সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য তাকওয়া জরুরী

রমজানুল মোবারক

আ.ফ.ম নুুরুল কাদের ॥ আবার এলো রমজান, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তাকওয়ায় শাণ  দেয়া। যেই তাকওয়া মানবতার সব রকমের কল্যাণ ও মর্যাদার প্রতীক। তাকওয়ার ওপর ভিত্তি করেই নিরূপিত হয় মানুষের মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্ব। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ তাকওয়ার ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য তাকওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাকওয়াহীন ব্যক্তি সে  যেই হোক না কেন, তাকে সম্মানি ব্যক্তি বলা যাবে না। যদিও পৃথিবীর মানুষ বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মর্যাদার বৃত্ত গড়ে তুলেছে, কিন্তু তাকওয়ার কাছে তা একান্তই মূল্যহীন। বংশ, ভাষা, বর্ণ ও দেশ এগুলো আল্লাহরই সৃষ্টি, তাই বলে এগুলো কোনো মর্যাদার মানদন্ড বা মাপকাঠি নয় বরং এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন যাতে মানুষ পরস্পরকে চিনতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও  গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, তোমাদের মধ্যে  যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে (মোত্তাকি)। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সবকিছু জানেন ও খবর রাখেন’ (আল হুজরাত ১৩)। ইসলাম সাম্য-সংহতির অনুপম শিক্ষা শুধু ব্যক্তি চরিত্রে নয়, বরং মানুষের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় জীবনসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাস্তবায়ন করেছে। আজ  থেকে চৌদ্দ শ’ বছর আগে রাসূল সা: কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনা নামক ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করুন। রাসূল সা: এমন এক সমাজ কায়েম করেছিলেন, যেখানে বর্ণ, বংশ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার কোনো  ভেদাভেদ ছিল না, যেখানে উঁচু-নিচু, ছুত-ছাত এবং বিভেদ ও পক্ষপাতিত্বের  কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সে সমাজ ব্যবস্থায় হজরত বেলাল রা: এবং হজরত ওমর রা: এর মধ্যে যেমন কোনো পার্থক্য ছিল না, তেমনি আলী রা: ও আনাস-জায়েদ ইবনে সাবেত রা: মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। থাকলেও  সেটি তাকওয়ার ভিত্তিতেই নিরূপণ হতো। প্রকৃত রূপে আমরা মুত্তাকি হতে পারছি না বিধায় ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মতো বিকল্প পথে মর্যাদার সন্ধান করে ফিরছি। আর এ জন্য আমরাও বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মর্যাদার বৃত্ত গড়ে তুলেছি। এ নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যেই আমাদের সামজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সব কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। এ নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে আমাদের চিন্তা-চেতনাকে নিয়ে যেতে পারছি না বিধায় উন্নয়নের বাধা গুলোও টপকানো আমাদের জন্য দুষ্কর হয়েছে। ফলে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের আজ্ঞাবহ সাজতে বাধ্য হচ্ছি। অথচ তাকওয়ার মতো মানবীয় উন্নতর গুণের অধিকারীদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণের ভান্ডার সংরক্ষিত রয়েছে বলে আল-কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। সত্যিই মুসলিম দেশগুলোর ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান অধিকতর এমন উত্তম স্থানে রয়েছে যে, প্রতিটি মুসলিম দেশের মাটির নিচে আল্লাহ তায়ালা অফুরন্ত নেয়ামতের ভান্ডার মজুত করে  রেখেছেন। আমাদের গোলামি ও পরাজিত মানসিকতার কারণে আল্লাহ দান করছেন না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর সরকার প্রধানগণ আল্লাহর ভয়ের চেয়ে সাম্রাজ্যবাদী ইহুদি-খ্রিষ্টানগোষ্ঠীকেই  বেশি ভয় করেন। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘লোকালয়ের মানুষগুলো যদি ঈমান আনত ও তাকওয়া বা ভয় করত তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দোয়ার খুলে দিতাম, কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। সুতরাং তাদের কর্মকান্ডের জন্য আমি তাদের পাকড়াও করলাম’ (সুরা আরাফ ৯৬)। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ আয়াতটি ছিল ইহুদিদের সম্পর্কে। বনি ইসরাইল জাতিকে পৃথিবীবাসীর নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করে আল্লাহ তায়ালা তাদের ইতিহাসকে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘হে বনি ইসরাইল! আমার সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আমি তোমাদের দান করেছিলাম এবং একথাটিও যে আমি দুনিয়ার সমস্ত জাতির ওপর তোমাদের শ্রেষ্টত্ব দান করেছিলাম’ (সুরা বাকারা ৪৮)। পৃথিবীর ইতিহাসের এক দীর্ঘকাল ব্যাপী তারা এ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু হঠকারী কর্মকান্ড, গোঁড়ামি ও চরমপন্থার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে নেতৃত্বের আসন থেকে অপসারিত করে মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে ‘উম্মতে মুহাম্মদি সা: হাতে  নেতৃত্বের দন্ড তুলে দিলেন। আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় ইসরাইল জাতির গোঁড়ামির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। তাদের ঔদ্ধ্যত্যে ও সাহসের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে আল্লাহ ক্রোধ সহসা সে জাতির ওপর আছরে পড়ে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিতে পরিণত হয়। সে বৈশিষ্ট্যগুলো আজ আমাদেরকেও সংক্রমিত করেছে। ইসলাম ভারসাম্য নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ও বাঁকে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির অনুপম শিক্ষা একমাত্র ইসলামই দিয়েছে। রাসূল সা: পুরো মানব সমাজকে ভেতর থেকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিলেন যে, সমাজ ও সভ্যতায় ভারসাম্য স্থাপিত হয়েছিল। সম্মান ও মর্যাদার সনদ বদলে গিয়েছিল। তাকওয়া ছিল সে সমাজের মানুষের মর্যাদার মানদন্ড।তাকওয়া এমন একটি শক্তি, এমন একটি গুণ, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ হক ও বাতিল, ভুল ও সঠিক, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। যিনি শুধু আল্লাহর ভয়ে সেটিকেই সত্য হিসেবে মেনে  নেন যা তিনি নাজিল করেছেন। তিনি সেটিকেই সঠিক মনে করেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। যে কাজ বা প্রথা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরো অসংখ্য ক্ষতির সৃষ্টি করে, যে সব কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। এ ধরনের ক্ষতিকর কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা খুবই জরুরি। আর আত্মরক্ষার জন্য জ্ঞানের প্রয়োজন। জ্ঞানের চাহিদা মেটাবে আল-কুরআন। রক্ষার জন্য আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য দরকার বাস্তব ট্রেনিং। পুরো রমজানে আমরা সেই প্রশিক্ষণে অংশ নেব। রমজানের সিয়াম একমাস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আমাদের  যেই মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, সেই মর্যাদাকে অক্ষুন্ন রাখতে হবে এবং এই তাকওয়াভিত্তিক সমাজ কায়েমে আমাদের অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, তাকওয়া গুণ সম্পন্ন মর্যাদাশীল জনগোষ্ঠী নিয়ে যে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটিই হবে আল-কুরআনের  দেয়া বিধিবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা।

 

আরো খবর...