বুদ্ধি-বিবেক-যুক্তি জাগ্রত হোক

॥ মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ॥

আর মাত্র সপ্তাহ দুয়েক পরই দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটার থেকে শুরু করে প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সহকারে দিনটির অপেক্ষায় আছে। নির্বাচন কমিশনেরও চোখে ঘুম নেই। এ ক’দিন তারা ঘুমাতে পারবেনও না।

কারণ প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই থেকে শুরু করে নির্বাচনের পরদিন পর্যন্ত তাদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় মিলবে না। এরই মধ্যে যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে কমিশনকে বেশ সমালোচনা ও ঝক্কি-ঝামেলা সহ্য করতে হয়েছে। শত শত প্রার্থী প্রার্থিতা বাতিলের কবলে পড়ায় বিভিন্ন মহল থেকে নানা কথা উঠেছে এবং ওইসব প্রার্থীর প্রায় সবাই আপিল করায় তা নিষ্পত্তি করতেও কমিশনকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

ইংরেজিতে থ্যাংকলেস জব বলে যে কথাটি আছে, আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে তা কতটা প্রযোজ্য তা জানি না। তবে তারা যে কস্মিনকালেও সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন না, সে কথা বলাই বাহুল্য। ইতঃপূর্বেও প্রতিটি নির্বাচনের আগে বা পড়ে কোনো না কোনো দল বা গোষ্ঠী নির্বাচন কমিশনের ওপর কুপিত হয়েছে! এ অবস্থায় কমিশন যে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবে, সে আশা করাটাও বৃথা। তবে কাজের মাধমে কমিশনকে অবশ্যই দল বা গোষ্ঠী নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।

অন্যথায় দেশের মানুষের এত উৎসাহ-উদ্দীপনার নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নির্বাচন কমিশনের প্রতি কথাবার্তা, আচার-আচরণে সহনশীল হতে হবে। কমিশনের দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা প্রদান করতে হবে।

কথায় কথায় তীব্র সমালোচনা বা আক্রমণাত্মক কথাবার্তা নির্বাচন কমিশনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই একতরফা সমালোচনাও এক্ষেত্রে কাম্য নয়। মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচন কমিশনকেও দেশের আইন ও নিয়মাচার মেনেই কাজ করতে হয় এবং তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ আইন ও নিয়মের বাইরে তাদের কিছু করার নেই।

একেকটি দলের একেকজন প্রার্থী ব্যাংক ঋণ নিয়ে তা পরিশোধের কথা না ভেবে নির্বাচনের সময় হলেই নমিনেশনের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বেন, আবার কেউ কেউ অন্ধের মতো ফরম পূরণ করে কমিশনে দাখিল করবেন আর সেসব কারণে তাদের প্রার্থিতা বাতিল হলে ‘কিয়া হুয়া কিয়া হুয়া’ জিকির শুরু করবেন, তেমনটিও হওয়া উচিত নয়।

সারা জীবন, সারা বছর নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করবেন না, জীবনের কোনো ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারের ধারে কাছে যাবেন না, ব্যাংকে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, ইউটিলিটি বিলে বকেয়া পরিশোধের কথা না ভেবেই নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইবেন আর এসব কারণে প্রার্থিতা বাতিল হলে হইচই-চিৎকার শুরু করে দেবেন, দেশ ও জাতির জন্য এমন সংসদ সদস্যও কাম্য নয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যারা সংসদ সদস্য হতে চাইবেন, তাদের এসব বিষয়ে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

অন্যথায় নির্বাচন কমিশন যদি এসব সঙ্গত কারণে প্রার্থিতা বাতিল করে, সেক্ষেত্রে কারও কিছু বলার থাকবে বলে মনে হয় না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি তুচ্ছ কারণে যেসব প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছিল, সেটাও কাম্য ছিল না। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন আরও সহনশীল হলে এসব নিয়ে এতটা হইচই হতো বলে মনে হয় না।

যদিও পরবর্তী সময়ে সেসব বিষয় সুরাহা করে অনেকের প্রার্থিতা ফেরত দেয়ায় নির্বাচন কমিশন প্রশংসার দাবিদার হয়েছে। অনেকে আবার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে তাদের প্রার্থিতা ফেরত পেয়েছেন। যাক সে কথা। এখন অন্য কথায় আসা যাক।

আমাদের দেশে নির্বাচনের সময়কে একটি উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় সব শ্রেণী-পেশার মানুষই কমবেশি নির্বাচনী দোলায় আন্দোলিত হন। যিনি নির্বাচন করেন, তার পরিবার, আত্মীয়পরিজন, সমাজ ও দল যেমন বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন, তেমনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাইরে থাকা দেশের সাধারণ মানুষও বিষয়টিকে একধরনের আনন্দানুভূতি সহকারে গ্রহণ করেন।

জাতীয় নির্বাচনের এ সময়ে চায়ের দোকানে যেমন আড্ডা জমে ওঠে, তেমনি শহরে-বন্দরে, পাড়া-মহল্লায় এসব নিয়ে শুরু হয়ে যায় আলোচনা, সমালোচনা, গুঞ্জন। আর সেই ফাঁকে চারদিকে নানা ধরনের গুজবও ছড়িয়ে পড়ে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থী ও দলের বিরুদ্ধেও নানা গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে অনেক প্রার্থীর জন্য তা হরিষে বিষাদ হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনেক প্রার্থীও একে অপরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে শুরু করে মারামারি, হানাহানি পর্যন্ত শুরু করে দেন। যুগ যুগ ধরে দেশ ও জাতিকে এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে! এবারের নির্বাচনে এসব ঘটনার প্রাধান্য থাকবে কি না জানি না, তবে স্বাধীনতার এত বছর পর এসবের অবসান হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

সাধারণ মানুষ যেমন জাতীয় নির্বাচনকে গুরুত্ব ও আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীরও মানুষের সে আনন্দঘন পরিবেশ নষ্ট করা উচিত নয়। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও সাধারণ ভোটারদের সেন্টিমেন্টকে গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত।

মোট কথা, নির্বাচনের সময়ে কেউ যাতে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে না পারেন, ভোট ডাকাতি, ভোট চুরি করতে না পারেন, সে দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ পালন করতে পারলে কেবল তখনই আসন্ন নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য শুভবার্তা নিয়ে আসতে পারবে। আর ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি, হানাহানি বন্ধ করতে না পারলে নির্বাচন যে অর্থবহ বা গ্রহণযোগ্য হবে না, সে কথাও অনস্বীকার্য।

এবার লক্ষ করা গেল, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা থেকে শুরু করে গ্ল্যামার জগৎ, ক্রীড়াজগৎ, শিল্পী, ব্যবসায়ী মহলের লোকজন অধিক সংখ্যায় বিভিন্ন দলে ভিড়ে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি এতে দোষের কিছু দেখি না। কারণ এতকাল রাজনৈতিক ক্ষেত্রটি একচেটিয়া যাদের দখলে ছিল, তাদের অনেকেই মেধাহীন, মতলববাজ এবং কায়েমি স্বার্থবাদী। তাই দেশ ও জাতির জন্য সেটা তেমন সুখকর ছিল বলে মনে হয় না।

কারণ রাজনীতিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করে একশ্রেণীর রাজনীতিক শুধু নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছিলেন। দলীয় নামাবলি গায়ে চাপিয়ে, দলের নামে, নেতার নামে স্লোগান দিয়ে মুখে ফেনা তুললেও তাদের অনেকেই দলীয় আদর্শ ও নীতির ধারেকাছে না থেকে রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

গুন্ডামি, মাস্তানি ইত্যাদির মাধ্যমে চর দখলের মতো নির্বাচনী ময়দান দখল করে নির্বাচনে জিতে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, এমনকি ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত হয়ে তাদের অনেকে নিজেরা যেমন কলঙ্কিত হয়েছেন, তেমনি রাজনীতির ময়দানকেও ভালো মানুষের জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন।

এ অবস্থায় যেহেতু একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তি রাজনৈতিক অঙ্গনকে নষ্ট করে দিচ্ছিলেন, তাই অন্য  পেশার মানুষজন- হোন তিনি ব্যবসায়ী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রীড়াবিদ, শিল্পী বা অন্য পেশার কেউ- তারা যদি এসে রাজনৈতিক অঙ্গনকে কিছুটা হলেও পরিচ্ছন্ন করতে পারেন, তাহলে দোষের কিছু আছে বলে মনে হয় না।

কারণ রাজনীতি করে খাওয়া লোকজন- যারা উন্নয়ন কর্মকান্ডের টাকা, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, বাঁধ নির্মাণের টাকা গিলে খাচ্ছিলেন- তাদের হাত থেকেও রাজনীতিকে মুক্ত করা দরকার। অতএব, জনসাধারণ যদি অন্য ট্র্যাকের কিছু প্রার্থীকে নির্বাচন করেন এবং তারা যদি উন্নয়ন কর্মকান্ডের টাকা আত্মসাৎ না করেন, তাহলে রাস্তাখেকো, ব্রিজখেকো রাজনীতিকদের চেয়ে তা ভালো বলেই বিবেচিত হবে। আর এভাবে রাজনীতিতে যদি গুণগত কিছু পরিবর্তন আসে, আসুক না!

কারণ একজন ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ বা এই শ্রেণীর সুশীল চিন্তাধারার সৃজনশীল ব্যক্তি যদি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। যদিও প্রশ্ন থাকে, তারাও আবার একই পথের পথিক হবেন কি না? যদি তা-ই হয়, তাহলে ভবিষ্যতে জনগণই তাদের রাজনীতি থেকে বিদায় করবেন। কিন্তু এরই মধ্যে আমরা যেসব ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পী বা এ জাতীয় সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী পেয়েছি, তারা এসব করেছেন বলে দেখা যায়নি।

এক্ষেত্রে দু-একজন মন্ত্রীর নামও উল্লেখ করা যেত, যারা এসব করেননি। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্তত এই শ্রেণীর নবাগতদের স্বাগত জানানোর পক্ষে। আর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবার সেই কাজটিই বোধহয় একটু জোর দিয়ে করেছে। এখন দেখা যাক ভবিষ্যতে কী ঘটে।

পরিশেষে যেসব প্রার্থী, দল ও জোট নির্বাচনে যাচ্ছে এবং যারা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকছেন, তাদের সবার প্রতি একটি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই আর তা হল : ‘আপনারা সংশ্লিষ্ট সবাই চিন্তা-চেতনায়, মননে-দর্শনে সৎ ও সঠিক পথে থাকুন।’ কারণ এই দেশ, এই মাটি, এই মানুষ অনেক কিছু সহ্য করেছে, করছে!

একজন কৃষক মাটিতে পাটের বীজ রোপণ করে পরিচর্যার মাধ্যমে তা বড় করে আবার পানিতে পচিয়ে রোদে শুকিয়ে পাটকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পর সেই পাট ও পাটজাত দ্রব্য বিদেশে রফতানি হয়। একজন পোশাক শ্রমিক সকাল-দুপুর-রাতে খেয়ে, না খেয়ে কারখানায় শ্রম দিয়ে পোশাক প্রস্তুত করেন এবং সেই পোশাক রফতানি হয়।

একজন ট্যানারি শ্রমিক দুর্গন্ধময় পরিবেশে কাজ করে হাতে-পায়ে-নখে কেমিক্যাল মেখে চামড়ার গন্ধ দূর করে প্রক্রিয়াজাত করার পর তা রফতানি হয়। দেশের যুবক-যুবতীরা পরিবারের সান্নিধ্য ত্যাগ করে বিদেশের মাটিতে, মরুভূমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বিদেশিদের মন জুগিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশে পাঠান।

আর আমরা তাদের সেই সব অর্জিত অর্থ দিয়ে সংসদ চালাই, ট্যাক্স ফ্রি গাড়িতে চড়ি, আবার কেউ কেউ উন্নয়ন কর্মকান্ডের অর্থ পকেটে ঢুকাই, ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করি।

অথচ এসব করতে আমরা বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ করি না। আপনারা জানেন, নতুন প্রজন্মের যুবক-যুবতী সওদাগরি অফিসে দিনরাত পরিশ্রম করে একটু ভালো বেতন পেলেই তারা স্বেচ্ছায় সেই বেতনের অর্থ থেকে আয়কর দিচ্ছেন। একজন রিকশাচালক, ঠেলাগাড়িচালক, দিনমজুর সারাদিন ঘাম ঝরিয়ে কয়টি টাকা রোজগার করে তার শিশুসন্তানকে যখন একটি লজেন্স কিনে দিচ্ছেন, সেক্ষেত্রে তারাও ভ্যাট প্রদান করছেন। হয়তো জানেন বা জানেন না।

কিন্তু তাদের প্রদানকৃত আয়কর ও ভ্যাটের টাকা দিয়েও কিন্তু সংসদ চলে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পান। অতএব, এসব সাধারণ শ্রেণীর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ভাবলে কিন্তু ‘যিনি বা যারা নিঃস্বার্থভাবে অপরকে সুখ দিতে নিজে আনন্দবোধ করেন, কেবল তারাই আসন্ন নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে আসার হকদার।’

আমি এ লেখাটির মাধ্যমে সেই কথাটিই বলার চেষ্টা করছি মাত্র। আর সে অবস্থায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাই নীতিপরায়ণ ও ন্যায়নিষ্ঠ না হলে সুন্দর, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কিন্তু কথার কথাই থেকে যাবে!

পাদটীকায় তাই আবারও বলি, ‘নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবারই বুদ্ধি, বিবেক আর যুক্তি জাগ্রহ হোক।’

লেখক ঃ কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

আরো খবর...