হাসি-কান্নার ফুটবল

কখন ও কোথায় ফুটবল খেলার প্রথম প্রচলন হয়েছিল- এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিগত ৩ হাজার বছর ধরে সর্বাধিক জনপ্রিয় খেলা হিসেবে ফুটবলের প্রচলন রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে ক্রীড়া হিসেবে চীনে ফুটবল খেলা হতো, এমন তথ্য পাওয়া যায়। চীনে হান বংশের শাসনামলে খেলোয়াড়রা পায়ে পায়ে বল গড়িয়ে ছোট জালে পা দ্বারা বল ছুড়ে মারত। রোমান ও গ্রিকরা বল খেলাকে তামাশা এবং আমোদ-প্রমোদের অবলম্বন হিসেবে দেখত। জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিউটোতে বলে লাথি মারা একটি জনপ্রিয় ক্রীড়া ছিল।আধুনিক ফুটবলের জন্ম যুক্তরাজ্যে। ফুটবলের জন্ম থেকেই এর উন্মত্ততা পরিলক্ষিত হয়। জনসাধারণ ফুটবলের প্রতি এত অনুরক্ত ছিল যে, তারা খেলা দেখার জন্য দিনভর মাঠের চর্তুপাশে ভিড় করত। সে সময় সৈনিকরা এ খেলাটিকে ভালোবাসত এবং এমনও দেখা যেত- তীর নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ বাদ দিয়ে তারা খেলা দেখায় নিমগ্ন।১৩৬৫ সালে ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় অ্যাডওয়ার্ড উন্মত্ততা ও সেনাদের প্রশ্রয়ের কারণে ফুটবল খেলা বন্ধ ঘোষণা করেন। এরপর দেখা গেল, ১৪২৪ সালে স্কটল্যান্ডের সংসদে রাজা জেমস ঘোষণা করছেন- কোনো ব্যক্তি ফুটবল খেলবে না। ফুটবলের অনুরূপ বল দ্বারা রাগবি ফুটবল খেলা হলেও ফুটবলের সঙ্গে এর পার্থক্য হল, এ খেলাটিতে বল হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আধুনিক ফুটবল খেলায় বলে কোনোভাবে হাতের ছোঁয়া লাগলে সেটিকে ফাউল হিসেবে ধরা হয় এবং পেনাল্টি সীমানায় স্বপক্ষের কোনো খেলোয়াড়ের হাতে বল লাগা খুবই বিপজ্জনক।তাই পেনাল্টি সীমানায় স্বপক্ষের খেলোয়াড়রা যখন আত্মরক্ষামূলক খেলায় লিপ্ত থাকেন- তখন তাদের কোনোভাবে যেন হাতে বল না লাগে, এ বিষয়ে সর্বতোভাবে সচেষ্ট থাকতে দেখা যায়। আর পেনাল্টি সীমানায় স্বপক্ষের খেলোয়াড়ের হাতে তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বল লাগলে খেলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত রেফারির এটিকে ফাউল গণ্যে পেনাল্টি দেয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকে না। একজন গোলরক্ষক যতই পারদর্শী হোক না কেন, পেনাল্টি শুটের গোল ফেরানো নেহাত ভাগ্যের ব্যাপার। এ কারণে দেখা যায়, পেনাল্টি শুটের বিপরীত দিকে লাফ দিয়ে গোলরক্ষক গোল ঠেকানোয় সচেষ্ট।কালের পরিক্রমায় ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্রমান্বয়ে ইতালি, অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে ফুটবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একই সময় দেখা যায় আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও ব্রাজিলেও খেলাটি জনসাধারণের আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে আসে। ফুটবল খেলাকে আন্তর্জাতিকভাবে যে সংস্থাটি নিয়ন্ত্রণ করে, সেটাকে ফিফা (ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) বলা হয়। ১৯০৪ সালে ফিফা প্রতিষ্ঠিত হয়।বর্তমানে বিশ্বের ২০০টির বেশি দেশের ২৫ কোটি খেলোয়াড় ফুটবল খেলে থাকেন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ফুটবল খেলায় গোলরক্ষক ছাড়া অপর কোনো খেলোয়াড় বল হাত দিয়ে ধরতে পারে না। গোলরক্ষক শুধু পেনাল্টি সীমানায় বল হাত দিয়ে ধরতে পারে, পেনাল্টি সীমানাবহির্ভূত স্থানে নয়। গোলরক্ষক ছাড়া অপরাপর খেলোয়াড়রা পা ছাড়াও মাথা বা কাঁধের সাহায্যে বল নিক্ষেপ করতে পারে।ফুটবলের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিশ্বকাপ প্রতি ৪ বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্যতা নির্ধারণী খেলায় বিভিন্ন মহাদেশের ১৯০-২০০টি জাতীয় দল অংশগ্রহণ করে থাকে। এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মহাদেশগুলোর ৩২টি দল চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। পৃথিবীর সবচেয়ে সর্ববৃহৎ ক্রীড়া আসর অলিম্পিক গেমসেও ফুটবল খেলা হয়; তবে তা বিশ্বকাপের মতো আকর্ষণীয় হয় না। অতীতে পেশাদার ফুটবলারদের অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণের ব্যাপারে বিধিনিষেধ ছিল। ১৯৮৪ সাল থেকে পেশাদার ফুটবলাররাও অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্বকাপের আগে ও পরে বিভিন্ন মহাদেশে মহাদেশভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হয়।

ফুটবল খেলার সার্বিক নিয়ন্ত্রণে যিনি নিয়োজিত থাকেন, তাকে রেফারি বলা হয় এবং দু’জন লাইন্সম্যান তাকে সহায়তা করে থাকে। খেলা চলাকালীন মাঠের মধ্যে প্রদত্ত রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। খেলার মধ্যে একজন খেলোয়াড়ের অসদাচরণের মাত্রাভেদে রেফারি লাল বা হলুদ কার্ড প্রদর্শন করতে পারেন। কোনো খেলোয়াড়কে লাল কার্ড প্রদর্শন করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক খেলার মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হন এবং পরের ন্যূনতম একটি খেলা থেকে তিনি বিরত থাকেন। লাল কার্ডের কারণে একজন খেলোয়াড় মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হলে তার দল অবশিষ্ট খেলা ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে সম্পন্ন করে থাকে।একজন রেফারি একটি খেলায় একদলের বিরুদ্ধে কয়টি লাল কার্ড প্রয়োগ করতে পারবে, তা নির্দিষ্ট করে বলে দেয়া না থাকলেও যদি কখনও কোনো দলে খেলোয়াড় সংখ্যা ৭ জনের নিচে হয়, তাহলে রেফারিকে অবশ্যই সে খেলা পরিচালনা বন্ধ করে দিতে হয়। একটি খেলায় একজন খেলোয়াড়কে দুটি হলুদ কার্ড দেখানো হলে সেটিকে লাল কার্ডের সমতুল্য বিবেচনা করা হয় এবং এরূপ ক্ষেত্রে তিনি পরের খেলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত হন।ফুটবল খেলায় যে দল অধিকসংখ্যক গোল করতে সক্ষম হয়, সে দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। গোলপোস্টের ভেতর যেন বল প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে গোলরক্ষকের চেয়ে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের দায়িত্ব কোনো অংশে কম নয়। রক্ষণভাগ দুর্বল হলে খুব ভালো গোলরক্ষক দিয়েও গোল থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকের বাইরে অবশিষ্ট ১০ জন খেলোয়াড় তিনটি ধাপে ২, ৩ ও ৫ বিন্যাসে অবস্থান গ্রহণ করে থাকেন।

এখানে ২ অর্থ লেফট ও রাইট ব্যাক, ৩ অর্থ লেফট হাফ, সেন্টার হাফ ও রাইট হাফ এবং ৫ অর্থ লেফট উইং ২ জন, রাইট উইং ২ জন এবং সেন্টার ফরোয়ার্ড ১ জন। তবে এ অবস্থান গ্রহণের বিন্যাস সব দলের ক্ষেত্রে সমরূপ হয় না এবং একটি দলের অবস্থান গ্রহণ কেমন হবে, তা দলটির কোচের ওপর নির্ভর করে। অনেক কোচকে দেখা যায়, উপরোক্ত বিন্যাসের পরিবর্তে নিজ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিন্যাসের পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন।আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দু’দলের ফুটবল খেলার ব্যাপ্তিকাল ৯০ মিনিট। তবে ৪৫ মিনিট খেলার পর ১৫ মিনিটের বিরতি দেয়া হয়। এ ৯০ মিনিট খেলার মধ্যে কোনো পক্ষ গোল করতে না পারলে অথবা উভয়পক্ষের গোল সমসংখ্যক হলে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেয়া হয়। এ অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে কোনো গোল না হলে পেনাল্টি শুটের টাইব্রেকারের মাধ্যমে খেলার ফলাফল নির্ধারিত হয়। দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের আক্রমণ ভাগ ও রক্ষণভাগ সমভাবে ভালো হলে গোল পাওয়া না-পাওয়া দলের জন্য ভাগ্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এরূপ খেলায় আক্রমণাত্মক খেলেও কোনো দল যদি টাইব্রেকারে পরাভূত হয়, সেক্ষেত্রে দলটির ভাগ্য বিড়ম্বনার আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না।বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম আসর বসে ১৯৩০ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েতে। প্রথম বিশ্বকাপে স্বাগতিক দেশ উরুগুয়ে বিজয়ী হয়। সেবার রানার্সআপ হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ১৯৩০ থেকে ২০১৪ সাল অবধি বিশ্বকাপের ২০টি আসর বসেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর প্রতি ৪ বছর পর বসার কথা থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬-এর বিশ্বকাপের দুটি আসর বসতে পারেনি।বিশ্বকাপের ২০টি আসরের মধ্যে ব্রাজিল সর্বাধিক পাঁচবার বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়ে শীর্ষে রয়েছে। এর পরের অবস্থানটি জার্মানি ও ইতালির। এ দুটি দেশ চারবার করে বিজয়ী হয়েছে। আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে দু’বার করে বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়েছে। নেদারল্যান্ডস তিনবার বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলায় অবতীর্ণ হলেও প্রতিবারই তাদের রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৬০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বের খেলাগুলো পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২০০ কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরাসরি উপভোগ করে থাকে। বিশ্বকাপের খেলায় দেখা যায়, প্রতিটি খেলায় বিজয়-পরবর্তী বিজয়ী দল উল্লাস প্রকাশ করছে। অপরদিকে বিজিত দল দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে চোখের পানি ফেলছে। এ হাসি-কান্না শেষ খেলা অর্থাৎ ফাইনাল বা চূড়ান্ত খেলা অবধি চলতে থাকে। চূড়ান্ত খেলায় যে দলটি পরাভূত হয়, সে দলটির জন্য রানার্সআপ হয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন গৌরবের হলেও কিন্তু দলের খেলোয়াড়, সমর্থক ও দেশের নাগরিকরা কখনও এটিকে গৌরব হিসেবে দেখে না। তাই খেলায় পরাজয়-পরবর্তী খেলোয়াড়দের যে অশ্র“সিক্ত ভাব পরিলক্ষিত হয়, তা পুরস্কার গ্রহণ ও দেশে প্রত্যাবর্তন অবধি অব্যাহত থাকে। বিশ্বকাপ খেলায় নিজ দেশের খেলোয়াড়দের মাঠে উপস্থিত থেকে সমর্থন জোগানোর জন্য ফুটবলভক্ত হাজার হাজার দর্শক অনেক ত্যাগ স্বীকার করে নিজ দেশ খেলায় জয়ী হবে, এ আশা নিয়ে খেলা দেখতে আসেন। এ ধরনের দর্শকদের উপস্থিতিতে নিজ দেশের দল পরাভূত হলে তাদের আক্ষেপের আর অন্ত থাকে না। আর আক্ষেপের বহিঃপ্রকাশে দেখা যায়, দু’চোখ বেয়ে অশ্র“ নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ছে।বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় ৩২ দলের মধ্যে ১৬ দল নকআউট পর্যায়ে, ৮টি দল কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যায়ে, ৪টি দল সেমিফাইনাল পর্যায়ে এবং ২টি দল ফাইনাল পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে থাকে। উপরোক্ত যে কোনো পর্যায়ে আসতে হলে একটি দলের খেলোয়াড়দের কঠোর অনুশীলনের পথ অতিক্রম করতে হয়। এ অনুশীলনের সূচনা আসর শুরুর ৩ থেকে ৪ বছর আগে শুরু হয়।এ ধরনের কঠোর অনুশীলনের পর যে কোনো পর্যায়ে পরাজয় দলের খেলোয়াড় ও দেশের জন্য পীড়াদায়ক। আর বিপরীতে যে কোনো জয় দলের খেলোয়াড় ও দেশের জন্য আনন্দ উদ্দীপক। প্রতিটি খেলায় সমভাবে দুটি দলের জন্য জয়-পরাজয় সম্ভব নয় বিধায় একটি দল বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয় আর অপরটি বিজিত হিসেবে পরিগণিত হয়। বিজয়ী-বিজিত উভয়ের পরিশ্রমকে খাটো করে দেখার সুযোগ না থাকলেও জয়-পরাজয়ের মাধ্যমে যে হাসি-কান্নার সৃষ্টি হয়- তা খেলা হিসেবে ফুটবল যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন এ হাসি-কান্নাও ফুটবলের সঙ্গী হয়ে থাকবে।লেখক ঃ সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশে¬ষক

আরো খবর...