৫ জানুয়ারির নির্বাচন

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার দায় কার?

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে মিডিয়ায় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেকেই নানা কথা বলেন, ১৫৩ জন সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া নিয়ে তীর্যক মন্তব্য ছোড়েন, বিনা ভোটের নির্বাচন বলে অভিহিত করেন, জনগণের ভোটাধিকার হরণের অভিযোগও করে থাকেন, কেউ কেউ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি বলে আর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত না করার অভিযোগ করে থাকেন কেউ কেউ। মূল কথা, ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যেসব কথাবার্তা এখনো উচ্চারিত হয় তা শুনে যে বিষয়টি নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায় তা হচ্ছে, যারা এই নির্বাচন নিয়ে সুযোগ পেলেই কথা বলেন তারা কাটিং-পেস্টিং মনোবৃত্তির সীমাবদ্ধতায় চরমভাবে আবদ্ধ, তারা নিজেরা জ্ঞান চর্চায় এমন মনোবৃত্তিকেই উদার বলার বা ভাবার প্রশ্নই আসে না, বরং এটি খন্ডিত বিকৃত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। অন্যদিকে যাদের লক্ষ্য করে এমন মন্তব্য করা হয় তারা এর ব্যাখ্যাদানে প্রায়ই অস্বস্তিবোধ করেন, অযোগ্যতার পরিচয় দেন, রাজনীতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে পারেন না। আমাদের দেশে রাজনীতিতে একদিকে কাটিং-পেস্টিং অর্থাৎ নিজের সুবিধা মতো তথ্য-উপাত্ত জোড়াতালি দিয়ে কথা বলা, লেখালেখি করার প্রবণতা একচ্ছত্রভাবে বিরাজ করছে, বিপরীত দিকে প্রকৃত রাজনৈতিক ঘটনাবলির কার্যকরণ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং ব্যবহারকারীদের হীন স্বার্থকে উন্মোচিত করার মতো জ্ঞানচর্চা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অভাব, আশান্বিত বাস্তবতা, দুর্বলতা ইত্যাদি অতিক্রম করতে না পারা। এর ফলে দেশের রাজনীতির খুব নিকট-ইতিহাস নিয়ে নানা বিভ্রান্তি, দিকভ্রান্তি, বিকৃতির ছড়াছড়ি বিরাজ করছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজনীতিতে জ্ঞানভিত্তিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার ধারা, দখল নিচ্ছে অজ্ঞতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা, উগ্রতা, হঠকারিতা, সুবিধাবাদিতাসহ স্থূ’ল, অন্ধ বিশ্বাস যা মোটেও গণতন্ত্রের পথকে স্বাভাবিক ধারায় বিকশিত হতে ভূমিকা রাখে না।

একটু পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমরা যদি রাজনৈতিক নানা ঘটনার অধ্যায়ে আমাদের দলগুলোর ভূমিকা, নেতাদের কথাবার্তা ও ভূমিকাকে খোলা মন, দৃষ্টি ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি তাহলে যে প্রবণতাসমূহ সহজেই ধরা পড়ার কথা তা হচ্ছে বাস্তব বোধ, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণের বিশাল ঘাটতি, শূন্যতা, আবেগ, অন্ধ বিশ্বাস, হঠকারিতার কাছে আত্মসমর্পণের প্রাবল্য। আমরা তখন বা এখনো কাটিং এবং পেস্টিং করে কথা বলার খারাপ, হীন অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারিনি। ফলে আমাদের রাজনৈতিক কথাবার্তা, অবস্থা গ্রহণ এবং নেতৃত্ব  দেয়ার মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা খুব একটা তৈরি হয়নি, বালুচরে ঢাকা পড়ার সুযোগ অবারিত থেকেছে। আমাদের রাজনীতির খুব নিকট-সময়ের ঘটনাবলি নিয়েও সৃষ্ট চোরাবালিতে আটকে পড়তে বা সলিল সমাধি হতে বাধ্য হয়েছে প্রকৃত রাজনীতির ইতিহাস, সেটির ওপর স্থান করে নিয়েছে ময়লা, ঘোলা জল- যেখানে ম্লান করে সবারই দেহ ও মন পরিচ্ছন্ন না হয়ে কর্দমাক্ত হয়।

এবার মূল প্রসঙ্গের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করা যেতে পারে। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে না এমনটি কেউ কি ক’মাস আগেও ভাবতে পেরেছিল? দেশে বেশ ক’টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একটি করপোরেশনেও জোরজবরদস্তিমূলক নির্বাচন কি হয়েছিল? সরকার বা নির্বাচন কমিশন কি কোথাও হস্তক্ষেপ করেছিল? যদি করত তাহলে সবক’টিতেই সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীরা এমন বিস্ময়করভাবে পরাজিত হতো কি? বিরোধী দলও তো নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার কোনো অভিযোগ করেনি। বরং বেশ ক’টি সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা মেয়র পদে নজিরবিহীন সাফল্য নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন, সবারই ধারণা ছিল যে বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট এবং গাজীপুরের মেয়ররা যার যার নগর উন্নয়নে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের কারো বিরুদ্ধেই যেহেতু সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না, তাই ভোটারদের কাছ থেকে তারা ইতিবাচক মূল্যায়ন নিয়েই ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন হওয়ায় অনেকেই হতাশ হন, ভোটার মানসিকতায় গণতান্ত্রিক মানসিকতার অনুপস্থিতি, আবেগ, প্রচার-প্রচারণায় আপ্লুত হওয়ার প্রবণতার প্রাধান্য বলে উল্লেখ করেন। উক্ত ফলাফল বিশ্লেষণের পর জানা গেল ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে অপপ্রচারটি দেশব্যাপী ছড়ানো হয়েছিল তাতে বড় সংখ্যক ভোটার বিশ্বাস স্থাপন করে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার বার্তা প্রদান করেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় নানা অবিশ্বাস্য বিষয় কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ভোটের রায় হিসেবে তৈরি হয়, বের হয়ে আসে সেই অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। এমন ফলাফলের পর পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন কী হতে পারে- তা অনেকটাই ধরে নেয়া সম্ভব হচ্ছিল। বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে পরিচালিত ২০ দলীয় জোট এমন বাস্তবতায় থেকেও কেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার সিদ্ধান্ত মনে মনে পোষণ করতে থাকে তা বেশ ভাবার বিষয়। ২০ দলীয় জোট তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা ফর্মুলা নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সংবিধানের আলোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে মোটেও রাজি ছিল না- যদিও বেশ কয়েকটি নির্বাচনে একচ্ছত্রভাবে তাদের প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়ে এসেছিল- তারপরও জাতীয় নির্বাচনকে তারা সেভাবে বিশ্বাস করতে চায়নি, নিজেদের শক্তিকে তারা সরকারের সব বাহিনীর চাইতেও অনেক বেশি কার্যকর বলে ধরে নিয়েছিল। অথচ এ ক্ষেত্রে জনগণের গোপন ভোটের বিষয়টি তার চাইতেও অনেক বেশি কার্যকর এবং শক্তিশালী- যা ক’মাস আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেই ফল দিয়েছিল। তারপরও ২০ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়া, অনুষ্ঠিত হতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। দেশব্যাপী তারা আন্দোলনের নানা কর্মসূচি দিতে থাকে। তাতে ছাত্র শিবির-জামায়াতের নারী-পুরুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের নানা ঘটনা দৃশ্যমান হতে থাকে। জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য এসব প্রতিহিংসামূলক কর্মকান্ড দেখিয়ে সরকারকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল, জনজীবনকে ভীতসন্ত্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত করতে মাঠে নামে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা সরকারকে কাবু করা, উৎখাত করা, নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে না দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার বাহিনীর ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে থাকে। সে ধরনের পরিস্থিতিতে সংসদের সরকার এবং বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করার জন্য সংসদ নেত্রী এবং সরকার প্রধান শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে আলোচনায় বসতে আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাটি বাংলাদেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে বিরোধীদলীয় প্রধানের অংশগ্রহণে আলোচনা-পর্যালোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন, কার্যপরিধি ইত্যাদি নির্ধারণপূর্বক চালু হলে প্রতিবার নির্বাচনের আগে দেশে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে ধরনের অবিশ্বাস বিরাজ করে তা থেকে হয়তো উত্তরণ ঘটানো যেত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাবটি তখন যদি খালেদা জিয়া গুরুত্ব দিতেন তাহলে সমাধানের একটি স্থায়ী রূপ লাভ করত। কিন্তু তখন খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হননি। তিনি সরকার উৎখাতের আন্দোলনে অনেক বেশি আস্থাশীল ছিলেন। নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের দূতিয়ালিও ব্যর্থ হয়। বিরোধী দল সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতায় না এসে দেশে হরতাল, অবরোধ ডেকে একটি অচলাবস্থা তৈরি করেছিল, রাজধানী ঢাকাকে গোটা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সড়ক, রেল ও নৌপথে পরিবহনের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা, পেট্রল বোমার মতো দাহ্য বোমা নিরীহ মানুষের ওপর নিক্ষেপ করার মতো নৃশংসতা সংঘটিত করেছিল। এতে অসংখ্য মানুষ পুড়ে মারা যান, চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে যান। নির্বাচন বর্জনের ডাক সফল করতে হামলা, পোড়াপুড়ি, রাস্তাঘাট অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি নির্বিচারে করেছে। বেশ কিছু এলাকার মানুষ ঘর থেকে প্রাণভয়ে বের হতে সাহস পায়নি, মানুষের রুটি রুজি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। দেশব্যাপী অবরোধ, পেট্রল বোমা নিক্ষেপে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা অংশ নেয়, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়া হয়, নির্বাচন প্রতিহত করতে ক্যাডার বাহিনী নির্বাচনী কেন্দ্রে আগে থেকেই ভাঙচুর, পোড়াপুড়ি, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা করে, একজন শিক্ষককে মেরে ফেলা হয়, অনেকে আহত হন, অনেকের বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। নির্বাচন বানচালে শক্তি ও আগুনের ব্যবহার করা হয়, রাস্তাঘাট গাছ ফেলে বন্ধ করে দেয়া হয়।

একটি নির্বাচনকে প্রতিহত করতে জামায়াত-বিএনপি যে তান্ডব চালিয়েছিল তার নজির খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। ২০১৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত এভাবেই দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল। সেই অবস্থায় নির্বাচন স্থগিত করার অর্থ দাঁড়ায় দেশে অরাজকতাকে চরম আকার ধারণ করতে দেয়া, বিরোধী দলের সশস্ত্র পন্থায় কর্মসূচির কাছে আত্মসমর্পণ করার পরণতি দেশে সরকার পতনের অবৈধ পন্থাকেই স্বীকৃতি দেয়া- যা পরবর্তী সময়ে একটি স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়াত। সে ক্ষেত্রে  দেশে নির্বাচনের আগে পেট্রল বোমার মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। সরকার সেই সময়ের সন্ত্রাসের সঙ্গে আপোস করেনি। নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনড় থেকেছে। প্রধান বিরোধী দল ও জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ রুদ্ধ করে, ভয়ভীতি, অগ্নিসংযোগ চালানোর ফলে অনেক দলই অংশ নিতে পারেনি, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন নির্বাচিত হয়েছেন, বাকিরা স্বল্প ভোটারের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হয়নি, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণও হয়নি, ব্যাপক ভোটারের অংশগ্রহণেও হয়নি। কিন্তু নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ না হলেও সাধারণ মানুষ ভোট বা নির্বাচন নিয়ে ভাবতে চায়নি। বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে, রুটি-রুজির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। ফলে বিরোধী দল ৬ জানুয়ারি থেকে মানুষকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। মানুষ নির্বাচনের চাইতেও নিজেদের জীবন-জীবিকা নিয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিল। সে কারণে মানুষ বিরোধী দলের নির্বাচন প্রতিহত বা বর্জনের সমর্থনে একটি মিছিলও করেনি, সমর্থনও জানায়নি। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে কর্মসূচি গুটিয়ে জামায়াত-বিএনপি ঘরে ঢুকে যায়। তাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়। দেশ সাংবিধানিক সংকট থেকে মুক্তি পায়, নতুন সরকার শপথ নিলে মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে। বিরোধী দলও নতুন কোনো নির্বাচনের দাবি তোলার সাহস পায়নি। কেননা যে পেট্রল বোমার নজির তারা ক’দিন আগে স্থাপন করেছিল তার আর পুনরাবৃত্তি দেশে ঘটুক তা কেউ স্বপ্নেও দেখতে চায়নি। নির্বাচন মানেই নতুন করে পেট্রল বোমার আগুনে মানুষ পুড়ে মারার নৃত্য, রাস্তাঘাট অবরোধ করার নামে নৈরাজ্য কেউ দেখতে চায়নি।

ড. কামাল হোসেন এখন বলছেন, সেদিন কেন সরকার আর একটি নির্বাচন করার উদ্যোগ নিল না। এখন তিনি এমন কথা কত সহজে বলছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পর তিনিও কি আর কোনো দাবি করেছিলেন? দেশে পুনরায় পেট্রল বোমার তান্ডব নির্বাচন উপলক্ষে ঘটবে না- সেই নিশ্চয়তা কি ছিল? ২০১৫ সালে জানুয়ারি-মার্চ তিন মাস আগে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি থেকে মানুষ বুঝতে পেরেছিল দেশে আগুন সন্ত্রাসের চাইতে বর্তমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবাই কাজ করছে, জীবন-জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত আছে- সেটিই ভালো, সেটিই নিরাপদ। ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার পেট্রল বোমার সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি থেকে জামায়াত-বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। নেতাকর্মীরা এসব নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধে মামলায় জড়িয়ে পড়ে, অনেকে পালিয়ে বেড়ায়। কোনো সভ্য দেশেই ২০১৩-২০১৪ ও ২০১৫ সালের মতো অপরাধ সংঘটিত করে কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট আশা করতে পারে না যে তারা কোনো মামলার আসামি হবে না, বিচারের সম্মুখীন হবে না।

অথচ নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করলে সরকার যদি কোনো ধরনের ভোট জালিয়াতির আশ্রয় নিত তাহলে সাধারণ মানুষই সরকার পতনে ঘর থেকে বের হয়ে আসত। কিন্তু জামায়াত-বিএনপি আগেই মানুষকে জিম্মি করে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল তা কোনো অবস্থাতেই আন্দোলন হতে পারে না। জামায়াত-বিএনপির কারণেই সেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। মানুষ ভোটদানে সুযোগ পায়নি। সরকার হস্তক্ষেপ করতে চাইলে পরিস্থিতি সরকারের জন্য ভয়ানক হতো। সেই ঝুঁকি মনে হয় না শেখ হাসিনা তখন নিতেন। তিনি যে রাজনীতি করেন- সেখানে জনগণকে বাদ দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার হিসাব মেলানো যাবে না। অথচ খালেদা জিয়া ২০১৩ এবং ২০১৫ সালে জামায়াতের ওপর ভর করার কারণে দেশে যে অবস্থা সৃষ্টি করেছিলেন- তা কোনো অবস্থাতেই নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সংজ্ঞায় পড়ে না। চরম পন্থায় বিশ্বাসীদের মতো বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করতে দেশব্যাপী তান্ডব চালিয়েছিল। নির্বাচনটি মূলত সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়। এর দায় এখন সরকারের ওপর চাপানো কিংবা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি বলে জোড়াতালি দিয়ে কথা বলার অর্থ দাঁড়ায় প্রকৃত সত্যকে মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নেয়া, অতীত থেকে প্রকৃত শিক্ষা না নেয়া।

লেখক ঃ অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যলয়।

॥ ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ ॥

উন্নয়নের স্বার্থে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রয়োজন

ভোট নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। এ পরিবর্তন যেন দুর্নীতিকে এগিয়ে না আনতে পারে। অব্যাহত উন্নয়নের ধারা ধরে রাখতে হবে। উন্নয়নের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে যাতে অন্যের পকেটে ঢুকতে না পারে, সে দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকে। যুগ যুগ ধরে যারা দুর্নীতির মাধ্যমে পকেট ভর্তি করছে, আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, এ ধরনের প্রার্থীদের বয়কট করতে হবে। তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে রাজনৈতিক দল এবং জনগণকে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে যেসব দল অংশগ্রহণ করবে, তারা যেন সৎ, যোগ্য, আদর্শবান দেশপ্রেমিক লোককে মনোনয়ন দেয়। অর্থ আর কালো টাকার দাপটে চোরাকারবারি, মাদক পাচারকারী, দুর্নীতিগ্রস্ত কেউ যেন প্রার্থী হতে না পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হতে হবে। অব্যাহত উন্নয়নের ধারা ধরে রাখতে হলে অবশ্যই গতিশীল, দায়িত্বশীল দেশপ্রেমিক সরকার দরকার। যাদের পক্ষে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব তাদেরই ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করা জনগণের দায়িত্ব। কোনো ধরনের দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র যেন দেশের উন্নয়নের গতিকে থামিয়ে দিতে না পারে, সে বিষয়ে জনগণকেও সতর্ক থাকতে হবে। উন্নয়ন ও দেশবিরোধী সব চক্রান্ত ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে জাতিকে সফল হতে হবে। এ সফলতার মাধ্যমে আগামী দিনের জাতীয় সমস্যা বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী যাতে কর্মসংস্থান পায়, সে চিন্তা এখন থেকে করতে হবে। প্রতিবছর সরকারের এমন পরিকল্পনা করতে হবে যাতে বেশিসংখ্যক কর্মসংস্থান  তৈরি হয়। ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীতে শ্রম রফতানির পথ ছোট হয়ে আসছে। পৃথিবীব্যাপী হু হু করে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। এসব বিষয় বিবেচনায় এনে আগামী নির্বাচিত সরকারকে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষিত জনশক্তি নিজ দেশে আত্মমর্যাদার সঙ্গে কাজের সুযোগ পেলে শ্রমশক্তি বিদেশে রফতানি করতে হবে না। নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনগণের আগ্রহ বাড়ছে। অনেক হতাশার মধ্যেও জাতির সামনে এক উজ্জ্বল আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাতাসে নানা গুঞ্জনও ভেসে বেড়াচ্ছে। জনগণ সেসব গুঞ্জনে কান দিতে চান না।

চলতি বছরের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু শুধুই সংবিধানের দোহাই এবং নির্বাচনের জন্য নির্বাচন হলে ভালো হবে কি? সার্থক নির্বাচনের জন্য দরকার সব দলের ও সব মতের লোকের অংশগ্রহণ। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাই মুখ্য, তবে সরকারকে অবশ্যই সহায়ক হতে হবে। মেয়াদপূর্ণ হওয়ার পর নতুন মেয়াদে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য। কিন্তু সেই নির্বাচন কীভাবে হবে? কারা করবে? নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে কি? না আগামী নির্বাচনও ২০১৪ সালের মতো একতরফা হবে? এসব প্রশ্নের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেয়ার সময় এখনও আসেনি। সব দলকে নির্বাচনে আনতে প্রথমে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব নাগরিক যেন তাদের ভোট পছন্দের প্রার্থীকে স্বাধীনভাবে দিতে পারে, নির্বাচন কমিশনকে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তাহলেই দেশে সুখ-শান্তি ফিরে আসবে এবং জনগণ তাদের প্রাপ্য অধিকার ভোগ করতে পারবে। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য এই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের জন্য আবশ্যিক শর্ত, সবার জন্য মাঠ সমতল করা। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু মতবিনিময় সভা করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নির্বাচন কমিশনকে আগে থেকেই বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা করে সুষ্ঠু ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আস্থার সংকট দূর করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। জনগণ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবে, সেই ক্ষেত্রটি তৈরি করার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত সুষ্ঠু নির্বাচন। একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ নির্বাচন জাতিকে একটি সুন্দর সংসদ উপহার দিতে পারে। সব দল অংশ নিলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে সর্বজনগ্রাহ্য মতগুলো নিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি বিতর্কিত হয়, তাহলে দেশ ভয়াবহ পরিণতির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা দেশবাসীর। মনে রাখতে হবে, রাজনীতিকদের কোনো ভুলের কারণে যদি দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়ে, নির্বাচন ভন্ডুল হয়ে যায়, তাহলে ইতিহাস কিন্তু ক্ষমা করবে না। গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। বর্তমান সরকার সে গণতন্ত্রের প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেই দেশের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। আর গণতন্ত্র মানে আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার, সুশাসন, মানবিক উন্নয়ন অর্থাৎ একে অপরের সঙ্গে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজও সেসব গণতান্ত্রিক চেতনা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ বিএনপিসহ বাংলাদেশে যে কয়টি রাজনৈতিক দল রয়েছে, বিশেষ করে বড় দুই দলের নেতারা যোগ্য ও অভিজ্ঞ, তারা এ দেশেরই সন্তান। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এ দেশের মাটি ও মানুষের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো কারণে যদি বড় দুই দলের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়, তবে নিজেরা বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। রাজনীতিতে বিদেশিদের নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়া মোটেই ঠিক নয়। আশা করি, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটবে না।

দেশ এখন উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। শহর, গ্রাম, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত উন্নয়নের ছোঁয়া দেখা যাচ্ছে। বলতে গেলে উন্নয়নের একটা গতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ গতিকে কেউ ইচ্ছা করে থামাতে পারবে না। নতুন প্রজন্ম উন্নয়ন অগ্রগতিতে বিশ্বাসী। দৃশ্যমান উন্নয়ন অগ্রগতিকে তারা সাধুবাদ জানাচ্ছে। অফিস-আদালতে আগের মতো যুগ যুগ ধরে ফাইল আটকে থাকে না। যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত কমিটির রিপোর্টের বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থা অনেকটা নিয়মের মধ্যে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সব প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছামাফিক ভোগান্তির দিন প্রায় শেষ। অন্যায়, অবিচার, জুলুম করলেই সঙ্গে সঙ্গে এখন তাদের বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যতই প্রভাবশালী আর ক্ষমতাধর হোক না কেন, বর্তমান সরকার নিজ দলের হলেও এ ক্ষেত্রে ছাড় দিচ্ছে না। এতে এ প্রজন্মের ভোটারের কাছে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। উন্নয়ন ও শৃঙ্খলায় দেশ যেভাবে সামনের দিকে এগোচ্ছে, এতে সরকারের সাফল্য উল্লেখ করার মতো। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই সরকারের সব ধরনের তথ্য বিজ্ঞপ্তি হাতের নাগালেই পেয়ে যাচ্ছে। ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক হানাহানি ও সহিংস কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জনগণ তাদের কর্মযজ্ঞ চালিয়ে দিনযাপন করতে বাধা পাচ্ছে না। নির্দিষ্ট শ্রেণী ও পেশার মানুষ ছাড়া অন্য জনগণ প্রশাসন ও পুলিশের অতটা হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। একসময় ব্যবসায়ীরা সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ভয়ে ব্যবসা করতে পারতেন না। এখন সে ধরনের খবর খুব কমই পাওয়া যায়। ব্যবসার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের বক্তব্য, তারা ভালোভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ইচ্ছামতো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় মাসের পর মাস অবরোধ রেখে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে শিক্ষাজীবন ধ্বংস করার কর্মসূচি এখন আর কেউ পালন করতে পারে না। রাজনীতির নামে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আছে। সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন তাদের নিজস্ব নিয়মনীতিতে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সন্ত্রাসী চাঁদাবাজ মাদক বেচাবিক্রি প্রায় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। সরকারের কঠোর পদক্ষেপ এবং আন্তরিকতার কারণে এসব সম্ভব হচ্ছে।

আমাদের দেশে নির্বাচন এলে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের নির্বাচনমুখী দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। বড় বড় দলের নমিনেশন পেতে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করতেও পিছু হটে না। নির্বাচনে একবার জয়ী হতে পারলেই যেন একসঙ্গে দুই হাতে আয় করা সম্ভব। যাদের ন্যূনতম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, এমন প্রার্থীকেও নির্বাচনের প্রার্থী হতে দেখা যায়। যাদের হাতে অবৈধ টাকার পাহাড়, তারা অর্থ দিয়ে বড় বড় দলের নীতিনির্ধারকদের বশ করে দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন।

অতীতের যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে একাদশ জাতীয় নির্বাচন অধিক গুরুত্ব বহন করে। তাই দেশ ও জনগণ সরকারের স্বার্থেই দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিককে বয়কট করার শপথ এখন থেকেই গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে।

লেখক ঃ গবেষক ও কলামিস্ট

 

॥ আবদুল লতিফ মন্ডল ॥

তফসিল ঘোষণাই যথেষ্ট নয়

আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য পুনঃতফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। পুনঃঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষদিন ২৮ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২ ডিসেম্বর। আর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন ৯ ডিসেম্বর। ১২ নভেম্বর বিকালে কমিশন এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই ওই দিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) পুনঃনির্ধারিত তফসিলের ঘোষণা দেন।

সিইসি বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট নির্বাচনে আসার কথা জানিয়েছে। সেটা বিবেচনায় নিয়ে কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা কমিশনের জন্য স্বস্তির বিষয়।

এর আগে ৮ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি। ওই তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ছিল ১৯ নভেম্বর।

মনোনয়নপত্র বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন ছিল যথাক্রমে ২২ নভেম্বর ও ২৯ নভেম্বর। ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছিল ২৩ ডিসেম্বর।

৮ নভেম্বরের ভাষণে সিইসি সব রাজনৈতিক দলকে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের আশ্বাস এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দেন।

দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ নিষ্পন্ন করতে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকেই অনুরোধ জানান। এরপরও কোনো বিষয়ে মতানৈক্য বা মতবিরোধ থাকলে রাজনৈতিকভাবে তা মীমাংসারও অনুরোধ জানান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সিইসি।

৮ নভেম্বর ঘোষিত নির্বাচনের তফসিল নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় সংসদে বিরোধী দল ও একইসঙ্গে সরকারে থাকা জাতীয় পার্টি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণায় সে ধোঁয়াশা কেটে গেল।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার তফসিল ঘোষণার জন্য কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। অন্যদিকে গণফোরামের সভাপতি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন তফসিল ঘোষণাকে দুঃখজনক অভিহিত করে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাব ছিল সংলাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা যাবে না।

এর মধ্যেই তড়িঘড়ি করে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন না ঘটিয়ে একতরফাভাবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় সরকারের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটল।

এদিকে ১১ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দল বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয় এবং নির্বাচনের তফসিল এক মাস পিছিয়ে দেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানায়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও এক সংবাদ সম্মেলনে অনুরূপ সিদ্ধান্ত ও দাবি জানানো হয়। নির্বাচনী তফসিল এক মাস পিছিয়ে দেয়ার জন্য জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১১ নভেম্বরই কমিশনকে একটি চিঠি দেয়।

নির্বাচনের তফসিল পিছিয়ে দিতে দাবি জানায় বাম গণতান্ত্রিক জোট, যুক্তফ্রন্ট ও ইসলামী আন্দোলন।

নির্বাচনের তফসিল পিছিয়ে দেয়ার দাবির পেছনে যেসব যুক্তি ছিল সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- এক. ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও নেতারা কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও অনুষ্ঠানে দলের পক্ষে ভোট চেয়ে আসছেন এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছেন।

অপরদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, বিশেষ করে সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল ও আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি পুলিশ তথা সরকারের অনুমোদন না পাওয়ায় সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠান করতে পারেনি এবং আটককৃত এবং আটকের ভয়ে গা ঢাকা দেয়া তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও অন্যসব নেতাকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের কোনো প্রস্তুতি নিতে পারেনি।

দুই. ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে অনেকটা ব্যর্থ সংলাপে ব্যস্ত থাকায় এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিশ্চিত না থাকায় ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো নির্বাচনের কাজে মনোযোগী হতে পারেনি।

তিন. দশম জাতীয় সংসদের প্রথম বৈঠক ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ায় ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

তাই ভোট গ্রহণের দিন জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ধার্য করে পুনরায় তফসিল ঘোষণা করা হলে তাতে কোনোরকম ঝুঁকি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।

নির্বাচন কমিশনের কাজ হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করা। দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলীয় সরকারের শাসনামলে অনুষ্ঠিত কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি এবং এসব নির্বাচনে ক্ষমতায় থাকা কোনো দলীয় সরকার পরাজিত হয়নি।

দলীয় সরকারের অধীনেও যে সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠান সম্ভব, সে উদাহরণ সৃষ্টি করাই বর্তমান কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে কমিশনকে যেসব বিষয়ের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে সেগুলো হল- প্রথমত, নির্বাচনে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।

সিইসি ইতিপূর্বে বলেছিলেন, এ মুহূর্তে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত নয়; তফসিল ঘোষণার পরই তারা সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে আইনানুগ পদক্ষেপ নেবেন।

কমিশনের পক্ষে সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ এ কারণে যে, তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট এবং জোটের বাইরে থাকা ৯টি সমমনা দল দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে অনেকটা একদলীয় নির্বাচনে স্বল্পসংখ্যক কয়েকটি আসন বাদে বাকি সব আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে বর্তমান সংসদ সদস্যরা আগামী ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের পদে বহাল থাকবেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি সরকার মেনে না নেয়ায় নির্বাচনের সময় জাতীয় সংসদের কমবেশি ৯০ ভাগ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা (তাদের অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন) ক্ষমতায় থাকবেন।

তাছাড়া কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন নিরপেক্ষভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত/মনোনীত প্রার্থীরা এসব নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন।

তারা দলীয় নীতিনির্ধারকদের ইঙ্গিতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে যে পিছপা হবেন না, তা অনেকটা জোর দিয়েই বলা যায়।

সব দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে কমিশন আর যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবেন তা হল, বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানি ও গ্রেফতার থেকে রক্ষা করা।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সংলাপের সূত্রে বিএনপি দ্বিতীয় দফার আলোচনার দিন (৭ নভেম্বর) আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ‘মিথ্যা ও গায়েবি মামলার’ একটি তালিকা জমা দেয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, এ তালিকায় ১ হাজার ৪৬টি মামলা রয়েছে।

এসব মামলায় কারাগারে রয়েছেন ৫ হাজার ২৭৪ নেতাকর্মী। বিভিন্ন মামলায় নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৯৬ হাজার ৭০০, অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার।

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা দেয়া হবে না- প্রধানমন্ত্রীর এরূপ আশ্বাসের পরও ‘হয়রানিমূলক ও গায়েবি মামলা’ দেয়া অব্যাহত রয়েছে বলে পত্রপত্রিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।

১২ নভেম্বর একটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ১ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর বাইরে ২০ জেলায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১০০টি। এর মধ্যে ৯৭টি মামলারই বাদী পুলিশ। বিএনপির নেতাদের দাবি, এ মামলাগুলো হয়রানিমূলক ও গায়েবি।’

দ্বিতীয়ত, একাদশ সংসদ নির্বাচনে কমিশনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবে নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। নব্বইয়ের দশকে দেশের দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রশাসনকে দলীয়করণের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, গত ১০ বছরে তা চরম আকার ধারণ করেছে।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরের একটানা শাসনামলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বেসামরিক প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বড় অংশ সরকারের আনুকূল্যে অপ্রত্যাশিত সুযোগ-সুবিধা পেয়ে দলটির অনুরক্ত হয়ে পড়েছেন।

যারা সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে উপ-সচিব ও তদূর্ধ্ব পদে এবং সচিবালয়ের বাইরে সমমানের পদে পদোন্নতি পেয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের অনুগত।

এসব কর্মকর্তার মধ্য থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং মাঠ প্রশাসনে বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি অব পুলিশ, জেলা প্রশাসক (ডিসি), সুপারিন্টেনডেন্ট অব পুলিশ (এসপি) ইত্যাদি পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বা হবে।

ক্ষমতাসীন দলের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে সরকারই তাদের রক্ষা করাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। তাই নির্বাচন কমিশন কোনো শাস্তি দিলেও শেষমেশ তা কার্যকর করতে পারবে না।

তৃতীয়ত, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ কালো টাকা ও পেশি শক্তির ব্যবহার। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনী ব্যয়ের যে সীমারেখা দেয়া আছে তা এখন না মানার নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এর অন্যতম প্রধান কারণ ব্যবসায়ী প্রার্থীদের আধিক্য। বর্তমান সংসদের মূল ৩০০ এমপির মধ্যে ২০৬ জনেরই পেশা ব্যবসা। অর্থাৎ ব্যবসায়ী এমপির হার ৬৯ শতাংশ। পেশাজীবীদের হার দ্রুত কমে যাচ্ছে।

আর বুদ্ধিজীবীদের তো সংসদে খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। এ কারণে নির্বাচনে কালো টাকার খেলা অপ্রতিরোধ্য গতিতে বেড়েই চলেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

চতুর্থত, সাম্প্রতিককালে সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু নির্বাচনে যে সমস্যাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হল, বিরোধী দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপি জোটের প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর ও ভয় দেখিয়ে বের করে দেয়া। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই শাসক দলের কর্মীরা এ কাজটি করে থাকেন।

অতীতে এ কারণে বিরোধী দলগুলোর অনেক প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দেখেও না দেখার ভান করায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকদের ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট প্রদানের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।

সবশেষে বলতে চাই, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল বা পুনঃতফসিল ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।

নির্বাচন কমিশনকে স্মরণে রাখতে হবে, একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের জন্য জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

আর আসন্ন সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে অতীতের অনেক নির্বাচন কমিশনের মতো বর্তমান নির্বাচন কমিশনও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।

লেখক ঃ সাবেক সচিব, কলাম লেখক

 

॥ এ কে এম শাহনাওয়াজ ॥

ক্ষমতার মধু এবং আদর্শ ও বিবেকের পরাজয়

আমরা একটি অদ্ভুত সময় পার করছি। বিশেষ করে দেশবাসী- যারা দলীয় রাজনীতির অক্টোপাসে আটকে যাননি তারা যেন একধরনের পরাধীনতার অর্গলে বাধা পড়ে গেছেন।

তারা যে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে একটি সুস্থ পরিবেশের সৃজন করবেন এরও যেন কোনো উপায় নেই।

রাজনীতি সত্যিই বোধহয় পথ হারিয়েছে! প্রচন্ড গণতন্ত্রবিরোধী হিটলার ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, গণতন্ত্রকে যদি পরাভূত করা না যায় তাহলে মানব সভ্যতার প্রসার তো ঘটবেই না বরং তা বিলুপ্ত হবে।

হিটলার কি তবে বহুকালদর্শী ছিলেন? আমাদের মতো দেশগুলোকে দিব্যদৃষ্টিতে যেন দেখতে পেরেছিলেন তিনি।

গণতন্ত্রের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতা প্রত্যাশীরা যেভাবে আদর্শ আর বিবেক বিসর্জন দিয়ে প্রতিদিন জনগণকে প্রতারিত করতে চাইছেন, তাতে সভ্যতার ধ্বংস না হোক, এদেশের দীর্ঘকালীন গণতান্ত্রিক বোধ আর আদর্শের অপমান তো হচ্ছেই।

এবার নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন পক্ষ আর বিরোধী পক্ষ  যেভাবে নিজেদের প্রকাশ করছেন তাতে মনে হয় ক্ষমতার মধু পানের নেশায় সবাই আদর্শ আর বিবেক বিসর্জন দিয়েছেন।

এদেশের মানুষ সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় সময় পার করছে এখন। কোনো পক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে যেখানে আস্থা রাখা যায়।

রাজনৈতিক পক্ষগুলোর লক্ষ্য তো থাকবেই ক্ষমতার মসনদে বসার। এ কারণে যে যার মতো করে কৌশল ব্যবহার করবে। কিন্তু দল অন্তপ্রাণ মানুষ ছাড়া অসংখ্য সাধারণ ভোটার এখন অন্ধকার হাতড়ে বেড়াচ্ছে।

কোনো দলের আধিকারিকদের নীতি পছন্দ না করলেও সংকটের সময় ঐতিহ্য ও আদর্শকে সম্মান জানিয়ে ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। পূর্ব সময়কালের কথা বাদ দিলেও পরপর দুই কালপর্বজুড়ে সরকারে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব।

অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এ সময়ে যতটা হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তরকালে ততটা হয়নি। এটি শেখ হাসিনা সরকারের একটি বড় সাফল্য।

কিন্তু এমন সাফল্য থাকার পরেও দৃশ্যত দুর্বল প্রতিপক্ষের সামনে অনেকটা যেন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। তা তাদের অস্থির আচরণ থেকেই অনুমান করা যায়।

সম্ভবত সুশাসন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং নিজ ভুবনের চারপাশে দুর্নীতিবাজ ও লোভী মানুষদের দাপটে চলা মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে সরকার ও সরকারি দলের নেতৃত্বকে। তাই নির্বাচনে বিরোধী পক্ষের চ্যালেঞ্জ ভাবিয়ে তুলেছে তাদের।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা পেয়েবসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নির্বাচনের রেসে টিকে থাকার জন্য আদর্শচ্যুত হতেও দ্বিধা করেননি।

তাই রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসার শোকরানা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে হেফাজতে ইসলামীর সঙ্গে হাত মিলালেন।

ক্ষমতার মধুর টানে ভুলে গেলেন ২০১৩-এর শাপলা চত্বরের হেফাজতি আচরণ। সে সময় বেগম জিয়া হেফাজতিদের সহায়তা করার জন্য নগরবাসীদের আহ্বান করেছিলেন।

এর কম সমালোচনা করেননি আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের নেতা নেত্রীরা। এ হেফাজত ১৩ দফা দাবিতে নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে হুঙ্কার তুলেছিল।

সেই হেফাজত আলেম-নেতারা নারী নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দিয়ে কাছে টেনে নিয়েছেন। হয়তো এতদিনে তাদের আত্মোপলব্ধি হয়েছে।

কলেজ শিক্ষক আমার এক ছাত্রীর ভাষায় টক তেঁতুল এখন মিষ্টি হয়ে গেছে। অন্যদিকে হেফাজতিদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য  যে কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন রয়েছে সেই শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো ধাপ না মেনে এদের সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির মর্যাদা দিয়ে দেয়া হয়েছে।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে সরকারযন্ত্রের ইচ্ছামাফিক ডিগ্রি বিতরণ করা যায় কিনা সে প্রশ্ন তো থেকেই যাচ্ছে। অতীতেও নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মৌলবাদী দল ও যুদ্ধাপরাধীদের কাছে ধরনা দেয়ার ইতিহাস আছে।

এ নিয়ে অতীতেও সমালোচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা। সরকার এতটাই ক্ষমতাবান যে হেফাজতের শোকরানা অনুষ্ঠান নির্বিঘœ করতে চলমান ছোটদের পাবলিক পরীক্ষাও এক ঘোষণায় স্থগিত করেছে।

ভোটের কৌশল করতে গিয়ে দলীয় আদর্শ ও বিবেকের এমন মৃত্যু ইতিহাস কেমন করে ব্যাখ্যা করবে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

বিরোধী শিবিরেও আদর্শহীনতার চর্চা কিছুমাত্র কম হচ্ছে না। ২০১৪-এর নির্বাচনী ট্রেন মিস করার পর থেকে ক্রমে বিপন্ন দশায় পৌঁছে গিয়েছিল বিএনপি।

জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্ভরশীল বিএনপি জামায়াতের সংকটদশায় আরও অসহায় হয়ে পড়ে। এরপরও কোনো এক দুর্বোধ্য কারণে নিবন্ধন হারান জামায়াতে ইসলামীকে জোটমুক্ত করতে পারেনি বিএনপি।

নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যখন ঘর গোছাচ্ছিল তখন নতুন করে আশায় বুক বাঁধেন কয়েকটি ক্ষুদ্র দলের নামি নেতারা। এরা বুঝতে পেরেছিলেন নির্বাচনী পুলসিরাত পাড়ি দেয়া বর্তমান সামর্থ্যে তাদের দলের পক্ষে সম্ভব নয়।

অথচ সারাজীবন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেও তেমনভাবে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া গেল না! এবার তারা ঐক্যফ্রন্ট করলেন বিএনপির সঙ্গে। শুরুতেই ঐক্য করার আগে দাবি ছিল বিএনপির ২০ দলীয় জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দিতে হবে।

বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে জামায়াত এমনভাবে বাঁধা পড়ে আছে যে দলটিকে বিএনপির পক্ষে অঙ্গচ্যুত করা সম্ভব নয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় অন্তরে কী আছে জানি না, তবে বাহ্যিকভাবে জামায়াতকে না ছাড়ায় বিকল্পধারা ঐক্যফ্রন্টে যোগদান থেকে বিরত থাকে। সাবেক বিএনপি হলেও ঐক্যফ্রন্টের নেতা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ দৃঢ়তার জন্য নন্দিত হয়েছেন।

অন্যদিকে সাবেক আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট  নেতারা জামায়াত-যুক্ত বিএনপির সঙ্গে অবলীলায় হাত মিলিয়ে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তুলেছেন। আমার মতো বিস্মিত দেশবাসী উপলব্ধি করেছে ক্ষমতার মধু আসলে কত মিষ্ট।

শ্রদ্ধেয় ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আর মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো সুপরিচিত নেতারা যদি বলতেন ‘গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসানের জন্য তারা ঐক্যজোট গঠন করেছেন’, তাহলে মানুষ একটি যুক্তি বা বক্তব্যের সারবত্তা খুঁজে পেত।

কিন্তু একদা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এসব শ্রদ্ধেয় নেতা গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদী বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে চাইলেন কোন হিসেবে তা বোধগম্য হল না।

বঙ্গবীর থেকে শুরু করে অন্য নেতারা যুদ্ধাপরাধী দলের সংস্রব অবলীলায় মেনে নিতে পারলেন! বঙ্গবন্ধুকে খাটো করে এবং ইতিহাসকে অস্বীকার করে যে দল জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানাল তাদের সঙ্গে হাত মিলালেন!

১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডকে আড়াল করার জন্য যে দল তাদের দলনেত্রীর বিশেষ এক জন্মদিন আরোপ করল- কোনো প্রশ্ন না করেই তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেন!

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারীদের সঙ্গে যুক্ত হলেন! তাহলে সাধারণ মানুষ কেমন করে অঙ্ক মেলাবে যে গণতন্ত্র রক্ষা এবং মানুষের ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন? নিজ অস্তিত্ব হারিয়ে স্বর্ণলতা হয়ে অন্য গাছে জড়িয়ে গেলে এর আর স্বকীয়তা কী থাকে!

সেদিন দুঃখ পেলাম আমার পছন্দের মানুষ মাহমুদুর রহমান মান্নার বক্তব্য টেলিভিশনে দেখে। খালেদা জিয়ার কারাগারে দুর্দশার কথা জানিয়ে এবং তার মুক্তির জন্য যেভাবে আবেগঘন কণ্ঠে এবং ক্ষোভের সঙ্গে বক্তব্য রাখলেন তেমনটা আমি কোনো বিএনপি নেতার কণ্ঠেও শুনিনি।

বিএনপির চেয়েও বড় বিএনপি হয়ে গেলে এমনভাবে বলা সম্ভব। ঐক্যজোটের একজন শরিক নেতার এমন পারফরম্যান্স আমাকে বিস্মিত করেছে। একই পারফরম্যান্স ঐক্যফ্রন্টে সদ্যযুক্ত বঙ্গবীরও দেখালেন দেখতে পেলাম। প্রকৃত বাস্তবতা বুঝতে না পেরে কিছুটা গোলকধাঁধায়ও ভুগছি এখন।

রাজশাহীর জনসভায় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না। আমি বুঝতে পারছি না তাহলে সংলাপ, ওঠাবসা- এসব কেন? এমনিতেই সাত দফায় ক্ষমতার সিঁড়ি খোঁজা ছাড়া জনগণের জন্য কোনো দফা নেই- তাহলে শুরু থেকে নেত্রীমুক্তির একদফা নিয়েই আন্দোলন হতে পারত।

আমার ঐক্যফ্রন্টের সম্মানিত নেতাদের কাছে সবিনয়ে জানতে ইচ্ছা করে রাজনৈতিক নেতানেত্রীর কি অপরাধ থাকতে পারে না? তাদের কি স্খলন ঘটে না?

আর যদি বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে এটি নিছক হয়রানি মামলা হতো তাহলে গোড়াতেই বিএনপি নেতারা এ মামলা মেনে নিলেন কেন? মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন না কেন?

বরঞ্চ আসামি-ফরিয়াদি যেভাবে লড়ে তেমনি করে বছরের পর পছর শুনানি হল। সবশেষে তো রায় হবেই। রায়ে সন্তুষ্ট হল না বিএনপি। এখন ঐক্যফ্রন্টের বন্ধুরাও।

বিএনপির যে রায় পছন্দ তাই যদি আদালতকে দিতে হয়, তাহলে আর আইন আদালত, বিচার আচারের দরকার কী! বিএনপি পক্ষ আদালতকে তুচ্ছজ্ঞান করে বলেছে এ রায় সরকার নির্দেশিত রায়!

তা হলে তো যুক্তির খাতিরে বলতে হয় উল্টোটি হলে কি তা হতো বিএনপি-নির্দেশিত রায়? এখন তো দেখছি আদালত শুধু সাধারণ মানুষের জন্য, রাজনীতিকদের জন্য নয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে।

এভাবে আমাদের সব দলের নেতারাই ক্ষমতার মধু আস্বাদনের লোভে যেন দলীয় আদর্শ ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে বসে আছেন। তবু ভালো সব দাবি, শর্ত না মানলেও নির্বাচনে না যাওয়ার হুমকি প্রত্যাহার করে বেলাশেষে সুবোধ নাগরিকের মতো ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

এখন সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছেন দলীয় বৃত্তে না থাকা সাধারণ মানুষ। তাদের কাছ থেকে একে একে সব বিকল্প যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অচল হয়ে যাচ্ছে দলীয় কেতাবী আদর্শ।

প্রায়োগিক ক্ষেত্রে যে ‘আদর্শে’র প্রকাশ ঘটাচ্ছেন আমাদের নানা ঘরানার নেতানেত্রীরা, তাতে কোন দলীয় দর্শন বিবেচনায় মুক্ত বিবেকের মানুষ ভোট দেবেন? সবচেয়ে দুর্ভাগ্য, আমাদের ক্ষমতার মধু অন্বেষী ছাড়া নিরেট দেশপ্রেমী মানুষদের সমন্বয়ে দৃশ্যত একটি বিকল্প পক্ষ এদেশে গড়ে উঠল না।

জয়-পরাজয় ভেবে নয়, অন্তত সুপাত্রে ভোট দেয়ার স্বস্তিটুকু নিতে পারতেন তখন ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত  তো ভোট দিতেই হবে। আওয়ামী লীগ অন্তপ্রাণ আমার এক নিকট আত্মীয় মুষড়ে পড়েছেন তার প্রিয় দলের হেফাজতের কাছে নতজানু হওয়ার দিনে।

তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পছন্দ হলে ব্যক্তি প্রার্থীকে ভোট দেবেন, নয়তো ভোট দানে বিরত থাকবেন। দলীয় প্রতীক তাকে তেমনভাবে টানবে না এবার। আর সাবেক ছাত্রদল কর্মী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার দল নির্বাচনে এলেও ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করেছেন।

আসলে এবারের নির্বাচন নিয়ে অনেকের মধ্যেই যেন অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে। নির্বাচনের মাঠে আমাদের বাকপটু নেতানেত্রীগণ এসব বাস্তব অবস্থা নিয়ে কি ভাবছেন?

লেখক ঃ অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

॥ শেখর দত্ত ॥

নির্বাচন উৎসবে মুখোমুখি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে হবে কিনা, এ নিয়ে একটা সংশয় তো ছিলই। তবে রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে এমনটা ধারণা করা গিয়েছিল যে, বিএনপি এবারে নির্বাচনে অংশ নেবে। অংশ না নিয়ে কি-ই-বা করতে পারত বিএনপি? গতবারের অভিজ্ঞতায় যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে জ্বালাও- পোড়াও করতে নামাটা বিএনপির পক্ষে যেমন রাজনৈতিক দিক থেকে সম্ভব ছিল না, তেমনি তা করার মতো মেকানিজম গড়ে তোলারও সামর্থ্যও ছিল না। বিএনপির মূল দাবি ছিল তিনটি। খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দেয়া এবং শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার গঠন করা। এ তিনটি বা এর কোনো একটি দাবি গণবিক্ষুব্ধ তীব্র ও ব্যাপক আন্দোলন ছাড়া আদায় করা আদৌ সম্ভব ছিল না।

পত্রপত্রিকা পাঠে জানা যায়, সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের মূল দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন পাঁচটি প্রশ্ন করেন- তখন দাবির পক্ষে যৌক্তিকতা উত্থাপন করে কোনো উত্তর দেয়া ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। দাবির যৌক্তিকতা ছাড়া দলীয় নেতাকর্মী ও জনগণ কখনো রাস্তায় নামে না। এ কারণেই বিএনপি জনগণ দূরে থাক, দলীয় নেতাকর্মীদের পর্যন্ত রাস্তায় নামাতে সক্ষম হয়নি। আর এটাও ধরে নেয়া যায়, উল্লিখিত মূল দাবিগুলো সংবিধান ও বিচার বিভাগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকায় এবং দাবির পক্ষে বিএনপি যথাযথ যুক্তি তুলে ধরতে না পারায় প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপও সরকারের ওপর বিএনপি ফেলতে পারেনি।

ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। নিবন্ধন ঠেকাতে মূল দাবির একটিও না মানা সত্ত্বেও অনন্যোপায় হয়ে বিএনপি নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়েছে। গতবার নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে বিএনপি সরকারের কাছ থেকে ছাড় পেয়েছিল, তবুও নিজের ওজন বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এবারে কিছু না পাওয়া সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কেবল তা-ই নয়, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বিএনপিকে দলের মূল রাজনীতির প্রশ্নে বিশাল ছাড় দিতে হয়েছে। তবে লক্ষ করার মতো বিষয় হচ্ছে, বিএনপি ডান হাতে ধরে রেখেছে যুদ্ধাপরাধী ও অনিবন্ধিত জামায়াত তথা ২০ দলীয় জোট এবং বাম হাতে ধরে রেখেছে আওয়ামী লীগের দলছুটদের নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ভোটপর্বে বিএনপির কাছে জামায়াত হচ্ছে সাথী আর দলছুট আওয়ামী লীগাররা হচ্ছে ছাতি। সাথী দিবে অতীতের মতো ভোট আর ছাতি অতীতের দুষ্কর্মের চোট থেকে করবে রক্ষা। প্রকাশ্য প্রচারে নামাবে দলছুটদের আর ভেতরে ভেতরে কাজে নামাবে জামায়াতকে। এই বিবেচনায় বলতেই হবে, দলছুট আওয়ামী লীগাররা সুযোগ করে দেয়ায় দুই পা পিছিয়ে বিএনপি নির্বাচন পর্ব পার করার বেশ ভালো কৌশল নিয়েছে। যদি দুই হাতে ধরা দুই জোটের দলগুলোকে আসন দিয়ে সন্তুষ্ট করতে, বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে এবং প্রচারে ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর যদি কাজে লাগাতে পারে, তবে মনে হয় ব্যালট বাক্সে ভালো চ্যালেঞ্জের মধ্যে বিএনপি ফেলতে পারে আওয়ামী লীগকে।

অবশ্য এটা ঠিক যে, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নির্বাচনী পর্ব পার করার মতো বহু কিছু রয়েছে আওয়ামী লীগের হাতে। প্রসঙ্গত, পঁচাত্তরের পর হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক শাসনের পর্ব পার হয়ে ১৯৯১ সালে দেশে সাংবিধানিক গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ২৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ২ বছর ছিল ১/১১-এর জরুরি আইনের আর্মি ও নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল সমাজ ব্যাকড ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিনের অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর বাকি ২৫ বছর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দুই টার্মে ১০ বছর এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তিন টার্মে ১৫ বছর দেশ শাসন করেছে।

এটা তো ঠিক যে, বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য ও খবর আদান-প্রদান বেড়ে চলেছে, তাতে মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা যথেষ্ট বেড়েছে। আর ঘা খেতে খেতেও মানুষের খুব একটা কম অভিজ্ঞতা হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে মানুষ কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটানা ১০ বছরসহ ১৫ বছরের শাসনকালের ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর (ক্ষমতায় থাকার ফলে নানাবিধ কারণে জনগণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া) যেমন বিবেচনায় নিবে তেমনি দুবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার ১০ বছরের শাসনামলও বিবেচনায় নিবে।

অতীত স্মরণে এনে এটা বোধকরি সবাই স্বীকার করবেন যে, পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে ১৯৯১ সালে যখন জাতি নবপর্যায়ে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় শামিল হয়, তখন দুই দলের মধ্যে সংগঠন শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ ছিল বিএনপির চাইতে এগিয়ে, উল্টো দিকে তখন রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দিকটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা না হওয়ায় ইমেজের দিক থেকে দুই নেত্রীর মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন এগিয়ে। আজ ২৭ বছর পর পরিস্থিতি একেবারেই পাল্টে গেছে। রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় শেখ হাসিনা স্টার মার্ক  পেয়েছেন আর খালেদা জিয়া স্কুল জীবনের মতো পাস করতে পারেননি। এটাই তো ঠিক যে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বেশি বেশি করে শোনা যেত, আওয়ামী লীগের অবস্থা মুসলিম লীগের মতো হয়ে গেছে আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না, দল হয়ে যাবে ছত্রখান। যতটুকু মনে পড়ছে, নির্বাচনে পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা দল থেকে পদত্যাগপত্রও দিয়েছিলেন।

আর এখন! রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে, ছলে-বলে-কৌশলে মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পূর্ববাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান বানাতে গিয়ে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল আর বিএনপি বাংলাদেশকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বানাতে গিয়ে ধ্বংস হতে চলেছে। যারাই জয় বাংলার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তারাই শেষ হয়ে যাবে। আইয়ুব-ইয়াহিয়া ‘তুলার বস্তার’ মতো বঙ্গোপসাগরে ডুবে গেছে আর খালেদা জিয়াকে এখন জেলের ভাত খেতে হচ্ছে আর পুত্র তারেক জিয়ারও দেশে আসার পথ চিরতরে বন্ধ।

আসলে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায় যেমন ঠিক তেমনি বিরোধী দল হিসেবেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের অস্তঃসারশূন্যতার উদাহরণ হয়ে যাচ্ছেন মা ও ছেলে। এ জন্য অন্য কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সূক্ষ্ণ ও স্থূল কারচুপি অর্থাৎ যে ধরনের নির্বাচনই হোক, ক্ষমতায় তো দুইবার তারা ছিলেনই। কিন্তু দেশের ইমেজ, উপমহাদেশ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শুরু করে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, দেশের উন্নয়ন ও জনগণের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন প্রভৃতি কিছুই করতে পারেনি বিএনপি। উল্টোদিকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের গাড়িতে-বাড়িতে দেশের রক্তস্নাত গৌরবের জাতীয় পতাকা আর ‘হাওয়া ভবন’। যা ছিল ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র; দুর্নীতি-লুটপাট-সন্ত্রাসসহ সব অপকর্ম-দুষ্কর্ম-অপশাসনের পরিচালন-নিয়ন্ত্রণ সেন্টার। পাপ আসলে বাপকেও ছাড়ে না। ফলে কর্মফল সরাসরি ভোগ করতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট জিয়ার উত্তরসূরিদের।

এই দিক বিচারে গণতন্ত্র ও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকার কথা এখন বিএনপির মুখে একটুও মানায় না। দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকাকালীন ১৯৯৬ সালে বিএনপি করেছিল একদলীয় নির্বাচন আর ২০০১ সালে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করতে গিয়ে জরুরি আইনের অসাংবিধানিক শাসনকে ক্ষমতাসীন করেছিল। অপরদিকে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে নির্বিঘœ ও সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে ২০০১ সালে নিরপেক্ষ বলে পরিচিত বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল। কিন্তু প্রথম রাতে বিড়াল মারার ফল পেয়েছিল। পরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাতিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল করেছে গায়ের জোরে কিংবা হুকুমের বলে নয়, সংবিধান ও আদালতের রায় সমুন্নত রেখেই। জামায়াত সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে টেলিফোনে আমন্ত্রণ করেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদ দিতে চেয়েছেন। কিন্তু বিএনপি গেছে বয়কটের লাইনে। এবারেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্র ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থেই সংলাপে বসেছেন এবং এখনো সংলাপের দুয়ার খোলা রেখেছেন।

এটা আজ দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে পদদলিত করে ক্ষমতা কুক্ষিগত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে চায় আর বিরোধী দলে থাকলে অসাংবিধানিক অবৈধ শক্তিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আন্দোলন করে কিংবা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করে ক্ষমতায় যেতে চায়। নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রকে যারা ভূত বানাতে চেয়েছিল, তারা যদি এখন নির্বাচন গণতন্ত্র ইত্যাদি বলে ভূত হওয়ার ভয়ে মুখে ফেনা তুলে, তবে তা হবে ভূতের মুখে রামনামেরই সমতুল্য। সর্বোপরি ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলের উন্নয়ন-সমৃদ্ধির ধারাকে কীভাবে বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি-লুণ্ঠনের সাগরে নিক্ষেপ করেছিল, তা  দেশবাসীর কাছে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট। দেশবাসী এখন মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনি এমনি তো আর অর্থনীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট ‘ক্ষমতাসীনদের কঠোরতার ওপর নির্ভর না করলেও চলবে’ মন্তব্য করে লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নানা দিক থেকেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল  গড়ে ৬.৩ শতাংশ। গত বছর তা ৭.৩ শতাংশ হয়ে ভারত ও পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। মোট দেশজ উৎপাদনেও (জিডিপি) বাংলাদেশ অনেকখানি এগিয়ে গেছে। শিশুমৃত্যুর হার কমানো, মাধ্যমিকে ভর্তির হার ও গড় আয়ু বৃদ্ধিসহ অনেক দিক দিয়ে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে গেছে।’

এই প্রেক্ষাপটে ইনকামবেন্সি ফ্যাক্টর নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগের চাইতে বিএনপিকে ভোগাবে বেশি। কি উত্তর দিবে বিএনপি বিগত সময়ের নির্বাচন বয়কটের! আগুন সন্ত্রাসের! সংসদীয় গণতন্ত্রে ভোটের সময় জেতার পর দলীয় নেতা কে হবেন তা তুলে ধরতে হয়। কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রজেক্ট করবে বিএনপি! খালেদা জিয়ার নামে অফিস থেকে নির্বাচন করার ফরম কেনা যায়, কিন্তু বাস্তব সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক কথায় মূল বিষয়টা এখনো বিএনপির থেকে যাচ্ছে অমীমাংসিত। তদুপরি আদালতের রায়ে দন্ডপ্রাপ্ত আসামির কার্যকরী চেয়ারপারসন না থাকতে পারার বিষয় তথা গঠনতান্ত্রিক সমস্যার দিকটি এখনো সমাধান করেনি বিএনপি। নির্বাচনের সমতল মাঠ  তৈরির ক্ষেত্রে দলটি নিজের দিক থেকে নিজেই আছে বেশ পিছিয়ে। তাই সাথী ও ছাতি ঠিক রেখে বিএনপি কতটা শক্তি সঞ্চয় করে নির্বাচনী মাঠে নামতে পারে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন!

এখন বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই আছে মনোনয়ন প্রক্রিয়ায়। নিজ নিজ দলের প্রার্থী ঠিক করা, জোটকে সিট ছেড়ে দেয়া প্রভৃতি প্রশ্নে বিএনপি কতটা বিপদে পড়বে, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোট এক জায়গায় পড়ায় বিএনপির এদিক থেকে ঝামেলা কম। কিন্তু এসব ব্যাপারে আওয়ামী লীগকে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়। দল বা জোটের প্রার্থীকে ‘সাইজআপ’ করতে অতীত অভিজ্ঞতায় আওয়ামী লীগ অনেকটাই এগিয়ে আছে। আওয়ামী লীগই আওয়ামী লীগের শক্র-কথাটা কি এবারে আরো পোক্ত হবে নাকি কাটিয়ে উঠতে পারবে?

ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে একশ আসন দাবি করেছে। যুক্তফ্রন্টসহ নতুন নির্বাচনী সাথীদেরও আসন ছাড়তে হবে। এই অবস্থায় খোদ ঢাকা শহরে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়েছে। তাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ইতোমধ্যে দলীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করার সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে কথা আছে যে, বিএনপির নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ  মোকাবেলা করার চাইতে আওয়ামী লীগের পক্ষে ঘরের চ্যালেঞ্জ  মোকাবেলা করা শক্ত। ইতিহাসের এটাই অভিজ্ঞতা যে, সুন্দর বাইরেটা অনেক সময়েই যায় অগোছালো ঘরে হারিয়ে। কি হবে তা সময়েই বলে দিবে? দশ বছর পর জনগণের নির্বাচনী উৎসব শুরু হয়েছে। কোন দল-জোট বিজয়ের হাসি হাসবে, তা নির্বাচনী উৎসবের ভেতর দিয়েই শেষ পর্বে স্থিরিকৃত হবে।

লেখক ঃ রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

॥ ড. এম এল আর সরকার ॥

নির্বাচন বল বল খেলা নয়

নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে যে সংলাপ বা কথাবার্তা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে- দেশে এখন এক ধরনের বল খেলা চলছে। এটি হতে পারে ফুটবল, পিংপং বল বা অন্য কোনো বল। খেলছে আমাদের দেশের দুই রাজনৈতিক জোট। আইনের কাছে বা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অনেকটা নিরুপায় হয়েই এ খেলা পরিচালনা করার চেষ্টা করছে নির্বাচন কমিশন। এ খেলা অধীর হয়ে দেখছেন দেশের নিরুপায় মানুষ। দর্শক কেউ কেউ ভাবছে ‘এ-দল’ গতবার ভালো খেলছে; অতএব তাদের এবারও জিততে দিতেই হবে। এক্ষেত্রে ‘এ-দল’ যদি কিছু ফাউল করে বা রেফারির যদি অন্যায়ভাবে তাদের কয়েকটি পেনাল্টি দেয়, তাতেও কোনো সমস্যা নেই।

অন্যদিকে কিছু দর্শক মনে করছে ‘বি-দল’ গতবার মাঠে ছিল না বলেই ‘এ-দল’ এত গোল করতে পেরেছিল। এবার ‘এ-দল’কে ফাঁকা মাঠে গোল করতে দেয়া হবে না। খেলা শুরু হওয়ার আগেই ‘বি-দল’ রেফারিকে বারবার বলছে, আমাদের খেলার মাঠে নিশ্চিন্তে খেলতে দিতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ‘এ-দল’কে পেনাল্টি দেয়ার চেষ্টা করলে ফল হবে ভয়াবহ। ‘এ-দল’ যাতে বারবার ফাউলের মাধ্যমে ‘বি-দলের’ খেলোয়াড়দের আহত করে মাঠ থেকে বের করে না দিতে পারে, সে ব্যাপারে রেফারিকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বলছে। ‘বি-দলের’ আরও দাবি হচ্ছে- মাঠে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে; যাতে করে ‘এ-দলের’ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তাদের ক্যাডার-দর্শকরা মাঠে ঢুকে গোল দিতে না পারে। ‘বি-দলের’ খেলোয়াড়রা ভীতু এ কারণে যে, অতীতে তাদের ক্যাডার-সমর্থকরাও এভাবে মাঠে ঢুকে তাদের পক্ষে গোল দিয়েছিল।

আমরা দর্শক, খেলা দেখব এবং সমর্থন দেব। ফাউল-পেনাল্টি বা বহিরাগতদের গোলে যেভাবেই হোক না কেন, এক দল খেলায় জিতবে। সঙ্গত কারণেই পরাজিত দল এ পরাজয় মেনে নেবে না। ফল-কিছু মারামারি, সাধারণ মানুষের সম্পদের ক্ষতি এবং কিছু অমূল্য জীবনহানি। তারপর আর কী? কিছু আশ্বাস, কিছু বিশ্বাস এবং কিছু ‘আগামীর আসা’। কিন্তু সেই শুভ আগামী আর আসে না। বারবার আমরা অতীতের কাছেই ফিরে যাই। এর শেষ কোথায় এবং কীভাবে, তা আমরা জানি না; খুঁজি না, খুঁজতে চাই না এবং মানি না, মানব না। আমরা শুধু একটাই জানি ও মানি, তা হচ্ছে- গোল এবং সেটা আমাকেই দিতে হবে; তাতে প্রয়োজনে অন্যায়ভাবে ফাউল, পেনাল্টি এবং তা সমর্থকদের মাধ্যমে হলেও কোনো সমস্যা নেই। প্রয়োজন একটি বিজয় এবং তা থেকে ক্ষমতা।

পাঠক হয়তো ভাবছেন, রাজনীতি বলতে হয়তো আমি এটিই বোঝাতে চেয়েছি। কিন্তু আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই- বলখেলার নাম রাজনীতি নয়। রাজনীতি হচ্ছে নীতির খেলা। এ খেলায় বিদ্যমান দলগুলো প্রতিপক্ষকে পরাজিত করবে জনগণ ও দেশের কল্যাণার্থে প্রদত্ত তাদের নীতির উৎকর্ষ দ্বারা। গায়ের জোর, ভোটচুরি, টাকার খেলা, গ্রেফতার, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, বিদেশিদের কাছে নালিশ বা সমর্থন চাওয়া অত্যন্ত অশোভনীয়, অপ্রয়োজনীয়, বেমানান এবং জাতির জন্য তা বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে রাজনীতির নামে চলছে বলখেলাখেলি। পাঠকের প্রশ্ন থাকতেই পারে, রাজনীতির নামে কেন বলখেলা খেলছে এ দুটি জোট? উত্তরটি হচ্ছে- আমাদের দেশের মানুষের মঙ্গল বা সমস্যা সমাধানের জন্য যে ভিশন বা মিশন প্রয়োজন, তা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী এজেন্ডায় নেই। তারা নির্বাচনী বক্তব্য দ্বারা মানুষকে আশান্বিত বা উদ্বুদ্ধ করতে পারছে না। তাদের এজেন্ডায় বা দফায় আছে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা বা আশা। এখানে জনগণের সমস্যা সমাধানের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। জনগণের কাছে তাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য বলেও মনে হচ্ছে না। জনগণ অনেকটা বাধ্য হয়েই হয় এদিক, না হয় ওদিক ভোট দেবে- এটি জোটনেতারা ভালো করেই জানেন।

ফলে এ খেলায় শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোট এ মুহূর্তে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলকে বা কিছু দলছুটকে অথবা একজন মানুষের যে দল, তাকেও দলে নেয়ার চেষ্টায় উদগ্রীব। তাদের ধারণা, এ লোকগুলো তাদের পক্ষে কথা বললে গ্রামের নিরীহ মানুষগুলো তো বটেই, আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত বলি; তারাও কিছু বুঝে বা না বুঝে অমুক মার্কা-তমুক মার্কা বলে বলে চিৎকার করবে এবং তাদের ভোটের গোল করতে সহায়তা করবে। এ গোল করে জিততে পারলেই ৫ বছরের জন্য অফুরন্ত ক্ষমতা।

ক্ষমতা ছাড়া জনগণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই। এটি পেলে প্রথম চেষ্টা হচ্ছে, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা এবং প্রয়োজন মোতাবেক নিজের আখের গোছানো। এরপর তারা ভেবে দেখেন, জনগণের জন্য কিছু করা যায় কিনা! যদি দয়াবশত তারা কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করেন, তবে তা থেকে তারা ও তাদের লোকেরা এত বেশি লাভের চেষ্টা করেন; সেই কাজ শেষ পর্যন্ত অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যায়। এই তো হচ্ছে আমাদের হালের রাজনীতি। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনের জন্য দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল, দেশের বর্তমান বিদ্যমান বহুবিধ সমস্যা; এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য সমস্যা হচ্ছে নিম্নরূপ-

প্রথমত, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা; দ্বিতীয়ত, সর্বস্তরে ঘুষ-দুর্নীতি, যার নমুনা কয়েকদিন আগে একজন জেলারের থলে থেকে বের হয়েছে; তৃতীয়ত, শত শত নামকাওয়াস্তে সার্টিফিকেটধারী উচ্চশিক্ষিত বেকার সমস্যা, যারা বের হচ্ছে কোনোরূপ পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো ছাড়াই গড়ে ওঠা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, অনেকটা বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভবিষ্যতে বের হবে রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কওমি মাদ্রাসাগুলো থেকে; চতুর্থত, নির্বিচারে বিদেশি ঋণ গ্রহণ এবং প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজ দীর্ঘায়িত করে অতিরিক্ত কয়েকগুণ টাকা ব্যয় করা; পঞ্চমত, লাখ লাখ মামলাজট দূর করা এবং পুলিশকে রাজনীতির হাতিয়ার না করে জনগণের বন্ধু হিসেবে পরিণত করা; ষষ্ঠত, ট্যাক্স ফাঁকি, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার এবং মাদক চোরাচালান; সপ্তমত, দেশের স্বার্থবিরোধী বিদেশি আগ্রাসন এবং অষ্টমত, প্রতিহিংসার রাজনীতি।

দুটি প্রধান জোটের অন্যতম আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী সভায় বারবার বলছে- উন্নয়ন, উন্নয়ন এবং উন্নয়ন। এটি কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই, শেখ হাসিনার সরকার দেশের ব্যাপক উন্নয়ন করেছে; কিন্তু আমাদের ঋণের বেড়াজাল এবং দুর্নীতিও অস্বীকার করার উপায় নেই। আরও অস্বীকার করার উপায় নেই- শত ব্যর্থতার পরও অর্থমন্ত্রী এবং নৌপরিবহনমন্ত্রীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্য। অর্থমন্ত্রী যতই মাননীয় হোন না কেন, ব্যাংক এবং শেয়ারবাজার রক্ষায় তার ব্যর্থতা কোনোভাবেই আড়াল করার উপায় নেই। অন্যদিকে নৌপরিবহনমন্ত্রীর কর্মকান্ড নিয়ে জনঅসন্তুষ্টির কথা সর্বজনবিদিত। একজন মন্ত্রী বা ব্যক্তি যতই শক্তিশালী বা শ্রদ্ধার পাত্র হোক না কেন, রাষ্ট্র তার কাছে কোনো দিনও পরাজিত হতে পারে না। অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের ভালো কাজগুলো ম্লান হয়েছে এ দুই মন্ত্রীর ব্যর্থতায়।

উন্নয়নের কথা বলে প্রধানমন্ত্রী আবারও ভোট চাচ্ছেন। ধরে নিলাম, ভোট আপনার প্রাপ্য; কিন্তু আবার ক্ষমতায় এলে দেশের ব্যাংকগুলোর কী হবে এবং পরিবহন ব্যবস্থার জন্য আপনি কী করবেন? আপনার নির্বাচনী প্রচারে এ বিষয়গুলো পরিষ্কার না হলে জনগণ কোন ভরসায় আপনাকে আবারও ভোট দেবে? শুধু তাই নয়, উপরের যে আটটি সমস্যার কথা বলা হয়েছে, তা সমাধানের জন্য আপনার সরকার ভবিষ্যতে কী কী পদক্ষেপ নেবে; এটাও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। না হলে জনগণকে শুধু উন্নয়নের দোহাই দিয়েই ভোট পাওয়া যাবে কিনা, এতে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। জনগণ উন্নয়ন চায়, উন্নয়নের সঙ্গে সুশাসন চায়। চায় দুনীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিকল্পনা; কিন্তু দেখতে চায় না ব্যক্তিস্বার্থে দেশের সর্বনাশ!

এবার আসি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কথায়। মোটকথা, তারা মূলত খালেদা জিয়ার মুক্তি, ক্ষমতার পরিবর্তন, স্বৈরশাসন বন্ধ এবং ক্ষমতা চায়। খালেদা জিয়ার প্রসঙ্গ বাদ দিলাম। বয়স হয়েছে, তাই মুক্তি পেলে কী এমন ক্ষতি! কিন্তু ক্ষমতা পেলে আপনারা আসলে দেশের জন্য কী করবেন, তা কি কখনও কোথাও বলেছেন? শুধু বলেছেন- গণতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং গণতন্ত্র। হ্যাঁ, গণতন্ত্র ভালো জিনিস। কিন্তু গণতন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচিত ক্ষমতাবানরাই তো আস্তে আস্তে স্বৈরশাসন শুরু করে।

আপনারা নির্বাচিত হলে কেমন করে স্বৈরশাসন বন্ধ হবে? আবার হাওয়া ভবন হবে না এবং বিদ্যুতের পরিবর্তে শুধু খাম্বা বিক্রি করবেন না বুঝলাম। কিন্তু ড. কামাল ভবন শুরু হবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? ড. কামাল হোসেন, আপনার আশপাশের লোকগুলো অত্যন্ত সুযোগসন্ধানী। দেখুন না, কাদের সিদ্দিকী কতদিন সময় নিয়ে, ভেবেচিন্তে, লাভক্ষতির হিসাব কষে তারপর আপনার সঙ্গে যোগ দিলেন! একবার ভেবে দেখুন তো, ক্ষমতা পেলে যেসব লোক আপনার আশপাশে আছে; তাদের আপনি কী করে সামলাবেন? তারপর কথা হচ্ছে- এতদিন পর এখন আপনি নিজেই খালেদা জিয়ার মুক্তি চাচ্ছেন; কিন্তু তারেক জিয়ার কথা কিছুই বলছেন না। এখন বলুন তো, আপনার জোট ক্ষমতায় এলে আপনি তারেক জিয়ার জন্য কী করবেন?

সবচেয়ে বড় কথা, দেশের জন্য ঐক্যফ্রন্ট আসলে কী করবে, তা মনে হয় আপনাদের চিন্তাতে নেই। যদি থাকত, তা হলে উপরের আটটি সমস্যার কথা না হয় বাদই দিলাম; ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, স্বৈরশাসনের অবসান, পরিবারতন্ত্র বন্ধ ইত্যাদি বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন- তার তো অন্তত একটি রূপরেখা আপনারা দিতেন বা দিতে পারতেন! কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য- দেশের সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা তো দূরের কথা, ক্ষমতায় এলে কে দেশ পরিচালনা করবে, সে বিষয়েও মনে হয় আপনাদের মধ্যে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কী সংলাপ, কী জনসভা- সবখানেই শুধু আপনারা বলে চলছেন দফার পর দফা। বিশ্বাস করুন, কিছু অত্যন্ত দলকানা লোক ছাড়া কেউ বুঝতে পারছে না আপনাদের ভোট দিলে দেশের কী পরিবর্তন হবে? আর আপনাদের উদ্ধার করা গণতন্ত্র দিয়ে মানুষ কী করবে!

পরিশেষে দুই জোটের কাছেই অনুরোধ- দেশ ও জনগণের কল্যাণার্থে একটি সমঝোতায় উপনীত হোন। দেশের জন্য আপনাদের সফলতা এবং ব্যর্থতার কথা মানুষকে বলুন। ব্যর্থতার দায়ভার গ্রহণ করুন এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায় নির্ধারণ করুন। দেশের বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধানে জনগণের কাছে আপনাদের পরিকল্পনা তুলে ধরুন। জনগণকে তাদের মতামত দিতে দিন। জনগণ খেলার বল না যে, আপনারা যেদিকে যেভাবে খুশি ছুঁড়ে দেবেন।

জনগণ একটি শক্তি। এ শক্তিকে যে অবহেলা করেছে বা করবে, তার পরাজয় একদিন হবেই। অনুগ্রহপূর্বক অতীত ভুলে, হিংসা হানাহানি ভুলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যান। শুধু ক্ষমতার জন্য এ দেশকে আর পিছিয়ে দেয়ার সময় নেই। কোর্টে বল ছোড়াছুড়ি বন্ধ করুন। আবারও অনুরোধ করছি- এখনও সময় আছে, সম্ভব হলে ক্ষমতার অংশীদারিত্বমূলক একটি সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করুন। এটি না হলে বন্ধ হবে না প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং বন্ধ হবে না প্রতিবার ভোটের আগের এ দেনদরবার।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

॥ মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ॥

নির্বাচনী তফসিলের ভালোমন্দ

নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও গঠনগত ক্রটির কারণে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। কমিশন অঘোষিত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, কমিশনে নিয়োগ দেয়ার জন্য কোনো সরকারই আইন তৈরি করেনি। ফলে সরকারের মনপসন্দ ব্যক্তিরাই কমিশনে নিয়োগ পান। বাহ্যিকভাবে লোক দেখানো সার্চ কমিটি গঠন করা হলেও কমিশনে মতাসীন প্রধানমন্ত্রীর পছন্দসই ব্যক্তিত্বরাই নিয়োগ পান।

মতায় থাকা তিনটি বড় দলের কেউই নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য আইন তৈরি করেনি। এর কারণ হল, প্রতিটি সরকারই চেয়েছে কমিশনে নিজের মনপছন্দ ব্যক্তি বসিয়ে তাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে। বর্তমান ইসিও একই প্রক্রিয়ায় গঠিত হয়েছে। সরকার দুই মেয়াদ মতায় থাকলেও নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করে সে আইনানুযায়ী ইসি গঠন করেননি।

এমনকি এ ইসি গঠনের প্রাক্কালে বিএনপি ইসি গঠনের ব্যাপারে যে ১৩ দফা সুপারিশ দিয়েছিল, তার মধ্যেও সরকারকে এ ল্েয সুনির্দিষ্ট আইন করতে বলা হয়নি। ফলে প্রতি ৫ বছর পরপর ইসি গঠন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করা ও তা জিইয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করা যায়। আর এ কারণে ইসি গঠিত হয় মতাসীনদের ইচ্ছামতো। ফলে ইসির কাজেও ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে।

বর্তমান কমিশন যেভাবে গঠিত হয়েছে সে প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে এ কলামে একাধিকবার লিখেছি। এ কমিশনের পাঁচজনের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব সম্পর্কেও লেখা হয়েছে। আবার অনেক সময় কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা না করে সিইসি একা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে কমিশন সদস্যদের মনকষাকষির খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এমন সময় সরকারপ্রধান বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দু’দফা সংলাপ করেও তাদের দাবিগুলো মানেননি। দু’একটি প্রতিশ্র“তি দিলেও তা পালন করা হয়নি। যেমন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার না করার আশ্বাস দিলেও তা কার্যকর হয়নি।

সমাবেশ করার অনুমতির প্রতিশ্র“তি দিলেও সমাবেশে আসা-যাওয়ার পথে জনগণকে পদে পদে বাধা দেয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনই প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাচন কমিশন বিরোধী ঐক্যফ্রন্টসহ আরও কতিপয় দলের অনুরোধ উপো করে ৮ নভেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। কমিশন চাইলে সংলাপ চলমান রেখে আর কয়েকদিন পর তফসিল ঘোষণা করলে সাংবিধানিক ব্যত্যয় হতো না। কারণ, এ তফসিলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য প্রদত্ত সময় বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করবে।

যেখানে সরকারি দল দীর্ঘদিন থেকে নির্বাচনী কাজকর্ম চালিয়ে আসছে, সেখানে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা অনেকেই জেলে। যারা বাইরে আছেন, তাদের অনেককেই গায়েবি মামলা মোকাবেলায় আদালতে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। কাজেই মনোনয়নপত্র জমা দিতে প্রার্থীদের আরেকটু বেশি সময় দেয়া উচিত ছিল। কারণ, মনোনয়নপত্র জমা দিতে হলে সময় লাগে। কাগজপত্র জোগাড় করতে হয়। অথচ প্রার্থীদের সময় দেয়া হয়েছে মাত্র ১৯ তারিখ পর্যন্ত। এর মধ্যে চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিলে প্রার্থীরা সময় পাচ্ছেন মাত্র সাত দিন, যা প্রার্থীদের জন্য খুবই কম সময়।

তফসিল দেখে মনে হয় না এ কমিশনের অবাধ নির্বাচন করার ইচ্ছা আছে। কারণ, বিভিন্ন ইসির সঙ্গে বিভিন্ন সময় কমিশনের প্রধান অংশীজন রাজনৈতিক দলগুলোর যতবার সংলাপ হয়েছে, প্রতিবারই অধিকাংশ রাজনৈতিক দল রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ইত্যাদি পদে ইসি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে অনুরোধ করেছে। এ কমিশনও যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল, তখন অধিকাংশ দল থেকে এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে এ পরামর্শ যৌক্তিক। কারণ, নির্বাচন সম্পর্কে প্রশাসনের লোকদের চেয়ে যারা সারা বছর নির্বাচনের কাজ করেন, সেসব নির্বাচনী কর্মকর্তা অধিক ওয়াকিবহাল।

প্রশাসনের লোকরা ইসি কর্মকর্তাদের চেয়ে নির্বাচনী জটিলতা নিরসনে কম পারদর্শী। কারণ, প্রশাসকদের ইসি কর্মকর্তাদের মতো সবসময় নির্বাচনের কাজ করতে হয় না। তাছাড়া প্রশাসন এখন দলীয়করণকৃত। সরকারি মতাদর্শে বিশ্বাসী নন এমন প্রশাসকদের অনেক েেত্র ওএসডি করা হয়েছে। প্রশাসকদের পদোন্নতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের আনুকূল্যলাভ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এবারও আমরা এ ধারা ল করেছি। গত এক বছরে প্রশাসনে ব্যাপক হারে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এ রকম পদোন্নতি দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকেও। কাজেই এসব প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে রিটার্নি ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ না দিয়ে ইসির উচিত জেলা ও উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এসব পদে ব্যবহার করা। কেন ইসি এমন কাজ করেনি সে ব্যাখ্যা তাদের দিতে হবে।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে ইসির কর্মকান্ড রহস্যজনক ও নিন্দনীয়। কারণ, এই ইসি ২০১৭ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে দায়িত্বভার গ্রহণ করার কিছুদিন পর প্রকাশ্যে বলেছিল, তারা সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে না। পরবর্তীকালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপেও তারা ইভিএম রাখেনি। কোন রহস্যজনক কারণে নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ার পর তাদের ঘাড়ে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ভূত চাপে তা গবেষণার বিষয়।

সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে কমিশন সভায়ও ইসির পাঁচজন একমত হতে পারেননি। একজন সম্মানিত নির্বাচন কমিশনার এ ব্যাপারে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ইভিএমকে ইসি এখনও হ্যাকগ্র“ফ প্রমাণ করতে পারেনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেও ভালো ফল আসেনি। খুলনা ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করতে গিয়ে ইসিকে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে।

এ অবস্থায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে ইসি কোনো বিশেষ দলকে ডিজিটাল কারচুপিতে সহায়তা করার সুযোগ করে দিতে চায় কিনা তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী কাজী রকিব কমিশন (২০১২-২০১৭) এবং তার পূর্ববর্তী ড. এটিএম শামসুল হুদা কমিশন (২০০৭-২০১২) ইভিএম নিয়ে অনেক মাতামাতি করেও সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করেনি। বর্তমান সিইসি কি নিজেকে পূর্ববর্তী সিইসিদের চেয়েও স্মার্ট প্রমাণ করতে চাইছেন! ময়রা তো বলেই যে আমার মিষ্টি সবচেয়ে ভালো। কিন্তু তার মিষ্টিতে কতটুকু ছানা আছে তা বোঝা যায় ওই মিষ্টির নমুনা নিয়ে যখন অন্য কয়েকজন ময়রাকে দিয়ে পরীা করানো হয়।

সিইসি মহোদয় ইভিএমের প্রশংসা করলেও জনগণ তার কথায় বিশ্বাস করছেন না। তিনি যে ইভিএম ব্যবহার করতে যাচ্ছেন তার কিছু নমুনা যদি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশের ইভিএম বিশারদদের দিয়ে পরীা করাতেন, তাহলে বোঝা যেত সেগুলো হ্যাকপ্র“ফ কিনা। হ্যাকাররা গুগল, ফেসবুক যেখানে হ্যাক করে ফেলছে, সেখানে এই ইভিএম হ্যাক করা যাবে না এ নিশ্চয়তা প্রযুক্তিবিশারদ না হয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা সিইসির দেয়া শোভা পায় না।

আরপিও নিয়ে ইসি যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল, তখন কেবল সরকারি দল বাদে অধিকাংশ দল সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে মতামত দিয়েছিল। গত ১ নভেম্বর থেকে গণভবনে কতিপয় দল ও জোটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ চলাকালে কয়েকটি দল ইসির সঙ্গেও দেখা করে। তাদের অধিকাংশই ইসিকে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করতে অনুরোধ করে। এমনকি সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টিও নির্বাচন কমিশনকে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে মত দেয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সরকারি দল ইভিএম চায়, তাতেই মনে হয় সিইসি কুপোকাৎ।

বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন থেকে ফিরে ৩ অক্টোবর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। আপনি সবচেয়ে প্রিয় জিনিস টাকা মোবাইল ফোনে পাঠাতে পারেন। ভোটটাও আপনার প্রিয় জিনিস, তো ভোটটাও কেন আপনি ইভিএমে দিতে পারবেন না? আমি ইভিএম ব্যবহারের প’ে (বাংলা ট্রিবিউন, ০৩.১০.২০১৮)। তবে যে ইভিএমগুলো নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে তার সমতা বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশারদ দিয়ে পরীা করানো হয়েছে এবং এগুলো হ্যাকপ্র“ফ- এমন কথা প্রশ্নকারী সাংবাদিককে বলতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা নেই, যা সংলাপকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল উল্লেখ করেছে। দলগুলো ইসিকে এমনভাবে কাজ করতে বলেছে যাতে কমিশন জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। কিন্তু ইসি তা করছে না। যে কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৭ দফা দাবিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন দাবি করেছে। এখন নির্বাচন যদি ভালোও হয়, ইসির সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি নির্বাচনকে বিতর্কিত করবে। ভোটারদের মধ্যে শিার হার কম, তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তিসচেতন নন, সেজন্য তারা মেশিনে ভোট দিতে স্বচ্ছন্দবোধ করেন না।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় দেখা গেছে, ভোটারদের বারবার বুঝিয়ে দিলেও তাদের অনেকে মেশিনে ভোট দিতে ভুল করেছেন। তাছাড়া নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী বলবেন, ইভিএমে প্রদত্ত তার প্রাপ্য ভোট অন্য প্রার্থীর অ্যাকাউন্টে চলে গেছে। সরকারি দলের দুই প্রার্থী শামীম ওসমান ও সেলিনা হায়াত আইভির মধ্যে অনুষ্ঠিত নাসিক নির্বাচনে জনাব ওসমান বলেছিলেন, ভোটাররা মেশিনে তাকে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু সেই ভোট চলে গেছে সেলিনা হায়াত আইভির ঘরে।

ইভিএমে ভোট ঠিকমতো হচ্ছে কিনা তা দেখভালের জন্য ইসি প্রতি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম বিশারদ নিয়োগ দিতে পারবেন না। এতদসত্ত্বেও কী কারণে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পূর্ব প্রতিশ্র“তি খেলাফ করে ইসি তফসিলে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের বিধান রেখেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

এ নির্বাচন কমিশনের ওপর এমনিতেই জনগণের আস্থা ছিল না, তার ওপর তাড়াহুড়ো করে তফসিল ঘোষণা, ইসি কর্মকর্তাদের অবজ্ঞা করে প্রশাসকদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ এবং অধিকাংশ দলের অনুরোধ উপো করে সীমিত পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত  ভোটারদের কাছে কমিশনের ভাবমূর্তির আরও অবনমন ঘটাবে। কমিশনের উচিত হবে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ জোট ও দলের অনুরোধ আমলে নিয়ে নির্বাচনী তফসিল এখনই কিছুদিন পিছিয়ে দেয়া। তা না হলে কয়েকদিন পরে যদি সরকারি দলের অনুরোধে তফসিল পিছিয়ে দেয়া হয়, তাহলে ভোটারদের কাছে কমিশনের হুকুমবরদারি চরিত্র আরও উন্মোচিত হওয়ার মধ্যদিয়ে তার ভাবমূর্তি বলে আর কিছু থাকবে না।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

॥ খায়রুল কবীর খোকন ॥

কিশোর-তরুণদের উন্নয়নে একটি প্রস্তাব

বর্তমান সরকার দেশের কিশোর-তরুণ-যুবা সমাজের উন্নয়নে বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে- সেগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে সেসব নিয়ে বাগাড়ম্বরের কিছু নেই, সবই রুটিন-কর্মকান্ড।

জাতিসংঘসহ আমাদের উন্নয়ন-সহযোগী সব বন্ধুরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাপী কিশোর-তরুণ-যুবা উন্নয়ন কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে নানাভাবে যেসব প্রণোদনামূলক কর্মকান্ড চালায়, তারই প্রতিফলন ঘটে তাদের পরামর্শে ও কর্মতৎপরতায়। বাংলাদেশ সরকার তাদের পরামর্শ অনুসরণ করেই বিভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছে ও সেসব বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে, একইভাবে বিশ্বের অন্যসব দেশেও এ ধরনের কর্মকান্ড চলছে, কোথাও কোথাও আমাদের দেশের কাজের গতির চেয়ে আরও বেশি গতিতেই তা চলছে। কিন্তু আমাদের দেশে কাজের কাজ যা হচ্ছে তার চেয়ে বাগাড়ম্বর হচ্ছে শতগুণ বেশি।

বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও তা সব মানুষের উপকারে যথাযথ ব্যবহারের প্রচেষ্টা চলছে- বিশেষভাবে কিশোর-তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তির উপকারিতা অনুভব করে তার যথার্থ অনুশীলনে অভ্যস্ত করার অবিরাম প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশকেও অবধারিতভাবে সেই কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে হচ্ছে। সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে একটা বড়সড় অনুষ্ঠানে ডিজিটাল প্রযুক্তির বহুল প্রচলনের মাধ্যমে আমাদের তরুণ সমাজের ব্যাপক উন্নয়নের আশাবাদ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তার ক্ষমতাভোগের একটানা দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে রুদ্ধশ্বাস-অনুষ্ঠান-চর্চা করে চলেছেন- অনুষ্ঠান-আনুষ্ঠানিকতার বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপরিসীম অপচয়ে এসব অনুষ্ঠান-আনুষ্ঠানিকতা তাকে বা দেশকে আর কিছু না-দিলেও কিছু মোসাহেব তৈরি ও চাটুকারিতা করার সুযোগ এনে দিচ্ছে আলস্যপ্রিয়, অনাচারদুষ্ট আমলাতন্ত্রকে আর কিছু ক্ষমতাভোগী অপগ–অসাধু রাজনীতিককে।

প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলনের মাধ্যমে তরুণ সমাজকে যথেষ্ট উন্নয়ন-সুবিধাদানের ঘোষণা দিলেন। এ ধরনের ঘোষণা তিনি বহুবারই দিয়েছেন। ডিজিটাল প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী সমগ্র মানবসমাজের সব উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করছে এখন, কিছু পিছিয়ে থাকা দেশ বাদে। এই পিছিয়ে থাকা দেশগুলোও অচিরেই এই উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে বাধ্য হবে এবং আগামী এক দশকের মধ্যেই দুনিয়ার প্রায় নব্বই শতাংশ বা তারও বেশি মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্পকারখানা ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনা, বিনোদন-সংস্কৃতির প্রসার মোটকথা জীবনাচারের প্রতিটি কাজেই শতভাগ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করবে। আমাদের বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই এক্ষেত্রে বেশ খানিকটা এগিয়ে রয়েছে, সেটা একটা সুখবর নিঃসন্দেহে।

তবে ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের কিশোর-তরুণ-যুবা সমাজে ভয়ানক অনাচারের জন্মও দিচ্ছে। বিশেষভাবে তারা মারাত্মক সাইবার অপরাধে জড়াচ্ছে। ‘বায়োলজিক্যাল-আর্জ’ এই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বেশিমাত্রায়ই ক্রিয়াশীল হবে, সেটাই স্বাভাবিক। সেই বিষয়টির সূত্রেই আমাদের দেশের কিশোর-তরুণ-যুবারা বেজায় আসক্তির শিকার, তথ্যপ্রযুক্তির আসক্তি- সেটা এখন মাদকাসক্তির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাখো কিশোর-তরুণ-যুবাকে দেখা যাবে, স্মার্টফোন সেটে বা ট্যাবলেট বা ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ পিসিতে ডুবে আছে নানা ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রোগ্রাম দেখা এবং বিশেষভাবে অশ্লীল পর্নোগ্রাফিক ছবি ও ছায়াছবি দেখার কাজে। তারা এসব পর্নোগ্রাফিক ছবি ও ছায়াছবি নিজেরাও তৈরি করে একজন আরেকজনকে সরবরাহ করে আসক্তিতে ডোবাচ্ছে। আর কিশোরী ও তরুণী বন্ধুকে তারা যখন তখন ব্ল্যাকমেইল করছে তাদের অশ্লীল ছবি ও ভিডিওচিত্র বানিয়ে তা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার কথা বলে। কিশোরী-তরুণীদের একটা বড় অংশও তাদের বন্ধুদের প্ররোচনায় এসব অশ্লীল কাজে আসক্ত হয়ে পড়া এবং ব্ল্যাকমেইলিং তৎপরতায় জড়িত হয়ে পড়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এমনিতেই এই তথ্যপ্রযুক্তির ডিভাইস মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের আসক্তির ফলে কিশোর-তরুণ-যুবারা বইপত্র অধ্যয়ন, লাইব্রেরিতে যাওয়া বা ক্লাসরুমে মনোযোগ দেয়া বা নিজের পড়ার টেবিলে বসে বইপত্র পড়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছে। কেবল ডিজিটাল প্রযুক্তির অবাধ সুবিধার কারণেই অনেকে মানসিক রোগে ভুগছে, বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হচ্ছে।

অতএব, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বহুলভাবে বাড়ালেই আর সেই কাজে যথার্থ সুযোগ সৃষ্টি করলেই আমাদের কিশোর-তরুণ-যুবাদের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়ে যাবে, এমন আশা করাটাও বোকামি। আমাদের বরং দরকার- কিশোর-তরুণ-যুবাদেরকে কঠোর অনুশাসনের মধ্যে  রেখে যথাযথ লেখাপড়া শেখা এবং সুস্থ জীবনাচারে অভ্যস্ত করা। মাদকাসক্তি আমাদের প্রায় আশি লাখ মানুষকে বিশেষভাবে কিশোর-তরুণ-যুবাদেরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তা থেকেও তাদের মুক্ত করার উদ্যোগ তেমন একটা নেই। এটা গেল একটা দিক।

অন্যদিকে আমাদের কিশোর-তরুণ-যুবাদের সঠিক পথে মানুষ করতে হলে, তাদের মধ্যে কোনোরকম ‘ট্রমা’ সৃষ্টি না করে মেধা-মননের, অসীম-শ্রমদানের নিত্যনতুন উদ্ভাবনের জীবন-সংস্কৃতিতে উজ্জীবন ঘটাতে হবে। গুম-খুন, ‘বন্দুকযুদ্ধের নামে’, ‘ক্রসফায়ার’র নামে খুন, নির্যাতন, অপহরণ, সরকারি দলের সমর্থক সন্ত্রাসীদের দ্বারা বিরোধীদলের সমর্থক তরুণ-যুবাদের ওপরে সন্ত্রাস চালানোর ‘ট্রমা’ সৃষ্টি বন্ধ করতে হবে।

স্কুল-কলেজের কিশোর-তরুণদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল নিরাপদ সড়কের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্র-প্রশাসনের সব দুর্নীতি ও নির্যাতনমূলক অঘটনগুলো, সামগ্রিক দুঃশাসনসহ সব অনাচারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ একটি সফল আন্দোলনে। আমাদের এই দেশের অগণতান্ত্রিক ও সুশাসনহীন রাষ্ট্রকাঠামো যে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা দেয়ার বদলে শুধু অপশাসনের শিকার বানাতেই নিয়োজিত, তার প্রমাণ মেলে এবার হাতেনাতে কিশোর-কিশোরী বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে চোখে-আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সরকারি আমলাদের, ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের, মন্ত্রীদের অবধি- তারা কেউই আইনের শাসন কায়েমে অঙ্গীকার পালনে আগ্রহী নয়, রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে বেড়ান, সুশাসন কারে কয় তারা তা জানারও চেষ্টা করেন না, ক্ষমতা-রক্ষার স্বার্থে মুুখেই কেবল সেসব বলে বেড়ান ‘নীতি-কথার’ মতো, তোতাপাখির মতো আওড়ানো সেসব। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা নিজেরা আইনের তোয়াক্কা করেন না কখনই, এমনকি তাদের আইনভঙ্গের কোনো প্রতিকার নেই এদেশে, তা প্রমাণিত সত্য।

এগুলোসহ জেঁকে বসা নানা সমস্যার সমাধানে সরকার তার মতো পন্থা বের করে চলেছে যা কেবল ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছে। আমরা আম-জনতার পক্ষে, অন্তত একটা সমাধান পন্থা বের করার চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমাদের দেশের কিশোর-কিশোরী (যদি নয় বছর বয়স থেকে অনূর্ধ্ব-১৮ অবধি গ্র“পটিকে ধরা হয়) জনসংখ্যা হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি। আর তরুণ-তরুণী (১৮ বছর থেকে ২৮ বছর অবধি ধরা হলে) একইভাবে প্রায় আড়াই কোটি। এই পাঁচ কোটি আমাদের জনসংখ্যার প্রধানতম অংশ- তারাই আমাদের মূল ভবিষ্যৎ। এই পাঁচ কোটি নাগরিককে আমাদের লালন-পালন করতে হবে অত্যন্ত সুচারু পদ্ধতিতে, বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগে, বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার সর্বোত্তম পন্থায়- কোনো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ‘ট্রমা’ যেন তাদের সারাজীবন দুঃস্বপ্নসম আতঙ্ক হয়ে তাড়িয়ে বেড়াতে না পারে, সেটাই রাষ্ট্রের বিবেচনায় নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তাদের এই দুটো গ্র“পের জনগোষ্ঠীর জন্য দুটো ফাউন্ডেশন করা যেতে পারে। প্রতিটি ফাউন্ডেশন হবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে- প্রতিটির পৃষ্ঠপোষক হবেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। তবে এই ফাউন্ডেশন দুটোর কোনোটির ওপরে সরকারের কোনো রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব রাখা চলবে না। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড কাজ করবে প্রতিটি ফাউন্ডেশন পরিচালনায়। সদস্যসচিব হবেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ (বয়সে পঞ্চান্ন থেকে ষাটের মধ্যে হতে পারেন)। অন্য সদস্যরা হবেন সমাজের বিশিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্য থেকে নেয়া প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা এই ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হবেন, থাকবেন বিভিন্ন উঁচুস্তরের পেশাজীবীরা। এখানে হবে অবিরাম গবেষণা কার্যক্রম, বিষয়বস্তু কিশোর সমস্যা (কিশোর ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রে) আর তরুণ সমস্যা (তরুণ ফাউন্ডেশনের বেলায়)। শুরুতেই অন্ততপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটা বাজেট নিয়ে কাজে নামতে হবে, প্রতিবছরই এ বাজেট বর্ধিত রূপ পাবে। বাজেটের মূল অর্থ সরকার ও অবশিষ্টাংশ জনগণের স্বেচ্ছা অনুদানের ভিত্তিতে সংগৃহীত হবে। এই ফাউন্ডেশন দুটো কিশোর ও তরুণদের যাবতীয় সমস্যাবলি নিয়ে স্টাডি করে যাবে, সমাধানের পন্থা বের করবে আর রাষ্ট্রকে তা বাস্তবায়নের জন্য চাপপ্রয়োগ করে যাবে। রাজধানী ঢাকায় ফাউন্ডেশনের বড় আকারের প্রশাসনিক অফিস ও গবেষণা ভবন থাকবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি করে ফাউন্ডেশন শাখা ভবন রাখা যেতে পারে। দুটো ফাউন্ডেশনই একই রকমের প্রশাসনিক ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাবে- যথাক্রমে কিশোর সমাজ ও তরুণ সমাজের উন্নয়নে।

এই ফাউন্ডেশন দুটোর প্রধান কাজই হবে- কিশোর সমাজ ও তরুণ সমাজের যে কোনো সমস্যার সমাধানে প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা, আর কিশোর বা তরুণ সমাজ কোনো আন্দোলনে জড়ালে প্রথমেই তার বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা না নিয়ে এই ফাউন্ডেশনকে দিয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে রাষ্ট্রকে। কোনো অবস্থায়ই পুলিশি হামলার (বা রাষ্ট্রীয় অন্য কোনো বাহিনীর হামলার) শিকারে পরিণত করা যাবে না কিশোর ও তরুণ সমাজকে বা তাদের কোনো সদস্যকে। আর মাদকাসক্তি ও নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতাসহ ভয়ানক যেসব সমস্যায় কিশোর সমাজ বা তরুণ সমাজ মহাসংকটে রয়েছে, সেসবের সমাধানেও গবেষণা কাজ চালাবে ফাউন্ডেশন। এবং সমাধানের পন্থা বের করে তা বাস্তবায়নে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে যাবে। মোদ্দা কথা, কিশোর ও তরুণদের মানবিক-আর্থিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে যত প্রকার কর্মকান্ড দরকার সবই করবে এই দুই ফাউন্ডেশন। শুরুটা এখনই দরকার, তারপর বেরিয়ে আসবে কর্মসূচির সম্প্রসারিত রূপগুলো।

লেখক ঃ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক

॥ ড. এম এল আর সরকার ॥

সংলাপ, সংবিধান সংশোধন, খালেদার মুক্তি এবং বাস্তবতা

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বহুল আলোচিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি নেতারা এ আলোচনার ফল নিয়ে সন্তুষ্ট নন এবং হওয়ার কথাও নয়।

তদুপরি আলোচনার যে পথ উন্মোচিত হয়েছে, সে পথ ধরেই একটি গন্তব্যে পৌঁছার বিষয়ে আশাবাদী হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘একদিনে সবকিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না।’ ড. কামাল হোসেন সংলাপের পর কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলেছেন, আলোচনা ভালো হয়েছে। তার মতে, তারা তাদের কথা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীও তার মনের কথা তাদের বলেছেন।

আবারও আলোচনা হতে পারে- এ বিষয়ে উভয়পক্ষই একমত হয়েছেন। আলোচনার সার্বিক পরিবেশ, আতিথেয়তা এবং সর্বোপরি ধৈর্যসহ একে অপরের কথা শোনা থেকে এটি বলা যায়, প্রাথমিক সংলাপটি অত্যন্ত সফল হয়েছে। কিন্তু ফখরুল সাহেরেব কথার সুর ধরেই বলতে হচ্ছে, ‘একদিনে সবকিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না।’ ৭ নভেম্বরের মধ্যে আবারও আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্যে শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমরা এই ৯ বছর ১০ মাস সময়ের মধ্যে দেশের কতটুকু উন্নয়ন করতে পেরেছি, তা নিশ্চয়ই আপনারা বিবেচনা করে দেখবেন।

তবে এটুকু বলতে পারি, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ভালো আছে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে। দিনবদলের যে সূচনা আমরা করেছিলাম, দিনবদল হচ্ছে; এটাকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের কথাগুলো একদিকে যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি এটি বিবেচনার ভার ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের ওপর ছেড়ে দেয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রশংসনীয়।

পক্ষান্তরে ড. কামাল হোসেন তার স্বভাবসুলভ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন সংলাপের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পর আগামী দিনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে কয়েকটি দিকনির্দেশনামূলক আবেদন রেখে।

তার বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এটুকু বোঝাতে চেয়েছেন যে, দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য এবং রিকন্সিলিয়শন বা মেলবন্ধন বা রাজনৈতিক সম্প্রীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যার ইতিবাচক প্রভাব জনপ্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ সবকিছুর ওপরই পড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি করার ঐতিহাসিক সুযোগ প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন।

তিনি মনে করেন, দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উদারতার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে জাতি তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং ইতিহাসে শেখ হাসিনার নাম সোনার হরফে লেখা থাকবে। ড. কামাল হোসেনের এ কথাগুলো সত্যিই সুন্দর এবং প্রশংসনীয়।

সব সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ সংলাপ থেকে কোনো মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়নি! প্রশ্ন হল, তাহলে এ সংলাপে কী হয়েছে? এ সংলাপ কাছ থেকে দেখার মতো সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবর, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত ‘গণভবনে সেই সাড়ে তিন ঘণ্টা’ শিরোনামে একটি লেখা থেকে এটি পরিষ্কার যে, অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, খালেদা জিয়ায় মুক্তি, একজন সর্বজন গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম, ১৫৩ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সেনাবাহিনী মোতায়েন, ইভিএম ব্যবহার, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং তফশিল ঘোষণা।

প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থা, আইন এবং বাস্তবতার আলোকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের এসব বিষয়ে উত্তর দিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্টের নেতা-নেত্রীদের কাছে তার যুক্তি খন্ডানোর আইনগত-যুক্তিযুক্ত কোনো ব্যাখা ছিল না।

এমনকি প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছেন, ‘আমি পদত্যাগ করব, আপনারা সবাই মিলে একজন সর্বজন গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ ব্যক্তির নাম বলেন; তখন সবাই নীরব ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘কী বলতে পারবেন?’ এ সময় অনেকেই মাথা নিচু করে ‘না-না’ করেন।

আসলে সংলাপে অধিকাংশ বিষয়েই আলোচনা হয়েছে সংবিধান, আইন এবং অতীত অভিজ্ঞতা বা বাস্তবতার নিরিখে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা- নেত্রীদের তেমন কিছু বলার বা করার ছিল না। যার ফলে তাদের দাবিগুলোর জন্য শেষ পর্যন্ত তারা প্রধানমন্ত্রীর উদারতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী প্রথম এ সংলাপে তার উদারতা এবং মেলবন্ধন সৃষ্টির বিষয়টির ওপর তেমন গুরুত্ব দেননি। কেন দেননি- তা মনে হয় একটু পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে-

সংবিধান সংশোধন এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন : আমরা সবাই জানি, সংবিধান কোনো সৃষ্টিকর্তার বাণী নয়। সোজা কথায়, সংবিধান মানুষ ও রাষ্ট্রের কল্যাণার্থে মানুষের তৈরি কিছু নিয়মাবলীর সমষ্টিমাত্র। মানুষের জন্যই যখন এ সংবিধান, তখন মানুষের প্রয়োজনেই এটি সংশোধন করা অসম্ভব নয় বলেই প্রতীয়মান হয়।

আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই, তবে ড. কামাল হোসেনের প্রধানমন্ত্রীকে বলা উদ্ধৃতি- ‘এটাও আপনার অজানা নয়, যে কোনো বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের দরকার পড়লে তা নিয়ে আলোচনা করাও সংবিধানসম্মত। কারণ সংবিধান সংশোধনের বিধান সংবিধানেরই অংশ।’ এ থেকে এটুকু বুঝতে পারছি, সংবিধান সংশোধন একটি সংবিধানসম্মত বিষয়।

সংবিধান সংশোধন করেও একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। দেশের জনগণও মনে করে এটি সম্ভব। তবে কথা থাকে যে, এর জন্য প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রীর উদারতা। কিন্তু কথা হচ্ছে, কেন প্রধানমন্ত্রী এ উদারতা দেখাবেন এবং তিনি দেখালেই যে দেশে শান্তি আসবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়?

আইন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি : বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এখানে আমাদের করার কিছু নেই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘এ মামলা তো আমি করিনি। এটি করেছে এক-এগারোর সরকার। আমার কী করার আছে? এখানে রাজনৈতিক কোনো হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।’ ধরেই নিচ্ছি, খালেদা জিয়ার কারাবাসে প্রতিহিংসার রাজনীতি নেই।

তার আইনজীবীরা যথেষ্ট বিচক্ষণ এবং অনেক দিক দিয়ে তারা বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তারপরও অনেকেই মনে করেন, খালেদা জিয়া অন্যায় করেছেন ঠিকই, তবে এই অন্যায়গুলোর অধিকাংশই সম্ভবত সংঘটিত হয়েছে কিছুটা তার অজান্তে এবং কিছুটা তার অন্ধ পুত্রস্নেহের কারণে। তদুপরি এরকম অনেকে অন্যায়ের পর আজও জেলের বাইরে আছেন।

এই বয়সে খালেদা জিয়ার এত দীর্ঘদিন কারাবাসের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার দাবিদার। বিএনপিও মনে করে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে খালেদা জিয়া দন্ডপ্রাপ্ত। আদৌ কি তার মুক্তি সম্ভব?

দন্ডপ্রাপ্ত কাউকে মুক্তি প্রদানের নজির বিশ্বে অনেক আছে। নিকট অতীতে এর প্রকৃষ্ট উদাহারণ হচ্ছে মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহীম। কিন্তু এখানেও সেই একই সমস্যা। খালেদা জিয়ার দন্ড মওকুফ বা মুক্তির জন্যও প্রয়োজন হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উদারতা। আবারও সেই প্রশ্ন- কেন শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রেও তার উদারতা দেখাবেন? শেখ হাসিনা দেখালে খালেদা জিয়া তার উত্তরে কী করবেন?

অভিজ্ঞতা বা বাস্তবতা : ধরুন ড. কামাল হোসেনের কথায় দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক উদারতা দেখিয়ে সংবিধান সংশোধন, খালেদা জিয়ার দন্ড মওকুফ এবং নির্বাচন কমিশন ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করলেন। ধরে নিলাম, এতে করে শেখ হাসিনাকে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করল এবং দেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার নাম সোনার হরফে লেখা থাকল।

কিন্তু ড. কামাল হোসেনের কাছে আমার প্রশ্ন- একবার ভেবে দেখুন তো! এভাবে শেখ হাসিনা সবকিছু মেনে নিলে ভোটের ময়দানে আপনি কি বলবেন যে, হাসিনা অনেক কাজ করেছেন এবং নজিরবিহীন উদারতা দেখিয়েছেন; সুতরাং তাকেই আর একবার ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী করা উচিত।

আপনি হয়তো বলেন না, কিন্তু আপনার জোটের লোকেরা কি জনসভায় এ কথা বলা বাদ দেবে, শেখ হাসিনাকে আমরা বাধ্য করেছি আমাদের দাবি মেনে নিতে! আপনাদের সব দাবি মেনে নিলে শেষ পর্যন্ত ভয়ে বা সুযোগ বুঝে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধাচরণ করতে কি দ্বিধাবোধ করবে?

ড. কামাল এবার ধরুন, নানা কারণে আওয়ামী লীগ ভোটে হেরে গেল। ভোটে হারার পর শেখ হাসিনাকে যে জেলে যেতে হবে না, তার দলের লোকদের হয়রানি করা হবে না এবং যে যুদ্ধাপারাধীর বিচার শেখ হাসিনা করেছেন, তারা প্রতিশোধ নেবে না; তার কি কোনো নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারবেন?

মান্যবর! আপনারা যে শুধু আপনাদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই কথায় কথায় বঙ্গবন্ধু-বঙ্গবন্ধু বলছেন না; তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? আপনি তো নিজেও ভালো করেই জানেন বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা। সেই বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারসহ স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পরই আমরা হত্যা করেছি।

আমরা জাতি হিসেবে বড়ই অদ্ভুত, ভুলো মনের এবং আমাদের কেউ কেউ আবার মীর জাফর শ্রেণীর। অতএব আপনি নিজেই একবার চিন্তা করে দেখুন তো, আপনাদের সব কথা শেখ হাসিনার আদৌ অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক হবে কিনা?

ধরে নিলাম, আপনি চেষ্টা করবেন; যাতে এরকম কিছু না হয়। কিন্তু ক্ষমতা ও প্রতিহিংসা বড় অদ্ভুত। আপনি ব্যক্তিগতভাবে চাইলেও সরকারি দলের লোকদের হয়রানি বন্ধ করতে পারবেন না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে আপনার ব্যক্তি ইমেজের কারণে এখন আপনার দাম আছে।

কিন্তু আপনার জোটে আপনার লোকদের এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, যা দিয়ে আপনি আপনার মতামতকে ক্ষমতায় যাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। তারপরও যদি আপনি সেই চেষ্টা করেন, তাহলে আপনার পরিণতি যে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতো হবে না, তা কী করে বুঝবেন?

ড. কামাল হোসেন হয়তো আমার লেখা পড়বেন না এবং পড়লেও এতক্ষণ হয়তো ভাবছেন- আমি চরম বিএনপি বিরোধী। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কারও ক্ষমতায় যাওয়ার বিরোধী নই। আমি বিরোধী প্রতিহিংসার রাজনীতির।

এই প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। দেশবাসী মনে করে, সাংবিধানিকভাবে এটি বন্ধ করতে পারলেই বারবার ভোটের আগে এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না এবং দেশের রাজনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসবে। জানি না, কেন আপনারা শুধু নির্বাচন নিয়েই কথা বলেন। আসলে মূল সমস্যা ক্ষমতার অপব্যবহার, যা মূলত হয় নির্বাচনের পর।

আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন, দেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে- প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করতে হলে প্রয়োজন সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতার একটি ভারসাম্য। ক্ষমতার ভারসাম্য থাকলে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা  স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে দেশ পরিচালনা করতে পারবে না।

আমরা মুখে যতই গণতন্ত্রের কথা বলি না কেন, ক্ষমতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা সবাই স্বৈরাচারে পরিণত হই এবং এটি করতে সহায়তা করে আমাদের এই গতানুগতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

আমি এর আগেও লিখেছিলাম ‘যে গণতন্ত্রে ৩০০টি আসনের মধ্যে শুধু ১৫১টি আসন পেলেই সব ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায় এবং ১৪৯টি আসন পেয়ে শূন্য হাতে বিরোধী দলের আসনে বসে থাকতে হয়, সেই গণতন্ত্র যতই ভালো হোক না কেন; তার সংশোধন প্রয়োজন। এ ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রয়োজন নেই।’

ড. কামাল হোসেন, আপনি সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং আপনি নিজেই বলেছেন- প্রধানমন্ত্রী চাইলে অতিদ্রুতই আপনি সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত আছেন। আমার মতামত হচ্ছে- এখানে প্রধানমন্ত্রীর চাওয়ার কিছুই নেই। তিনি দেশের জন্য কাজ করেছেন এবং দেশের সংবিধান অনুযায়ী সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন।

সংবিধান সংশোধন এবং দন্ড মওকুফের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রয়োজন আপনাদের। সুতরাং আপনাকেই বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে আসতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা আছে।

অনুগ্রহপূর্বক আপনার প্রস্তাবগুলো এমনভাবে তৈরি করবেন, যাতে করে প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষেই বুঝতে পারেন, এ প্রস্তাবনায় শুধু খালেদা জিয়ার প্রতি নয়; তার প্রতিও আপনার আন্তরিকতার প্রকাশ রয়েছে এবং এটি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে তিনি ও তার দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

সংবিধানের এ সংশোধনীতে প্রয়োজনে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার জন্য এমন ব্যবস্থা রাখুন, যাতে তারা বাকি জীবনটা দেশের অভিভাবক হিসেবে থাকতে পারেন।

আশা করছি- সৃষ্টিকর্তার রহমতে এবং আপনার প্রচেষ্টায়, সর্বোপরি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উদারতার মাধ্যমে সংশোধিত সাংবিধানিক কাঠামোয় আমরা স্বৈরাচার ও প্রতিহিংসার রাজনীতিমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ পাব; যেখানে বাস্তবায়িত হবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

॥ মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ॥

সদিচ্ছাবিহীন সংলাপে সংশয় বাড়ে

নির্বাচনী সংকট নিরসনে পৌনে পাঁচ বছর নেতিবাচক সুরে কথা বলে হঠাৎ নির্বাচনের প্রাক্কালে এ প্রসঙ্গে সরকারের ভিন্ন সুরে কথা বলার মধ্যে যে ‘ফন্দি ফিকির’ আছে তা আগেই অনুমিত হয়েছিল। তা না হলে যে সরকারি দল প্রহসনের দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দলগুলোর সংলাপের দাবি কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে আসছিল, হঠাৎ সে দলেরই একাদশ সংসদ নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার প্রাক্কালে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বর্ধিত সংখ্যায় গায়েবি মামলা ও নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের মধ্যে আচমকা সংলাপে রাজি হওয়ার মধ্যে যে কোনো সদিচ্ছা নেই, তা অনুমিত হয়েছিল। বিষয়টি ১ নভেম্বর, নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে প্রায় পৌনে চার ঘণ্টা সংলাপ করার মধ্য দিয়ে অধিকতর স্পষ্ট হয়। উল্লেখ্য, গত পৌনে পাঁচ বছর সংলাপ প্রশ্নে সরকার অব্যাহতভাবে সংলাপের দাবির একই রকম জবাব দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘কীসের সংলাপ? কার সঙ্গে সংলাপ? স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না।’ ‘যারা আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়েছে, রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে, তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না।’ তারা আরও বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী যথাসময় নির্বাচন হবে এবং সে নির্বাচনে কোনো দল অংশগ্রহণ করবে কিনা এটা সম্পূর্ণ দলগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার। তারা আরও বলেছেন, বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে ভুল করেছিল, যে ভুলের মাশুল দলটিকে এখনও দিতে হচ্ছে। আবার যদি তারা একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, বিএনপির পক্ষে দলীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। এ রকম ব্যাখ্যা গত পৌনে পাঁচ বছর সরকারি দল অব্যাহতভাবে দিয়ে আসছে।

পৌনে পাঁচ বছর যে বিএনপির সঙ্গে সরকার সংলাপ করেনি, সেই বিএনপি হঠাৎ কী করে সরকারি দলের কাছে দেশপ্রেমিক দলে রূপান্তরিত হয়ে গেল? কী এমন পরিবর্তন সরকার বিএনপি ডমিনেটেড ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে দেখল যে, চিঠি দেয়ার পরপরই দ্রুত ঐক্যফ্রন্টকে সংলাপে আহ্বান জানাল? কেবল ঐক্যফ্রন্ট নয়, যুক্তফ্রন্ট, এমনকি সরকারে শরিক জাতীয় পার্টির সঙ্গেও সরকার সংলাপে বসতে রাজি হল। আবার বাম দলগুলোকেও সরকার এ রকম সংলাপে আসতে আগ্রহী মনোভাব দেখাচ্ছে। মজার বিষয়, সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে জাপা থেকে কী দাবি উত্থাপন করা হবে? হয়তো জাপা নেতারা দাবি করতে পারেন, আমরা তো সংসদে আপনাদেরকে সব রকম সহযোগিতা করেছি। কাজেই, সামনের কেবিনেটে আমাদের আরও বেশি মন্ত্রী দিতে হবে। জাপা প্রধান এরশাদ সাহেবসহ আমাদের নেতাকর্মীদের মামলাগুলো ডিপ ফ্রিজ থেকে বের না করে এসব মামলা পর্যায়ক্রমে খারিজ করে দিতে হবে। আমাদের এমপিদের এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশি করে টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। প্রয়োজনে আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করব। আর বিএনপি যদি নির্বাচন করে, সে ক্ষেত্রে আপনারা চাইলে, আমাদেরকে প্রত্যাশিত সংখ্যক আসন দিলে ১৪-দলীয় জোটে যোগ দিয়ে নির্বাচন করতে আমরা আপত্তি করব না। এ রকম সংলাপ রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না করতে পারলেও গণভবনের বাবুর্চিদের ব্যস্ত রাখবে।

সরকার যদি সংলাপকে অর্থবহ করতে চাইত তাহলে তাদের উচিত হতো ঐক্যফ্রন্ট থেকে ৩-৪ জন নেতাকে আহ্বান জানিয়ে নিজেদের পক্ষ থেকেও ৩-৪ জন মিলে ছোট পরিসরে সংলাপ করা। কিন্তু গণভবনে প্রায় দু’পক্ষের অর্ধশতাধিক নেতাকে নিয়ে যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হল, তা কি একটি সুষ্ঠু সংলাপ অনুষ্ঠানের জন্য সহায়ক ছিল? এটা তো মনে হয় ঘরোয়া কর্মী সভার মতো রূপ নিয়েছিল। একে দুই পক্ষের নেতাদের এটি প্রাক-সংলাপ আলোচনা সভা বলে যদি এখানে পরবর্তী সংলাপের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা ঠিক করা হতো, তাহলে এর যৌক্তিকতা থাকত। কিন্তু পত্রিকা পড়ে যা জানা গেল, তাতে এ সংলাপকে অর্থহীন ছাড়া আর কিছু বলা যাবে না। এ সংলাপে সরকারের চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে যে কোনো সদিচ্ছা ছিল না, সে বিষয়টি সংলাপের পর স্পষ্ট হয়। কারণ, ঐক্যফ্রন্টের যে দাবি এবং লক্ষ্য সে সম্পর্কে সরকার অবহিত ছিল। কারণ, আগেই বিএনপির ৭ দফা দাবি এবং ১১ দফা লক্ষ্য প্রকাশিত হয়েছিল। এসব দাবি আদায়ের জন্যই তারা এ সংলাপে যোগ দিয়েছিল। অথচ, এসব দাবির একটিও না মেনে প্রধানমন্ত্রী চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। তাহলে এ সংলাপকে ‘অর্থহীন’ ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে! সরকার যে সংবিধানের বাইরে যেতে চায় না, সে ব্যাপারে ঐক্যফ্রন্ট জানত। সে জন্য তারা সংবিধানের মধ্যে থেকেই তাদের দাবি মানার পথ বাতলে দেয়া সত্ত্বেও সরকার সে সম্পর্কে সাড়া দেয়নি। উল্লেখ্য, সংবিধান সংশোধন করার বিধান তো সংবিধানেরই অংশ। কাজেই গণতন্ত্র ও টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আরেকটি সাংবিধানিক সংশোধনী করে বিএনপির যে দাবিগুলো অবাধ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয়, সরকার সে দাবিগুলো মানতে পারত। কিন্তু সেদিকে সরকার মোটেও আগ্রহ দেখায়নি। অর্থাৎ, সংসদ ভেঙে, সরকার পদত্যাগ করে দলনিরপেক্ষ সরকার এবং পুনর্গঠিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিএনপির দাবির প্রতি সরকার আগ্রহ দেখায়নি। কাজেই সংলাপ থেকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রাপ্তি শূন্য।

সরকার চাইলে এখনও সে পথে যাওয়ার সুযোগ আছে। সংসদের একটি স্বল্পকালীন জরুরি অধিবেশন ডেকে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের বিধানসংবলিত বিল সংসদে পাস করার পর নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা করে সরকার সাংবিধানিকভাবে ঐক্যফ্রন্টের দাবি মেনে ইনক্লুসিভ নির্বাচন করতে পারে। আর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে চাইলে সে কাজটিও সরকারের পক্ষে করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে মহামান্য রাষ্ট্রপতি যদি নির্বাচন কমিশনকে সম্মানের সঙ্গে বঙ্গভবনে চায়ের নিমন্ত্রণ করে তাদেরকে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে পদত্যাগের পরামর্শ দেন, তাহলে তাদের পদত্যাগের পর দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে সুযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ইসি গঠন করা সম্ভব। অথবা, সংসদে দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন সম্পর্কিত বিল পাস করার সময় একইসঙ্গে সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন সম্পর্কিত একটি বিলও সংসদে পাস করে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বর্তমান কমিশন পদত্যাগ করার পর ওই আইন অনুযায়ী নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হতে পারে। এসবের জন্য নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা প্রয়োজনে ১-২ সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়ার সুযোগ আছে। এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, সংসদ নির্বাচনকে অবাধ করতে সরকারের সদিচ্ছা থাকা। তাড়াহুড়ো করে যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচন করে আবার সরকার গঠন করা উদ্দেশ্য হলে হাজার সংলাপেও সমস্যার সমাধান হবে না।

সাংবিধানিক সংশোধনী প্রয়োজন, এমন বিরোধীদলীয় মূল দাবিগুলো যদি একটি সংশোধনী পাস করে মেনে নেয়া হয়, তাহলে আর যে দাবিগুলো বাকি থাকে, তা মানতে অসুবিধা হওয়ার কথা না। উল্লেখ্য, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দাবি করে, তারা যে ৭ দফা দাবি দিয়েছে, তা কোনো দলের লাভ-লোকসানের জন্য দেয়নি। মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন সুনিশ্চিত করে গণতন্ত্র কার্যকর করা এবং জনগণের ভোট দেয়ার অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ দাবিগুলো দেয়া হয়েছে। এসব দাবি পূরণ না করে দলীয় সরকারাধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সে নির্বাচন বিতর্কিত হবে। কারণ, ইতিপূর্বে প্রহসনের দশম সংসদ নির্বাচনের পর গত বছরগুলোতে যতগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, দু’একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত তার প্রায় সব নির্বাচনেই সরকারি দলের দখল, দাপট, ভোট কাটাকাটি, কেন্দ্র দখল করে বিরোধীদলীয় প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টদের বের করে দেয়া, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের আয়ত্তে নিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরা ও নানা ধরনের দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিজয় সুনিশ্চিত হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সরকারদলীয় প্রার্থীদের নেতাকর্মীরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা পেয়েছেন। দৃশ্যমানভাবে ভোট কারচুপি করলেও তাদের উল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়নি। ফলে একটি নির্বাচনের দুর্নীতিকারীরা প্রশ্রয় পেয়ে পরের নির্বাচনে আরও অধিক পরিমাণে দুর্নীতি করেছে। এ চলমান প্রক্রিয়ায় এখন সামনে এসেছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

সরকার যে কোনো উপায়ে এ নির্বাচন জিততে চাইবে। কারণ, সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীদের অনেকে ভাবছেন, এ নির্বাচনে হারলে হয়তো তাদেরকে গত দশ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক লুটপাটের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তবে সরকার যদি বিরোধীদলের একটি দাবিও না মেনে পঞ্চদশ সংশোধনীর অধীনে সংসদ না ভেঙে, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-এমপিরা নিজ নিজ ক্ষমতায় থেকে, দলীয়করণকৃত প্রশাসন এবং নতজানু ইসির অধীনে সংসদ নির্বাচন করে, সে নির্বাচনে কোনদিনই সরকারি দল হারবে না। এভাবে নির্বাচন করতে থাকলে এ সরকারের অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার পথে বিরোধীদল বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। আর জেনেশুনে এমন নির্বাচনে অংশ নিলে বিরোধী দলগুলোকে আজীবন বিরোধী দলে থাকতে হবে।

ইতিমধ্যে সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীদের বক্তব্য-বিবৃতিতে তার আভাষ স্পষ্ট হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ২ নভেম্বর, ময়মনসিংহ সার্কিট হাউসের জনসভায় বলেন, ‘আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েছি। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নয়নশীল ও সমৃদ্ধশালী দেশ। দেশ হবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত।’ ২০১৮ সালে যখন তিনি ২১০০ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তখন বুঝতে হবে যে অন্ততপক্ষে আগামী ৮২ বছর সরকারি দল ক্ষমতায় থাকছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলার আগেই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর অনেকে বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। বিরোধীদলগুলোও বুঝতে পেরেছে বলেই এহেন ব্যবস্থাধীনে নির্বাচনে যেতে চাইছে না। সম্মানিত সরকারপ্রধান এবং মাননীয় সরকারদলীয় মন্ত্রীরা তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে উন্নয়নের ফুলঝুরি ছড়ালেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলমন্ত্র তথা গণতন্ত্রকে কার্যকর করার কথা ভুলেও উচ্চারণ করছেন না। গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল নির্বাচন। সে নির্বাচনকে অর্থবহ করার কথা বলছেন না। এসব লক্ষণ দেখে সরকারের দোসর এরশাদ এবং আরেকটি ছোট দলের প্রধান কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম নির্বাচন আদৌ হবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এভাবে গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারী ভঙিমায় নির্বাচন করার চেষ্টা আবারও কোনো অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটাবে কিনা তেমন আলোচনাও সুশীল সমাজে চাউর আছে। সবকিছু ভেবে বলা যায়, দেশ এখন একটি বড় রকমের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সদিচ্ছাবিহীন হাজারও সংলাপে এ সমস্যার সমাধান হবে না। তবে সরকার আন্তরিক হলে এ সংকটের সমাধান করা যাবে। কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, দীর্ঘস্থায়ী একগুঁয়েমি, গণতন্ত্রহীনতা ও নির্যাতন-নিপীড়নের ভূমিতে নতুন করে অঙ্কুরোদ্গম হতে পারে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী আন্দোলন, জঙ্গি তৎপরতা, এমনকি রাজনৈতিক ভূমিকম্প। এমন প্রতিকূল পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের প্রত্যাশিত গণতন্ত্রবিহীন উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

॥ ড. মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

জোট ও আদর্শের লুকোচুরি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বেশ কিছু জোট গঠনের খবরাখবর গণমাধ্যমের কল্যাণে জানা সম্ভব হচ্ছে। এসব জোট কতটা রাজনৈতিক দলের, কতটা কিছুসংখ্যক নেতারÑ তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যেসব দলের নাম উচ্চারিত হচ্ছে সেগুলোর নাম সারা বছর মানুষ খুব একটা শুনেছে বলে মনে হয় না। আবার কোনো কোনো দলের এক অংশ এক জোটে আছেতো অন্য অংশ ভিন্ন জোটে চলে যাচ্ছে। কারা এসব দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাও খুব একটা স্পষ্ট নয়। ওইসব দলের নেতাকর্মী ক’জন আছে, সেটিও কেউ জানে না। এখন দেখা যাচ্ছে একজন বা দুজন ব্যক্তি ওইসব জোটভুক্ত দলের প্রধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছেন।

বাংলাদেশে অতীতে রাজনৈতিক দলের জোটভুক্তির এমন তুঘলোকি কান্ড দেখা যায়নি। এবার হঠাত্ করে জোটভুক্তির এমন হিড়িক পড়ে গেল কেনÑ বোঝা গেল না। মনে হচ্ছে এবার রাজনীতিবিদরা মনে করছেন যে, ৪০-৫০টি দলের সংখ্যা দেখিয়ে এক একটি জোট দেখানো গেলে নির্বাচনে হয়তো একটা সুবিধা হতে পারে। তবে বেশি সুবিধা হয়তো পাওয়া যাবে বড় দুই দলের কাছেÑ যেখান থেকে কয়েকটি আসন পাওয়ার জন্য দরকষাকষিতে। বেশির ভাগ দলের নেতারই কোনো নির্বাচনী আসন নেই। ভোটে কারো কারো জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার নজির রয়েছে। এসব নেতা এখন আর নিঃসঙ্গ থাকতে চান না, নির্বাচনে যেতে চান; তবে কোনো অবস্থাতেই পরাজিত হতে চান না। তাই তাদের রাজনীতির সহজ সমীকরণ হচ্ছে বড় কোনো দলের সঙ্গে নির্বাচনী আসন ভাগাভাগির সুযোগ নেওয়া। এ ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বিএনপি যেহেতু রাজনৈতিকভাবে বেশ বেকায়দায় রয়েছেÑ তাই তাদের সঙ্গে জোট করার সুযোগ নিয়েছে অনেকেই। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের বিচারজনিত কারণে বড় ধরনের সংকটে আছে। নেতারাও কেউ কাউকে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যেতে দিতে রাজি নয়, তাই বিএনপির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ড. কামাল হোসেন, আসম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বেশ কয়েকজন নেতা ‘ঐক্যফ্রন্ট’ নামে একটি জোট গঠন করেছেন। অথচ এদের কারোরই রাজনৈতিক অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে বিএনপির একজোটে রাজনীতি করার কথা কেউ ভাবতে পারেনি। কিন্তু এ মুহূর্তে বিএনপি ড. কামাল হোসেনসহ অন্য নেতৃবৃন্দকে নিয়ে মাঠে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

২০ দলীয় জোট, ঐক্যফ্রন্টÑ কোনটা বিএনপির কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আপাতত বোঝা না গেলেও বিএনপি এসব নিয়ে কৌশলের জোটখেলায় শক্তি সঞ্চয় করতে চাচ্ছে। কিছুটা লাভ আপাতত মিডিয়ায় পাচ্ছে, আবার আওয়ামী বিদ্বেষী মহলগুলোর কাছ থেকে সমর্থন তো পাচ্ছেই। মিডিয়া প্রচারে ঐক্যজোটকে সম্মুখে আনছে, জামায়াতের বিষয়টি আপাতত দূরে থাকছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র হলো জামায়াতের সঙ্গে বা ২০ দলের সঙ্গে বিএনপির জোটগত নির্বাচনী প্রস্তুতি অগ্রসর হচ্ছে। বিএনপি এক জোটে নয়, দুটো জোটে সমান্তরালভাবে অবস্থান করছে। ২০ দলকে নিয়ে বিএনপির আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা ২০১৩-১৫ সালে সুফল দেয়নি। তাই দলটি ড. কামাল হোসেনকে সম্মুখে রেখে ঐক্যফ্রন্ট নামে মাঠে নেমেছে। ৭ দফা দাবিনামা দিয়ে এখন যে আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখন নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে যে সব দাবিনামা নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট মাঠে নামতে চাচ্ছে তাতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ ফ্রন্টের কতখানি রয়েছে-সেটি নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাহলে এ জোটের আসল লক্ষ্য নিয়ে সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। ফ্রন্ট হয়তো এতোদিন মনে করেছিল যে তফসিল ঘোষণার পর পরই ৭ দফা নিয়ে মাঠে নামা গেলে হয়তো ব্যাপক মানুষ মাঠে নেমে আসবে। কিন্তু এরই মধ্যে ফ্রন্টের সঙ্গে আওয়ামীলীগ তথা ১৪ দলীয় জোটে সংলাপ অনুষ্ঠানের খবরে সর্বত্র পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। অন্যান্য জোটগুলো সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে আহ্বান জানানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদেরকেও সংলাপে বসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ফলে এই মুহূর্তে সংলাপ দেশি এবং আর্ন্তজাতিক সকল মহলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু বিএনপি সংলাপের বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী নয় যে, সেটি তাদের কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তৃতা থেকে জানা যাচ্ছে। সেকারণে তারা সংলাপ, আন্দোলন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি বিষয়টিকে দলীয় নেতাকর্মীদের সম্মুখে এনেছেন।

বিএনপি এতোদিন সরকারের সঙ্গে সংলাপের বসার দাবি করে এসেছিল, কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। তবে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লেখার পর প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক তা তাত্ক্ষণিকভাবে গৃহীত হওয়ায় ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দ সংলাপে বসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিএনপি হয়তো ভাবতে পারেনি সরকার সংলাপে ফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের বসবেন। যদি সরকার ফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেনের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করত তাহলে বিএনপির পক্ষে আন্দোলন এবং জনসমর্থন পাওয়ার সুযোগ যতটা সহজ হতো এখন সেটি সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে তফসিল ঘোষণার সঙ্গে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোট আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করত। সেটি ঘটলে নির্বাচনী পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, আবারও একটি হিংসাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারত। এক্ষেত্রে সরকার কৌশলগতভাবে সংলাপে সব জোটকে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে নির্বাচনের পরিবেশ কিছুটা হলেও সৃষ্টি হতে পারে।

এখন প্রয়োজন হচ্ছে সব দল ও জোটের পক্ষ থেকে একদিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া, সরকারের আন্তরিকতা যাচাই করা, অন্যদিক থেকে নির্বাচনী প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু তা না করে ৭ দফায় বেশ কিছু দাবি রয়েছে যেগুলোর বাস্তবায়ন এই মুহূর্তে মোটেও সম্ভব নয়, তাতে অনড় থাকলে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘিœত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, শেখ হাসিনার অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে কেন ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে? এমন প্রশ্নের সহজ-সরল উত্তর হচ্ছে, আগে থেকেই কেন আমরা ধরে নেব যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেশে অনুষ্ঠিত হবে না। এটি তো শেখ হাসিনার সরকারের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হলে দেশে-বিদেশে সব চাইতে মর্যাদার সংকটে পড়বেন শেখ হাসিনাই। শেখ হাসিনার জন্য সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা মস্তবড় চ্যালেঞ্জের কাজ। সে কাজ যেহেতু তিনি করতে চাচ্ছেন, সেটি তাকে করতে দেওয়া উচিত। ব্যর্থ হলে আন্দোলন করার সুযোগ থাকবে। তবে নির্বাচনের আগে আন্দোলন করার সময় নেই, এসব নিয়ে বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। মনে রাখতে হবে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতো। এবারও যদি নির্বাচনের আগে রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা হয় তাহলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

তবে নতুন কৌশলে দুই জোটে পা রেখেছে বিএনপি। এক জোটে সাবেক আওয়ামী লীগারদের সম্মুখে রেখে, অন্য জোটে পুরাতন মিত্ররা। এ ধরনের জোটের মধ্যে আদর্শের বালাই খুব একটা নেই। ফলে এমন জোট থেকে দেশ শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক কিছু লাভ করবে তেমন ভরসা করার আদৌ সুযোগ নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে সেই রকম কোনো নজির খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কেননা, এই জোটের মূলদল বিএনপি দ্বিতীয় বৃহত্তম দল কোনটি তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ এই জোটের পেছনেই লুকিয়ে আছে জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক নানা অপশক্তিÍযারা কোনোভাবে ক্ষমতায় যেতে পারলে ফ্রন্টের কোনো শরিক দল বা নেতাকেই মূল্য দেবে, তা আশা করা যায় না। কেননা, বিএনপি-জামায়াতের শক্তির কাছে তারা দাঁড়াতে পারার মতো অবস্থানে নেই। ফলে পরিণতি মোটেও ভালো কিছু হওয়ার আশা করা যাবে না। বরং দেশ একটি ভয়ানক সংঘাতের দিকেই যাবে। সেই সংঘাত পরস্পর-বিরোধী বা বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতি থেকেই উত্সারিত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের পার্থক্য ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মূলের দিকে তাকান না অনেকেই। অনেকেই সহজ-সরলভাবে দলীয় রাজনীতিকে দেখেন ও বোঝেন। কিন্তু নির্বাচনের পরই আসল রূপটি বের হয়ে আসে যেমনটি দেখা গেছে ২০০১-০৬ সালে। এ ধরনের আদর্শহীন পশ্চাত্পদ বা সাম্প্রদায়িক শক্তির জোট দেশ বা জনগণের ভোটে অনেকবারই নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু তাদের হাতে জনগণ বা গণতন্ত্র কখনই নিরাপদ হয়নি, বরং পিছিয়েছে। নির্বাচনের আগে অনেকেই জোট গঠনের মাধ্যমে নানা প্রতিশ্র“তি দিচ্ছেন। কিন্তু আদর্শহীন ব্যক্তি, দল ও জোটের ফাঁদে পা দিলে শেষ বিচারে মঙ্গলের চাইতে অমঙ্গলই বেশি হবে।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

 

॥ ড. এম এল আর সরকার ॥

সমঝোতার সম্ভাবনা এবং কিছু বিশ্লেষণ

কয়েকদিন আগেও দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অনেকটা অনিশ্চিত ও ঘোলাটে। সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারছিল না সামনের দিনগুলোতে কী হবে এবং আগামী নির্বাচনই বা কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া ড. কামাল হোসেনের চিঠি এবং সেই প্রস্তাবে আওয়ামী লীগ তথা প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুবাতাস বইছে। অনেকেই আশাবাদী এই ভেবে যে, আলোচনা শুরু হলে তা থেকে অবশ্যই দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের একটি পথ পাওয়া যাবে।

একটি সুন্দর সমাধানে পৌঁছার ব্যাপারে আমি নিজেও আশাবাদী এবং বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে বিদ্যমান কিছু বিতর্কিত বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে যাতে একটি সমাধানে উপনীত হওয়া যায়, সেজন্যই আমার এ বিশ্লেষণমূলক লেখা।

ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করেছেন, এজন্য প্রতিনিয়ত তাকে নানারূপ কটুকথা শুনতে হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, ড. কামাল একজন জাতীয় বেইমান। এটি সত্য, তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী জোট করেছেন; কিন্তু তাকে বেইমান বলার কোনো অবকাশ নেই। আসলে ড. কামাল ভালো করেই জানেন আওয়ামী লীগে তার কোনো শক্ত অবস্থান নেই। তার কোনো উপদেশ বা নিষেধ আওয়ামী লীগ শোনেনি এবং শুনবে না এটাও তিনি জানেন। বিগত কয়েক বছরে ড. কামাল বেশকিছু বিষয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন; কিন্তু কোনো ফল হয়নি। অনেকেই মনে করেন- এসব কারণেই ড. কামাল অনেকটা নিরুপায় হয়েই এ কাজটি করেছেন। মানুষ যখন নিরুপায় হয়, তখন নিজের স্বার্থেই বলুন বা দেশের স্বার্থেই বলুন- একটি পথ, সেটি পীড়াদায়ক হলেও খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করে। ড. কামালও তাই করেছেন এবং যেজন্য তিনি তার উৎস আওয়ামী লীগ ছেড়ে পরগাছা হয়েছেন বিএনপির ওপর।

রাজনীতির ইতিহাসে এরকম ঘটনা বিরল নয়। নিকট অতীতে এরকম একটি নজির স্থাপন করেছেন মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, যিনি তার নিজ দলের প্রধানমন্ত্রীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের দল ভেঙে তার চিরশক্রদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তার চিরশক্ররাও তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাককে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন। তাকেও তার দলের লোকেরা বেইমান বলেছেন; কিন্তু মাহাথিরের কাছে দলের চেয়ে দেশের স্বার্থই বড় ছিল।

মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে ড. কামালের পার্থক্য অনেক। মাহাথির একজন নির্ভীক ও বলিষ্ঠ নেতা, যিনি দল ও দেশ গড়েছেন। মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ড. কামাল দল গড়েননি, দেশ গড়েননি এবং জনগণের মনেও স্থান দখল করতে পারেননি; বরং আওয়ামী লীগ থেকে সুবিধা পেয়েছেন। তাই রাজনীতির ময়দানে তার অবস্থান সুদৃঢ় নয়। এ দুর্বল অবস্থানের কারণেই তাকে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করতে হচ্ছে, জামায়াতের বিষয়ে নীরব থাকতে হচ্ছে এবং দৃঢ়কণ্ঠে কূটনীতিকদের বলতে পারেননি বা পারছেন না- জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে তিনি দেশের নেতৃত্ব দেবেন।

সাত দফা ও জনগণের ভোটের অধিকার

ঐক্যফ্রন্টের নেতারা দিয়েছেন সাত দফা। বলছেন, দাবি মানতে হবে; না মানলে শাস্তি হবে কল্পনাতীত। কেউ বলছে- কীভাবে গদি থেকে নামাতে হয়, তা আমরা জানি। এ ফ্রন্টের নেতারা বলছেন- দেশে গণতন্ত্র নেই; দেশ চলছে এক স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায়। তারা বলছেন, এ সাত দফা দাবি আদায় করতে পারলেই দেশের মানুষ ভোটের অধিকার ফিরে পাবে এবং দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে।

ধরে নিলাম, এ সাত দফা দাবি আদায় হল এবং বিএনপি ক্ষমতায় এলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তারা ক্ষমতায় এসে স্বৈরতন্ত্র বন্ধের জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন- তা এ সাত দফায় নেই। আমি এর আগেও লিখেছিলাম- নিকট অতীতের এমন কোনো ঘটনা নেই, যার কারণে জনগণ বিশ্বাস করতে পারে, ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলে স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় দেশ পরিচালনা করবে না এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশের অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। প্রতিহিংসার রাজনীতির কোনো সুরাহা হবে না এবং এ সুরাহার কোনো ব্যবস্থাও ড. কামালের সাত দফায় নেই।

হ্যাঁ, ড. কামালের এ দাবিগুলো হয়তো তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হতে পারে; কিন্তু এতে জনগণের কোনো কল্যাণ হবে কিনা, তাতে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। কামাল সাহেব যতই গণতন্ত্রের কথা বলুন না কেন, অভিজ্ঞতা বলে- ক্ষমতা পাওয়ার পর সবাই স্বৈরচারে পরিণত হয়। দেশের মানুষ স্বৈরতন্ত্র চায় না এবং চায় না কোনো সহিংসতা। তারা চায় রাজনৈতিক দলগুলোর একটি শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান এবং দেশের সমৃদ্ধি। জনগণের এ চাওয়াগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে ভিশন, মিশন এবং কর্মপন্থা প্রয়োজন, তার কোনোটিই আসলে এ সাত দফায় নেই। ফলে ড. কামালের জ্বালাময়ী বক্তব্য বা হুমকি সত্ত্বেও জনগণ এখনও নির্বিকার। তারা কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।

ডা. বদরুদ্দোজার ১৫০-১৫০ বা ১৭৫-১২৫ আসন বণ্টন

এ প্রস্তাবের মাধ্যমে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী অনেকেরই হাসির খোরাক হয়েছেন এবং অনেকেই মনে করছেন- ক্ষমতার অংশীদারিত্ব পাওয়ার জন্যই তিনি এ হাস্যকর প্রস্তাবটি দিয়েছেন। এটি সত্য, এরকম প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে তার প্রস্তাবের একটি অন্তর্নিহিত গুরুত্ব আছে। বদরুদ্দোজা চৌধুরী হয়তো মনে করেন- যদি সমানসংখ্যক সংসদ সদস্য জোটের দুই গ্র“প থেকে নির্বাচিত হয়, তাহলে জোটের কোনো একটি দল (বড় দল) এককভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে না। এতে করে দেশের স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। তার এ ধ্যান-ধারণা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

৩ জুলাই ‘সংকট উত্তরণে সবাইকে ভাবতে হবে’ শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখায় আমি ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য বৃহৎ দুটি জোটের মধ্যে জাতীয় সংসদের আসনগুলো সমভাবে (১৫০-১৫০) ভাগ করে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে যোগ্য সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে উভয় দলকে ক্ষমতার ভাগীদার করার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আমি জানি না, বদরুদ্দোজা সাহেব সেই লেখাটি পড়েছিলেন কিনা! তবে এটি সত্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো একক দল বা জোটের ক্ষমতা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

আমরা যতই গণতন্ত্রের কথাই বলি না কেন, যে গণতন্ত্রে ৩০০টি আসনের মধ্যে শুধু ১৫১টি আসন পেলেই সব ক্ষমতার অধিকারী হওয়া যায় এবং ১৪৯টি আসন পেয়ে শূন্য হাতে বিরোধী দলের আসনে বসে থাকতে হয়, সেই গণতন্ত্র যতই ভালো হোক না কেন; তার সংশোধন প্রয়োজন। এরকম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন একটি সমঝোতাপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের ক্ষমতার অংশীদারিত্ব থাকবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বদরুদ্দোজা সাহেবের চিন্তাটিকে কোনোভাবেই হাস্যকর বলা যাবে না। তার এ প্রস্তাবটিকে একটু ঘুরিয়ে আসন বণ্টনটি দুটি বৃহৎ জোটের মধ্যে করলে একটি প্রকৃত জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার চূড়ান্ত লড়াই

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সাহেবের এ কথার যুক্তি অবশ্যই আছে। তবে এটি কোনোভাবেই বলা যাবে না- আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে হেরে গেলেই দেশের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হবে। বাংলাদেশের মানুষের রক্ত এখনও এত নিঃশেষিত হয়ে যায়নি যে- দেশের স্বাধীনতা বিনষ্ট হলে তারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে দ্বিধাবোধ করবে! তবে এটি সত্য, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে তা হবে তাদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। তাদের দেখানো পথ ধরেই হয়তো বিএনপি জোটও যতদিন সম্ভব, ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করবে। আর কোনোদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারবে কিনা বা এলেও কতদিন পর আসবে, তা বলা হবে সত্যিই দুষ্কর।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালেই এ দেশ আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো হবে, এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি। তবে মৌলবাদীদের যে আবারও উত্থান হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ কথাটি বিবেচনা করে অনেক মানুষ আছে, যারা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পছন্দ না করলেও শেষ পর্যন্ত নৌকায় ভোট দেয়। তারা এমনটি করে অনেকটা নিরুপায় হয়ে। তবে এটি যে তারা বারবার করবে, তা আশা করা অবান্তর। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে বলছি- অনুগ্রহপূর্বক আওয়ামী লীগকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করুন। দেশের স্বাধীনতা নষ্ট হবে ও সাম্প্রদায়িক সমস্যা শুরু হবে, এটি বলে যদি আওয়ামী লীগকে ভোট নিতে হয়; তবে তা হবে দুঃখজনক। আওয়ামী লীগ অনেক বড় দল এবং অনেক কাজ করেছে; কিন্তু এত বেশি আত্মতুষ্টিতে ভুগছে এবং কিছু দুর্নীতি দমনে এত নির্লিপ্ততার পরিচয় দিয়েছে, তা মেনে নেয়া অনেকের পক্ষেই কঠিন। হ্যাঁ, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে  ষড়যন্ত্র করার লোকের অভাব নেই; কিন্তু আওয়ামী লীগ সেই ষড়যন্ত্র বুঝতে পারবে না এবং ষড়যন্ত্রের ফাঁদেই পা দেবে, তা ভাবা কি সমীচীন?

আরেকবার নৌকায় ভোট দিন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একবার ভেবে দেখুন তো; কেন দেশের এত কাজ করার পরও আজ আপনাকে বলতে হচ্ছে আরেকবার নৌকায় ভোট দিন। আপনার বা আওয়ামী লীগের তো আরও অনেকদিন ক্ষমতায় থাকার কথা। কিন্তু আপনি চাইছেন, আর মাত্র পাঁচ বছরের জন্য  ক্ষমতা। প্রশ্ন হচ্ছে- এ পাঁচ বছর পর আমাদের দেশের ক্ষমতায় কে আসবে? আপনার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বা কে আসবে? এ প্রশ্নগুলোর একটিরও উত্তর পাওয়া দুষ্কর। আপনার মতো দেশের অনেকেই এখনও মনে করেন, আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা উচিত; কিন্তু কিছু লোকের দুর্নীতি, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার ধ্বংস এবং অতিরিক্ত আমলানির্ভরতা আওয়ামী লীগকে আজ প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে।

একবার ভেবে দেখুন তো, কোনো শেয়ারবাজার লুটপাটকারী যখন আপনার দলের জন্য ভোট চায়; তখন মানুষের মনের অবস্থা কেমন হয়? আপনি যখন বলেন, ‘আমি যাকে নৌকার প্রার্থী দেব, তাকে আপনারা ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন’ (যুগান্তর, ৩০-১০-২০১৮); তখন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কি অন্য কোনো নেতা বা নেতৃত্বের মূল্য থাকে?

আপনি ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি হয়েছেন। এটি আসলেই দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত সুখের খবর। আপনি অনেক করেছেন এবং বাংলাদেশ ইতিহাসে আপনার নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তারপরও দেশবাসীর আশা- দেশের সার্বিক মঙ্গলের জন্য আপনি আগামী নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের জন্য ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একটি সমঝোতায় উপনীত হয়ে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটি রাজনৈতিক সমঝোতা দেশে বড়ই প্রয়োজন। এ সমঝোতায় উপনীত হলেই আপনি, আওয়ামী লীগ এবং সর্বোপরি দেশ উপকৃত হবে।

প্রধানমন্ত্রীকে ড. কামালের চিঠি

অনেকদিন পর ড. কামাল হোসেন মনে হয় একটি সঠিক কাজ করেছেন। দেশের মানুষ এখনও পরিষ্কার নয়- প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আজকের সভায় কী কী বিষয় আলোচিত হবে। তবে অনুগ্রহপূর্বক আপনি আলোচনাটি শুধু আপনার সাত দফার ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখবেন না। আপনার এ সাত দফা দিয়েই হয়তোবা নির্বাচন করা সম্ভব। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনোভাবেই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের শান্তি আনয়ন করা সম্ভব নয়। দেশের শান্তির জন্য প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বন্ধ করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এরকম একটি ব্যবস্থা গতানুগতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আর সম্ভব নয়।

আশা করছি, আপনারা এমন একটি সমঝোতায় উপনীত হবেন- যার মাধ্যমে উভয় বৃহৎ জোটের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণমূলক একটি প্রকৃত জাতীয় সরকার ব্যবস্থা আগামী পাঁচ অথবা দশ বছরের জন্য এদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আপনি একবার নয়, দু’বার নয়, যতবার সম্ভব চিঠি দিয়ে আপনার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন; যাতে করে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি রূপরেখা প্রবর্তন করা সম্ভব হয়। এটি করতে পারলেই এদেশ থেকে রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ হবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে। এ পথ কঠিন, অবশ্যই আপনি বাধার সম্মুখীন হবেন আপনার জোট এবং আওয়ামী লীগের কিছু লোকের কাছ থেকে। তবে আশার কথা হচ্ছে, দু’দল থেকেই কিছু ভালো মানুষের সমর্থন আপনি পাবেন। আপনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী; যিনি আপনাকে এখনও ভালো চোখেই দেখেন। আপনার এবং প্রধানমন্ত্রীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা সফল হোক, এ কামনা করি।

লেখক ঃ অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

॥ আবদুল লতিফ মন্ডল ॥

আইনটি যেন দুর্নীতিবাজদের ঢাল না হয়

অবশেষে জাতীয় সংসদে পাস হল সরকারি চাকরি বিল-২০১৮। এরপর এটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর আইনে পরিণত হবে এবং তা বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হবে।

পাস হওয়া বিলের ১(১) ধারায় বলা হয়েছে, এই আইন ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’ নামে অভিহিত হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা থাকলেও ইতঃপূর্বে কোনো সরকার আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন না থাকায় বিভিন্ন সরকার সরকারি কর্মচারীদের দলীয়করণের উদ্দেশ্যে নিয়োগ ও পদোন্নতির বিধি-বিধানাবলি ব্যবহার করেছে। নিজ নিজ দলের আদর্শ ও ভাবধারায় বিশ্বাসী সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি ও পদায়নের সুবিধার্থে তারা ক্ষমতায় এসে বিদ্যমান বিধিমালায় পরিবর্তন এনেছে অথবা নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করেছে।

দেরিতে হলেও সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের গুরুত্ব অনুধাবন করে আইনটি প্রণয়নে এগিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারেন।

আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্যাবলি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সরকারি চাকরি বিল ২০১৮’-তে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলির বিভিন্ন বিষয়ে প্রণীত ভিন্ন ভিন্ন আইন, প্রয়োজন অনুযায়ী ১৩৩ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত বিধি ও সরকারি অনুশাসন দ্বারা সরকারি কর্মচারীদের চাকরি সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হচ্ছে।

সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকারি চাকরি সংক্রান্ত একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন থেকে অনুভূত হওয়ায় ‘সরকারি চাকরি আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে প্রশাসনকে নির্দলীয় ও গণমুখী করার অঙ্গীকার করেছিল। মেনিফেস্টোতে বলা হয়, চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির মাপকাঠি হবে মেধা, দক্ষতা ও জ্যেষ্ঠতা।

প্রশাসন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে। প্রশাসনে গতিশীলতা আনয়নে এবং জনসেবার মানোন্নয়নে একটি কার্যকর সিভিল সার্ভিসের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়নের কথা বলতে শুরু করে। দেশের শাসন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি কার্যকর সিভিল সার্ভিসের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে শক্তিশালী সিভিল সার্ভিস গঠনের ওপর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক (২০১১-১৫) পরিকল্পনায় জোর দেয়া হয়।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রস্তাবিত আইনটি সম্পর্কে মতৈক্যের অভাব এবং এটির বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি প্রভাবশালী কর্মচারীদের বিরোধের কারণে মহাজোট সরকারের পাঁচ বছরে আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট থেকে সরে এসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘সরকারি কর্মচারী আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।

‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’-এর উল্লে¬খযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হল- (ক) সরকার, সরকারি গেজেটে আদেশ দ্বারা, প্রজাতন্ত্রের যে কোনো কর্ম বা কর্মবিভাগ সৃজন, সংযুক্তকরণ, একীকরণ বা বিলুপ্তকরণসহ অন্য যে কোনোভাবে পুনর্গঠন করতে পারবে।

(খ) সরকারি কর্মচারীদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আইনানুগ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে। (গ) এ আইনের আওতাভুক্ত কোনো কর্ম বা কর্মবিভাগে সরাসরি জনবল নিয়োগের ভিত্তি হবে মেধা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের নাগরিক নন এমন কোনো ব্যক্তিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ করা যাবে না। (ঘ) কোনো স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরি বিবেচনাক্রমে পদোন্নতি দিতে হবে।

(ঙ) সরকার, সরকারি গেজেটে আদেশ দ্বারা, কোনো সরকারি কর্মচারীর বা সব সরকারি কর্মচারীর বা সরকারি কর্মচারীদের কোনো অংশের জন্য বেতন, ভাতা, বেতনের গ্রেড বা স্কেল, অন্যান্য সুবিধা ও প্রাপ্যতা বা অবসর সুবিধা সম্পর্কিত শর্তাদি নির্ধারণ করতে পারবে।

(চ) সরকার বা, ক্ষেত্রমতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সরকারি কর্মচারী ও তার পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ে কর্মকৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(ছ) সরকার, সরকারি সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণে কর্মচারীদের বিশেষ সাফল্য, উদ্যোগ, উদ্ভাবনী প্রয়াস বা অবদানের জন্য প্রণোদনা, পুরস্কার, স্বীকৃতি বা সম্মান প্রদান করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

(জ) সরকার, জনপ্রশাসনের সব পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিতকল্পে, সরকারি কাজ সম্পাদনের নীতি, শুদ্ধাচার চর্চা এবং কর্মচারী কর্তৃক অনুসরণীয় নৈতিকতার মানদন্ড অনুসরণের প্রক্রিয়া ও কৌশল প্রণয়ন করবে।

(ঝ) এ আইনের বিধানাবলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে সরকারি কর্মচারীর আচরণ এবং শৃঙ্খলা-সংশ্লি¬ষ্ট বিষয় ও শর্তাদি সংশ্লিষ্ট বিধি ও সরকার কর্তৃক সময় সময় জারিকৃত দ্বারা নির্ধারিত হবে।

(ঞ) কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেফতার করতে হলে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে।

(ট) কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক মৃত্যুদন্ড বা এক বছর মেয়াদের অধিক মেয়াদের কারাদন্ডে দন্ডিত হলে দন্ড আরোপের রায় বা আদেশ প্রদানের তারিখ হতে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত হবেন। তবে কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি অপরাধে এক বছরের বেশি দন্ড, যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি যদি তাকে অব্যাহতি দেন, সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হবেন।

(ঠ) চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে যে কোনো সময় একজন সরকারি কর্মচারী অবসর গ্রহণ করতে পারবেন এবং চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, সরকার এমন কোনো সরকারি কর্মচারীকে কোনোরূপ কারণ দর্শানো ছাড়াই চাকরি হতে অবসর প্রদান করতে পারবে।

(ড) রাষ্ট্রপতি, জনস্বার্থে, কোনো কর্মচারীকে চাকরি হতে অবসর গ্রহণের পর সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করতে পারবেন।

(ঢ) সরকারি কর্মচারীর অবসরে গমন বা অন্য কোনো উপায়ে চাকরির পরিসমাপ্তির ক্ষেত্রে সুবিধাদির প্রাপ্যতা, শর্তাদি ও অন্যান্য বিষয় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে।

তবে অবসর গ্রহণের পর কোনো ব্যক্তি গুরুতর অপরাধে দন্ডপ্রাপ্ত বা কোনো গুরুতর অপরাধের দোষে দোষী সাব্যস্ত হলে, কারণ দর্শানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ প্রদান করে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তার অবসর সুবিধা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বাতিল, স্থগিত বা প্রত্যাহার করতে পারবে।

আইনটির একটি ধারা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেফতার করতে হলে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে- এ ধারাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিলটির ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র সদস্যরা বলেছেন, ফৌজদারি অপরাধের জন্য মন্ত্রী-এমপিদের গ্রেফতারে অনুমতি লাগে না।

কিন্তু সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতারে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে, এটা বৈষম্যমূলক। এটা কালো আইন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ ছাড় দেয়ার এ বিধান বাতিল করার জন্য দাবি জানিয়েছে।

তবে এখানে যে বিষয়টি স্মরণে রাখতে হবে তা হল, সরকারি কর্মচারীরা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারকে সহায়তা করেন এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন।

তারা সাধারণত একটি টিম হিসেবে কাজ করেন। ফলে কোনো একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে গৃহীত হওয়ার আগেই তাকে গ্রেফতার করা হলে তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যায়।

দ্বিতীয়ত, যে কোনো সরকারি কর্মচারীর পদের বিপরীতে তার দায়িত্বাবলি নির্ধারণ করা থাকে। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে গৃহীত হওয়ার আগেই তাকে গ্রেফতার করা হলে তার পদের দায়িত্বাবলি পালন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়।

কারণ তার আটককালীন তার পদের দায়িত্বাবলি নির্বাহের জন্য নতুন কোনো পদ সৃষ্টি করা যায় না। তার দায়িত্ব অন্য কোনো কর্মচারীকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রদান করা হলে একজন ব্যক্তির পক্ষে দুটি পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

এতে সরকার তথা জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করে এর সত্যতা খুঁজে পেলে তাকে গ্রেতারের অনুমতি দেবে। এসব বিবেচনায় কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেফতারে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণের বিধানটি যুক্তিসঙ্গত হয়েছে বলে মনে হয়।

সবশেষে বলতে চাই, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিককালে একটি জেলের জেলারকে ঘুষের ৪৪ লাখ টাকাসহ আটক, ঘুষের সাড়ে ১৪ লাখ টাকাসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি টিমের হাতে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা গ্রেফতার, ২০১২ সালে ঘুষের ৭০ লাখ টাকাসহ তৎকালীন রেলমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব ও রেলের দু’জন কর্মকর্তাকে আটক দুর্নীতির কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। তাই সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে সজাগ থাকতে হবে যেন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আদালতে গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেফতারে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণের বিধানটি দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারীদের ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়।

লেখক ঃ সাবেক সচিব, কলাম লেখক

॥ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.) ॥

জগাখিচুড়ি ঐক্যফ্রন্টের আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্য কী

তথাকথিত ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন হুমকি দেওয়া শুরু করেছেন, যার কোনো রাজনৈতিক ক্রেডেনশিয়াল নেই, নেই কোনো জনসমর্থন ও জনসংযোগ। কিন্তু হুমকি দিয়ে বলেছেন, সাত দফা না মানলে তিনি এবং তেনারা নাকি দেখে নিবেন। হায়রে বাংলাদেশের রাজনীতি। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্য না পেলে যে কামাল হোসেনকে কেউ চিনত না। সেই কামাল হোসেন আজ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে হুমকি দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে, যিনি গত ৩৭ বছর জীবনের ওপর বাজি ধরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। গত দশ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে একটা মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। বিশ্বব্যাংকসহ বিশ্বের বড় বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, দারিদ্র্য দূরীকরণসহ বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালের পর একাত্তরের পরাজিত শক্তি কর্তৃক বিনষ্টিত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পূর্ণ বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসছেন। তখন এই সময়ে ড. কামাল হোসেন মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক অপশক্তিকে সঙ্গে নিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করার হুমকি দিচ্ছেন। ড. কামাল হোসেন যেহেতু একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন না, তাই হয়ত তিনি জানেন না মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরে ওই অপশক্তিকে কিভাবে পরাজিত করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা তো এখনো জীবিত আছে এবং তাদের সন্তানেরাও এখন নতুন প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা। একদিকে কথিত ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতির জন্য আরেকটি ট্র্যাজেডি হলেও অন্যদিক থেকে মন্দের ভালো এই জন্যে যে, এর মাধ্যমে ড. কামাল হোসেনসহ অন্য সকলের আসল রূপটি এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে উন্মোচিত হয়ে গেল। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, তিনি বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করেছেন, তারেক রহমান এবং জামায়াতের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। একবিংশ শতাব্দীতে ছাই দিয়ে মাছ ঢাকার দিন শেষ। এ সমস্ত ছলনাপূর্ণ কথা মানুষের বুঝতে সময় লাগে না। বিএনপির অপর নাম জামায়াত এ কথা একটু দেরিতে হলেও বাংলাদেশের মানুষ বুঝে ফেলেছে। আমার এ কথাটি কোনো কথার কথা নয়, এটি নির্মম ও কঠিন সত্য কথা। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির জন্ম হয় ১৯৭৮ সালে। কিন্তু তার জন্ম প্রক্রিয়া ও কর্মকা- শুরু হয়ে যায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের অব্যবহিত পর। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক শাসক হওয়ার পর থেকেই সেই কাজ শুরু করেন।

তিনি সামরিক আদেশ জারি করে মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাহাত্তরের সংবিধান থেকে একেবারে মৌলিক নীতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সম্বলিত সকল শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ বাতিল করে দিলেন। এগুলো তো রাজনীতি ও রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়। তিনি তো তখনো রাজনীতিক হননি এবং জনগণের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তিনি এ কাজগুলো করলেন। বিএনপির জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশে একটা ফ্রেশ রাজনৈতিক দল হিসেবে। তাহলে মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং সেখান থেকে উৎপত্তি হওয়া রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও দর্শনের সঙ্গে বিএনপির তো কোনো বিরোধ ও শক্রতা থাকার কথা নয়। এগুলোর সঙ্গে জামায়াতের চিরদিনের শক্রতা একথা সবাই জানে। ১৯৭১ সালে জামায়াত এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ইতিহাস বাতিল করে দেওয়ার মাধ্যমে তো জামায়াতের এজেন্ডাই বাস্তবায়িত হয়ে গেল। নাম দিয়ে কী হবে, কাজটিই তো ব্যক্তি ও দলের আসল পরিচয় বহন করে। একথা তো দিবালোকের মতো পরিষ্কার, বাংলাদেশের জামায়াত হলো পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল, একথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে।

বিএনপি নামের ছদ্মাবরণটি ধারণ করা তখনকার বাস্তবতায় জরুরি ছিল এবং এটি বিএনপিকে বহুবিধ রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। এটিকে শক্তিশালী করার জন্য বিএনপির নেতৃত্বে আনা হয়েছে জিয়াউর রহমানকে, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত। তার সঙ্গে আরও গুটিকয়েক ক্ষমতা ও সম্পদলোভী কক্ষচ্যুত মুক্তিযোদ্ধা যোগ দেওয়ায় মানুষ তখন বিভ্রান্তিতে পড়ে যায় এবং তাত্ক্ষণিকভাবে এদের আসল রূপটি বুঝে ওঠতে পারেনি। বিএনপির এই ছদ্মাবরণটি আরও পুরু করার জন্য কিছু দিনের জন্য জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশের দ্বারা সাংবিধানিক বিধি নিষেধ তুলে দিয়ে মূল জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেয়, যাতে মানুষ বিএনপিকে জামায়াত বলে আর সন্দেহ করতে না পারে। তাই বিএনপির যে কর্মকান্ড, যার সামান্য কিছু উপরে উল্লেখ করেছি তাতে বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলা তো দূরের কথা তাদের বাংলাদেশে রাজনীতি করার মৌলিক অধিকার থাকার কথা কিনা সেটাই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে ধরা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ বৃহত্তর তরুণ সমাজের কাছে। কারণ ২৩ বছর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জনের মাধ্যমে যে আদর্শের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই আদর্শের শুধু বিরোধিতা নয়, সেগুলো ধ্বংস করাই যাদের উদ্দেশ্য তারা কি বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, আমাদের রাজনীতির দুর্ভাগ্য জাতিদ্রোহের মতো আদর্শ নিয়ে তারা বহাল তবিয়তে বাংলাদেশে রাজনীতি করছে। তারপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনাটির বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখুন। এ সংক্রান্ত মামলার রায় সম্প্রতি আদালত থেকে ঘোষণা করা হয়েছে। জজ মিয়া নাটক সাজানো, এতবড় ভয়ঙ্কর অপরাধের আলামত নষ্ট করে ফেলা, তথাকথিত বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রহসন, ঘটনার পর আরও প্রায় আড়াই বছর ক্ষমতায় থেকে তদন্ত শেষ না করাসহ সর্বশেষ মামলার রায়ে যা বেরিয়ে এসেছে তাতে দল হিসেবে বিএনপি কি এই হত্যাকান্ডের দায় এড়াতে পারে?

তাহলে কি এই দাঁড়াল না যে, ড. কামাল হোসেন আঁতাত করলেন বিএনপির বেনামে জামায়াতের সঙ্গে এবং যে দলটি সরাসরি রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। শুধু পার্থক্য এতটুকু যে, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে, আর কলুষিত রাজনীতির বিভ্রান্তিতে বিএনপির নিবন্ধন বহাল আছে। সম্মানিত পাঠকদের অনুরোধ করব জিয়াউর রহমান কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী সম্পন্ন করার পর ওই সংবিধানের দিকে তাকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের যে স্বরূপটি পাওয়া যায় তার সঙ্গে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপির শাসনের স্বরূপটা মিলিয়ে দেখলে অবশ্যই উপলব্ধি করবেন ওই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে  কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে কি এই দাঁড়াল না যে, বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তান বানাবার যে প্রকল্প জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন সেই কাজটির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন প্রায় সেরে ফেলেছিলেন ২০০১-২০০৬ মেয়াদের জামায়াত-বিএনপি সরকার। এহেন বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল যখন আঁতাত করেন এবং তার নেতা হন তখন বাংলাদেশের মানুষের বুঝতে বাকি থাকে না এনাদের আসল উদ্দেশ্য কী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস কোথায় ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পূর্বে ও পরে তার ভূমিকা এখন মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ঐক্যফ্রন্টের অপর নেতা আসম আবদুর রব গংয়েরা স্বাধীনতার অব্যবহিত পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দলের খেতাব পেয়েছিলেন। ঐক্যফ্রন্টের আরেক নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না তো বহুরূপী। জাসদ, বাসদ, আওয়ামী লীগ হয়ে তিনি এখন বেনামে বিএনপি। একবার পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল তিনি লন্ডনে অবস্থিত বিএনপির এক নেতার সঙ্গে কথোপকথনে বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দু’চারটি লাশ ফেলে দিলেই আন্দোলন জমে উঠবে। সুতরাং ঐক্যফ্রন্টের মিথস্ক্রিয়া ও লেগেসি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য। আর এটা বাংলাদেশের মানুষ বুঝে ফেলেছে বলেই তারা আজ দেশের বৃহত্তর মানুষের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তাই নির্বাচন তাদের উদ্দেশ্য নয়। নির্বাচন উদ্দেশ্য হলে জয়ী হওয়ার পর কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা স্পষ্ট করে বলতে পারছে না কেন? আগে বললেও এখন কামাল হোসেন বলছেন তিনি কিছুই হতে চান না। আর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন, একথা ড. কামাল, রব, মান্না কেউ-ই লজ্জায় বলতে পারছেন না। সুতরাং জগাখিচুড়ি বাংলাদেশ বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন নয়, আসলে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে নির্বাচনকে বানচাল করার জন্যই তারা মাঠে নেমেছেন। কারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বিরোধী এসব ছদ্মবেশীদের প্রত্যাখ্যান করবে সেটা তারা বুঝে ফেলেছে।

লেখক ঃ রাজনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

॥ শেখর দত্ত ॥

নৌকাকে নৌকার রাজনীতি দিয়ে ঘায়েলের ফন্দি!

নির্বাচন সামনে রেখে দ্রুততার সঙ্গেই পাল্টে গেল রাজনৈতিক দৃশ্যপট। ২৮ অক্টোবর রবিবার সন্ধ্যায় সংলাপ চেয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে চিঠি দিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। চিঠি পাওয়ার ২৪ ঘণ্টা না যেতেই সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংলাপে আওয়ামী লীগের সম্মতির কথা জানিয়ে দিয়ে বললেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে নেতৃত্ব দেবেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সংলাপ হবে। দিনক্ষণ স্থান দ্রুতই চিঠি দিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে জানিয়ে দেয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে বিএনপি নেতারা এই কথাকে ইতিবাচক হিসেবে আখ্যায়িত করলেন।

এখন বলা যাচ্ছে নির্বাচন সামনে রেখে সংলাপ হচ্ছে। বলাই বাহুল্য বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব সময়ের চাইতে এখন অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত এবং ভালোর দিকে একটি পদক্ষেপ। বিগত নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে একদিকে রাস্তায় চলছিল নাশকতামূলক আগুন সন্ত্রাস আর অন্যদিকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া টেলিফোনে সংলাপের আমন্ত্রণ এবং নির্বাচনকালীন সংবিধান অনুয়ায়ী মন্ত্রিসভায় যোগদানের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এবারে রাস্তার নাশকতা নেই। সংলাপ হচ্ছে।

এদিকে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ড. কামাল এখন কার্যত বিএনপির নেতা। সিলেটে স্লোগান উঠলেও ড. কামাল খালেদা জিয়ার মুক্তি চাননি। চট্টগ্রামে খালেদা জিয়ার মুক্তি তিনি চাইলেও ভারপ্রাপ্ত  চেয়ারপারসন তারেক জিয়ার মুক্তি চাননি ড. কামাল। বরং ২২ অক্টোবর তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘ব্যক্তি তারেক রহমানের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ এ কথাও হজম করছে বিএনপি। সংলাপের আগে কোনো পূর্বশর্তও দেয়নি বিএনপি। কতটা দুর্ভাগ্য ও বিপাকের জালে আটকা পড়েছে ক্যু-পাল্টা ক্যু, হত্যা-খুনের ভেতর দিয়ে সেনা ছাউনিতে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া এবং গ্রহণযোগ্য  কিংবা অগ্রহণযোগ্য যা-ই হোক, বিগত সময়ে তিনবারের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, তা এ থেকেই প্রমাণিত হয়।

ড. কামাল যে চিঠি দেবেন, তা উল্লিখিত সংবাদ সম্মেলন থেকে আগেই জানা গিয়েছিল। অপরদিকে একই দিনে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আগে সংলাপের আবেদনের চিঠি পাই পরে দেখা যাবে।’ আসলে হত্যা-ক্যু আর ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনীতিতে অনেক চমক দেখালেন বটে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্রথমবার ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে সংবিধান অনুয়ায়ী তিনি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বজনমান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। এটা ছিল দেশের রাজনীতির ইতিহাসের এক অনন্য নজির, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দ্বিতীয়বার ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন বিএনপিকে নির্বাচনে নিতে। এবারো তিনি সংলাপের আহ্বান গ্রহণ করলেন। বারবার বিফল হওয়া সত্ত্বেও তিনি যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে হাল ছাড়ার ব্যক্তি নন, তা তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ রেখে চলেছেন।

বিগত ২৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে কখনো পিছপা হই না। রাজনৈতিকভাবেই আমরা মোকাবেলা করি।’ রাখঢাক না করে সুস্পষ্ট কথা তিনি বলেন এবং ওই কথা যে তিনি রাখেন সংলাপে সম্মতি এর প্রমাণ। সেইসঙ্গে তিনি এটাও বলেছিলেন, ‘তবে কেউ জঙ্গি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি বা অশালীন উক্তি করলে মানুষ যদি তার বিচার চায়, তবে তার বিচার করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। রাষ্ট্র তা করছে এবং করবে।’ অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে যেমন ছাড় দিতে কুণ্ঠিত হন না, তেমনি কেউ দেশ ও জনগণের স্বার্থের বিপরীতে অন্যায় কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত ছাড় দেন না। দলীয় বড় বড় কত নেতাকে যে তিনি কত সময়ে এবং এখনো মন্ত্রিত্ব না দিয়ে বাইরে রেখেছেন, তার হিসাব নিলেই বিষয়টা সুস্পষ্ট হবে। যিনি গণতন্ত্রকে লালন করেন, তিনিই রাজনীতির প্রয়োজনে যেমন ছাড় দিতে পারেন, তেমনি গণবিরোধী অন্যায় কাজ করলে তাকেও ছাড় দেন না। তাই রাজনীতির অঙ্গনে কথা আছে, বাঘে ধরলে ছাড়ে কিন্তু  শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না।

কিন্তু জাতির অদৃষ্টের পরিহাস! সেই পাকিস্তানি আমল থেকে আজো পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ কখনো রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করে না। কথা দিয়ে কেউ কথা রাখেনি। বরং কথা না বলে ঠান্ডা মাথায় খুন-হত্যা, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করেছে। ক্যু-পাল্টা ক্যু করেছে। হ্যাঁ ভোট-না ভোটের প্রহসন নাটক করেছে। গণতন্ত্রের কথা বলে লেবাসী গণতন্ত্র, পার্লামেন্টের কথা বলে রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট দিয়ে দেশবাসীকে ধোঁকা দিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা শেষ বিচারে ধোঁকা দেননি। রাজনীতির নানা কৌশলের খেলা খেলে শেখ হাসিনা সব শেষে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিয়েছে আর প্রতিপক্ষ জাতিকে কলঙ্কিত করতে ওই সব মানবতাবিরোধীকে মন্ত্রী বানিয়ে বাড়িতে-গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর লাইসেন্স দিয়েছে। হেফাজত প্রশ্নেও শেখ হাসিনার অবস্থান সুস্পষ্ট। শাপলা চত্বরের তা-বকে তিনি দমন করেন শক্ত হাতে, উল্টোদিকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে যেহেতু বিলোপ করা সম্ভব নয়, তাই তিনি ওই শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ বা মূলধারায় আনতে ব্যবস্থা নিতেও রাখঢাক করেন না।

বলাই বাহুল্য, রাজনৈতিক দলকে কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে প্রতিনিয়ত ভোটের হিসাব কষতে হয়, যে দল তা করে না সেই দল বন্ধ্যা, টিকে থাকার যোগ্যতা হারায়। ভোটের সব হিসাব-নিকাশের সঙ্গে সাহস নিয়ে হত্যা-ক্যু-পাল্টা ক্যু কবলিত দেশকে এগিয়ে নিতে শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে এসে রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর হত্যার ঝুঁকি নিয়ে যা করে চলেছেন, সেসব কেবল বিস্মিত হওয়ার মতোই নয়, উদাহরণ স্থানীয় ও শিক্ষণীয়ও বটে! ভালোবাসা, উদারতা ও ক্ষমার কারণে বঙ্গবন্ধু চার নেতাসহ জীবন দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ঠেকে ঠেকে শিখেছেন। টেউয়ের ওপর দিয়ে কীভাবে পালের নৌকাকে এগিয়ে নিতে হয়, কীভাবে দেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশ ও জনগণের জীবন-জীবিকা উন্নত করতে হয় প্রভৃতি সবই দেখিয়ে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। যেসব নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল মহল কথায় কথায় শেখ হাসিনার সর্বৈব সমালোচনায় পঞ্চমুখ হন, সংলাপের আহ্বান মেনে নেয়ায় পর তারা কি বলেন, তা শোনার জন্য দেশবাসী অপেক্ষায় থাকবে।

বিএনপির দুই সময়ের দুই নেতা জিয়াউর রহমান কিংবা খালেদা জিয়া কতটুকু ও কীভাবে কথার বিপরীতে কাজ করেছেন, তা এই কলামে লেখা হচ্ছে না। অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাস হচ্ছে, হত্যা-ক্যুয়ের রাজনীতির খেলা খেলতে গিয়ে জিয়া হত্যার শিকার হয়েছেন আর খালেদা জিয়া ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে বিচারকদের বয়স বাড়িয়ে আদালতকে নিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন, এখন তিনি অন্যায় করে আদালতের রায়েই রয়েছেন জেলে। প্রবাদ বলে, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। ড. কামাল যেহেতু কার্যত এখন বিএনপির নেতা, তাই এই নেতার কথা ও কাজে কতটুকু মিল রয়েছে, সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়। ড. কামাল সংলাপের আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে দুই চিঠিতেই লিখেছেন, ‘ইতিবাচক রাজনীতি একটা জাতিকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করে জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারসমূহ আদায়ের মূল শক্তিতে পরিণত করে, তা বঙ্গবন্ধু আমাদের শিখিয়েছেন। নেতিবাচক রুগ্ন রাজনীতি কীভাবে আমাদের জাতিকে বিভক্ত ও মহাসংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে তাও আমাদের অজানা নয়। এক ব্যক্তির এক ভোটের বিধান জনগণের জন্য বঙ্গবন্ধুই নিশ্চিত করেছেন।’ জাতির পিতা শব্দটা উচ্চারণ করা ছাড়া ড. কামাল স্বল্প কথার মূলে ইতিহাসের সত্যই তুলে ধরেছেন।

চিঠিতে তিনি যা বলেছেন, সেটা ভুল বলতে পারে কেবল পরাজিত শক্ররাই। যথার্থ মূল্যায়নই তিনি করেছেন। আমাদের জাতীয় পছন্দ গণতন্ত্র ছিল বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত স্বপ্ন। তিনিই দেশের ইতিহাসে প্রথম জাতিকে ‘এক লোক এক ভোটের’ ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। এই গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়েই ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে দেশে পাকিস্তানের মতো হত্যা-ক্যুয়ের রুগ্ন রাজনীতি আমদানি করেছে। যার বিষবাষ্পে এখন আমরা শ্বাসরুদ্ধ। অগ্নিশিখায় আমরা দগ্ধ। এই কথাগুলোই তো এতদিন জাতীয় মূলধারার রাজনীতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

কিন্তু এই ঐতিহাসিক সত্য কি বিএনপি মানে? বিএনপি কি ড. কামালের চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী ‘এ সংকট থেকে উত্তরণ’ ঘটাতে ‘জাতীয় চ্যালেঞ্জ’ মোকাবেলা করতে ড. কামালকে নিয়ে আদৌ মাঠে নেমেছে! বিএনপির কাছে তো জিয়াউর রহমান হচ্ছেন স্বাধীনতার ঘোষক! যেন জিয়ার ঘোষণা থেকেই শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ! তারেক জিয়া তো বলেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াই ‘জাতির পিতা’! বিএনপির কথা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন গণতন্ত্রের হন্তারক; বিপরীতে জিয়া হচ্ছেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক! বিএনপি কেবল বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের দেশ থেকে পালানোর সুযোগ করেই দেয়নি, হত্যাকারীদের মন্ত্রীও বানিয়েছে! বঙ্গবন্ধুর হত্যার দিন জাতীয় শোক দিবসে কেক কেটে ভুয়া জন্মদিন পালন করে চলেছে! এক কথায় বিএনপি এতদিন যা বলে আমাদের জাতি ও রাজনীতিকে ‘বিভক্ত’ ও ‘রুগ্ন’ করেছে; এর বিপরীত কথাই ড. কামাল বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে চিঠিতে বলেছেন।

ওই চিঠিতে কি বিএনপি সই করবে? চিঠির কথাগুলো কি প্রকাশ্যে উচ্চারণ করতে পারবে? ড. কামাল কি পারবেন বিএনপিকে দিয়ে কথাগুলো বলাতে? বিএনপি যদি ড. কামালের কথাগুলো সর্বান্তকরণে মেনে নিতে পারে, তবে তো ল্যাঠার অনেকটাই চুকে যায়! জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনার রাজনীতিতে যোগদানের একটা দিক বঙ্গবন্ধুকে সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। শেখ হাসিনা আসলেই উদার, সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন এবং গণতন্ত্র চান বলে ঐক্যফ্রন্টের দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবেন বলেছেন। কোনো শর্ত তিনি দেননি। ড. কামালের চিঠিটা পড়ে আমারই মনে হয়েছে, এই শর্ত দেয়াটা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সঙ্গত ছিল যে, এই চিঠিতে দলগতভাবে বিএনপিও সই করুক। কেননা সত্য মেনে নিয়েই কেবল সত্যের জন্য লড়াই করা যায়, সত্যের অভিমুখে অগ্রসর হওয়া যায়। এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলেই বুঝা যাবে, ড. কামালের কথা ও কাজের ফারাক কতটা আকাশ-পাতাল।

প্রকৃত বিচারে বিএনপিকে আড়ালে রেখে তিনি আসলে জাতীয় রাজনীতির মূলধারার কথাগুলো আওড়িয়ে জাতীয় রাজনীতির মূলধারাকেই আঘাত করতে চাইছেন। ‘জয় বাংলা’ বলে বক্তৃতা দেয়া হয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ-মঞ্চ থেকে আর বক্তৃতা দেয় বিএনপি নেতারা এবং জামায়াত থাকে শ্রোতা! এটাকে ঘৃণ্য মুখোশ ছাড়া আর কি বলা যাবে! এতদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল নির্যাস বাঙালি জাতিসত্তাকে সমূলে উৎখাত করার টার্গেট করে পরাজিত শক্তি অস্ত্র ও অপপ্রচার নিয়ে রাজনীতির মাঠে ছিল আর এখন চোরাবালিতে পড়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দিয়েই আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার জন্য মুখোশের আশ্রয় নিয়েছে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তথা নৌকাকে নৌকার রাজনীতি দিয়ে কুপোকাৎ করার ফন্দি আঁটা হয়েছে। সেই পরিবেশ ও সুযোগই পরাজিত শক্তিকে করে দিতে চাইছেন ড. কামাল। ঘরের শক্র বিভীষণ প্রবাদটা তো আর এমনি এমনি জনপ্রিয় নয়। এখন দেখা যাক, কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়!

লেখক ঃ রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

 

॥ কারশেদ আলম ॥

জাসদ-এর লড়াই ও সংগ্রামের ৪৬ বছর

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে আত্মপ্রকাশ করে। বাঙালি জাতি ও জনগণের সার্বিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চালিত এক দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফসল জাসদ।

“মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে উপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রশাসন ও পশ্চাদপদ পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বৈপ্ল¬¬বিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব”-এ বিশ্বাস নিয়ে জাসদের যাত্রা শুরু। সে জন্য জন্মলগ্নেই জাসদ ঘোষণা করে যে,  বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে একটি শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পর আজো জাসদ সে মূল ঘোষণা থেকে বিচ্যুত হয়নি। তাই আজকের জাসদ বিশ্বাস করে যে, ’৭২ সালের সেই মূল ঘোষণার আলোকে বর্তমান-আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে একটি শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই তার ধর্মভিত্তিক জাতি গঠনের ব্যর্থ প্রয়াস ও উপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে শুরু হয় বাঙালি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসন বিরোধী গণতন্ত্র ও শিক্ষার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ শুরু হয় এবং গড়ে উঠে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্ল¬¬বী পরিষদ’ ও তার নেতৃত্ব কাঠামো কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস। ১৯৬৬ সালে শেষ মুজিবের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার বেগবান করে। ১৯৬৯ সালে ৬ দফা ভিত্তিক ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন গণ অভ্যূত্থানে পরিণত হয় এবং আইয়ুব শাহীর পতন ঘটায়। এ সকল আন্দোলনে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ তার পরিকল্পিত কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলধারা হিসেবে বেড়ে উঠে।

স্বাধীন বাংলা বিপ্ল¬বী পরিষদ-এর নেতৃত্বে ও দায়িত্বে ১৯৭০ সালের ৬ জুন প্রস্তাবিত স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরি হয় এবং ৭ জুন ‘জয়বাংলা বাহিনীর পতাকা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। ‘নিউক্লিয়াস’-এর উদ্যোগেই ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ’৭০ সালের ১২ আগস্ট ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। বাঙালির স্বাধীকার সংগ্রামকেস্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে উন্নীত করার ধারায় গড়ে উঠে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। ’৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন, ৩ মার্চ পল্টনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ ইত্যাদি সচেতন ও পরিকল্পিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীকার সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক দর্শন লাভ করে। ‘নিউক্লিয়াস’ এর এই বিপ্লবী উদ্যোগের পাশাপাশি ’৭১ সালের ৭ মার্চ সেকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক বাঙালি জাতিকেস্বাধীনতার আকাঙ্খায় উজ্জীবিত করে ও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করে। ’৭১ সালের ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে পালিত হয় ‘পতাকা দিবস’। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে প্রগতিশীল এ শক্তির চেতনা ক্ষুরধার হয়। সাধারণ মানুষের সার্বিক মুক্তির আকাঙ্খা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

জনগণ আশা করেছিল বাংলাদেশে সকলের জীবনে অর্থনেতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে। গড়ে উঠবে শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ। সর্বস্তরে অনুসৃত হবে গণতান্ত্রিক নীতি ও পদ্ধতি। উপনিবেশিক প্রশাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে গড়ে উঠবে স্বাধীন দেশের উপযোগী গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা। জনগণের এ আশা পুরণের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাত্র, যুবক, সৈনিক, শ্রমিক, কৃষক জনতার পক্ষ থেকে ছাত্র, যুব সমাজ সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন, উন্নয়ন ও পরিচালনায় সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দল ও শক্তির সমন্বয়ে ‘বিপ¬বী সরকার’ প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন কর। প্রত্যাশা ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীকার সংগ্রামের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান এ দাবির  যৌক্তিকতা অনুধাবন করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্নতর। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দল ও শক্তিসমূহের সমন্বয়ে ‘বিপ্ল¬¬বী সরকার’ প্রতিষ্ঠার বদলে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা হলো। বিচার ব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, পুলিশ থেকে শুরু করে পুরনো ব্যবস্থা, আইন-কানুন অক্ষুন্ন রাখা হলো। এ সকল পদক্ষেপের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে,

* সরকারের সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন শক্তির বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হতে শুরু করে। * মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শক্তিসমূহের মধ্যে বিভক্তি শুরু হয়। * অর্থনেতিক মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাব্য সুযোগ হাতছাড়া হতে থাকে। * স্বাধীনতা উত্তরকালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ধারা ব্যাহত হতে শুরু করে। * স্বাধীনতার অন্যতম স্বপ্ন শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের কাজ ব্যাহত হয়।  জাতির এ বিপর্যয় রোধ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ও আকাঙ্খা ভিত্তিক দেশ পরিচালনার উন্নত বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনে জাসদ-এর আত্মপ্রকাশ ঐতিহাসিকভাবে অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তা বাস্তবায়নের উপযোগী রাষ্ট্র প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাসঙ্গিক উদ্যোগনেয়া হলো না। শত্র“ সম্পত্তি আইন অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে হুবহু বহাল থাকে। অপরদিকে আমলাতন্ত্রের হাতকে শক্তিশালী করে বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং রক্ষী বাহিনীর কার্যকলাপকে আইনের উর্ধে স্থান দিয়ে এক অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়। এর বিপরীতে জাসদীয় রাজনীতি খুব দ্রুত গতিতে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় লালিত স্বাধীনতা পূর্বকালের সংগ্রামের অগ্রগামী ধারার প্রধান অংশ জাসদের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের রক্ষণশীল কর্মকান্ডের মুখোমুখী হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল কায়েমের মধ্যদিয়ে বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলোপ সাধনের ফলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জাসদ কর্মীরা আদর্শের প্রতি নিবেদিত হয়ে সমাজ বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণের মুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেল, জুলুম, সন্ত্রাস, নির্যাতন মোকাবেলা করতে গিয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সংগঠক আত্মদান করেছেন। দুঃশাসন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিচ্যুতির বিরুদ্ধে জাসদ আপোষহীন সংগ্রাম গড়ে তোলে। এ সংগ্রামের ধারা গড়তে শহীদ হন সিদ্দিক মাষ্টার, এডভোকেট মোশাররফ হোসেনসহ হাজার হাজার জাসদ নেতা-কর্মী। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কোন দলের এত বিপুল আত্মদানের নজির নেই। লক্ষ্য ছিলো রাজনৈতিকভাবে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা অপসারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে দেশ পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকারের ক্রমাগত বিচ্ছিন্নতার সুযোগে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পাকিস্তানপন্থী ’৭১ এর পরজিত শত্র“রা, সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে মেতে উঠে। মদদ যোগায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের এদেশীয় এজেন্ট এবং রক্ষণশীল সেনাবাহিনীর কতিপয় অফিসার। সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন অপশক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠা ষড়যন্ত্রকারী চক্র ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক খুনী মেজর ফারুক-রশিদ চক্রের সহায়তায় ক্ষমতা জবর দখল করে।

জাসদ কখনও কোন ষড়যন্ত্র বা হত্যা-ক্যু’র রাজনীতি প্রশয় দেয়নি। জাসদ আওয়ামী লীগের শাসনের বিরোধীতাকারী প্রধান বিরোধী দল হলেও বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকান্ডকে কখনই সমর্থন করে নাই। তাই ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরও জাসদ তার ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রামের ধারা অব্যাহত রাখে। ফলে মোশতাকের শাসনকালে জাসদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন-নিপরীড়নের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। গ্রেফতার করা হয় জাসদের অগণিত নেতা-কর্মী-সংগঠককে।

মোশতাক মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে ’৭১ এর পরাজিত শত্র“দের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মোশতাকের আড়াই মাসের শাসনকালকে জাসদ অবৈধ ক্ষমতা দখল হিসাবে চিহ্নিত করেন। ১৫ আগস্টের ষড়যন্ত্রমূলক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে শুরু হয় জনগণকে দূরে রেখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লাগাতার ষড়যন্ত্র। এই পটভূমিতে ’৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সামরিক জান্তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে অবৈধ ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ায় খালেদ মোশারফ মোশতাককে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। এভাবে ক্যু এবং পাল্টা ক্যু’র মধ্যদিয়ে শুরু হয় সামরিক জান্তার বিভিন্ন অংশের শক্তি পরীক্ষার লড়াই। এরকম এটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধ অংশগ্রহণকারী সৈনিকরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে। সংঘটিত হয় ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার অভ্যূত্থান। এ অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে কর্ণেল আবু তাহের বীর উত্তমকে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিতে হয়। জাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করে। জিয়াউর রহমান দেশ প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সিপাহীদের রাতের অন্ধকারে বিভিন্নভাবে আড়াই হাজার সৈনিক ও অফিসারদের নির্মমভাবে হত্যা করে। এই সামরিক ক্যু ও পাল্টা ক্যু’র মধ্যদিয়ে এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জাসদ গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য লড়াই এবং সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাসী সকল দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তানী ভাবধারার শক্তিকে পরাজিত করার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক মোর্চা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯৯২ সালে ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে সাথে নিয়ে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমের গণআদালতে বিচার করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আসার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে শক্তির ঐক্য করার লক্ষ্যে জাসদ ঐক্যমতের সরকারে যোগদান করেন। কিন্তু ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ঐক্য করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন এবং সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক ধারাকে ধ্বংস করার জন্য বিখ্যাত শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাষ্টারকে হত্যা, সাবেক অর্থ মন্ত্রী এস,এম কিবরিয়া হত্যা, সারাদেশে একযোগে আদালতে বোমা হামলা ও ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা করেন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। জাসদ এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জাসদের সভাপতি  জননেতা হাসানুল হক ইনু উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং পল্টন ময়দানে মুক্তিযোদ্ধাদের মহাসমাবেশের মধ্যদিয়ে ১৪ দলীয় ঐক্যজোটের সূচনা সৃষ্টি করেন এবং পরবর্তীতে ১৪ দল গঠন করেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশে ব্যাপক ভোটে ১৪ দলীয় জোট সরকার জয়লাভ করেন। উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানী ভাবধারার রাজনৈতিক শক্তি জামায়াত-বিএনপি, জঙ্গিবাদীরা মহাষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজ সভ্যতাকে রক্ষা করতে হলে ১৪ দলীয় জোটের ইস্পাত কঠিন ঐক্যর বিকল্প নেয়।

লেখক ঃ প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, জেলা জাসদ, কুষ্টিয়া।

॥ এম এ খালেক ॥

কেমন চলছে ব্যাংকিং খাত

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি বলেছেন, দেশের আর্থিক খাতের চাহিদার তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। তাই ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, দেশের ব্যাংকিং সেক্টর সংকুচিত করা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, ব্যাংকিং সেক্টরে ব্যাপক সংস্কারের দরকার হতে পারে। আমি উত্তরসূরিদের জন্য একটি রিপোর্ট  তৈরি করে রেখে যাব। সেখানে কীভাবে ব্যাংকিং সেক্টর সংস্কার হতে পারে, সে সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা থাকবে। তবে একই সঙ্গে পুরো আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়টি এখানে উল্লেখ থাকবে।তিনি আরও বলেছেন, সেই রিপোর্ট কেমন হবে, তা নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ রিপোর্টটি এখনও প্রণীত হয়নি। অর্থমন্ত্রী ব্যাংকিং খাত নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা নানা কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কর্তৃপক্ষ স্বীকার করুক আর নাই করুক- ব্যাংকিং সেক্টর যে ভালোভাবে চলছে না, তা বলাই বাহুল্য।যদিও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে তেমন কোনো বড় ধরনের সমস্যা নেই। কিন্তু তিনি যাই বলুন না কেন, ব্যাংকিং সেক্টর বর্তমানে এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। নানা সমস্যার কারণে এই সেক্টরটি অর্থনীতিতে কাঙ্খিত মাত্রায় অবদান রাখতে পারছে না।অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিং সেক্টর ধমনিতে রক্ত প্রবাহের মতো কাজ করে। মানবদেহের ধমনিতে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে যেমন মানুষ বাঁচতে পারে না; ঠিক তেমনি ব্যাংকিং সেক্টর সঠিকভাবে কাজ না করলে সেই দেশের অর্থনীতি দ্রুত এবং টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না। ব্যাংকিং সেক্টর সঠিকভাবে কাজ না করলে কী সমস্যা হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ব্যবস্থা।সঠিক নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং যেনতেনভাবে ঋণদান করায় ২০০৭-০৮ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। একের পর এক ব্যাংক দেউলিয়া হতে শুরু করে। ফলে মার্কিন অর্থনীতিতে চরম মন্দাভাবের সৃষ্টি হয়, যার অনিবার্য প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশ্বের অনেক দেশ এখনও সেই অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি।মার্কিন ব্যাংক ব্যবস্থার একটি অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে, তারা ইউনিট ব্যাংকিং করে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর নেচার হচ্ছে সামান্য কয়েকটি শাখা নিয়ে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে সব সময়ই অসম প্রতিযোগিতা লেগে থাকে। তারা হাউজ বিল্ডিং খাতে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ প্রদান করে। ফলে পরবর্তী সময়ে সেই ঋণের বেশিরভাগই অনাদায়ী থেকে যায়।ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তারা ভালো পারফরম্যান্স  দেখানোর জন্য এ ধরনের ঋণদানকে উৎসাহিত করতেন। দেখা গেছে, সে দেশের ব্যাংকগুলো একের পর এক দেউলিয়া হতে থাকলেও সেই বছর ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা সবচেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি খাত। এ খাতের সঠিকভাবে চলার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে।বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা যে ভালোভাবে চলছে না, তা বলাই বাহুল্য। নানা ধরনের অনিয়ম-অনাচার এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব এই খাতের অফুরন্ত সম্ভাবনাকে বিলীন করে দিচ্ছে। যারা সমাজে বিত্তবান এবং রাজনৈতিক-আর্থিক ক্ষমতার অধিকারী, তারা ব্যাংকিং খাতকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। তারা চাইলে যে কোনো সুযোগ এই খাত থেকে নিতে পারে।কিন্তু যারা সত্যিকার উদ্যোক্তা এবং ঋণ নিলে যথাসময়ে কিস্তি ফেরতদানের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ, তারা এ সেক্টর থেকে কাঙ্খিত মাত্রায় সহযোগিতা পাচ্ছে না। যারা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপি ব্যাংকিং সেক্টর তাদের ব্যাপারে বড়ই উদার। তারা চাইলে দাবি জানিয়ে যে কোনো আইনের পরিবর্তন করতে পারে।সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে বেশ কিছু আইনি সংস্কার করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ঋণ খেলাপিদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। বর্তমানে এমন এক অবস্থার মধ্যে ব্যাংক চলছে, যেখানে একজন ঋণ গ্রহীতা ইচ্ছা করে ঋণের কিস্তি ফেরত না দিলে তার কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় করা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হয় না। কিছুদিন আগে আমি এক লেখায় বলেছিলাম- জাতীয় নির্বাচনের আগে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ আইনটি অন্তত তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখা যেতে পারে। কারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এমন অনেকেই আছেন, যারা ঋণ খেলাপি।নির্বাচনের আগে তারা খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করতে চাইবেন। কিন্তু ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণের আইনটি যদি তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়, তাহলে তারা নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করতে চাইলে পুরো খেলাপি ঋণ পরিশোধ করেই তা করতে হবে। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে কিছু ব্যক্তি, যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন- তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদনকরেছেন, যেন তাদের ঋণ হিসাব কোনো ধরনের ডাউন পেমেন্ট গ্রহণ ছাড়াই পুনঃতফসিলিকরণ করে দেয়া হয়। জানি না, এ আবেদন গৃহীত হবে কিনা।উল্লেখ্য, কোনো একজন ঋণগ্রহীতা যদি তার ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ বা সুদ মওকুফ ইত্যাদি সুবিধা পেতে চান, তাহলে তাকে সংশ্লিষ্ট ঋণদানকারী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ব্যাপারে করণীয় কিছু নেই। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী একজন ঋণগ্রহীতা যদি তার খেলাপি ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করতে চান, তাহলে তাকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে নির্ধারিত হারে ডাউন পেমেন্ট দিয়ে আবেদন করতে হয়।এই ডাউন পেমেন্টের পরিমাণ হচ্ছে, মোট ঋণের ১০ শতাংশ অথবা মোট খেলাপি ঋণের ১৫ শতাংশ। যেমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে হয়তোএকটি ব্যাংকের সুদে-আসলে মোট পাওনার পরিমাণ দুই কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল ঋণ এক কোটি টাকা এবং আরোপিত সুদের পরিমাণ এক কোটি টাকা। তিনি যদি এই ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলিকরণ করতে চান, তাহলে ডাউন পেমেন্ট হিসাবে এককালীন সুদাসল দুই কোটি টাকার ১০ শতাংশ অর্থাৎ ২০ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিতে হবে অথবা আরোপিত সুদ এক কোটি টাকার ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকা এককালীন ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এখন ঋণখেলাপিদের একটি অংশ বলছে- তারা এই ডাউন পেমেন্ট দিতে পারবে না। জানি না, বাংলাদেশ ব্যাংক এই আবেদনপত্রটি কীভাবে দেখবে।ঋণখেলাপিদের মধ্যে যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান। তারা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন। এদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারার কারণেই ব্যাংকিং সেক্টর খেলাপি ঋণের সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারছে না। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত ‘দৃশ্যমান খেলাপি ঋণ’র পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এটা ব্যাংকগুলোর ছাড়কৃত মোট ঋণের ১০ শতাংশ।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রদত্ত মোট ঋণের ২৬ শতাংশই খেলাপি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এত উচ্চহারে খেলাপি আর কোনো দেশের নেই। এই বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮৭ শতাংশ আর কখনোই আদায় হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখানে ‘দৃশ্যমান খেলাপি ঋণ’ শব্দটি অত্যন্ত সচেতনভাবেই ব্যবহার করা হল। কারণ খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ উল্লেখ করা হল, এটাই প্রকৃত খেলাপি ঋণ নয়। আরও অন্তত ৪৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ এই হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে যেগুলোকে অবলোপন করা হয়েছে।আগে মনে করা হতো, ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের সমস্যা তেমন একটা নেই। কিন্তু বর্তমানে এ ধারণার পরিবর্তন হতে চলেছে। এখন ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোও ক্রমশ খেলাপি ঋণ কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।কিছুদিন আগে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক মালিকদের সংগঠন সুদের হার ‘সিঙ্গেল ডিজিটে’ নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এখনও তারা সেই অঙ্গীকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর প্রধান কারণ হল, পর্বতপ্রমাণ খেলাপি ঋণ বহাল রেখে ব্যাংকগুলোর পক্ষে সুদের হার কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে নানা ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঠিকই বলেছেন, দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। সর্বশেষ ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতে যে ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক ভালোভাবে চলছে না। সেই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ব্যাংক স্থাপনের বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিল।এমনকি দেশের অর্থনীতিবিদরাও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী তখন বলেছিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি প্রদান যে ভালো রেজাল্ট বয়ে আনে না, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণ হয়েছে।বাংলাদেশের মতো একটি অর্থনীতিতে এতগুলো ব্যাংক স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন। নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতের অর্থনীতি আমাদের চেয়ে অনেক বড় এবং টেকসই। কিন্তু তারপরও তারা এত বিপুলসংখ্যক ব্যাংক স্থাপন করেনি।বাংলাদেশে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং বিদেশি মিলিয়ে ৫৭টি ব্যাংক ব্যবসা করছে। এত বিপুলসংখ্যক ব্যাংক থাকার ফলে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো কোনো নতুন প্রোডাক্ট উদ্ভাবন করতে পারছে না। তারা আগ্রাসী ব্যাংকিং করে চলেছে।বিশ্বে সাধারণত দুই ধরনের ব্যাংকিং লক্ষ করা যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ইউনিট ব্যাংকিং; যেখানে সামান্য কয়েকটি শাখা নিয়েই একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়। আর এক ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে কিছুসংখ্যক ব্যাংক থাকে, তবে তাদের প্রচুর শাখা থাকে। যেমন ব্রিটেনে এই ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু আছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় ব্রাঞ্চ ব্যাংকিং ব্যবস্থাই সবচেয়ে উপযোগী বলে অনেকে মনে করেন।অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রয়োজনটি আরও আগেই অনুভূত হওয়া উচিত ছিল। যাই হোক, এখনও সময় আছে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কীভাবে ব্যাংকগুলোকে কমানো হবে? বিদ্যমান ব্যাংকগুলো কি বন্ধ করে দিতে হবে? কোনো ব্যাংক বন্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ এতে প্রচুরসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বরং সমজাতীয় এক বা একাধিক ব্যাংককে মার্জ করা যেতে পারে।এই মার্জ প্রক্রিয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় এই দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় একই ধরনের কাজ করত। সরকার ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের যাত্রা শুরু হয়।নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা ও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড লাভজনকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের উদাহরণ অন্য অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যেতে পারে।

লেখক ঃ অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

॥ ড. আর এম দেবনাথ ॥

ছেঁড়া, ফাটা ও পুরনো নোট সমাচার

গত সপ্তাহে মতিঝিল কাঁচা বাজারে এক অপ্রীতিকর ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। আমি দোকানের ক্রেতা। আমার সঙ্গেই আরেকজন তিনিও সবজি ক্রেতা। ক্রেতা ভদ্রলোক একটা ৫০ টাকার নোট দোকানীকে দিলেন। দোকানদার ওটা নেবে না। নোটটি চূড়ান্তভাবে নোংরা। কত শত হাত তার বদল হয়েছে কেউ বলতে পারবে না। সামান্য একটু রঙও উঠে গেছে। ক্রেতার কথা- এই নোট তিনি বাজার থেকেই পেয়েছেন। এটা বৈধ নোট। আমি দুইপক্ষের লড়াইয়ে বোকা একজন দর্শক। কোন্ পক্ষে যাই! দেখলাম রাগারাগি উভয়পক্ষের চরম অবস্থায়। নিতান্ত কৌতূহলবশতই নোটটি হাতে নিলাম। দোকানদারকে আমি নিজের পকেট থেকে একটা ভালো ৫০ টাকার নোট দিলাম। ভাবলাম কোনো ব্যাংক থেকে বদলিয়ে নেবো। এত লোককে চিনি, নোটটি বদলাতে পারব না? পরের ঘটনা ব্যাংকের। যে ব্যাংকে গেলাম তাদের অবস্থা আরো খারাপ। সেখানে পচা, ছেঁড়া, ফাটা নোটে ভর্তি। ম্যানেজার সাহেব বললেন, স্যার তদবির করতে করতে শেষ। ভালো নোট, নতুন নোট পাওয়া যায় না। অতএব এসব বাজে নোট দিয়েই লেনদেন চালিয়ে নিচ্ছি। ঝগড়া ঝাটির শেষ নেই। সব গ্রাহকই ভালো নোট চায়। আমরা তো পারি না তা দিতে। কোত্থেকে দেব? আমাদের হাতে এসবই নোট। আমি লিখব ভেবে দুই টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকা, কুড়ি টাকা, পঞ্চাশ ও একশ’ টাকার নোটের কয়েকটি বান্ডিল তিনি দেখালেন। দেখে প্রথমেই আমার ধারণা হলো এসব নোট তো পুড়িয়ে ফেলার কথা। এগুলোর সার্কুলেশনে থাকার কোনো কারণ নেই। এটাই নিয়ম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ভল্ট’ ভর্তি থাকার কথা নতুন নোটে। পুরনো নোট বদল হবে। পুরনো নোট ব্যাংকে জমা হবে। ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তা জমা দেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা বদল করে দেবে। বদলের প্রতিশ্র“তি নোটেই দেয়া আছে। নোটের বদলে কী দেবে? সোনা-রূপা? না তা নয়। দেবে আরেকটি নতুন নোট। এর জন্য ৫ টাকার নোটে লেখা ‘চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে পাঁচ টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে’। কে বাধ্য থাকিবে? বাংলাদেশ ব্যাংক। কে এই অঙ্গীকারে যে সই করছে? গভর্ণর স্বয়ং। এই নোটটি বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বে প্রবর্তিত। অন্যান্য সব নোটই তো। সেগুলোও সরকারের দায়িত্বে প্রবর্তিত। তাহলে নোট বদলের পরিস্থিতি এমন কেন? প্রায় সকল ব্যাংকেই আজকাল ভালো নোটের অভাব। নতুন নোট কদাচিৎ মিলে। ইদানীং দেখলাম একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে। পবিত্র ঈদের পূর্বে বাজারে নতুন নোট দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তখন সকল ব্যাংকে মানুষ উপচে পড়ে। মানুষের মাথা মানুষ খায়। সবারই দরকার নতুন নোট। বাত্সরিক এই কর্মকান্ডে তো কোনো কাজ হচ্ছে না। বাজার তো দেখছি পুরনো ছেঁড়া ফাটা নোটে সয়লাব। অবশ্য কথা আছে। ব্যাংকে ব্যাংকে ভালো নোট পাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বাইরে দেয়াল ঘেঁষে নতুন নোট পাওয়া যায়। সেখানে নোটের বাজার বসে নিয়মিত। ১০-২০ টাকা ডিসকাউন্টে নতুন নোট পাওয়া যায়। পুরনো নোট ব্যক্তিগতভাবে বদলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গেলে বহু ঝামেলা। বাণিজ্যিক ব্যাংক তো তা বদলাতেই চায় না। অতএব মানুষ বাধ্য হয়ে যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বাজারে। এটা ঢাকার অন্যান্য বাজারের মত বেশ পুরনো এবং সংগঠিত বাজার। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকের সামনেই এই অবৈধ ব্যবসা চলে।

অতএব একমাত্র ‘গতি’ হচ্ছে চোরাই বাজার। তারা প্রকাশ্যে নোট বদলায়। বড় কথা এসব পুরনো ছেঁড়া ফাটা নোট বাজারে আছে কী করে? আমি ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের’ একজন অবসরপ্রাপ্ত বড় কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এমন অবস্থা কেন? এটা তো কোনো দেশে হয় না বলেই জানি। নতুন নোট নিয়মিত বাজারে ছাড়া হবে। পুরনো নোট নিয়মিত বাজার থেকে তুলে নেয়া হবে। কারণ ছেঁড়া ফাটা নোটের মাধ্যমে জীবাণু ছড়ায় বলে ডাক্তাররা বলেন। এসব ব্যবহার করা স্বাস্থ্যসম্মত কাজ নয়। অথচ এই কাজটি হচ্ছে না কেন? নোট ছাপানোতে কী কোনো সমস্যা হচ্ছে? তাদের ‘ক্যাপাসিটির’ তুলনায় কী বাজারে নোটের চাহিদা বেশি? সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসটি বাংলাদেশ ব্যাংকের। তার ব্যবস্থাপনাও মজবুত। ভদ্রলোক এক কথায় সমস্ত অভিযোগ ফেলে দিয়ে বললেন- এসব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সমস্যা। তারা সমস্যা তৈরি করে। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে না। নতুন নোটের কোনো অভাব নেই বলে তিনি আলোচনা শেষ করে দেন। আমার জিজ্ঞাসা- নতুন নোট ছাপা হলো ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে’। তা আসবে যথানিয়মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ‘ভল্টে’ ঢুকবে। প্রয়োজনানুসারে তা ধীরে ধীরে বাজারে আসবে। এর নিয়ম কানুন আছে। পুরনো নোট জমা হবে। একসঙ্গে করে তা নিয়মিত পুড়ানোর ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আছে। অনেকটা  শিখা অনির্বাণের মত। সবসময় পুরনো নোট পুড়বে। সবসময় নতুন নোট বাজারে আসছে। তাহলে কে দায়ী এই অবস্থার জন্য? আমি আশা করেছিলাম বস্তুত বহুদিন অপেক্ষা করেছিলাম এই ভেবে যে, কোনো না কোনো সাংবাদিকের নজরে এটা পড়বে এবং তারা একটা ভালো স্টোরি করবে। না তা পেলাম না। তাদের নজর শুধু খেলাপি ঋণে। এর উপরই রিপোর্ট। অথচ খেলাপি বড় গ্রাহককে বিচারের আওতায় এনে জেলে পাঠালে তা আবার সবাই খবর করে না। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়ে পুরনো নোটের পেছনে লড়েছি। প্রশ্ন, এই অবস্থায় জন্য কে দায়ী? অর্থমন্ত্রী, অর্থসচিব, ব্যাংকিং সচিব, গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সদস্যÑ এরা দায়ী? না কি দায়ী ৬০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের  প্রধান নির্বাহী, চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা? কোনো জবাব পাই না। তবে জবাবটি অবশ্য ‘নোটেই’ দেয়া আছে। সকল নোটেই দেয়া আছে। আইনের দৃষ্টিতে যার দায়িত্বে নোটগুলো ছাপা হয়ে বাজারে আসছে সেই দায়ী? দায়িত্বে প্রবর্তিত দেখা যাচ্ছে ‘সরকারের’। এখন ‘সরকারকে’ আমরা কোথায় পাব? ‘সরকার’ এমন একটা শক্তি যার অস্তিত্ব প্রতি মুহূর্তে টের পাওয়া যায়। কিন্তু ‘তাকে’ তো ধরা যায় না। ছোঁয়া যায় না, স্পর্শ করা যায় না। কেবল হাড়ে হাড়ে অনুভব করা যায়। তাহলে উপায়? উপায় একটা আছে। সরকারের পক্ষে যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন তাকে ধরা যায়। সরকারের পক্ষে দায়িত্ব নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব একটা আইন আছেÑ বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার-১৯৭২। এই আইনেই তারা চলে। এবং এই আইনের সঙ্গে সঙ্গেই ‘কারেন্সি’ অ্যাক্টও আছে বলে জানি। এসবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে গভর্নরকে। তিনি ঐ শক্তির বলেই সকল নোটে সই করেন এবং অঙ্গীকার করেন। কিছু ছোট নোট ও মুদ্রা বাদে অবশ্য। বাজারে যে নোট এখন পাওয়া যাচ্ছে তাতে বোঝা যায় ৫ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত সকল নোটেই গভর্নর সাহেবের সই আছে। কত নোট বাজারে চালু? ২০১৭ সালের ৩০ জুনের হিসাবে দেখা যাচ্ছে বাজারে মোট নোট চালু ছিল ৪৯৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৩ হাজার ১৬৪টি। বিশাল অঙ্ক। এখানে আছে ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকা, ৫০০ টাকা এবং ১০০০ টাকার নোট। ৫ টাকা, ২ টাকার কাগুজে নোট এবং মুদ্রা এবং এর নিচের মুদ্রার হিসাব এতে নেই। টাকার অঙ্কে ৫০০ টাকা এবং ১০০০ টাকার নোটের প্রচলনই অনধিক। বাকি নোটের সংখ্যা বেশি হলেও পরিমাণ কম। অথচ ঐসব নোটের চাহিদাই বেশি। দৈনন্দিন লেনদেনে  ২ টাকা, ৫ ও ১০ টাকা, ৫০ টাকা, ১০০ টাকা ইত্যাদির চাহিদা খুবই বেশি। এসবের ব্যবহারও বেশি। এসব নোট নোংরা, ছেঁড়া, ময়লাযুক্ত হয় বেশি। দেখা যাচ্ছে এখানেই সবচেয়ে বেশি গন্ডগোল। গভর্নর সাহেব কী জবাব দেবেন? কেন এই অবস্থা বাজারে? কেন পারস্পারিক দোষারোপ চলছে? কেন বাংলাদেশ ব্যাংকে গেলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নতুন নোট পায় না? কেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদেরকে পচা নোট দিয়ে বিদায় করছে? এসবের জবাব কাউকে না কাউকে তো দিতেই হয়। গভর্নর সাহেবের জবাব আশা করি। সঙ্গে-সঙ্গে একটা সন্দেহ স্থাপনও করতে হয়। বেশ কিছুদিন আগে পুরনো নোটের একটা ব্যবসা হয়েছিল খুলনার বাংলাদেশ ব্যাংকে। যেসব নোট পুড়ানোর কথা ছিল তা পুড়ানো হতো না। চোরাপথে পুনরায় তা বাজারে চালু হতো। মারাত্মক ও লোমহর্ষক ঘটনা ছিল ওটি। দুই-চারজন কর্মকর্তার চাকরিও গিয়েছিল যতদূর মনে পড়ে। বর্তমান অবস্থা এবং খুলনার ঘটনায় সন্দেহ করা যায় কী এমন একটা ঘটনা চলছে? এটা না হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় এবং আশাপ্রদ খবর। কিন্তু নানা রকমের দুর্ঘটনা চারদিকে ঘটছে।

হ্যাকিং করে রিজার্ভের টাকা নিয়ে যাচ্ছে বিদেশিরা! এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলব বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে। ব্যাংকের বোর্ড এই দায়িত্ব থেকে রেহাই পাবেন না! ছেঁড়া, ফাটা, পুরনো নোটের সমস্যার সমাধান করুন। মানুষকে রোগ-শোক থেকে মুক্তি দিন। নিত্যদিনের ঝগড়া থেকে মানুষকে মুক্তি দিন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

॥ মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার ॥

সংকট উত্তরণে দুটি পরিবর্তন প্রয়োজন

গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দুটি পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সরকার এ দুটি প্রয়োজন মেটালে দেশে অর্থবহ নির্বাচন হতে পারে। এর একটি হল নির্বাচনকালীন সরকার, অন্যটি নির্বাচন কমিশন। ইনক্লুসিভ নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনকালে দলীয় সরকার বদলাতে হবে। কারণ, এমন সরকার ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচন পক্ষপাতমুক্ত হবে না। বর্তমান সরকার সবার পরামর্শ উপেক্ষা করে যেভাবে সংবিধান সংশোধন করে নিয়েছে, তাতে ওই সংবিধানের অধীনে নির্বাচন অবাধ হবে না। সরকার ইসি থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারি বিভাগ ও প্রশাসনকে মনমতো সাজিয়েছে। কাজেই বিরাজমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকার দরকার। এমন সরকার গঠন একাধিক উপায়ে সম্ভব। সহজ উপায়টি হল, দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার লক্ষ্যে সংসদে একটি বিল উত্থাপন ও পাস করে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে ওই সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। এভাবেই ষষ্ঠ সংসদে বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, যখন বিচারপতি হাবিবুর রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছিলেন।সরকার এ পদ্ধতিতে রাজি না হলে বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করতে পারে। এভাবে আওয়ামী লীগ ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে জামায়াত ও জাপার সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন, সংসদ থেকে সম্মিলিত পদত্যাগ এবং ১৭৩ দিন হরতাল করে বিএনপি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করেছিল। আবার, সরকার যদি সংসদ না ডাকে বা ভেঙে দেয়, তাহলেও সব দল মিলে আলোচনা করে একটি দলনিরপেক্ষ সরকার গঠন করা যায়। এভাবে ১৯৯০ সালে প্রধান দলগুলো মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সৃষ্টি করেছিল এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ শর্তসাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি হয়ে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন। কাজেই কোন্ পথে দলীয় সরকার পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছা ও আচরণের ওপর।দ্বিতীয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনটি হল নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন। গঠন প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম দেখে বলা যায়, বর্তমান ইসির পক্ষে  স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। কমিশন গঠনের জন্য আইন তৈরি না করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসিতে নিয়োগদান বিষয়ে সংলাপ করেন। রাষ্ট্রপতিকে যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে কমিশনে নিয়োগ দিতে হয়, সে কারণে সংলাপ ছিল লোক দেখানো। ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি যে ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেন, সেখান থেকে অনধিক পাঁচজনকে কমিশনে নিয়োগ দেয়ার কথা রাষ্ট্রপতির। এ প্রক্রিয়ায় লুকোচুরি ছিল। মহামান্য রাষ্ট্রপতি পাঁচজনকে কমিশনে নিয়োগ দেন, তবে পত্রিকার খবর অনুযায়ী সিইসির নাম সার্চ কমিটি প্রদত্ত ১০ জনের তালিকায় ছিল না। প্রশ্ন হল, সার্চ কমিটির দেয়া তালিকার বাইরে থেকেই যদি রাষ্ট্রপতি কমিশনে সিইসি নিয়োগ দেবেন, তাহলে ওই কমিটি গঠনের কী দরকার ছিল? সার্চ কমিটি যে ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছিলেন, ওই নামগুলো দেশবাসীর জানার অধিকার থাকলেও কেন তাদের নামগুলো গোপন রাখা হয়েছিল তা জনগণ পরে বুঝেছেন। কারণ, তালিকার বাইরে থেকে এমন একজন ব্যক্তিকে সিইসি নিয়োগ দেয়া হয়, যিনি যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় আগের ১১ জন সিইসির মতো ছিলেন না। তিনি চাকরিবিধি ভেঙে ‘জনতার মঞ্চে’ অংশ নিয়েছিলেন এবং বিএনপি সরকারের আমলে ওএসডি হয়েছিল।এসব দেখে বিবেকবান নাগরিকরা বলছেন, এ ইসি স্বচ্ছ নির্বাচন করতে পারবে না। কারণ, সারা দেশে এত যোগ্য ব্যক্তি থাকলেও যারা জনতার মঞ্চে অংশ নেয়া এবং বিএনপি আমলে ওএসডি হওয়া একজন ব্যক্তিকে সিইসি করেছেন, তারা নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছাড়া এ কাজ করেননি। পরবর্তী সময়ে নিজের কাজের মাধ্যমে সিইসি তার প্রমাণও দিচ্ছেন। ইসির প্রধান অংশীজন রাজনৈতিক দল হলেও নির্বাচন বিষয়ে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার আগেই কমিশন আলোচনা শুরু করে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে। ইসি ২০১৭ সালের ৩১ মে ও ৬ জুন যথাক্রমে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ও ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন বে¬কের সঙ্গে নির্বাচনবিষয়ক আলোচনা করে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রাপ্য গুরুত্ব না দিয়ে অসম্মান করে। কমিশন একই বছর ৩১ জুলাই ও ১৬-১৭ আগস্ট যথাক্রমে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে সংলাপ আয়োজনে পেশাদারিত্ব  দেখাতে পারেনি। সংলাপে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম কর্মীরা তাদের বক্তব্যে জনগণের আস্থা অর্জনের পরামর্শ দিয়ে ইসিকে যে মেসেজটি দেন তা হল, ইসির ওপর জনগণের আস্থা নেই।পরবর্তীকালে ইসির আচরণে এর ওপর গণআস্থা আরও হ্রাস পায়। যেমন, ইভিএম নিয়ে ইসির আচরণ ছিল রহস্যঘেরা। দায়িত্ব গ্রহণের পর ইসি সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার ওয়াদা করে। সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপেও একই প্রতিশ্র“তি দেয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করে তিক্ত অভিজ্ঞতা হলেও ইসি সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়। এমনকি কমিশন সভায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পাস হওয়ার আগেই ইসি ৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকার দেড় লাখ ইভিএম কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। পরে ৩৫তম কমিশন সভায় বিষয়টি উপস্থাপিত হলে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করায় এটি ইসিতে খন্ডিত সিদ্ধান্ত (৪:১) হিসেবে পাস হয়। সরকারি দল ছাড়া অধিকাংশ বড় দল নির্বাচনে ইভিএম না চাইলেও সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে ইসির অতি আগ্রহে অনেকে নির্বাচনে ডিজিটাল কারচুপির আশঙ্কা করছেন।উল্লেখ্য, একমাত্র সরকারি দল রাষ্ট্রপতি ও ইসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত তাদের আনুষ্ঠানিক সংলাপ দুটিতে ইভিএমে সংসদ নির্বাচন দাবি করে। অনেক বিরোধীদলীয় নেতা মনে করেন, ইভিএম ব্যবহার করে ডিজিটাল কারচুপি করার সরকারি দলের মনোবাসনা পূরণের সহযোগী হিসেবে ইসি ইভিএমকে হ্যাকপ্রুফ প্রমাণ না করেই সংসদ নির্বাচনে তা ব্যবহার করছে। যে ইসি স্থানীয় নির্বাচনই দুর্নীতিমুক্ত করতে পারেনি, তার পক্ষে সংসদ নির্বাচন অবাধ করা কী করে সম্ভব? উলে¬খ্য, এ ইসির অধীনে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে এতই দুর্নীতি-কারচুপি হয় যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত রেওয়াজ ভেঙে ডিক্যাব টকে খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের অনিয়ম সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কথা জানান। কমিশনের অনেক সিদ্ধান্ত সিইসি এককভাবে গ্রহণ করায় ইসি কমিশনাররা তার ওপর বেজার হন। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার কমিশনের ৩৬তম সভায় তার নির্বাচনবিষয়ক কতিপয় পরামর্শ উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা ত্যাগ করেন। যে ইসি পাঁচজনের কমিশন সভারই আস্থাভাজন হতে পারেনি, সেই ইসি সংসদ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে পারবে কি?

সাজানো প্রশাসনে দলীয় সরকারের অধীনে এমন বিতর্কিত ইসির পরিচালনায় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা আর গলায় পরাজয়ের মালা পরা একই কথা। বিরোধীদলীয় দাবি মানা তো দূরে থাক, তাদের সঙ্গে সংলাপেও আগ্রহ না দেখানোর কারণে দলগুলো বুঝতে পারে, সরকার একতরফা নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে চায়। এ জন্য হামলা-মামলায় কাবু মাঠের বিরোধী দল গণতন্ত্রপ্রেমী দলগুলোকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ চাপ প্রয়োগ করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা ছাড়া কোনো বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে অল্পদিনেই রাজপথ উত্তপ্ত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু সরকারি দল প্রতিদিন সভা-সমাবেশ করলেও নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ২৩ তারিখে সিলেটে জনসভা করার অনুমতি চেয়ে পায়নি। পরে ২৪ তারিখে অনুমতি চেয়ে না পেয়ে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা ২১ তারিখে উচ্চ আদালতে রিট করলে অনেক নাটকীয়তার পর ওইদিন বিকালে পুলিশ ২৪ তারিখে ঐক্যফ্রন্টকে ১৪টি শর্তে সিলেটে সমাবেশের অনুমতি দেয়।ঐক্যফ্রন্টকে সরকার ভয় পাচ্ছে বলে সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীরা ফ্রন্ট নেতাদের তীব্র ভাষায় সমালোচনা করছেন। এ প্রসঙ্গে সরকারদলীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং ১৪ দলীয় মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের সমালোচনা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনরা ১/১১-এর জন্ম দিয়েছিলেন। গণতন্ত্রকে হত্যা করার জন্য মাইনাস টু ফর্মুলা নিয়ে মাঠে খেলেছিলেন। এখন তারা গণতন্ত্র রক্ষার ¯ে¬াগান নিয়ে মাঠে। আসলে এরা হচ্ছেন পরীক্ষিত গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি’ (যুগান্তর, ১৮-১০-২০১৮)। এমন সমালোচনার আগে জনাব নাসিমের মনে রাখা উচিত ছিল, এই গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে ‘আমাদের আন্দোলনের ফসল’ বলেছিলেন তারই সম্মানিত নেত্রী। ওই সময়ের খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ২০০৯ সালের ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রামে এক সভায় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার অন্যতম আর্কিটেক্ট জেনারেল মইন উ আহমেদের ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, ‘জেনারেল মইন যুগে যুগে আবির্ভূত মহামানবদেরই একজন’ (দ্রষ্টব্য : মহাজোট সরকারের দুই বছর : অসডার, ২০১১, পৃষ্ঠা-৪৭)। আর এই জেনারেলের ডানহাত মেজর জেনারেল মাসউদ উদ্দিন চৌধুরীকে সরকার কেবল অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতই করেনি, মেয়াদান্তে তাকে ওই পদে একাধিকবার এক্সটেনশন দিয়েছিল। সরকারদলীয় নেতারা যে ঐক্যফ্রন্টকে ভয় পেয়েছেন, তা তাদের দলীয় সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়। দলীয় নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করে জনাব ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যারা গত ১০ বছরে আন্দোলন করতে পারেনি, শুরুর আগেই যাদের দুই উইকেট পড়ে গেছে, আরও কত উইকেট পড়বে তা সময় বলে দেবে’ (মানবজমিন, ২০-১০-২০১৮)। ঐক্যফ্রন্টকে যদি সরকার ভয়ই না পাবে, তাহলে তাদের সমাবেশের অনুমতি দিতে এত নাটকীয়তা কেন? সরকার জানে মানুষ পরিবর্তন চায়। ঐক্যফ্রন্ট মাঠে নামলে মানুষের ঢল নামবে।

ঐক্যফ্রন্ট প্রদত্ত ৭ দফা নয়, এ প্রবন্ধের শুরুতে যে দুটি দাবির উলে¬খ আছে (যা ৭ দফারও অন্তর্ভুক্ত), কেবল ওই দাবি দুটি মানলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। দলনিরপেক্ষ সরকার আর ইসি যদি দক্ষ, যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তিদের দিয়ে গঠন করা যায়, তাহলে তারাই বাকি কাজগুলো গণতন্ত্রসম্মতভাবে সম্পন্ন করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু সরকার এ দুটি দাবি না মেনে যদি একতরফা নির্বাচন করতে চায়, তাহলে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা দেখা দেবে। সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপাও এমন সন্দেহ করছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাধাহীন সমাবেশে ২০ অক্টোবর ১৮ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে জাপা নেতা এইচএম এরশাদবলেছেন, ‘নির্বাচন হওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছি, নির্বাচন হবে কিনা জানি না।’ নির্বাচন না হলে দেশ যে দুঃসময়ে পতিত হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ নির্বাচনের খবরাখবর রাখছে। কাজেই সরকার যা খুশি তা-ই করে পার পাবে না। ভারত গতবারের মতো এবার সরকারকে সরাসরি সমর্থন না দিয়ে নির্বাচনে গণরায়ের প্রতিফলন দেখতে চাইছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলে দিয়েছে, তারা নির্বাচনে পর্যবেক্ষক প্রেরণের পরিবর্তে দেশে নির্বাচনী পরিবেশ আছে কিনা তা দেখতে দু’জন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ পাঠাবে। এটা ভালো লক্ষণ নয়। সিডিউল ঘোষণার প্রাক্কালে বিরোধী দলীয় হাজার হাজার নেতাকর্মীর নামে ‘গায়েবি’ মামলা দিয়ে লাখ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা স্বচ্ছ নির্বাচনের ইঙ্গিতবাহী নয়। এসব ‘গায়েবি’ মামলার নিন্দা করেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ১৭ অক্টোবর প্রদত্ত বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, “সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘গায়েবি’ মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আসামি হিসেবে ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত, বিদেশে অবস্থানরত, এমনকি মৃত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে পুলিশের একাংশের এহেন কর্মকা- পেশাদারিত্বের উদ্বেগজনক অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত।” তবে পুলিশ যে কার ডিকটেশন অনুযায়ী এসব মামলা করছে তা জনগণের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা সরকারকে সবিনয়ে অনুরোধ করব, নির্বাচনে লেভেল পে¬য়িং ফিল্ড তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করবেন না। সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করুন। সরকারি দল ও জাপা যেভাবে বিনা বাধায় সভা-সমাবেশ করছে, অন্য  জোট ও দলগুলোকে একই রকমভাবে সভা-সমাবেশ করতে দিন। মনে রাখবেন, বিরোধী জোট ও দলগুলোর সঙ্গে বিরূপ আচরণ করলে সরকারি দলের জনপ্রিয়তা আরও হ্রাস পাবে। রাজনৈতিক সংকট সমাধানের চাবিকাঠি এখন সরকারের হাতে। দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিলে তা কারও জন্য ভালো হবে না। নির্বাচনে প্রশাসন, ইভিএম ও হেলমেট বাহিনী ব্যবহার করলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। গণতন্ত্রপ্রেমী জনগণ ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন। সংবিধানের দোহাই না দিয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দেশবাসীকে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে দিন। বিরোধী দলগুলোর মনে ক্ষোভ থাকলে সভা-সমাবেশ করে তা প্রকাশ করতে দিন। ভিন্নমত সহ্য করা এবং শত ফুল ফুটতে দেয়াই তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। মনে রাখবেন, কেতলি এখন জ্বলন্ত উনুনের উপরে। কেতলি ও নলের মুখ বন্ধ করে দিলে বিস্ফোরণ অনিবার্য। লেখক  ঃ অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

॥ বাহার উদ্দিন ॥

মুুজিবের বেটি হাল ছাড়বে না

সামাজিক সৌহার্দ্য তৈরিতে আর মহিলাদের ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আজ এক বিরল দৃষ্টান্ত। এক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরেক সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক, মসৃণ আত্মীয়তার নির্মাণ যে কত জরুরি, তা ঢাকার গঠনশীল রাজনীতি বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব যেভাবে বুঝতে পেরেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলো যদি এ ব্যাপারে সমানভাবে অনুশীলনময় হয়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্রের মর্ম আর কর্ম একই পথে নির্বিরোধ যাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের গতিকে বাইরের উসকানি বা অভ্যন্তরীণ প্ররোচনা বিভ্রান্ত করার বিলকুল সুযোগ পাবে না।

গত এক দশক জুড়ে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সংহতি রক্ষঅয় তার অঙ্গীকারকে যে গুরুত্ব দিচ্ছে, যে নিষ্ঠায় বিভিন্ন সম্প্রদায় আর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক সমন্বয় গড়ে তুলছে, যেভাবে লিঙ্গ বৈষম্যকে প্রতিহত করে সমতার ভিত গড়ে তুলছে যদি আরও কয়েক বছর এই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে তার কাঙ্খিত অগ্রগতি দুনিয়ার প্রতিটি উন্নত, অতি উন্নত দেশগুলোর সমতুল্য হয়ে উঠবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিবৃতি মনে পড়ছে। জাতীয় সংসদে সংবিধানের খসড়া পেশ করে তিনি বলেছিলেন এই দেশ সকলের। প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, ধর্মীয় উত্সব উদযাপন করবে। ধর্মের রীতি-নীতি পালনে কোনো বাধা থাকবে না। এটাই আমাদের গণতান্ত্রিকতা আর ধর্মনিরপেক্ষতার মৌল আদর্শ।

জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু তার এ অঙ্গীকার থেকে কখনো এক ইঞ্চিও সরে দাঁড়াননি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও এই সাধনাকে, শাশ্বত অনুশীলনকে সঙ্গে নিয়ে বাঙালির চিত্তভিত্তিকে পোক্ত করতে চেয়েছে। পরে তার মনন আর সৃষ্টিতে এই প্রয়াস আরো বড়ো হয়ে ওঠে। গঠনশীল রাজনীতি ও জাতির ঘোষিত আকাঙ্খাকে মর্যাদা দেবার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তার রক্তক্ষয়, রক্তক্ষরণ আর আত্মত্যাগ নেহাৎ নগণ্য নয়। সপরিবারে নিহত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। পরপর হত্যাকান্ডে নিহত হয়েছেন তার বহু সহকর্মী। আমাদের মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর ইহজাগতিকতাময় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা আর জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগকে মেনে নিতে পারেনি বহির্দেশীয় ও অভ্যন্তরীণ গণশক্ররা। তাই তাকে তার বহু অনুগামীকে হত্যা করেই বসে থাকেনি, ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাকে এবং বাংলাদেশকে অনুশাসিত রাষ্ট্রের বন্দিশালায় আটকে রাখার চেষ্টা করেছে। পরপর ফৌজিশাসন, মৌলবাদের উত্থান, সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ঘটিয়ে দেশ গঠনের অভিমুখকে ঘুরিয়ে দিয়ে বলতে চেয়েছে, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নয় বহুত্ববাদ নয়, সংখ্যাগুরুর একাধিপত্যই আমাদের অভীষ্ট। কিন্তু বাংলাদেশের প্রজ্ঞা আর তারুণ্য তাদের বরদাশত করেননি। তাদের মনন আর সৃষ্টি এক হয়ে এক সুরে লোকায়ত বাংলাদেশ, বাঙালির বাংলাদেশ, শেখ মুজিবের বাংলাদেশকে রক্ষা করতে মাঠে নেমে লড়াই করে ঐতিহ্যের বিস্তারকে ক্রমাগত উঁচু করে বলেছে আজও বলছে… জাতিরাষ্ট্রের ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আরো বড়ো হতে চাই, গড়তে চাই এমন একটি দেশ, যা হবে আধুনিক, মানবিক। যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ, লিঙ্গ বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিকতার জায়গা নেই। ধর্মীয় রীতিপালনে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য সত্ত্ব্বেও আমরা এক ও অখন্ড। এটাই আমাদের সমস্ত প্রস্তুতির সমস্ত নির্মাণের অপ্রতিরোধ্য গন্তব্য। এই লক্ষ্য পূরণের প্রথম স্বপ্ন দেখিয়েই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন বাংলাদেশ একদিন জাপানের মতো উন্নত, স্থিতিশীল দেশ হয়ে উঠবে।

সম্ভবত ভুল বলেননি। ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী দেশটি  আজ যে সংকল্প নিয়ে ঘরে-বাইরে হয়ে ওঠার লড়াই করছে, উন্নয়নের বিভিন্ন মাত্রা ছুঁয়ে যেভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যে প্রতিশ্র“তি নিয়ে বাণিজ্যে, অভ্যন্তরীণ উত্পাদনে বিস্ময় তৈরি করছে, নারীর ক্ষমতায়ন আর সাম্প্রদায়িক প্রেমের বিস্তারে অভিনব নজির গড়ছে তা ভেতরে ঢুকে খতিয়ে দেখলে বাঙালি হিসেবে, মানুষ হিসেবে গর্বিত হতে হয়। সামাজিক সংহতি এবং নারীর ক্ষমতায়ন যে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, বাংলাদেশ তার নিকটতম দৃষ্টান্ত নয় শুধু এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রমও বটে।

আমরা, প্রতিবেশীরা অনেক সময় ভুল জানি, ভুল বলি, ভুল খবরে কান দিয়ে পরিকল্পিত গুজবের অসত্যকে বড়ো করে দেখার চেষ্টা করি। এই যেমন, যাঁরা বলছেন, প্রতিদিন হাজার হাজার বাংলাদেশির অনুপ্রবেশ ঘটছে, ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সীমান্তে জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে, অনুপ্রবেশের উইপোকারা আমাদের সব সম্পদ হজম করে নিচ্ছে, তারা সত্য জেনেও নিছক গুজব ও ভুল তথ্য চাউর করে সত্যকে চাপা দিয়ে আরোপিত মিথ্যার প্রতিষ্ঠা দাবি করছেন। এই মনোভাব যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি একধরনের বিকৃতির অভ্যাসে তাড়িত এবং জাতিবিদ্বেষে আক্রান্ত। হয়তো এ কারণেই সত্য যখন সামনে বেরিয়ে আসে তখন সত্যের মহিমাকে তারা হয় উড়িয়ে দেন, নয়তো তাকে অবজ্ঞা করার প্রয়াসে নীরবতার আশ্রয় নেন। আমরাও তাদের প্রশ্রয় দিয়ে বসি।

প্রসঙ্গত কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ৩১ হাজারেরও বেশি সার্বজনীন পুজো হয়েছে। কোথাও কোনো অঘটন ঘটেনি। ঢাকেশ্বরী আর রামকৃষ্ণ মিশনের মন্ডপ পরিদর্শন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দেশবাসীকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছেন, ধর্মীয় রীতি পালনে আমরা অনেকেই আলাদা কিন্তু উৎসবের উদযাপনে সবাই অভিন্ন। দুই, সৌদি আরব সফরে যাবার প্রাক্কালেই তিনি ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে দেড় বিঘা জমি দিয়ে ৬৩ বছরের সম্পত্তি বিবাদের নিষ্পত্তি ঘটিয়ে দিলেন। তিন, ইতিহাস প্রসিদ্ধ ঢাকেশ্বরীকে কয়েক বছর আগেই জাতীয় মন্দিরের মর্যাদা দিয়েছে বাংলাদেশ। চার, বাংলাদেশে হিন্দুদের জনসংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ভারতীয় সংসদে বিবৃতি পেশ করে বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন এখন ওখানে সাড়ে ১২ শতাংশ হিন্দু। পাঁচ, সচিবালয়ে, সচিব পর্যায়ে কর্মীর সংখ্যা অন্তত ৩০। ছয়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অমুসলিম বিদ্যাদাতাদের প্রতিনিধিত্ব তথাকথিত সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরুর ব্যবধানকে ক্রমশ নস্যাত্ করে দিচ্ছে। সাত, প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের উচ্চপদে হিন্দু সংবাদকর্মীর উপস্থিতি বহুত্ববাদের সত্যকে নিরন্তর উঁচু করছে। আট, নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিঃশর্ত অঙ্গীকার যে নজির গড়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ায় এক মহিমাময় বিষ্ময়। এখানে বাংলাদেশ আজ শীর্ষে। এ ব্যাপারে সংসদের অধ্যক্ষ শিরীন শারমিন চৌধুরী ২ অক্টোবর ৫০ জন বিদেশি সাংবাদিককে বলেছেন, ‘টু ডে উইমেন এম্প্রাওয়ারমেন্ট ইজ দ্য সেন্ট্রাল স্টোরি অফ বাংলাদেশ’। বিষয়টি কত বড়ো সত্য এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি তা আমরা যথাযথ পরিসংখ্যান পেশ করেই বলব। এখন যা বলতে চাইছি তা হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের অন্তরে আর বাইরে ঐক্য আর সামাজিক প্রেমের যে অঙ্গীকার দেখা যাচ্ছে, তা আদপে অবজ্ঞার বিষয় নয়। এখানে তার দেশপ্রেম আর মাতৃময়তা ঐতিহ্যের অঙ্গীকারকে, অঙ্গীকারের ধর্মকে নিরন্তর লোকায়তিক সাধনা দিয়ে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। এই সাধনার ইতিহাস বাঙালির মিশ্রসত্তার ইতিহাস। তার অখন্ড মননের নির্মিত আর নির্মীয়মাণ অভিজ্ঞান। একে অস্বীকার করে সে বড়ো হবে না, হতে চায় না। বাংলাদেশ তার ভাষাপ্রীতি দিয়ে, সংস্কৃতির নির্মাণ আর বিনির্মাণ দিয়ে ‘আমি থেকে আমরা‘য় উপনীত হয়ে, উত্সবের রঙে অঙ্গ মিলিয়ে ঘোষণা করছে, আমরা এক জাতি। এক প্রাণ। দেশভাগ আমাদের ছিন্নভিন্ন করে দিলেও হূদয়ের ধর্মকে ছিনিয়ে নিতে পারেনি। ঐক্যের অঙ্গীকারে আমরা সংঘবন্ধ। প্রতিজ্ঞা পালনের নিয়মে গুরুত্ব দেই অশেষকে। গঠনশীল রাজনীতি এখানে আমাদের সহোদর, যাপনেরও সহচর। তাকে আমরা হৃদমাঝারে রাখব। ছেড়ে দেব না।

শারদীয় উৎসবের প্রাক্কালে ১০ দেশের ৫০ সাংবাদিক বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ঘুরতে ঘুরতে অবাক হয়ে দেখলেন বাংলাদেশের ধর্ম, উত্সব আর অঙ্গীকার যাপনের গৌরবকে। বলতে ভালো লাগছে, এই কলমচি তাদের অন্যতম। নৈর্ব্যক্তিক হয়েও যে মুগ্ধ। প্রাণিত। অভিভূত। একথাও বলতে ইচ্ছে করছে, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্নকে পূর্ণ করতে সতর্ক, জাগ্রত তাঁর দুঃসাহসী কন্যা শেখ হাসিনা। খুলনার একটি মেয়ে, রাবিয়াÑ লেখাপড়া জানে না, দরিদ্র ঘরের সন্তানÑ আমাকে বলেছিলÑ মুুজিবের বেটি হাল ছাড়বে না। নৌকো নিয়ে সাগর পাড়ি দেবেই দেবে। রাবেয়ার মতো মেয়েদের, মানিকগঞ্জে এক দুস্থ পরিবারের সন্তান অনিমার মতো লাঞ্ছিত (নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে যার নাম প্রকাশ করতে চাইছি না) মেয়েদের বেঁচে থাকার, পরম ভরসা হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা। আজ তিনি বিশ্বজননী। হিমালয় নন্দিনী উমার মতো কখনো মাতৃরূপে সজ্জিতা। দুর্গতিনাশিনী। কখনো অসুর বিনাশে দুর্বার দুঃসাহসী। সেলাম, নারীশক্তির হে তুলনাহীনা সেলাম।

লেখক ঃ ভারতীয় সাংবাদিক, সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

 

 

এ কি বললেন আমেরিকার বিদায়ী রাষ্ট্রদূত!

শেখর দত্ত : ‘পূর্বপুরুষের স্বপ্নপূরণ অগ্রযাত্রার মূলমন্ত্র/প্রথম আলোতে মার্শা বার্নিকাট’- উল্লিখিত পত্রিকায় এই হেডিংয়ে নিউজ দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লাম। বলেন কি বিশ্বের এক নম্বর শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকার রাষ্ট্রদূত! এ তো দেখি ভূতের মুখে রামনাম! বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেয়ার আগে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রথম আলো পত্রিকার নিমন্ত্রণে তিনি সেখানে যান। মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ইতিহাসের ছাত্রী বলে নয়, বাংলাদেশে কাজ করতে এসে বুঝেছি, এ দেশের মানুষের ইতিহাসবোধ খুব প্রখর। পূর্বপুরুষের স্বপ্নপূরণের একটা তাগিদ আছে এ দেশের মানুষের। আর সেটাই মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক।

এটুকু বলেই তিনি থেমে যাননি। তিনি আরো বলেন, উন্নতির জন্য শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে হয়। তার এ কৃতিত্ব শুধু নিজের পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেয়াতেই সীমিত নয়। তিনি তার বাবার স্বপ্নকে পূর্ণতা দিচ্ছেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তার এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারবিষয়ক কর্মসূচি ‘শান্তিতে বিজয়’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, নির্বাচন ঘিরে যারা সহিংসতা করে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ ও তার নাগরিকদের স্বার্থহানি চায়। বর্তমান সরকারের সপক্ষে সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার কথা এর চাইতে বেশি আর কি হতে পারে! বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে এই বোধোদয় হওয়ায় মহামান্য এক্সট্রা অর্ডিনারি এন্ড প্লেনিপোটেনশিয়্যারি (রাষ্ট্রপতির পূর্ণক্ষমতাবিশিষ্ট রাষ্ট্রদূত) প্রতিনিধিকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।

আসন্ন নির্বাচন নিয়েও তিনি প্রথম আলোতে কথা বলেছেন। ‘সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের’ ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি সঠিকভাবেই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিভিন্ন মন্ত্রীসহ সবাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চান। আর গণতন্ত্রে সবার দায়িত্ব পালন করতে হয়। শেষ বাক্যটির মতো কথা ইতোপূর্বে মার্শা বার্নিকাটের মুখ থেকে শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। প্রসঙ্গত নির্বাচন সামনে রেখে ‘জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের’ বক্তব্য নিয়ে বিগত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে এই কলামে ‘বার্নিকাটের বয়ান : গোড়া কেটে আগায় পানি দেয়ার নামান্তর’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। অনেক খুঁজে দেখলাম, ওই বক্তৃতায় তিনি ‘গণতন্ত্রে সবার দায়িত্ব সমান’ কথাটি বলেননি। এটা নিঃসন্দেহে অবস্থানের পরিবর্তন।

সংবাদটা পড়ে মনে হলো সরকারের অন্যতম প্রধান বিরূপ সমালোচক, মাইনাস টু তত্ত্বের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ও বিগত নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের দিকে ঝুঁকে থাকা দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় এসে বিদায়ী আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের এ কথা বলা বেশ আগ্রহ উদ্দীপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা আমাদের দেশের জ্ঞানী-গুণী নিরপেক্ষ দাবিদার ১/১১ সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বলতে ভালোবাসেন, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি দল বা জোটের। কথাটা তারা বুঝে বলেন নাকি না বুঝে বলেন জানি না। তবে বুঝেই বলেন বলে মনে হয়।

কেননা ক্যান্টনমেন্টে বসে ক্ষমতার সোনার চামচ মুখে নিয়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়া দল বিএনপি যে ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত হওয়া ছাড়া নির্বাচনে যেতে চায় না, এটা অভিজ্ঞতা থেকে জনগণের কাছে সুস্পষ্ট। তাই জ্ঞানী-গুণীজনদের কাছেও সে কথা অস্পষ্ট থাকার কথা নয়। প্রসঙ্গত, নির্বাচন বয়কট বিষয়টা আমাদের রাজনীতিতে আমদানি হয় স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে প্রো-চাইনিজ অতিবামপন্থি রাজনীতির ভেতর দিয়ে। পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক দুই হত্যাকা- ও ক্ষমতার উল্টোমুখী পটপরিবর্তনের পর চরম দমন-পীড়ন, অপপ্রচারের মধ্যেও আওয়ামী লীগ নির্বাচন বয়কট করেনি।

তাই বলা যায়, যা ছিল বামপন্থার ‘শিশুরোগ’, তা এখন ডানপন্থার ‘চক্রান্ত রোগ’-এর ঘাড়ে চেপেছে। মজার বিষয় হলো, বিগত নির্বাচনে এই রোগে অতি বাম-ডান দুটোই দুদিক থেকে এসে চিরসত্য ‘চরম দুই প্রান্ত এক বিন্দুতে মিলিত হয়’ রোমান প্রবাদবাক্যটি প্রমাণ করে মামার বাড়িতে একত্র হয়েছিল। ধারণা করি ২০১৪ সালে বাংলাদেশে আসা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে আসার পর থেকে বিগত দিনগুলোর অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপ করে উল্লিখিত উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন, যা এই কলামসহ আরো কলামে বারবার প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ ছাড়ার আগে এই উপলব্ধির জন্যও তাই রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন। জানি না এই উপলব্ধি কী বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের নিজস্ব নাকি আমেরিকার সরকারের। তবে মনে করার কারণ আছে যে, এটা সরকারের। যদি তা হয় তবে আমেরিকার এই অবস্থান আমাদের দেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও প্রতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়ার জন্য নিঃসন্দেহে শুভ। কেননা প্রতিদ্বন্দ্বী দল দুটির ‘দায়িত্ব সমান’ বিষয়টা যদি মেনে নেয়া হয়, তবে বিদেশিদের কাছে গণসমর্থিত দলগুলোর ধরনা দেয়ার প্রবণতা যেমন কমবে, তেমনি বিদেশিদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশেষত নির্বাচনের সময় নাক গলানো ও দৌড়ঝাঁপ কমবে। বিগত নির্বাচনের আগে দৌড়ঝাঁপ করে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা দিল্লি গিয়ে দিল্লি দুরস্ত হওয়ার মুখরোচক গল্প এখনো দেশবাসীর স্মরণে আছে। দেশবাসী আশা করবে নির্বাচনের আগে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রদূত রাবার্ট মিলার বাংলাদেশে এসে মার্শা বার্নিকাটের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি বিবেচনায় নিয়ে চলবেন। আমেরিকার কাছ থেকে এমন কূটনীতি আশা করার সুযোগ করে দিয়েছেন বিদায়ী রাষ্ট্রদূত। তাই খোলা মন নিয়ে বিদায়ের ক্ষণে বলতে চাই : বিদায় মার্শা বার্নিকাট! আপনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন!

এটাই তো কমবেশি সবারই জানা যে, ‘সকল মানুষ সমান’, ‘বহুর মধ্যে এক’ ও ‘মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ’ প্রভৃতি ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার মর্মবাণী। আদিবাসী আমেরিকানদের জীবনধারা ধ্বংস করে ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ পাইয়ে দিতে গিয়ে চরম অত্যাচার আর নির্যাতনে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল নতুন দুনিয়ার ইউরোপীয় অভিবাসীরা। নিজেদের সমাজ গড়ে তুলতে কালোদের জোর করে এনে বানিয়েছিল দাস। কিন্তু ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে নিজেদের ব্যবহৃত শিকলেই নিজেরা পড়েছিল বাঁধা। ওই শিকল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মানবাধিকার গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখার সংগ্রামে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছে সাদা-কালো, ইউরোপিয়ান-আফ্রিকান-এশিয়ান মিলে সম্মিলিত আমেরিকান জাতি। কিন্তু দুর্ভাগ্য বিশ্ববাসীর!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমেরিকা সুপার পাওয়ার হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভূরাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষার জন্য বিশ^বাসীর গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মুক্তির সব পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করে আসছে আমেরিকা। তাই সংগ্রামের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাসী সাধারণভাবে আমেরিকাকে ভয় সন্দেহ অবিশ্বাস ও ঘৃণার চোখে দেখে। আর অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটাই সত্য যেখানে সমস্যা, সংকট, শোষণ, যুদ্ধ, মানবাধিকারহরণ সেখানেই আমেরিকার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ উপস্থিতি থাকে। জাতি হিসেবে আমরাও এ থেকে রেহাই পাইনি এবং পাচ্ছিও না।

পাকিস্তানি আমলে আমেরিকা দাঁড়িয়েছিল আমাদের গণতন্ত্র ও স্বাধিকার আন্দোলনের বিরুদ্ধে। আইয়ুব-ইয়াহিয়া সেনাশাসকের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান-আমেরিকা-চীন অক্ষশক্তি সৃষ্টি করে পাঠিয়েছিল বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর। মুক্তিযুদ্ধ ও বন্যা বিধ্বস্ত দেশে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে প্রতিশ্রুত খাদ্য না পাঠিয়ে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যায়িত করেছিল। পঁচাত্তরে ইতিহাসের বর্বরতম ও নৃশংস দুই হত্যার পর দাঁড়িয়েছিল হত্যাকারীদের পক্ষে। দুই সেনাশাসককে উসকানি দিতে জন্মলগ্নের মর্মবাণী জাতীয় চার নীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, বাংলাদেশকে বলেছিল ‘মধ্যপন্থার মুসলিম দেশ।’ এই অভিধা সত্য প্রমাণ করতে বিগত নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসের পক্ষে দাঁড়াতেও কুণ্ঠিত হয়নি। ১/১১-এর পক্ষের সুশীলদের নিয়ে কিংস পার্টিকে ক্ষমতায় বসাতে পূর্বাপর মিটিং-সিটিং করে যাচ্ছিল। সবশেষে করেছিল পদ্মা সেতুকে টার্গেট। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বার্নিকাটের এসব না জানার কথা নয়। তখন কোথায় ছিল রাষ্ট্রদূত থাকার সময়ে সুন্দর উক্তি: ‘পূর্বপুরুষদের স্বপ্নপূরণ অগ্রযাত্রার মূলমন্ত্র!’

বলাই বাহুল্য বিশ্ব প্রেক্ষাপটে জন্মলগ্নের মর্মবাণী থেকে যেমন বহু যোজন দূরে গণতন্ত্র আইনের শাসন ও মানবাধিকার বিষয়ে আমেরিকার অবস্থান, ঠিক তেমনি আমাদের জন্মলগ্নের মর্মবাণী থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় রয়েছে এতদিন আমেরিকা। এই অবস্থায় পারবে কি আমেরিকা আমাদের পূর্বপুরুষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ যাদের মর্মর ও অবিনশ্বর মূর্তি রয়েছে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের উৎসমুখে, তাদের স্বপ্ন আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার পক্ষে দাঁড়াতে? অপ্রত্যাশিত অভিনব আকস্মিক ঘটনা মানব জাতির অগ্রগতির ইতিহাসে বিভিন্ন কালপর্বে হয়ে থাকে।

এমনটা কি ঘটবে আমেরিকার দিক থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে, যা আমেরিকাকে বিশ্বাস করার সহায়ক হবে? জানি না। তবে এটাই মানবতার রেওয়াজ যে, গণহত্যার পক্ষে দাঁড়ালে কিংবা অন্যায় অন্যায্য হত্যার মতো কিছু করলে ক্ষমা চাইতে কিংবা অন্তত দুঃখ প্রকাশ বা ভুল স্বীকার করতে হয়। পারবে কি মার্শা বার্নিকাটের দেশ আমেরিকা আমাদের জাতির কাছে তা চাইতে? যদি তা না পারে তবে আদৌ পূর্বপুরুষদের স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যাভিমুখী জাতির অভিযাত্রায় আমেরিকা সর্বতোভাবে আমাদের প্রকৃত সাথী হতে পারবে না। অনাগত ভবিষ্যৎ এই প্রশ্নের জবাব দিবে।

লেখক ঃ শেখর দত্ত