বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও

দেশে কতরকম দুর্নীতি সংঘটিত হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উত্তোলিত ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার খবরে সারা দেশের মানুষ বিস্মিত হয়েছে। এ ঘটনায় খোদ প্রধানমন্ত্রীও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই বিপুল পরিমাণ কয়লা কোথায় গেল তা পূর্ণ তদন্তের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে খনি থেকে উত্তোলিত ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার আলামত পেয়েছে দুদক। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এদিকে কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়ার ৫২৫ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুত কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে লোডশেডিং বাড়বে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিকল্প উপায়ে দ্রুত বিদ্যুত উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলে একদিকে মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে, অন্যদিকে বিদ্যুতের অভাবে অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের সদ্য অপসৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, উল্লিখিত খনি থেকে ইতিমধ্যে ১১ বছরে ১ কোটি ১০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে সিস্টেম লসের কারণে ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তার বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নটি আসে তা হল সিস্টেম লসের কারণে উত্তোলিত কয়লা নষ্ট হলে কয়লা রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হল না কেন? গত ১১ বছর ধরে কয়লা উধাও হয়ে গেল, আর তা কারও নজরে এলো না? একজন কয়লা ব্যবসায়ীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালে ৩০০ টন কয়লা চুরি হয়ে যায়। এ তথ্য জানাজানি হলে খনি কর্মকর্তারা ৩০০ টন কয়লার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে হিসাব সমন্বয় করেন। আমরা মনে করি, এ রকম অপ্রকাশিত চুরির ঘটনা থেকে থাকলে তা তদন্তে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অপর এক কয়লা ব্যবসায়ীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে আরেক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে কয়লা বিক্রির সঙ্গে কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। এ ব্যবসায়ীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে যখন একাধিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তখন খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা উধাও হওয়ার ঘটনাটি উদ্বেগজনক। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। এসব বিদ্যুত কেন্দ্র পরিচালনার জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করতে হবে। সেই কয়লার অংশবিশেষ যদি হঠাৎ ‘উধাও’ হয়ে যায় তাহলে দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদনে ধস নামবে। এতে দেশ কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা রাতারাতি উধাও হয়ে যায়নি, দীর্ঘদিন ধরেই এটি ঘটেছে। এই বিপুল পরিমাণ কয়লা কী করে উধাও হয়ে গেল- যারা সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন তাদের তা স্পষ্ট করতে হবে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কয়লা উধাও হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটন করতে হবে। এ ঘটনায় দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কয়লার রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

আরো খবর...