মৌ চাষে লাভ বেশি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ “মৌমাছি, মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি দাঁড়াও না একবার ভাই। ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময় তো নাই।” মৌমাছি আর মধু চিনে না এমন মানুষ হয়ত এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। জন্মের পর নানা-নানি কিংবা দাদা-দাদিরা মুখে মধু দেয়নি এমন লোকও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মধু খুব উপকারী একটি খাদ্য, পণ্য ও ওষুধ। আদিকাল থেকেই মানুষ প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে, মিষ্টি হিসেবে, চিকিৎসা ও সৌন্দর্য চর্চাসহ নানাভাবে মধুর ব্যবহার করে আসছে। শরীরের সুস্থতায় মধুর উপকারিতা অনেক। একটা সময় ছিল যখন সুন্দরবনের মধু ছাড়া অন্যভাবে মধু আহরণ ভাবা যেত না, কিন্তু সময়ের পালাক্রমে মধু হয়ে উঠেছে শিল্প। দেশে বাণিজ্যকভাবে মধু চাষাবাদ শুরু হয়েছে। সরিষা, ধনিয়া, তিল, কালিজিরা, লিচুর ফসলে বাক্স বসিয়ে মধু আহরণ করে মৌ চাষীরা । বাংলাদেশে বছের মধু উৎপাদন প্রায় ৬ হাজার টন। বাংলাদেশে একজন মানুষ বছরে মাত্র ১০ গ্রাম মধু খেয়ে থাকে। কিন্তু বিশ্বে অস্ট্রেলিয়া ১১০০ গ্রাম, জার্মানি ৬০০ গ্রাম, স্পেন ৬০০ গ্রাম এবং ইতালি ৫০০ গ্রাম করে মধু খেয়ে থাকে বছরে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে  দেশে মধু উৎপাদিত হয় ৭৪৩ টন, আর মৌচাষ থেকে উপকৃত  মোট কৃষকের সংখ্যা ৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭ জন। এই খাতে স্থায়ী চাষী রয়েছে ২ হাজার ৪৭৫ এবং ভাসমান ২ হাজার ৩২ জন। এই দেশে মৌ বাক্স রয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৬৭০টি। মধু উৎপাদনের শতকরা ২০ ভাগ সুন্দরবন থেকে আহরণ করা হয়ে থাকে। মধু চাষ করে অতিসহজের যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারে। এ খাতে বিনিয়োগ করতে বেশি অর্থেরও প্রয়োজন পড়ে না। সরিষার ফুলের বাগানে মৌ বাক্স স্থাপন করে অতিসহজেই মধু আহরণ করা যায়। মৌচাষে এবং মধু খেতে আগ্রহ তৈরি করতে কৃষি মন্ত্রণালয় ঢাকঢোল পিটিয়ে রবিবার থেকে রাজধানীর খামারবাড়ির আ.কা.মু গিয়াস উদ্দিন মিলকি অডিটরিয়াম চত্বরে তিন দিনব্যাপী জাতীয় মৌমেলা ২০১৯ অনুষ্ঠিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হর্টিকালচার উইংয়ের সহকারী পরিচালক একরাম হক বলেন, ‘ মৌমেলার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মধুর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এই মেলার ফলে যেমন মৌচাষীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে তেমনি মধু খাওয়ার পরিমাণও বেড়ে যাবে।’ মেলাতে ৬০টি স্টল বসেছিল। হরেকরকমের মধু নিয়ে মেলায় এসেছিল মৌচাষী এবং খামারিরা। মেলায় সরিষা ফুলের মধুর আধিপত্য  বেশি লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া কালিজিরা, লিচু এবং সুন্দরবনের মধু দেখতে পাওয়া যায়। মধুকে পরিচিত করাতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এদেশে মানুষের মধুর প্রতি তেমন কোন আগ্রহ নেই। তাই সেভাবে উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়নি। আর নামেমাত্র রফতানি হচ্ছে কিছু মধু। বিসিকের মৌচাষ প্রকল্প পরিচালক খন্দকার আমিনুল জামান বলেন, শতকরা ৭০ ভাগ আমদানি এবং ৩০ ভাগ মধু উৎপাদন করে এদেশে মধুর চাহিদার যোগান দিয়ে থাকে। গত বছর মধু রফতানি না করলেও এ বছর রফতানি করা সম্ভব হবে। দেশে মধুর যে চাহিদা তার শতকরা ১০০ ভাগ উৎপাদন করা সম্ভব। বাজারে দেশী মধু থাকলেও এই দেশের এলিট শ্রেণীর মানুষ বিদেশী মধু খোঁজ করে। সে মধু ভেজাল কিনা সেটাও তারা পরীক্ষা করে না। তারা সব সময় দেশী মধুর ভেজাল খুঁজে বেড়ায়।  দেশী পণ্যকে সবার আগে মূল্য দিতে হবে। এদেশের মধুর গুণগত মান অনেক ভাল। আমিনুল জামান বলেন, তিন ক্যাটাগরিতে ৬ হাজার ব্যক্তিকে মৌচাষে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। মৌচাষ প্রকল্পে ২  কোটি টাকা  মৌচাষের সম্ভাবনাময় ৫০টি জেলায় মৌ খামারিকে ঋণ দেয়া হয়েছে।  মৌচাষের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা সরলসুদে ঋণ দেয়া হয়ে থাকে। মধুর প্রকারভেদে এক কেজি মধুর উৎপাদন মূল্য ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা হয়ে থাকে এবং বিক্রিমূল্য ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা হয়ে থাকে। ভরা মৌসুমে একটি মৌ বাক্স থেকে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ কেজি মধু আহরণ করা যায়। সরিষা ফুলের মাধ্যমে সবচেয়ে  বেশি মধু সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। জাতীয় মৌমেলার তাওহিদ এন্টারপ্রাইজের স্টলের কর্ণধার মোর্শেদ হাসান বলেন, ৫ বছর আগে শখেরবশে সরিষার জমিতে  মৌচাষ করি। আর আজ ওই মধুই আমার প্রধান ব্যবসা। ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিবছর ৩ লাখ টাকার মতো আয় হয়ে থাকি। মোর্শেদের মতো বহু মানুষ আজ মৌচাষ করছে। এতে যেমন খাঁটি মধু পাওয়া যাচ্ছে তেমনি দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। একজনের  মৌচাষে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২ থেকে ১০ জনের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হচ্ছে। জাতীয় মৌমেলার মাধ্যমে মৌচাষের যাবতীয় তথ্য জানা যাচ্ছে। মেলায় ঢাকার বাইরের বাসিন্দা শরিফ মিয়া মৌচাষ জানার জন্য এসেছিলেন। মৌচাষের যাবতীয় তথ্য জানার পর শরিফ বলেন, মেলায় আসা আমার সফল হয়েছে। আমি মৌচাষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। গ্রামে ফিরে যাওয়ার পর সরিষা ফুলে মৌচাষ শুরু করব।

 

আরো খবর...