৬ মাসেই গুড়িয়ে গেছে কুষ্টিয়া জেলার মাদক সিন্ডিকেট

৭০০ গ্রেফতার, মামলা ৫ শতাধিক, রেহায় পাচ্ছে না পুলিশের সদস্যরাও
পুলিশ সুপারের কঠোর অবস্থান

সাজ্জাদ রানা ॥ পুলিশ সুপার হিসেবে কুষ্টিয়ায় যোগ দেয়ার পর কয়েকটি এজেন্ডা নিয়ে কাজ শুরু করেন এসএম তানভীর আরাফাত। তার মধ্যে সব থেকে বেশি অগ্রাধিকার দেন মাদক দমনকে। সেই মোতাবেক ৬ মাসের একটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগে নিজের ঘরে সুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। এখন পর্যন্ত মাদকের সাথে সম্পর্কের কারনে প্রায় অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যকে জেলা ছাড়া করেছেন। আর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের যে কোন মূল্য আইনের আওতায় আনতে ওসিদের নির্দেশ দেন। এখন পর্যন্ত পুলিশের নেয়া পদক্ষেপের কারনে মাদকের যে সিন্ডিকেট ছিল তা অনেকটা গুড়িয়ে গেছে। নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে প্রায় ৭০০জনকে। আর মামলা দেয়া হয়েছে ৫ শতাধিক। কঠোর পরিণতির কথা ভেবে অনেক মাদক ব্যবসায়ী কারাগার থেকে জামিন পর্যন্ত নিচ্ছে না।

সীমান্ত ঘেরা কুষ্টিয়া জেলায় মাদকের থাবা নিয়ে সব মহল কমবেশি উদ্বিগ্ন। কোনভাবেই মাদকের ঢেউ বন্ধ করা যাচ্ছে না। তবে আগে মাদকের যে রমরমা উপস্থিতি ছিল তা আর এখন নেই। হাত বাড়ালেই এখন আর মাদক মেলে না। তারপরও সীমান্তসহ আশেপাশের জেলা দিয়ে মাদক কমবেশি জেলায় প্রবেশ করছে। আর ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবা না পেয়ে অনেকে বিকল্প মাদক হিসেবে টাপেন্টা নামক এক প্রকার ওষুধ সেবন করছে।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মাদক নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন। মাদকের পিছনে যত শক্তিশালী লোকেরই হাত থাক না কেন কাউকে ছাড় না দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক জেলা পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।

পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফত জেলায় যোগ দেয়ার পর ৬টি থানা ও ডিবির যাদের বিরুদ্ধে মাদকে ইন্ধনসহ অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল ইতিমধ্যে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নেয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে জেলার বাইরে বদলি করা হয়েছে। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতার অভিযোগ পুলিশের বেশ কিছূ এসআইকে বদলি করা হয়েছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কয়েজনের বিরুদ্ধে।

পুলিশ সুত্র জানায়, সরাকরের নির্দেশনা অনুযায়ী মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সনীতি নিয়েছে জেলা পুলিশ। মাদকের সাথে জড়িত প্রায় ৫১জন পুলিশ সদস্যকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি দৌলতপুরে এক মাদক বিরোধী সমাবেশে পুলিশ সুপার হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মাদক নির্মূল করতে না পারলে চুরি পরে জেলা থেকে চলে যাব। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পনের আহবান জানান তিনি। না হলে চুড়ান্ত পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে বলেন।’ এ ঘোষনার পর বদলে গেছে চিত্র।

পুলিশের গোপন শাখা সুত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশের টিম দৌলতপুর ও ভেড়ামারা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ফেনসিডিলের একাধিক বড় চালান আটক করেছে। যার সংখ্যা ২ হাজার বোতলের ওপরে। এর পাশাপাশি শহর এলাকা থেকেও ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ফেনসিডিল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আনা হয়। পরে অন্য জেলায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ভেড়াড়ারা ও দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক। এ ছাড়া মণ খানেক গাঁজা উদ্ধার হয়েছে বিগত কয়েক মাসে। ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে প্রায ১২ হাজার পিচ। মামলা দেয়া হয়েছে ৫ শতাধিক। একই সময় মাদক ব্যবসা, পরিবহন ও সেবনের অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ৭ শতাধিক ব্যক্তিকে।

এদের মধ্যে মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও সেবনকারি রয়েছে। পুলিশ সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ীদের নতুন তালিকা প্রস্তুত করেছে। সেই তালিকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন বলেন, মাদকের সাথে কোন আপোষ নয়। শহরের মাদক সিন্ডিকেট ইতিমধ্যে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ ব্যবসায়ী পলাতক। অনেকে জেলে। নতুন যারা মাদক ব্যবসা করার চেষ্টা করছে তাদের ওপর নজরদারি রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের কোন ভাবেই মাথা তুলে দাঁড়াতে দেয়া হবে না।

কয়েকটি সুত্র জানিয়েছে, দৌলতপুরসহ কয়েকটি থানার অন্তত ১০ পুলিশ সদস্যও এখনো মাদক ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে। এর মধ্যে মিরপুর থানার দুই এসআই ও এক এএসআই রয়েছে। এছাড়া ইবি থানার কয়েকজন পুলিশের সদস্যের বিরুদ্ধে রয়েছে অভিযোগ।

সচেতন মহল মনে করেন, জেলার তিন শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এনকাউন্টার নিহত হওয়ার পর কাঁপন ধরেছে মাদক সিন্ডিকেটে। এরপর জান বাঁচাতে শীর্ষরা গা ঢাকা দেয়া শুরু করে। অনেকে পালিয়ে ভারতে অবস্থান করছে। যেসব রাজনৈতিক নেতারা সেল্টার দিত তারাও সাবধান হয়েছে। মাদক ও অস্ত্র কারবারের সাথে জড়িত থাকায় জেলা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ইতিমধ্যে।

দৌলতপুর উপজেলার জামালপুর গ্রামে বাড়ি একাধিক মাদক ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশের অভিযানে সব বদলে গেছে। আগে পুলিশ টাকা নিয়ে সহযোগিতা করত। এখন লাখ টাকা দিলেও অনেকে নিতে চাই না। ব্যবসাতো দুরে থাক জান বাঁচানো কঠিন। পুরাতনরা এখন ব্যবসা থেকে দুরে আছে বলে জানান তিনি। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছে। আর যারা গডফাদার ছিল তারাও ভোল পাল্টে ফেলেছে। যে সিন্ডিকেট ছিল তা এখন আর নেই।’

ওই ব্যবসায়ী জানান, আগে দৌলতপুর থানায় পোষ্টিং নিতে পুলিশের ওসিসহ এসআইদের ঘুষ দিয়ে আসতে হতো। কোটি কোটি টাকা আয় ছিল। এখন সেসব আয় প্রায় বন্ধ। কিছু লোক গোপনে এখনো কাজ চালাচ্ছে তবে এ অবস্থা চলতে থাকলে মাদক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।’

সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম টুকু বলেন, পুলিশের চলমান অভিযানের কারনে মাদক কমেছে এটা ঠিক। মাদক বন্ধে পুলিশকে আরো কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে সচেতন করতে হবে। তাহলে মাদক পরিস্থিতির দিন দিন উন্নতি হবে। বর্তমান পুলিশ সুপারে নেয়া পদক্ষেপের কারনে মাদকের প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক কম বলে মনে করেন তিনি।’

মাদক প্রতিরোধের সাথে জড়িতরা মনে করেন, আগের তুলনায় মাদকের প্রকোপ অনেক কমেছে। এখন গোপনে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে নতুন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য পুলিশকে আরো সক্রিয় হবে। শহরে সুবিধা করতে না পেরে অনেকেই গ্রামের দিকে ব্যবসা করার চেষ্টা করছে। গ্রামঞ্চলেও ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

দৌলতপুর উপজেলায় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে ৭২জন। এর মধ্যে এনকাউন্টারে মারা গেছে ২জন। গ্রেফতার হয়ে জেলে আছেন প্রায় অর্ধশত ব্যবসায়ী। সীমান্ত উপজেলা হিসেবে দৌলতপুর মাদক নির্মূল করতে পুলিশ সুপার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয় সব শ্রেণী পেশার মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। মাদক ব্যবসায়ীদের একঘরে করে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে কোন জায়গা থেকে তারা সহযোগিতা না পায়। ইতিমধ্যে পুলিশ অনেকটা সফল হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা স্থানীয় এমপিসহ কারো সহযোগিতা পাচ্ছে না। তবে পুরোপুরি মাদক নিমূল হতে সময় লাগবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পুলিশের একাধিক সুত্র জানিয়েছে, বর্তমানে পুলিশের কোন সদস্যের বিরুদ্ধে মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কোন ভাবে কেউ ছাড় পাচ্ছে না। এছাড়াও পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে। আগে পুলিশের কিছূ অসাধু সদস্যের কারনে মাদক ব্যবসায়ীরা নানাভাবে সহযোগিতা পেয়ে আসছিল। এখন সেই সুযোগ নেই। এমনকি অনেকে ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েছিল। এদের চিহিৃত করে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এখনো যারা অপকর্র্মে জড়িয়ে আছে তারাও বাঁচতে পারবে না।’

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন,‘ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা  ও নির্র্দেশনা অনুযায়ী জেলা পুলিশ মাদক নির্মুলে কাজ করছে। বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে পুলিশ মাঠে মাঠে কাজ করছে। মাদকের বিষয়ে কোন অবহেলা সহ্য করা হব্ েনা। সব শ্রেণী পেশার মানুষকে সচেতন করতে উপজেলাগুলোতে সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। সাধারন মানুষের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। জেলায় কোন মাদক থাকবে না। আর যারা মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করবে তাদেরও আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

পুলিশ সুপার বলেন, আর পুলিশের কেউ জড়িত থাকলে প্রমান পাওয়া গেলে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে। পুলিশের চাকুরি করার কোন অধিকার তার থাকবে না। অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিজের বাড়ি ঠিক থাকতে হবে। তবেই সফলতা আসবে।’

 

আরো খবর...