॥ কুলদীপ নায়ার ॥

৭১ বছরেও বরফ গলেনি পাক-ভারত সম্পর্কের

ভারতের স্বাধীনতা লাভের তিনদিন আগের কথা। দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের ১২ আগস্ট। আমার বাবা একজন ডাক্তার। তিনি আমাদের তিনভাইকে ডেকে পাঠালেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জানতে চাইলেন আমাদের পরিকল্পনা কী? আমি বললাম, আমি পাকিস্তানেই থাকতে চাই। ভারতে মুসলমানরা যেভাবে থাকবেন আমরাও সেভাবে পাকিস্তানেই থাকব। আমার বড় ভাই সেসময় অমৃতসরে পড়ালেখা করতেন। তিনি কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, পশ্চিম পাঞ্জাবে মুসলমানরা হিন্দুদের বাড়িঘর খালি করে দিতে বলবে। একইভাবে যেসব মুসলমান পূর্ব পাঞ্জাবে বসবাস করছেন, তাদের চলে যেতে বলা হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হিন্দুরা যদি নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে দিতে না চায়, তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব? জবাবে তিনি বললেন, প্রয়োজনে আমাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হবে।

তখন কী ঘটেছিল এটাই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। আগস্টের ১৭ তারিখ। ভারতের স্বাধীনতা লাভের মাত্র দুদিন পরের ঘটনা। কয়েকজন ভদ্র মুসলমান আমাদের কাছে এলেন। তারা আমাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। আমি তাদের একজনকে বললাম, তাহলে আমরা কোথায় যাব? তিনি ভারতের জলন্ধরে অবস্থিত তার বাড়ির চাবি আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন, আপনাদের তেমন কিছুই করতে হবে না। কেননা বাড়িটি বিভিন্ন আসবাবপত্রে সুসজ্জিত এবং দখলের জন্য প্রস্তুত। আমরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম।

তারা চলে যাওয়ার পর আমাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা সবাই খাবার টেবিলে বসলাম। আমি ভাইদের বললাম, আমি কিন্তু পাকিস্তানেই ফিরে আসছি। তারা বললেন, তারা অমৃতসর যাচ্ছেন, গোলমাল থেমে গেলে আবার ফিরে আসবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা ভারতে গিয়ে খুব জোর মাসখানেক থাকব। তারপর আবার ফিরে আসব। আমার মা আমাদের ঘরে তালা দেওয়ার সময় বললেন, আমার মন বলছে আমরা আর ফিরে আসতে পারব না। আমার বড় ভাইও তার সঙ্গে একমত হলেন।

আমি নীলরঙের একটা কাপড়ের ব্যাগে একটা শার্ট ভরে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বললাম, দিল্লির দরিয়াগঞ্জে মামার বাড়িতে আমাদের দেখা হচ্ছে। আমার মা আমাকে ১২০ রুপি দিলেন যাতে দিল্লিতে সবার সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমি চলতে পারি। আমার বাবা আমার এই সফরকে সহজ করে তুললেন। তিনি একজন ব্রিগেডিয়ারকে বলে দিলেন যাতে সীমান্তের ওপারে আমাদের তিনভাইকে গ্রহণ করা হয়। এই ব্রিগেডিয়ার ছিলেন আমার বাবার একজন রোগী। তিনি সব শুনে বললেন, তার জংগাটি (গাড়িবিশেষ) ছোট। সেখানে আমাদের একজনের জায়গা হতে পারে। পরের দিন সকাল বেলা আমাকে তার গাড়িতে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। আমি আমার চোখের জল লুকোতে পারলাম না। আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে কিনা আমার সন্দেহ হলো।

শিয়ালকোট থেকে সাম্বিয়ালের যাত্রাপথটি ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু এরপর দেখলাম দুই পাশে কেবল মানুষভর্তি এক একটা বৃহত্ শকট। এসব মরুর যানবাহনে হিন্দুরা যাচ্ছে ভারতে, আর মুসলমানরা যাচ্ছে পাকিস্তানে। হঠাৎ আমাদের জংগা গাড়িটি থেমে গেল। একজন বৃদ্ধ শিখ আমাদের পথ আগলে ধরলেন। তিনি তার নাতনিটিকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইলেন। আমি তাকে ভদ্রভাবে বললাম, আমি তো এখনো পড়াশুনা করছি। আমি আপনার নাতনিকে বহন করে নিয়ে যেতে পারি না। যাহোক, তিনি কাতরভাবে অনুনয়-বিনয় করছিলেন। বৃদ্ধ লোকটি তখন বললেন যে, তিনি তার পরিবারের সব সদস্যকেই হারিয়েছেন। এখন তার ওই নাতিটিই কেবল বেঁচে আছে। তিনি চান তার নাতিটি অন্তত বেঁচে থাকুক।

বৃদ্ধ লোকটির অশ্র“সিক্ত মুখ আজও আমার মনে পড়ে। কিন্তু আমি তাকে আমার বাস্তবতার কথাই বলেছিলাম। যেখানে আমার নিজেরই ভূত-ভবিষ্যতের ঠিক নেই, সেখানে একজন শিশুকে আমি কীভাবে লালন-পালন করব? তারপর আমরা এগিয়ে গেলাম। যাত্রাপথে আমরা দেখলাম এখানে-সেখানে মালপত্র পড়ে আছে। কিন্তু মৃতদেহগুলো যথাসময়েই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তারপরও বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে মরা মানুষের উত্কট গন্ধ ।

সেসময় আমি প্রতিজ্ঞা করি, দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব। এ কারণেই আমি ওয়াগাহ সীমান্তে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন শুরু করলাম। ২০ বছর আগে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাত্র ১৫-২০ জন লোক নিয়ে শুরু হয় এই ছোট আন্দোলন । এখন মোটামুটি এক লাখ লোক ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় জড়ো হন। পাকিস্তান সীমান্তেও সীমিত সংখ্যক লোক এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

জনগণের কৌতূহল ও আগ্রহের সীমা নেই। কিন্তু দুই দেশের সরকার আছেন তাদের মতো। মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের পুরো এলাকায় জারি করা হয় কারফিউ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স উভয়ই যাতে আমাদের জিরো পয়েন্টে যাওয়ার অনুমতি দেয়, এইজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে আমি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের কাছে চিঠি লিখেছি। মোমবাতি প্রজ্জ্বলন আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে এক দিকে রয়েছে স্টিল গেট।

এই ব্যবস্থার কারণে কিছু লোক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আমি আশা করি, এই সময় সীমান্ত শিথিল ও চারপাশের পরিবেশ থাকবে শান্ত যাতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ঘৃণা ও শক্রতার নিরসন হয়। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী যখন স্থলপথে দিল্লি থেকে লাহোর শোভাযাত্রা করেন, তখন সেই বাসে আমিও ছিলাম। দেখেছি দু’পাশে মানুষের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। ভেবেছিলাম এই যাত্রা দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত বাণিজ্য, যৌথ উদ্যোগ ও জনগণ থেকে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে।

কিন্তু যখন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলো, তখন আমি হতাশ হলাম। এর ফলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতে সৃষ্টি হলো প্রতিবন্ধকতা । ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হলো সীমাবদ্ধতা। অতীতে বুদ্ধিজীবী, সংগীত শিল্পী ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। পারতেন যৌথ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু দুই দেশের সরকার ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তোলে। ফলে আজ তাও বন্ধ হয়ে গেল। বাস্তবে সরকারি বা এমনকি বেসরকারিভাবেও দুই দেশের মাঝে এখন কোনো যোগাযোগ নেই।

পাকিস্তানের নয়া প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চিত করবেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে আমার আশঙ্কা হয় যে, তার এই অঙ্গীকার রক্ষার অনুমতি তাকে দেওয়া হবে না। আবার দেওয়া হতেও পারে। কারণ সেনাবাহিনীর দৃষ্টিকোণকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করা হয়। সেনাবাহিনীও শান্তি চায়। কেননা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের লোককেই যুদ্ধ করতে হয়। দুঃখের বিষয় হলো, ভারতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও পাকিস্তানে তা হয় না। সেখানে সেনাবাহিনীই শেষ কথা বলে। এ কারণে সেখানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই ব্যাপারে ইমরান খান সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হবেন কিনা তা কল্পনা করা কঠিন।

নয়াদিল্লির একটি উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিন্তু মুম্বাই বোমা হামলায় যেসব সন্ত্রাসী জড়িত তাদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা ও তাদের শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লি এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের সঙ্গে কোনো প্রকার উদ্যোগ নেবে না বলে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দুই দেশের মাঝে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে ভারতের দাবি মেনে নিয়ে ইমরান খানের এই ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। (কুলদীপ নায়ারের প্রকাশিত এটিই শেষ লেখা।)

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম

লেখক ঃ সদ্যপ্রয়াত ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনীতিক ও কলামিস্ট

॥ রাশেদ খান মেনন ॥

হত্যার বিচার হয়েছে- প্রয়োজন পিছনের ষড়যন্ত্রকারীদের স্বরূপ উন্মোচন

পনেরোই আগস্ট। জাতির জীবনে শোকাবহ দিন। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের প্রত্যুষে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী অফিসার- সৈন্যদের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খুনিরা রেহাই দেয়নি তার নিকটাত্মীয় পরিমন্ডলের সদস্যদেরও। যে মানুষকে পাকিস্তানিরা শত ষড়যন্ত্র করে হত্যা করতে পারেনি, তাকে হত্যা করলো বাঙালিরা! বঙ্গবন্ধুকে এ ধরনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষের, বিশেষ করে বাঙালির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও আস্থা থেকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমার সন্তান। ওরা আমার ক্ষতি করবে না।’

পনেরোই আগস্টের আত্মস্বীকৃত ঐসব খুনির বিচার হয়েছে। তাদের অধিকাংশের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়েছে। যারা বিদেশে পালিয়ে আছে তাদের ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করতে সরকার তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেসব দেশে মৃত্যুদন্ড সম্পর্কিত ও অন্যান্য আইনের কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। তবে বিশ্বাসঘাতক পরিচয়ে বিদেশের মাটিতেই তাদের মৃত্যুবরণ করতে হবে।

পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর এই হত্যাকান্ডের বিচার সহজ ছিল না। ঘাতকরা নিজেদের পরিণাম বুঝতে পেরে আইন করে ঐ বিচার যাতে না হতে পারে তার জন্য নজিরবিহীন এক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ঐ বিচার থেকে নিজেকে ও খুনিদের বাঁচাতে বিশ্বাসঘাতক খোন্দকার মোশতাক ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে। আর এই অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ডের নায়ক জেনারেল জিয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ঐ অধ্যাদেশকে র‌্যাটিফাই করে তাকে সংবিধানের অংশ করার আরও বড় ঘৃণ্য পদক্ষেপ নেয়। এর কারণ অবশ্য অস্পষ্ট নয়। এই বিচার অনুষ্ঠিত হলে অবধারিতভাবে তার নাম চলে আসত। বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছন পর্দার নায়কদের সম্পর্কে খ্যাতিমান অনুসন্ধানী সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ হাইকোর্টের বেঞ্চে দেওয়া সাক্ষ্যে স্পষ্টভাবেই বলেন যে, জেনারেল জিয়া ঐ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানতেন এবং তিনি তা প্রতিরোধ করেননি। বরঞ্চ বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি সেরকম (অভ্যুত্থান) কর তা’হলে করতে পার।’ এ কারণেই জিয়া মোশতাকের ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’কে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ প্রদান করে।

নব্বুইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশবাসীর এটা আশা ছিল যে, দেড় দশকের সামরিক শাসনামলের সকল হত্যার বিচার হবে। তিন জোটের ঘোষণায় আট, সাত ও পাঁচ দল বলেছিল যে হত্যা-ক্যু-অভ্যুত্থানের অবসান ঘটিয়ে দেশ গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিচালিত হবে। এরই অনুসরণে পঞ্চম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য, পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী এই অধ্যাদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে অনেক অন্তরায় (তার ভাষায় গিট্টু) আছে বলে সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। অথচ তার মাত্র ক’দিন আগেই সংসদের সমস্ত দল মিলে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালুর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। হত্যা-ক্যু-অভ্যুত্থানের রাজনীতি অবসানের জন্য তিন জোটের আন্দোলন ও ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপি সরকার এভাবেই তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়। এখানেও সেই একই কারণ পনেরোই আগস্টের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ থেকে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াকে রক্ষা করা।

আর এ কারণেই পনেরোই আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ড সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু-কন্যা, আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বিদেশের মাটি লন্ডনে গঠিত তদন্ত কমিশনকে বাংলাদেশে আসতে অনুমতি দেয়নি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালে স্যার টমাস উইলিয়ামস্্, কিউসি, এমপিকে প্রধান ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর সাবেক চেয়ারম্যান নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সিয়ান ম্যাকব্রাইড, জেফ্রি টমাস কিউসি এমপি ও আব্রে রোজ যিনি কমিশনের সদস্য সচিবও ছিলেন সমন্বয়ে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল।

এই তদন্ত কমিশন গড়ার আগে বা পরে পনেরোই আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ডের স্বরূপ ও পিছন পর্দার নায়কদের খুঁজে বের করার ব্যাপারে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়নি, কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। অথচ পনেরোই আগস্টের ঘটনাবলির পর থেকে এই অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ডের পিছনে সিআইএ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত আছে একথা ভারতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে হংকং-এর ‘ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিয়্যু’-এর প্রতিবেদক লরেন্স লিফশুলজ বঙ্গবন্ধু হত্যার ব্যাপারে তিনবছর গবেষণার পর ১৯৭৯ সালে ‘বাংলাদেশ : দি আনফিনিশড রেভল্যুশন’ (সহ-লেখক কাইবার্ড) যে গ্রন্থটি লেখেন তাতে বঙ্গবন্ধু হত্যার  পিছনে সিআইএ-র সম্পৃক্ততার বিষয় উল্লেখ করেন। কেবল তিনি নন, মার্কিন সাংবাদিক ক্রিস্টেফার এরিক হিচেন্স ২০০১ সালে তাঁর ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ বইয়ে লিফশুলজের বরাতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সিআই-এর সম্পৃক্ততার বিষয়টি সমর্থন করেন। হিচেন্স চার দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে জড়িত ছিলেন। নিউ স্টেটসম্যান, দি আটলান্টিক, দ্য নেশন, দ্য ডেইলি মিরর ও ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে তার লেখা ছাপা হয়েছে এবং তিনি ১২টি বই লিখেছিলেন। তিনি মারা গেলে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অবশ্য অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের তার বই ‘এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ ১৫ আগস্টের অভূ্যূত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে মার্কিন সরকার বা সিআইএ-র সম্পৃক্ততার লিফশুলজ-এর বক্তব্য খন্ডন করার চেষ্টা করেছেন। ফারুক-রশীদের বিভিন্ন ইন্টারভিউ ও ম্যাসকারেনহাসের বই থেকে স্পষ্ট যে, জেনারেল জিয়া আগস্ট অভ্যুত্থানের মুখ্য ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন।

সে প্রসঙ্গ এখন না। যেটা বলা হয়েছে যে ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থান সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিপূর্ণ অবহিত ছিল সেটা সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান রচিত ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড’ বইয়ে মার্কিন সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সেই সময়ে ঢাকা দূতাবাস থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে যেসব বার্তা আদান-প্রদান করা হয়েছিল তার ডক্যুমেন্টসসমূহের বিশ্লেষণ থেকে অনেক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ঐসব ডকুমেন্টস থেকে জানা যায় যে ১৫ আগস্টের সেনা অভ্যুত্থান ও নির্মম হত্যাকান্ডসমূহের হোতা কর্নেল ফারুক-রশীদের মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে ‘পূর্ব যোগাযোগ’ ছিল। আর এই ‘পূর্ব যোগাযোগ’ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে ভারতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের যোগাযোগেরই ধারাবাহিকতা ছিল। (উল্লেখ্য কর্নেল রশীদ মোশতাকের ভাগ্নে, আর ফারুক-রশীদ দু’জন ভায়রা ভাই)। ঐসব ডক্যুমেন্টস অনুসারে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব সরকারের অগোচরে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিলেন অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে আলোচনা করতেÑ যা তার কোনো এখতিয়ারাধীন বিষয় ছিল না। সেখানে তিনি জানান যে জেনারেল জিয়া ঐ অস্ত্র ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি। এরপর বছর না ঘুরতেই ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই একইভাবে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য মার্কিন দূতাবাসে যান আরেকজন মেজরÑ মেজর রশীদ। তিনিও জিয়ার কমিটির পক্ষ থেকে কথা বলতে গেছেন বলে দাবি করেন। ‘একইভাবে ১৯৭৪-এর ১৩ মে  সৈয়দ ফারুক রহমান ‘উচ্চতম পর্যায়ের বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে’ শেখ মুজিব সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তা চান। (মিজানুর রহমান খান তার বইয়ে এসব দলিলের নম্বর ও তারিখ সহ উল্লেখ করেছেন)। তিনি তার বইয়ে এরপর উল্লেখ করেছেন যে এর ঠিক ১৫ মাসের ব্যবধানে ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটে। তাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফারুক রহমান দাবি করেন তিনি পনেরো মাস ধরে মুজিব হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন (ঐ বইয়ের পরিশিষ্ট-৩)।

মিজানুর রহমান খান তার বইয়ে লিফশুলজের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, বাংলাদেশের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতগণ এবং ১৫ আগস্ট ঢাকার সিআইএ স্টেশন প্রধানের কথোপকথনের বিষয় উদ্ধৃত করেছেন। এসব কথায় মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি ও সিআইএ কর্মকর্তারা ১৫ আগস্টের সঙ্গে তাদের কোনো প্রকার সম্পর্ক ছিল বলে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মিজানের বইয়ে সংকলিত বিভিন্ন বার্তায় ডক্যুমেন্টস ভিন্ন কথা বলে। আর সিআইএ-র দলিলসমূহ এখনো প্রকাশিত হয়নি। সেগুলো প্রকাশ পেলে আরও বিষয় জানা যেত।

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সেনাবাহিনীতে একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনার বিষয় জানত সে বিষয়ে মিজানুর রহমান খান গত ১৩ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলেছেনÑ ‘মার্চে অভ্যুত্থানের বার্তা পান কিসিঞ্জার’। ১৯৭৫-এর ২২ জানুয়ারি সকাল ১০.২০-এ ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন উপপ্রধান আরভিং চেসল ঢাকা থেকে পাঠানো ‘অভ্যুত্থানের গুজব’ শীর্ষক তারবার্তায় লিখেছিলেন, “সামরিক অভ্যুত্থান সংক্রান্ত কিছু গুজব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মার্চ হলো সবচেয়ে অনুকূল সময়। দেশের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে বাংলাদেশ সরকারের সামনে কোনো আশা নেই এবং কর্তৃত্ববাদের এক বড় ডোজ গলধঃকরণই এখন বঙ্গবন্ধুর জন্য অত্যন্ত লোভনীয় বিষয়।” মিজানুর রহমান খান প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘পঁচাত্তরের মার্চ মাসটাই কেন ও কিভাবে সবচেয়ে অনুকূল মনে হলো, তার উত্তর আমরা ঐ তারবার্তায় পাই না। তবে এটা কাকতালীয় হলেও বিস্ময়কর যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি) নির্দিষ্টভাবে সিআইএ-কে যুক্ত করে মার্চেই একটি দলিল তৈরি করল। তার শিরোনাম হলো ‘সিআইএ ও বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য অভ্যুত্থান’। মিজান লিখেছেন, ‘অবশ্য এর দ্বারা অভ্যুত্থানে সিআইএ-র সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে কোনো স্থির ধারণায় পৌঁছানো যায় না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সিআইএ-র জড়িত থাকার অভিযোগ মার্কিন প্রশাসন সব সময় দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করেছে।’ তার সংগৃহীত ও সংকলিত দলিলসমূহ এর বিপরীত ধারণাই বরং জোরদার করে।

সে যাই হোক, সিআইএ-র দলিলসমূহ প্রকাশিত হলে সামনের দিনগুলোতে এসব বিষয় আরও পরিষ্কার হবে বলে ধারণা করা যায়। এখানে যেটা উল্লেখ করার তা হলো, ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের বিচারপর্ব শেষ হলেও ঐ ঘটনাবলির পিছনে যেসব কালো শক্তি কাজ করেছিল তাকে উদ্ঘাটন করা জরুরি। সাধারণভাবে ধারণা আছে যে সেনাবাহিনীর প্রতি মুজিব সরকারের অবহেলা, বিকল্প হিসেবে রক্ষীবাহিনী গঠন, সংবিধানের পরিবর্তন করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন ও দেশের সার্বিক অবস্থায় বিক্ষুব্ধ একদল সেনা অফিসার তাদের অধীনস্থ সৈন্যদের ব্যবহার করে ঐ হঠকারী কাজটি ঘটিয়েছিল। তাদের অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থানপরবর্তী দেশ পরিচালনা কিভাবে হবে তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। হয়ত ফারুক-রশীদের ছিল না, কিন্তু ঐ অভ্যূত্থানের মূল অনুঘটক খোন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়ার সে সম্পর্কে স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। আর মার্কিন সরকারের মোশতাক সরকারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলাপ (দ্রষ্টব্য : মিজানুর রহমান খান-এর ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড)-এর বিবরণ মার্কিনি পরিকল্পনারও প্রমাণ দেয়।

মোশতাক ক্ষমতায় এসে টুপি-সাফারী পরে মুজিব কোটধারীদের থেকে তিনি যে আলাদা তার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বঙ্গবন্ধুর ‘ভায়েরা আমার’ বাদ দিয়ে আয়ুবী-ইয়াহিয়া কায়দায় ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেছেন। জিয়া কেবল তাকে অনুসরণই করেন নাই ঐ ‘বিসমিল্লাহ’কে সংবিধানের অংশে পরিণত করেন।

অপরদিকে জিয়া ক্ষমতায় এসে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালুর জন্য সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা বাদ দেয়। সমাজতন্ত্রকে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ বলে সংজ্ঞায়িত করে। পাকিস্তানি সেনাশাসক আয়ুব খানের মতো সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি বনে যান এবং ‘হ্যা’ ‘না’ ভোটে নিজেকে আইনসিদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক ফ্রন্ট ও দল গঠন, অর্থনীতি ক্ষেত্রে বি-রাষ্ট্রীয়করণসহ ব্যক্তিখাতে ব্যাংক, বীমা ছেড়ে দেওয়া, তীব্র রুশ-ভারত বিরোধী (যেহেতু তারা মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক ছিল) রাজনীতি অনুসরণ করা এসব তারই প্রমাণ। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে জিয়াই বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন ও পরে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করেন। সুতরাং ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ড নিছক কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের হঠকারী কাজ নয়। এর পিছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাংলাদেশকে চরম শিক্ষা দান, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে পাকিস্তান আমলের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটানো এসব উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা ১৫ আগস্টের ঘটনাবলির পিছনে কাজ করেছে।

১৫ আগস্টের আত্মস্বীকৃত খুনিদের শাস্তি হয়েছে। অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও এখন প্রয়োজন ১৫ আগস্টের জাতীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্তের স্বরূপ উন্মোচন করা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এবং সেটা যেমন উচিত, তেমনই সম্ভবও।

লেখক ঃ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য। প্রবীণ রাজনীতিক।

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

১৫ আগস্টের নেপথ্য শক্তি এবং তাদের বর্তমান রাজনীতি

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু, তার পরিবার এবং নিকটাত্মীয়দের ট্যাঙ্ক নামিয়ে হত্যাকারীরা তাদের ব্যক্তিগত শক্রতা চরিতার্থ করেনি। যারা হত্যাকান্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল তাদের সঙ্গে নিহত কারো কোনো ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল না, অনেকের জানা পরিচয়ও ছিল না। কিন্তু হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া প্রতিটি ব্যক্তিই ছিল সামরিক বাহিনীর সাবেক অথবা কর্মরত সদস্য। হত্যাকান্ডে তাদের অংশগ্রহণের পেছনে অনেকেরই সহযোগিতা ছিল, ট্যাঙ্ক ও গোলাগুলি সরবরাহে কেউ কেউ নেপথ্যে কাজ করেছে। এরও পেছনে ছিল আরো বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের নানা প্রস্তুতি, পরিকল্পনা- যা অতি গোপনে দেশের সবচাইতে সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ডের চোখে ধুলা দিতে পেরেছিল। এটিকে এক কথায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর গোপন মিশন নামে অভিহিত করা হয়। সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ক-কামান-বন্দুক ছাড়া তৎকালীন বাস্তবতায় এমন নিষ্ঠুর রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। অধিকন্তু রাতের আঁধার ছাড়াও এটি করা সম্ভব ছিল না। ষড়যন্ত্রকারীরা এসব জেনেশুনেই তাদের প্রস্তুতি সেভাবে নিয়েছিল। অধিকন্তু দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ঠান্ডা যুদ্ধের যুগে বিশ্ব মোড়ল রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে যেসব সরকার তাদের বলয়ের প্রতি শতভাগ আনুগত্য পোষণ করে চলত না তাদের ‘মার্কিন শক্র’ হিসেবে চিহ্নিত করত, জোট নিরপেক্ষ শক্তিকে মার্কিনবিরোধী বলে তকমা লাগিয়ে সেগুলোর বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে ইন্ধন জোগাত, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেই সব সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিত, দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী শক্তিকে সমর্থন জানাত। বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতির এমন এক হিংসাত্মক পরিস্থিতির শিকার হয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনাতেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে বা ৭ম নৌবহর প্রেরণের মাধ্যমে অংশ নিয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে দেশটি আমাদের পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়ায়নি, অধিকন্তু কিসিঞ্জার সাহেব যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে বিরূপ মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র, হঠকারী শক্তিকে বঙ্গবন্ধুর সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের রসদ জুগিয়েছিলেন। ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া নেপথ্য শক্তির পেছনে মার্কিন তৎকালীন সরকার ও বিভিন্ন অপশক্তির সমর্থনই হয়তো তাদের কাছে বড় শক্তি ছিল। সে কারণেই প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যকার ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী সংখ্যায় ব্যাপক না হয়েও রাষ্ট্র ক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার ও নিকটজনদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, সেভাবেই তারা ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে রাতের আঁধারে হামলা করে। সেই সময় সরকার প্রধানের বাড়িতে যে ধরনের নিরাপত্তা বিধান থাকা দরকার ছিল- তাতে চরম ঘাটতি ছিল। বঙ্গবন্ধু সারা জীবন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে এসেছেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন; একটি ‘শোষণহীন সোনার বাংলা’ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শুরু থেকে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু একবারও সরকারি বঙ্গভবন ও গণভবনে থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি, ভাবতে চাননি তাকে হত্যা করা বা স্পর্শ করার কথা কোনো বাঙালি করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাসের এমন দুর্বলতার কথা জানত, অঙ্ক কষে দেখেছিল দেশি এবং তাদের সহযোগী বিদেশি শক্তিসমূহ। সুতরাং ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধুকে রাতের আঁধারে হামলা করার হিসাবটি ততটা কঠিন বা দুরূহ ছিল না। সেই সময়ে ঢাকা শহরে রাতের আঁধারে এক দুইটা ট্যাঙ্ক ঘোরাফিরা করলেও কেউ কি কল্পনা করতে পারত যে এসব ট্যাঙ্কের গন্তব্য ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে হবে? কিংবা এগুলো বঙ্গবন্ধুর মতো নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল? সেনাবাহিনী কি তখন এমন ভাবনা ভাবতে পারত?

সদ্য স্বাধীন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের দাগ তখনো শুকায়নি, মা-বোনদের হাহাকার চারদিকে কানে ভেসে আসত, পাকিস্তান থেকে চার লাখ বাঙালির ফিরে আসা, চারদিকে হাজারো সমস্যার মধ্যেও বঙ্গবন্ধু দেশটাকে সাংবিধানিকভাবে পরিচালিত করতে শুরু করেছেন, যুদ্ধ ফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র অনেকটাই জমা নিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিচ্ছেন, খাদ্য সংকট মোকাবেলা করছিলেন, দেশটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক বেশি মর্যাদা লাভের অধিকারী হলো, শত সমস্যার মধ্যেও সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছিল, আর্থসামাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিকভাবে এমন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। দেশের অভ্যন্তরে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ ১৯৭৫ সালে নির্মিত হয়; একটি জাগরণের উপলব্ধি চারদিকে পরিলক্ষিত হয়। বঙ্গবন্ধু সেই ধারায় কিছুকাল অগ্রসর হতে পারলে বাংলাদেশ অচিরেই হয়তো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পরিস্থিতি অতিক্রম করতে সক্ষম হবে, জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে বিজয়ী এক দেশের নাম বাংলাদেশ উচ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছিল। ঠিক সে ধরনের পরিবেশ পছন্দ ছিল বিদেশি কোনো কোনো মহলের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু দেশ এবং তাদের মুরব্বি দেশসমূহ বিশ্ব অভিজ্ঞতায় তাদের জন্য মস্তবড় থ্রেট হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করতে থাকে, সে ক্ষেত্রে এই রাষ্ট্রের মূল কান্ডারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেই তাদের বিবেচনায় সবচাইতে বড় বিপজ্জনক রাষ্ট্র নেতা হিসেবে দেখতে থাকে, সুতরাং তাদের পরোক্ষ সমর্থন নিয়েই ভেতরের ষড়যন্ত্রকারী শক্তিসমূহ দ্রুত বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগঠনের বেশ ক’জন প্রভাবশালী নেতা ১৯৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তারা মুজিবদরদী হয়ে আড়ালে মুক্তিযুদ্ধকে দ্বিধাবিভক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ের প্রবল গ্রোতের তোড়ে এসব তত্ত্ব ভেসে যায়। এরাই স্বাধীনতার পর গোপনে একত্রিত হতে থাকে। নানা গুজব, অপপ্রচার, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অভাব-অভিযোগ ইত্যাদিকে বড় করে দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবার, নিকটাত্মীয় স্বজনদের বিরুদ্ধে ছড়িয়েছে। তারপরও সাধারণ মানুষ এতে ততটা কান দেয়নি, বিভ্রান্ত হয়নি। ফলে ওই সব অপশক্তি বুঝতে পেরেছিল যে, শেখ মুজিবের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় সহজে চিড় ধরানো যাবে না। আবার শেখ মুজিবকে খুব বেশি সময়ও দেয়া যাবে না। কেননা শেখ মুজিব তার গুণাগুণ দিয়েই রাজনীতিতে শীর্ষ স্থানে উঠেছেন, সাফল্য তার জীবনে যত বেশি ভর করেছে তাতে কোনো গণকের পক্ষেই বলা সম্ভব হবে না যে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার সোনার বাংলা গড়তে গিয়ে তিনি ব্যর্থ হবেন। যে নেতার অনুপস্থিতেও মুক্তিযুদ্ধকে ঠেকিয়ে রাখা যায়নি, দেশ স্বাধীন না হয়ে থাকেনি, মানুষ অকাতরে জীবন দিতে দ্বিধা করেনি, সেই নেতা ‘দ্বিতীয় বিপ্লবে’ সফল হবেন না- তা কী করে ভাবা যায়? ১৫ আগস্ট সংঘটিত করতে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গোপনে যুক্ত হতে থাকে, তারা এসব কিছু হিসাব-নিকাশ করেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে এমন সব কিলারদের রিক্রুট করা হয়, বঙ্গবন্ধু পরিবারের ছোট সদস্য রাসেলকে হত্যার মাধ্যমে তাদের পশু মনোবৃত্তির পরিচয়ই শুধু দেয়নি, ভবিষ্যতে যাতে বঙ্গবন্ধু পরিবার থেকে কেউ বাংলাদেশের হাল ধরতে না পারে সেটির প্রমাণ তারা রাখে। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর নিকটাত্মীয় স্বজনদের সেই রাতে হত্যা করা হয়। এই পর্ব শেষ করে হত্যাকারীরা খন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের উদ্দিন ঠাকুর গংদের ক্ষমতায় আসীন করে। দ্রুতই সামরিক বাহিনীর প্রধান পদ থেকে মে. জে. শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে বসানো হয়। থলের বিড়াল কিন্তু এতেই দেখা যেতে থাকে। আওয়ামী লীগের মূল নেতাদের গৃহবন্দি থেকে জেলে নেয়া হয়। অচিরেই যখন মোশতাকের অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে, সংসদ সদস্যদের ভেতর থেকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ শুরু হতে থাকে তখন ষড়যন্ত্রের বহর আরো বাড়ানো হয়, জেলের অভ্যন্তরে ৪ জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়- যেন তারা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে নেতৃত্ব দিতে না পারেন। কিন্তু তাতেও ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে থাকেনি। সামরিক বাহিনীর ভেতরে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান, অপপ্রচার ঘটিয়ে পরিস্থতিকে আরো ঘোলাটে করা হয়, এরপরই সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার মূল অবস্থানে আবির্ভূত হন। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারা থেকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে নিতে ধর্ম, ভারতবিরোধিতা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আমদানি, স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে রাজনীতির চাবিকাঠি তুলে দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের হাতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের এমন সমাধি রচিত হবে- তা ক’জন বুঝতে পেরেছিল, বুঝতে পেরেছিল- সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুবই জরুরি। বাংলাদেশে তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথচলাকে পিচ্ছিলই শুধু করেননি, রুদ্ধও করে দিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বড় অংশ তার দলে স্থান করে নেয়, নীতি, আদর্শ ইত্যাদিও বিদায় নিতে থাকে।

গণতন্ত্রের পথ চলা এভাবে এতটাই জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়ে যে, বাংলাদেশে এখন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে দোদুল্যমান, বিভ্রান্ত, দিকভ্রান্ত এবং আপসকামী হয়ে পড়েছে। এরা ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের বিকৃত ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে, বিষয়টিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বলে প্রচার করার চেষ্টা করে, এখনো নানাভাবে বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে, গুজব, অপপ্রচার, মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা, ভারতবিরোধিতা ইত্যাদি মুখরোচক বিষয়কে গত সাড়ে চার দশক ধরে প্রচার করে বেড়াচ্ছে, এটিই তাদের রাজনীতির উপজীব্য। ১৯৯৬ সাল থেকে বিএনপি খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৫ আগস্টে নামিয়ে আনে, কেক কেটে তা পালন করার উদ্যোগ নেয়। অথচ ১৯৯১ সালে সরকার প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়ার জন্ম তারিখ ১৯ আগস্ট দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, জেনারেল জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যায় অংশ নেয়া সবাইকে পুরস্কৃত করেছে, বিদেশি দূতাবাসে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে, তাদের বিচারের হাত থেকে রক্ষার জন্য সংবিধানে ইনডেমনিটি অন্তর্ভুক্ত করে। এক সময় বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। ১৫ আগস্ট পালনে বাধা দেয়া হতো, ফ্রিডম পার্টিকে মাঠে নামিয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করা হতো। ১৯৯১-এ ক্ষমতায় আসার পর জামায়াত-ফ্রিডম পার্টিসহ সব উগ্র, হঠকারী শক্তিকে নিয়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী শক্তিকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টিকে সংসদে প্রধান বিরোধী দল করা হয়। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার শুরু হলে বিএনপি তাতে বাধা দেয়। বিচারের রায় ২০০১ সালের পর দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখেছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বাধা প্রদান করে। কার্যত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যার মাধ্যমে বিএনপিসহ যেসব দল রাজনীতিতে স্থান করে নেয় তারা বঙ্গবন্ধুকেই শুধু তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে সচেষ্ট তা নয়, তারা একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার রাজনীতির ধারক, বাহক, পৃষ্ঠপোষকের অবস্থানে নিজেদের প্রদর্শন করছে, তাদের শাসনামলে বাংলাদেশ ‘দ্বিতীয় পাকিস্তানের’ স্বরূপে উদ্ভাসিত হয়, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের তেমন কিছুই তাতে থাকে না, উন্নয়ন, প্রগতি ইত্যাদির কোনো বালাই নেই, কেবলই সাম্প্রদায়িকতা, আওয়ামী বিরোধিতা ইত্যাদিই এই রাজনীতির প্রধান উপজীব্য।

এই শক্তির কাছে বাংলাদেশে এখনো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি মস্ত বড় শক্র। সে কারণেই ২০০১-২০০৬ সালে আওয়ামী নিধন হয়েছে নির্বিচারে, ২১ আগস্ট সংঘটিত হয়েছে, শেখ হাসিনাকে হত্যার নানা ষড়যন্ত্র সংঘটিত হয়েছে, অনেকবারই শেখ হাসিনার সরকারকে ‘আরব বসন্তের’ মতো রাস্তায় মানুষ জড়ো করে উৎখাতের চেষ্টা হয়েছে। ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যানারে একবার উৎখাত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, ৫ মে, ২০১৩ সালে হেফাজতের ব্যানারে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করা হয়েছিল, কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সর্বশেষ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নামে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সামাজিক আন্দোলনের ওপরও ভর করা হয়েছিল ষড়যন্ত্রের নানা নাটিকা এখন রচিত হচ্ছে, হবেও। কথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসীরাই শুধু নয়, একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বিশ্বাসী মানুষজন কতটা এসব ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন থাকবে, বুঝবে এবং প্রতিহত করার ব্যবস্থা নেবে সেটিই বড় প্রশ্ন।

লেখক ঃ  অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

দেবের হইচই আনলিমিটেড’

বিনোদন বাজার ॥ সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে দেবের নতুন ছবি ‘হইচই আনলিমিটেড’র পোস্টার শ্যুটের ভিডিও। মুক্তি পেতেই হইচই পড়ে গিয়েছে দর্শমহলে৷ কৌশানি, দেব এবং পূজার কয়েকটি শট দেখে সকলের ধারণা একটা ইন্টারেস্টিং লাভ ট্র্যাঙ্গেল দেখা যাবে ছবিটিতে৷ছবিতে দেব, কৌশানি, পূজা ছাড়াও রয়েছেন খরাজ, কোনিনিকা, অর্ণ, পারমিতা৷ পুজোয় মুক্তি পেতে চলেছে ছবিটি।চিত্রনাট্য অনুযায়ী, এই ছবিতে এক বড় শিল্পপতির ঘরজামাই উত্তীয় (দেব)। তার স্ত্রী (কৌশানি) সব সময় পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। যা উত্তীয়র জীবনের সব থেকে বড় সমস্যা। অন্যদিকে বিজন (খরাজ) তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে সমস্যায় জর্জরিত।এছাড়া বউয়ের জন্য মনে শান্তি নেই গ্যারাজ মেকানিক আজমল খানের (অর্ণ)। কারণ অভিনেত্রী হতে চাওয়া তার বউ (রোজা পারমিতা) মনে করেন, এই কালিঝুলি মাখা মানুষটি তার বর হওয়ার যোগ্য নয়।সুতরাং কারও মনেই শান্তি নেই। তাই শান্তির খোঁজে তারা সবাই উজবেকিস্তানে ঘুরতে যায়। বিদেশে ঘুরতে গিয়ে ঘটনাচক্রে তৈরি হয় এমন সমস্যা, যা রীতিমতো হইচই

॥ সালাহ্উদ্দিন নাগরী ॥

অনিরাপদ পানির ব্যবহার বন্ধ হোক

পানি কিনে খেতে হয়- নব্বই দশকের আগে আমাদের দেশের লোকজনের এ রকম ধারণা ছিল না বললেই চলে। বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কলসি বা ড্রাম থেকে পানি নিয়ে পান করা হতো। একটি মুহূর্তের জন্য মনে হয়নি, এ পানি বিশুদ্ধ কিনা? ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা? আশির দশকেও পানি ফুটিয়ে পান করার রেওয়াজ ছিল না। ওয়াসার পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ট্যাপ নির্গত পানিকেই সুপেয় পানি বিবেচনা করা হতো। স্মৃতিপটে ভেসে উঠে- সত্তর-আশির দশকে চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে অনেক পুকুর ছিল। ওইসব পুকুরের পাড়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে গোসলখানার মতো প্রকোষ্ঠে মা-বোনদের গোসল করা, কাপড়-চোপড় কাচা, থালা-বাসন ধোয়া সবকিছুই চলত, কোথাও কোথাও ওই পানি খাওয়াও হতো।

খাল-বিল, পুকুর, জলাভূমির সংখ্যা কমছে। নিুাঞ্চল ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা ও কলকারখানা তৈরি হচ্ছে; ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়ার জন্য ফসলের মাঠে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক, শিল্প-কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নদী, খাল-বিলের পানির সঙ্গে মিশে পানির উৎসকে দূষিত ও বিষাক্ত করছে।

ওয়াসার পানি, কনটেইনারের পানি, জারের পানি, বিভিন্ন কোম্পানির পরিশোধিত পানি যখন আমাদের হাতে আসে, তখন তা কতটুকু নিরাপদ থাকে? নিরাপদ ও সুপেয় পানি এবং পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে বছরে বিশ্বে প্রায় ৩৭ লাখ মানুষ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে মারা যায়, যার মধ্যে ১৫ লাখ শিশু। বাংলাদেশে এ অবস্থা আরও ভয়াবহ। কেবল বিশুদ্ধ পানির ব্যবহারে মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে পানিবাহিত রোগে মৃত্যুঝুঁকি ২১% কমানো যেতে পারে। প্রতি বছর গরমকালের শুরুতে ঢাকার হাসপাতালগুলোয় ডায়রিয়া রোগীর ভিড় বাড়তে থাকে। এর কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলেছেন পানির সমস্যা। রাজধানীতে  দৈনিক বিশুদ্ধ পানির চাহিদা ২৩০ থেকে ২৩৫ কোটি লিটার, তন্মধ্যে ৬০ কোটি লিটার বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি পরিশোধন করে এবং ১৭০ কোটি লিটার ঢাকা ওয়াসা গভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলন করে নগরবাসীর জন্য সরবরাহ করে থাকে। গত ২০/০৩/২০১৭ তারিখের যুগান্তরের রিপোর্ট মতে, নগরবাসীর (ঢাকা) দীর্ঘদিনের অভিযোগ- ওয়াসার পানিতে মাত্রাতিরিক্ত দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকে, দীর্ঘ সময় ফোটানোর পরও দুর্গন্ধ যাচ্ছে না। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ করা পানির যে পরিমাণ শীতলক্ষ্যা থেকে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারে শোধন করে নগরবাসীর জন্য সরবরাহ করা হয়, তা এতটাই দূষিত যে, শোধন করার পরও পানযোগ্য হচ্ছে না।

ধীরে ধীরে আমাদের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, সবাই শরীর ও স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছে, সেবাদানকারী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে, চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এসেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, পানির উৎসগুলো বর্ধিত জনসংখ্যা দ্বারা দূষিত হচ্ছে, খাদ্যে ভেজাল এসেছে, মানুষকে ঠকানোর প্রবণতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ধীরে ধীরে মানুষ সচেতন হওয়ারও চেষ্টা করছে। দেশে পানি যখন বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত হল, খাওয়ার পানি, গৃহস্থালী পানি কেনাবেচা শুরু হল, তখন থেকেই পানি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করল। এ সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিশুদ্ধ পানির নামে বোতলজাত ও জারে পানি বিক্রির রমরমা ব্যবসা পেতে বসল। এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠের ১৪.০২.২০১৮ তারিখের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মতে, মতিঝিলের ফুটপাতের এক দোকানে চা পান করার আগে জার থেকে এক গ¬াস পানি পান করছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক চাকরিজীবী; ওই পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন এটি ফিল্টার করা, ওরা তো ভালোই বলে, তবে ইদানীং অনেক কথাই শোনা যায়। জারের এক গ¬াস পানি এক টাকায় পাওয়া যায়, বোতলের পানির দাম পনের টাকা। পল্টন মোড়ের আরেক চা দোকানদার জানান, ১ জার পানি ৩০ টাকায় কিনে প্রতি গ¬াস ১ টাকায় বিক্রি করেন। তাকে পানির বিশুদ্ধতার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে জানান- বিভিন্ন কোম্পানি নিরাপদ পানি বলে দোকানে দিয়ে যায়, তারা সরল বিশ্বাসে এসব কিনে নেন, কাস্টমারও সরল বিশ্বাসে এগুলো পান করে।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় সব শহরেই এ জারের পানি পথচারী, শ্রমজীবী, নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীসহ সবাই পান করছে। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সরাসরি ওয়াসার লাইন থেকে সংগ্রহ করা জারের ওই পানিই মানুষজন বিশুদ্ধ মনে করে পান করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও বিএসটিআই জারের পানির ২৫০টি নমুনা পরীক্ষা করে। ওই পানিতে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। মানুষ ও প্রাণীর মলে এ জীবাণু থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিএসটিআইয়ের তথ্যমতে, জার ও বোতলের পানি সরবরাহের জন্য যথাক্রমে ১৬৬৫ ও ৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। কতগুলো নিয়ম মেনে জারের পানি বিক্রয় করতে হয়। যেমন ওই প্রতিষ্ঠানের বিএসটিআইয়ের অনুমোদন, রসায়নবিদ ও পরিছন্নতাকর্মী, যেসব কর্মী জারে পানি ভর্তি করে তাদের সুস্বাস্থ্যের সনদ, জারের লেভেলে উৎপাদন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ থাকতে হয়।

এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের জনৈক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি বিশুদ্ধ পানির নামে প্রতারণার ব্যবসা শুরু করেছে। বিএআরসি, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। টোটাল কলিফর্ম ও ফিকাল কলিফর্মের পাশাপশি এসব পানির পিএইচ, টিডিএস, সিসার পরিমাণ ঝূঁকিপূর্ণ। ১২টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে, ১১টি সরাসরি ওয়াসার পানি এবং ১টি ডিপটিউবওয়েলের পানি জারে ভরে বিক্রয় করছে। কোথাও মান পরীক্ষার প্যারামিটার নেই। অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে পানি ভরা হচ্ছে।

আমাদের সচেতন জনগণ বাসায় ফোটানো পানি, অফিসে জারের পানি, বাইরে ঘোরাঘুরির সময় বোতলের পানি পান করছে। কোনটা নিরাপদ? উত্তর হয়তো কোনোটাই না। তাহলে কী হবে? ভূগর্ভস্থ পানি, নদী-নালা, খাল-বিলের পানি, ওয়াসার পানি, জার ও বোতলের পানি পদ্ধতিগতভাবে ব্যবহার ও পানির অপচয় রোধ করতে হবে। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি অন্তত পরিশোধনের পর যেন দুর্গন্ধমুক্ত ও সুপেয় হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রতিটি উৎসকে দ্রুততার সঙ্গে নিরাপদ পানির আধারে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে। যেখানে-সেখানে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। এমনিতেই প্রতিনিয়ত আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, ফলে নিচের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। আর্সেনিকমুক্ত এলাকা ব্যতীত কোথাও কোনো ধরনের নলকূপ ও গভীর নলকূপ থাকতে পারবে না। ২০২১ সালে ওয়াসার পানি ট্যাপ থেকে নিয়ে সরাসরি পান করা যাবে মর্মে যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

বিভিন্ন স্থাপনাগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন পাইপের মাধ্যমে নদী, খাল-বিল বা প্রাকৃতিক জলাভূমিতে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করে পানির উৎসগুলোকে দূষণমুক্ত রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পরিশোধিত পানিতে দুর্গন্ধ থেকেই যাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে, পয়ঃবর্জ্যরে পানি পরিশোধন করে সিঙ্গাপুর বিশুদ্ধ পানি তৈরি করছে। তাই আমাদেরও পানি পরিশোধনের জন্য ওই ধরনের উন্নতমানের শোধনাগার গড়ে তুলতে হবে। ওয়াসার লাইনে ক্রটি থাকায় অনেক সময় ড্রেনের পানি ও পয়ঃআবর্জনা লাইনে প্রবেশ করে পানিকে বিষাক্ত, দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত করে তোলে। তাই ওয়াসার লাইন নিয়মিত পরীক্ষা ও ক্রটিমুক্ত রাখতে হবে।

বাসাবাড়ি, বিল্ডিং বা অন্যান্য স্থাপনায় সাপ্লাই পানি সাধারণত প্রথমে আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভারে জমা হয়ে ওভারহেড ট্যাঙ্কের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্ল্যাট, অফিস ও অন্যান্য ইউনিটে সরবরাহ করা হয়। অধিকাংশ আন্ডারগ্রাউন্ড ও ওভারহেড ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, অনেক সময় ঢাকনা খোলা থাকে; কুকুর, বিড়াল, মুরগি, কীটপতঙ্গ ঘোরাফেরা করে, কাক ময়লা-আবর্জনাসহ ঢাকনাবিহীন ট্যাঙ্কে বসে। এ ধরনের অব্যবস্থাপনায় নিরাপদ পানিও বিভিন্ন হাউসহোল্ডে ব্যবহারের প্রাক্কালে দূষিত হয়ে যায়। ট্যাঙ্কের ভেতর-বাহির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক হতে হবে।

ট্যাঙ্কের পানি সাধারণত ফুটিয়ে পান করা হয়। পানি কতক্ষণ ফোটাতে হবে, এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য নেই। কেউ বলে ১০ মিনিট, কেউ বলে ৩০ মিনিট, কেউ বলে ৪৫ মিনিট, আবার কেউ বলে পানিতে ‘বলক’ এলেই জীবাণুমুক্ত হয়ে গেল। তাহলে প্রত্যেককে কী গবেষণা করে বের করতে হবে, কোন্টি সঠিক? জনগণকে এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্য অবহিত করা যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, তাকেই বিভ্রান্তি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা প্লাস্টিকের তৈরি ফিল্টার, জগ বছরের পর বছর এবং মিনারেল ওয়াটারের বোতল বারবার রিফিল করে ব্যবহার করছি। আয়রন, ময়লা জমে ফিল্টার, জগ-গ্লাসের সাদা রং তামাটে হয়ে যাওয়ার পরও সেগুলো পাল্টানো হয় না। প্লাস্টিকের এ জিনিসগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ওয়ান টাইম ইউজেবল জিনিসপত্রের ব্যবহার অনেক সময় স্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গ্লাসের পাতলা প্লাস্টিকের উপাদান গরম পানি চা-কফির সংস্পর্শে গলে মারাত্মক ক্ষতিকর বিক্রিয়া তৈরি করে, তাই পাতলা প্লাস্টিক গ্লাসে গরম পানীয় পান থেকে বিরত থাকা যেতে পারে। বাজারের শাকসবজি, ফলমূল ও মাছ সতেজ রাখার জন্য ড্রেনের বা অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

হোটেলে, বিয়ে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অ্যালুমিনিয়ামের বড় বড় ভাড়ে একই পানিতে শত শত লোকের ব্যবহৃত থালা-বাসন, গ¬াস ধোয়া হচ্ছে। এত এঁটো প্লেট একই পানিতে ধোয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়, এটি আমরা বুঝতে চাই না। একইভাবে অনেক বাসাবাড়িতে কাপড়- চোপড়, থালা-বাসন এবং রান্নার প্রাক্কালে তরিতরকারি ধোয়াতে একই গামলা ও বালতি ব্যবহৃত হওয়ায় রোগ-জীবাণুর সংক্রমণের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে পথ খাবারের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় যে রোগ-জীবাণু পাওয়া গেছে, তার বেশিরভাগই পানিবাহিত।

বাসাবাড়িতে পানি সংরক্ষণের জন্য সাধারণত বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম বা স্টিল নির্মিত পাত্র ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, পানি সংরক্ষণ ও পান করার জন্য কাঁচের পাত্র সবচেয়ে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যবান্ধব। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, নবম শতকে মুসলিম শাসন আমলে স্পেনের (আন্দালুসিয়া) আমিরের (বাদশা) দরবারের বিখ্যাত গায়ক, ফ্যাশন ডিজাইনার, কবি, শিক্ষক আবু আল হাসান আলী ইবনে নাফি ওরফে জির’আব পৃথিবীতে প্রথম কাচের গ¬াসে পানি পানের প্রচলন করেন।

ঢক ঢক করে দু’ঢোক বিশুদ্ধ পানি পান করে নিলেই পানিবিষয়ক সতর্কতা, সচেতনতা ও সব দায়িত্ব সম্পন্ন হয়ে গেল- মনে করার কোনো কারণ নেই। জাতিসংঘ বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ ৩৫টি দেশে পানি দুর্লভ হয়ে পড়বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের রিপোর্ট মতে, ২০১২ সালে ১০০ কোটির বেশি মানুষ নিরাপদ পানির সংকটে ভুগেছিল। ২০ বছর পর বাংলাদেশের ১০ কোটিসহ বিশ্বের কমপক্ষে ৪০০ কোটি মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে নিপতিত হবে। দেশের বাইরে থেকে নদী-নালা, খাল-বিলে প্রবাহিত পানিতে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, ফলে এ পানিকে কেন্দ্র করে সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন সম্ভবপর হয় না। এ প্রেক্ষাপটে, আমাদের অদক্ষতায় পানি যেন জীবন, প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য হুমকি তৈরি করতে না পারে সে দিকে লক্ষ্য রেখে পানিসম্পদকে সমৃদ্ধ করতে হবে।

লেখক ঃ সরকারি চাকরিজীবী

॥ আবুল কাসেম ফজলুল হক ॥

রাজনীতিই হওয়া উচিত মূল চালিকাশক্তি

এত পত্রপত্রিকা, এত টিভি চ্যানেল, তার ওপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম- এসবের মধ্যে যে কোনো নাগরিকেরই বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ আছে, কোনো ব্যাপারেই পরিচ্ছন্ন ধারণা লাভেল সুযোগ প্রায় নেই। বাংলাদেশে বিবিসি রেডিও এখনো প্রভাবশালী। বিবিসি রেডিও কি আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের জাতি ও জনজীবনের স্বার্থে প্রচার চালায়? না কি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কাজ করে? বাংলাদেশের প্রচার মাধ্যমগুলো কার স্বার্থে কাজ করে? স্বাজাত্যবোধ ও স্বরাষ্ট্রচেতনা কি অবাঞ্ছনীয়?

বিজ্ঞানের আবিষ্কার উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বিস্তারের ফলে অনেক সুযোগ-সুবিধা আমাদের জীবনে এসেছে। এসব সুযোগ-সুবিধা নিতে গিয়ে আমরা যান্ত্রিক গতিতে অত্যন্ত দ্রুত চলছি- মানবিক বিচার-বিবেচনা বাদ দিয়ে চলছি। এর ফল যে ভালো হচ্ছে না তা বুঝতে মোটেই অসুবিধা হচ্ছে না। অত্যুন্নত প্রযুক্তির এই কালে দুনিয়াব্যাপী প্রায় সর্বত্র অশুভ বুদ্ধির কর্তৃত্ব, শুভ বুদ্ধি পরাজিত অবস্থানে আছে। মিথ্যা সত্যকে পরাজিত করে রাজত্ব করছে। প্রযুক্তি মানুষের কর্তৃত্বে থাকলে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়। কিন্তু অশুভ যখন প্রযুক্তির স্বাধীন হয়ে যায়, প্রযুক্তির দ্বার পরিচালিত হয়, তখন মানুষ আর সভ্যতার ধারায় চলতে পারে না- বর্বরতামুখী হয়ে যায়। যারা ক্ষমতাবান ও বিত্তবান তাদের চালিকাশক্তি হয় ভোগবাদ ও সুবিধাবাদ। তাদের কর্মসূচি, কর্মনীতি ও কার্যক্রমের মর্মে থাকে ভোগের বাসনা ও সুবিধাবাদের চেতনা।

সামরিক শক্তি যখন শুভকর রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন সেই সামরিক শক্তি জনগণের জন্য কল্যাণকর হয়। কিন্তু সামরিক শক্তি যখন রাজনৈতিক শক্তির ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তখন তা আর জনগণের জন্য কল্যাণকর থাকে না। ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক শক্তির ব্যর্থতার কারণে সামরিক শক্তি প্রাধান্যে আসে। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দ্বারা। তখন সরকার ছিল। পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার। ‘তাজউদ্দীন আহমদ ও প্রথম বাংলাদশে সরকার’ নামে আমার একটি ছোট্ট বই আছে। তাতে যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কার্যাবলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ আছে। আমি দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন প্রথম সরকারকে আলোচনার বাইরে রেখে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ প্রচার করা হচ্ছে। এতে ইতিহাসের মৌলিক বিকৃতি ঘটে যায়। ইতিহাসকে বিকৃত করা হলে জাতির আত্মাই বিকৃত হয়ে যায়। বিকৃতি নিয়ে এক পক্ষের পাল্টা আর এক পক্ষ সামনে আসে। তাতে চলে অন্ধ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া- বিকৃতির পর পাল্টা বিকৃতি। মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট ধরা পড়ছে। দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে- মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেটও বাড়ছে- সংখ্যা বাড়ছে। সুবিধা নাতি-পুতিদেরও দেয়া হচ্ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-পুতিদের বঞ্চিত করার দাবি তোলা হচ্ছে। ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ বইয়ের একটি ইংলিশ ভার্সন প্রকাশিত হয়েছিল। তার শেষ বাক্যটি বোধ হয় এই ছিল : খবঃ ঃযব যধঃৎবফ পড়হঃরহঁব ভড়ৎ যঁহফৎবফং ধহফ ঃযড়ঁংধহফং ড়ভ ুবধৎং. শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু এ রকম বংশানুক্রমিক ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণের পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি বলতেন, বাঙালি প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়, বাঙালি ক্ষমা করতে জানে।

১৯৭১ সালের মার্চে যে আন্দোলন তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ চালিয়ছিল, তার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘অহিংস অসহযোগ আন্দোলন’। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগীদের বিচার আরম্ভ করে বছর শেষ হতে না হতেই ১৯৭৩ সালে তিনি ঘোষণা করেছিলেন ‘সাধারণ ক্ষমা’। তাতে চল্লিশ হাজারের মতো সন্দেহভাজনকে- যারা কারারুদ্ধ ছিল কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট তৈরি হয়নি- তাদের তিনি মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে ক্ষমা করে জেলখানা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি হয়েছিল তাদের মামলা অব্যাহত রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর এক পর্যায়ে খন্দকার মোশতাক ও প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করে পদত্যাগ করেছিলেন। সায়েম সাহেব রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েই ১৯৭২ সালের কোলাবরেশন অ্যাক্ট বাতিল করে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে নতুনভাবে কোলাবরেটরদের বিচার আবার আরম্ভ করেছে। বিচার চলছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে মাত্র জনাদশেক কোলাবরেটরকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোলাবরেটরদের ফাঁসির দাবিতে গঠিত ব¬গার্স এন্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ব্লগার আরো বেশি সংখ্যায় প্রাণ হারিয়েছেন। যে ব্লগাররা প্রাণ হারিয়েছেন তারা এর মধ্যে বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছেন। গণজাগরণ মঞ্চের দ্বারা যারা লাভবান হয়েছেন তারা তাদের সুবিধা অনুযায়ী মনের মতো করে এর ইতিহাস প্রচার করছেন। গণজাগরণ মঞ্চের গণজাগরণের প্রকৃতি কি ছিল? গণজাগরণ মঞ্চের ভূমিকা ছাড়া ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এভাবে হতে পারত না। নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত সরকার গণজাগরণ মঞ্চকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর সরকার গণজাগরণ মঞ্চকে আর টিকতে দিতে চায়নি। তখন ছাত্রলীগের ভূমিকা কী ছিল? পরে ছাত্রদের যেসব আন্দোলন হয়েছে- সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার ফলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের জন্য আন্দোলন, বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের ও পরিবহন আইন সংস্কারের আন্দোলন- এগুলোতে ছাত্রলীগের ভূমিকা কী দেখা দিয়েছে? প্রচার মাধ্যম এ প্রশ্নের উত্তর সাপ্লাই দিয়েছে বা দিতে পেরেছে? এসব আন্দোলনে কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন। কেন, কীভাবে, কাদের দ্বারা তারা আহত হয়েছেন। সাত কলেজের অধিভুক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে আছে। নানা কারণে প্রতিষ্ঠার শতবর্ষের পর্যায়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মর্মগত দিক দিয়ে ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় পড়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতনের প্রক্রিয়া থেকে উত্থানের প্রক্রিয়ায় উঠতে পারবে কি? কোটা পদ্ধতি সংস্কারের যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা জাতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে আছে। নিরাপদ সড়ক আর পরিবহন নীতির সংলাপের জন্য চাপের মধ্যে সরকার যে আইন জারি করতে যাচ্ছে, তাতে সমস্যার যে কোনো সমাধান হবে তা মনে হয় না। সমস্যা অত্যন্ত জটিল। দেশে রাজনীতির যে অস্বাভাবিক রূপ ও প্রকৃতি তা নিয়ে জটিল কোনো সমস্যারই সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার আন্দোলনের চাপে কোনো সমস্যারই সমাধান না করে, নানা কৌশলে আন্দোলন দমন করে নিজের বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা করে থাকে। সরকার যে বাহাদুর, তাতে আমাদের কোনোই সন্দেহ নেই। সরকারি দলের ভেতরে আলোচনা-সমালোচনার ও মত প্রকাশের কোনো রেওয়াজ নেই। জাতীয় সংসদকে ‘মহান’ বলে অভিহিত করা হয়। আসলেই কি বর্তমান জাতীয় সংসদ মহান? সংসদের সদস্যরা মহৎপ্রাণ?

বাংলাদেশে বর্তমান সরকার অত্যন্ত শক্তিশালী। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত কখনো এত শক্তিশালী সরকার এ দেশে হয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধকালের কথা আলাদা। দেশে এখন কার্যকর কোনো বিরোধী দল নেই। দেশের জনগণের ওপর আস্থা হারিয়ে জনগণ কিছুই করতে পারবে না- এটা মনে করে সাম্রাজ্যবাদ রাষ্ট্রসমূহের স্থানীয় কূটনীতিকদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিচ্ছে। বাম দলগুলো কোনো শক্তির জানান দিতে পারছে না। জাতীয় পার্টি যথার্থ গৃহপালিত বিরোধী দলরূপে প্রভুদলের সেবায় নিয়োজিত। ছাত্রলীগ যে কোনো আন্দোলন দমনে পুলিশের সহযোগী এবং পুলিশের চেয়ে অনেক সক্রিয়। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্রদল বলা যায় নিস্ক্রিয়। বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে নিঃরাজনীতিকৃত। নির্বাচনকে বলা হয় ভোটের উৎসব। লোকে ভোটের উৎসব উপভোগ করে। প্রচার মাধ্যম মজার মজার খবর দেয়। টকশোতে জনপ্রিয় কথকেরা তাদের বাকচাতুর্য প্রদর্শন করে। মাঝে মাঝে আওয়ামী লীগ, বিএনপির মজাদার ঝগড়া দেখা যায়। প্রচলিত রাজনীতির বাইরে কোনো রাজনৈতিক চিন্তা নেই। সরকারি বুদ্ধিজীবীরা সরকারকে সব দিক দিয়ে ঠিকা দিয়ে রাখছে। এনজিও ও সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনগুলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অনুকূলে কাজ করছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভালো করার জন্য ভালো ভালো কথা বলছে। ভারত বাংলাদেশে তার অনুগত সরকার রাখার জন্য প্রকাশ্যে ও গোপনে ভীষণভাবে সক্রিয় আছে। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনে বাংলাদেশে তার অনুগত পুতুল সরকার কায়েম করার জন্য তৎপর আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন তাদের আধিপত্য রাখতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াচ্ছে, লাখ লাখ সৈন্য এনে যুদ্ধ চালাচ্ছে। তাতে জঙ্গিবাদ দেখা দিয়েছে। জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন মহাদেশের প্রায় বিশটি রাষ্ট্রে। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য বিশেষ বেগ পেতে হয় না। ডলার, মদের বোতল আর ককটেল পার্টি দিয়েই এখানে প্রায় সবাইকে গৃহপালিত বানিয়ে উদ্দেশ্য সফল করে নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর জনচরিত্র, রাজনৈতিক চরিত্র আর বৌদ্ধিক চরিত্র বাংলাদেশ থেকে একেবারেই ভিন্ন। বাংলাদেশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারত কি পারবে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে? শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাগ্যে কি আছে?

সাত কলেজের অধিভুক্তির ফলে সৃষ্ট সমস্যার জন্য, কোটা সংলাপের জন্য এবং নিরাপদ সড়ক ও পরিবহন আইন সংলাপের জন্য ছাত্ররা যে আন্দোলন চালিয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলের আশার অন্ত নেই। টকশোতে দৈনিক পত্রিকায়, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে বিখ্যাত লোকেরা ছাত্র-তরুণদের উদ্দেশ্যে পরম ভালো ভালো সব কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আমাদের দেখা দরকার ইতিহাস কী বলে। ইতিহাস বলে যে, তরুণদের সমস্যাভিত্তিক এই সব আন্দোলনকে হীন-স্বার্থান্বেষীরা তাদের দখলে নিয়ে নেয় এবং তা দ্বারা তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। ১৬৮০-র দশক থেকে যেসব আন্দোলন হয়েছে তার সবক’টির ভাগ্য এই রকমই হচ্ছে। হুজুগকেই বলা হয়েছে গণজাগরণ। বড় হুজুগকে বলা হয়েছে গণঅভ্যূত্থান। ১৯৯০-এর আন্দোলনকে বলা হয়েছে ‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থান’। আসলে এগুলো তো হুজুগ মাত্র; গণজাগরণও নয়, গণঅভ্যুত্থানও নয়। আন্দোলনের চরিত্র বুঝতে হয় আন্দোলনের নেতৃত্বে চরিত্রের দ্বারা।

ছাত্ররা অধিভুক্তিবিরোধী আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন ইত্যাদিতে যে শক্তির জানান দিয়েছে তার প্রশংসা করি। তাদের ভবিষ্যৎ ভাবতে হবে এবং ভবিষ্যতের বৃহত্তর প্রস্তুতি নিতে হবে। দূরদর্শী প্রস্তুতিবিহীন গতানুগতিক আন্দোলন দ্বারা বিশেষ সুফল অর্জন করা যায় না। যে অবস্থা দেখা দিয়েছে তাতে রাজনীতির উন্নতির জন্য গভীর চিন্তা ব্যাপক দলীয় প্রস্তুতি ও সাহসী ভূমিকা দরকার। জনগণ ঘুমিয়ে থাকলে হবে না।

লেখক ঃ প্রগতিশীল চিন্তাবিদ; সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

॥ মো. মইনুল ইসলাম ॥

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সুশাসন ও উন্নয়ন

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশবাসীকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। ছুটি-বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে যেভাবে তারা রাস্তায় নেমে এসেছে এবং যাদের অনেকেই কিশোর-কিশোরী, তার কারণ ও সমাধানের ব্যাপারে সরকারকে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে এবং দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেল, লক্ষাধিক বাস-ট্রাকের ফিটনেস সনদ নেই। ১৬ লাখ গাড়িচালকের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিক সমিতিগুলোকে ম্যানেজ করেই চলছে এসব গাড়ি (যুগান্তর ৩-৮-১৮)। ম্যানেজ করা মানে ঘুষ প্রদান। বলার অপেক্ষা রাখে না, দুর্নীতি এবং অদক্ষতার সনদ হচ্ছে সড়ক অব্যবস্থাপনা এবং দুর্ঘটনা। সড়কে দুর্ঘটনা এবং বহু মানুষের প্রাণ হারানোর খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে পাওয়া যায়। এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়া এবং দেশব্যাপী দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, মানুষের হয়রানি এবং মৃত্যুর খবর তরুণ শিক্ষার্থীদের অজানা নয়। এরই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যে এই আন্দোলন, তা সরকারি এবং বেসরকারি মহল থেকে স্বীকার করা হচ্ছে। ফার্মগেটে আমার গাড়ি আটকিয়ে এক তরুণ বলল, ‘বঙ্গবন্ধুই আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের কথা বলে গেছেন’, বৃষ্টিতে অনবরত ভিজতে ছিল ছেলেটি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মতো বড় ধরনের না হলেও কিছুদিন আগে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা চুরির ঘটনাটিও প্রসঙ্গক্রমে কিছুটা আলোচনা করতে হয়। এই লুটপাটের জন্য খনিটির ১৯ পদস্থ কর্মকর্তা দায়ী বলে অভিযোগ, যার মধ্যে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সাবেক কয়েকজন প্রধান নির্বাহীও আছে। দেখা যাচ্ছে, এই কয়লা চুরি দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কয়লা মজুদ এখন তলানিতে ঠেকায় এবং নিকটবর্তী বিদ্যুত কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের টনক নড়েছে। এ ঘটনায় শুধু দুর্নীতির ব্যাপকতাই ফুটে ওঠেনি, তাতে ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়ও ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, যার বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে অভিযোগ আছে, তাকে হজব্রত পালনের জন্য ৪২ দিনের ছুটি দেয়া হয়েছে। টঙ্গি এসি ল্যান্ডের অফিসে একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাও ছুটি নিয়ে হজ পালন করতে গেছেন। ওই অফিসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ তদন্ত করতে এসে একদল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘ঘুষের টাকায় হজ হয় কিনা?’ দেশে এখন এই দুর্নীতিবাজদেরই বেশি বেশি হজ এবং কোরবানির ঈদে বড় বড় গরু কোরবানি এবং রোজার ঈদে বেশি জাকাত দিতে দেখা যায়।

কিছুদিন আগে একটি দৈনিকে দেখা গেল, শিক্ষকদের এমপিও বা মান্থলি পে অর্ডার ভুক্তির ব্যাপারে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা দফতরের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষের ছড়াছড়ি। এ ব্যাপারে একজন প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য প্রতিবাদ জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু এই ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপারটি এত ব্যাপক যে, সরকারের এমন অফিস খুব কমই পাওয়া যাবে- যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ পাওয়া যায়। শুধু কোটা সংস্কারের ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলাই সন্ত্রাস নয়। ঘুষ-দুর্নীতিও এক ধরনের সন্ত্রাস, যা শারীরিকভাবে আহত করে না; তবে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মানুষ যে হেনস্তার শিকার হয়, তাকে নীরব সন্ত্রাস না বলে পারা যায় না।

এই দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের পটভূমিতে শিক্ষার্থীদের বর্তমান আন্দোলনকে বিচার করলে দেখা যাবে, এটা সরকারি প্রশাসনের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে এটা সুশাসন প্রতিষ্ঠারও দাবি। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ফিটনেস সার্টিফিকেট যাচাই করার কাজ ছাত্রদের নয়। প্রশাসন বা পুলিশ সেটা যথাযথভাবে এতদিন করেনি বলে তরুণ শিক্ষার্থীরা পথে নেমে এসেছে। এটাও এক ধরনের প্রতিবাদ। এটা স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। স্থায়ী ব্যবস্থা হল সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দক্ষতা, সততা ও দায়িত্বশীলতা। এ ব্যাপারেই এখন সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সুশাসনের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

দেশে সামগ্রিকভাবে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে। বিশেষ করে ভৌতিক অবকাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তাছাড়া অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে প্রায় ৭ দশমিকের কাছাকাছি জিডিপি প্রবৃদ্ধি তারই প্রমাণ। বিষয়টি শুধু আমাদের সরকারই দাবি করছে না; বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং জাতিসংঘও তার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ কৃতিত্ব অবশ্যই বর্তমান সরকারের পাওনা। তবে যা আমাদের দুঃখ দেয় তা হল, দুর্নীতির পরাজয় এবং তার সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। দুর্নীতি সৎ মানুষ, সৎ পরিশ্রম এবং সুনীতিকে মূল্যহীন করে তোলে।

এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ প্রতিদিন জীবিকা অর্জনের জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করে থাকে। এ পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী শহরের নানা ধরনের শ্রমিক ও কর্মী এবং গ্রামাঞ্চলের কৃষক। এদের একটি অংশ, যাদের অধিকাংশই মহিলা, পোশাক শিল্পে কাজ করে আমাদের জন্য প্রায় ৭৫ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। আরেকটি অংশ যাদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য এবং মালয়েশিয়ায় কাজ করে ১২শ’ কোটি ডলার দেশে পাঠায়। এই শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের শ্রম ও টাকায় সরকার চলে এবং উন্নয়নের রথ এগিয়ে চলেছে। এ উন্নয়নের মাত্রা আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত, যদি দুর্নীতি তা না খেয়ে নিত বা বাধাগ্রস্ত করত।

দেশব্যাপী দুর্নীতির এই দাপট সুশাসনের অভাবই তুলে ধরে। সুশাসন গণতন্ত্রের অন্যতম উপাদান। নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনীতিকদের যতটা আগ্রহ দেখা যায়, সুশাসনের ব্যাপারে ততটা দেখা যায় না। এ ব্যাপারে বর্তমানে বিএনপি বেজায় উচ্চকণ্ঠ। তাদের আমলে সুশাসন দেশ থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছিল। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ পর পর ৪ বার বিশ্বের সেরা দুর্নীতিবাজ দেশ বলে পরিচিতি পেয়েছিল। সুশাসনের ব্যাপারে রাজনীতিকদের নীরব থাকার কারণ বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে তাদের সম্পদ অর্জন এবং দক্ষতা প্রদর্শনে অসুবিধা হবে। নির্বাচনের ব্যাপারে তাদের বিশেষ উৎসাহের কারণ নির্বাচন ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি। সিঁড়িটি বেয়ে ক্ষমতার মসনদে বসে গেলে সিঁড়ির কথা মনে থাকে না। বরং নির্দ্বিধায় পায়ে ঠেলে ফেলে দেয়া যায়।

মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন দারিদ্র্য হ্রাস করে, যা যুগ যুগ ধরে দারিদ্র্যের অভিশাপে জর্জরিত আমাদের মানুষের জীবনে এক পরম আশীর্বাদের সূচনা করে। এর ফলে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অভাব হ্রাস পায়। তবে এর সঙ্গে যদি কাঙ্খিত পরিমাণে মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো বৃদ্ধি না পায়, তাহলে সে উন্নয়ন অর্থপূর্ণ হয় না। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে, উন্নয়ন তথা সার্বিক বিকাশ দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি চলমান আছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নটি বেগবান আছে বলা যায়। গত এক দশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও স্বীকৃতি পেয়েছে, যা আগেই বলা হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে, বর্তমান সরকারের বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও অঙ্গীকারবদ্ধতার কারণে। তাই তিনি যখন বলেন, তিনি শুধু পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান এবং প্রতিটি মুহূর্ত দেশের মানুষের চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন, তখন তা বিশ্বাস না করে পারা যায় না। কিন্তু সে ধরনের আন্তরিকতা ও অঙ্গীকার তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকর্মী এবং সরকারি আমলাদের মধ্যে দেখতে পেলে খুশি হতাম। তাহলে দুর্নীতি হ্রাস পেত, সুনীতি ও সুশাসনের প্রসার ঘটত এবং উন্নয়ন আরও বেগবান হতো। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মহলে যে উল্লাস দেখি, তাতে সাধারণ মানুষের উল্লসিত হওয়ার কারণ নেই। তাদের শাসনকালে ব্যাপক দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের রাজত্ব মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়ার কথা নয়। শুধু বিদ্যুতের অভাব এবং যন্ত্রণার স্মৃতিটি মনে করিয়ে দিলেই যথেষ্ট। এ সরকারের ক্রটি-বিচ্যুতি যে নেই, তা বলব না। তবে তার বিকল্প মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক এবং বিশ্বের সেরা দুর্নীতিবাজ দেশের তকমা উপহার দানকারীরা হতে পারে না। সুশাসন ও উন্নয়নের জন্য সুস্থ আন্দোলনকে স্বাগত। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তিকে ধিক্কার এবং প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া উপায় নেই।

লেখক ঃ সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

\ আসিফ রশীদ \

দুর্বৃত্তায়নের এই বলয় ভাঙতে হবে

আমাদের স্কুল ও কলেজ জীবনে ঢাকা নগরী বেশ ছিমছাম ছিল। রিকশায় ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগত। সে সময় বিদেশ থেকে, বিশেষ করে পাশের কোনো দেশ থেকে কেউ ঢাকায় এলে মুগ্ধ হয়ে যেতেন। দেখতে পেতেন পরিচ্ছন্ন নগরী। রাস্তাগুলো প্রশস্ত। যানজট নেই। যান চলাচলে নেই বিশৃঙ্খলা। প্রায় প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা।

ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও সব গাড়িচালক সিগন্যাল মেনে চলেন। মনে আছে, সে সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকা বেড়িয়ে গিয়ে কলকাতার দেশ ম্যাগাজিনে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন, যেখানে ঢাকা নগরী দেখে তিনি তার মুগ্ধ হওয়ার কথা তুলে ধরেছিলেন। লিখেছিলেন, ঢাকার তুলনায় কলকাতার অনেককিছুই ‘ম্যাড়মেড়ে’। আরও মনে পড়ে, আমার এক আত্মীয় কলকাতা বেড়িয়ে এসে বলেছিলেন, ওখানে কোলাহল, হৈ-হট্টগোল, কেউ সিগন্যাল মানে না, বিশৃঙ্খল অবস্থা- সে তুলনায় আমাদের ঢাকা অনেক ভালো। বিরানব্বইয়ে কলকাতা সফরে গিয়ে আমারও প্রায় একই অনুভূতি হয়েছিল। সত্যি বলতে কী, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকা অনেকটাই সহনীয় ছিল।

সেই দৃশ্যপট এখন পাল্টে গেছে। নগরীতে জনসংখ্যা বেড়েছে। কয়েকগুণ বেড়েছে যানবাহন। কিন্তু এসবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে আমরা নগরীর স¤প্রসারণ ঘটাতে পারিনি। গড়ে তুলতে পারিনি যথাযথ নগর ব্যবস্থাপনা। ফলে ঢাকা এখন এক বিশৃঙ্খল নগরী। প্রতিটি রাস্তায় যানজট। যত্রতত্র খানাখন্দ। রাস্তা খোঁড়া হয় যখন-তখন। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা দূরে থাক, ট্রাফিক পুলিশের সিগন্যালও কেউ মানতে চায় না। গণপরিবহন নিয়ম মানে না। যে যেমন খুশি চলে, যেমন খুশি থামে, যাত্রী ওঠায়-নামায়। ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রেও স্বেচ্ছাচারিতা। সিটিং সার্ভিস নাম দিয়ে আদায় করা হয় বাড়তি ভাড়া; যদিও চলে লোকাল বাসের নিয়মে। ওভারটেকিংয়ের জন্য এক বাস (আসলে মিনিবাস) আরেক বাসের গা ঘেঁষে চলে, যেন ক্রসকান্ট্রি রেস! এক বাস আরেক বাসকে ইচ্ছা করে আঘাত করতেও দ্বিধা করে না। তাই নগরীর মধ্যেও দুর্ঘটনার শিকার হয় মানুষ। একে তো যানজট, তার ওপর গণপরিবহনের অভাব; ফলে মানুষের জন্য অফিস-আদালত বা প্রয়োজনীয় স্থানে যাতায়াত হয়ে দাঁড়ায় দুর্বিষহ।

আগে এ নগরীতে বড় বড় বাস চলত, যা বেশি যাত্রী বহন করতে পারত। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মিনিবাস, যা রাস্তায় জায়গা দখল করে বড় বাসের সমানই; কিন্তু যাত্রী বহন করতে পারে না বেশি। শোনা যায়, কী এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নাকি পরিবহন শ্রমিক-মালিকরা মিলে রাস্তা থেকে বড় বাস উঠিয়ে দিয়েছে! এ নগরীতে যে সিএনজিচালিত বেবিট্যাক্সি চলে, সেগুলোর অবস্থাও অনেকটা বাসেরই মতো। বারবার ভাড়ার হার বাড়িয়েও কোনো বেবিট্যাক্সি চালককে মিটারে চলতে বাধ্য করা যায় না। তারাও চলে নিজেদের মর্জিমাফিক, যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে নির্ধারিত ভাড়ার কয়েকগুণ বেশি। সবকিছু মিলিয়ে অনেকের কাছেই এই নগরীকে মনে হয় নরকতুল্য। একান্তই চাকরি বা ব্যবসায়িক প্রয়োজন না থাকলে যে এখানে এত মানুষ বসবাস করত না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বহু বছর পর স¤প্রতি কলকাতা যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে যে পরিবর্তন দেখতে পেলাম তা চোখে পড়ার মতো। মূল কলকাতা নগরীর দালানগুলো পুরনো হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট জনবান্ধব। কোথাও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ দেখিনি। কোথাও কোথাও ফ্লাইওভারের উন্নয়ন কাজ চললেও জনভোগান্তি যথাসম্ভব কমানোর চেষ্টা রয়েছে। যানজট বলতে তেমন কিছু দেখিনি, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালে যেটুকু সময় গাড়ি আটকে থাকে সেটুকু ছাড়া। আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার হল, সিগন্যাল মেনে চলার প্রবণতা। সবাই সিগন্যাল মেনে চলে। এমনকি ভোরবেলায়ও দেখেছি, রাস্তা পুরো ফাঁকা থাকা সত্তে¡ও সিগন্যাল পড়ামাত্রই ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে গেল। কলকাতায় কোনো মিনিবাস দেখিনি। অল্পকিছু বড় বাস চললেও সেগুলো ট্রাফিক শৃঙ্খলা মেনে চলে। কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতা নেই। বেবিট্যাক্সিও কম। ট্যাক্সি আছে নানা ধরনের। সেগুলো নিয়ম মেনে চলে। বিমানবন্দর, রেলস্টেশনসহ কয়েকটি জায়গায় রয়েছে প্রিপেইড ট্যাক্সিক্যাব, নগরীতে নতুন কেউ এলে তাকে ঠকানোর সুযোগ কম। কলকাতায় প্রাইভেট কারই বেশি। ভারতে তিন থেকে ছয় লাখ টাকার মধ্যে নতুন গাড়ি পাওয়া যায়। আট লাখে মেলে নতুন হোন্ডা এইচআরভি জিপ! ফলে যে কোনো মধ্যবিত্ত গাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখে। তবে কলকাতার সবচেয়ে অসাধারণ বাহন মেট্রোরেল নামে পরিচিত পাতালরেল। এর মাধ্যমে মাত্র ১০ টাকায় পার্ক স্ট্রিট থেকে দমদম পর্যন্ত যাওয়া যায় অতি অল্প সময়ে। দেখেশুনে মনে হল এ নগরীতে সবকিছুতেই গণমানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, আমাদের রাজধানীতে যা অনুপস্থিত।

ঢাকা কখনও কলকাতার সঙ্গে তুলনীয় নয়। ঢাকা একটি রাষ্ট্রের রাজধানী, আর কলকাতা রাজ্যের। তারপরও ঢাকার সঙ্গে কোনো শহরের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বা অন্যকিছুর তুলনা করতে গেলে প্রথমেই কলকাতার নামটি চলে আসে। এর কারণ হল উভয়ই দুই দেশের বাঙালির প্রধান শহর। তাছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও এ তুলনার একটি কারণ বৈকি।

ঢাকায় এতদিনে মেট্রোরেল নামের উড়াল রেলব্যবস্থা নির্মিত হচ্ছে বটে, তবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের স্বার্থ কাটিয়ে এটি কতটা জনবান্ধব পরিবহন হয়ে উঠবে, তা নিয়ে সংশয় দূর করতে পারি না। মনে পড়ে, বাস মালিক-শ্রমিকদের প্রতারণা বন্ধে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সিটিং নামের চিটিং সার্ভিস উঠিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু জেনেশুনে শেষমেশ তাকেও পিছু হটতে হয়েছে। আরও শুনি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকামুখী ট্রেনের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কেউ দিনে ঢাকায় এসে কাজ শেষে দিনে ফিরে যেতে না পারেন। সবই নাকি চলছে বাস মালিকদের স্বার্থে! ট্রেনের পরিবর্তে যেন যেতে হয় বাসে! এই যখন অবস্থা, তখন সরকার চাইলেও কি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা জনবান্ধব করা সম্ভব?

হ্যাঁ, সম্ভব। যদি দেশের প্রধান নির্বাহী এদিকে দৃষ্টি দেন। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’ তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে দেশের পরিবহন সেক্টরে যে দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে, তা নির্মূলে প্রধানমন্ত্রীর বাধা কোথায়? পরিবহন সেক্টরের দুর্বৃত্তায়ন কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, হানিফ এন্টারপ্রাইজ বাসের তিন কর্মচারী যেভাবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্র পায়েলকে হত্যা করেছে সে ঘটনাই এর বড় প্রমাণ। কিংবা রোববার বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস যেভাবে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং অনেকের আহতের কারণ হয়েছে সেই ঘটনাটির কথাই ধরুন।

এ ক্ষেত্রে দুই বাসের রেষারেষি দায়ী বললে সবটা বলা হয় না। এ বাসগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে সিটিং সার্ভিসের নামে ভাড়া আদায় করে থাকে। সেই হিসেবে ঘাতক বাসটির ওই স্থান থেকে যাত্রী তোলার কথা নয়। কিন্তু যত্রতত্র যাত্রী তুলতে গিয়েই তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই সেক্টরটি যেভাবে চলছে, যে নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কোনো সভ্য দেশের উদাহরণ হতে পারে না। অনেক অনিষ্টের মূলে রয়েছে দেশের পরিবহন খাত। এরা মানুষ খুন করেও বিচার মানতে নারাজ! এদের আর এভাবে চলতে দেয়া উচিত নয়। এ ব্যাপারে কিছু একটা করার সময় এখনই।

স¤প্রতি রামপুরা-বাড্ডা-প্রগতি সরণি এলাকায় হাতিরঝিল প্রকল্পের নর্থ ইউ-লুপ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যানজট নিরসনে নিজের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেছেন, সমগ্র ঢাকাকে ঘিরে একটি এলিভেটেড রিং রোড নির্মাণ করা হবে, যানবাহন শুধু রাস্তা দিয়ে নয়, উপর দিয়েও চলবে। ভবিষ্যতে পাতালরেল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছেন ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট ট্রেন চালু করার কথা। মানুষ ঢাকায় দিনে দিনে কাজ সেরে যে যার গন্তব্যে যেন ফিরে যেতে পারেন সে লক্ষ্য থেকেই এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সন্দেহ নেই খুবই জনবান্ধব পরিকল্পনা। কিন্তু কায়েমিগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যে প্রবণতা দেশে চলে আসছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, সেটা ভেঙে দিতে না পারলে যে পরিকল্পনাই নেয়া হোক না কেন, তা কখনও জনবান্ধব হয়ে উঠবে না।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার একটা ব্যাপার থাকে, যেটা ভারতে আছে; কিন্তু আমাদের দেশে নেই। আর নেই বলেই সব ক্ষেত্রে কায়েমিগোষ্ঠী তার স্বার্থরক্ষায় তৎপর থাকে। এতে জনস্বার্থ হয় উপেক্ষিত। এখানে ট্রেনের টিকিট কাটার মতো সামান্য বিষয়েও একজনকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। টিকিট হয়তো পাওয়া গেল, কিন্তু সিটটি পাওয়া যায় না কাঙ্খিত স্থানে। আপনি হয়তো এসি বার্থ বা চেয়ারে যেতে চাইছেন; কিন্তু বলা হবে- টিকিট নেই, সব বুকড হয়ে গেছে। সবকিছুই যেন ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষিত! আসলে এসব ক্ষেত্রেও চলছে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন। সাধারণ মানুষ এখানে অপাঙ্ক্তেয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই দুর্বৃত্তায়নের বলয় শক্ত হাতে ভেঙে দিন। জনগণ আপনাকে মনে রাখবে।

লেখক ঃ সাংবাদিক

 

॥ আহমদ রফিক ॥

এ লজ্জা আমরা কোথায় লুকোবো

মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি নারী, বিশেষ করে তরুণী ও গৃহবধূদের ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে, মানসিক ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। এ ব্যাপারে সৌদি আরবিদের অগ্রগণ্য ভূমিকা- মহানবীর (স.) দেশ হিসেবে যে ভূখন্ডের প্রতি মুসলমান সমাজ-শ্রদ্ধা ভরে মাথা নোয়ায়, সে দেশের সমাজে এমন জঘন্য অনাচারী তৎপরতা! মনে হয় বিদেশিদের জন্য বিশেষত বাংলাদেশিদের জন্য সেখানে কোনো সুশাসন নেই, আইনি ব্যবস্থা নেই।

দু’চারটে ঘটনা নয় শত শত তরুণী ও গৃহবধূ নারীকর্মী, বিশেষ করে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে গিয়ে অবিশ্বাস্য যৌন নির্যাতনের শিকার যেন ফাঁদে আবদ্ধ হরিণী। পরিস্থিতি এমনই যে কোনোভাবেই ওই ফাঁদ থেকে উদ্ধার পাওয়া বা মুক্তির কোনো সুযোগ নেই, সুবিধা নেই। সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিবারের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে অল্পশিক্ষিত এসব নারী মধ্যপ্রাচ্যে (সৌদি আরবে) গৃহকর্মে নিযুক্ত অবস্থায় মহাবিপদের সম্মুখীন।

সংখ্যাটি বেশ বড়। যৌন নির্যাতনও সেই মাপের। বিদেশিদের জন্য ওদের আইন-কানুন হয়তো এমনই বা পরিস্থিতি এমনই যে অত্যাচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা বা সুবিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত নিরুপায় বাংলাদেশি তরুণী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু ঘটনাবলে, তারা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

বেশ কিছুদিন থেকে এ জাতীয় ঘটনা ফাঁস হচ্ছে, মাঝেমধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে। কিন্তু অনাচারের মূলোচ্ছেদে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। খবরের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবাদী লেখালেখিও হচ্ছে, তা সত্ত্বেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মাসখানেক আগে অনেক খবর একসঙ্গে সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছিল বলেই ওইসব লেখা।

আমরা জানতে চাই, সেসব জঘন্য ঘটনার কী ব্যবস্থা নিয়েছেন সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহল। এসব নির্যাতনের কি কোনো ক্ষতিপূরণ হয়, না হতে পারে? কিন্তু দেশের সংবিধান মাফিক দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তো রাষ্ট্রযন্ত্রের তা দেশে হোক বা বিদেশেই হোক।

এ সমস্যা কিন্তু যৌন নির্যাতনেই সীমাবদ্ধ নেই, এ সমস্যা যেমন তাদের মুক্তি ও নিরাপদে দেশে ফেরা নিয়ে, তেমনি স্বদেশে তাদের পারিবারিক পুনর্বাসন নিয়ে, সর্বোপরি অপরাধীর যথাযথ শাস্তি বিধান নিয়ে। একমাত্র দেশে ফেরার ব্যবস্থা ছাড়া আর কোনো সমস্যারই সমাধান হচ্ছে বলে মনে হয় না।

দুই.

বাংলাদেশ ঘন জনবসতির দেশ, অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বিস্ফোরণের এমন এক ভূখন্ড যেখানে সেই সমস্যা সম্পর্কে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই, জন্ম নিয়ন্ত্রণের যথোচিত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেয়ার দায়ও যেন কারো নেই এবং একে বলা হচ্ছে জনসম্পদ- যা আসলে সম্পদ নয়, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিশ্চিত অভিশাপ। যে দেশে শিক্ষার হার অবিশ্বাস্য মাত্রায় কম, বিশেষ করে নারীশিক্ষা, গরিব পরিবারে নারীশিক্ষা, যেখানে বেকারত্ব তরুণদের বাধ্য করছে অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রার চেষ্টায় মৃত্যুর মুখোমুখি হতে, গ্রামের বা ছোট শহরের দরিদ্র পরিবারের অভাব মেটাতে বিদেশে (বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরবে) তরুণী ও তেমনি বয়সী গৃহবধূদের গৃহকর্মী হিসেবে পাড়ি জমাতে এবং যৌন নির্যাতনের লজ্জায় মুখ ঢাকতে, সেখানে কীভাবে বলা যাবে অপরিমিত এই জনসংখ্যা আমাদের ‘সম্পদ’?

শাসনযন্ত্র আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে পারে এই ভেবে যে এদের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে পেট্রোডলার অর্জন (রেমিটেন্স) বাড়ছে এবং তা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করছে- আমাদের প্রশ্ন তা কিসের বিনিময়ে? ওই অভিশপ্ত গৃহকর্মীদের বাধ্যতামূলক ইজ্জতদানের কান্নায়?

এ কান্না, এ যন্ত্রণা, এ দুর্দশা মুখ খুলে বলার নয়, তবু যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে নির্যাতিতরা সব লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে তাদের নির্যাতনের কথা, তাদের কান্নার কথা বলতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেকে বাড়িতে সংবাদ জানিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে জানাচ্ছেন, যন্ত্রণার অসহনীয় হয়ে ওঠায় অনেকে স্থানীয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন ওই অপমান আর লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে, কখনো স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছেন।

ঘটনা এমনই করুণ, রাষ্ট্রের পক্ষে এতটাই লজ্জাজনক যে বাংলাদেশ দূতাবাস ওই নির্যাতিতাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খুলতে বাধ্য হচ্ছে, বিশেষ করে সৌদি আরবে। তাতেও হুঁশ নেই আমাদের সংশ্লিষ্ট মহলের। দেশের মর্যাদা, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়া নিয়েও তাদের কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই, আর ডলার এলেই তারা খুশি, বিনিময়ে নারী-নাগরিক তার সম্ভ্রমসহ সব কিছু হারাক, ক্ষতি নেই। সরকার কি একবার ভেবে দেখেছেন যৌন নির্যাতনের শিকার এসব তরুণী-নারীর ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাদের পরিবার কি সব কিছু জেনে তাদের সম্মানে পরিবারে ঠাঁই দেবে? দিলেও কী হবে তাদের মানসিক ও পারিবারিক মর্যাদার?

না, এসব নিয়ে কেউ ভাবেন না, ভাবছেন না। ভাবলে গত কয়েক বছর ধরে বিদেশে বাংলাদেশি নারীর এসব দুর্দশার পর তারা তাদের অদক্ষ নারী জনশক্তি তথা নারী গৃহকর্মীদের বিদেশে পাঠানো বন্ধ করতেন, নিষিদ্ধ করতেন এ ধরনের নারী শ্রমিকদের বিদেশযাত্রা। কারণ তাদের প্রায় সবাই পরিস্থিতির শিকার, না জেনেশুনে বিষপান তাদের।

এর দায় যেমন পরোক্ষ তাদের তেমনি তার চেয়ে বেশি দায় সরকারি নীতির এবং বিদেশে নারীকর্মী পাঠানোর লোভী এজেন্সিগুলোর, ঠক দালাল চক্রের। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কি এসব ঘটনা অজানা? তারা কি এ ধরনের নারী পাচারকারী দালালচক্রের অন্যায় ও অবৈধ কার্যক্রম সম্বন্ধে অবহিত নন? কোনো ব্যবস্থা কি নেয়া হয় এসব অসৎ, অসাধু ব্যবসায়ীচক্রের বিরুদ্ধে? এ পর্যন্ত কি নেয়া হয়েছে?

বিস্ময়কর যে, যথেষ্ট মাত্রায় না হলেও এসব অমানবিক ঘটনা নিয়ে কিছু লেখালেখি তো পত্রপত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, তথ্য-উপাত্ত বাস্তব ঘটনার করুণ কাহিনী সেসব লেখায় প্রকাশ পাচ্ছে। এ জাতীয় লেখা কি সংশ্লিষ্ট মহলের চোখে পড়ে না? আন্তর্জাতিক খবরাদি কি তাদের জানার বাইরে? তেমনটি তো হওয়ার কথা নয়, তবু তারা নীরব, নিশ্চেষ্ট। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সব খবরই তো ভেসে বেড়াচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অজানা থাকার কথা নয়। তাদের জানা মোট কত লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত এবং তা কোথায়, কোন কোন দেশে। দেশ বিচারে এসব কর্মীর সংখ্যা ও অবস্থানও তাদের নখদর্পণে থাকার কথা। আছেও। তা ছাড়া এসব তথ্য আমাদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত।

তা ছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাবের খাতায় সব তথ্যের খুঁটিনাটি ধরা রয়েছে। একাধিক সূত্রের তথ্য মতে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর সংখ্যা ২০ লাখেরও কিছুটা বেশি। এর মধ্যে ১০ লাখের বেশি নারী গৃহকর্মীর অবস্থান সৌদি আরবে। এ দিক থেকে সৌদি আরব সবার থেকে এগিয়ে। তাদের হাতে পেট্রোডলারও সবার চেয়ে বেশি, আর নারী গৃহকর্মীর প্রয়োজনে তাদের সবচেয়ে বেশি।

আমরা আমাদের নিম্নস্তরের নারীদের শ্রম বিক্রিতে বোধহয় অনেক দেশেরই ওপরে। এবং তা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে। আমাদের দেশের গরিব পরিবারগুলোও তাদের মেয়েদের বিদেশে ডলার অর্জনের জন্য পাঠাতে ব্যাকুল। আমাদের নিজস্ব হিসাবমতেই প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী অদক্ষ নারী শ্রমিক একাধিক দেশে কর্মরত; তার মধ্যে আড়াই লাখই সৌদি আরবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ তথ্যাদি থেকে দেখা যায় এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী গৃহকর্মী সৌদি আরবে যৌন নির্যাতনের শিকার। তাই গত কয়েক বছর ধরে তাদের ঘরে ফেরার আর্তিও প্রবল এবং তা যে কোনো মূল্যে। অর্থাৎ শ্রমের মূল্য না পেয়েও তারা ঘরে ফিরতে ব্যাকুল, মূলত যৌন নির্যাতনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। তাদের যন্ত্রণার কাহিনী সংবাদপত্রে মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়, পায় ঘরে ফেরার মর্মন্তুদ কাহিনী।

এই তো সপ্তাহখানেক আগে একটি দৈনিকে সংবাদ শিরোনাম ‘তাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা’। এ প্রতিবেদনেও প্রকাশ পেয়েছে যৌন নির্যাতনের যন্ত্রণায় ঘরে ফেরা নারীদের করুণ কাহিনী। তাদের কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা, পরিবারে ফেরার উপায় নেই। কোথায় যাবে তারা? কে তাদের বিশ্বাস করবে যে তাদের এ অবস্থার কারণ সৌদি পুরুষ তথা গৃহকর্তাদের যৌন লালসা যা জবরদস্তিমূলক।

কোথায় আশ্রয় মিলবে বা কোথায় শেষ অবস্থান এই হতভাগিনীদের? পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার অবসান ঘটাতে তাদের এই সর্বনাশ। সর্বনাশ ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক জীবনে, আর বিবাহিতাদের সর্বনাশ তাদের দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে। আবারো বলি, এদের দুর্ভাগ্যের দায় কে নেবে? তাদের পরিবার? না, আমাদের সংশ্লিষ্ট সরকারি মহল?

ওই দৈনিকের সূত্র মতে, শুধু সৌদি আরব থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মাত্র গত আড়াই মাসে দেশে ফিরেছেন ৫০০ নারী গৃহকর্মী। গত তিন বছরে এই সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি। কী চমৎকার সম্মানজনক একটি পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য! এক কথায় বলতে হয় রেমিটেন্স নামক এক লোভের ঘেরাটোপে বন্দি এসব নারী- এদের ভবিষ্যৎ জীবন শেষ। আর ওই ঘেরাটোপ  তৈরির দায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রেরও কম নয়, তাদের লোভ এবং উদ্যোগও কম নয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তাড়নায় তাদের তরুণীদের বলিদানের ব্যবস্থা করতে।

নিদারুণ অপ্রিয় এ কথাগুলো বলছি এ কারণে যে এ অবৈধ ও অন্যায় কাজগুলো করা হচ্ছে সব জেনেশুনে। আর না জেনেশুনে প্রতারিত হচ্ছেন নির্যাতিত নারীরা। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা নাকি আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, নারী গৃহকর্মীদের এরপর থেকে যাচাই-বাছাই করে তবেই পাঠানো হবে।

আশ্চর্য, তবু তারা অন্তত সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করবেন না? এতই তাদের লোভ সৌদি পেট্রোডলারের। এ বিষয়ে কী বলতে পারি আমরা,  নৈতিক প্রতিবাদ ছাড়া? উচ্চ আদালত কি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবেন ভবিষ্যৎ হতভাগিনীদের বাঁচাতে? তারা তো অনেক ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রুল জারি করেন  নৈতিকতার পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে। তাই আমাদের আবেদন তাদের কাছে যাতে কিছু জীবন সর্বনাশের আগুন থেকে রক্ষা করতে তারা কি এগিয়ে আসবেন না?

লেখক ঃ ভাষা সংগ্রামী, কবি ও গবেষক।

॥ বদরুদ্দীন উমর ॥

কোথায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের এখন বড়ই দুঃসময়। যা আগে কল্পনাও করা যেত না সেই সব ঘটনা এখন ঘটছে। গত রোববার ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বাসের ধাক্কায় দুই ছাত্রছাত্রীর নিহত হওয়ার ঘটনার পর বিমানবন্দর এলাকাজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রছাত্রীরা বের হয়ে সড়ক অবরোধ করে তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কারণ এখনকার বাংলাদেশে প্রতিবাদ জানানোর অন্য কোনো পথ খোলা নেই। এর বিরুদ্ধে মিছিল বের করলে পুলিশের লাঠিতে অনেকের হাত-পা ভেঙে যাবে, মাথা ফেটে যাবে।

সংবাদপত্র রিপোর্ট অনুযায়ী দুটি বাস রেষারেষি করে অন্যটিকে পেছনে ফেলার উন্মাদ চেষ্টা করতে গিয়েই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনাকে আসলে দুর্ঘটনাও বলা চলে না। কারণ অদক্ষ লোকদের বাস চালানোর ক্ষেত্রে এখানে কোনো বাধা নেই। সরকার থেকে নিয়ে সরকারের তাঁবেদার বাস কর্মচারী সমিতির এ বিষয়ে খেয়াল ও নজরদারির কোনো ব্যাপার নেই।

টাকা-পয়সা খেয়ে অদক্ষ বাস চালক নিয়োগ, রাস্তায় চলার অযোগ্য বাস-ট্রাক চলতে দেয়া, দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দেয়া, বাস মালিক ও বাস চালকদের শাস্তি না দেয়া ইত্যাদি অতি পরিচিত কারণেই রাস্তার দুর্ঘটনা এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, প্রতিদিন এর ফলে ৮/১০/১৫ জনের মৃত্যু হচ্ছে।

এক হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান আফগান যুদ্ধে প্রতিদিন যত লোকের মৃত্যু হচ্ছে তার থেকে বেশিসংখ্যক লোকের মৃত্যু হচ্ছে বাংলাদেশে শুধু বাস দুর্ঘটনায়!

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রী ও সরকারি সড়ক পরিবহন সমিতির সভাপতি তার সরকারি অফিসে বসে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘ভারতের মহারাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে; কিন্তু এ নিয়ে আমরা যা করি সেটা তারা করে না।’

অর্থাৎ তারা শোরগোল-প্রতিবাদ না করলেও আমরা তা করছি! প্রথমত, একথা তাকে কে বলল যে, ‘এটা তারা করে না’? তারা নিশ্চয়ই করে এবং করেছে, তবে দুই দেশের পরিস্থিতির ভিন্নতার কারণে তারা এটা করে অন্যভাবে। তারা এসবের বিরুদ্ধে অবশ্যই জোরালো প্রতিবাদ করে।

দ্বিতীয়ত, ভারতীয়রা কী করে, এ প্রশ্ন বাদ দিয়ে বলা দরকার, যেখানে সদ্য দুই তরুণের প্রাণ এভাবে চলে গেল বাস দুর্ঘটনায়, সেখানে দেশের একজন মন্ত্রী কিভাবে এরকম দায়িত্বহীন ও নিষ্ঠুর বক্তব্য প্রদান করতে পারেন, নিজেদের এ ব্যাপারে দায়িত্ব সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে?

শুধু তাই নয়, সাংবাদিকদের সঙ্গে এসব কথা বলার সময় তিনি যেভাবে হাসাহাসি করেছেন, এটা পরিস্থিতির আরেক দিক। এর থেকে কি বোঝা যায় না আমরা কোন ধরনের সমাজে, শাসনব্যবস্থায় ও সরকারের অধীনে এখন বসবাস করছি? এর থেকে কি বোঝা যায় না, কী ধরনের লোকজন এখন মন্ত্রিত্বের গদিতে বসে দেশ শাসন করছে?

তিনি নিশ্চয়ই দাবি করেন যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এর থেকে বোঝার কোনো অসুবিধা আছে দেশ আজ কোন্ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে?

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রী দিয়া খানম মিমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম দৈনিক যুগান্তরের প্রতিনিধির কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘তার মেয়ে মারা গেল অথচ কেউ তাকে সান্ত¡না দিতে এলো না। উল্টো শুনলাম আমার মেয়েসহ দু’জন মরার কথা বলতে বলতে আমাগো অভিভাবক মন্ত্রী শাজাহান খান নাকি হাসতেছিলেন। কী বলব ভাষা নেই। দুঃখে আমার বুকটা ভাইঙ্গা আসছে’ (যুগান্তর, ৩১.০৭.২০১৮)।

বর্তমান সরকারি শাসনব্যবস্থায় সারা দেশে যে বেহাল অবস্থা এবং অদৃষ্টপূর্ব  নৈরাজ্য বিরাজ করছে তার এই মুহূর্তের একটি উদাহরণ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন, তাদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কিছু নৈতিক চেতনাসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল শিক্ষক নির্যাতিত ছাত্রদের পক্ষে দাঁড়িয়ে শহীদ মিনারের সভায় বক্তব্য দেয়ার সময় ছাত্রলীগের গুন্ডাবাহিনী দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়া, শিক্ষকদের এভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের সমাবেশে অধ্যাপক আকমল হোসেনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি, সম্পাদকসহ সরকারসমর্থক লোকদের অবিশ্বাস্য প্রতিক্রিয়া একই সূত্রে গাঁথা।

সরকারসমর্থক শিক্ষক সমিতির নেতাদের বক্তব্য এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের উপরোক্ত বক্তব্যের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত ঐক্য আছে তার মধ্যে দেখা যায় জনগণ আজ কী ধরনের শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতাসীনদের হাতে জিম্মির জীবনযাপন করছেন।

যে দু’জন শিক্ষককে শহীদ মিনারের সভায় লাঞ্ছিত করা হয়েছিল তাদেরকে ছাত্রলীগের গুন্ডারা জিজ্ঞেস করেছিল, তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি কেন? মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তারা কথা বলার অধিকার কোথায় পেলেন? কীভাবে তারা সরকারের সমালোচনা করতে পারেন?

নিপীড়নবিরোধী শিক্ষকদের সভায় অধ্যাপক আকমল হোসেন যথার্থভাবেই বলেছিলেন, কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কোনো সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্রের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানে বন্দি থাকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, যদিও তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নেতা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে সামরিক বাহিনীর হাতে সপরিবারে আটক থাকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। তাতে কী এসে যায়। এই বক্তব্যের মধ্যে দোষের কী আছে? এর মধ্যে সত্যের অপলাপ আছে, না এর মধ্যে আছে সত্যের বিকৃতি?

কিন্তু তা সত্ত্বেও এই বক্তব্যকে বিকৃত করে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি নামে সংগঠনটির নেতারা অধ্যাপক আকমলের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তাকে শাস্তি দিতে বলছেন! এর থেকে বিপজ্জনক ব্যাপার ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের মতো বিদ্যাপীঠে আর কী হতে পারে?

অধ্যাপক আকমল হোসেনের উপরোক্ত বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ৩০ জুলাই বুধবার এক মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।

সে প্রসঙ্গে এক বিবৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা মনে করি তার (অধ্যাপক আকমল হোসেন) এ ধরনের বক্তব্য ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী, সংবিধানবিরোধী এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।

এসব মিথ্যা ও দুরভিসন্ধিমূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই চক্র গোটা আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার হীন ও গভীর চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

আমরা বিস্মিত হই এই ভেবে যে, এ ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য সত্ত্বেও এই সমাবেশের আয়োজকরা তার এ বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ তো করেনইনি, বরং বাহবা দিয়েছেন। ঘটনা পরম্পরায় প্রতীয়মান হয় যে জনাব আকমল হোসেনের এই বক্তব্য তার একক বক্তব্য নয়, এটি সেই অতি প্রতিক্রিয়াশীলদের অপভাবনার বহিঃপ্রকাশ, যারা মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বারংবার বিতর্ক তৈরির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করে তারা শুধু মুক্তিযুদ্ধকেই নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত করেছে।’

অধ্যাপক আকমল হোসেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে তার উপরোক্ত বক্তব্য প্রদান করে বর্তমান পরিস্থিতিতে যে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তো একপ্রকার নিরীহ মানুষ, শিক্ষকতা করেছেন কিন্তু কোনো দুষ্টচক্রের সঙ্গে কোনোদিন সম্পর্কিত থাকেননি।

এখানে বলা দরকার, তিনি হলেন সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সমিতির সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠনটি কোনো দুষ্টচক্র নয়। উপরন্তু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ক্ষেত্রে সব থেকে শক্তিশালী দুষ্টচক্রের বিরোধিতাই এর ঘোষিত লক্ষ্য। শিক্ষক সমিতির সভাপতি-সম্পাদকের বক্তব্য অনুযায়ী ‘আকমল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে, মুক্তিযুদ্ধকে আঘাত করেছেন এবং তার কর্মের দ্বারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব পর্যন্ত বিপন্ন।’

এমন কথা শুনে যে কোনো সৎ ও ওয়াকিবহাল লোকেরই যারপরনাই বিস্মিত হওয়ার কথা। শুধু তাই নয়, অধ্যাপক আকমল হোসেনের বিরুদ্ধে যেভাবে এই সব সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি মর্যাদাসম্পন্ন বিদ্যাপীঠের শিক্ষক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে করার মতো অবস্থায় এসেছেন এর থেকে বিপজ্জনক অবস্থা একটা দেশের পক্ষে আর কী হতে পারে?

এর থেকে বোঝার কি কোনো অসুবিধা আছে যে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন কতখানি বিপন্ন, বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ আজ দেশের কত গভীরদেশ পর্যন্ত তার ডালপালা বিস্তার করেছে?

প্রকৃতপক্ষে অধ্যাপক আকমল হোসেন শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনা কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অপারগ হওয়ার কথা যেভাবে বলেছেন, তার মধ্যে সত্যতা ছাড়া আর কী আছে? তাছাড়া তিনি তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাদেরকে কোনোভাবেই দোষারোপ করেননি।

উপরন্তু তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও বড় কাজ করা যায়। যারা তার বক্তব্যকে বিকৃত করে ইতিহাস বিকৃতির কথা বলছেন, আসলে তারাই হলেন সবচেয়ে বিপজ্জনক ইতিহাস বিকৃতিকারী।

যারা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে, এর ইতিহাস ও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত তারা জানেন, এ ধরনের কথাবার্তা ও হুমকি ফ্যাসিবাদেরই বৈশিষ্ট্য। সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কে নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি-সম্পাদকের কথাবার্তার মধ্যে অন্তর্নিহিত ঐক্যের কথা আগেই বলেছি। কিন্তু শুধু এ দুই ক্ষেত্রেই নয়, সর্বক্ষেত্রেই আজ ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশের জনগণের জীবনকে ত্রাস ও বিপদের মধ্যে রেখেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন অনুষ্ঠানে সমিতির সভাপতি বলেন, ‘আমরা আশঙ্কা করেছি কোটা আন্দোলন এ দেশের ছাত্রদের অধিকারের আন্দোলন নয়।

কোটা আন্দোলন হল নির্বাচনের বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমতা নেয়া যায় তার আন্দোলন। এ আশঙ্কা আমরা সেদিন থেকে করেছিলাম। আর সেদিনকার হাততালি থেকে সে আশঙ্কা প্রমাণিত হল।’

কিসের তাদের এই অদ্ভুত আশঙ্কা হাততালির কারণে প্রমাণিত হল? প্রমাণ সম্পর্কে এই শিক্ষকদের ধারণা কী? যাই হোক, এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও বলেন, ‘কোটা আন্দোলনের ভেতর জামায়াত-বিএনপি ঢুকেছে। আয়োজকরা অধ্যাপক আকমলের বক্তব্যের পর কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া করেনি।

অধ্যাপক আকমল হোসেন যে অপরাধে অপরাধী আয়োজকরাও একই অপরাধের অপরাধী। আয়োজকরা তাদের বসিয়ে রেখে হাততালি দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এই হাততালি ছাত্রশিবির-বিএনপি-ছাত্রদলের হাততালি।’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক কটূক্তিকারী শিক্ষক অর্থাৎ অধ্যাপক আকমল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ক্ষমতামদমত্ত অবস্থায় যেসব উক্তি করেছেন তা অবশ্যই ধিক্কারযোগ্য। তিনি যা বলেছেন তার থেকে মনে হয়, বাংলাদেশে এখন সরকারবিরোধী লোকদের সভা-সমাবেশে হাততালি দেয়ার অধিকার পর্যন্ত নেই, থাকা উচিত নয়। হাততালি দিলে তার দ্বারাই প্রমাণিত হবে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী!

সমিতির সভাপতি তার বক্তৃতায় বলেছেন, কোটা আন্দোলনের ভেতর জামায়াত-বিএনপি ঢুকেছে। অবাক ব্যাপার! তারা ঢুকলে অসুবিধা কী? এ ধরনের ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনে শুধু জামায়াত-বিএনপি কেন, সব দলের ছাত্ররাই (শুধু ছাত্রলীগের গুন্ডারা ছাড়া) যোগ দিয়েছে।

তার মধ্যে বড় সংখ্যায় আছে নানা বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং অন্য দলের ছাত্ররাও। এমনকি ছাত্রলীগের গুন্ডারা ছাড়া কিছু আওয়ামীপন্থী ছাত্ররাও। এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে দোষের কিছু নেই, অস্বাভাবিক কিছু নেই।

সব রকম বড় ছাত্র আন্দোলন, গণআন্দোলনেই এটা ঘটে থাকে। কাজেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের রাষ্ট্রদ্রোহী, অপরাধী ইত্যাদি বলার মধ্যে উন্মাদতুল্য ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কী আছে? এদের ঔদ্ধত্য কোন্ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তার অন্য একটা উদাহরণ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য কর্তৃক কোটা আন্দোলনকারীদের তালেবান বলে আখ্যায়িত করা! এসবের মধ্যে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ও শিক্ষা পরিবেশের দুর্দশার এক করুণ চিত্রই দেখার মতো এবং আতঙ্কিত হওয়ার মতো ব্যাপার।

অধ্যাপক আকমলের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে এবং তার ‘অপরাধের’ জন্য শাস্তির দাবি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির বিজ্ঞ সভাপতি এক চমকপ্রদ সুপারিশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে।

৩৭ বছর শিক্ষকতা জীবনে অধ্যাপক আকমল হোসেন কী পড়িয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সেটা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক আকমল ৩৭ বছর শ্রেণীকক্ষে পড়িয়েছেন। তিনি কি ৩৭ বছর এই বিষয়গুলো পড়িয়েছেন? মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তিনি ৩৭ বছর শ্রেণীকক্ষে বিভ্রান্তিকর তথ্য পড়িয়েছেন, সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয় আজকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে বলব ৩৭ বছর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বাংলাদেশের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে তিনি কী পড়িয়েছেন, সেখানে সিলেবাস কী আছে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে।’ হায় সভাপতি! সিলেবাসে কী আছে সেটা বের করা সহজ।

কিন্তু আকমল সাহেব তার ৩৭ বছরের শিক্ষকতার সময় শ্রেণীকক্ষে কী পড়িয়েছেন সেটা ‘খতিয়ে দেখার’ কোনো উপায় তো নেই। কারণ এজন্য প্রয়োজন প্রত্যেক শিক্ষক বক্তব্য দেয়ার সময় প্রশাসন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শ্রেণীকক্ষে গোয়েন্দা বসিয়ে রাখা। সে রকম কোনো ব্যবস্থা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই।

তবে ‘আজকের’ দিনের কথা বলে সভাপতি যেভাবে এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, তাতে এখন থেকে শ্রেণীকক্ষে গোয়েন্দা বসিয়ে রাখার ব্যবস্থা তারা করলেও করতে পারেন। এর দ্বারা তারা ফ্যাসিবাদকে অবশ্যই উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাবেন। এই মর্মে শিক্ষক সমিতির সভাপতি বর্তমান উপাচার্যের কাছে আবেদন জানাতে পারেন। তার যে অবস্থা তাতে এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ তিনি নিতেও পারেন। কারণ এ ধরনের কাজের ব্যাপারে তার মস্তিষ্কও সভাপতির মস্তিষ্কের মতো বেশ সক্রিয় দেখা যায়।

লেখক ঃ সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

॥ আবদুল লতিফ মন্ডল ॥

রাজনীতিতে সুবাতাসের ঘ্রাণ কাজে লাগানো হোক

দেশের রাজনীতিতে সুবাতাসের ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আবারও সংলাপে বসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বানের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২৭ জুলাই বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেল প্রকল্প কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে গিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে টেলিফোনে কথা হতে পারে। ওয়ার্কিং আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের জন্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার সঙ্গে ফোনে কথাবার্তা হতেই পারে।

রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে সৌজন্যমূলক যোগাযোগ থাকলে অনেক সমস্যাই সমাধান করা যায়।’ চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাতীয় সংসদের বাইরে থাকা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে টেলিফোনে আলাপের যে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন, সে জন্য তিনি অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। জনগণ আশা করেন, টেলিফোনে আলোচনা ক্রমান্বয়ে টেবিলে আলোচনার পথ সুগম করবে এবং চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান বা হ্রাসের মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব করে তুলবে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী দু’দশকে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হওয়ায় মানুষ নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের যে দাবি আশির দশকের শেষদিকে রাষ্ট্রপতি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির শাসনামলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো উত্থাপন করে, নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে বিএনপি সরকারের আমলে একটি উপনির্বাচনে কারচুপির কারণে তা অনেকটা গণদাবিতে পরিণত হয়।

এ দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং অন্য দুটি বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও জনগণের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালের মার্চে সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে। এ সরকারব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি (সপ্তম, অষ্টম ও নবম) জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।

যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ১৯৯৩-৯৫ সালে বিএনপির শাসনামলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে এবং সংসদ থেকে পদত্যাগ করে, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই বাতিল করে দেয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে আগে থেকে যে বৈরিতা বিরাজ করছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল সে বৈরিতাকে অনেকটা শক্রতায় পরিণত করে। একদল আরেক দলকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করে দেয়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, যা আজও বহাল রয়েছে।

অথচ বহুদলীয় গণতন্ত্র বিকাশের স্বার্থে বড় এ দুই দলের উচিত হবে সহাবস্থানে বিশ্বাসী হয়ে ওঠা এবং এক দল অন্য দলকে নির্মূল করে দেয়ার মনোভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা।

তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের সহযোগী ১৮টি দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সরকারকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অনেকটা এককভাবে সে নির্বাচন আয়োজন করে আবার ক্ষমতায় আসে। ভোটারবিহীন এ নির্বাচনে দেশের গণতন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির মধ্যে যে গুটিকয়েক বিষয় নিয়ে মতানৈক্য ও বৈরিতা বিরাজ করছে, তার একটি হল সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর থেকে বিএনপি তা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে এবং সে দাবিতে তারা অনড় রয়েছে, যদিও দলটি মাঝখানে কিছু সময়ের জন্য সে দাবি থেকে সরে এসে নির্বাচনী সহায়ক সরকারের কথা বলেছিল।

দলটি দেশবাসীর কাছে সহায়ক সরকারের রূপরেখা উপস্থাপনের কথা বললেও এ যাবৎ তারা তা করেনি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের সম্ভাবনাকে একাধিকবার নাকচ করে দিয়েছে এবং সংবিধান অনুযায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে।

গত ৩০ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে একজন নির্বাচন কমিশনার জানান যে, আগামী অক্টোবরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। পরে ১০ জুলাই কমিশনের এক সভাশেষে প্রতিষ্ঠানটির সচিব সাংবাদিকদের জানান, আগামী অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে।

৩০ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণার পর নিজ দলের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ২ মে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুর নিষ্পত্তি করতে হবে। কোনো সমঝোতা ছাড়া তফসিল হলে তা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্যের পরদিন ৩ মে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল নয় বিধায় নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

এ ইস্যুতে সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা যায়নি। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে তারা সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে।

সংবিধানে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যার ‘অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে নিযুক্ত হবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মনোনীত হতে পারবেন।’ সুতরাং মন্ত্রিসভার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দশ শতাংশ কোটায় যোগদানের জন্য বিএনপির প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভা পূর্ণতা লাভ করবে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে তা হল- জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালে সংসদ বহাল রাখা। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচনের বিতর্কিত বিধান প্রবর্তন করে।

এতে বলা হয়, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে আরও বিধান করা হয়, সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকালে সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন।

এতে দশম সংসদের প্রায় একদলীয় নির্বাচনে কমবেশি ৯০ ভাগ আসনে জয়ী আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা (তাদের অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন) ক্ষমতায় থাকবেন এবং তাদের অধিকাংশই একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হবেন। তা ছাড়া কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন ইসি নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত বা মনোনীত প্রার্থীরা এসব নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এসব সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় আওয়ামী লীগের সমর্থন-মনোনয়নে অনেকটা একচেটিয়াভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রভাবমুক্ত হয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা ইসির পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

উল্লেখ্য, গত বছর ইসির সঙ্গে সংলাপে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সংসদ ভেঙে দিয়ে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেয়। তারা যুক্তি দেখান, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু রয়েছে এমন সব দেশে জাতীয় সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচনের বিধান নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুসারী হয়ে বাংলাদেশ এমন কিছু করতে পারে না, যা বিশ্বে প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে বেমানান।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের টেলিফোনে আলোচনার প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে মাঠে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলটির মহাসচিবসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা ক্ষমতাসীন দলের এমন মনোভাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, তারা যে কোনো সময় সংলাপে বসতে প্রস্তুত। এদিকে চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের টেলিফোনে আলোচনার প্রস্তাব এবং বিএনপি মহাসচিবের সেটি ইতিবাচক হিসেবে দেখাকে ভালো লক্ষণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামতের বরাত দিয়ে ২৮ জুলাই যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংলাপ নিয়ে ২৭ জুলাই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে আলোচনায় বসতে নানা মহল থেকে প্রস্তাব দেয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। এক টেবিলে না বসায় তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আগামী একাদশ নির্বাচন সন্নিকটে। নির্বাচন নিয়ে দু’দলের মধ্যে এখনও সমঝোতা হয়নি।

ভোট ইস্যুতে দু’দলই বিপরীতমুখী অবস্থানে। এ পরিস্থিতিতে সবার মধ্যেই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, টেলিফোনে আলোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে আসা সম্ভব না হলেও ফোনালাপের মধ্য দিয়ে দু’দলের মধ্যে সৃষ্ট দূরত্ব অনেকটা কমে আসতে পারে। যদি ফোনালাপও হয় সেটাও রাজনীতির জন্য ইতিবাচক, যা পরে এক টেবিলে বসতে সহায়তা করবে।

সবশেষে বলতে চাই, চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে টেলিফোনে আলোচনার শুভসূচনা হোক এবং তা সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের টেবিলে আলোচনার পথ সুগম করুক। দেশে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়াসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য বিরোধী দল এবং সরকারি দল আওয়ামী লীগের মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতা হতে হবে। এজন্য তাদের আলোচনার টেবিলে বসার বিকল্প নেই।

লেখক ঃ সাবেক সচিব

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় নয় সাম্প্রদায়িক শক্তির ঐক্য হবে

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায়ই বলে থাকেন যে, বর্তমান স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটাতে অচিরেই বিএনপির নেতৃত্বে একটি জাতীয় ঐক্য গঠিত হবে, সেই লক্ষ্যেই বিএনপি অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা করছে। বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ কয়েকজন নেতা ইদানীং প্রেসক্লাব কেন্দ্রিক অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভায় জাতীয় ঐক্য গঠনের জোর প্রচেষ্টার কথা বলছেন। উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকরা হাততালি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। আমরা টিভি সংবাদ শ্রোতা দর্শকরা তা শুনি এবং দেখিও। যারা বিএনপির রাজনীতি করেন, সমর্থন করেন, রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিএনপিকে দেখতে চান তারা কে কীভাবে নেন জানি না। তবে তারা নিশ্চয়ই আশায় বুক বাঁধেন। তবে যারা রাজনীতির নানা মতাদর্শিক বিষয়-আশয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা অট্টহাসি না দিলেও মুখে ফোকলা হাসি দিয়ে স্বগত উচ্চারণ করে হয়তো বলেন ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ব্যারিস্টার মওদুদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম রাজনীতির মতাদর্শক জ্ঞান আমাদের অনেকের চাইতে ভালোই রাখেন। মওদুদ সাহেব গবেষক হিসেবে মন্দ নন, রাজনীতিবিদ হিসেবে উদারবাদী অবস্থান থেকে সত্তর দশকে সরে যাওয়ার পর বিএনপি-জাতীয় পার্টি বিএনপিতে তথা দক্ষিণ ঘরানার মতাদর্শেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। ফখরুল সাহেব মুসলিম লীগ থেকে ভাসানী ন্যাপের উগ্র হঠকারী বাম ঘরানা থেকে বিএনপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতেই নতুনভাবে ‘জীবন লাভের দীক্ষা’ নিয়েছেন। তারা উভয়েই রাজনীতির মতাদর্শিক দিকগুলো পড়াশোনা থেকেই জানেন। তবে দক্ষিণপন্থায় বিশ্বাসীরা নিজেদের কখনো রাজনৈতিকভাবে দক্ষিণপন্থার প্রদর্শন করতে চান না। নিজেদের উদারবাদী গণতান্ত্রিক শক্তি বলে দাবি করেন- যা ডাহা মিথ্যা কথা। অথচ কোনো উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দলে নেতা কোনো দিনই বলতে শুনিনি যে তিনি বা তার দল রক্ষণশীল, ডানপন্থি মতাদর্শ বিশ্বাস করে। তাহলে বিএনপির নেতারা কেন নিজেদের আসল পরিচয় দিতে চান না? তারা কি জোর গলায় দাবি করতে পারবেন যে বিএনপি উদারতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী দল? বিএনপি সাম্প্রদায়িকতার বীজ, গাছ, ডালপালা রয়েছে এমন রাজনীতি দেশে প্রবর্তন করে, দলের গঠনতন্ত্রেও এর নজির রয়েছে, ধর্মীয় বিভেদকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করে, জাতীয়তাবাদ নিয়ে সমতলে বাংলাদেশি নৃগোষ্ঠীর পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে, ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা পাল্টিয়ে যা করেছে তা গণতন্ত্রের মূল দর্শনেরই পরিপন্থী। দেশের অভ্যন্তরে বিএনপি ধর্মীয় বিভাজনের দৃশ্যত কৌশল, বাস্তবে নীতিরই পরিচর্যা করে থাকে। গণতন্ত্র চরিত্রগত এবং আদর্শগতভাবেই উদার এবং ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সবার জন্যই সমান, বিশেষ কোনো ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে না। আমাদের দেশের নৃজাতি গোষ্ঠীকে বিএনপি কী দৃষ্টিতে দেখে তা তো সবারই জানা কথা, আবার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কেমন আদরযতœ করে সেটি ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর দেখিয়ে দিয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে জামায়াত-বিএনপি যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল তখন সরকারি চাকরিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পদোন্নতি, চাকরি প্রাপ্তিতে বৈষম্যের দৃষ্টিতে দেখা- এটি কোনো গোপনীয় বিষয় ছিল না। এই ঢাকা শহরেই বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষককে চাকরি হারাতে হয়েছে তাদের ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে, প্রগতিশীল মতাদর্শের কারণে, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অঙ্গীকার প্রদর্শনের কারণে। বিএনপি দাবি করে তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাস করে। তবে সেই আদর্শ হচ্ছে ১৯৭১-এ মেজর জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস সংবলিত। এর প্রমাণ ২০০১-২০০৬ সালের পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস পঠন-পাঠনের, ২০০৪ সালে জিয়ার নামে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের জাল একটি ঘোষণাপত্র সৃজন করে। প্রমাণ দেখতে চান- ২০০৫ সালে ১৬ খন্ডের দলিলপত্রের ৩য় খন্ডের নতুন সংস্করণে প্রবেশ করুন, দেখবেন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাপত্রটি নেই, মেজর জিয়ার নামে নতুন ঘোষণাপত্র শোভা পাচ্ছে, সেটিকে আবার জায়েজ করতে ড. এমাজউদ্দিন আহমেদরা এক পাতার ফিরিস্তি দিয়েছেন। এমন কাজটি নিশ্চয়ই কোনো উদার গণতান্ত্রিক শক্তি করবে না।

ইউরোপ অথবা উন্নত গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় গণতন্ত্রে দুটো ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে। এক. উদারবাদী, দুই. রক্ষণশীল। রক্ষণশীলরা উদারতাকে কিছুটা কম চর্চা করে, রক্ষণশীল মনোবৃত্তির অধিকারী হিসেবে পরিচিত। তবে গণতন্ত্রের মূল দর্শনের সঙ্গে তাদের অবস্থানে মৌলিক কোনো সাংঘর্ষিকতা খুব একটা থাকে না। তারপরও উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজে রক্ষণশীল গণতান্ত্রিক শক্তির পরিচয়টি বদলে যাচ্ছে, উদারবাদী অনেক নেতাই এসব দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের শাসনামলে দেশ উল্টোপথে হাঁটেনি, বরং গণতন্ত্রের মূলধারাতেই গতিশীল থেকেছে। বেশ কিছু পাশ্চাত্য দেশে উদারবাদী গণতান্ত্রিক বনাম রক্ষণশীল গণতান্ত্রিক দলের আদর্শগত দূরত্ব অনেকটাই কমে এসেছে, কোথাও কোথাও নেই বললেই চলে। জার্মানিতে খ্রিস্টান ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলের শাসনামলে নীতি ও কৌশলে বড় ধরনের পার্থক্য নির্ণয় করা বেশ কঠিন।

অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির আদর্শগত পার্থক্য আকাশ ও পাতালসম দূরত্ব। প্রথমটি গণতন্ত্রের উদারবাদী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িকতার রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ার আদর্শে উদ্বুদ্ধ, দ্বিতীয়টি অর্থাৎ বিএনপি আগা-গোড়াই সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী দল। দলটির অন্যান্য নীতি ও কৌশল আগেই উল্লেখ করেছি। দলটি এ পর্যন্ত জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক দলসমূহের সঙ্গে জোটবদ্ধ থেকেছে, ক্ষমতায় গিয়ে দেশকে ‘দ্বিতীয় পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের নীতি ও কৌশলই প্রয়োগ করেছে। বিএনপি নিজে আচারে ধর্মকর্মের সংগঠন নয়, কিন্তু ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারকারী দল। ২০০১ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির তৎকালীন নেতা বি. চৌধুরী একটি ভিডিও অনুষ্ঠানে এক হাতে কুরআন, অন্য হাতে গীতা নিয়ে ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন কুরআনকে ভোট দিতে হলে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে, নৌকায় ভোট দিলে গীতায় ভোট দেয়া হবে। এমন ফতুয়া প্রচার-প্রচারণা যে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে করা হয় সে দলের হাতে ধর্মের অপব্যবহারই হতে পারে, গণতন্ত্রকে শবযাত্রায় পাঠাতে হয়। ২০০১-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিএনপি-জামায়াত যে শাসন দেশকে উপহার দিয়েছিল তার সঙ্গে ধর্ম অথবা গণতন্ত্রের ন্যূনতম কোনো সম্পর্ক ছিল বলার কোনো সুযোগ রয়েছে কি? বি. চৌধুরীর নিজেরই জীবন কতখানি অনিরাপদ হয়ে উঠেছিল- তা নতুন করে তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই না। তবে তার মতো নেতা কতখানি রাজনীতির বিশ্লেষণ কতখানি বস্তুনিষ্ঠতা প্রদর্শন করতে পেরেছেন- তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে।

বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকে গণতন্ত্রের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আওয়ামী বিরোধিতা থেকেই জিয়াউর রহমান এ কাজটি করেছেন। অথচ তিনি যদি প্রকৃত গণতন্ত্রের আদর্শের দল হিসেবে বিএনপিকে গড়ে তুলতেন তাহলে আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপি, বিএনপির বিপরীতে আওয়ামী লীগকে পছন্দ করতে ক্ষমতায় বসাতে রাষ্ট্রের মৌলিক কোনো স্খলন ঘটত না, গণতন্ত্রের মহাসড়কেই জনগণ থাকতে পারত। মানুষের ধর্ম বিশ্বাসকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করে রাজনীতি করার পরিণতি খুবই বিপজ্জনক। আমাদের মতো শিক্ষা-সংস্কৃতিতে পিছিয়ে থাকা দেশে বেশির ভাগ মানুষই রাজনীতির যথাযথ পাঠ নেয়ার সুযোগ সাধারণভাবে পায় না। দলগুলো জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করে না। ফলে রাজনীতির জটিল জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারণা অনেকেরই লাভ করার সুযোগ ঘটে না। সেখানে ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হলে ধর্মবিশ্বাসী বেশির ভাগ মানুষই দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে যে সিদ্ধান্ত নেয় তা রাজনীতি সচেতন না হওয়ার সম্ভাবনা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম না করে দুর্গমই করতে সহায়ক হতে বাধ্য। বিএনপিসহ ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলগুলো গত ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে সেভাবেই দিকভ্রান্ত করেছে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সে কারণে দর্শনগতভাবে দুটো পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে গেছে। অনেকেই তা অজ্ঞাতসারে, না বুঝেই অবস্থান নিয়েছে। এখানে বিএনপির ‘কৃতিত্ব’ হচ্ছে দলটি বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশকে তাদের সাম্প্রদায়িক, রাজনীতির অনুসারী করতে পেরেছে। কিন্তু দেশের অপর একটি বড় অংশ মানুষ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অপরিহার্যতা ও গুরুত্ব কমবেশি অনুধাবন করতে পেরে বিএনপি এবং এর জোট রাজনীতির সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত হয় না। এটি লক্ষ করলেই বোঝা যায় রাজনীতি সচেতন, দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষ বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষ ধারা এখন বাংলাদেশে সোজাসুজি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে- যেখানে রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের মতাদর্শগত বিভাজন একেবারেই স্পষ্ট। বিএনপির অবস্থানও স্পষ্ট। আওয়ামী লীগসহ কিছু ছোট ছোট বাম দলের অবস্থানও স্পষ্ট। বিএনপি যতই জামায়াতকে তাদের নির্বাচনী বন্ধু দল বলে দাবি করুক, বাস্তবে দুই দলের অবস্থান দক্ষিণ তথা ডানপন্থায়। বিএনপি ডানের কিছুটা বামে অবস্থান করে সত্য, জামায়াত ডানের অংশে অবস্থান করে, বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই বিশ্বাসগত কারণে ডানপন্থার যে কোনো জায়গাতেই নড়াচড়া করে থাকেন। এটি অস্বাভাবিক কোনো প্রবণতা নয়। ডানপন্থার ঝোঁক এককোণায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নড়বেচড়বে না, প্রয়োজনে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতায় গড়াবে না- তা ভাবার কোনো কারণ নেই। ২০০১-২০০৬ সালে আওয়ামী লীগকে নির্মূল করতে, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে বিএনপি-জামায়াত চরম অবস্থান নিতেও দ্বিধা করেনি। এসব নিকট-ঐতিহাসিক ঘটনাবলি পর্যালোচনা করেই বিএনপি রাজনীতির মতাদর্শগত অবস্থান সম্পর্কে মনগড়া নয়, বরং সুস্পষ্ট মত দেয়া কোনো সচেতন মানুষের পক্ষে অসম্ভব নয়। বিএনপি ২০১১-২০১৫ সালে বাংলাদেশে প্রতিবিপ্লব ঘটাতে কম চেষ্টা করেনি, ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করতেও দ্বিধা করেনি। উদ্দেশ্য ছিল ৬ জানুয়ারির পর দেশে একটি সাংবিধানিক সংকট তৈরি করে ক্ষমতায় এককভাবে আসার পথ করা। অতি ডান, অতি বাম আদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে এসব উল্লম্ফনবাদী চিন্তা-চেতনা থাকে- যা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। বিষয়গুলো সবার কাছে স্পষ্ট না হলেও সচেতন মানুষের কাছে স্পষ্ট। সে কারণেই ২০১৫ সাল থেকে বিএনপি সরকার বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলে আসলেও ২০ দলীয় জোটের বাইরে তেমন কেউ সাড়া দিচ্ছে না। বামরা আওয়ামী লীগকেই তাদের মিত্র মনে করে না, বিএনপিকে করার আশা করা কতটা সম্ভব তা বিএনপির নেতারা ও বামরা বলতে পারবেন। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পর্কে নানা সমালোচনা থাকলেও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার মিশনারি ভিশনারি নেতৃত্ব সচেতন মানুষদের অভিভূত করছে, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। সে কারণে বিএনপির ডাকে সাড়া দেয়ার মতো কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না।

বিএনপি-জামায়াত মিলিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে ২০১১-১৫ সালে যা করেছে তার চাইতে বেশি কিছু করার শক্তি এই দুই দলের আছে কিনা- সন্দেহ আছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থানীয় নেতাকর্মীদের কারো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে একাত্ম হয়ে কিছু করার বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির রাজনীতি, ২০০৬-০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বরূপ নির্বাচন সম্পন্ন করার নীল নকশার অভিজ্ঞতা খুব দূরের বিষয় নয়। সে কারণে আস্থার কোনো জায়গা বিএনপি-জামায়াত-২০ দলীয় জোট সৃষ্টি করতে পারছে। জাতীয় ঐক্যের জন্য যে ধরনের অভিন্ন কর্মসূচি, চিন্তা-ভাবনা ও দিকদর্শন থাকা প্রয়োজন তা ২০ দলীয় জোটের ধারেকাছেও নেই। সে কারণে জাতীয় ঐক্য গঠনের ভিত্তি দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলকে বাদ দিলে জাতীয় ঐক্যের অর্ধেক অংশ থাকে না, বিএনপি-জামায়াত ২০ দলকে নিয়ে ঐক্যতো আগে থেকেই আছে। সেই ঐক্যের স্বরূপ আলোচিত হয়েছে, সেটি সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহের ঐক্য- যা তাদের রয়েছে। জাতীয় অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে, ভুল পথে পরিচালিত হতে পারে এমন ঐক্য বাম, উদারবাদী মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী সংগঠন, গোষ্ঠী ও ব্যক্তি মানুষ সাড়া দেবে বলে মনে হয় না। বিএনপি সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে পরীক্ষিত শক্তি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের কাছে নয়। সে কারণেই বিএনপির ডাকে সাড়া মিলছে না, মেলার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ ড. আর এম দেবনাথ ॥

আর্থিক খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে

‘ব্যাংকের কার্যক্রমে মানুষের মনে অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।’ এই কথাগুলো কার? স্বয়ং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের। জুলাই মাসের ১৫ তারিখে খবরের কাগজে এ সম্পর্কিত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এমনিতেই মানুষ ব্যাংক ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করছে, এর ওপর যদি গভর্নর বলেন, ‘অবিশ্বাসের’ কথা- তাহলে সমস্যাটা গভীরতর হয় না কি? হবে না কেন? অনেক দিন যাবৎ ব্যাংকগুলোর নানা কার্যক্রম নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ দেশের প্রায় ৬০টি ব্যাংকে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা আমানত হিসাবে গচ্ছিত আছে।

হাজার হাজার বলছি কী, এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে- দেশের ব্যাংকগুলোতে কমপক্ষে ১০ লাখ কোটি টাকার আমানত (ডিপোজিট) গচ্ছিত আছে। এর মধ্যে সরকারের আমানত হবে বড়জোর ১৫-২০ শতাংশ। বাকি আমানতের টাকা জনসাধারণের। এ সব টাকা কোটি কোটি আমানতকারী ব্যাংকে রেখেছে। এই টাকা ৪৬-৪৭ বছরে সঞ্চিত টাকা। অর্থাৎ স্বাধীনতার পরবর্তীকালে মানুষের সঞ্চয়ের টাকা। তিলে তিলে জমা করা টাকা। এই টাকার ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে- এ সব টাকার নিরাপত্তা কী? মানুষ তাদের টাকা ‘চাহিবামাত্র’ (অন ডিমান্ড) পাবে কী না? চাহিবা মাত্রই পাওয়ার কথা। এটাই নিয়ম-বিধান। ‘ডিপোজিটের’ সংজ্ঞাও তাই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়ম মেনে আমানতের টাকা ফেরত চাইলে সেই টাকা ব্যাংক ফেরত দিতে বাধ্য। এর ব্যতিক্রম ঘটলেই বিপদ। প্রশ্ন হল, ব্যাংকে যে সব অনিয়ম হচ্ছে, যেভাবে বিভিন্ন ব্যাংকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব দেখা দিয়েছে, তাতে কি আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ আছে? বলা দরকার, আমানতের নিরাপত্তা বিধান করার আইনি দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এই উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা বিধিবিধান তৈরি করে রেখেছে।

এখন গভর্নর সাহেব ওই সব বিধিবিধানের কথা না বলে যদি নিজেই বলেন, ব্যাংকের ওপর মানুষের অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? তাহলে তো অবিশ্বাস গভীরতর হবে এবং পুরো ব্যাংকিং খাত পড়বে গভীর খাদে। তাই নয় কি? অথচ পরিস্থিতিটা তো এমন উদ্বেগজনক নয়। সংকট আছে, সমস্যা আছে। মূল সমস্যা শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ (ক্লাসিফাইড লোন) নিয়ে। এটা খারাপ ঋণ। এ সব টাকা কিছু ‘দুষ্টু’ গ্রাহক মেরে দিতে চাইছে। এই টাকার পরিমাণ কত? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মোট ঋণের ১০-১২ শতাংশ হচ্ছে খারাপ ঋণ। আমি তর্কের খাতিরে ধরে নিই এর পরিমাণ ২০ শতাংশ। তাহলেও ৮০ শতাংশ ঋণের টাকা ‘ভালো’ আছে। তবে ২০ শতাংশ টাকা অনেক টাকা। এটা হওয়া অনুচিত ছিল। এটা হওয়াতেই আমানতকারীদের টাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে এরই মধ্যে আমানতকারীদের টাকার নিরাপত্তার জন্য অনেক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের জন্য আমানত বীমা (ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স) আছে। ব্যাংকের পুঁজি আছে আমানতের ১০ শতাংশ। খারাপ ঋণের বিপরীতে অর্থাৎ ‘ব্যাড অ্যান্ড লস’ভুক্ত ঋণের বিপরীতে শতভাগ ‘প্রভিশন’ করা আছে। এই শ্রেণীভূক্ত ঋণের প্রতিটির বিপরীতে কোর্টে মামলা আছে। সর্বোপরি রয়েছে ব্যাংকের ভালো ঋণ। এ সবই আমানতকারীদের স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্যই।

এর পরও কথা আছে। ‘লেন্ডার অব দ্য লাস্ট রিসট’ বলে একটা ব্যবস্থা আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি ব্যাংককে বাঁচানোর জন্য এটা করে থাকে। ১০-১৫ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (ওবামা প্রশাসন) ডুবন্ত ব্যাংকগুলোকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। আমাদের দেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা ব্যবস্থায় ডুবন্ত অনেক ব্যাংককে বাঁচিয়েছে। ইস্টার্ন ব্যাংক, এনসিসিবিএল, কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, বিডিবিএল ইত্যাদি এর উদাহরণ। এর ফলে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছুটা সময় হয়তো লেগেছে, কিন্তু সবাই তাদের টাকা ফেরত পেয়েছে।

‘ফারমার্স ব্যাংকের’ ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা-ই করেছে। সরকারি ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের স্বার্থে এর মালিকানায় ঢুকেছে। আমানতকারীদের ‘ডিপোজিট’ রক্ষার্থেই এই ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা প্রায় সব দেশেই গৃহীত হয়। এটা নতুন কিছু নয়। সঞ্চয় রক্ষা করা সব সরকারের দায়িত্ব। সঞ্চয় ছাড়া ব্যাংক হবে না, ব্যাংক ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে না। এ কারণেই সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধস চাইতে পারে না। একশ্রেণীর মিডিয়ায় নানা ধরনের মুখরোচক খবর ছাপা হতে পারে তাতে কিছু আসে যায় না। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত কোনো ব্যাংক টাকা তুলতে গিয়ে কেউ টাকা পায়নি এমন উদাহরণ নেই। অতএব, আমানতকারীরা ঝুঁকিতে এই বলে আতঙ্ক তৈরি করা উচিত নয়।

আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার নানা ব্যবস্থার কথা এতক্ষণ বললাম। এর কারণও আছে। কারণ, আর যাই হোক কিছুসংখ্যক খারাপ ঋণগ্রহীতার শাস্তিযোগ্য অপরাধের জন্য কোটি কোটি আমানতকারীকে শাস্তি দেয়া যায় না। তবে আরও কথা আছে। বর্তমান সংকট মোকাবেলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে আগামীদিনের কিছু কাজ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অর্থায়নের বোঝা ব্যাংকের ওপর থেকে কমানো দরকার।

দেশের শিল্পায়ন, ব্যবসা উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন থেকে শুরু করে সব উন্নয়নমূলক কাজে যে ‘ফাইন্যান্স’ লাগে তার পুরোটার জন্য এখন সবাই যাচ্ছে ব্যাংকের কাছে। এই ‘ব্যাংক লেড গ্রোথ’ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসা দরকার। বড় সহজ হয়ে গেছে ব্যাংকের লোন। যে কোনো ব্যক্তি বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তি অর্থের দরকার হলেই চলে যায় ব্যাংকের কাছে। এর বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে গড়ে তোলার কথা হচ্ছে অনেকদিন থেকেই। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। দেশে অনেক প্রাইভেট কোম্পানি আছে যারা হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করছে। তারা ব্যাংক ফিন্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। তাদের শেয়ারবাজারে যাওয়া উচিত। এতে তাদের সুদ খরচ কমবে। ব্যাংকের বোঝা লাঘব হবে, তাদের শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের বোঝা কমবে। আমানতকারীদের ঝুঁকিও হ্রাস পাবে।

দ্বিতীয়ত দেশে বড় বড় যে সব প্রাইভেট কোম্পানি ব্যবসা করছে, তাদের জনগণের কাছ থেকে সরাসরি ঋণ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণপত্র (ডিবেঞ্চার) আছে, বন্ড আছে। এ সব ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলো সরাসরি মানুষের কাছ থেকে ধার নিতে পারে। নির্দিষ্ট হারে সুদ দিতে পারে। প্রতিষ্ঠিত অনেক কোম্পানি আছে জনগণ যাদের ঋণ দিতে ভয় পাবে না। এই কাজটা করা গেলে ব্যাংকের ওপর বোঝা লাঘব হবে। কোম্পানিগুলোও সতর্ক হবে। ভালোভাবে কাজ করতে উৎসাহিত হবে। এটি করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘লার্জ লোনের’ সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে পারে। ‘লার্জ লোনের’ সংজ্ঞার ফাঁক-ফোকর দিয়ে বড় বড় কোম্পানি মাত্রাতিরিক্ত ঋণ নিয়ে বসে আছে। অনেকেই এখন ‘ওভার বরোড কোম্পানি’। অনেকেই সহজে ব্যাংক ঋণ পেয়ে নানাদিকে ব্যবসা সম্প্রসারিত করেছে। এখন এই ‘সম্প্রসারণ’ অনেকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেক সমস্যা হচ্ছে তাদের জমি নিয়ে। অনেকেই অহেতুক বাজার চাহিদা না বোঝে মাত্রাতিরিক্ত জমি কিনেছে। এ সবের বাজার নেই। টাকা আটকা পড়েছে। ব্যাংকারদের উচিত তাদের সঙ্গে বসে এই সমস্যার সমাধান করা। আরেকটা ব্যবস্থার কথা এখনই ভাবতে হবে। শুধু ভাবলেই চলবে না- আইনি কাঠামো তৈরি করা শুরু করতে হবে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে অনেক ‘পাজি ব্যাংক’ টিকবে না। এগুলো চিহ্নিত করা দরকার। ‘মার্জার’, ‘এমালগেমেশন’, ‘টেকওভার’ ইত্যাদি বিষয়ক আইন তৈরি করা দরকার। মাথায় রাখতে হবে আমানতকারীদের স্বার্থ, তাদের টাকার নিরাপত্তা। যে সব ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়, যাদের আমানতকারীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তাদের হিসাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আছে। এদের উৎসাহিত করা দরকার ‘একীভূত’ হতে।

ব্যাংকগুলো দেখা যাচ্ছে ধীরে ধীরে শিল্পঋণে ঢুকে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণে ঢুকে পড়ছে। ট্রাস্ট রিসিটের (টিআর লোন) লোন দীর্ঘমেয়াদি ঋণে পরিণত হচ্ছে। এ সব খুবই খারাপ প্রবণতা। শিল্প ঋণের অভিজ্ঞতা আমাদের খুবই খারাপ। শিল্প ব্যাংক ও বিএসআরএস টিকেনি। শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের ভারে দুটোই ডুবেছে। এখন এদের নাম ‘বিডিবিএল’। আমি মনে করি, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ থেকে বিরত রাখা দরকার। এটা এখন থেকেই করা যায়। ব্যবসায়ী, নতুন উদ্যোক্তা ইত্যাদি শ্রেণীর লোক বুঝুক, ব্যাংকে গেলেই টাকা পাওয়া যাবে না। সরকারের উচিত শিল্পঋণের বিকল্প ব্যবস্থা করা। স্বল্পমেয়াদি আমানতকারীদের টাকায় দীর্ঘমেয়াদি ফিন্যান্সিং উচিত নয়। যা হওয়ার হয়েছে। যারা খুবই বড় তারা দেখা যাচ্ছে বিদেশ থেকে ঋণ করছে। করুক। একটা সীমার মধ্যে করুক। শেষ কথা হচ্ছে, পুরো আর্থিক খাত নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কার্পেটের নিচে ধুলা আর ধুলা। এসব সাফ করতেই হবে- আজ না হোক কাল। সবশেষে একটা কথা। আমানতকারীদের টাকা যে নিরাপদ, তা বিজ্ঞাপন দিয়ে সরকারের ঘন ঘন বলা উচিত।

লেখক ঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

॥ ড. শামসুল আলম ॥

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন ‘ধরিত্রী রূপান্তর: টেকসই উন্নয়নের জন্য ২০৩০ এজেন্ডা’ গৃহীত হয়। এমডিজিতে সাফল্যের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিল-যা বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রেরিত খসড়া প্রস্তাবনার সুন্দর প্রতিফলন। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রণীত বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবনায় ১১টি অভীষ্ট, ৫৮টি লক্ষ্যমাত্রা এবং ২৪১টি সূচক ছিল। এর মধ্যে ১০টি অভীষ্ট টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি)-এর সাথে মিলে যায়। বাকি অভীষ্ট এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে। এটি অতুলনীয় যে, বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে গৃহীত দুটি উন্নয়ন ঘোষণারই (শতাব্দী ঘোষণা ২০০০ ও এসডিজি ২০১৫) স্বাক্ষর প্রদানকারী সরকারপ্রধান। এমডিজিতে অনুস্বাক্ষর করেছেন ১৮৯টি দেশের সরকার/রাষ্ট্রপ্রধান। এসডিজিতে বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯২টি দেশের সরকার/রাষ্ট্রপ্রধান অনুস্বাক্ষর করেছেন।

জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় এই অভীষ্টসমূহ গৃহীত হয়েছে। এসডিজি প্রণয়নে প্রায় ৮৫ লাখ ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের মতামত নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘে দুই বছরের বেশি সময় ধরে (মার্চ, ২০১৩ থেকে আগষ্ট, ২০১৫ পর্যন্ত) এসডিজি নিয়ে আলোচনা হয়। এসডিজি পাঁচটি ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত জনগণ, ধরিত্রী, সমৃদ্ধি, শান্তি এবং অংশীদারিত্ব। এর মূলমন্ত্র হচ্ছে কাউকে পশ্চাতে রেখে নয়, যেখানে উন্নয়নের মূলমন্ত্রই হবে টেকসই উন্নয়ন, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ব্যবস্থার প্রচলন, সকল স্তরে কার্যকর, জবাবদিহিতাপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণ।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অসমাপ্ত কার্যক্রমসমূহ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ক্রস কাটিং বিষয়সমূহ যেমন: দারিদ্র্য, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প, অসমতা, নগরায়ণ যথাক্রমে এসডিজি ১, ২, ৩, ৬, ৮, ৯, ১০, ১১ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  সুনির্দিষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে: গুণগত শিক্ষা (এসডিজি-৪), জেন্ডার সমতা (এসডিজি-৫), সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানি (এসডিজি-৭), টেকসই প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থাপনা, (এসডিজি ১১-১৫); সুশাসন, (এসডিজি-১৬)। টেকসই উন্নয়নের জন্য  বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব উজ্জীবিতকরণ ও বাস্তবায়নের উপায়সমূহ  এসডিজি-১৭-তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এসডিজির অভীষ্ট ও লক্ষ্যমাত্রাসমূহকে সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ ডকুমেন্ট’ হিসেবে বিবেচিত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলের বিভিন্ন অধ্যায়ে সমন্বিত করা হয়েছে; ২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে (বর্তমানে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক) আহ্বায়ক করে ২০ সদস্যবিশিষ্ট এসডিজির বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনা সম্পর্কিত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার সাচিবিক দায়িত্ব সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পালন করছে। এসডিজি’র অভীষ্ট লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রাসমূহের সাথে মন্ত্রণালয়/বিভাগভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন/কার্য সংশ্লি¬ষ্টতা অর্থাত্ ম্যাপিং নির্ধারণ করা হয়েছে যার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়/বিভাগ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রাসমূহ সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন/নির্ধারণ করবে। এসডিজি’র পরিবীক্ষণে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এসডিজি’র বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণে বাংলাদেশের উপযোগী প্রতিনিধিত্বশীল কিছু সূচক চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসডিজি’র বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য একটি জাতীয় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। ভিত্তিবছর হিসেবে ধরা হয়েছে ২০১৪-১৫ সালকে। ১২৭টি সূচকের ক্ষেত্রে ভিত্তিবছরের তথ্য দেওয়া আছে এবং ২০২০, ২০২৫, ২০৩০-এর মধ্যে অর্জনের জন্য লক্ষ্যমাত্রা বিভাজন করে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসডিজি’র লক্ষ্যসমূহ অর্জনে কী পরিমাণ অর্থায়নের প্রয়োজন হবে তা প্রাক্কলনের জন্য ‘এসডিজি ফাইন্যান্সিং স্ট্র্রাটেজি’-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়/বিভাগ ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আর্থিক মূল্যায়নে দেখা যায় যে, এসডিজির পূর্ণ বাস্তবায়নে ২০১৪-১৫ সালের স্থির মূল্যে মোট প্রায় ৯২৮.৪৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে। বার্ষিক মোট ৬৬.৩২ বিলিয়ন ইউএস ডলার অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে যার মধ্যে দেশীয় উত্স হতে আসবে প্রায় ৫৬.৮৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার (এই সময়ে আমাদের গড় বাজেটের আকার হবে বছরে ১১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বৈদেশিক উত্স হতে অতিরিক্ত বার্ষিক অনুদান ও সহায়তা আসতে হবে প্রায় ২.২৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার। সরকার দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রায় একডজন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। এ কারণে প্রস্তাবিত সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করি। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার দৃঢ় আশ্বাস পাওয়া গেছে।

এছাড়াও জিইডি কর্তৃক পরিকল্পনা কমিশনের সেক্টর ডিভিশন, মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং অধীনস্থ অধিদপ্তর/ পরিদপ্তর/ সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য (এসডিজি) বিষয়ে সম্যক ধারণা প্রদানের নিমিত্ত ‘মন্ত্রণালয়/ বিভাগভিত্তিক সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন’ শীর্ষক সিরিজ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। এ প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে পরিকল্পনা-সংশ্লি¬ষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের ও এসডিজি ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তাদেরকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও এসডিজি বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধারণা প্রদান করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই ২০১৮-এ জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক পাঁচ বছরের কর্ম-পরিকল্পনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উন্মোচিত হয়েছে। এতে ৪৩টি লিড মন্ত্রণালয়/বিভাগের আগামী পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা দেওয়া আছে।

২০১৭ সালের ১৭ জুলাই ঊঈঙঝঙঈ-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতিসংঘের শীর্ষক এসডিজি বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ ৪৪টি দেশ এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। খসড়া  প্রতিবেদন নিয়ে সরকার, এনজিও, সুশীল সমাজ, শিক্ষক-গবেষক, উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। সমুদয় সমাজকে আমরা সংযুক্ত করার চেষ্টা চালিয়েছি।

২৪টি মন্ত্রণালয়, বৈদেশিক বাণিজ্য ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে ঢাকা বিভাগীয় উন্নয়ন মেলায়, পিএটিসি সাভার, ইসলামী ফাউন্ডেশনে এসডিজি অবহিতকরণে জিইডি সেমিনার করেছে। সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এসডিজি অভীষ্ট এবং লক্ষ্যগুলোকে বাংলায় অনুবাদ করে ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ।

এসডিজি অর্জনে ‘পুরো সমাজকে সম্পৃক্ত’ করার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছি আমরা। এসডিজিতে অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিয়ে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ যৌথভাবে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক (ইউএনআরসি)। এতে এনজিও, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত থেকে মতামত ব্যক্ত করেন। এসডিজি বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে সরকার, বেসরকারি খাত ও জাতিসংঘের যৌথ আয়োজনে ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর হোটেল র্যাডিসনে আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকার, বেসরকারি খাত এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তাদের মূল্যবান মতামত প্রদান করেন। বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই ও বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি এসডিজি বাস্তবায়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে একটি একক পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়।

২০১৮ সালের ৪-৬ জুলাই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো টেকসই উন্নয়নে অভীষ্ট বাস্তবায়ন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পর্যালোচনা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট-এর সহযোগিতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে দুই হাজার প্রতিনিধি যোগদান করেন। এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পর্যালোচনার মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা। এতে ৪৩টি লিড মন্ত্রণালয়ের সচিবগণ তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলে ধরেন। এর ফলে একদিকে যেমন মন্ত্রণালয়ের মালিকানা তৈরি হবে, অন্যদিকে বাস্তবায়নে দ্বায়বদ্ধতা জন্মাবে। এই সম্মেলনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি সংগঠন এসডিজি বাস্তবায়নে তাদের অগ্রগতি তুলে ধরে। এই সম্মেলনের আরো একটি উদ্দেশ্য হলো— এসডিজি বাস্তবায়নে তাদের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের ভবিষ্যত্ করণীয় কী তা সকলকে অবগত করা। সম্মেলনে যে চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয় তা মোটা দাগে তুলে ধরা হলো:

১) আগামী দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সমাজের আয় বৈষম্য মোকাবিলা ও বেকারদের জন্য শোভন কাজ সৃষ্টি করা। কারণ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে ভবিষ্যতে অনেক কাজ পুরাতন হয়ে যাবে এবং এর ফলে অনেকে কাজ হারাবে।

২) উপাত্তের প্রাপ্যতা ও সময়োপযোগী তথ্য প্রাপ্তি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসডিজি অগ্রগতি বাস্তবায়নে ফলোআপ-এর অংশ হিসেবে, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী তথ্য-উপাত্তের বিকল্প নেই।

৩) বেশির ভাগ মন্ত্রণালয় মানবসম্পদের সক্ষমতার ঘাটতি ও সম্পদের আহরণকে তাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ মনে করে।

৪) জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার দরকার, বিশেষ করে উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি সংগঠনের শিক্ষা ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়া দরকার।

৫) জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় আমরা যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করলেও এটি আমাদের কৃষি খাত ও খাদ্য নিরাপত্তার উপর ক্রমাগত আঘাত হানবে।

৬) পরিবেশ বিপর্যয় রোধ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় আমাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে।

৭) এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা, বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ক সেবা প্রদানে ব্যাপক দক্ষতা বাড়াতে হবে।

বিস্তৃত এসডিজি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাই এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কার্যকর পরিবীক্ষণ ও অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপাত্ত সরবরাহের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থায়নের উৎস নির্ধারণ এবং সম্পদের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা দৃঢ়করণ এবং কার্যকর অংশীদারিত্ব বিনির্মাণের পাশাপাশি সরকার, আন্তর্জাতিক এনজিও এবং দেশীয় এনজিওর মাধ্যমে এসডিজির স্থানীয়করণ ও বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং সক্ষমতার বিকাশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় কর-জিডিপির হার খুব কম। সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে অর্থায়নের দেশজ নতুন উত্স খুঁজে বের করতে হবে। জনগণকে কর প্রদানে প্রয়োজনীয় উত্সাহ দান করার পাশাপাশি কর প্রদান সহজতর ও ঝামেলামুক্ত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি কমানোর কথা ভাবতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির বাস্তবায়ন সফলতা নির্ভর করছে জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনাসমূহের কার্যকর বাস্তবায়নের উপর। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মুখ্য ভূমিকা পালনকারী কর্তৃপক্ষ। তারাই স্থানীয় জনপদে সেবা পৌঁছে দেবে এবং দারিদ্র্য বিলোপ, ক্ষুধা মুক্তি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। স্থানীয় সরকারকে এসডিজি বাস্তবায়নে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। এজেন্ডা ২০৩০-এর মতো একটি সামগ্রিক, জটিল এবং সর্বব্যাপ্ত উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থেরও সংস্থান করতেই হবে।

লেখক ঃ অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন

॥ শহীদ ইকবাল ॥

জনগণের ভয় ও শঙ্কা তাড়াতে হবে

এখন তেমন কোনো সংবাদ নেই। আসন্ন তিন সিটির নির্বাচন নিয়ে গড়পড়তা কিছু সংবাদ চোখে পড়ছে। কিন্তু প্রচুর সংবাদ জন্ম নিচ্ছে প্রতিনিয়ত- মানুষের মনে, শহরে-বন্দরে, ঘরে-বাইরে। তুচ্ছ কিছু সংবাদ কিন্তু তা খুব আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার মতোও বলা যায়। যেমন বড়পুকুরিয়ায় ২৩০ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা উধাও; আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনা থাকা না থাকা ‘গুজব’ ইত্যাদি। চলছে এখন সিটি নির্বাচনের মারমুখী হাওয়া। নিশ্চয়ই প্রাধান্য পেয়ে আছে সরকারি প্রতীক নৌকা। নির্বাচন কমিশন বলছে, এবার গাজীপুর-খুলনার চেয়েও ‘বেটার’ নির্বাচন হবে। রাজশাহীর মতো এলাকায় নির্বাচন তারিখ ও প্রতীক বরাদ্দের মধ্যেই সর্বত্র ছেয়ে গেছে নৌকার প্রতীক; পোস্টারে-ব্যানারে। এমনটা কী সরকারের উন্নয়ন ঢাকের জনজোয়ারের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও মিলছে সর্বত্র। নির্বাচনমুখী আমেজ এখন সর্বত্র। মানুষের কাজকর্মে নির্বাচনের আলাপ, অভিব্যক্তি প্রকাশ্য প্রায়। সেটা মূল কথা নয়। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। বাস্তবে থাকলে এবং বাস্তবত ঘটলে আমার মতো চালচুলোহীন একজন কর্মী-সমর্থক যারপরনাই তো খুশিই হবে। কিন্তু খুশিটার পেছনে ঠিক শঙ্কা ও ভয় যেন অদৃশ্যমান নয়। এত অধিক সমর্থন, একই দলের (দাবি করা) একাধিক কমিশনার প্রার্থী, ম্রিয়মাণ অপজিশন, মনে মনে ক্ষোভ আর আক্রোশ নিয়ে নিজের স্বার্থপরতার কোণে আশ্রয় করে আছেন যেন অনেকেই। কেউ বলেন, ভোট আবার কী, নৌকা তো হয়েই আছে। কেউ বলে ও তো জিতেই গেছে। এগুলো কানকথা নয়। ভোটের বাজারে চোখে পড়ছে এমন অনেক কিছু। পুলিশের লোক, বিভিন্ন সংস্থার লোকজন ভোট নিয়ে নানারকম কাজ করছেন। তারা এজেন্ট, পোলিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার দেবেন। তাদের আমলনামাও গোনা হচ্ছে। এ সব করতে গিয়ে অনেকেই বিরক্তও হচ্ছেন। কোনো ক্ষেত্রে বেশি মাত্রার বাড়াবাড়ি শোনা যায়। নির্বাচনটাকে ছেড়ে দেয়ার কোনো প্রশ্ন নেই যেন। কিন্তু কাজটা দলীয় হোক। তরতাজা হোক। গণতন্ত্রমাফিক হোক। মানুষের কাঙ্খিত ইচ্ছার বাস্তবায়ন হোক। স্বপ্নের ও ফলের প্রতিফলন ঘটুক- সেটা সবাই চায়। কিন্তু এর বিপরীতে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু হলে- দায় তো অস্বীকার করা যায় না। সেই ভয়টা যেন গড়িয়ে কোনো সার্বিক কিছু ক্ষতি না করে। সে আশঙ্কাটাই করি। কারণ এই মুহূর্তে সরকারে অতি উৎসাহী লোকের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। সরকারের দল, নিষ্ঠাবান-ত্যাগী কর্মী, অভ্যন্তরে ভিশনারি বুদ্ধিশীল মেধাবী মানুষের অভাব অকুণ্ঠভাবে পরিলক্ষিত। অনেক বাজে, ‘হাইব্রিড’ ক্যারিকেচার চলছে যেন। তার বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে চোখেও পড়ছে। হোক তা ভোটের মাঠে কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে।

এখনো মানুষের চোখ ভেজে শেয়ার বাজারে কোটি কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায়। অনেকের শ্রম-ঘাম কষ্টের টাকা ওতে ছিল। এরপর ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা। খেলাপি ঋণের অপতৎপরতা। ঋণখোররা ঋণের টাকা ফেরত দেন না। ডেসটিনি কেলেঙ্কারি তৃণমূল মানুষের মন থেকে এখনো যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রা পাচারের ঘটনা ইত্যাদি ব্যাপার ছাপিয়ে এখন কয়লা কেলেঙ্কারি আর ব্যাংক ভল্টের সোনার নয়ছয় করার বিষয় বেশ আলোচিত হচ্ছে। এগুলো অর্থনীতির বড় জটিল হিসাব-নিকাশ। কিন্তু জনতা যাবে কোথায়! সরকারের ব্যাংক পলিসি যেমনই হোক কিন্তু সুদের হার থেকে আরম্ভ করে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার নানা বিষয়ে বেশ অদক্ষতার কথা প্রায়ই শোনা যায়। এ নিয়ে সরকার পরিষ্কার করে কিছু বলেও না। ব্যাংক নীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী প্রেস-মিডিয়ায় কিছু হৈ  চৈ করে থেমে যান, তারপর আবারো আর একটি ঘটনা ঘটে। এই চলছে। এখন ভল্টের সোনা বিষয়ক ব্যাপার বেশ মুখরোচক হয়ে চলছে। সবকিছু মিলে একটা ঘোলাটে ব্যাপার মনে হয়। সরকার টানা দশ বছর পার করছে, এবার নির্বাচনের বছর- এ নিয়ে দলে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বও কম নয়। বস্তুত সব ক্ষেত্রেই হস্তক্ষেপ প্রত্যাশিত হয়ে উঠছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর। এটা কোনো ব্যবস্থাপনার সমাধানের কৌশলও নয়, পথও নয়। সবকিছুতে একজন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করতে হলে, বিষয়টি সুখকর নয়। নইলে যে সমাধানও হয় না, কারো কথা কেউ শোনে না! ছাত্রলীগ সামলানো নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক নিয়ন্ত্রণ ও দায়ের কথা বলেছেন। কে নিয়ন্ত্রণ করবে? এর দায় কার? কেন ছাত্রলীগ কারো কথা কথা শুনছে না? এখানেও কী নেত্রীর হস্তক্ষেপ লাগবে? এভাবে কয়লা চুরির ঘটনার তদন্তেরও নির্দেশ দিতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। তখন প্রশ্ন আসে, পেট্রোবাংলা কী করে! জ্বালানিমন্ত্রীর কাজ কী? বিষয়গুলো এভাবে এককেন্দ্রিক ও এক ব্যবস্থামুখী ক্রনিক কৌশলে পরিণত হয়েছে এখন। এভাবে কী রাষ্ট্রের সমস্যার সমাধার করা সম্ভব! রাষ্ট্র কী এভাবে চলতে সক্ষম। রাষ্ট্র তো ব্যক্তি নয়। যে কাঠামো ও ছকে সরকার পরিচালনা হয়, সেখানে অথরিটিশিপ থাকাটা জরুরি। তা থাকার কথাও। সেটি এতদিনে হয়নি। দক্ষ ও নৈপুণ্যতা তো দূরের কথা। কিছুতেই কোথাও তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। না দলে, না প্রশাসনে, না সরকারের অভ্যন্তর কাঠামোয়। একজন সভানেত্রী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- তার তো চিন্তা-কাঠামো অনেক সুদূরপ্রসারী এবং সেটি হওয়ার জন্য তো তাকে চিন্তার সময় দিতে হবে।

আমাদের সর্বস্তরে নৈরাজ্য ও নিয়ন্ত্রণহীনতা, লা-জওয়াব কৃষ্টির কারণেই এমনটা হচ্ছে। এখন সেটি আরো ভয়ানক রূপ নিচ্ছে বলে মনে হয়। সেজন্য ভয় ও আশঙ্কা বাড়ছে। এখন ক্ষমতায় থাকা না থাকায় মনোযোগী হওয়ার চেয়ে সামগ্রিক সাংগঠনিক কাঠামোর অগ্রগতির বিষয়টি যাতে ঝুঁকিতে না পড়ে সেটাতেই অধিক মনোযোগী হওয়া জরুরি। কারণ সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা কঠোর ও স্বচ্ছ হলে অনেক কিছুই টিকে থাকা সহজ। এক্ষুনি সরকারকে সে বিষয়ে আরো সতর্ক হতে হবে। কোনো গভীর খাদে যাতে আমরা পড়ে না যাই। এটা আশঙ্কার যে, শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়, আমাদের প্রগতিপন্থার সবটুকু যদি খসে পড়ে তবে তার পরিণতিতে আমরা কেউই রেহাই পাব না। প্রসঙ্গত, আজকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ইরাকের কিংবা মিসর-লিবিয়ার কী পরিণতি- কল্পনা করা যায়! আমাদের সুন্দর বাংলাদেশকে আমরা সেদিকে ঠেলে দিতে চাই না। মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে কিছুতেই জলাঞ্জলি দেয়া যাবে না। এখনই তা রুখতে হবে। দুর্নীতির বোঝা নামাতে হবে। পার্টির নামে, ক্ষমতার নামে, সরকারের নামে কোনো অন্যায় বদাস্ত করা ঠিক হবে না। অতি-উৎসাহীদের আস্থায় নেয়া যাবে না। এখন কোথাও বিরোধীদের দেখা যায় না! বঙ্গবন্ধু হত্যার একুশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দেশে দশটি সংসদ নির্বাচন হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের বাইরে একটি অংশের সমর্থকগোষ্ঠী আছে- তারা এখন কোথায়! যারা ধর্মানুসারী দল, উগ্র ডানপন্থি দল, আটের দশকের রাজনীতিতে  স্বৈরশাসনের পৃষ্ঠপোষণার যারা সক্রিয় ছিল তারা এখন কোথায়! সব কী নৌকার গণজোয়ারে বশীভূত হয়ে গেল? এই প্রশ্নটি করি। এই গণজোয়ার কী প্রকৃত মতাদর্শদের বা আনন্দ ও সাফল্যের? সেটি চিহ্নিত করাটাও এখন জরুরি। বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসে অনেক পরিবর্তন চোখে পড়েছে। অনেক স্মৃতিও আছে। যারা অভিজ্ঞ, দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের এসব স্মৃতি নিরপেক্ষতার আয়নায় যাচাই করা প্রয়োজন। নইলে দুঃসময় তৈরি হলে কাউকেই কিন্তু পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই আমরা কেউই চাইব না উন্নয়নের ধারা বেপথু হোক। অন্য কোনো অন্ধকার পরিণতি আমাদের নেমে আসুক। কিন্তু আবেগ ও অতিশয় আস্থায় তার মূল্য গুনলে কিন্তু চলবে না। বাস্তব অবস্থাটা বিচার করতে হবে। বাস্তবতার চোখে কঠোর সিদ্ধান্তটি নেয়া চাই। কারণ আওয়ামী লীগ পুরনো দল, সে দলের সমর্থক এবং নির্বাচনী অভিজ্ঞতা বেশি থাকবে, সমর্থকও বেশি কিন্তু সেটি যেন উল্টে না যায়! সত্যিকার অর্থে, যখন দেখা যায়, কোথাও বিরোধী দল নেই, বিরোধীরা তৎপর নয়, বিপরীতে ক্ষমতাসীনরা অধিক উন্মত্ততায় উল্লসিত, তখন কে আপন আর কে পর তাও চিহ্নিত করা মুশকিল হয়ে যায়- তখন ভয় আর আশঙ্কা চেপে বসে। ‘অর্থ’ ও ‘নীতি’ কিন্তু এক নয়। অর্থ দিয়ে নীতি-আদর্শ কেনা যায় না। অর্থই অনর্থের মূল। সুতরাং সতর্কতাটা ওখানেই যে, দল কারা চালায়, সাংসদ কারা, তৃণমূলের নেতৃত্ব কে পাচ্ছে, প্রকৃত শিক্ষিত ও আস্থাশীল ব্যক্তি দলের প্রতীকটি বহন করছেন কিনা; তিনি কী ধরনের সংগঠক- সেটি বাছাই করাটাই সংগঠনের কাজ। সংগঠক সেটিই করবেন। আওয়ামী লীগ সেই সংগঠনের ধারায় সচল ও প্রবহমান একটি দল। সেটি ভূলে গেলে চলবে না। যে কোনো মূল্যে তা রক্ষা করতে হবে। আর সহজ পথই সবকিছু রক্ষার সহজ উপায়।

দশ বছর প্রশাসন চালানোর ফলে স্বভাবতই অনেক ময়লা জমে যায়। এই ময়লা এখন দূর করাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে গেছে। নানারকম তার আকার-আকৃতি, প্রকৃতি। রংও তার নানা রকমের। এ থেকে এক্ষুনি বেরুতে হবে। নইলে খাদের কিনারে যে ভয় ও আশঙ্কা তা দূর হবে না। এ জন্য সবাইকে ঐক্য থেকে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ও আদর্শের পক্ষে থেকে কাজ করতে হবে। অবস্থান নিতে হবে। এটিই সহজ ও সরল পথ। এবং প্রশাসনও সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন আসলে অনেক কিছুই সহজ করে দেয়। অনেক দিক অভিপ্রেত হতে তখন বাধ্যও হয়। জয় তো শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়, সব মানুষের অধিকারের সপক্ষেই আমাদের সবার জয় ছিনিয়ে আনতে হবে। এই সংকল্প হোক সবার। বিরোধীরা উগ্র মতাদর্শের কারণেই পদদলিত হবে, আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। কারণ দর্শানো ছাড়া দল চলে না। বিরোধের জন্য বিরোধিতা কোনো আদর্শ নয়। তাই বাংলাদেশ জন্মই আমাদের দর্শন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তিকে সেই লক্ষ্যেই ঐক্যবদ্ধ করে কাজের কাজটুকু করতে হবে। এর বাইরে কোনো বিকল্প নেই।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

.

॥ ড. এম এ মাননান ॥

মাদকবিরোধী অভিযান আরও যা করতে হবে

২৪ জুলাই জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং মাদকবিরোধী অভিযান চলবে। অত্যন্ত আশা-জাগানিয়া কথা।

আগের অনেক সরকারের আমলেই আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় গিয়ে নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা কথার ফুলঝুরি ছড়াতে থাকেন, অনেক অনেক আপ্তবাক্য বলেন, প্রতিশ্র“তিতে বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই অর্জিত হয় না, জনগণ তাদের কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যের পরিবর্তে খুঁজে পায় বিশাল ফারাক। এখন নেতৃত্বের বদলের সঙ্গে সঙ্গে নেতাদের কথার মধ্যেও এসেছে বিপুল পরিবর্তন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অনেক অনাকাঙ্খিত জিনিসও বদলে দিচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায় জনগণের কাছে লৌহমানবী নামে এর মধ্যেই সুুপরিচিত বঙ্গবন্ধুর অকুতোভয় কন্যা পিতার মতোই দৃঢ়চিত্তে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বছরের ৪ মে থেকে শুরু হওয়া এ অভিযানকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবারও নির্দেশ দিলেন এবং অভয় দিলেন ডিসিরা যেন বিনা দ্বিধায় সন্ত্রাস ও টেন্ডারবাজিসহ মাদক নির্মূল করেন- কে কোন দল করে, কে কী করে সেগুলো দেখার কোনো দরকার নেই।

তিনি আরও একটি আশাব্যঞ্জক নির্দেশনা দিয়েছেন: ‘যদি কেউ বাধা দেয়, আপনারা সরাসরি আমার সঙ্গে বা আমার অফিসে যোগাযোগ করতে পারবেন।’ তিনি তাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘সরকারপ্রধান হতে পারি, আমি কিন্তু জাতির পিতার কন্যা, আপনাদের সেটাও মনে রাখতে হবে।’ আমার প্রায় ঊনসত্তর বছরের জীবনে রাষ্ট্রনেতাদের কাছ থেকে এমন ভয় তাড়ানিয়া অভয় বাণী কখনও শুনিনি।

তিনি অনুধাবন করেছেন, তরুণদের মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে তরুণদের নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন। তাই তিনি একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিজ নিজ জেলায় ক্রীড়া, বিনোদন ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সুযোগ বাড়ানোর জন্যও নির্দেশনা দিয়েছেন।

সবারই জানা, অন্যতম মাদক ইয়াবার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মিয়ানমার। এ দেশটি সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ, ভারত আর থাইল্যান্ডে ইয়াবা পাচার করছে বহু বছর ধরে। মিয়ানমারের নির্জন পাহাড়ের ঘন অরণ্যের ভেতরে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামক এলাকা ইয়াবা ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির সরকার নিজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধির লোভে এ জীবনবিধ্বংসী ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু মাদক আফগানিস্তান থেকেও আসে।

ব্রিটিশরা কয়েক শতাব্দী আগেই বিভিন্ন ধরনের মাদক অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশে প্রচলন করে দিয়েছিল যাতে প্রজারা রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার মতো শক্তি হারিয়ে ফেলে ও মাদকাসক্ত হয়ে দিনরাত ঝিম মেরে পড়ে থাকে। ব্রিটিশরা ভালো করেই জানত, ঝিম মেরে পড়ে থাকা মানুষ জীবনীশক্তি হারিয়ে শুধু পরিবারের বোঝাই বাড়ায় না, তারা অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকে।

মাদক একটি যন্ত্রণার নাম। মাদকের মাদকতায় একবার যারা ডুবেছে, তারা না বুঝলেও তাদের আপনজনরা বোঝে তারা কোন সর্বনাশের লেজে পা দিয়েছে। মাদক তিলে তিলে সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাদক যদি একবার একটা জাতিকে গ্রাস করতে পারে, সে জাতি আর সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। ব্যক্তি-মাদকসেবীদের যেমন একূল-ওকূল কোনো কূলই থাকে না, তেমনি তাদের জাতিরও আগ-পর সব শেষ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মাদকসেবীরা।

বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরী-তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ ডুবে যাচ্ছে মাদকে, হারিয়ে ফেলছে জীবনীশক্তি। অকর্মণ্য হয়ে যাচ্ছে সমাজজীবনে। বোঝা বনে যাচ্ছে পরিবারের, সমাজের এবং দেশের। মাদকগ্রস্ত হয়ে এরা হয়ে যাচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল, করছে ছিনতাই, রাস্তায় আর অলিগলিতে করছে বখাটেপনা, জড়িয়ে পড়ছে চুরি-চামারি আর খুনখারাবিতে। মা-বাবা-আত্মীয়স্বজন অসহায় নয়নে দেখছে তাদের প্রিয়জন শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তিলে তিলে।

মাদকসেবীরা কোথাও কোথাও ভাইকে, মাকে, স্ত্রীকে, বাবাকে পর্যন্ত খুন করছে নেশার ঘোরে কিংবা মাদক কেনার টাকার জন্য। কলেজছাত্রী ঐশীর কথা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যায়নি, যে মেয়েটি নেশার কারণেই বাবা-মাকে হত্যা করার অপরাধে আদালতের রায়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার জন্য অপেক্ষমাণ।

মাদকবিরোধী অভিযানে জনগণ ভীষণ খুশি। তাদের মনে স্বস্তি আসায় সমর্থন দিচ্ছে অকুণ্ঠচিত্তে। সবাই বুঝতে পেরেছে এক কোটির কাছাকাছি মাদকসেবী শুধু তাদের পরিবারেরই নয়, পুরো দেশটার বোঝায় পরিণত হচ্ছে। শহরের গন্ডি ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও চলছে মাদকের আগ্রাসন। চাহিদার ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সঙ্গে মাদক কারবারির সংখ্যাও বাড়ছে সারা দেশে। একই সঙ্গে বাড়ছে সমাজের-দেশের বোঝা। এ বোঝা আরও বাড়তে থাকবে যদি না মাদকের আগ্রাসনের রাশ টেনে ধরা যায়। যে যা বলে বলুক, মাদক অভিযান চালাতেই হবে যতক্ষণ না সমস্যাটি সমূলে উৎখাত হয়।

মাদক নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষ বিচলিত। দক্ষিণ আমেরিকার কলম্বিয়া, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো, আফ্রিকার নাইজেরিয়া আর সাউথ আফ্রিকা, এশিয়ার ফিলিপিন্স আর থাইল্যান্ডে মাদকের রমরমা ব্যবসা। এদেশগুলোয় অনেক আগে থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে মরছে অসংখ্য মাদক-ব্যবসায়ী আর মাদকসেবী। কাজেই বাংলাদেশ একাই মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে না।

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান সারা বিশ্বে বহু আগে থেকেই পরিচালিত হয়ে আসছে। ফিলিপিন্সের বর্তমান প্রেসিডেন্ট দুতের্তে তো রীতিমতো মাদকের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’ ঘোষণা করেছেন। কিছুদিন আগে ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় দেখেছি, সাধারণ মানুষ পর্যন্ত কীভাবে মাদক-কারবারিদের বিরুদ্ধে খক্ষহস্ত। বাংলাদেশেও এমনটি দেখে আমরা আশান্বিত। তবে আমরা কামনা করব, কোনো নিরীহ মানুষ যেন এ অভিযানে হয়রানির শিকার না হয়।

আলোর মধ্যেও কখনও কখনও পোকা ঢুকে আলোকে অনুজ্জ্বল করে ফেলে। মাদকের ক্ষেত্রেও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যারা মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত তাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তি মাদক-কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশে লিপ্ত।

কালের কণ্ঠের একটি সংবাদে দেখতে পেলাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২১৩ জন সদস্যকে শনাক্ত করা হয়েছে যারা মাদক ব্যবসায় মদদ দিচ্ছে। এ ধরনের অসুখকর খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে। তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। তা হল, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এককভাবে মাদক নির্মূল করা যাবে না। মাদক থেকে পরিত্রাণের আরও উপায় খুঁজতে হবে। কিছু উপায় এখানে তুলে ধরলাম।

১. উৎসমূল ধ্বংস করা। মিয়ানমার সীমান্ত এমনভাবে বন্ধ করা দরকার যাতে কোনোভাবেই মাদক দেশের ভেতরে ঢুকতে না পারে। সীমান্তে পাহারা চৌকি তৈরি করে সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই। মিয়ানমার বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সঙ্গে মাদকও বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দিচ্ছে।

২. চাহিদা বন্ধ করা। বিভিন্ন সামাজিক ও আইনগত উদ্যোগ গ্রহণ করে মাদকসেবীর সংখ্যা শূন্যে বা শূন্যের কাছাকাছি আনতে পারলে বাজার শক্তিসমূহের মিথস্ক্রিয়ায় জোগান এমনিতেই স্বাভাবিক নিয়মে বন্ধ হয়ে যাবে।

৩. সাংস্কৃতিক-বিনোদন কর্মকান্ড বৃদ্ধি। খেলাধুলার পরিবেশ সৃষ্টিসহ জারিগান, সারিগান, যাত্রাগান, বিকালে মাঠে খেলার ব্যবস্থাকরণ, বৈশাখী মেলা, পূজাপার্বণে অনুষ্ঠান, ফুটবলের সুদিন ফিরিয়ে আনা এবং স্কুল-কলেজের মাঠগুলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া অপরিহার্য।

৪. শিক্ষকদের মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে সম্পৃক্ত করা। দিনের একটা বড় অংশ শিক্ষার্থীরা কাটায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের সান্নিধ্যে। শিশুদের ব্যস্ত রাখতে হবে গানে, খেলায়, বাগানের কাজে, চিত্রাঙ্কনে, নাটকে, বিতর্কে, বৃক্ষরোপণে, গল্প-কবিতা লেখার প্রতিযোগিতায়, রচনা প্রতিযোগিতায়, গল্পের বই পড়ায়। নিরানন্দ, একঘেয়ে লেখাপড়ার হাত থেকে তাদের মুক্তি দিয়ে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখা খুবই জরুরি।

বিড়ি-সিগারেটের কুফল থেকে শুরু করে সব ধরনের নেশাজাতীয় জিনিসের ক্ষতিকর দিকগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে প্রাঞ্জল ভাষায় নিয়মিত তুলে ধরতে হবে মাসিক আলোচনা বা মতবিনিময় সভায়।

৫. তিন লাখ মসজিদের ছয় লাখ ইমাম মোয়াজ্জিনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি। পবিত্র ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত মাদক সংক্রান্ত বিষয়গুলো, বিশেষ করে সূরা মায়িদার ৯০ ও ৯১ আয়াত থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাদিস তুলে ধরে তারা সব অপরাধ-অনাচার-পাপের জনক মাদক-ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের আখেরাতে ভয়ংকর পরিণতির কথা প্রচার করতে পারেন।

৬. পরিবার থেকে সচেতনতা শুরু করা। সন্তানদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন বাড়াতেই হবে। সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়াতে না পারলে পরিবারেই বিপর্যয় নেমে আসবে নিজের অজান্তে। পরীক্ষার চাপে রেখে খেলাধুলা কমিয়ে দিয়ে সকালে ক্লাস আর বিকালে কোচিংয়ে পাঠিয়ে সন্তানকে কী উপহার দিচ্ছি আমরা? নিজের অজান্তেই ঠেলে দিচ্ছি মাদকের হাতে।

৭. দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। কেউ কেউ মাদক নির্মূলের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছেন। মনে হয়, আইডিয়াটা উত্তম।

৮. অবিশ্বাস্য বিত্তশালীদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করা। তাদের অর্থের উৎস কোথায়? একই সঙ্গে কায়েমি স্বার্থবাদীদের চিহ্নিত করে তাদেরও উৎখাতের ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কায়েমি স্বার্থবাদীরা তাদের নিজ লোভের কারণে মাদক নির্মূল চায় না। গডফাদারসহ পাইকারি-খুচরা কারবারি সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা খায় তাদেরও খাওয়ার অপরাধে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো জরুরি। নতুবা চাহিদার দিকটি উপেক্ষিত থেকে গেলে বাজার-শক্তির সূত্র ধরে জোগান আসতেই থাকবে।

৯. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভূত তাড়ানো সচেতনভাবে, স্থায়ীভাবে। সরিষার ভেতরে ভূত থেকে গেলে ‘জিন’ তাড়ানো যায় না। তাই প্রশাসনকেও ঢেলে সাজাতে হবে।

১০. বিয়ের আগে বর-কনের ডোপটেস্ট করানো। সমাজের সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিয়ে-শাদির কথা পাকাপোক্ত হওয়ার আগেই বর-কনের মাদক পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে বিয়ে বন্ধ করার পাশাপাশি পরিচিত সবাইকে বিষয়টা ঘটা করে জানিয়ে দিতে হবে, যাতে তার সঙ্গে আর কারও বিয়ে হতে না পারে। ডোপ টেস্ট সার্টিফিকেট ব্যতীত বিয়ে নিবন্ধন না করার জন্য ফরমান জারি করা আবশ্যক। বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ স্বামীর মাদকাসক্তি। ভুলে যাওয়া উচিত নয়, একটি বিবাহবিচ্ছেদ মানে দুটি নর-নারীর জীবন অমানিশায় ঢেকে যাওয়া আর তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের পাকে তলিয়ে যাওয়া।

অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মানবাধিকারের ধোয়া তুলে যারা রাজনৈতিক বাঁশি বাজাতে ব্যস্ত, তাদের বাঁশি বাজতে থাকুক; মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলতেই থাকুক। কারণ তাদের বাঁশি একবার বাজতে শুরু হলে আর থামে না, থামবেও না। অযথা বাঁশি বাজানো এদের বদাভ্যাস। ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে পিছুহটার কোনো সুযোগ নেই। এ অভিশাপ থেকে তরুণ সম্প্রদায়কে, এ জাতির ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতেই হবে।

মাদকের ভয়াবহতা এখন নির্মূল করা না হলে আর সময় কোথায়? যারা এর বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারা কিসের জন্য অপেক্ষা করছেন? মাদকসেবীদের ছুরি বুকে নিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার জন্য, না-কি নিজের নেশাগ্রস্ত সন্তানের হাতে জীবন বিলিয়ে দেয়ার জন্য? বিরোধিতার পথ থেকে সরে এসে মাদক নামক দৈত্যকে রুখে দাঁড়ান, নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করুন, নিজে সুস্থ থাকুন এবং কয়েক কোটি তরুণকে অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন।

মাদক ব্যবসায়ীরা দেশের শক্র, সব নাগরিকের শক্র। এরা নিজের লাভ ছাড়া আর কিছুই কামনা করে না। এরা আপনার আমার সন্তানের কথা ভাবে না; এরা নিজের সন্তানকে নিরাপদ দূরত্বে রাখে কিংবা ভিনদেশে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেদের জীবন নিশ্চিন্ত করে। এদের মানবাধিকারের কথা না বলে দেশের সম্পদ যুবাদের মানবাধিকারের কথা বলুন।

আমরা কি ভুলে গেছি অপিয়াম যুদ্ধের কথা? ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে চীন সপ্তদশ শতাব্দীতে দুটি যুদ্ধ করেছিল শুধু চীনে আফিম রফতানি বন্ধ করার লক্ষ্যে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধকালে (১৮৬০-৬৫) সৈনিকদের মধ্যে মাদকের স্বেচ্ছা বিস্তারের কথাও ভুলে যাওয়া যাবে না, যেমনি ভুললে ভুল হবে যদি ভুলে যাই হিটলারের চক্রান্তে জার্মানির সৈন্যদের মধ্যে ঘুম দূর করে দিনের পর দিন চাঙ্গা রাখা আর তাদের মধ্যে ভয়ভীতি তাড়িয়ে সক্রিয় রাখার জন্য লাখ লাখ অপিয়ামের বড়ি বিতরণের বিষয়টিও। ব্রিটিশরা তো আমাদের তখনও ছাড়েনি। ব্রিটিশ শাসকরা এ উপমহাদেশে পরিকল্পিতভাবে মাদকের বিস্তার ঘটিয়েছিল। অগণিত মানুষ মরেছে এসব গিলে। ইতিহাস এসবের সাক্ষী।

ইয়াবা, হেরোইনের মতো দেহ-মন বিধ্বংসকারী মাদক বাংলাদেশে জন্মায় না। এগুলো সরবরাহ করে অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা, মূল-পরিকল্পনায় থাকে আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা। কে যে কাকে কীভাবে ঠকাচ্ছে, তা দু’চোখে দেখা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন তৃতীয় নয়ন। এক ঠোঁটে আলতো হাসি হেসে দান-অনুদান দিচ্ছে; আরেক ঠোঁটে বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে অন্য হাতে তুলে দিচ্ছে জীবন-ধর্মবিধ্বংসী মাদকসহ অনেক অনাচারের উপাদান।

ইতিহাসের পাতা উল্টালেই এ রকম অজানা অনেক কিছু জানা যাবে। সপ্তদশ শতাব্দীর ইতিহাস থেকে কয়েকটি পাতা উল্টান, দেখতে পাবেন বিস্ময়কর তথ্য। পাঁচ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত ভিনদেশি গোয়েন্দাকে মুসলিম নাম দিয়ে গুপ্তচর হিসেবে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল ইরান, ইরাক, মিসর, তুরস্ক, সৌদি আরবসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোয়। তখন খিলাফতের হেডকোয়ার্টার ছিল তুরস্কে, যে খেলাফতের পতন ঘটে প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর পর ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে। এ গুপ্তচররা কৌশলে এসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, মসজিদে, মক্তবে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় ‘কাজ’ নিয়ে তাদের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী নানা সমস্যা ঢুকিয়ে দিয়েছে বিভিন্নভাবে।

তার মধ্যে অন্যতম ছিল মদ-জুয়া আর বিভিন্ন নেশার বিস্তার। উদ্দেশ্য, এ সম্প্রদায়কে বিপথে চালিত করে জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া, ধীরে ধীরে যাতে শেষ পর্যন্ত খিলাফতই ধ্বংস হয়ে যায়। পরিণামে হয়েছেও তাই। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, প্রজ্ঞাসম্পন্ন শাসক, সমাজসংস্কারক আর শান্তির বাহক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া মর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম জাতি ওদের ছড়িয়ে দেয়া মাদক আর অশ্লীলতার কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে গেল, হারিয়ে ফেলল খিলাফত।

তারই জের টানছি আমরা, তাদের উত্তরসূরিরা। এখনও সাবধান না হলে আর সাবধান হব কখন? জাতি ধ্বংসকারী মাদক উড়তে উড়তে আসেনি এ দেশে, আনা হয়েছে এবং হচ্ছে প্রচ্ছন্ন কৌশলে। বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন বলেই রশিতে টান দিয়েছেন জাতির জনকের সত্যিকারের উত্তরসূরি সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। বিনম্র শ্রদ্ধা তার প্রতি এ বহু আকাঙ্খিত উদ্যোগের জন্য। জয় হোক মাদকবিরোধী অভিযানের, জয় হোক বাংলাদেশের প্রত্যেক দেশপ্রেমিকের।

লেখক ঃ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

॥ কাজী ফারুক আহমেদ ॥

পরীক্ষা সংস্কারে চাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ

৯ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকে এর বিভিন্ন দিক যেমন- পাসের হার, জিপিএ, কোন শাখায় খারাপ, কোথায় গাফিলতি, তা নিয়ে দৈনিক সংবাদপত্রগুলো বিভিন্ন জনের মতপ্রকাশ অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে পরীক্ষার্থী, উচ্চমাধ্যমিকে পাঠদানকারী শিক্ষক, উচ্চশিক্ষা স্তরে পাঠদানকারী শিক্ষক, পরীক্ষার্থীর অভিভাবক, শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা এনজিও প্রতিনিধি সবাই আছেন।

এবারের পাসের হার ও জিপিএ-৫ : দেশের ১০টি শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাসের হার ৬৬.৬৪। তবে কম পাসের হার কয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে কত কম, তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। কারও কারও মতে, ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নগামী এবারের ফল। কেউ কেউ মনে করেন, তা ৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নগামী। ৭ বছরের মধ্যে ফল সবচেয়ে নিম্নগামী বলার লোকও আছেন।

অন্যদিকে কারও কারও মতে, এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলে বিপর্যয় হয়েছে। আবার কেউ কেউ তা পরিস্থিতির বিবেচনায় স্বাভাবিক মনে করেন। কারও কারও চিন্তা- উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে না। এবারের পরীক্ষায় ফলের দিক থেকে শহরের স্কুলের তুলনায় গ্রাম এলাকার ছাত্ররা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। শুধু ঢাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্রদের মধ্যে ৪০ শতাংশ।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে একটি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ সরকারি কলেজ। অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি থেকে। পাসের হার শতকরা ৪৫.২৫ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র দু’জন। জামালপুর জেলার ৮ সরকারি কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার ফলও এরকমই। ৮ কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মোট ৫ হাজার ৩২১ পরীক্ষার্থী। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ হাজার ৫৭৫ জন, অকৃতকার্য হয়েছে ২ হাজার ৫৮৬ জন। এ কলেজগুলো বেসরকারি এবং এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান হলে এরই মধ্যে শিক্ষকদের এমপিও নিয়ে হয়তো কথা উঠত।

কিন্তু সরকারি কলেজে এ ধরনের ফলাফলের দায় কার ওপর বর্তাবে? এতে কি শিক্ষকদের বেতনভাতা-পদোন্নতি প্রাপ্তিতে কোনো ব্যাঘাত হবে? প্রসঙ্গক্রমে এমপিওবঞ্চিত শিক্ষকদের একটি কলেজের পরীক্ষার্থীরা কীভাবে শতভাগ পাস করেছে, তা নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘শিক্ষকরা বেতন না পেলেও এইচএসসিতে শতভাগ পাস’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে। পনেরো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও নেই। তারপরও শিক্ষকদের নিরলস চেষ্টায় সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার জিডিবি আদর্শ কলেজ।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় কলেজটির মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ৮৫ পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে। এর মধ্যে মানবিক বিভাগের তিনজন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। যশোর শিক্ষা বোর্ডের শতভাগ পাস করা ছয়টি কলেজের মধ্যে এটি একটি। এর আগে ২০১৬ ও ২০১০ সালে শতভাগ পাসের কৃতিত্ব দেখায় কলেজটির শিক্ষার্থীরা। ২০১৫ সালে ৯৮ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে।

এছাড়া অন্যান্য বছরের ফলে কলেজটি ৮০ শতাংশের ওপরে পাস করেছে। এবার জিপিএ-৫ প্রাপ্ত দুই শিক্ষার্থী শারমিন খাতুন ও হৃদয় হোসেন বলেন, আমাদের শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায়ই আমরা জিপিএ-৫ পেয়েছি। আমরা এসএসসিতে জিপিএ-৫ না পেলেও স্যারদের আন্তরিকতা আর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে লেখাপড়া করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারেনি কেন, এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

পরীক্ষার ফল নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন পরীক্ষার্থী, একজন অভিভাবক মা ও একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের মতামত আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। খারাপ ফলের জন্য প্রশ্নপত্রে ১২টি ভুল এবং কঠিন প্রশ্নকে দুষছেন পরীক্ষার্থীরা। উল্লেখ্য, বরিশালে এবার এইচএসসির ফল গতবারের তুলনায় ভালো হলেও জিপিএ-৫ কমেছে। পরীক্ষার্থীরা এটিকে ফল বিপর্যয় বলছে। আবার অভিভাবকরাও ক্ষুব্ধ।

অভিভাবক আরজু বেগম মনে করেন, ফলে ধস নামার দায় শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকদের নয়। যারা প্রশ্নপত্র করেছেন, তারাই এজন্য দায়ী। শহরের ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মহসিন-উল ইসলামের মতে, ‘শিক্ষা বোর্ডের মনিটরিং ব্যবস্থা আরও ভালো হলে ফলও ভালো হতো। তার মতে, কোচিংমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই দিন দিন পড়ালেখার মান খারাপ হচ্ছে আর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় খারাপ ফল করছে। এজন্য স্কুল-কলেজগুলোর অভ্যন্তরে এবং বাইরে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। তাহলে ক্লাসে পাঠ নেয়ায় শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হবে।’

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে ইউএনডিপির এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেকেলে এবং অনুপযোগী শিখন পদ্ধতি, বিশেষত শ্রেণীকক্ষে শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের অবকাশ থাকে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইউএনডিপি, শুধু বহিঃপরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে সুপারিশ করে।

সব পরীক্ষা প্রশ্নব্যাংকের প্রশ্নে : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৩ বছরের প্রচেষ্টায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, গাইড-বই ব্যবসা বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভরতা কমাতে যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রশ্নব্যাংক তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, বোর্ডের আওতাধীন স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সব পরীক্ষা হবে এ প্রশ্নব্যাংকের প্রশ্ন দিয়েই। আর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের পাশাপাশি এ প্রশ্ন তৈরি করবেন শিক্ষার্থীরাও।

বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, এ পদক্ষেপ সফল হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সব বোর্ডে চালু করবে এ পদ্ধতি। অতীতে বি. চৌধুরী শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে প্রশ্নব্যাংক চালু নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক উদ্যোগ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে বলে আশা করা যেতে পারে। এমনিতে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এভাবে একের পর এক নতুন নতুন পরিকল্পনার চাপে আছে শিক্ষার্থীরা। এই তিন স্তরে শিক্ষার্থী প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পরীক্ষা ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে সবাই। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত নির্বাহী আদেশে হলে নানা ধরনের জটিলতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করেন।

গত এক দশকে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশকিছু নতুন সিদ্ধান্ত এসেছে। কখনও পরীক্ষা, কখনও বিষয়ের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। মুখস্থ বিদ্যার বদলে শিক্ষার্থীরা বুঝে পড়বে ও শিখবে, এমন উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০৮ সালে শিক্ষা ব্যবস্থায় সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। প্রথমে মাধ্যমিক স্তরে এ পদ্ধতিতে প্রশ্নপত্র করা হয়। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি একাধিক গবেষণা ও জরিপে জানা যাচ্ছে, এখনও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের প্রায় অর্ধেক শিক্ষক সৃজনশীল পদ্ধতি ভালো করে বোঝেন না এবং এ পদ্ধতিতে প্রশ্নও করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণীকক্ষে যথাযথ শিক্ষা না পেয়ে নোট-গাইড বা অনুশীলন বই এবং কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষকের অভিমত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. ছিদ্দিকুর রহমানের মতে, এবারের এইচএসসির ফল বাস্তবসম্মত। তিনি বলেন, ‘এবারের এইচএসসির ফলের মাধ্যমে আমরা বাস্তবের কাছাকাছি রয়েছি বলে মনে করা যায়। পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ বাড়লে তা নিয়ে উচ্ছ্বাস করে লাভ নেই, যদি না বাস্তবে তার ফল দেখা যায়। আবার এবারের মতো ফলকে ‘খারাপ’ বা ‘নিম্নমুখী’ বলে বুক চাপড়ানোরও কিছু নেই। তবে আমরা ইতিবাচক ও ভালো লক্ষণ দেখছি।

স্বাভাবিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দিকনির্দেশনা তারই অন্যতম।’ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে খাতা মূল্যায়ন পদ্ধতি মেধা মূল্যায়নভিত্তিক নয়। ‘ফল যাই হোক না কেন, সেই ফলে শিক্ষার্থীদের শিখন ফল হয়তো কিছুটা প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার ফল প্রতিফলিত হয়নি। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষিত হল কি না, জ্ঞান অর্জন করল কি না, সেটি নির্ধারিত হয়নি।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মীজানুর রহমান মনে করেন, ‘দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যয়ের কারণ হচ্ছে শিক্ষকের স্বল্পতা এবং নিবেদিত শিক্ষকের অভাব। …আমাদের দেশে ভালো ছাত্রের কোনো অভাব নেই। কিন্তু ভালো শিক্ষকের বড়ই অভাব। …শিক্ষার্থী ফেল করছে। ফেল করাতে বাচ্চাদের কোনো দোষ নেই, এটা অভিভাবকের দোষ। অভিভাবকরা মনে করেন, জিপিএ-৫ বা পরীক্ষায় পাস এগুলোই জীবনের চূড়ান্ত পর্যায়। রেজাল্টভিত্তিক মনোভাব থেকে অভিভাবকদের বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে কিন্তু আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বাড়তে থাকবে।’

এশিয়ার ১২ দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ইউনেস্কো : কম্বোডিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের পরীক্ষা ব্যবস্থার পর্যালোচনা করে ২০১৭ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। দেশগুলোর অবস্থায় বিভিন্নতা সত্ত্বেও অভিন্ন সমালোচনার বহু বিষয় ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরে প্রচলিত ব্যবস্থার উন্নয়নে যে ৫টি পরামর্শ দেয়া হয় তা হল- ১. মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ২. পরীক্ষার চাপ কমানো ৩. বহুধারার, বিভিন্নমুখী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী/পরীক্ষার্থীর জন্য অনুকূল ব্যবস্থা চালু ৪. বৃহত্তর পরিধিতে শিক্ষাক্রম মূল্যায়ন ৫. গুণগত মান ও জনআস্থা নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার মূল্যায়ন, পরীক্ষা পদ্ধতি ইউনেস্কো পরিচালিত উপরিউক্ত গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত না হলেও আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্খিত সংস্কার আনার ক্ষেত্রে তা যে কাজে আসবে, তাতে সন্দেহ নেই।

শিক্ষাবান্ধব শেখ হাসিনার পরামর্শ : এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের সময় পাবলিক পরীক্ষার সময় কমিয়ে পড়াশোনার সময় সাশ্রয় করার পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যখন পরীক্ষা দিয়েছি, তখন তো আমাদের দুই বেলা করে পরীক্ষা দিতে হতো। সকালে এক পেপার, বিকালে এক পেপার। আমাদের তো দম ফেলার সময়ই থাকত না, সাত দিনে পরীক্ষা শেষ। …১০টা সাবজেক্ট, মাঝখানে দুই দিন ছুটি ধরে আমাদের পরীক্ষা শেষ হয়ে যেত।’

আজকের বাস্তবতায় পরীক্ষার সময় কী করে কমানো যায়, তা খুঁজে দেখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার সময় আরেকটু কমিয়ে আনার ব্যবস্থা যদি করতে পারেন, তাহলে দেখবেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করবে, পরীক্ষাটাও তাড়াতাড়ি হবে, আর এখানে ওই যে নানা ধরনের কথা প্রচার, অপপ্রচার, তার হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া যাবে।’ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। যারা অকৃতকার্য হয়েছে তাদের মনোবল হারালে চলবে না। পরবর্তী পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। এখন থেকে মনোযোগ দিয়ে পড়লে কৃতকার্য হবে। নিজের ইচ্ছায় পড়াতে হবে।’ অভিভাবকদের শেখ হাসিনা পরামর্শ দেন- ‘ছেলেমেয়েদের বকাঝকা করবেন না। কেন খারাপ করল, তা খুঁজে বের করুন।’

পরীক্ষা সংস্কার অপরিহার্য : এ প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের মূল্যায়নে আমাদের দেশে যে পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তা কতটা কার্যকর, নিরূপণের সময় এসেছে। সমস্যাটিকে খন্ডিত ও বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। দেশে-বিদেশের উদাহরণ, ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন, সব স্তর ও পর্যায় বিশেষ করে তৃণমূলের শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিজ্ঞতার পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষার আদৌ উপযোগিতা আছে কি না বা কতটুকু আছে, তা যাচাই করে একটি যুগোপযোগী জাতীয় পরীক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশের পরীক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষাবিষয়ক গবেষণা পরিচালনা ও কর্মসূচি গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক উভয় পরীক্ষার দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের পর্যায় ও পালাক্রমিক প্রশিক্ষণ প্রদানের কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। সেই সঙ্গে বোর্ডভিত্তিক না করে জেলা ও উপজেলা ভিত্তিতে আঞ্চলিকভাবে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যায় কি না, ভেবে দেখা যেতে পারে।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসির মতো দুটি বড় পাবলিক পরীক্ষা সংস্কার ও যদ্দূর সম্ভব ক্রটিমুক্তভাবে গ্রহণ করা যেমন অপরিহার্য, একইভাবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ পরীক্ষা, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষাও এর সঙ্গে যুক্ত করা আবশ্যক। কেউ কেউ পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক বললেও প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান অথবা মেধা নির্ধারক বলা চলে না। বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা ভীতিরও কারণ। এরই মধ্যে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলের কারণে ৩ পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে, শিক্ষার্থীর কাম্য বিকাশের অনুকূল পরীক্ষা সংস্কারে সব স্টেকহোল্ডারের যুক্তিসঙ্গত মতামত ও পরামর্শ ধারণ ও সমন্বয় করে সাহসী ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকন্যাই সবচেয়ে উপযুক্ত মানুষ।

লেখক ঃ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

শেখ হাসিনা যথার্থই বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন

গত ২১ জুলাই শনিবার ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় সভাপতি এবং সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৪টি কারণে সংবর্ধনা দেয়া হয়। কারণগুলো হচ্ছে স্বল্পোন্নত থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ জয়, অস্ট্রেলিয়ায় গে¬াবাল উইমেন্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড এবং ভারতের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডি লিট ডিগ্রি প্রদান। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বক্তব্যের শুরুতেই পিতা বঙ্গবন্ধুর মতোই রবীন্দ্রনাথের লেখা পঙিক্ত ‘এ মণিহার আমার নাহি সাজে’ আওড়িয়ে সংবর্ধনার আয়োজনকে দেশের জনগণের প্রতি উৎসর্গ করে দেন।

সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের প্রবীণ নেত্রী, সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী। এতে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই ভাষণ দেননি, ফলে স্তুতিচর্চায় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। দলের সাধারণ সম্পাদক লিখিত মানপত্র পাঠ করেন। শুরুতে সংক্ষিপ্ত নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশনার অনুষ্ঠানটি কেবলই শেখ হাসিনার একক বক্তৃতায় প্রাণবন্ত হয়েছে। লাখ লাখ শ্রোতা-দর্শক মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছে। যদিও অনেক কথাই তিনি আগেও বলেছেন, শনিবার আবার বললেন। তাতে একসঙ্গে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই ধারাবাহিক চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষত ১৯৭৫-এর পরবর্তী প্রজন্ম অনেক কিছুই আগের জানা-অজানায় মিলিয়ে নিতে পারার কথা, তুলনামূলক চিন্তাতেও খোরাক জোগানোর কথা। এখনো যুবসমাজের অনেকেই ১৯৭৫-এর হত্যাকান্ডের ভুল বর্ণনা শুনে প্রবীণ হওয়ার অপেক্ষায় আছে, উঠতি তরুণদেরও অনেকে আছে যারা বিকৃত ইতিহাস শুনে বড় হচ্ছে। এখানে বঙ্গবন্ধু তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অসংখ্য মিথ্যা, বানোয়াট গল্প বানানো হয়েছে, সেগুলো গ্রামগঞ্জে, শহরে কয়েক দশক ধরে প্রচার করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে অনেক তরুণ-তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় যাদের কথা ও প্রশ্ন শুনে বিস্মিত হই, কষ্ট পাই। এরা দেশে শুদ্ধ ইতিহাসের ক, খও জানে না, কিন্তু বিকৃত ইতিহাস বয়ান করে যেভাবে নিজের ‘জানা’কে আঁকড়ে ধরে আছে- তা থেকে তাদের মুক্তির পথ খুব সহজ নয় বলেই মনে হচ্ছে। আমাদের সমাজে মুখরোচক গল্পের প্রসার ব্যাপক, এটিকে যাচাই-বাছাই করে দেখার মানসিকতা প্রায় নেই বললেই চলে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসটি বারবার বলা ও শোনানোর উদ্যোগকে ভিন্নভাবে নিয়ে লাভ নেই। যারা জানেন তাদের সংখ্যা কম, যারা কম জানেন তাদের সংখ্যাও খুব বেশি না, তবে যারা বিকৃত তথ্য জানে, বিশ্বাস করে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি। সুতরাং তাদের জানার জন্য হলেও এসব বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হওয়া প্রয়োজন। যে দেশে এক সময় বঙ্গবন্ধুর নামই ভুলিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাকে নিয়ে লেখালেখি বন্ধ ছিল, সেই দেশে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র দর্শন, রাষ্ট্র গঠনের বিষয়টি আরো বেশি বেশি আলোচনায় আসা উচিত। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের তরুণদের বড় একটি অংশই নিজের দেশের গৌরবময় অধ্যায় সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে, খুব বেশি মৌলিক বই-পুস্তক পড়ার অভ্যাস তাদের মধ্যে দেখা যায় না। অথচ অগৌরবময় অধ্যায় সম্পর্কে তাদের রয়েছে উচ্চ ধারণা। একটি প্রতিসংস্কার তথা প্রতিবিপ্লবের ঢেউ এ দেশের সমাজ-রাষ্ট্র, রাজনীতির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। সেটির রেশ এখনো কাটেনি। তারা এখনো ১৯৭৫-এর হত্যাকান্ডের নেপথ্য নায়কদের খুব বেশি চেনে না, এই হত্যাকান্ডের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী ছিল- তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা মোটেও সুখকর ছিল না। কেন এমন হয়েছিল- তার  বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানা ও বোঝা মোটেও সহজ নয়। সেই কাজটি আমাদের রাজনীতিবিদরা খুব একটা করেননি। তাদের বেশিরভাগেরই বক্তৃতা-বিবৃতিতে দেশের রাজনীতির ইতিহাসনিষ্ঠ অবস্থানের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকে না। ফলে রাজনীতি হয়ে উঠেছে বেশিরভাগ নবাগতদের জন্য কেবইল গলাবাজি করা, প্রতিপক্ষকে গালাগাল করা, বিকৃত তথ্য, মিথ্যাচার ইদ্যাদিকে দলীয়ভাবে চলতে দেয়া। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত একভাবে চলেছে, ১৯৭৫-এর সাম্প্রদায়িকতাকে দেশের রাজনীতিতে ছড়িয়ে দেয়ার নীল নকশা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে যে সব দল চুটিয়ে রাজনীতি করেছে তাদের মিশন সফল হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণতন্ত্রের আদর্শ বাস্তবায়নের রাজনীতি। সেখানেই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির স্বরূপ উন্মোচন করা। কিন্তু কাজটি শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য দলের নেতারা করছেন না- এই সত্য স্বীকার করতে হবে।

এক সময় ধারণা দেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ মানে হিন্দুদের দল, ভারতের অনুগত দল, ধর্মবিরোধী দল। এ ধরনের প্রচারণায় এক সময় সাধারণ মানুষ, তরুণ সমাজ, এমনকি উচ্চ শিক্ষিত একটি গোষ্ঠীও বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু এমন জিগির তোলা রাজনীতি দেশ ও জাতিকে কোনো উন্নতি, অগ্রগতি দেয়নি বরং বাংলাদেশে তিমিরই আবদ্ধ ছিল। যারা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতায় থেকেছে তারা ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি, সীমান্ত চুক্তি, সমুদ্র সীমানা, পর্বত চট্টগ্রামের সংকট ইত্যাদির কোনোটিই সমাধান চায়নি, বরং সমস্যাগুলো জিইয়ে রেখে ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা রেখে অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। এটি কোনো রাষ্ট্রকে আধুনিক চিন্তা- চেতনা ধ্যান-ধারণা ও অর্থনৈতিক উন্নতি দিতে পারে না। বাংলাদেশ যত বছর সাম্প্রদায়িকতা ও ভারতবিরোধিতার বৃত্তে আবদ্ধ থাকার সম্পর্ক ও রাজনীতি নিয়ে চলেছিল তত বছর আমাদের মাথাপিছু আয় খুব একটা বাড়েনি, দারিদ্র্য উল্লেখ করার মতো কমেনি, মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেনি, বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব একটা মর্যাদার আসন স্পর্শ করতে পারেনি। এমন আত্মঘাতী রাজনীতির শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ এবং এর বৃহত্তর জনসাধারণ।

কিন্তু ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অতীতের অপপ্রচার ভাঙার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে থাকে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে থাকে, বাংলাদেশের সমস্যা একে একে সমাধান হতে থাকে, দেশের বিদেশ নির্ভরশীলতা কমতে থাকে, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ আবার ফিরে আসে, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের আসর থেকে বাংলাদেশ মুক্ত করা হয়, দেশে সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের ধারা চালু হয়, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটার সুযোগ পায়। এর মূলে শেখ হাসিনার মিশন-ভিশনকে অনেকে ধরতে পারেনি। কিন্তু ২০০১-০৬ সালে জামায়াত-বিএনপির শাসনকাল বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের ভুল ভাঙতে সক্ষম হয় যে, বিএনপি-জামায়াত বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার কৌশল নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যবহার করছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় মানুষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ভূমিধস বিজয় দিয়েছে। শেখ হাসিনা সেই নির্বাচনে ২০২১ সালকে উন্নয়নের লক্ষ্য বছর হিসেবে ‘দিন বদলের সনদ’ ঘোষণা করেন, সর্বক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা ও কর্মকৌশল ঘোষণা করেন- যা রূপকল্প নামে পরিচিতি পায়। তখন বেশির ভাগ মানুষই বুঝতে পারেনি শেখ হাসিনার রূপকল্প কল্পনা, নাকি বাস্তবে রূপদানের সম্ভব হবে। অনেকেই ডিজিটাল শব্দ নিয়ে ব্যঙ্গ করত, কুইকরেন্টালে বিদ্যুত উৎপাদন নিয়ে নানা ধরনের কল্পকাহিনী ছড়িয়েছিল, কৃষি, সার, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে তার পরিকল্পনাকে অনেকেই গতানুগতিক ফাঁকিবাজি হিসেবে প্রচারও করেছিল, এমনকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেছিল। পদ্মা সেতু নিয়ে তো দুর্নীতির নানা অপপ্রচারে দেশে এমন বাতাস ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল- তাতে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়েছিল। তাদের সবার সন্দেহ, অবিশ্বাস, অপপ্রচার এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বকে মিথ্যা প্রমাণ করে শেখ হাসিনা রূপকল্প একের পর এক বাস্তবায়ন করেছেন। খাদ্যে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে, বিদ্যুত, রেল, যোগাযোগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনেতিক উন্নতি অগ্রগতিতে দেশকে দ্রুতই উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়নে দেশ এখন গ্লানিকর কোনো অবস্থানে আবদ্ধ নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, জঙ্গিবাদ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ অনেক বেশি মর্যাদার আসন লাভ করেছে। বাংলাদেশ ১০ বছরে ৫/৬ গুণ বিদ্যুত উৎপাদনে সক্ষম হওয়ার কথা ভাবতেই পারেনি। এখন তা বাস্তব সত্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। দেশে এনজিও নিয়ন্ত্রিত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দুর্বল হয়ে গেছে, রাষ্ট্র বিনামূল্যে বই দিয়ে বেশির ভাগ শিশুকেই স্কুলমুখী করেছে। এখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত অবস্থান থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের স্বীকৃতি লাভ করেছে, নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নের স্বীকৃতিও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে পেয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ^বিদ্যালয় শেখ হাসিনাকে ডি লিট উপাধি দিয়ে বাংলাদেশকেই যেন নতুনভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এসব অর্জনের পেছনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে বিশেষভাবে স্বীকার করতেই হবে। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস জনগণ সৃষ্টি করে সত্য, তবে সেই ইতিহাস রচনার জন্য জনগণের প্রয়োজন প্রকৃত নেতার নেতৃত্বে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বই আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তিনি সদ্য স্বাধীন দেশকে আধুনিক একটি রাষ্ট্র চরিত্র দিতেই সংবিধান প্রণয়ন, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে একে একে উদ্যোগ নিলেন, জোট আন্দোলনে বাংলাদেশকে তুলে ধরলেন, বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর পরিচয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে থাকে, নতুন স্বপ্ন দেখানোর এক নেতার নাম শেখ মুজিবুর রহমান যাকে বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সেই নেতাকে যারা হত্যা করেছে তারা বাংলাদেশকে পশ্চাৎপদ দেশে পরিণত করতেই তা করেছিল। তাদের সমগ্র শাসনকালে বাংলাদেশ ‘দ্বিতীয় পাকিস্তান’ নামে পরিচিত ছিল। প্রথম পাকিস্তান এখন দুনিয়া জুড়ে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় পাকিস্তান তথা পাকিস্তানের পদাঙ্ক অনুসারী জিয়া-এরশাদ-খালেদার বাংলাদেশও ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ারই তকমা লাভ করত। কিন্তু আমরা রক্ষা পেয়েছি ১৯৯৬-২০০১ সালের শেখ হাসিনার শাসন লাভের সুযোগ পাওয়ার কারণে। ২০০৯ থেকে মাত্র সাড়ে নয় বছরে বাংলাদেশ এখন এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। কীভাবে তা সম্ভব হয়েছে সেই গল্পই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়াজিত গণসংবর্ধনায় শেখ হাসিনা উপস্থিত দলীয় নেতাকর্মী, দর্শক-শ্রোতা এবং দেশবাসীকে শুনিয়েছেন। তিনি এই গল্প বলতে গিয়ে কোথাও কি মিথ্যা কথা বলেছেন? না, তেমন কিছু আমাদের কানে শোনা যায়নি। তবে তিনি তার এমন দৃঢ় অবস্থান নেয়ার পেছনে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা বলেছেন, বলেছেন নতুন জাতি রাষ্ট্র গঠনে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগসমূহকে বুঝতে চেষ্টা করা, সেই নীতিকে অনুসরণ করা, বঙ্গবন্ধু যা শুরু করেছিলেন তিনি তার সব কিছুকেই নতুন বাস্তবতায় পুনর্মূল্যায়ন করে বাস্তবায়িত করতে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন।

তিনি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে কাজ করে যাচ্ছেন। এ কারণে তাকে প্রায় ১৮/১৯ ঘণ্টা দৈনিক পরিশ্রম করতে হয়। তিনি সব প্রকার দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিজেকে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন। বলেছেন, তার হারাবার কিছু নেই, দেশকে কিছু দিতে কাজ করা ছাড়া, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা ছাড়া তার কোনো উদ্দেশ্য নেই। সেই লক্ষ্যে কাজ করে তিনি বাংলাদেশকে এখন মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা দিতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের গ্রাম, শহর সর্বত্র পরিবর্তন দৃশ্যমান, জনজীবনে আশার আলো দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এর পেছনে ও সম্মুখে আছেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সাল থেকে দলের হাল ধরে তিনি দলের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন, ১৯৯৬ সালে দেশের নেতৃত্ব লাভ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও অসামান্য পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন। এমন নেতার সংবর্ধনা হবে না তো কার হবে? তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাজ হওয়া দরকার তার ভাষণটি মনোযোগ দিয়ে শোনা, কীভাবে নেতা হতে হয়- তা শেখা, বোঝা এবং সেই শিক্ষা নেয়া। তাহলে বাংলাদেশ নেতৃত্বের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। নতুবা শেখ হাসিনার ভয় আছে, বাংলাদেশের জন্য ভয়ানক অবস্থাও অপেক্ষা করতে পারে। কেননা বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা পেরেছিলেন ৪ জাতীয় নেতাকে তৈরি করতে- যারা তার অনুপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাকে হত্যার পর শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুসারী হয়ে দেশকে বর্তমান উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা এর ধারাবাহিকতা দেখতে চাই, পেতে চাই। তবে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির শিখরে উঠতেই থাকবে।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ আবুল কাসেম ফজলুল হক ॥

বাংলাদেশে কি কোনো প্রগতিশীল শক্তি আছে?

সভ্যতা, প্রগতি, আদর্শ ইত্যাদি নিয়ে দুনিয়ায় এখন খুব কম লোকেরই আগ্রহ দেখা যায়। অনেকে এমন উদারতাবাদ, বহুত্ববাদ, অবাধ-প্রতিযোগিতাবাদ ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহী। এসব শেষ পর্যন্ত মানুষকে শূন্যবাদ ও নৈরাশ্যবাদে নিয়ে যায়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ- ইত্যাদিকে অনেকে আজকাল অবাস্তব, প্রতারণামূলক, ভাঁওতামূলক ব্যাপার মনে করেন। যে আদর্শগত বাস্তবতা বিভিন্ন দেশে বিরাজ করছে তাতে মানুষ দ্রুত ধর্মের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। ধর্মের কিংবা আদর্শের পরম্পরতা ছাড়া বিপুল অধিকাংশ মানুষ চলতে পারে না। বাংলাদেশে প্রগতি বলতে অনেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মের বিরোধিতা, নাস্তিকতা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতা, নারীবাদ, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ইত্যাদি বুঝে থাকেন এবং এসবের পক্ষে প্রচার চালান। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন ও নারীবাদী আন্দোলন বাংলাদেশে ১৯৮০-এর দশক থেকে চালানো হচ্ছে এবং আগে বাংলাভাষার দেশে মৌলবাদ ও নারীবাদের ধারণা ও এই পারিভাষিক শব্দ ছিল না। সুবিধাবাদের নিন্দা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও দুই দশক প্রচলিত ছিল। কিন্তু পরে বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা অতিদ্রুত সুবিধাবাদকে তাদের স্থায়ী কর্মনীতি রূপে গ্রহণ করে নেন। এখন সুবিধাবাদকে বলা যায় বাংলাদেশের জাতীয় আদর্শ। সবচেয়ে সুবিধাবাদীরাই বেশি সম্মানিত ও সফল। সমাজের ও রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তরে স্তরে বিকশিত হচ্ছে এমন এক অবস্থা তাকে বলা যায়- জোর যার মুল্লুক তার। ধূর্ততার জোর, চতুরতার জোর, গায়ের জোর, মারামারি করার জোর, অস্ত্রের জোর, টাকাপয়সার জোর। এই অবস্থাটা কি জীবনের জন্য ভালো?

আমার ধারণা সভ্যতা, প্রগতি, আদর্শ, সাম্যবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদির ধারণাকে ইতিহাসের দিক দিয়ে নতুন করে গভীরভাবে বোঝা দরকার। এসবের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে উন্নত নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টির কথা আমাদের ভাবতে হবে। নতুন কালের জন্য সভ্যতা, প্রগতি, আদর্শ, সাম্যবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি ধারাকে নবায়িত করে নিতে হবে। প্রচলিত ধারণা আবেদনহীন হয়ে আছে। ইতিহাসের দিক দিয়ে প্রতিটি প্রধান ধর্মের উত্থান-পতন ও পুনরুজ্জীবনকেও আমাদের বুঝতে হবে তাদের আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক পটভূমি সমেত। উন্মেষপর্বে, প্রতিষ্ঠাপর্বে ও অবক্ষয়পর্বে প্রত্যেক ধর্মের ভূমিকাই বিভিন্ন রকম। ধর্মের যেমন অপব্যবহার দেখা গেছে তেমনি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদেরও অপব্যবহার দেখা গেছে। জাতীয়তাবাদ, ঔপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ এক নয়। অনেকে এগুলোকে গুলিয়ে ফেলেন একাকার করে দেখেন। তাতে ক্ষতি হয়। ইতিহাসের দিক দিয়ে আদর্শগত প্রত্যয়গুলোকে বোঝার জন্য আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে ইউরোপের অগ্রসর জাতিগুলোর রেনেসাঁস, রিফর্মেশক, এনলাইটেনমেন্ট ইত্যাদির দিকে। বাংলার রেনেসাঁসকেও নতুনভাবে বুঝতে হবে। এখানে সংক্ষেপে প্রগতি কথাটির অর্থ সন্ধান করতে চাই। বাংলাদেশে প্রগতি এখন এক হারিয়ে যাওয়া প্রত্যয়। মনে হয় পৃথিবীর সব জাতিই এখন প্রগতির ধারণা হারিয়ে ফেলেছে।

পরিবর্তন ও প্রগতি এক নয়। পরিবর্তন আপনিতেই ঘটে এবং তা মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিরপেক্ষ। পৃথিবীতে সব কিছুই পরিবর্তনশীল। অপরদিকে প্রগতি মানবীয় ব্যাপার- মানুষের ইচ্ছাসাপেক্ষ, অর্জনসাপেক্ষ প্রয়াসসাধ্য। সব কিছুই গতিশীল, কিন্তু সব কিছু প্রগতিশীল নয়। কোনো জনগোষ্ঠীতে কিংবা জাতির মধ্যে যে চিন্তা ও কাজের দ্বারা কায়েমি-স্বার্থবাদী অপ্রক্রিয়াশীলদের ও অনুশোচনাহীন অপরাধীদের ছাড়া বাকি সবার কমবেশি কল্যাণ হয়, তার মধ্যেই প্রগতি নিহিত থাকে। প্রগতিতে সর্বাধিক সংখ্যক লোকের সম্ভবপর সবচেয়ে বেশি কল্যাণ বাঞ্ছনীয়। অগ্রগতি না থাকলে, বিকাশ না থাকলে প্রগতি হয় না। আবার যে কোনো অগ্রগতি, যে কোনো বিকাশ প্রগতি নয়। প্রগতির মর্মে থাকে যুগপৎ সৃষ্টিশীলতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা চেতনা, আদর্শবোধ এবং আদর্শ অভিমুখী বাস্তবসম্মত কর্মসূচি ও কর্মনীতি। প্রগতির বিপরীতে থাকে প্রতিক্রিয়াশীলতা। রক্ষণশীলতা প্রগতির সরাসরি বিরোধী নয়। তবে রক্ষণশীলদের বিচার-বিবেচনা বেশি, তাদের গতি ধীর, শেষ পর্যন্ত তারা প্রগতির ধারায়ই চলেন। যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিঙ্কন, যুক্তরাষ্ট্রের এডমান্ড বার্ক রক্ষণশীল চিন্তাধারার নেতা ছিলেন। যুক্তরাজ্যে রক্ষণশীল দল, কনজারভেটিভ পার্টি নামে দল আছে। বাংলা ভাষায় রক্ষণশীলতা, প্রগতিশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার ধারণাকে রাজনীতিবিদরা ও বুদ্ধিজীবীরা কখনো স্পর্শ করেননি।

প্রত্যেক জাতির ইতিহাসেই দেখা যায়, প্রগতিশীল ধারা সব সময় প্রগতিশীল থাকে না, কখনো কখনো রক্ষণশীল হয়ে পড়ে- নানাভাবে বিকারপ্রাপ্তও হয়। আবার রক্ষণশীল ধারাও সব সময় রক্ষণশীল থাকে না, কখনো কখনো প্রগতিশীল হয়ে ওঠে। কোনো জনগোষ্ঠীতে কিংবা জাতির মধ্যে সব মানুষ প্রগতিশীল নয়, অনেকে প্রগতিশীল, অনেকে রক্ষণশীল কিছু লোক প্রতিক্রিয়াশীল। পরিবর্তনশীল পরিবেশে সারা জীবন কেউই এক অবস্থান নিয়ে কিংবা অপরিবর্তনীয় নীতি নিয়ে চলতে পারে না। সমাজের, জাতির, রাষ্ট্রের গতিধারায় আরো অনেক জটিল ব্যাপার আছে। বাংলাদেশে এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা নেই। প্রগতি ও সভ্যতার জন্য চিন্তা-ভাবনা দরকার। উন্নত চিন্তা ছাড়া উন্নতি, প্রগতি, সভ্যতা সম্ভব নয়। অর্থনীতিবিদদের চিন্তায় টাকা, ডলার, বৈষয়িক সম্পদ, পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচ থাকে, কিন্তু মানবীয় বিষয়াদির বিবেচনা অল্পই থাকে।

ইউরোপে বিকশিত হয়েছিল প্রগ্রেস এর ধারণা যার বাংলা করা হয়েছে প্রগতি। লক্ষ করলে দেখা যায়, উন্নতি শব্দটি ইংরেজি প্রগ্রেস-এর মোটামুটি সমার্থক। ইতিহাসে উন্নতি, প্রগতি, প্রগ্রেস-এই তিনটি শব্দেরই অর্থের মধ্যে বৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক ন্যায়, জনগণের সার্বিক কল্যাণ ও প্রয়োজনীয় নেতৃত্বের ধারণা যুক্ত। এতে যুক্ত থাকে জনগণের উন্নত আর্থিক জীবন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে উন্নত সামাজিক জীবন প্রতিষ্ঠারও লক্ষ্য। উন্নতি বা প্রগতির জন্য আর্থিক সমৃদ্ধির সঙ্গে নৈতিক উন্নতিও অপরিহার্য। প্রত্যেক ঐতিহাসিককালের প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর প্রগতি বা উন্নতির জন্য নেতৃত্বের দিক থেকে জনজীবনের কাজের লক্ষ্য নির্ণয় এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের কার্যক্রম দরকার হয়। চিন্তাশীলতা, শ্রমশীলতা, সাধনা, সংগ্রাম, বিবর্তন, বিপ্লব-এগুলো প্রগতি বা উন্নতির অবলম্বন। উন্নতির বা প্রগতির মর্মে থাকে সৃষ্টিশীলতা ও ন্যায়পরতা।

প্রগতির পথ কুসুমাস্তীর্ণ থাকে না। জাতীয় জীবনে প্রগতি-প্রয়াসী সংঘশক্তির অভাবে কখনো কখনো সে পথ বিলুপ্তও হয়ে যায়। তখন কাউকে কাউকে কঠিন ব্রত নিয়ে একা একাই পথ তৈরি করে সামনে চলতে হয়। তারপর প্রগতি-অভিলাষী জনসম্পৃক্ত সংঘশক্তি গড়ে তোলা গেলে পথ ও বিপথের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে এখন কি কোনো প্রগতিশীল সংঘশক্তি আছে? প্রগতিশীল কোনো সামাজিক শক্তি আছে? যারা এখন প্রগতিশীল বলে আত্মপরিচয় দেন তাদের চিন্তা ও কাজের বৈশিষ্ট্য কী? জাতির সামনে পথ ও বিপথের পার্থক্য কি স্পষ্ট? আমরা কি পথে চলছি, না বিপথে? আমাদের কাছেই আমাদের প্রশ্ন।

উন্নতি ও উন্নয়ন এক নয়। উন্নতি মানে উপরে ওঠা, আর উন্নয়ন হলো উপরে তোলা। উন্নতি নিজের শক্তিতে, নিজের বুদ্ধিতে নিজেকে করতে হয়; তাতে অন্যের সহায়তা যতটা সম্ভব, নিজের স্বাধীনতা ও কর্তৃত্ব বজায় রেখে নিজেকে নিতে হয়। আর উন্নয়ন অন্যের পরিচালনায় অন্যের কর্তৃত্বে সাধিত হয়। তাতে নিজের স্বাধীনতা থাকে না। আজকের পৃথিবীতে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ধনী রাষ্ট্রসমূহের অর্থলগ্নিকারী বিভিন্ন সংস্থার সুদের ব্যবসা, বাণিজ্যনীতি, কূটনীতি ও গোয়েন্দানীতির সঙ্গে গরিব রাষ্ট্রগুলোর উন্নয়ন সম্পূর্ণ শর্তাবদ্ধ। উন্নয়ন উন্নতি ও প্রগতি থেকে ভিন্ন।

বাংলাদেশ সরকার বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য এসব অনেক কম নেয়। এখন সাহায্য নেয় এনজিওগুলো এবং সিএসওগুলো (সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন) যার প্রকৃত হিসাব সরকার কিংবা দেশবাসী কাউকেই জানানো হয় না। এনজিওগুলো এবং সিএসওগুলো হলো বাংলাদেশের ভেতরে বিদেশি সরকার দ্বারা পরিচালিত সংস্থা। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারী সংস্থাগুলো এখন দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী নাম নিয়ে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতি ইত্যাদির ওপর প্রায় নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব নিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থায় পড়েছে যে, তার গুরুত্বপূর্ণ সব কিছু নির্ধারিত হচ্ছে বিদেশি অর্থলগ্নিকারীদের ও কূটনীতিকদের আদেশ নির্দেশ দ্বারা। টুইস্টডে গ্র“প-এর ভূমিকা অনুসন্ধান করলে অনেক রহস্য উন্মোচিত হবে। যে মূলনীতি অনুসারে তারা কাজ করে তা হলো ‘আধিপত্য ও নির্ভরশীলতা নীতি’। এই নীতির কবলে পড়ে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো আরো দুর্বল হচ্ছে এবং স্বাধীনতা হারাচ্ছে। স্বাধীনতা হারানো ও নিঃস্ব হওয়া একই কথা। স্বাধীনতা হারালে নিজের দেহ-মনের ওপরও নিজের কর্তৃত্ব থাকে না।

উন্নতির ধারণা আমাদের নিজেদের আর উন্নয়নের তত্ত্ব পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ কর্তৃক আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া। উন্নতির ধারণাকে অপসৃত করে তার জায়গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে উন্নয়নের ধারণা। উনিশ শতকের এবং বিংশ শতকের ও প্রথমার্ধের বাংলা ভাষার চিন্তক ও কর্মীদের রচনাবলিতে উন্নতি কথাটিই পাওয়া যায়, উন্নয়ন পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিকভাবে এই সময়টা ছিল সৃষ্টির অনুকূল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকে উন্নতি শব্দটির ব্যবহার কমিয়ে ক্রমে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে উন্নয়নকে। বাংলাদেশ কালে এসে উন্নতির কথা আমরা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছি এবং উন্নয়ন ছাড়া আমাদের এক দিনও চলে না। আমরা আমাদের স্বকীয় ধারণাকে বিকাশশীল ও কার্যকর রাখার এবং কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের প্রয়োজনে নতুন ধারণা উদ্ভাবনের কথা ভাবিনি। উন্নতির কোনো সূচকও আমরা নির্ণয় করিনি। আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি আমাদের নিয়ে অন্যদের প্রয়োজনে, অন্যদের দ্বারা উদ্ভাবিত ও অন্যদের দ্বারা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া সব কর্মনীতি ও ধারণা। আমরা ব্যবহৃত হচ্ছি বিদেশি আধিপত্যবাদীদের উদ্দেশ্য সাধনের কাজে। ক্রমে আমাদের চিন্তা বদলে গেছে, কাজের ধারাও বদলে গেছে। আমাদের মগজ ধোলাই করা হয়েছে এবং চিন্তন পদ্ধতিকে বদলে দেয়া হয়েছে। এখন আমরা নিজেদের হীন ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। জাতীয় জীবনে আমরা আত্মশক্তি হারিয়ে পরের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছি। তাতে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের অভিধা লাভ করেছে। যতই উন্নয়ন হোক, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ উঠেছে? বাংলাদেশের শাসক শ্রেণিতে স্বাজাত্যবোধ ও স্বরাষ্ট্রচেতনা বিলীয়মান। এমনটা যে কেবল বাংলাদেশে ঘটেছে তা নয়, নানাভাবে সব দুর্বল রাষ্ট্র আজ এই বাস্তবতার মুখোমুখি। দুর্বল রাষ্ট্রগুলো উন্নয়নশীল নাম পেয়েছে বটে, তবে চলমান প্রক্রিয়ায় তারা আত্মরক্ষার ও শক্তিশালী হওয়ার কিংবা উন্নতি করার উপায় পাচ্ছে না। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের অভিঘাতে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত হারিয়ে চলছে। আমাদের জন্য সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার এই যে আমাদের রাষ্ট্র তার রাজনীতি হারিয়েছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ও ভারতের কর্তৃত্ব কায়েম হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশে তার অনুগত পুতুল সরকার কায়েম করতে।

উন্নয়নকে দুর্বল করা হয় মহিমান্বিত করে। এতে উন্নতির অনেক উপাদানকেই স্থান দেয়া হয়। কিন্তু তা কাগুজে ব্যাপার মাত্র। বাস্তবের সঙ্গে কেতাবি ধারণার মিল নেই। শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের মাপকাঠি মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধির হার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার- এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উন্নয়নকে সীমাবদ্ধ রাখা হয় কেবল ডলার কিংবা টাকা দিয়ে যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় তার মধ্যে। বিশ্ববিস্তৃত বাজার অর্থনীতির সব অধ্যায় এর সঙ্গে যুক্ত। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদেরই অপরিহার্য অঙ্গ এই উন্নয়ন।

প্রগতির ধারণা উন্নয়নের ধারণা থেকে ভিন্ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে এবং উন্নয়নের ধারণা উদ্ভাবন করে। তখন থেকে উন্নতি ও প্রগতির ধারণাকে আর বিকশিত করা হয়নি। সভ্যতার উত্থান-পতন সম্পর্কে কালবার্ট সুইটজারের মতো, সংস্কৃতির উত্থান-পতন সম্পর্কে ওয়াস ওয়ার্থ স্পেংলারের মতো পৃথিবীর কোথাও রাজনীতিবিদদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রগতির ধারায় অবলম্বন করেছিল বটে, কিন্তু দেশকালের উপযোগী করে বিকশিত করেনি। বাংলা ভাষায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রগতির ধারণা কিছুটা বিস্তার লাভ করেছিল, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে কিংবা বাংলাদেশে কোথাও প্রগতির কোনো সূচক বা পরিমাপক নির্ণয় করা হয়নি। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নের ধারণা সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পূর্ণ গ্রহণ করে নিয়েছিল এবং মার্কসীয় ডায়লেকটিস ও ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণা ভুলে গিয়েছিল। প্রগতি ও উন্নতির মর্মও ভুলে গিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে (১৯৯১)। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দার্শনিক ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা দি ইন্ড অফ হিস্ট্রি নামে বই লিখে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। তিনি মতপ্রকাশ করেছেন যে, মার্কসীয় ইতিহাসের ধারণার চির অবসান ঘটে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্য- দুই রকম কারণই ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীরা নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে ব্যর্থ করে দিতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার জন্য অভ্যন্তরীণ কারণই মূল, বাহ্য কারণ অভ্যন্তরীণ কারণের মধ্য দিয়ে কাজ করেছে। প্রগতির প্রয়োজনে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদির সঙ্গে পারিপার্শ্বিক বিষয়াদিকেও বিবেচনায় ধরতে হয়।

বাংলাদেশে আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমরা উন্নতি চাই, প্রগতি চাই, প্রগ্রেস চাই। উন্নয়নও চাই। তবে বিশ্বব্যাংক ও অর্থনীতিবিদরা যেভাবে চিন্তার গোটা ধারাকে কেবল উন্নয়নে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় তা আমরা অতিক্রম করে যেতে চাই। অর্থনীতিবিদদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা আমাদের বুঝতে হবে। যে রাজনীতিবিদরা ও বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বব্যাংকের অন্ধ অনুসারী, বুঝতে হবে যে, তারা আমাদের ভুল পথে পরিচালনা করেন। আমরা আমাদের জন্য এবং গোটা মানবজাতির জন্য সমৃদ্ধিমান, সুন্দর, প্রগতিশীল নতুন ভবিষ্যৎ চাই। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে আমরা দর্শন-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গ্রহণ করতে চাই আত্মসত্তা রক্ষা করে- আমাদের মতো করে। এ উদ্দেশে জাতীয় জীবনের নানা কাজের মধ্যে আমরা জাতীয় ইতিহাসের চর্চা চাই। ক্লাসিকের চর্চা চাই। নতুন ক্লাসিক ও উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির প্রচেষ্টা চাই। আমরা আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করে অতীত থেকে এবং বাইরের জগত থেকে ভালো যা কিছু সম্ভব গ্রহণ করে সামনে চলতে চাই।

নতুন ভবিষ্যৎ সৃষ্টি করতে হলে অতীত সম্পর্কে ধারণাকেও পুনর্গঠিত ও নবায়িত করতে হবে। অতীত সম্পর্কে প্রচলিত সব ধারণা অপরিবর্তিত রেখে উন্নত ভবিষ্যৎ সৃষ্টির চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশের লেখক-শিল্পীদের ও রাজনীতিবিদদের একটি ধারায় দেখা যাচ্ছে বিশ্ব ভারত ও কলকাতার সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ। তারা আত্মবিস্মৃত। অপর একটি ধারাকে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে, দেশকালের ঐতিহ্য উপেক্ষা করে, কেবল মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ইতিহাসের ভালোবাসা স্থূল ধারণার মধ্যে নিজেদের সংস্কৃতির উৎস সন্ধানে ব্যস্ত। দুই পক্ষেরই কেন্দ্রীয় প্রবণতা ধনতান্ত্রিক। ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগবাদ দুই পক্ষেরই চালিকাশক্তি। এই দুই ধারার কোনোটির মধ্যেই আত্মশক্তির উপলব্ধি ও উন্নত  নৈতিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় না। দুই পক্ষই সমভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতি, অবাধ-প্রতিযোগিতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন নিয়ে চলছে। দুই পক্ষেরই রাজনীতি বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্ক অভিমুখী। দুই ধারার মাঝখানে, ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে ভীষণভাবে সক্রিয় আছে সিএসও (সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন) ও এনজিওরা। সাম্রাজ্যবাদী মহলের আর্থিক সহায়তা নিয়ে এবং নির্দেশ নিয়ে তারা চলে। বাংলাদেশের রাজনীতির ও সংস্কৃতির গতি ও প্রকৃতি নির্ধারণে গত প্রায় চার দশক ধরে তারা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের কথামতো চলে কোনোকালে বাংলাদেশের রাজনীতি সুস্থ স্বাভাবিক আত্মবিকাশের পথে উঠতে পারবে? চিন্তার ও কর্মের তিনটি ধারার ভূমিকাই ইতিহাসের সম্মুখগতির বা প্রগতির পরিপন্থী।

সভ্যতা, প্রগতি, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ও বিশ্বায়ন ইত্যাদির ইতিহাস জেনে নতুন বাস্তবতায় নতুন করে নিজেদের আদর্শ নির্ণয় করে উন্নত নতুন ভবিষ্যতের পথে চলতে হবে। আদর্শগত পুনর্গঠন এখন সময়ের মূল দাবি।

লেখক ঃ প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

॥ একেএম শামসুদ্দিন ॥

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বনাম ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা

ইদানীং ‘কোটা সংস্কার’ একটি বহুল উচ্চারিত শব্দ। এই কোটা সংস্কার নিয়ে বেশ ক’মাস দেশব্যাপী খুব অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বর্তমান কোটা পদ্ধতি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি আছে। কিন্তু এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, কোটা পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন যে প্রয়োজন তা সবাই উপলব্ধি করছে।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও ১১ এপ্রিল কোটা পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছেন এবং সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করে দিয়েছেন। কমিটি ইতিমধ্যেই তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটায় নিয়োগ ৫৬ শতাংশ এবং বাকি ৪৪ শতাংশ মেধায়। কোটার শতাংশের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ এবং জেলা, নারী, নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ২৬ শতাংশ। মোট কোটা নিয়োগের সিংহভাগ যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা কোটা এককভাবে দখল করে আছে, এজন্য এই কোটা নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে।

এ নির্দিষ্ট কোটা নিয়ে আলোচনার আরও একটি কারণ হল- মুক্তিযোদ্ধা কোটা এখন আর মুক্তিযোদ্ধা কোটা নেই! এটি এখন ‘পোষ্য কোটা’য় পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য, সামাজিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ১৯৭২ সালের গণপরিষদ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য অর্ন্তবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে কোটা পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অনেকেই নিহত হয়েছিলেন, অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অনেকের পরিবার আবার স্বর্বস্ব হারিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর তাদের যথোপযুক্ত পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়নি। এ কথা বিবেচনা করে নিহত, যুদ্ধাহত এবং নিঃস্ব মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ করা হয়েছিল। আমাদের সংবিধানে মুক্তিযোদ্ধা কোটার নামে কোনো বিধান নেই, এই কোটা পদ্ধতি যুগ যুগ ধরে চালু থাকবে সেই রকম কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনাও তখন ছিল না।

কিন্তু যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর সরাসরি প্রতিক্রিয়া তাদের সন্তানদের ওপরও পড়েছিল, এ কথা বিবেচনা করে পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের এই কোটার সুযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এরও পরে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিনাতনিদেরও এই কোটার সুযোগ করে দেয়া হল। কিন্তু নাতিনাতনিদের অন্তর্ভুক্ত করার পর জনগণ এ ব্যবস্থাকে সহজ চোখে নিতে পারল না।

জনমনে প্রশ্ন, সাধারণ মানুষের আবেগকে জিম্মি করে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা- এই দুটি স্পর্শকাতর ইস্যুকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের উদ্দেশ্যেই এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ১৯৭২ সালের গণপরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি অর্ন্তবর্তীকালীন কোটা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য যুগের পর যুগ চালু রাখা যায় না।

বর্তমান কোটা পদ্ধতি সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষ্যমের সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক! এ ছাড়া সংবিধানের ১৯(১) এবং ১৯(২) ধারারও পরিপন্থী। ১৯(১) ধারায় বলা আছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন’। ১৯(২) ধারায় চাকরিতে নিয়োগ সম্পর্কে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগ সমান থাকিবে।’

কোটা সংস্কারের দাবি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। শিক্ষিত ও মেধাবী চাকরিপ্রত্যাশী যুবসমাজের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে এখন এই দাবি গণমানুষের দাবিতে পরিণত হয়ে গেছে। বিশেষ করে কোটা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকারসমর্থিত ছাত্রলীগের বর্বোচিত আচরণের পর।

দেশের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্ব, স্থানীয় ব্যক্তি ও সুশীলসমাজ একযোগে এই দাবির পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে সহমত পোষণ করেছেন এবং বিভিন্ন বক্তৃতা ও বিবৃতির মাধ্যমে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির যে সংস্কার প্রয়োজন সে ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছেন। আমরা জানি, ইতঃপূর্বে কোটা পদ্ধতি সম্পর্কিত বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন গঠন করা হয়েছিল।

এ ছাড়াও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকেও কোটা পদ্ধতি মূল্যায়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল। এসব কমিটি, কমিশন বা সংস্থার প্রতিটি প্রতিবেদনে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সাবেক সচিব এটিএম শামসুল হকের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ ও আমলাদের নিয়ে ১৩ সদস্যের ওই কমিশন ২০০০ সালের ২৫ জুন সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু সময় স্বল্পতাহেতু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি।

কমিশনের প্রতিবেদনে ৩০টি অন্তর্বর্তীকালীন সুপারিশ করা হয়েছিল। উল্লিখিত ৩০টি সুপারিশের মধ্যে মেধা কোটা শতকরা ৪৪ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ৫৪ ভাগ করার কথা বলা হয়েছিল। এই কমিশন আরও মতপ্রকাশ করে, সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা ও প্রকৃত চাহিদা পূরণে যে বিশাল ও জটিল উন্নয়নমূলক কাজ করতে দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সিভিল সার্ভিসের সে দক্ষতা নেই। সেই দক্ষতা অর্জনে চাই মেধাবী, দক্ষ ও কর্মস্পৃহাসম্পন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী। কিন্তু বিদ্যমান কোটা পদ্ধতিতে মেধা কোটার প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার সুযোগ সীমিত; এ কারণে ‘সিভিল সার্ভিস সংস্কার’ প্রসঙ্গে সুপারিশ প্রণয়নকালে ১৯৯৭ সালের কমিশন নিয়োগ নীতিপর্বে কোটা পদ্ধতি ক্রমান্নয়ে বিলোপের সুপারিশও করে। ১১ এপ্রিল সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেও কমিশনের এই সুপারিশটিই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণার পর সরকারসমর্থিত ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কৃতিত্ব ছিনতাই করে নিয়ে এটি তাদের বিজয় বলে ঘোষণা দেয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আনন্দ মিছিল করে। বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আগ বাড়িয়ে এই বিজয় তাদের আন্দোলনের ফসল বলে দাবিও করে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনও স্তিমিত হয়ে পড়ে।

অতঃপর সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাদার অব এডুকেশন’ উপাধি দিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারির অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু দীর্ঘ আড়াই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও প্রজ্ঞাপন জারির কোনো লক্ষণ না দেখে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী কোটা সংস্কার আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে তাদের ভেতর সংশয় দেখা দেয়।

এরই মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রজ্ঞাপন জারির ব্যাপারে উচ্চমহল থেকে কোনো দিকনির্দেশনা পাননি বলে জানালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভেতর হতাশার সৃষ্টি হয়। দৃশ্যত এ নিয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা ৩০ জুন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেন।

অতঃপর সেদিন সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে ছাত্রলীগের সদস্যরা বাধা দেয় এবং সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের ওপর নৃশংসভাবে আক্রমণ করে আহত করে। এরপর দেশব্যাপী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোটা আন্দোলনকারী নেতাদের খুঁজে খুঁজে বের করে একযোগে আক্রমণ চালায় এবং হাতুড়িপেটা করে। ছাত্রলীগের এসব ক্যাডার নিজ উদ্যোগে আন্দোলনকারী কয়েকজন নেতাকেও পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে ঘটেনি। এ সময় ঢাকায় ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রকাশ্যে একজন কলেজপড়ুয়া ছাত্রীর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটায়।

একটি অরাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে এহেন হিংসাত্মক আচরণ ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দৈন্যদশার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়। ছাত্রলীগের এ ধরনের কর্মকান্ড স্বাধীনতাপূর্ব আইয়ুব-মোনায়েম খানের মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফ-এর দুর্ধর্ষ নামকরা পান্ডা খোকা, আবু, জাহাঙ্গীর এবং তৎকালীন ফজলুল হক হলের পাঁচপাত্তুর কর্মকান্ডকে মনে করিয়ে দেয়। মনে রাখা জরুরি, ১৯৬৫ সালের অত্যন্ত প্রতাপশালী এনএসএফের ক্যাডাররা মাত্র চার বছরের মাথায়ই ১১ দফা ছাত্র আন্দোলনের ঘূর্ণিঝড়ের এক ফুঁৎকারে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।

ছাত্রলীগের হিংস্র আক্রমণের পর কোটা সংস্কার আন্দোলন আপাতত স্তিমিত মনে হচ্ছে। অনেকে বলেন, ছাইচাপা দিয়ে আপাতত আগুন প্রশমিত করা হয়েছে। কখন যে আবার দমকা হাওয়ায় এই ছাইচাপা আগুন অগ্নিস্ফূলিঙ্গের রূপ নেয়, তা দেখার অপেক্ষার পালা। কারণ বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের একটা ঐতিহ্য আছে। ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠীর দাবি আদায়ের ইতিহাস খুবই উজ্জ্বল।

১৯৪৭ সালের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এমন একটিও উদাহরণ নেই, যেখানে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশে ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকা শুরু হয়। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের ১১ দফা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১/১১-এর পর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। অতএব, কোনো কোনো মহল যদি ভেবে থাকেন, ওরা শিরদাঁড়া খাড়া করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না; কোটা আন্দোলনের এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তাহলে ভুল করবেন।

২.

যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে এতকথা, এত আলোচনা-সমালোচনা সেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা আমরা আজ পর্যন্ত কি তৈরি করতে পেরেছি? এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র নিয়ে অনেক তুঘলকিকান্ড হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়সসীমা দুই বছর বাড়ানোর ঘোষণা দিলে মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ করার হিড়িক পড়ে যায়।

যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিতে যোগদানের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেব কোথাও ঘোষণা দেননি, চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণার পর ধীরে ধীরে তাদের অনেকেই নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাহির করতে শুরু করেন। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর চারটি মানদ- বা শর্ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই চারটি মানদন্ডের মধ্যে চাকরিতে যোগদানের সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়, এমন অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিতে যোগদানকালে ঘোষণা না দিয়েও নানা কৌশলে ও জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাগিয়ে নিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছেন এবং সরকারপ্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আমলা থেকে শুরু করে এমএলএসএস পর্যন্ত এই তালিকায় রয়েছেন।

যে সিভিল সার্ভিসের চাকরির জন্য মুক্তিযাদ্ধা কোটা নিয়ে এত বিতর্ক, সেই সিভিল সার্ভিসেরই পাঁচ পাঁচজন সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেখিয়ে দিব্যি বর্ধিত চাকরির সুবিধা ভোগ করে গেলেন। এই পাঁচজন সচিবের মধ্যে খোদ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব মাসুদ সিদ্দিকী অন্যতম। ‘এ যেন সরষের ভেতর ভূত দেখার মতো’! এ পর্যন্ত জানামতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ১৮২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করেছে।

অপরদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১৯ জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করেছে। শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ইতঃপূর্বে ভুয়া সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৪৪৩ জন পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগেরও অভিযোগ করেছে। দুদক কর্তৃক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত ১৯ জন পুলিশ কর্মকর্তার মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার, পুলিশ সুপার, ডিআইজি এবং অতিরিক্ত আইজি পদের একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অথচ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদের সবার বয়স ১১ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে ছিল বলে দুদকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে; যা এক প্রকার অবিশ্বাস্য ঘটনা হিসেবে দুদক তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। জানা যায়, টাকার বিনিময়ে এসব মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগৃহীত হয়েছিল।

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কে বিভিন্ন সময় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচুর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বেরিয়েছে। জাল সনদের হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সংবাদ আমরা দেখেছি। যথাযথ লোক ধরে প্রতিশ্র“ত টাকা খরচা করলেই মিলছে মুক্তিযুদ্ধ না করেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। মুক্তিযোদ্ধার সনদ পাওয়া, গেজেটভুক্ত হওয়া এসব কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপারই না। এই সুযোগে অনেক রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীও মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন। এভাবেই মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়ে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, যেখানে টাকার বিনিময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ম্যানেজ করে চাকরির মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব, সেখানে একই উপায়ে ম্যানেজ করা সনদ দেখিয়ে রাজাকারের নাতিনাতনিরাও যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিচ্ছে না, তারই বা কী নিশ্চয়তা আছে? স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও যখন আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করতে পারিনি, সেখানে ভুয়া সনদ দাখিল করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুযোগ নিয়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেয়ার পথ বন্ধ করি কী করে?

যে পাঁচজন সচিবের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করা হয়েছে তাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে পুনরায় মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণের জন্য বলা হলেও তারা তা করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এতকিছুর পরও তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা গেল না।

সাধারণ মানুষ যখন দেখে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণের পরও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে এমএম নিয়াজউদ্দিন মিয়া জাতিসংঘের ৬৯তম সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সফরসঙ্গী হয়ে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন, তখন মুক্তিযাদ্ধা কোটার শতকরা হার অপরিবর্তিত রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সবার মনে সংশয় জাগে বৈকি!

‘মুক্তিযোদ্ধা’র মতো এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে জোচ্চুরির পরও এসব দুশ্চরিত্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যখন দৃশ্যমান কোনো শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না, তখন সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অন্য অনেক পদক্ষেপই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সাধারণ জনমনে দেখা দেয় সংশয় ও সন্দেহ।

রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে যখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আবিষ্কৃত হয় অথচ কিছুতেই কিছু হয় না, তখন সমাজের অন্যান্য স্তরের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরেরা যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে না, মানুষের এই সন্দেহকে আমরা দূর করি কী করে? মুক্তিযুদ্ধকে পণ্য করে বাণিজ্য করার পরও যখন কেউ কেউ বিশেষ বিবেচনায় ছাড় পেয়ে যায়, তখন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মন খারাপ হয়, তারা দুঃখবোধ করেন, আহত হন। আমরা কি একবার অন্তত কান পেতে তাদের বুকের গভীরে এই নীরব রক্তক্ষরণের শব্দ শোনার চেষ্টা করেছি?

৩.

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কোটা পদ্ধতি বাতিলের যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বর্তমানে তিনি তার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন বলে মনে হয়। ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপ্তি দিনে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের হাইকোর্টের আদেশ আছে উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন।

তার এই ঘোষণার পর দেশব্যাপী সাধারণ ছাত্রদের ভেতর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণের পর সাধারণ জনমনেও হতাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সবার মনে একটি ছোট্ট প্রশ্ন জেগেছে- হাইকোর্টের এমন একটি আদেশ থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে গোটা কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিলেন কী করে?

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় তাহলে কি সঠিক তথ্য প্রধানমন্ত্রীকে দেয়নি? সেদিন কোটা বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তিনি, সেই প্রতিশ্র“তি রক্ষার জন্য হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কি রিভিউ করার কোনো সুযোগই নেই? এখানেও তথ্যের কিছুটা বিভ্রাট রয়েছে বলে মনে হয়। হাইকোর্টের আদেশে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার নাতিনাতনিদের কথা বলা হয়নি। কাজেই সরকার ইচ্ছা করলেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্র“তি রক্ষার জন্য হাইকোর্টের ওই আদেশ এবং আপিল আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশনে যেতে পারে।

কোটা সংস্কারের দাবি বর্তমানে শুধু সাধারণ ছাত্রদের দাবির মধ্যে নেই, এই দাবি এখন গণমানুষের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া কোটা পদ্ধতি মূল্যায়ন সংক্রান্ত এ পর্যন্ত গঠিত যতগুলো কমিটি, কমিশন ও সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তাদের প্রতিটি প্রতিবেদনে কোটা সংস্কারের সুপারিশ রয়েছে।

এতকিছুর পরও মুক্তিযোদ্ধা কোটা যদি অবিকল রাখা হয়, তাহলে দেশবাসীর কাছে ভুলবার্তা পৌঁছবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের পর তাদের নাতিনাতনিদের অন্তর্ভুক্তি অব্যাহত রাখলে সাধারণ মানুষ তা সহজ চোখে দেখবে না।

সুযোগ সন্ধানীরা সুযোগ খুঁজবে এবং নিন্দুকেরা নিন্দা করবে, বলবে- ‘সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মুক্তিযোদ্ধা সন্তান বাদেও তাদের নাতিনাতনিদের চাকরির সুবিধা নিশ্চিত করে একশ্রেণীর অনুগত সরকারি কর্মকর্তা তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে, এরা হল- ১৯৭৩ সালের ক্যাডারের নবসংস্করণ’। দেশের নাগরিকদের ভেতর এরূপ ধারণা বদ্ধমূল হওয়ার আগেই যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

জনগণের এই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ১১ এপ্রিলের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোটা পদ্ধতির একটি গ্রহণযোগ্য সংস্কার করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি চিহ্নিত ও অচিহ্নিত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিশেষ বিবেচনায়’ কোনো ছাড় না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; তাহলেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি সম্ভব হবে প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করা।

লেখক ঃ অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

॥ বিভুরঞ্জন সরকার ॥

চালের দাম চড়া পেছনে ‘রাজনীতি’ নেই তো?

কারণ ছাড়া নাকি কিছুই ঘটে না। বাজারে জিনিসপত্রের দামও অকারণ বাড়ার কথা নয়। চাহিদা বেশি হওয়া, উৎপাদন কম হওয়া অর্থাৎ ঘাটতি দেখা দিলেই সাধারণত কোনো জিনিসের দাম বাড়ে। আমাদের দেশে অবশ্য দাম বাড়ার কারণ লাগে না। ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভেও জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে থাকেন। ব্যবসায়ীরা সংগঠিত। তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। মানুষকে জিম্মি করতে পারেন। তারা তাদের মুনাফার কিছু অংশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি দলের নেতা-পাতি নেতাসহ অনেককেই নিজেদের অনুকূলে রাখতে পারেন। কিন্তু যারা ক্রেতা, ভোক্তা, সাধারণ মানুষ তাদের অসংগঠিত, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই। তারা কাউকে জিম্মি করতে পারেন না। তাই অকারণ মূল্যবৃদ্ধির খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই।

দাম বাড়িয়ে মুনাফা করে একশ্রেণির ব্যবসায়ী আর বদনাম হয় সরকারের। ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর’- এর মতো আমাদের দেশে যাই কিছু হোক না কেন মানুষ সব কিছুর জন্য সরকারকেই দায়ী করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়, দুর্ভোগ বাড়ে এমন কিছু যাতে দেশে না ঘটে সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। বর্তমান সরকার নিজেদের জনকল্যাণকামী সরকার বলে দাবি করে থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রায় সব বক্তৃতায়ই বলে থাকেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের মানুষ কিছু পায় আর অন্যরা ক্ষমতায় থেকে নিজেরাই খায়। তবে আওয়ামী লীগেও এখন ‘খাই’ পার্টি আছে। মানুষের সুবিধা-অসুবিধার কথা সরকার ও দলের সব পর্যায়ে সবাই একভাবে ভাবেন বলে মনে হয় না। সবদিকেই প্রায় একক নজরদারি রাখতে হয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই।

বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। কারণ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা। মানুষ ভোট দিয়ে যাদের ক্ষমতায় বসায় তাদের কাছে শুধু খবরদারি প্রত্যাশা করে না, নজরদারিও আশা করে। নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের একটি অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত। সরকার ব্যবসায়ী নয়, সরকার ব্যবসা করবে না, কিন্তু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের নিয়মনীতির মধ্য দিয়ে চালানোর দায়িত্ব সরকারের। কারণ বাজারে আগুন লাগলে অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়লে মানুষের গায়ে সরাসরি আঁচ লাগে, আয়-ব্যয়ের মধ্যে সঙ্গতি রাখতে না পারলে মেজাজ তিরিক্ষি হয়। সব ক্ষোভ গিয়ে আছড়ে পড়ে সরকারের ওপর, সরকারের বিরুদ্ধে। অস্থিতিশীল বাজার সরকারকে অজনপ্রিয় করে তোলে। বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে তার প্রত্যক্ষ আঘাত লাগে সাধারণ মানুষের ওপর। ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। ফলে চালের দাম বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া হয় ত্বরিত। সম্প্রতি হঠাৎ করেই চালের দাম কেজিপ্রতি দুই/তিন টাকা বেড়েছে। এ নিয়ে সংবাদপত্রে কিছু খবরও বেরিয়েছে।

উৎপাদন ভালো হয়েছে, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে, তা সত্ত্বেও চালের দাম কেন বাড়ছে তার কোনো যুক্তিসঙ্গত জবাব কারো কাছে নেই। চাল ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকরা হয়তো বলবেন আমদানি শুল্ক শতকরা ২ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ২৮ ভাগ করায় চালের বাজারে তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় এ কারণে যে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্ধিত শুল্ক পরিশোধ করে এখন পর্যন্ত কোনো চাল আমদানি করা হয়নি। ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের আশায়ই যে চালের দাম বাড়িয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এ ধরনের অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা ঠিক যে লাভের জন্যই ব্যবসা। কিন্তু খাদ্যপণ্যে অতি মুনাফা এক ধরনের অপরাধ। যা খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকে তাতে ভেজাল দেয়া যেমন মারাত্মক অপরাধ, তেমনি অকারণ দাম বাড়িয়ে মানুষের পকেট কেটে নেয়াও অপরাধ। এই অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার ক্ষমতা একমাত্র সরকারেরই আছে। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী এবং অসৎ রাজনীতিবিদদের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কথা শোনা যায়। এরা পরস্পরের যোগসাজশে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে নিজেরা লাভবান হয়, ক্ষতি হয় সরকারের।

আমাদের দেশে চালের চাহিদা বার্ষিক ৩ কোটি ১০ লাখ টন। গত বছর দেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত মোট চালের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৫৭ লাখ টন। বর্তমানে চালের সরকারি মজুদের পরিমাণ ১৩ লাখ ২১ হাজার টন। চালের বাজারে যাতে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় সে জন্য গত বছর বিদেশ থেকে সাড়ে ৪২ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারেও চালের দাম এখন নিম্নমুখী। সামগ্রিক বিবেচনায় তাই চালের দাম বাড়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণই নেই।

আমরা জানি, আর মাত্র পাঁচ মাস পর দেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী নির্বাচন বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে শেখ হাসিনার সরকারকে পুনর্নিবাচিত করার কথা বলা হচ্ছে। শেখ হাসিনা টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছেন। আরো এক মেয়াদ থাকতে চান। কাজটি সহজ নয়। আমাদের দেশের মানুষের একাংশের মধ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন দেখার আগ্রহ প্রবল। তাছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শক্তি নিজ নিজ ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নানাভাবে আগামী নির্বাচনের আগে সক্রিয় হবে, বর্তমান সরকারকে চাপে রাখতে চাইবে, বিব্রত করতে চাইবে, যার কিছু কিছু লক্ষণ এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশের অভ্যন্তীরণ বিষয়ে বিদেশি দূতাবাসগুলো এবং তাদের কূটনীতিকরা নাক গলাতে শুরু করেছেন।

দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার জন্য নানা রকম উসকানি, অপচেষ্টা চলবে বলেই ধরে নেয়া যায়। সেজন্য সরকার এবং সরকার সংশ্লিষ্ট সব মহলকেই সতর্ক থাকতে হবে।

আমাদের দেশের নির্বাচনে চালের মূল্য সব সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সেজন্য নির্বাচনের আগে কোনোভাবেই চালের বাজারে অস্থিরতা কাম্য নয়। চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার সবই করতে হবে। স্বল্প আয়, নির্দিষ্ট আয়ের ভোক্তাদের ওপর চালের দাম যাতে বাড়তি চাপ হয়ে না দেখা দেয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ওএমএসের মাধ্যমে শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের কাছে কম দামে চাল ও আটা বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। খোলা বাজারে ওএমএসের মাধ্যমে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা এবং প্রতি কেজি আটা ১৮ টাকা দরে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিক্রির ব্যবস্থা করা হলে বাজারে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চালের বাজার যেন কোনোভাবেই কোনো সিন্ডিকেটের হাতে চলে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। চাল আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং চালকল মালিকদের মধ্যে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করতে হবে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে। চালের বাজারে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই- এমন ধারণা তৈরি হতে দেয়া যাবে না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কেউ চালের বাজার চড়া করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাচনের আগে মানুষের কাছে কোনোভাবেই যেন এই বার্তা না যায় যে, সরকার তাদের সঙ্গে নেই। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সহায়তার জন্য নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। কড়া নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ থাকলে কোনো মহল পানি ঘোলা করার সুযোগ পাবে না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে হবে। কোনো দুর্নীতিবাজ মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর সহযোগী হিসেবে সরকারি দলের কাউকে দেখা গেলে তা আগামী নির্বাচনে দলের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষের দূরত্ব তৈরি হওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। চাল নিয়ে মানুষের পক্ষ থেকে সে অভিযোগ খন্ডানোর সুযোগ এসেছে। দেখা যাক, সুযোগের সদ্ব্যবহার করা হয় কিনা।

লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।