সমবেদনার মাস রমজান

আ.ফ.ম নুরুল কাদের ॥ রমজানুল মোবারকের আজ ১৭ তারিখ। অফুরন্ত কল্যাণের বার্তাবাহী এ মাসের মাহাত্ম প্রসঙ্গে হজরত সালমান ফারসি রাজিয়াল্লাহ আনহু বর্ণিত হাদীসে মহানবী সঃ ইরশাদ করেছেন, এটা সমবেদনার মাস। পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহানুভূতি পৃথিবীতে মানবজাতির অস্তিত্ব ও স্থায়িত্বের অন্যতম শর্ত। তাই ইসলামে এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন মজিদে মাতা-পিতা, আত্মীয়স্বজন ও সব মানুষের সাথে সদাচার ও সহানুভূতিমূলক আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইসলামে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের প্রতি কর্তব্য পালনের ওপর এতই  জোর দেয়া হয়েছে, বিশ্বের অন্য কোনো ধর্ম ও আদর্শে যার নজির পাওয়া যায় না। মহানবী সঃ বলেন, জিবরাইল আল্লাইহিস সালাম আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে এতই তাগিদ দিতে থাকেন যে আমি মনে করেছিলাম প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত করা হবে। আদম -হাওয়ার সন্তান হিসেবে পৃথিবীর সব মানুষ একই পরিবারের সদস্য এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হতে হবে সহমর্মিতা ও সহানুভূতিমূলকÑ এটাই ইসলামের শিক্ষা। কুরআন মজিদে মুসলমানদের একে অপরের ভাই বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (সূরা হুজুরাত-১০) । হাদিস শরীফে পুরো সৃষ্টিজগৎকে আল্লাহর পরিবার সাব্যস্ত করে সৃষ্টির সেবাকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার উপায় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত আনাস (রাঃ) আনহু বর্ণনা করেন, হজরত নবী করিম সাঃ এরশাদ করেন, সৃষ্টিকুল আল্লাহর পরিবার। এই পরিবারের কল্যাণে যে ব্যক্তি আত্মনিয়োগ করে সে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়। মহানবী সঃ পুরো মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, কারো  চোখে যন্ত্রণা হলে যেমন পুরো শরীর অস্বস্তিবোধ করে, মাথা ব্যথা হলে যেমন পুরো শরীর অসুস্থ হয়, গোটা মুসলিম উম্মাহ এমনই। পারস্যের কবি শেখ সাদি রহ: তার বিখ্যাত গুলিস্তান গ্রন্থে কাব্যিক ভাষায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আদম সন্তানেরা একটি দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতো। কেননা তাদের সৃষ্টির মূল উৎস একটাই। একটি অঙ্গে যখন যন্ত্রণা হয় অন্য অঙ্গগুলোরও তখন স্বস্তি থাকে না। অন্যদের ব্যথায় যদি নির্বিকার থাক, তাহলে তুমি মানুষ নামে আখ্যায়িত হওয়ার যোগ্য নও। ইসলাম এমন সমাজব্যবস্থার নির্দেশনা দেয় যেখানে একে অপরের সুখ ও আনন্দে  যেমন শরিক হবে তেমনি দুঃখকষ্টের বেলায়ও সবাই একে অপরের পাশে এসে দাঁড়াবে। মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিনদের মধ্যে পরস্পরের মধ্যে সহানুভূতি ও সমবেদনার গুণ অর্জিত হয়। বিশেষ করে যারা দুস্থ, অনাহারের কষ্ট যাদের সহ্য করতে হয় তাদের ব্যথা বোঝার সুযোগ হয় সিয়াম পালনের কারণে। যারা কখনো ক্ষুধার যন্ত্রণা পোহায়নি, খাবারের অভাব কাকে বলে তা যারা জানে না তারা কিভাবে বুঝবে অভাবী লোকদের ব্যথা? লাগাতার একমাস রোজা রাখার কারণে এই ব্যক্তিরা নিরন্ন মানুষের প্রতি সদয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারে। পুরো একমাস  রোজার হুকুম দেয়ার একটা তাৎপর্য বোঝা যায় এখান থেকে। কেননা দু-এক দিন খাবার গ্রহণে ব্যত্যয়ের কোনো প্রভাব নাও পড়তে পারে। কিন্তু লাগাতার একমাস সুনির্দিষ্ট দীর্ঘ সময় খাবার গ্রহণ থেকে বাধ্যতামূলক বিরত থাকার অভিজ্ঞতা অবশ্যই একজন মানুষকে সচেতন করবে। অভাবী ও গরিব মানুষের প্রতি অন্তরে দয়ার উদ্রেক হবে এবং তাদের কল্যাণে ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে। প্রকৃতপে অধীনস্থদের প্রতি সদয় আচরণের তাগিদ রয়েছে সারা বছরের জন্য। তাই রমজানের এই শিক্ষা যদি সারা বছর অনুসরণ করা যায় তাহলে  যেমন সিয়াম পালন সার্থক হবে তেমনি সমাজে  নেমে আসতে পারে জান্নাতি পরিবেশ।

আরো খবর...