স্বাস্থ্যকর জাতি গঠনে নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনের প্রত্যয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মেধাবী প্রজন্ম গঠন, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বহুমুখী সম্প্রসারণশীল শিল্প হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান বাড়ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে  পোল্ট্রি শিল্প মানসম্মত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি চাহিদার ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ মাংস ও আমিষের  জোগানদাতা হিসেবেও অবদান রাখছে পোল্ট্রি শিল্প। মানসম্মত পোল্ট্রির মাংস ও ডিম উৎপাদনে ভুট্টা ও সয়াবিনের সমন্বয়ে অরগানিক পদ্ধতিতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে এ শিল্পের খাবার। ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০  কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের নতুন আশা নিয়ে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন পোল্ট্রি শিল্পসংশ্লিষ্টরা। মেধাবী ও স্বাস্থ্যকর জাতি গঠনে নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনের প্রত্যয়ে শনিবার শেষ হয়েছে ৫ দিনব্যাপী ১১৩ম আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো ও সেমিনার। বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে বিশ্বের পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এশিয়ার বৃহত্তম এই পোল্ট্রি শো’র আয়োজক ওয়ার্ল্ড’স পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি) এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি)। পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে ৫-৬ মার্চ ঢাকার লা  মেরিডিয়ান হোটেলে ‘আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি সেমিনার’ এবং ৭, ৮ ও ৯ মার্চ বসুন্ধরা কনভেনশন সিটিতে ‘১১তম আন্তর্জাতিক পোল্ট্রি শো’ অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া জাঁকজমকপূর্ণ এই আয়োজনে ছিল সেলফি কনটেস্ট, পোল্ট্রি রেসিপি কনটেস্ট প্রভৃতি। পোল্ট্রি শো’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, এতদিন শুধু ভাতের কথা ভাবা হলেও এখন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। তিনি বলেন, দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে  পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ ছাড়া অন্য কোনো খাত এত বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না। তাই তিনি পোল্ট্রি শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতি। পোল্ট্রিতে মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে অনেক সময় অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রচার হতে  দেখা যায়। তিনি এ বিষয়ে সব মহলের সচেতন ভূমিকা রাখারও আহ্বান জানিয়েছেন। একই দিনে ওয়াপসা’র গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট নিং ইয়াং বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী পোল্ট্রি শিল্পের সম্ভাবনা প্রসারিত হচ্ছে তবে সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জও বাড়ছে।’ সদস্য সংখ্যার বিচারে ওয়াপসা-বাংলাদেশ শাখা প্রথম সারিতে অবস্থান করছে বলে জানান মি. নিং। স্বাস্থ্যকর জাতি গঠনে বাংলাদেশের  পোল্ট্রি শিল্পের মানসম্মত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। যেহেতু গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, সেহেতু গবেষণা বৃদ্ধি এবং বায়োসিকিউরিটি বাড়িয়ে মানসম্মত উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। ‘পোল্ট্রি ফর হেলথ লিভিং’ স্লোগানকে সামনে রেখে দু’দিনব্যাপী ১১তম আন্তর্জাতিক  পোল্ট্রি সেমিনার-২০১৯-এর উদ্বোধনী দিনে বক্তারা এসব কথা বলেন। এবারের পোল্ট্রি শোকে এশিয়ার অন্যতম বড় শো বলে দাবি করে ওয়াপসা-বিবি সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, স্বাস্থ্যবান জাতি ও উন্নত  দেশ গড়ার যেমন বিকল্প নেই; তেমনি পুষ্টি চাহিদা পূরণে পোল্ট্রির কোনো বিকল্প  নেই। বাংলাদেশের মানুষকে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটি আর্থ-সামাজিক মডেল প্রয়োজন। ওই মডেলে পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্যমুক্ত  সুস্থ নাগরিক এবং কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা থাকা দরকার। আমরা বিশ্বাস করি, এগুলোর ভালো সমাধান দিতে পারে পোল্ট্রি শিল্প। কারণ মানসম্পন্ন পুষ্টি সরবরাহে বড় অবদান রাখছে পোল্ট্রি খাত। পাঁচ দিনের আয়োজনে এক  গোলটেবিল আলোচনায় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানানো হয়, বর্তমানে নিরাপদ পোল্ট্রি উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন করবে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যে সবার জন্য নিরাপদ ডিম ও মুরগির মাংসের জোগান নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ করছে সরকার ও পোল্ট্রি শিল্প। তবে সেখানে বলা হয়, পোল্ট্রি বিজ্ঞান সম্পর্কে খামারিদের জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে খামার না করার কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের অযাচিত ব্যবহার হচ্ছে। বৈঠকের আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের (ডিএলএস) মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও ওষুধের দোকানে গেলেই অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যাচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হবে। ড্রাগ অথরিটিকে এ ব্যাপারে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি বলেন, প্লাস্টিকের ডিম নিয়ে যা হচ্ছে তা প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছুই নয়। গোলটেবিল বৈঠকের বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক. ড. নাথুরাম সরকার বলেন, তথ্যবিভ্রাটের কারণে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এতে সাধারণ মানুষ ডিম ও মুরগির মাংস খাওয়া কমিয়ে দিতে পারে। তাই সংবাদ পরিবেশনের আগে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন অহেতুক আতঙ্কের কারণ না হয়। ওয়াপসা-বিবি’র সহসভাপতি ইয়াসমীন রহমান বলেন, দারিদ্র্য, অপুষ্টি, মা ও শিশুমৃত্যুর হার কমাতে, শর্করার পরিমাণ কমিয়ে ডিম ও মুরগির মাংস গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। ২০২১ সালের চাহিদা মেটাতে হলে বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি ডিম; ২০ লাখ টন মুরগির মাংস উৎপাদন করতে হবে। বিপিআইসিসি’র তথ্য অনুযায়ী, খাত সংশ্লিষ্টদের নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার ফলে  দেশ এখন মুরগির ডিম ও মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এমনকি  দেশের ডিম ও মাংসের শতভাগ চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে রফতানির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক ডিম উৎপাদন হয় কমবেশি ৩ কোটি ৮০ লাখ। আমরা যদি গড়ে ৭ টাকা করে একটি ডিমের দাম ধরি তাহলে ডিমকে কেন্দ্র করে দৈনিক ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং মাসে ৮০৯ কোটি, আর বছরে ৯ হাজার ৭০৯ কোটি টাকার  লেনদেন হয়। পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার ছোট-বড় খামারে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ। আগে হ্যাচিং ডিম আমদানি করতে হতো। এখন বাংলাদেশে ৭টি গ্রান্ড প্যারেন্ট (জিপি) স্টক ফার্ম আছে। প্যারেন্ট স্টক বা পিএস ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। ২০২১ সালে দৈনিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ ডিম। আর তখন মাথাপিছু কনজাম্পশন প্রায় ৮৬টিতে। পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে ছয়টি  পোল্ট্রি ফার্ম স্থাপনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও ১৯৮০ সালের দিকে বাণিজ্যিকভাবে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। গত তিন দশকে তা দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাতে রূপ নিয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। পাঁচ দিনের এই আয়োজনে বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনায়  পোল্ট্রি শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরাও গবেষণাসমৃদ্ধ এবং তথ্যবহুল বক্তব্য রাখেন। তারা তাদের কিছু দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেন। বিপিআইসিসি সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, এমন কিছু সমস্যা বর্তমানে মোকাবেলা করতে হচ্ছে যা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। ভুট্টাসহ  পোল্ট্রি খাদ্য তৈরির বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি এবং বিভিন্ন ভ্যাকসিন আমদানির অনুমতি দিতে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ছাড়া কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো প্রয়োজন। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, বর্ধিত জনসংখ্যা আমিষের চাহিদা পূরণে পোল্ট্রি শিল্পের বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন প্রফেসর ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, পুষ্টি ঘাটতি পূরণে পোল্ট্রি শিল্প আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। পোল্ট্রি মুরগির মাংসে  কোলেস্টেরলের মাত্রা নেই বললেই চলে। এ ছাড়া এর পুষ্টিগুণ অন্য সব ধরনের মাংসের চেয়ে বেশি, দামেও সস্তা। তিনি বলেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও কিশোর-কিশোরদের বেশি করে ডিম খাওয়া উচিত; এমনকি হার্টের  রোগী, ডায়াবেটিক রোগীদেরও ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। সেমিনারে প্রায় একশ সায়েন্টিফিক পেপার উপস্থাপন করা হয়। পোল্ট্রির পুষ্টি ও ব্যবস্থাপনা এবং পোল্ট্রি ব্রিডিং ও জেনেটিকস বিষয়ে ১৩ বিজ্ঞানী ও গবেষক অংশগ্রহণ করেন। সূত্র মতে, পোল্ট্রি শোতে বিশ্বের ২২টি দেশ এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান মিলে প্রায় ৫০০ কোম্পানি অংশ নেয়। পোল্ট্রি কুকিং কনটেস্টে অংশগ্রহণকারীদের মধ্য থেকে ১০ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। এ ছাড়া চিকেন  সেলফি কনটেস্ট ও ডিম সেলফি কনটেস্টের বিজয়ীদের মধ্যেও পুরস্কার বিতরণ করা হয়।  পোল্ট্রি মেলায় বেস্ট স্টল হিসেবে প্রথম পুরস্কার পায় এসিআই লিমিটেড, দ্বিতীয় হয় নাহার অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স এবং তৃতীয় হয়  রেনেটা লি.।

আরো খবর...