ভোটারের লক্ষ্য স্থির করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে

॥ এ কে এম শাহনাওয়াজ ॥

নির্বাচন এখন দোরগোড়ায়। জাতীয় নির্বাচনে ভোটারের নানা রকমফের থাকে। যারা দল অন্তঃপ্রাণ, তারা দলের মার্কায় কলাগাছ দাঁড়ালেও সেদিকে তাকান না। তাকান মার্কার দিকে। সেখানেই ছাপ মারেন। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে এসব ভোট দিয়ে চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না।

কোনো দলের প্রতি মোহগ্রস্ত নয়, তবে আদর্শ ও ঐতিহ্যের বিচারে কোনো কোনো দলকে একশ্রেণীর ভোটার ভোট প্রদান করেন। অমন দল কিছুটা এগিয়ে থাকে। প্রাচীনত্বের বিচারে ঐতিহ্যিক না হলে নতুন কোনো দল যে ভোটারের আস্থা অর্জন করতে পারে না, এমন নয়।

কতটা সততা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে দল নিজেকে উপস্থাপন করেছে, সেটিই বড় কথা। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কেএসপি) তো নবীন দল ছিল। তবুও বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের ভালোবাসা পেয়ে অল্প সময়েই জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছিল কেএসপি।

আবার ঐতিহ্যবাহী দলও নিজ আচরণে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে নিমিষেই অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। এভাবে দীর্ঘ ঐতিহ্যে লালিত জনপ্রিয় মুসলিম লীগের পতন আমাদের দেখতে হয়েছে।

তবে বর্তমান সময়ের রাজনীতিতে অধিক জনসংখ্যার বাংলাদেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার পর একটি বড় সংখ্যক নবীন ভোটার যুক্ত হয়েছে। এ নবীনরা বয়সের ধর্ম অনুযায়ী স্বার্থবাজ আর দলবাজ বড়দের মতো দলীয় বলয়ে আটকে যায় না বলে মুক্তচিন্তায় ভোট দেয়।

যে দলের আদর্শ আর নির্বাচনী ইশতেহার আকৃষ্ট করে এবং নিজেদের স্বপ্নপূরণের অঙ্গীকার দেখতে পায়, সেদিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ভোটাররাই হল জয়-পরাজয়ের আসল নির্ধারক।

আমরা ২০০৮-এর নির্বাচনের কথা মনে করতে পারি। আওয়ামী লীগের দিন বদলের কথা, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্র“তি আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করেছিল। অন্যদিকে বিএনপির ইশতেহার ছিল অনেকটাই গতানুগতিক।

উপরন্তু যুদ্ধাপরাধীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা নির্বাচনের মাঠে ছিল। এর সঙ্গে ছিল সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ। তাই নতুন ভোটারদের পাশাপাশি নারী ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে এসেছিল। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার তাদেরও আকৃষ্ট করেছিল। এ কারণে নেতাদের ধারণার চেয়েও বেশি ভোট ও আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ।

এবারও নতুন ভোটাররা একই ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। কিন্তু এ শক্তিকে নিজেদের আস্থায় রাখার জন্য তেমন পরিকল্পনা কি বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো নিতে পেরেছে? বড় দলগুলো মার্কা দিয়ে নিজেদের পরিচিত করাতে এতটাই ব্যস্ত যে, মার্কা তরুণ ভোটারদের জন্য কতটা জরুরি; তা বিবেচনা করছে না।

পরিচয়ের তিলক হিসেবে মার্কা তো লাগবেই। এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন মার্কাধারীর পরিচয়। প্রথমবার ভোট দিতে গিয়ে এ নবীন ভোটারের বড় অংশ কিন্তু তার প্রার্থীকে বিচার করবে। রাজনীতি অঞ্চলের মানুষরা এ সত্যটিকে মানতে চান না যে, মার্কা দেখে অন্ধের মতো সবাই এখন আর ভোট দেয় না; নবীন ভোটাররা তো নয়ই।

এ সত্যটি অনেক ভোটারকে পীড়া দেয় যে, বড় দলগুলোর সামনের সারির ব্যক্তি পূজারি নেতাদের দাপটে দলের ত্যাগী নেতারা নিজ দলে যোগ্য জায়গা পাননি বহুদিন। দলের ভেতর ‘গণতন্ত্র চর্চার’ পরিবেশ থাকে না বলে দলীয় কর্মীদের ভোটাধিকারের সুযোগও থাকে না। তাই সুবিধাবাদী আর সুবিধাভোগীরাই দাপটে নিয়ন্ত্রণ করে দল। এ কারণে আমাদের বড় দলগুলো জনগণের মনোরঞ্জনের বদলে ক্ষমতার লক্ষে পৌঁছার জন্য নানা কূটকৌশল গ্রহণে সিদ্ধহস্ত হন বেশি।

ক্ষমতা দখলের জন্য তথাকথিত নির্বাচনের বৈতরণী পাড়ি দিতে টাকার খেলা একটি বড় জায়গা করে নেয়। আর একে ঘিরেই দলীয় দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে; নির্বাচনী খেলা খেলতে বিশাল বাজেট করতে হয়। আর সে অর্থ সংগ্রহের জন্য হাঁটতে হয় ঘাট-আঘাটায়। ফখরুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুদকের অভিযোগে প্রকাশিত বড় নেতানেত্রীদের অপ্রদর্শিত বিশাল আয় তো অনেক ক্ষেত্রে দলীয় ফান্ড তৈরিরই কার্যক্রম ছিল।

এভাবেই প্রকৃত রাজনীতিবিদদের বদলে বণিক আর আমলারা মনোনয়ন পেয়ে থাকেন। একই কারণে পেশিশক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে দলে। পাঁচমিশালি হয়ে যেতে থাকে দল। এমপি হয়ে যাওয়া বণিক রাজনীতিকদের অনেকেই সংসদ আলোকিত না করে সুদে-আসলে নির্বাচনী ব্যয় আর দলীয় চাঁদা উশুল করতে ব্যক্তিগত বাণিজ্য এবং তদবির বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকেন।

বড় মুনাফার দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন তারা। জনগণের জন্য আইন প্রণয়নের ভূমিকা রাখার সময় কোথায় তাদের! এমপির রাবার স্ট্যাম্পটি বাণিজ্যের পুঁজি হিসেবে অনেক যতেœ তুলে রাখেন স্যুটের পকেটে। প্রশাসনিক কূটকৌশল আর দুর্নীতির মারপ্যাঁচ জানা আমলা এমপির অনেকে নিজ প্রতিভা প্রয়োগ করেন দলে ও এমপি হিসেবে ব্যক্তিগত জীবনে।

নির্বাচন সমাগত। কিন্তু শহর থেকে গ্রাম- কোথাও তেমন উৎসবের আমেজ নেই। সব দলের স্লোগানে জনপদগুলো মুখরিত হতে দেখছি না। জানিনা, এ অসুস্থ বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত শাসক দলকে স্বস্তি দেবে কিনা! মানুষের প্রত্যাশা ছিল দলগুলো ঘোষণা দেবে এখন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সবসময় নির্বাচনী এলাকার মানুষ কাছে থেকে দেখতে পাবে।

তাদের কাছে পৌঁছতে চেলা-চামুন্ডার কাছে ধরনা দিতে হবে না। সংসদ সদস্যরা এখন থেকে পদবি আর ক্ষমতা দিয়ে বিত্ত বানানোর যন্ত্র তৈরি না করে নিজেদের সমাজকল্যাণের কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেবেন। তারা প্রতিশ্র“তি দেবেন প্রভাব প্রয়োগ করে এখন থেকে স্থানীয় শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর ‘কূটরাজনীতি’ প্রবেশ করিয়ে পরিবেশ বিষময় করে তুলবেন না।

তিক্ত অভিজ্ঞতার পথ মাড়িয়ে মানুষ এমন আশাও করেছিল, দলগুলো থেকে ঘোষণা আসবে- তারা আর কোনো ছুতোনাতায় সংসদ অকার্যকর করবেন না; বিরোধী দলে থাকলেই সংসদ লাগাতার বর্জনের উৎসবে মেতে উঠবেন না। সংসদীয় যুদ্ধ যা করার তা সংসদের ভেতরেই করবেন।

রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য জনস্বার্থবিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ করবেন না। প্রকৃত অর্থে জনস্বার্থের বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রশ্ন না থাকলে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়- এমন কর্মসূচি গ্রহণ না করার ঘোষণা আসবে দলগুলো থেকে।

এবার বড় দলগুলোর ইশতেহার খুব যে চমক দিতে পেরেছে তেমন নয়। যেমনটি মহাজোট পেরেছিল ২০০৮ সালে। আমাদের মনে হচ্ছে, পাঁড় দলীয় ভোটার ছাড়া সাধারণ ভোটাররা এখনও লক্ষ্য স্থির করতে পারছে না। মনোনয়নপত্র বিক্রির পর থেকে এখনও বিএনপি নেতাদের মুখে একটি কথা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে, তারা নির্বাচন করছেন- নির্বাচনে জিতে তাদের নেত্রী বেগম জিয়াকে আর দন্ডিত প্রবাসী নেতা তারেক রহমানকে মুক্ত করতে। সাধারণ মানুষের কথা ততটা বলছেন না।

সাধারণ ও নবীন ভোটাররা কি কোনো দলের নেতানেত্রীদের মুক্ত করার দায় নিয়ে ভোট দেবেন! তা-ও এসব নেতানেত্রী যদি রাজনৈতিক মামলায় দন্ডিত হতেন। এরা সবাই দুর্নীতির মামলায় দন্ডিত। এদের ভাষ্যে আরও একটি ঔদ্ধত্য রয়েছে। আদালতের দীর্ঘ বিচার সূত্রে এরা দন্ডিত।

এখন নির্বাচনে জিতে এসব নেতাকে মুক্ত করার অর্থ হচ্ছে, আইনের শাসনকে ঘোষণা দিয়ে অবজ্ঞা করা। দলমুক্ত ভোটারদের কাছে এমন দম্ভ ভালো লাগার কথা নয়। অন্যদিকে নিবন্ধন হারানো ও আদালতে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীকে ধানের শীষে নির্বাচন করতে দিয়ে ভোটারের সামনে নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে একদা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ হিসেবে দাবিদার সাবেক কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষমতার আস্বাদ পাওয়ার আকাঙ্খায় জামায়াত-বিএনপি প্রযোজিত ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করে ধানের শীষের বিএনপি দলটিকে বারোমিশালি বানিয়ে ছেড়েছে। সাধারণ এবং নতুন ভোটাররা এদিকে আকৃষ্ট হবে কিনা, সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

এসব বিচারে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কিছুটা এগিয়ে থাকার কথা। কিন্তু এখানেও ভোটার দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে। আওয়ামী লীগের শাসনের বিগত দশ বছরে তারা দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন করেছে। উন্নয়নের গতি এখনও সচল। তবুও তারা স্বস্তি পাচ্ছে না। টাকার পাহাড় গড়া দুর্নীতিবাজ নেতানেত্রীদের চারপাশে দেখতে পাচ্ছে। গুম-খুন আর বিরোধীদল দমনের কু-রাজনীতির চর্চা এরা দেখছে। অতি দলীয়করণ ও দলীয় সন্ত্রাস দেখে সাধারণ ভোটাররা আতঙ্কিত হয়েছে। এসব কারণে ভোটের মাঠে ভোটারের লক্ষ্য স্থির করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এসব বাস্তবতার কারণে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাফল্য দেখানোর পরও নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের শারীরিক ভাষায় শঙ্কাগ্রস্ত দেখা যাচ্ছে। এটি এসব নেতিবাচক বাস্তবতার পীড়ন। নির্বাচনের মাঠে দাঁড়ানোর আগে এ সত্যটি নিয়ে কেউ ভাবেন না। ক্ষমতায় আসার পর একেকজন লাগাম ছাড়া হয়ে পড়েন।

ধরাকে সরা জ্ঞান করেন। পাঁচ বছর পর যে আবার জনগণের কাছে আসতে হবে, এ সত্যটি বিবেচনায় রাখেন না। না হলে একজন ভোটারকে যদি প্রশ্ন করা হয়, বিএনপি জোটকে কি গুণের কারণে ভোট দেবেন? অর্থাৎ বিএনপির দীর্ঘ শাসনামলে জনগণের স্বার্থে মহৎ কাজ ক’টি করেছেন, এর কি তেমন পরিসংখ্যান দিতে পারবেন কেউ? অন্ধকার হাতড়েও কি কোনো মুক্তা খোঁজা যাবে!

আওয়ামী লীগ সরকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নতি, ডিজিটাল অগ্রগতি, সামাজিক উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা ও এসবের বাস্তবায়ন- এ ধারার জনকল্যাণমুখী কাজে কি বিএনপি তুলনায় আসতে পারবে? গুম, খুন, দলীয় সন্ত্রাস আর দুর্নীতি বিএনপি আমলে কি কম হয়েছে?

দুই বৃহৎ দলের এ ধারার অন্যায়গুলো কাটাকাটি করলে আওয়ামী লীগ তো এগিয়েই থাকে। তবুও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভেতরে ভোটের মাঠে এক ধরনের আতঙ্ক প্রকাশ পাচ্ছে কেন? এটিই হচ্ছে মনোজগতে আত্মপীড়নের কষাঘাত।

সুশাসনের পথ তৈরি করার পরিবেশ ও যোগত্যা এবারের আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে থাকলেও দুর্নীতিবাজ-দাম্ভিক নেতাকর্মীদের সহযোগিতার অভাবে শেখ হাসিনার সরকার সে পথে হাঁটতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ক্ষতটিই ভোটের মাঠে পীড়িত করছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে।

ইশতেহারে এবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দুর্নীতি কমিয়ে আনার অঙ্গীকার রয়েছে। গত নির্বাচনের ইশতেহারে রাখা প্রতিশ্র“তির অনেকটা পালন করে দলটি কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। একইসঙ্গে আমরা চাইব একটি ভারসাম্যমূলক সংসদ হোক। ক্ষমতার দাপটে স্বেচ্ছাচারী হয়ে যাওয়াটা যে কতটা দুর্ভাগ্যজনক, তাতো এদেশের মানুষ কম দেখেনি!

লেখক ঃ অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরো খবর...