বিদেশে পিছিয়ে আছে দেশে উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বাজার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ব্যাপক চাহিদা থাকলেও প্রচারের অভাবে বিদেশে পিছিয়ে আছে দেশে উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বাজার। এখন আবার দেশি জাত নেই বললেই চলে। উন্নত প্রযুক্তির আবিষ্কারের জাতগুলোতে ঝুঁকছে দেশের কৃষক। এ ছাড়া নামিদামি হোটেলগুলোয় স্থান পেয়েছে বিদেশি বাসমতি চাল। বাজারে হরেক রকমের সুগন্ধি চাল থাকলেও তাতে নেই আগের সেই সুঘ্রাণ। ভোজনরসিক থেকে দেশের কৃষক সমাজ সবার কাছেই সুগন্ধি জাতের কালিজিরা, কাটারিভোগ কিংবা চিনিগুঁড়া চাল বেশ পরিচিত। কেননা নানা উৎসবে বাহারি নামের এই চাল দিয়ে পোলাও, বিরিয়ানি, জর্দা, পায়েসসহ নানা পিঠাপুলি তৈরি করে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ধারণা ও প্রচারের অভাবে বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়েছে দেশের জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি ধানের জাতগুলো। তা ছাড়া সময়ের পরিবর্তনে উদ্যোগের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এসব দেশি চালের গর্ব, যা রক্ষার্থে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। উন্নত প্রযুক্তির জাতগুলোতে আরো  বেশি ঘ্রাণ ও স্বাদ সংমিশ্রণ করা দরকার বলেও কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমানে দেশের অনেক জেলায় সুগন্ধি জাতের ধান চাষ হচ্ছে। তবে সেটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে চাষ হওয়া এই চালের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া যা চাষাবাদ হচ্ছে তার মধ্যে উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবিত বিভিন্ন সুগন্ধি ধান। ফলন কম হওয়ায় দেশি জাতগুলো চাষের আগ্রহ নেই কৃষকদের মধ্যে। বিশেষ জাতের ধান থেকে সুগন্ধি চাল তৈরি হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশে বোরো ও আমন দুই মৌসুমে সুগন্ধি ধান চাষ করা যায়। বাংলাদেশে একসময় এলাকাভিত্তিক সুগন্ধি ধান আবাদের প্রচলন ছিল। আবার বহুকাল ধরে দেশের গ্রাম বা শহরে ধনী কিংবা গরিব সবার ঘরোয়া উৎসবে ব্যবহার হয়ে আসছে এই সুগন্ধি চাল। পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে স্থান করে নিয়েছে নামিদামি হোটেল রেস্তোরাঁর মেন্যুতেও। জানা গেছে, কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, চিনি আতপ, বাদশাভোগ, খাসকানী, বেগুনবিচি, তুলসীমালা নামের চালগুলো এখনো বেশ জনপ্রিয় হয়ে আছে বাংলার মানুষের কাছে। তবে দেশের বিভিন্ন  হোটেল বা রেস্তরোঁয় সুগন্ধি বলে যে চাল খাওয়ানো হয় তাতে না আছে ঘ্রাণ না আছে স্বাদ। দেশে প্রধানত দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, পঞ্চগড় ও রাজশাহী জেলায় সুগন্ধি ধান উৎপাদিত হয়। কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, আমন ও  বোরো মৌসুমে সুগন্ধি সরু বা চিকন ধান চাষের উপযুক্ত মৌসুম। কৃষকরা আমন মৌসুমে প্রচলিত জাত কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, চিনি আতপ, বাদশাভোগ, খাসকানী, বেগুনবিচি, তুলসীমালাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি ধান চাষ করে আসছে। জানা গেছে, এসব জাত চাষাবাদে ফলন কম হওয়ায় কৃষকদের আগের মতো আগ্রহ নেই। তবে আশার কথাও শুনিয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কৃষি বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণায় সুগন্ধি ধানের স্বাদ ও গন্ধ অক্ষুন্ন রেখে বিভিন্ন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশ সুগন্ধি ধান উৎপাদনের উপযোগী। এসব জাতের মধ্যে রয়েছে আমন মৌসুমে ব্রি ধান ৩৪, ব্রি ধান ৩৭, ব্রি ধান ৩৮, ব্রি ধান ৭০, ব্রি ধান ৭৫, ব্রি ধান ৮০, বিনা ধান-১৩ ছাড়াও রয়েছে বি ইউ-সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১। বি ইউ-সুগন্ধি হাইব্রিড ধান-১ সুবিধা হচ্ছে আমন ও  বোরো উভয় মৌসুমেও চাষ করা যায়। ব্রি ধান ৩৪ জাতের ধান চিনিগুঁড়া বা কালিজিরার মতোই অথচ ফলন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কৃষকরা এ ধানের আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন। তা ছাড়া আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় এই জাতটি আমনে বন্যাপ্রবণ এলাকায় নাবীতে রোপণ উপযোগী। ব্রি ধান ৭০ ও ব্রি ধান ৮০ আমন মৌসুমের উচ্চ ফলনশীল সুগন্ধি ধান এবং আলোক অসংবেদনশীল। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৫-৫.০ মেট্রিক টন, যা প্রচলিত জাত কাটারিভোগ ধানের চেয়ে দ্বিগুণ। ব্রি ৭০ ধানের চাল দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগের চেয়ে আরো বেশি লম্বা। আর ব্রি ধান ৮০ থাইল্যান্ডের জনপ্রিয়  জেসমিন ধানের মতো, সুগন্ধিযুক্ত এবং খেতেও সুস্বাদু। অন্যদিকে বোরো  মৌসুমে সুগন্ধিযুক্ত আধুনিক জাত হচ্ছে ব্রি ধান ৫০, যা বাংলামতি নামে পরিচিত। হেক্টরপ্রতি ফলন ৬ মেট্রিক টন। বাংলামতি ধান বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন জাতের ধানের চেয়ে দাম অনেক  বেশি হওয়ায় লাভ বেশি হয়। এ জাতের চালের মান, স্বাদ, গন্ধ, বাসমতি চালের মতোই। দিন দিন বিদেশ  থেকে আমদানি করা বাসমতি চালের স্থান দখল করে নিচ্ছে আমাদের বাংলামতি চাল। আমদানি করা বিদেশি বাসমতি চালের চেয়ে দাম অনেক কম, দেশি অন্যান্য সুগন্ধি জাতের ধানের চেয়ে ফলন বেশি হওয়ায় বাংলামতি ধান চাষে কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। ফুল আসা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত যথাযথ সুগন্ধি-শস্যদানার জন্য প্রয়োজন সামান্য আর্দ্রতা, মৃদু বাতাস, শীতল রাত্রি অর্থাৎ ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং রৌদ্রজ্জ্বল আলোকিত দিন অর্থাৎ ২৫-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। সব ধরনের মাটিতেই সুগন্ধি ধানের চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি সুগন্ধি চাষাবাদের জন্য বেশি উপযোগী বলেও জানান কৃষিবিদরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের উপপরিচালক (মনিটরিং) মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের যা চাষাবাদ হচ্ছে তার মধ্যে কাটারিভোগ,  সোনামুখি, ব্রি ধান ৩৪, ব্রি ধান ৫০, ব্রি ধান ৬৪ একটু বেশি, যা গড় উৎপাদন হয় ২.৩৩ মেট্রিক টন। সরেজমিন বিভাগে সর্বশেষ তথ্যে পাওয়া  গেছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সুগন্ধি ধান উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন। এদিকে সুগন্ধি চালের দিনকাল কেমন সে হিসেবে জানা  গেছে, এখনো দিনাজপুরের কাটারিভোগ সুগন্ধি চাল দেশি-বিদেশি অতিথি আপ্যায়নে সুনাম বজায় রেখেছে। দিনাজপুরের কৃষকরা বিভিন্ন উৎসবে এই চাল ব্যবহার করে থাকেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলে সুগন্ধি চালের উৎপাদনও অনেকাংশে বেড়ে গেছে মনে করেন কৃষিবিদরা। কৃষিসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু রাসায়নিক সার দিয়ে চাষ করলে আধুনিক জাতে স্থানীয় জাতের ধানের মতো সুগন্ধিযুক্ত হয় না। তাই প্রচুর জৈবসার ব্যবহারের মাধ্যমে চাষাবাদ করা হলে সুগন্ধি চাল তার নিজস্ব সুঘ্রাণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে ধান পরিপক্ব হলে অর্থাৎ অধিকাংশ ধানের ছড়ায় শতকরা ৮০ ভাগ ধান পেকে গেলে ধান কাটতে হবে। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা জানান, দেশের চাহিদা ও কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় আধুনিক জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব আধুনিক জাতে উৎপাদন বেশি এবং ঘ্রাণও ঠিক রাখা হয়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিস সংশ্লিষ্টরা জানান, ধানের শীষ বের হওয়ার আগে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা ছাড়া উৎপাদনের সময়  পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে ফসলের মাঠে নিবিড় পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। দেশি উন্নত মানের সুগন্ধি চাল সম্পর্কে ধারণা ও প্রচারের অভাব থাকায় নামিদামি হোটেল, রেস্তরোঁয় আমাদের জনপ্রিয় সুগন্ধি চালের পরিবর্তে বিদেশি চাল ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। যেগুলোর অধিকাংশতেই সুঘ্রাণ নেই। কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাটারিভোগ  ক্ষেতে গোবর সার ফেললেও পার্শ্ববর্তী ক্ষেতের রাসায়নিক সারের প্রভাবে ঘ্রাণ ও গুণগতমান বজায় রাখা যায় না। দিনাজপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, ২০১৫-১৬ সালে জেলায় সুগন্ধি ধানের আবাদ বাড়লেও কমেছে কাটারিভোগ ধানের আবাদ। কাটারিভোগ ধান আবাদ হয়েছে ১ হাজার ১১০  হেক্টর জমিতে। ২০১৬-১৭ কাটারিভোগ ধানের আবাদ আরো কমে মাত্র ২৫৪  হেক্টর জমিতে এর আবাদ হয়। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিক পরিমাণে সুগন্ধি ধান চাষাবাদে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি রফতানির সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুগন্ধি চালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ১৩৬টি দেশে রফতানি করছে বলেও তথ্যে জানা যায়। একাধিক কৃষিবিদ জানিয়েছেন দেশিয় জাতগুলো ছোট চাল হয় আর ফলন কম। তবে ব্রি  যেগুলো আবিষ্কার করেছে সেগুলোতেও পুরোপুরি সুঘ্রাণ দিতে পারেনি। সেই সঙ্গে স্বাদও দেশি জাতগুলোর মতো হয়নি। এই চালগুলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং দিয়ে জিন স্থানান্তর করা হলে শতভাগই ঘ্রাণ ও স্বাদ পাওয়া যাবে। বর্তমানে যা করা হয়েছে সেগুলো হাইড্রিজাইটেশন। ফসল স্থানান্তর করা হলেও জিন স্থানান্তর না করার কারণেই ঘ্রাণ ও স্বাদ পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে কৃষিবিদরা জানান। এছাড়া দিনাজপুর কাটারিভোগের জন্য বিখ্যাত থাকলেও এখন ব্রি ৩৪, ব্রি ৭০, ব্রি ৮০ ব্যাপকহারে চাষাবাদ হয়। কৃষকদের সুগন্ধি ধানের দাম নিয়ে ব্রি মহাপরিচালক বলেন, আমাদের বিদেশে রফতানির অনেক সুযোগ আছে। তবে এজন্য বাজার সৃষ্টি করাও গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে কৃষকরাও তাদের ন্যায্যমূল্য পাবে। তবে কোনো সুগন্ধি জাত হারিয়ে যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। এদিকে বাজারে অন্যান্য চালের চেয়ে সব সময় বেশি থাকে সুগন্ধি চালের দাম। কৃষকরা স্বল্প পরিসরে চাষাবাদ করলেও হারানো  গৌরব ফেরাতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা আর প্রচারে আরো গুরুত্ব  দেওয়ার কথা বলেন কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, সুগন্ধি চালের দেশি বাজারের চাহিদা আছে আগের মতোই। তবে বাজারে সুগন্ধি নামে যা পাওয়া যায় সেখানেই পরিপূর্ণ সুঘ্রাণ পাওয়া যায় না। এ ছাড়া ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে কৃষকের মধ্যে আরো আগ্রহ বাড়বে।

আরো খবর...