ভেষজ বাগানে বিপুল সম্ভাবনা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ পৃথিবীর সব উদ্ভিদেরই ঔষধি বা ভেষজ গুণ রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা ২০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিশ্বব্যাপী ভেষজ ঔষধের বাজার দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করছে। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে ভেষজের চাহিদা বাড়ছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে। পাশাপাশি ভেষজ উপাদানের চাহিদা আমাদের দেশে গত ৫ বছরের তুলনায় পাঁচগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধের জন্য ভেষজ উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীলতা চিরায়ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর শতকরা ৭০ থেকে ৯০ জন লোক ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে রোগ সারায় ও প্রতিরোধ করে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করছে। ইউনানি, আর্য়ুবেদীয়, অ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজিসহ সব ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০৫০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেষজের বাণিজ্য হবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের।
চাহিদা বাড়ছে দেশে
ঔষধশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও বেড়ে চলেছে। ভেষজ উৎপাদনে চমৎকার সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিদ্যমান। ভেষজ উৎপাদন উপযোগী উর্বর জমি, পর্যাপ্ত পানি ও অনুকূল আবহাওয়া। দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ থাকলেও ঔষধশিল্পে বর্তমানে ১০০ ধরনের ওষুধ উদ্ভিদ থেকে দেড় শতাধিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ ভাগ এখনো ঔষধি উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। উপাত্ত বলছে পৃথিবীর ৩৩ শতাংশ ওষুধ ভেষজ উদ্ভিদ থেকে তৈরি হচ্ছে। অণুজীব উদ্ভূত ৬০ শতাংশ অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুত হয় ভেষজ উদ্ভিদ থেকে। রাশিয়ায় প্রস্তুত ও ব্যবহৃত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের শতকরা ৪৭ শতাংশের বেশি ভেষজ উদ্ভিদ থেকে তৈরি করা হয়। আশার খবর হলো- অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারের কথা বিবেচনা করে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ ও উৎপাদন শুরু হয়েছে। ইউনানি, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিউটি পার্লারেও প্রসাধন শিল্পে এখন প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উপাদান ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে জানা গেছে- বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার উদ্ভিদের মধ্যে ৬০০ প্রজাতি ঔষধি বা ভেষজ উদ্ভিদ।
ভেষজের আন্তর্জাতিক বাজার ঃ ভেষজ উদ্ভিদ প্রধান আমদানিকারক দেশগুলো হচ্ছেথ যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তান, কোরিয়া। বর্তমানে বিশ্বে ভেষজ বাজার ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ১.৩ ও জার্মানিতে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ভেষজ ওষুধ বিক্রি হয়। ভেষজ উদ্ভিদ রপ্তানি করে চীন প্রতি বছর আয় করে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভারত ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১ হাজার কোটি রুপি এবং দক্ষিণ কোরিয়া ২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বে শুধু ঔষধি উদ্ভিদের বাজার রয়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই এখন ভারত ও চীনের দখলে।
ওষুধ ও প্রসাধন সামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজ সামগ্রী আমদানি করা হয়। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ঔষধশিল্পে বর্তমানে যে পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয় তার ৭০ ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। ডেবটেকের জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৪২২টি আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি প্রতিষ্ঠান ওষুধ উৎপাদনে ঔষধি উদ্ভিদ ব্যবহার করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, চীন, জাপান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় সব দেশেই ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

আরো খবর...