মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং কিছু কথা

॥ মোঃ আসলাম হোসেন ॥

বর্তমান উন্নত বিশ্ব ব্যবস্থায় একথা অস্বীকার করার উপায়  নেই যে,  মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা একটি উন্নত-সমৃদ্ধ ও সুশিক্ষিত জাতি গঠনের অন্যতম হাতিয়ার। মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। একটি জাতির শিক্ষিত শ্রেণির জনগণই সেই জাতির জীবনমান উন্নয়নে, দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন। দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশ্বের দরবারে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। জাতিকে স্বপ্ন দেখান, পথ দেখান, সামনে এগিয়ে  নেন। আর তাইতো এই শিক্ষিত-উন্নত জাতি গঠনে মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

এক সময়কার অবহেলিত, শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ স্বাধীনতার মাত্র সাতচল্লিশ বছরে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে উন্নতির শিখরে দ্রুত বেগে ধাবমান। বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা আজ সারা বিশ্বকে দারুণভাবে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তবে আমাদের এই অগ্রযাত্রার পথটি কখনোই মসৃণ ছিলো না। সময়ে সময়ে নানান প্রতিবন্ধকতা ও চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমরা আজ একটি মর্যাদাজনক অবস্থানে এসে পৌঁছেছি। আমরা পর্যায়ক্রমে  মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের হার হ্রাস, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার কমানো, বাল্যবিবাহ নিরোধ, প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া  রোধসহ জাতিসংঘ ঘোষিত এমডিজি এর অনেক টার্গেট অর্জনে সক্ষম হয়েছি। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও মানসম্মত করার জন্য সরকার নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।

অপার সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অগণিত নজির আমাদের সামনে আছে। হেনরি কিসিঞ্জারের সেই তলাবিহীন ঝুড়ির যুগ বহু আগেই পিছনে ফেলে এসেছি আমরা। আমাদের এখন আছে শক্তপোক্ত নিরেট ঝুড়ি। আর তার মধ্যে আছে প্রভূত সব অর্জন। আমরা এখন উন্নয়নের পথে বীর দর্পে হাঁটছি। এখানে আমি অর্থনৈতিক সব অর্জন, মানব-উন্নয়ন সূচকে উন্নতিসহ অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নতির কথা বলছি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, প্রাথমিক শিক্ষায় অর্জনের কথা বলছি। বিগত বছরগুলোতে আমরা প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়ে অনেক অনেক দূর এগিয়েছি। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে স্বাধীনতার পরপরই প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৯৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করে দেওয়া হয়। এরপর নব্বইতে এসে জমতিয়েনের সবার জন্য শিক্ষা ঘোষণাকে গ্রহণ করে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়তে থাকে হু হু করে। দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে যায় শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ে উপচে পড়ে ছাত্র-ছাত্রী। সারা বিশ্ব অবাক হয়ে  দেখে আমাদের সাফল্য। সংখ্যার বিচারে ভর্তির হার ৯৭% শতাংশ ছাড়িয়েছে বলে মত দিয়েছেন কোন কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। শতভাগ ভর্তি হয়েছে কোন কোন এলাকায়। এ এক বিস্ময়কর অর্জন। আমরা এক্ষেত্রে জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ধরে ফেলি সময়ের আগেই। আজকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে  ছেলে-মেয়েকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সকলেরই রয়েছে সমান অধিকার। এটুকু করতে যেয়ে আমাদের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হয়েছে যথেষ্ট। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা শৌচাগার বানানো হয়েছে। পর্যাপ্ত আসবাবপত্র দেয়া হয়েছে শ্রেণিকক্ষে। সেই সাথে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোরও যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। এখন গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর ভবনটি হচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। প্রাকৃতিক দুর্যোগেও প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি কোথাও কোথাও হয়ে উঠে দুর্গতদের নির্ভয় আশ্রয়স্থল।

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, সবার জন্য শিক্ষা এসবই ছিল আমাদের মূল চালিকা শক্তি। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। উপরন্তু আমরা শিক্ষার্থীর পরিবারকে বিশেষ উপবৃত্তি দিচ্ছি। একটা সময় শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচীও চালু ছিল। এই প্রকল্পগুলি বিশ্বে অনুকরণীয়। এর সাথে আমরা প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিচ্ছি। এ বছর সাড়ে তিন কোটিরও  বেশি বিনামূল্যের পাঠ্যবই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে সরবরাহ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের বিনিয়োগ উত্তরোত্তর বাড়ছে। কারণ গবেষণায় বলে শিক্ষায় বিনিয়োগ পাঁচগুণ সাফল্য আসে। অন্য কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এত বেশি রিটার্ন দিতে পারে না।

এত এত সাফল্যের সাথে কিছু ব্যর্থতাও আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে। যে বিষয়টা প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছে তা হলো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। আমরা জানি যে, আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করায় হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ শিশু বিদ্যালয়ে চলে আসে। আমরা ততটা প্রস্তুত ছিলাম না এই বিরাট কর্মযজ্ঞে। ক্ষেত্র পুরোপুরি প্রস্তুত না করেই বীজ লাগানো হয়েছিল। ফলে আমাদের একটা আশংকা রয়ে গেছে যে ফসল ভালো হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা কাঙ্খিত মানের হচ্ছে না। আমরা এলক্ষ্যেও কাজ করে যাচ্ছি নিরলসভাবে। বেশ অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে এজন্যে। শুধুমাত্র শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য নেয়া এসব কারিগরি প্রকল্পগুলো কাজ করছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প নামে ধাপে ধাপে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হয়েছে। চতুর্থটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।

বর্তমানে আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এসডিজি এর লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে সফল হওয়া। সেই লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এসডিজি এর সতেরোটি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে চতর্থটি হলো ‘কোয়ালিটি এডুকেশন বা মানসম্মত শিক্ষা’। ‘মানসম্মত শিক্ষা’ কথাটিকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। একেক শিক্ষাবিদ একেকভাবে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা এবং দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে সংজ্ঞায়িত করার  চেষ্টা করেছেন। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠি দিয়ে এটা নিরূপণ করা ঠিক নয়। কেউ অসম্ভব মেধাবী হলে কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করলে সে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে বলা যায় না। মূলত মানসম্মত শিক্ষা অনেকগুলো বিষয়কে একীভূত করে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে আমরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে সরকার প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে এক্ষেত্রে দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে আরো যুগোপযোগী উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার। আর সামগ্রিক বিবেচনায় এক্ষেত্রে সফল হওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং যা ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের উন্নত দেশ হবার স্বপ্ন পূরণে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। সরকারের চেষ্টা এবং পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগ ছাড়া এক্ষেত্রে সাফল্য আসা কঠিন।

একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালিত করেন। শিক্ষক নিয়ম-মাফিক পাঠদান করেন। শিক্ষার্থীগণ সেই পাঠ অনুসরণ করে কাঙ্খিত যোগ্যতাটি অর্জন করে। আর এই যোগ্যতা হচ্ছে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় আমরা যতকিছু বিনিয়োগ করি তার মূল লক্ষ্যই এই যোগ্যতা অর্জন বিষয়টি নিশ্চিত করা। ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের রয়েছে একটি বিশাল প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার। প্রায় পাঁচ লক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী-শিক্ষক এই মহান পেশায় নিয়োজিত। এত বড় একটি পরিবারকে সফলভাবে পরিচালনা করা একটি দূরহ কাজ। মহান শিক্ষকদের পাঠদান কার্যক্রম নিবিড় করা তাই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন করার জন্য আমাদের সকলের সহযোগিতা বাঞ্ছনীয়। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সাথে যারা জড়িত আছেন তাদের মূল দায়িত্বই হবে  শ্রেণিকক্ষে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাগণও এ বিষয়টি নিশ্চিতকরণে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেন। কার্যকর এবং টেকসই শ্রেণি পাঠদানের সকল প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সহযোগিতা করা তাই সকলের দায়িত্ব এবং কর্তব্য। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপই হবে শ্রেণি পাঠদান নিশ্চিতকরণ।

মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সরকারের গৃহীত উদ্যোগসমূহের পাশাপাশি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চালুকৃত মিড ডে মিল কার্যক্রম, আনন্দ পাঠের আসর, মেধা পুরস্কার ও সেরা উপস্থিতি পুরস্কারের প্রচলন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড শিশুদের বিদ্যালয়ের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট করে তুলছে। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুকরণ বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রমকে অনেকখানি সহজ করেছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাবৃন্দের বিভিন্ন ধরণের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতা শিশুর পাঠদান কার্যক্রমকে আনন্দদায়ক ও শিশুর  মেধা বিকাশের প্রক্রিয়াকে অধিক ফলপ্রসু ও ত্বরান্বিত করছে। এছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে কাবস্কাউট কার্যক্রম, ক্ষুদে ডাক্তার কার্যক্রম, স্টুডেন্ট কাউন্সিল কার্যক্রম ও স্টুডেন্ট ব্রিগেড কার্যক্রম শিশুদের মাঝে নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক মনোভাব, সমাজ সচেতনতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করছে।

মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষাই জাতির ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে পারে। শিক্ষাই হলো সুষম উন্নয়নের পূর্বশর্ত। শিক্ষাটা যদি মানসম্মত হয় তবে এই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে উন্নত জাতি গঠনের। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করেই সে লক্ষ্যে এগিয়ে যাব আমরা। দেশমাতৃকার কাছে এটা হোক আমাদের দৃপ্ত অঙ্গীকার।

লেখক ঃ জেলা প্রশাসক, কুষ্টিয়া।

আরো খবর...