হত্যার বিচার হয়েছে- প্রয়োজন পিছনের ষড়যন্ত্রকারীদের স্বরূপ উন্মোচন

॥ রাশেদ খান মেনন ॥

পনেরোই আগস্ট। জাতির জীবনে শোকাবহ দিন। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের প্রত্যুষে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী অফিসার- সৈন্যদের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। খুনিরা রেহাই দেয়নি তার নিকটাত্মীয় পরিমন্ডলের সদস্যদেরও। যে মানুষকে পাকিস্তানিরা শত ষড়যন্ত্র করে হত্যা করতে পারেনি, তাকে হত্যা করলো বাঙালিরা! বঙ্গবন্ধুকে এ ধরনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষের, বিশেষ করে বাঙালির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও আস্থা থেকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমার সন্তান। ওরা আমার ক্ষতি করবে না।’

পনেরোই আগস্টের আত্মস্বীকৃত ঐসব খুনির বিচার হয়েছে। তাদের অধিকাংশের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়েছে। যারা বিদেশে পালিয়ে আছে তাদের ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকর করতে সরকার তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেসব দেশে মৃত্যুদন্ড সম্পর্কিত ও অন্যান্য আইনের কারণে তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। তবে বিশ্বাসঘাতক পরিচয়ে বিদেশের মাটিতেই তাদের মৃত্যুবরণ করতে হবে।

পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর এই হত্যাকান্ডের বিচার সহজ ছিল না। ঘাতকরা নিজেদের পরিণাম বুঝতে পেরে আইন করে ঐ বিচার যাতে না হতে পারে তার জন্য নজিরবিহীন এক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ঐ বিচার থেকে নিজেকে ও খুনিদের বাঁচাতে বিশ্বাসঘাতক খোন্দকার মোশতাক ১৯৭৫-এর ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে। আর এই অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ডের নায়ক জেনারেল জিয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ঐ অধ্যাদেশকে র‌্যাটিফাই করে তাকে সংবিধানের অংশ করার আরও বড় ঘৃণ্য পদক্ষেপ নেয়। এর কারণ অবশ্য অস্পষ্ট নয়। এই বিচার অনুষ্ঠিত হলে অবধারিতভাবে তার নাম চলে আসত। বঙ্গবন্ধু হত্যার পিছন পর্দার নায়কদের সম্পর্কে খ্যাতিমান অনুসন্ধানী সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ হাইকোর্টের বেঞ্চে দেওয়া সাক্ষ্যে স্পষ্টভাবেই বলেন যে, জেনারেল জিয়া ঐ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা সম্পর্কে জানতেন এবং তিনি তা প্রতিরোধ করেননি। বরঞ্চ বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি সেরকম (অভ্যুত্থান) কর তা’হলে করতে পার।’ এ কারণেই জিয়া মোশতাকের ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’কে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ প্রদান করে।

নব্বুইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশবাসীর এটা আশা ছিল যে, দেড় দশকের সামরিক শাসনামলের সকল হত্যার বিচার হবে। তিন জোটের ঘোষণায় আট, সাত ও পাঁচ দল বলেছিল যে হত্যা-ক্যু-অভ্যুত্থানের অবসান ঘটিয়ে দেশ গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের ধারায় পরিচালিত হবে। এরই অনুসরণে পঞ্চম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য, পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী এই অধ্যাদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে অনেক অন্তরায় (তার ভাষায় গিট্টু) আছে বলে সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। অথচ তার মাত্র ক’দিন আগেই সংসদের সমস্ত দল মিলে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালুর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। হত্যা-ক্যু-অভ্যুত্থানের রাজনীতি অবসানের জন্য তিন জোটের আন্দোলন ও ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিএনপি সরকার এভাবেই তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়। এখানেও সেই একই কারণ পনেরোই আগস্টের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ থেকে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াকে রক্ষা করা।

আর এ কারণেই পনেরোই আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ড সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু-কন্যা, আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বিদেশের মাটি লন্ডনে গঠিত তদন্ত কমিশনকে বাংলাদেশে আসতে অনুমতি দেয়নি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালে স্যার টমাস উইলিয়ামস্্, কিউসি, এমপিকে প্রধান ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর সাবেক চেয়ারম্যান নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সিয়ান ম্যাকব্রাইড, জেফ্রি টমাস কিউসি এমপি ও আব্রে রোজ যিনি কমিশনের সদস্য সচিবও ছিলেন সমন্বয়ে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল।

এই তদন্ত কমিশন গড়ার আগে বা পরে পনেরোই আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ডের স্বরূপ ও পিছন পর্দার নায়কদের খুঁজে বের করার ব্যাপারে কোনো তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়নি, কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। অথচ পনেরোই আগস্টের ঘটনাবলির পর থেকে এই অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ডের পিছনে সিআইএ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত আছে একথা ভারতসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে হংকং-এর ‘ফার ইস্টার্ন ইকনমিক রিভিয়্যু’-এর প্রতিবেদক লরেন্স লিফশুলজ বঙ্গবন্ধু হত্যার ব্যাপারে তিনবছর গবেষণার পর ১৯৭৯ সালে ‘বাংলাদেশ : দি আনফিনিশড রেভল্যুশন’ (সহ-লেখক কাইবার্ড) যে গ্রন্থটি লেখেন তাতে বঙ্গবন্ধু হত্যার  পিছনে সিআইএ-র সম্পৃক্ততার বিষয় উল্লেখ করেন। কেবল তিনি নন, মার্কিন সাংবাদিক ক্রিস্টেফার এরিক হিচেন্স ২০০১ সালে তাঁর ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ বইয়ে লিফশুলজের বরাতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সিআই-এর সম্পৃক্ততার বিষয়টি সমর্থন করেন। হিচেন্স চার দশকের বেশি সময় সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে জড়িত ছিলেন। নিউ স্টেটসম্যান, দি আটলান্টিক, দ্য নেশন, দ্য ডেইলি মিরর ও ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে তার লেখা ছাপা হয়েছে এবং তিনি ১২টি বই লিখেছিলেন। তিনি মারা গেলে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অবশ্য অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের তার বই ‘এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ ১৫ আগস্টের অভূ্যূত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে মার্কিন সরকার বা সিআইএ-র সম্পৃক্ততার লিফশুলজ-এর বক্তব্য খন্ডন করার চেষ্টা করেছেন। ফারুক-রশীদের বিভিন্ন ইন্টারভিউ ও ম্যাসকারেনহাসের বই থেকে স্পষ্ট যে, জেনারেল জিয়া আগস্ট অভ্যুত্থানের মুখ্য ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন।

সে প্রসঙ্গ এখন না। যেটা বলা হয়েছে যে ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থান সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিপূর্ণ অবহিত ছিল সেটা সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান রচিত ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড’ বইয়ে মার্কিন সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সেই সময়ে ঢাকা দূতাবাস থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে যেসব বার্তা আদান-প্রদান করা হয়েছিল তার ডক্যুমেন্টসসমূহের বিশ্লেষণ থেকে অনেক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ঐসব ডকুমেন্টস থেকে জানা যায় যে ১৫ আগস্টের সেনা অভ্যুত্থান ও নির্মম হত্যাকান্ডসমূহের হোতা কর্নেল ফারুক-রশীদের মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে ‘পূর্ব যোগাযোগ’ ছিল। আর এই ‘পূর্ব যোগাযোগ’ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে খোন্দকার মোশতাকের সঙ্গে ভারতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের যোগাযোগেরই ধারাবাহিকতা ছিল। (উল্লেখ্য কর্নেল রশীদ মোশতাকের ভাগ্নে, আর ফারুক-রশীদ দু’জন ভায়রা ভাই)। ঐসব ডক্যুমেন্টস অনুসারে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব সরকারের অগোচরে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিলেন অস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে আলোচনা করতেÑ যা তার কোনো এখতিয়ারাধীন বিষয় ছিল না। সেখানে তিনি জানান যে জেনারেল জিয়া ঐ অস্ত্র ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি। এরপর বছর না ঘুরতেই ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই একইভাবে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য মার্কিন দূতাবাসে যান আরেকজন মেজরÑ মেজর রশীদ। তিনিও জিয়ার কমিটির পক্ষ থেকে কথা বলতে গেছেন বলে দাবি করেন। ‘একইভাবে ১৯৭৪-এর ১৩ মে  সৈয়দ ফারুক রহমান ‘উচ্চতম পর্যায়ের বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে’ শেখ মুজিব সরকার উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তা চান। (মিজানুর রহমান খান তার বইয়ে এসব দলিলের নম্বর ও তারিখ সহ উল্লেখ করেছেন)। তিনি তার বইয়ে এরপর উল্লেখ করেছেন যে এর ঠিক ১৫ মাসের ব্যবধানে ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটে। তাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফারুক রহমান দাবি করেন তিনি পনেরো মাস ধরে মুজিব হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন (ঐ বইয়ের পরিশিষ্ট-৩)।

মিজানুর রহমান খান তার বইয়ে লিফশুলজের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, বাংলাদেশের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতগণ এবং ১৫ আগস্ট ঢাকার সিআইএ স্টেশন প্রধানের কথোপকথনের বিষয় উদ্ধৃত করেছেন। এসব কথায় মার্কিন সরকারের প্রতিনিধি ও সিআইএ কর্মকর্তারা ১৫ আগস্টের সঙ্গে তাদের কোনো প্রকার সম্পর্ক ছিল বলে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মিজানের বইয়ে সংকলিত বিভিন্ন বার্তায় ডক্যুমেন্টস ভিন্ন কথা বলে। আর সিআইএ-র দলিলসমূহ এখনো প্রকাশিত হয়নি। সেগুলো প্রকাশ পেলে আরও বিষয় জানা যেত।

কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সেনাবাহিনীতে একটি অভ্যুত্থান পরিকল্পনার বিষয় জানত সে বিষয়ে মিজানুর রহমান খান গত ১৩ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনামেই বলেছেনÑ ‘মার্চে অভ্যুত্থানের বার্তা পান কিসিঞ্জার’। ১৯৭৫-এর ২২ জানুয়ারি সকাল ১০.২০-এ ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন উপপ্রধান আরভিং চেসল ঢাকা থেকে পাঠানো ‘অভ্যুত্থানের গুজব’ শীর্ষক তারবার্তায় লিখেছিলেন, “সামরিক অভ্যুত্থান সংক্রান্ত কিছু গুজব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মার্চ হলো সবচেয়ে অনুকূল সময়। দেশের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে বাংলাদেশ সরকারের সামনে কোনো আশা নেই এবং কর্তৃত্ববাদের এক বড় ডোজ গলধঃকরণই এখন বঙ্গবন্ধুর জন্য অত্যন্ত লোভনীয় বিষয়।” মিজানুর রহমান খান প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘পঁচাত্তরের মার্চ মাসটাই কেন ও কিভাবে সবচেয়ে অনুকূল মনে হলো, তার উত্তর আমরা ঐ তারবার্তায় পাই না। তবে এটা কাকতালীয় হলেও বিস্ময়কর যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার নিয়ন্ত্রিত ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি) নির্দিষ্টভাবে সিআইএ-কে যুক্ত করে মার্চেই একটি দলিল তৈরি করল। তার শিরোনাম হলো ‘সিআইএ ও বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য অভ্যুত্থান’। মিজান লিখেছেন, ‘অবশ্য এর দ্বারা অভ্যুত্থানে সিআইএ-র সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে কোনো স্থির ধারণায় পৌঁছানো যায় না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সিআইএ-র জড়িত থাকার অভিযোগ মার্কিন প্রশাসন সব সময় দৃঢ়তার সঙ্গে নাকচ করেছে।’ তার সংগৃহীত ও সংকলিত দলিলসমূহ এর বিপরীত ধারণাই বরং জোরদার করে।

সে যাই হোক, সিআইএ-র দলিলসমূহ প্রকাশিত হলে সামনের দিনগুলোতে এসব বিষয় আরও পরিষ্কার হবে বলে ধারণা করা যায়। এখানে যেটা উল্লেখ করার তা হলো, ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের বিচারপর্ব শেষ হলেও ঐ ঘটনাবলির পিছনে যেসব কালো শক্তি কাজ করেছিল তাকে উদ্ঘাটন করা জরুরি। সাধারণভাবে ধারণা আছে যে সেনাবাহিনীর প্রতি মুজিব সরকারের অবহেলা, বিকল্প হিসেবে রক্ষীবাহিনী গঠন, সংবিধানের পরিবর্তন করে একদলীয় শাসন প্রবর্তন ও দেশের সার্বিক অবস্থায় বিক্ষুব্ধ একদল সেনা অফিসার তাদের অধীনস্থ সৈন্যদের ব্যবহার করে ঐ হঠকারী কাজটি ঘটিয়েছিল। তাদের অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থানপরবর্তী দেশ পরিচালনা কিভাবে হবে তার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। হয়ত ফারুক-রশীদের ছিল না, কিন্তু ঐ অভ্যূত্থানের মূল অনুঘটক খোন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়ার সে সম্পর্কে স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল। আর মার্কিন সরকারের মোশতাক সরকারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলাপ (দ্রষ্টব্য : মিজানুর রহমান খান-এর ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড)-এর বিবরণ মার্কিনি পরিকল্পনারও প্রমাণ দেয়।

মোশতাক ক্ষমতায় এসে টুপি-সাফারী পরে মুজিব কোটধারীদের থেকে তিনি যে আলাদা তার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বঙ্গবন্ধুর ‘ভায়েরা আমার’ বাদ দিয়ে আয়ুবী-ইয়াহিয়া কায়দায় ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেছেন। জিয়া কেবল তাকে অনুসরণই করেন নাই ঐ ‘বিসমিল্লাহ’কে সংবিধানের অংশে পরিণত করেন।

অপরদিকে জিয়া ক্ষমতায় এসে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালুর জন্য সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা বাদ দেয়। সমাজতন্ত্রকে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ বলে সংজ্ঞায়িত করে। পাকিস্তানি সেনাশাসক আয়ুব খানের মতো সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে নিজে রাষ্ট্রপতি বনে যান এবং ‘হ্যা’ ‘না’ ভোটে নিজেকে আইনসিদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় থেকে রাজনৈতিক ফ্রন্ট ও দল গঠন, অর্থনীতি ক্ষেত্রে বি-রাষ্ট্রীয়করণসহ ব্যক্তিখাতে ব্যাংক, বীমা ছেড়ে দেওয়া, তীব্র রুশ-ভারত বিরোধী (যেহেতু তারা মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক ছিল) রাজনীতি অনুসরণ করা এসব তারই প্রমাণ। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে জিয়াই বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন ও পরে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করেন। সুতরাং ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও হত্যাকান্ড নিছক কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের হঠকারী কাজ নয়। এর পিছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাংলাদেশকে চরম শিক্ষা দান, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে পাকিস্তান আমলের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটানো এসব উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা ১৫ আগস্টের ঘটনাবলির পিছনে কাজ করেছে।

১৫ আগস্টের আত্মস্বীকৃত খুনিদের শাস্তি হয়েছে। অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও এখন প্রয়োজন ১৫ আগস্টের জাতীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্তের স্বরূপ উন্মোচন করা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে এই উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এবং সেটা যেমন উচিত, তেমনই সম্ভবও।

লেখক ঃ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য। প্রবীণ রাজনীতিক।

আরো খবর...