মাদক, ডাকাতি, ছিনতাইসহ সবধরনের অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপে বদলে গেছে কুষ্টিয়ার চিত্র

এসপি তানভীর আরাফাতের তিন মাসের অ্যাকশন
নারী সহায়তা কেন্দ্র প্রত্যয়ী চালু, যানজট নিরসনসহ নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ গত ১৫ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দেন এসএম তানভীর আরাফাত। যোগ দিয়ে তিনটি এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নামেন। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করা, মাদক নির্মূল করা ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের মূলউৎপাটন করা। তিন মাসেই কুষ্টিয়ার আইন শৃংখলার চিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে মাদক, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের লাগাম অনেকটাই টানতে পেরেছেন। পাশাপাশি সাধারন মানুষের কল্যাণে এ পুলিশ সুপার নিয়েছেন বিশেষ উদ্যোগ। যা জেলা জুড়ে আলোড়িত হয়েছে। অত্যন্ত কর্মঠ, ন্যায়পরায়ন ও মিষ্টভাষী এ পুলিশ সুপারকে পেয়ে উচ্ছসিত জেলার মানুষ। দিন ও রাতের বড় একটি সময় তিনি ব্যয় করেন জেলার মানুষের জন্য।

কুষ্টিয়া জেলাকে অপরাধীমুক্ত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এছাড়া সাধারন জনগন যাতে কোন ধরনের হয়রানী ছাড়াই সেবা পাই সেদিকেও মনোযোগ দিয়েছেন সদ্য যোগ দেয়া পুলিশ সুপার তানভীর আরাফত। তারই উদ্যোগে ইতিমধ্যে পুলিশ লাইনে প্রথমবারের মত অসহায় নারী ও শিশুদের জন্য নারী সহায়তা কেন্দ্র প্রত্যয়ী চালু করা হয়েছে। এছাড়া জেলা থেকে মাদক ব্যবসা ডাকাতি, ছিনতাইসহ যাবতীয় অপরাধ দূর করতে নেয়া হয়েছে বিশেষ পদক্ষেপ।

কুষ্টিয়া জেলাকে অপরাধ প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহিৃত করা হয়। বিশেষ করে বর্ডার থাকায় সহজেই এখানে অস্ত্র, মাদকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর জিনিস আসার সহজ রাস্তা রয়েছে। এ কারনে দৌলতপুর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম ছিল কিছূদিন আগেও। তবে বর্তমানে পুলিশের শক্ত পদক্ষেপের কারনে মাদকের দৌরাত্ম কমেছে আগের যে কোন সময়ের তুলনায়। আর পুলিশ সুপার হিসেবে যোগ দিয়ে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাত। এমনকি পুলিশ সদস্যেদের মধ্যে যাদের গায়ে গন্ধ আছে তাদেরও ইতিমধ্যে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর জেলার বড় বড় মাদক ব্যবসায়ীরাও ইতিমধ্যে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। পুলিশের অভিযানের মুখে অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছে। এদিকে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকায় আগের যে কোন সময়ের তুলনায় মাদকের প্রকোপ কমেছে।

কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ নাসির উদ্দিন বলেন,‘ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামার পর শহর থেকে মাদকের প্রকোপ অনেকটাই কমেছে। মাদকের প্রকোপ কমে যাওয়ার মামলার পরিমানও আগের থেকে কমেছে। তবে অভিযান চলমান আছে। অনেক মাদক ব্যবসায়ী পলাতক আছে। পুলিশ সুপার স্যারের নির্দেশ মাদকের বিষয়ে কোন আপোষ করা চলবে না। তাই এটাকে কঠোরভাবে দেখা হচ্ছে।

ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, মাদক উদ্ধারে যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি কাজ হচ্ছে জেলায়। মাদক উদ্ধার বেড়েছে। মামলাও দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। তবে মাদক ব্যবসায়ীরা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে কোণঠাসা। তারা পলাতক। অনেকে কুষ্টিয়া ছেড়ে চলে গেছে। যারা এখনো লুকিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করছে তাদের যে কোন মূল্যে আইনের আওতায় নিয়ে আনা হবে।’

মাদকের পাশাপাশি জেলা থেকে ডাকাতি, অস্ত্র উদ্ধার ও ছিনতাই দুর করতেও জেলা পুলিশ থেকে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। কয়েকটি উপজেলা ডাকাতের উপদ্রুপ থাকলেও এখন তাদের অবৈধ কার্যক্রম গুটিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে ডাকাত ও পুলিশের ত্রিমুখী বন্দুকযুদ্ধে বেশ কয়েকজন ডাকাত নিহত হয়েছে। অনেকে জেলা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

এছাড়া সম্প্রতি আন্তঃজেলা মটর সাইকেল চোর চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ চক্রটি কুষ্টিয়াসহ আশেপাশের জেলা থেকে মটর সাইকেল চুরি করে আসছিল। এটা পুলিশের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন সবাই।

সাধারন নিপীড়িত অহসায় নারীদের সেবা দিতে পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাতের উদ্যোগে প্রথম বারের মত কুষ্টিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে প্রত্যয়ী নারী সহায়তা কেন্দ্র। তিনি নিজেই এটার পৃষ্ঠপোষক। ইতিমধ্যে এ কেন্দ্র থেকে সেবা পেয়েছেন বেশ কয়েকজন অসহায় নারী।

গত ১৯ নভেম্বর শাহনাজ পারভীন নামের সীমা নামের এক নারী অভিযোগ করেন স্বামী  তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করে প্রতিবন্ধী শিশুসহ তাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। এরপর তিনি নারী সহায়তা কেন্দ্র প্রত্যয়ীতে অভিযোগ দেন। অভিযোগের পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নুরানী ফেরদৌস দিশা সীমা ও তার স্বামী তলব করে মীমাংসা করে দেন। প্রত্যয়ীর মাধ্যমে নতুন করে সংসার শুরু করেছেন সীমা।

এর আগে ২ ডিসেম্বর  স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকের নির্যাতনের ফারিয়া হুসনা নুপুর। স্বামী শফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। দুই বছরের প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে প্রত্যয়ীতে আসেন ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়া হয়। এখন তারা আবার সংসার করছে। শুধু সীমা ও নুপুরই নয় তাদের মত অনেকেই ন্যায় পাচ্ছেন প্রত্যয়ী থেকে। প্রত্যয়ী এখন অসহায় নারীদের কাছে ভরসা ও আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নুরানী ফেরদৌস দিশা বলেন, ‘প্রতিনিয়ত অসহায় নারীরা আমাদের প্রত্যয়ীতে আসছে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের পাশে দাঁড়াতে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অসহায় নারী সেবা পেয়েছে। তারা এখন ভাল জীবন যাপন করছে।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম বলেন,‘ প্রথমবারের মত পুলিশ সুপার স্যারের উদ্যোগে এ ধরনের সহয়তা কেন্দ্র চালু হয়েছে। এখানে নারীসহ অসহায় যে কোন মানুষকে সেবা দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে সহায়তা কেন্দ্র থেকে বেশ কিছু ভাল কাজ হয়েছে।

জেলা পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগের যে কোন সময়ের চেয়ে জেলা পুলিশের কাজে গতি এসেছে। থানাগুলোও সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে। নিরীহ কোন মানুষ যাতে হয়রানী না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে পুলিশ সুপার কাজ করছেন এবং সবাইকে বিষয়টি মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। এতে করে সাধারন মানুষের পুলিশের প্রতি আস্থা বড়াছে।

শহরে বালুবাহি ট্রাক যাতে চলতে না পেরে সে ব্যাপারেও পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে বালুবাহি ট্রাক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের মানুষ এ জন্য সাধুবাদ জানিয়েছেন পুলিশ সুপারকে। যানজট নিরসনের জন্যও উদ্যোগ নিচ্ছেন পুলিশ সুপার। শুধু সাধারন মানুষের জন্য নয় পুলিশের কোন সদস্য অবসরে গেলে খালি হাতে বাড়ি যেত। টাকা পয়সা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। কুষ্টিয়ায় যোগ দিয়েই অবসের যাওয়া কয়েকজন সদস্যের হাতে তাৎক্ষনিক অর্থ তুলে দিয়ে নজির স্থাপন করেন তিনি। এতে প্রতিটি সদস্যরা খুশি হন।

জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘জনগনের শান্তির জন্য পুলিশ কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। বর্তমান পুলিশ সুপার তানভীর আরাফত জনগনের জন্য জনবান্ধব পদক্ষেপ নিয়েছেন। এতে করে সাধারন মানুষ ভাল আছে। মাদকের প্রকোপ কমেছে আগের তুলনায়। এছাড়া অসহায় মানুষের জন্য যে সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে এটা ভাল উদ্যোগ।’

পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাত বলেন,‘ জনগনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের কাজ। তাই প্রতিটি কাজকেই আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে থাকি। জেলার মানুষ কিসে ভাল থাকবে সেদিকে ভেবে আমরা কাজ করছি। জেলায় কোন ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক কারবার থাকবে না। আমরা কাজ করছি। জেলার মানুষ সুফল পাচ্ছে। পুলিশের সদস্যকেও ছাড় নেই মাদকের বিষয়ে।

জনগনের সহযোগিতা পেলে যে কোন ভাল কাজ করা সম্ভব। ইতিমধ্যে নারী সহায়তা কেন্দ্র চালু করেছি। মানুষ সুফল পাবে। সারা জেলায় যাতে মানুষ পুলিশের কাছ থেকে  হয়রানীমুক্ত সেবা পাই সেদিকে লক্ষ্য রেখে কাজ করে যাচ্ছ্ ি। মানুষের কথা বেশি বেশি শুনতে হবে। তাহলে মানুষের সমস্যা বুঝতে পারব। তাই আমি আসার পর বেশি বেশি মানুষের কথা শোনার চেষ্টা করি।’

আরো খবর...