বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার পুতুল নাচ

কাঞ্চন কুমার ॥ পুতুল নাচ। গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য এটি। গানের তালে তালে ঐতিহ্য এবং কাহিনীর সাথে বাদ্যযন্ত্র ও সুরের মোছনায় পুতুলের নৃত্য। গ্রামীণ জনপদে শিশু-কিশোর ও সর্বস্তরের মানুষের বিনোদনে মাধ্যম। পুতুল খেলা শিশুদের কাছে উৎসবের মতো। মেয়ে পুতুলের সাথে ছেলে পুতুলের বিয়ে এ যেন গ্রাম বাংলার সাধারণ রূপ। আর তার সাথে যদি সেই জড় পুতুল নাচে, কথা বলে তাহলে ছোট থেকে বড় সবাই যেন তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুভব করে। বাংলার সংস্কৃতিতে বিনোদনে বড় মাধ্যম এটি। রাত জেগে পুতুল নাচ দেখতে গ্রামীন মানুষ ভীড় করতো এই পুতুল নাচ-গানের আসরে। পুতুল নাচের গল্পে তুলে ধরা হতো সে সময়ের মানুষের ধর্মকথা, নীতিকথা, সুখ-দুঃখ, রঙ্গরস, হাসি-ঠাট্টা ও নিত্যদিনের জীবনাচরণ। কাঠের পুতুল অথবা সোলা দিয়ে পুতুল তৈরী করে, সেটাতে রং তুলির আচড় দিয়ে, বিভিন্ন বর্ণিল সাজে সাজিয়ে বাদ্যযন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে সুতার দিয়ে হেলিয়ে দুলিয়ে নাচায় এই পুতুল নাচের আসরে। তবে কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী এই পুতুল নাচ আজ প্রায় বিলুপ্তির তালিকায় নাম লিখিয়েছে। সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়ার জনপদের বিনোদনে পুতুল নাচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। আজো মাঝে মাঝে কোন বাঙ্গালী অনুষ্ঠানে দেখা মেলে এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ ও গানের আসর। কুষ্টিয়ার“মনহারা” পুতুল নাচের যৌবনে দীপ্তমান কদর থাকলেও আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে আজো বিশেষ কোন আয়োজন ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের বাহক হিসাবে টিপ টিপ প্রদিপের মতো হয়ে বেঁচে আছে দেশের বিখ্যাত পুতুল নাচ “মনহারা” পুতুল নাচ। কুষ্টিয়ার এই “মনহারা” পুতুল নাচ দেখলে সত্যিই যে কারো মন হারিয়ে যায়। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামের মৃত সলিম মালিথার ছেলে আব্দুস কুদ্দুস। জীবনের প্রায় সবটুকু সময় ব্যয় করে দিয়েছেন এই “মনহারা” পুতুল নাচের সাথে। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি এই “মনহারা” পুতুল নাচের দলের হাল ধরে রেখেছেন। আজো দেখে যাচ্ছেন সেই স্বপ্ন। ফিরবে পুতুল নাচের সুদিন। নিজ হাতে এখনো তৈরী করে যাচ্ছেন বিভিন্ন পালার জন্য পুতুল। আব্দুস কুদ্দুস জানান, ১৯৬৫ সালে তখন আমার বয়স ৯-১০ বছর। আমার বাবা খুবই সৌখিন মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে বিভিন্ন গান-বাজনা শেখানোর জন্য পুতুল নাচের “মনহারা” পুতুল নাচের দলে নিয়ে যায়। সেখানে শুকচাঁন মাল নামের একজন ওস্তাদের কাছে নিয়ে যায় আমাকে। আমি তখন দেখতে খুব সুন্দর ছিলাম। সেখানে মাস কয়েক পুতুল নাচের বিভিন্ন গান শিখি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাড়ী পরে পুতুলের সাথে নাচ-গান করি। এরই মধ্যে ওস্তাদের প্রিয় হয়ে উঠি। প্রায় ১৬ বছর আমি পুতুল নাচের আসরে পুতুলের সাথে মেয়ে সেজে গান করি। ৪-৫ দিন অনুষ্ঠান করলে আমি ৫০-১০০ টাকা পেতাম। ১৯৭২ সালে এই “মনহারা” পুতুল নাচের দলটির দায়িত্ব আমি পায়। তখনো ওস্তাদ আমার সাথে থাকতেন। তারপর ওস্তাদ শুকচাঁন অসুস্থ্য হয়ে মারা যান। দলের প্রায় দুর্দিন নেমে আসে। আমাদের “মনহারা” পুতুল নাচের দলে ছিলো ১৪জন সদস্য। এর মধ্যে ১০জন গানের তালে পুতুলকে পরিচালনা করতো। বাকীরা বাদ্যযন্ত্র বাজাতো আর গান গাইতো। ১৯৭৫ সালে আমি হারমনিয়াম বাজানোর প্রশিক্ষন নেয় কুষ্টিয়া শিল্পকলা থেকে। তারপরে দলের দুর্দিন প্রায় কাটিয়ে উঠি। একটা অনুষ্ঠানে গেলে আরেকটি অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেতাম। বেশ ভালোই চলছিলো আমাদের পুতুল নাচ। কুষ্টিয়াসহ বেশ কিছু অঞ্চলে পুতুল নাচ করে বেশ সুনাম অর্জন করি। তিনি আরো জানান, কুষ্টিয়ার বাইরে চুয়াডাঙ্গায় “রাজকণ্যা মনিক মালা”, “সীতার বনবাস”, “রূপবান”, “গরীবের ছেলে”, “গরীবের মেয়ে”, হিংসার পরিনাম” এবং মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নাটোর, রাজশাহী, নড়াইল, ঢাকায় “প্রেম সার্থক” ও “কালো গাজী” এর পুতুল নাচের পালা করেছি। তারপরে ঢাকার শিল্প কলায় “ঘুনাই সুন্দরী” পালা করেছি। এছাড়াও আমি পুতুল নাচে সাপ, নৌকামাঝি, কুমার, মাছ, বাঘ, হুনুমান, হরিন, ঘোড়া প্রভূতি বিষয় নিয়ে গ্রাম্য জীবন ভিত্তিক হাসি-ঠাট্টা ও তামাশা মূলক গল্পে রচিত পুতুল নাচ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্যবার দেখিয়েছি। তিনি আরো জানান, আমার এই “মনহারা” পুতুল নাচে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় “সোনার যাদু” ও “রূপবান”। এছাড়াও “সাগর ভাষা”, “ফেরারী স¤্রাট”, “নাচ মহল”, “ভিখারীর ছেলে” অন্যতম পালা। তিনি আরো জানান, ২০০৭ সালে ঢাকায় শিল্প কলা একাডেমীতে পুতুল নাচ প্রতিযোগিতায় আমি ও আমার দল অংশ গ্রহণ করি। সেখানে সারা দেশের ৪৮টি পুতুল নাচের দলের মধ্যে আমি প্রথম হই। এছাড়া ২০১৩ সালে এবং ২০১৬ সালেও আমি পুরষ্কার গ্রহণ করি।

তিনি আরো জানান, পুতুল নাচ বাংলার মানুষের প্রাচীন একটি ঐতিহ্য। এই পুতুল তৈরী করতে যেমন অর্থের প্রয়োজন তেমনি এই নাচ-গান পরিচালনার জন্যেও অর্থের প্রয়োজন। তবে বর্তমানে অশ্লীল নাচ গানের কারনে এই গান করতে নানান বাধার সম্মুখিন হতে হয়। প্রশাসন আমাদের প্রোগাম করার অনুমতি দেয় না। কারন বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় পুতুল নাচের নামে বিভিন্ন ব্যক্তিরা অশ্লীল নাচ গান করায়। তবে আমাদের এই “মনহারা” পুতুল নাচ দেখতে এখনো অনেক মানুষ ভীড় করে। দলটিতে খুব কষ্টে টিকিয়ে রেখেছি। সরকারী কোন সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া আর কতদিন এভাবে টিকে থাকবে ঐতিহ্যবাহী এই “মনহারা” পুতুল নাচ। তবে আমি যতদিন বেঁচে আছি এই পুতুলের সাথেই জীবনটা কাটিয়ে দেবো। মানুষের মনে একটু আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করবো। মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম জামাল আহমেদ জানান, মিরপুর উপজেলার “মনহারা” পুতুল নাচ জেলার মধ্যে তথা সারাদেশেই বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আব্দুস কুদ্দুস তিনি এই দলটিকে ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন স্থানে গ্রামের মানুষের মাঝে পুতুল নাচের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিনোদন দিচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের পরে সরকারী কোন সাহায্য সহযোগিতা করা সম্ভব কিনা এ ব্যাপারে উর্দ্ধতন সংশ্লিষ্টদের সাথে আমি যোগাযোগ করবো।

আরো খবর...