বিজয়ের মাসে সংসদ নির্বাচন ভাবনা

॥ মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী ॥

ডিসেম্বর, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাস। মাসটি শুধু ১৯৭১ সালেই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছরই বিজয়ের মাসটিকে আমরা একদিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম এই মাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের শৌর্যবীর্য থেকে প্রেরণা নেয়ার চেষ্টা করে থাকে। ডিসেম্বরকে তাই আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনন্য প্রেরণা সৃষ্টিকারী মাস হিসেবে আমরা পালন করে থাকি। ডিসেম্বর মাসে যা কিছু আমরা করি আমাদের বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার চিন্তা কার্যকর থাকে- অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি নয় এমন কোনো কাজ করা থেকে আমরা বিরত থাকার চেষ্টা করি। সেই বিবেচনা থেকে এবার ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদের একাদশ নির্বাচন। এর আগে ২০০৮ সালেও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৯ ডিসেম্বর। জনগণ সে দিন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বস্ত  থেকে যে রায় প্রদান করেছিল তাতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিজয়ী দল ও জোট নতুন সরকার গঠন করে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার এতদিন ঝুলেছিল সেটি শুধু শুরুই করেনি অনেকটা সম্পন্ন করেছে, পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংযোজনের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে দেশ ও জাতির ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার পাঠক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে দিনবদলের সনদ রূপকল্প উপস্থাপনের মাধ্যমে সরকার দেশ ও জাতির আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধনের চেষ্টা করেছে। নির্বাচনের আগে সেক্টর কমান্ডার্স  ফোরাম এবং তরুণ সমাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপন করেছিল। আওয়ামী লীগ সেই দাবি রূপকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ফলে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতি সমর্থন জানাতে থাকে। এর নজির ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দেখা যায়। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার কারণে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে, বাংলাদেশে ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তিসমূহ প্রায় সাড়ে তিন দশক কমবেশি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে ছিল। সেখান থেকে ১৯৯৬-২০০১ সময়ে অনুকূল অবস্থায় থাকলেও ২০০১-২০০৬ সময়ে চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে পড়েছিল। রাষ্ট্রশক্তি ১৯৭৫-পরবর্তী সময় থেকে ২০০৮ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুকূলে খুব একটা ছিল না। রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি প্রবলভাবে শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ যে একটি মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ হিসেবে দাবি করত সেটি অনেকটাই পরিহাসমূলক ছিল। ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক, বেসামরিক এমনকি নির্বাচিত ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬)-এর শাসনকালেও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে অনেক দূরে ছিটকে পড়েছিল, সরকারগুলো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিসমূহকে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, শিক্ষার সংস্কৃতি এবং সমাজের সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমনকি স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে সরকার গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শে দেশ পরিচালনা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের নাম উচ্চারণ করলেও বিকৃত ইতিহাস পাঠ্যপুস্তক ও রাজনীতিতে ভরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ধারণায় বেড়ে উঠতে রণকৌশল বাস্তবায়ন করেছিল। ফলে বাংলাদেশে তরুণ সমাজের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাধা ব্যাপকভাবে ছিল। তরুণরা জানতেই পারেনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব  কোন রাজনৈতিক শক্তি কীভাবে দিয়েছিল। বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র  দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কারা ছিল, শত্রু-মিত্র  দেশগুলোর ভূমিকা কি ছিল তা বিকৃতভাবে জানা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। সে কারণে দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের তরুণদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিকৃতি ইতিহাস জানা, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত নেতৃত্বের চরিত্র হননের ধারণা পাওয়া ছাড়া সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ পায়নি। এই তরুণরাই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা (!) জানাতে দেখেছে। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার বিকৃত ইতিহাস প্রচার মাধ্যমে শুনেছে, আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা জানতে পারেনি, পাকিস্তানিদের গণহত্যাকে ‘শত্রু’ বাহিনীর অত্যাচার হিসেবে জেনেছে। ভারতসহ মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী দেশসমূহ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকায় বেশকিছু সরকার প্রচার করেছিল। মূলত এই সরকারগুলো ধরেই নিয়েছিল এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রতারণার মাধ্যমে তারা দেশ ও জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ  থেকে চিরকাল দূরে রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এবং মুক্তিযোদ্ধারা নতুনভাবে জেগে উঠেছিল, তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার এমন রাজনীতি আর দেখতে চায়নি, দাবি করেছিলেন একাত্তরের ঘাতকদের বিচার। যদিও এই দাবি বহু আগে থেকেই ধীরে ধীরে উচ্চারিত হয়েছিল, ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, দেশে প্রতীকী গণআদালতে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির বিচার দেয়া হয়েছিল এবং দাবি করা হয়েছিল এই বিচার যেন দেশের আদালতে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার শুধু এই বিচারকে এড়িয়েই যায়নি যুদ্ধাপরাধীদের দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে। নির্বাচনে বিজয়ী জোট সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশে অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে নির্মূল করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিল, দেশে জঙ্গিগোষ্ঠীকে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সুযোগ করে দিয়েছিল। দেশব্যাপী জঙ্গিবাদের চরম উত্থান, বোমাবাজি, হত্যা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, রাজনৈতিক নেতাদের মেরে ফেলা এবং দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িকতার উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার যে আবহ তৈরি করেছিল সেটি কোনো অবস্থাতেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে বাস্তবতার সঙ্গে মিল খায়নি। এর ফলে দেশব্যাপী নীরবে সেই সরকার এবং সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর প্রতি চরম ঘৃণা জেগে উঠতে থাকে। সেটিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম গঠন এবং দেশব্যাপী একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের দাবির মাধ্যমে। বলা যায় ২০০৮ সালে বিজয়ের মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তরুণ সমাজ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বস্ত জনগোষ্ঠী তাদের মত প্রকাশে সুযোগটি গ্রহণ করেছিল, ভোটযুদ্ধে বেশিরভাগ ভোটারই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ভোটদানের মাধ্যমে বিজয়ের মাসের চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। এটিকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের প্রতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অন্তরের লালিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখতে হবে। বলা চলে জনগণের এই ভোট ও রায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে দেশ পরিচালনায় এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে অসীম প্রেরণা দিয়েছিল। এর ফলে গত ১০ বছর সরকার বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক শিক্ষার সংস্কৃতি এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে সেটি বাংলাদেশকে গৌরবের নতুন উচ্চতায় নিতে সাহায্য করেছে। এবার কাকতালীয়ভাবে একাদশ নির্বাচনটিও ডিসেম্বর মাসে ৩০ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং প্রশাসনসহ সমাজের সর্বত্র পরিপূর্ণভাবে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের ধারার অনুকূলে রাষ্ট্র যেহেতু গত ১০ বছর পরিচালিত হয়েছে ফলে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশ উল্লেখযোগ্যভাবে ঘটেছে, তরুণদের একটি বড় অংশ এখন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও অবস্থান সংহত করতে পেরেছে, দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংবলিত বই-পুস্তক প্রচার-প্রচারণা এখন সর্বত্র অবারিত। সামাজিক গণমাধ্যমে তরুণদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করছে, বিরোধীদের কূটকৌশল, অপপ্রচার, মিথ্যাচার, বিকৃত ইতিহাসের জবাব তারাই দিচ্ছে। বলা চলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক তরুণ প্রজন্মের এই অংশ দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর ফলে সময়ের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তারা আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশ যে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল তার ঝা-া তুলে নেয়ার নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। এরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির রাজনীতি, দর্শন, কূটকৌশল এবং প্রচার-প্রচারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সক্ষম হবে বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি গোষ্ঠী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বত্র ঘাপটি মেরে থাকার কারণে নিরন্তর আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিরাপদ হওয়ার নয়। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদীর এবং মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস ধারণা পোষণকারী রাজনৈতিক শক্তি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। এই শক্তি এবারের নির্বাচনে নতুন কৌশলে অংশ নিতে যাচ্ছে। এক সময়ের কিছু আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থি নেতা বেশ কয়েক বছর আগে দলছুট অবস্থায় ছিলেন। তারা এবার নির্বাচনে একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। বলা চলে নির্বাচনে জয়লাভের জন্য তারা দ্বারস্থ হয়েছেন বিএনপি-জামায়াতের বিশ দলীয় ঐক্যজোটের কাছে। যদিও সমান্তরাল আরেকটি জোট গঠনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নাম ধারণ করে এই জোট গঠিত হয়েছে কিন্তু নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ গ্রহণ করে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বিএনপির আদর্শকেই অনেকটা ধারণ করেছেন। এই প্রতীকটি এখন জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের এককালের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী নেতারাও নিয়েছেন। ফলে নির্বাচনী এই লড়াইটি হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি তথা নৌকা বনাম ধানের শীষ তথা আওয়ামী বিরোধী গোষ্ঠীসমূহের লড়াইয়ের মধ্যে। ঐক্যফ্রন্ট দাবি করেছে তারা জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেÑ যেখানে জামায়াত এবং বিএনপি তাদের কাছে মিত্রশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অথচ জামায়াত এবং বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি কতটা বিশ্বস্ত নাকি অবিশ্বস্ত সেটি তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। মূলত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে জামায়াত ও বিএনপি প্রতিহত করতে গিয়ে দেশব্যাপী যে তান্ডব, অগ্নিসংযোগ, হরতাল, অবরোধ, পোড়াপুড়ি ইত্যাদি সংঘটিত করেছিল সেটি ছিল নজিরবিহীন বীভৎস ঘটনা, জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ সে কারণেই তখন পায়নি, নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারেনি। কিন্তু এখন ওই নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু না হওয়ার দায় সরকারের ওপর চাপানো হচ্ছে, দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতকে। এই কৌশলটি জামায়াত এবং বিএনপির তৎকালীন ভূমিকাকে আড়াল করার একটি অপকৌশল মাত্র। বিএনপি এবং জামায়াত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পন্ড করতে গিয়ে দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত করতে সক্ষম হলেও নির্বাচনটি সম্পূর্ণরূপে পন্ড করতে পারেনি। ফলে সরকার দৃঢ়ভাবে সেই ষড়যন্ত্র মোকাবেলার মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে দেশকে রূপকল্প-২০০৮ ইশতেহার মোতাবেক ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত করেছে। এর ফলে রাজনৈতিক সংকটে পড়েছে বিএনপি এবং জামায়াত। বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং অন্যান্য বিচার সম্পন্ন করার ফলে এই দুটো দল সাংগঠনিকভাবেই শুধু সংকটে পড়েনি, রাজনৈতিকভাবেও দেশে এবং বিদেশে বেশ শক্তভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। যে রাষ্ট্রগুলো আগে এই দুটো দলের মিত্র ছিল তারাও এদের ভূমিকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। জামায়াত এবং বিএনপি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি যে বিরূপ অবস্থান নিয়েছিল সেটিও অনেক দেশ জানতে পেরেছে। বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকালে জামায়াত এবং বিএনপির বিদেশে বিচার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রচার করেছিল, বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এসব কারণে অনেক মিত্র তারা হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। বলা চলে জামায়াত এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে একটি চরম সংকট ও দেউলিয়াপনায় পড়েছে, ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা দল দুটো হারিয়ে ফেলেছে, জামায়াতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা যুদ্ধাপরাধী বিচারে দন্ডিত হয়েছে। ফলে দলটির নেতৃত্বে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন অর্থ কেলেঙ্কারির মামলায় দন্ডিত হয়ে জেলে গেছেন। দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা এক দশক আগেই দেশের বাইরে চলে গেছেন। ফলে দলটি নেতৃত্বের সংকটে আছে। বিএনপি এবং জামায়াত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে ধারায় ইতোপূর্বে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ২০০৮ সাল পরবর্তী সময় থেকে তাতে অবনতি ঘটতে থাকে। বিশেষত বিএনপির মতো দলটি নতুন বাস্তবতায় দলের আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং রাজনীতিকে পুনর্মূল্যায়ন না করে জামায়াত তথা সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে আরো বেশি জনবিচ্ছিন্নতায় পড়তে থাকে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়তে থাকে। এটিই মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০৮ পরবর্তী সময়ে যে মুক্তিযুদ্ধের ধারার উত্থান ঘটেছিল তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার বিষয়। এক সময় যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে অপরাজেয় ভাবা হতো সেটি ২০০৮-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের ফলে দুর্বলতর হতে থাকে। বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে একটি অসাম্প্রদায়িক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ধারায় বিকশিত হওয়ার পর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। এরই বহিঃপ্রকাশ ভবিষ্যতে ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

বলা হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরকারি ও বিরোধী দল- উভয়েই হবে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী গণতান্ত্রিক দল। কিন্তু দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হলো বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের দল হিসেবে দাবি করলেও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে এর আদর্শগত সম্পর্ক ও গাঁটছড়া অবস্থান থাকার কারণে কোনোকালেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য দল হতে পারেনি। বর্তমান সংকটকালে দলটি হয়তো পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু সেই ধারা দলের মধ্যে দেখা যায়নি। অধিকন্তু ঐক্যফ্রন্টের আদলে একটি জোটের নেতৃত্ব বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্যের মাধ্যমে যেই ধারণাটি দেয়ার চেষ্টা করেছে তাতে বিএনপির আদর্শগত পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আশা করা যায় না। বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট একটি সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নির্বাচনী জোট হিসেবে প্রার্থী ও প্রতীক বরাদ্দ করেছে। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আওয়ামী লীগ ঐক্যফ্রন্টের বিরুদ্ধে ১৪ দলীয় জোট যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় পার্টির সঙ্গে মহাজোটগতভাবে অবতীর্ণ হয়েছে। উভয় জোটের লড়াইটি আদর্শগতভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বনাম বিপক্ষ, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষ বনাম সাম্প্রদায়িকতার শক্তিতে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় এই দুই পরস্পরবিরোধী আদর্শের দ্বন্দ্ব নিরসন সহজে হওয়ার নয়, নির্বাচনে পরস্পরবিরোধী যেই লড়াই চলছে তাতে নৌকা প্রতীকে যেই মহাজোট অবতীর্ণ হয়েছে সেটির বিজয় নিশ্চিত হলে মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিকাশ রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে অব্যাহত থাকবে, অপরদিকে ঐক্যফ্রন্টের প্রতীকে যে শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে সেটির বিজয় ঘটলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যতটুকু অর্জিত হয়েছিল তার তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকবে বলে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কেননা এই নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি জোট হলেও কার্যত এটি জামায়াত-বিএনপির ২০ দলীয় জোটের কাছেই আত্মসমর্পণ করে আছে। ফলে নির্বাচনে তাদের বিজয় ঘটলে ঐক্যফ্রন্টও থাকবে না, মহাজোটেরও অস্তিত্ব বিপন্ন করার চেষ্টা রোধ করা খুব সহজ হবে না। বাংলাদেশ এমনি এক আদর্শিক দ্বন্দ্বের উত্তপ্ত বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এই মাসে রাজনীতির এমন বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনটিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বাসী শক্তিকে দাঁড়াতে হবে, নতুবা বিপর্যয় রোধ করা খুব সহজ হবে না।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

আরো খবর...