সরকারকে চাল দিয়ে কেজিপ্রতি ১০ টাকা লাভ পাচ্ছে চাল ব্যবসায়ীরা

কুষ্টিয়ায় লোকসান গুনছে কৃষক

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বোরো ধান আবাদ করে লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কিন্তু সেই ধান থেকে চাল উৎপাদন করে সরকারের কাছে বিক্রি করে অধিক লাভবান হচ্ছেন চাল ব্যবসায়ীরা। তাঁরা কেজি প্রতি ১০ টাকা লাভ পাচ্ছেন। কৃষকেরা বলছেন, সরকার কৃষকের দিকে নজর কম দিয়ে ব্যবসায়ীদের ধনী বানাচ্ছে। তাদের দাবি, যে হারে সরকার চাল কিনছে সেই হারে ধানও কিনতে হবে। নতুবা সরকারীভাবে যে মূল্য (কেজিপ্রতি ২৬ টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে সেটা বাইরেও নির্ধারণ করা হোক। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় রবি মৌসুমে বোরো আবাদে সবচেয়ে বেশি মোটা জাতের চালের ধান আবাদ করা হয়। সরকার বোরো সংগ্রহও করে বেশি। চলতি মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি ৩৬ টাকা কেজি দরে বোরো চাল সংগ্রহ করছে। জেলায় ২৯ হাজার ৮৬৯ মেট্রিক টন কেনা হচ্ছে। তারমধ্যে সদর উপজেলাতেই ৩৩৬ মিল মালিক ২৩ হাজার ৯১১ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করছে। আগামী ৩১ আগষ্টের মধ্যে চাল কেনা সম্পন্ন করা হবে। চালকল মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, বোরো চাল তৈরিতে মোটা ধানের জাত যেমন বিআর-২৮,কাজললতা ও শুভলতা ধান কেনা হয়। গত রোববার আইলচারা বাজারে এসব ধান বিক্রি হয়েছে মণ প্রতি ৬০০ টাকা। ধান কেনাসহ মিলে আনার পরিবহন খরচ ২৫ টাকা, শ্রমিক ২০ টাকা ও মিল চার্জ ৩৫ টাকা মিলে খরচ হয় আরও ৮০ টাকা। প্রতি মণ ধান থেকে চাল উৎপাদন হয় ২৬ কেজি। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ হচ্ছে কেজি প্রতি ২৬ টাকা। এই উৎপাদিত চাল তাদের কাছ থেকে সরকার কিনছে কেজি প্রতি ৩৬ টাকা দরে। অর্থ্যাৎ তারা কেজি প্রতি ১০ টাকা লাভ পাচ্ছেন। কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকের দেওয়া তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করে ঘরে তুলতে (জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে মাড়াই শেষ করে) প্রায় ১৫ হাজার ৮৪৪ টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ধান হচ্ছে গড়ে ২০ মণ করে। বাজাওে ৬০০ টাকা মণ হিসাবে সব ধান বিক্রি করে পাচ্ছে ১২ হাজার টাকা। লোকসান হচ্ছে ৩ হাজার ৮৪৪ টাকা। সহজ এই হিসাবে রোদে পুড়ে চার মাস ধরে কৃষককে বোরো আবাদ করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। সেখানে ঘরে বসে কেজি প্রতি ১০ টাকা হিসাবে লাভ করে কোটি কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে আয় করছেন চাল ব্যবসায়ীরা। কুষ্টিয়া পৌরসভা বাজারে খুচরায় এখন মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ২৭ টাকা। সরু চালের দাম কেজিপ্রতি ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা এবং মাঝারি চাল ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। তবে পুরাতন চাল বিক্রি হচ্ছে প্রত্যেক প্রকারে কেজি প্রতি আরও ৪ টাকা করে বেশি দরে। ক্ষোভপ্রকাশ করে কৃষকেরা বলছেন, বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় মিল মালিকেরা এখনই জেলাসহ আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায় ধান কিনে গুদামজাত করে ফেলছে। বিভিন্ন জেলায় ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তারা এধান কিনে নিচ্ছে। সুযোগ বুঝে সেই ধান পরবর্তীতে ধীরে ধীরে চাল উৎপাদনে যাবে। এতে কম টাকায় কিনে চাল উৎপাদন করবে। কৃষকদের দাবি, সরকার ২৬ টাকা প্রতিকেজি দরে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছে। কিন্তু সেটা খুবই নগন্য। তাই খোলা বাজারেও সরকারের এই দাম (২৬ টাকা) নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। যাতে কৃষকদের কেউ ঠকাতে না পারে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষি কর্মকর্তা বলেন,সরকার যে দামে ধান কিনছে  সেই দামই বাজারে নির্ধারণ করে দিলে কৃষক বাঁচবে। হয়তো এতে করে চালের দাম কিছুটা বাড়বে। অন্যদিকে কোটি কোটি কৃষকও লাভবান হবে। জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধানের দাবি, জেলায় যে পরিমাণ বোরো চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে তা সব মিল মালিকদের মধ্যে ধারণ ক্ষমতা অনুপাতে বন্টন করে দেওয়া হয়। এতে একজন মিলমালিক গড়ে ৪০ টন করে বরাদ্দ পান। এই চাল উৎপাদন করতে মাত্র দশ দিন লাগে। কিন্তু বাকি দিনগুলোতে উৎপাদন করা চাল বাইরে বিক্রি করতে গেলে লোকসানে পড়তে হয়।

 

আরো খবর...