৭১ বছরেও বরফ গলেনি পাক-ভারত সম্পর্কের

॥ কুলদীপ নায়ার ॥

ভারতের স্বাধীনতা লাভের তিনদিন আগের কথা। দিনটি ছিল ১৯৪৭ সালের ১২ আগস্ট। আমার বাবা একজন ডাক্তার। তিনি আমাদের তিনভাইকে ডেকে পাঠালেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জানতে চাইলেন আমাদের পরিকল্পনা কী? আমি বললাম, আমি পাকিস্তানেই থাকতে চাই। ভারতে মুসলমানরা যেভাবে থাকবেন আমরাও সেভাবে পাকিস্তানেই থাকব। আমার বড় ভাই সেসময় অমৃতসরে পড়ালেখা করতেন। তিনি কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, পশ্চিম পাঞ্জাবে মুসলমানরা হিন্দুদের বাড়িঘর খালি করে দিতে বলবে। একইভাবে যেসব মুসলমান পূর্ব পাঞ্জাবে বসবাস করছেন, তাদের চলে যেতে বলা হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হিন্দুরা যদি নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে দিতে না চায়, তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব? জবাবে তিনি বললেন, প্রয়োজনে আমাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হবে।

তখন কী ঘটেছিল এটাই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। আগস্টের ১৭ তারিখ। ভারতের স্বাধীনতা লাভের মাত্র দুদিন পরের ঘটনা। কয়েকজন ভদ্র মুসলমান আমাদের কাছে এলেন। তারা আমাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। আমি তাদের একজনকে বললাম, তাহলে আমরা কোথায় যাব? তিনি ভারতের জলন্ধরে অবস্থিত তার বাড়ির চাবি আমাদের হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন, আপনাদের তেমন কিছুই করতে হবে না। কেননা বাড়িটি বিভিন্ন আসবাবপত্রে সুসজ্জিত এবং দখলের জন্য প্রস্তুত। আমরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলাম।

তারা চলে যাওয়ার পর আমাদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আমরা সবাই খাবার টেবিলে বসলাম। আমি ভাইদের বললাম, আমি কিন্তু পাকিস্তানেই ফিরে আসছি। তারা বললেন, তারা অমৃতসর যাচ্ছেন, গোলমাল থেমে গেলে আবার ফিরে আসবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা ভারতে গিয়ে খুব জোর মাসখানেক থাকব। তারপর আবার ফিরে আসব। আমার মা আমাদের ঘরে তালা দেওয়ার সময় বললেন, আমার মন বলছে আমরা আর ফিরে আসতে পারব না। আমার বড় ভাইও তার সঙ্গে একমত হলেন।

আমি নীলরঙের একটা কাপড়ের ব্যাগে একটা শার্ট ভরে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বললাম, দিল্লির দরিয়াগঞ্জে মামার বাড়িতে আমাদের দেখা হচ্ছে। আমার মা আমাকে ১২০ রুপি দিলেন যাতে দিল্লিতে সবার সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমি চলতে পারি। আমার বাবা আমার এই সফরকে সহজ করে তুললেন। তিনি একজন ব্রিগেডিয়ারকে বলে দিলেন যাতে সীমান্তের ওপারে আমাদের তিনভাইকে গ্রহণ করা হয়। এই ব্রিগেডিয়ার ছিলেন আমার বাবার একজন রোগী। তিনি সব শুনে বললেন, তার জংগাটি (গাড়িবিশেষ) ছোট। সেখানে আমাদের একজনের জায়গা হতে পারে। পরের দিন সকাল বেলা আমাকে তার গাড়িতে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। আমি আমার চোখের জল লুকোতে পারলাম না। আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে কিনা আমার সন্দেহ হলো।

শিয়ালকোট থেকে সাম্বিয়ালের যাত্রাপথটি ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু এরপর দেখলাম দুই পাশে কেবল মানুষভর্তি এক একটা বৃহত্ শকট। এসব মরুর যানবাহনে হিন্দুরা যাচ্ছে ভারতে, আর মুসলমানরা যাচ্ছে পাকিস্তানে। হঠাৎ আমাদের জংগা গাড়িটি থেমে গেল। একজন বৃদ্ধ শিখ আমাদের পথ আগলে ধরলেন। তিনি তার নাতনিটিকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভিক্ষা চাইলেন। আমি তাকে ভদ্রভাবে বললাম, আমি তো এখনো পড়াশুনা করছি। আমি আপনার নাতনিকে বহন করে নিয়ে যেতে পারি না। যাহোক, তিনি কাতরভাবে অনুনয়-বিনয় করছিলেন। বৃদ্ধ লোকটি তখন বললেন যে, তিনি তার পরিবারের সব সদস্যকেই হারিয়েছেন। এখন তার ওই নাতিটিই কেবল বেঁচে আছে। তিনি চান তার নাতিটি অন্তত বেঁচে থাকুক।

বৃদ্ধ লোকটির অশ্র“সিক্ত মুখ আজও আমার মনে পড়ে। কিন্তু আমি তাকে আমার বাস্তবতার কথাই বলেছিলাম। যেখানে আমার নিজেরই ভূত-ভবিষ্যতের ঠিক নেই, সেখানে একজন শিশুকে আমি কীভাবে লালন-পালন করব? তারপর আমরা এগিয়ে গেলাম। যাত্রাপথে আমরা দেখলাম এখানে-সেখানে মালপত্র পড়ে আছে। কিন্তু মৃতদেহগুলো যথাসময়েই সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তারপরও বাতাসে পাওয়া যাচ্ছে মরা মানুষের উত্কট গন্ধ ।

সেসময় আমি প্রতিজ্ঞা করি, দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব। এ কারণেই আমি ওয়াগাহ সীমান্তে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন শুরু করলাম। ২০ বছর আগে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাত্র ১৫-২০ জন লোক নিয়ে শুরু হয় এই ছোট আন্দোলন । এখন মোটামুটি এক লাখ লোক ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় জড়ো হন। পাকিস্তান সীমান্তেও সীমিত সংখ্যক লোক এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।

জনগণের কৌতূহল ও আগ্রহের সীমা নেই। কিন্তু দুই দেশের সরকার আছেন তাদের মতো। মোমবাতি প্রজ্জ্বলনের পুরো এলাকায় জারি করা হয় কারফিউ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স ও সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স উভয়ই যাতে আমাদের জিরো পয়েন্টে যাওয়ার অনুমতি দেয়, এইজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে আমি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের কাছে চিঠি লিখেছি। মোমবাতি প্রজ্জ্বলন আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে এক দিকে রয়েছে স্টিল গেট।

এই ব্যবস্থার কারণে কিছু লোক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আমি আশা করি, এই সময় সীমান্ত শিথিল ও চারপাশের পরিবেশ থাকবে শান্ত যাতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ঘৃণা ও শক্রতার নিরসন হয়। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী যখন স্থলপথে দিল্লি থেকে লাহোর শোভাযাত্রা করেন, তখন সেই বাসে আমিও ছিলাম। দেখেছি দু’পাশে মানুষের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। ভেবেছিলাম এই যাত্রা দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত বাণিজ্য, যৌথ উদ্যোগ ও জনগণ থেকে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে।

কিন্তু যখন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলো, তখন আমি হতাশ হলাম। এর ফলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতে সৃষ্টি হলো প্রতিবন্ধকতা । ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তৈরি হলো সীমাবদ্ধতা। অতীতে বুদ্ধিজীবী, সংগীত শিল্পী ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। পারতেন যৌথ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে। কিন্তু দুই দেশের সরকার ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তোলে। ফলে আজ তাও বন্ধ হয়ে গেল। বাস্তবে সরকারি বা এমনকি বেসরকারিভাবেও দুই দেশের মাঝে এখন কোনো যোগাযোগ নেই।

পাকিস্তানের নয়া প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তিনি দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চিত করবেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা থাকার কারণে আমার আশঙ্কা হয় যে, তার এই অঙ্গীকার রক্ষার অনুমতি তাকে দেওয়া হবে না। আবার দেওয়া হতেও পারে। কারণ সেনাবাহিনীর দৃষ্টিকোণকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করা হয়। সেনাবাহিনীও শান্তি চায়। কেননা যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের লোককেই যুদ্ধ করতে হয়। দুঃখের বিষয় হলো, ভারতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও পাকিস্তানে তা হয় না। সেখানে সেনাবাহিনীই শেষ কথা বলে। এ কারণে সেখানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এই ব্যাপারে ইমরান খান সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হবেন কিনা তা কল্পনা করা কঠিন।

নয়াদিল্লির একটি উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিন্তু মুম্বাই বোমা হামলায় যেসব সন্ত্রাসী জড়িত তাদের প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা ও তাদের শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লি এ ব্যাপারে ইসলামাবাদের সঙ্গে কোনো প্রকার উদ্যোগ নেবে না বলে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দুই দেশের মাঝে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হলে ভারতের দাবি মেনে নিয়ে ইমরান খানের এই ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। (কুলদীপ নায়ারের প্রকাশিত এটিই শেষ লেখা।)

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : ফাইজুল ইসলাম

লেখক ঃ সদ্যপ্রয়াত ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনীতিক ও কলামিস্ট

আরো খবর...