রাসূল নামে কে এল

॥ নাজীর আহ্মদ জীবন ॥

“আকাশের চাঁদ আজ ম্লান হ’লো। লজ্জা পায়ে গেল রবি। পৃথিবীতে এলেন আজ “সামসুজ্জোহা”। আল্লাহর নূরে জ্যোতি।”

১২ই রবিউল আউয়াল; ফাতেহা দোয়াজদাহ্ম বা ঈদে মিলাদুন্নব্ ী১২ শরীফের  জন্মদিন। তাই ১২ রবিউল আউয়াল ১২ শরীফের হৃদয়। ১২ শরীফের ইমাম (র) এর কথায় Ñ“এ ঈদ শ্রেষ্ঠ ঈদÑআমাদেরÑনবীর ঈদ মুক্তির ঈদ”। প্রেমময় আল্লাহ তাঁর অফুরন্ত সৌন্দর্য ও পবিত্রতা নিয়ে তখন ছিলেন অপ্রকাশ্য। রাসূল (সাঃ) বলেন;আর তখন আল্লাহর আরস আযীম (সিংহাসন) ছিল পানির উপর। (মুসলিম শরীফ)

এরপর এ মহাপ্রেম নিজেকে প্রকাশের ব্যাকুলতায় একটা মহা হাঁক মারেন। ফলে  তার পবিত্র  সিনা হতে একটা সবুজ নূর বিচ্ছুরিত হলো, তা থেকে সৃষ্টি হলো মোহাম্মদ (সা) এর নূর। তাই বারো শরীফের মিলাদ মাহফিলে বলা হয়ঃ ‘নূর সে মাবুদ সিনা, মেশক্ সে বেহ্তার পাসিনা।’ বারো শরীফের মহান ইমাম হযরত শাহ্ সূফী মীর মাস্উদ হেলাল (র) বলেছিলেন, “আল্লাহ যখন নিজকে প্রকাশে ইচ্ছা করলেন তখন সর্বপ্রথম তার নূর হতে সৃষ্টি করলেন মোহাম্মদ (সা) কে। তারপর নূর এ মোহাম্মদ কে চার ভাগ করে এক ভাগ দিয়ে আল্লাহর আসন, এক ভাগ দিয়ে আত্মার জগৎ, এক ভাগ দিয়ে ভাগ্য লিপি; অবশিষ্ট ভাগ দিয়ে মোহাম্মদ (সা) কে সৃষ্টি করে রাখেন। নূরে মোহাম্মদকে ময়ুর আকৃতিতে  বহু হাজার বছর উর্ধ্বজগতে রাখেন। তাই সাধক “কৃষ্ণ” ময়ুরের পাখনা তার মাথার মুকুটের চারদিকে সম্মানের সাথে রাখতেন। এর বহুবছর পর নূর আকৃতির মোহাম্মদ (সাঃ) হতে সমগ্র বস্তুজগত সৃষ্টি করেন। তাই মোহাম্মদ (সা) এর নূর হতে আমাদের আত্মা তৈরী। তাই আমরা সবুজ টুপি পড়ি। আজ বিজ্ঞান বলছে , “আলো আর পানি হতে সবকিছু সৃষ্টি।”

আল্লাহ বলেন; “আমি তোমাদের কাছে পাঠিয়েছি আমার নূর ও সুস্পষ্ট কিতাব এখানে নূর বলতে রাসূল (সা) কে বোঝানো হয়েছে। (সূরা মায়েদা)

আর রাসূল (সাঃ) বলেছেন ঃ আমি আল্লাহর নূরে, আর সমগ্র সৃষ্টি আমার নূরে।” আল্লাহ ও  রাসূলের গুপ্ত ভেদ প্রসঙ্গে ইমাম (র) বলেছিলেনঃ বলা হচ্ছে; কুলুবুল মোমেনিান আরশিল্লাহ, আবার বলা হচ্ছে; আত্মাটা মোহাম্মদ (সাঃ) এর নূরে  তৈরী; বিষয়টা কি দাঁড়াচ্ছে? আবার বলা হচ্ছে আল্লাহর আশন অর্থাৎ আরশে কুরশী রাসূলের নূরে তৈরী এর অর্থ কি? এসব রহস্য করে রাখা হয় না কি?” আল্লাহ তার ফেরেশ্তারা এ নবীর উপর দরুদ ও সালাম পড়েন এবং বিশ্বাসীদেরকে পড়তে বলেছেন।” (সূরা   আহ্যাব) আল্লামা কাযী আয়ায লিখেছেনঃপ্রমাণ রয়েছে যে, চন্দ্র, সূর্য, কিংবা কোন বাতির আলোতে তাঁর নূরী সত্তার ছায়া পতিত হতো না এবং তার নুরী দেহ মোবারকে মশা-মাছি বসত না। রাসূল এমন এক অদ্বিতীয় মহান সত্তা যার কোন বিকল্প নেই, ছিল না হবে না। রাসূলকে জানতে চিনতে ও সেভাবে ভালবাসতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী দিয়ে হবে না। হবে না কেবল মাদ্রাসার ডিগ্রী। কারণ তিনি এমন একজন নবী, রাসূল, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ও মারেফাত এর জনক যাকে বই কিতাব পড়ে জানা যাবে না তো বটেই, পৃথিবীর কোন নবী রাসুলও ওলী আল্লাহ ও সাধক তাঁকে পরিপূর্ণ রূপে জানতে ও তাঁর সৃষ্টি রহস্য ও মারেফাত এর অবস্থা জানতে সক্ষম হবেন না। তার দ্বিতীয়তঃ তাঁকে ইব্রাহিমী দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

রাসূল নিজেও বলেছেন ঃ “জানো হে আবু বকর! আমার রহস্য এক আল্লাহ ছাড়া কেহ জানে না।” আরও বলেছেন ঃ “আল্লাহর সাথে আমার এমন এক গোপণ সম্পর্ক আছে যেখানে কোন উচ্চ স্তরের ফেরেস্তা ও নবীর প্রবেশাধীকার নেই।”

মহর্ষি ব্যাসদেব মোহাম্মদ (স) এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন তার ভবিষ্যপূরাণ গ্রন্থে। ঈসা নবী তার জাতিকে আহ্মদ নামে এক রাসূল উনার পরে আমার সু সংবাদ দিয়েছেন। সাধক বুদ্ধ বলেছেন, আর একজন মৈত্রেয় বা শান্তি ও করুণার বুদ্ধের কথা।

আহ্মদ ও মোহাম্মদ উনার জাতি নাম। আহ্মদ তাঁর আধ্যাত্মিক রূপ মোহাম্মদ রূপে প্রকাশ। আহমদ রূপে তিনি স্রষ্টার আদি থেকে সমগ্র বিশ্বের নবী। বিস্মিল্লাহর ‘মীম’ই হলো আহ্মদে বিদ্যমান ‘মীম’। আহ্মদ রূপ বিশ্ব নবুয়তেরে বা নূরে মোহাম্মদী থেকে নূরের বিকিরণ মালা ছড়ায়ে যতদুর বিস্তৃত জগত তৈরী হয়েছে, সেই মহা বিস্তৃত রাজত্বকেই ‘মীম’ রাজত্ব বলে। এই মীম রাজত্বরূপ মহাআলোক জগত যে কত বড় কোন সৃষ্টিকুল তা নির্ণয় করতে সক্ষম নয়। তবে সমগ্র ভূ-মন্ডল এবং নভোমন্ডল  যেন এই সুবিশাল রাজত্বের পাজরে এক বিন্দু পানির ন্যায়। (দ্রঃ দৈনিক ইনকিলাব ১২-১২-২০১৩)। এ জগত আলো আর রূপে রহস্যময়। এর ধারক বাহক ও প্রকাশক হলেন রাসুল (সা)। সৃষ্টি আদি থেকে উর্দ্ধ জগতে তিনি আহমদ রূপ বিশ্বনবী রূপে প্রকাশিত, প্রচারিত বিভোষিত। তাই পৃথিবীতে তাঁর আগমন না হলেও প্রত্যেক নবী রাসূল  মোহাম্মদ (সাঃ) কে বিশ্বনবী রূপে চিনতে পেরেছেন, মহান আল্লাহ প্রদত্ত উর্ধ্ব জগতের জ্ঞান থাকার জন্য। তাই রাসূল (সা) বলেছেনঃ পৃথিবীর মত আরো অনেক জগত আছে যেখানে তোমাদের নবীর মত  নবী, আদমের মত আদম, নূহের মত নূহ; ইব্রাহিমের মত ইব্রাহিম এবং  ঈসার মত ঈসা আছে।” (দ্রঃ কিতাবুল আস্মা ওয়াস সিফাত)

কবি নজরুল তাই বলেছেন ঃ ‘আহ্মদের” মীমের পর্দা উঠায়ে দেখ মন; আহ্াদ সেথায় বিরাজ করে হেরে গুনীগণ।’ আল্লাহ প্রেমের গভীরতায় রাসূল বলেছেন ঃ “আনা আহ্ম্মাদুন বিলা মীম” Ñ আমি মীম ছাড়া আহ্মদ। আল্লামা ইকবাল বলেছেন ঃ প্রেমময় দৃষ্টিতে তিনিই আদি, তিনিই  অন্ত, তিনিই কোরআন, তিনিই ফোরকান, তিনিই ইয়াসিন, তিনিই তোয়াহ।” হাদীসে কুদ্সীতে আল্লাহ বলেন; “তোমার মত এত প্রিয় করে কাউকে সৃষ্টি করিনি। তোমার মাধ্যমে আমি দান করি; তোমার মাধ্যমে গ্রহণ করি এবং তোমার মাধ্যমেই শাস্তি দিয়ে থাকি।” (দৈনিক ইনকিলাব ১২Ñ১২Ñ২০১৩)

১২ শরীফ তথা মোহাম্মদী দরবার রাসূল (সা) এর যা কোন সাধক পান নাই। হযরত শাহ সূফী মীর মাস্উদ হেলাল (র) ১৯৭১ এ প্রথম ফাতেহা শরীফ বা ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করেন। রাসূর (সাঃ) তাবুকে সালাত আদায় করে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেনঃ “সবচেয়ে উত্তম তরীকা আমার তরীকা”। ১২ শরীফ তথা মোহাম্মদী তরীকা তাঁরই।

আসেন, আমরা ১২ শরীফে এসে মোহাম্মদী তরীকা গ্রহণ করি আর আত্মার মুক্তির পথ ও পাথেয় করে যায়। আল্লাহ আমাদের দয়া করুন। আমীন –

 

আরো খবর...