মাটির স্বাস্থ্য ও অধিক ফসল উৎপাদনে ন্যানো ফার্টিলাইজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ বিশ্বের সর্বাধুনিক ন্যানো টেকনোলজির সাহায্যে দেশের বিজ্ঞানীরা ‘ন্যানো ফার্টিলাইজার’ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার  ক্ষেত্রে এটিকে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের (বিসিএসআইআর) বিজ্ঞানীরা ‘ন্যানো ফার্টিলাইজার’ তৈরির পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনে যাওয়ার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে এর গবেষণা কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ন্যানো টেকনোলজি বিশ্বের অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র প্রযুক্তি যা সহজেই ফসলের মূলে প্রবেশ করে তার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে। এর ব্যবহারে তৈরি সার ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এলিমেন্ট সার। আগের দিনে মানুষ বাড়িতে যে সব আবর্জনা থাকত, সেগুলোকে এক জায়গায় জমা করত। গরুর  গোয়াল থেকে যেসব গোবর বা গৃহপালিত পশুপাখির বিষ্ঠা আসত,  সেগুলোকে পচিয়ে জমিতে দিত, তারপর ভালো ফসল হতো। ষাটের দশকের পর সার যখন বাজারে ইউরিয়া, নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশ আসে, তখন সার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফসল উৎপাদন বাড়া শুরু হলো। ন্যানো পার্টিকেলের আকার অণুর চেয়ে সামান্য বড়। এটি ন্যানোমিটার দিয়ে পরিমাপ করা হয়। ১ ন্যানোমিটার সমান টেন টু দি পাওয়ার মাইনাস ৯ মিটার বা ১ বিলিয়ন অফ এ মিটার। বস্তুকে ভেঙে যখন অতটা ক্ষুদ্রতর পর্যায়ে নেওয়া হয়, তখন তার কার্যক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যায়, অনেকটা পারমাণবিক শক্তির মতো। বিসিএসআইআরের কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগে ন্যানো ফার্টিলাইজার তৈরির বিষয়ে গবেষণায় অনেক দূর এগিয়েছেন। আসুন, জানা যাক ন্যানো ফার্টিলাইজার কীভাবে কাজ করে? এটা এমন একটি সার যেখানে ফসলের প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদানকে অনেক কম মাত্রায়, একসঙ্গে মিশিয়ে উপাদানগুলোকে কম্প্যাক্ট করে পলিমারাইজড করা হয়। ফলে স্থায়িত্ব বেড়ে যায়। ফসলের গাছ দ্রুত এটা নিতে পারছে। এতে লাভ হচ্ছে একবার সার ব্যবহার করে দুই ফসল ফলানো যাচ্ছে। কেননা আমাদের দেশে এক বছরে প্রায় দুই বা তিনটি ফসল হয়। এখন ফসলের জন্য একাধিকবার সার দিতে হয়, এতে আনুপাতিক হারে মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে। আবার এমোনিয়া আকাশে উড়ে বায়ুমন্ডল দূষিত হচ্ছে। কৃষককে কিন্তু এগুলো কিনতে হচ্ছে। ভর্তুকি থাক আর যা-ই থাক, তারপরও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তাহলে উপায় কী? উপায় হচ্ছে এই ন্যানো ফার্টিলাইজার। ন্যানো ফার্টিলাইজারের মাধ্যমে কম্প্যাক্ট নাইট্রোজেন, ফসফেট, পটাশ কিংবা অন্যান্য খাদ্য উপাদান পলিমারাইজড করে, গাছের  গোড়ায় দিলে একবার ব্যবহার করে কমপক্ষে দুটি ফসল ফলানো সম্ভব। এটা আট মাস পর্যন্ত রাখা যায়। তাহলে ফার্টিলাইজারে কিন্তু নতুন টেকনোলজি আসছে। এটা একটা বিষয়। দ্বিতীয়টি হলো অ্যাপ্লিকেশনের দিক দিয়ে  বৈচিত্র্য আসছে। আমাদের দেশের কৃষক নাইট্রোজেন ফসফেট কিনে নিয়ে যায় বস্তা ধরে। তিনটি বস্তা নিয়ে ক্ষেতের পাশে একটা চট বিছিয়ে নিল। তার ওপর ঢেলে দিল। তারপর হাত দিয়ে মেশানো শুরু করল। এখন একটি ফসফেটের দানা একটি ইউরিয়ার দানার চেয়ে অনেক বড়। আবার একটি ইউরিয়ার দানা ফসফেটের দানার চেয়ে অনেক ছোট। আর পটাশিয়ামের দানা ক্রিস্টাল। তিনটিকে মেশানো হলো। ছড়ানোর সময় কী হলো, বড় দানাটি আগে হাতে আসবে। তাহলে যে এলাকায় বড় দানাটি পড়ল, সেখানে ফসফেট বেশি পড়ল। তারপর আরেক পাশে ইউরিয়া বেশি পড়ল। পরের পাশে পটাশিয়াম বেশি পড়ল। একই ক্ষেতের মধ্যে, অর্থাৎ একজন কৃষকের  ক্ষেত যদি বিশ শতকের হয়, তার মধ্যে যদি তিন ভাগের এক ভাগে ফসফেট  বেশি পড়ে, তারপর তিন ভাগের আরেক ভাগে ইউরিয়া বেশি পড়ে এবং তিন ভাগের অপর ভাগে পটাশিয়াম বেশি পড়ে, তাহলে কী হবে? ফলনের তারতম্য হবে। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, চা বাগানের গাছগুলো আলাদা আলাদা থাকে। গাছের গোড়ায় যদি ৫০ গ্রামের গ্রানয়েল (ন্যানো ফার্টিলাইজার) দিয়ে দেওয়া হয়, সেটা চায়ের যে লাইফ সাইকেল আছে অর্থাৎ উৎপাদনের সময়টা সাত আট মাস, এই পুরো সময়টা চা উৎপাদন করা যাবে। চা বাগানে সার ছড়িয়ে দিলে বৃষ্টি হলে পানিতে গড়িয়ে নিচে চলে যায়। অনেক সময় লিচিং হয় না, মাটিতে মেশে না। সে ক্ষেত্রে গাছের  গোড়ায় ফার্টিলাইজারটা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না। এই ন্যানো ফার্টিলাইজার চা বাগানে অনেক বেশি দিতে হবে না, বেশিবারও দিতে হবে না। ফলনও ভালো পাওয়া যাবে। এতে একদিনে একজন শ্রমিক এক একর জমিতে সার ছিটাতে  যে পরিমাণ খরচ হয়, তার অনেক কম খরচ হবে, বাড়তি লেবার লাগবে না,  তেমনি বাড়তি সারও লাগবে না।

লেখক ঃ কৃষিবিদ এম আবদুল, লিয়াজো অফিসার, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

আরো খবর...