীরের তাপমাত্রা ঘরের তাপকে কিছুটা প্রশমিত করলেও বেশি ডিম উৎপাদনের জন্য এটা ভালো নয়। তাই ঘরে মুরগির ঘনত্ব কেমন হবে তা নির্ভর করবে ঘরের ধরন, ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি, মুরগির বয়স, জাত ও পালন পদ্ধতির ওপর, পরিবেশের তাপমাত্রার ওপর নয়।

হভেন্টিলেশন : মুরগির ঘরে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা বাতাস প্রবাহের মাধ্যমে ঘরে উৎপন্ন বিষাক্ত বাতাস বের করে এবং বিশুদ্ধ বাতাস প্রবেশে সহায়তা করে। শীতকালে ঘরে ঠান্ডা বাতাস যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সব দরজা-জানালা বন্ধ রাখলেও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা অবশ্যই চালু রাখতে হবে।

ভ্যাক্সিনেশন : সঠিক খামার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। ব্রয়লারের জন্য রানিক্ষেত এবং গামবোরো এই দু’টি ভ্যাক্সিনই যথেষ্ট। তবে খামারের জন্য সম্পূর্ণ ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচি অনুসরণ করতে হবে। শীতকালে পরিবেশের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার কারণ বিশেষ করে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ও রানিক্ষেত রোগ সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। ধারণা করা হয় রানিক্ষেত রোগ প্রতিরোধ করার মাধ্যমে এভিয়ান ইনফস্নুয়েঞ্জা সংক্রমণ কমানো যায়। এ জন্য সময় মতো রানিক্ষেত রোগের ভ্যাক্সিন দিতে হবে।

শীতকালের খাদ্য ব্যবস্থাপনা : শীতকালে ঠান্ডা আবহাওয়ায় মুরগি খাবার বেশি খায়। অতিরিক্ত খাবার খেয়ে শরীরে তাপ উৎপাদন করে। অর্থাৎ শীতকালে শরীরে  বেশি ক্যালরি দরকার হয়। এ জন্য খাবারে শর্করা-চর্বি উৎপাদনের উৎস কিছুটা বাড়িয়ে দিতে হবে। তবে সব খাদ্য উপাদানের পরিমাণগুলো ঠিক রেখে কিছু পরিমাণ তেল মিশিয়ে ক্যালরির পরিমাণ বাড়ানো যায়। ব্রম্নডিং অবস্থায় প্রথম তিন দিন লিটারের ওপর চট বা কাগজ বিছিয়ে তার ওপর খাদ্য ছিটিয়ে দিলে ভালো হয়। বাচ্চা মুরগিকে অল্প অল্প করে বারবার খাবার দিতে হবে। ফলে খাবার খাওয়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। শীতকালে সব বয়সের মুরগির উৎপাদন (গোশত, ডিম) কমে যায়। তাই সরবরাহকৃত খাবারে পর্যাপ্ত পুষ্টি উপাদান নিশ্চিত করতে হবে।

পানি : মুরগি যা খাবার গ্রহণ করে তার দ্বিগুণ পানি পান করে। তবে শীতকালে ঠান্ডার কারণে পানি গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। তাই পানি গ্রহণের পরিমাণ ঠিক রাখতে প্রচন্ড শীতের সময় সকালে ঠান্ডা পানি না দিয়ে হালকা গরম দিতে হবে। পানি ভরার আগে পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

মসুর খরা সহিষ্ণু ফসল এবং বৃষ্টিনির্ভর এলাকায় ভালো জন্মে

কৃষি প্রতিবেদক \ বাংলাদেশ পুষ্টি এবং খাদ্য বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ মতে, প্রতিটি মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১১২ গ্রাম ডাল শস্য গ্রহণ করা উচিত। এ হিসাবে আমাদের বছরে ৫ মিলিয়ন টন ডাল শস্যের প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক প্রণীত সুষম খাদ্য তালিকায় প্রতিটি মানুষের দৈনিক ৫৮ গ্রাম ডাল শস্য থাকা প্রয়োজন। একজন মানুষের জন্য প্রতিদিন গড়পরতা ২ হাজার ৩০০ কিলোক্যালোরি শক্তি প্রয়োজন। সাধারণত দানা ও শর্করা জাতীয় খাদ্য, ডাল শস্য, সবজি, ফল, তেল জাতীয় খাদ্য এবং প্রাণীজ খাদ্য এ শক্তি জোগায়। মসুর ডালের আবাদ কৌশল ঃ পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা আছে এমন বেলে দোআঁশ এবং এঁটেল মাটি মসুর চাষের জন্য উপযোগী। মাটির অম্লান (পিএইচ) ৬.৫-৭.৫-এর মধ্যে হলে ভালো হয়। মসুর খরা সহিষ্ণু ফসল এবং বৃষ্টিনির্ভর এলাকায় ভালো জন্মে। জলবায়ু গত বিচারে রবি মৌসুম বাংলাদেশে মসুর চাষ করার উপযোগী। মধ্য অক্টোবর থেকেই এর বপন কাজ শুরু হয় এবং মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়। মসুর বীজ যথাসময়ে বপন না করলে ফলন বেশ কমে যায়। জাত ঃ উৎফলা (এল-৫) একটি অনুমোদিত জাত। জমি তৈরি ঃ মসুরের বীজ আকারে ছোট বলে জমি বেশ ঝুরঝুরে এবং নরম করে তৈরি করতে হয়। আগাম জাতের ধান বা পাট কেটে নেয়ার পর জো এলে জমিতে ৩-৪ বার সোজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়। পলি মাটিতে বর্ষার পানি চলে যাওয়ার পর বিনা সেচেও মসুরের চাষ করা যায়। মসুর গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না বলে জমি তৈরির সময়ই নালা কেটে পানি সেচের ব্যবস্থা রাখতে হয়। সার প্রয়োগ ঃ নদীর অববাহিকা অঞ্চলের পলি মাটি স্বভাবতই উর্বর বলে এরূপ জমিতে মসুর চাষ করতে জৈব সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য অঞ্চলের বেলে দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা বাড়ানো যায়। এ ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৫-৭ টন খামারে পচানো সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া হেক্টর প্রতি ৬৬-৮৮ কেজি ইউরিয়া সার এবং ১৮৮-২৫০ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসলেট প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। শেষ চাষের সময় এসব সার জমিতে ছিঁটিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। মাটিতে সামান্য পরিমাণ কোবাল্ট ও মলিবডেনাম নামক গৌণ খাদ্যোপাদানের উপস্থিতিতে মিথোজীবী, ব্যাকটেরিয়াগুলোর বংশ বৃদ্ধি ঘটে, যার ফলে মাটিতে নাইট্রোজেন বন্ধন বেশি হয়। সুতরাং হালকা মাটিতে ওই সারের সঙ্গে হেক্টর প্রতি ২ কেজি সোডিয়াম মলিবডেট এবং এক কেজি কোবাল্ট নাইট্রেট মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে। বীজ বপন ঃ মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর মসুর বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। ছিঁটিয়ে বা সারিতে উভয় পদ্ধতিতে বীজ বপন করা গেলেও মসুরের ফলনে তেমন কোনো পার্থক্য না থাকায় সাধারণত শেষ চাষের সময় বীজ ছিঁটিয়ে বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করতে চাইলে ৩০ সে. মি. দূরত্বে সারি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৩০-৩৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। জমিতে নাইট্রোজেন গুঁটি উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া কম থাকলে বপনের আগে উপযুক্ত ইনোকুলাম প্রয়োগ করলে ফলন বৃদ্ধি পায়। তবে জমিতে এর আগে মসুর চাষ করা হয়ে থাকলে প্রাথমিক ইউরিয়া এবং জীবাণু সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না। আন্তঃপরিচর্যা ঃ বীজ বোনার ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করতে হয়। গাছ ঘন থাকলে পাতলা করা যেতে পারে। সাধারণত বাংলাদেশে মসুর ফসলে সেচ প্রয়োগ করা হয় না। তবে মাটিতে রসের অবস্থা বুঝে সেচ দেয়া উত্তম। মরিচা পড়া এবং নেতিয়ে পড়া রোগ দুটি মসুরের বেশ ক্ষতি করে থাকে। ভিটাভ্যাক্স ৪০০ (১:৪০০ হারে) দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করে গোড়া পচারোগ দমন করা যায়। দেরি না করে সময় মতো বীজ বপন করলে মরিচা পড়া রোগ দমন করা সম্ভব। সাথী ফসল ঃ গম, আখ, ভুট্টা এবং সরিষার সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে মসুরের চাষ করা যায়। এছাড়া এ দেশে সরিষার সঙ্গেও মিশ্র ফসল হিসেবে মসুর চাষের প্রচলন রয়েছে। ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণ ঃ সাধারণত বীজ বপনের ৯০-১০০ দিনের মধ্যেই মসুর ডালে পরিপক্বতা আসে এবং মাঠের ৮০ ভাগ ফল পরিপক্বতা লাভ করলে ফসল সংগ্রহ করা যায়। জাত অনুসারে হেক্টর প্রতি ১.৫-২.০ টন দানা পাওয়া যায়। বীজ সংগ্রহ করার পর ভালো করে রৌদ্রে শুকিয়ে মাটির পাত্রে, টিনে, ড্রামে এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে বাতাস বা কীটপতঙ্গ ঢুকতে না পারে। পোকার আক্রমণ হয়েছে কিনা দেখার জন্য বর্ষাকালে মাঝে মাঝে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

কৃষিযন্ত্র কিনতে সুদবিহীন ঋণ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষকদের জন্য আরো একটি সুখবর এসেছে। সরকার কৃষকদের নানা ধরনের ভর্তুকি দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সাশ্রয়ী মূল্যে কৃষিযন্ত্র পাচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। এবার সহজ শর্ত ও ন্যূনতম সুদ বা সুদবিহীন ঋণ দিতে একটি নীতিমালা করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত ৮ জানুয়ারি তার কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০১৯’-এর খসড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সভা শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বৈঠকে ১ মার্চকে বীমা দিবস ঘোষণা এবং দিবসটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ-সংক্রান্ত পরিপত্রের ‘খ’ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব অনুমোদন এবং ভোটার তালিকা (সংশোধন) আইনের খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালার কার্যকর হলে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের পরিধি আরো সম্প্রসারিত হবে এবং শ্রমিকের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। এই নীতিমালার আওতায় কৃষকরা সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন ধরনের কৃষিযন্ত্র কেনার সুযোগ ও সহজশর্তে ন্যূনতম সুদ বা সুদবিহীন ঋণ সুবিধা পাবেন। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভা নীতিমালাটি অনুমোদন দিয়ে অনুশাসন দিয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ের বাইরে সমবায় পদ্ধতিতেও যেন এসব যন্ত্রপাতি কেনা ও ব্যবহারের বিষয়টা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যখন আপনি কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করবেন ফসল রোপণ, কর্তন, মাড়াইয়ে শ্রমিক অনেক কম লাগবে। ফলে কৃষি শ্রমিকের অপ্রতুলতা মোকাবেলা করে কৃষি উন্নয়নের গতি বৃদ্ধি পাবে, ফসলের অপচয় রোধ হবে, শ্রমিক খরচ কম হওয়ার ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসবে, কৃষকরা লাভবান হবেন এবং দেশের যুবসমাজ কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ হবে। অপরপক্ষে বাণিজ্যিক কৃষিব্যবস্থারও প্রসার হবে। অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বীমা কোম্পানির চাকরিতে যোগদানের তারিখ, অর্থাৎ ১ মার্চকে ‘বীমা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১ মার্চকে বীমা দিবস ঘোষণা এবং দিবসটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ-সংক্রান্ত পরিপত্রের ‘খ’ ক্রমিকে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বীমা দেশের একটি ‘সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপর্ণ’ আর্থিক খাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার পর দেশীয় বীমা শিল্প সৃষ্টি হয় এবং বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স ন্যাশনালাইজেশন অর্ডার ১৯৭২, দ্য ইনস্যুরেন্স কো-অপারেশন অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর মতো বীমা সংশ্লিষ্ট মৌলিক আইন প্রণীত হয়। এ খাতের ব্যপ্তি বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে বীমা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে বর্তমান সরকারও এর আগে বীমা মেলার আয়োজন, দেশব্যাপী বীমা-সম্পর্কিত সভা, সেমিনার, শোভাযাত্রার মতো আয়োজন করেছে। এ কার্যক্রমকে আরো বেগবান করতে বীমার বিস্তৃতি, জনসম্পৃক্ততা তথা জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ২০১৪ সালের জাতীয় বীমা নীতিতেও জাতীয় বীমা দিবস পালনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবছর ১ মার্চকে জাতীয় বীমা দিবস হিসেবে পালনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিশেষ অনুরোধ করেছিল জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রস্তাব ছিল ২ বা ৩ মার্চ (বীমা দিবস) করার, কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলেছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬০ সালের ১ মার্চ তৎকালীন আলফা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগদান করেছিলেন। এটার সঙ্গে একটা ঐতিহাসিক দিনের সংযোগ আছে। পহেলা মার্চ অন্য কোনো দিবস থাকলে সেটি শিফট করে দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে এবং তা করেও দেওয়া হয়েছে। এতদিন ১ মার্চ ভোটার দিবস হিসেবে পালন করা হলেও গতকাল বুধবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তা ২ মার্চে স্থানান্তর করা হয়েছে। ভোটার তালিকা (সংশোধন) আইনের খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রতি বছর ২ মার্চ জাতীয় ভোটার দিবস পালন করা হবে। এর আগে ২ জানুয়ারি থেকে ১ মার্চ পর্যন্ত কম্পিউটার ডেটাবেজে থাকা বিদ্যমান সব ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হবে। বর্তমান আইনে কম্পিউটার ডেটাবেজে থাকা ভোটার তালিকা প্রতিবছর ২ জানুয়ারি থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে হালনাগাদ করার বিধান রয়েছে।

যান্ত্রিকীকরণে ধীরগতি, কমছে না কৃষির খরচ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে খরচ হয় ১৮ থেকে ১৯ টাকা। কিন্তু উৎপাদনের সব ধাপ (জমি চাষ, সেচ, রোপণ, ফসল কাটা ও মাড়াই) আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে করা গেলে এ খরচ দাঁড়াত ৯ থেকে ১০ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় অর্ধেকে নামত। এতে লাভবান হতেন কৃষক। শুধু ব্যয়ই নয়, যন্ত্রের ব্যবহারে কমে যেত অপচয়। অন্যদিকে খাদ্যের গুণগত মান ঠিক থাকত। কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য বলছে, কৃষির উৎপাদনে যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে, তবে তা শুধু চাষ ও সেচের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু মাড়াই, রোপণ, ফসল কাটা, সার প্রয়োগ, শুকনো ও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনো খুবই কম। সারা দেশে ফসল লাগানোর জন্য মাত্র ১ শতাংশ বা তারও কম জমিতে কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। আর ফসল কাটা থেকে শুরু করে শস্য বাছাই পর্যন্ত অন্যান্য ধাপে যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। এ পরিস্থিতি ফসল উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি ও অবচয়ের প্রধান কারণ। যদিও একই সূত্রের তথ্যমতে, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ফসল লাগানোর আগে জমি তৈরির ক্ষেত্রে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যবহার হচ্ছে ৯০-৯৫ ভাগ জমিতে। ৭৬ শতাংশ জমিতে সেচ দেওয়া হয় পাম্পের মাধ্যমে। উন্নতি হয়েছে কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষেত্রেও। এদিকে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, আমদানিনির্ভর এসব যন্ত্রপাতির ব্যবহার ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক কৃষক সেগুলোর ব্যবহার বাড়াতে পারছেন না। তথ্যানুসারে, দেশে এখনো পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের শতকরা ৯৫ ভাগ, চারা রোপণ যন্ত্রের শতভাগ, বীজবপন যন্ত্র ৭০ ভাগ ও ফসল কাটার যন্ত্রের (রিপার) ৯৯ ভাগ আমদানিনির্ভর। এছাড়াও সেচ মেশিন, ¯েপ্র মেশিনের একটি অংশ আমদানি করা হয়, কিছুটা দেশেও তৈরি হচ্ছে। কৃষিযন্ত্রের বাজার নিয়ে তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের কাছে। ওই বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল আলম বলেন, কৃষি যন্ত্রপাতির ১০ হাজার কোটি টাকার বাজার রয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ ভাগই বিদেশের দখলে। বিশেষ করে দামি ও বড় যন্ত্রগুলোর বাজার ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও জাপানের দখলে। তিনি বলেন, চাহিদার বাকি ৩৫ শতাংশ তৈরি হচ্ছে দেশে। তবে এর মধ্যে ছোট উপকরণ বেশি। স্থানীয়ভাবে এসব যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ তৈরিতে বর্তমানে দেড় হাজার ছোটবড় কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই ছোট ছোট বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করছে। দেশে বড় যন্ত্রগুলোর উৎপাদন বাড়লে কম মূল্যে ও সহজে সেগুলো কৃষকদের কাছে পৌঁছানো যেত। এদিকে জানতে চাইলে দেশে কৃষিযন্ত্রের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন অ্যাগ্রিকালচার মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলীমুল এহছান চৌধুরী বলেন, সময়ের সঙ্গে কৃষিযন্ত্রের ধরন পাল্টাচ্ছে। বাজার বড় হচ্ছে। সে অনুযায়ী পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের উৎপাদকরা এগিয়ে যেতে পারছে না। ফলে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির গতি বেশ মন্থর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও কেনার জন্য কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকরা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য কোনো ঋণ পান না। অর্থায়নের অপর্যাপ্ততা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বড় প্রতিবন্ধকতা। ঋণ সহায়তা আরো সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করা গেলে কৃষিযন্ত্রের আরো প্রসার ঘটবে। ঋণের সুদহার কমিয়ে ৪ শতাংশে আনতে হবে। যদিও সম্প্রতি সময়ে সরকার এটাকে খুবই অগ্রাধিকার কার্যক্রমের তালিকায় রেখেছে। কৃষিশ্রমিকের অভাব পূরণে কৃষিকে পুরোপুরি যান্ত্রিকীকরণে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষককে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সরকার ভর্তুকি দেবে বলে জানিয়ে আসছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক। এ জন্য সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৪১৫ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবও দিয়েছে। প্রস্তাবটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গবেষক এবং যন্ত্রপাতি উৎপাদক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, এক দশক ধরে জিডিপিতে কৃষিখাতের অংশ কমে শিল্প ও সেবাখাতের অংশ বেড়েছে। মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। ফলে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের কৃষিখাতে শ্রমিকসংকট বাড়ছে। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, মোট শ্রমিকের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন কৃষিতে নিয়োজিত, যা ২০০২-৩ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ। যদিও বাড়তি জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বিশ্বের অন্যান্য অংশের কৃষি কর্মকান্ডে আধুনিক যন্ত্রের ছোঁয়া লেগেছে অনেক আগেই। দেরিতে হলেও কৃষিপ্রধান বাংলাদেশও এখন সেই পথে হাঁটছে। তবে কাঙ্খিত গতি নেই সে যাত্রায়।

টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে ফুলের চারা উতপাদন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিদেশি ফুল চাষ করার জন্য বাংলাদেশের ফুল চাষিরা বিদেশ থেকে টিস্যু কালচারের ফুলের চারা এনে ফুল চাষ করছেন। দেশে প্রতিবছর বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের কয়েক কোটি চারার চাহিদা রয়েছে। দেশে প্রাপ্যতার অভাবে ফুলচাষিরা ভারত থেকে কোটি কোটি টাকার ফুলের চারা কিনে আনেন। ফুল চাষিদের চাহিদার কথা ভেবে রাজশাহীতে অ্যাগ্রোব্যাক নামের একটি টিস্যু কালচার ল্যাব বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চারা উৎপাদন করছে। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় অ্যাগ্রোব্যাক ল্যাবে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে জারবেরা, ইউস্টোমা, লিলিয়াম, টিউলিপ, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন ফুলের চারা উৎপাদন করছে। তারা সেগুলো কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করতে শুরু করেছেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিতে সারাদেশের ফুলচাষিরা ফুলচাষে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। টিস্যু কালচার ল্যাব পরিদর্শন, হার্ডেনিং হাউসে ফুলের চারার সংরক্ষণ, মাঠপর্যায়ে ফুল উৎপাদন যেন ফুলচাষিদের কাছে আশার আলো জুগিয়েছে। এরকম আরও টিস্যু কালচার সংশ্লিষ্ট ইন্ডাস্ট্র্রি ও ল্যাব গড়ে উঠলে ভারত থেকে আর চারা আনতে হবে না বলে তারা জানিয়েছেন দেশের সেরা ফুলচাষি, ব্যবসায়ী ও উৎপাদকরা। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, সারাদেশে টিস্যু কালচারের ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিষ্ঠান যেভাবে সফলতার সঙ্গে বিভিন্ন ফুলের যে চারা উৎপাদন শুরু করেছে তাতে ভবিষ্যতে আর ভারত থেকে চারা আনতে হবে না। টিস্যু কালচারের চারা ভারত থেকে কেনা দামের চেয়ে অনেক কম মূল্যে চারা পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সারাদেশের ফুলচাষিরা লাভবান হবেন। বাংলাদেশে ফুল চাষের জনক ও ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি যশোরের ঝিকরগাছার শের আলী বলেন, টিস্যু কালচারের ফুলের চারা উৎপাদন হওয়ায় তিনি খুব খুশি। সারাদেশে যেন প্রতিষ্ঠানটি চারা সরবরাহ করতে পারে সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অ্যাগ্রোব্যাক বাংলাদেশে প্রথম ও একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে বিভিন্ন ফুলের চারা উৎপাদন এবং সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। অ্যাগ্রোব্যাক টিস্যু কালচার ল্যাবের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও পরিচালক মতিউর রহমান বলেন, আমরা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে জারবেরা, ইউস্টোমা, লিলিয়াম, টিউলিপ, চন্দ্রমল্লিকাসহ বিভিন্ন ফুলের চারা উৎপাদন করছি। কৃষকদের মধ্যে সেগুলো সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে অ্যাগ্রোব্যাক ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে প্লান্ট টিস্যু কালচার ইন্ডাস্ট্রি গঠন করবে এমন প্রত্যাশা করেন তিনি ।

দেশের উন্নয়নে বাণিজ্যিক কৃষির গুরুত্ব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জীবনজীবিকার পাশাপাশি আমাদের সার্বিক উন্নয়নে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই কৃষির উন্নয়ন মানে দেশের সার্বিক উন্নয়ন। টেকসই কৃষি উন্নয়নে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং দিকনির্দেশনায় খোরপোশের কৃষি আজ বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। খাদ্যশস্য উৎপাদন, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমান সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে কৃষির উন্নয়ন ও কৃষকের কল্যাণকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নিয়ে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দশম। দারিদ্র্য, ঘনবসতি, নগরজীবনের নানা অনিশ্চয়তা আর জলবায়ুর পরিবর্তনের ভেতর বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও টিকে থাকার মূল জায়গাটি হচ্ছে ভূমি ও কৃষক সম্প্রদায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০১৮ সময়ের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় গত এক বছরে লাভজনক ও বাণিজ্যিকীকরণের অগ্রযাত্রায় কৃষি। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন (৪৩২.১১ লাখ মেট্রিক টন) এর লক্ষ্যমাত্রা (৪১৫.৭৪ লাখ মেট্রিক টন) ছাড়িয়ে গেছে। দেশ আজ চালে উদ্বৃত্ত; ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। ভুট্টা উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ৪৬ লাখ টন। নিবিড় চাষের মাধ্যমে বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে। সবজি উৎপাদন বেড়ে ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার টন হয়েছে। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত এবং বিশ্বে সপ্তম। এ বছর আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ টন। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারায় অষ্টম। আম উৎপাদন প্রায় ২৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আলুসহ বিভিন্ন সবজি, ফল ও ফুল রপ্তানি সম্প্রসারণের নিমিত্তে উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা উন্নয়নসহ কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। যশোরের গদখালির পলিহাউসে রপ্তানিযোগ্য ফুল এবং নিরাপদ সবজি উৎপাদনের উদ্যোগ দেশি-বিদেশি মহলে প্রশংসিত হয়েছে। কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও নিরাপদ সবজি/ফল সহজলভ্য করার নিমিত্তে ঢাকায় শেরেবাংলা নগরে কৃষকের বাজার চালু করা হয়েছে যেখানে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারজাত করছে। ক্রমান্বয়ে এই ব্যবস্থা জেলা-উপজেলা শহরে সম্প্রসারিত হবে। ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ভুট্টা চাষ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সহায়তা অব্যাহত আছে। এ ছাড়াও কাজু বাদাম ও কফি ইত্যাদি অর্থকরী ফসল চাষ ও বাজারব্যবস্থা উন্নয়নে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাস করার লক্ষ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত সারের মূল্য ৪ দফা কমিয়ে প্রতি কেজি টিএসপি ৮০ টাকা থেকে কমিয়ে ২২ টাকা, এমওপি ৭০ টাকা থেকে ১৫ টাকা, ডিএপি ৯০ টাকা থেকে ২৫ টাকায় নির্ধারণ করেছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষক পর্যায়ে ডিএপি সারের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা করা হয়েছে; কৃষকদের জন্য এটা ছিল গত বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেরা উপহার। বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কর্তৃক গৃহীত কৃষি প্রণোদনা/পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত ৯৬০ কোটি ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে- যার মাধ্যমে ৮৬ লাখ ৪০ হাজার ৪৪ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৩৩ কোটি ১৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। ফসলের উন্নত ও প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে অভূতপূর্ণ সাফল্য এসেছে। ২০১৮-১৯ সালে অবমুক্তকৃত বিভিন্ন ফসলের উদ্ভাবিত প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত ১২টি, উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ৯৫টি এবং নিবন্ধিত জাত ২৬টি। গম ও ভুট্টার গবেষণা সম্প্রসারণের জন্য সরকার ২০১৮ সালে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। গমের ১টি জাত উদ্ভাবন, গম ও ভুট্টার ৪ হাজার ৫শটি জার্মপস্নাজম সংগ্রহ এবং রোগবালাই ব্যবস্থাপনার ওপর ১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে ৫৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ নারিকেল, তাল, খেজুর ও সুপারি চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে। মাল্টা, রামবুতান, ড্রাগন প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের অপ্রচলিত ও বিদেশি ফল চাষে উৎসাহ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ২০১৮-১৯ সালে সম্প্রসারিত সেচ এলাকা ২২ হাজার ৮৪০ হেক্টর। সরবরাহকৃত সেচযন্ত্র ৫৪৭টি এবং স্থাপিত সোলার প্যানেলযুক্ত সেচযন্ত্র ৯৫টি। ৪৮০টি সেচ অবকাঠামো, ৫৮১ কিলোমিটার খাল-নালা খনন/পুনঃখনন, ৬৮২ কিলোমিটার ভূ-গর্ভস্থ (বারিড পাইপ) সেচনালা এবং ৮ কিলোমিটার ভূ-উপরিস্থ সেচনালা, ২৪ কিলোমিটার গাইড/ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থার আওতায় সৌরবিদ্যুৎ চালিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুপেয় পানির ব্যবস্থাকরণ ও সেচ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১০০টি পাতকুয়া স্থাপন করা হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে দেশের হাওর ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় কৃষকের জন্য ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকার জন্য ৫০ শতাংশ হারে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩২২ কোটি ৮০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এ জন্য নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা-২০১৯ চূড়ান্ত করা হয়েছে, যাতে বিনা সুদে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ঋণের ব্যবস্থা থাকবে। ডিজিটাল কৃষি তথা ‘ই-কৃষি’ প্রবর্তনের ধারা জোরদার করা হয়েছে। দেশে মোট ৪৯৯টি কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (এআইসিসি), কৃষি কল সেন্টার ১৬ হাজার ১২৩, ইউটিউব, কৃষি তথ্য বাতায়ন, কৃষক বন্ধু ফোন-৩ হাজার ৩৩১, ই-বুক, অনলাইন সার সুপারিশ, ই-সেচসেবা, কৃষকের জানালা, কৃষকের ডিজিটাল ঠিকানা, কমিউনিটি রেডিওসহ বিভিন্ন মোবাইল এবং ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ও সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বীজতুলা বিক্রয়ে ই-সেবা, পোকা দমনে পরিবেশবান্ধব ইয়েলো স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার, নগর কৃষি, ডিজিটাল কৃষি ক্যালেন্ডার বাছাই করে দেশব্যাপী ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে আশানুরূপ উন্নতি হয়েছে, এখন কৃষি বহুমুখীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাণিজিকীকরণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। বাংলাদেশের কৃষক প্রতিদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করে- যেমন দেশবাসীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করছেন, তেমনি নিজেদের ভাগ্যেরও পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নানা মূল্যবান অপ্রচলিত ফসল উৎপাদনেও তারা সফলতা দেখাচ্ছেন। দেশের কৃষক দারিদ্রমুক্ত হওয়া মানেই, দেশের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া। কৃষিক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের সাফল্য তাই দেশবাসীর মুখে হাসি ফোটায়। নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৮, এসডিজি-২০৩০, রূপকল্প-২০২১ এবং রূপকল্প-২০৪১ এর আলোকে জাতীয় কৃষিনীতি, ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট, ডেল্টাপ্লান-২১০০ এবং অন্যান্য পরিকল্পনা দলিলের আলোকে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলেই কৃষিসহ সব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তব রূপ পাবে।
লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

ছাদ বাগানে ফুলের টবের পরিচর্যা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফুল সৌন্দর্যের প্রতীক। সবাই ফুল পছন্দ করেন। শুধু মনের আনন্দের জন্যই নয় শোভাবর্ধনের ক্ষেত্রেও ফুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইদানীং নাগরিক পরিবেশে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা আনতে অনেকেই বাড়ি সংলগ্ন আঙিনা, লন, বারান্দা বা বিল্ডিংয়ের ছাদে ফুলের বাগান করে থাকেন। এসব ফুল বাগানে মাটিতে লাগানোর পাশাপাশি টবেও ফুলগাছ লাগানো হয়ে থাকে। এসব ফুল বাগানে নিজ হাতে বিভিন্ন পরিচর্যা করার আনন্দ অনেকেই উপভোগ করে থাকেন। বাগানের টবে বিভিন্ন ফুলগাছ লাগানোর পর থেকে ফুল ধরা পর্যন্ত এবং সেসব ফুলের দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য কিছু কিছু পরিচর্যা করার প্রয়োজন হয়। সেরকমই কিছু পরিচর্যার বিষয় কৃষি ও সম্ভাবনা পাতার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো। টবের গাছের পরিচর্যা টবের ফুলগাছ দ্রুত বেড়ে উঠতে শুরু করলে গাছকে সোজা রাখার জন্য বাঁশের শক্ত কাঠি বা কঞ্চি ব্যবহার করতে হয়। তবে টবের ফুলগাছ খুব বড় হতে দিতে নেই। যত বড় হলে হেলে না পড়ে তত বড় রেখে বাড়তি অংশ ছাঁটাই করে দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে একটা বিষয়ে লক্ষ্য রাখা দরকার, যেসব ফুলগাছের শীর্ষে ফুল ধরে সেগুলো যেন আবার ছাঁটাই করা না হয়। গাছের ফুল শুকিয়ে যাওয়ার আগে বোঁটার কিছুটা সতেজ অংশসহ কেটে ফেলতে হয়, এতে দীর্ঘদিন ধরে ফুল ধরার সম্ভাবনা বাড়ে। তেমনিভাবে গাছের শুকনো পাতা বা হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাও ছাঁটাই করে দিতে হয়। ফুলগাছে মরা পাতা বা হলুদ হওয়া পাতা অথবা মরা শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে দিতে হয়। বিশেষ করে দুর্বল, চিকন ও রোগাক্রান্ত শাখা-প্রশাখা অবশ্যই কেটে ফেলতে হয়। এতে নতুন শাখা-প্রশাখা গজায়, যেগুলো নতুন পাতা ও ফুল উৎপন্ন হয়। ছাঁটাইয়ের পর গাছে আগা মরা রোগ দেখা দিতে পারে। সেজন্য পরে ছত্রাকনাশক ¯েপ্র করতে হয়। অনেক সময় গাছের একটি নির্দিষ্ট আকৃতি দেয়ার জন্য ফুলগাছ ছাঁটাই করতে হয়। এছাড়া ফুলগাছের শাখা-প্রশাখা টবের বাইরে চলে গেলে ছাঁটাই করতে হয়। আগাছা ফুলগাছের ক্ষতি করে থাকে। তাই টবে যেন আগাছা বা কাঙ্খিত ফুলগাছ ছাড়া অন্য কোনো গাছ বেড়ে উঠতে না পারে সেজন্য নিয়মিত টব পরিদর্শন ও টবে জন্মানো আগাছা পরিষ্কার করতে হয়। টব স্থাপন ঃ ফুলের টব কড়া রোদে সবসময় না রেখে মাঝেমধ্যে ছায়ায় রাখার ব্যবস্থা করতে হয়। কারণ অতিরিক্ত আলোর নিচে ফুলের টব রাখলে ফুল ও ফুলগাছের রং বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। সকালের হালকা রোদ ফুলগাছের জন্য ভালো। সেচ ব্যবস্থাপনা ঃ টবে একবারে বেশি পানি সেচ দেয়া উচিত নয়। এতে টবের মাটি শক্ত হয়ে যেতে পারে। আবার টবের মাটি যেন কখনো শুকিয়ে না যায় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়। এ জন্য টবের মাটিতে রসের অবস্থা বুঝে অল্প অল্প করে পানি সেচ দিতে হয়। প্রয়োজনে সকালে, বিকালে পানি দিতে হয়। মনে রাখতে হবে, বেশি পানি দিলে গাছের গোড়া ও শিকড় পচে যেতে পারে এবং কম পানি দিলে গাছের সজীবতা নষ্ট হতে পারে, বিশেষ করে গাছে ফুল থাকলে তা শুকনো ও বিবর্ণ দেখাতে পারে। টবের অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যাওয়ার জন্য টবের নিচে একটি ছিদ্র করতে হয় এবং টবটি একটি মাটির প্লেটের ওপর রাখতে হয়। সকালে বা বিকালে যখন রোদের তেজ কম থাকে তখন পানি সেচ দিতে হয়। তবে পড়ন্ত বিকেল বেলায়ই সেচ দেয়া ভালো। মাটি ব্যবস্থাপনা ঃ ৭ থেকে ১০ দিন পর পর টবের ওপরের স্তুরের মাটি সাবধানে উলট-পালট করে দিতে হয়। সেটি করা সম্ভব না হলে মাসে অন্ত্মত একবার নিড়ানির সাহায্যে খুঁচিয়ে আলগা করে দিতে হয়। এ কাজটি এমনভাবে করা দরকার, যেন গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এতে টবের মাটির নিচের দিকে জমা হওয়া ক্ষতিকর গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ পায়। অতিরিক্ত রস থাকলে তা কমে যায় এবং টবের মাটিতে কোনো পোকাই অবস্থান করতে পারে না। টবের মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে টবের গাছের গোড়ায় অনেক সময় মালচিং দ্রব্য হিসেবে শুকনো খড় বা ঘাস বা কাগজ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হয়, এসবের নিচে যেন কোনো পোকামাকড় লুকিয়ে থাকার সুযোগ না পায়। টবে সার ব্যবস্থাপনা ঃ দুর্বল ফুলগাছের সঠিক বৃদ্ধি ও নতুন পাতা বের হওয়ার সময় প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ইউরিয়া মিশিয়ে টবের মাটিতে ও গাছে ২-৩ দিন পর পর বিকেল বেলায় ¯েপ্র করলে গাছের ও পাতা বৃদ্ধি ভালো হয়। এতে ফুল ধরার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও ফুলের আকার বড় হয়। ট্যাবলেট সারও টবের ফুলগাছে ব্যবহার করা যায়, এতেও ফুলের আকার বড় হয়। টবে ব্যবহারের জন্য বাড়িতেই জৈবসার তৈরি করা যেতে পারে। এজন্য ফেলে দেয়া চা-পাতা ও ডিমের খোসা গুঁড়ো করে এক সঙ্গে মিশিয়ে ৭-৮ দিন রোদে শুকিয়ে গোলাপ ও অন্যান্য ফুলগাছের গোড়ায় ব্যবহার করলে খুব ভালো কাজ করে। অনেকে টবের মাটিতে খৈল ব্যবহার করেন। এতে পিঁপড়ার উপদ্রব দেখা দিতে পারে। পিঁপড়া তাড়ানোর জন্য টবের বাইরে নিচের দিকে ফিনিস পাউডার ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। বছরে অন্তত একবার টবের উপরের দিকে কোনা ঘেঁষে ৬ সেন্টিমিটার গভীর ও ৩ সেন্টিমিটার চওড়া করে মাটি তুলে ফেলে শুকনো গোবর বা জৈব সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে পুনঃভরাট করতে হয়। এসময়ে হাড়ের গুঁড়া, ইউরিয়া, টিএসপি ও পটাশ সার টবের নতুন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। তবে বিভিন্ন ফুলের জন্য আলাদা আলাদা সারের মাত্রা থাকায় উপরি সার প্রয়োগের বেলায় পরিমাণ জেনে সে অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হয়। টব পরিবর্তন ঃ মাঝেমধ্যে গাছের জন্য টব পরিবর্তন করতে হতে পারে। টব পরিবর্তনের সময় খুব সাবধানে কাজটি করতে হয়। কোনোক্রমেই যেন মূলগাছের শিকড়ের সঙ্গে লেগে থাকা মাটি বা মাটির দলা ভেঙে না যায়। টব পরিবর্তনের বেশ কয়েক ঘণ্টা আগে টবে হালকা করে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়। পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ ঃ টবের ফুল ও ফুলগাছে কোনো পোকামাকড় দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত বাছাইয়ের মাধ্যমে ধরে মেরে ফেলতে হয়। ফুলগাছে সাধারণত জাব পোকা, জ্যাসিড বা সবুজ পাতা ফড়িং, পাতা ফড়িং, বিভিন্ন ধরনের পাতাখেকো বিটল, কান্ড ও ফুলের মাজরা পোকা, ছাতরা পোকা বা মিলিবাগ, লেদা পোকা, শুঁয়ো পোকা, পিঁপড়া, উইপোকা, গান্ধী পোকা, থ্রিপস বা চোষী পোকা ও লাল মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে এসব পোকার উপদ্রব প্রতিরোধ করা যায়। রোগ নিয়ন্ত্রণ ঃ এ ছাড়া সাদা গুঁড়া বা পাউডারী মিলডিউ, ঢলে পড়া, গোড়া পচা, ডগা পচা, কুঁড়ি পচা, কুঁড়ি ঝরা, পাতা ঝলসানো, পাতায় দাগ, আগা মরা, ক্লোরোসিস এবং ভাইরাসঘটিত রোগের সংক্রমণ ফুলে ও ফুলের গাছে দেখা যায়। এসব নিয়ন্ত্রণে জৈব ছত্রাকনাশক বা অনুমোদিত অজৈব ছত্রাকনাশক নির্দিষ্ট মাত্রায় ¯েপ্র করতে হয়। অনুখাদ্য ব্যবহার ঃ অনুখাদ্যের অভাবে টবের ফুলগাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। অথবা ফুলের আকার ছোট বা রং ফ্যাকাশে হতে পারে। এজন্য উপরি সার প্রয়োগের সময় টবের ফুলগাছের বিভিন্ন অনুখাদ্যের অভাবের লক্ষণ দেখে ক্যালসিয়ামের জন্য চুন, ম্যাগনেশিয়ামের জন্য ম্যাগসালফ, সালফারের জন্য জিপসাম, দস্তুার জন্য জিঙ্ক অক্সাইড, বোরনের জন্য বোরিক এসিড বা সলুবর ¯েপ্র করা যেতে পারে। লেখক ঃ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম, উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চল, রংপুর।

তিল চাষ কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পুষ্টি সমস্যা নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে তিল দ্বিতীয় প্রধান তৈল বীজ ফসল হিসেবে পরিগণিত। তিলের তেলের স্বাদ ও গন্ধ সুমিষ্ট এবং পচনরোধী উঁচুমানের ভোজ্য তেল। খাদ্য হিসেবেও তিল বীজ জনপ্রিয়। একক বা মিশ্র ফসল হিসেবেও স্ব-পরাগায়ণ প্রকৃতির উদ্ভিদ। তিল চাষ করে কৃষকের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা পুষ্টি সমস্যা নিরসনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধান ভিত্তিক ফসল পরিক্রমায় তিল চাষে কোন অসুবিধা হয় না। বিদেশ হতে সংগৃহীত একটি জার্মপ্লাজমে গামারশ্মি প্রয়োগ করে উন্নত লাইন নির্বাচন এবং নির্বাচিত লাইনটিকে দেশের বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে অঞ্চলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিনা তিল-১ নামে নতুন এ জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ জাতটি স্থানীয় আবাদি জাত টি-৬ অপেক্ষা প্রায় দেড়গুণ বেশি ফলন দেয়। বিনা তিল-১ এর গাছ শাখাবিহীন এবং পাতার রঙ ঘন সবুজ। প্রতিটি গিরায় ৩-৬ বড় আকারের লম্বা ফল ধরে। বীজাবরণ পাতলা, নরম ও ক্রীম রঙের বিধায় খোসা না ছড়িয়ে তিলের চাহিদাও প্রচুর। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৫০-৫২ ভাগ। জীবনকাল ৮৫-৯০ দিন। গড় ফলন হেক্টর প্রতি ১৩০০ কেজি (একর প্রতি ৫৩০ কেজি বা বিঘা প্রতি ১৭৫ কেজি)। বাংলাদেশের উপকূলীয় বিশাল লবণাক্ত এলাকা বছরের প্রায় ছমাস (ডিসেম্বর থেকে জুন) পতিত থাকে। এ সময়ে অর্থাৎ খরিফ-১ মৌসুমে বিনা তিল-১ এর লবণাক্ততা সহিষ্ণুতার কারণে এর চাষ করে বাংলাদেশে তেলবীজের বিরাট ঘাটতি বহুলাংশে লাঘব করা যেতে পারে। দেশের বৃহত্তম জেলাসমূহ যেমন-ঢাকা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, পাবনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, জামালপুর ও পার্বত্য জেলাসমূহে বিনা তিল-১ চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। আউস ধান, আখ ও গ্রীষ্মকালীন মুগের সাথে সাথী ফসল হিসেবেও বিনা তিল-১ চাষ করা যায়। বেলে দো-আঁশ বা দো-আঁশ মাটি বিনা তিল-১ চাষের জন্য উপযোগী। এই ফসল জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তবে জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে সকল প্রকার মাটিতেই জাতটি চাষ করা যেতে পারে । তিল কুয়াশা ও জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না কিন্তু যথেষ্ট খরা সহিঞ্চু। যদি তাপমাত্রা ২৫-৩৫ সেলসিয়াসের নীচে নামে তাহলে বীজ গজাতে দেরী হয় এবং চারাগাছ ঠিকমত বাড়তে পারে না। বাড়ন্ত অবস্থায় অনবরত বৃষ্টিপাত হলে তিল গাছ মরে যায়। খরিপ মৌসুমে বীজ বপনের ৩৫-৩০ দিনের মধ্যে তিল গাছে ফুলের কুঁড়ি আসে এবং ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে ফুল ফোটা শুরু হয়। সাধারণত ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ভালভাবে ঝুরঝুরে এবং জমি সমান করে বিনা তিল-১ এর বীজ বপন করতে হয়। মুগসহ অন্যান্য ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করলে প্রধান ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে হবে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ (মধ্য ফাগুন) বিনা তিল-১ এর বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে উঁচু শ্রেণীর জমিতে ভাদ্র/আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়েও বিনা তিল-১ চাষ করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পপ্রন্ড শীত শুরুর আগেই ফসল কর্তন করতে হবে। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৯ কেজি (একর প্রতি ৩-৩.৫ কেজি) এবং সারিতে বপন করার জন্য ৭ কেজি (একর প্রতি ২.৫-৩.০ কেজি) বীজ যথেষ্ট। তবে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করার সময় উভয় ফসল কি হারে বা কত সারি পর পর কোন ফসলের বীজ বপন করা হবে, তার উপর নির্ভর করে বীজের হার নির্ধারণ করতে হবে। জমিতে রস বেশি হলে অল্প গভীরে বীজ বপন করলে বীজ পচে না। মাটি শুষ্ক হলে বপনের পূর্বে একটি হলকা সেচ দিয়ে জমি তৈরি করে বীজ বপন করতে হবে। বিনা তিল-১ এর বীজ ছিটিয়ে বা সারিতে বপন করা যেতে পারে। বীজ ও শুকনো বালু একত্রে মিশিয়ে ছিটিয়ে বপন করলে সমান দূরত্বে বীজ ফেলতে সুবিধে হয়। বিনা তিল-১ এর জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০-২৫ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৫ সেন্টিমিটার দিতে হবে। বীজ বপনের ২ দিনের মধ্যে অংকুরোদগম ঘটে এবং ৩-৪ দিনের মধ্যে মাটির উপর উঠে আসে। জমিতে চারা যদি ঘন হয় তবে ১৫ দিনের মধ্যে গাছ তুলে পাতলা করে দিতে হবে। বিনা তিল-১ চাষে সারের মাত্রা নির্ভর করে জমির ধরণ ও কৃষি পরিবেশ অঞ্চলের উপর। সাধারনত বিনা তিল-১ চাষে একর প্রতি ইউরিয়া- ৪০-৫০ কেজি, টিএসপি- ৩৬-৪৮ কেজি, এমপি- ২০-৩০ কেজি, জিপসাম- ৫০-৬০ কেজি, জিংক সালফেট- ১-২ কেজি ও বোরন- ০.৪-০.৮ কেজি হারে প্রযোগ করতে হবে। বোরন ঘাটতি এলাকায় হেক্টরপ্রতি ১০ কেজি হারে বরিক এসিড প্রয়োগ করে অধিক ফলন পাওয়া যেতে পারে। জমি প্রস্তুতকালে অর্ধেক ইউরিয়া এবং পূর্ণ মাত্রায় অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে ভালভাবে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। অবশিষ্ট ইউরিয়া সার বীজ বপনের ২৫-৩০ দিন পর গাছে ফুল আসার সময় উপরি প্রয়োগ করতে হবে। অধিক ফলন পেতে হলে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে। চারা অবস্থায় প্রায় ২০ দিন পর্যন্ত তিল গাছের বৃদ্ধি ধীর গতিতে হতে থাকে। এ সময় জমির আগাছা দ্রুত বেড়ে তিল গাছ ঢেকে ফেলতে পারে। তাই বীজ বপনের পূর্বেই জমিকে ভালভাবে আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে। প্রয়োজনে সর্তকতার সাথে নিড়নী দিয়ে আগাছা তুলে ফেলতে হবে। সাধারনত বিনা তিল-১ চাষাবাদে সেচের প্রয়োজন হবে না। বপনের সময় মাটিতে রসের অভাব থাকলে একটি হালকা সেচ দিয়ে বীজ গজানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর ২৫-৩০ দিন পর ফুল আসার সময় জমি শুষ্ক হলে একবার এবং ভীষণ খরা হলে ৫৫-৬০ দিন পর ফল ধরার সময় আর একবার সেচ দিতে হবে। তিল ফসল জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই জমির মধ্যে মাঝে মাঝে নালা কেটে বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ফসলকে রক্ষা করতে হবে । রোগবালাই দমন ঃ কান্ড পচা রোগ এবং বিছা পোকা ও হক মথ তিল ফসলের ক্ষতি করতে পারে। কান্ড পচা রোগ দেখা দেয়ার সাথে সাথে বাজারে যেসব ছত্রাকনাশক পাওয়া যায়, যেমন রেভিস্টিন এক গ্রাম বা ডাইথেন এম-৪৫, ২ গ্রাম হারে প্রতি লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পরপর তিনবার দুপুর ২-৩ টার সময় জমিতে ছিটিয়ে রোগটি দমন করা যেতে পারে। বিছাপোকা দমনের জন্য ডিম পাড়ার সাথে সাথে আক্রান্ত পাতা ছিঁড়ে কেরোসিন মিশ্রিত পানিতে ডুবিয়ে কার্যকরভাবে মেরে ফেলা যেতে পারে। সাইথ্রিন-১০ ইসি বা সবিক্রন-৪২৫ ইসি প্রয়োগ করে দমন করা যেতে পারে। ফসল কাটা ঃ বিনাতিল-১ পাকার সময় পাতা, কান্ড ও ফলের রঙ হলুদাভ হয় এবং বীজের খোসা ধূসর বর্ণ ধারণ করে। তিল ফসলের প্রতিটি গাছের সব বীজ এক সঙ্গে পাকে না। গাছের গোড়ার দিকের বীজ আগে পাকে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে উপরের দিকের বীজ পাকাতে শুরু করে । এ সমস্যা থেকে উত্তরণের বাস্তব উপায় হল, গাছের নীচের অংশের বীজ যখন পাকা শুরু করে তখন ফসল কেটে বাড়ির উঠানে কয়েকদিন স্তুপ করে রেখে দিলে উপরের দিকের বীজও পেকে যায়। তারপর তিল গাছ রৌদ্রে শুকিয়ে লাঠির সাহায্যে পিটিয়ে মাড়াই করতে হবে। এরপর বীজ ভালভাবে ৪-৫ দিন টানা রৌদ্রে ৩-৪ ঘন্টা করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। তিল ফসল কর্তনের ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিলম্বে ফসল কাটা হলে বীজ ক্ষেতে ঝরে পড়ে, আবার আগাম কাটা হলে অনেক বীজ অপরিপক্ক থেকে যায়, উভয় ক্ষেত্রেই ফলন হ্রাস পায়। বীজ সংরক্ষণ ঃ বীজের মান ভাল রাখার জন্য পরিষ্কার বীজ পুরু বা শক্ত পলিথিন ব্যাগে ভরে মুখ বেঁধে অপেক্ষাকৃত শীতল স্থানে কম আর্দ্রতায় সংরক্ষণ করতে হবে। সংরক্ষণকালে বীজের আর্দ্রতা অবশ্যই শতকরা ৮ থেকে ৯ ভাগ হতে হবে। আরও ভাল হয় যদি ব্যভিস্টিন (প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে) দিয়ে বীজ শোধন করে সংরক্ষণ করা যায়। এভাবে সংরক্ষিত বীজের মান ভাল থাকে এবং অংকুরোদগম ক্ষমতা সহজে নষ্ট হয় না।

বছরের যে কোনো সময় মিষ্টিকুমড়া বোনা যায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বছরের যে কোনো সময় মিষ্টিকুমড়া বোনা যায়, তবে কৃষকরা সাধারণত রবি মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এবং খরিফ মৌসুমে ফেব্র“য়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে মিষ্টিকুমড়া চাষ করে থাকেন। জমি তৈরি ও বীজ বপন : অল্প পরিমাণে মিষ্টিকুমড়া উৎপাদন করতে হলে বাসগৃহের আশপাশে ছায়াহীন স্থানে মাচা করে বীজ বোনা যেতে পারে। ব্যবসাভিত্তিক চাষের ক্ষেত্রে প্রথমে চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে মাচা অথবা সারিতে বীজ বুনতে হয়। ঝোপালো জাতের ক্ষেত্রে পাশাপাশি দুটি মাচার মধ্যে ২ মিটার দূরত্ব রাখা যেতে পারে। লতানো জাতে এটি ৩ থেকে ৪ মিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। বীজ রোপণ ঃ বৈশাখী কুমড়ার জন্য ২ দশমিক ৪ থেকে ২ দশমিক ৭ মিটার পরপর এবং অন্যান্য কুমড়ার জন্য ৩ থেকে ৩ দশমিক ৬ মিটার পরপর মাচা তৈরি করা যেতে পারে। মাচা তৈরি করতে (৮০ দ্ধ ৮০ দ্ধ ৮০ ঘন সেন্টিমিটার) গর্ত করলে ভালো হয়। একেকটি মাচায় প্রথমে ছয় থেকে সাতটি বীজ বুনতে হয়। পরে চারা অবস্থায় দুটি করে ভালো চারা রাখলেই চলে। হেক্টরপ্রতি ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৯ কেজি বীজের প্রয়োজন। বৈশাখী কুমড়ার লতা ভূমিতে বাইতে দেয়া যেতে পারে। অন্যান্য কুমড়ার জন্য মাচার আবশ্যক হয়। সার প্রয়োগ ঃ কুমড়ার জন্য হেক্টরপ্রতি ৫ টন গোবর সার, ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজি খৈল, ১২০ থেকে ১৩০ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ থেকে ১৭৫ কেজি টিএসপি এবং ১২০ থেকে ১৩০ কেজি এমপি দরকার। গোবর সার, ছাই, খৈল ও ট্রিপল সুপার ফসফেট গর্তের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে গর্ত ভর্তি করে ১০ থেকে ১২ দিন পর মাচায় বীজ বপন করতে হয়। চারা ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হওয়ার পর মাচার চতুর্দিক দিয়ে একটি অগভীর নালা কেটে নালার মাটির সঙ্গে ইউরিয়া সার মিশিয়ে নালা ভর্তি করে দিতে হয়। মিউরেট অব পটাশ সার ইউরিয়ার সঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়। অর্ন্তবতীকালীন পরিচর্যা ঃ শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টিকুমড়ার চাষ করা হলে অধিকাংশ স্থানে সেচের প্রয়োজন হয়। বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাউনির ওপর কান্ড তুলে দিলে ফলন বেশি ও ফুলের গুণ ভালো হয় ; কিন্তু বাউনির খরচ বেড়ে যাওয়াতে এর অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করতে হয়। জমির ফসল হিসেবে লতানো জাতের চাষ করা হলে ফল ধরার সময় ফলের নিচে কিছু খড় কুটো বিছিয়ে দেয়া ভালো যাতে মাটির সংস্পর্শে এসে ফল রোগাক্রান্ত না হয়। কৃত্রিম পরাগায়নের জন্য ভোরে পুরুষ ফুলের পরাগধানী হাতে নিয়ে স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে আস্তে করে ঘষে দিতে হয়। কোনো কোনো সময় ফ্রুট ফ্লাই নামক পোকা ফল ধারণে সমস্যা সৃষ্টি করে। ওষুধ দিয়ে এ পোকা দমন করতে না পারলে ফোটার আগ থেকে ফল অনেকটা বড় না হওয়া পর্যন্ত কাপড় অথবা পলিথিনের পোঁটলা দিয়ে ঢেকে রাখলে উপকার পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরাগায়নের প্রয়োজন হয়। গাছ ছাঁটাই ঃ অনেক সময় গাছের অতিরিক্ত বৃদ্ধির জন্য কুমড়ার ফলন কম হয়। এরূপ অবস্থায় গাছের কিছু লতাপাতা কেটে দেয়া যেতে পারে। পরাগায়ন সমস্যা ঃ কখনো কখনো ফুল থেকে কুমড়া বের হওয়ার পর শুকিয়ে যায়, কিংবা ঝরে যায়। মাটিতে টিএসপি সার প্রয়োগ করা এবং প্রত্যুষে ফুল ফোটার পর পুংজাতীয় ফুলের মুন্ড ফল প্রদানকারী পুষ্পের গর্ভকেশরের গায়ে বুলিয়ে দেয়া যেতে পারে। পোকা দমন ঃ কুমড়া জাতীয় গাছের বিভিন্ন পোকার মধ্যে লালপোকা, কাটালে পোকা এবং ফলের মাছি উল্লেখযোগ্য। এ পোকা দমনের জন্য সেভিন (১০ শতাংশ), ডাস্টিং কিংবা নেক্সিয়ান (শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ) এবং ডায়াজিননের (শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ) ¯েপ্র প্রয়োগ করা যেতে পারে। ফলের মাছির কিড়া কচি ফলে ছিদ্র করে প্রবেশ করে। এতে আক্রান্ত স্থান পচে যায় কিংবা সে অংশের বৃদ্ধি থেমে যায়। এ পোকা দমনের জন্য মাঝে মধ্যে ডিপ্টারেক্স, নেক্সিয়ন বা ডাইব্রেম ব্যবহার করা যেতে পারে। রোগ দমন ঃ কুমড়াজাতীয় গাছের রোগের মধ্যে পাউডারি মিলডিউ, ডাউনি মিলডিড ও অ্যানথ্রোকনোজ প্রধান। দুই সপ্তাহ পরপর ডায়াথেন বা পার্জেট ¯েপ্র করা যেতে পারে। প্রতিষেধকরূপে ১০০ গ্যালন গরম পানিতে ১ কেজি জাইনের মিশ্রিত করে বীজ শোধন করা উত্তম।

দেশি শিমের পোকা ব্যবস্থাপনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে শীতকালীন সবজির মধ্যে দেশি শিম অন্যতম জনপ্রিয় একটি সবজি। আমিষসমৃদ্ধ পুষ্টিকর সবজিটির কচি অবস্থা ছাড়াও এর বীজ শুকিয়ে সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়। অন্যান্য লতাজাতীয় সবজির মতো এটি মাচায় চাষ করা হয়, তবে বসতবাড়িতে ঘরের চালে বা বেড়ায়, গাছে, জমির আইলে, রাস্তার ধারে, পুকুর পাড়ে লাগানো যায়। দেশি শিম চাষে বেশ কিছু সমস্যা দেখা যায়। এর মধ্যে জাব পোকা, পাতা সুরঙ্গকারী পোকা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে। নিয়মিত ক্ষেত পরিদর্শনের মাধ্যমে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে কাঙ্খিত ফলন পাওয়া সম্ভব হয়। জাব পোকা ঃ চারা বাড়ন্ত গাছ বা গাছে ফল ধরা অবস্থায় জাব পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। তবে ফুলের কুঁড়ি, ফুল ও কচি ফলে জাব পোকার আক্রমণে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। শিম গাছে যে জাব পোকা আক্রমণ করে তা খুব ছোট আকৃতির ও দেখতে কালো রংয়ের। বাড়ন্ত লতার কচি ডগা, কচি পাতায়, ফুলের ডগায়, ফুলে ও কচি ফলে আক্রমণ করে। জাব পোকা শিমের অন্যতম ক্ষতিকর পোকা। অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্ত বয়স্ক পোকা শিম গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে (কচি ডগা, পাতা, কুঁড়ি, ফুল ও কচি ফল) এর রস চুষে খায়। এতে প্রথমত গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। পরে আক্রান্ত ফুল ও ফল নষ্ট হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঃ জাব পোকা নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত ফুলের ডগার জাব পোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলতে হয়। গাছের গোড়া এবং শিম মাচার সব খুঁটির গোড়ার চারদিকে ছাই (ধানের তুষের ছাই হলে ভালো) ছিটিয়ে দিলে জাব পোকার শরীর থেকে বের হওয়া মধুরস খাওয়ার জন্য পিঁপড়ার আনাগোনা বন্ধ হয়, এতে নিজের শরীরের মধুরসে পোকার শরীর ঢেকে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে পোকা মরে যায়। এ ছাড়া আক্রান্ত ফুলের ডগায় কেরোসিন মিশ্রিত ছাই (এক কেজি ছাইয়ের সঙ্গে ২-৩ চামচ কেরোসিন) ছিটানো যায়। ১ কেজি অর্ধ ভাঙ্গা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২-১৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে অথবা ১০ লিটার পানিতে ১০ গ্রাম (২ চা চামচ) গুঁড়ো সাবান গুলিয়ে নিয়ে সকালের দিকে ¯েপ্র করতে হয়। তবে আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরপিড জাতীয় কীটনাশক (ইমিটাফ/ এম্পায়ার/ এডমায়ার ইত্যাদি) ¯েপ্র করতে হয়। পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা ঃ চারা বা গাছ ছোট অবস্থায় এ পোকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এ পোকার মথ দেখতে হালকা লালচে বাদামি রংয়ের। সামনের পাখার রং গাঢ় বাদামি। এ পোকা বছরে ৮ বারেরও বেশি বার বংশ বৃদ্ধি করতে পারে। এরা বাড়ন্ত গাছের কচি পাতা আক্রমণ করে থাকে। এ পোকার ডিম থেকে লার্ভা বের হয়েই শিমের নতুন বা কচি পাতার ভেতরে ঢুকে সুড়ঙ্গ তৈরি করে সবুজ অংশ কুরে কুরে খেতে থাকে। এতে করে পাতার উপরের দিকে সবুজ অংশের মাঝে সাদা সাদা আঁকা-বাঁকা দাগ দেখা দেয়। পাতা ধীরে ধীরে লালচে বাদামি রং ধারণ করে, কুঁকড়িয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। শেষে পাতা দুর্বল হয়ে মরে যায় এবং অনেক সময় ঝরে পড়ে। এতে শিমের ফলন কমে যায়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঃ শিম গাছ বা শিমের মাচা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে এ পোকার উপদ্রব কম হয়। এ জন্য রোপণ দূরত্ব ঠিক রাখার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেতে ভালোভাবে আলো-বাতাস প্রবেশ করার ব্যবস্থা করতে হয়। এ ছাড়া শিম গাছের গোড়ার দিকে ৩-৪ পর্ব বা গিঁট পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় শাখাসহ ঝোপালো অংশ ছেঁটে পাতলা করে দিতে হবে। ক্ষেতের আশপাশে লেবু জাতীয় গাছে বা বেগুন/টমেটো/বরবটি ক্ষেতে এ পোকার উপস্থিতি থাকলে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হয়। পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে ফেনিট্রথিয়ন ৫০ ইসি (সুমিথিয়ন বা লিথিয়ন) অথবা ফেনথিয়ন ৫০ ইসির (লেবাসিড বা ড্রাগন) যে কোনো একটি কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে সম্পূর্ণ গাছে ভালোভাবে ¯েপ্র করতে হয়। আক্রমণ কম হলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলিলিটার ফেনিট্রথিয়ন ৫০ ইসি (সুমিথিয়ন বা লিথিয়ন) বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি মিশিয়ে পাতার উপর ও নিচে ¯েপ্র করতে হয়। ফল ছিদ্রকারী পোকা ঃ গাছের ফল ধরা অবস্থায় এ পোকার আক্রমণে শিম বা ফল খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। শিম বাজারজাত করতে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়। ফল ছিদ্রকারী পোকার কীড়ার মাথা গাঢ় বাদামি থেকে কালো রংয়ের হয়ে থাকে। দেহ হলদেটে সাদা ও নরম এবং পিঠের দিকে মধ্য রেখা বরাবর লম্বালম্বি লালচে ফোটা দেখা যায়। মাথার অংশ শক্ত। পূর্ণ বয়স্ক পোকা দেখতে কালচে ছাই রংয়ের। নীলচে রংয়ের পাখা দেখতে সাদা তুলার মতো। শিমের ফলছিদ্রকারী পোকা শিমের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা। স্ত্রী পোকা ফুলের কুঁড়ি, কচি ফল বা শুঁটি এবং কচি ডগায় ডিম পাড়ে। ডিম থেকে বের হয়ে কীট ফলন্ত গাছের এসব অংশে আক্রমণ করে থাকে। বিশেষ করে ফুলের কুঁড়ি ও কচি ফল ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে বীজ ও শাঁস খায় ও মল ত্যাগ করে শিমের শুঁটিটি খাওয়ার অনুপযোগী করে ফেলে। আক্রান্ত ফল অনেক সময় কুঁকড়ে যায় ও অসময়ে ঝরে পড়ে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শিমের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঃ আক্রান্ত কুঁড়ি, ফুল বা শুঁটি সংগ্রহ করে কম পক্ষে ১ ফুট গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হয়। ক্ষেত সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে হয়। কীটনাশকমুক্ত শিম চাষাবাদে এমএনপিভি (নিউক্লিয়ার পলিহেড্রিসিস ভাইরাস) প্রয়োগ করে এ পোকার আক্রমণ কমানো সম্ভব এবং প্রতি সপ্তাহে একবার করে ডিম নষ্টকারী পরজীবী পোকা ট্রাইকোগ্রামা কাইলোনিজ (হেক্টর প্রতি এক গ্রাম পরজীবী পোকা আক্রান্ত ডিম, যেখান থেকে ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার পূর্ণাঙ্গ ট্রাইকোগ্রামা বের হয়ে আসে) ও কীট নষ্টকারী পরজীবী পোকা ব্রাকন (হেক্টর প্রতি এক বাংকার বা ৮০০-১২০০টি হিসেবে) পর্যায়ক্রমে অবমুক্ত করতে হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে কীটনাশক প্রয়োগের আগে খাওয়ার উপযোগী শিম সংগ্রহ করতে হয়। শিমের ফল ছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণে ডাইমেথোয়েট জাতীয় (স্টার্টার/টাফগর/ডায়মেথিয়ন/সেলাথয়েট/ বিস্টারথয়েট/ ডেলথয়েট ইত্যাদি) অন্তর্বাহী বিষক্রিয়াসম্পন্ন কীটনাশক বা কার্বারিল জাতীয় (সেভিন) কীটনাশক ¯েপ্র করতে হয়। দু’সপ্তাহ পর পর ২-৩ বার ¯েপ্র করতে হয়। ¯েপ্র করার পর ১৫ দিন পর্যন্ত কোনো শিম সংগ্রহ করা উচিত নয়।
লেখক ঃ কৃষিবিদ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বিলুপ্তি প্রায় শিং মাছ রক্ষা পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এক সময় আমাদের খাল-বিল-হাওর-বাঁওড়ে প্রচুর শিং মাছ পাওয়া যেত। বিভিন্ন কারণে প্রাকৃতিক এই সব অভয়াশ্রম নষ্ট ও সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে এখন আর শিং মাছ তেমন একটা পাওয়া যায় না। সে সব দিনে শিং মাছ পুকুরে চাষ হত না। যে কারণে বছর কয়েক আগে শিং মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আশার কথা হল এই যে, আমাদের দেশের মৎস্য খামারিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে শিং মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে। পুকুর নির্বাচন ঃ শিং মাছ চাষের জন্য পুকুর নির্বাচনের সময় কয়েকটা দিক লক্ষ্য রাখতে হবে- ১. পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে। ২. পুকুরের পাড় মজবুত হতে হবে। কোন প্রকার ছিদ্র থাকলে সমস্ত- শিং মাছ চলে যাবে। ৩. বর্ষাকালে বৃষ্টির সময় পানির উচ্চতা ৪ ফুটের বেশি হবে না এই জাতীয় পুকুর নির্বাচন করতে হবে। ৪. চাষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, শিং মাছের পুকুর আয়তাকার হলে ভাল ফল পাওয়া যায়। বর্গাকার একটি পুকুরের চেয়ে আয়তাকার পুকুরে একই হারে খাদ্য ও ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশি উৎপাদন হয়। ৫. পুকুরের আয়তন ৪০/৫০ শতাংশের মধ্যে হতে হবে এবং পুকুরের এক প্রান্ত- অন্য প্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখতে হবে যাতে মাছ ধরার সুবিধাসহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা যায়।
পুকুর প্রস্তুত ঃ নতুন ও পুরাতন উভয় ধরনের পুকুরে শিং মাছ চাষ করা যায়। তবে নতুন পুকুরের চেয়ে পুরাতন পুকুরে শিং মাছ চাষ ভাল হয়। নতুন পুকুরে শিং মাছ চাষ করলে পুকুর ভালভাবে চাষ দিয়ে প্রতি শতাংশে কমপক্ষে ২০ কেজি গোবর ও ভালভাবে মই দিয়ে তারপর চুন দিতে হবে। তাতে মাটির উর্বরতা বাড়বে। শিং মাছের পুুকুর উর্বর না থাকলে অনেক সময় শিং মাছ মজুতের পর পোনা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। পুরাতন পুকুরে শিং মাছ চাষের জন্য প্রথমেই সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। পুকুরের তলায় বেশি কাদা থাকলে উপরের স্তরের কিছু কাদা উঠিয়ে ফেলতে হবে। এরপর চুন দিতে হবে শতাংশ প্রতি ১ কেজি। তারপর পুকুরের চারদিকে জাল দিয়ে ভালভাবে ঘের দিতে হবে। এতে কোন সাপ বা ব্যাঙ পুকুরে ঢুকতে পারবে না। ব্যাঙ বেশি ক্ষতিকর না হলেও সাপ শিং মাছের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শিং পোনার চলার ধীর গতির কারণে সাপ অনেক পোনা খেয়ে ফেলতে পারে। চারপাশে জাল দেয়ার পর পুকুরে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পরিষ্কার পানি দিতে হবে। পানি দেয়ার ২/৩ দিনের মধ্যে পোনা ছাড়তে হবে। পোনা ছাড়ার পর এক ইঞ্চি ফাঁসের একটি জাল পেতে রাখতে হবে তাতে পুকুরের ভেতর কোন সাপ থাকলে ওই জালে আটকা পড়বে। পোনা মজুদ ঃ পুকুর প্রস্তুতের পর গুণগতমানের পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি সাইজের পোনা মজুদ করতে হবে। আজকাল পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেক হ্যাচারিই শিং মাছের পোনা উৎপাদন করে। কিন্তু পোনাকে কীভাবে মজুদ করলে পোনার মৃত্যুহার কম হবে বা আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থাপনা কি হবে তা অধিকাংশ হ্যাচারিই না জানার কারণে শিং মাছের পোনা মজুদের পর ব্যাপকহারে মড়ক দেখা দেয়। প্রথমে যা করতে হবে তা হল, হ্যাচারিতে পোনা তোলার পর কন্ডিশন করে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পোনা ডেলিভারি দিতে হবে। পোনা পরিবহনের পর এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। আর তা না হলে পুকুরে ছাড়ার পর পোনা ক্ষতরোগে আক্রান্ত- হতে পারে। পুকুরে পোনা ছাড়ার ২/৩ দিন পর আবার একই জাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। এতে শিং মাছের পোনা মজুদের পর আর কোন রোগবালাই আসবে না। মজুদ ঘনত্ব ঃ শিং মাছ এককভাবে বা মিশ্রভাবে চাষ করা যায়। মিশ্রভাবে চাষ করতে হলে কার্প জাতীয় মাছের সাথে প্রতি শতাংশে ৩০টি পর্যন্ত- আঙ্গুল সাইজের শিং মাছের পোনা ছাড়তে হবে। পোনা মজুদের সময় পোনাকে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পুকুরে ছাড়তে হবে। কার্প জাতীয় মাছ ছাড়া তেলাপিয়া এবং পাঙ্গাসের সাথেও শিং মাছের মিশ্রচাষ করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫০টি পর্যন্ত- শিং মাছের পোনা মিশ্রভাবে ছাড়া যায়। কার্প জাতীয়, তেলাপিয়া বা পাঙ্গাসের সাথে শিং মাছ চাষ করলে বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। পুকুরের তলায় উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়েই এরা বড় হয়ে থাকে। উপরোন্ত- এই জাতীয় মাছের পুকুরে শিং মাছ মিশ্রভাবে চাষ করলে পুকুরে অ্যামোনিয়াসহ অন্যান্য গ্যাসের কম হয়। একক চাষে শিং মাছ প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১০০০ টি পর্যন্ত ছাড়া যায়। খাবার প্রয়োগ পদ্ধতি ঃ পুকুরে শিং মাছের পোনা মজুদের পর প্রথম ১০ দিন দৈনিক মাছের ওজনের ২০% খাবার প্রয়োগ করতে হয়। ছোট থাকা শিং মাছ সাধারণত রাতের বেলায় খেতে পছন্দ করে; তাই ২০% খাবারকে দু’বেলায় সমান ভাগ করে সন্ধ্যার পর অর্থাৎ ভোরের দিকে একটু অন্ধকার থাকতে পুকুরে প্রয়োগ করতে হয়। মাছ মজুদের পরের ১০ দিন ১৫% হারে এবং এর পরের ১০ দিন মাছের ওজনের ১০% হারে পুকুরে খাবার প্রয়োগ করতে হয় একই নিয়মে। এভাবে এক মাস খাবার প্রয়োগের পর ৫% হারে পুকুরে খাবার দিতে হবে। শিং মাছ ছোট থাকা অবস্থায় রাতে খাবার খেলেও ৩ ইঞ্চির মত সাইজ হওয়ার সাথে সাথে দিনের বেলাতে খাবার দিতে হবে। সন্ধ্যার পর যে খাবার দেয়া হত সেটি সন্ধ্যার একটু আগে এগিয়ে এনে আস্তে আস্তে বিকেলে দিতে হবে। অন্যদিকে ভোর বেলার খাবারও এমনি করে সকাল ৯/১০ টার দিকে পিছিয়ে নিতে হবে। শিং মাছের ওজন ১৫ গ্রাম হলে ৩% এর অধিক খাবার দেয়া মোটেই ঠিক নয় এবং বিক্রির আগ পর্যন্ত এই নিয়মই বজায় রাখতে হবে। পুকুরে বেশি পরিমাণ খাবার দিলে পানি নষ্ট হয়ে যেতে পারে যা শিং মাছ চাষের একটি বড় অন্তরায়। শীতকালে শিং মাছ চাষের জন্য করণীয় ঃ শীতকালে শিং মাছের রোগবালাই থেকে রক্ষার জন্য প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হয়। সাথে প্রতি মাসে একবার এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিন দেয়া দরকার। পানির উচ্চতা ২ ফুটে রাখা বাঞ্চনীয়। গ্যাস দূর করতে কোন অবস্থাতেই শিং মাছের পুকুরে হররা টানা যাবে না। এতে শিং মাছ খাবার ছেড়ে দিয়ে আরো বেশি গ্যাসের সৃষ্টি করবে। নিচের অ্যামোনিয়া গ্যাস দূর করতে গ্যাসোনেক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। শিং মাছ আহরণ পদ্ধতি ঃ অন্যান্য মাছ জাল টেনে ধরা গেলেও শিং মাছ জাল টেনে ধরা যায় না। শিং মাছ ধরতে হলে শেষ রাতের দিকে পুকুর সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। শিং মাছ ধরার উত্তম সময় হল ভোর বেলা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। রোদের সময় মাছ ধরলে মাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাছ ধরার পর মাছ থেকে গেলে শ্যালো দিয়ে কমপক্ষে ২ ফুট ঠান্ডা পানি দিয়ে পুকুর ভরে রাখতে হবে। পরের দিন আবার একই নিয়মে মাছ ধরতে হবে। শিং মাছ ধরতে একটা কৌশল অবলম্বন করতে হয়। একহাতে নুডুল্সের প্লাস্টিক ছাকনী আর অন্য হাতে স্টিলের ছোট গামলা দিয়ে মাছ ধরে প্লাস্টিকের বড় পাত্রে রাখতে হবে। এরপর মাছগুলো হাপায় নিয়ে ছাড়তে হবে। আগেই উল্লেখ করেছি, শিং মাছের পুকুর এক পাশে ঢালু রাখা দরকার। এতে পুকুর সেচ দেয়ার পর সমস্ত মাছ একপাশে চলে আসবে। তা না হলে সমস্ত পুকুর জুড়ে মাছ ছড়িয়ে থাকবে। মাছ ধরায় খুব সমস্যা হবে। সাধারণত শিং মাছ ধরার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। মাছের কাঁটা বিঁধলে সেখানে খুবই ব্যথা হয়। কাঁটা বিঁধানো জায়গায় ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে গরম পানি দিলে সাথে সাথে কিছুটা উপশম হয়। এছাড়া মলম লাগিয়ে গরম বালির ছ্যাক দিলেও আরাম পাওয়া যায়। তাই শিং মাছ ধরার আগে এমন ব্যবস্থা রাখলে মন্দ হয় না। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে এসবের কিছুরই প্রয়োজন হয় না। শিং মাছ বাজারের একটি দামি মাছ। ডাক্তাররা বিভিন্ন রোগির পথ্য হিসেবে শিং মাছ খাবার উপদেশ দিয়ে থাকেন। কথায় আছে, শিং মাছে গায়ে দ্রুত রক্ত বৃদ্ধি করে থাকে। পুকুরে শিং মাছের কীভাবে চাষ করতে হয় তা আলোচনা করা হল। আলোচিত পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করলে ১০ মাসে এক একরে প্রায় ৪ টন শিং মাছ উৎপাদন সম্ভব যা নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বিলুপ্তির হাত থেকেও রক্ষা পাবে এই শিং মাছ।

বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু আঙ্গুর চাষের জন্য উপযোগী

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্রবাদ আছে আঙ্গুর ফল টক। আর এ কথাটি আমাদের জন্য বেশ কার্যকর এ কারণে যে এই ফলটি আমরা এতদিন ফলাতে পারিনি। পুরোটাই আমদানি করতে হয়। উচ্চমূল্যের কারণে বরাবরই সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। কখনো কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কালেভদ্রে সাধারণ পরিবারের মানুষ আঙ্গুর খায়। কিন্তু আমাদের মাটি ও জলবায়ু আঙ্গুর চাষের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আঙ্গুর চাষ হলেও সেটা পারিবারিক বাগানের আওতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক আঙ্গুর চাষের চেষ্টা চালানো হয় ১৯৯০ সালে গাজীপুরের কাশিমপুরস্থ বিএডিসির উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্রে। আঙ্গুর চাষের জন্য জমি ও মাটি নির্বাচন দোআঁশযুক্ত লালমাটি, জৈব সারসমৃদ্ধ কাঁকর জাতীয় মাটি এবং পাহাড়ের পাললিক মাটিতে আঙ্গুর চাষ ভালো হয়। জমি অবশ্যই উঁচু হতে হবে যেখানে পানি দাঁড়িয়ে থাকবে না এবং প্রচুর সূর্যের আলো পড়বে এমন জায়গা আঙ্গুর চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। জমি তৈরি কীভাবে করবেন। ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুর করবেন । তারপর ৭০দ্ধ ৭০দ্ধ ৭০ সেন্টিমিটার মাপের গর্ত করে তাতে ৪০ কেজি গোবর, ৪০০ গ্রাম পটাশ, ৫০০ গ্রাম ফসফেট এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া গর্তের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ১০-১৫ দিন রেখে দিতে হবে যেন সারগুলো ভালোভাবে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সংগৃহীত চারা গোড়ার মাটির বলসহ গর্তে রোপণ করে একটি কাঠি গেড়ে সোজা হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হবে এবং হালকা পানি সেচ দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আঙ্গুর চারা লাগানোর উপযুক্ত সময় মার্চ-এপ্রিল মাস। আঙ্গুর যেহেতু লতানো গাছ তাই এর বৃদ্ধির জন্য সময়মতো বাড়তি সার প্রয়োগ করতে হবে। রোপণের ১ মাসের মধ্যে বাড়বাড়তি না হলে গোড়ার মাটি আলগা করে তাতে ৫ গ্রাম ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করা দরকার। ১-৩ বছরের প্রতিটি গাছে বছরে ১০ কেজি গোবর, ৪০০ গ্রাম পটাশ, ৫০০ গ্রাম ফসফেট এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। পটাশ সার ব্যবহারে আঙ্গুর মিষ্টি হয় এবং রোগ-বালাইয়ের উপদ্রব কম হয়। গাছ বেড়ে ওঠার জন্য গাছের গোড়ায় শক্ত কাঠি দিতে হবে এবং মাচার ব্যবস্থা করতে হবে- সে মাচায় আঙ্গুর শাখা-প্রশাখা ছড়াবে। গাছের কান্ড ছাঁটাই রোপণের পরবর্তী বছরের ফেব্র“য়ারি মাসে মাচায় ছড়িয়ে থাকা আঙ্গুর গাছের কান্ড ছাঁটাই করতে হবে। অধিকাংশ খামারিরই প্রশ্ন- গাছে ফুল হয় কিন্তু ফল হয় না। এর কারণ কী? কান্ড ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে আঙ্গুর গাছের ফলন বৃদ্ধি হয় এবং ফুল ঝরে পড়া কমে যায়। ছাঁটাইয়ের ৭ দিন আগে এবং পরে গোড়ায় হালকা সেচ দিতে হয়। গাছ রোপণের পর মাচায় ওঠা পর্যন্ত প্রধান কান্ড ছাড়া অন্যসব পাশের শাখা ভেঙে ফেলতে হবে। প্রথম ছাঁটাই মাচায় কান্ড ওঠার ৩৫-৪৫ সেন্টিমিটার পর প্রধান কান্ডের শীর্ষদেশ কেটে দিতে হবে যাতে ওই কান্ডের দুই দিক থেকে দুটি করে চারটি শাখা গজায়। দ্বিতীয় ছাঁটাই গজানো চারটি শাখা বড় হয়ে ১৫-২০ দিনের মাথায় ৪৫-৬০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে তখন ৪টি শীর্ষদেশ কেটে দিতে হবে যেখানে থেকে আরো আগের মতো দুটি করে ১৬টি প্রশাখা গজাবে। তৃতীয় ছাঁটাই এই ১৬টি প্রশাখা ১৫-২০ দিনের মাথায় ৪৫-৬০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে তখন আবার এদের শীর্ষদেশ কেটে দিতে হবে যাতে প্রতিটি প্রশাখার দুদিকে দুটি করে ৪টি নতুন শাখা এবং এমনিভাবে ১৬টি শাখা থেকে সর্বমোট ৬৪টি শাখা গজাবে। অবশ্য সর্বক্ষেত্রেই যে ৬৪টি শাখা গজাবে এমন কোনো কথা নেই। এই শাখার গিরার মধ্যেই প্রথমে ফুল এবং পরে এই ফুল মটরদানার মতো আকার ধারণ করে আঙ্গুর ফলে রূপান্তরিত হবে। প্রথম বছর ফল পাওয়ার পর শাখাগুলোকে ১৫-২০ সেন্টিমিটার লম্বা রেখে ফেব্র“য়ারি মাসে ছেঁটে দিতে হবে ফলে বসন্তের প্রাক্কালে নতুন নতুন শাখা গজাবে এবং ফুল ধরবে। এই পদ্ধতি ৩-৪ বছর পর্যন্ত চলবে এবং ফলের স্থিতি লাভ করবে। পরিমিত সার এবং উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে একটি আঙ্গুর গাছ না হলেও ৩০ বছর ফলন দিতে পারে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি একরে ৪৩৬টি আঙ্গুর গাছ লাগানো যায় এবং জাতিতে ভিন্নতায় গড়ে প্রতি গাছে প্রতিবছর ৪ কেজি হিসাবে মোট ১৭৪৪ কেজি আঙ্গুর এক একরে উৎপাদন করা সম্ভব। হিসাব করে দেখা গেছে, কৃষকের বসতভিটার ৯ বর্গমিটার জায়গায় ৪টি গাছ লাগিয়ে বছরে সর্বোচ্চ তিনটি ফলনের মাধ্যমে ১৬ কেজি আঙ্গুর উৎপাদন করা সম্ভব। লাউ, শিম, কুমড়া এখন বসতভিটার আঙিনা থেকে বাণিজ্যিকভাবে মাঠপর্যায়ে চাষ হচ্ছে, অতএব বসতভিটার ওই মাচাটি এখন চাইলে আমরা আঙ্গুর মাচায় রূপান্তরিত করতে পারি।

ভাতেই মিলবে দরকারি পুষ্টি উপাদান জিঙ্ক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কী, শিরোনাম পড়ে অবাক হচ্ছেন তো! অবাক হওয়ার কিছুই নেই। দেশের কৃষি বিজ্ঞানীর কল্যাণে এটি এখন সত্যি হয়ে গেছে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। দেশের বাজারে খোঁজ করলেই পাবেন এমন ভিটামিন যুক্ত চাল। আর সে চাল সিদ্ধ করেই পেতে পারেন জিঙ্ক ভিটামিন। কৃষি বিজ্ঞানীরা বলেছেন, জিঙ্ক সাধারণত সামুদ্রিক মাছ, মাংস, কলিজা ও ফলমূলে বেশিরভাগ পাওয়া যায়- যার বেশিরভাগই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদিন গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। প্রতিদিন ঘাটতি থেকে যায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। মানবদেহে জিঙ্ক প্রায় ৩৬০ ধরনের হরমোনকে তাদের কার্যকারিতা সম্পন্ন করতে সহায়তা করে। জিঙ্কের ঘাটতির কারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায় আমাদের বিপাকীয় কার্যক্রম- তথা বৃদ্ধি ও বিকাশ। আর এসব কারণেই বাংলাদেশের উচ্চ ফলনশীল ধানের সঙ্গে পরাগায়ন ঘটিয়ে জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাতগুলো উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ধান থেকে কৃষকরা নিজেরাই বীজ তৈরি করে রোপণ করতে পারবেন। কৃষি বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোপা আমন মৌসুমের জন্য দুটি জিঙ্কসমৃদ্ধ জাত ব্রি ধান৬২ এবং ব্রি ধান৭২ (স্বল্প জীবনকাল) উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ব্রি ধান৬২ এর প্রতি কেজি চালে প্রায় ২০ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে। হেক্টর প্রতি এর ফলন ৪ থেকে সাড়ে ৪ টন। বছরের অন্যান্য মৌসুমেও এ ধানের আবাদ করা যায়। ব্রি ধান৭২-এর প্রতি কেজি চালে জিঙ্ক রয়েছে ২২ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ দশমিক ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ টন। এ ধান চাষাবাদে প্রচলিত জাতের চেয়ে কম পরিমাণে ইউরিয়া সার লাগে। এদিকে বোরো মৌসুমের জন্য ব্রি ধান৬৪ উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার প্রতি কেজিতে ২৫ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে। হেক্টর প্রতি এর ফলন ৭ টন। উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের মতো। ব্রি ধান৭৪-এর প্রতি কেজি চালে জিঙ্ক রয়েছে ২৪ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। হেক্টরপ্রতি ফলন ৮ টনেরও বেশি। এ জাতটি মধ্যম মানের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান২৮-এর বিকল্প হিসেবে সম্প্রতি উদ্ভাবন করা হয়েছে ব্রি ধান৮৪, এটিও জিঙ্কসমৃদ্ধ। বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মীর্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন করেছে বিনাধান২০। এর চালের রঙ লালচে ও বাদামি। প্রতি কেজি চালে ২৬ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে। এ জাতটি চাষাবাদ উচ্চ ফলনশীল ধানের আবাদের মতোই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি হাইব্রিড জাতের জিঙ্ক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বিইউ হাইব্রিড ধান১ নামে এই জাতে মানবদেহের জন্য অতি প্রয়োজনীয় আয়রন ও জিঙ্ক রয়েছে। এটি সুগন্ধি গুণসম্পন্ন। প্রতি কেজি চালে ২২ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কর্মশালায় বেসরকারি সংস্থা হারভেস্টপ্লাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ড. মো. খায়রুল বাশার বলেন, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এ পর্যন্ত ১৬টি বায়োফরটিফাইড ক্রপ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত ৮টি। যা দেশের মানুষের জিঙ্কের চাহিদা পূরণ করবে। কিভাবে সেগুলো বাজারজাত করা যায়, সে লক্ষ্যে তার প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রথম কৃষক-পর্যায়ে জিঙ্ক ধানের বিতরণ শুরু করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং এনজিওদের মাধ্যমে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলায় বীজ বিতরণ করতে সক্ষম হয়েছে। ধান ছাড়া বায়োফর্টিফাইড ফসলের অন্যান্য জাতগুলো কৃষকপর্যায়ে খুব সহজলভ্য না হলেও আগ্রহী উৎপাদনকারীরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। বর্তমানে বিএডিসি কিছু পরিমাণে বীজ উৎপাদন শুরু করেছে এবং মেহেরপুর, যশোর, বগুড়া, মানিকগঞ্জ এবং রাজশাহী এলাকায় কিছু বীজ উৎপাদনকারী প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জিঙ্ক ধান বীজ উৎপাদন করে যাচ্ছে। গবেষণায় উঠে এসেছে দেশে পাঁচ বছরের নিচে এমন বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশু জিঙ্ক স্বল্পতায় ভুগছে। আবার বিভিন্ন বয়সী ৫৭ শতাংশ নারীর রয়েছে জিঙ্কস্বল্পতা। ১৫ থেকে ১৯ বছরের শতকরা ৪৪ ভাগ মেয়ে জিঙ্কের অভাবে খাটো হয়ে যাচ্ছে। এর সমাধান খুঁজতেই ভাতের মাধ্যমে জিঙ্কের অভাব দূর করতে জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, অধিক পরিমাণে জিঙ্ক থাকা সত্ত্বেও এই ভাতের স্বাদ ও রঙয়ের কোনো তারতম্য হয় না। পুষ্টি গবেষকদের মতে, জিঙ্কের ঘাটতির কারণে শিশুর শরীরের কলা গঠন ব্যাহত হয়, বাড়বাড়তি কমে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, খাদ্য গ্রহণে অরুচি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়াসহ শিশুর নানাবিধ রোগ দেখা দেয়, স্মৃতিশক্তি কমে যায় ও কম মেধাবী হয়। নারীদের সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা হারানো, কম ওজনের সন্তান জন্ম দেওয়া, বামন বা খাটো শিশুর জন্মদান, গর্ভবতী মায়েদের প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দেয়- যা মা ও শিশুমৃত্যুর কারণ হতে পারে। তা ছাড়াও জিঙ্কের অভাবে মানসিক ভারসাম্যহীনতা, দৃষ্টিশক্তিতে ব্যাঘাত ঘটা, মাথার চুল পড়ে যাওয়া ও প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা দেখা দেয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ১২-১৫ মিলিগ্রাম, দুগ্ধদানকারী মায়েদের ১৬ মিলিগ্রাম এবং শিশুদের ২-১০ মিলিগ্রাম জিঙ্ক প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসান বলেন, সরকার যদি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত ও সহযোগিতা করে তাহলে ভালো ফল আসবে। এ ছাড়া সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সময় যদি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধান-চাল ক্রয় করা হয় তবে কৃষকদের মধ্যে এ ধান আবাদে আগ্রহ বাড়বে। লেখক ঃ আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি

লাউয়ের ফলন বৃদ্ধির উপায়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের সবজির মধ্যে লাউ অন্যতম। বর্তমানে বাজারে লাউয়ের দাম বেশ একটু চড়া। লাউয়ের উৎপাদন বাড়াতে পারলে কৃষক লাভবান হবে পাশাপাশি ক্রেতারাও কম দাম লাউ কিনতে পারবে। লাউ গাছে প্রচুর ফুল ধরে, কিন্তু লাউ ধরে খুব কম। কৌশল জানা থাকলে অধিকাংশ ফুল থেকেই লাউ ধরানো সম্ভব। লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা, কাঁকরোল, পেঁপে ইত্যাদি সবজি গাছ একলিঙ্গ এবং ভিন্নবাসী উদ্ভিদ হওয়ায় প্রাকৃতিক পরাগায়ন কম হয়। অর্থাৎ এসব গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল পৃথক পৃথক হয়। পুরুষ ও স্ত্রী গাছও পৃথক হয়। ফলে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল যদি দূরে থাকে তবে কীট-পতঙ্গ, পোকা-মাকড় অথবা অন্য যে কোনো পরাগায়নের মাধ্যমে প্রাকৃতিক পরাগায়ন সম্ভব হয় না। এ জন্য লাউ ধরে না। পুরুষ গাছ বা পুরুষ ফুল থেকে ফল হয় না। লাউয়ের পুরুষ গাছ ও স্ত্রী গাছ পৃথক হওয়ায় কৃত্রিমভাবে পুরুষ ফুল এনে স্ত্রী ফুলের সঙ্গে মিলন ঘটাতে হয়। কৌশল ঃ প্রতিদিন ভোর বেলায় সদ্যফোটা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পুংরেণু সমৃদ্ধ পুংকেশর রেখে পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলতে হয়। এরপর পুংরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে হালকাভাবে সামান্য একটু ঘষে দিতে হয়। এতে স্ত্রী ফুল নিষিক্ত হয়ে ফল ধরে। একটি পুরুষ ফুলের পুংকেশর দিয়ে ৬ থেকে ৭টি স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে পরাগায়ন করা যায়। এ জন্য একটা লাউয়ের মাচায় শতকরা ১০টা পুরুষ ফুল রাখতে হয়। এতে শতকরা ৯৫টি স্ত্রী ফুলে ফল ধরবে। এ জন্য পুরুষ ও স্ত্রী ফুল চেনা প্রয়োজন। ফুল চেনার উপায় ঃ পুরুষ ফুল : ফুলের বোঁটার অগ্রভাগে ফুটে। পাপড়ির গোড়ায় গর্ভাশয় থাকে না। পাপড়ির মাঝখান দিয়ে বেড়ে যাওয়া পুংদন্ডে পাউডারের গুঁড়ার মত পুংরেণু থাকবে। পুংদন্ডের শীর্ষভাগে গর্ভমুন্ড থাকবে না। শুধু বোঁটার অগ্রভাগে ফুটে থাকা ফুলগুলো পুরুষ ফুল। স্ত্রী ফুল ঃ ক্ষুদ্রাকৃতি লাউয়ের মত গর্ভাশয়ধারী ফুলগুলো স্ত্রী ফুল। গর্ভাশয়ের ওপর থেকে পাপড়ি থাকবে। পুংদন্ড থাকবে না। গর্ভদন্ড ছোট ও মোটা। গর্ভদন্ডে আঠালো পদার্থ থাকবে। পুংরেণু এখানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঠায় আটকে যায়। অনেকেরই ধারণা, শুধু স্ত্রী ফুলের এই গর্ভাশয় থাকলেই লাউ ধরবে। গর্ভমুন্ডে পুরুষ ফুলের পুংরেণু না লাগা পর্যন্ত লাউ ধরবে না। অন্যান্য কৌশল ঃ ১. গর্ভাশয় ঝরে পড়াকে অনেকেই মনে করে কচি লাউ ঝরে পড়ে। সত্যিকারে তা নয়। যেসব স্ত্রী ফুল পুংরেণু দ্বারা নিষিক্ত হয় না অর্থাৎ পরাগায়ন হয় না সেগুলো ঝরে পড়ে। এ জন্য উপরোক্ত নিয়মে কৃত্রিম পরাগায়ন করতে হবে। এরপরেও ঝরে পড়লে গাছের গোড়ায় নিয়মিত পানি দিতে হবে। গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমপি সার গাছের গোড়া থেকে ৬ ইঞ্চি দূর দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। ২. কচি লাউ পচে যাওয়ার কারণ হচ্ছে ফ্রুট ফ্লাই পোকা কচি লাউয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। এ ক্ষতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে লাউ পচিয়ে ফেলে। এ পোকা হাত দ্বারা মারা যায়। ছাই দেয়া যেতে পারে। অথবা ডায়াজিনন/ ডাইমেক্রন/ নগস ছিটাতে পারেন। ৩. লাউ গাছ খুব বড় হয় কিন্তু ফুল কম ধরে। এ জন্য জৈব সার কম দিতে হবে। টিএসপি ও এমপি সার সম্পূর্ণ মাত্রায় দিতে হবে। এছাড়াও গ্রোথ হরমোন ¯েপ্র করতে পারেন। ৪. ফুলের মধ্যে পিঁপড়া আক্রমণ করলে ছাই অথবা সেভিন ছিটাতে পারেন। ৫. ইঁদুরের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বিষটোপ অথবা ফাঁদ দিতে পারেন। যা হোক লাউ চাষে ওই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারলে লাউয়ের ফলন বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

শৈত্যপ্রবাহে ফসল রক্ষায় করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ রবি মৌসুমে প্রায় সারা দেশে বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে ঘন কুয়াশা ও প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়া প্রবাহিত হয়ে থাকে। প্রতিবছরই বোরো বীজতলাসহ বিভিন্ন মাঠ ফসল ঠান্ডাজনিত আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। প্রচন্ড ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশার কবল থেকে বোরো বীজতলাসহ বিভিন্ন মাঠ ফসল রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে। প্রচলিত কিছু পদ্ধতি ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি উভয়ই মিলিয়ে সহজেই সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে ফসল রক্ষা করা যায় এবং অধিক ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। বোরো ফসল ঃ বীজতলায় এক থেকে দুই ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে এবং স্বচ্ছ পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা দরকার। শৈত্যপ্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০-১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিলে, প্রতিদিন সকালে রশি টানা দিয়ে চারা থেকে কুয়াশার পানি ফেলে দিলে চারা শীত থেকে রক্ষা পায় এবং ভালোভাবে বাড়তে পারে। ঠান্ডার কারণে চারায় ধসেপড়া রোগ দেখা দিলে বীজতলা থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে এবং বীজতলায় প্রতি শতাংশে ৫০ গ্রাম পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপণের সময় শৈত্যপ্রবাহ থাকলে কয়েকদিন দেরি করে চারা রোপণ করুন। রোপণের জন্য কমপক্ষে ৩৫-৪৫ দিনের চারা ব্যবহার করতে হবে। এ বয়সের চারা রোপণ করলে শীতে চারা কম মারা যায়, চারা সতেজ থাকে এবং ফলন বেশি হয়। থোড় ও ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়া থাকলে জমিতে ২-৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখলে থোড় সহজে বের হয় এবং চিটার পরিমাণ কম হয়। ঠান্ডা সহনশীল জাত যেমন-ব্রি ধান৩৬, ব্রি ধান৫৫ চাষ করলে বেশি ঠান্ডায় চারা কম মারা যায়। আলু ও টমেটো ঃ ঘন কুয়াশার কারণে আলু ও টমেটো ফসলে লেইট বস্নাইট (মড়ক রোগ) রোগের আক্রমণ হতে পারে। এ ধরনের আবহাওয়ায় আলু ও টমেটো ফসলে প্রতিরোধক হিসেবে বর্দোমিকচার অথবা মেনকোজেবজাতীয় ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে সাতদিন পর পর ¯েপ্র করতে হবে। এ রোগের আক্রমণ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত গাছ তুলে মাটিচাপা দিতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে এবং জমিতে সেচ দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। এ ছাড়া প্রতি লিটার পানিতে সিকিউর এক গ্রাম মেলোডিও দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে সাত থেকে ১০ দিন পর পর ¯েপ্র করতে হবে। সরিষা ও শিম ঃ সরিষা ও শিমগাছে জাবপোকার আক্রমণ দেখা দিলে আঠাযুক্ত হলুদ ফাঁদ অথবা আধাভাঙ্গা নিমবীজের পানি (এক লিটার পানিতে ৫০ গ্রাম নিমবীজ ভেঙে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে ছেঁকে নিতে হবে) আক্রান্ত গাছে ৭-১০ দিন পর পর ¯েপ্র করতে হবে। তবে আক্রমণের মাত্রা খুব বেশি হলে প্রতি লিটার পানিতে অ্যাডমায়ার/টিডো/অ্যামিটাফ ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। আমের মুকুল ঃ ঘন কুয়াশার কারণে আমগাছের মুকুল নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এরূপ আবহাওয়ায় আমগাছে প্রতিরোধক হিসেবে বর্দোমিকচার অথবা সালফারঘটিত ছত্রাকনাশক যেমন-থিওভিট ৮০ ডাব্লিউজি প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া এরূপ আবহাওয়ায় শোষক পোকার (হপার) বংশ দ্রুত বৃদ্ধি ঘটতে পারে তাই গাছের কান্ডে ও পাতায় সাইপারমেথ্রিন ১০ ইসি বা ল্যামডা সাই হ্যালাথ্রিন ২.৫ ইসি বা ফেন ভেলোরেট ২০ ইসি গ্র“পের যে কোনো কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে এক মিলি হারে ¯েপ্র করতে হবে। পানের পাতা ঝরা রোধ ঃ তীব্র শীতের কারণে অনেক সময় পানের পাতা ঝরে যেতে পারে। পানের বরজের চারপাশে বিশেষ করে উত্তরে পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিলে তীব্র শীতের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। সুপারি ও নারিকেলের পাতাপড়া রোধ ঃ তীব্র শীতের কারণে অনেক সময় নারিকেল-সুপারির পাতা পুড়ে যেতে পারে। তীব্র শৈত্যপ্রবাহকালে সেচের পানি বা হালকা গরম পানি ¯েপ্র করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে গাছে নিয়মিত সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করলে গাছপালা সুস্থ সবল থাকে এবং যে কোনো খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে। সর্বোপরি, রবি মৌসুমের বিভিন্ন ফসল উৎপাদনে ডিএপিসহ অন্যান্য রাসায়নিক সার সুষম মাত্রায় ব্যবহার করলে বেশি ঠান্ডা থেকে ফসল রক্ষা পায় এবং ফলন বেশি পাওয়া যায়। লেখক : মো. আবু সায়েম, আঞ্চলিক বেতার কৃষি অফিসার, রংপুর

কমেছে সারের দাম

কৃষি প্রণোদনা বেড়েছে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কালের চাকায় ঘুরে বিদায় নিয়েছে ২০১৯ সাল। শুরু হল নতুন বছর ২০২০। ২০১৯ সাল সরকারের অর্জনের বছর। উন্নয়ন ও জনকল্যাণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই কৃষি মন্ত্রণালয়। গত এক বছরে বেড়েছে কৃষি প্রণোদনা, ডিএপি সারের দাম কমানো হয়েছে, অ্যাপভিত্তিক কৃষিসেবা চালু করেছে সরকার। বেড়েছে কৃষি প্রণোদনা ঃ কৃষি উৎপাদন বাড়াতে নয়টি ফসল উৎপাদনে সারাদেশের ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ৮০ কোটি ৭৬ লাখ ৯১ হাজার ৮০০ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়। অক্টোবরে দেওয়া এ প্রণোদনা সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে চলতি রবি মৌসুমে গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, শীতকালীন মুগ, পেঁয়াজ এবং পরবর্তী খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মুগ ও গ্রীষ্মকালীন তিল উৎপাদনে বীজ ও রাসায়নিক সার (ডিএপি ও এমওপি) দেওয়া হয়। রবি মৌসুমে গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, শীতকালীন মুগ, পেঁয়াজ এবং পরবর্তী খরিপ-১ মৌসুমে গ্রীষ্মকালীন মুগ ও গ্রীষ্মকালীন তিল উৎপাদন বৃদ্ধিতে ৬৪টি জেলায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রণোদনার মাধ্যমে প্রতি কৃষক পরিবারকে সর্বোচ্চ এক বিঘা জমির জন্য বিনামূল্যে বীজ ও রাসায়নিক সার প্রণোদনা দেওয়া হয়। ডিএপি সারের মূল্য হ্রাস ঃ কৃষকের স্বার্থে ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের দাম প্রতি কেজিতে ৯ টাকা কমানো হয়েছে। যা গত বিজয় দিবসের দিন থেকে (১৬ ডিসেম্বর) কার্যকর হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে ডিএপি সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে প্রতি কেজি ১৬ টাকা- যা আগে ছিল ২৫ টাকা। আর ডিলার পর্যায়ে প্রতি কেজি ২৩ টাকা থেকে কমিয়ে ১৪ টাকা করা হয়। বিজয় দিবসের উপহার হিসেবে ডিএপি সারের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে। গত ৪ ডিসেম্বর সচিবালয়ে সারের মূল্য হ্রাসের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এ ঘোষণা দেন। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, কৃষকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকদের জন্য উপহার অর্থাৎ হ্রাসকৃত মূলে ডিএপি সারের বিক্রি বিজয় দিবস থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে সুষম সার ব্যবহারে কৃষকরা অধিক ফলন পাবে। পরিবেশবান্ধব টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে। ডিপিতে ফসফরাসের পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও নাইট্রোজেন যুক্ত থাকে। যেটা গাছের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ রোধ করে। ফুল, ফল ও বীজে গুণগতমান বাড়ায়। ফলে এ সার প্রয়োগে একদিকে যেমন ইউরিয়া ও টিএসপি উভয় সারের সুফল পাওয়া যাবে আবার অর্থ ও শ্রম উভয়ের সাশ্রয় হবে। দেশে বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ টন ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে। দাম কমানোর ফলে ডিএপি সারের ব্যবহার আরো বাড়বে।
বেড়েছে অ্যাপভিত্তিক সেবা ও এর ব্যবহার: আবহাওয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোন ধরনের বালাই আক্রমণ করতে পারে সে বিষয়ে ঘরে বসেই চলতি বছরে তথ্য পেয়েছে কৃষক। ফসলের উৎপাদন কখন কী পর্যায়ে রয়েছে সে নির্দেশনাও চলে যাচ্ছে কৃষকের মোবাইল ফোনে। নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক তথ্য পাওয়ায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পোকার আক্রমণ থেকে ফসলের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি কমছে। এতে ফসলের উৎপাদনশীলতা ১৫ শতাংশ বেড়েছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেশ কিছু কৃষিভিত্তিক মোবাইল অ্যাপস চালু রয়েছে। এসব অ্যাপসের মাধ্যমে দেশে চলতি বছর প্রায় ৪০ লাখের বেশি কৃষক সরাসরি সেবা নিয়েছে। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে আরো কয়েক লাখ উপকৃত হয়েছে। চালু হয়েছে সরকারি কৃষি বাতায়ন : কৃষিসেবা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে কৃষি বাতায়ন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) কর্মসূচির আওতায় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে গত ২৮ ফেব্র“য়ারি চালু করা হয়। কৃষি বাতায়নে নিবন্ধিত যে কোনো কৃষক ‘৩৩৩১’ নম্বরে ফোন করে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারছেন। বেসরকারি উদ্যোগ : ১২টি জেলার প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার কৃষককে কৃষিবিষয়ক পাঁচ ধরনের তথ্য সেবা দিচ্ছে এসিআই লিমিটেডের ‘ফসলি’। এ অ্যাপসের মাধ্যমে সম্প্রসারণ কর্মীরা স্যাটেলাইট ডাটা ও আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃষককে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তথ্য দিচ্ছে। কৃষক বালাই ও রোগের ক্ষেত্রে করণীয় এবং শস্য উৎপাদনে আয়-ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণের তথ্য পাচ্ছেন। মাঠে থাকা ফসলের উৎপাদন কোন এলাকায় কোন পর্যায়ে রয়েছে সে তথ্য দিয়েছে। নওগাঁ, রংপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, বগুড়া, দিনাজপুর, কক্সবাজার, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার কৃষকরা এ সুবিধা পেয়েছেন। কৃষি প্রযুক্তি ভান্ডার : গ্রামের কৃষকদের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করতে কৃষি প্রযুক্তি ভান্ডার চালু করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি)। অ্যাপের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ফসলের জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি, বিশেষ করে রোগবালাই, পোকামাকড় ও সার ব্যবস্থাপনাসহ যাবতীয় তথ্য পাওয়া যায়। তথ্য জানার জন্য প্রশ্ন করার সুযোগ আছে। প্রশ্ন করার পর সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। কৃষক জানালা: কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, সমস্যা ও সমাধানের উপায় বিশেষ করে রোগ-পোকামাকড়ের ছবিসহ চিকিৎসাপত্র, সার, বীজ ও বালাইনাশকের তথ্যাবলি, উপজেলার শস্যবিন্যাস, ভেজাল সার শনাক্তকরণের ভিডিওচিত্র রয়েছে অ্যাপে। ছবি দেখে কৃষক নিজেই তার সমস্যা চিহ্নিত করতে পারে। চিহ্নিত ছবিতে ক্লিক করলেই সমস্যার সমাধানের ছবি ভেসে উঠবে। প্রতিটি সমস্যার একাধিক ছবি এবং কমপক্ষে একটি প্রতিনিধিত্বপূর্ণ ছবি যুক্ত আছে। এর মাধ্যমে কৃষক সহজেই তার সমস্যা চিহ্নিত করে। এখানে ১২০টি ফসলের এক হাজারেরও বেশি সমস্যার সমাধান দেওয়া আছে।

টবে চাষ করুন শীতের শাক-সবজি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ শহর জীবনেও শীতের স্বাদ উপভোগ করতে পারেন। তার জন্য একটু কাজ তো করতেই হবে। সেজন্য কম পরিশ্রমে বাড়ির ছাদ, বারান্দা, কার্ণিশে বিভিন্ন আকারের টবে শাক-সবজির চাষ করতে পারেন। তাহলে জেনে নিন টবে সবজি চাষের নিয়ম-কানুন ঃ- যা চাষ করবেন :- টমেটো, বেগুন, মরিচ, শসা, ঝিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, মটরশুটি, কলমি শুটি, কলমি শাক, লাউ, পুঁই শাক, পেঁপে, পুদিনা পাতা, ধনে পাতা, থানকুনি, লেটুস, ব্রোকলি প্রভৃতি। টবের মাটি:- মাটি হতে হবে ঝরঝরে, হালকা এবং পানি ধরে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন। মাটি চালনি দিয়ে চেলে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। দুই ভাগ  বেলে দো-আঁশ মাটির সঙ্গে দুই ভাগ জৈব সার মিলিয়ে বীজতলার মাটি  তৈরি করতে হয়। মাটি এঁটেল হলে একভাগ বালি মিশিয়ে হালকা করে নিতে হয়। মাটিকে জীবাণুমুক্ত করে চারাকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করতে হয়। সাধারণত ১ লিটার ফরমালডিহাইড শতকরা ৪০ ভাগ ৪০ লিটার পানিতে মিশিয়ে এই দ্রবণের ২৫ লিটার প্রতি ঘন মিটার মাটিতে কয়েক কিস্তিতে ভিজিয়ে দিতে হয়। এরপর দু’দিন চটের কাপড় দিয়ে মাটি ঢেকে রেখে পরে চট উঠিয়ে দিলে মাটি জীবাণুমুক্ত হয়। বীজ বপন ঃ মাটি হালকা ঝরঝরে করে টবের উপরের ভাগ সমতল করতে হবে। হালকাভাবে বীজ ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর জৈব সার দিয়ে বীজগুলোকে ঢেকে দিতে হবে। সেচ ঃ নিয়মিত ছোট ছোট ছিদ্রযুক্ত ঝাজরি দিয়ে পানি দিতে হবে। পানির ঝাপটায় যাতে বীজের উপর জৈব সারের আবরণ সরে না যায়। আকারে ছোট বীজগুলোর উপর দিয়ে পানি দিলে পানির ধাক্কায় একস্থানে অঙ্কুরোদগমে ব্যঘাত ঘটতে পারে। তাই সব টবের উপর দিয়ে পানি না দিয়ে তলা দিয়ে  সেচের ব্যবস্থা করা উচিত। পরিচর্যা: হেপ্টোক্লোর ৪০ পরিমাণ মত দিয়ে পিঁপড়া ও মাকড়সার আক্রমণ  থেকে রক্ষা করা যায়। পাখির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে হলে টবের উপর তারের বা নাইলনের জাল দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। টবের মাটিতে বীজ বপনের আগে বিভিন্ন প্রকার আগাছা জন্মাতে পারে। তাই নিড়ানি দিয়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলতে হবে। চারার গোড়ায় যেন আঘাত না লাগে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। টবগুলো অবশ্যই আলো-বাতাসযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত ঝড়-বৃষ্টি-রোদ-তাপ থেকে রক্ষার জন্য সাময়িকভাবে টব নিরাপদ স্থানে সরানো যেতে পারে। সবজি সংগ্রহ : সবজি বেশিদিন গাছে না রেখে নরম থাকতেই তুলে খাওয়া ভালো। সবজি গাছ থেকে ছিঁড়ে সংগ্রহ করা যাবে না। আস্তে করে কেটে সংগ্রহ করতে হবে। তাহলে সবজি গাছের কোন ক্ষতি হবে না।