সুতা শিল্পে তুলার ব্যবহার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্যের পরই বস্ত্রের স্থান। রপ্তানিমুখী এই শিল্পকে নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থায় আসতে হয়েছে। মূলত ষাটের দশকে যাত্রা শুরু হলেও সত্তরের দশকের শেষ দিকে রপ্তানিমুখী শিল্পের মর্যাদা লাভ করে। এ শিল্পের উন্নয়নের ঊর্ধ্বমুখী স্রোতের ফলে বর্তমানে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত। সুলভ শ্রমের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী স্থানে পরিণত হয়েছে। ফলে বস্ত্রশিল্প এখন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প। অথচ এই শিল্পের কাঁচামালের সিংহভাগ আমদানিনির্ভর। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে যে কোনো সময় এই শিল্পে নানান বাধা-বিপত্তি আসতে পারে। তা ছাড়া চলমান বৈশ্বিক রাজনীতিও পণ্যের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে দেখা যাচ্ছে। এ দেশের মানুষ বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে বস্ত্রশিল্প, দেশে প্রায় ৮০ ভাগ গার্মেন্টস কর্মী নারী। জাতির এই বৃহৎ অংশের কথা মাথায় রেখে এই শিল্পের স্থায়ী উন্নতির কথা ভাবতে হবে। কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) অনুসারে বর্তমান বস্ত্র খাতের ৩৮৩টি সুতাকলের জন্য বিদেশ থেকে সুতা আমদানি করতে হয়; এতে প্রায় ১২০০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অন্যদিকে সুতার বর্তমান উৎপাদন দেশীয় চাহিদার প্রায় ৩.৬ ভাগ। স্বাধীনতার পর শুধু তুলা উৎপাদনে অপ্রতুলতার কারণে দেশীয় বস্ত্রশিল্পে সংকটময় অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই সংকটকে মোকাবেলা করার জন্য এবং ভবিষ্যতে বস্ত্রশিল্পে পৃথিবীর বুকে অবস্থান সৃষ্টির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত ইচ্ছায় ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর তুলা উন্নয়ন বোর্ড স্থাপিত হয়। আজ স্বাধীনতার দীর্ঘসময় পরও তুলার উৎপাদন সেই অর্থে কাঙ্খিত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। এ জন্য কিছু কারণ থাকতে পারে তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো- চাষিদের তুলা উৎপাদনে অনীহা, উৎপাদন পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে অজ্ঞতা, কৃষি সম্প্রসারণের অপ্রতুলতা, দুর্বল অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থা, খাদ্যশস্য উৎপাদনে অধিক মনোযোগিতা ইত্যাদি। সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কিছু কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে কৃষকশ্রেণির মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব। বিশেষ করে তামাক উৎপাদনের মতো চুক্তিভিত্তিক ফামিং ব্যবস্থায় গেলে তুলার উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। গবেষকদের তথ্য অনুসারে তুলাগাছ খরা ও লবণসহিষ্ণু। সুতরাং দেশের খরাপ্রবণ ও লবণজল বিধৌত অঞ্চলে তুলাচাষ করা সম্ভব, যেখানে অন্য ফসল ফলাতে কৃষকগোষ্ঠীকে নানান বেগ পেতে হয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু তুলাচাষের জন্য উপযোগী। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর এবং বরেন্দ্র এলাকায় প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমি তুলাচাষের আওতায় আনা সম্ভব। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ চরাঞ্চলে অতি সহজে তুলার চাষ সম্ভব। তুলার সঙ্গে অন্যান্য ফসল করা যায় যেমন: তুলা-পাট, তুলা-গম, তুলা-আলু, তুলা-তিল, তুলা-মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি। ফলে কৃষক সহজেই অন্যান্য ফসলের সঙ্গে চাষ করতে পারে। বর্তমান দেশের ৩৪টি জেলায় তুলাচাষ হচ্ছে। শুধু চাষিপর্যায়ে হাইব্রিড সিড প্রদানে, তুলাচাষে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ৬-৭ লাখ বেল তুলা উৎপাদন সম্ভব। দেশে বর্তমান ৩৯২টি স্পিনিং মিলের বার্ষিক আঁশতুলার চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ বেল (১ বেল =১৮২ কেজি)। তুলাচাষের সম্প্রসারণ, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং জিনিংযের মাধ্যমে এ দেশের আবহাওয়ায় দেশীয় চাহিদার ৬০-৬৫% উৎপাদন সম্ভব। এ ছাড়া পরীক্ষা করে দেখা গেছে আমদানিকৃত তুলার চেয়ে দেশীয় তুলার গুণগত মান ভালো। বলা বাহুল্য, এক সময় মসলিন কাপড় সমগ্র বিশ্বে নজর কেড়েছিল, সেই মসলিনের সুতাও উৎপাদিত হতো দেশীয় তুলা থেকে। ভিশন ২০২১ অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে গার্মেন্ট রপ্তানিতে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করা হয়েছে সেটিকে অর্জন করতে তুলার দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখতে হবে তুলাভিত্তিক শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান; তৈরি পোশাকশিল্প অগণন নর-নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির এক বড় জায়গায় পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া দেশের জিডিপিতে বস্ত্রশিল্পের অবদান অনেক বেশি। সুতরাং এই শিল্পকে আরও বেশি স্থায়ী ও শক্তিশালী করার নিমিত্তে কাঁচামাল উৎপাদনে নজর দিতে হবে। এতে তুলা আমদানি করার জন্য যে অর্থ বিদেশে চলে যায় তার সিংহভাগ দেশেই থেকে যাবে। তুলাভিত্তিক শিল্পকে টেকসই করার জন্য এবং অন্য দেশের দিকে মুখাপেক্ষী না হয়ে একটি স্বাধীনশিল্প সত্তা হিসেবে বিকশিত করে, আগামীর পোশাকশিল্পে বাংলাদেশকে এক নম্বরে স্থায়ী করার জন্য কাঁচামালের দিকে নজর দেয়ার সময় এসেছে।

আরো খবর...