সুুুগন্ধি ধানের চাষ লাভজনক

কৃষি প্রতিবেদক ॥ সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এই দেশে আউশ, আমন, বোরো মৌসুমে ধানের জাতে ও ব্যবহারে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্রতা। সেই বৈচিত্রতা উঠে এসেছে কবি জসীমউদ্দীনের একটি কবিতায়। তিনি লিখেছেনÑ আমার বাড়ি যাইও ভোমর, বসতে দেব পিঁড়ে, জলপান যে করতে দেব শালি ধানের চিঁড়ে। শালি ধানের চিঁড়ে দেব, বিন্নি ধানের খই…বাড়ীর গাছের কবরী কলা, গামছা বাঁধা দই। ধান চাষের তিনটি মৌসুমের মধ্যে আমন ও বোরো মৌসুম সুগন্ধি সরু বা চিকন ধান চাষের এর উপযুক্ত মৌসুম। এই ধানের রয়েছে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা। সুদীর্ঘ কাল থেকে গ্রাম বা শহরে ধনী কিংবা গরিব সবার ঘরোয়া কোনো উৎসবে, গায়ে হলুদ, বিয়ে, ঈদ, পূজায় অতিথি আপ্যায়নে সুগন্ধি চালের তৈরি পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, জর্দা, পায়েস, ফিন্নি, পিঠাপুলিসহ নানান মুখরোচক খাবার আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে স্থান করে নিয়েছে সুগন্ধির চালের তৈরি খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ এমনকি আলো ঝলমলে পাঁচতারকা হোটেলে কোনো উৎসব কিংবা সেট মেন্যুতে। হাজারো বছর ধরে কৃষকরা আমন মৌসুমে প্রচলিত জাত কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, চিনি আতপ, বাদশাভোগ, খাসকানী, বেগুনবিচি, তুলসীমালাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি ধান চাষ করে আসছে। প্রচলিত এসব জাত চাষাবাদে ফলন কম হওয়ায় অনেক কৃষক সুগন্ধি ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম ও দীঘর্ গবেষণায় সুগন্ধি ধানের স্বাদ ও গন্ধ অক্ষুণœ রেখে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ সুগন্ধি ধান উৎপাদনের উপযোগী। বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, রংপুর, নওগাঁ, রাজশাহী জেলায় সুগন্ধি ধান বেশি উৎপাদিত হয়। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে আমন মৌসুমে বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, বিনা ধান১৩ এ ছাড়া রয়েছে বিইউ সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১। বিইউ সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১ সুবিধা হচ্ছে আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেও চাষ করা যায়। ব্রি ধান৩৪ জাতের ধান চিনিগুঁড়া বা কালিজিরার মতোই অথচ ফলন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কৃষকরা এ ধানের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন। তা ছাড়া আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় এই জাতটি আমনে বন্যাপ্রবণ এলাকায় নাবিতে রোপণ উপযোগী। ব্রি ধান৭০ ও ব্রি ধান৮০ আমন মৌসুমের উচ্চফলনশীল ধান এবং আলোক অসংবেদনশীল। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫-৫.০ মেট্রিক টন। যা প্রচলিত জাত কাটারিভোগ ধানের চেয়ে দ্বিগুণ। ব্রি ধান৭০ ধানের চাল দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগের চেয়ে আরও বেশি লম্বা। আর ব্রি ধান৮০ থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় জেসমিন ধানের মতো, সুগন্ধিযুক্ত এবং খেতেও সুস্বাদু। অন্যদিকে বোরো মৌসুমে সুগন্ধিযুক্ত আধুনিক জাত হচ্ছে ব্রি ধান৫০ যা বাংলামতি নামে পরিচিত। হেক্টরপ্রতি ফলন ৫.৫ থেকে ৬ মেট্রিক টন। বাংলামতি ধান বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন জাতের ধানের চেয়ে দাম অনেক বেশি হওয়ায় লাভ বেশি হয়। এ জাতের চালের মান, স্বাদ, গন্ধ, বাসমতি চালের মতোই। দিনে দিনে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বাসমতি চালের স্থান দখল করে নিচ্ছে আমাদের বাংলামতি চাল। আমদানিকৃত বিদেশি বাসমতি চালের চেয়ে দাম অনেক কম, দেশি অন্যান্য সুগন্ধি জাতের ধানের চেয়ে ফলন বেশি হওয়ায় বাংলামতি ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। সব ধরনের মাটিতেই সুগন্ধি ধানের চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি সুগন্ধি চাষাবাদের জন্য বেশি উপযোগী। বোরো মৌসুমে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ এবং রোপা আমন মৌসুমে ১৫ থেকে ২৫ জুলাই পযর্ন্ত বীজতলায় বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। তবে স্বল্পমেয়াদি জাতের ক্ষেত্রে জুলাইয়ের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহে বপন করা ভালো। মূল জমি ভালোভাবে তৈরি করে আমন মৌসুমে ২৫ থেকে ৩০ দিনের এবং বোরো মৌসুমে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের চারা রোপণ করতে হয়। সুগন্ধি ধানের ভালো ফলনের জন্য সারব্যবস্থাপনা খুব জরুরি। সুগন্ধি ধানের জমিতে বিঘাপ্রতি বা ৩৩ শতকে আমনে আধুনিক জাত ব্রি ধান৩৪, ৩৭, ৩৮, ৭০, ৮০ বা বিনাধান১৩-এর ক্ষেত্রে ইউরিয়া ১৮-২০ কেজি, টিএসপি ১০-১২ কেজি, এমওপি ৯-১০ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি, দস্তা ১ কেজি হারে সার প্রয়োগ করতে হয়। আমনে স্থানীয় জাত যেমনÑ কাটারিভোগ, কালিজিরা ইত্যাদি জাতের ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি ইউরিয়া-ডিএপি/ডিএপি-এমওপি-জিপসাম যথাক্রমে ১২-৭-৮-৬ কেজি হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে। সব ক্ষেত্রে প্রতিকেজি ডিএপি সারের জন্য ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া কম ব্যবহার করতে হবে। দেশি উন্নতমানের সুগন্ধি চাল সম্পর্কে ধারণা ও প্রচারণার অভাব থাকায় নামি-দামি হোটেল, রেস্তোরাঁয় আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি চালের পরিবর্তে বিদেশি চাল ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। অধিক পরিমাণে সুগন্ধি ধান চাষাবাদে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে আমাদের সুগন্ধি চালের ব্যাপক চাহিদা। গবের্র বিষয় বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ১৩৬টি দেশে রপ্তানি করছে। বতর্মান সরকারের সদ্বিচ্ছা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট দিক-নিদের্শনায় আধুনিক উচ্চফলনশীল সুগন্ধি ধানের এলাকা ও উৎপাদন বৃদ্ধি হবে, নিদির্ষ্ট জেলাভিক্তিক চাষ হওয়া সুগন্ধি ধানের চাষাবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে, কৃষক সমাবেশ, মাঠ দিবসের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে সুগন্ধি ধান চাষে আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি করতে হবে। কৃষকের পরিশ্রমের ফসলের ন্যায্যমূল্যে নিশ্চিত করতে সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে এবং ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে বাংলার সুগন্ধি ধানের মান, পুষ্টিগুণের কথা দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। সবার মধ্যে বিদেশি সুগন্ধি জাতের চালের ওপর নিভর্রতা কমিয়ে বাংলামতিসহ দেশীয় সুগন্ধি চালের তৈরি বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর নতুন নতুন আকষর্ণীয় খাবারের প্রতি উৎসাহিত করতে পারলেই সুগন্ধি ধানের হারানো ঐতিহ্যে ফিরে আসবে। কৃষকরা আথির্কভাবে লাভবান হবে এবং অপ্রতিরোধ্য দেশের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখবে।
লেখকদ্বয় ঃ ফার্ম ব্রডকাস্টিং অফিসার, কৃষি তথ্য সার্ভিস এবং ঊধ্বর্তন যোগাযোগ কমর্কতার্, ব্রি, গাজীপুর

আরো খবর...