সাহসী মানুষের কথা বলছি

হাসনাত আবদুল হাই ॥

অনেক সাহসী মানুষের কাহিনি আছে ইতিহাসে। এরা যুদ্ধ এবং শান্তির সময়ে চরম বিপদের মুখে অসীম সাহস দেখিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন জীবিতকালেই। পরে তাদের স্থান হয়েছে ইতিহাসে। বলা হয় যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় মানুষকে আগের মতো একাকী বা দলবদ্ধ হয়ে সাহস দেখাতে হয় না, প্রযুক্তিই তাদের হয়ে কাজ করে, বিপদে জয়ী হতে প্রধান ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভূমিকা মেনে নিয়েও এ কথা অস্বীকার করার উপায় থাকে না যে, অনেক বিপদেই বিস্ময়কর মনোবলের পরিচয় দেন। মাঝেমধ্যেই দেশে এবং বিদেশে মানুষের অসম সাহসের কাহিনি জানা যায়। ২০১০ সালে চিলিতে কয়লা খনির ২০ জন শ্রমিক দুর্ঘটনার পর ভূগর্ভে আটকে ছিল ৭০ দিন। ওপর থেকে ছিদ্র করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল এবং পাঠানো হয়েছিল পানি, খাবার ও ওষুধ। তাদের জানানো হয়েছিল যে উদ্ধারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে। সমস্ত পৃথিবীর দৃষ্টি এবং মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল ভূগর্ভে পড়া শ্রমজীবী এইসব মানুষের বেঁচে থাকার কাহিনি। একদিন, দু’দিন নয়, দুই মাসের ওপর মাটির নিচে অন্ধকূপে থেকে শ্রমিকরা যে শেষ পর্যন্ত প্রাণ নিয়ে ওপরে উঠে এসেছিল। সবচেয়ে বিস্ময়ের  বিষয় এই যে, এমন চরম সংকটের মধ্যে দীর্ঘকাল থেকে ভূগর্ভের ওপরে উঠে আসার পর আটকে পড়া শ্রমিকদের কেউই মানসিক অসুস্থতায় ভোগেনি। খুব সহজেই তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।চরম বিপদে পড়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে যারা মনোবল না হারিয়ে অসম সাহসিকতার সঙ্গে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকে তারা শুধু সাহসী নয়, বীরও বটে। বীরত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয় নয়, শান্তির সময়েও তার প্রমাণ পাওয়া যায় চরম সংকটের সময়। থাইল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে এক দুর্গম গুহায় বর্ষার পানিতে আটকে পড়া একজন যুবক ও বারোজন কিশোরের প্রাণ নিয়ে ফিরে আসার অতিসাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এমন ঘটনার একটি। কিন্তু গুহার বর্ণনা শুনে এবং পড়ে সেখানকার ছবি দেখে অনেকেই নিশ্চিত হতে পারেনি যে, আটকে পড়া বারোজন কিশোর এবং তাদের প্রশিক্ষক প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারবে কিনা। কেবল গুহার ভেতরের ভয়াবহ দৃশ্যই নয়, বারোজন শীর্ণদেহের কিশোরদের দেখেও এই শঙ্কা দেখা দিয়েছে মনে। সব শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা মিথ্যা প্রমাণ করে তেরোজন আটকে পড়া মানুষই নিরাপদে ফিরে এসেছে। এই বিস্ময়কর ঘটনায় আবারো প্রমাণিত হয়েছে যে, চরম বিপদে শেষ পর্যন্ত মনোবলই সাহায্য করে উত্তীর্ণ হতে। এরই নাম সাহস এবং একেই বলতে হয় বীরত্ব।মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তের কাছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ থাম লু সাং গুহা থাইল্যান্ডের দীর্ঘতম গুহা। কম চওড়া আর অনেক সঙ্কীর্ণ এবং চড়াই-উতরাই পূর্ণ হওয়ায় গুহার ভেতরে চলাচল করা কঠিন। বর্ষার পানিতে ভরে গেলে গুহায় প্রবেশ এবং ফিরে আসা হয়ে পড়ে অসম্ভব। এই জন্য গুহার মুখেই লেখা আছে সতর্ক করানোর নোটিস। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার সন্ধানে ঝুঁকি আছে জেনেও সেই গুহায় প্রবেশ করে ফুটবল খেলোয়াড় বারো জন কিশোর এবং তাদের পঁচিশ বছরের প্রশিক্ষক। তারা যে গুহাতেই প্রবেশ করেছে সে কথা বলে জানা যায়নি এবং সেকথা জানেওনি কেউ। নিখোঁজ হওয়ায় তাদের আত্মীয়-স্বজন গুহার কাছে এসে দেখতে পায় রেখে যাওয়া সাইকেল এবং মাটিতে পদচিহ্ন। কিশোরদের ফুটবল দল প্রশিক্ষকসহ নিখোঁজ হয় ২৩ জুন। তাদের পদচিহ্ন এবং রেখে যাওয়া সাইকেল শনাক্ত হয় ২৪ জুন। সঙ্গে সঙ্গে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনীর ডুবুরিরা এসে উপস্থিত হয় গুহার সামনে অনুসন্ধানের জন্য। শুরু হয় পরিকল্পনা এবং অনুসন্ধানের আয়োজন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, স্বেচ্ছাসেবী এবং অভিভাবকরা এসে অবস্থান নেয় একই সঙ্গে। ২৬ জুন অনুসন্ধানকারী ডুবুরিরা বৃষ্টির পানিতে নিমগ্ন গুহার ভেতরে অনেকদূর গিয়ে ফিরে আসে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ায়। ততদিনে খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব দেশে। ত্বরিতে এসে উপস্থিত হয় অভিজ্ঞ বিদেশি ডুবুরিরা। ২৭ জুন ৩০ জন আমেরিকান, ৬ জন ব্রিটিশ ডুবুরি এসে যোগ দেয় থাইল্যান্ডের ডুবুরিদের সঙ্গে। এদের মধ্যে ২ জন ব্রিটিশ ডুবুরি গুহায় প্রবেশ করেও ফিরে আসে, প্রবল বর্ষায় গুহার ভেতরে পানি আরো বেড়ে যাওয়ায় শুরু হয় পানি নিষ্কাশনের কাজ। কিন্তু আবারো বৃষ্টির পূর্বাভাসের জন্য পানি সম্পূর্ণ নিষ্কাশনের অপেক্ষা না করে ৩০ জুন ভেতরে প্রবেশ করে দুইজন ব্রিটিশ ডুবুরি রিচার্ড স্টিফেইন ও জন ভলা নাসন। ১ জুলাই গুহার অনেক ভেতরে দেওয়া হয় কয়েক’শ অক্সিজেন ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য উদ্ধার সামগ্রী। ২ জুলাই তারিখের সন্ধ্যায় ব্রিটিশ ডুবুরি অবশেষে দেখতে পায় একটা সংকীর্ণ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে বারোজন কিশোর এবং তাদের প্রশিক্ষক। অনাহারে তাদের সবাইকে শীর্ণ এবং দুর্বল দেখা গিয়েছে। কিন্তু তাদের মনোবল অটুট দেখতে পায় দুই ব্রিটিশ ডুবুরি। প্রায় দুই মাইল ভেতরে যেতে-আসতে তাদের সময় লেগেছে বারো ঘণ্টা। কেবল দীর্ঘ আর জলমগ্ন নয়, স্থানে স্থানে গুহা খুব সংকীর্ণ হওয়ার জন্য ব্রিটিশ ডুবুরিদের অক্সিজেন ট্যাঙ্ক সামনে ঠেলে ঠেলে উপুড় হয়ে শুয়ে থেকে ভেতরে যেতে হয়েছে। নিখোঁজ কিশোর ও তাদের প্রশিক্ষকের সন্ধান পাওয়া গেলেও উদ্ধার সম্পর্কে সন্দেহ দেখা দেয় অনেকের মনে। কিশোরদের কেউই সাঁতার জানে না। উদ্ধারের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয় সেখানে কিশোরদের সাঁতার দিতে না বলে সামনে- পেছনে ডুবুরির সাহায্যে দড়ি ধরে আসতে হবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর জন্য তাদের সঙ্গে থাকতে হবে অক্সিজেন ট্যাঙ্ক, যা বেশ ভারী। অনিশ্চয়তা এবং সন্দেহের ভেতর উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু হয়ে যায় ত্বরিত গতিতে, কেননা আবারো প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছে। গুহার ভেতর গিয়ে রসদ রাখার সময় ৬ জুলাই থাই নৌবাহিনীর একজন অভিজ্ঞ ডুবুরি গুহার ভেতরে অক্সিজেনের অভাবে প্রাণ হারায়। এতে নিরাশ কিংবা ভীত হয় না দেশি এবং বিদেশি ডুবুরি দল। ততদিনে বিদেশি ডুবুরির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪০ জন এবং থাই নৌবাহিনীর ডুবুরির সংখ্যা ৪০ জন। তাদের সাহায্য করেছে সেনাবাহিনী, ডাক্তার, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং স্বেচ্ছাসেবী। ৭ জুলাই স্থানীয় গভর্নর গণমাধ্যমকে জানান যে, উদ্ধার কাজ ‘মিশন ইমপসিবল’ অসাধ্য সাধন বলা যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে, আটকে পড়া কিশোররা পানিতে ডুব দিয়ে হেঁটে কিংবা সাঁতার কেটে আসতে পারবে না। এই বাস্তবতার ভিত্তিতে উদ্ধারের কৌশল গ্রহণ করা হয়— যেখানে প্রতি কিশোরকে দুইজন ডুবুরি সাহায্য করে সারা পথ নিয়ে আসবে। এমন কৌশল কার্যকর হবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চয়তা না থাকলেও তার ভিত্তিতেই উদ্ধার কাজ শুরু হয়। ৮ জুলাই প্রথম সুখবর জানা যায়। ডুবুরিরা পরিকল্পনা অনুযায়ী চার জন কিশোরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। এই প্রথম আশার আলো দেখা যায় কিন্তু বৃষ্টি শুরু হলে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। ৯ জুলাই আরো চারজন কিশোরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। চরম উত্তেজনার মধ্যে অবশেষে ১০ জুলাই উদ্ধার করা হয় অবশিষ্ট চার জন কিশোরকে। গুহায় আটকে পড়া তেরো জনের উদ্ধার সংবাদ শুধু থাইল্যান্ডে নয়, সমস্ত বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।উদ্ধার কাজটি দুরূহ ছিল, বিশেষ দাবিদার ডুবুরিরা যারা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও বিপদসংকুল গুহায় একাধিকবার যাওয়া-আসার কাজ ‘মিশন পসিবল’ করেছে। এমন কর্তব্যপরায়ণ, নিষ্ঠাবান এবং মানবিক অনুভূতি সম্পন্ন মানুষই প্রমাণ করে যে, বিপদের সময়েই সাহস ও বীরত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।সবচেয়ে বেশি সাহস ও দৃঢ় মনোবল প্রদর্শন করেছে বারো জন কিশোর। চরম হতাশা ও বিপদের মধ্যে তারা নিরাশ কিংবা হতোদ্যম হয়নি। ২৩ জুন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে জুলাই ২ পর্যন্ত প্রায় নয় দিন তারা বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। তাদের কাছে না ছিল খাবার, না সুপেয় পানীয়। অক্সিজেনও ছিল অপ্রতুল এবং গুহার ভেতর জমে থাকা পানি তাদের ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গিয়েছিল দূরবর্তী অঞ্চলে যেখানে শুধুই অন্ধকার। এমন পরিবেশে তাদের যে মনোবল অটুট ছিল এবং ভবিষ্যত্ সম্পর্কে আশাবাদ জেগে ছিল, তার প্রধান কারণ তাদের খেলোয়াড় হিসেবে প্রশিক্ষণে পাওয়া শৃঙ্খলাবোধ এবং জয়ী হবার সঙ্কল্প। এই সম্পর্কে তাদের অটুট ছিল শেষ পর্যন্ত। এক্ষেত্রে তাদের প্রশিক্ষকের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু মাঠেই তাদের প্রশিক্ষণ দেননি মনোবল অটুট রাখতে অষ্টপ্রহর দিয়েছেন পরাভয় এবং উত্সাহ। এরা সবাই সাহসী যোদ্ধা এবং প্রাণবন্ত খেলোয়াড়। তারা ‘খেলোয়াড়’ ব্যাপক অর্থেই, শুধু ফুটবল খেলায় নয়। শৃঙ্খলাবোধ, আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা এবং দৃঢ় সঙ্কল্প থাকলে অনেকেই এমন ‘খেলোয়াড়’ হতে পারে। থাইল্যান্ডের গভীর গুহায় প্রায় দু’সপ্তাহ আটকে থাকার পর নিরাপদে নিজেদের ভুবনে ফিরে আসা বারো জন কিশোর এবং তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল যে প্রশিক্ষক, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে সেই শিক্ষা পাওয়া যেতে পারে।লেখক ঃ কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব

আরো খবর...