‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ খুব দ্রুত প্রজননক্ষম ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ নামে পরিচিত জাতের ছাগল। আকারে ছোট হলেও এ জাতের একটি ছাগল ১২ মাসে গড়ে ১৫ কেজি ওজন হয়। অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের খাদ্য খেলেও এই ছাগল থেকে পাওয়া যায় উন্নতমানের মাংস। প্রতি বছর একটি ছাগল দু’বার করে গড়ে ২ থেকে ৪টি বাচ্চা দেয়। লাভজনক বিধায় ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ উৎপাদনে নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগলের জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন গবেষণা’ শীর্ষক এ প্রকল্প কমিউনিটিভিত্তিক বাস্তবায়ন হলে দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ৪৬ কোটি ৩৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হবে ঢাকার সাভার, ময়মনসিংহ সদর, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও বান্দরবান। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, টেকসই উন্নয়নে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ নামের এ সম্ভাবনাময় জেনেটিক সম্পদের জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও উন্নয়ন জরুরি। এ প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন এলাকায় কমিউনিটিভিত্তিক ছাগল উৎপাদন মডেল তৈরির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণা অবকাঠামো তৈরি এবং গবেষণা পরিচালনার জন্যই প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটির আওতায় ব্ল্যাক বেঙ্গলের বাচ্চা উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রাণীটির জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হবে। মাঠ পর্যায়ে নিউট্রিশন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্রিডিংয়ের কার্যক্রমও চলবে। এ বিষয়ে বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এবারই প্রথম কমিউনিটিভিত্তিক ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল উৎপাদন করা হবে। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে এ জাতের ছাগল ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, আমরা গবেষণা করে দেখেছি বান্দরবানে যে জাতের ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল বেড়ে উঠছে একই জাতের ছাগল রংপুরে টিকতে পারবে না। তাই সারা দেশে কমিউনিটি ভিত্তিক ছাগল উৎপাদন করা হবে। এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি তৈরি করে এ জাতের ছাগলের প্রসার ও উৎপাদন বাড়ানো হবে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটিতে নিউক্লিয়াস প্রজনন কেন্দ্র, এলাকাভিত্তিক ছাগলের খাদ্য হিসেবে চারণ ভূমি, এলাকা উপযোগী হাইড্রোফনিক (মৃত্তিকাবিহীন জল চাষ বিদ্যা) ফডার ঘাস উৎপাদন, ছাগলের জন্য ফিডিং সিস্টেমের উন্নয়ন করা হবে। জোনভিত্তিক ছাগলের কমিউনিটি গঠন, কমিউনিটি খামারিদের উৎপাদন ও প্রজনন তথ্য রেকর্ডিং সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ, কমিউনিটিতে ফ্রোজেন সিমেন ব্যবহার ও উন্নত প্রজনন সংক্রান্ত প্রযুক্তির (এআই) প্রয়োগ করা হবে। এ ছাড়া কমিউনিটি ও বাণিজ্যিকভিত্তিক খামারিদের মধ্যে নতুন প্রযুক্তির বিস্তার, গণসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচারণা কার্যক্রমও চালানো হবে। দেশে প্রাপ্ত প্রায় ২০ মিলিয়ন ছাগলের প্রায় ৯৩ শতাংশ পালন করেন ক্ষুদ্র এবং মাঝারি পর্যায়ের খামারিরা। তাদের খামারের ৯০ শতাংশই ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগল। দেশে প্রাপ্ত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস যেমন সুস্বাদু, তেমনি চামড়া আন্তর্জাতিকভাবে উন্নতমানের বলে স্বীকৃত। তা ছাড়া ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের প্রজননক্ষমতা অধিক এবং দেশীয় জলবায়ুতে এটি বিশেষভাবে উৎপাদন উপযোগী। এসব গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগলের বাণিজ্যিক উৎপাদন এদেশে এখনো চোখে পড়ার মতো প্রসার লাভ করেনি। এর অন্যতম কারণ ইনটেনসিভ বা সেমি-ইনটেনসিভ পদ্ধতিতে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ ছাগল পালনের ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব। এসব বাধা দূর করতেই কমিউনিটিভিত্তিক ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ উৎপাদনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে দেশের বিভিন্ন উপযোগী এলাকায়। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষকে এই প্রকল্পের আওতায় এনে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে।

আরো খবর...