অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত

কৃষি প্রতিবেদক ॥ অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বে অর্কিডের রয়েছে বহুবিধ চাহিদা যেমন : খাদ্য, খাদ্য সহায়ক, ওষুধ, ঔষধি উপাদান, পানীয় উপাদান, পানীয় সহায়ক, আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট, অভ্যন্তরীণ সজ্জায়নসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে অর্কিডের রয়েছে আভিজাত্যিক ব্যবহার। আফ্রিকানরা প্রায় ৭৭ প্রজাতির অর্কিড খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন শত বর্ণে ও বৈচিত্রে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক আর্কষণীয় ফুলের নাম অর্কিড। এরা অর্কিডেসি পরিবারের উদ্ভিদ। এক বীজপত্রী উদ্ভিদের অন্তর্ভুক্ত এ উদ্ভিদের ৮০০ গণ এবং ৩৫ হাজারেরও বেশি প্রজাতি রয়েছে। প্রজাতিভেদে এদের ফুলের গঠন, আকার, আকৃতি এবং বর্ণে অনন্য বৈচিত্র ও বিভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। অর্কিডেসি পরিবার উদ্ভিদ জগতের তিনটি বড় পরিবারের একটি। অনেকের মতে এ পরিবারে সর্বাধিক বেশিসংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতি বিদ্যমান। প্রাচীন চীনা গ্রন্থে তিন হাজার বছর আগে প্রথম অর্কিড উদ্ভিদকে ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জনক ‘থিওফ্রাস্টাস (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭১-২৮৭) এ উদ্ভিদের নামকরণ করেন অর্কিড। অর্কিড শব্দটি গ্রিক শব্দ অর্কিস থেকে নেয়া। তৎকালীন সমাজে অর্কিডের মূলাংশের টিউবার নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, পুরুষের অন্ডকোষ সদৃশ্য হওয়ায় এগুলো পুরুষত্ব বর্ধক জাতীয় কিছু। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, টিউবারে উদ্দীপক জাতীয় কিছু উপাদান রয়েছে।
হিসেবে ওই সমাজে এ উদ্ভিদের চাহিদা ছিল খুব বেশি। আবার অনেকে বিশ্বাস করত, প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ‘ভেনাস’ অর্কিডের ওই বিশেষ গঠনের প্রতি খুবই আসক্ত। এগুলো দেবীকে কামোদ্দীপ্ত করে। তাই যারা ওই টিউবারকে ভালোবেসে ভক্ষণ করেন, দেবী তুষ্ট হয়ে তাদের পুত্রসন্তান দিয়ে থাকেন। তাই পুত্রসন্তান লাভের বাসনায় অর্কিডের টিউবার খেতেন অনেকেই। অধিকাংশ অর্কিড বহুবর্ষজীবী হার্বজাতীয় উদ্ভিদ। অঙ্গজ গঠনে ব্যাপক বিভিন্নতা থাকলেও ফুলের গঠনের সামঞ্জস্যতা এসব উদ্ভিদকে একই পরিবারভুক্ত করেছে। অর্কিডের কিছু বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য রয়েছ যেমন: এরা টেরিস্ট্রিয়াল, ইপিফাইট, স্যাপ্রোফাইট বা কাইমবার হয়ে থাকে। এদের মূল ফেসি বা রাইজোমেটাস। মূলে ভ্যালামেন টিস্যু থাকে। এ টিস্যুর সাহায্যে বাতাস থেকে এ উদ্ভিদ পানি শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফুল এর উপরাংশ নিচের দিকে হয়ে থাকে। ফুলে তিনটি সেপাল এবং তিনটি পেটাল থাকে। অর্কিড বর্তমান বিশ্বে অর্নামেন্টাল উদ্ভিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বে অর্কিডের রয়েছে বহুবিদ চাহিদা যেমন : খাদ্য, খাদ্য সহায়ক, ওষুধ, ঔষধি উপাদান, পানীয় উপাদান, পানীয় সহায়ক, আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট, অভ্যন্তরীণ সজ্জায়নসহ বহুবিধ ক্ষেত্রে অর্কিডের রয়েছে আভিজাত্যিক ব্যবহার। এ লেখায় খাদ্য হিসেবে অর্কিডের অবস্থান তুলে ধরাই হবে মূল প্রতিপাদ্য। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক স্থানেই দেখা যায়, তারা অর্কিডের ওপর কোনো গ্রন্থ লেখার শুরুতেই উল্লেখ করেন যে, অর্কিড সর্ববৃহৎ উদ্ভিদ পরিবার, আর তন্মধ্যে শুধু ভ্যানিলা এবং অর্কিড খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ উক্তিকে অনেকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিলেও একথা আজ চিরন্তন সত্য যে, প্রতি একক আয়তনে উৎপন্ন লাভজনক উদ্ভিদের মধ্যে অর্কিডই প্রথম স্থানের অধিকারী। ইউরোপিয়ান ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আফ্রিকানরা শত শত বছর আগে থেকেই অর্কিডকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি জীববিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, আফ্রিকানরা প্রায় ৭৭ প্রজাতির অর্কিড খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘চিকানদা’ বা ‘কানাকা’ নামের ডিশে জাম্বিয়ার লোকজন স্থলজ অ্ির্কডের টিউবার ব্যবহার করেন। ভ্যানিলা বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত অর্কিড। কারণ এর ফ্লেভার বা সুঘ্রাণ খাদ্যের ও পানীয়ের মান বহুগুণে বৃদ্ধি করে। কিউবায় ভ্যানিলার সুঘ্রাণ তামাক জাত খাদ্যোপাদানকে আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, ১৬ থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বছর কামোদ্দীপক থেরাপিতে অর্কিড ব্যবহৃত হয়েছে। এ ছাড়া অনেক অর্কিড মাথাব্যথা দূরীকরণে, বিষাক্ত পোকার দংশন উপশমে এবং পেটের পীড়ার ওষুধ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে বহুকাল থেকে। সম্প্রতি কিছু গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভ্যানিলার ফ্লেভার কেমোথেরাপি দেয়া রোগীদের খাদ্য গ্রহণ বৃদ্ধি করে এবং অবসাদ দূর করে বমি বমি ভাব থেকে মুক্ত করে। ডেনড্রোবিয়াম গণভুক্ত অর্কিড ‘ফুড-অর্কিড’ হিসেবে খ্যাত। আমেরিকায় হাইব্রিড ডেনড্রোবিয়াম অর্কিডের ফুল খাদ্য ডেকোরেশন করতে ব্যবহৃত হয়। এশিয়ার অনেক দেশে হালকা পানীয় ক্যানে এ ফুল চিত্রাকর্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জাপান এবং সিঙ্গাপুরে সস তৈরিতে ডেনড্রোবিয়াম ব্যবহার করা হয়। আয়ারল্যান্ডে এ জাতের ফুল বাটারের সঙ্গে ফ্রাই করে সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। ইউরোপে ডেজার্ট এবং কেকে এ ফুল ব্যবহার করা হয়। কেকে অর্কিড বহুকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অর্কিডকে অস্ট্রেলিয়ার অনেক উপজাতি আপদকালীন খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেন। নেপালে কিছু প্রজাতির অর্কিড ফুলগুলো শুকায়ে চায়ের সঙ্গে খাওয়া হয় সুস্বাস্থ্যের আশায়। নেপালের তামিল অধ্যুষিত এলাকায় অর্কিডের ফুল দিয়ে উপাদেয় আচার বানানো হয়। গ্রামাঞ্চলে অনেক অর্কিডের সিউডোবাল্ব এবং টিউবার তৃষ্ণা নিরাময়কারী হিসেবে খাওয়া হয়। পানীয় জগতে অর্কিডের ব্যবহার ব্যাপক। মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে টার্কিতে স্থলজ অর্কিডের টিউবার থেকে ‘সাহলেপ’ নামক আইসক্রিম ও পানীয় প্রস্তুত করা হয়। আরবি সাহলেপ শব্দটি ইংরেজিতে ‘সালেপ’ শব্দে প্রচলিত হয়েছে। ‘সালেপ’ স্টার্চ সমৃদ্ধ মিষ্টি উপাদান। এটি রুটিতে মিশিয়ে খাওয়া যায়, আবার পানীয়তে মিশিয়েও খাওয়া যায়। ঐতিহ্যগতভাবে এটি পুষ্টি সমৃদ্ধ এবং টুরিস্টরা দুপুরের খাবারের বিকল্প হিসেবে ‘সালেপ’ গ্রহণ করতেন। ১৫৬৮ সালে ‘উইলিয়াম টারনার’ নামে বিখ্যাত একজন হার্বালিস্ট অর্কিডের চারটি ঔষধি গুণাগুণ প্রচার করেন। এগুলো হলোথ এন্টি-পাইরেটিক, এন্টি-কনজামশন, এন্টি-ডায়ারিয়া এবং এন্টি-এলকোহলিক গ্যাস্ট্রাইটিস। ১৬৪০ সালে বিখ্যাত চিকিৎসক জন পার্কিনসন বলেছেন, অর্কিডজাত খাদ্য মানব দেহে পুনরুৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। উনিশ শতকে পশ্চিমা দেশগুলোয় এক ধরনের চা খুবই জনপ্রিয় ছিল। ওই চা এক প্রকার অর্কিড মিশিয়ে তৈরি করা হতো। মনে করা হতো, এই চা এক ধরনের ‘সিডেটিভ’ গুণসম্পন্ন এবং এতে ‘জুমেলিয়া’ নামক সুগন্ধী পাওয়া যেত। আফ্রিকান অঞ্চলের তাঞ্জানিয়া, জাম্বিয়া এবং মলাবিতে সুদীর্ঘকাল থেকেই অর্কিডের টিউবার খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে অর্কিড টিউবার বাণিজ্যিকভাবেও ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। টিউবার দিয়ে তৈরি খাদ্যকে তারা মাংসের স্থলাভিষিক্ত মনে করতেন। এ ব্যবসা ব্যাপক হওয়ায় এ অঞ্চলে অর্কিড নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়। অর্কিড প্রেমিকদের এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অর্কিড উৎপাদনকারীদের মতে অর্কিড উপাদেয় ফাইবার ও ভিটামিন যুক্ত খাবার। কেমন স্বাদ এ খাবারের? জরিপে বিভিন্ন মতামত পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলেছেন, কিছুটা মিষ্টি স্বাদের অর্কিড খুবই ভালো লাগে। কেউ কেউ বলেছেন, এদের স্বাদ কিছুটা ট্যানিন যুক্ত খাবারের মতো আবার কেউ কেউ বলেন, খাদ্য হিসেবে এটি তাদের পছন্দের সর্বশেষ তালিকায়। সাম্প্রতিককালেও হাওয়াই দীপপুঞ্জে অর্কিড বিভিন্নভাবে খাদ্য হিসেবে প্রচলিত আছে বিশেষ করে খাদ্যভান্ডার ডেকোরেশনে এবং খাবার প্লেট ডেকোরেশনে হোটেলে ও রেস্তোরাঁগুলোয় অর্কিডের কদর অনেক। তারা সালাদ হিসেবে খাদ্যের ডিশে অর্কিড ব্যবহার করছেন। সুগার কোটেড করে অর্কিড দিয়ে বিভিন্ন স্বাদের মূল্যবান ক্যান্ডি তৈরি করছেন। কোনো অর্কিডই বিষাক্ত নয় বিধায় খাদ্য পরিবেশনায়- রকমারিকরণে, সহায়ক স্বাদের সংযোজনে এবং খাদ্য পরিবেশনা ডেকোরেশনে অর্কিড দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। লেখক : ড. মো. ওবায়েদুল ইসলাম, অধ্যাপক, ফসল উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

আরো খবর...