ভালো ও বেশি ফল পেতে দরকার স্বাস্থ্যবান ভালো জাতের চারা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এখন ফলগাছ লাগানোর সময়। ভালো ও বেশি ফল পেতে হলে প্রথমেই দরকার স্বাস্থ্যবান ভালো জাতের চারা। তারপর চাই সেগুলো সঠিকভাবে লাগানো। যেনতেনভাবে ফলের চারা-কলম লাগালে সেসব গাছ থেকে কখনো খুব ভালো ফল আশা করা যায় না। মানসম্পন্ন ফল পেতে হলে প্রথমেই কাংক্ষিত জাতের চারা বা কলম সংগ্রহ করতে হবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সিডরের আঘাতে অনেক ফলের গাছ সহজে উপড়ে গেছে। এ সবই অনভিজ্ঞতার ফল। শুধু বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় বেশির ভাগ নার্সারিতেই এখন মানসম্পন্ন চারাকলম তৈরি হচ্ছে না,  তৈরি হলেও সেসব কলমের খাসি করা ঠিকভাবে হচ্ছে না। ফলে অল্প শিকড় নিয়ে গাছ বড় হওয়ায় সহজে ঝড়-বাতাসে গাছ পড়ে যাচ্ছে। ফলগাছ রোপণের সময়  যেসব কাজ করা হয় তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ গাছের বৃদ্ধি। গর্ত খনন থেকে শুরু করে চারাকলম রোপণ পর্যন্ত সকল কাজের ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। এসব নিয়ম ঠিকমতো মানা না হলে গাছের বৃদ্ধিই শুধু নয়, ফলনের ওপরও প্রভাব পড়ে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেয়ার দরকার আছে।

গর্ত তৈরি ঃ

আমগাছের কলম লাগানোর জন্য যত বড় গর্ত করতে হবে পেয়ারার জন্য তা নয়, কাগজী লেবুর জন্য গর্ত হবে তার চেয়েও ছোট। বড় গাছ যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল, ডেওয়া ইত্যাদির জন্যও গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৯০ সেন্টিমিটার। মাঝারি গাছ যেমন- পেয়ারা, বাতাবিলেবু, কমলা, তৈকর, জামরুল ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৭৫ সেন্টিমিটার। ছোট গাছ যেমন- কাগজী লেবু, করমচা, লুকলুকি, কলা, পেঁপে ইত্যাদির জন্য গর্তের মাপ হবে সব দিকে ৪৫  সেন্টিমিটার। ওপরের মাপে গর্ত খননের সময় ওপরের মাটি গর্তের এক পাশে এবং নিচের মাটি গর্তের আরেক পাশে রেখে প্রথমে জৈব সার মেশাতে হবে। এভাবে  রেখে দেয়ার ৪ থেকে ৫ দিন পর গাছ রোপণের ৩ থেকে ৪ দিন আগে রাসায়নিক সার মেশাতে হবে। এ সময়ে মাঝে মাঝে এই সার মিশ্রিত মাটি ওলট-পালট করে দিতে হবে।

রোপণের সময় ঃ বর্ষার আগে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) বা বর্ষার শুরুতে (আষাঢ়) এবং বর্ষার  শেষে (ভাদ্র-আশ্বিন) ফলগাছের চারাকলম রোপণ করা যেতে পারে। তবে জমি সুনিষ্কাশিত ও বেলে দো-আঁশ প্রকৃতির হলে বর্ষায় ও (আষাঢ়-শ্রাবণ) বৃষ্টির দিন ছাড়া রোপণ করা যায়। শীতকালে চারাকলমের নতুন শিকড় গজায় না বা শিকড়ের বৃদ্ধি আশানুরূপ হয় না বলে শীতের সময় রোপণ না করা ভালো। বিকেলবেলা চারা বা কলম রোপণের উপযুক্ত সময়।

রোপণ পদ্ধতি ঃ চারাকলম লাগানোরও বেশ কিছু নিয়ম আছে যেমন- মাটির মধ্যে কতটুকু পুঁতবেন, লাগানোর সময় কোনো ডাল-পাতা ছেঁটে দেবেন কি না অথবা নার্সারি থেকে কিনে এনেই চারাটি লাগাবেন কি না ইত্যাদি। কিছু সাধারণ নিয়ম  মেনে চারাকলম লাগালে ওগুলো ভালো থাকে। যেমন-কলম করে সাথে সাথেই বাগানে রোপণ করা চলবে না। তা করলে গাছ রোপণজনিত আঘাতে মরে যেতে পারে এবং কলমের জোড়া খুলে যেতে পারে। সে জন্য কলম করার অন্তত কয়েক মাস পরে তা রোপণ করা ভালো।

রোপণ করার আগে চাষ ও মই দিয়ে বাগানের মাটি সমতল করে নেয়া উচিত।  রোপণের আগে অবশ্যই দূরত্ব ঠিক করে নকশা করে নেয়া উচিত। গ্রীষ্মেই এ কাজ করে ফেলতে হবে। রোপণের অন্তত ১৫ দিন আগে গর্ত  তৈরি করে সার মাটি ভরে রাখতে হবে। গর্ত প্রতি ৫-১০ কেজি গোবর সার, ১০০-১৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০-২৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫-১৫০ গ্রাম এমওপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

রোপণের কয়েক দিন আগে চারা বা কলম সংগ্রহ করে হার্ডেনিং করতে হবে। এ জন্য ছায়াযুক্ত জায়গায় কয়েক দিন চারাকলম শুইয়ে রেখে পাতা ঝরাতে হবে। মাঝে মাঝে গোড়ার মাটির বলে ও গাছে হালকা পানির ছিটা দিতে হবে। এতে গাছের  রোপণোত্তর মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়। লাগানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন চারাকলমের গোড়ার মাটির বলটি ভেঙে না যায়।

মাটির টবে বা পলিব্যাগে চারাকলম থাকলে কিছুটা পানি দিয়ে মাটি সামান্য নরম করে নিতে হবে। এরপর টব মাটিতে কাত করে গড়িয়ে এবং পলিব্যাগ গড়িয়ে বা দুই হাতের তালু দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেপে নরম করে নিতে হয়। টব বা পলিব্যাগের চারাকলমের গোড়ায় হাত দিয়ে চেপে ধরে সম্পূর্ণ চারা বা কলমটি উল্টো করে ধরে টব বা পলিব্যাগ ওপরের দিকে টান দিলে বা টবটির কিনারা শক্ত কোনো জায়গায় ধীরে ধীরে টোকা দিলে মাটির বলটি বেরিয়ে আসে এবং সেটি গর্তে স্থাপন করতে হয়। অবশ্য পলিব্যাগের চারাকলমের ক্ষেত্রে চাকু বা ব্লেড দিয়ে পলিব্যাগের এক দিক কেটে অথবা মাটির টবটির চার দিক আস্তে আস্তে ভেঙে দিয়ে মাটির সম্পূর্ণ বলটি বের করে এনেও গর্তে বসানো যায়। গর্তে বসানোর সময় চারাকলমের গোড়া টবে বা পলিব্যাগে যে পর্যন্ত গোড়ায় মাটি ছিল বা বাইরে ছিল সে পর্যন্তই বাইরে রাখতে হয়। এর বেশি পুঁতে দেয়া বা ওপরে রাখা কোনোটাই ঠিক নয়।

রোপণের সময় অতিরিক্ত পাতা ছাঁটাই করে দিতে হয়। তবে এটি সতর্কতার সাথে করতে হয়, যেন চারাকলমের গাছটি আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। চারা কলম রোপণের পর  গোড়ার মাটি কিছুটা চেপে দিয়ে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়।

চারাকলম যদি বড় হয় তবে এটিকে সোজা ও শক্ত রাখার জন্য গাছ থেকে ১০-১৫  সেন্টিমিটার দূরে একটি খুঁটি পুঁতে একটু কাত করে সুতলী দিয়ে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হয়। শক্ত করে বাঁধলে অনেক সময় চারাকলমের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ঝড়ো বাতাসে উপড়ে যাওয়া থেকে চারাকলমকে এই খুঁটি রক্ষা করে।  চারাকলমের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে বেড়া বা খাঁচার ব্যবস্থা করতে হয়। নতুন কুড়ি বা পাতা না আসা পর্যন্ত গাছে উপরি সার দেয়ার প্রয়োজন নেই।  তবে এই সময়ে গাছের গোড়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়।

আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন আশার নাম ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নতুন আশার নাম। এই ছাগল দেখতে কালো এবং বেশ বড়সড় হওয়ায় অনেকে একে ‘বাংলার কালো বাঘ’ বলে থাকেন। ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট বা বাংলার কালো ছাগল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাগলের উন্নত জাতগুলোর মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল, বারবারি, বিটাল, বোয়ের, যমুনা পাড়ি, কিকু, স্প্যানিশ, সাহেলিয়ান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ধারণা করা হয়, বিশ্বের হাতে গোনা যে চার-পাঁচটি ছাগলের জাতের এখনো সংকরায়ন হয়নি তার মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল অন্যতম। নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এ জাতটি টিকিয়ে রেখেছে গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষ। আশার খবর হলো- বাংলাদেশের এ জাতের ছাগলের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং ডিএনএ পরীক্ষা নিয়ে প্রায় ১০ বছর গবেষণা করেছে। ২০০৭ সালে প্রায় ১০ বছর গবেষণার পর জাতিসংঘের আণবিক শক্তিবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক অ্যানার্জি এজেন্সি (আইএইএ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিশ্বের ১০০টি জাতের ছাগলের ওপরে তাদের প্রতিবেদনে ব্ল্যাক বেঙ্গলকে অন্যতম  সেরা জাত হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশে খবরটি যে কাউকে আশাবাদী করবে। বিশ্ববাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া কুষ্টিয়া গ্রেড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে এটিও একটি আশাজাগানিয়া খবর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে কমবেশি আড়াই কোটি ছাগল আছে, যার ৯৫ শতাংশই ব্ল্যাক বেঙ্গল। দেশের প্রায় এক কোটি লোক ছাগল পালনের সঙ্গে যুক্ত যা একক কোনো প্রাণী পালনের রেকর্ড। বলা হয়ে থাকে ছাগলের দুধ হলো অনেক রোগের মহৌষধ।

বিশ্বসেরা বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ঃ বাংলাদেশের নিজস্ব জাতের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বসেরা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং আন্তর্জাতিক আণবিক গবেষণা কেন্দ্রের (আইএইএ) সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিশ্বের অন্যতম সেরা জাত। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রাণিবিদ্যা বিষয়ক স্বীকৃত জার্নালগুলোতে ব্ল্যাক বেঙ্গল নিয়ে শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এই গবেষণার মাঝ পর্যায়ে ২০০৭ সালের ২০ মার্চ জাতিসংঘের সংবাদ সংস্থা ইউএন নিউজে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ বিশ্বের দরিদ্র দেশ হলেও এখানেই বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রাণিসম্পদ ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগলের বসতি।’

‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ পালনে দিনবদল ঃ ছাগল পালন বাংলাদেশের দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি ছাগল পালিত হয়। তবে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর  জেলায় ব্ল্যাক বেঙ্গল পালনের সাফল্যে উজ্জীবিত হচ্ছেন আশপাশের অন্যান্য এলাকার জনগণ। চুয়াডাঙ্গা সদর থেকে প্রধান সড়ক ধরে আলমডাঙ্গা উপজেলার দিকে অগ্রসর হতেই প্রায় সব বাড়ির উঠানেই চোখে পড়বে ছাগলের ছোটাছুটি। অনেক বাড়িতে আলাদা ঘর করে মাচায় ছাগল পালতেও  দেখা যায়। ব্ল্যাক বেঙ্গল গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ দিয়ে গ্রামীণ যুবসমাজকে এ জাতের ছাগল প্রতিপালনের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও অন্যতম আয়বর্ধনমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্যবসার জন্য ছাগল পুষতে হলে ব্ল্যাক বেঙ্গল সবচেয়ে লাভজনক। এই জাতের ছাগলের মাংসের চাহিদা দেশে ও বিদেশে ব্যাপক। উন্নত পদ্ধতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল পালন করে অনেক খামারি লাভের মুখ দেখেছেন। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় ২০০৮ সালে মাচায় ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন এবং ছাগলের মৃত্যুহার কমানোর জন্য ‘লিফট’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থা ওয়েব ফাউন্ডেশন সফলতা  পেয়েছে। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ পালনের উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলো হচ্ছে- খাবার তুলনামূলকভাবে কম লাগে, পালনের জন্য অল্প জায়গা হলেই চলে, মূলধনও সামর্থ্যরে মধ্যে থাকে, রোগবালাই তুলনামূলক কম। এটি পালন করতে বড় চারণভূমি লাগে না। বাড়ির উঠান বা রান্নাঘরের পাশের ছোট্ট স্থানেও পালন করা যায়। বছরে দুইবার দুয়ের অধিক সংখ্যক বাচ্চা পাওয়া যায়। সঠিক পরিচর্যা, চিকিৎসা ও লালন-পালনে প্রশিক্ষিত হলে কোনো খামারিই ব্ল্যাক বেঙ্গল খামার করে লোকসানের কবলে পড়বেন না। ব্ল্যাক বেঙ্গল থেকে পাওয়া যায় উন্নত মানের চামড়া, যা পৃথিবীর যে কোনো জাতের ছাগলের চামড়া থেকে গুণগত মানসম্পন্ন। খাসির মাংস খেতে খুবই সুস্বাদু। ছাগলের  লোম  থেকে তৈরি হয় উন্নতমানের পশম। ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের এ ছাগল খুবই রোগ প্রতিরোধী এবং সহজে রোগবালাই হয় না, আর হলেও এর চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ। তাই এখন আর শুধু চুয়াডাঙ্গা নয় কুষ্টিয়া, যশোর ইত্যাদি জায়গায় নয় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতি গ্রামে মানুষ ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের খামার গড়ে তুলেছেন। উটকে যেমন বলা হয়ে থাকে মরুভূমির জাহাজ তেমনি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলকে বলা হয়ে থাকে ‘গরিবের গাভী।’

ভূমিকা রাখবে অর্থনীতিতে ঃ বাংলাদেশকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ছাগল পালনকারী দেশ। প্রতিবছর এ জাতীয় ছাগল থেকে প্রায় সোয়া লাখ মেট্রিক টন মাংসের সরবরাহ পেয়ে থাকে। যা মোট মাংসের প্রায় ২৫ শতাংশ। এই প্রজাতির ছাগল যেমন দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে তেমনি দ্রুত বড় হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমাল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেন ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল নিয়ে ২০ বছর ধরে গবেষণা করছেন। তার মতে, ‘তুলনা করে দেখা গেছে, অন্যান্য জাতের ছাগলের চেয়ে এর মাংসের স্বাদ ভালো। এ কারণে বিশ্ববাজারে এর চাহিদা বেশি। এর চামড়া এত উন্নতমানের যে বিশ্বের বড় কোম্পানিগুলোর চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের চামড়া ব্যবহৃত হয়। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। শুধু বাংলাদেশ নয় অনেক দেশেই ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের খামার অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অন্যান্য  দেশের মানুষ যেমন- ভারত, ইরান, সৌদি আরবের অনেক কৃষক জমি চাষ করার পাশাপাশি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের খামার করে অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট সফলতা পেয়েছেন। জানা গেছে, উন্নত দেশের খামারিরা প্রায় আড়াই হাজার ব্ল্যাক বেঙ্গলের একটি খামার থেকে মাসে কম হলেও ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার আয় করতে পারেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় সাত-সাড়ে সাত লাখ টাকা। আফ্রিকার মাসাই ছাগল, ভারতের যমুনাপাড়ি ছাগল এবং চীনা জাতের ছাগলের মাংস ও দুধের পরিমাণ ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’র চেয়ে ৪০  থেকে ৬০ শতাংশ বেশি। তবে ওই তিন জাতের ছাগলের ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাচ্চা জন্মের পরই মারা যায়। অন্যদিকে ব্ল্যাক বেঙ্গলের বাচ্চার মৃত্যুর হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ আর বংশবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। তাই বিজ্ঞানীরা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার বিচারে এটিকে সেরা জাত হিসেবে নির্বাচন করেছেন।  কোনো একটি খামারে কাজ শুরু থেকে তৃতীয় বছরেই ছাগল বিক্রিযোগ্য হয়। এসব কারণে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন রীতিমতো একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে।

খামারি, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মতে- বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি সঠিক  সেবাপ্রদানের সুযোগ যেমন- ঋণ সুবিধা, সহজশর্তে অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তা, যথাযথ প্রশিক্ষণ, বাজার সুবিধা সৃষ্টি ইত্যাদিতে এগিয়ে আসে তবে কোনো খামারি লোকসানের কবলে পড়বেন না। ব্ল্যাক বেঙ্গল পালনে সরকার যদি যথাযথ মনোযোগ ও গুরুত্ব দেয় তবে দেশের সব  জেলার প্রতিটি গ্রামের মানুষ অতি লাভজনকের খামার গড়ে তুলতে আরও উৎসাহী হবে। ফলে খাদ্য ও আমিষের পুষ্টি ঘাটতি পূরণ হবে। এভাবে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ পালন খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

 

 

টার্কি পালন শখ ও পেশা- একের ভিতর দুই

মাহমুদ শরীফ ॥ টার্কি একটি বিদেশি পাখি। উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকায় টার্কির চাহিদা ও জনপ্রিয়তা ব্যাপক। বাংলাদেশে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে টার্কি সহজেই নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায়ও টার্কির মাংস বেশ উপযোগী। এর মাংসে চর্বি ও কোলেস্টেরলের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। দেশে মাংসের চাহিদা পূরণে বিশেষ করে ব্রয়লারের বিকল্প হিসেবে টার্কি যথেষ্ট উপাদেয় ও সম্ভাবনাময়। টার্কি পালনে খরচও কম। এরা নরম লতাপাতা, ঘাস, সবজি জাতীয় খাবার বেশ উৎসাহের সঙ্গেই খেয়ে থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশ ভালো। রাণীক্ষেত, ফাউলপক্সসহ কিছু নির্দিষ্ট রোগের টিকা সময়মতো দিলে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে রাখলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাই ঝুঁকিও অনেক কম এবং লাভও বেশি। খামারে পালনের পাশাপাশি বাড়িতে অল্প কিছু মুক্ত অবস্থায়ও স্বাচ্ছন্দে পালন করা যায়। বর্তমানে অনেক তরুণই আগ্রহ নিয়ে টার্কির খামার গড়ে তুলেছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কেউ কেউ শখের বশে অল্প কিছু বাসায়ও পালন করছেন। এতে অনেক বেকার যুবকের ভাগ্য পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক পরিবার স্বচ্ছলতার ছোঁয়া পেয়েছে। নিতান্তই শখের বশে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি গ্রামের বকুল, সজিব, কেশবপুরের প্রকৌশলী শামীম, শিক্ষক মাহমুদ শরীফ গড়ে তুলেছেন টার্কি খামার। তাদের খামারে এখন ছোট-বড় প্রায় দেড় হাজার টার্কি রয়েছে। আশেপাশের এলাকা থেকে আগ্রহী অনেক মানুষ ভিড় জমায় তাদের খামার দেখতে। তাদের দেখাদেখি অনেকেই নতুন করে টার্কি খামার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন। বকুল হোসেন বলেন, ‘টার্কি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ আগে থেকেই ছিল। মানসম্মত বাচ্চা উৎপাদন ও ফার্মিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নিয়েছি। দেশে ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বাড়ছে। আমাদের মতো অনেকেই টার্কির খামার গড়ে তুলছেন। আশা করা যায়, খুব শিগগিরই টার্কি শিল্প দেশে ভালো একটা স্থান পাবে।’ তার পরামর্শ নতুন কেউ টার্কির খামার বা বাড়িতে ৫/১০টি টার্কি শখের জন্য পালন করতে চাইলে এখন শুরু করতে পারেন। বাচ্চা সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ করতে চাইলে কুমারখালীর ‘ভাই ভাই কোয়েল ও টার্কি খামার- লালন বাজার, কুমারখালী, কুষ্টিয়া, মোবাইল নং ০১৭১৭-৫১২৬০০ ফোন দিতে পারেন।  শেষে টার্কি পালন ঃ শখ ও পেশা একের ভিতর দুই একথা বলাই যায়।

 

 

ধান চাষে বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ রাসায়নিক সার সাশ্রয়ী বায়ো-অর্গানিক সার উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। রাসায়নিক সার ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে মাটির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই কৃষি বিজ্ঞানীরা মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো ও জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। আদর্শ ও উর্বর মাটিতে শতকরা ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের মাটিতে বর্তমানে  জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশ বা তারও কম। তাই মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ কিভাবে ২% বা তারও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করা যায় এ ব্যাপারে বাস্তবসম্মত গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। এ জন্য ইতিমধ্যে তারা গৃহস্থলীর আবর্জনা সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং করে বায়ো-অর্গানিক সার ও কম্পোস্ট সার তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ও উপযোগিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে এই সার সহজলভ্য করতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। জানা গেছে, ব্রি নতুন উদ্ভাবিত এবং ধান চাষে ব্যবহারযোগ্য বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে আউশ, বোরো ও আমন মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আউশ মৌসুমে এ সার হেক্টরপ্রতি এক টন এবং বোরো ও আমন মৌসুমে দুই টন হারে ব্যবহার করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, এ সার ব্যবহার করলে ধানের জমিতে টিএসপি পূর্ণমাত্রায় ও ইউরিয়া শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ সাশ্রয় করা যায়। এটি ব্যবহার করলে ফলনেও কোনো তারতম্য হয় না। এই সার উদ্ভাবক দলের একজন অন্যতম বিজ্ঞানী ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. উম্মে আমিনুন নাহার জানান, পরিবেশবান্ধব ১০টি ব্যাকটেরিয়া, বাজারের কাঁচা শাক সবজির অবশিষ্টাংশ, রান্না ঘরের পচনশীল বর্জ্য পদার্থ, রক ফসফেট (শতকরা ৫ ভাগ) ও বায়োচার (শতকরা ১৫ ভাগ) মিশিয়ে বায়ো-অর্গানিক সার উদ্ভাবন করেছেন। বায়ো-অর্গানিক সারের উদ্ভাবক দলের অন্য সদস্যরা হলেন, ড. যতীশ চন্দ্র বিশ্বাস, মো. ইমরান উল্লাহ সরকার ও আফসানা জাহান। ইউরিয়া ও টিএসপি সারের জন্য সরকারকে প্রতি বছরে বিপুল পরিমাণে অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। তাছাড়া সার উৎপাদনে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস  তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি  কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি উৎপাদনে প্রায় সাড়ে ছয় কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে যুক্ত হয়। টিএসপি অথবা ডিএপি সার তৈরীর প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে রক ফসফেট, যার বাজার মূল্য কেজি প্রতি মাত্র পাঁচ টাকা। রক ফসফেট সহজে দ্রবীভূত হয় না বিধায় এটিকে ধানসহ বিভিন্ন স্বল্প মেয়াদি ফসলে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। মাটিতে বসবাসকারী এক শ্রেণির পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া যা ফসফেট দ্রবণকারী ব্যাকটেরিয়া নামে পরিচিত এবং খুব সহজেই রক ফসফেটকে স্বল্প সময়ে দ্রবীভূত করে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত সার অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। উদ্ভাবিত বায়ো-অর্গানিক সার ধান চাষে ব্যবহারে একদিকে যেমন শতকরা ৩০ ভাগ ইউরিয়া সার ও পূর্ণ মাত্রার টিএসপি সারের ব্যবহার কমাবে, অন্যদিকে কাঁচা বাজারসহ রান্নাঘরের বর্জ্য দ্রব্যকে ধান চাষে জৈব সার রূপে ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনা যাবে। তদুপরি মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এই উদ্ভাবিত সারটির সঙ্গে শতকরা ১৫ ভাগ বায়োচার আছে বিধায় মাটিতে সরাসরি কার্বন যোগ করে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করবে।

লেখক ঃ এম এ মোমিন।

ধান চাষে বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ রাসায়নিক সার সাশ্রয়ী বায়ো-অর্গানিক সার উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। রাসায়নিক সার ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে মাটির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই কৃষি বিজ্ঞানীরা মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো ও জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। আদর্শ ও উর্বর মাটিতে শতকরা ৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশের মাটিতে বর্তমানে  জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশ বা তারও কম। তাই মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ কিভাবে ২% বা তারও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করা যায় এ ব্যাপারে বাস্তবসম্মত গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। এ জন্য ইতিমধ্যে তারা গৃহস্থলীর আবর্জনা সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং করে বায়ো-অর্গানিক সার ও কম্পোস্ট সার তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ কর্তৃক উদ্ভাবিত বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ও উপযোগিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে এই সার সহজলভ্য করতে উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন ব্রির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের বিজ্ঞানীরা। জানা গেছে, ব্রি নতুন উদ্ভাবিত এবং ধান চাষে ব্যবহারযোগ্য বায়ো-অর্গানিক ফার্টিলাইজার এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে আউশ, বোরো ও আমন মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আউশ মৌসুমে এ সার হেক্টরপ্রতি এক টন এবং বোরো ও আমন মৌসুমে দুই টন হারে ব্যবহার করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, এ সার ব্যবহার করলে ধানের জমিতে টিএসপি পূর্ণমাত্রায় ও ইউরিয়া শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ সাশ্রয় করা যায়। এটি ব্যবহার করলে ফলনেও কোনো তারতম্য হয় না। এই সার উদ্ভাবক দলের একজন অন্যতম বিজ্ঞানী ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. উম্মে আমিনুন নাহার জানান, পরিবেশবান্ধব ১০টি ব্যাকটেরিয়া, বাজারের কাঁচা শাক সবজির অবশিষ্টাংশ, রান্না ঘরের পচনশীল বর্জ্য পদার্থ, রক ফসফেট (শতকরা ৫ ভাগ) ও বায়োচার (শতকরা ১৫ ভাগ) মিশিয়ে বায়ো-অর্গানিক সার উদ্ভাবন করেছেন। বায়ো-অর্গানিক সারের উদ্ভাবক দলের অন্য সদস্যরা হলেন, ড. যতীশ চন্দ্র বিশ্বাস, মো. ইমরান উল্লাহ সরকার ও আফসানা জাহান। ইউরিয়া ও টিএসপি সারের জন্য সরকারকে প্রতি বছরে বিপুল পরিমাণে অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। তাছাড়া সার উৎপাদনে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক গ্রিনহাউস গ্যাস  তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি  কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি উৎপাদনে প্রায় সাড়ে ছয় কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে যুক্ত হয়। টিএসপি অথবা ডিএপি সার তৈরীর প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে রক ফসফেট, যার বাজার মূল্য কেজি প্রতি মাত্র পাঁচ টাকা। রক ফসফেট সহজে দ্রবীভূত হয় না বিধায় এটিকে ধানসহ বিভিন্ন স্বল্প মেয়াদি ফসলে সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। মাটিতে বসবাসকারী এক শ্রেণির পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া যা ফসফেট দ্রবণকারী ব্যাকটেরিয়া নামে পরিচিত এবং খুব সহজেই রক ফসফেটকে স্বল্প সময়ে দ্রবীভূত করে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত সার অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে। উদ্ভাবিত বায়ো-অর্গানিক সার ধান চাষে ব্যবহারে একদিকে যেমন শতকরা ৩০ ভাগ ইউরিয়া সার ও পূর্ণ মাত্রার টিএসপি সারের ব্যবহার কমাবে, অন্যদিকে কাঁচা বাজারসহ রান্নাঘরের বর্জ্য দ্রব্যকে ধান চাষে জৈব সার রূপে ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনা যাবে। তদুপরি মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এই উদ্ভাবিত সারটির সঙ্গে শতকরা ১৫ ভাগ বায়োচার আছে বিধায় মাটিতে সরাসরি কার্বন যোগ করে মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করবে।

লেখক ঃ এম এ মোমিন।

জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বর্তমানে পুকুর হচ্ছে মাছের অন্যতম উৎস। বাণিজ্যিকভাবে যারা আমাদের দেশে অনেকে মাছ চাষের সাথে সম্পৃক্ত। আবার অনেকের প্রধান পেশা মাছ চাষ। বর্তমানে মাছ লাভজনক একটি প্রযুক্তি। মৎস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের মতে, পুকুরে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করলে খুব সহজে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব। ঢাকার আশপাশের এলাকা- ধামরাই, সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের অনেক স্থানে হাঁস ও মাছের সমন্বিত চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতিতে অনেক সুবিধা রয়েছে যেমন- এর জন্য পুকুরে তেমন বাড়তি সার ও খাদ্য দিতে হয় না। মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সাথে মাছ, হাঁসও ডিম থেকে সমানে আয় করা যায়।
যেভাবে শুরু করতে পারেন ঃ- এ প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাইলে আপনাকে ৪০-৫০ শতাংশ আয়তনের একটি পুকুর লাগবে। ১০০- ১৫০টি হাঁস, ১৫০০-১৮০০টি মাছের পোনা, হাঁসের ঘর। এসব পরিকল্পিতভাবে করলে ভালো হয়। পাহারাদারের ঘরটি হাঁসের ঘরের দক্ষিণ পাশে হলে ভালো হয়।
পুকুর তৈরি করুন নিখুঁতভাবে ঃ- সঠিকভাবে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে পুকুরের চারপাশের পাড় ভালোভাবে মাটি দিয়ে উঁচু করে বাঁধতে হবে। পুকুরের তলদেশ সংস্কার করতে হবে। পুকুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে প্রতি শতকে ১ কেজি হারে। চুন প্রয়োগের পর পানি সরবরাহ করতে হবে। মনে রাখবেন চুন প্রয়োগের ২-৩ সপ্তাহ পর মাছ ছাড়তে হবে। পুকুরে কোনো আগাছা রাখা যাবে না, এমনকি পানা থাকলেও তা পরিষ্কার করে দিতে হবে। পুকুরে পানি কমানো বা বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কোন জাতের মাছ নির্বাচন করবেন ঃ হাঁস চাষ করায় পুকুরে মাছের বিভিন্ন প্রকার খাবারের সৃষ্টি হয়। এজন্য ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ করা উচিৎ। তাছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভিন্ন ভিন্ন স্তরের খাবার খায়। মাছের প্রজাতির মধ্যে সিলভার কার্প ও কাতলা-পানির উপরের স্তরে খাদ্য খায় গ্রাস কার্প-পুকুরের জলজ আগাছা ও ঘাস খায়, কমন কার্প- পুকুরে তলদেশের খাদ্য খায় বলে জানালেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও মৃগেল, কালিবাউশ, মিরর কার্প, সরপুঁটিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করতে পারেন।
মাছের সম্ভব্য সংখ্যা ঃ- প্রতি শতকের জন্য সিলভার কার্প- ১০-১৫টি, কাতলা/ব্রিগেড- ৬টি, মৃগেল ৬টি, কালিবাউশ ৩টি, গ্রাস কার্প ৩টি, সরপুঁটি ৭-১০টি।
হাঁসের ঘর তৈরি ঃ- পুকুর পাড়ে কিংবা পুকুরের ওপর ঘরটি তৈরি করতে হবে। ঘরের উচ্চতা ৫-৬ ফুট হলে ভালো হয়। ঘর তৈরিতে বাঁশ, বেত, টিন, ছন, খড় ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরটি খোলামেলা হতে হবে এবং সাপ ও ইঁদুর থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
উন্নত হাঁসের জাত ঃ- হাঁসের জাত নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে জাতের হাঁস বেশি ডিম দেয় সে জাতের হাঁস নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান রানার ও খাকি ক্যাম্পেবেল নির্বাচন করা যেতে পারে। এ জাতের হাঁস ৫ মাস বয়স থেকে ২ বছর পর্যন্ত ডিম দেয়। বছরে ২৫০- ৩০০টি ডিম দিয়ে থাকে।
হাঁসের খাদ্য ঃ- শুকনা খাদ্য না দিয়ে হাঁসকে সবসময় ভেজা খাদ্য দেয়া উচিত। খাদ্যে আমিষের পরিমাণ ডিম দেয়া হাঁসের ক্ষেত্রে ১৭-১৮ শতাংশ ও বাচ্চা হাঁসের ক্ষেত্রে ২১ শতাংশ রাখা উচিত।
সম্ভাব্য আয়-ব্যয় ঃ- ৪০-৫০ শতাংশের একটি পুকুরে ১০০টি হাঁসের জন্য এ প্রকল্প শুরু করলে সব মিলে খরচ দাঁড়াবে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। সঠিক পরিচর্যা আর যতœ নিতে পারলে প্রথম বছরে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে ৬০-৯০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব হতে পারে। রোগমুক্ত, উন্নত জাতের হাঁস আধুনিক পদ্ধতি ও সঠিক নিয়ম অনুযায়ী চাষ করুন। যে কোনো পরামর্শের জন্য আপনার উপজেলা বা জেলা মৎস্য ও পশুসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

কুমারখালীতে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, খামারি, ডিলার ও ভোক্তা কমিটির সদস্যদের নিয়ে আলোচনা সভা

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায়, নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা, খামারি, ডিলার (পোল্ট্রি ফিড বিক্রেতা) ও ভোক্তা কমিটির সদস্যদের অংশগ্রহণে মাসিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ৩ টায় উপজেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তরের সভাকক্ষে এই মাসিক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রোকাশ প্রোগ্রামের কারিগরী সহায়তায় ও ইউকে এইড এর আর্থিক সহায়তায় বীজবিস্তার ফাউন্ডেশন এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা: নূর আলম সিদ্দিকী। আলোচনা সভার শুরুতেই প্রকল্প সম্পর্কে ধারণা ও মাসিক আলোচনা সভার উদ্দেশ্য তুলে ধরেন এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশনের ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর ডলি ভদ্র। আলোচনা সভায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায় খামার রেজিষ্ট্রেশন, খামার পরিচালনা ও মুরগি পরিচর্যার কৌশল পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার, নিরাপদ পোল্ট্রি ফিড সরবরাহ ও নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। এ সময় ভোক্তা কমিটির সদস্যরা নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে প্রাণি সম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তাদের খামার মনিটরিং কার্যক্রম ও প্রতিটি পোল্ট্রি খামার রেজিষ্ট্রেশনের আওতায় নিয়ে আসার আহবান জানান। সভায় প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা: নুর আলম সিদ্দিকী খামারি ও ডিলারদের উদ্দেশ্যে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চয়তায় নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে নিরাপদ পোল্ট্রি ফিড ও মুরগি বাজারজাত করণের নির্দিষ্ট সময়ের আগে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকবে হবে। এ ছাড়াও জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় জনবহুল এলাকায় খামার স্থাপন না করার আহবান জানান তিনি। উল্লেখ্য, দেশের বেকার যুবক-যুব মহিলারা মুরগী খামার স্থাপনে আগ্রহী হওয়ার কারণে দিনে দিনে পোল্ট্রি শিল্প ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। দেশের প্রাণীজ প্রোটিনের চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ পোল্ট্রি সেক্টর পূরণ করে যাচ্ছে। তুলনামূলক দামে সস্তা হওয়ায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রোটিনের মূল উৎস হচ্ছে পোল্ট্রি মুরগী। কিন্তু সচেতন নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্যের বিবেচনায় পোল্ট্রি সেক্টর নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নিন্মমানের পোল্ট্রি ফিড, পোল্ট্রি ফিডে মাত্রারিক্তি ও অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার পোল্ট্রি খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলছে। এ জন্য নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনের লক্ষ্যে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় রেখে ভোক্তা সাধারন, সিভিল সোসাইটি, মুরগী খামারি, পোল্ট্রি ফিড বিক্রেতা, ডিলার ও বেসরকারি সংগঠনসমূহের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থেকে পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিধিসম্মতভাবে পরিচালনার গতিপথ প্রদর্শনের সহায়তার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

তিতির পালনে বেশি লাভ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে তিতির পাখি চায়না মুরগি নামে পরিচিত। আফ্রিকান এই পাখিটি ইংরেজদের হাত ধরে ইউরোপ থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশের সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আসে। বর্তমানে আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে আশঙ্কাহীন বলে ঘোষণা করলেও বাংলাদেশে এরা প্রায় বিপন্ন বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।তিতির অত্যধিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন পাখি। এ ছাড়া এর বাজার মূল্য দেশি হাঁস-মুরগির চেয়ে অনেক বেশি। তাই এটি লালন-পালন করা অন্যান্য দেশি মুরগির চেয়ে লাভজনক। তিতির পাখি পালন দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তেমনি বিপন্নপ্রায় এই প্রজাতিটির সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষক ও পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, গত ৩ দশক আগেও এই তিতির পাখি দেশের গ্রামাঞ্চলে দেশি মুরগির সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা যেত। কিন্ত হঠাৎ করেই এই পাখি আর দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে এই পাখি গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে না থেকে ঢাকার কাটাবনে খাঁচায় দেখা যাচ্ছে। আর সেই খাঁচার প্রতিটি তিতির পাখি ১ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু একটি গৃহপালিত পাখি কেন খাঁচায় বন্দি থাকবে। পাখিটি যেন আবার কাটাবনের সেই খাঁচা থেকে আবার কৃষকের ঘরে ঘরে পালিত হতে পারে সেই জন্য তিনি নতুন করে ২০১০ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি খামারে তিতির পাখি পালন, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের উদ্যোগে বিপন্নপ্রায় এই তিতির পাখি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস। টানা ছয় বছর ধরে অধ্যাপক ড. সুবাস ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদন ও তা পালনের সব ধাপ এই গবেষণা খামারে সম্পন্ন করেছেন। দেশের সর্বত্র এই পাখি ছড়িয়ে দিতে বিনামূল্যে অনেককেই তিনি এই পাখি বিতরণ করেছেন। এখন উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিতির পালনকে নতুন করে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ শুরু করেছেন তিনি। ইতোমধ্যে তিতির পালনের জন্য খামারিরা উৎসাহিত হচ্ছেন। তিতির পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশি মুরগির মতোই এদের লালন-পালন করা যায়। তিতির পাখির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্যান্য পাখির তুলনায় বেশি। সংক্রমণ বা পরজীবী সহজে আক্রান্ত করতে পারে না। আলাদা কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ দেয়ারও প্রয়োজন হয় না। এমনকি এদের সম্পূরক খাদ্যের চাহিদাও কম। প্রতিকূল পরিবেশ এরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। তিতিরের মাংস উৎপাদন সম্পর্কে অধ্যাপক সুবাস বলেন, দেশি মুরগি যেখানে ছয় মাসে সর্বোচ্চ এক কেজি ওজনের হয় সেখানে তিতির পাখি দেড় কেজি বা তার বেশিও হয়ে থাকে। আবার একটি দেশি মুরগি বছরে ৫০-৬০টা ডিম দেয় যেখানে একটি তিতির পাখি বছরে প্রায় ১০০-১২০টি ডিম দেয়। বাণিজ্যিক পোল্ট্রির দাপটে বিলুপ্তির মুখে পড়েছে তিতির পাখি পালন। কিন্তু ডিম আর মাংসের উৎপাদনে পোল্ট্রির চেয়েও তিতির পাখি পালনে দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দাস।

অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত

কৃষি প্রতিবেদক ॥ অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বে অর্কিডের রয়েছে বহুবিধ চাহিদা যেমন : খাদ্য, খাদ্য সহায়ক, ওষুধ, ঔষধি উপাদান, পানীয় উপাদান, পানীয় সহায়ক, আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট, অভ্যন্তরীণ সজ্জায়নসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে অর্কিডের রয়েছে আভিজাত্যিক ব্যবহার। আফ্রিকানরা প্রায় ৭৭ প্রজাতির অর্কিড খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন শত বর্ণে ও বৈচিত্রে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক আর্কষণীয় ফুলের নাম অর্কিড। এরা অর্কিডেসি পরিবারের উদ্ভিদ। এক বীজপত্রী উদ্ভিদের অন্তর্ভুক্ত এ উদ্ভিদের ৮০০ গণ এবং ৩৫ হাজারেরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। প্রজাতিভেদে এদের ফুলের গঠন, আকার, আকৃতি এবং বর্ণে অনন্য বৈচিত্র ও বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। অর্কিডেসি পরিবার উদ্ভিদ জগতের তিনটি বড় পরিবারের একটি। অনেকের মতে এ পরিবারে সর্বাধিক বেশিসংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতি বিদ্যমান। প্রাচীন চীনা গ্রন্থে তিন হাজার বছর আগে প্রথম অর্কিড উদ্ভিদকে ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জনক ‘থিওফ্রাস্টাস (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭১-২৮৭) এ উদ্ভিদের নামকরণ করেন অর্কিড। অর্কিড শব্দটি গ্রিক শব্দ অর্কিস থেকে নেয়া। তৎকালীন সমাজে অর্কিডের মূলাংশের টিউবার নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, পুরুষের অন্ডকোষ সদৃশ্য হওয়ায় এগুলো পুরুষত্ব বর্ধক জাতীয় কিছু। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, টিউবারে উদ্দীপক জাতীয় কিছু উপাদান রয়েছে।
হিসেবে ওই সমাজে এ উদ্ভিদের চাহিদা ছিল খুব বেশি। আবার অনেকে বিশ্বাস করত, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ‘ভেনাস’ অর্কিডের ওই বিশেষ গঠনের প্রতি খুবই আসক্ত। এগুলো দেবীকে কামোদ্দীপ্ত করে। তাই যারা ওই টিউবারকে ভালোবেসে ভক্ষণ করেন, দেবী তুষ্ট হয়ে তাদের পুত্রসন্তান দিয়ে থাকেন। তাই পুত্রসন্তান লাভের বাসনায় অর্কিডের টিউবার খেতেন অনেকেই। অধিকাংশ অর্কিড বহুবর্ষজীবী হার্বজাতীয় উদ্ভিদ। অঙ্গজ গঠনে ব্যাপক বিভিন্নতা থাকলেও ফুলের গঠনের সামঞ্জস্যতা এসব উদ্ভিদকে একই পরিবারভুক্ত করেছে। অর্কিডের কিছু বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য রয়েছ যেমন: এরা টেরিস্ট্রিয়াল, ইপিফাইট, স্যাপ্রোফাইট বা কাইমবার হয়ে থাকে। এদের মূল ফেসি বা রাইজোমেটাস। মূলে ভ্যালামেন টিস্যু থাকে। এ টিস্যুর সাহায্যে বাতাস থেকে এ উদ্ভিদ পানি শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফুল এর উপরাংশ নিচের দিকে হয়ে থাকে। ফুলে তিনটি সেপাল এবং তিনটি পেটাল থাকে। অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বে অর্কিডের রয়েছে বহুবিদ চাহিদা যেমন : খাদ্য, খাদ্য সহায়ক, ওষুধ, ঔষধি উপাদান, পানীয় উপাদান, পানীয় সহায়ক, আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট, অভ্যন্তরীণ সজ্জায়নসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে অর্কিডের রয়েছে আভিজাত্যিক ব্যবহার। এ লেখায় খাদ্য হিসেবে অর্কিডের অবস্থান তুলে ধরাই হবে মূল প্রতিপাদ্য। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক স্থানেই দেখা যায়, তারা অর্কিডের ওপর কোনো গ্রন্থ লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেন যে, অর্কিড সর্ববৃহৎ উদ্ভিদ পরিবার, আর তন্মধ্যে শুধু ভ্যানিলা এবং অর্কিড খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ উক্তিকে অনেকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিলেও একথা আজ চিরন্তন সত্য যে, প্রতি একক আয়তনে উৎপন্ন লাভজনক উদ্ভিদের মধ্যে অর্কিডই প্রথম স্থানের অধিকারী। ইউরোপিয়ান ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আফ্রিকানরা শত শত বছর আগে থেকেই অর্কিডকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি জীববিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, আফ্রিকানরা প্রায় ৭৭ প্রজাতির অর্কিড খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘চিকানদা’ বা ‘কানাকা’ নামের ডিশে জাম্বিয়ার লোকজন স্থলজ অ্ির্কডের টিউবার ব্যবহার করেন। ভ্যানিলা বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত অর্কিড। কারণ এর ফ্লেভার বা সুঘ্রাণ খাদ্যের ও পানীয়ের মান বহুগুণে বৃদ্ধি করে। কিউবায় ভ্যানিলার সুঘ্রাণ তামাক জাত খাদ্যোপাদানকে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, ১৬ থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বছর কামোদ্দীপক থেরাপিতে অর্কিড ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া অনেক অর্কিড মাথাব্যথা দূরীকরণে, বিষাক্ত পোকার দংশন উপশমে এবং পেটের পীড়ার ওষুধ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে বহুকাল থেকে। সম্প্রতি কিছু গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভ্যানিলার ফ্লেভার কেমোথেরাপি দেয়া রোগীদের খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি করে এবং অবসাদ দূর করে বমি বমি ভাব থেকে মুক্ত করে। ডেনড্রোবিয়াম গণভুক্ত অর্কিড ‘ফুড-অর্কিড’ হিসেবে খ্যাত। আমেরিকায় হাইব্রিড ডেনড্রোবিয়াম অর্কিডের ফুল খাদ্য ডেকোরেশন করতে ব্যবহৃত হয়। এশিয়ার অনেক দেশে হালকা পানীয় ক্যানে এ ফুল চিত্রাকর্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাপান এবং সিঙ্গাপুরে সস তৈরিতে ডেনড্রোবিয়াম ব্যবহার করা হয়। আয়ারল্যান্ডে এ জাতের ফুল বাটারের সঙ্গে ফ্রাই করে সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। ইউরোপে ডেজার্ট এবং কেকে এ ফুল ব্যবহার করা হয়। কেকে অর্কিড বহুকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্কিডকে অস্ট্রেলিয়ার অনেক উপজাতি আপদকালীন খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। নেপালে কিছু প্রজাতির অর্কিড ফুলগুলো শুকায়ে চায়ের সঙ্গে খাওয়া হয় সুস্বাস্থ্যের আশায়। নেপালের তামিল অধ্যুষিত এলাকায় অর্কিডের ফুল দিয়ে উপাদেয় আচার বানানো হয়। গ্রামাঞ্চলে অনেক অর্কিডের সিউডোবাল্ব এবং টিউবার তৃষ্ণা নিরাময়কারী হিসেবে খাওয়া হয়। পানীয় জগতে অর্কিডের ব্যবহার ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে টার্কিতে স্থলজ অর্কিডের টিউবার থেকে ‘সাহলেপ’ নামক আইসক্রিম ও পানীয় প্রস্তুত করা হয়। আরবি সাহলেপ শব্দটি ইংরেজিতে ‘সালেপ’ শব্দে প্রচলিত হয়েছে। ‘সালেপ’ স্টার্চ সমৃদ্ধ মিষ্টি উপাদান। এটি রুটিতে মিশিয়ে খাওয়া যায়, আবার পানীয়তে মিশিয়েও খাওয়া যায়। ঐতিহ্যগতভাবে এটি পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং টুরিস্টরা দুপুরের খাবারের বিকল্প হিসেবে ‘সালেপ’ গ্রহণ করতেন। ১৫৬৮ সালে ‘উইলিয়াম টারনার’ নামে বিখ্যাত একজন হার্বালিস্ট অর্কিডের চারটি ঔষধি গুণাগুণ প্রচার করেন। এগুলো হলোথ এন্টি-পাইরেটিক, এন্টি-কনজামশন, এন্টি-ডায়ারিয়া এবং এন্টি-এলকোহলিক গ্যাস্ট্রাইটিস। ১৬৪০ সালে বিখ্যাত চিকিৎসক জন পার্কিনসন বলেছেন, অর্কিডজাত খাদ্য মানব দেহে পুনরুৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। উনিশ শতকে পশ্চিমা দেশগুলোয় এক ধরনের চা খুবই জনপ্রিয় ছিল। ওই চা এক প্রকার অর্কিড মিশিয়ে তৈরি করা হতো। মনে করা হতো, এই চা এক ধরনের ‘সিডেটিভ’ গুণসম্পন্ন এবং এতে ‘জুমেলিয়া’ নামক সুগন্ধী পাওয়া যেত। আফ্রিকান অঞ্চলের তাঞ্জানিয়া, জাম্বিয়া এবং মলাবিতে সুদীর্ঘকাল থেকেই অর্কিডের টিউবার খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে অর্কিড টিউবার বাণিজ্যিকভাবেও ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। টিউবার দিয়ে তৈরি খাদ্যকে তারা মাংসের স্থলাভিষিক্ত মনে করতেন। এ ব্যবসা ব্যাপক হওয়ায় এ অঞ্চলে অর্কিড নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়। অর্কিড প্রেমিকদের এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অর্কিড উৎপাদনকারীদের মতে অর্কিড উপাদেয় ফাইবার ও ভিটামিন যুক্ত খাবার। কেমন স্বাদ এ খাবারের? জরিপে বিভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলেছেন, কিছুটা মিষ্টি স্বাদের অর্কিড খুবই ভালো লাগে। কেউ কেউ বলেছেন, এদের স্বাদ কিছুটা ট্যানিন যুক্ত খাবারের মতো আবার কেউ কেউ বলেন, খাদ্য হিসেবে এটি তাদের পছন্দের সর্বশেষ তালিকায়। সাম্প্রতিককালেও হাওয়াই দীপপুঞ্জে অর্কিড বিভিন্নভাবে খাদ্য হিসেবে প্রচলিত আছে বিশেষ করে খাদ্যভান্ডার ডেকোরেশনে এবং খাবার প্লেট ডেকোরেশনে হোটেলে ও রেস্তোরাঁগুলোয় অর্কিডের কদর অনেক। তারা সালাদ হিসেবে খাদ্যের ডিশে অর্কিড ব্যবহার করছেন। সুগার কোটেড করে অর্কিড দিয়ে বিভিন্ন স্বাদের মূল্যবান ক্যান্ডি তৈরি করছেন। কোনো অর্কিডই বিষাক্ত নয় বিধায় খাদ্য পরিবেশনায়- রকমারিকরণে, সহায়ক স্বাদের সংযোজনে এবং খাদ্য পরিবেশনা ডেকোরেশনে অর্কিড দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। লেখক : ড. মো. ওবায়েদুল ইসলাম, অধ্যাপক, ফসল উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

আধুনিক পদ্ধতিতে পান চাষে আয় চারগুন পর্যন্ত বাড়তে পারে

কৃষি প্রতিবেদক ॥ এককালে বরিশাল অঞ্চলে প্রধানত ধানের আবাদ হতো। কালের পরিক্রমায় এখন বরিশালেও পৌছে গেছে পান চাষ। পান এখন সারা দেশেই হয়। জাত ভেদে খাসিয়া, রাজশাই, মহেশখালীর পানের সুনাম রয়েছে। এছাড়া প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলে আবাদ হচ্ছে ভারতীয় বাংলা পান প্রজাতির ভবানী ও ভাবনা। বেনারসী, রাজনগর, গাছপান ইত্যাদি জাতেরও চাষাবাদ চালু আছে।
বর্তমানে কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট উদ্ভাবিত বরিশাল-১, বরিশাল-২ ও বরিশাল-৩ জাতের পানের ফলন ও গুণমান ভালো। তবে বিগত কয়েকবছর থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পান চাষ পড়েছে ঝুঁকির মধ্যে। বিশেষ করে পান গাছের গোড়া পঁচা ও পাতার দাগ রোগ, পাতায় মাছি পোকার আক্রমণ তো রয়েছেই এর ওপর পুষ্টি ঘাটতি, সেচ ব্যয়, ও কিটনাশক প্রয়োগের কারণে রপ্তানি সমস্যা পান চাষকে অবক্ষয়ের মধ্যে ফেলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য উপযুক্ত সরকারি পদক্ষেপ না নিলে পানেও ধান-পাটের অবস্থা সৃষ্টি হবে। দানা খাদ্য ও অর্থকরি ফসলের চাষ এখন তথ্য সন্ত্রাসের কবলে পড়েছে। এসব ফসল চাষে কৃষকের অব্যাহত উৎসাহ-হীনতার ব্যাপারে যথার্থ ব্যাবস্থা নেয়া হচ্ছে না। পানের ব্যাপারেও উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিয়ে উৎপাদন বাড়ানোর নামে, তথ্য-রহস্য সৃষ্টি করলে পানের উৎপাদন আসলেই কমে যাবে। এভাবেই কমে গেছে। বর্তমানে ঢাকায় পানের মূল্য ২-৩ টাকা থেকে ৫-১০ টাকা কোন কোন ক্ষেত্রে ৫০ টাকা পর্যন্ত, কিন্তু কৃষক বিক্রি করে আট আনারও কম দামে। ভারত পান উৎপাদনে ধাপে ধাপে আধূনিকায়ন করে অনেক দুর এগিয়ে গেছে। তারা পান রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্রে। ৫টি পানের একটি প্যাকেটের মুল্য প্রায় ২ ডলার বা ১৭০ টাকা। আমরাও এখানে সেসব আধুনিক প্রযুক্তি অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে পারি। যা অর্থকরি কৃষি উৎপাদন হিসেবে গণ্য হতে পারে কৃষকের কাছে। আধুনিক পদ্ধতিতে পান চাষের একটি অন্যতম প্রযুক্তি হল শেডনেট পদ্ধতিতে পান চাষ। এতে পান চাষের আয় চারগুন পর্যন্ত বাড়তে পারে। ভারতীয় কেন্দ্রিয় সরকারের জাতীয় উদ্যান ‘পান মিশন প্রকল্প’ সেচ্ছাসেবি জাতীয় সংগঠনের তত্বাবধানে শেডনেট পদ্ধতির চাষে সারাবছর শতকরা ৫০ ভাগ ভর্তুকি দেয়। একটি শেডনেট স্থাপনে স্ক্রিংকলার সেচ ব্যবস্থাসহ প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। ১ হাজার বর্গমিটার বা ১৫ কাঠা জায়গার জন্য। এতে স্থাপনার জীবনকাল হিসাব করে বার্ষিক অপচয় আসে ৭৫ হাজার টাকা মত। আর পান চাষে খরচ হয় প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। ১৫ কাঠা জমিতে চারা রোপন করা যায় প্রায় ৮ হাজার। প্রতি গাছ থেকে পাতা তোলা যায় ১১৫টি পর্যন্ত। এভাবে সাড়ে আট লক্ষ পর্যন্ত পাতা বিক্রি করা যায় অন্তত সাড়ে তিন লক্ষ টাকায়। তাতে লাভ আসে বার্ষিক প্রায় ২ লক্ষ টাকা। অথচ প্রথাগত বর্তমান পদ্ধতিতে একই পরিমাণ জমিতে নীট লাভ আসে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা। এই আধুনিক পদ্ধতিটি নিয়ে কয়েকটি জায়গায় প্রর্দশনী করে তার ফলাফল অনুসারে পান চাষীদের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায়। শেডনেট হল সিন্থেটিক হাল ও খুঁটি, যা ঝড় ঝঞ্ঝায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়না। শেডনেটের সাথে সেচের যে স্ক্রিংকলার থাকে তার সাহায্যে সেচ দিয়ে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ৬৫ ভাগ পর্যন্ত পানি সাশ্রয় হয়। এই পদ্ধতিতে পানের পরির্চযা কাজে প্রতি বিঘায় ২-৩ জন লোকের (মহিলাসহ) লাভজনক কর্মসংস্থান হয়। শেডে সার্বক্ষণিক জাল থাকার কারণে পোকার আক্রমণ বিশেষ করে পাতা মাছির আক্রমণ নিয়ন্ত্রিত হয়। শেডনেটের নিচে কাঠামোর ভিতরে বীজতলা সহজেই শোধন করা যায় বলে গোড়াপচা ও পাতার দাগ রোগ কম হয়। এর মধ্য দিয়ে কিটনাশকের ব্যবহার অনেকটা কমে যায়। আর সেরা অনুশীলন হিসেবে নিম খৈল ও নিম তেল এবং বিশেষ প্রয়োজনে ঘেটু পাতার নির্যাস ও স্কিনোসাড জাতীয় দ্রব্য ব্যবহার করলে তা অর্গানিক পর্যায়ে পড়ে বলে সে পান রপ্তানির উপযোগী হয়। পান চাষে আধুনিক শেডনেট পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য সর্বনিম্ন ইউনিট হতে পারে ৮০০ বর্গমিটার। এতে প্রতি বর্গমিটারে এক হাজার টাকা ব্যয় আসলে প্রতিবেশি দেশ ভারত সরকারিভাবে আমাদের টাকায় ৫০০ টাকা ভর্তুকি দেয়। বিনিময়ে দেশ পায় অতিরিক্তি হাজার টাকার অধিক উৎপাদন। এছাড়া পরিবেশ রক্ষা ও কর্মসংস্থানও রয়েছে। তাই মনে হয় আমাদের বর্তমান অবস্থায় আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করে পান চাষ করার সময় এসেছে। নয়ত পান চাষীরা পান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এসব জমি চলে যেতে পারে তামাক চাষ বা ইট ভাটায়। তাই চাষ কৌশলে আধুনিক চিন্তার কোন বিকল্প নেই। এদেশের একটি বেসরকারি সেচ্ছাসেবি সংস্থাই পান চাষে কৃষক বান্ধব প্রকল্পের সূচনা করতে পারে। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রযুক্তি সহায়তা দেশেই পাওয়া যেতে পারে।

বেগুন দেশের দ্বিতীয় প্রধান সবজি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বেগুন সাধারনত শীতকালের সব্জী । তবে সারা বছর ধরেই এর চাষ করা যায়। শীর্ষ স্থানীয় সব্জী সমুহের মধ্যে বেগুন অন্যতম। বাংলাদেশের ব্যাপক জনসাধারণ বেগুন খেতে পছন্দ করে । সব্জী উৎপাদনের দিক দিয়েও বেগুন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান সবজি। বাজারে বেগুন দুই রঙের দেখা যায়। সাদা এবং বেগুনী । তবে বেগুনী রঙের বেগুন খেতে বেশি সুস্বাদু । ছাদে সহজেই বেগুন চাষ করা যায়। তবে যেহেতু বেগুনে রোগবালাই এবং পোকার আক্রমন বেশী তাই বেগুন চাষে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় ।
চাষ পদ্ধতি ঃ এটেঁল দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি বেগুন চাষের জন্য বেশী উপযোগী। এই মাটিতে বেগুনের ফলন বেশী হয়। বেগুন চাষের জন্য প্রথমে বীজতলায় চারা করে পরে তা টব বা ড্রামে রোপণ করতে হবে । ছাদে অল্প সংখ্যক চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা হিসেবে কাঠের বাক্স, প্লাস্টিকের ট্রে, গামলা অথবা হাফ ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে । বীজতলার পানি যাতে দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। জৈবসার মিশ্রিত বেলে দোআঁশ মাটি দিয়ে বীজতলার পাত্রটি ভরতে হবে। অতঃপর উক্ত পাত্রে বেগুনের বীজ বোনা যেতে পারে। বেগুনের বাগান সাধারণত বিভিন্ন ধরণের রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এসব রোগের অধিকাংশই বীজ বাহিত। তাই বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করে নেয়া দরকার। বীজতলায় বীজ বপনের পূর্বে ভাল কোন ছত্রাকনাশক এমনভাবে মিশাতে হবে যাতে সব বেগুনের বীজে ভালভাবে লাগে। অতঃপর শোধনকৃত বীজ ৫/৬ ঘন্টা ছায়াতে শুকিয়ে বীজতলায় বপন করতে হবে। বীজ বোনার পর মাটি হাত দিয়ে সমান করে দিতে হবে এবং চেপে দিতে হবে। বীজ বপনের একমাস পর বেগুনের চারা ছাদে লাগানোর উপযোগী হয়। চারা বীজতলা থেকে উঠানোর কয়েকঘন্টা আগে বীজতলায় পানে দেয়া প্রয়োজন। যাতে সহজে চারা উঠানো যায়। চারা উঠানোর সময় লক্ষ্য রাখতে হবে চারার শিকড় যাতে বেশী কাটা না পড়ে এবং শিকড়ের সাথে কিছুটা মাটি থাকে। তবে বীজতলার চারা উঠানোর ১৫-২০ দিন পূর্বেই চারা গাছ লাগানোর প্রস্তুতমূলক কাজটি সেরে নিতে হবে । ছাদে বেগুনের চারা লাগানোর জন্য ১০-১২ ইঞ্চি মাটির টব সংগ্রহ করতে হবে। টবের তলার ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। এবার ২ ভাগ এঁটেল দোআঁশ বা পলি দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ২০-৩০ গ্রাম টি,এস,পি সার, ২০-৩০ গ্রাম পটাশ সার, একত্রে মিশিয়ে ড্রাম বা টব ভরে পানিতে ভিজিয়ে রেখে দিতে হবে ১০-১২ দিন । অতঃপর মাটি কিছুটা খুচিয়ে দিয়ে আবার ৪-৫ দিন এভাবেই রেখে দিতে হবে। যখন মাটি ঝুরঝুরে হবে তখন বেগুনের চারা উক্ত টবে রোপন করতে হবে। বিকাল অথবা রাতে চারা লাগাতে পারলে ভাল হয় । চারা গাছটিকে সোজা করে লাগাতে হবে। সেই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উচু করে দিতে হবে এবং মাটি হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে। যাতে গাছের গোড়া দিয়ে বেশী পানি না ঢুকতে পারে। একটি সোজা কাঠি দিয়ে গাছটিকে বেধে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর প্রথমদিকে পানি কম দিতে হবে। আস্তে আস্তে পানি বাড়াতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি জমে না ।
অন্যান্য পরিচর্যা ঃ টবের মাটি কয়েকদিন পর পর হালকা নিড়ানি দিয়ে আলগা করে দিতে হবে । যাতে বেগুন গাছে আগাছা জন্মাতে না পারে। সেই সাথে মাটি কিছুটা আলগা করে দিলে গাছের শিকড়ের ভাল বৃদ্ধি হয়। বেগুনের ফল ধরা শুরু করলে সরিষার খৈল পচা পানি পাতলা করে গাছে ১৫-২০ দিন অন্তর অন্তর নিয়মিত দিতে হবে ।
রোগবালাই ঃ বেগুনের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হল ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা । এছাড়াও বেগুনে জাব পোকা, বিছা পোকা, পাটা মোড়ানো পোকা ও লাল মাকড় আক্রমণ করে থাকে। রোগবালাইয়ের মধ্যে ঢলে পড়া আর গোড়া পচা অন্যতম। এছাড়াও ফল পচা রোগে বেগুনের অনেক ক্ষতি করে। বেগুনের রোগবালাই এবং পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে মাঝে মাঝে বেগুন গাছে ভাল কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক একত্রে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে ।

লাভজনক কৃষিপণ্য তরমুজ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ তরমুজ গ্রীষ্মকালীন একটি জনপ্রিয় ফল। গরমে তরমুজ দেহ ও মনে শুধু প্রশান্তিই আনে না এর পুষ্টি ও ভেষজগুণ রয়েছে অনেক। প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান রয়েছে তরমুজে। রাতকানা, কোষ্ঠ-কাঠিন্য, অন্ত্রীয় ক্ষত, রক্তচাপ, কিডনিসহ নানা ধরনের অসুখ প্রতিরোধ করে। গরমের দিনে ঘামের সাথে প্রচুর লবণ ও জল বেরিয়ে যায়। তরমুজে প্রায় ৯৬ ভাগই জল এবং প্রচুর খনিজ লবণ থাকায় দেহে লবণ ও জলের ঘাটতি পূরণ করে। আসুন, আমরা জেনে নেই কীভাবে এই উপকারী ফলটি চাষ করতে হয়।
মাঘ-ফাল্গুন হচ্ছে তরমুজ চাষের সময়। তবে হাইব্রিড জাতের বীজ গোটা ফাল্গুন মাস ধরে লাগানো যায়। আমাদের দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় জাত হল সুগার বেবি। ওপেন পলিনেটেড গোলাকার সমান আকৃতির ঘন সবুজ আবরণের ঘন লাল অভ্যন্তর জাতটি বেশি চাষ হয়। চাষের পর তরমুজ সাধারণত আড়াই মাসের মাথায় ফলন দিয়ে থাকে। অন্যান্য যে জাতগুলো আছে তা হল আসাহি ইয়ামাতো, আধারি, পুষা বেদানা ইত্যাদি। হাইব্রিড জাতের মধ্যে সুগার এম্পায়ার, অমৃত, মিলন মধু, সুগার বেলে, ক্রিমসন সুইট, ক্রিমসন গ্লোরি, মোহিনী, আমরুদ ইত্যাদি। তবে সাগর এলাকায় পাটনাগরা এবং মধু এফ ওয়ান হাইব্রিড জাতটির চাষ বেশি হচ্ছে। পাটনাগরা জাতটি গোলাকৃতি সবুজ আবরণীর শাঁসালো লাল রঙের অভ্যন্তর। আকারে বড়, ৬ থেকে ৭ কেজি পর্যন্ত হয়। তিন মাসে ফলন ওঠে। মধু জাতটি একটু লম্বাটে গোলাকার মাঝারি সবুজ আবরণে লম্বা দাগযুক্ত, মধ্যে গাঢ় লাল রঙের, মাঝে সরু বীজযুক্ত ফল। এই দু’টি জাতই জলদি, মাঝারি ও নাবি চাষের জন্য উপযুক্ত। উন্নতজাত কাঠাপ্রতি ১৫ গ্রাম ও হাইব্রিড জাত চাষের জন্য ৫ গ্রাম বীজ লাগবে। বিঘাপ্রতি মূল সার হিসেবে গোবর বা আবর্জনা পচা সার ৩০ ক্যুইন্টাল বা নিম খোল ২ ক্যুইন্টাল, সুজলা ২০ : ২০ : ২০ কেজি এবং মিউরেট অব পটাশ ৭ কেজি শেষ চাষের সময় জমির মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে। পরিবর্তে ইপকো এনপিবে ১০ : ২৬ : ২৬ বিঘাপ্রতি ১৫ কেজি ইউরিয়া ৫ কেজি এবং আগে বলা গোবর সার বা নিম খোল দিতে হবে। তবে হাইব্রিড জাত চাষের জন্য মাদা তৈরির সময় সুফলা (১৫ : ১৫ : ১৫) বিঘাপ্রতি ৪৫ কেজি ও মিউরেট অব পটাশ ৩ কেজি মূল সার হিসেবে প্রয়োগ করা দরকার। ওই একই পরিমাণ সার বীজ বসানোর ২৫ থেকে ৩০ দিন পরে প্রয়োগ করতে হবে।
তরমুজ চাষে ভাল ফলন পেতে হলে প্রথম থেকেই কয়েকটি বিষয়ের প্রতি নজর দেয়া দরকার। চাষের এলাকার উপযোগী এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী জাত নির্বাচন করতে হবে। শীত শীত থাকলে কম তাপমাত্রার জন্য মাদায় বীজ বুনে ফল আসা পর্যন্ত খড় চাপা দিয়ে মাচা গরম রাখতে হবে। প্রতি মাদায় ৩টি সমান চারা রেখে বাকি চারা তুলে দিতে হবে। মাদা থেকে মাদার দূরত্ব আড়াাই ফুট এবং লাইন থেকে লাইন ৫ ফুট রাখা দরকার। তবে হাইব্রিড জাতের জন্য ৬ ফুট থেকে ৩ ফুট রাখা ভাল। চারা বের হওয়ার ২৫ ও ৪৫ দিনের মাথায় ফুল/ফল বৃদ্ধিকারক ¯েপ্র করলে ভাল হয়। উন্নতজাতের বীজ কাঠাপ্রতি দেড় ক্যুইন্টাল এবং হাইব্রিড জাতের চাষে ৩ থেকে ৪ ক্যুইন্টাল ফলন হবে।
ভাল বীজের অভাব এবং নানা ধরনের পোকা-মাকড়ের আক্রমণের কারণে তরমুজ চাষ দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। পোকা-মাকড়ের আক্রমণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেক কৃষক। তরমুজ চাষে পোকা-মাকড়ের আক্রমণ হলে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সাথে পরামর্শ করে ক্ষেতে ওষুধ দিতে হবে। তরমুজ গাছ নোনাজল সহনশীল হওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজের আবাদ ব্যাপকভাবে করা যেতে পারে। বাজারে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এখনই আগাম তরমুজ উঠে গেছে। দামও খুব চড়া। আগাম তরমুজ চাষ করলে কৃষক দারুণভাবে লাভবান হতে পারেন। কিন্তু এখনই চলছে তরমুজ চাষের সঠিক সময়। মৌসুমী ফল হিসেবে তরমুজ একটি লাভজনক কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত আমাদের দেশে।

খলিশা মাছের পোনা উৎপাদনে সফলতা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ তিন বছর গবেষণার পর দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন। তারা খলিশা মাছের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছেন। ফলে মাছটি চাষাবাদের জন্য পোনাপ্রাপ্তি সহজ হবে। এতে প্রজাতিটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, ইনস্টিটিউট থেকে ইতোমধ্যে ১৮টি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে। এরমধ্যে পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা, মহাশোল অন্যতম। সম্প্রতি পাবদা, গুলশা, ট্যাংরা জাতীয় মাছের প্রাপ্যতা বাজারে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও জানান, এসব মাছের ক্রয়মূল্য সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে আছে। পর্যায়ক্রমে সব বিলুপ্তপ্রায় মাছকে খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনার জন্য ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, ইনস্টিটিউটের নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্র থেকে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ গবেষণায় গবেষক হিসেবে ছিলেন সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খোন্দকার রাশিদুল হাসান এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শওকত আহমেদ।
বিগত ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্বাদুপানি উপকেন্দ্র সৈয়দপুর প্রাকৃতিক উৎস্য থেকে খলিশা মাছ সংগ্রহ করে পুকুরে ব্র“ড প্রতিপালন, ডিম ধারণ ক্ষমতা নির্ণয়, সঠিক প্রজননকাল চিহ্নিতকরণসহ অন্যান্য গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।
গবেষণায় দেখা যায়, পুতুরে ৮-১০ সে.মি (১৫-২০ গ্রামের) খলিশা মাছ পরিপক্ক হয়ে থাকে। মাছটির বয়স, আকার ও ওজন আনুপাতে ডিম ধারণ ক্ষমতা ৫ হাজার থেকে ১৩ হাজার। এর প্রজননকাল মে থেকে সেপ্টেম্বর। সে আলোকে বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে গত ১২ জুলাই মাছটির কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবনে সাফল্য লাভ করেন।
গবেষকরা জানান, প্রজনন মৌসুমের আগেই প্রাকৃতিক উৎস্য থেকে কিশোর বয়সের মাছ সংগ্রহ করে উপকেন্দ্রের পুকুরে ব্র“ড তৈরির জন্য প্রতিপালন করা হয়। প্রজনন মৌসুমে পরিপক্ক স্ত্রী ও পুরুষ মাছ পুকুর থেকে সংগ্রহ করে হ্যাচারি ট্যাংকে ৫-৬ ঘণ্টা রাখা হয়।
পরবর্তীতে হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়। হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগের ১৩-১৫ ঘণ্টা পর মা খলিশা মাছ ডিম দেয়। এরপর ২০-২২ ঘণ্টা পর ডিম থেকে রেণু পোনা উৎপন্ন হয়। তবে মাছটিকে খাবারের মাছ ছাড়াও অ্যাকোরিয়াম মাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

গ্রীষ্মকালীন বারি মরিচ-২ এর চাষাবাদ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মরিচ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী মসলা ফসল। কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই এ ফসলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। রান্নার রং, রুচি ও স্বাদে ভিন্নতা আনার জন্য মরিচ একটি অপরিহার্য উপাদান। পুষ্টির পাশাপাশি মরিচের ভেষজ গুণ রয়েছে। কাঁচা মরিচ ভিটামিন-এ ও সি-সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা মরিচে ২-৩ গ্রাম আমিষ, ৬ গ্রাম শ্বেতসার, ০.৬ গ্রাম তেল, ৭ গ্রাম আঁশ, ১০০ থেকে ২০০০ আইইউ ভিটামিন-সি এবং ২০ থেকে ২৮ গ্রাম অন্যান্য ভিটামিন ও পানি রয়েছে। এটি ক্ষুধাবর্ধক, বায়ুনাশক ইত্যাদি গুণাবলিসম্পন্ন। বাংলাদেশে প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ৩৭ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন কাঁচা মরিচ উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কাঁচা মরিচ রপ্তানি হয়। রবিও খরিপ-১ মৌসুমে মরিচ সহজলভ্য হলেও খরিপ-২ মৌসুমে বাজারে স্বল্পতা দেখা দেয়। তাই বর্ষা ও শীত মৌসুমের আগে মরিচের উৎপাদন অব্যাহত রাখার প্রয়াসে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টায় বারি মরিচ-২ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজবোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে মুক্তায়িত করা হয়। জাতটি দেশে কাঁচা মরিচের মোট উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
জাতটির বৈশিষ্ট্য ঃ এটি একটি গ্রীষ্মকালীন মরিচের জাত। গাছ বেশ লম্বা ও ঝোপালো। গাছের পাতার রং হালকা সবুজ। প্রতি গাছে ৪৫০ থেকে ৫০০টি মরিচ ধরে। কাঁচা অবস্থায় মরিচের রং হালকা সবুজ এবং পাকা অবস্থায় লাল। এ জাতের মরিচের জীবনকাল প্রায় ২৪০ দিন। উঁচু এবং মাঝারি উঁচু জমিতে এ জাতটি চাষ করা যায়। সুনিষ্কাশিত, উর্বরতাসমৃদ্ধ বেলে দোঁআশ এবং পলি দোঁআশ মাটি এ জাতের মরিচ চাষের জন্য উত্তম।
রোপণ ঃ এপ্রিল মাসে জমিতে গ্রীষ্মকালীন জাতের মরিচের চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এ জাতের মরিচের চারা জমিতে রোপণ করা যায়। অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি যেখানে বৃষ্টির পানি দাঁড়ায় না, যথেষ্ট আলো-বাতাস পায়, পানি সেচের উৎস আছে এরূপ জমি বীজতলার জন্য নির্বাচন করতে হবে। গ্রীষ্মকালীন মরিচের জন্য মার্চ মাসে বীজতলায় বীজ বপন করতে হবে। ভালো চারার জন্য প্রথমে বীজতলার মাটিতে প্রয়োজনীয় কম্পোস্ট সার এবং কাঠের ছাই মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। বীজ বপনের ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা আগে প্রতি কেজি বীজে ২ গ্রাম হারে প্রোভেক্স বা ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে শোধন করে নিতে হবে। শোধিত বীজ বীজতলায় ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার দূরে সারি করে ১ সেন্টিমিটার গভীরে সরু দাগ টেনে ঘন করে বপন করতে হবে।
জমি ও বেড তৈরি ঃ গ্রীষ্মকালীন মরিচ চাষের জন্য ৪ থেকে ৫টি আড়াআড়িভাবে চাষ ও মই দিয়ে গভীরভাবে চাষ করে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা ও পূর্ববর্তী ফসলের আবর্জনা ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। চারা রোপণের জন্য ১.২ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট প্রয়োজন মতো লম্বা ৩০ সেন্টিমিটার উচ্চতার বেড তৈরি করতে হবে।
বীজের পরিমাণ ও রোপণ দূরত্ব ঃ বারি মরিচ-২ এর চারা তৈরি করার জন্য একরপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব দিতে হবে ৬০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব দিতে হবে ৫০ সেন্টিমিটার। এভাবে রোপণ করলে একরপ্রতি ১৩,৩৩৩টি গাছ পাওয়া যায়।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি ঃ মাটির প্রকৃতি, উর্বরতা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে সারের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। বারি মরিচ-২ এর জন্য একরপ্রতি ২ টন কম্পোস্ট, ৮৪ কেজি ইউরিয়া, ১৩২ কেজি টিএসপি, ৮০ কেজি এমওপি ৪৪ কেজি জিপসাম ৬০০ গ্রাম বোরন সারের প্রয়োজন হয়। শেষ চাষের সময় কম্পোস্ট, টিএসপি, জিপসাম, বোরন ও ১/৪ অংশ এমপি সার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর চারা রোপণের ২৫, ৫০ ও ৭০ দিন পর পর্যাক্রমে ১ম ২য় ও ৩য় কিস্তিতে প্রতিবার ৭০ কেজি ইউরিয়া ও ৫০ কেজি এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
ফসল ও বীজ সংগ্রহ ঃ চারা রোপণের ৭০ থেকে ৮০ দিন পর মরিচ উত্তোলন করা হয়। বারি মরিচ-২ এর জীবনকাল দীর্ঘ হওয়ায় প্রায় ৮ থেকে ১০ বার ফসল উত্তোলন করা যায়। উত্তম বীজের জন্য বড়, পুষ্ট ও সম্পূর্ণ পাকা মরিচ নির্বাচন করতে হবে। বর্ষাকালে মরিচ শুকানো বেশ কষ্টকর। এজন্য পাকা মরিচ দুই ফালি করে কেটে বীজ বের করে নিয়ে শুকাতে হবে।
লেখক ঃ কৃষিবিদ নিতাই চন্দ্র রায়।

ভেষজ উৎপাদনে দেশে চমৎকার সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বিদ্যমান

কৃষি প্রতিবেদক ॥ চিকিৎসার জন্য ভেষজ উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীলতা চিরায়ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ ভাগ লোক রোগের নিরাময়ক হিসেবে ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করছে। ইউনানী, আয়ুর্বেদীয়, এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজিসহ বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে থাকে। বিশ্বব্যাপী ভেষজ ওষুধের বাজার দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০৫০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেষজের বাণিজ্য হবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশও এই বাণিজ্যের অংশীদার। প্রায় শতকোটি টাকার ঔষধি কাঁচামালের স্থানীয় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বাজার বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে।
চাহিদা বাড়ছে দেশে ঃ ভেষজ উৎপাদনে চমৎকার সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিদ্যমান। দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ থাকলেও ওষুধ শিল্পে বর্তমানে ১০০ ধরনের উদ্ভিদ থেকে দেড় শতাধিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিউটি পার্লারেও প্রসাধন শিল্পে এখন প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উপাদান ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ ও উৎপাদন শুরু হয়েছে।
ভেষজের আন্তর্জাতিক বাজার ঃ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তান, কোরিয়া ভেষজ উদ্ভিদের প্রধান আমদানিকারক দেশ । বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বে শুধু ঔষধি উদ্ভিদের বাজার রয়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। অন্যদিকে ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজসামগ্রী আমদানি করে থাকে। অথচ দেশের ওষুধ শিল্পে বর্তমানে যে পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়, তার ৭০ ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। কেবল প্রয়োজন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ।
ঔষধিগ্রাম ঃ নাটোরের ‘খোলাবাড়িয়া’ একটি গ্রামের নাম। গ্রামের বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ পাগলা বাড়ির পাশে ৫টি ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করেছিলেন বছর ত্রিশেক আগে। সেই ঘৃতকুমারীরর গাছই বদলে দিয়েছে গ্রামটির নাম। খোলাবাড়িয়া এখন ঔষধি গ্রাম নামেই পরিচিত। গ্রামের প্রায় ষোলশ পরিবারের জীবিকা ঔষধি গাছের ওপর নির্ভর করছে। গ্রামে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে ঔষধি গাছের চাষাবাদ করা হচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রির দোকান। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে ‘ভেষজ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা আর উৎপাদনকারীর সমন্বয়ে জমে উঠেছে ভেষজ বিপ্লব। আফাজ পাগলের ১৭ কাঠার চাষী জমিতে ৪৫০ প্রজাতির ভেষজ নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রামে এ রকম আরও ৮টি নার্সারি আছে। বাসক, সাদা তুলসী, উলটকম্বল, চিরতা, নিম, কৃষ্ণতুলসী, রামতুলসী, ক্যাকটাস, সর্পগন্ধা, মিশ্রিদানা, হরীতকী, লজ্জাবতীসহ হরেক রকমের ঔষধি গাছ এসব নার্সারিতে পাওয়া যায়। ঔষধি গ্রামের এই ভেষজ চাষাবাদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী গ্রামগুলোতেও। এ যেন এক ভেষজ বিপ্লব কাহিনী। আফাজ পাগলার দেখানো পথেই ঘটেছে এই ভেষজ বিপ্লব।
গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম ঃ ‘ঔষধি গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম। এসব গ্রামের আদিবাসীরা ঔষধি গাছের নার্সারি করে ভাগ্যের পরিবর্তনে দিনরাত খেটে যাচ্ছেন। ‘সোসাইটি ফর বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন’ (এসবিসি) নামের সংগঠনটি ২০০৮ সাল থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ী গ্রামসহ সীমান্তবর্তী ৪ ইউনিয়ন কাংশা, নলকুড়া, ধানশাইল ও গৌরীপুরের ২৪ গ্রামে ৩৭টি কৃষকমৈত্রী সংগঠনের মাধ্যমে ঔষধি গাছ রোপণ ও পরিচর্যার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। ভেষজ উদ্ভিদের চাষকে যদি আরো জনপ্রিয় করে তোলা যায় এবং সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদ চাষের বিস্তার ঘটানো যায়, তবে কেবল আমদানী ব্যয় হ্রাসই নয়, বিদেশেও রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

কৃষিতে পানি সাশ্রয়ী চাষাবাদ প্রযুক্তি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশের উত্তরাঞ্চলসহ কোথাও কোথাও আবাদি মৌসুমে খরা সৃষ্টি হয়। সে সময়ে ফসল চাষে সেচের প্রয়োজন হয়। কৃষকরা বিভিন্ন উৎস থেকে সেচের পানি সংগ্রহ করেন। এতে ভূ-নিম্নস্থ পানির উৎসই বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফসল আবাদে যে উৎস  থেকেই পানি ব্যবহার করা হোক না কেন যদি সঠিক পরিমাণ পানি ফসলের জন্য সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা হয়, তাহলে একদিকে যেমন পানির সাশ্রয় করা সম্ভব হবে তেমনি অর্থের অপচয়ও কম হবে। এজন্য কৃষি কাজে বা ফসল চাষে প্রচলিত ও অপ্রচলিত সেচ ব্যবস্থাগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেচের পানি সাশ্রয়ে  বেশকিছু সেচ পদ্ধতি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ড্রিপ পদ্ধতি, ভূ-নিম্নস্থ সেচ নালা পদ্ধতি, ফিতা পাইপ ব্যবহার ও পাকা সেচ নালা ইত্যাদি।

ড্রিপ সেচ ঃ  ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে গাছের মূলের কাছাকাছি সরাসরি পানি পৌঁছে দেয়া হয়। এতে পানির বাষ্পায়ন কমে পানির অপচয় কম হয়। ড্রিপ পদ্ধতিতে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে যদি ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরা নির্দিষ্ট সময় পরপর সেট করে দেয়, তাহলে পানির অপচয় কম হয়। যেমন-সকালে যখন ঠান্ডা পরিবেশ থাকে তখন ফোঁটার সংখ্যা কম এবং দুপুরে রোদ থাকলে ফোঁটার সংখ্যা বাড়ানো অথবা রাতে বন্ধ করে রাখা। যদি সঠিকভাবে ড্রিপ সেচ পদ্ধতিটি স্থাপন ও পানি সেচ নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে প্রথাগত সেচ পদ্ধতির চেয়ে ৮০% পর্যন্ত পানির সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।

ভূ-নিম্নস্থ সেচ নালা ঃ  এই পদ্ধতিতে পানি সেচ দিলে ভূ-উপরিস্থ পানির বাষ্পায়ন কম হয় ও ফসলের শিকড়ের কাছাকাছি সেচের পানি পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় সেচের পানির সাশ্রয় হয়। এ ছাড়া মাটি ও পুষ্টি উপাদানের অপচয় হয় না, মূলের কাছাকাছি পুষ্টি উপাদান প্রয়োগ করা যায়, আগাছা কম জন্মায়, ফসলে রোগ কম হয়, ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায় এবং শ্রমিক ও  সেচ খরচ কম লাগে। এ পদ্ধতির অসুবিধা হলো প্রাথমিকভাবে স্থাপন খরচ বেশি লাগে, কাদায় পাইপের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা পাইপ ছিদ্র হতে পারে। এ জন্য কিছুদিন পরপর পাইপের মধ্যে পানিপ্রবাহ দিয়ে পরীক্ষা করতে হয়।

ফিতা পাইপ ঃ এটি দিয়ে সাধারণত অগভীর নলকূপের পানি সেচ কাজে ব্যবহার করা হয়। ফিতা পাইপের সুবিধা হলো, সেচ নালা না থাকলেও এটি ব্যবহার করে জমিতে সেচ দেয়া সম্ভব হয়। খরাপ্রবণ এলাকায় ফিতাপাইপ ব্যবহার করে সেচ প্রদান করলে উৎস থেকে দূরবর্তী নির্দিষ্ট স্থানে অপচয় ছাড়াই সেচের পানি পৌঁছানো যায়। পাকা সেচ নালা দিয়ে পানির অপচয় হয় না বললেই চলে। তবে পাকা সেচ নালা স্থায়ী হলেও নির্মাণ ব্যয় বেশি এবং জমিও নষ্ট হয়।

সেচের জন্য পানি সংরক্ষণ ঃ অনেক কৃষকই ফসল উৎপাদনে সেচের পানির জন্য অগভীর বা গভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। স্বল্পসংখ্যক কৃষক পুকুর বা খাল-বিলের পানি ব্যবহার করে থাকে, যা মূলত বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টির পানি। যদি এসব পুকুরও খাল-বিল সংস্কার করে দীর্ঘ সময় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার উপযোগী করে  তোলা যায়, তাহলে শুকনো মৌসুমে এই পানি সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে  সেচবাবদ খরচ কমবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ছোট ছোট নদী এবং খাল খনন করা হচ্ছে অনেক স্থানের জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য অথবা সেচের পানি সরবরাহ করার জন্য। দেশের উত্তরাঞ্চলে এসব খনন করা ছোট ছোট নদী ও খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন সহজ হলেও খরার  মৌসুমে অর্থাৎ কখনো কখনো বর্ষার শেষ ভাগে ও শীতের সময়ে এসব ছোট নদীতে ও খালে পানি না থাকায় শীতকালীন বা রবি মৌসুমের ফসল চাষে কৃষকদের সেচের পানি প্রাপ্তিতে বিশেষ সুবিধা হয় না। যদি এসব ছোট নদী ও খালে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে রবি  মৌসুমে বোরো ধান, ভুট্টা, গম, শাক-সবজি এবং ফল বাগানে প্রয়োজনীয় পানি সেচ প্রদান করা যেতে পারে।

স্মার্ট সেচ ব্যবস্থাপনা ঃ বর্তমানে স্মার্ট কথাটি খুব বেশি ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে। সেচের কাজেও ‘স্মার্ট সেচ ব্যবস্থাপনা’ প্রয়োগ করা যায়। তবে এটি এমন নয় যে, কেমন করে সেচ প্রদান করা হবে, বরং কখন, কীভাবে ও কি পরিমাণে ঠিক কোথায় কোন প্রয়োজনে সেচ প্রদান করা হবে সেটিরই ধারণা দেয়। ফসলে প্রয়োজনের চেয়ে কম বা বেশি পানি সেচ দিতে কৃষক আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে সঠিকভাবে অনুসরণ করবে, সে সঙ্গে মাটির রসের অবস্থা বা জো অবস্থা বিবেচনা করে এবং গাছের বয়স ও বৃদ্ধির ধরন অনুযায়ী বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পানির চাহিদা বুঝে সেচের পানির পরিমাণ নির্ধারণ করবে। ফল বাগানে রাতের  বেলায় যদি সেচ দেয়া যায় তাহলে পানির বাষ্পায়ন কম হবে এবং এবং পানি মাটির নিচে চুইয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি হবে। অর্থাৎ মাটির জো অবস্থা তৈরি সহজ হবে। এতে মাটিতে প্রয়োগ করা সার সহজে গাছের গ্রহণ উপযোগী অবস্থায় আসবে।

বিনা চাষে ফসল উৎপাদন ঃ বর্ষার পর যেসব এলাকায় জমির জো অবস্থা আসতে দেরি হয় অর্থাৎ জমিতে চাষ দেয়া সম্ভব হয় না, সেসব জমিতে বিনা চাষেই রসুন, আলু, ছিটিয়ে বোনা ধান সহজেই চাষ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে, ফসলের দৈহিক বৃদ্ধির জন্য প্রাথমিকভাবে  সেচের পানির খুব একটা প্রয়োজন হয় না। ফসল বেড়ে উঠলে যখন মাটির আর্দ্রতা বা মাটির রসের পরিমাণ কমতে থাকে তখন প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হয়।

আচ্ছাদন ফসল চাষ ঃ মাটিকে ক্ষয় হওয়া থেকে রক্ষার জন্য যে কোনো ধরনের গাছ বা ফসল লাগাতে হয়, তা’না হলে উন্মুক্ত মাটি বিভিন্নভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এজন্য আচ্ছাদন ফসল চাষ করলে আগাছা কম জন্মানোর পাশাপাশি মাটির উর্বরতা শক্তিও বৃদ্ধি পায়। আচ্ছাদন ফসলের শিকড় মাটির ক্ষয়রোধ করে ও মাটিকে দৃঢ়তা প্রদান করে। এ অবস্থায় মাটিতে সেচ দিলে পানি সহজেই মাটিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একটি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, খরাপ্রবণ অঞ্চলে প্রথাগতভাবে জমিতে সেচ দিলে যে পানি লাগে আচ্ছাদন ফসল চাষ করার পর সেচের পরিমাণ তার চেয়ে ১১-১৪ ভাগ পর্যন্ত কম লাগে। ফল বাগানে আচ্ছাদন ফসল চাষ করলে সহজেই সেচের পানির সাশ্রয় করা যায়।

লেখক ঃ খোন্দকার মো. মেসবাহুল ইসলাম, কৃষিবিদ ও উদ্যান বিশেষজ্ঞ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর।

আধুনিক জাতের কল্যাণে অসময়েও শিম চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ আধুনিক নিয়মে শিম চাষ শিমের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হলো ফল ছিদ্রকারী পোকা ও জাব পোকা। শিমের ফলছিদ্রকারী পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য আক্রান্ত ফল তুলে ধ্বংস করতে হবে, শিমগাছের ডগার প্যাঁচ খুলে ছাড়িয়ে দিতে হবে ও এসব করার পর প্রোক্লেম কীটনাশক প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম গুলে ক্ষেতে ¯েপ্র করতে হবে। চারা অবস্থায় পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা মহাক্ষতিকর। লাল ক্ষুদ্র মাকড়ও অনেক সময় বেশ ক্ষতি করে থাকে। ফুল ফুটলে থ্রিপস ক্ষতি করতে পারে। ফল পেকে এলে বিন পড বাগ বা শিমের গান্ধি পোকা ক্ষতি করে। শিমের সবচেয়ে মারাত্মক রোগ দুটি- মোজেইক ও অ্যানথ্রাকনোজ। আইপিএম পদ্ধতি অনুসরণ করে এসব পোকামাকড় ও রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। মৃত্যুঞ্জয় রায় শিম মানে দেশি শিম। শিম একটি প্রোটিনসমৃদ্ধ সবজি। এর সবুজ বিচিও পুষ্টিকর হিসেবে খাওয়া হয়। এটি জমি ছাড়াও রাস্তার ধারে, আইলে, ঘরের চালে, গাছেও ফলানো যায়। শিম এ দেশে একটি জনপ্রিয় শীতকালের সবজি। এখন আধুনিক জাতের কল্যাণে অসময়েও শিম চাষ করা হচ্ছে। শিম বা ফল সবজি হিসেবে রেঁধে খাওয়া হয়। সবজি হিসেবেই শিম প্রধানত চাষ করা হয়। তবে এর পাতা উত্তম পশুখাদ্য। কেউ কেউ সবুজ সার ফসল ও শোভাবর্ধক ফুলের গাছ হিসেবেও চাষ করেন। ভারতের মহারাষ্ট্রে শ্রাবণ মাসে এক বিশেষ উপবাসে শিম দিয়ে এক মসলা তরকারি রান্না করা হয় যাকে বলে ‘বালা ছে বারডে’। কর্নাটকে সালাদে শিম ব্যবহার করা হয়। তেলেঙ্গানায় পোঙ্গাল উৎসব উপলক্ষে শিমের ফলকে কুচি কুচি করে কেটে এক বিশেষ ধরনের তরকারি রান্না করা হয়। বাজরার রুটি দিয়ে সেই তরকারি খাওয়া হয়। শত বছরের এই ঐতিহ্য সেখানে চলে আসছে। পাকা শিমের বিচি ভেজে বাদামের মতো খাওয়া হয়। শিমের বিচির ডাল একটি উপাদেয় খাবার। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিমের কাঁচা বিচি আলু ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে বা শুধু বিচি দিয়ে তরকারি রেঁধে খাওয়া হয়। কেনিয়ায় প্রসূতি মায়ের বুকের দুধ বাড়ানোর জন্য শিম খাওয়ানো হয়। ফল সিদ্ধ করে ভর্তা বানিয়ে খাওয়া হয়। কেনিয়া ও এ দেশে শিমের ভর্তা একটি জনপ্রিয় খাবার। কোনো কোনো দেশে শিমের কচি পাতা পালংশাকের মতো ভেজে খাওয়া হয়।
জলবায়ু ও মাটি ঃ শিম ঠান্ডা ও শুষ্ক জলবায়ুতে ভালো হয়। এটি একটি হ্রস্ব দিবসী উদ্ভিদ। তবে গাছের দৈহিক বৃদ্ধির জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং দীর্ঘ দিবসের দরকার হয়। গাছ যখনই লাগানো হোক না কেন দিনের দৈর্ঘ্য একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত ফুল ও ফল ধরে না। অতীতে এ দেশে যেসব জাত ছিল সেসব জাতে কোনোভাবেই মধ্য অক্টোবরের আগে ফুল আসত না। এখন গ্রীষ্মকালীন জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় গ্রীষ্মকালেও (জুন-জুলাই) ফল ধরছে। এসব জাতের শিমগাছ তাপমাত্রা ও দিবস নিরপেক্ষ হওয়ায় এখন বছরের যে কোনো সময় লাগালে শিম হচ্ছে। দোঁ-আশ ও বেলে দোঁ-আশ মাটিতে শিম ভালো ফলন হয়। নদী তীরের উর্বর পলিমাটিতেও শিম ভালো হয়।
উল্লেখযোগ্য জাত ঃ দেশে ৫০টিরও বেশি স্থানীয় শিমের জাত আছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাইনতারা, হাতিকান, চ্যাপ্টা শিম, ধলা শিম, পুঁটি শিম, ঘৃত কাঞ্চন, সীতাকুন্ডু, নলডক ইত্যাদি। বারি শিম ১, বারিশিম ২, বারি শিম ৫, বারি শিম ৬, বিইউ শিম ৩, ইপসা শিম ১, ইপসা শিম ২, একস্ট্রা আর্লি, আইরেট ইত্যাদি আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত। নিচে কয়েকটি আধুনিক জাতের শিমের পরিচয় দেয়া হলো-
বারি শিম-১ মাঝারি আগাম জাত। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি শিমের ওজন ১০-১১ গ্রাম, শিমে ৪-৫ টি বীজ হয়, গাছপ্রতি ৪৫০-৫০০টি শিম ধরে। জীবনকাল ২০০-২২০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ২০-২২ টন।
বারি শিম-২ আগাম জাত। আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাসে বীজ বপন করতে হয়। প্রতিটি শিমের ওজন ১০-১৩ গ্রাম, শিমে ৪-৫টি বীজ হয়, গাছপ্রতি ৩৮০-৪০০টি শিম ধরে। জীবনকাল ১৯০-২১০ দিন। হেক্টরপ্রতি ফলন ১০-১২ টন।
বারি শিম-৫ শীতকালে হয়। গাছ খাটো, লতায় না বলে এ গাছে মাচার দরকার হয় না। বীজ বোনার ৩৫ থেকে ৪৫ দিন পর থেকেই শিম তোলা শুরু করা যায়। প্রতি গাছে ৫০ থেকে ৭০টি ফল ধরে। এ জাতের জীবনকাল ৭৫ থেকে ৮০ দিন, হেক্টরপ্রতি ফলন ১২.১৩ টন।
বারি শিম-৬ ফল কম আঁশযুক্ত, লম্বাটে, দেখতে অনেকটা নলডক শিমের মতো। গাছপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০টি শিম ধরে। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হয়। ফলন হেক্টরপ্রতি ১৭ থেকে ২০ টন। জীবনকাল ২২০ থেকে ২২৫ দিন। বিইউ শিম-৩ সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ বেগুনি। প্রতিটি শিমে গড়ে ৫টি বীজ হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ৭-৮ টন। ইপসা শিম-১ সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ বেগুনি। প্রতিটি শিমে গড়ে ৫টি বীজ হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫-১০ টন। ইপসা শিম-২ সারা বছর চাষ করা যায়। গ্রীষ্ম মৌসুমেও চাষের উপযোগী। শিমের রঙ সাদাটে সবুজ। প্রতিটি শিমে গড়ে ৪টি বীজ হয়। হেক্টর প্রতি ফলন ৭-৮ টন।
চারা তৈরি ঃ বর্ষাকালে যদি প্রচুর বৃষ্টি হয় তাহলে মাদায় বোনা বীজ পচে যেতে পারে বা মাদার মাটি ধুয়ে বীজ সরে যেতে পারে। এ জন্য ঝুঁকি না নিয়ে এ সময় অনেকে বাড়িতে নিরাপদ স্থানে পলিব্যাগে চারা তৈরি করে নিতে হবে। শ্রাবণের শেষের দিকে বা ভাদ্র মাসে ১০ থেকে ১৫ দিন বয়সী সেসব চারা মাদায় রোপণ করতে হবে।
জমি তৈরি, বীজ বপন ও চারা রোপণ ঃ বেশি জমিতে আবাদ করা হলে সে জমিতে কয়েকটি চাষ ও মই দেয়া ভালো। চাষের পর ২.৫ মিটার চওড়া করে বেড তৈরি করতে হবে। প্রতি বেডের মধ্যে ৫০ সেন্টিমিটার চওড়া ও ১৫ সেন্টিমিটার গভীর নালা রাখতে হবে। প্রতি বেডের কিনার থেকে ৫০ সেন্টিমিটার বাদ দিয়ে সারি করে মাদার জায়গা ঠিক করতে হবে। একটি বেডের উভয় পাশ থেকে এভাবে ৫০ সেন্টিমিটার বাদ দিলে একটি বেডে দুটি সারির মধ্যে দূরত্ব থাকবে ১.৫ মিটার। জোড়া সারি পদ্ধতিতে প্রতি সারিতে ১.৫ মিটার পর পর মাদা তৈরি করতে হবে। মাদার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতার আকার ৪০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে। এখন অনেকে বেড ২.৫ মিটার চওড়া না করে ১ মিটার চওড়া করে বেড তৈরি করছেন ও সে বেডের মাঝখানে একটি সারিতে ১ থেকে ১.৫ মিটার পর পর মাদা তৈরি করে বীজ বুনছেন। এতে পরিচর্যা ও ফল তুলতে সুবিধে হয়। ঈশ্বরদী বা পাবনা ও যশোরে অনেকে মাঝারি নিচু জমিতেও শিম চাষ করছেন। সে ক্ষেত্রে মাদা তৈরির আগে মাদার চিহ্নিত স্থানে মাটি তুলে ঢিবির মতো উঁচু করে কয়েকদিন রেখে দিয়ে তারপর সেই ঢিবিতে মাদা তৈরি করে বীজ বুনছেন। খুলনা ও যশোরের কোনো কোনো এলাকায় নিচু জমিতেও শিম চাষ করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরজান বা কান্দিবেড় পদ্ধতিতে ০.৫ থেকে ১ মিটার গভীর ও ১ মিটার চওড়া করে নালা বা পরিখা খুঁড়ে সেই মাটি দুপাশে উঁচু বেডের মতো তুলে দেয়া হচ্ছে। এসব বেডে শিমের মাদা করে শিম চাষ করা হচ্ছে। নালার ওপরে থাকছে মাচা ও নিচে পানিতে দ্রুত বর্ধনশীল মাছের চাষ করা হচ্ছে।
আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। প্রতি মাদায় ৩ থেকে ৪টি বীজ বুনতে হবে। মাদায় সার মেশানোর ৪ থেকে ৫ দিন পর বীজ বুনতে হবে। বীজ বপনের আগে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বীজ ভিজিয়ে নিতে হবে। বীজ গজানোর পর ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিটি মাদায় ১টি করে সুস্থ চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে। সাধারণত হেক্টরে ৭.৫ কেজি বীজ লাগে (শতকে ৩০ গ্রাম)। জুন মাসে বা আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বীজ বপন করা যেতে পারে। আগাম শিমের জন্য এ সময়টা উত্তম। গ্রীষ্মকালীন জাতের জন্য বছরের যে কোনো সময় বীজ বোনা যায়।
রোপণ দূরত্ব ঃ একটি মাদা থেকে অন্য মাদার দূরত্ব ১ থেকে ১.৫ মিটার দিলে ভালো হয়। সেচ ও পানি নিকাশ ঃ কোন অবস্থাতেই গাছের গোড়ায় পানি যাতে না জমে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে জমিতে প্রয়োজন মতো সেচ দিতে হবে। আগাছা পরিষ্কার ঃ মাঝেমধ্যে মাটি নিড়ানি দিয়ে মাদার মাটি আলগা করে দিতে হবে। মাচা বা বাউনি দেয়া ঃ শিম গাছ যখন ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হবে তখন মাদার গাছের গোড়ার পাশে বাঁশের ডগা মাটিতে পুঁতে বাউনির ব্যবস্থা করতে হবে।
শাখা ছাঁটাই ঃ পুরনো ও মরা শাখা, ডগা ছাঁটাই করে পরিষ্কার করে দিতে হবে। যেসব ডগায় ফুল ফোটে না সেসব ডগা ছেঁটে পরিষ্কার করে দিলে গাছে বেশি ফুল আসে। ডগার প্যাঁচ খোলা ঃ শিমের ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ কমাতে ও বেশি ফুল ধরাতে জড়াজড়ি করে থাকা ডগাগুলোর প্যাঁচ খুলে দিতে হবে। ফসল তোলা ও ফলন ঃ জাতভেদে বীজ বোনার ৯৫ থেকে ১৪৫ দিন পর শিম তোলা যায়। সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক মাসে ফুল ধরে। ফুল ফোটার ২০ থেকে ২৫ দিন পর ফসল সংগ্রহ করা যায়। শিমগাছ ৪ মাসেরও বেশি সময় ধরে ফল দেয়। ফলনপ্রতি শতকে ৬০ থেকে ৮০ কেজি, হেক্টরপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টন।

লটকন উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বাংলাদেশের অপ্রচলিত, আকর্ষণীয়, ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ দেশীয় টক-মিষ্টি ফল লটকন। আশার খবর হচ্ছে, নরসিংদী, ময়মনসিংহের গৌরীপুরসহ দেশের অনেক স্থানেই লটকনের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। তবে পুরো বাংলাদেশেই ফলটির বাণিজ্যিক চাষাবাদ সম্ভব। কেননা লটকন উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটি বেশ উপযোগী। বর্ষাকালীন এ ফলটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইংরেজিতে বার্মিজ গ্রেপ নামে পরিচিত হলেও আমাদের দেশে এ ফলটি বুবি, বুগি, লটকা, লটকো, নটকো ইত্যাদি নামে পরিচিত। মার্চ মাসের দিকে লটকন গাছে ফুল আসে এবং ফল পরিপক্ব হতে চার-পাঁচ মাস সময় লাগে। লোভনীয় রঙ ও আকৃতির থোকা থোকা লটকন ঢাকাসহ সারা দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। ১০-১৫ বছর আগেও লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না। দামও ছিল কম। সেজন্য কেউ লটকনের বাগান করার চিন্তা করতেন না।
বর্তমানে এ ফলের চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়েছে। এমনকি অন্যান্য ফল চাষের তুলনায় লটকন চাষ বেশ সহজ এবং ফলনও ভালো হওয়ায় চাষিরা বেশি লাভবান হচ্ছেন। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে লটকন বাজারে পাওয়া যায়। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কান্ডগুলোয় বেশি ফল আসে। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে পাঁচ থেকে ১৫ মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তাই সারা দেশেই (নিচু এলাকা বাদে) এর বাণিজ্যিক চাষ করা সম্ভব। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একটি পূর্ণ বয়স্ক লটকন গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে ১০০ কেজি পর্যন্ত লটকন সংগ্রহ করা সম্ভব। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করে নিয়েছে নরসিংদীর শিবপুরের লটকন। দেশের লটকন ইংল্যান্ড, কাতার, সৌদি আরবসহ নানা দেশে রফতানি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর লটকন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ২০-২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। এ বিষয়ে নরসিংদীর লটকন চাষীরা জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শে এবং ব্যাংকের সহায়তায় প্রতিটি জেলায় লটকনের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করা যেতে পারে।
কৃষির ওপর নির্ভরশীল এলাকা ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক পরিবারের অর্থভাগ্য খুলেছে মৌসুমি ফল লটকন বিক্রি করে। কোনো ধরনের পরিচর্যা ছাড়াই প্রকৃতিগতভাবে জন্ম নেওয়া দেশীয় লটকন ফল (বুবি) বাগানের মালিকরা কয়েক দশক ধরে প্রতি মৌসুমে শুধু লটকন ফল বিক্রি করে ঘরে তুলছেন লাখ লাখ টাকা। উপজেলায় বিচ্ছিন্নভাবে ১০টি ইউনিয়নের ৫০টি গ্রামের ৮০ হেক্টর জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে ছোট-বড় ২৫০টি লটকন ফলের বাগান রয়েছে। লটকন চাষ কয়েক দশক ধরে উপজেলায় কৃষিনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থিক চাহিদা পূরণসহ অনেকের সংসারে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা।
কৃষি অধিদফতরের বিভিন্ন সূত্র মতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশ থেকে প্রায় সাড়ে ১৬ টন লটকন বিদেশে রফতানি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে চলতি অর্থবছরেও বিপুল পরিমাণ লটকন বিদেশে যাবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে আড়াই হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার টন লটকন উৎপাদন হয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি ও বাউ লটকনের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে। বারি লটকন-১ ও বাউ লটকন-১ এখন কৃষক পর্যায়ে চাষ হচ্ছে।
লেখক ঃ এস এম মুকুল, বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক।

যেভাবে চাষ করবেন পানি কচু

কৃষি প্রতিবেদক ॥ যে সব কচু দাঁড়ানো বা স্থির পানিতে চাষ করা যায় তাকে পানি কচু বলে। পানি কচুর বিভিন্ন নাম রয়েছে। কচুতে ভিটামিন এ এবং প্রচুর পরিমাণে লৌহ রয়েছে। তাই সুস্বাদু সবজি হিসেবে চাষ করতে পারেন পানি কচু।
মাটি ঃ পলি দো-আঁশ ও এটেল মাটি পানি কচু চাষের জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এর চাষাবাদ করা যায়। বৈশিষ্ট্য ঃ কচুর লতি লম্বায় ৯০-১০০ সেন্টিমিটার। এটি সামান্য চেপ্টা ও সবুজ হয়। বোঁটা এবং পাতার সংযোগস্থলের উপরিভাগের রং বেগুনি। জীবনকাল ১৮০-২১০ দিন। চারা ঃ আগাম ফসলের জন্য কার্তিক (মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেস্বর), নাবী ফসলের জন্য মধ্য-ফাল্গুন থেকে মধ্য-বৈশাখ (মার্চ-এপ্রিল) মাসে লাগানো যায়। দক্ষিণাঞ্চলে বছরের যে কোনো সময় লাগানো যায়। প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি লতা রোপণ করা যায়। জমি ভালোভাবে তৈরি করে লাইন থেকে লাইন ২ ফুট এবং গাছ থেকে গাছ ১.৫ ফুট দূরত্ব রাখতে হবে। সার ঃ প্রতি শতকে ইউরিয়া ৬০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি ৭৫০ গ্রাম এবং গোবর ৫০ কেজি দিতে হবে। গোবর, টিএসপি এবং এমওপি সার জমি তৈরির শেষ সময়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ২-৩ কিস্তিতে দিতে হয়, তবে প্রথম কিস্তি রোপণের ২০-২৫ দিনের মধ্যে দেওয়া দরকার। সেচ ঃ পানি কচুর গোড়ায় দাঁড়ানো পানি রাখতে হবে এবং দাঁড়ানো পানি মাঝে মাঝে নাড়িয়ে দিতে হবে। লতিরাজ জাতের জন্য দাঁড়ানো পানির গভীরতা ৮-১০ সেন্টিমিটার হওয়া দরকার। রোগ ঃ পাতার উপর বেগুনি থেকে বাদামি রঙের গোলাকার দাগ পড়ে। পরবর্তীতে এ দাগ আকারে বেড়ে একত্রিত হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে তা কচু ও কন্দে ছড়িয়ে যায়। উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্র আবহাওয়া ও পরপর ৩-৪ দিন বৃষ্টি হলে এ রোগের মাত্রা খুব বেড়ে যায়। তাই রোগ দেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রিডোমিল এমজেড-৭২ ডব্লিউ অথবা ডাইথেন এম ৪৫ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ৩-৪ বার দিতে হবে। দেওয়ার আগে ট্রিকস মিশিয়ে নিতে হয়। সংগ্রহ ঃ চারা রোপণের ২ মাস পর থেকে ৭ মাস পর্যন্ত লতি হয়ে থাকে।

যেভাবে টবে চাষ করবেন মিশরীয় ডুমুর

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ডুমুর একটি অতি উপাদেয় ফল। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যে ডুমুর দেখা যায়, তা পাখিরা  খেয়ে থাকে। কোথাও কোথাও এটি তরকারি হিসেবে সীমিত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ডুমুর মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ফল। যদিও বর্তমানে এর প্রসার ঘটেছে। বিশ্বজুড়েই এখন চাষ হচ্ছে এ ফল। বিশেষ করে বাড়ির ছাদে টবে চাষ করা যায় এটি। চাষ পদ্ধতি ঃ ছাদে মিষ্টি ডুমুরের চারা লাগানোর জন্য ১২-২০ ইঞ্চি মাটির টব বা কালার ড্রাম সংগ্রহ করতে হবে। ড্রামের তলায় ৩-৫টি ছিদ্র করে নিতে হবে। যাতে গাছের গোড়ায় পানি জমে না থাকে। টব বা ড্রামের তলার ছিদ্রগুলো ইটের ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে। টব বা ড্রামের গাছটিকে ছাদের এমন জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে সব সময়  রোদ থাকে। এবার ২ ভাগ বেলে দো-আঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ২০-৪০ গ্রাম টিএসপি সার, ২০-৪০ গ্রাম পটাশ সার এবং ২০০ গ্রাম হাড়ের গুড়া একত্রে মিশিয়ে ড্রাম বা টবে পানি দিয়ে রেখে দিতে হবে ১০-১২ দিন। এরপর মাটি কিছুটা খুচিয়ে দিয়ে আবার ৪-৫ দিন একইভাবে রেখে দিতে হবে। মাটি যখন ঝুরঝুরে হবে তখন একটি সবল-সুস্থ মিশরীয় মিষ্টি ডুমুরের কাটিং চারা টব বা ড্রামে রোপণ করতে হবে। চারা গাছটিকে  সোজা করে লাগাতে হবে। সেই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উঁচু করে দিতে হবে এবং মাটি হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে। যাতে গাছের  গোড়া দিয়ে বেশি পানি না ঢুকতে পারে। একটি সোজা কাঠি দিয়ে গাছটিকে বেঁধে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর প্রথমদিকে পানি কম দিতে হবে। আস্তে আস্তে পানি বাড়াতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে- যেন গাছের  গোড়ায় পানি জমে না থাকে, আবার বেশি শুকিয়েও না যায়।

পরিচর্যা ঃ ডুমুরের কাটিং চারা লাগানোর ৪-৫ মাস পর থেকেই ফল দিতে শুরু করে। তাই গাছ লাগানোর ২-৩ মাস পর থেকেই টবের গাছকে নিয়মিত অল্প অল্প খাবার দেওয়া প্রয়োজন। সে অনুযায়ী ১০-১৫ দিন পর পর সরিষার খৈল পচা পানি প্রয়োগ করতে হবে। সরিষার খৈল গাছে  দেওয়ার কমপক্ষে ১০ দিন আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর  সেই পচা খৈলের পানি পাতলা করে গাছের গোড়ায় দিতে হবে। ১ বছর পর টবের আংশিক মাটি পরিবর্তন করে দিতে হবে। ২ ইঞ্চি প্রস্থে এবং ৬ ইঞ্চি গভীরে শিকরসহ মাটি ফেলে দিয়ে নতুন সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে তা ভরে দিতে হবে। মাটি পরিবর্তনের এই কাজটি সাধারণত বর্ষার শেষ এবং শীতের আগে করলেই ভালো হয়। ১০-১৫ দিন অন্তর অন্তর টব বা ড্রামের মাটি কিছুটা খুঁচিয়ে দিতে হবে।

ব্যবহার ঃ ডুমুর ফলের উপরের আবরণ খুব পাতলা ও নরম। খেতে খুবই সুস্বাদু ও মিষ্টি। পাকা ফল আবরণসহ সরাসরি খাওয়া যায়। তাছাড়াও পাকা ডুমুর দিয়ে জ্যাম, জ্যালি, চাটনি ইত্যাদি তৈরি করে খাওয়া যায়। পাকা ডুমুর শুকিয়ে বিভিন্ন রকমের খাবারের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কাঁচা ডুমুর তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। কার্বোহাইড্রেট, সুগার, ফ্যাট, প্রোটিন, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ছাড়াও বিভিন্ন পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ডুমুর। পুষ্টিগুণের পাশাপাশি ডুমুরের অনেক ওষুধি গুণও রয়েছে। বংশ বিস্তার ঃ ডুমুরের বংশ বিস্তারের অনেক পদ্ধতি থাকলেও সবচেয়ে সহজ ও ভালো পদ্ধতি হলো কাটিং। কাটিং পদ্ধতিতে বংশ বিস্তারে শতকরা প্রায় ৯৮% চারাই টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কাটিংয়ের এক মাসের মধ্যেই চারা মূল টবে লাগানোর উপযুক্ত হয়। টবে কাটিং লাগানোর ৪-৫ মাসের মধ্যেই ডুমুর ফল পাওয়া যায়।

আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ডেইরি ফার্ম করে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়া সম্ভব

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পড়াশোনা শেষ করে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরা গতানুগতিক চাকরি বা ব্যবসার আশায় বসে থাকে। এ সকল চাকরি বা ব্যবসার আশায় না থেকে আমরা যদি নিজেরাই আত্মকর্মসংস্থানের জন্য কিছু গঠনমূলক কাজ করি তাহলে আমাদের ভাগ্যের সঙ্গে সঙ্গে সমাজকেও আমরা কিছু উপহার দিতে পারব। এজন্য দরকার আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠা। সমাজে এমন অনেক ব্যতিক্রমী পেশা রয়েছে যেখানে একটু পরিশ্রম ও চিন্তা ভাবনা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করলে সফলতা দরজায় এসে কড়া নাড়বে।
বাংলাদেশে এখন সফল ডেইরি ফার্মের সংখ্যা অনেক। দিন দিন এর চাহিদা ও বাজার বাড়ছে। একদিকে যেমন এ থেকে আদর্শ খাবার হিসেবে দুধ, আমিষের চাহিদা মেটাতে মাংস এবং জ্বালানি হিসেবে গোবর ও জৈব সার পাওয়া যাবে, তেমনি অন্যদিকে এ খাত থেকে বেশ ভালো আয় করাও সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাকে অল্পবিস্তর জ্ঞান থাকতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিলে।
প্রাথমিক প্রয়োজন ঃ যেকোনো কিছু গড়তে সবার আগে প্রয়োজন প্রাথমিক প্রস্তুতি। এ প্রস্তুতির উপর নির্ভর করে যে কোনো কাজের সফলতার ও ব্যর্থতা। ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলতে প্রয়োজন আর্থিক সঙ্গতি, অভিজ্ঞতা ও গরুর নিরাপদ আশ্রয়। প্রথমেই বিশাল ফার্ম তৈরিতে হাত না দিয়ে ছোট পরিসরে কাজে হাত দেওয়া ভালো। ৫ থেকে ৬টি গরু নিয়ে যাত্রা করে আস্তে আস্তে ফার্মকে সম্প্রসারণ করাই উত্তম। ২টি গরুর জন্য একজন দক্ষ লোক নিয়োগ করা গেলে ভালো। তবে খেয়াল রাখতে হবে লোকটির গরুর যতœ নেয়ার পূর্বঅভিজ্ঞতা আছে কিনা।
বাছাই প্রক্রিয়া ঃ নিজ এলাকায় বিশেষ করে মফস্বলে গরুর ফার্ম গড়ে তোলাই শ্রেয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন গরুর উন্নত জাত বাছাই। উন্নত জাতের গরু বাছাই না করলে সারা বছর ফার্মে রোগবালাই লেগে থাকবে। ভালো জাতের গরুর পাশাপাশি ফার্মে পর্যাপ্ত ঘাস, খৈল বিচালির ব্যবস্থা রাখতে হবে। ফার্ম গড়ে তোলার পরপরই দুধ বিক্রির জন্য প্রচারণা চালাতে হবে।
স্থান নির্বাচন ঃ যেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো এবং দুধ বিক্রির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এসব এলাকার আশপাশেই ডেইরি ফার্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন। চারপাশে উঁচু দেওয়াল, পরিবেশসম্মত আবাসন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং গরুর বিশ্রাম ও হাঁটাচলার জন্য জায়গা থাকতে হবে। গরুর ওষুধের দোকান, কাঁচা ঘাসের খামার আশপাশে থাকলে ভালো।
খাবার সরবরাহ ঃ ডেইরি ফার্মের জন্য সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হবে গরুর খাবারের প্রতি। পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন খাবার না পেলে সঠিক পরিমাণ দুধ পাওয়া যায় না। ধানের কুঁড়া, গমের ভুসি, ছোলা, খেসারির খোসা, লবণ, খৈল, নারিকেলের ছোবড়া, ঘাস-বিচালির পর্যাপ্ত সংগ্রহ রাখতে হবে। অনেক সময় বাসি ও পচা খাবার গরুকে সরবরাহ করা হয়। যা কখনোই ঠিক নয়। এতে করে গরুর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সবসময়ই খেয়াল রাখতে হবে গরুর খাদ্য যেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও পুষ্টিমান সম্পন্ন হয়। এ জন্য পচা বা দীর্ঘদিন রাখা এসব পণ্য গরুকে খাওয়ানো উচিত নয়। গাভীর গর্ভধারণ ও গর্ভকালীন আলাদাভাবে পরিচর্যা করতে হবে। এ সময় স্থানীয় পশু চিকিৎসকের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।
আয়-ব্যয় ঃ ডেইরি ফার্ম একটি দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম। সঙ্গে সঙ্গেই লাভের আশা করা ভুল। বরং ধীরে সুস্থে এগুলেই ভালো ফল পাওয়া যাবে। গড়ে এক একটি গরু কিনতে ৩০-৫০ হাজার টাকা খরচ হবে। এছাড়া যত বেশি গরুর সংখ্যা বাড়বে খরচের খাতও তত কমবে। বর্তমানে শহরের বিভিন্ন মিষ্টির দোকান ও কনফেকশনারীর লোকজন সরাসরি ফার্মে এসে দুধ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। গড়ে এক একটি গরু থেকে মাসে ৪-৫ হাজার টাকার দুধ বিক্রি করা সম্ভব। খরচ বাদে এই লাভ একটি পরিবারের জন্য কম নয়।
পরিচর্যা ঃ উন্নত জাতের গাভী ডেইরি ফার্মের জন্য সহায়ক। এ ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ান গাভীর জাত বেছে নেওয়াা যেতে পারে। এজন্য পশু খামারি এবং পশু কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে নিলে ভালো হয়। প্রতিটি গরুর জন্য আলাদা মশারি, ফ্যান, ময়লা পরিষ্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আলোর জন্য লাইটিং এবং পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও নজর দেওয়া জরুরি।
পশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যা ” দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় পশু চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। এছড়া সরকারিভাবেও খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য ছাড়াও ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যুব উন্নয়ন, কৃষিব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকেও প্রশিক্ষিত তরুণরা বিনা জামানতে বেশ মোটা অংকের ঋণ সহায়তা পেতে পারেন। বেকার শিক্ষিত তরুণদের জন্য এটি হতে পারে একটি চমৎকার পেশা। তাই নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে সচেষ্ট হই এবং এরকম ডেইরি ফার্ম করে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হই।