মিরপুরে ভূট্টা প্রদর্শনীর মাঠ দিবসে বক্তারা

তামাক চাষের বিকল্প হিসাবে ভুট্টা চাষ করুন

আমলা অফিস ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে ভূট্টার চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে ভূট্টার আবাদ সম্প্রসারণে রাজস্ব খাতের আওতায় মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নে ফুলবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে এ মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। মাঠ দিবস অনুষ্ঠানে ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ঢাকা খামারবাড়ির আইসিটি ম্যানেজমেন্ট  প্রোগ্রামার কৃষিবিদ আজম উদ্দিন। এসময় তিনি বলেন, ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশী। এতে প্রায় ১১% আমিষ জাতীয় উপাদান রয়েছে। আমিষে প্রয়োজনীয় এ্যামিনো এসিড, ট্রিপটোফ্যান ও লাইসিন অধিক পরিমানে আছে। এছাড়া হলদে রংয়ের ভুট্টা দানায় প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন বা ভিটামিন-এ থাকে। ভুট্টার দানা মানুষের খাদ্য হিসেবে এবং ভুট্টার গাছ ও সবুজ পাতা উন্নত মানের  গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হাঁস-মুরগি ও মাছের খাদ্য হিসেবেও এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। তিনি আরো বলেন, বেলে দোঁআশ ও দোঁআশ মাটি ভুট্টা চাষের জন্য উপযোগী। এই অঞ্চলের মাটি ভূট্টার জন্য খুবই উপযোগী। আপনারা জমিতে তামাক চাষ এর বিকল্প হিসাবে ভুট্টা চাষ করুন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ভূট্টা চাষ সম্প্রসারণের উপরে বিস্তারিত আলোচনা করে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ। তিনি বলেন, ভূট্টা ঝুঁকিমুক্ত ফসল। আর ভুট্টায় বর্তমানে ফলন ও দাম ভালো পাওয়া যায়। জ্বালানি হিসেবেও ভুট্টা গাছ ব্যবহার করা যায়। ভুট্টার চাহিদা তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে-বাড়ছে জমিতে ভুট্টা উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহ। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার উৎপাদন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসময় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুকেশ রঞ্জন পালের পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ঢাকা খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ ওবাইদুল হক রেজা, মিরপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাবিহা সুলতানা, সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অশোক কুমার কর্মকার, ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবু চিত্তরঞ্জন বিশ^াস, বিশিষ্ট কবি ও লেখক কবি জসিম উল্লাহ আল হামিদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে উপজেলার সকল উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ, এসএপিপিওসহ প্রায় ছয় শতাধিক কৃষক/কৃষাণী উপস্থিত ছিলেন।

 

 

 

 

প্রাণিসম্পদের জন্য গুণগতমানের ফিড

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশে ছোট বড় অসংখ্য ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং বর্তমানে প্রায় ১ কোটি মানুষ এই ফিড সেক্টরের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের বর্তমান পরিসংখ্যান ঠিক এমনটিই বলছে। হাঁস-মুরগী ও গবাদি পশুপালন বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবিকার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এদিকে গত ২ দশকে বাণিজ্যিকভাবে হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু এবং মাছের খামারগুলো বিশেষত্ব অর্জন করেছে। এই বিপুল চাহিদার কারণে গত এক দশকে বাণিজ্যিকভাবে খাদ্য উৎপাদন শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার ফিড ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ অবদান রাখছে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে খামারিদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও চালু করেছে। ফিড ইন্ডাস্ট্রিগুলো একদিকে যেমন বাংলাদেশের মানুষের পুষ্টির ঘাটতি দূরীকরণের চেষ্টা করছে তেমনি অধিকসংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। ইউটিউব ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি ভিডিওতে। মূলত ভিডিওটির প্রথমভাগই আমার দেখার আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলছে। দেখতে পেলাম দুইজন খামারির সফলতার গল্প। এরপরই ক্রমান্বয়ে জানতে পারলাম এর প্রতিষ্ঠাকাল, উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ থেকে শুরু করে ডেলিভারি সিস্টেম পর্যন্ত। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি কয়েকজন সফল খামারি এবং পরিবেশকও এই ফিড ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সন্তোষজনক বার্তা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। দেখেই বুঝতে পারলাম এখানে ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি এবং রয়েছে মন জুড়ানো কিছু শট। ভিডিওটির নির্মাতা স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ফেসবুক ঘেটে বের করলাম এর নির্মাতা মো. মহিউদ্দিন মোস্তফাকে। ধন্যবাদ জানালাম তাকে এ চমৎকার এ কাজটির জন্য। কন্টাক্ট নাম্বার চাওয়ার সঙ্গেই সেটিও দিয়ে দিলেন। এরপর মুঠোফোনে কথা হলো করপোরেট ফিল্মটির নির্মাতার সঙ্গে। তিনি জানান, দেশের শীর্ষ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রমোশনাল কাজ করা সত্যিই গর্বের বিষয়। তারা দেশের প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও আমরা ভিডিওটিতে বাংলাদেশের ফিড সেক্টরের উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় আমরা তুলে ধরেছি। ভবিষ্যতে এরকম আরো ভালো কাজ করতে চাই। ভিডিওটি থেকে আরো জানতে পারলাম, বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, পুষ্টির ঘাটতির দূরীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আশির দশকে যাত্রা শুরু করে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্ট (এআইটি) এবং এটিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফিড উৎপাদন শুরু করে। গাজীপুরের শফিপুরে প্রায় ৯ একর জায়গার ওপর গড়ে উঠেছে এর সুবৃহৎ ফ্যাক্টরি। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি পোল্ট্রি, ফিশ এবং ক্যাটল ফিড উৎপাদন করছে। করপোরেট ফিল্মটি মহিউদ্দিন মোস্তফার পরিচালনায় এবং অ্যাডভারটাইজিং কোম্পানি ‘ফিল্ম ক্যাসল ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে।

দৌলতপুরে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ

দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। খরিফ-১/২০১৯-২০ মৌসুমে প্রণোদনা কর্মসূচীর আওতায় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দৌলতপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের আয়োজনে রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপস্থিত কৃষকদের মাঝে এ বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শারমিন আক্তার-এর সভাপতিত্বে কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড. আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ্। এসময় উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন দৌলতপুর কৃষি অফিসার এ কে এম কামরুজ্জামান, ফিলিপনগর ইউপি চেয়ারম্যান একেএম ফজলুল হক কবিরাজ, হোগলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম চৌধুরী, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফজলুর রহমান ও ফিলিপনগর ইউপি সদস্য কৃষক লিয়াকত আলী। দৌলতপুর কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সঞ্চালণে অনুষ্ঠিত বীজ ও সার বিতরণ অনুষ্ঠানে ২০৭৪ জন কৃষকের মাঝে ৫কেজি আউশ ধান বীজ, ১৫কেজি ড্যাপ ও ১০কেজি এমওপি সার প্রদান করা হয়।

গ্রীষ্মকালীন সবজি ডাটা চাষ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ডাটা বাংলাদেশের অন্যতম গ্রীষ্মকালীন সবজি। ডাটায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-এ, বি, সি, ডি এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ বিদ্যমান। ডাটার কান্ডের চেয়ে পাতা বেশি পুষ্টিকর। খুব কম সবজিতে এত পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ লবণ থাকে। মাটির বৈশিষ্ট্য ডাটার জন্য উর্বর ও গভীর মাটি প্রয়োজন। সুনিষ্কাশিত অথচ ‘জো’ থাকে এমন মাটিতে এটি সবচেয়ে ভাল জন্মে। উৎপাদন কৌশল বাংলাদেশে ডাটার আবাদ খরা মৌসুমেই করা হয়। শীত প্রকট ও দীর্ঘস্থায়ী নয় বলে রবি মৌসুমেও এর চাষ সম্ভব, তবে সেই সময় অন্য অনেক সবজি পাওয়া যায়। জমি তৈরি ডাটার জন্য জমি গভীর করে কর্ষণ ও মিহি করে প্রস্তুত করতে হবে। জমিতে বড় ঢেলা থাকবে না। বাংলাদেশে ডাটা প্রধানত কান্ড উৎপাদনের জন্য চাষ করা হয়। আমাদের বেশি জাতসমূহ কান্ডপ্রধান, এগুলো ডালপালা খুব কম উৎপাদন করে। এসব জাত ৩০ সে.মি. দূরত্বে সারি লাগানো যেতে পারে। চারা গজানোর পর ক্রমান্বয়ে পাতলা করে দিতে হবে।  যেন শেষ পর্যন্ত সারিতে পাশাপাশি দুটি গাছ ৮/১২ সে.মি. দূরত্বে থাকে। যেসব জাতের কান্ড অনেক মোটা ও দীর্ঘ হয় এবং  দেরিতে ফুল উৎপাদন করে সেগুলো আরও পাতলা করা উচিত। বীজের পরিমাণ ডাটা চাষের জন্য শতাংশ প্রতি ১৫ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বপন জমি গভীরভাবে চাষ দিয়ে বড় ঢেলা ভেঙে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে। সারিতে কাঠির সাহায্যে ১.০-১.৫ সে.মি. গভীর লাইন টানতে হবে। লাইনে বীজ বুনে হাত দিয়ে সমান করে দিতে হবে। ছিটিয়ে বুনলে বীজের সঙ্গে সমপরিমাণ ছাই বা পাতলা বালি মিশিয়ে নিলে সমভাবে বীজ পড়বে। বপনের পর হাল্কাভাবে মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিতে হবে। জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে ঝাঝরি দিয়ে হাল্কা করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। তাহলে বীজ দ্রুত এবং সমানভাবে গজাবে। অর্ন্তবতীকালীন পরিচর্যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য জমিকে আগাছামুক্ত রাখা আবশ্যক। প্রয়োজনমতো জমিতে সেচ না দিলে কান্ড দ্রুত আঁশমুক্ত হয়ে ডাটার গুণগতমান ও ফলন কমে যাবে। মাটির চটা ভেঙে ঝুরঝুরে করে দিলে গাছের বৃদ্ধির সুবিধা এবং গোড়াপচা রোগও রোধ হয়। চারা গজানোর ৭ দিন পর হতে পর্যায়ক্রমে একাধিকবার গাছ পাতলাকরণের কাজ করতে হবে। জাত ভেদে ৫-১০ সে.মি. অন্তর গাছ রেখে বাকি চারা তুলে শাক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যেহেতু দ্রুত বর্ধনশীল ফসল তাই সঠিক সময়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ফসল তোলা কান্ড প্রধান জাতে ফসল সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। গাছে ফুল আসার পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় ফসল তোলা যেতে পারে। ফুল আসলেই কান্ড আঁশময় হয়ে যায়। ডাটার কান্ডের মাঝামাঝি ভাঙার চেষ্টা করলে যদি সহজে ভেঙে যায় তাহলে বুঝতে হবে আঁশমুক্ত অবস্থায় আছে। তখনই সংগ্রহের উপযুক্ত সময় বলে বিবেচিত হয়। জীবনকাল লাল তীর সীড লিমিটেড উদ্ভাবিত জাতসমূহের জীবনকাল বপন থেকে ৪০-৬০ দিন। ফলন ডাটা একটি উচ্চ ফলনশীল সবজি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের চাষ করলে প্রতি একরে ১০০-১২০ টন ডাটা পাওয়া সম্ভব।

কৃষকের বাঁচছে সময় ও অর্থ

মিরপুরে মাঠে বসেই কৃষক পাচ্ছেন ডিজিটাল কৃষি সেবা

কাঞ্চন কুমার ॥ কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে, কৃষককের দোড় গোড়ায় কৃষি সেবা পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ কাজ করে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস। মিরপুরের কৃষির সার্বিক উন্নয়নের ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সাধারন কৃষকদের সেবা দিয়ে আস্থা অর্জন করেছে এই অফিসের কর্মকর্তাগণ। ফসলের রোগবলাই, কোন সময়ে বা কোন মাসে মাঠ ফসলের জন্য কি কি করনীয় সেটা তাৎক্ষনিক কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে তৈরী করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পেজ খুলে প্রচারনা। তাদের ফেসবুক পেজে উপজেলা কৃষির সকল তথ্য কৃষকদের মাঝে পৌঁছে দিচ্ছে খুব সহজেই। এতে কৃষককের একদিকে বাঁচছে সময় অন্যদিকে অর্থও।
সেই সাথে প্রতিনিয়িত কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য উপজেলা এবং ইউনিয়ন কৃষক তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্রে কর্মরত কর্মকর্তাগণ কৃষকদের ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে পরাশর্ম দিচ্ছে। এতে সেবার মান আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরেজমিনে গিয়ে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা ইউনিয়নের শাহাপুর মাঠে দেখা যায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: সাদ্দাম হোসেন বেশ কয়েকজন কৃষকদের ডিজিটাল ট্যাবের মাধ্যমে কৃষি সেবা দিতে। সেখানে তিনি বোরো ধানের জমিতে যাতে ব্লাস্ট রোগের আক্রমন না হয় ও হলে কি কি লক্ষন দেখা দিতে পারে এবং তার প্রতিকার কি সে সম্পর্কে তিনি কৃষকদের আগাম সতর্কতা দিচ্ছেন। সেই সাথে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন অ্যাপস এর মাধ্যমে ফসল ব্যবস্থাপনা, রোগ, পোকা-মাকড় সম্পর্কেও ধারণা দিচ্ছেন তিনি। মাঠে বসেই ডিজিটাল অ্যাপস এর মাধ্যমে নিজের ধানের জমিতে কোন রোগ দেখা দিয়েছে কিনা তা মিলিয়ে দেখছেন শাহাপুর এলাকার কৃষক খাইরুল মালিথা। তিনি জানান, “মোবাইলে নাকি কিভাবে ধানের চাষ করা দেখায়। পোকা লেগেছে কিনা দেখা যায়, রোগ হয়েছে কিনা তা দেখা যায়। সেটাই আজকে নিজে হাতে দেখলাম। এই ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি অফিসার বড় এই মোবাইল এর মাধ্যমে আমাদের শেখালেন ধানের কোন সময় কি দিতে হবে। এবং ব্লাস্ট রোগের হওয়ার আগে আমাদের কি কি করতে হবে যাতে এ রোগ না হয়।” আরেকজন কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়েছে। তাই আমরাও এখন ডিজিটাল। কৃষি অফিসের লোকজন আমাদের মাঠে এসেই পরামর্শ দিচ্ছে। আমরাও আমাদের যে কোন অসুবিধা হলেই কৃষি অফিসে ফোন দিয়ে সমাধান পায়। এছাড়া এই আমাদের এখন আর টাকা খরচ করে কৃষি অফিসে যেতে হয় না। ফোন দিয়েও আমরা সেবা নিতে পারছি। এতে আমাদের সময় এবং টাকা দুটোই বেঁচে যাচ্ছে। আরেক কৃষক মনোয়ার মন্ডল জানান, আমার বেগুনের জমিতে পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছিলো। আমি কৃষি অফিসে গিয়ে তাদের বিষয়টি বলি তারপর তাদের পরামর্শ নিয়ে ভালো উপকার পেয়েছি।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো: সাদ্দাম হোসেন জানান, বিভিন্ন ফসল চাষের ক্ষেত্রে কৃষকদের যে কোন সমস্যা দেখা দিলে আমরা চেষ্টা করি তাৎক্ষনিক সেটার সমাধান করার জন্য। নিরাপদ উপায়ে চাষাবাদ এবং আধুনিক চাষাবাদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। কৃষি বিভাগ বর্তমানে কৃষকদের দোড় গোড়ায় কৃষি সেবা পৌঁছে দিতে জোর দিয়েছে। কৃষি কাজের সুবিধার জন্য বিভিন্ন অ্যাপস এর মাধ্যমে আমরা কৃষকের কাছে সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল সেবা মানুষের দোড় গোড়ায় পৌঁছে দিতে কৃষি বিভাগও এগিয়ে রয়েছে। মিরপুর উপজেলায় ২৩টি ডিজিটাল ট্যাবে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে এবং উপজেলার সকল উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার স্মাট ফোনের মাধ্যমে সার্বক্ষনিক কৃষি সেবা নিশ্চিত করছি। এছাড়াও কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষক তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা সেবা দিচ্ছি। তিনি আরো জানান, বতর্মানে অনেক কৃষক স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। আমরা তাদের কাছে কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন অ্যাপস পৌঁছে দিচ্ছি সেই সাথে ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সাথে মতবিনিময় এবং মাঠে গিয়ে কৃষকদের সেবা দেওয়ার দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। উপজেলায় কর্মরত প্রতিটি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাসহ সকলেই মাঠে গিয়ে হাতে কলমেও কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া অব্যাহত রেখেছেন। তিনি আরো বলেন, কৃষক আমাদের কাছে পরামর্শ চাইতে আসার আগেই আমরা চেষ্টা করছি তাদের কাছে গিয়ে পরামর্শ পৌঁছে দেওয়ার।

বীজ সংরক্ষণের লাগসই পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসল উৎপাদনে বীজ যত মানসম্মত হয় ফলন ততবেশি হয়, তত ভালো হয়। ভালো মানসম্মত বীজ যতটুকু না উৎপাদন কৌশলের ওপর নির্ভর করে তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে যথাযথ পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণের ওপর। সাধারণভাবে লাগসই পদ্ধতিতে, আধুনিক পদ্ধতিতে বীজ সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণ পদ্ধতিতে সংরক্ষিত বীজ মানসম্মত থাকে না। আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে খরচ বেশি হয়। সেজন্য কম খরচে মানসম্মত বীজ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাওয়া যায় এমন পদ্ধতিই বিশ্লেষণ করা হবে। আমাদের দেশে সাধারণত মাটির পাত্রে বীজ সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষ কিছু কৌশল আর পদ্ধতি অবলম্বন করলে সাধারণ পদ্ধতি অসাধারণ পদ্ধতিতে পরিণত হয়। বীজ মাটির পাত্রে, বোতলে, পটে, টিনে, ড্রামে, প্লাস্টিকের ড্রামে, বস্তায় সংরক্ষণ করা হয়। তবে বীজ পাত্রের পছন্দ নির্ভর করে বীজের পরিমাণ, জাতের ওপর। যেমন- শাকসবজির বীজ হলে বোতলে/পটে, ডাল  তেল বীজের জন্য পট বা টিনে আর দানাদার বীজ হলে ড্রাম, মাটির পাত্র, পলিথিনের বস্তায় রাখা যায়। যে কোনো পাত্রেই রাখা হোক না কেন সাধারণ অনুসরণীয় কৌশল হলো বীজপাত্রের তলায় শুকনা/পরিষ্কার/ ঠান্ডা বালি রেখে তার ওপর ১০-১২% আর্দ্রতা সম্পন্ন বীজ রাখতে হবে। বীজ পাত্রের ঠিক মাঝখানে ১/২ খন্ড শুকনা চুন রাখতে হয়। তারপর বীজ পাত্রের মুখ পর্যন্ত বীজ রেখে তার উপরে বিশকাটালী/ নিম/ নিসিন্দা/ ল্যান্টানা/তামাকের শুকনা পাতার গুঁড়া মুখে রেখে বীজপাত্র বায়ুরোধী করে বন্ধ করে দিতে হবে। এভাবে বীজ পাত্রে বীজ একবছর পর্যন্ত ভালো থাকে। বীজ সংরক্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু আবশ্যকীয় করণীয় হলো-

ক. বীজ পাত্র মাটির হলে অগণিত অদৃশ্য ছিদ্রের মাধ্যমে বাতাস মাটির বীজপাত্রের ভেতরে ঢুকে বীজের মান নষ্ট করে দেয়। এ জন্য মাটির বীজপাত্র ভালোভাবে লেপে দিতে হবে। বীজপাত্র প্রলেপ দেয়ার জন্য আলকাতরা, গাবের রস, যে কোনো বাজারি রঙ, রান্নার পুরনো তেল, রেডি/ভেরেন্ডা তেল, পাকা বীচিকলার কাথ, কাঁঠালের খোসার কাথ, পাকা বেল এসব দিয়ে মাটির পাত্র লেপে দিয়ে শুকানো বীজ রাখতে হবে। এতে বীজ শতভাগ ভালো এবং বিশুদ্ধ থাকবে।

খ. বীজপাত্রে বীজ যদি কম থাকে তাহলে বিভিন্ন সমস্যা হয়, বীজের মান কমে যায় সেজন্য পারতপক্ষে মুরী, শুকনা পরিষ্কার কাঠের গুঁড়া/ছাই/তুষ দিয়ে বীজপাত্রের খালি অংশ ভরে তারপর বায়ুরোধী করে মুখ বন্ধ করতে হয়। যদি কোনোভাবে বীজপাত্র ভরে দেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে খালি জায়গাটিতে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে আস্তে আস্তে বীজপাত্রের ঢাকনা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিতে হবে। এতে খালি জায়গার জীবাণু মরে গিয়ে বীজপাত্রের পরিবেশ বালাইমুক্ত রেখে বীজ মানসম্মত থাকে।

গ. বীজপাত্রে বীজ রাখার কাজ শেষ হলে হয় শিকায় ঝুলিয়ে রাখতে হয় অথবা ওজনে ভারী হলে মাচা করে চাটাই, কাঠের ওপর এমনভাবে রাখতে হবে যেন বীজপাত্র মাটির বা ফ্লোরের সংস্পর্শে না লাগে। এতে মাটির আদ্রতায় বীজের কোনো ক্ষতি হয় না।

বীজ সংগ্রহ ঃ মাঠ থেকে জমির সবচেয়ে ভালো ফলন সম্পন্ন অংশ বীজের জন্য নির্বাচন করতে হবে। ৮০ শতাংশের উপর পাকলে বীজ কাটার সময় হয়। রোদ্রউজ্জ্বল দিনে ফসল কেটে পরিষ্কার ভালো স্থানে উপযুক্ত উপকরণে মাচা/টেবিল/গাছের গুড়ি/ড্রাম এসবে আড়াই বাড়ি দিলে যে পরিমাণ বীজ আলাদা হয় সেগুলোই ভালো বীজ হিসেবে সংগ্রহ করতে হবে। আড়াই বাড়ির পর যেসব দানা ফসলের কান্ডের সাথে লেগে থাকে সেগুলো গরু/মহিষ বা পায়ে মুড়িয়ে আলাদা করে খাওয়ার জন্য রাখা যায়। এরপর ভালোভাবে   রোদে শুকিয়ে, নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। বীজ শুকানো হলো কিনা তার লাগসই পরীক্ষা হলো দাঁতের মধ্যে দিয়ে চাপ দিলে কটকট আওয়াজ করলে বা ধানের বীজ ডানহাতের বৃদ্ধ ও তর্জনীর মধ্যে দিয়ে কানের কাছে নিয়ে চাপ দিলে কট করে আওয়াজ হয়। এতে বুঝতে হবে ধানের আর্দ্রতা সংরক্ষণের পর্যায়ে এসেছে। তারপর শুকিয়ে ঠান্ডা করে উপযুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করতে হয়। মোটকথা বীজের জন্য সবকিছু আলাদা বিশেষত্ব অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

আউশের আবাদ ও ফলন বৃদ্ধিতে করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আউশ শব্দের অর্থ আগাম। বাংলা আশু শব্দ থেকে আউশ শব্দের উৎপত্তি। আউশ মানে আশু ধান্য। আশি থেকে একশ বিশ দিনের ভেতর এ ধান ঘরে তোলা যায়। দ্রুত (আশু) ফসল উৎপন্ন হওয়ার বিচারে এই ধানের এমন নামকরণ হয়েছে। খনার বচনে আছে ‘আউশ ধানের চাষ, লাগে তিন মাস, কোল পাতলা ডাগর গুছি, লক্ষ্মী বলে হেথায় আছি অর্থাৎ আউশ ধান চাষে তিন মাস লাগে। ফাঁক ফাঁক করে লাগালে গোছা মোটা হয় এবং ফলনও বেশি হয়’। আরো সহজ কথায় আউশে আমন-বোরোর মতো যতœ নিলে ফলন কোনো অংশেই কম হয় না। আউশ সালোকসংশ্লেষণ বেশি হয়, জীবনকাল কম এবং পানি সাশ্রয়ী। কথায় আছে জ্যৈষ্ঠে খরা ধানে ভরা। অথ্যাৎ জ্যৈষ্ঠ মাসে একটু বৃষ্টি পেলেই আউশের জমি সবুজ ধানে ভরে যায়। এ জন্য আউশ আবাদে বৃষ্টি ছাড়া অতিরিক্ত পানির তেমন দরকার হয় না। সার দেয়ার প্রয়োজনীয়তাও বোরোর চেয়ে কম। এক সময় সারাদেশে অনেক এলাকা জুড়ে এ ধানের আবাদ করা হতো। আমাদের দেশে শুকনো মওসুমে বোরো চাষে সেচ কাজে পানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়- যা মেটাতে ভূ-গর্ভস্থ পানি অধিক উত্তোলন করা হয়। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে ও ভৌগোলিক পরিবেশ বিঘিœত হয়। ব্রির গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে ২০০০-২৫০০ লিটার পানির প্রয়োজন যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল তাই বোরো এলাকা আর না বাড়িয়ে বরং আউশের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। স্বাধীনতার পরপর আউশের জমি ছিল ৩.০ মিলিয়ন হেক্টর। আর বোরোর জমি ছিল ১ মিলিয়ন হেক্টরের কাছাকাছি। পবারো শুধু হাওর আর বিল এলাকার আশপাশে চাষ করা হতো। আউশ করা হতো কিছুটা উঁচু জায়গায়।
আউশের প্রকারভেদ ঃ দুরকমের আউশ হয়। যেমন- বোনা ও রোপা আউশ। বোনা আউশ: বোনা আউশে সাধারণত মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের ২৫ তারিখের মধ্যে (১০ চৈত্র হতে ১০ বৈশাখ) বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের জন্য হেক্টর প্রতি ৭০-৮০ কেজি বীজ ছিটিয়ে বপন করে হালকাভাবে একটা চাষ ও মই দিয়ে মাটি সমান করতে হয়। সারি করে ২৫ সে.মি. দূরত্বে ৪-৫ সি.মি. গভীর সারি করতে হয়। এতে হেক্টর প্রতি ৪০-৫০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। তারপর মই দিয়ে মাটি সমান করতে হয়। ডিবালং পদ্ধতিতে বাঁশ বা কাঠের দন্ড দিয়ে ২০ সি.মি. পরপর মাটিতে গর্ত করে প্রতি গর্তে ২/৩ বীজ বপন করে মই দিয়ে সমান করে দিতে হয়। এই পদ্ধতিতে বীজ হার হলো ২৫-৩০ কেজি/হেক্টর। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন কোনো বীজ মাঠের ওপরে না থাকে। জমিতে প্রচুর পরিমাণে রস থাকলে বীজ বপন করতে হবে। চারাগুলোর ১ সপ্তাহ পর আঁচড়া দিয়ে জমির মাটি আলাদা করে দিতে হবে। এতে চারার ঘনত্ব ঠিক থাকবে গাছের বাড় বাড়তি ভালো হবে, আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। রোপা আউশ ঃ বীজ বপনের সময় হলো ১৫ চৈত্র হতে ৫ বৈশাখ (৩০ মার্চ-১৫ এপ্রিল) এবং চারা রোপণের সময় ৫-৩০ বৈশাখ (১৫ এপ্রিল -১০ মে)। উর্বর ও উঁচু জমিতে বীজতলা করতে হবে যেখানে হঠাৎ বৃষ্টিতে/বন্যায় পানি উঠার সম্ভবনা নেই। এ ক্ষেত্রে চারার বয়স হবে ১৫-২০ দিনের এবং রোপণ দূরত্ব রাখতে হবে সারি থেকে সারি ২০ সে.মি. ও চারার দূরত্ব ১৫ সে.মি.।
জাত নির্বাচন ঃ আগে আউশ আবাদ স্থানীয় জাত নির্ভর ছিল। স্থানীয় জাতের গড় ফলন ছিল হেক্টর প্রতি ২.০০ টন থেকে ২.৩৫ টন পর্যন্ত। ব্যতিক্রম ছিল কেবল কটকতাঁরা, যার এর হেক্টর প্রতি ফলন ছিল ৩.৩৫ টন। তবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এখন পর্যন্ত ১১টি আউশের জাত উদ্ভাবন করেছে; যার মধ্যে বোনা হিসেবে বিআর২০, বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩ ও ব্রি ধান৮৩ এবং রোপা হিসেবে বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮, ব্রি ধান৮২ ও ব্রি ধান৮৫সহ প্রত্যেকটি জাতের ফলন কটকতাঁরার চেয়ে অনেক বেশি। তা ছাড়াও বোরো মওসুমের ১২টি জাত আউশ মৌসুমে ভালোভাবে চাষ করা যায়। এগুলোর ফলন ৩.৫-৫ টন/ হে.।
সম্পূরক সেচ ঃ আউশ চাষাবাদ পুরোটাই বৃষ্টি নির্ভর। তবে প্রতি বৎসর সব স্থানে বৃষ্টিপাতের ধরন এক রকম হয় না। এমন কি একই বছরে একই স্থানে সবসময় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। বিশেষত বোনা আউশে এটি বৃষ্টিপাতের পর জমিতে জো আসলে বীজ ছিটানো হয়। যদি সময়মতো বৃষ্টিপাত না হয় তাহলে যে কোনো পর্যায়ে সাময়িকভাবে বৃষ্টির অভাব দেখা দিলে অবশ্যই সম্পূরক সেচ দিতে হবে। একইভাবে রোপা আউশের সময়ও যদি প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হয় তবে বৃষ্টির আশায় না থেকে প্রয়োজনে একাধিক সম্পূরক সেচ দেয়া যেতে পারে। এ জন্য আউশ মৌসুমে নিশ্চিত ভালো ফলনের জন্য ধান জমিতে প্রতিষ্ঠিত করতে সম্পূরক সেচের প্রয়োজন পড়ে।
বীজ বপন ঃ বোনা আউশের বীজ তিনভাবে বপন করা যায়- ছিটিয়ে- এতে শতকরা ৮০ ভাগ অঙ্কুরোদগম সম্পন্ন ভালো বীজ হেক্টরপ্রতি ৭০-৮০ কেজি হারে বুনে দিতে হবে, এরপর হাল্কাভাবে একটা চাষ ও মই দ্বারা মাটি সমান করতে হবে। সারি করে- এতে ২৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে ৪-৫ সে.মি. গভীর করে সারি তৈরি করতে হবে এবং হেক্টর প্রতি ৪৫-৫০ কেজি হারে বীজ বপন করতে হবে। এবার মই দিয়ে মাটি সমান করতে হবে। ডিবলিং পদ্ধতিতে- এতে বাঁশ বা কাঠের দন্ড দিয়ে ২০ সেন্টিমিটার পর পর মাটিতে গর্ত করে গর্তপ্রতি ২/৩ টি করে বীজ বপন করে মই দিয়ে মাটি সমান করে দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে বপনের জন্য বীজের হার হলো হেক্টর প্রতি ২৫-৩০ কেজি। সার ব্যবস্থাপনা ঃ মাটির উর্বরতার মান যাচাই এবং ফলন মাত্রার ওপর ভিত্তি করে সারের মাত্রা ঠিক করা প্রয়োজন। বোনা/রোপা আউশে ইউরিয়া- টিএসপি-এমওপি-জিপসাম- দস্তা (মনোহাইড্রেট) হেক্টর প্রতি ১৩৫ – ৫৫- ৭৫ – ৩৫- ৫ হারে প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরির শেষ চাষের সময় বোনা আউশের সব সারই প্রয়োগ করতে হবে। বৃষ্টিবহুল বোনা আউশে ইউরিয়া সমান দুকিস্তিতে প্রয়োগ করলে গাছের বাড় বাড়তি ভালো হয় ও ফলন বৃদ্ধি পায়। ১ মণ কিস্তি শেষ চাষের সময় ও ২য় কিস্তি ধান বপনের ৩০-৪০ দিন পর। রোপা আউশে ইউরিয়া ১ কিস্তি (১/৩) শেষ চাষের সময়, ২য় কিস্তি (১/৩) ৪-৫টি কুশি দেখা দিলে (সাধারণত রোপনের ১৫-১৮ দিন পর) এবং ৩য় কিস্তি (১/৩) ইউরিয়া কাইচথোড় আসার ৫-৭ দিন পূর্বে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। জমিতে গন্ধক এবং দস্তার অভাব থাকলে শুধুমাত্র জিপসাম এবং দস্তা (মনোহাইড্রেট) প্রয়োগ করতে হবে।
সম্ভাবনা ও সুপারিশ ঃ কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েব পোর্টাল থেকে জানা যায়, দেশে মোট আবাদযোগ্য জমি ৮৫.৭৭ লাখ হেক্টর, মোট সেচকৃত জমি ৭৪.৪৮ লাখ হেক্টর, আবাদযোগ্য পতিত জমি ২.২৩ লাখ হেক্টর। সেচ নির্ভর জমি বোরো উৎপাদনে ছেড়ে দিয়ে দেশজুড়ে থাকা আবাদযোগ্য পতিত জমিতে আউশ আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে গড় ফলন ৩.০ টন/ হে. ধরলেও বিপুল পরিমাণ ফলন জাতীয় উৎপাদনে যোগ হবে। সেচ নির্ভর বোরো ধান আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় সর্বাধিক অবদান রাখা সত্ত্বেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ও ভৌগলিক পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে বোরো আবাদি এলাকা যথাসম্ভব কমিয়ে পানি সাশ্রয়ী আউশের আবাদ বৃদ্ধি করা জরুরি।

দেশীয় মলা মাছ হতে পারে পুষ্টি ও আয়ের অন্যতম বড় উৎস

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশীয় মলা মাছ হতে পারে পুষ্টি ও আয়ের অন্যতম বড় উৎস।

দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে খালবিলের অতি পরিচিত একটি মাছ মলা। প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় বসতবাড়ির পুকুরে এই মাছ চাষ করে কৃষিনির্ভর পরিবারের পুষ্টির অভাব পূরণ সম্ভব। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই মাছ চাষ পারিবারিক আয়ের একটি বড় উৎস হতে পারে। সব মিলিয়ে মলা মাছ চাষ হতে পারে টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের কিছু এলাকা নিয়ে এই গবেষণা করা হয়েছে। ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এই মাছটি মানব দেহের নানা রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষিনির্ভর ২  কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ভিটামিন এ, আয়রন এবং জিঙ্কের অভাবে ভুগছে। যাদের মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যাই বেশি। ফলে শিশুদের শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের গঠন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশটির নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে সাশ্রয়ী মূল্যের প্রধানতম খাদ্য ভাত। তবে এই ভাত পর্যাপ্ত ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণে সমর্থ নয়। এ অবস্থায় গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়ির পুকুরে অন্যান্য মাছের সঙ্গে মলা চাষ পুষ্টি এবং পরিবারের আয়ের একটি ভালো উৎস হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাম্য অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

যশোরে মলা মাছ চাষের উপর একটি প্রকল্প পরিচালনা করেছে ‘সেন্ট্রাল সিস্টেম ইনিশিয়েটিভ অব সাউথ এশিয়া ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি সংস্থা। এই সংস্থার অর্থায়নে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদে পরিচালিত প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামাঞ্চলের কৃষিনির্ভর পরিবারের পুষ্টির অভাব পূরণের মাধ্যমে খাদ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপশি পারিবারিক আয়ের ভালো উৎস নিশ্চিত করা।

এই প্রকল্পের সহায়তায় নিজ বাড়ির পুকুরে অন্যান্য কার্প জাতীয় মাছের সঙ্গে মলা মাছ চাষ করছেন যশোরের জগাহাটি গ্রামের তাছবিনা বেগম। তিনি বলেন, এই প্রকল্প গ্রহণের আগে আমরা সপ্তাহে একবার মাত্র মাছ খেতে পারতাম। কারণ পরিবারের অন্যান্য আবশ্যিক চাহিদা মিটিয়ে পর্যাপ্ত মাছ কিনে খাওয়া অনেকটা অসম্ভব ছিল। এখন আমরা শিখেছি কিভাবে অন্যান্য মাছের সঙ্গে মলা চাষ করতে হয়। এই নারী আরও জানান, এখন আমরা খাওয়ার পাশাপাশি মাছ বাজারে বিক্রিও করতে পারছি। সপ্তাহে দুবার মাছ ধরা হয়। প্রথম বছর  শেষে মাছ বিক্রি করে ২১ হাজার টাকা আয় হয়েছে বলেও তিনি জানান ।

প্রসঙ্গত, মলা অত্যন্ত সুস্বাদু এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ মাছ। এই মাছে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন রয়েছে। মলা মাছ বিল হাওর-বাওড়, নদী, ধানক্ষেত, পুকুর ও ডোবায় পাওয়া যায়। প্রান্তিক মৎস্য চাষীরা পুকুর-ডোবা ও অন্যান্য জলাশয়ে সাধারণত রুই জাতীয় মাছ চাষ করে থাকেন। তারা মলা জাতীয়  ছোট মাছকে অবাঞ্চিত মাছ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। অথচ এখন পর্যন্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই প্রাণিজ আমিষের জন্য নির্ভর করে থাকেন মলাসহ অন্যান্য  ছোট মাছের উপর।

ভেড়ামারায় আউশ প্রণোদনা কর্মসূচী’র উদ্বোধন

আল-মাহাদী ॥ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় আউশ প্রণোদনা কর্মসূচী ২০১৯-২০ গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় উপজেলা কৃষি অফিস চত্বরে উদ্বোধন করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার লক্ষ্যে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে খরিপ-১ মৌসুমে প্রণোদনা কর্মসূচীর আওতায় আউশ ধান ফসলের কৃষি উপকরণ (বীজ ও সার) বিতরণের শুভ উদ্বোধন করেন, ভেড়ামারা উপজেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান হাজী আক্তারুজ্জামান মিঠু। ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সোহেল মারুফের সভাপতিত্বে এসময় উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ শায়খুল ইসলাম, খোলা কাগজের প্রতিনিধি মোঃ আবু ওবাইদা-আল-মাহাদীসহ প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। এসময় ৮৬০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ১ বিঘা জমি আবাদের জন্য ৫ কেজি ধান বীজ, ১৫ কেজি ডি.এ.পি সার এবং ১০ কেজি এম.ও.পি সার বিতরণ করা হয়।

মিরপুরে আউশ প্রণোদনার বীজ ও সার বিতরণের উদ্বোধন

আমলা অফিস ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুরে আউশ মৌসুমের ধান চাষের প্রণোদনায় ২ হাজার ১শ ৫০জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে বীজ ও রাসনায়িক সার বিতরণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল  সোমবার বেলা ১১টায় উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে কৃষি অফিস চত্ত্বরে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনকালে মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম জামাল আহমেদের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ, মিরপুর উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাশেম জোয়ার্দ্দার, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সাবিহা সুলতানা, জেলা পরিষদের সদস্য মহাম্মদ আলী জোয়ার্দ্দার, মিরপুর প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি কাঞ্চন কুমার প্রমুখ। এবছর আউশ মৌসুমে মিরপুর উপজেলার ১৩ টি ইউনিয়নে ও পৌরসভার ২ হাজার ১শ ৫০জন কৃষক আউশ প্রণোদনা পাবেন। এর মধ্যে প্রতিজন কৃষক বিনামূল্যে ৫ কেজি উফশী আউশ ধান বীজ, ১৫ কেজি ডিএপি সার, ১০ কেজি এমওপি সার পাবেন।

দেশি মাগুর চাষে বেশি লাভ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মাগুর বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় মাছের মধ্যে অন্যতম। সুস্বাদু ও উপাদেয় এ মাছ দেশের সব শ্রেণির মানুষের কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। কোনো পুকুরে ১ লাখ মাগুর চাষ করে সব খরচ বাদে বছরে কমপক্ষে ৫০ লক্ষাধিক টাকা আয় করা সম্ভব। মাছ ছাড়া আমাদের এক দিনও কি চলে! বাংলাদেশে মাগুর অত্যন্ত সুস্বাদুও পুষ্টিকর মাছ। বাজারে এ মাছের কদর অনেক বেশি। এ কারণেই এটি দামি ও বহুল আলোচিত এবং সমাদৃত। রোগীদের পথ্য হিসেবে মাগুরের ব্যাপক চাহিদা ও জিইয়ে রাখার মতো এ মাছ। বাড়িতে যে কোনো পাত্রে অনেক দিন পর্যন্ত জীবিত রাখা সম্ভব। বর্তমানে চাষের অভাবে এবং পানিতে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ও কেমিক্যাল নদীতে পড়ায় এ মাছের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। এখন কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশি মাগুর চাষ ব্যাপক আকারে হচ্ছে। আশা করব দিন দিন এ মাছের চাষ বাড়বে এবং দেশের শিক্ষিত বেকার ভাই ও বোনেরা মিনি পুকুরে এ মাছের চাষ করে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূর করবে। মাগুর মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। অধিক সংখ্যক মাছ একসঙ্গে চাষ করা যায়। স্বল্প গভীর পানিতে নিরাপদে চাষ করা সম্ভব। অন্যান্য মাছের তুলনায় এ মাছের চাহিদা ও বাজার মূল্য অনেক বেশি। অতিরিক্ত শ্বাসনালি থাকায় বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে এরা বেঁচে থাকতে পারে। যার জন্য এ মাছ জীবন্ত বাজারজাত করা সম্ভব। কৃত্রিম প্রজনন কৌশল উদ্ভাবনের ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে পোনা উৎপাদন করা সম্ভব।
দেশি মাগুরের বৈশিষ্ট্য ঃ অতিরিক্ত শ্বাসনালি থাকায় পানি ছাড়াও বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে। তাই মজা ও পচা পুকুর, ছোট ছোট ডোবা ইত্যাদি জলাশয়ের দূষিত পানিতেও মাগুর মাছের বেঁচে থাকতে কোনো সমস্যা হয় না। পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলে যে প্রতিকূল পরিবেশের সৃষ্টি হয়, সে অবস্থায়ও ছোট ছোট গর্ত করে এ মাছ দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। পানি থেকে উত্তোলনের পর দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার কারণে জীবন্ত মাগুর বাজারজাত করা সম্ভব।
পুকুর নির্মাণ ঃ পুকুরের আয়তন ১০ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশ এবং গভীরতা ৮০ থেকে ১২০ সেন্টিমিটার (৩ থেকে ৪ফুট) হওয়া বাঞ্ছনীয়। অধিক গভীরতা উৎপাদনের দিক থেকে অসুবিধাজনক। কেননা, মাগুর মাছকে শ্বাস নেয়ার জন্য সবসময় ওপরে আসতে হয়। এতে অতিরিক্ত শক্তি ক্ষয়ের কারণে মাছের বৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট বিঘœ ঘটে।
পুকুর তৈরি ঃ পাড়ের ঊর্ধ্বসীমা অবশ্যই সর্বোচ্চ বন্যার লেভেল থেকে ৩০ সেন্টিমিটার (১ফুট) ওপরে রাখা আবশ্যক। এতে বৃষ্টির সময় মাছ বুকে হেঁটে বাইরে যেতে পারবে না। তদুপরি বাইরে থেকে সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি মৎস্যভুক প্রাণীও পুকুর প্রবেশের কোনো সুযোগ পাবে না। এ ছাড়া পুকুরের চারদিকের পাড়ের ওপর ৩০ সেন্টিমিটার উঁচু নেটের বেড়া দেয়া বাঞ্ছনীয়।
চুন প্রয়োগ ঃ পুকুরের তলদেশ শুকিয়ে হালকাভাবে চাষ দিয়ে তলার মাটির অম্ল বা খরতা পরীক্ষা সাপেক্ষে প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করতে হবে। চুন প্রয়োগের পর পুকুর ১৫ সেন্টিমিটার (৬ ইঞ্চি) পরিমাণ পানি ঢুকিয়ে সপ্তাহখানেক ধরে রাখতে হবে।
জৈব সার প্রয়োগ ঃ চুন প্রয়োগের ৭ থেকে ১৫ দিন পর প্রতি শতাংশে ১০ কেজি হারে গোবর সার অথবা ৫ কেজি হারে মুরগির বিষ্ঠা ছিটিয়ে দিতে হবে।
অজৈব সার প্রয়োগ : জৈব সার প্রয়োগের সাতদিন পর পানির উচ্চতা ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বজায় থাকা অবস্থায় প্রতি শতাংশে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি সার ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পানির রং বাদামি সবুজ, লালচে বাদামি, হালকা সবুজ, লালচে সবুজ অথবা সবুজ থাকাকালে অজৈব সার (রাসায়নিক) প্রয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই।
পোনা মজুদ ঃ ৫ থেকে ৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের সুস্থ-সবল পোনা প্রতি বর্গমিটারে ৫০ থেকে ৮০টি হারে পুকুরে ছাড়া যেতে পারে। মে থেকে জুন মাস মাগুরের পোনা ছাড়ার যথার্থ সময়।
মাগুরের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ঃ প্রাকৃতিক পরিবেশে মাগুর মূলত জলাশয়ের তলদেশের খাদ্য খেয়ে জীবনধারণ করে। প্রাকৃতিক এই খাদ্যগুলো হচ্ছে- জলাশয়ের তলার আমিষজাতীয় পচনশীল দ্রব্যাদি, প্রাণী প্লাঙ্কটন ও কেঁচোজাতীয় ক্ষুদ্রাকার প্রাণী ইত্যাদি।
সম্পূরক খাদ্য সরবরাহ ঃ অধিক ঘনত্বে চাষের ক্ষেত্রে পুকুরে সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ অপরিহার্য। সহজলভ্য দেশীয় উপকরণ সমন্বয়ে মাগুর মাছের সম্পূরক খাদ্য প্রস্তুত করা যায়। এ ক্ষেত্রে চালের কুড়া ৪০ শতাংশ, তৈলবীজের খৈল ৩০ শতাংশ এবং শুঁটকি ৩০ শতাংশ একত্রে মিশিয়ে গোলাকার বল তৈরি করে মাছকে সরবরাহ করা যেতে পারে। তা ছাড়া শামুক ও ঝিনুকের মাংস মাগুরের অত্যন্ত প্রিয় খাবার। এগুলোও অবাধে খাওয়ানো যায়।
খাদ্যের প্রয়োগমাত্রা ঃ পুকুরে মজুদকৃত মাছের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে দৈনিক খাদ্যের এক-চতুর্থাংশ সকালে এবং বাকি তিন-চতুর্থাংশ সন্ধ্যায় প্রয়োগ করতে হবে। একাধিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উপরোক্ত প্রযুক্তি মোতাবেক পুকুরে চাষকৃত দেশি মাগুরের ওজন অনধিক ৪ থেকে ৫ মাসে ১৭৫ থেকে ২০০ গ্রামে উন্নীত করা সম্ভব।
বছরে লাভ অর্ধকোটি ঃ একজন সফল মৎস্য খামারির বাস্তব তথ্য অনুযায়ী কোনো পুকুরে ১ লাখ পোনা মাছ চাষ করলে নিম্নতম ৮৫ হাজার মাগুর টিকে থাকবে। ৬ মাসে পরে মাগুর মাছের ওজন (প্রতিটি মাছের ওজন গড়ে ১৭৫ গ্রাম হলে) ১৪৮৭৫ কেজি। বর্তমান বাজারদর প্রতি কেজি মাগুর পাইকারি বিক্রয় মূল্য ৪৫০ টাকা হিসাবে ১৪৮৭৫ কেজির দাম হবে ৬৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫০ টাকা। এদিকে ১ লাখ পোনা মাছের ৬ মাসের খাদ্য খরচ সর্বোচ্চ ১৫ টন খাবার প্রয়োজন হবে। খাবারের বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি টন খাবারের দাম ৫০ হাজার টাকা। এ হিসাবে ৮ টন খাবারের দাম পড়ে ৮ লাখ টাকা এবং শ্রমিক ও পরিবহন খরচ হবে দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। সব খরচ বাদে বছরে কমপক্ষে ৫০ লক্ষাধিক টাকা আয় করা সম্ভব।
মাগুর বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় মাছের মধ্যে অন্যতম। সুস্বাদু ও উপাদেয় এ মাছ দেশের সব শ্রেণির মানুষের কাছে অত্যন্ত লোভনীয়। রোগীর পথ্য হিসেবেও এ মাছের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এক সময় এই মাছটিকে সহজেই প্রাকৃতিক জলাশয়ে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন দেশি মাগুর আর তেমন পাওয়া যায় না। তাই মাছটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। তবে আশার কথা হলো দেশের মাছ চাষিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এই মাছটিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আর এই সুস্বাদু মাছটিকে লাভজনক একটি করতে হলে সঠিক চাষপদ্ধতি সম্পর্কে জানা ও সুষ্ঠুভাবে চাষ করার কোনো বিকল্প নেই।

ফলগাছ রোপণে করণীয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গ্রীষ্মের শেষে প্রথম বৃষ্টি হলেই আমরা গাছ রোপণের কথা চিন্তা করি। ভাবি, বাড়ির আশপাশের ফাঁকা জায়গাটা এবার গাছে গাছে ভরিয়ে দেবো। বাদ যাবে না ঘরের বারান্দা কিংবা ছাদও। অনেকের চিন্তাটা মাথার ভেতরেই ঘুরপাক খেতে থাকলেও অনেকে বাস্তবায়ন করতে মাঠেও নেমে পড়ি। প্রিয় গাছের চারা বা কলম খুঁজতে ছুটে যাই সরকারি বা বেসরকারি নার্সারিতে। কাংখিত গাছের চারা বা কলম পেয়েও যাই। তাৎক্ষণিকভাবে রোপণের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় লাগিয়েও ফেলি। লাগিয়েই ভাবি, যাক কিছু দিনের মধ্যেই জায়গাটা সবুজে সবুজে ভরে যাবে। কিন্তু না, ভাবনার সাথে বাস্তবতাটা ঠিক মেলে না। ক’দিন পরেই দেখা যায় চারা বা কলম সঠিকভাবে বাড়ছে না। শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। কী যে হলো চারাগুলোর। চারা বা কলমের এই সমস্যাটা কিন্তু কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখলেই দূর করা যায়। তাহলে চলুন কারণগুলো একে একে জেনে নেয়া যাক।
গ্রীষ্মের শেষে প্রথম বৃষ্টি হলেই গাছের চারা বা কলম রোপণ করা ঠিক নয়। একটু অপেক্ষা করতে হয় পরের দু’তিন বার বৃষ্টির জন্য। কারণ প্রথম বৃষ্টির পর মাটির ভেতরে সৃষ্টি হওয়া গ্যাস বের হওয়ার জন্য বা মাটিতে কিছুটা রস সঞ্চয়ের জন্য সময় দিতে হয়। তাই পর পর কয়েকবার বৃষ্টি হলে মাটির ভেতর ও বাইরের আবহাওয়া প্রায় সম পর্যায়ে চলে আসে। অর্থাৎ মাটির রস ও বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে যায়। এই অবস্থায় গাছের চারা বা কলম রোপণ করলে সেগুলো আর মরে না। প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় চারাগুলো তরতর করে বেড়ে উঠতে থাকে।
দেশের অনেক জায়গাতেই এখন মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে। তাপমাত্রা বেশি থাকলেও বাতাসের আর্দ্রতা আগের তুলনায় বেশ বেড়ে গেছে। ফল বা কাঠজাতীয় যেকোনো গাছের চারা বা কলম রোপণের সময় এখনই। এ জন্য বেশ কিছু করণীয় কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চারা বা কলম নির্বাচন, রোপণের জায়গা ঠিক করা, চারা বা কলমের জাত অনুসারে সঠিকভাবে গর্ত তৈরি, গর্তে সঠিক নিয়মে সার ব্যবহার, গর্তে সঠিক নিয়মে চারা বা কলম রোপণ এবং রোপণ করা গাছের সুরক্ষা প্রদান।
রোপণ করার জন্য যে চারা বা কলম নির্বাচন করা হবে তার বয়স কখনোই এক বা দু’ বছরের বেশি হওয়া চলবে না। আমাদের অনেকেরই ধারণা, বড় আকারের চারা বা কলম রোপণ করলে সেটা খুব তাড়াতাড়ি বড় হবে এবং ফল দিতে শুরু করবে। সত্যি বলতে কি ধারণাটি একদম ভুল। ছোট আকারের নিখুঁত ও তেজি চারা বা কলম সহজেই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং দ্রুত বেড়ে ওঠে। চারা বা কলম বাছাই করার সময় আরো যেসব বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। চারা বা কলমের নতুন পাতা থাকলে সেই চারা বা কলম রোপণের জন্য বাছাই করবেন না। চারা বা কলমে ফুল বা ফল থাকলে সেটাও রোপণের জন্য বাছাই করবেন না। রোপণের জন্য বাছাই করা চারা বা কলমটি সোজা হতে হবে, দুর্বল বা বাঁকা চারা বা কলম বাদ দিতে হবে। বেশি শাখা-প্রশাখাযুক্ত চারা বা কলম বাছাই করবেন না। বেশি শাখা-প্রশাখা থাকলে সেগুলো ছাঁটাই করে শুধু মূল কান্ডটি রেখে রোপণ করতে হবে। রোপণের আগে নিচের দিকের কিছু পাতার অর্ধেক ছাঁটাই করে দিতে হবে। এতে চারা বা কলম থেকে পানি বের হয়ে গাছ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। কলমের গাছের বেলায় জোড় ঠিকমতো আছে কি না, তা পরখ করে নিতে হবে। বিশেষ করে আদিজোড়ে কোনো ফাটা দাগ আছে কি না, তা দেখে নিতে হবে। যদি থাকে তাহলে সেই কলম বাদ দিতে হবে। কলমের জায়গার পলিথিন খোলা হয়েছে কি না রোপণের আগে সেটাও দেখে নিতে হবে। চারা বা কলমের পাতা কোনো ধরনের পোকামাকড়ে আক্রান্ত থাকলে তা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে ছত্রাকনাশক দিয়ে চারা বা কলম ভালোভাবে ¯েপ্র করার পর রোপণ করতে হবে। রোগাক্রান্ত কোনো চারা বা কলম রোপণের জন্য বাছাই করা ঠিক হবে না। বিশ্বস্ত উৎস বা প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক তথ্য নিয়ে উন্নত জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। চারা বা কলমের শিকড় পলিব্যাগ বা মাটির পট ভেদ করে বের হয়েছে কি না সেটা দেখে নিতে হবে। যদি শিকড় বের হয় তাহলে সেটা ছাঁটাই করে দিতে হবে। পলিব্যাগ বা মাটির পটের মাটি ঠিক আছে কিনা সেটাও দেখে নিতে হবে। যদি চারা বা কলমের গোড়ার মাটি আলগা হয়ে সরে যায় কিংবা পট বা পলিথিন থেকে চারা বা কলম বের করার পর মাটির বল ভেঙে যায় তাহলে সেই চারা বা কলম বাদ দেয়া ভালো। চারা বা কলম কোথায় রোপণ করা হবে সেই জায়গাটি আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। রোদ পড়ে এবং ভবিষ্যতে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোনো রকম বাধার সৃষ্টি না হয় এমন জায়গাই নির্বাচন করতে হবে। চারা বা কলম রোপণের আগেই বড় গাছের জন্য (আম, কাঁঠাল, লিচু, নারিকেল, বাতাবি লেবু, সফেদা) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও গভীরতায় ১ বর্গ মিটার গর্ত খনন করে কমপক্ষে ৭-১০ দিন খোলা অবস্থায় ফেলে রাখতে হবে। এ সময় গর্ত থেকে তোলা মাটি ঝুরঝুরে করে তার সাথে জৈব সার মিশিয়ে রাখতে হবে। মাঝারি গাছের জন্য (পেয়ারা, লেবু, জলপাই, কামরাঙ্গা, আমড়া) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও গভীরতায় ৬০ বর্গ সেন্টিমিটার গর্ত খনন করতে হবে। ছোট গাছের জন্য (কলা, পেঁপে, ডালিম) দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ও গভীরতায় ৪৫ বর্গ সেন্টিমিটার গর্ত খনন করতে হবে। রোপণের ঠিক ৩-৪ দিন আগে জৈব সার মিশ্রিত মাটির সাথে রাসায়নিক সার মিশাতে হবে এবং মাটি দিয়ে গর্ত এমনভাবে ভরাট করতে হবে যেন জমির সমতল থেকে ভরাটকৃত মাটির উচ্চতা ১৫-২০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়। ভরাট করা মাটি চার দিকে ঢালু করে দিতে হবে যেন পানি সহজেই গড়িয়ে যেতে পারে। এ সময় প্রয়োজনমতো পানি গর্তের মাটিতে দিতে হবে, যাতে মাটিতে রসের অভাব না হয়। এরপর গর্তের ঠিক মাঝখানে নিড়ানি বা হাত দিয়ে পট বা পলিব্যাগের সমান করে বা একটু বড় করে গর্ত করতে হবে। গর্তের মাঝে চারা বা কলম স্থাপন করতে হবে এমনভাবে যেন চারা বা কলমের গোড়া আগের অবস্থাতেই থাকে। অর্থাৎ আগে যেটুকু মাটির বলের নিচে ছিল কিংবা যেটুকু মাটির বলের বাইরে ছিল ঠিক সেভাবেই যেন থাকে। এতে চারা বা কলমের গোড়ার বাকল ঠিক থাকে এবং গোড়াপচা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। রোপণ করার পরপরই গাছে এবং গাছের গোড়ার চার দিকে কিছুটা পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। রোপণ করা চারা বা কলমের সুরক্ষার জন্য ঘেরার ব্যবস্থা করতে হবে।

কৃষির উপকারী কোলা ব্যাঙ বিপন্ন

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসলের জমিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিপন্ন হয়ে পড়ছে মাটির উর্বরতা। শুধু তা-ই নয়, এর ফলে চরম হুমকির মুখে পড়ছে কৃষিবান্ধব প্রাণীকূল। বাংলার পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা এ সব প্রাণীর তালিকায় স্থান পাওয়া অন্যতম কৃষি উপকারী প্রাণী কোলা ব্যাঙ।
ব্যাপক কীটনাশক ব্যবহার এবং বন-জঙ্গল উজার করায় জীববৈচিত্র রক্ষাকারী ব্যাঙের দিন ফুরিয়ে আসছে। প্রতিনিয়তই নষ্ট হচ্ছে এদের বাসস্থান ও প্রজনন-আশ্রয়গুলো। ফলে দিন দিন বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে কোলা ব্যাঙসহ নানান প্রজাতির কৃষি উপকারী ব্যাঙ। অনেক জীবজন্তু এবং পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত কোলা ব্যাঙ। যা খাদ্য-শৃঙ্খলের সহায়ক হয়ে জীবজগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
কোলা ব্যাঙ নিশাচর প্রাণী। সাধারণত এরা একা থাকতে পছন্দ করে। বাংলাদেশের সর্বত্র কোলা ব্যাঙ দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও ভারত, নেপাল, মায়ানমার, পাকিস্তানের সিন্ধু উপত্যকায় ও আফগানিস্তান পর্যন্ত রয়েছে এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ বা আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।
বন্যপ্রাণি সংরক্ষক কামরুজ্জামান বাবু বলেন, বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর কীটতত্ত্ব বিভাগের গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন তথ্যে দেখা যায় ধানের প্রধান প্রধান ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণে বোরো মৌসুমে ১৩ শতাংশ, আউশ মৌসুমে ২৪ শতাংশ এবং আমন মৌসুমে ১৮ শতাংশ ভাগ ফলন কম হয়।
তিনি আরও বলেন, সেই গবেষণাতে আরও দেখা গেছে জমিতে সোনা ব্যাঙ ক্ষতিকর পোকামাকড় শতকরা ১৬-৪১ ভাগ কমিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এইভাবে যদি সব ফসলের তথ্য পাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে, কোলা ব্যাঙ কৃষি ফসলের উৎপাদনে কতটা অবধান রাখছে। এছাড়াও মশা ও মাছি ভক্ষণ করে মশা ও মাছি বাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন- গধষধৎরধ, উবহমঁব, ঞুঢ়যড়রফ, অহঃযৎধী প্রভৃতির মতো অনেক রোগ প্রতিরোধ করে কোলা ব্যাঙ।
কোলা ব্যাঙের পরিচিতি ও খাদ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, কোলা ব্যাঙ অনেক স্থানে সোনা ব্যাঙ বা ভাউয়া ব্যাঙ নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম অংরধহ ইঁষষ ঋৎড়ম এবং বৈজ্ঞানিক নাম ঐড়ঢ়ষড়নধঃৎধপযঁধ ঃরমবৎরহঁং। এটি উরপৎড়মষড়ংংরফধব পরিবারের ও ঐড়ঢ়ষড়নধঃৎধপযঁং গণের অন্তর্ভুক্ত উভচর প্রাণী। বিভিন্ন আকারের ফড়িং, পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ এদের খাদ্য। এরা দীর্ঘ সময় ধরে জলে থাকতে পারে না। ডাঙায় খাদ্যের সন্ধানে সময় কাটায়।
এর শারীরিক গঠন সম্পর্কে তিনি বলেন, কোলা ব্যাঙ আমাদের দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাঙ ও মেরুদন্ডী প্রাণী। আকারে ৬৫-১৩৪ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের গায়ের রঙ মূলত সবুজাভ, হালকা বাদামি বা হলুদাভ রঙের। স্ত্রী ও পুরুষ সোনা ব্যাঙ উভয়ের হলদে সোনালি রঙের একটি পৃষ্ঠীয় দাগ মুখ থেকে পায়ু পর্যন্ত বিস্তৃত। তাদের মুখ সুচালো। স্ত্রী ব্যাঙরা সব ঋতুতে হালকা ধূসর রঙের হয়ে থাকে। পুরুষ ব্যাঙের চোয়ালের দু’ধারে কালো বর্ণের স্বরথলি আছে, যা স্ত্রী ব্যাঙের নেই। পুরুষ ব্যাঙের হাত-পায়ের আঙুল ও কব্জি মোটা হয় অপরদিকে স্ত্রী ব্যাঙের সরু হয়।
কোলা ব্যাঙের প্রজনন সম্পর্কে কামরুজ্জামান বাবু বলেন, বর্ষা শুরু হলে পুরুষ ব্যাঙ স্ত্রী ব্যাঙটিকে আকর্ষণ করতে গলা ফুলিয়ে ডাকতে থাকে। এই সময় পুরুষ ব্যাঙ অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। পুরুষ ব্যাঙের দেহের রঙ উজ্জ্বল হয় আর স্বরথলি উজ্জ্বল নীলাভ রঙ ধারণ করে। পুরুষ ব্যাঙটি স্ত্রী ব্যাঙটিকে আঁকড়ে ধরে দু’তিন ঘণ্টা পানিতে ভাসতে থাকে। এরপর স্ত্রী ব্যাঙ ডিম্বাণু ছাড়ে আর পুরুষ ব্যাঙ শুক্রাণু ছাড়ে।
তিনি আরও বলেন, এদের বহির্নিষেকক্রিয়ার মাধ্যমে প্রজনন ঘটিয়ে ডিম পারে। অর্থাৎ এদের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু বাহিরে মিলিত হয়। ডিমগুলো ফিতার মতো পানিতে ভাসতে থাকে। ২৪ ঘণ্টা পর ডিম থেকে ফুটে বেঙাচি বের হয়। প্রায় ৩৫-৪০ দিনের ভিতরে বেঙাচি পূর্ণাঙ্গ ব্যাঙে রূপান্তরিত হয়। একটি স্ত্রী ব্যাঙ প্রাকৃতিক অবস্থায় এক সাথে প্রায় তিন থেকে দশ হাজার ডিম্বাণু ছাড়ে।

ঔষধিগুণ গুণ সমৃদ্ধ সবজি করলা চাষ লাভজনক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ উচ্ছে ও করলা তিতা বলে অনেকেই খেতে পছন্দ করেন না। তবে এর ঔষধিগুণ অনেক বেশি। ডায়াবেটিস, চর্মরোগ ও কৃমি সারাতে এগুলো ওস্তাদসবজি। ভিটামিন ও আয়রন-সমৃদ্ধ এই সবজির অন্যান্য পুষ্টিমূল্যও কম নয়। উচ্ছে ও করলা এ দেশের প্রায় সব জেলাতেই চাষ হয়। আগে শুধু গরমকালে উচ্ছে-করলা উৎপাদিত হলেও এখন জাতের গুণে প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায়। যেগুলো অপেক্ষাকৃত ছোট, গোলাকার, বেশি তিতা, সেগুলোকে বলা হয় উচ্ছে। বড়, লম্বা ও কিছুটা কম তিতা স্বাদের ফলকে বলা হয় করলা। উচ্ছেগাছ ছোট ও কম লতানো হয়। করলাগাছ বেশি লতানো ও লম্বা লতাবিশিষ্ট, পাতাও বড়। উচ্ছে ও করলা তিতা বলে অনেকেই খেতে পছন্দ করেন না। তবে এর ঔষধিমূল্য অনেক বেশি। ডায়াবেটিস, চর্মরোগ ও কৃমি সারাতে এগুলো এক ওস্তাদসবজি। ভিটামিন ও আয়রন-সমৃদ্ধ এই সবজির অন্যান্য পুষ্টিমূল্যও কম নয়।
মাটি ঃ প্রায় সব রকমের মাটিতে ও পানি জমে না এমন জায়গায় উচ্ছে-করলার চাষ করা যায়। তবে জৈব পদার্থসমৃদ্ধ দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে ভালো হয়। ছায়া জায়গায় ভালো হয় না।
জাত ঃ উচ্ছে ও করলা পরপরাগায়িত সবজি হওয়ায় এর জাত বৈচিত্রের শেষ নেই। এক জাত লাগালেও পরের বছর সে জাত থেকে রাখা বীজ লাগিয়ে হুবহু একই বৈশিষ্ট্যের ফল পাওয়া যায় না। তাই প্রতি মৌসুমেই বিশ্বস্ত উৎস থেকে ভালো জাতের ভালো বীজ সংগ্রহ করে এর চাষ করা উচিত। উচ্ছের প্রায় সব জাতই দেশী বা স্থানীয় । চাষিরাই এগুলোর বীজ রাখেন ও লাগান। এ দেশে করলার যেসব জাত রয়েছে সেগুলো হলো-
উচ্চফলনশীল জাত বারি করলা ১। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতের একটি গাছে ২৫ থেকে ৩০টি করলা ধরে। হেক্টরপ্রতি ফলন ২৫ থেকে ৩০ টন (প্রতি শতকে ১০০ থেকে ১২০ কেজি)।
বিএডিসির ‘গজ করলা’ নামে আর একটি জাত আছে। এ জাতও ভালো, গাছপ্রতি ১৫ থেকে ২০টি করলা ধরে। ফলন ২০ থেকে ২৫ টন (প্রতি শতকে ৮০ থেকে ১০০ কেজি)। হাইব্রিড জাত বুলবুলি, টিয়া, প্যারট, কাকলি, প্রাইম-এক্সএল, টাইড, গ্রিন স্টার, গৌরব, প্রাইড ১, প্রাইড ২, গ্রিন রকেট, হীরা ৩০৪, মিনি, গুডবয়, ওয়াইজম্যান, জাম্বো, গজনি, ইউরেকা, হীরক, মানিক, মণি, জয়, কোড-বিএসবিডি ২০০২, কোড-বিএসবিডি ২০০৫, পেন্টাগ্রিন, ভিভাক, পিয়া, এনএসসি ৫, এনএসসি ৬, রাজা, প্রাচী ইত্যাদি।
জমি ও মাদা তৈরি ঃ জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে প্রতি শতাংশে জমি তৈরির সময় ৪০ কেজি পচা গোবর সার মিশিয়ে দিতে হবে। মই দিয়ে সমান করার পর ১ মিটার চওড়া বেড করে তার মাঝে ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া করে নালা কাটতে হবে। জমি যতটুকু লম্বা ততটুকুই লম্বা বেড হতে পারে। খুব বেশি লম্বা হলে মাঝখানে খন্ড করা যেতে পারে। উচ্ছের ক্ষেত্রে ১ মিটার ও করলা ক্ষেত্রে ১.৫ মিটার দূরে দূরে মাদা তৈরি করতে হবে। সব দিকে ৪০ সেন্টিমিটার করে মাদা তৈরি করতে হবে। বীজ বোনার ৭ থেকে ১০ দিন আগে মাদায় পচা গোবর ও সার মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
বীজ বোনা ঃ বছরের যেকোনো সময় এখন করলা লাগানো যায়। তবে খরিপ বা গ্রীষ্ম-বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে ভালো হয়। এ মৌসুমে চাষ করতে হলে ফেব্র“য়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বীজ বুনতে হবে। আগাম ফলন পেতে চাইলে ফেব্র“য়ারির মাঝামাঝি সময়ে বীজ বোনা ভালো। তবে উচ্ছে বসন্ত-গ্রীষ্মেই ভালো হয়। উচ্ছে চাষ করতে চাইলে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে বীজ বুনতে হবে। করলার বীজ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত বোনা যেতে পারে। প্রতি মাদায় দু’টি করে বীজ বুনতে হবে। বীজের খোসা শক্ত বলে বোনার আগের দিন রাতে পানিতে বীজ ভিজিয়ে রাখতে হবে, তাহলে ভালো গজাবে। তবে মাদায় সরাসরি বীজ না বুনে কলার ঠোঙা বা পলিব্যাগেও চারা তৈরি করে সেসব চারা মাদায় রোপণ করা যেতে পারে। সাধারণত ১০০ গ্রাম বীজে ৬০০ থেকে ৭০০টি চারা হয়। প্রতি শতকে ১২-১৫ গ্রাম উচ্ছে ও ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম করলার বীজ লাগে।
সারের পরিমাণ ঃ করলা চাষে জৈবসার খুব দরকার। মোট জৈবসারের অর্ধেক জমি চাষের সময় ও বাকি অর্ধেক বীজ বোনা বা চারা লাগানোর ১০ দিন আগে মাদায় দিতে হবে। অন্যান্য সার নিচের ছক অনুযায়ী দিতে হবে।
বাউনি দেয়া ঃ চারা ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে গেলে চারার সাথে কাঠি পুঁতে বাউনি দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মাটি থেকে এক থেকে দেড় মিটার উঁচু করে মাচা তৈরি করতে হবে। যেহেতু বেড ১ মিটার চওড়া, সে জন্য মাচাও অনুরূপ চওড়া রাখলে ভালো হয়। এতে করলা তোলা ও পরিচর্যার কাজ সহজ হয়। বাঁশের শক্ত খুঁটি পুঁতে তার মাথায় জিআই তার, রশি ইত্যাদি বেঁধে খাঁচা তৈরি করে তার উপর দিয়ে পাটকাঠি বা বাঁশের সরু কাঠি ফাঁকা করে বিছিয়ে মাচা তৈরি করা যেতে পারে। মাটিতে লতিয়ে দেয়ার চেয়ে মাচায় লতিয়ে দিলে করলার ফলন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি হয়।
সেচ ও আগাছা পরিষ্কার ঃ মাদায় জো রেখে বীজ বুনতে হবে। চারা গজানোর পর মাদা শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। সেচ দেয়ার পর মাটি চটা বেঁধে গেলে তা নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে ভেঙে দিতে হবে। পানির অভাবে গাছের বাড়বাড়তি কমে যায়, ফুল ও কচি ফল ঝরে যায়, ফল ছোট হয়। সে জন্য খরা হলে বা জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। প্রতিবার সার প্রয়োগের পর সেচ দিতে হবে। গাছের গোড়া থেকে ছোট ছোট কিছু ডগা বের হয়। সেগুলো ছেঁটে দিলে ফলন ভালো হয়। জমিতে যেন পানি জমতে না পারে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
করলা তোলা ঃ চারা গজানোর ৪০ থেকে ৫০ দিন পর থেকেই উচ্ছেগাছ ফল দেয়া শুরু করে। করলাগাছ ফল দেয়া শুরু করে ৬০ দিন পর। ফল আসা শুরু হলে গাছ থেকে প্রায় দু’মাস ফল তোলা যায়।

পুষ্টিকর প্রিন্সেস মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ প্রিন্সেস মাশরুম নামটা আনকোরা নতুন। মাশরুমটি দেখতে হালকা বাদামি, প্রথমে বাদামি বোতামের মতো মনে হলেও পরিণত অবস্থায় এটি অর্ধ বৃত্তাকার এবং ছত্রাকার আকৃতি ধারণ করে। ছত্রাকার অংশটিকে পাইলিয়াস বলে যা বাদামি বর্ণের আইশ দ্বারা আবৃত থাকে। সুস্বাদু ও ঔষধি গুণসম্পন্ন মাশরুমটি সারাবিশ্বে সমাদৃত মূল্যবান মাশরুম। ঔষধি গুণসম্পন্ন মাশরুমটির উৎপাদন একটু কষ্টকর হওয়ায় বিশ্ববাজারে এটি অত্যন্ত উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। মাশরুমটি চাষের জন্য একটি নির্দিষ্ট আবহাওয়া দরকার হয় এবং অক্টোবর থেকে এপ্রিল এটি জন্মানো সম্ভব। রাতে নিম্ন তাপমাত্রা এবং দিনে অপেক্ষাকৃত বেশি তাপমাত্রা এই মাশরুম উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটি উৎপাদনের জন্য মানসম্মত কম্পোস্ট উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে। মাশরুমটি চাষের জন্য ধান বা গমের খড়ে এক হাজার  কেজি কম্পোস্ট তৈরি করতে হয়।

বাণিজ্যিকভাবে মাশরুমটি উৎপাদনে বিশাল স্থাপনা, মূল্যবান যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনশক্তি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয়। অল্প পরিসরে মাশরুম চাষিরা ৩০০ কেজি কম্পোস্ট তৈরি করে মাশরুমটি উৎপাদন করে। অল্প পরিসরে এই আয়োজনটি ও কম ব্যয় বহুল বা শ্রমনির্ভর কাজ নয়। এ ছাড়া বসতবাড়ির আশপাশে এই কম্পোস্ট তৈরি করা যায় না, কেননা এতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের তীব্র গন্ধের জন্য আপনাকে প্রতিবেশী দ্বারা অভিযুক্ত হতে হবে। তাই আমাদের দেশের সাধারণ চাষিদের জন্য সহজ উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের নিমিত্তে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন মাশরুম গবেষক এবং উদ্যোক্তা ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। প্রিন্সেস মাশরুম উৎপাদনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কিছু কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে  কোনো প্রকার কম্পোস্ট তৈরি না করে এই বাটন মাশরুম উৎপাদনের কাজটি চলছিল।

তিন বছর ধরে গবেষণা করে তিনি এই মাশরুমের আশাব্যঞ্জক ফলন লাভ করেন। অপরিণত অবস্থায়ই এটির চাহিদা বেশি। পরিণত অবস্থায় এটি ছত্রাকার। তবে এই অবস্থায়ও এটিকে ব্যাঙের ছাতা বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যাবে না। কেননা পরিণত অবস্থায়ও এটি পৃথিবীব্যাপী বাজারজাত হয়। প্রিন্সেস মাশরুম মোটামুটি ক্যালরিমুক্ত এবং দেহ গঠনের জন্য উপযোগী উন্নতমানের প্রোটিন, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-ডি, পামিটরেনিক এসিড, লিনোলিক এসিড এবং আরগোস্টেরল সমন্বয়ের এক বিশুদ্ধ অর্গানিক পণ্য। এতে প্রচুর মিনারেল, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সেলেনিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে।

মাশরুমটির বিটা-ডি গ্লুকান টিউমার এবং ক্যান্সার প্রতিরোধে কাজ করে।  কেমোথেরাপি গ্রহণের সময় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাসে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া মাশরুমটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা কমানো, হেপাটাইটিস রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এজন্য প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধী উপকরণ হিসেবে খাদ্য তালিকায় সারাবিশ্বে এটি মূল্যবান মাশরুম হিসেবে বিবেচ্য। ব্রাজিল, জাপান, চীন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ায় এটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়।

মাশরুম গবেষক এবং উৎপাদক ড. তাকাতোসি ফোরোমুটো ১৯৬০ সালে সাও পাওলো নামক ব্রাজিলের একটি রাজ্যে এটির সর্বপ্রথম কৃত্তিম উৎপাদনে সফল হন। তিনি ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ১৯৬৫ সালে মাশরুমটিকে জাপানে পাঠান। জাপান পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মাশরুমটির নাম দেন হাইমেতাতসুতাকে, যার অর্থ প্রিন্সেস মাশরুম। গবেষক আনোয়ার জানান, মাশরুমটিকে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন নামে  চেনে। ব্রাজিলিয়ান মাশরুম বলে এর ব্যাপক পরিচিতি আছে। এ ছাড়া আঞ্চলিকভাবে ব্রাজিলে এটিকে বলা হয় কগমেলু ডে ডেউস -যার অর্থ স্রস্টার মাশরুম। পৃথিবীর অনেক  দেশে এটি রয়েল সান এগারিক্স বলে পরিচিত। কেউবা শুধু ঔষধি মাশরুম নামে চেনে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মাশরুমটি কাঁচা-শুকনা, পাউডার এবং ক্যাপসুল আকারে সমান জনপ্রিয়। মাশরুমটি আমাদের দেশে লম্বা সময় ধরে চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। মাশরুমটি উৎপাদনে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।

 

বাণিজ্যিকভাবে পুকুরে হাঁস আর মাছ চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বর্তমানে পুকুর হচ্ছে মাছের অন্যতম উৎস। বাণিজ্যিকভাবে যারা আমাদের দেশে অনেকে মাছ চাষের সাথে সম্পৃক্ত। আবার অনেকের প্রধান পেশা মাছ চাষ। বর্তমানে মাছ লাভজনক একটি প্রযুক্তি। মৎস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খুব সহজে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। ঢাকার আশপাশের এলাকা- ধামরাই, সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ  দেশের অনেক স্থানে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে অনেক সুবিধা রয়েছে যেমন- এর জন্য পুকুরে তেমন বাড়তি সার ও খাদ্য দিতে হয় না। মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সাথে মাছ, হাঁসও ডিম  থেকে সমানে আয় করা যায়।

যেভাবে শুরু করতে পারেন ঃ- এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আপনাকে ৪০-৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর লাগবে। ১০০- ১৫০টি হাঁস, ১৫০০-১৮০০টি মাছের পোনা, হাঁসের ঘর। এসব পরিকল্পিতভাবে করলে ভালো হয়। পাহারাদারের ঘরটি হাঁসের ঘরের দক্ষিণ পাশে হলে ভালো হয়।

পুকুর তৈরি করুন নিখুঁতভাবে ঃ- সঠিকভাবে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে পুকুরের চারপাশের পাড় ভালোভাবে মাটি দিয়ে উঁচু করে বাঁধতে হবে। পুকুরের তলদেশ সংস্কার করতে হবে। পুকুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। চুন প্রয়োগের পর পানি সরবরাহ করতে হবে। মনে রাখবেন চুন প্রয়োগের ২-৩ সপ্তাহ পর মাছ ছাড়তে হবে। পুকুরে কোনো আগাছা রাখা যাবে না, এমনকি পানা থাকলেও তা পরিষ্কার করে দিতে হবে। পুকুরে পানি কমানো বা বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কোন জাতের মাছ নির্বাচন করবেন ঃ হাঁস চাষ করায় পুকুরে মাছের বিভিন্ন প্রকার খাবারের সৃষ্টি হয়। এজন্য ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ করা উচিৎ। তাছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভিন্ন ভিন্ন স্তরের খাবার খায়। মাছের প্রজাতির মধ্যে সিলভার কার্প ও কাতলা-পানির উপরের স্তরে খাদ্য খায় গ্রাস কার্প-পুকুরের জলজ আগাছা ও ঘাস খায়, কমন কার্প- পুকুরে তলদেশের খাদ্য খায় বলে জানালেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও মৃগেল, কালিবাউশ, মিরর কার্প, সরপুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করতে পারেন।

মাছের সম্ভব্য সংখ্যা ঃ- প্রতি শতকের জন্য সিলভার কার্প- ১০-১৫টি, কাতলা/ব্রিগেড- ৬টি, মৃগেল ৬টি, কালিবাউশ ৩টি, গ্রাস কার্প ৩টি, সরপুঁটি ৭-১০টি।

হাঁসের ঘর  তৈরি ঃ- পুকুর পাড়ে কিংবা পুকুরের ওপর ঘরটি তৈরি করতে হবে। ঘরের উচ্চতা ৫-৬ ফুট হলে ভালো হয়। ঘর তৈরিতে বাঁশ, বেত, টিন, ছন, খড় ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরটি খোলামেলা হতে হবে এবং সাপ ও ইঁদুর থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

উন্নত হাঁসের জাত ঃ- হাঁসের জাত নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে জাতের হাঁস বেশি ডিম দেয় সে জাতের হাঁস নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান রানার ও খাকি ক্যাম্পেবেল নির্বাচন করা যেতে পারে। এ জাতের হাঁস ৫ মাস বয়স থেকে ২ বছর পর্যন্ত ডিম দেয়। বছরে ২৫০- ৩০০টি ডিম দিয়ে থাকে।

হাঁসের খাদ্য ঃ- শুকনা খাদ্য না দিয়ে হাঁসকে সবসময় ভেজা খাদ্য দেয়া উচিত। খাদ্যে আমিষের পরিমাণ ডিম দেয়া হাঁসের ক্ষেত্রে ১৭-১৮ শতাংশ ও বাচ্চা হাঁসের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ রাখা উচিত।

সম্ভাব্য আয়-ব্যয় ঃ- ৪০-৫০ শতাংশের একটি পুকুরে ১০০টি হাঁসের জন্য এ প্রকল্প শুরু করলে সব মিলে খরচ দাঁড়াবে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। সঠিক পরিচর্যা আর যতœ নিতে পারলে প্রথম বছরে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে ৬০-৯০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হতে পারে। রোগমুক্ত, উন্নত জাতের হাঁস আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী চাষ করুন। যে  কোনো পরামর্শের জন্য আপনার উপজেলা বা জেলা মৎস্য ও পশুসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

আগাম সবজি উতপাদনে টানেল টেকনোলজি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাঙালির খাদ্য তালিকায় তিনবেলা যে খাবারটি থাকে তার নাম ভাত। আমরা প্রতিদিন যে সব খাবার খাই সেটা যদি ঠিকঠাক হজম না হয় তাহলে তা শরীরের কোনো কাজেই আসে না। আপনি যে খাবারই খান সেটাকে পরিপাকের মাধ্যমে শরীরের গ্রহণ উপযোগী করে তোলার জন্য সবজির কোনো জুড়ি নেই। সবজি যে কেবল খাবার পরিপাক করতেই সাহায্য করে তা কিন্তু নয়। আমাদের শরীরের জন্য দরকারি অনেক পুষ্টি উপাদানও জোগান দিয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ তার অন্যতম। একজন সুস্থ সবল মানুষের জন্য প্রতিদিন ২২০ গ্রাম সবজি গ্রহণ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে দেশের মানুষ প্রতিদিন গ্রহণ করছেন ৫০ গ্রাম সবজি। এ হিসেবে দৈনিক চাহিদার মাত্র চতুর্থাংশ সবজি খাচ্ছেন মানুষ। কৃষি ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ ও ভিটামিনের পর্যাপ্ত প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সবজি গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্য জগতে বিভিন্ন ধরনের সবজিই একমাত্র খাদ্য শরীর গঠনে যার ইতিবাচক ছাড়া নেতিবাচক কোনো প্রভাব নেই। তাই খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে খাদ্য তালিকায় বৈচিত্রময় পাতা ও ফলমূল জাতীয় সবজিকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন।
নানান ধরনের সবজি উৎপাদনের জন্য আমাদের মাটি খুবই উপযোগী। শীত ও গ্রীষ্মকালীন সময়ে চাষ করা যায় এমন সবজির তালিকাটাও বেশ বড়। কিন্তু নানান কারণে আমাদের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। যে সব জমি আবাদযোগ্য আছে সেসব জমিতে প্রধান ফসল ধান, পাট কিংবা গমের চাষই প্রাধান্য পায়। সবজি চাষের জন্য বরাদ্দ থাকে রান্না বা গোয়াল ঘরের পেছনের এক চিলতে জমি। অথচ পুষ্টি চাহিদার কথা মাথায় রাখলে সবজি চাষের কথা ভাবতেই হবে। এ জন্য ধান-পাট চাষের মতো অনেক বেশি জমি ব্যবহার করতে হবে তা নয়। সত্যি বলতে কি, কম জমি কাজে লাগিয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণের একমাত্র উপায় সারা বছর সবজির নিবিড় চাষ। আমাদের দেশে বেশির ভাগ সবজি উৎপাদন হয় রবি মৌসুমে অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ মাসে। খরিপ মৌসুম অর্থাৎ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় সবজি চাষ খুব কম হয়। ফলে বাজারে এ সময় সবজির দাম থাকে আকাশ ছোঁয়া। বিশেষ করে মে থেকে জুলাই মাসে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও খরার কারণে সবজির উৎপাদন কম হওয়ার জন্য বাজার মূল্য বেশি থাকে।
একটু কৌশল অবলম্বন করলেই কম জমিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে সারা বছর সবজি চাষ করা যায়। মৌসুমে বাজারে সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় চাষি ভাইয়েরা ন্যায্য মূল্য পান না। তাই মৌসুম শুরুর আগেই যদি আগাম সবজি উৎপাদন করে বাজারজাত করা যায়, তাহলে দ্বিগুণেরও বেশি দাম পাওয়া যায়। যে কৌশল অবলম্বন করে সারা বছর সবজি চাষ করা বা আগাম শীতকালীন সবজি উৎপাদন করা যায় তার নাম ‘টানেল টেকনোলজি’। সোজা কথায় নৌকার ছইয়ের মতো ছাউনি দিয়ে সবজি চাষ।
প্রকৃত মৌসুম ছেড়ে অন্য মৌসুমে সবজি চাষ করার জন্য এই কৌশলের কোনো জুড়ি নেই। তবে এই কৌশলের মাধ্যমে শীতকালীন সবজিকে গ্রীষ্মকালে চাষ করা কঠিন। কারণ শীতকালীন সবজি চাষের জন্য যে ধরনের তাপমাত্রা প্রয়োজন সেই ধরনের তাপমাত্রা কৃত্রিম পরিবেশে তৈরি করা বেশ ব্যয়বহুল। তবে এই কৌশলের মাধ্যমে কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে গ্রীষ্মকালীন সবজিকে শীতকালে চাষ করা খুবই সহজ। কারণ প্লাস্টিক ছাউনি ব্যবহারের মাধ্যমে শীতকালে খুব সহজেই সৌরশক্তি সঞ্চয় করে তাপমাত্রা বাড়িয়ে নেয়া যায়, যা শীতকালে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষের জন্য যথেষ্ট। টানেল টেকনোলজি বা ছাউনি পদ্ধতি ব্যবহার করে যে সব সবজি খুব সহজেই চাষ করা যায় সেগুলো হলো- শসাজাতীয় সবজি, টমেটো, পালংশাক, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শীম ইত্যাদি। এই কৌশলে একজন চাষি আগাম সবজি চাষ করে প্রকৃত মৌসুমের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। এই পদ্ধতিতে আমাদের দেশের অনেক অঞ্চলের চাষি ভাইয়েরা সবজি চাষ করে আসছেন যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। টানেলের ধরন ও আকার দুই রকমের হতে পারে। নিচু টানেল ও উঁচু টানেল। নিচু টানেল হয় অস্থায়ী এবং এ ধরনের টানেল তৈরিতে খরচ কম। কিন্তু যে সব এলাকায় খুব জোরে বাতাস প্রবাহিত হয় সেসব এলাকায় এ ধরনের টানেল উপযোগী নয়। তবে আমাদের দেশে প্রধানত যেসব এলাকায় সবজি চাষ হয় সেসব এলাকায় এ ধরনের বাতাস খুব একটা প্রবাহিত হয় না। এ ধরনের টানেল তৈরিতে বাঁশ এবং পলিথিন ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের টানেলের মাধ্যমে প্রকৃত মৌসুমের চেয়ে প্রায় এক মাস আগে সবজি উৎপাদন করা যায়। উঁচু টানেল হলো স্থায়ী টানেল। এ ধরনের টানেল তৈরিতে খরচ বেশি। উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয় স্টিল ফ্রেম ও বাঁশ। এ ধরনের টানেল যে কোনো এলাকাতেই তৈরি করা যায়। টানেল সবজি চাষের জমি তৈরি করে বীজ বা চারা রোপণের আগেও করা যায়, পরেও করা যায়। নিচু টানেল তৈরি ঃ এ ধরনের টানেল তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ। টানেলের দৈর্ঘ হতে হবে ৯৮.৪ ফুট এবং চওড়ায় হতে হবে ১৪.৭৬ ফুট। টানেলের ভেতরের মাঝ বরাবর উচ্চতা হবে ৭ ফুট এবং পাশের উচ্চতা হবে ৫ ফুট। সেচ ও পানি নিকাশের জন্য দুই বেড বা টানেলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি গভীরতার ২ ফুট চওড়া নালা রাখতে হয়। তারপর স্বচ্ছ কালো বা নীল রঙের পলিথিন দিয়ে টানেলটি নৌকার ছইয়ের মতো ঢেকে দিতে হয়।
উঁচু টানেল তৈরি ঃ এ ধরনের টানেল তৈরির প্রধান উপকরণ স্টিল ফ্রেম বা বাঁশ। টানেলের দৈর্ঘ হতে হবে ১৩০ ফুট এবং চওড়ায় হতে হবে ৩২ ফুট। টানেলের ভেতরের মাঝ বরাবর উচ্চতা হবে ১২ ফুট এবং পাশের উচ্চতা হবে ১০ ফুট। সেচ ও পানি নিকাশের জন্য দুই বেড বা টানেলের মাঝখানে ৬ ইঞ্চি গভীরতার ৩ ফুট চওড়া নালা রাখতে হয়। চারা বা বীজ থেকে বীজের দূরত্ব রাখতে হয় ১.৫ ফুট। এরপর স্বচ্ছ কালো বা নীল রঙের পলিথিন দিয়ে টানেলটি নৌকার ছইয়ের মতো ঢেকে দিতে হয়। এই পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য যে জমিটি বাছাই করা হয় তা অবশ্যই উর্বর হতে হয়। মাটির পিএইচ থাকতে হয় ৫ থেকে ৭ এর মধ্যে। টানেল তৈরির পর জমি কোদাল দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে ভালোভাবে চাষ বা কর্ষণ করে প্রতি টানেলে পর্যাপ্ত জৈব সার, ২.৫ কেজি খৈল, ইউরিয়া ৮০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম এবং এমওপি ৭০০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া ও পটাশ সারের অর্ধেক জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক চারা গজানোর দুই সপ্তাহ পরে উপরি প্রয়োগ করতে হয়। এগুলো সম্পন্ন হলে চারা বা বীজ রোপণের আগে বেড তৈরি করে নিতে হয়। জৈষ্ঠ মাসের শুরুতে টানেল প্রতি ২০০ গ্রাম পালংকশাকের বীজ বুনলে ১ মাস পর অর্থাৎ আষাঢ় মাসে ফসল তোলা যায়। পরে পালংশাক তোলার পর পুনরায় টানেলের জমি উত্তমরূপে কর্ষণ করে এবং উপরোল্লিখিত রাসায়নিক সার জমিতে প্রয়োগ করে জমি প্রস্তুত করতে হয়। কোনো কোনো সময় টানেলের মাটি জো থাকলে কর্ষণ ছাড়াই সবজি চারা রোপণ করা যায়। সবজি হিসেবে বাঁধাকপি, ফুলকপি ও টমেটো চারা আষাঢ় মাসের শুরুতেই রোপণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে জৈষ্ঠ মাসেই অন্য বীজতলায় চারা তৈরি করে নিতে হয়। ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সের চারা টানেলের জমিতে লাইন করে রোপণ করতে হয়। বীজ বা চারা রোপণ করার আগে ভিটাভেক্স বা ব্যাভিস্টিন দিয়ে বীজ বা চারা শোধন করে নিতে হয়। প্রয়োজনমতো সেচ নিকাশ, আগাছা দমন, রোগ পোকা ব্যবস্থাপনা করলে সহজেই ভালো ফলন নিশ্চিত করা যায়। টানেল পদ্ধতিতে অমৌসুমে সবজি চাষ করে পৃথিবীর অনেক দেশ বিশেষ করে ভারত- প্রতি বছর নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর সবজি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে থাকে। আমাদের দেশের চাষিদের যদি সবজি চাষের এই কৌশল সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে তাহলে আমাদের দেশও নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে। সরকারের কৃষি বিভাগ অনেক আগে থেকেই সবজি চাষের এই কৌশলটি নিয়ে কাজ করলেও খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। কেন পারেনি, কী কী সমস্যা ছিল সেসব নিরূপণ করে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে চাষিদের পাশে এসে দাঁড়াতে পারলে সবজি চাষের মাধ্যমেও দিন বদলের প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যেতে পারে। লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন

একজনের জন্য বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণায় দেরি হচ্ছে বিসিবির

ক্রীড়া প্রতিবেদক ॥ মাস দুয়েকও বাকি নেই। এরপরই বেজে উঠবে বিশ্বকাপের দামামা। ইতিমধ্যে বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণা করেছে নিউজিল্যান্ড। চূড়ান্ত দল ঘোষণা আসেনি বাকি দেশগুলো থেকে। এদিকে ক্রিকেটের বৈশ্বিক আসরে বাংলাদেশ দলে কারা থাকছেন-এ নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা কল্পনা। যদিও বাংলাদেশের স্কোয়াড প্রায়ই চূড়ান্ত। তবে মিডল অর্ডারের একজন ব্যাটসম্যান নিয়ে দ্বিধায় ভূগছেন নির্বাচকরা। শনিবার হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএসপিএ’র স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানিয়েছেন, দল প্রায় চূড়ান্ত। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পালা। তার এ বক্তব্যের পরেও যে কথাটি রয়ে গেছে, একটি জায়গা নিয়েই দ্বিধায় আছেন তারা। এ কারণেই দল ঘোষণা করা হচ্ছে না। জানা গেছে, কোনো মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানকে অন্তর্ভুক্ত করে টাইগারদের বিশ্বকাপের স্কোয়াড পূর্ণতা দিতে চাচ্ছেন বোর্ড সভাপতি। কেন দল ঘোষণায় দেরি করা হচ্ছে প্রশ্ন ছুঁড়ে বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন বলেন, ‘মোটামুটি এখন সবই ফাইনাল। আমি জানি না কেন দল ঘোষণায় দেরি করছে। ১৫ নম্বরটা নিয়েই শুধু আলোচনা হতে পারে। আর এ বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করার আসলে কিছু নেই। আমার মতে অধিনায়ক, নির্বাচক, কোচ উনারা যাকে খুশি দিতে পারে। তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না তাতে।’ তবে ১৫ নম্বর স্থানটিতে কোনো মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান চান নাজমুল হাসান। মিডল অর্ডারের দিকে জোর দেয়া জরুরি মন্তব্য করে তিনি যোগ করেন, ‘ওপেনিংয়ের জন্য তামিম, সৌম্য, লিটন আছে। আমাদের মিডল অর্ডারের দিকে একটু গ্যাপ আছে। উদাহরণ স্বরূপ- যদি মিঠুন কোনো কারণে খেলতে না পারে তবে ওর জায়গায় আসবে কে! অথবা সাব্বিরের জায়গায় কে আসবে?’ এর আগে আসন্ন বিশ্বকাপের টিকিট কারা পাচ্ছেন সে নামগুলো জানিয়েছিলেন বিসিবি প্রধান। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্কোয়াড নিয়ে পাপন বলেন, তামিম ইকবাল, লিটন কুমার দাস, সৌম্য সরকার, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মোহাম্মদ মিঠুন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, সাব্বির রহমান, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, মেহেদী হাসান মিরাজ, মাশরাফি বিন মুর্তজা, রুবেল হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান থাকছে। এদের বাইরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, ফরহাদ রেজা, জহুরুল ইসলাম অমি ও এনামুল হক বিজয়ের নাম নির্বাচকম-লীর মাথায় রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পরীক্ষিত মোসাদ্দেকের বিশ্বকাপ দলে থাকার সম্ভবনা বেশি বলে ইঙ্গিত দেন পাপন। সেক্ষেত্রে ১৫ নম্বরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

দেশি মুরগির চেয়েও তিতির পালনে বেশি লাভ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে তিতির পাখি চায়না মুরগি নামে পরিচিত। আফ্রিকান এই পাখিটি ইংরেজদের হাত ধরে ইউরোপ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আসে। বর্তমানে আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে আশঙ্কাহীন বলে ঘোষণা করলেও বাংলাদেশে এরা প্রায় বিপন্ন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।
তিতির অত্যধিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন পাখি। এ ছাড়া এর বাজার মূল্য দেশি হাঁস-মুরগির চেয়ে অনেক বেশি। তাই এটি লালন-পালন করা অন্যান্য দেশি মুরগির চেয়ে লাভজনক। তিতির পাখি পালন দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তেমনি বিপন্নপ্রায় এই প্রজাতিটির সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষক ও পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস।
তিনি বলেন, গত ৩ দশক আগেও এই তিতির পাখি দেশের গ্রামাঞ্চলে দেশি মুরগির সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা যেত। কিন্ত হঠাৎ করেই এই পাখি আর দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে এই পাখি গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে না থেকে ঢাকার কাটাবনে খাঁচায় দেখা যাচ্ছে। আর সেই খাঁচার প্রতিটি তিতির পাখি ১ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু একটি গৃহপালিত পাখি কেন খাঁচায় বন্দি থাকবে। পাখিটি যেন আবার কাটাবনের সেই খাঁচা থেকে আবার কৃষকের ঘরে ঘরে পালিত হতে পারে সেই জন্য তিনি নতুন করে ২০১০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি খামারে তিতির পাখি পালন, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের উদ্যোগে বিপন্নপ্রায় এই তিতির পাখি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস। টানা ছয় বছর ধরে অধ্যাপক ড. সুবাস ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন ও তা পালনের সব ধাপ এই গবেষণা খামারে সম্পন্ন করেছেন। দেশের সর্বত্র এই পাখি ছড়িয়ে দিতে বিনামূল্যে অনেককেই তিনি এই পাখি বিতরণ করেছেন। এখন উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিতির পালনকে নতুন করে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ শুরু করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে তিতির পালনের জন্য খামারিরা উৎসাহিত হচ্ছেন। তিতির পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশি মুরগির মতোই এদের লালন-পালন করা যায়। তিতির পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্য পাখির তুলনায় বেশি। সংক্রমণ বা পরজীবী সহজে আক্রান্ত করতে পারে না। আলাদা কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ দেয়ারও প্রয়োজন হয় না। এমনকি এদের সম্পূরক খাদ্যের চাহিদাও কম। প্রতিকূল পরিবেশ এরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। তিতিরের মাংস উৎপাদন সম্পর্কে অধ্যাপক সুবাস বলেন, দেশি মুরগি যেখানে ছয় মাসে সর্বোচ্চ এক কেজি ওজনের হয় সেখানে তিতির পাখি দেড় কেজি বা তার বেশিও হয়ে থাকে। আবার একটি দেশি মুরগি বছরে ৫০-৬০টা ডিম দেয় যেখানে একটি তিতির পাখি বছরে প্রায় ১০০-১২০টি ডিম দেয়। বাণিজ্যিক পোল্ট্রির দাপটে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে তিতির পাখি পালন। কিন্তু ডিম আর মাংসের উৎপাদনে পোল্ট্রির চেয়েও তিতির পাখি পালনে দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস।

দেশে ভেষজ উদ্ভিদের উপর সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বিদ্যমান

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চিকিৎসার জন্য ভেষজ উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীলতা চিরায়ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ ভাগ লোক রোগের নিরাময়ক হিসেবে ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করছে। ইউনানী, আয়ুর্বেদীয়, এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজিসহ বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে থাকে। বিশ্বব্যাপী ভেষজ ওষুধের বাজার দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০৫০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেষজের বাণিজ্য হবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশও এই বাণিজ্যের অংশীদার। প্রায় শতকোটি টাকার ঔষধি কাঁচামালের স্থানীয় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বাজার বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে।
চাহিদা বাড়ছে দেশে ঃ ভেষজ উৎপাদনে চমৎকার সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিদ্যমান। দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ থাকলেও ওষুধ শিল্পে বর্তমানে ১০০ ধরনের উদ্ভিদ থেকে দেড় শতাধিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিউটি পার্লারেও প্রসাধন শিল্পে এখন প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উপাদান ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ ও উৎপাদন শুরু হয়েছে।
ভেষজের আন্তর্জাতিক বাজার ঃ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তান, কোরিয়া ভেষজ উদ্ভিদের প্রধান আমদানিকারক দেশ । বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বে শুধু ঔষধি উদ্ভিদের বাজার রয়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। অন্যদিকে ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজসামগ্রী আমদানি করে থাকে। অথচ দেশের ওষুধ শিল্পে বর্তমানে যে পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়, তার ৭০ ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। কেবল প্রয়োজন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ।
ঔষধিগ্রাম ঃ নাটোরের ‘খোলাবাড়িয়া’ একটি গ্রামের নাম। গ্রামের বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ পাগলা বাড়ির পাশে ৫টি ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করেছিলেন বছর ত্রিশেক আগে। সেই ঘৃতকুমারীরর গাছই বদলে দিয়েছে গ্রামটির নাম। খোলাবাড়িয়া এখন ঔষধি গ্রাম নামেই পরিচিত। গ্রামের প্রায় ষোলশ পরিবারের জীবিকা ঔষধি গাছের ওপর নির্ভর করছে। গ্রামে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে ঔষধি গাছের চাষাবাদ করা হচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রির দোকান। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে ‘ভেষজ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা আর উৎপাদনকারীর সমন্বয়ে জমে উঠেছে ভেষজ বিপ্লব। আফাজ পাগলের ১৭ কাঠার চাষী জমিতে ৪৫০ প্রজাতির ভেষজ নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রামে এ রকম আরও ৮টি নার্সারি আছে। বাসক, সাদা তুলসী, উলটকম্বল, চিরতা, নিম, কৃষ্ণতুলসী, রামতুলসী, ক্যাকটাস, সর্পগন্ধা, মিশ্রিদানা, হরীতকী, লজ্জাবতীসহ হরেক রকমের ঔষধি গাছ এসব নার্সারিতে পাওয়া যায়। ঔষধি গ্রামের এই ভেষজ চাষাবাদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী গ্রামগুলোতেও। এ যেন এক ভেষজ বিপ্লব কাহিনী। আফাজ পাগলার দেখানো পথেই ঘটেছে এই ভেষজ বিপ্লব।
গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম ঃ ‘ঔষধি গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম। এসব গ্রামের আদিবাসীরা ঔষধি গাছের নার্সারি করে ভাগ্যের পরিবর্তনে দিনরাত খেটে যাচ্ছেন। ‘সোসাইটি ফর বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন’ (এসবিসি) নামের সংগঠনটি ২০০৮ সাল থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ী গ্রামসহ সীমান্তবর্তী ৪ ইউনিয়ন কাংশা, নলকুড়া, ধানশাইল ও গৌরীপুরের ২৪ গ্রামে ৩৭টি কৃষকমৈত্রী সংগঠনের মাধ্যমে ঔষধি গাছ রোপণ ও পরিচর্যার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ভেষজ উদ্ভিদের চাষকে যদি আরো জনপ্রিয় করে তোলা যায় এবং সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদ চাষের বিস্তার ঘটানো যায়, তবে কেবল আমদানী ব্যয় হ্রাসই নয়, বিদেশেও রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

ভালো জাতের চারায় ভালো ও বেশি ফল

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ভালো ও বেশি ফল পেতে হলে প্রথমেই দরকার স্বাস্থ্যবান ভালো জাতের চারা। তারপর চাই সেগুলো সঠিকভাবে লাগানো। যেনতেনভাবে ফলের চারা-কলম লাগালে সেসব গাছ থেকে কখনো খুব ভালো ফল আশা করা যায় না। মানসম্পন্ন ফল পেতে হলে প্রথমেই কাংক্ষিত জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করতে হবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সিডরের আঘাতে অনেক ফলের গাছ সহজে উপড়ে গেছে। এ সবই অনভিজ্ঞতার ফল। শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় বেশির ভাগ নার্সারিতেই এখন মানসম্পন্ন চারাকলম তৈরি হচ্ছে না, তৈরি হলেও সেসব কলমের খাসি করা ঠিকভাবে হচ্ছে না। ফলে অল্প শিকড় নিয়ে গাছ বড় হওয়ায় সহজে ঝড়-বাতাসে গাছ পড়ে যাচ্ছে। ফলগাছ রোপণের সময় যেসব কাজ করা হয় তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ গাছের বৃদ্ধি। গর্ত খনন থেকে শুরু করে চারাকলম রোপণ পর্যন্ত সকল কাজের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। এসব নিয়ম ঠিকমতো মানা না হলে গাছের বৃদ্ধিই শুধু নয়, ফলনের ওপরও প্রভাব পড়ে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেয়ার দরকার আছে।
গর্ত তৈরি ঃ
আমগাছের কলম লাগানোর জন্য যত বড় গর্ত করতে হবে পেয়ারার জন্য তা নয়, কাগজী লেবুর জন্য গর্ত হবে তার চেয়েও ছোট। বড় গাছ যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, ডেওয়া ইত্যাদির জন্যও গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৯০ সেন্টিমিটার। মাঝারি গাছ যেমন- পেয়ারা, বাতাবিলেবু, কমলা, তৈকর, জামরুল ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৭৫ সেন্টিমিটার। ছোট গাছ যেমন- কাগজী লেবু, করমচা, লুকলুকি, কলা, পেঁপে ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৪৫ সেন্টিমিটার। ওপরের মাপে গর্ত খননের সময় ওপরের মাটি গর্তের এক পাশে এবং নিচের মাটি গর্তের আরেক পাশে রেখে প্রথমে জৈব সার মেশাতে হবে। এভাবে রেখে দেয়ার ৪ থেকে ৫ দিন পর গাছ রোপণের ৩ থেকে ৪ দিন আগে রাসায়নিক সার মেশাতে হবে। এ সময়ে মাঝে মাঝে এই সার মিশ্রিত মাটি ওলট-পালট করে দিতে হবে।
রোপণের সময় ঃ বর্ষার আগে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) বা বর্ষার শুরুতে (আষাঢ়) এবং বর্ষার শেষে (ভাদ্র-আশ্বিন) ফলগাছের চারাকলম রোপণ করা যেতে পারে। তবে জমি সুনিষ্কাশিত ও বেলে দো-আঁশ প্রকৃতির হলে বর্ষায় ও (আষাঢ়-শ্রাবণ) বৃষ্টির দিন ছাড়া রোপণ করা যায়। শীতকালে চারাকলমের নতুন শিকড় গজায় না বা শিকড়ের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না বলে শীতের সময় রোপণ না করা ভালো। বিকেলবেলা চারা বা কলম রোপণের উপযুক্ত সময়।
রোপণ পদ্ধতি ঃ চারাকলম লাগানোরও বেশ কিছু নিয়ম আছে যেমন- মাটির মধ্যে কতটুকু পুঁতবেন, লাগানোর সময় কোনো ডাল-পাতা ছেঁটে দেবেন কি না অথবা নার্সারি থেকে কিনে এনেই চারাটি লাগাবেন কি না ইত্যাদি। কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চারাকলম লাগালে ওগুলো ভালো থাকে। যেমন-কলম করে সাথে সাথেই বাগানে রোপণ করা চলবে না। তা করলে গাছ রোপণজনিত আঘাতে মরে যেতে পারে এবং কলমের জোড়া খুলে যেতে পারে। সে জন্য কলম করার অন্তত কয়েক মাস পরে তা রোপণ করা ভালো।
রোপণ করার আগে চাষ ও মই দিয়ে বাগানের মাটি সমতল করে নেয়া উচিত। রোপণের আগে অবশ্যই দূরত্ব ঠিক করে নকশা করে নেয়া উচিত। গ্রীষ্মেই এ কাজ করে ফেলতে হবে। রোপণের অন্তত ১৫ দিন আগে গর্ত তৈরি করে সার মাটি ভরে রাখতে হবে। গর্ত প্রতি ৫-১০ কেজি গোবর সার, ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০-২৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫-১৫০ গ্রাম এমওপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
রোপণের কয়েক দিন আগে চারা বা কলম সংগ্রহ করে হার্ডেনিং করতে হবে। এ জন্য ছায়াযুক্ত জায়গায় কয়েক দিন চারাকলম শুইয়ে রেখে পাতা ঝরাতে হবে। মাঝে মাঝে গোড়ার মাটির বলে ও গাছে হালকা পানির ছিটা দিতে হবে। এতে গাছের রোপণোত্তর মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। লাগানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন চারাকলমের গোড়ার মাটির বলটি ভেঙে না যায়।
মাটির টবে বা পলিব্যাগে চারাকলম থাকলে কিছুটা পানি দিয়ে মাটি সামান্য নরম করে নিতে হবে। এরপর টব মাটিতে কাত করে গড়িয়ে এবং পলিব্যাগ গড়িয়ে বা দুই হাতের তালু দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেপে নরম করে নিতে হয়। টব বা পলিব্যাগের চারাকলমের গোড়ায় হাত দিয়ে চেপে ধরে সম্পূর্ণ চারা বা কলমটি উল্টো করে ধরে টব বা পলিব্যাগ ওপরের দিকে টান দিলে বা টবটির কিনারা শক্ত কোনো জায়গায় ধীরে ধীরে টোকা দিলে মাটির বলটি বেরিয়ে আসে এবং সেটি গর্তে স্থাপন করতে হয়। অবশ্য পলিব্যাগের চারাকলমের ক্ষেত্রে চাকু বা ব্লেড দিয়ে পলিব্যাগের এক দিক কেটে অথবা মাটির টবটির চার দিক আস্তে আস্তে ভেঙে দিয়ে মাটির সম্পূর্ণ বলটি বের করে এনেও গর্তে বসানো যায়। গর্তে বসানোর সময় চারাকলমের গোড়া টবে বা পলিব্যাগে যে পর্যন্ত গোড়ায় মাটি ছিল বা বাইরে ছিল সে পর্যন্তই বাইরে রাখতে হয়। এর বেশি পুঁতে দেয়া বা ওপরে রাখা কোনোটাই ঠিক নয়।
রোপণের সময় অতিরিক্ত পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। তবে এটি সতর্কতার সাথে করতে হয়, যেন চারাকলমের গাছটি আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। চারা কলম রোপণের পর গোড়ার মাটি কিছুটা চেপে দিয়ে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়।
চারাকলম যদি বড় হয় তবে এটিকে সোজা ও শক্ত রাখার জন্য গাছ থেকে ১০-১৫ সেন্টিমিটার দূরে একটি খুঁটি পুঁতে একটু কাত করে সুতলী দিয়ে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হয়। শক্ত করে বাঁধলে অনেক সময় চারাকলমের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ঝড়ো বাতাসে উপড়ে যাওয়া থেকে চারাকলমকে এই খুঁটি রক্ষা করে। চারাকলমের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে বেড়া বা খাঁচার ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন কুড়ি বা পাতা না আসা পর্যন্ত গাছে উপরি সার দেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এই সময়ে গাছের গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়।