রোহিঙ্গা সংকট বনাম আঞ্চলিক সহযোগিতা

॥ মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব) ॥

আগস্টের ২৫ তারিখ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা জনগ্রোত বাংলাদেশের দিকে সুনামির মত ধেয়ে আসতে শুরু করে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি সংগঠন ৩০ টি পুলিশ ফাঁড়ি ও একটি সেনা চৌকিতে ভোর রাতে একযোগে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ১২ নিরাপত্তা সদস্যকে হত্যা করে এবং নিজেদের ৭০ জন নিহত হয়। পাল্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সন্ত্রাস দমন অভিযানের নামে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। গণহারে নিরীহ মানুষ নিধন করে, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যা থেকে শুরু করে রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন ধ্বংস করে তাদের বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়। সীমান্তে তারকাঁটার বেড়া মেরামত ও এলোপাতাড়ি স্থল মাইন বসিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত আসার সুযোগ বন্ধ করার চেষ্টা করে। মানবিক বিপর্যয়ের পেছনে বর্মী সেনাদের গোপন পরিকল্পনার অস্তিত্ব প্রকাশ পেতে শুরু করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। আরসা সন্ত্রাসীদের হামলা সম্পর্কে তারা পূর্বেই অবহিত হয়ে প্রস্তুত ছিল। এমনকি জাতিসংঘের কাছেও খবর ছিল রাখাইনের সহিংসতার পরিকল্পনার কথা যা চেপে রেখেছিল আবাসিক সমন্বয়কারী। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিধন ও বিতাড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার বর্মীদের পরিকল্পিত কৌশল বিশ্বের কাছে আড়াল করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়, যখন ৫ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। চলমান কূটনীতি থেকে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবার প্রতিশ্রুতি স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি দিলেও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন থামছে না। সীমান্তে এখনো অনেক রোহিঙ্গা সীমানা অতিক্রমের জন্য অপেক্ষায় আছে। রোহিঙ্গা সংকট তৈরির পেছনে সন্ত্রাস দমনের নামে চালানো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত শক্তি প্রয়োগ ও পাশবিক নির্যাতনকে সংকটের সূচনা মনে করা হলেও অন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির গতি প্রবাহ দেখে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, সংকট সৃষ্টির পেছনে ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। আরসার হামলার ধরন ও কৌশল থেকে বোঝা যায়, তড়িঘড়ি করে প্রস্তুতি ছাড়াই হামলা করা হয়েছে। কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট পেশের সঙ্গে হামলার সময় নির্ধারিত হয়েছে। উত্তর রাখাইনে সেনা মোতায়েন আগে থেকেই করা হয়েছিল। আরসা হামলাকে উপলক্ষ হিসাবে নিয়ে নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে। প্রাণঘাতী সেনা অভিযান মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গণতান্ত্রিক প্রবাহকে বিনষ্ট করেছে, অপরদিকে বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতিতে ঘূর্ণিপাক তৈরি করেছে। সমাধানের উপায় খুঁজতে গিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিকে ঘোরপ্যাঁচে ফেলেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দশক ধরে গড়ে ওঠা বিসিআইএম ও বিমস্টেকের মত সহযোগিতার কাঠামোতে হঠাত ধাক্কা এসেছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত সহযোগিতা হোঁচট খেয়েছে। সংকট থেকে উত্তরণের পথ ও মত নিয়ে  ভিন্নতা আঞ্চলিক সংহতিকে ঢিলা করেছে অনেকাংশে। বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু দেশ চীন, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ধাঁধার মধ্যে পড়েছে। রাখাইনে সেনা অভিযানের যথার্থতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে আরসাকে হামলা ও রাখাইনদের উপর নির্যাতনকারী বানিয়ে সহিংসতার হোতা হিসাবে দমনে সেনা নামাতে বাধ্য হয়েছে মিয়ানমার সরকার। রাজনৈতিক সরকার ও সেনা আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থেকে রোহিঙ্গা নিধনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে সেটা সুস্পষ্ট। কফি আনান রিপোর্টের উপর রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ হবার আগেই  রোহিঙ্গাদের উপর সহিংসতা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করা করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা। মিয়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মনে রোহিঙ্গা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক পুষ্টি নিয়েছে। অচলাবস্থা তৈরিতে ক্রীড়নক হিসাবে ব্যবহূত হয়েছে আরসা। মিয়ানমার সেনা আধিকারীকদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দাদের গোপন সমঝোতার সম্ভাবনার বিষয়টি চিন্তার খোরাক হিসাবে দেখা দিয়েছে। গণতন্ত্রের বিকাশ ও রাজনৈতিক শক্তিকে রুখতে মিয়ানমার সেনাশাসকদের পরিকল্পিত সহিংসতা অং সান সু চিকে বিশ্বের কাছে নিদারুণভাবে ক্ষত বিক্ষত করেছে। অর্ধ শতাব্দী ধরে চলা সেনা শাসনের আমলে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় কট্টরতা বেড়েছে রাষ্ট্রের মদদে। বহু জাতিসত্তার বর্মী রাষ্ট্রের সংহতি ধরে রাখতে সামরিক শক্তির অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ, বাক স্বাধীনতা হরণ এবং  বার্মা শুধু বর্মীদের এক ভাষা ও এক ধর্মের রাষ্ট্র তৈরিতে জনগণের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তন করে মানবতার মূল্যবোধে হিংসা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূল জনগ্রোতের রোহিঙ্গা বিদ্বেষী মনোভাব অং সান সু চিকে মানবতার মৌলিক নীতি থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করেছে। গণতন্ত্র ও সেনা আধিপত্যের সমঝোতা কোনো দেশেই জনকল্যাণমুখী হতে পারেনি। ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ হিসাবে অং সান সু চির সেনাদের সঙ্গে সমঝোতা তাকে বেশি ভঙ্গুর করে রেখেছে। বিশ্বের অব্যাহত চাপের মুখে  সু চির রাজনীতি সেনা নির্ভরতা কাটাতে  প্রত্যয়ী নয়। সেনাদের সম্মতি ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে তাঁর ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ব্রিটেন রোহিঙ্গা  সংকট উত্তরণে বেশি তত্পর ও উচ্চকণ্ঠ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক চাপ জোরাল করতে নিরাপত্তা পরিষদকে উন্মুক্ত আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে দুবার। স্থায়ী সদস্য দেশ হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ব্রিটেন একাট্টা হলেও অপর দুই স্থায়ী সদস্য রাশিয়া এবং চীন মিয়ানমারের  পক্ষে অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুকে মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ বিষয় বানিয়ে ধৈর্য সহকারে সমস্যা সমাধান খুঁজতে পরামর্শ দিয়েছে। সহিংসতার দায় আরসা জঙ্গিদের ঘাড়ে চাপাতেও দ্বিধা করেনি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান রোহিঙ্গা নির্যাতনকে জাতিগত নিধনের পুঁথিগত উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত করে সহিংসতা অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব সোচ্চার হয়েছেন মিয়ানমারকে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য। অপরদিকে সামরিক জান্তার সঙ্গে পুরোন সম্পর্কে থাকা ভারত, চীন ও রাশিয়া গণতন্ত্রের বিকাশে অং সান সু চিকে শক্তি জোগানোর চেয়ে সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করে নিজস্ব  স্বার্থ উদ্ধারে বেশি মনোযোগী। আশঙ্কা রয়েছে, সামরিক আধিপত্য বিলীন হলে পশ্চিমা দেশের স্বার্থ মিয়ানমারে বেশি জায়গা করে নেবে। মিয়ানমার দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সেতু এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলবর্তী দেশ হিসাবে অধিক গুরুত্বের অধিকারী। চীন এবং ভারতের কাছে সমান আকর্ষণীয়। সংকটের প্রকৃতি ও প্রকার দেখে এটা সবার কাছে সুস্পষ্ট যে, রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির পেছনে মিয়ানমারের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদ্যমান সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির বিভাজন সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে আনার বদলে অং সান সু চি সমঝোতার রাস্তা বেছে নিয়ে অবশেষে গোলক ধাঁধায় নিপতিত হয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশ চীন, ভারত ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার জোট আশিয়ানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও উদ্যোগ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত সম্মানজনকভাবে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পশ্চিমা বিশ্বের উৎসাহী তৎপরতা ও তুরস্কের অতি সংবেদনশীলতাকে চীন ও ভারত সন্দেহমুক্ত ভাবে দেখছে না। দ্বিপাক্ষিক ভাবে সমাধান খুঁজে বের করার নীতি অনুসরণের পক্ষে অবিচল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পর্ষদের মাধ্যমে বহুপাক্ষিক সমাধানে আগ্রহী নয়।  শরণার্থী সংকটের বাস্তবতা অস্বীকার না করে মানবিক ত্রাণ সহায়তা দিয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। অপরদিকে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপে সম্মত হচ্ছে না এবং মিয়ানমারের সপক্ষে যুক্তি তৈরি করে চলেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। বাণিজ্য অবরোধের হুমকি দিয়ে সেনা জেনারেলদের প্রবেশে অবরোধ দিয়ে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের প্রতি তাদের অবস্থান দৃঢ়। জাতিসংঘ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সমানভাবে তত্পর থাকলেও মিয়ানমার তার অবস্থান থেকে নড়ছে না। বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগে রয়েছে সমানভাবে। রোহিঙ্গাদের জিহাদি মতাদর্শে অনুরুক্তি রয়েছে বলে ভারত ঝুঁকি এড়াতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে অনাগ্রহী। অতীতের ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বিতাড়িত করার উদ্যোগে এখনো অবিচল। মিয়ানমারের বাসিন্দাদের নিজ বাস্তুভিটাতে ফেরত পাঠানো সমস্যা সমাধানের মূল লক্ষ্য হলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার গতি ফেরত আসবে। রোহিঙ্গা সংকট অঞ্চলের কৌশলগত বন্ধুদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে এবং অনেক দিন ধরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোকে ধাক্কা দিয়েছে। ফলে অঞ্চলের ভূ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের অবকাশ সৃষ্টি করেছে। পুরনো সমীকরণে পাকিস্তান একা হয়ে পড়েছিল, মিয়ানমারকে ঘিরে নতুন সমীকরণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চীনা আধিপত্য বাড়বে এবং ভারত কোনঠাসা হয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের হারানোর কিছু না থাকায় জন্ম নেওয়া প্রতিশোধের আকাঙ্খার তীব্রতাকে  কাজে লাগিয়ে জিহাদী যুদ্ধে নামানো অনেকটাই সহজ। আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের নজর ঘুরিয়েছে ইতোমধ্যেই। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও অধিকারসহ স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি ধরে রাখায় অপশক্তি জায়গা করে নিতে পারছে না। তবুও বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে রয়েছে সমানভাবে। ঝুঁকি সুদূর চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে সময় নেবে না বেশি। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের খাতিরে নিরাপত্তা ঝুঁকিকে খাটো করে দেখলে অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। চীন, ভারত ও আসিয়ান জোটের ইতিবাচক উদ্যোগ রোহিঙ্গা সংকট সমাধান দ্রুত বয়ে আনতে সমর্থ হবে, কোশলগত সম্পর্ক অটুট রাখবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতাকে গতিশীল করবে।

লেখক : স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশে¬ষক। ইন্সটিটিউট অফ কনফ্লিক্ট, ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস (আই ক্লাডস) এর নির্বাহী পরিচালক

আরো খবর...