স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায় এগিয়ে চলছে দেশ

॥ অমিত রায় চৌধুরী ॥

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল একাত্তরে। এরপর ’৭৫’র বিয়োগান্তক হত্যাকান্ড সদ্যজাত এ রাষ্ট্রের গতিপথ পাল্টে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় জনজীবন হয়ে পড়ে স্তব্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের মহৎ দর্শন অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হয়। ভ্রান্তির ধোঁয়াশায় কায়েমি স্বার্থচক্র অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্ততায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে সুবিধাবাদী রাজনীতি, কর্তৃত্বপরায়ণ আমলাতন্ত্র ও নব্য বেনিয়া শেণীর বিকাশ শুধু সমাজকাঠামোকে নয়, মূল্যবোধ গঠনের অন্তর্গত প্রক্রিয়াকেও বিপন্ন করে তোলে।

’৯০’র গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক উত্তরণ সম্পন্ন হলেও ’৭৫ পরবর্তী নীতি বিবর্জিত আগ্রাসী শাসকগোষ্ঠী যেভাবে হত্যা-লুটকে ন্যায্যতা দিয়ে আইনের শাসনকে বিপর্যস্ত করেছে- তার অনিবার্য নেতিবাচক অভিঘাত সমাজ কাঠামোর গভীরে দীর্ঘকাল ক্রিয়াশীল থাকবে- এটি অপ্রত্যাশিত নয়।

আর সমাজের অভ্যন্তরে জমে থাকা কলুষ থেকে মানস জগৎকে মুক্ত করার শুদ্ধচার প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়েছে কিনা বলা মুশকিল। এমনই এক জটিল আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্য টেকসই গণতান্ত্রিক ধারাপথে সংযুক্ত হওয়া যথেষ্টই উৎসাহব্যঞ্জক ও তাৎপর্যপূর্ণ।

‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নামক অভিনব অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থার উৎপত্তিস্থলও বাংলাদেশে। অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের পথটি সুগম করতে গণতন্ত্রকামী জনতার এটি একটি মহৎ অভিপ্রায়ের ফসল। এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে সীমিত সময়ের জন্য অনির্বাচিত অর্ন্তবতী সরকারের প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

পরপর কয়েকবার এমন ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়েই এদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তি সঞ্চয় করেছে- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিদ্যমান রাজনীতির ভূমিবাস্তবতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে গণতন্ত্রের মানদন্ডে খানিকটা হলেও পরিণত ও দায়িত্বশীল করেছে বলেই হয়তো নির্বাচিত সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে দেশ আজ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পথে পা বাড়িয়েছে।

নির্বাচনের কিছুদিন আগে সমাজে যে শান্তি ও শৃঙ্খলা এখনও দৃশ্যমান- তা সত্যিই ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। আলোচনার টেবিলে প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের মধ্যে যে সৌহার্দ্য ও শিষ্টাচার জাতি প্রত্যক্ষ করেছে- তা সমকালীন বাস্তবতায় নজিরবিহীন।

২০০৬-এর অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম ভবিষ্যতে ইতিহাসের একজন অনুসন্ধানী পাঠকের কাছে নানা জিজ্ঞাসা, কৌতূহল ও গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে- একথা অনুমান করা যায়। এ সময়পর্বে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও তাদের কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ এদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের গতিপথকে পরবর্তী সময়ে প্রভাবিত করতে পেরেছিল বলে মনে হয়।

নাগরিকের মানস কাঠামোতে নৈতিক ও মূল্যবোধগত রূপান্তরের ক্ষেত্রও হয়তো ইতিহাসের এ সন্ধিক্ষণে প্রস্তুত হয়ে থাকবে। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার লক্ষ করলেই ওই সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মনোজাগতিক পরিবর্তনের ধারাটি দেখা যায়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধ ও ২১ আগস্টসহ সব হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের পথ উন্মুক্ত করা, ভোটার তালিকা সংশোধন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের ব্যবহার, রাজনৈতিক দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি নাগরিকের আস্থা বৃদ্ধি করা এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার ধারণাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার মতো উদ্যোগ বা তার নৈতিক মর্মবাণী পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রেখেছে বলে প্রতীয়মান হয়।

২০০৮ সালে নির্বাচিত সরকার দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে বিগত ১০ বছরে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে যে মহা কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিল, নির্দ্বিধায় বলা যায়- তার অনেকটাই সফল হয়েছে। অতীতে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের সঙ্গে এর চরিত্রগত তফাৎ আছে। পাকিস্তান শাসনামলে সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের উন্নয়নের কথাও এ প্রসঙ্গে অনেকে তুলনায় নিয়ে আসেন। আসল কথা হল- বর্তমান সময়ে যে উন্নয়ন তার সঙ্গে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের তুলনা হাস্যকর।

পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের লক্ষ্য ছিল মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্ত মানুষের কাছে কৌশলে সম্পদ কুক্ষিগত করার সুযোগ করে দেয়া। আর লোকদেখানো কিছু কর্মকান্ডের মধ্যেই উন্নয়ন সীমাবদ্ধ ছিল। আমজনতার ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সাধারণ নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান বা গ্রামীণ অবকাঠামোর ন্যূনতম কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বা তা বাস্তবায়নের কোনো সদিচ্ছা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ভাবনার প্রধান লক্ষ্যই হল দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে বিভিন্ন  ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির চিহ্ন স্পষ্ট। পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন, গৃহসজ্জা, সন্তানের শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগের তাড়না- সর্বত্রই আজ পরিবর্তনের ছোঁয়া স্পষ্ট। এর জন্য অর্থশাস্ত্রে গবেষণার দরকার নেই, পরিসংখ্যানের তত্ত্ব-উপাত্তের গম্ভীর চর্চাও বোধ হয় খুব জরুরি নয়। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় আছে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য কমেছে, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু কমেছে। সামর্থ্য বেড়েছে আমজনতার।

বেড়েছে গড় আয়ু। প্রযুক্তির বিস্ফারিত বিস্তার জনমানসে ঘটিয়ে ফেলেছে নীরব বিপ্লব। ফলে বেড়েছে কর্মসংস্থান। প্রসার ঘটেছে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর। রাষ্ট্রীয় সেবার পরিধি ক্রমে বাড়ছে।

উন্নয়নের ধারণা শুধু বৈষয়িক সমৃদ্ধির পরিধিতে আটকে রাখা আধুনিকতার লক্ষণ নয়। বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন ঘটেছে মননশীলতায়, জীবনবোধে। এগিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো আজ স্পষ্ট। উৎপাদনের বৃত্তে নারী আজ পুরুষের পাশে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। একজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীও তার সন্তানের শিক্ষার জন্য বিনিয়োগে আগ্রহী। অন্যদিকে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত ভারসাম্যমূলক বৈদেশিক নীতি বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ আদায় করার যুগান্তকারী নজির স্থাপনে রাষ্ট্রের সাফল্য জাতি হিসেবে আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের দিকটিই স্পষ্ট হয়ে উঠে।

দেশের সাফল্যকে দলমত নির্বিশেষে জনসাধারণের অর্জন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় বৃত্তের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিকোণ যাতে জাতীয় স্বার্থকে আচ্ছন্ন না করে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে তাদেরকে অসমাপ্ত উন্নয়ন কর্মসূচিকে এগিয়ে নিতে হবে।

নিশ্চিত করে বলা যায়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসন্ন। বিজয়ীদের জন্য দেশ সেবার ক্ষেত্র উন্মুক্ত। ভিন্ন কণ্ঠস্বরের পরিসর যেন সংকুচিত হয়ে না পড়ে- তা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভিন্ন মত, ভিন্ন পথকে ধারণ করে সবাই মিলে দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করা জরুরি।

একথা ভুললে চলবে না যে, দুর্নীতি আজ দেশের প্রগতি ও সুশাসনের পথে প্রধান অন্তরায়। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র সরকারের অনেক রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের নিরঙ্কুশ সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পথে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে  যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীকে সতর্ক থাকতে হবে।

এ মুহূর্তে দেশের অগ্রগতির চাকাকে সচল রাখার জন্য দুর্নীতিবাজ নাগরিকের ভাবনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

নিজের মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করে লোভ সংবরণ করতে না পারলে, ব্যক্তিগত চাহিদাকে সীমিত করা না গেলে দুর্নীতির ঘোড়ার লাগাম টানা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। শুধু নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা পরিণামে গোটা সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতো কার্যক্রম জরুরিভিত্তিতে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু করা প্রয়োজন।

নতুন প্রজন্মকে পরিবার থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন করা দরকার। অন্যকে শদ্ধা করা, অন্যের মত, পথের প্রতি সহ্যশীলতা বৃদ্ধি করা এবং বহুত্বকে ধারণ করার শিক্ষা শৈশবেই শিশুর মনে যেন প্রবেশ করে – সে আয়োজন সম্পন্ন করতে হবে।

রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, আদর্শের দোদুল্যমানতা ও অসহিষ্ণুতা সমকালের রাজনীতিতে নতুন এক চ্যালেঞ্জ। রাজনীতিতে যারা রোলমডেল তাদের নৈতিক অবস্থান বদল- সমাজ সহজভাবে নেয় না। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম এতে হতাশ হয়। এমন বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক শূন্যতা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে হবে। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে তাদের জন্য বিভ্রান্তির আঁধার যে ক্ষণস্থায়ী, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

সবার প্রত্যাশা, আসন্ন নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে; সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। আরও প্রত্যাশা থাকবে- নির্বাচনে যে দলই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসীন হোক না কেন, উন্নয়ন অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে। প্রত্যাখ্যান বা প্রতিহিংসা নয়- অন্তর্ভুক্তি ও সৌহার্দ্যময় পরিবেশে দলমত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ এ দেশের মানুষ দেশকে বিশ্বসভায় শেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সামনের কাতারে থাকার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। দেশের সব জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলস্রোতে নিয়ে আসতে হবে।

দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষায় সমৃদ্ধ করে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থাকার উপযোগী করে গড়ে তোলা দরকার। এদেশের মানুষকে শিক্ষায়, ভাবনায়, সম্পদে সমৃদ্ধ করার যে আয়োজন চলেছে তা অব্যাহত থাকলে অবশেষে গণতন্ত্রই জয়ী হবে।

আমাদের সম্ভাবনার দিগন্তে যে রুপালি আলো দৃশ্যমান, তা ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হবে। ২০২১ হয়ে আমরা নির্বিঘেœ ছুঁয়ে ফেলব ২০৪১’র স্বপ্নচূড়া। লাখো শহীদের রক্তস্নাত বিজয়ের মাসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক ঃ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

আরো খবর...