সুষ্ঠু গণতন্ত্র বিকাশে বাধা তারেক জিয়ার নেতৃত্ব

॥ প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ ॥

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন। এই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই পরিলক্ষিত হয় একটি ভবিষ্যৎ পথ। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সবার কাম্য। আমার মনে হয় নির্বাচন কমিশন এখন সেই দিকে হাঁটছে। একই সঙ্গে দলগুলোর মাঝে সাজসাজ রব। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে এর প্রভাব। এবারের শীতটা বোধহয় নির্বাচনের গরমে ম্লান হয়ে যাবে। তবে এবারের নির্বাচনের সার্বিক অবস্থাটা আমার অভিজ্ঞতায় একটু অন্যরকম। বিএনপিকে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হোক না কেন দলটির আছে বিশাল এক ভোটব্যাংক। ঐক্যফ্রন্টের ২৪ দলের মধ্যে ২৩ দল এবং ১৪ দলের মধ্যে ১৩ দলে তার সিকিভাগও নেই। তাদের না আছে অস্তিত্ব, না আছে ভোট, না আছে নমিনেশন দেয়ার মতো যোগ্যতা। প্রধান দুই দলের ওপর ভর করে এরা সুযোগ নিতে চায়। এক ব্যক্তি এক দলে পরিণত হয়েছে। একটি সার্কাস পার্টিতে যত লোকজন দেখা যায় কার্যত এ দলগুলোতে তা দেখা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি এই দলগুলোকে কেন নিজেদের দিকে ভেড়াচ্ছে। বিএনপির মতো এত বড় দলে এসব নামসর্বস্ব দল না থাকলেও তো হতো। তাদের ভোটের সংখ্যাই বা কত? ইতোমধ্যে আসন নিয়ে শুরু হয়েছে মনোমালিন্য, বিবাদ। সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা অতিথি পাখিদের কোনোভাবে জায়গা দিতে নারাজ স্থানীয় নেতারা।

গত এক মাস ধরে টেলিভিশন, পত্রিকায় দেখছি ড. কামাল হোসেনের সরব উপস্থিতি। মাঝে মাঝে মান্না, রব সাহেব, সুলতান মনসুরসহ অনেকেই বজ্র বাক্য ছুড়ছেন। তাদের কথায় আমার মতো ষাটোর্ধ্ব নাগরিক ভড়কে যান। কেননা, ১৯৯১-এর নির্বাচনে এভাবে সরব দেখেছিলাম তাদের। কিন্তু বিএনপির এ হাল তো হওয়ার কথা নয়। কেন নেতাহীন, অভিভাবকহীন আজ বিএনপি। কোথায় হারালো এক সময়কার মিছিল কাঁপানো, মাঠ দাপিয়ে বেরা নেতারা। সবাই সবার মতো আখের গুছিয়ে তেপান্তর। বিএনপির এ দৈনদশার জন্য দায়ী কে? কেনই বা সার্কাস পার্টিগুলো এসে ভর করছে বিএনপির কাঁধে। যারা এক সময় বিএনপির কট্টর সমালোচক ছিলেন তারা কেন আবার বিএনপির মুখপাত্র হয়েছেন। মানছি, এটা একটা রাজনৈতিক কৌশল কিন্তু বিএনপির এত ভগ্নদশা তো এ দেশের জনগণ চিন্তাও করেননি। বিএনপির এ দুরবস্থার জন্য একমাত্র দায়ী তারেক রহমান। দলের ভেতরে ভাঙন, সিনিয়রদের অবমূল্যায়ন, সীমাহীন দুর্নীতি, অস্ত্রের চোরাচালানসহ নানা ধরনের নেতিবাচক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারেক। সম্প্রতি দেখেছি ধানের শীষ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের স্কাইপিতে ইন্টারভিউ বা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক জিয়া। তাদের দিকনির্দেশনা ও কর্মকান্ড সম্পর্কে অবহিত করেছেন। তাদের ধারণা, এ উদ্যোগের ফলে মনোনীত প্রার্থী মানসিকভাবে চাঙ্গা হবেন, আরো দ্বিগুণ উৎসাহে দলের জন্য কাজ করবেন। প্রার্থীরা তার এলাকায় গিয়ে কর্মীদের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন স্কাইপির মাধ্যমে পাওয়া কথোপকথন ও নির্দেশনা। কিন্তু এটা তো চরম এক অন্যায়ের মধ্য দিয়ে দলটি তাদের নতুন কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। একজন দন্ডপ্রাপ্ত আসামি যিনি কিনা হত্যা, টাকা আত্মসাৎ, নারী কেলেঙ্কারির দায়ে দন্ডিত। আইনকে কী বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন, নাকি না বুঝেই নতুন এ অন্যায়টি করছেন তিনি। এতে করে মনোনয়ন প্রার্থীদের অপমান করা হচ্ছে। দন্ডপ্রাপ্ত আসামি কেমন করে জনপ্রিয়, ত্যাগী মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীদের সঙ্গে এক সড়কে হাঁটবেন। একই স্লোগানে মুখরিত করবেন রাজপথ। জনগণকে কেমন করে দেবেন আশ্বাস। স্কাইপির মাধ্যমে এ ধরনের কর্মকান্ড আমার দৃষ্টিতে নীতিগতভাবে অন্যায় এমনকি নৈতিকতা পরিপন্থী। জানি না, নির্বাচন কমিশন কীভাবে এর ব্যাখ্যা দেবে?

ড. কামাল হোসেনের সাক্ষাৎকার নেবেন তারেক জিয়া, এই কথাটা বেশ শোনা যাচ্ছিল। আমার প্রশ্ন কামাল সাহেব স্কাইপি বা এ ধরনের ঔদ্ধত্যকে কী করে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তিনি নিজেও তো আইনের লোক। দেশের বাইরেও নাম ডাক তার। অন্যেরা ভুল করলেও তার তো এ ভুলকে সমর্থন দেয়াটা শোভা পায় না। অন্যভাবে বলতে গেলে, তারেক জিয়ার এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জন্য অতীতেও ত্যাগী ও প্রবীণ নেতারা মনোক্ষুন্ন হয়েছেন। বিএনপির মাঝে মেরুকরণ, এটা স্পষ্ট শুধু তারেকের জন্যই। হয়তো নবীন কর্মীদের মাঝে তিনি জনপ্রিয় কিন্তু সিনিয়রদের মাঝে নন। প্রথমদিকে ড. কামাল হোসেনকে মুখপাত্র হিসেবে উপস্থাপন করলে ধীরে ধীরে ফিকে হতে থাকে সে সৌন্দর্য। এখন কামাল সাহেব আর আগের স্থানে নেই। বিএনপির এটা কৌশল মাত্র। কিন্তু একের পর এক প্রতারণা, মিথ্যা কৌশলে আজ দলটি খাদের কোণে অবস্থান করছে। এভাবে চলতে থাকলে যুক্তফ্রন্টের ভবিষ্যৎ কী, এমনটা জিজ্ঞাসা মাঠের অনেক কর্মীর।

আসলে খালেদা জিয়া ছাড়া কতটুকু সুন্দর এ ফরমেট! নেতৃত্বে ড. কামাল। নাম ও নেতৃত্ব দুইটাই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, শুধু সময়ের অপেক্ষায়। দেশের মানুষের কাছে তারেক জিয়া একজন দুর্নীতিবাজ। তার খামখেয়ালির কারণেই পর পর পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বের তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসে। ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে সেনা সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে, বাকিটা ইতিহাস।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছে তারেক জিয়ার নেতৃত্ব মানা অগ্রহণযোগ্য। ২০০৫ সালের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিএনপির নেতাদের কথাবার্তার আকার ইঙ্গিত সেটা বারবার প্রমাণ হয়। নমিনেশন না পাওয়ার ভয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছেন প্রবীণ নেতারা।

আর আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রের নেতাদের কাছে তারেক জিয়ার নাম হলো মিস্টার ১০%। ক্ষমতা থাকাকালীন বিদেশিরা যখন ব্যবসার বিনিয়োগ করতে বাংলাদেশে আসত তখন তারেক জিয়া টেন পার্সেন্ট অর্থ দাবি করতেন। পত্রিকার পাতায় দেখতাম যেমন নিটল টাটার মালিক তার ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ চুক্তি বাতিল করেছিল তারেক জিয়ার টেন পার্সেন্ট চাঁদা দাবির কারণে। আর আওয়ামী লীগ দলের কাছে তারেক জিয়া একজন ক্ষতিকর ব্যক্তি। স্বয়ং শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা মামলা তারেক জিয়া শাস্তিপ্রাপ্ত আসামি। এই সব কারণে তারেক জিয়ার নেতৃত্বকে দলের বড় একটা অংশ আর দেখতে চান না। খালেদা জিয়ার বয়স, অসুস্থ আর মামলার ধরনে দেখা যায় আগামী দিনে হয়তো তিনি আর হাল ধরতে পারবেন না।

বিএনপির নেতৃত্বে একজন মুরব্বি দরকার ছিল এটা হয়তো বিএনপির নেতারাও বুঝতে পারছেন। আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে শক্তিতে পেরে ওঠা সম্ভব না বলে বিএনপির জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল। দেশের মানুষকে বুঝানো ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলার মতো ইমেজ বিএনপির নেই, তাই জাতীয় ঐক্যের এই প্রবীণ নেতাদের সামনে রেখে ইমেজ ফিরিয়া আনার প্রয়োজনীয়তা বিএনপি অনুভব করছে। সাধারণ জনগণ হয়তো ভাববে যেহেতু বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের ইমেজ নেতারা হাল ধরছে, এবার না হয় সমর্থন করা যেতে পারে!

এতে বিএনপির নেতৃত্ব চলে যাচ্ছে ড. কামালদের হাতে আর দলের নাম হয়ে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আওয়ামী লীগের পজিটিভ দিক বিনা ভোটের কলঙ্ক মুছে আগামী পাঁচ বছরের ক্ষমতা থাকার পথ তৈরি হলো। জাতীয় ঐক্যের নেতারা বিএনপিকে নির্বাচনে আনবেই। ড. কামাল হবেন বিরোধী দলের চেয়ারপারসন। বিএনপির লাভ হলো অনেক এমপি পদ পেয়ে নাই মামুর চেয়ে কানা মামু ভালোর মতো সংসদে হৈহল্লা করার সুযোগ পাওয়া। তবে দেখার বাকি আছে আরো অনেক কিছু। কেবল তো পালে হাওয়া লেগেছে। গিরগিটির মতো রং পাল্টাতে শুরু করেছে অনেক নেতার। একটি মনোনয়ন না পাওয়ার আশঙ্কা অন্যদিকে অতীত কর্মকান্ডের ফল। অতীত থেকে বিএনপির শিক্ষা নিতেই হবে। ক্ষমা চাইতে হবে গ্রেনেড হামলাসহ সব অপকর্মের জন্য। একই সঙ্গে নির্বাচন নীতিমালা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে বিএনপি তার নির্বাচনী সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনবে সেটা সবাই আমরা দেখতে চাই। আসন্ন নির্বাচন বিএনপির বাঁচা মরার লড়াই, তাই অতীতের ভুলগুলো মারিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, জনগণের অনুভূতিকে সম্মান আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাড়াতে হবে আগে।

লেখক ঃ শিক্ষাবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক।

আরো খবর...